কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফলের গুরুত্ব ও গ্রহণের নিয়ম

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফলের গুরুত্ব ও গ্রহণের নিয়ম
মোঃ বেনজীর আলম
কথায় আছে খালি পেটে জল আর ভরা পেটে ফল খাওয়ার মতো উপকারিতা আর কোন কিছুতেই নেই। পুষ্টিকর উপাদানে ভরপুর একটি খাবার হচ্ছে ফল। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ফলমূল দেখা যায়। এসব রসাল, মিষ্টি ও সুগন্ধি ফল উঠতে শুরু করে জ্যৈষ্ঠ মাসে। আর এজন্য জ্যৈষ্ঠ মাসকে মধু মাসও বলা হয়ে থাকে। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে সফলতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। মৌসুমি ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় এখন বাংলাদেশ। তবে বিদেশে টাটকা ও প্রক্রিয়াজাতকৃত ফলের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে সীমিত আকারে টাটকা ফল রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানিকৃত উল্লেখযোগ্য ফলগুলোর মধ্যে কাঁঠাল, আম, আনারস, লেবু, কামরাঙা, বাতাবিলেবু, তেঁতুল, চালতা উল্লেখযোগ্য। টাটকা ফল ছাড়াও হিমায়িত ফল (সাতকরা, কাঁঠাল বীজ, কাঁচা কলা, লেবু, জলপাই, আমড়া ইত্যাদি) ইতালি, জার্মানি, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও বাহরাইনে রপ্তানি হচ্ছে। যার ভোক্তা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এতে ফল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে।
ফলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি রান্না করে খেতে হয় না। আর সব ফলের মধ্যেই পানির পরিমাণ বেশি থাকে, যা গরমের সময় শরীরের পানিশূন্যতা পূরণে সহায়তা করে। ফলের মধ্যে খাদ্যশক্তি থাকে, যা শরীরের ভেতর থেকে ক্ষতিকর চর্বি বের করে দেয় তাই ফল সবার জন্য উপকারী। পুষ্টিমানের দিক থেকেও সব ফলেই রয়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও খনিজ পদার্থ। বিশেষ করে রঙিন ফলে লাইকোপেট আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের ভেতরের বিষাক্ত জিনিস দূর করে দেয় এবং ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে।
শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবারের একটি দারুণ উৎস হচ্ছে ফল। তবে চিকিৎসকদের মতে, কোনও কিছুই খুব বেশি খাওয়া ভালো নয়।  বিভিন্ন ফলের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টিগুণ। বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগভেদে নিয়মিত ও সঠিক মাত্রায় ফল খেলে তা শারীরিক অনেক রোগব্যাধির ক্ষেত্রেও উপকারী। আবার যাদের কিডনির রোগ রয়েছে, তাদের ফলমূল খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হয়। ফলের সম্পূর্ণ উপকার পেতে হলে তা নিয়ম মেনে খেতে হবে। ফলে আঁশ বেশি থাকে তাই এমনিতেই হজম হতে সময় লাগে। অন্য খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে তা আরও ধীরে হজম হয়।  ফল এবং অন্যান্য খাবার খাওয়ার মাঝখানে কমপক্ষে আধা ঘণ্টার ব্যবধান রাখা উচিত। কারণ, এক্ষেত্রেও হজমে ব্যাঘাত  হতে পারে এবং ফলের পুরোপুরি পুষ্টিগুণ শরীরে শোষিত হবে না। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান হওয়া উচিত অন্যান্য খাবার খাওয়ার আগে কমপক্ষে এক ঘণ্টা এবং অন্যান্য খাবার খাওয়ার পর দুই ঘণ্টা। ফল খেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় ঠিকই কিন্তু সঠিক নিয়ম মেনে না খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে এবং ওজন কমার বদলে বেড়ে যেতে পারে। 
বর্তমানে বাংলাদেশের ৭২ প্রজাতির ফল চাষাবাদ করা হচ্ছে। দুই দশক আগেও বাংলাদেশের প্রধান ফল ছিল আম এবং কাঁঠাল।  ডিএই এর হিসেবে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ৭ লাখ ২৯ হাজার ১৩০ হে. জমিতে ফলের মোট উৎপাদন ছিল ১২২০২০৮৭ মে.টন।  উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম, কলা, কাঁঠালের পরিমাণ মোট উৎপাদনের ৬৩ শতাংশ (বিবিএস ২০১৮)। কৃষকরা নতুন নতুন ফল চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। যার মধ্যে রয়েছে খেজুর, বরই, মাল্টা, ড্রাগন ফল, অ্যাভোকাডো, স্ট্রবেরি, বাউকুল, আপেলকুল, ডুমুরসহ আন্যান্য ফল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছর ধরে গড়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফল চাষে জমি বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম ও পেঁপেতে চতুর্দশতম স্থানে আছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে নিত্যনতুন ফল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ সফলতা পেয়েছে। ফলচাষিদের পাশাপাশি সরকারের গৃহীত বিভিন্ন নীতি সহায়তা এ সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা যায়। আধুনিক কৃষির অন্যতম খাত হিসেবে দেশের মোট চাষাবাদযোগ্য জমির মধ্যে ফলের আওতায় মাত্র ১-২ শতাংশ জমি রয়েছে। অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের ১০ শতাংশ আসে ফল থেকে। সারা বছর উৎপাদিত ফলের প্রায় ৬০ শতাংশ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ (মে-আগস্ট) এ চার মাসেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন রকম দেশীয় ফল পাওয়া যায়, তবে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আনারসই প্রধান। পাওয়া যায় জাম, আমলকী, আতা, করমজা, জামরুল, বেল, গাব, কাঁচা তাল ইত্যাদি। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদন হয় ২১ শতাংশ, যার মধ্যে আমড়া, কামরাঙা, কদবেল, চালতা অন্যতম। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলে উৎপাদন হয় মোট ফলের ১৯ শতাংশ, যার মধ্যে কুল, বেল, কলা, সফেদা অন্যতম।
মোট উৎপাদিত ফলের প্রায় ৫৩ শতাংশ বাণিজ্যিক বাগান থেকে উৎপাদন হয়, বাকি ৪৭ শতাংশ ফলের জোগান আসে বসতবাড়ি ও তৎসংলগ্ন জমি থেকে। কাজেই ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে দুই জায়গাতেই ফল চাষে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত ফল উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিক বাগানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাহাড়ি অঞ্চল। পাহাড় ছড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের কিছু অংশে, ময়মনসিংহের দক্ষিণাংশে, সিলেটের উত্তরাংশে, কুমিল্লার পূর্বাংশে, নোয়াখালীর উত্তর-পূর্বাংশে ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামেই আছে দেশের মোট জমির প্রায় ১০ শতাংশ। এসব পাহাড়ের অনেকটা ভূমি বনাঞ্চল। ভূমিবৈচিত্র্যের জন্য মাঠ ফসলের চেয়ে হর্টিকালচারাল ফসল চাষে পাহাড় বেশি উপযোগী। পাহাড়ে প্রায় ২০ রকমের ফল খুব ভালোভাবে চাষ করা যায় যেমন- আম, কলা, কাঁঠাল, লেবু ও আনারস। নতুন ফলের মধ্যে ড্রাগন ফল, মাল্টা ও কমলা চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তারলাভ করেছে। পাহাড়ি এলাকায় কাজুবাদাম অপার সম্ভবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ-মাঠকর্মী ও চাষিদের প্রচেষ্টায় দেশীয় বিলুপ্ত প্রায় ফলের প্রজাতিগুলো আবার ফিরে আসছে। যেমন- কদবেল, সফেদা, আতা, শরিফা, ডেউয়া, ডালিম, করমচা, চালতা, বিলেতি গাব, বিলিম্বি, তেঁতুল, গোলাপজাম, ছুঁই-খাট্টা। স্ট্রবেরি, ড্রাগনফল, আঙুর, রাম্বুটান, থাই ও বার্মিজ আম, পেয়ারা,  খেজুরসহ বিদেশি ফলগুলো দারুণ ফলছে। পুষ্টিবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের মন্তব্য নিয়ে জানানো হয় যে প্রতিদিন তিনবেলা খাবার খাওয়ার মতোই মৌসুমি ফল খাওয়া উচিত। তবে সময়ের উপর নির্ভর করবে ফল খাওয়ার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব। যেমন- ফল ভিটামিন, খনিজ, আঁশ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর একটি প্রাকৃতিক খাবার। আর এই সবগুলো পুষ্টিগুণ লুফে নেওয়ার আদর্শ সময় সকাল বেলা। কারণ সকাল বেলা ফলের মধ্যে থাকা শর্করা দ্রুত হজম হয়। যে কারণে সকল পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা সহজ হয়।
