কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

শ্রাবণ মাস। প্রকৃতির বহুমাত্রিক রূপ উদ্ভাসিত হয়। মেঘ, বৃষ্টি, রৌদ্রছায়ায় পুরো আকাশে বিছিয়ে দেয় রঙের মহোৎসব। শ্রাবণের শেষ দিন। ১৫ আগস্ট ২০২২। জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালো রাতে ঘাতকরা জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারকে হত্যার ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। জাতি হারায় তার গর্ব, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, ইতিহাসের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। জাতির পিতার ৪৭তম শাহাদতবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুসহ সব শহীদের বিন¤্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক সুতোয় গাঁথা। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। তিনি ছিলেন কৃষি অন্তপ্রাণ। সদ্যস্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে জাতির পিতা কৃষিতে নিয়েছিলেন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ও কার্যক্রম। তাঁরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার ৫০ বছর পর কৃষির সমৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি এবং জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ফসল উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ। খোরপোশের কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর হচ্ছে। কৃষি উন্নয়নের এই সাফল্য সারা পৃথিবীতে বহুলভাবে প্রশংসিত ও নন্দিত হচ্ছে। এ অর্জন সম্ভব হয়েছে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দিকনির্দেশনা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী কার্যক্রম এবং কৃষি বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, সুশীল সমাজ ও কৃষক সমাজের নিবিড় পরিশ্রমের ফলে।
জাতির পিতা কৃষি উন্নয়নে নানামুখী কার্যক্রমের মধ্যে ১৯৭৩ সালে কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। পিতার ধারা অব্যাহত রাখতে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নীতিমালা ২০১৯ প্রবর্তন করেছেন। তারই আলোকে প্রথমবারের মতো কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০’ প্রদান করা হচ্ছে। সে লক্ষ্যে কৃষিকথা শ্রাবণ সংখ্যাটি বিশেষ সংখ্যা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কৃষিকথা এবারের বিশেষ সংখ্যায় কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০ এর গুরুত্ব তুলে ধরে দিকনির্দেশনামূলক বাণী ও সময়োপযোগী তথ্য ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ লেখা দিয়ে যারা সমৃদ্ধ করেছেন তাদের সবার প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এ ছাড়াও নিয়মিত বিভাগ দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের বিশেষ সংখ্যা। যা কৃষি কর্মকা-ের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য আরো বেশি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা উৎস হিসেবে কাজ করবে।

সম্পাদক,

বিস্তারিত
কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০

কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০
মোঃ সায়েদুল ইসলাম
দেশের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কৃষিখাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১১.৫২ শতাংশ। দেশের মোট শ্রমশক্তির চল্লিশ শতাংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষিখাতকে দেশের অর্থনীতির মেরুদ- বললেও অত্যুক্তি হবে না।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে দেশের প্রধান প্রধান শস্য উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের এ ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) খাদ্যশস্য উৎপাদনের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদির উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বঙ্গবন্ধুর কৃষিনীতির পথ ধরেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ খাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ প্রদানের মাধ্যমে খাতটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট এবং বেশ ঘনবসতিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি উৎপাদনে বিশে^র দরবারে গৌরবোজ্জ্বল ও ঈর্ষণীয় অবস্থান তৈরি করেছে। শুধু উৎপাদনেই নয়, রপ্তানি ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে বাংলাদেশ এরই মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারেরও অধিক মূল্যের কৃষিপণ্য রফতানির মাইলফলক অতিক্রম করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশে^ উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং ২০৩১ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আর সেজন্য প্রয়োজন যেকোনো মূল্যে আমাদের  কৃষিখাতের অগ্রগতি অব্যাহত রাখা।
কৃষিতে বিশে^ বাংলাদেশের এমন অবস্থান তৈরি করতে বর্তমান সরকারের নীতি-সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে এই অবদানকে স্বীকৃতি দিতে কৃষি মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি)’ নির্বাচন করার। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নীতিমালা ২০১৯’ প্রণয়ন করেছে। কৃষির চারটি উপখাতে (ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বন) গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর কৃষি বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, উৎপাদনকারী, বাণিজ্যিক কৃষি খামার স্থাপনকারী, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও কৃষি সংগঠক বাংলাদেশী নাগরিকদের মধ্য হতে সর্বোচ্চ ৪৫ জন ব্যক্তিকে এক বছর মেয়াদের জন্য ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি)’ হিসেবে নির্বাচন করা হবে। ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নীতিমালা ২০১৯’ এ উল্লেখিত শর্তসমূহ পূরণ সাপেক্ষে চারটি পর্যায়ে নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। নির্বাচিত এআইপিগণের তালিকা প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হবে। নির্বাচিত এআইপিগণ
নীতিমালায় ঘোষিত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন।
এবারই প্রথমবারের মতো কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ২০২০ এর এআইপি কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত ১৩ জন ব্যক্তিকে এ বছর এআইপি কার্ড ২০২০ বিতরণ করা হচ্ছে। যাঁরা এ বছর এআইপি কার্ড ২০২০ এর জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের আমি আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনাদের সম্মানিত করতে পেরে আমরা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করছি। আমি আশা করছি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে। সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।

লেখক : সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা। www.moa.gov.bd

বিস্তারিত
এআইপি ২০২০ পুরস্কারপ্রাপ্তদের পরিচিতি ও কৃষিক্ষেত্রে অবদান

এআইপি ২০২০
পুরস্কারপ্রাপ্তদের পরিচিতি ও কৃষিক্ষেত্রে অবদান
ড. সুরজিত সাহা রায়, পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত)
“ক” বিভাগ (কৃষি উদ্ভাবন জাত/প্রযুক্তি)
নির্বাচিত-৪ জন
ক্রমিক নং    নাম, পিতা/স্বামী, মাতার নাম ও ঠিকানা    কৃষিক্ষেত্রে অবদান
১.    ড. লুৎফুল হাসান, প্রফেসর
ডিপার্টমেন্ট অব জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়
পিতা : মৃত আবুল হাসান
মাতা : মিসেস ফাতেমা বেগম
বাড়ি নং : ই ২৮/৮, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ সদর, ময়মনসিংহ    বাউধান-৩ এর জাত উদ্ভাবন ;  লবণাক্তসহিষ্ণু বাউ সরিষা-১, বাউ সরিষা-২, বাউ সরিষা-৩ এর জাত উদ্ভাবন।
২.    জনাব আতাউস সোপান মালিক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক
এ আর মালিক সিডস প্রা: লিমিটেড (গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র), প্রাণনগর, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর
পিতা : আতিয়ার রহমান মালিক
মাতা : আফরোজা মালিক
বাসা-৩৮৪, গ্রাম/রাস্তা-ব্লক ডি জোয়ার সাহারা
ডাকঘর : খিলক্ষেত-১২২৯, বাড্ডা, ঢাকা     ২ টি বীজ আলুসহ মোট ১০টি সবজির (মরিচ, বেগুন, শসা, লাউ, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, ধুন্দল, মিষ্টি কুমড়া, বীজ আলু ও ক্যারোলাস) জাত উদ্ভাবন ও বাজারজাতকরণ।
৩.    সৈয়দ আব্দুল মতিন
ফিউচার অর্গানিক ফার্ম
ভরসাপুর, উজলকুড়, রামপাল, বাগেরহাট
পিতা : মো. ফজলুল হক
মাতা : ফজিলাতুন্নেছা
বাসা নং-২০৭, রাস্তা-১০, সোনাডাঙ্গা আ/এ ২য় ফেজ
ডাকঘর : জিপিও ৯০০০, সোনাডাঙ্গা, খুলনা    মেহগনি ফলের বীজ থেকে তেল তৈরী যা জৈব বালাইনাশক প্রস্তুত; মেহগনি খৈল/জৈব সার প্রস্তুত; মেহগনি পাতা থেকে চা তৈরি;
বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪১৮ এ ব্রোঞ্জ পদক; প্যাটেন্টকৃত প্রযুক্তি।
ঙৎমধহরপ ঋবৎঃরষরুবৎ ভৎড়স গধযড়মড়হু; গধযড়মড়হু ঞবধ; চবংঃ পড়হঃৎড়ষ নু গধযড়মড়হু ড়রষ.
৪.    জনাব আলীমুছ ছাদাত চৌধুরী
আলীম ইন্ডাস্ট্রিস লিমিটেড
বিসিক শিল্পনগরী, গোটাটিকর, সিলেট
পিতা : এম এ আলীম চৌধুরী
মাতা : লুৎফা চৌধুরী
বাসা : বসুন্ধরা ৪৩, গ্রাম : রাজবাড়ী
ডাকঘর : সিলেট-৩১০০, সিলেট সদর, সিলেট সিটি কর্পোরেশন, সিলেট    আলীম পাওয়ার টিলার উদ্ভাবন (কপি রাইটকৃত)।

“খ” বিভাগ (কৃষি উৎপাদন/বাণিজ্যিক খামার স্থাপন ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প)
নির্বাচিত-৬ জন
ক্রমিক নং    নাম, পিতা/স্বামী, মাতার নাম ও ঠিকানা    কৃষিক্ষেত্রে অবদান
৫.    আলহাজ্জ মোঃ সেলিম রেজা, দৃষ্টান্ত এগ্রো ফার্ম এন্ড নার্সারী, ডাল সড়ক, নাটোর সদর, নাটোর
পিতা : মো. নাজিম উদ্দিন
মাতা : মোছা: ছাবেদা বেগম
গ্রাম : আলাইপুর, ডাকঘর : নাটোর ৬৪০০
নাটোর সদর, নাটোর পৌরসভা, নাটোর    কৃষি উৎপাদন, বাণিজ্যিক খামার স্থাপন ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন; বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪১৯ রৌপ্য পদক।
৬.    জনাব মোঃ মেহেদী আহসান উল্লাহ চৌধুরী
পিতা : মো. হামির উদ্দীন সরকার
মাতা : মোছা: আরজিনা বেগম
গ্রাম : চামেশ^রী, ডাকঘর : চৌধুরীহাট ৫০০১, ঠাকুরগাঁও সদর, ঠাকুরগাঁও    বাণিজ্যিক কৃষি খামার স্থাপন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন; বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪২৩ এ ব্রোঞ্জ পদক।
৭.    জনাব মোঃ মাহফুজুর রহমান, এশা ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচার ফার্ম, ঝালকাঠি
পিতা : গফুর মোল্লা
মাতা : জমিলা বেগম
গ্রাম : বেশাইন খান, ডাকঘর : বেশহিন খান-৮৪০০, ঝালকাঠি সদর, ঝালকাঠি    বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফল বাগান ও নার্সারী স্থাপন; বাংলাদেশের বৃহত্তর ভিয়েতনামের খাটোজাতের নারিকেলের বাগান স্থাপন; বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪২৩ এ ব্রোঞ্জ পদক।
৮.    জনাব মোঃ বদরুল হায়দার বেপারী, প্রোপ্রাইটর, জাগো কেঁচো সার উৎপাদন খামার, চৌঠাইমহল, নাজিরপুর, পিরোজপুর
পিতা : মো. আলতাফ হোসেন বেপারী
মাতা : আয়েশা বেগম
গ্রাম : বেপারী বাড়ী, চৌঠাইমহল
ডাকঘর : নাজিরপুর, পিরোজপুর    কেঁচো সার উৎপাদন ও সম্প্রসারণ।
৯.    জনাব মোঃ শাহবাজ হোসেন খান, নূর জাহান গার্ডেন, শৌলা, কালাইয়া, বাউফল, পটুয়াখালী
পিতা : আহাম্মদ আলী খান
মাতা : নূরজাহান বেগম
নূর জাহান গার্ডেন, শৌলা, কালাইয়া, বাউফল, পটুয়াখালী    ফল, সবজি, মৎস্য উৎপাদন ও পশু পালনে সাফল্য।
১০.    জনাব মোঃ সামছুদ্দিন (কালু)
বিছমিল্লাহ মৎস্য বীজ উৎপাদন কেন্দ্র ও খামার নাঙ্গলকোট রেলস্টেশন সংলগ্ন, নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা
পিতা : মৃত হাজী আলী আকবর
মাতা : মরিয়ম বেগম
গ্রাম : চেয়ারম্যান বাড়ী, নাঙ্গলকোট
ডাকঘর : নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা    বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ ও সমন্বিতভাবে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রেনু উৎপাদন।

“ঘ” বিভাগ (স্বীকৃত বা সরকার কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত কৃষি ফসল/মৎস্য/প্রাণিসম্পদ/বনজসম্পদ উপখাতভুক্ত সংগঠন)
 নির্বাচিত-১ জন
ক্রমিক নং    নাম, পিতা/স্বামী, মাতার নাম ও ঠিকানা    কৃষিক্ষেত্রে অবদান
১১.    মোঃ জাহাঙ্গীর আলম শাহ, শাহ্ কৃষি তথ্য পাঠাগার ও জাদুঘর কালীগ্রাম, মান্দা, নওগাঁ
পিতা : মৃত আব্দুর রশিদ
মাতা : মোছা: জাহানারা বেগম
গ্রাম : কালীগ্রাম, ডাকঘর : কালীগ্রাম, মান্দ্রা, নওগাঁ    শাহ্ কৃষি তথ্য পাঠাগার ও জাদুঘর স্থাপন; বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪২০ এ রৌপ্য পদক।

“ঙ” বিভাগ (বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কারে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত)
নির্বাচিত-২ জন
ক্রমিক নং    নাম, পিতা/স্বামী, মাতার নাম ও ঠিকানা    কৃষিক্ষেত্রে অবদান
১২.    মোছাঃ নুরুন্নাহার বেগম, নুরুন্নাহার কৃষি খামার, ছলিমপুর (বক্তারপুর), জয়নগর, ঈশ^রদী, পাবনা
স্বামী : মো. রবিউল ইসলাম
মাতা : মোছা: আনোয়ারা বেগম
গ্রাম : বক্তারপুর, ডাকঘর : জয়নগর, ঈশ^রদী, পাবনা    বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪১৭ ব্রোঞ্জ পদক ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪২০ স্বর্ণ পদক।
১৩.    মোঃ শাহজাহান আলী বাদশা
মা-মণি কৃষি খামার
ছালিমপুর (বক্তারপুর), জয়নগর, ঈশ^রদী, পাবনা
পিতা : মরহুম আবু জাফর প্রামাণিক
মাতা : মোছা. সাহাস্তন নেসা
গ্রাম : বক্তারপুর, ডাকঘর : জয়নগর, ঈশ^রদী, পাবনা    বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪০৩ রৌপ্য পদক ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, ১৪০৪ স্বর্ণ পদক।

লেখক : পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। ফোন : ৫৫০২৮২৬০, ই-মেইল : dirais@ais.gov.bd

বিস্তারিত
দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ত্বরান্বিত করবে পদ্মা সেতু