চটজলদি ক্ষুধা মেটাতে স্ন্যাকস হিসেবে ‘জাঙ্কফুড’ বা ‘ফাস্টফুড’ না খেয়ে ফল খাওয়া যেতে পারে । এতে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং ওজন কমাতেও সাহায্য করবে। ব্যায়ামের আগে ফল খেলে শরীরে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় কর্মশক্তি জোগাবে। আবার ব্যায়ামের পরে ফল খেলে তা শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে চাঙ্গা করতে সাহায্য করে। ফলে ক্যালরি কম, খনিজ ও আঁশ বেশি, যা ব্যায়ামের কারণে হারানো কর্মশক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য অনন্য।
ঘুমানোর আগে ফল খাওয়ার উচিত নয়। কারণ ঘুমানোর আগে ফল খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাবে এবং ঘুম আসবে না। এমনকি রাতের খাবারও ঘুমানোর কমপক্ষে দুই ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত। অন্যথায় হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তরমুজ জাতীয় ফলের সঙ্গে আর অন্য কোনও ফল খাওয়া উচিত নয়। এই জাতীয় ফলে জলের পরিমাণ বেশি থাকার জন্য তাড়াতাড়ি হজম হয়ে যায়। যে কারণে অন্য কোনও ফল তরমুজ বা ফুটি জাতীয় ফলের সঙ্গে খেলে তা হজম হতে চায় না। স্ট্রবেরি, কমলালেবু, বেদানা, পিচ বা আপেলের মতো অ্যাসিড জাতীয় ফলে সঙ্গে কলা, খেজুর, কিশমিশ জাতীয় মিষ্টি ফল খাওয়া এড়িয়ে চলুন। এই দুই ধরনের ফলে পিএইচ মাত্রা আলাদা হওয়ার কারণে হজমে সমস্যা হয়। অম্বল, বদহজম, মাথা যন্ত্রণার মতো বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফল ও সবজি হজম হওয়ার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। ফল অনেক তাড়াতাড়ি হজম হয়। ফলের মধ্যে শর্করার মাত্রা বেশি থাকার কারণে তা সবজির পরিপাকেও বাধা দেয়। ফলে বুকজ্বালার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এই জন্য কমলালেবু ও গাজর একই সঙ্গে খাওয়া উচিত নয়। স্টার্চজাতীয় ফল খুবই কম যেমন : কলা। কিন্তু ভুট্টা, আলু, বাদাম ইত্যাদিতে স্টার্চের পরিমাণ বেশি। প্রোটিন জাতীয় ফল ও সবজির সঙ্গে স্টার্চজাতীয় ফল ও সবজি একসঙ্গে খাবেন না। প্রোটিন হজম করার জন্য শরীরের অম্ল উপাদান প্রয়োজন আর স্টার্চ হজম করার জন্য ক্ষারক উপাদান প্রয়োজন। তাই এই দুই রকম খাবার একসঙ্গে খেলে হজমে সমস্যা হয়।
শরীরের সার্বিক সুস্থতার জন্য ফলের ভূমিকা অপরিহার্য। সুস্থ থাকতে এবং শরীর মেদহীন রাখতে পুষ্টিবিদরা বরাবরই ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে অনেকেই আছেন, যাদের ফল খাওয়া মাত্রই অম্বলের সমস্যা দেখা দেয়। মুখের ভিতর টক টক লাগে।  তবে ফল খাওয়ার ব্যাপারে কিছু বিধি মেনে চললে এই সমস্যা দূর হবে। এ ছাড়াও ফল খাওয়ার সময় যেসব বিধিনিষেধগুলো মেনে চলতে হবে। সেগুলো হলো : ১. একসঙ্গে ৪-৬টি ফল খাওয়া যাবে না; ২. আগের দিন যদি খুব বেশি প্রোটিন খেয়ে থাকলে তা হলে পরের দিন সকালে পেঁপে খাওয়া ভাল। এর মধ্যে থাকা প্যাপেইন প্রোটিন হজমে সাহায্য করে; ৩. যদি কোন কারনে বেশি লবন খাওয়া হয়ে যায় তবে পানি যুক্ত ফল খেতে হবে। যা নুন শরীর থেকে বার করে দিতে সাহায্য করবে; ৪. কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কামরাঙ্গা, বিলম্বি ইত্যাদি ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত; ৫. সকালে কলা খেলে রাত এবং দুপুরের চেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায়।
অনেকেই বলেন ফল খেয়ে পানি খাওয়া ঠিক নয়, আসলে শুধু ফল নয়, সব ধরনের খাবার খাওয়ার সাথে সাথে পানি খেতে না বলা হয়। এর কারণ হলো, পেটের ভেতরের এনজাইম যেন খাবারকে ভেঙে হজমে সহায়তা করতে পারে। এমনিতেই ফলে ৭০ ভাগ পানি থাকে এবং ফল খাওয়ার সাথে সাথে পানি খেলে তা হজমে কিছুটা সমস্যা তৈরি করে। কেননা  এনজাইম তখন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। সেই কারণে ফলমূল খাওয়ার সাথে সাথে পানি খেতে না বলা হয়।
পুষ্টিবিদের মতে মাথাপিছু দৈনিক ফলের চাহিদা ২০০ গ্রাম কিন্তু খাওয়া হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম। দেশে ফলের চাহিদা অনুপাতে এখনও উৎপাদনে ঘাটতি ৬৫ শতাংশ। আমদানি করে ঘাটতির আংশিক পূরণ হয়। করোনাকালে ফল আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে ফলের চাহিদা বাড়ছেই। বিশেষ করে করোনার কারণে পুষ্টি, ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফলের কদর বেশি। ফরমালিন বিষমুক্ত দেশীয় ফলের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে মানুষ। চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিচিত্র ফলের আবাদ-উৎপাদন বাড়ছে। চাষিরা বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন। ব্যাপক সুযোগ-সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে ফলের উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি সম্ভব। ঘাটতি পূরণ করে উদ্বৃত্ত ফল বিদেশে রফতানির মাধ্যমে অর্থনীতি হবে সমৃদ্ধ। 

লেখক : মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ৫৫০২৮৩৬৯, ই-মেইল : ফম@ফধব.মড়া.নফ

বিস্তারিত
বিভিন্ন ফলের পুষ্টিমান

বিভিন্ন ফলের পুষ্টিমান
বছরব্যাপী ফল চাষে, অর্থ পুষ্টি দুই-ই আসে
ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার
খাদ্য ও পুষ্টির অন্যতম উৎস হলো ফল। বাংলাদেশের ফল স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে ও পুষ্টিমানে আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময়। ফলদবৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া ফলের ভেষজ গুণাবলিও অনেক। আমাদের খাদ্য, পুষ্টি, ভিটামিনের চাহিদাপূরণ, শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধে ফলের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি) মূলত ফলের উপর গবেষণা করে থাকে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পুষ্টি ইউনিট ফলের উপর কীটনাশক, ইথোফেন, বিভিন্ন রাসায়নিক কেমিক্যালের ব্যবহার এবং ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা করে থাকে। তা ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ও ফলের উপর গবেষণা করে থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মাথাপিছু  দৈনিক ২০০ গ্রাম  ফল খাওয়া উচিত। বাংলাদেশে ফলমূলের পুষ্টিমানের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়  বিভিন্ন ফল বিভিন্ন পুষ্টি সরবরাহ করে। তাই পারিবারিক পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপদ ফল আবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের ফলমূল নির্ভর নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ফল জাতীয় খাদ্যের পুষ্টি উপাদান (খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রামে) উল্লেখ করা হলো:-