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ত্বরান্বিত করবে পদ্মা সেতু
ড. জাহাঙ্গীর আলম
স্বপ্নের পদ্মা সেতু। ২৫ জুন সকাল ১০টায় এর উদ্বোধন  করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর দিন থেকেই সেতুটির উপর দিয়ে শুরু হয়েছে সকল প্রকার যান চলাচল। তাতে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলো। এতদিন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল খরস্রােতা পদ্মা। এই সেতুর কারণে মানুষের দীর্ঘ নৌপথের যাত্রার প্রয়োজন ফুরাবে। তাদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সূচিত হয়েছে নতুন অধ্যায়। তাদের ভোগান্তি ও সময়ের অপচয় কম হবে। মাত্র ৪-৫ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকা পৌঁছে যাবে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক। ফলে সারা দেশের সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন সুদৃঢ় হবে। কৃষি, শিল্প ও পর্যটন খাতে সাধিত হবে ব্যাপক উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলবে। শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে। মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে চাঙ্গা হবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে সারা দেশের মানুষ।
এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসেবে এ সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ এবং আঞ্চলিক জিডিপি ২.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। অন্য এক হিসেবে সারা দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে ২.২ শতাংশে। তাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাবে প্রায়ে ১ শতাংশ করে। দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও অর্থায়ন ত্বরান্বিত হবে। উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ। তাদের জীবন ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আনবে এই বহুমুখী পদ্মা সেতু। এ সেতুটি আমাদের গর্বের স্থাপনা। সক্ষমতার প্রতীক। এত বড় একটি প্রকল্প নিজ অর্থায়নে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে বিশ^বাসীর সামনে। এটি আমাদের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।
বিশে^র ১১তম দীর্ঘ সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতু। এশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু এটি। দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। সেতুর উপরে চলবে গাড়ি, নিচে চলবে রেল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়েতে। এই সেতুর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম দফায় (১৯৯৬-২০০১) রাষ্ট্র পরিচালনাকালে, ১৯৯৯ সালে। ২০০১ সালের ৪ জুলাই তিনি এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর পর তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। এতে অর্থায়নের কথা ছিল এডিবি, জাইকা ও বিশ^ব্যাংকের। কিন্তু ২০১২ সালে দুর্নীতির চেষ্টার ধোয়া তুলে প্রথমে বিশ^ব্যাংক এবং পরে অন্যান্যরা অর্থায়ন থেকে সরে যায়। ২০১৩ সালের ৪ মে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে ২০১৪ সালে দুর্নীতির চেষ্টা অভিযোগকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে কানাডার আদালত থেকে রায় দেয়া হয়। অতঃপর বিশ^ব্যাংক সেতুটির অর্থায়নে ফিরে আসতে চাইলেও শেখ হাসিনার সরকার সে প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। ওই বছর ১৭ জুন বাংলাদেশ সরকার এবং চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির মধ্যে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। এর পর অনেক সমালোচনা ও অবজ্ঞা উপেক্ষা করে চলতি ২০২২ সালের এই জুন মাসে পদ্মা সেতুর উপরের তলার কাজ শেষ হয়। নিচ তলায় রেললাইন স্থাপনের কাজ চলছে। শুরুতে সেতুটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এখন তা বাস্তবায়নে লেগেছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত আছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের খরচ ১১ হাজার কোটি টাকা। তা ছাড়া রয়েছে রেললাইন নির্মাণের খরচ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে মোট খরচ হবে ৮০ হাজার কোটি টাকার কিছু উপরে। এ পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশের এখনকার এক বছরের মোট বাজটের মাত্র ১২ শতাংশ। তার বিপরীতে দেশের মানুষের যে উপকার হবে তা সীমাহীন। এতে পরিবহন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়বে। মানুষের চলাচল বৃদ্ধি পাবে। পণ্য পরিবহন সহজ হবে। মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে। কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়বে। কৃষির বিভিন্ন উপখাতে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। আমাদের সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে কৃষি বিপ্লব বিকাশের কথা বলা হয়েছে। গত পঞ্চাশ বছরে দেশের অন্য অঞ্চলে তার অনেকটাই সফল হয়েছে। কিন্তু এ লক্ষ্যে পিছিয়ে আছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এর প্রধান কারণ হলো যোগাযোগের অসুবিধা। উপকরণ পরিবহনে দীর্ঘ সূত্রিতা। উৎপাদিত পণ্য বিপণনের দুর্ভোগ। ফসলের মূল্যে অন্যায্যতা। চাষাবাদে কৃষকের কম লাভজনকতা। এসব কারণে ওই অঞ্চলে শস্য নিবিরতা অপেক্ষকৃত কম। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের অভিপ্রায় সফল হবে। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ত্বরান্বিত হবে। দ্রুত বেড়ে যাবে শস্যের উৎপাদন। গড়ে উঠবে কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা। তাতে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আয় বাড়বে। পদ্মা সেতুর কুলঘেঁষে থাকা শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে রয়েছে ফসল চাষের বিস্তীর্ণ জমি। শাকসবজি ও মসলা ফসল উৎপাদনের জন্য এসব জমি খুবই উপযোগী। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সংগে যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় এখানে ফসলের পচনশীলতা হ্রাস পাবে। বিভিন্ন শাকসবজি এবং মসলা ফসলের, বিশেষ করে পেঁয়াজ ও রসুনের উৎপাদন বাড়বে। তাছাড়া এখানকার গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়বে। উৎসাহিত হবে পাটের উৎপাদন। গড়ে উঠবে পাটভিত্তিক শিল্প।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় খাদ্য ভা-ার। কিন্তু এই সুযোগ এতদিন পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ফলে সেখানে সবুজ বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। ধানের ঘাত সহিঞ্চু ও উচ্চফলনশীল নতুন জাতসমূহের বিস্তার ঘটবে। ফলে চাল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে তরমুজের চাষ হয়। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধাসহ বিপণন সমস্যার কারণে কৃষক তরমুজ চাষে তেমন লাভবান হন না। এখন এ সমস্যা দূর হবে এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত তরমুজ প্রেরণ করা সম্ভব হবে। তাতে কৃষকদের তরমুজ বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরে নারিকেল ও সুপারির চাষ হয়। সমতলে হয় পান ও তেজপাতার চাষ। পটুয়াখালীতে মুগডালের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। জাপানসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তা রফতানি করা হয়। তাছাড়া প্রচুর ফুলের চাষ হয় যশোরে। এখানকার ফুল রফতানি হয় বিদেশেও। পদ্মা সেতুর ফলে এসব কৃষিপণ্যের চাষ উৎসাহিত হবে।
যশোর ও ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের কদর আছে দেশজুড়ে। এখন বিপণন ব্যবস্থার উন্নতি হলে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে খেজুর গাছের চাষ হবে। খেজুরের গুড়ভিক্তিক কুটির শিল্প সম্প্রসারিত হবে। পিরোজপুরে নারিকেলের ছোবড়ার তৈরি পাপোষ ও দড়ি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও বিপণন করা হয়। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের ফলে এ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। পদ্মা সেতুর কারণে জায়গা-জমির দাম অনেক বেড়ে গেছে।
প্রাণি-পাখি খাতে পদ্মা সেতুর প্রভাব হবে ইতিবাচক। সেতুটি চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুগ্ধ ও মাংস শিল্প বিকশিত হবে। গরু মোটাজাতাকরণ কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে যাবে। অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠবে। মাদারীপুরের টেকেরহাট এখন দুগ্ধ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এর পরিধি শরীয়তপুর, ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাছাড়া পোল্ট্রি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দানাদার খাদ্য সহজে পরিবহন করার কারণে এর মূল্য হ্রাস পাবে। খামারিরা প্রাণি-পাখি প্রতিপালনে আগ্রহী হবে। দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। তাতে বৃদ্ধি পাবে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান।
দেশের দক্ষিণাঞ্চল মৎস্য চাষ ও আহরণের জন্য খুবই গুরুপূর্ণ। এ দেশে উৎপাদিত চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে আছে অসংখ্য মাছের ঘের। সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। তাতে কাজ করছে অসংখ্য গরিব মানুষ। পদ্মা সেতুর ফলে নিবিড় মৎস্য চাষ উৎসাহিত হবে। রেণুপোনাসহ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশে মৎস্য প্রেরণ সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে। তাতে মাছের অপচয় হ্রাস পাবে। আয় বাড়বে মৎস্যচাষিদের। তাছাড়া সুনীল অর্থনীতি গতিময় হবে। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে মৎস্য খাতের।
পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুুষের কাজের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রাসারিত হবে। কৃষি বহুধাকরণ ও শস্যের বৈচিত্র্যকরণ সহজ হবে। কৃষি ব্যবসায় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। উপযুক্ত কাজ ও আয়ের অভাবে যারা নিজের এলাকা ছেড়ে ঢাকা বা অন্য কোনো এলাকায় চলে গিয়েছিলেন তারা নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে আসবেন। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ নেবেন। তাদের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। দক্ষতা অর্জিত হবে। বিভিন্ন অর্থ উপার্জনের কাজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। ইপিজেড, পাটকল, চালকল পুরো মাত্রায় বিকশিত হবে। মংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থল বন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবন ও সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এগিয়ে যাবে সারা দেশ।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা বিনির্মাণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। তিনি শুরু করেছেন এক বিশাল কর্মসূচি। তার দৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আগামী ৪১ সালে হবে উন্নত দেশের অন্তর্র্ভুক্ত। এর প্রস্তুতি পর্বে তিনি শুধু বড় বড় সেতু নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হননি। এ ছাড়া তিনি গড়ে তুলেছেন ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, দোহাজারি-রামু-কক্সবাজার-গুনদুম প্রকল্পসহ অনেক মেগা প্রকল্প। এদের কোনোটির কাজ শেষ হবার পথে, কোনোটি চলমান। এছাড়া তিনি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও শিশু এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছেন। সারা দেশে গড়ে তুলেছেন ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। আমাদের জিডিপির আকার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মসংস্থান বাড়ছে। হ্রাস পাচ্ছে দারিদ্র্য। সামনে আমাদের কাক্সিক্ষত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার হাতছানি। এই অগ্রযাত্রায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্য কামনা করি।

লেখক : বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। মোবাইল : ০১৭১৪২০৪৯১০, ই-মেইল : ধষধসল৫২@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
রিবন রেটিং পদ্ধতি : স্বল্প পানি এলাকায় পাট

রিবন রেটিং পদ্ধতি : স্বল্প পানি এলাকায় পাট
পচানোর জন্য লাগসই প্রযুক্তি
ড. এ. টি. এম. মোরশেদ আলম
উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় গড়ে উঠা বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জলবায়ু পাট চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তাই বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ। বিগত কয়েক বছরের পাট আবাদের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ৬-৭ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে এবং পাট চাষাবাদকৃত উক্ত জমি থেকে প্রায় ৬০-৭০ লাখ বেল পাটের আঁশ পাওয়া যায়। পাট আঁশের গুণগত মান নির্ভর করে এর পচন প্রক্রিয়ার উপর। বাংলাদেশের যে সমস্ত অঞ্চলে প্রচুর পাটের আবাদ হয় অথচ পাট জাগ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি পাওয়া যায় না সে সমস্ত অঞ্চলের জন্য রিবন রেটিং পদ্ধতিই পাট পচানোর জন্য উত্তম ও লাগসই প্রযুক্তি।
পাটের রিবন রেটিং (পাটের ছালকরণ ও পচন) প্রযুক্তি
বাংলাদেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে ভালো পাট জন্মে। কিন্তু যথাসময়ে পাট পচনের জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত পানির অভাবে এ সমস্ত এলাকায় উৎপাদিত পাটের আঁশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত নিম্নমানের হয়ে থাকে। পাট আঁশের গুণগত মানের উপরই পাটের বাজার মূল্য নির্ভর করে। আর পাট আঁশের গুণগত মান বহুলাংশে এর পচন প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। এমতাবস্থায় স্বল্প পানি এলাকায় পাট পচন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বল্প পানি এলাকার পাট চাষিদের জন্য রিবন রেটিং (পাটের ছালকরণ ও পচন) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এ পদ্ধতিতে পুরো পাট গাছ না পচিয়ে কাঁচা গাছ হতে প্রথমে ছাল বা বাকল ছাড়িয়ে নেয়া হয়। সেই ছাল আগে থেকে তৈরি করা মাটির গর্তে বা চাড়িতে রক্ষিত পানিতে পচানো হয়। এ প্রযুক্তির গোটা প্রক্রিয়া দুটি অংশে বিভক্ত। যথা : ১. পাটের ছালকরণ (রিবনিং), ২. রিবন রেটিং (ছাল পচন)।
পাটের ছালকরণ বা রিবনিং
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে বাঁশের হুক (ইংরেজি ‘ট’ আকৃতির)-এর সাহায্যে পাটের ছাল ছাড়ানোর জন্য একটি নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছে। এক্ষেত্রে প্রথমিকভাবে ৬ ফুট বা ১৮০ সে. মিটার লম্বা বোরাক বাঁশের যে কোন প্রান্ত ধারালো দায়ের সাহায্যে কোনাকোনিভাবে কেটে বাঁশের হুক তৈরি করে উক্ত হুকের সাহায্যে পাটের গাছ থেকে ছাল পৃথক করা হয়। পৃথককৃত ছালকে বলা হয় রিবন এবং ছাল বা বাকল পৃথক করার প্রক্রিয়াকে রিবনিং বলা হয়।
পরবর্তীতে শক্ত, মজবুত ও দ্রুত কার্যকর লোহার ‘সিঙ্গেল রোলার রিবনার’ এবং ‘ডাবল রোলার রিবনার’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ সমস্ত ছালকরণ যন্ত্র বা রিবনারের সাহায্যে সহজেই কাঁচা পাট গাছ থেকে ছাল ছাড়ানো যায়।
প্রথমে বাঁশ খ-টির গোড়ার ১ ফুট পরিমাণ অংশ মাটির মধ্যে শক্ত করে পুঁতে দিতে হবে। পাশাপাশি ৩-৪ ফুট বা ৯০-১০০ সেমি. দূরে দূরে প্রয়োজনমতো এরূপ বেশ কয়েকটি বাঁশের হুক স্থাপন করা যেতে পারে।
অতঃপর বাঁশের হুকগুলোর সঙ্গে একটি মুরুলী বাঁশ দিয়ে আড়াআড়িভাবে আড়া বাঁধতে হবে যার উপর পাট গাছ জমি থেকে কেটে এনে দাঁড় করিয়ে রাখা যাবে। পাট গাছগুলো বঁাঁশের আড়ার উপর দাঁড় করানোর পূর্বে যথাসম্ভব হাত দিয়ে পাতা ঝরিয়ে গাছের গোড়ার ৩-৪ ইঞ্চি বা ৮-১০ সেমি. অংশ একটি শক্ত কাঠের হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলে নিতে হবে।
প্রতিটি গাছের গোড়ার থেঁতলানো ছালগুলো হাত দিয়ে দুই ভাগ করে পাট গাছের গোড়া হুকের মধ্যে রাখতে হবে। গোড়ার ছালের দুই ভাগ পৃথকভাবে হাতে ধরে একসাথে জোরে টান দিলে দেখা যাবে পাটের ছালগুলো সহজেই পাটখড়ি থেকে আলাদা হয়ে গেছে এবং পাট খড়ি সামনের দিকে চলে গেছে। এভাবে ৪-৫টি পাট গাছের ছাল একসঙ্গে ছাড়ানো সম্ভব। একইভাবে সিঙ্গেল রোলার ও ডাবল রোলার রিবনারের সাহায্যেও পাটের রিবনিং করা যেতে পারে। ছালগুলোকে গোলাকৃতির মোড়া বেঁধে পচানোর জন্য পানিতে জাগ দিতে হবে। সম্প্রতি বিজেআরআই কর্তৃক পাওয়ার জুট রিবনার উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে দ্রুত কম সময়ে ও কম পরিশ্রমে রিবনিং করা যাবে।
রিবন রেটিং প্রক্রিয়া (ছাল পচন)
রিবনিং প্রক্রিয়ায় পৃথককৃত ছাল বা বাকলগুলোকে তিনভাবে পচানো যায়। যথা- ক. বড় মাটির চাড়িতে; খ. পাটক্ষেতের আশে পাশে ছোট ডোবা, পুকুর বা খালে ও গ. মাটির তৈরি গর্তে।
ক. বড় মাটির চাড়িতে ছাল পচন : বড় মাটির চাড়িতে ছালগুলোকে গোলাকার মোড়া বেঁধে সাজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে চাড়িটি ভরে দিতে হবে। একটি বড় চাড়িতে প্রায় ৩০ কেজি ছাল পচানো যায়।
খ. পাট ক্ষেতের আশে পাশে ছোট ডোবা ও পুকুরে ছাল পচন : পাটক্ষেতের আশ পাশে যদি ছোট ডোবা, পুকুর বা খাল বা কম গভীরতা সম্পন্ন জলাশয় থাকে তবে ছালগুলোকে মোড়া বেঁধে একটি লম্বা বাঁশের সংগে  ঝুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে পচানো যায়।
গ. মাটির তৈরি গর্তে ছাল পচন : প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদিত পাট গাছের কাঁচা ছালের পরিমাণ হয় প্রায় ৩০০০-৪৫০০ কেজি। এ পরিমাণ পাট ছালের জন্য বসতবাড়ির আশ পাশে বা পাট ক্ষেতের পাশে ১০-১২ ফুট দৈর্ঘ্য, ৬-৮ ফুট প্রস্থ এবং         ২-৩ ফুট গভীরতা বিশিষ্ট গর্ত খুঁড়ে গর্তের তলা ও দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বরাবর চারিদিকের কিনারা পর্যন্ত পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে। পলিথিনের মাপ অনুযায়ী গর্তের                  দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-গভীরতা কম বেশি হতে পারে। অতঃপর পরিষ্কার পানি দিয়ে গর্তটি ভরে দিয়ে তারমধ্যে পাটের কাঁচা ছালগুলো মোড়া বাঁধা অবস্থায় ডুবিয়ে দিতে হবে। ছালের ডুবানো মোড়াগুলো কচুরি পানা দিয়ে ঢেকে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
রিবন রেটিং প্রযুক্তিতে কম সময়ে পাটের ছাল পচানোর পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে দুইভাবে পচন সময় কমানো সম্ভব। ১. প্রতি ১০০০ কেজি ওজনের কাঁচা ছালের জন্য ১৫০-২০০ গ্রাম ইউরিয়া সার পচন পানিতে মিশেয়ে দিলে পচন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ২. ছোট বালতি বা মাটির হাঁড়িতে ২/১ টা পাট গাছ ছোট ছোট টুকরা করে আগে থেকেই পচিয়ে নিতে হবে। অতঃপর ওই বালতি বা হাঁড়ির পানি ছাল পচানোর জন্য নির্ধারিত চাড়ি বা মাটির গর্তের পানিতে মিশিয়ে দিতে হবে। এর ফলে পানিতে পাট পচনকারী জীবাণুুর দ্রুত বংশবৃদ্ধি হয়ে পচন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে এবং কম সময়ে ছালের পচন কাজ সম্পন্ন হবে।
রিবন রেটিং প্রযুক্তিতে ছালের পচন সময় নির্ধারণ করার পদ্ধতি : রিবন রেটিং প্রযুক্তিতে ছাল পচাতে খুব কম সময় লাগে। কাজেই ছাল পানিতে ডুবানের ৭-৮ দিন পর থেকে পচন প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দুই একটি ছাল পানি থেকে তুলে ভলো করে ধুয়ে দেখতে হবে। যদি পাটের আঁশগুলো পরস্পর ভালোভাবে পৃথক হয়েছে বলে মনে হয়, তবে আর দেরি না করে সাথে সাথে পরিষ্কার পানিতে ছাল ধুয়ে আঁশ সংগ্রহ করতে হবে। এ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পাট আঁশের গুণগত মানের উপরই আঁশের বাজার মূল্য নির্ভর করে।
রিবন রেটিং প্রযুক্তিতে পাটের ছাল পচানোর সুবিধা : ছাল পচানোর জন্য পানি কম লাগে; আঁশে কাটিংস মোটেই হয় না; আঁশের গুণগত মান খুব ভালো হয়, ফলে বাজারমূল্য বেশি পাওয়া যায়; ছাল পচানোর জন্য স্থান ও সময় কম লাগে; পরিবহন খরচ কম হয়; এটি একটি স্বাস্থ্যকর পচন ব্যবস্থা ও এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক পদ্ধতি।
বাংলাদেশের শুষ্ক অঞ্চলসমূহে বিশেষ করে বৃহত্তর যশোর, কুষ্টিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহের কিছু অংশে উন্নত মানের পাট ফসল উৎপন্ন হয় কিন্তু পচন পানির অপর্যাপ্ততা ও প্রয়োজনীয় পানির অভাবেই উৎপাদিত পাট থেকে যে আঁশ পাওয়া যায় তা প্রায়ই নিম্ন মানের হয়ে থাকে। এখানে উল্লেখ্য, স্বল্প পানি এলাকায় রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচন উৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিজস্ব উদ্যোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি রিবনার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাটচাষি কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের শুষ্ক অঞ্চল বা স্বল্প পানি এলাকার পাটচাষিগণ বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত রিবন রেটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত মানের পাট আঁশ উৎপাদন করতে সক্ষম হবেন বলে গবেষকগণ মনে করেন। বাংলাদেশের জমির শস্য পর্যায়ক্রমিক চাহিদা, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা ও বহুবিধ প্রয়োজনে বাংলাদেশের মাটিতে পাট চাষ অব্যাহত থাকবে। তাই, এদেশের কৃষক তথা পাট চাষিদের  স্বার্থেই উন্নত পাট পচন প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত মানের পাটের আঁশ উৎপাদন করে কৃষক তথা দেশের আয় ও সুনাম বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগ, বিজেআরআই, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৭৪০-৫৫৯১৫৫। ই-মেইল : সড়ৎংযবফনলৎর@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
মুগডালের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

মুগডালের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
ড. মোঃ ওমর আলী
সৃষ্টির আদিকাল থেকেই বাংলাদেশে ডাল চাষ হয়ে আসছে। আর সেই সাথে আমাদের খাদ্য  সংস্কৃতিতে ডাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কারণ ডাল থেকে পাওয়া যায় সহজে হজমযোগ্য আমিষ। ডাল গরিবের মাংস হিসেবে পরিচিত। বিশ^ খাদ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিদিন একজন মানুষের ৪০-৪৫ গ্রাম ডাল খাওয়া উচিত। কিন্তু আমরা সেখানে খাচ্ছি মাত্র ১৭ গ্রাম। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অথচ আমাদের দেশে স্বল্প পরিচর্যা ও বৃষ্টিনির্ভর ফসল হিসেবে ডালের চাষ হয়ে আসছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টিস্বল্পতা দূর করতে, মাটির হারানো উর্বরাশক্তি ফিরে পেতে, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ডালের আবাদ বৃদ্ধি এ সময়ের অগ্রগণ্য দাবি। ডাল আবাদে জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে উন্নত জাত ও প্রযুক্তি, ভালো বীজ এবং অনেক ক্ষেত্রে উপযোগী জমির বিষয়ে খেয়াল রেখেই বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডাল গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীবৃন্দ উদ্ভাবন করেছেন উচ্চফলনশীল জাত ও উন্নত প্রযুক্তি। এসব উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে ডাল ফসলের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে উল্লেখ্য, ডাল ফসলের সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উপরই অনেকাংশেই নির্ভর করে বীজের মান। কিন্তু দেখা যায় সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময়ই সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন না করার জন্য বীজের পরিমাণ ও গুণাগুণ অনেকাংশে কমে যায়। গবেষণায় দেখা যায় অন্যান্য সকল বিষয় অপরিবর্তিত রেখেও শুধু ভালো বীজ ব্যবহারের মাধ্যমেই কোন ফসলের ফলন ১৫-২০% বৃদ্ধি করা সম্ভব। আর ভালো মানের বীজ থেকেই পাওয়া যায় ভালো ফসল। সুতরাং ভালো বীজ উৎপাদনের পাশাপাশি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্পর্কে কৃষকের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে এবং তা সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।
মুগডালের ভালো বীজের বৈশিষ্ট্য : উচ্চফলনশীল হতে হবে; বীজ বিশুদ্ধ হতে হবে; বীজ রোগ ও পোকামুক্ত এবং রঙ হবে উজ্জ্বল; সম আকারের বীজ দানা পুষ্ট হতে হবে; বীজে পানির পরিমাণ ৯-১০% এর মধ্যে থাকতে হবে; সর্বোপরি, বীজের গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৭৫ ভাগের ওপরে হতে হবে; দেশে ৪ ধাপে বীজ বর্ধন হয়ে থাকে, যথা-মৌল বীজ (ব্রিডার বীজ), ভিত্তি বীজ, প্রত্যয়িত বীজ ও মানঘোষিত বীজ (ঞখঝ) এবং এগুলোর সাথে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জড়িত।কৃষকগণ প্রত্যয়িত বীজ ও মানঘোষিত বীজ উৎপাদন করতে পারেন। এই সমস্ত বীজের গুণগত মান বজায় রাখার জন্য সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট মানদ- মেনে চলা হয়।
মুগডাল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময় করণীয়  
ফসল কর্তন : সঠিক সময়ে ফসল কর্তন করলে একদিকে যেমন বেশি ফলন পাওয়া যায়, অন্যদিকে মানসম্মত ফসলও পাওয়া যায়। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে কর্তন না করলে প্রায় ৫-৭% ফসল/দানা ঝরে মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য পরিপক্ব ডাল জমিতে অধিক সময় না শুকিয়ে সময়মতো কেটে সরাসরি মাড়াই স্থানে নেয়া উচিত। এখানে উল্লেখ্য যে, ফসল কাটতে হবে কিন্তু মাটি থেকে টেনে উঠানো ঠিক নয়। কারণ এতে শিকড়ের সাথে মাটিসহ অন্যান্য উপাদান মিশে বীজের গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং মাটিও তার কিছুটা জৈব পদার্থ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।
মাড়াই ও শুকানোর স্থান : মাড়াই ও শুকানোর স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। মাড়াই ও শুকানোর জন্য পলিথিন সীট, পাকা মেঝে বা মাটির ওপর গোবরের প্রলেপ ব্যবহার করা যেতে পারে। মাড়াই ও শুকানোর স্থান অবশ্যই পোকামাকড় ও জীবাণুমুক্ত হতে হবে। বিভিন্ন ময়লা দানার সাথে মিশে দানাকে খাওয়ার/বীজের অনুপযোগী করে তোলে, যার ফলে ফসলের বাজারমূল্যও কমে যায়।
মুগের পড সংগ্রহের উপযোগী অবস্থা : সাধারণত অধিক পাকলে দানা ঝরে যায়। শুঁটি বা পড কালচে রঙ হলে বুঝতে হবে পরিপক্ব হয়েছে। খরিফ-১ ও বিলম্ব রবিতে সব ফল/পড এক সাথে পাকে না। ২-৩ বারে ফল সংগ্রহ করতে হয়। পরিষ্কার সূর্যালোকে ফল তুলে শুকিয়ে লাঠি দ্বারা মাড়াই করতে হবে। তবে খরিফ-২ মৌসুমে সব ফসল একসাথে পাকে, তখন গাছ কেটে এনে শুকিয়ে গরু ঘুরিয়ে/লাঠি দ্বারা খুব সাবধানে পিটিয়ে মাড়াই করতে হবে।
দানা পরিষ্কারকরণ : দানা সব সময় পরিষ্কার স্থানে শুকানো দরকার; ঝাড়াই কাজে বাঁশের কুলা ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া ফ্যানের বাতাসে বা মেশিনের সাহায্যেও বীজ ঝাড়াই বাছাই করা যেতে পারে। তবে প্রবল বাতাসে দানা ঝাড়াই করা উচিত নয়; সঠিক মাপের চালুনি দিয়ে দানা চেলে নিতে হবে; স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ঝাড়াইয়ের সময় মুখে পাতলা কাপড় বেঁধে নেয়া উত্তম।
গুদামজাতকরণের জন্য বীজ শুকানো : মাড়াইকৃত মুগডাল পরিষ্কার করে সূর্যের তাপে শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে। বীজ সারাদিন ধরে না শুকিয়ে ৪-৫ ঘণ্টা করে ৩-৪ দিন শুকালে বীজ ভালো থাকে; শুকানোর সময় হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ক্ষতি এড়াতে পলিথিন শিট ব্যবহার করা উত্তম; আর্দ্র বীজ একসাথে অধিক পরিমাণ জড়ো করে না রেখে ছড়িয়ে রাখা উচিত; বৃষ্টির পর বীজ পুনরায় শুকিয়ে নিতে হবে; বীজ এমনভাবে শুকাতে হবে যাতে বীজে আর্দ্রতার পরিমাণ ৯-১০% থাকে; বীজ দাঁতের নিচে দিয়ে কট শব্দ করলে বুঝতে হবে বীজ শুকিয়েছে; শুকানো বীজ বাতাসে রেখে ঠা-া করতে হবে।
বীজমান : বীজের আর্দ্রতা ৯-১০%, বিশুদ্ধতা ৯৫% এবং অংকুরোদগম ক্ষমতা ৭৫% এর ওপরে হতে হবে।
বীজ সংরক্ষণ পূর্ব পরীক্ষা : গুদামে বা পাত্রে রাখার পূর্বে ডালবীজ ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সমস্ত বীজ থেকে প্রতি ১০ গ্রাম করে ৩টি নমুনা সংগ্রহ করতে হবে এবং তা ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে উক্ত ডালের নমুনা বীজে কোনো পূর্ণাঙ্গ পোকা বা বীজের ওপর সাদা ডিম আছে কি না। যদি কোনো পোকা বা সাদা ডিম না থাকে তাহলে বীজ যে কোনো ছিদ্রহীন পাত্র যেমন: আলকাতরার প্রলেপযুক্ত মাটির পাত্র, টিন, লোহা, কাঠের পাত্র এবং মোটা পলিথিন ব্যাগে রাখা যায়। পলিথিন লাইনিংযুক্ত বস্তায়ও বীজ রাখা যেতে পারে।
গুদামজাতকরণ : ডাল ফসল সংগ্রহের পরই সংরক্ষণ জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। বীজের আর্দ্রতা এবং গুদামের তাপমাত্রা এ দুটো বিষয়ের ওপরই প্রধানত গুদামে ডাল ফসলের গুণগতমান নির্ভর করে। এজন্য গুদামে এ দুটো বিষয়ই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সঠিকভাবে গুদামজাতকরণের অভাবে প্রায় ১২-১৫% দানা নষ্ট হয়। কারণ গুদামে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বীজে পোকা ও রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সঠিকভাবে আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে উন্নত গুদাম এবং সঠিক স্বতন্ত্রীকরণ দূরত্বের ব্যবস্থা করতে হবে। ডাল ফসলের বীজ সাধারণত কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ডিলাররা পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের গুদাম বা পাত্রে সংরক্ষণ করে থাকে। কৃষক পর্যায়ে ডাল ফসল সংরক্ষণের জন্য সুপারিশকৃত পাত্রগুলো হচ্ছে- পলিথিনযুক্ত পাটের বস্তা; পলিথিন লাইনিংকৃত মটকা; আলকাতরার প্রলেপযুক্ত মটকা/মাটির পাত্র; উন্নত ধরনের টিনের পাত্র; লোহার ড্রাম, প্লাস্টিক ড্রাম প্রভৃতি।
ব্যবসায়ী ও ডিলার পর্যায়ে ডাল ফসল সংরক্ষণের সুপারিশকৃত পাত্র- পলিথিনযুক্ত বস্তা; পলিথিনযুক্ত ঝারি; লোহার ড্রাম; ঠা-া ঘর (কুল হাউজ)।
সাবধানতা : আর্দ্রতা নিরোধক পাত্রে ডাল ফসল সংরক্ষণ করতে হবে; ভালোমানের বীজ সংগ্রহ করতে হবে; নতুন ও পুরনো বীজ মেশানো যাবে না; সংরক্ষিত বীজে আর্দ্রতার পরিমাণ  ৯-১০% হতে হবে; সংরক্ষিত পাত্রের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করতে হবে যাতে পাত্রের মধ্যে আর্দ্রতা ও পোকা প্রবেশ করতে না পারে; ডাল বীজ সংরক্ষিত পাত্র মেঝেতে না রেখে মাচা/চৌকিতে রাখতে হবে; অর্থাৎ মেঝে থেকে উপরে রাখতে হবে; গুদাম ঘর ঠা-া এবং শুকনা হতে হবে; গুদাম ঘরের চারদিকে পরিষ্কার ও ইঁদুরমুক্ত হতে হবে; কুল হাউজের তাপমাত্রা ১২-১৫০ সেন্টিগ্রেড এবং আর্দ্রতা ৫০-৬০% হতে হবে।
পোকামাকড় দমন : পালস বিটল অর্থাৎ ডালের শুষড়ি পোকা সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা। প্লাস্টিক ব্যাগে মজুদ করার আগে ডেসিস ২.৫ এর ১ মিলিলিটার প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ব্যাগের বাইরের দিকে শোধন করে নিতে হবে; অল্প পরিমাণ বীজের ক্ষেত্রে গুদামে প্রতি কেজি বীজের জন্য ৮ মিলি. নিমতেল শুকনা বালুসহ পাত্রের ওপরের অংশে রেখে পাত্র/ব্যাগের মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে; প্রতি ৫০-১০০ কেজি বীজের জন্য ১টি এ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ট্যাবলেট (ফসটক্সিন ট্যাবলেট) ন্যাকড়ার পুঁটলিতে বেঁধে ব্যবহার করলে প্রায় ১ (এক) বছর বীজ ভালো থাকবে; বিভিন্ন ধরনের পাত্রে সংরক্ষিত মুগডাল বীজের অংকুরোদগমের উপর গুদামজাতকরণের প্রভাব গবেষণাভিত্তিক ফলাফল টেবিল-১ দ্রষ্টব্য।
টেবিল-১ বিভিন্ন পাত্রে সংরক্ষিত মুগবীজের অংকুরোদগমের উপর গুদামজাতকরণের প্রভাব
উপরের টেবিল থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বীজ যে পাত্রেই রাখা হউক না কেন আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে থাকলে বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট হয় না। কিন্তু বীজে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়।
গুদাম পরিদর্শন এবং রক্ষণাবেক্ষণ
গুদামজাতকৃত ডালশস্য নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করতে হবে। সম্পূর্ণ শুষ্ক ও আর্দ্রতা নিরোধক পাত্রে মুগডালের বীজ রাখার পরও পোকা ও ইঁদুরের আক্রমণে ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে লক্ষ রাখা দরকার। আর্দ্রতা ও পোকা নিরোধক পাত্রে বীজ রাখলেও পোকার আক্রমণ ও আর্দ্রতা যাতে না বাড়ে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। গুদামে পোকামাকড় ও ইঁদুরের আক্রমণ যাতে না ঘটতে পারে সেজন্য মাঝে মাঝে পরিদর্শনপূর্বক প্রয়োজনে অনুমোদিত মাত্রায় কীটনাশক ছিটাতে হবে। ডাল বীজের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে পুনরায় বীজ শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে।

লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ডাল গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, জয়দেবপুর, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৭১২৫৪৩৭২০, ই-মেইল : ড়সধৎধষরঢ়ৎপ@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
ক্যাপসিকাম ও ঝাল মরিচের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি

ক্যাপসিকাম ও ঝাল মরিচের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
ড. মো. সদরুল আমিন
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পুষ্টি ও আর্থিক লাভ, সাংবাৎসরিক চাহিদা ও অনুকূল বাজার, ব্যবহার বৈচিত্র্য এবং জলবায়ু ও মাটির উপযুক্ততায় মরিচ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল।  মরিচ মসলা ও সবজি ফসল। কেপসিসিন এর ঝালের জন্য দায়ী। কাঁচামরিচে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকে। মরিচ গাছের বৃদ্ধির জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র এবং ফলের বৃদ্ধির জন্য শুষ্ক জলবায়ু প্রয়োজন।  
জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দো-আঁশ মাটি চাষাবাদের জন্য উত্তম। মিষ্টি মরিচ  রবি মওসুমে জন্মানো হয়।    
মরিচের জাত : শতাধিক দেশি জাত। তবে ক্যাপসিকাম বা মিষ্টি বা সবজি মরিচ জাত অন্তত: ৩০টি  যেমন- ক্যাপসিকাম, চাইনিজ জায়েন্ট, বেলবয় গোল ও লংগ্রিন, মিপিস, হাংগেরিয়ান ইয়োলো ওয়াক্স, ম্যারাথন, পেলিটা, যমুনা অগ্নিকন্যা ফায়ার ক্রেকার, আর কে ৬০৭  ও অনেক। সাথে সাথে রয়েছে বারি মরিচ-২, বারি অর্নামেন্টাল মরিচ-১, বারি অর্নামেন্টাল মরিচ-২ জাত।
চিত্র ১: বারি উদ্ভবিত ক্যাপসিকাম জাত বা লাইন
ব্যবহার : বর্তমানে দেশে উন্নত পদ্ধতিতে  ক্যাপসিকাম মরিচের চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। ক্যাপসিকাম মরিচ সালাদ ও তরকারি হিসেবে কাঁচা ও সিদ্ধ রান্না খাওয়া হয়। কেপসেইসিন (ঈ১৮ ঐ২৭ ঘ) পাসেনটাল টিসুতে থাকায় মরিচ ঝাল হয়ে থাকে। ক্যাপসিকাম মরিচে কেপসেইসিন খুবই কম থাকে।
চাষ পদ্ধতি
ক্যাপসিকাম ও মরিচের উন্নত চাষ পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে এলাকা মাটি ও জাত নির্বাচন, চারা উৎপাদন, চারা রোপণ ও পরিচর্যা, বালাই দমন, ফসল সংগ্রহ  প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন।  যেহেতু সরাসরি খাওয়া হয় সেজন্য ক্যাপসিকাম চাষে বালাই দমনে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার স্বাস্থ্য-পুষ্টির জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখানে  উন্নত চাষ পদ্ধতির মধ্যে বালাই দমন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি আলোচনা করা হলো।    
ক্যাপসিকাম  চাষে বালাই দমন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি  
তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে ক্যাপসিকামের রোগ-পোকা ও অন্যান্য বালাই  দমন পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে :
১. মৃত্তিকা  শোধন ও চারা রোপণ
বীজতলার মাটি সূর্যতাপে শোধন করে নিলে ভালো হয়। বীজ বপনের জন্য প্রতি বীজতলায় (৩/১ বর্গ মি.) প্রায় ১০ গ্রাম বীজ দরকার হয়।
৫-৬ সপ্তাহ বয়সের চারা ৭৫ সেমি. দূরত্বে সারি করে ৬০ সেমি. দূরে দূরে রোপণ করতে হয়।    
চিত্র ২: বীজ শোধন, সারিতে বপন ও সুস্থ চারা উৎপাদন
শোধিত বীজ বীজতলায় ৫ সেমি. দূরে  সারি করে ২-৩ সেমি. গভীরে বপন করতে হয়। পিঁপড়ার থেকে রক্ষার জন্য বীজতলার চার ধারে ডারসবান প্রয়োগ করতে হবে।  রবি মৌসুমে চারা সারি ও গাছের দূরত্ব ২৫ঢ২০ সেমি ও খরিপ- ৪৫ঢ৪৫ সেমি. দূরত্বে রোপণ করতে হবে।  
২. সুষম সার প্রয়োগ ও পুষ্টি ঘাটতি পরিপূরণ
চারা রোপণের ২০, ৪০ এবং ৬০ দিন পর ১ম, ২য় ও ৩য় বারে সার বেডের মাটিতে গাছের গোড়া থেকে ১০-১৫ সেমি. দূরে ছিটিয়ে মিশিয়ে দিতে হবে। কম্পোস্ট/গোবর ১০টন,  ইউরিয়া ২৫০-৩০০ কেজি, টিএসপি ২০০-২৫০ কেজি, এমওপি               ২০০-৩০০ কেজি, জিপসাম ৬০-১০০ কেজি।   
ক্যালসিয়ামের (+ ফসফরাস) অপুষ্টি  লক্ষণ গাঢ় নীল বাঁকা পাতা, ক্যালসিয়ামের (+ বোরন) অপুষ্টি লক্ষণ গাছের পাতা কুঁচকে যায় নৌকার মতো বাঁকা হয়। অপুষ্টি রোগ প্রতিকারে করা প্রয়োজন সলুবর বোরন ও ডলুচুন প্রয়োগ করে।
চিত্র ৩: ক্যালসিয়াম, বোরন ও মেগনেসিয়াম ঘাটতির ব্লোসম অ্যান্ড, ও কেøারোসিস লক্ষণ
৩. ফসল চক্র অনুসরণ
মাটিবাহিত রোগের প্রতিকার। একবার মরিচ করার পর একই জমিতে সোলানেসি পরিবার কোন ফসল  আলু, বেগুন, টমেটো  চাষ করা  যাবে না।
৪. রোগ দমন        
মরিচের  রোগের মধ্যে রয়েছে : উইল্ট, পচন রোগ, ড্যাম্পিং অফ, পাতার দাগ, অ্যানথ্রাকনোজ, ঢলে পড়া ও ভাইরাস রোগ। রোগ দমনের জন্য আইপিএম পদ্ধতিসহ কম্প্যানিয়ন ক্যাব্রিওটপ, মাইক্রা, রোভরাল, ব্যাক্টাফ  ও ব্লিটক্স ২-৪ গ্রাম প্রতি লিটার হারে একাধিক স্প্রে করতে হবে। আইপিএম পদ্ধতিতে রোগ নিয়ন্ত্রণ, সকল রোগ পোকা দমনের ক্ষেত্রে ১. রোগের প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে; ২. আক্রান্ত চারা তুলে তা ধ্বংস করতে হবে; ৩. পর্যাপ্ত জৈবসার ও পরিমিত নাইট্রোজেন ব্যবহার করা উচিত; ৪. জমি সব সময় ভিজা-ভিজা রাখা চলবে না।    
উইল্ট  রোগ : এ রোগ ২ প্রকার যথা- ব্যাক্টেরিয়েল ও ফাংগাল বা ছত্রাকজনিত। সিউডোমোনাস ব্যাকটেরিয়া এবং ফিউজেরিয়াম  ছত্রাকে  পৃথক এ দুটি  রোগ হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে সম্পূর্ণ গাছ সবুজ অবস্থায়ই নুয়ে পড়ে। ছত্রাক হলে গাছ এক পাশ থেকে বাদামি হয়ে নুয়ে পড়ে। আক্রান্ত কা-ের ভেতরে বাদামি রঙ ধারণ করে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভেজা মাটিতে রোগের তীব্রতা বাড়ে।
চিত্র ৪: ব্যাক্টেরিয়েল উইল্ট রোগে সবুজ গাছের উইল্টিং
কা-ের ভিতরে বাদামি দাগ লক্ষণ
রোগটি ব্যাক্টেরিয়েল হলে ব্যাক্টাফ ও ব্লিটক্স ও  ছত্রাক হলে  কম্প্যানিয়ন ক্যাব্রিওটপ পরিমিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।    
মরিচ কা--ফল পচা ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগ :  প্রথমে কা-ে ও মরিচে কাল কাল দাগ দেখা যায়। পরে এই দাগগুলো বড় হয়ে পচে যায়। এখানে বলা দরকার যে মাঠে অধিকাংশ সময় একাধিক রোগ পোকা আক্রমণ করে বলে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে বালাইনাশক নির্বাচন করতে হয় যাতে ন্যূনতম সংখ্যক দ্রব্য স্প্রে করে সুফল পাওয়া যায়।
রোগ নিয়ন্ত্রণে অটোষ্টিন দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে; আক্রান্ত হলে কম্প্যানিয়ন/নাভারা ২মিলি/গ্রাম/লি পানি ২-৩ টি ¯েপ্র করতে হবে।     
চিত্র ৫: ফল পচা অ্যানথ্রাকনোজ লক্ষণ
পোকা মাকড় দমন    
ক্যাপসিকাম মরিচের পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে-মাইটস বা মাকড়, জাবপোকা, সাদা মাছি, ফল মাজরা, কাটুই পোকা, থ্রিপস এসব পোকামাকড় দমনের জন্য জমিতে প্রতি সপ্তাহে জরিপ করে পোকার উপস্থিতি যাচাই করতে হবে;            পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে; একই জমিতে প্রতি বছর মরিচের চাষ করা যাবে না; বালাই প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে; আক্রান্ত ডগা ও  ফল পোকাসহ ছিঁড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে; পর্যাপ্ত জৈবসার ও পরিমিত নাইট্রোজেন ব্যবহার করতে হবে; পোকা মাকড় হাত বাছাই করতে হবে; আলো ও ফেরোমন ট্র্যাপ ও রঙিন আঠালো স্টিকার কাগজ ব্যবহার করতে হবে; বীজ শোধন ও সুস্থ বীজ ব্যবহার করতে হবে। আইপিএম পদ্ধতি অবলম্বনসহ বালাইনাশক যেমন-সানেক্টিন, সাকসেস, ডারসবান, ইমটাফ, প্রয়োগ করতে হয়। ডারসবান ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
উপকারী পোকা, পাখি ও পোকা খেকো অন্যান্য প্রাণী সংরক্ষণ করে সঠিক পদ্ধতিতে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
চিত্র ৬: উপকারী পোকা খেকো বিটল
ফসল সংগ্রহ : কাঁচা বা পাকার সঠিক সময়ে মরিচ তুলতে হবে। ফলন- জাত ও মৌসুমভেদে ২০-৪০ টন/হে.।