বিস্তারিত
বারোমাস আম চাষ

 বারোমাস আম চাষ
ড. মোঃ মেহেদী মাসুদ 
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিচিত্র রূপের অপরূপ সমারোহের সম্ভারে সমৃদ্ধ বাংলার আদিগন্ত মাঠ-ঘাট, প্রান্তর। ফল উপযোগী অনুকূল আবহাওয়ার প্রভাবে দুই দশকে বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশে^ মৌসুমি ফল উৎপাদনে শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের হয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থান। 
আম হলো ফলের রাজা। পুষ্টি, স্বাদ বা গন্ধে, বর্ণে অতুলনীয় আম নামক ফলটির জুড়ি মেলা ভার। সময়ের সাথে সাথে এ ফলটি হয়ে উঠছে অধিকতর চাহিদাসম্পন্ন। অপ্রতিদ¦ন্দ্বী চাহিদাসম্পন্ন এ ফল শুধুমাত্র বাড়ির আঙ্গিনায় নয় বরং ফলবাগানের শোভা বর্ধনের জন্য ফল সজ্জিত মিয়াজাকি বা বারোমাসী কাটিমনই যথেষ্ট। 
প্রায় সব ধরনের মাটিতেই আম ভালো জন্মে, তবে পার্বত্য অঞ্চল আগাম জাতের আমের জন্য ভালো। ফলের মধুমাসের আগেই পাকা আমের আনাগোনা ফল পিপাসুদের মুগ্ধ করে। বলা যায় মে মাসেই আমের আগাম জাত চৈতী, বৈশাখী, সুড়ৎ বোম্বাই, গোলাপখাস, গোবিন্দভোগ, লক্ষণভোগ জাতের আমের ফল পাকতে থাকে। চৈতী আগাম জাতের আম বলে বাজারে এ আমের বেশ চাহিদা থাকে। আমের আরেকটি আশু জাত বৈশাখী। বৈশাখ মাসে পাকে বলেই এ আমের নামকরণ করা হয়েছে বৈশাখী। পাতলা আঁটির আঁশহীন, সুস্বাদু এ জাতটির শেল্ফ লাইফ তুলনামূলকভাবে বেশি। মাঝারি আকারের এ আমগুলোর ৪-৫ টিতে ১ কেজি হয়ে থাকে। আরেকটি আগাম জাত সুড়ৎ বোম্বই; জাতটি আকারে ছোটো হলেও আঁটি পাতলা হওয়ায় ভক্ষণশীল অংশের পরিমাণ বেশি। শাঁস কমলা বর্ণের, সুগন্ধী ও আঁশহীন। গোলাপখাস; পাকা আম থেকে গোলাপ ফুলের ন্যায় গন্ধ পাওয়া যায় বলে এ জাতটির নাম গোলাপখাস। মাঝারি আকৃতির গোলাপখাস জাতের আম কিছুটা লম্বাকৃতি। অতি আগাম জাত হওয়ায় বাজারে এ জাতের চাহিদা বেশ। পাকা ফল দেখতে সুন্দর কিন্তু স্বাদে সামান্য টক-মিষ্টি। গোবিন্দভোগ জাতটি বাংলাদেশে প্রাপ্ত আগাম আশু জাতের আমের মাঝে উল্লেখ করার মতো মিষ্টি। উৎকৃষ্ট জাতের এ আম সাতক্ষীরা ও যশোর জেলায় সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয়ে থাকে। এ আম মে মাসের শুরুর দিকে পরিপক্ব হতে এবং মাঝামাঝিতে পাকতে শুরু করে। এবার বলা যাক লক্ষণভোগের কথা। লখনা নামেও এ জাত বেশ সমাদৃত। প্রতি বছরই ফল দিতে সক্ষম বলে লক্ষণভোগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন উপযোগী জাত। ফলের আকৃতি উপবৃত্তাকার। চামড়া পুরু হলেও আঁটি পাতলা, স্বাদ, সুগন্ধে অতুলনীয় অগ্রিম এ আমের জাতের বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে। রাজশাহী, নাটোর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ জাত বেশি জন্মে থাকে।
আমের মৌসুমি জাতের কথা আসতেই মনে পড়ে যায় গ্রীষ্মকালীন ছুটির বিষয়টি। এ সময়ে পাকা-কাঁচা ফলের সমাহারে বাংলার প্রকৃতি সুশোভিত হয়ে উঠে। এ সময়কালে উল্লেখ করার মতো আমের জাতগুলোর মাঝে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে ল্যাংড়া, আ¤্রপালী, হিমসাগর, ব্যানানা ম্যাংগো, হাঁড়িভাঙ্গা, গোপালভোগ, রাণীপছন্দ আম। কথিত আছে, পায়ে সমস্যাগ্রস্ত এক ফকিরবাবা প্রথম ল্যাংড়া আমের চাষ শুরু করেন বলে এ জাতটি এমন অদ্ভুত নামের অধিকারী। মাঝারি আকৃতির এ ফলের স্বাদ অতুলনীয়। ডিম্বাকার- গোলাকৃতির কাঁচা আমের গন্ধও আকর্ষণীয়। শাঁস রসাল, সুগন্ধযুক্ত, ছোটো আটির উৎকৃষ্ট এ জাত আমাদের দেশে অতি জনপ্রিয়। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, কুষ্টিয়ায় প্রচুর পরিমাণে ফজলি আম জন্মে। গড় ওজন ৬১০ গ্রাম হলেও এর ওজন ১ কেজিও হয়ে থাকে। হলুদ শাঁস, আঁশহীন, রসাল, সুস্বাদু এ আমের আঁটি লম্বা, চ্যাপ্টা, পাতলা। জুলাইয়ের ১ম সপ্তাহ থেকে ফজলি আম পাকা শুরু হয়। 
বাংলাদেশের অতি পরিচিত ও সারাবিশে^ সমাদৃত আমের জাত হাঁড়িভাঙ্গা। এ আমের উৎপত্তি রংপুর জেলায়। এর গাছের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার মতো। গাছের ডালপালা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চেয়ে পাশে বেশি বিস্তৃত হয়। ফলে ঝড়ো বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে না এবং আমও তুলনামূলকভাবে কম ঝরে। হিমসাগর পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত আম হলেও আঁশহীন, মিষ্টি স্বাদ ও গন্ধের জন্য সারা পৃথিবীতে এ আম বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়ে থাকে। জুন মাসের শেষে এ আম বাজারে আসে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরা জেলায় এ আমের বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়ে থাকে। আ¤্রপালি জাতটি সত্তরের দশকে ‘দশেরি’ ও ’নিলম’ জাতের সংকরায়নে ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়। পরবর্তীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এনামুল হক ও চুয়াডাঙ্গার হাইব্রিড নার্সারির কর্ণধার আবুল কালাম আজাদ যৌথভাবে আ¤্রপালি জাতটি বাংলাদেশে আমদানি করেন। এজাত প্রতি বছরই ফল দিতে সক্ষম বলে সফলতার সাথে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন শুরু হয়েছে। বর্তমানে উৎপাদিত আমের ৩০ভাগই আ¤্রপালি। গাছের গঠন ছোট, এর মিষ্টতা ল্যাংড়া বা হিমসাগর হতে বেশি। এ ফল পাকলে গাঢ় কমলা-লাল ধারণ করে, ভিটামিন ’এ’ এর পরিমাণ বেশি। দিনকে দিন বিদেশী যে কয় জাতের আমের গ্রহণযোগ্যতা চোখে পরার মতো তার মাঝে ব্যানানা ম্যাংগো একটি। থাই এ জাতটি বাণিজ্যিকভাবে পাহাড়ি অঞ্চলে ও আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাষ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও বাড়ির আংগিনা বা ছাদবাগানে কলা সদৃশ এ জাত বাগানের জন্য শোভাবর্ধক। পাকা আম ৩৫০ গ্রাম হয়ে থাকে। আকার আকৃতি আকর্ষণীয় ও স্বাদ-গন্ধ অতুলনীয়, পাকা ফল দুধ আলতা রং এসব বিশেষত্বের কারণে এ আমের বাজার মূল্য বেশি হয়ে থাকে। গোপালভোগ আমের জাতটি খুব অল্প সময় বাজারে পাওয়া যায়। এ জাতটি দেশের প্রায় সব জেলাতেই জন্মে। আমের খোসা মোটা তবে আটি পাতলা হয়ে থাকে। গোলাকৃতি এ আম কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে হলুদ- লালচে রঙের হয়। উল্লেখ্য, আমের রাজা বলে খ্যাত ল্যাংড়া আমের পরেই এ জাতের অবস্থান। 