লেখক : প্রফেসর, হাজী মোঃ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৯৮৮৮০২২৫৩, ই-মেইল : ংধফৎঁষধসরহ৪৭@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর মৎস্যজীবীদের উন্নয়ন দর্শন ও প্রতিভাস

বঙ্গবন্ধুর মৎস্যজীবীদের উন্নয়ন দর্শন ও প্রতিভাস
কৃষিবিদ মোঃ লতিফুর রহমান সুজান
আজকের মৎস্যক্ষেত্রে যে বৈচিত্রময় সাফল্য, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি-নিরাপত্তাদানে সক্ষমতা সেই ভিত্তি বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কৃষকের প্রতি অন্তরতম মমত্বে স্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধু মৎস্য সম্পদকে কতটা গুরুত্ব দিতেন তা তাঁর নিজের জীবনের ঘটনাগুলো থেকেই উপলব্ধি করা যায়। বঙ্গবন্ধুর পছন্দের খাবার নিয়ে বেশ লেখা আছে ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে ৪ আগস্ট ১৯৬৬ সালের ঘটনায় বঙ্গবন্ধু লেখেন, ‘রেণু কিছু খাবার দিয়ে গেছে-কি করে একলা খেতে পারি? কই মাছ খেতে আমি ভালোবাসতাম, তাই ভেজে দিয়ে গেছে।’ গণভবনের লেকে তিনি মাছ ধরতেন, নিজ হাতে মাছকে খাবার দিতেন। তিনি বিভিন্ন সময় ভাষণে মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, ধ্যান, ধারণা ছিল একমাত্র সোনার বাংলা গড়া। ৩০ জুন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক সমবায় সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে প্রদত্ত বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে উন্নত জীবনের অধিকারী হবে- এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন।’ এই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন গণমুখী সমবায় আন্দোলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা সমবায়ের পথ-সমাজতন্ত্রের পথ, গণতন্ত্রের পথ। সমবায়ের মাধ্যমে গরিব কৃষকরা যৌথভাবে উৎপাদন-যন্ত্রের মালিকানা লাভ করবে। অন্যদিকে অধিকতর উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদের সুষম বণ্টন ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষুদ্র চাষি গণতান্ত্রিক অংশ ও অধিকার পাবে। জোতদার ধনী চাষির শোষণ থেকে তারা মুক্তিলাভ করবে সমবায়ের সংহত শক্তির দ্বারা। একইভাবে তিনি বলেছিলেন কৃষক, শ্রমিক, তাঁতী, জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি একজোট হয়ে পুঁজি এবং অন্যান্য উৎপাদনের মাধ্যমে একত্র করতে পারলে আর মধ্যবর্তী ধনিক ব্যবসায়ী-শিল্পপতির গোষ্ঠী তাদের শ্রমের ফসলকে লুট করে খেতে পারবে না।
জাতির পিতা প্রিয় কৃষক-মজুর-জেলে-তাঁতী ভাইদের সাহায্যে শোষণ ও প্রতিক্রিয়াশীল কোটারি স্বার্থকে চিরদিনের জন্য নস্যাৎ করে দেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন একটি নুতন ও সুষম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জেলে সমিতি, তাঁতী সমিতি, গ্রামীণ কৃষক সমিতি যেন সত্যিকারের জেলে-তাঁতী, কৃষকের সংস্থা হয়। মধ্যবর্তী ব্যবসায়ী বা ধনী কৃষক যেন আবার এই সমিতিগুলোকে দখল করে অতীত দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি না করে। যদি আবার সেই কোটারি স্বার্থ সমবায়ের পবিত্রতা নষ্ট করে, তবে নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন যে আমরা সমসত্ম পুরাতন ব্যবস্থা বাতিল করে দেবো।
জুলাই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের ৭২ হাজার জেলেকে পুনর্বাসন ও মৎস্য শিল্পের উন্নয়নের জন্য ৯১ কোটি ২ লক্ষ টাকার একটি ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১০১০৫টি নৌকা নির্মাণ ও জেলেদের ৫ কোটি পাউন্ড নাইলন সুতা সরবরাহ, ট্রানজিস্টর রেডিওসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ। নৌকার মধ্যে ১২০৫টি নৌকা হবে ইঞ্জিনচালিত। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে একদিকে দেশের মৎস্য শিল্পের যেমন উন্নতি হবে ঠিক তেমনি মৎস্য রপ্তানি করে সরকার প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। অপরদিকে জেলেদের ব্যবসায়ী কর্তৃক শোষিত হওয়াও বন্ধ হয়ে যাবে উল্লেখ করেছিলেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে স্বাধীনতা পর্যন্ত পাক বর্বর বাহিনী ৪০ হাজার মৎস্য নৌকা ও জাল আংশিক এবং সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ২ লক্ষ জেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশে সর্বমোট ৭ লক্ষ ৫০ হাজার জেলে রয়েছিল। ১৯৭১ সালে ভোলা, পটুয়াখালী, নোয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে ৩ লক্ষ জেলে বেকার হয়ে পড়েছিল। এদের নৌকা, জাল ও মাছ ধরার অন্যান্য সামগ্রী সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির মাধ্যমে এই বিরাট কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। এই কর্মসূচি অনুযায়ী প্রথমে কিছু সংখ্যক জেলেকে নৌকা ও নাইলন সুতা সরবরাহ করা হবে। কিছু সংখ্যক নৌকা যন্ত্রচালিত হবে। কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সহায়তায় মৎস্য বহনের জন্য যানবাহন ও ট্রাকের ব্যবস্থা করা হবে। বরফকল ও কোল্ডস্টোরেজও নির্মাণ করা হবে। সমবায়ের ভিত্তিতে স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হবে বলে উল্লেখ করেছিলেন। [দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ জুলাই ১৯৭২]
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দেড় মাসের মধ্যে তথা ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশের সর্বপ্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮)। ১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম পাঁচশালা উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। পরিকল্পনার সর্বমোট ৪৪৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সর্বনিম্ন চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সামাজিকভাবে কাম্য আয়ের সুষম বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের জন্য অর্থনীতির বিকাশ সাধন পাঁচশালার পরিকল্পনার লক্ষ্যরূপে ধার্য্য করা হয়েছিল। পরিকল্পনার রূপকারদের মতে এই পরিকল্পনা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করবে এবং পরিকল্পনাকালে জাতীয় উৎপাদন শতকরা ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পাবে উল্লেখ করেছিলেন।  [দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ নভেম্বর ১৯৭৩]
প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মৎস্য খাতের উদ্দেশ্যগুলো ছিল- (১) মাছের উৎপাদন প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা, ১৯৬৯-৭০ সালের বেইজ লাইন উৎপাদন ৮.০৯ লক্ষ টন থেকে ১৯৭৭-৭৮ সালে ১০.২১ লক্ষ টন; (২) অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক উভয় ক্ষেত্রেই মৎস্য সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার করা; (৩) জেলেদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি করা; (৪) মৎস্য এবং মৎস্য সংশ্লিষ্ট শিল্পে বৃহত্তর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং (৫) মাছের রপ্তানি বৃদ্ধি করা, ১৯৭৭-৭৮ সালের মধ্যে প্রায় ২০,০০০ টন।
প্রাকৃতিক অবদান সবুজ বনরাজি, অগণিত নদীনালা ও অসংখ্য সবুজ প্রান্তরের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু সরকার ব্যাপক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে সরকারের অগ্রগতির চিত্র নিম্নরূপ:
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবীদের পুনর্বাসন কর্মসূচির ব্যয়: ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে মৎস্যচাষে পতিত জলাভূমি উন্নয়ন ১,৩০০০ একর; পোনা উৎপাদন খামার স্থাপন ৪টি; মৎস্য খামার স্থাপন ৩টি; মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি গঠন ২০২টি; মাছ ধরা নৌকা বিতরণ ৭০০টি; [বাংলাদেশ সরকার, ১৯৭১-৭৫, এইচ টি ইমাম, পৃষ্ঠা ৩১৯-৩২০]
প্রকৃত জেলেদের তালিকা বা স্বীকৃতি না থাকায় অনেক সময় জেলেদের নাম ব্যবহার করে অমৎস্যজীবীগণ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে থাকতো। ফলে প্রকৃত জেলেরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। জেলেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, গ্রামীণ আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, মৎস্য সম্পদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সানুগ্রহ দিকনির্দেশনায় প্রকৃত জেলেদের শনাক্তকরণ ও সামাজিকভাবে পেশার স্বীকৃতিস্বরূপ জেলে নিবন্ধন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৬.২০ লক্ষ জেলের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে এবং ১৪.২০ লক্ষ জেলের পরিচয়পত্র প্রস্তুত ও বিতরণ করা হয়েছে। জলাশয়ে মাছ ধরার সময় ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাতের কারণে ও জলদস্যুদের হামলায় অথবা বাঘ, কুমির বা হিং¯্র জলজ প্রাণীর আক্রমণে নিবন্ধিত নিহত, নিখোঁজ অথবা স্থায়ীভাবে অক্ষম জেলেকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জীবিকার ঝুঁকি হ্রাস করার নিমিত্ত  ‘নিহত জেলে পরিবার বা স্থায়ীভাবে অক্ষম জেলেদের আর্থিক সহায়তা প্রদান নীতিমালা, ২০১৯’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ নীতিমালার আলোকে জলাশয়ে মাছ ধরার সময় ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বজ্রপাতের কারণে ও জলদস্যুদের হামলায় অথবা বাঘ, কুমির বা হিং¯্র জলজ প্রাণীর আক্রমণে নিবন্ধিত নিহত, নিখোঁজ জেলে অনধিক ৫০,০০০/- টাকা এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় এবং নিবন্ধিত স্থায়ীভাবে অক্ষম জেলেকে অনধিক ২৫,০০০/- টাকা এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমুদ্র সীমা বিজয় এবং সুনীল অর্থনীতির ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়ে গেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারিত হওয়ায় ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিমি. এলাকায় মৎস্য আহরণে আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মৎস্য উৎপাদনে বিশ^ পরিম-লে বাংলাদেশের সাফল্য আজ   স্বীকৃত। ঞযব ংঃধঃব ড়ভ ডড়ৎষফ ঋরংযবৎরবং ধহফ অয়ঁধপঁষঃঁৎব ২০২০ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশে^ বাংলাদেশের অবস্থান  ইলিশ আহরণে প্রথম, স্বাদু পানির মাছের বৃদ্ধির হারে দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ, বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া উৎপাদনে অষ্টম, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ফিনফিশ উৎপাদনে ১২ তম।

লেখক : সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার ও বিভাগীয় প্রশিক্ষক, মৎস্য অধিদপ্তর, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ। মোবাইল : ০১৭৬৫১১১৪৪৪, ই-মেইল : ংুঁধহ.ফড়ভ@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রতিরোধে করণীয়

লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রতিরোধে করণীয়
ডা: সুচয়ন চৌধুরী
লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) একটি ভাইরাসঘটিত রোগ যা মূলত গৃহপালিত গরু এবং মহিষকে আক্রান্ত করে। প্রাণীর গায়ে ফোসকা দেখে প্রাথমিকভাবে এই রোগ শনাক্ত করা হয়। লাম্পি স্কিন ডিজিজ ছড়িয়ে পড়লে গরু পালনের সাথে জড়িত সকলে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই রোগের ফলশ্রুতিতে গরু থেকে মাংস উৎপাদন এবং দুধ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে আসে গর্ভপাত এবং অনুর্বরতার মতো বিষয়গুলো।
লাম্পি স্কিন ডিজিজ নির্দিষ্ট পোষকের দেহে আক্রমণ করে। এই পোষকের মধ্যে আছে গরু এবং এশিয়ান মহিষ (ইঁনধষঁং নঁনধষরং)। তবে মহিষে আক্রান্ত হওয়ার হার খুব কম। কিন্তু গরুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
লাম্পি স্কিন ডিজিজ ছড়ানোর কারণ
লাম্পি স্কিন ডিজিজ ছড়ানোর প্রধান কারণ হতে পারে এক খামার থেকে অন্য খামারে, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এমন কি এক দেশ থেকে অন্য দেশে গরু নিয়ে যাওয়া। মূলত এই গরু স্থানান্তরের মাধ্যমে অনেকদূর পর্যন্ত এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর মশা, মাছির মাধ্যমে কাছাকাছি স্থানগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মূলত যে মশা, মাছিগুলো পোষকের দেহ থেকে রক্ত পান করে তারাই এ রোগের জীবাণু বহন করে। এক এক এলাকায় একেক ধরনের বাহকের মাধ্যমে এই রোগ ছড়াতে পারে। তবে এই রোগের ভাইরাসটি সাধারণত বাহকের শরীরে বংশবিস্তার করে না। সাধারণত কিছু মাছি (যেমন-ঝঃড়সড়ীুং পধষপরঃৎধহং), মশা (অবফবং ধবমুঢ়ঃর), আঁঠালো (জযরঢ়রপবঢ়যধষঁং ধহফ অসনষুড়সসধ ংঢ়ঢ়) এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
সাধারণত সরাসরি স্পর্শের কারণে এই রোগ ছড়ায় না। প্রাণী আক্রান্ত হওয়ার পর ভাইরাস রক্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে তবে তা অল্প কয়েক দিন থাকে। কিন্তু কিছু কিছু প্রাণীতে এই রোগের সংক্রমণ মারাত্মক হলে এই অবস্থা দুই সপ্তাহ থাকতে পারে। যে সমস্ত প্রাণীর চামড়ায় ক্ষত দেখা যায় এবং নাক মুখ দিয়ে লালা ঝরে তার মাধ্যমে প্রাণীর সামনের খাবার এবং পানি সংক্রমিত হতে পারে।
অসুস্থ প্রাণীর শরীর থেকে যখন ফোসকাগুলো খসে পড়ে তখন সেখানে যে ভাইরাস থাকে তা নতুন করে রোগ তৈরি করার সামর্থ্য রাখে। অসুস্থ ষাড়ের বীর্যেও এই ভাইরাস থাকতে পারে। তাই এই ষাঁড় দিয়ে যদি প্রজনন করানো হয় তাহলে গাভীটিও আক্রান্ত হতে পারে। অসুস্থ গাভী থেকে দুধের মাধ্যমে অথবা ওলানের বাঁটের ক্ষতের মাধ্যমে দুধ খাওয়া বাছুরকে আক্রান্ত করতে পারে।
আক্রান্ত প্রাণীতে ব্যবহৃত নিডল (সুচ) যদি অন্য সুস্থ প্রাণীতে পুশ করা হয় সেক্ষেত্রেও এই রোগ ছড়ানোর একটা আশঙ্কা থাকে।
এলএসডি রোগের লক্ষণ
প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করার চার থেকে সাত দিনের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় সাধারণত প্রথমে নাক এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ে; শরীরের কিছু কিছু স্থানে লসিকা গ্রন্থিগুলো ফুলে উঠে, যা সহজে অনুভব করা যায়; খুব বেশি জ্বর থাকতে পারে। যা টানা এক সপ্তাহও হতে পারে; দুগ্ধবতী গাভীর হঠাৎ করে দুধ উৎপাদন কমে যায়; তাছাড়াও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুটি দেখা দেয়। এই গুটিগুলোর ব্যাসার্ধ ১০-১৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই গুটির পরিমাণ কম বেশি হতে পারে। মুখে, গলায়, তলপেটে, ওলানে এবং পায়ে এই গুটি এবং ক্ষত বেশি দেখা যায়। এই গুটিগুলো ভেতরের দিকে প্রথমে চামড়া থেকে শুরু করে পরবর্তীতে সাবকিউটেনিয়াস স্তরে এমনকি চামড়া নিচে মাংসপেশিতেও পৌঁছে যেতে পারে। মুখের বা নাকের ভেতরে যেই গুটিগুলো উঠে সেগুলো ফেটে গিয়ে ক্ষত হতে পারে। সেখানে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজও হতে পারে। এই সময় নাকমুখ দিয়ে তরল ঝরতে পারে। সাধারণত যে গুটি উঠে তার মাঝখানে ঘা হতে পারে, যা পরবর্তীতে খোসা আকারে উঠে আসে। চামড়ার এই গুটিগুলো অনেক সময় কয়েক মাসও থেকে যেতে পারে। মাঝে মধ্যে দুই চোখের কর্নিয়াতে ঘাঁ হতে পারে যাতে খুব ব্যথা থাকে। পায়ে বা হাঁটুতে যে ক্ষত হয় তা অনেক সময় ২য় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়াল ইকফেকশনের কারণে চামড়ার নিচে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। যার ফলে পশু খোঁড়াতে শুরু করে।
এলএসডি রোগের সাদৃশ্যপূর্ণ অন্য রোগ
রোগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই ক্ষেত্রে সন্দেহজনক প্রাণীগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পিসিআর পদ্ধতিতে নিশ্চিতভাবে এই রোগ নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা হয়। এলএসডির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নি¤েœ সে রকম কিছু রোগ নিয়ে আলোচনা করা হলো-
১. সিউডো লাম্পি স্কিন ডিজিজ/বোবাইন হারপিস ম্যামিলাইটিস (ইড়ারহব যবৎঢ়বং ারৎঁং ২) রোগের ফলে চামড়ায় যে লক্ষণ হয় তা অনেক সময় লাম্পি স্কিন ডিজিজের সাথে একই রকম মনে হতে পারে। তবে এই রোগের ক্ষেত্রে ক্ষতটি চামড়ার বেশি ভিতরে প্রবেশ করে না এবং এই রোগটির স্থায়িত্বে লাম্পি স্কিন ডিজিজের চেয়ে অনেক কম এবং তীব্রতাও অনেক কম।
২. সিউডো কাউপক্স (চধৎধঢ়ড়ীারৎঁং) ভাইরাসের সংক্রমণে যে লক্ষণ দেখা যায় তাও লাম্পি স্কিন ডিজিজের সাথে সাদৃশ্যপূর্র্ণ। কিন্তু সিউডো কাউপক্সের ক্ষেত্রে শুধু প্রাণীর ওলানে এবং বাঁটে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ দেখা যায়।
৩. পোকামাকড়ের কামড়, ছুলি/আমবাত এবং আলোক সংবেদনশীলতার কারণে চামড়ায় যে লক্ষণ দেখা যায় তা অনেক সময় লাম্পি স্কিন ডিজিজের সাথে মিল থাকতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রেও ক্ষত তেমন গভীর হয় না। এই রোগের তীব্রতাও অনেক কম যা এলএসডির চেয়ে অনেক কম সময়ে সেরে যায়।
৪. ডার্মাটোফিলোসিস হলেও চামড়ায় ক্ষত দেখা যেতে পারে তবে সেটা ঘাঁ হয় না ।
৫.  ডেমোডিকোসিস হলে সাধারণত গলায় এবং তলপেটের চামড়ায় ক্ষত থাকে। আর এই রোগে শরীরের পশম পড়ে যায়। এই রোগের চামড়া থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করলে মাইট পাওয়া যায়।
৬.  বোবাইন পেপুলার স্টোমাটাইটিস (চধৎধঢ়ড়ীারৎঁং) এর ক্ষত শুধু মুখের ঝিল্লিতে দেখা যায়।
৭.  বেসনয়টিওসিস হলে সেক্লরাল কঞ্জাংক্টিভা এবং চামড়ার যে ক্ষত হয় সেখানে লোম পড়ে যায়।
লাম্বি স্কিন ডিজিজ প্রতিরোধে করণীয়
খামার জীবাণুুমুক্তকরণ : লাম্পি স্কিন ডিজিজ ভাইরাসটি খুব ঠা-া এবং শুষ্ক পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে যেখানে পি,এইচ ৬.৩- ৮.৩। এলএসডি আক্রান্ত প্রাণীর ক্ষতস্থানে খসে পড়া গুটির খোসায় এই ভাইরাসটি টিকে থাকতে পারে কয়েক মাস। তাই এলএসডি আক্রান্ত খামার, খামারে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি এবং নিযুক্ত লোকজনসহ সবকিছু ভালো করে জীবাণুমুক্ত করা প্রয়োজন। এলএসডি ভাইরাসটি প্রায় সকল জীবাণুুনাশক এবং ডিটারজেন্টের প্রতি সংবেদনশীল। ভালোভাবে জীবাণুুমুক্ত করার জন্য খামারের গোবর, খড়কুটো আগেই সরিয়ে নিতে হবে। জাতীয় সংঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) অহরসধষ ঐবধষঃয গধহঁধষ ড়হ চৎড়পবফঁৎবং ভড়ৎ উরংবধংব ঊৎধফরপধঃরড়হ নু ঝঃধসঢ়রহম ঙঁঃ (ঋঅঙ, ২০০১) এ খামার জীবাণুুমুক্ত করার ব্যাপারে কিছু ব্যবহারিক নির্দেশনা দিয়েছে।
খামারে কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ : খামারে ঠিক মতো মশা মাছি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই ভাইরাসে চলাচল অনেকটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কিন্তু স¤পূর্র্ণ রূপে এই রোগের প্রতিরোধ করা যাবে না। যে সব খামারে প্রাণীকে সম্পূর্ণরূপে বেঁধে পালন করা হয় সে সমস্ত খামারে মশার উৎপাত কমানোর জন্য মশারি বা নেট ব্যবহার করা যায়। আবার প্রাণীর গায়ে মশা মাছি না বসার জন্য ঔষধ ব্যবহার করে সাময়িকভাবে মশামাছি এবং আঁঠালি প্রতিরোধ করা যায়।
যখন কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তখন খেয়াল রাখতে হবে যেন তার অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ক্ষতি না হয় এবং অন্যান্য উপকারী কীটপতঙ্গ যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। কীটপতঙ্গ যেখানে প্রজনন করতে পারে যেমন- জমানো পানি, ময়লা, গোবর ইত্যাদি স্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করলে কীট পতঙ্গের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়।
বায়োসিকিউরিটি : এলাকায় লাম্পি স্কিন ডিজিজ দেখা গেলে খামারে কোন নতুন প্রাণী প্রবেশ না করানোই উত্তম। আর যদি প্রাণী আনতেই হয় তাহলে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা উচিত। আর এই প্রাণী ক্রয় করার আগে ভালো করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত এবং খামারে আনার পরও কমপক্ষে ২৮ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখা উচিত।
খামারে দর্শনার্থী প্রবেশ খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে করতে হবে। খামারের প্রয়োজনীয় যেকোন যানবাহন বা দ্রব্যাদি খামারে প্রবেশের আগে ভালো করে ধুয়ে  নিতে হবে।
চিকিৎসা : লাম্পি স্কিন ডিজিজ একটি ভাইরাস গঠিত রোগ তাই এর সরাসরি কোন চিকিৎসা নেই। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করার জন্য লক্ষণ দেখে চিকিৎসা প্রয়োগ করতে হয়। এই ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
লাম্পি স্কিন ডিজিজে জ্বর এবং গায়ে ব্যথা থাকলে কিটোপ্রোপেন বা প্যারাসিটামল জাতীয় ব্যথানাশকগুলো ব্যবহার করা যাতে পারে। রোগ খুব তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। গুটিগুলো ফেটে গেলে পটাশ বা আয়োডিন সলিউশন দিয়ে ক্ষতস্থান ধুতে হবে নিয়মিত। তাছাড়া ঘা হয়ে গেলে বিভিন্ন ধরনের সালফার পাউডার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ক্ষত স্থানে ব্যবহার করতে হবে।

লেখক : উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি। মোবাইল : ০১৭১৮৬৩০২৬৮ ই-মেইল : ঝঁপযধুধহথপযু@ুধযড়ড়.পড়স

 

বিস্তারিত
বাংলাদেশী কৃষি পণ্যের জিআই স্বীকৃতি অর্জনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

বাংলাদেশী কৃষি পণ্যের জিআই স্বীকৃতি অর্জনে
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
ড. মো: আজিজ জিলানী চৌধুরী১ ড. সুস্মিতা দাস২
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় ১৯৯৪ সালে ঞৎধফব জবষধঃবফ অংঢ়বপঃং ড়ভ ওহঃবষষবপঃঁধষ চৎড়ঢ়বৎঃু জরমযঃং (ঞজওচঝ) চুক্তির মাধ্যমে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) বা এবড়মৎধঢ়যরপধষ ওহফরপধঃরড়হ (এও) প্রবর্তন করা হয়। পণ্য বিপণনে বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্যে ক্রেতাদের সহায়তা এবং উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কোন দেশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিশেষ গুণাবলি সম্পন্ন পণ্যকে ভৌগোলিক নির্দেশক রেজিস্ট্রেশন বা ট্যাগ প্রদান করা হয়, যা সংক্ষেপে জিআই ট্যাগ হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে সমাদৃত যে সব পণ্য একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের সত্যতা এবং বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে কেবলমাত্র সেসব পণ্যই জিআই ট্যাগের জন্য নির্ধারিত হয়। জিআই স্বীকৃত পণ্যগুলো বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চল অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।
ট্রেডমার্ক ও ভৌগোলিক নির্দেশক এ দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। ট্রেডমার্ক হচ্ছে নির্দিষ্ট পণ্যের বা সেবার ব্যক্তিমালিকানাধীন লোগো এবং জিআই হচ্ছে এলাকার সুনাম ও ঐতিহ্য। সেজন্য বাণিজ্য ছাড়াও ঐতিহাসিকভাবে সমাদৃত পণ্য উৎপাদন এলাকায় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠে। সেসব পণ্য পর্যায়ক্রমে জিআই স্বীকৃতি পায়। যেমন যশোরের কাঁচাগোল্লা অথবা কুমিল্লার রসমালাই প্রস্তুত প্রণালী দেখতে এখনও লোকেরা যশোর ও কুমিল্লা ভ্রমণ করে। ভারতের দার্জিলিং সফরে কেউ দার্জিলিংয়ের চা না খেয়ে কিংবা প্রিয়জনদের জন্য চা উপহার না নিয়ে ফেরে না। ভারতের হায়দ্রাবাদে হায়দ্রাবাদী বিরানির স্বাদ আস্বদন না করা এমন আগন্তুক পাওয়া মুসকিল। এভাবে ভারত ও পাকিস্তানের বাসমতি চাল, অস্ট্রেলিয়ার গুঁড়া দুধ, ভুটানের লাল চাল, থাইল্যান্ডের জেসমিন চাল সারা বিশ্বে জিআই পণ্য হিসাবে সমাদৃত।
মূলত জিআই ট্যাগ একটি আইনি সুরক্ষা যা উৎপাদকের জন্য উন্নত পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির অনুপ্রেরণা। এটা বিভিন্ন আঞ্চলিক পণ্যের বিশ্বজোড়া খ্যাতি আনে। যা পর্যটন বৃদ্ধিও নিশ্চিত করে। জিআই ট্যাগ জাতিকে রফতানি বৃদ্ধি করতে সক্ষম করে। বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনে কৃষককে আত্মবিশ্বাসী করে। ফলে জিআই ট্যাগ উৎপাদনকারীদের সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের সবগুলো দেশকে তাদের ভূমিতে উৎপাদিত পণ্য নিবন্ধন করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। মেধাস্বত্ব বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ডওচঙ (ডড়ৎষফ ওহঃবষষবপঃঁধষ চৎড়ঢ়বৎঃু ঙৎমধহরুধঃরড়হ) বাংলাদেশে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরকে জিআই নিবন্ধন প্রদানের ক্ষমতা দিয়েছে। দেরিতে হলেও ২০১৩ সালে বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত আইন এবং ২০১৫ সালে তার বিধিমালা হয়েছে। ভারত ১৯৯৯ সালে মেধাস্বত্ব আইন পাস করে এবং ২০০৩ সালে কার্যকর করে। দার্জিলিং চা ভারতের প্রথম জিআই সনদপ্রাপ্ত পণ্য। বর্তমানে ভারতে মোট ১২৯টি (জবভবৎবহপব যঃঃ//রঢ়রহফরধ.মড়া.রহ/ৎিরঃবৎধফফধঃধ/ঢ়ড়ৎঃধষ/ রসধমবং/চফভ/এও) কৃষি পণ্য জিআই হিসাবে স্বীকৃত। সেসব পণ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নকশিকাথা, বাংলার রসগোল্লা, মালদার ফজলি আমসহ ২০টি পণ্য রয়েছে। নেপালে ২০১৭ সালে জাতীয় মেধাস্বত্ব নীতিমালা প্রণয়ন হলেও ২০২০ সাল পর্যন্ত কোন পণ্যের রেজিস্ট্রেশন হয়নি। শ্রীলংকা ২০০৩ সালে ঘধঃরড়হধষ ওহঃবষষবপঃঁধষ চৎড়ঢ়বৎঃু অপঃ প্রবর্তন করে। সিলন চা, সিলন দারুচিনি, কাজুবাদামসহ কিছু পণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় জিআই বিশেষ সুবিধা পায়। পাকিস্তান জিআই আইন প্রবর্তন করে ২০২০ সালে এবং বাসমতি চাল, সিন্ধু আমসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের জিআই হিসাবে স্বীকৃতি পায়। ভারত ও পাকিস্তান দুটি দেশই বাসমতি চাল উৎপাদন ও রফতানি করে। উভয় দেশই এই চালের জিআই স্বীকৃতি পায়।
সাধারণত ভৌগোলিক নির্দেশক দ্রব্যের মধ্যে কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প, বাণিজ্যিকপণ্য, খাদ্যপণ্য, পানীয় দ্রব্য হয়। ২০১৬ সালে ১৭ নভেম্বর ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি বাংলাদেশের প্রথম জিআই সনদপ্রাপ্ত পণ্য। ইলিশ মাছ ও খিরসাপাত (হিমসাগর) আম পরবর্তী জিআই পণ্য। বৈশ্বিক পরিম-লে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের ছয়টি ঐতিহ্যবাহী পণ্য কাটারিভোগ ও কালিজিরা (ধান), সিল্ক ও মসলিন শাড়ি, সাদামাটি এবং শতরঞ্জি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে।
জিআই পণ্য তৃতীয় পক্ষকে বেআইনি উৎপাদন ও প্রস্তুত প্রণালি সম্পর্কিত ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা নিম্নমানের পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয় সম্পর্কিত মিথ্যা প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে সহায়তা করে। যেমন বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম অন্য অঞ্চলের আম দ্বারা বিপণন করা যাবে না যা স্বাদ, গন্ধ, বর্র্ণ, আকারের ভিন্নতা বিদ্যমান। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সাথে সাথে প্রায় প্রতিটি দ্রব্য সংস্কারের অধীন। কৃষি ও শিল্প পণ্য উচ্চতর গতিতে বিকাশ ঘটছে। এ সুযোগে অনেক অসাধু লোক নকল বা দুর্বল মানের পণ্য বিক্রি করে অসৎ অর্থ উপার্জন করছে। এ কারণে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে খাঁটি উৎপাদকদের প্রিমিয়াম সামগ্রীর জন্য সর্বোত্তম মূল্যায়ন পেতে জিআই সনদ সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
তিনটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন খিরসাপাত (আম), কাটারিভোগ ও কালিজিরার (ধান) জিআই অন্তর্ভুক্তির পেছনে বাংলাদেশ        কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিএআরসি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সিস্টেমের সমন্বয়ক প্রতিষ্ঠান। এটি মূলত ২০১৩ সাল থেকে জিআই পণ্যের মধ্যে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের নিবন্ধীকরণের জন্য নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয়ক হিসাবে কাজ করছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন শিল্প উন্নয়ন ও গবেষণা সমন্বয় কমিটির (ওউজঈঈ) সাথে বিএআরসি ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চে ওউজঈঈ এর ১ম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএআরসি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে বিবেচ্য ফসল, মৎস্য, এবং প্রাণিসম্পদ নিবন্ধনের জন্য সকল নার্স প্রতিষ্ঠানকে পত্র প্রেরণ করে। পরবর্তীতে ওউজঈঈ এর সভায় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য নিবন্ধীকরণ বিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিএআরসি ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ একটি সেমিনারের আয়োজন করে। উক্ত সেমিনারে আলোচনা শেষে নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানসমূহের জিআই পণ্য স্বীকৃতির নিবন্ধীকরণের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করার লক্ষ্যে বিএআরসির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়।
পরবর্তীতে দেশে পণ্যের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য নিবন্ধীকরণের জন্য বিএআরসি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে উদ্বুদ্ধ-প্রেরণামূলক পত্র জারি করে। শিল্প উন্নয়ন গবেষণা সমন্বয় কমিটির (ওউজঈঈ) এর ৬ষ্ঠ সভায় নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যকে ভৌগোলিক নির্দেশক জিআই স্বীকৃতির নিবন্ধীকরণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ প্রদান করা হয়।
জিআই আইন ও বিধিমালার আওতায় বাংলাদেশে এখন ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্য জিআই অন্তর্ভুক্তির দাবি রাখে। জিআই অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি যদিও বাংলাদেশের কাছে নতুন, আশার কথা হলো দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে।
জিআই পণ্যের বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক মূল্য ও ঐতিহাসিক সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা। সে বিচারে বাংলাদেশে এখনও বিপুল সংখ্যক পণ্য জিআই অন্তর্ভুক্তির দাবিদার। এ ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা সিস্টেমের আওতায় যেসব ঐতিহাসিক পণ্য রয়েছে তাদের জিআই প্রাপ্তির বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এপেক্স বডি হিসেবে বিএআরসি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমূহের উদ্ভাবিত পণ্যসমূহের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্তির লক্ষ্যে আগামী দিনগুলোতেও চলমান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) বা এবড়মৎধঢ়যরপধষ ওহফরপধঃরড়হ (এও) বিষয়ে আমাদের দেশে অনেকেই অজ্ঞাত । সে কারণে জিআই সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রচার ও গবেষণাসহ কৃষিশিক্ষা পাঠ্যক্রমে জিআই আইন এবং প্রযুক্তিগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। দেশে বিশ্ব বাণিজ্য এবং মেধাস্বত্ব বিষয়ে আরো জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য যেমন পাহাড়ি ঝাড়শিম বা হাটহাজারীর পুতা বেগুন, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, কিশোরগঞ্জের চেপা শুঁটকি ও টেপি বোরো চাল, মহেশখালির মিঠা পান, বগুড়ার দই, যশোরের কাঁচাগোল্লার মতো ঐতিহ্যবাহী নানা পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) বা এবড়মৎধঢ়যরপধষ ওহফরপধঃরড়হ (এও) বিবেচনা করা দরকার। এসব পণ্যের গুণাগুণ ও রপ্তানি সম্ভাবনা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের জন্য কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

লেখক : ১সদস্য পরিচালক (শস্য), বিএআরসি, ২প্রিন্সিপাল ডকুমেন্টেশন অফিসার, বিএআরসি। মোবাইল : ০১৭১১১০২১৯৮        ই-মেইল : ংঁংসরঃধনধৎপ@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
তেলজাতীয় ফসলের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সম্প্র্রসারণ

তেলজাতীয় ফসলের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সম্প্র্রসারণ
ড. জগৎ চাঁদ মালাকার
বাংলাদেশে একটি জনবহুল দেশ। এদেশে তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় কম। এই জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা আমাদের এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিকভাবে একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে সে দেশের মোট খাদ্যর প্রাপ্যতা, জনগণের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা এবং খাবার গ্রহণের উপর (সুষম বণ্টন)। তা ছাড়া প্রাপ্যতা থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না থাকলে জনগণ কিনতে পারবে না। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদার ৫৩% আমরা পাই দানাদার খাদ্যশস্য থেকে যা দৈনিক ২১২২ কিলো-ক্যালরির ৭৫%। বাকি ২৫% কিলো-ক্যালরি আসে ফলমূল, শাকসবজি, ডাল ও তেল থেকে। মাথাপিছু তেল গ্রহণের চাহিদা ৩০ গ্রাম, আমরা গ্রহণ করি ২০-২২ গ্রাম। খাদ্য ও পুষ্টি দুটি বিষয় খুবই অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আমরা খাদ্য খাই দেহের পুষ্টি সাধনের জন্য। খাদ্য গ্রহণের ফলে দেহে পুষ্টি উপাদান শোষিত হয় এবং দেহের পুষ্টি সাধন ঘটে। ভালোভাবে জীবন ধারণের জন্য আমাদের পুষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞান খুবই জরুরি একটি বিষয়। দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব হলে দেহে নানা সমস্যা তৈরি হয়। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে পুষ্টি সমস্যা একটি মারাত্মক সমস্যা। অনেকেই পুষ্টি উপাদান, তার উৎস, অপুষ্টিজনিত সমস্য ও তার প্রতিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নাই।
¯েœহ পদার্থ আমিষের মতো প্রাণী এবং উদ্ভিদ দুই উৎস থেকেই পাওয়া যায়। যেমন- ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস, চর্বিযুক্ত মাছ ইত্যাদি প্রাণী থেকে এবং সরিষার তেল, তিলের তেল, বাদামের তেল, সয়াবিনের তেল ইত্যাদি উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়।
তেল/¯েœহ পদার্থ দেহে শক্তি সরবরাহ করে (১ গ্রাম থেকে ৯ ক্যালরি পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়)। দেহের ত্বককে মসৃন রাখে এবং দেহকে আঘাত থেকে রক্ষা করে। খাবারকে সুস্বাদু ও মুখরোচক করে। তেল থেকে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড সরবরাহ করে, যা দেহের বৃদ্ধি, ত্বকের মসৃণতা রক্ষা করে এবং হৃৎপি-ের সঞ্চালনে সহায়তা করে। সবজিতে অবস্থিত ভিটামিন এ, ডি, ই, কে আমাদের শরীরের জন্য গ্রহণোপযোগী করতে হলে সবজিকে তেল দিয়ে রান্না করে খেতে হবে। সুষম খাদ্য বলতে এমন সব খাদ্য বোঝায় যা শরীরের প্রয়োজনীয় সবকটি পুষ্টি উপাদান (যথা- আমিষ, শ্বেতসার, শর্করা, ¯েœহপদার্থ, খাদ্যপ্রাণ, খনিজ লবণ এবং পানি) সঠিক পরিমাণে সরবরাহ করে থাকে।
বর্তমানে দেশ দানাজাতীয় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও তেল, চর্বি ও প্রোটিনের পুষ্টিসমৃদ্ধ শস্য বিশেষভাবে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে অনেকটাই পিছিয়ে আছে, যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএং) ২০৩০ এর পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি অর্জনের একটি প্রধান অন্তরায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, গুণগত মানসম্পন্ন পরিমিত ভোজ্যতেল খাওয়া ব্যতিরেকে পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়, কারণ ভোজ্যতেলে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড যা মানবদেহে তৈরি হয় না। এ ঘাটতি পূরণে ভোজ্যতেল সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সেজন্য দেহকে সুস্থ, সুগঠিত ও রোগ প্রতিরোধে কার্যকর রাখতে নিয়মিত সঠিক পরিমাণ ভালোমানের ভোজ্য তেল গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, মানবদেহে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির ৩০% তেল বা চর্বিজাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত, কিন্তু আমাদের আসে মাত্র ৯% যা নিতান্তই অপ্রতুল। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের ৯০% বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ আমদানি নির্ভরতার ফলে একদিকে যেমন বিদেশে প্রচুর অর্থ চলে যাচ্ছে, তেমনি আমদানি ও বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা পণ্যটির বাজারকে প্রায়ই অস্থিতিশীল করছে। এখন সময় এসেছে দেশে তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে নিজেদের উৎপাদিত ভেজালমুক্ত তেল ব্যবহার করার।
তেলফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির দুটো কৌশল রয়েছে- একটি হলো বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে হেক্টরপ্রতি ফলন বৃদ্ধি (ঠবৎঃরপধষ ঊীঢ়ধহংরড়হ) অন্যটি হলো প্রচলিত শস্যবিন্যাসে তেলফসলকে অন্তর্ভুক্ত করে তেল ফসলের আবাদি এলাকা বৃদ্ধি (ঐড়ৎরুড়হঃধষ ঊীঢ়ধহংরড়হ)। এ মুহূর্তে দেশে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর বোরো-পতিত-রোপাআমন শস্যবিন্যাস প্রচলিত আছে যাকে সরিষা-বোরো-রোপাআমন শস্যবিন্যাসে রূপান্তরিত করতে পারলে সরিষার উৎপাদন বৃদ্ধি অনেকাংশে সম্ভব। এ শস্য বিন্যাসটি প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি রোপাআমন (জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন) এবং স্বল্প জীবনকালের সরিষার জাত (জীবনকাল ৭৫-৮০ দিন) বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে এরই মধ্যে স্বল্পমেয়াদি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে যা এখন সহজলভ্য। তাছাড়া অন্যান্য তেল ফসল যেমন-তিল, চীনাবাদাম, সয়াবিন এবং সূর্যমুখীর বেশ কিছু উন্নত জাত রয়েছে যেগুলো উচ্চফলনশীল হওয়ায় চাষের আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
উল্লেখ্য যে, দেশে তেলজাতীয় ফসল সূর্যমুখী আবাদের একটি অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান রয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ফসলটি চাষাবাদে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় ঘানিতে নিষ্কাশন করে লোকজন ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহারও করছেন। উচ্চফলনশীল খাটো জাতের প্রচলন এবং উপযুক্ত বাজার মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে এ তেল ফসলটির আবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে তেল ফসলের আবাদি জমি ৭.২৪ লাখ হেক্টর থেকে ১৫% বৃদ্ধি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মৌচাষকে অন্তর্ভুক্ত করে হেক্টরপ্রতি ফলন ১.৩৪ মে.টন থেকে ১৫% বৃদ্ধি করতে পারলে দেশে অতিরিক্ত ১.২৫ লাখ মে.টন তেল উৎপাদন করা সম্ভব যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা। বিশেষভাবে উল্লেখ, মৌ-চাষ পরাগায়ণের মাধ্যমে কেবল তেল ফসলের উৎপাদনই বাড়ায় না পাশাপাশি মধুও উৎপাদিত হয় যা থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং আলাদা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ সকল দিকগুলো বিবেচনা করে তেলজাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধিপূর্বক ভোজ্যতেলের চাহিদাপূরণ ও আমদানি ব্যয় হ্রাস করণের লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
মানুষ বাড়ছে জমি কমছে সেজন্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ আমাদের রয়েছে, ফলে অল্প জমিতে অধিক ফসল ফলানোর তাগিদও বাড়ছে। লক্ষ্য হচ্ছে এক জমি থেকে বছরে তিন ফসল ফলানো। আর এজন্য এমন সব ফসলের জাত প্রয়োজন যেন জমি প্রস্তুতের সময় ছাড়া বাকি সময়ে তিনটি ফসল কেটে নিয়ে আসা যায়। অনেক শস্য বিন্যাসে যেমন- সরিষা-বোরো-রোপা আমন-এ তিনটি  ফসলের জাত এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন ৩২০-৩৪৫ দিনের মধ্যে তিনটি  ফসলই সংগ্রহ করা যায়।  
ধান কৃষকদের প্রধান ফসল। কৃষক সাধারণত চায় ধানের ফলনের পাশাপাশি বাড়তি আরও ৩টি ফসল পেতে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি কিন্তু অধিক ফলনশীল জাত পছন্দ করেন। ধানের স্বল্পমেয়াদি আমন ধান, বিনা ধান-১৬, বিনা ধান-১৭,  ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫,  ব্রি ধান৮৭, ব্রি হাইব্র্রিড ধান৪, বাউ ধান-১ ও বোরো ধানের জাত যথাযথ ভাবে  চাষাবাদ করতে পারলে ফলন খুব একটা না কমিয়ে ২৩০-২৫০ দিনের মধ্যে দুটি ধান ফসল সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব। কৃষকের কাছে সে রকম জাতের তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং শস্যবিন্যাসে এদের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা বড় প্রয়োজন। আর সেটা পারলে দুই ধানের মাঝখানে      ৮০-৯০ দিনের উচ্চফলনশীল সরিষার জাত বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা-৯, বাউ সরিষা ১, বাউ সরিষা-২, বাউ সরিষা-৩ আবাদ করা সম্ভব। যে সকল জমিতে আউশ বা পাট আবাদ করা হয় সে সকল জমিতে সরিষা চাষের জন্য বারি সরিষা-১৮ (ক্যানোলা টাইপ) নির্বাচন করা যেতে পারে। কারণ উক্ত জাতের জীবনকাল ও ফলন বেশি।
মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক, এমপি মহোদয়ের নির্দেশনায় তেল ফসলের আমদানি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দেশ অচিরেই এর সুফল পাবে বলে আশা করা যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরা উৎপাদন করতে হবে। জাতির পিতার মহামূল্যবান বাণী অনুসরণ করে সম্মানিত কৃষক ভাইদের তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বৃদ্ধির আহ্বান জানাচ্ছি।

লেখক : ড. জগৎ চাঁদ মালাকার, প্রকল্প পরিচালক, কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজে স্থাপিত উদ্ভিদ সংগনিরোধ ল্যাবরেটরিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। ইমেইল: লধমড়ঃথসধষধ@ুধযড়ড়.পড়স,  ফোন : ০১৭১৬০০৪৪০০

বিস্তারিত
প্রাকৃতিক খাদ্যশস্যের ‘এক পাওয়ার হাউস’ চিয়া বীজ পুষ্টি ও শক্তির জোগানদাতা