নাবীজাতের বারি আম-৪ উচ্চফলনশীল নাবী এ জাতটি সারাদেশে চাষোপযোগী। বাজারে নাবীজাতের আমের মাঝে অন্যতম স্থানের অধিকারী গৌড়মতি আম। বাংলার প্রাচীন জনপথ ’গৌড়’ ও মূল্য বিবেচনায় মতি; যা একত্রে গৌড়মতি। অতি মিষ্ট, সুঘ্রাণযুক্ত এ জাতটি অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায়, অসময়ের ফল বলে বাজারমূল্য আমচাষির অনুকূলে থাকে। আরেকটি নাবীজাত জাদুভোগ। ৪০০ বছর আগে ভোলাহাটের নাম ছিল জাদুনগর। ভোলাহাট উপজেলায় এখনো ১টি গ্রামের নাম জাদুনগর। এলাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ভোগ মিলিয়ে এ জাতের নামকরণ করা হয় জাদুভোগ। ৮-১০ বছর বয়সি এ গাছ থেকে প্রায় ৫-৭ মণ আম পাওয়া যেতে পারে। ঝিনুক আশি^না হলো সব থেকে নাবী জাত। ওজন প্রায় ফজলি আমের মতো হয়ে থাকে, তবে এর একটি জাত আকারে ছোটো ও ঝিনুক সদৃশ হওয়ায় এর নাম ঝিনুক আশি^না। অসময়ের আম হওয়ায় এর বাজার দাম বেশি হয়ে থাকে।
আশা করা যায়, আগামী ৫ বছরের মাঝে সারা বছর আম            পাওয়া সম্ভব হবে। এসময় কালে স্বল্প পরিসরে আমের প্রাপ্যতা সহজতর করেছে বারমাসী জাতের বারি আম-১১ ও কাটিমন জাতের আম।
বারি আম-১১ জাতটি সারাদেশেই চাষ করা যায়। উচ্চফলনশীল এজাতটি আঁশহীন, সুস্বাদু। পাকা অবস্থায় গাঢ় হলদে, গড় ওজন প্রায় ৩১৭ গ্রাম। ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ফল সংগ্রহ সম্ভব এবং অফ সিজন হওয়ায় আমের বাজার মূল্য বেশি থাকে। বহুবছর ফেনী সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার এ জাতের সহজপ্রাপ্যতা ছিল, এ ছাড়াও পার্বত্য তিন জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে বারি আম-১১ জাতের গাছ আছে। কাটিমন থাই ভ্যারাইটি। স্থানীয়ভাবে একে অমৃত নামেও ডাকা হয়। যেকোন বারমাসী আমের জাতের মাঝে এ জাত আঁশহীন সেরা জাত। নভেম্বর, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে মুকুল আসে এবং মার্চ-এপ্রিল, মে-জুন ও জুলাই-আগস্ট আম পাকে এবং সংগ্রোহের উপযোগী হয়। তবে, মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত যেহেতু বাজারে আমের প্রচলিত অনেক জাতের সম্ভার থাকে সেই বিবেচনায় ফেব্রুয়ারি মাসের মুকুল ভেঙ্গে দিয়ে অসময়ের অধিক আম প্রাপ্যতা সহজ করার মাধ্যমে আমের ফলন ও মূল্য উভয়েই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উচ্চফলনশীল এ জাতটির প্রতিটি আমের ওজন ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম এবং প্রতি থোকায় প্রায় ৫-৬ টি আম থাকে। এ আমগাছ থেকে সারাবছরই ফুল, ফল ও পাকা আম পাওয়া যায় বলে আমের জগতে এ জাতটি অপার সম্ভাবনাময়। যদিও থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালোয়েশিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে এ জাতের আবাদ করা হয় এবং বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ একইভাবে বাণিজ্যিক আবাদ ও রপ্তানির সাথে যুক্ত হতে পারে। বিশ^ বাজারে সমাদৃত অন্যতম দামি জাপানি আম মিয়াজাকি (সূর্যডিম) বা লাল আম। অনেকে শখের বশে ছাদবাগানে মিয়াজাকি আমের চাষ করছেন। আশার কথা এই যে, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে এ জাতের আমের চাষ শুরু হয়েছে। অনেক দেশে এ আম ৫০০০- ৬০০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে।
পরিশেষে, আমের উৎপাদনের সাথে জড়িত আমচাষি, মধ্যস্বত্বভোগী, আমের ব্যবসায়ী সকলকে দেশ মাতৃকার কথাভেবে শুধুমাত্র অধিক মুনাফার আশায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, বালাইনাশক প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে তাহলে আমের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ একদিকে যেমন পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করতে পারে, অন্যদিকে দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে কার্যকরি ভূমিকা পালন করতে পারে।

লেখক : প্রকল্প পরিচালক, বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৬২৬০৬৯৫ ইমেইল : ঢ়ফুৎভঢ়@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে বিএআরআই উদ্ভাবিত ফলের ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি

 টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে বিএআরআই উদ্ভাবিত 
ফলের ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
ড. বাবুল চন্দ্র সরকার
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি একটি অনন্য ভূমিকা পালন করছে এবং খোরপোশের কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে উন্নয়ন ঘটছে। চাহিদার বিপরীতে ফলের উৎপাদন এখনও অনেক কম। ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই কর্তৃক পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য (এসডিজি) গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত ফলের উচ্চফলনশীল, পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, সংগ্রহোত্তর এবং ভ্যালু চেইন ব্যবস্থাপনার উপর উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ মাঠ পর্যায়ে বিস্তারের মাধ্যমে দেশে বছরব্যাপী ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে সাথে জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় ফল চাষ করে কম জমি থেকে বেশি আয় করা সম্ভব এবং দানাশস্যের তুলনায় উচ্চমূল্যে বিক্রয় করা যায় বিধায় ফল চাষ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে, উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল বিশেষত ফল উৎপাদনে বাংলাদেশে বিগত এক যুগে ফল বিপ্লব সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে আম উৎপাদনে বিশ্বে ৭ম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। 
বিএআরআই উদ্ভাবিত ফলের কিছু প্রতিশ্রুতিশীল ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
আমের ফুল ও ফল ঝরা রোধে টেকসই ব্যবস্থাপনা : গাছের বয়স অনুসারে তিন কিস্তিতে নির্দেশিত মাত্রার সার প্রয়োগ করতে হবে প্রথম কিস্তি (সম্পূর্ণ জৈবসার, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট ও বরিক এসিড এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও অর্ধেক এমওপি সার) ১৫-৩০ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এমওপি সার সমান দুই ভাগ করে এক ভাগ (দ্বিতীয় কিস্তি) মার্চ মাসের শেষ সময়ে যখন ফল মটর দানার মতো হয় তখন এবং অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এমওপি সার এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অথবা আম সংগ্রহের এক মাস পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে। একটি পূর্ণবয়স্ক আম গাছে (১১-১৫ বছর) গোবর ৫২ কেজি, ইউরিয়া ১৭৫০ গ্রাম, টিএসপি ৮৭৫ গ্রাম, এমওপি ৭০০ গ্রাম, জিপসাম ৬১২ গ্রাম, জিংক সালফেট ২৬ গ্রাম এবং বরিক এসিড ৫২ গ্রাম প্রয়োগ করা আবশ্যক। সার প্রয়োগের পর হালকা সেচ দিতে হবে। 
গাছে সম্পূর্ণরূপে ফুল প্রস্ফুটিত (ঋঁষষ নষড়ড়স) হবার পর থেকে শুরু করে, ১৫ দিন অন্তর আম গাছে ৪ বার সেচ দিতে হবে। আমের হপার পোকা দমনের জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপ এর কীটনাশক; কনফিডর ৭০ ডব্লিউজি, প্রতি লিটার পানিতে ০.২ গ্রাম এবং এনথ্রাকনোজ রোগ দমনের জন্য ম্যানকোজেব গ্রুপ এর ছত্রাকনাশক; ইন্ডোফিল এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম, একসাথে মিশিয়ে, ২ বার; মুকুল বের হবার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে ১ বার এবং ফল মটরদানা আকৃতিতে আরেকবার প্রয়োগ করতে হবে। 
অমৌসুমে ড্রাগন ফল উৎপাদন কৌশল : ড্রাগন ফল দীর্ঘ দিবসী উদ্ভিদ হওয়ার কারণে ফুল ও ফল উৎপাদনের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি হওয়া প্রয়োজন। যে কারণে, এপ্রিল মাসের শেষ থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সাধারণত ড্রাগনফল গাছে ফুল ও ফল উৎপন্ন হয়। তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যখন দিনের দৈর্ঘ্য কম থাকে তখনও সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত থেকে বৈদ্যুতিক বাতির আলোর ব্যবস্থা করে কৃত্রিম উপায়ে দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ড্রাগনফল গাছে ফুল ও ফল উৎপাদন করা যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রযুক্তি অনুযায়ী দেখা যায় যে, অক্টোবর হতে মার্চ মাস পর্যন্ত বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পূর্ণবয়স্ক ড্রাগন ফল গাছে বিভিন্ন তীব্রতা সম্পন্ন বৈদ্যুতিক বাতির আলোর প্রয়োগ করা হলে, আলো প্রয়োগের ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে গাছে অমৌসুমি ফুলের কুঁড়ি দেখা যায়, যা হতে ১৫-২০ দিনের মধ্যে ফুল ফোটে এবং তার ২২-৩০ দিনের মধ্যে ফল আহরণ করা যায়। বৈদ্যুতিক বাতি হিসেবে ১০০ ওয়াট সাধারণ বাল্ব, ৩৫ ওয়াট সিএফএল (এনার্জি সেভিং) বাল্ব ও ২০ ওয়াট এলইডি বাল্ব কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে। 
স্ট্রবেরি উৎপাদনে সার প্রয়োগের মাত্রা : প্রতি হেক্টর জমিতে ১২০ কেজি নাইট্রোজেন, ৭০ কেজি ফসফরাস, ১২০ কেজি পটাশিয়াম এবং ৪০ কেজি সালফার ব্যাবহার করে স্ট্রবেরি চাষ করলে অধিক ফলন ও গুণগতমানসম্পন্ন স্ট্রবেরি উৎপাদন সম্ভব। ছাদে ১২ ইঞ্চি টবে ৫০% মাটি ও ৫০% পোল্ট্রি লিটার ব্যবহার করে স্ট্রবেরির খুব ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
কাঁঠালের গ্রাফটিং প্রযুক্তি : বছরের অন্যান্য সময় গ্রাফটিং করা গেলেও সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস গ্রাফটিং এর সবচেয়ে বেশি উপযোগী। ক্লেফট গ্রাফটিং, ভিনিয়ার গ্রাফটিং এবং কনটাক্ট গ্রাফটিং পদ্ধতি উত্তম। সাধারণত ৬-১২ মাস বয়সী সতেজ ও রোগমুক্ত চারা রুটস্টক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। 
লিচুর অঙ্গজ বংশবিস্তার পদ্ধতি আদর্শীকরণ : লিচুর অঙ্গজ বংশবিস্তারের একটি আদর্শ পদ্ধতি হলো গুটি কলম। গুটি কলম তৈরির ক্ষেত্রে শতকরা ৫০ ভাগ পাতা রেখে একদিন অন্তর পানি প্রয়োগ করলে সর্বোচ্চ সংখ্যক সুস্থ কলম পাওয়া যায়। ৫০ শতাংশ পাতাবিশিষ্ট গুটিগুলোর বৃদ্ধিও অপেক্ষাকৃত ভালো হয়। শিকড় খুব নরম থাকে বলে গুটিগুলোকে ৫০% মাটি ও ৫০% তুষের ছাই দ্বারা পূর্ণকৃত টব বা বেডে আলতোভাবে স্থাপন করতে হবে, যাতে শিকড় আঘাতপ্রাপ্ত না হয়।
লিচুতে ক্লেফট গ্রাফটিং : মে মাসে বারি লিচু-২ ও বারি লিচু-৪ এ ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে অধিক সফলতা পাওয়া গেছে। 
আমড়ার অঙ্গজ বংশবিস্তার পদ্ধতি আদর্শীকরণ : ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে এক বছর বয়সের রুটস্টকের উপর ৩০-৪০ দিন বয়সের সুস্থ সায়ন (পষবভঃ) এবং স্লাইস (ংষরপব) গ্রাফটিং এর মাধ্যমে জোড়া লাগানো স্থলে শতকরা ৯০ ভাগের অধিক সুস্থ-সবল ও মানসম্পন্ন আমড়া কলম উৎপাদন সম্ভব। 
মাল্টার বৃদ্ধি এবং ফলনের জন্য বিভিন্ন ধরনের রুটস্টক নির্ধারণ : চারার বৃদ্ধি, টিকে থাকা, রোগ সংক্রামণ এবং লিফ মাইনার আক্রমণ বিবেচনায় রাফ লেমন সবচেয়ে উপযোগী রুটস্টক। জলপাইয়ের গ্রাফটিং এর সফলতা, টিকে থাকা ও বৃদ্ধির জন্য গ্রাফটিং এর সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ খুব জরুরি। জলপাইয়ের অঙ্গজ বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে মে মাসে ক্লেফট বা স্পøাইস গ্রাফটিং পদ্ধতি উত্তম। 
জিবরেলিক এসিড (এঅ৩) হরমোন প্রয়োগের মাধমে স্ট্রবেরিতে চারা (ৎঁহহবৎ) উৎপাদন : ১.০ মিলিমোল (১ সগ) মাত্রায় জিবরেলিক এসিড (এঅ৩) সপ্তাহে ১ বারের জন্য স্প্রে করলে প্রতিটি গাছ থেকে সর্বাধিক সংখ্যক রানার (৩.৫টি) ও উপ-রানার (১১.০টি) পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রতিটি মাতৃগাছ থেকে গড়ে ১৫টি চারা উৎপাদিত হয়। এছাড়া ০.৫ মিলিমোল (০.৫ সগ) মাত্রায় জিবরেলিক এসিড হরমোন শুধুমাত্র একসপ্তাহে দুই বার ব্যবহার করলে গড়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক চারা/রানার (৩টি) ও উপ-রানার (৯টি) পাওয়া যেতে পারে।
কাঁঠালের গামোসিস রোগ দমনব্যবস্থা : আক্রান্ত স্থান চাকু দিয়ে চেঁছে পরিষ্কার করে আলকাতরা বা বর্দোপেস্ট (তুঁত-১০০ গ্রাম; চুন-১০০ গ্রাম; পানি-১ লি.) প্রয়োগ করতে হবে।
ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে লিচুর ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ রোধকরণ : লিচুতে গুটি ধরার (ভৎঁরঃ ংবঃ) ৪০ দিন পর বাদামি পেপার ব্যাগ দ্বারা ব্যাগিং করলে ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ প্রায় ৯৭ শতাংশ রোধ করা সম্ভব যেখানে ব্যাগবিহীন লিচুতে পোকার আক্রমণ থাকে ২৫ শতাংশ বা তার অধিক।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনের জন্য ফলের উদ্ভিদ প্রজনন (নৎববফরহম) কার্যক্রম জোরদার করা; দেশ ও বিদেশ থেকে বিভিন্ন ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, বৈশিষ্ট্যকরণ, মূল্যায়ন, সংরক্ষণ এবং নতুন নতুন জাতসহ উন্নত কলাকৌশল উদ্ভাবন; জৈবিক (নরড়ঃরপ) ও অজৈবিক (ধনরড়ঃরপ) ঘাত সহিঞ্চু জাত উদ্ভাবন; অমৌসুমি ও বছরব্যাপী উৎপাদনক্ষম ফলের উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন; ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত প্রযুক্তি (যেমন: ন্যানো প্রযুক্তি, দ্রোন এর ব্যবহার ইত্যাদি) উদ্ভাবন; নিরাপদ ফল উৎপাদনের প্রযুক্তি (এঅচ) উদ্ভাবন; জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন; উন্নত গুণগত মানসম্পন্ন মাতৃকলম/চারা উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা; প্রতি বছর স্থানীয় জাতের পরিবর্তে (কম উৎপাদনশীল) উন্নত জাতের পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্পন্ন কলমের চারার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা; ফলের সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হ্রাসকরণের জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন; শহর এবং শহরতলী এলাকাতে ফল চাষের জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন; ফলের উন্নয়নের জন্য জীবপ্রযুক্তির ব্যবহার; দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন “আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে-এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন”। ফলের আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়নে ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই প্রধান ভূমিকা পালন করছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফলের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। অধিকন্তু, দেশে ফলনির্ভর  কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠছে এবং কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। পরিশেষে বলা যায়, ফলের উন্নত জাত ও অন্যান্য প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের পুষ্টিচাহিদা মেটানোর পাশাপাশি, বাড়তি আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যা দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়ন তথা উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও অধিক ফল চাষের মাধ্যমে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, তবেই বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে হবে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। 

লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর। মোবাইল: ০১৭১৬০০৯৩১৯,          ই মেইল : নংধৎশবৎথ৬৪@ুধযড়ড়.পড়স

বিস্তারিত
পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় কাঁঠাল

পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় কাঁঠাল
ড. মোঃ জিল্লুর রহমান
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। ইহা সাধারণত অযতেœ চাষ হয়ে থাকে অর্থাৎ কোন রকম পরিচর্যা ছাড়াই ফল দিয়ে থাকে। তাই কাঁঠাল জৈব উপায়ে উৎপাদিত ফল বা অরগানিক ফুড। দেশে কাঁঠালের প্রতিটি গাছই আলাদা। অন্যান্য ফলের মতো এর সম্প্রসারিত কোন জনপ্রিয় জাত বা কালটিভার নেই। তাই চাহিদামতো কাক্সিক্ষত অধিক পরিমাণ কাঁঠাল পাওয়া যায় না। বাগান আকারে কাঁঠালের চাষ বেশি না হলেও বসতবাড়ির আঙ্গিনায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চত্বরে, রেললাইন ও  রাস্তার ধারে, ক্ষেতের আইলে তথা অব্যবহৃত স্থানে বাংলাদেশের সর্বত্রই কাঁঠালের চাষ হয়ে থাকে। ফলের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় কাঁঠাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। খাদ্য নিরাপত্তার তিনটি মূল বিষয় হলো-এর প্রাচুর্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে  থাকা এবং পুষ্টির সরবরাহ বজায় থাকা। তাই এককভাবে কাঁঠাল খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে অর্থাৎ মৌসুমে এর প্রাচুর্য থাকে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে উল্লেখযোগ্য হারে ভিটামিন, খনিজ এবং শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এর উচ্চ মাত্রার ক্যারোটিন যা পরবর্তীতে শরীরে ভিটামিন এ তে পরিবর্তিত হয়ে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। 
সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এ ফলটি মানুষ মন ভরে এবং পেট পুরে খেতে পারে। কাঁঠালের মোট ওজনের প্রায় শতকরা ৫০-৬০ ভাগ মানুষের খাদ্য। দেখা যায় যে, পাঁচ কেজি ওজনের একটা কাঁঠালে সাধারণত আধাকেজি বীজ এবং  আড়াই কেজি ওজনের পাল্প হয়ে থাকে। এতে গড়ে ১০০টি কোষ বা কোয়া পাওয়া যায়। একটা কোষের গড় ওজন প্রায় ২৫ গ্রাম। একজন মানুষ চার-পাঁচটা কোষ খেয়ে সহজেই দৈনিক ফলের চাহিদা মিটাতে পারে। গবেষণায় দেখা যায় ১০০ গ্রাম কাঁঠালের পাল্প থেকে ৭.২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১৮.১% চিনি, ৭.০৭% প্রোটিন এবং ৫৭০ আন্তর্জাতিক একক মাত্রার ক্যারোটিন এবং ৯৪ কিলোক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। ছোট ও মাঝারি কাঁঠাল শহরে, মাঝারি ও বড় কাঁঠাল গ্রামাঞ্চলে বেশি প্রিয়। বড় কাঁঠাল শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কাঁঠালের কোন অংশ ফেলে দেবার নয়। পাকা কাঁঠালের কোষ মানুষ সরাসরি খেয়ে থাকে অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে চিপস, ক্যান্ডি, জ্যাম, জেলি, আচার ইত্যাদি তৈরি করে খেয়ে থাকে।  কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। ইহা ভেজিটেবল মিট হিসেবে পরিচিত। এর বীজ উৎকৃষ্ট মানের তরকারি। একে ভেজেও খাওয়া যায়। কাঁঠালের বীজ অনেক দিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়। এজন্য মাটির পাত্রে বালুর মধ্যে বীজ রাখা হয়। বীজের উপরের ছাল ছাড়িয়ে কাপড়ে ঘষা দিয়ে ঈষদোষ্ণ গরম পানিতে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে ডিপ ফ্রিজে কয়েক মাস সংরক্ষণ করা যায় এবং তরকারিতে ব্যবহার করা যায়। কাঁঠালের  উপরিভাগ তথা চামড়া এবং অন্যান্য অংশ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা ছাগলের খাদ্য হিসেবে সমাদৃত। কাঁঠালের কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করা হয়ে থাকে। কাঁঠাল  গাছ বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ অর্থাৎ বছরের পর বছর তা থেকে ফল পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ফল পাওয়ার ক্ষেত্রে কাঁঠাল গাছের সাথে অন্য কোন গাছের তুলনা হয় না। শত বছরের গাছও ভালো ফলন দিয়ে থাকে। গাছের প্রধান কা- এবং প্রাথমিক শাখায় বেশির ভাগ কাঁঠাল ধরে বিধায় ঝড়ে বা বাতাসে পড়ে না। এর প্রতিটি ফলের আলাদা আলাদা যত্ন নেয়া সম্ভব। কাঁঠাল গাছ খড়া সহিষ্ণু। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। কাঁঠাল থেকে প্রাপ্ত অর্থ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী ক্রয়ে ব্যবহৃত হতে পারে।
পাকা কাঁঠালের কোষের ধরনের উপরভিত্তি করে ইহাকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এগুলোর মধ্যে অতি নরম বা নরম পাল্প সম্পন্ন কাঁঠালকে গিলা বা গালা বা রসা কাঁঠাল বলা হয়ে থাকে। এর পাল্প সহজেই গলে যায়, রসালো প্রকৃতির এবং বেশ মিষ্টি। নরম ও শক্ত এর মাঝামাঝি পাল্প সমৃদ্ধ কাঁঠালকে আদরসা বা দো-রসা কাঁঠাল বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের কাঁঠালও মিষ্টি হয়ে থাকে। যে কাঁঠালের পাল্প শক্ত তাদেরকে খাজা বা চাওলা কাঁঠাল বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের কাঁঠাল মাঝারি মিষ্টি হয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ কাঁঠাল মৌসুমের শেষের দিকে শক্ত পাল্প সম্পন্ন হয়ে থাকে। কাঁঠালের টিএসএস সাধারণত         ১৪-৩০% হয়ে থাকে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম কাঁঠাল পাওয়া যায়। তার নামকরণ এলাকাভিত্তিক ভিন্ন হয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় লাল রঙের কোষসমৃদ্ধ কাঁঠাল  পাওয়া যায় যাকে বিন্নী কাঁঠাল বলে। গাজীপুরে এক রকম আগাম কাঁঠাল পাওয়া যায় যার একটি ভিন্ন গন্ধ থাকে তাকে কুবাইরা কাঁঠাল বলে। রসালো সুস্বাদু কাঁঠালকে মধু কাঁঠাল বলা হয়। আবার এ অঞ্চলের মানুষ ৪০-৫০ কেজি ওজনের বড় কাঁঠালকে পাহাড়িয়া কাঁঠাল নামে অভিহিত করে থাকে। 
কাঁঠালের প্রাপ্যতার সময়ের উপর ভিত্তি করে কয়েক প্রকার হয়ে থাকে যথাঃ মৌসুমি কাঁঠাল (জুন-জুলাই মাসে পাকে), অমৌসুমি কাঁঠাল (অক্টোবরের পরে এবং মে মাসের আগে যেকোন সময় পাকে), নাবী কাঁঠাল যা মৌসুমের পরে পাকে অর্থাৎ আগষ্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যায়। এছাড়া কিছু কাঁঠাল বছরে দুইবার ফল দেয়, যা দোফলা নামে পরিচিত, একবার মৌসুমে এবং আরেকবার অমৌসুমে; যে সকল কাঁঠাল গাছে বছরে কমপক্ষে ৮-৯ মাস ফল দেয় তাকে বারোমাসি কাঁঠাল বলে অভিহিত করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি কাঁঠাল-১, বারি কাঁঠাল-২ ও বারি কাঁঠাল-৩ নামে কাঁঠালের তিনটি উন্নত জাত কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্য মুক্তায়িত করেছে। বারি কাঁঠাল-১ একটি নিয়মিত ফলদানকারী উচ্চফলনশীল মৌসুমি জাত। মে মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত এই জাতের ফল আহরণ করা যায়। ফলের শাঁস হালকা হলুদ ও মধ্যম নরম,  রসালো এবং খুব মিষ্টি; বারি কাঁঠাল-২ একটি নিয়মিত ফলদানকারী উচ্চফলনশীল অমৌসুমি জাত। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফল আহরণ করা যায়। ফলের শাঁস হলুদ বর্ণের, সুগন্ধযুক্ত ও মধ্যম রসালো এবং খুব মিষ্টি; বারি কাঁঠাল-৩ একটি নিয়মিত ফলদানকারী উচ্চফলনশীল বারোমাসি জাত (সেপ্টেম্বর-জুন)। ফল দেখতে আকর্ষণীয় সবুজাভ হলুদ, ফলের শাঁস  হলুদ বর্ণের, সুগন্ধযুক্ত, মধ্যম রসালো, খুব মিষ্টি এবং এক কোষ থেকে আরেক কোষ সহজে আলাদা করা যায় ও এতে আঠা লাগে না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে আরো উন্নত জাতের কাঁঠাল কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য জাত উদ্ভাবনের উপর গবেষণা চলছে। এভাবে জাত উদ্ভাবন করে তা অঙ্গজ উপায়ে বংশবিস্তার করে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সমমান ও সমগুণসম্পন্ন অধিক পরিমাণে কাঁঠাল পাওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর ফল বিভাগ কাঁঠালের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি উপযুক্ত অঙ্গজ বংশবিস্তার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে এবং এ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে কৃষকের মাঝে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ‘বারি উদ্ভাবিত বারোমাসি কাঁঠালের জাত বিস্তার’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে গাজীপুর, খাগড়াছড়ি, নরসিংদী ও ময়মনসিংহ জেলার চারটি উপজেলায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ জন কৃষকের বাড়ির আঙ্গিনায় প্রতিটি জাতের ৫টি করে গ্রাফটিং এর চারা দিয়ে ১২০টি মাতৃবাগান সৃষ্টি করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা মাঠে স্থাপিত বাগানে সাড়ে তিন বছরের তিনটি জাতের গাছেই ফল ধরেছে। দেশী কাঁঠালের এ রকম বাগানে কয়েকটি গাছে এই প্রথম একই রকম ফল ধরেছে। গাজীপুরের কৃষকের বাগানেও ফল ধরেছে। এই বাগানগুলো এখন মাতৃবাগান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আশা করা যায় এসব বাগান থেকে দেশে কাঁঠালের উন্নয়ন শুরু হবে। 
কাঁঠালের সংগ্রহকাল সীমিত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কাঁঠালের সংগ্রহকালীন সময় কিছুটা ভিন্ন হতে দেখা যায়। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার কাঁঠাল সাধারণত আগে পাকে। দেখা যায় যে ফল ধরার পর থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পর তা পরিপক্ব অবস্থায় পৌঁছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে কাঁঠাল পাকতে শুরু করে। তখন সঠিক আকার প্রাপ্ত হলে তা সংগ্রহ করা যেতে পারে। পরিপুষ্ট অবস্থায় কাঁঠাল সঠিক আকার ধারণ করে যা গাছ বা জার্মপ্লাজম ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। এ সময় কাঁঠালের উপরিভাগের কাটাগুলো সুচালো অবস্থা থেকে  ছড়ানো অবস্থায় আসে ও কাঁঠালের উপরিভাগের রং পরিবর্তন হয়ে সবুজ থেকে সবুজাভ হলুদ হয়ে থাকে। হাত দিয়ে আঘাত করলে তা ড্যাব ড্যাব শব্দ তৈরি করে। এ সময় কাঁঠালের বোটার আঠার ঘনত্ব  বৃদ্ধি হ্রাস পায়। অপরিপক্ব কাঁঠাল টনটনে ধাতব শব্দ তৈরি করে থাকে। কাঁঠাল পাকতে শুরু করলে অদ্রবণীয় প্রোটোপেকটিন ভেঙে দ্রবণীয় পেকটিন তৈরি হয় যার কারণে তা নরম হয়ে থাকে।
অনেকে অপরিপক্ব কাঁঠাল আগাম সংগ্রহ করে বিক্রি করে বেশি লাভবান হতে চায়, এতে ক্রেতাগণ প্রতারিত হয়ে থাকে।  সঠিক সময় এবং পরিপক্ব অবস্থায় তা সংগ্রহ করে কাঁঠালের অপচয় রোধ করা যায়। পরিপক্ব কাঁঠালকে তাড়াতাড়ি পাকানোর জন্য গোঁজ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে কাঠির মাথা সরু করে তা দিয়ে বোটার কিনার ঘেঁষে উপর থেকে তিন চার ইঞ্চি নিচের দিকে প্রবেশ করিয়ে গোঁজ দিলে কাঁঠাল তাড়াতাড়ি পাকে। বাণিজ্যিক কারণে অনেক কাঁঠালকে এক সাথে পাকাতে এ পন্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পরিপক্ব অবস্থায় সংগৃহীত কাঁঠালের গুণগত মানের কোন পরিবর্তন হয় না। অনেকে তাড়াতাড়ি পাকানোর জন্য গোঁজ এর মধ্যে লবণ ও দুধ দিয়ে থাকে। কাঁঠালকে  কয়েক ঘণ্টা রোদে দেয়ার পর বদ্ধ পরিবেশে রেখে দিলে তাড়াতাড়ি পাকে।
কাঁঠালের সংগ্রহকাল সাধারণত জুন-জুলাই মাসে সীমাবদ্ধ থাকে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ কাঁঠাল সংগ্রহ হয়ে থাকে। এই সময়ে কাঁঠালের স্বল্পমূল্য থাকে। পরিবহনজনিত খরচ কমানোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল ট্রাকে, বাসে এবং ভ্যানে একই সাথে গাদাগাদি করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে আঘাতজনিত কারণে কাঁঠালের অনেকাংশই নষ্ট হয়ে থাকে। তাই একদিকে কৃষক যেমন মূল্য পায় না, অন্যদিকে ভোক্তাদেরও পর্যাপ্ত ভাল কাঁঠালের সরবরাহ বিঘিœত হয়। এই অপচয়ের কারণে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পরিবহনের সময় নির্দিষ্ট এবং সীমিত সংখ্যক ফল একটা গাড়িতে বহন করে কাঁঠালের নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা যায়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল তথা কার্টন ব্যবহার করা যেতে পারে।  কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি, চিপস্ তৈরি করে দীর্ঘ দিন ব্যবহার করা যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা উন্নত গুণসম্পন্ন অধিক ফলনশীল মৌসুমি, অমৌসুম, আগাম ও বারোমাসি কাঁঠালের জার্মপ্ল­াজম বা গাছ শনাক্ত করে মূল্যায়নের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবন করতে হবে এবং তা সম্প্রসারণ করে দেশে সমগুণসম্পন্ন কাঁঠাল প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। 

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১৫০৮২৫৫৫, ই-মেইল : লরষষঁৎযৎপ@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
ফল গাছের পরাগায়ন ও করণীয়

ফল গাছের পরাগায়ন ও করণীয়
ড. মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন
ফল আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। আমাদের পুষ্টির অত্যাবশকীয় উপাদান বিশেষ করে ভিটামিন, মিনারেলস এবং এন্টি-অক্সিডেন্টের প্রধান উৎস হচ্ছে ফল। আমাদের দৈনিক চাহিদার মাত্র অর্ধেক পরিমাণ ফল গ্রহণ করে থাকি। কিন্তু পুষ্টি নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলে মাথাপিছু কমপক্ষে প্রতিদিন ১০০ গ্রাম ফল প্রয়োজন। বিগত দশকে ফলের উৎপাদন এবং ফলন দুই-ই বেড়েছে।  কৃষি পরিসংখ্যানের তথ্য মতে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আম উৎপাদনের এরিয়া ১,১০,০০০ একর হতে ২,৩৫,০০০ একরে বৃদ্ধি পেয়েছে তদ্রƒপ কাঁঠাল, পেঁপে, লিচু, পেয়ারা, বরই ইত্যাদি ফলের উৎপাদনের এলাকা বেড়েছে, যা খুবই আশাব্যঞ্জক।
বিভিন্ন ফলের ফলন বৃদ্ধিতে সময়মতো রোগ ও পোকামাকড় দমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যা আমাদের ফলের ফলনই শুধু বৃদ্ধি করেনি বরং মিটিয়ে যাচ্ছে পুষ্টির চাহিদা। বিভিন্ন ফলের ফলন বৃদ্ধি এবং ফলের আকার আকৃতি সঠিক রাখার জন্য উত্তম পরাগায়ন প্রয়োজন। আর এই পরাগায়নের প্রায় ৭০ ভাগ কার্য সম্পাদন করে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ। ফলের বাগান বাংলাদেশে যত বৃদ্ধি পাবে আমাদের জন্য তা ততই মঙ্গলজনক। ফলের পোকামাকড় দমনে আমরা প্রায়ই বালাইনাশক ব্যবহার করে থাকি। সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার না করলে পরাগায়কের সংখ্যা হ্রাস পায়, যা ফলের ফলন বৃদ্ধিতে অন্তরায়। 
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমের ফলনে পরাগায়কের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমে সাধারণত : মাছি, হুলবিহীন মৌমাছি, ঐধষরপঃঁং মৌমাছি, খধংরড়মষড়ংংঁস মৌমাছি, ইউরোপীয় মৌমাছি, ইন্ডিয়ান মৌমাছি ইত্যাদি পতঙ্গ দ্বারা পরাগায়ন সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে আমের পরাগায়নে মাছির ভূমিকা বেশ। আমাদের দেশে আমের মুকুল অবস্থায় অনেক এলাকাতে বালাইনাশক ব্যবহার করা হয় ফলে আমের পরাগায়কের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু তারপরও মৌচাষিরা তাদের পালনকৃত মৌমাছি বিভিন্ন আমের বাগানে নিয়ে যান না শুধুমাত্র বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে। পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি বাগানে আমের পরাগায়নের জন্য মৌমাছি ব্যবহার করা উচিত। আমের ফুল হতে সংগ্রহকৃত মধু অতি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। আম স্বপরাগী হলেও পরাগায়ক ব্যবহার করে আমের ফলন দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।   
লিচুতে স্বপরাগায়ন হয়ে থাকে তবে পতঙ্গের মাধ্যমে পরাগায়ন সম্পন্ন হলে লিচুর ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। লিচুর ফুলে মাছি, বিটল, প্রজাপতি, পিঁপড়া ইত্যাদি বিচরণ করলেও মৌমাছি দ্বারা পরাগায়িত হলে লিচুর ফলন ২-৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে লিচুর বাগানে মৌবাক্স স্থাপন করে প্রায় ২,৫০০ টন মধু সংগ্রহ করা হয়। এজন্য লিচুর বাগান বৃদ্ধি করা উচিত যাতে মৌমাছির সংখ্যাও বৃদ্ধি পায় এবং মধুও অধিক পরিমাণে সংগ্রহ করা যায়।
লেবুজাতীয় ফসলে পরাগায়ন অপরিহার্য। তবে এতে মৌমাছির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। তবুও দেখা যায় কিছু কিছু লেবুজাতীয় ফুল সারা বছর ফোঁটে এবং বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ লেবুর ফুলে বিচরণ করে। লেবুর ফলন বৃদ্ধিতেও পরাগায়নের ভূমিকা রয়েছে, যা স্থান, আবহাওয়ার অবস্থা এবং ফসলের জাতের উপর নির্ভর করে।
পেয়ারার পরাগায়নের শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ মৌমাছির কারণে হয়ে থাকে। পেয়ারার ফলের আকার, গুণগতমান এবং ফলন বৃদ্ধিতেও পরাগায়কের ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৭,০০০ একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়ে থাকে, যা ২০১৭-২০১৮ সালে ছিল মাত্র ১১,০০০ একর। 
ফলের মধ্যে তরমুজ খুবই সুস্বাদু বিশেষ করে গরমের সময় তা খুবই স্বস্তিদায়ক খাদ্য। তরমুজ চাষের আওতা দিন দিন বেড়েই চলছে। তরমুজের পরাগায়নে বিভিন্ন পরাগায়ক কাজ করে। তবে এক্ষেত্রে মৌমাছি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তরমুজ, বাঙ্গি ইত্যাদি ফুলের মধুও সুস্বাদু। তবে সেক্ষেত্রে অধিক মৌকলনী কোন এলাকায় থাকলে সে সকল চাক থেকে মধু সংগ্রহ করা দুরূহ।
বরই সুস্বাদু ফল। বরই গাছে প্রচুর পরিমাণ কীটপতঙ্গ দেখা যায়। আমাদের দেশে জুন-আগস্ট মাস পর্যন্ত উপকারী পতঙ্গের বিশেষ করে যে সকল পতঙ্গ গবষরঢ়যধমড়ঁং তাদের খাদ্যের স্বল্পতা থাকে। সেপ্টেম্বরের বরইর ফুল সকল পরাগায়কের প্রিয়। পরাগায়কের ব্যবহারে বড়ইর ফলন দ্বিগুণ পর্যন্ত করা সম্ভব। তবে বরইর বাগানে বালাইনাশক ব্যবহারে খুবই সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে শেষ বিকেলে বালাইনাশক প্রয়োগ করলে উপকারী পতঙ্গ কম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বরই বাগানের পরিমাণ বর্তমানে ৩৯,০০০ একর যা ২০১৭-২০১৮ তে মাত্র ৪,০০০ একর ছিল। আমাদের ফলের সমৃদ্ধি যে দিন দিন বাড়ছে এটিই তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার জন্য এখানে কিছু সংখ্যক ফল গাছে পরাগায়কের ভূমিকা দেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে এই সৃষ্টি জগতে প্রতিটি প্রাণীই কারো না কারোর জন্য। পতঙ্গকে অবহেলা করা উচিত নয়। এই ক্ষুদ্র পরাগায়ক পতঙ্গই আমাদের বিনামূল্যে লাখ কোটি টাকার শ্রম দিয়ে সহায়তা করছে।
ইদানীং আমাদের দেশে বিদেশি ফলের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ড্রাগন ফল, রাম্বুটান, অ্যাভোকেডো, বিদেশী আম উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে ড্রাগন ফুলের পরাগায়ন একটি বড় সমস্যা। এক জাতীয় হক মথ দ্বারা ড্রাগন ফুলে পরাগায়ন হয় এবং খুব ভোরে কিছু প্রজাতির মৌমাছি ড্রাগন ফলের পরাগায়ন ঘটায়। আমাদের দেশে বেশির ভাগ চাষিই হাতের মাধ্যমে ড্রাগন ফলের পরাগায়ন ঘটান। ড্রাগন ফলের বাগানে পরাগায়কদের আকৃষ্ট করতে প্রচুর ফুল  সমৃদ্ধ জাতীয় বৃক্ষ বা গুল্মজাতীয় গাছ লাগানো উচিত। এ ছাড়া বাগানে মৌবাক্স স্থাপন করে ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে। ফলের বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি বিশেষ করে প্রতি জেলায় বড় আকারের একটি করে মডেল বাগান স্থাপন করা উচিত। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টারগুলো এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে তবুও এই সেন্টারগুলো পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় বৃদ্ধি করা উচিত। একক গাছের ফলের বাগান না করে যথাসম্ভব বিভিন্ন ফল গাছের সমন্বয়ে বাগান করা উচিত। ফলের গাছ নির্বাচনের সময় বছরের প্রতি মাসে যাতে বাগানে ফুল থাকে সেটা বিবেচনা করা উচিত। এভাবে সারা বছর ফুলের উপস্থিতিসম্পন্ন বাগান পরাগায়কদের জন্য একেকটা কনজারভেশন সেন্টার হিসেবে কাজ করবে।
আমাদের দেশি ফলসমূহের প্রাধান্য অবশ্যই দিতে হবে। দেশি ফলসমূহ বিদেশী ফলের তুলনায় পুষ্টিকর এবং আমাদের ইকোসিস্টেমে আমাদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত। একেকটি ফলের বাগান তৈরি যেমনি আমাদের পুষ্টিতে ভূমিকা রাখবে তেমনি এই জাতীয় ফলগাছ রোপণের মাধ্যমে আমাদের বৃক্ষরাজির সংখ্যা বাড়বে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া আমাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে বিশেষ করে আমাদের যে সকল পতঙ্গ পরাগায়ক হিসেবে কাজ করে তাদের জন্য হবে অভয়ারণ্য। তাই এই আসন্ন ফল দিবসে আমাদের চেষ্টা থাকবে যাতে প্রত্যেকে এমন একটি ফল গাছ লাগাই যেটি প্রচুর পরিমাণে ফুল দেয়। আপনিই নির্বাচন করুন আপনার পছন্দের দেশী ফল।

লেখক : প্রফেসর, কীটতত্ত্ব বিভাগ, শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিদ্যালয়, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৭৪৩৫৫৭৮৭, ই-মেইল : ংধশযধধিঃ থংধঁ@