প্রাকৃতিক খাদ্যশস্যের ‘এক পাওয়ার হাউস’ চিয়া বীজ
পুষ্টি ও শক্তির জোগানদাতা
মো: হাফিজুর রহমান
ক্ষুদ্র দানাকৃতির এই বীজ আসলেই - এক পাওয়ার হাউস; পুষ্টি ও শক্তির উৎস। চিয়া অর্থ শক্তি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মেক্সিকোর অ্যাজটেক এবং মধ্য আমেরিকার মায়ান সভ্যতা পৃথিবীর পুরাতন সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। যীশু খৃষ্টের জন্মের প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে দক্ষিন আমেরিকায় এই সভ্যতার হদিস পাওয়া যায়। এই সময় থেকেই তারা দানাদার এক শস্যকে ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে গুরুত্ব দিত। এই দানা শস্যের নামই ‘চিয়া। এক জাদুকরী দানা। অ্যাজটেকদের মুল খাবার ছিল এই চিয়া বীজ। এমনকি তাদের প্রার্থনা/ উৎসর্গেও এই বীজের ব্যবহার হত। খৃষ্টপূর্ব ৩৫০০ বছর আগে থেকে এই বীজ ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া গেছে। খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৯০০ সালের মধ্যে মেক্সিকোর টিওতিহুয়াকান ও টোলটেক জাতির লোকেরা এর চাষ করত।  
চিয়া বীজ থেকে আটা তৈরি করে খেতো সাধারণ মানুষ- কিন্তু অ্যাজটেক যোদ্ধারা এই দানা সরাসরি ব্যবহার করতো পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারের সুবিধার্থে। পানিতে ভেজালেই এই বীজ ফুলে উঠে পানিটাকে ঘন ‘জেলি’ বানিয়ে ফেলে; সহজে খেয়ে নেয়া যায়। ক্ষুদ্র বীজে রয়েছে উচ্চ মাত্রার পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ১৫-২০% প্রোটিন, ১৮-৩০% চর্বি, ৪১% ডায়েটারি ফাইবার/আঁশ, ১৮-৩০% অ্যাশ, ৪-৫ এন্টি অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। চিয়া বীজের বিশেষত্ব হল এর পুষ্টিমান। প্রক্রিয়াজাত না হয়েও- সরাসরি শরীরে তা শোষিত হতে পারে!   প্রতি ১০০ গ্রাম চিয়া বীজে ৬৩১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪০৭ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ৩৩৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, ৮৬০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ৫৫.২ মাইক্রোগ্রাম সেলেনিয়াম, ৭.৭২ মাইক্রোগ্রাম আয়রন, ২.৭২ মাইক্রোগ্রাম ম্যাঙ্গানিজ ও ১৮ গ্রাম ওমেগা-৩-ফ্যাটি এসিড। এই এসিড শরীরের ট্রাইগ্লিসারিন বাড়ায় এবং কোলেস্টরল কমায়। চিয়া সীডের পুষ্টিগুণ তুলনা করলে জানা যায় এতে রয়েছে দুধের চেয়ে ৫ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, কমলার চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি, পালং শাকের চেয়ে ৩ গুণ বেশি আয়রন (লোহা), কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম, স্যামন মাছের থেকে ৮ গুণ বেশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। বিভিন্ন ফল ও সবজির তুলনায় চিয়া বীজে বেশি ফাইবার থাকায় কোষ্ঠ্যকাঠিন্য নিরাময়ে খুবই উপযোগী। পেটের রোগ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোসহ ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। এটি নিয়মিত সেবনে ওজন কমায়। প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে চিয়া বীজে। আর এর এন্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ফ্রি রেডিক্যালস বার্ধক্য আর ক্যান্সার এর বিরুদ্ধে অতি কার্যকর এক বস্তু। চিয়া বীজের পুষ্টিগুণ দানাদার শস্য বা তেলবীজ গুলোর মধ্যে সেরা। ডি এন এ সংশ্লেষণ এবং বিপাকের প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি পূরণে এই চিয়া বীজ আমাদের ডায়েটে এক দারুন সংযোজন হতে পারে। ফাইবার আর জেলির মত উপাদানের কারণে তরলের সাথে মিশে চিয়া মানসিক পরিতৃপ্তির কারণ হয়; এটা শারীরিক পুষ্টি ও মানসিক প্রশান্তির জোগান দেয়। এ ছাড়া গ্লুটিন মুক্ত হওয়ায় যাদের শরীরে গ্লুটিন হজম হয় না, তাদের জন্য চিয়া বীজ এক আশীর্বাদ।
চিয়া পুডিং বেশ বাজার পেয়েছে। সিরিয়াল, সস, সব্জি, এমনকি ইউগার্ট এর উপরে ছিটিয়ে দিয়ে খাওয়া যায়। চিয়া সিড সরাসরি যে কোন ফলের জুসের সাথে পান করা যায়। খৈ এর মত ভেজেও খাওয়া যায়। চিয়া বীজের নিরপেক্ষ স্বাদের কারণে এটা সব ধরনের খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়ার উপযুক্ত। সবচেয়ে সহজ হল- ষ্টীম করে নিয়ে সালাদ এর সাথে যোগ করা। বেক করা খাবার (বিস্কুট, কেক ইত্যাদি), সুপ, সালাদ ইত্যাদির সাথে মিশিয়েও চিয়া সীড খাওয়া যায়। যেভাবে ইসপগুলের ভুসি পানিতে ভিজিয়ে খেতে হয়, সেইভাবে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এক ধরনের জেলি বের হয়। এই জেলিই খেতে হয়। এ ছাড়া রুটি, পুডিং, কেক, পাউরুটির সঙ্গে মিক্সিং করে খাওয়া যায়। ফুটন্ত গরম পানিতে চিয়া পাতা ৩-৫ মিনিট রেখে দিলে হলুদ রংয়ের আকর্ষণীয় চা  তৈরি করে পান করা যায় । এ ছাড়াও পেট্রিডিশ বা প্লাস্টিক পটে চিয়া বীজ থেকে ১০-২১ দিন বয়সের মাইক্রোগ্রীন বা কচি চারা তৈরি করে সালাদ বানিয়ে পিজ্জা ও বার্গারের সাথে খাওয়া যায়।
চিয়ার  উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচিতি ও চাষবাস  
চিয়া (ঝধষারধ যরংঢ়ধহরপধ), মিন্ট পরিবার বা খধসরধপবধব)’র সদস্য। চিয়া বর্ষজীবী, ওষধি তৈলবীজ- তিল বা তিষির মত। এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা প্রতিপন্ন, দন্তর । ফুল স্পাইকে সজ্জিত, নীল, বেগুনী বা সাদা রং এর হতে পারে। দুটো বর্ধিত ঠোঁটের মত ফুল- যা মিন্ট পরিবারের বৈশিষ্ট, উচ্চ মাত্রায়              স্বপরাগী। গোল বা উপবৃত্তাকার বাদামি থেকে ধূসর  সাদা বা ধূসর-সাদা রঙের বীজ হয়। চিয়া, দানা শস্য ও হেলথ ফুড হিসেবে প্রথমে আমেরিকায় এবং সে সাথে সারা দুনিয়ায় ‘গ্রহণযোগ্যতা পায়।
পুষ্টিমানের দিক থেকে চিয়া বীজ হল- প্রকৃতিতে অধিক মাত্রার আলফা লিনোলিনিক এসিড বা ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিডের উদ্ভিজ্জ উৎস হিসেবে অন্যতম।
চিয়া বীজের প্রকারভেদ
প্রধানত দুটি ভিন্ন ধরনের চিয়া বীজ রয়েছে, একটি কালো চিয়া বীজ এবং অন্যটি সাদা রঙের বীজ। বেগুনি ফুল, উৎপাদনকারী চিয়া গাছগুলি বাদামি বীজ দেয়। এই বাদামি রঙের বীজগুলিকে কালো চিয়া” বলা হয়। সাদা ফুল উৎপন্নকারী চিয়া উদ্ভিদ কেবল সাদা বীজ উৎপন্ন করে। সাদা চিয়া বীজ হল সাদা, ধূসর এবং হলুদ মার্বেলযুক্ত রঙের বীজ ।
চিয়া বীজের বংশ বিস্তার
চিয়া মূলত বীজ এবং চারা উভয় থেকে বংশ বিস্তার করা হয়, বীজ থেকে চিয়া উদ্ভিদ বৃদ্ধি করা সবচেয়ে ভাল। চিয়া বীজ ৫-৭ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।
চিয়া বীজ চাষের জন্য তাপমাত্রা এবং জলবায়ু
চিয়া বীজ ফসলের বৃদ্ধির জন্য সর্বনিম্ন ১১ ডিগ্রি সে.  এবং সর্বাধিক ৩৬ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা এবং অনুকূল তাপমাত্রা  ১৬-২৬ ডিগ্রি সে. প্রয়োজন। চিয়া বীজ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উষ্ণ তাপমাত্রায় ভালো জন্মে। চিয়া বীজ ফসলের জীবন চক্রের সময়কাল অবস্থানের উপর নির্ভর করে এবং বৃদ্ধি  উচ্চতা/অক্ষাংশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক সবজি বীজের মতো চিয়া উদ্ভিদ হল স্বল্প দিনের ফুল গাছ যা ১২-১৩ ঘন্টা ফোটোপেরিওডিক থ্রেশহোল্ডে তার বৃদ্ধি এবং ফলের সময়কাল অক্ষাংশ/উচ্চতার বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে। উত্তর গোলার্ধে চিয়া অক্টোবরে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এপ্রিল মাসে ফুল আসতে শুরু করে।  বিভিন্ন বাস্তুসংস্থানে চিয়া বীজের জীবন চক্রের সময়কাল ১০০-১৫০দিনের মধ্যে।
বাংলাদেশে চিয়া বীজ চাষের জন্য উপযুক্ত মৌসুম
দেশীয় আবহাওয়ায় চিয়া বীজ রবিশস্য হিসেবে চাষ করা যায়। শীত হল চিয়া বীজ রোপণ ও বৃদ্ধির আদর্শ সময়। কারণ এটি একটি স্বল্প দিনের ফুল গাছ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় দীর্ঘ দিনের ঋতুতে বৃদ্ধি পায় না। বেশি ফলনের জন্য ১৫ নভেম্বরের মধ্যে চাষ করতে হবে। তবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ এবং জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেও বোনা যেতে পারে। ফসল ঘরে উঠাতে ৯০-১০০দিন সময় লাগে।
চিয়া বীজ চাষের জন্য মাটি
ফসলটি সব রকম মাটিতে চাষ করা যায়। হালকা থেকে মাঝারি কাদামাটি বা বেলে থেকে বেলে দোআঁশ মাটি প্রয়োজন। ভালোভাবে নিষ্কাশিত, মাঝারি উর্বর মাটিতে ভালো ফলন দিতে পারে। এটি অ্যাসিড মাটি এবং মাঝারি খরাও প্রতিরোধ করতে পারে। চিয়া বীজ বপন ও চারা স্থাপনের জন্য সম্পূর্ণ আর্দ্র মাটির প্রয়োজন কিন্তু পরিপক্ক চিয়া উদ্ভিদ বৃদ্ধির সময় ভেজা মাটি সহ্য করতে পারে না।
বীজহার, বীজ বপন ও চারা রোপন পদ্ধতি
সাধারণত বিঘা প্রতি  ১০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। ৩/৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুড়া করে জমি প্রস্তুত করে নিতে হবে। মাটি আগাছামুক্ত হওয়া উচিত। চিয়া বীজ খুবই ক্ষুদ্র বীজ। তাই সরাসরি বীজ ছিটিয়ে বপন করার আগে প্রায় পাঁচ কেজি শুকনো বালি বা ছাই বীজের সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। তারপর সরিষা/তিল এবং ডাটা শাক বীজের মত ৪০-৫০ সেন্টিমিটার সারি থেকে সারিতে বালু বা ছাই মাখা বীজ ক্রমাগত ছিটাতে হবে। এ ছাড়া চারা করে ১৫-২৫ দিন বয়সের চারা ৪০-৫০ সেন্টিমিটার সারি থেকে সারিতে এবং গাছ থেকে গাছ ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ভিজা মাটিতে লাগানো যায়।
আন্তঃপরিচর্যা
সার ও সেচ : চিয়া বীজ কম সার প্রয়োগের মাধ্যমে চাষ করা যেতে পারে।  সুপারিশকৃত সার বিঘা প্রতি ইউরিয়া ৩০ কেজি, টিএসপি ৪৫ কেজি, এমওপি ২০ কেজি এবং বোরিক এসিড ৩০০ গ্রাম। চূড়ান্ত জমি প্রস্তুতির সময় শেষ চাষে আনুমানিক এক -তৃতীয়াংশ ইউরিয়া এবং সম্পূর্ণ পরিমাণ অন্যান্য সার প্রয়োগ করতে হবে। পরবর্তীতে দুই-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া দুটি কিস্তিতে রোপণের ২০ দিন এবং ৪০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। চিয়া গাছ রোদ, ভেজা-নিষ্কাশন এবং খরা পছন্দ করে কিন্তু নিয়মিতভাবে পানি দিলে এর বাড়বাড়ন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই ভাল ফলনের জন্য আবহাওয়া এবং বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে দুই-তিনটি সেচের প্রয়োজন হতে পারে।
রোগ ও কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা : চিয়া ফসলে তেমন কোন কীটপতঙ্গ বা রোগবালাই এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। চিয়া পাতায় অপরিহার্য এমন কিছু তৈলাক্ত পদার্থ ও গন্ধ রয়েছে যা পোকামাকড়ের প্রতি আরও প্রতিরোধী করে তোলে, ফলে কীটনাশক ছাড়াই  নিরাপদ/জৈব চাষের জন্য উপযুক্ত। কখনও কখনও সাদা মাছি দ্বারা সালভিয়া বংশকে সংক্রমনকারী ভাইরাস যেমন শসার মোজাইক ভাইরাস, ব্রড বিন উইল্ট ভাইরাস, মুগ ডাল হলুদ মোজাইক ভাইরাস, টমেটো হলুদ পাতা কার্ল ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যায় । ফসলে এই ভাইরাসে সংক্রমণ দেখার সাথে সাথে আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে এবং সাদা মাছি নিয়ন্ত্রনের জন্য এডমায়ার ২মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১-২ বার স্প্রে করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ
যখন ৬০-৮০ % ফুলের মাথা বাদামি এবং হলুদ-ব্রাউন রঙে পরিণত হয়, তখন চিয়া ফসল কাটার জন্য প্রস্তুত হয়। মাটির উপরে থাকা পুরো চিয়া গাছগুলি কেটে নিয়ে ত্রিপল বা পরিষ্কার মেঝেতে রেখে রোদে শুকাতে হবে । এক-দুই দিনের রোদ শুকানোর পরে, বাঁশ বা কাঠের লাঠি দিয়ে আলতো ভাবে আঘাত করলে গাছ থেকে বীজ আলাদা হয়ে যাবে।  তারপর বীজ ঝেড়ে পরিষ্কার করে সংরক্ষণ করতে হবে। চাষের পদ্ধতি ও ভৌগোলিক অঞ্চল ভেদে ফলন বিঘা প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।

লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, যশোর। মোবাইল-০১৭৫৭-৮০২১৮৯, ই-মেইল : যধভরলৎধযসধহ০৫@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
আমে লাভবান গোমস্তাপুরের কৃষি উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম

আমে লাভবান গোমস্তাপুরের কৃষি
উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম  
কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ-হিল-কাফি১ মো: আমিনুল ইসলাম২
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত। এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাতের আম উৎপাদন হয়। অথচ আমের মৌসুম ছাড়া সারাবছর আম পাওয়া যায় না। এ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেরাজুলের মাথায়। মানুষ কেন বারমাস সুস্বাদু আম খেতে পায় না। তাঁর এই উদ্বুদ্ধর কথা নিজ ভাই কমান্ডার রেজাউল করিমকে বলেন। ভাইয়ের পরামর্শে তিনি নিজ গ্রাম বোয়ালিয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া এলাকায় একটি বাগান তৈরি করেন। ওই বাগানে একটি প্রজেক্ট করেন। অমৌসুমে তার আম বাগানে গাছে ঝুলছে বিভিন্ন জাতের পাকা আম ও ডালে ডালে মুকুলের সমারোহ। গোমস্তাপুর উপজেলা পার্বতীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের প্রত্যন্ত মাঠের একটি বাগানের এ দৃশ্য দেখা যায়। প্রথমে পরীক্ষামূলক চাষাবাদ করে আজ সফলতার মুখ দেখছেন অসময়ের (বারোমাসি) আম উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলাম।
তিনি ওই মাঠে ব্যক্তি মালিকাধীন ১২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে এ আম উৎপাদন শুরু করেছেন। পাকা আমসহ আমের চারা বিক্রি করছেন। সেখানে বারোমাসী ম্যাংগো ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ওই বাগান থেকে তিনি বছরে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।
সেই প্রজেক্টে পরীক্ষামূলকভাবে আম উৎপাদনে সফলতা অর্জন করে এবং ভালো একটা মুনাফা পায়। এরপর থেকে তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তীতে সেরাজুল ইসলাম উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে ১২ বিঘা জমি লিজ নেন। ওই জমিতে ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রজেক্ট হিসেবে আ¤্রপালি জাতের আমগাছ থেকে সাইনিং শুরু করেন। পরে বারোমাসি বারি-১১ জাতের আম উৎপাদন করতে থাকে। তার ওই বাগানে প্রায় দেড় হাজারের অধিক বিভিন্ন জাতের আমগাছ রয়েছে। ওই গাছগুলো থেকে বছরে তিনবার আম ধরে বলেন উদ্যাক্তা সেরাজুল ইসলাম। এখন তিনি সাড়ে তিন’শ থেকে সাড়ে চার’শ টাকা কেজি ধরে আম বিক্রি করছেন।
এ বিষয়ে সেরাজুল ইসলাম বলেন, দেশসহ বিশ্বে যেহেতু আমের পরিচিত রয়েছে, আম ফুরিয়ে গেলে অসময়ে আর আম পাওয়া যায়না। কিভাবে অসময়ে আম পাওয়া যাবে। এ চিন্তা থেকে বিভিন্ন স্থানে জাত সংগ্রহ করতে থাকি। কিন্তু সে জাতগুলো ভালো না। খোঁজ করতে করতে ঢাকা থেকে এ জাত সংগ্রহ করি। তারপর পরিকল্পনা করি। সফল হয়েছি।
এক বিঘা জমিতে প্রায় ৪ লাখ টাকার আম বিক্রি করা হয়েছিল। এ সফলতা থেকে তিনি উপজেলার মহেশপুর গ্রাম এলাকায় ব্যক্তি মালিকের ১২ বিঘা জমি লিজ নেয়া হয়। সেখানে তিনি অসময়ে আম উৎপাদন শুরু করেন।
তিনি আম চাষের বিষয়ে বলেন, যেমন : বারি আম-১১। এ জাতের গাছ বছরে তিনবার ফল দেবে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি, এপ্রিল ও জুলাই-আগস্টে এ আম পাওয়া যাবে। এটি খেতে খুবই  সুস্বাদু। তবে আঁশ আছে। এটি আকারে লম্বাটে। প্রতিটি আমের গড় ওজন হয় ৩০০-৩১৭ গ্রাম। কাঁচা আমের ত্বক হালকা সবুজ। আর পাকলে ত্বক হয় হলুদাভাব সবুজ। আঁটির ওজন ২৫ গ্রাম অর্থাৎ পাতলা আঁটির আমটির ৭৯ ভাগ খাওয়া যায়। মিষ্টতার পরিমাণ জানি যে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ টিএসএস।
তিনি আরো বলেন, আমরা আমের চাষ করে থাকি লাভ পাওয়ার জন্য। আম চাষ থেকে লাভ পেতে হলে আমাদের একটি ভালো জাত নির্বাচন করতে হবে যেন ফলন ভালো হয়। আমাদের দেশে নানা জাতের আম রয়েছে। এদের মধ্যে কিছু উন্নত হাইব্রিড জাত হলো- আ¤্রপালি, বারি-৭, বারি-১১, কাটিমন, ভাসতারা, গৌড়মতি ইত্যাদি। এদের মধ্যে আ¤্রপালি চাষ করা বেশ লাভজনক। এটি আকারে অনেক বড় হয় এবং খেতে ও বেশ সুস্বাদু। এই জাতের আম ঘরেও বেশ কয়েক দিন রেখে দেওয়া যায়। তাছাড়া এর ফলনও অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক বেশি।
শুধু বাগান বা বাড়ির আঙিনায় নয় ছাদের উপরে ড্রামে, পুকুরপাড়ে বাণিজ্যিকভাবে  বাগানে বারোমাসি  জাতের আমগাছ লাগানো যায়। বসতবাড়িতে শখ করে দু-একটা গাছ লাগানো যেতে পারে। তবে কেউ যদি দুই-এক হেক্টর জমিতেও এ জাতের বাণিজ্যিক বাগান গড়তে চান তো সে ক্ষেত্রে আ¤্রপালি আমের চেয়ে লাভ কম হবে না। এ জাতের আমের গাছ লাগানোর জন্য চাই উঁচু জমি, যেখানে বন্যা বা বৃষ্টির পানি আটকে থাকে না। বেলে, বেলে দোআঁশ ও উপকূলের লোনা মাটি ছাড়া যেকোনো মাটিতে এই জাতের আম চাষ করা যেতে পারে। এই জাতের আম চাষ করা যায় লাল মাটি ও পাহাড়েও। তবে দো-আঁশ ও এঁটেল-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। এরূপ মাটিতে জৈবসার ব্যবহার করে চাষ করলে গাছের বাড়বাড়তি ও ফলন ভালো হয়। আম চাষ করতে গেলে প্রথমে মাটি তৈরি করতে হবে। এটা অনেকটা জমি নির্বাচনের মত। যদি টবে আম চাষ করতে চান তাহলে টবের জন্য মাটি তৈরি করে নিতে হবে। টবে আম চাষের জন্য উর্বর দো-আঁশ মাটি সর্বোত্তম। টবের মাটির সাথে গোবর, টিএসপি ও কম্পোস্ট সার মেশাতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার তৈরি হয়। পানি নিষ্কানের জন্য টব বা ড্রামের নিচের দিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিদ্র করে দিতে হবে।
আমের চারা রোপণের উত্তম সময় জেনে নিতে হবে। আমের চারা রোপণের জন্য জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস সর্বোত্তম। এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণের বৃষ্টি হয় তাই চারা পর্যাপ্ত খাবার পায় ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়াও ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আ¤্রপালি চারা লাগানো যেতে পারে। এটিও একটি উপযুক্ত সময়। যদি পানি সেচের জন্য যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা থাকে তাহলে সারা বছরই আমের চারা রোপণ করা যেতে পারে। আমের বীজ বপন ও রোপণ করতে হবে  সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক সময়ে পানি সেচ দেয়া প্রয়োজন। আমের চারা সোজা করে লাগাতে হবে। চারা রোপণের পর গাছের গোড়ার মাটি হাত দিয়ে টিপে টিপে কিছুটা উঁচু করে দিতে হবে যেন পানি গাছের গোড়া দিয়ে না ঢুকে একটু দূর দিয়ে ঢুকে। চারা লাগানোর পর চারাটিকে একটি কাঠির সাথে সোজা করে বেঁধে দিতে হবে। চারা লাগানোর প্রথম দিকে পানি কম পরিমাণে সেচ দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে পানি সেচের পরিমাণ বাড়াতে হবে। আমের চারা দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ঘন ঘন পানি দিতে হয় এবং পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর ব্যবস্থা আছে এমন স্থানে রোপণ করতে হয়। বাড়ির ছাদের টবে অথবা ড্রামে আমের চারার কলম লাগানোর পর পানি দিবেন। নিয়মিত পানি দিতে হবে। কলমের চারা যদি লম্বা হয় তখন ডালপালা মাটিতে লেগে যায় সেক্ষেত্রে ডালপালার আগা কেটে দিতে হবে। টব বা ড্রাম ছাদ থেকে কিছুটা উপরে রাখতে হবে তাহলে ছাদের কোন ক্ষতি হবে না। টব বা ড্রামের চার কোণায় চারটি ইট ব্যবহার করে উঁচু করে দেওয়া যেতে পারে বা অন্যান্য পদ্ধতিও অবলম্বন করা যেতে পারে।
আম গাছের পরিচর্যার বিষয়ে এই চাষি বলেন, আমগাছে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করে ফসল নষ্ট করে। বিশেষ করে যখন গাছে মুকুল ধরে তখন পোকা আক্রমণ করে যার কারণে আম কুঁড়ি অবস্থায় ঝরে যায়। আবার যখন আম কিছুটা বড় হয় তখন আমের ভেতরেও পোকা হয়ে থেকে যায় ফলে ফলন খুব একটা ভালো হয় না। এসব সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিকটস্থ কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ নিয়ে কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত।
পরিশেষে তিনি বলেন, সাধারণত আম হচ্ছে একটি গ্রীষ্মকালীন ফল। আমাদের দেশে বৈশাখ শেষের দিকে ও জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথমের দিকে আম সংগ্রহ করার উপযুক্ত সময়। আম সংগ্রহ করার সময় দু-তিনটি পাতাসহ বোঁটা কেটে আম সংগ্রহ করলে ভালো হয়। তাহলে আমের গুণগতমান ভালো থাকবে। বোঁটার নিচে অথবা আমের উপরিভাগ কিছুটা হলদে ভাব ধারণ করবে যাকে আমরা আধাপাকা বলে থাকি তখনই আম সংগ্রহ করতে হবে।
কৃষক অথবা তরুণদের উদ্দেশে বলেন, প্রজেক্ট হিসেবে কাজ শুরু করে এখন সফলতার মুখ দেখছেন তিনি। তার ওই বাগানে আছে, বারি-১১, কাটিমন, বানানা ম্যাংগো, গৌরমতি, বিশ্বনাথ চ্যাটার্জি, খিরসাপাত, আশ্বিনাসহ বিভিন্ন জাতের আম। এ ছাড়া অসময়ে আমের জন্য অন্যজাতের আম পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজেরসহ এলাকার লোকজনের কাজের কর্মস্থান হয়েছে। বাগান থেকে বিঘাপ্রতি তিন লাখ টাকার আম বিক্রি হবে।
আগামীতে এর চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে আশা করছেন। তিনি ধারণা করছেন তার জীবনের একটা মোর ঘুরে যাবে। এদিকে সফল উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলামের সম্ভাবনায় আম উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এলাকায়, সরকারি প্রণোদনা পেলে বেশি বেশি আম উৎপাদন করে বাংলাদেশ তথা বিশ্বে রপ্তানি করে দেশ ও বিদেশের মানুষকে অসময়ে আমের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবেন বলেন তিনি ।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সীমা কর্মকার বলেন, কয়েক মাস আগে সেরাজুল ইসলামের বাগান পরিদর্শন করি। তাঁকে বাগান পরিচর্যার বিষয়ে অনেক রকম পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অসময়ে এত বড় বারোমাসি বাগানের আম চাষি ও নতুন উদ্যোক্তা সেরাজুল ইসলামের লক্ষ্যমাত্রা দেখে তিনি মুগ্ধ। তিনি আরো বলেন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাকে প্রয়োজনীয় যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা সম্ভব তা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া তার বাগানের প্রজেক্ট বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতা করে যাবে উপজেলা কৃষি বিভাগ।

লেখক : ১আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, ২কৃষি তথ্য কেন্দ্র সংগঠক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, রাজশাহী, মোবাইল : ০১৭৬৭৭৬৫৫৫৮; ইমেইল: ধসরহঁষ.ধরপড়@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
তথ্য ও প্রযুক্তি পাতা

তথ্য ও প্রযুক্তি পাতা
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
আউশ  
    এসময় আউশ ধান পাকে। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পাকা আউশ ধান রিপার/কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে কম খরচে, স্বল্প সময়ে সংগ্রহ করুন।
আমন ধান
    রোপা আমন ধানের চারা রোপণের লক্ষ্যে মূল জমিতে শেষ চাষের সময় হেক্টর প্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিন।
    জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করুন।
    চারার বয়স ৩০-৪০ দিন হলে জমিতে রোপণ করুন।
    চারা রোপনের ১২-১৫ দিন পর প্রথমবার, এর ১৫-২০ দিন পর দ্বিতীয়বার এবং তার ১৫-২০ দিন পর তৃতীয়বার ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করুন।
    গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে চারা লাগানোর ১০ দিনের মধ্যে প্রতি চার গুছির জন্য ১৮ গ্রামের ১টি গুটি ব্যবহার করুন।
    পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধানের ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি বা ডাল পুঁতে দিন যাতে পাখি বসতে পারে এবং এসব পাখি পোকা ধরে খেতে পারে।
পাট
    ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি পাট গাছে ফুল আসলে পাট কেটে, পাতা ঝড়িয়ে জাগ দিন।
    পাট পচে গেলে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ভালো করে ধোয়ার পর ৪০ লিটার পানিতে এক কেজি তেঁতুল গুলে তাতে আঁশ ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন, এতে উজ্জ্বল বর্ণের পাট পাওয়া যায়।
    যেখানে জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়।
    বন্যার কারণে অনেক সময় সরাসরি পাট গাছ থেকে বীজ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই পাটের ডগা বা কা- কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়ে তা থেকে খুব সহজেই বীজ উৎপাদন করার ব্যবস্থা নিন।
তুলা
    রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলে আগাম শীত আসে, সে জন্য এসব অঞ্চলেএ মাসের মধ্যে তুলার বীজ বপন করুন। তুলা উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত যেমন সিবি ১৬, সিবি১৭, সিবি১৮, সিডিবি তুলা এম-১, সিবি হাইব্রিড-১ আবাদ করুন।
শাকসবজি
    বর্ষাকালে শুকনো জায়গার অভাব হলে টব, মাটির চাড়ি, কাঠের বাক্স এমনকি পলিথিন ব্যাগে সবজির চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা নিন।
    সবজি বাগানে প্রয়োজনে মাদায় মাটি দিন, আগাছা পরিষ্কার করুন, গাছের গোড়ায় পানি যেন না জমে সে জন্য পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করুন, মরা বা হলুদ পাতা কেটে ফেলুন, প্রয়োজনে সারের উপরিপ্রয়োগ করুন।
    লতা জাতীয় গাছের বৃদ্ধি বেশি হলে ১৫-২০ শতাংশ পাতা ও লতা কেটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে।
    কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করুন এতে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।
    গত মাসে শিম ও লাউয়ের চারা রোপনের ব্যবস্থা না নিয়ে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আগাম জাতের শিম এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করুন।
গাছপালা
    এখন সারা দেশে গাছ রোপণের কাজ চলছে। ফলদ, বনজ এবং ঔষধি বৃক্ষজাতীয় গাছের চারা বা কলম রোপণের ব্যবস্থা নিন।
    উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে একহাত চওড়া এবং একহাত গভীর গর্ত করে অর্ধেক মাটি এবং অর্ধেক জৈবসারের সাথে ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ১০০ গ্রাম এমওপি ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে সার ও মাটির এ মিশ্রণ গর্ত ভরাট করে রেখে দিন। দিন দশেক পরে গর্তে চারা বা কলাম রোপণ করুন।
    ভালো জাতের স্বাস্থ্যবান চারা রোপণ করুন। চারা রোপণের পর গোড়ার মাটি তুলে দিন এবং খুটির সাথে সোজা করে বেঁধে দিন। রোপণ করা চারার চারপাশে বেড়া দিন।
    কোন পতিত জমি যেন বৃক্ষরোপণ থেকে বাদ না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
বিবিধ
    উচ্চমূল্যের ফসল আবাদ করুন, অধিক লাভবান হন।
    স্বল্পকালীন ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন করুন অধিক ফসল ঘরে তুলুন।
    শ্রম, সময় ও খরচ সাশ্রয়ে আধুনিক কৃষি যন্ত্রের মাধ্যমে আবাদ করুন।

লেখক : তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৯১১০১৯৬১০, ই-মেইল manzur_1980@yahoo.com

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর

প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ মোঃ আবু জাফর আল মুনছুর
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো: সৌরভ, উপজেলা : ডুমুরিয়া, জেলা : খুলনা।
প্রশ্ন : চলতি আমন মৌসুমে কোন জাতের ধান চাষ করতে পারি?
উত্তর : চলতি আমন মৌসুমে আমরা ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২ জাতের ধান চাষ করতে পারি। জলমগ্নতা সহনশীল জাত ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২। স্বল্পজীবনকাল সম্পন্ন জাত ব্রি ধান৬২ ও ব্রি ধান৭৫। অলবণাক্ত জোয়ারভাটা অঞ্চলে চাষযোগ্য জাত ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭। এ ছাড়া উচ্চফলনশীল জাত হিসেবে ব্রি ধান-৮৭ চাষ করতে পারি।
মো: ইমরান, উপজেলা : চৌদ্দগ্রাম, জেলা : কুমিল্লা।
প্রশ্ন : পাটের কা-ে কালচে দাগ পড়েছে, এখন আমরা কী করতে পারি?
উত্তর : আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়ে নষ্ট করতে হবে। সুষম রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। ২ গ্রাম/কেজি হারে ব্যাভিস্টিন দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে ব্যাভিস্টিন ১ গ্রাম, একরোবেস্ট ২ গ্রাম, এপ্রিকোনাজল-১ মিলি প্রতি মিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: আলআমিন, উপজেলা : বিরল, জেলা : দিনাজপুর।
প্রশ্ন : আমের বোঁটার কাছ থেকে পচন শুরু হয়েছে, করণীয় কী?
উত্তর : আম পারার সময় আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আম সংগ্রহের পর ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৫ মিনিট পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। গাছে আক্রমণ হলে এপিকোনাজল বা কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ওষুধ ১ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: ফিরোজ শেখ, উপজেলা : গলাচিপা, জেলা : পটুয়াখালী।
প্রশ্ন : আমন ধানের চারা রোপণের জন্য চারার বয়স কত হতে হবে?
উত্তর : আমন ধানের চারা রোপণের জন্য চারার বয়স ২০ থেকে ২৫ দিন হতে হবে।
মো: আকরাম, উপজেলা : পাকুন্দিয়া, জেলা : কিশোরগঞ্জ।
প্রশ্ন : শসার পাতায় সাদা পাউডারের মতো দেখা যায়, করণীয় কী?
উত্তর : রোগ প্রতিরোধ সম্পন্ন জাত ব্যবহার করতে হবে। পরিত্যক্ত পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট করে পুড়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গাছে সালফার (থিওভিট)-২ গ্রাম/মিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: মাহাবুব, উপজেলা : রংপুর সদর, জেলা : রংপুর।
প্রশ্ন : বেগুনের গোড়া পচা রোগ শুরু হয়েছে, করণীয় কী?
উত্তর : রোগাক্রান্ত গাছের গোড়ায় ছাই মিশ্রিত পটাশ সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। রোগাক্রান্ত হওয়ার আগে এপিকোনাজল গ্রুপের ওষুধ গাছের গোড়ায় স্প্রে করলে আক্রমণ কম হয়। এ ছাড়া গাছের গোড়ায় বর্দোপেস্ট লাগানো যেতে পারে।
মো: এনামুল, উপজেলা : সাদুল্লাপুর, জেলা : গাইবান্ধা।
প্রশ্ন : মিষ্টি কুমড়া গাছের পাতা খেয়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : পাতার উপর ছাই ছিটিয়ে দিলে সাময়িকভাবে দমন করা যায়। চারা বা মাদার চারদিকে ২-৫ গ্রাম দানাদার কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে সাইপারসেথ্রিন-১ মিলি, মিপসিন, সপসিন-২ গ্রাম, সেভিন-২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা প্রয়োজন।
মোছা: তানজিমা, উপজেলা : মান্দা, জেলা : নওগাঁ।
প্রশ্ন : বরবটি গাছের পাতা খেয়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : আক্রমণ বেশি হলে সাইপারসেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক ১ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: ছামাউল কবীর, উপজেলা : গোদাগাড়ি, জেলা : রাজশাহী।
প্রশ্ন : বেগুনের কচি ডগা ঢলে পড়ে শুকিয়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : বেগুনের জমিতে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। সুষম সার ব্যবহার করা বিশেষ করে পটাশ সার ব্যবহারে গাছের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। বালাইনাশক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের ১ মিলি হারে ওষুধ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: জুয়েল, উপজেলা : কুমারখালী, জেলা : কুষ্টিয়া।
প্রশ্ন : ধানের গাছের গোড়ায় প্রচুর পরিমাণে ছোট ছোট পোকা দেখা যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত ব্যবহার করতে হবে। অতিমাত্রায় ইউরিয়া ব্যবহার পরিহার করা উচিত। আক্রমণ প্রতিরোধে আলোক ফাঁদ ব্যবহার করা, কার্বোসালফান অথবা ফেনিট্রথিয়ন গ্রুপের যে কোন একটি বালাইনাশক শুধুমাত্র আক্রান্ত স্থানে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বি. দ্র. : কৃষিবিষয়ক যে কোন সমস্যা সমাধান পেতে কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টার ১৬১২৩ নম্বরে যেকোন মোবাইল অপারেটর থেকে ফোন করুন। অথবা প্রশ্ন লিখে ডাকযোগে রড়ঢ়ঢ়@ধরং.মড়া.নফ ই-মেইলে প্রেরণ করতে পারেন।

লেখক : তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৪১০৪৮৫৩; ই-মেইল : iopp@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত
ভাদ্র মাসের কৃষি (১৬ আগস্ট-১৫ সেপ্টেম্বর)

ভাদ্র মাসের কৃষি
(১৬ আগস্ট-১৫ সেপ্টেম্বর)
কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম
ঋতু পরিক্রমায় ভাদ্র মাসে বর্ষার পানিতে সারাদেশ টইটুম্বুর থাকে, বৈশি^ক আবহাওয়া পরিবর্তনে এসময় ঝরে অঝোর বৃষ্টি। আগাম বন্যা বা নাবি বন্যার কারণে কৃষিতে অনেক সময় বিপর্যয় ডেকে আনে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থাপনা

প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনাগুলো যথাযথভাবে শেষ করার জন্য ভাদ্র মাসে কৃষিতে করণীয় বিষয়গুলো জেনে নেবো সংক্ষিপ্তভাবে।
আমন ধান
আমন ধান ক্ষেতের অন্তর্বর্তীকালীন যতœ নিতে হবে। ক্ষেতে আগাছা জন্মালে তা পরিষ্কার করে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। আমন ধানের জন্য প্রতি একর জমিতে ৮০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। এ সার তিনভাগ করে প্রথম ভাগ চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর, দ্বিতীয় ভাগ ৩০-৪০ দিন পর এবং তৃতীয় ভাগ ৫০-৬০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। আমন মৌসুমে মাজরা, পামরি, চুঙ্গী, প্রভৃতি পোকা এবং খোলপড়া, পাতায় দাগ পরা রোগ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বালাই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
পাট
এসময় পাট বীজ উৎপাদনের জন্য ভাদ্রের শেষ পর্যন্ত দেশি পাট এবং আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত তোষা পাটের বীজ বোনা যায়। বন্যার পানি উঠে না এমন সুনিষ্কাশিত উঁচু জমিতে জো বুঝে  লাইনে বুনলে প্রতি শতাংশে ১০ গ্রাম আর ছিটিয়ে বুনলে ১৬ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
আখ
এসময় আখ ফসলে লালপচা রোগ দেখা দিতে পারে। লালপচা রোগের আক্রমণ হলে আখের কা- পচে যায় এবং হলদে হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। এজন্য আক্রান্ত আখ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জমিতে যাতে পানি না জমে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধী জাত ঈশ্বরদী ১৬, ঈশ্বরদী ২০, ঈশ্বরদী ৩০, ঈশ^রদী ৩৯, ঈশ^রদী ৪০, ঈশ^রদী ৪৫, ঈশ^রদী ৪৬ চাষ করলে লালপচা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
তুলা
ভাদ্র মাসের প্রথম দিকেই তুলার বীজ বপন কাজ শেষ করতে হবে। হাতে সময় না থাকলে জমি চাষ না দিয়ে নিড়ানি বা আগাছা নাশক প্রয়োগ করে ডিবলিং পদ্ধতিতে বীজ বপন করা যায়। বীজ গজানোর পর কোদাল দিয়ে সারির মাঝখানের মাটি আলগা করে দিতে হবে।
শাকসবজি
এ সময় লাউ ও শিমের বীজ বপন করা যায়। এজন্য ৪-৫ মিটার দূরে দূরে ৭৫ সেমি. চওড়া এবং ৬০ সে.মি গভীর করে মাদা বা গর্ত তৈরি করতে হবে। এরপর প্রতি মাদায় ২০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। মাদা তৈরি হলে প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বুনে দিতে হবে এবং চারা গজানোর ২-৩ সপ্তাহ পর দুই-তিন কিস্তিতে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৭৫ গ্রাম এমওপি সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এ সময় আগাম শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করা যেতে পারে।
গাছপালা
ভাদ্র মাসেও ফলদবৃক্ষ এবং ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা যায়। বন্যায় বা বৃষ্টিতে মৌসুমের রোপিত চারা নষ্ট হলে মরা চারা তুলে নতুন চারা রোপণসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে।
প্রাণিসম্পদচৃ
ভাদ্র মাসের গরমে পোলট্রি শেডে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করতে হবে। টিনশেডে চটের ছালা রেখে মাঝে মাঝে পানি দ্বারা ভিজিয়ে দিতে হবে। যাতে করে অধিক গরমে মুরগিগুলো মারা না যায় এবং নানা রোগের বিস্তার না ঘটে। গোখাদ্যের সমস্যা সমাধানে পতিত জমিতে নেপিয়ার, বাজরা প্রভৃতি ঘাস লাগানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পোলট্রি ও গবাদিপশুর রোগবালাই আক্রান্ত হলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারি সার্জনের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
পুকুরে সার ব্যবহারের মাত্রা আস্তে আস্তে কমিয়ে ফেলতে হবে। জৈবসার ব্যবহার না করাই ভালো। খাদ্য ঘাটতির জন্য পরিমাণ মতো অজৈব সার ব্যবহার করা দরকার। পুকুরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। পুকুরে নতুন মাছ ছাড়ার সময় এখন। মাছ ছাড়ার আগে পুকুরের জলজ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। পুকুর জীবাণুমুক্ত করে সঠিক সংখ্যক সুস্থ সবল পোনা মজুদ করতে হবে। যেসব পুকুরে মাছ আছে সেসব পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, পরিবর্তিত জলবায়ুর ফলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে সবসময়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের দারপ্রান্তে। য়সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন:০২৫৫০২৮৪০৪, ই-মেইল : editor@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook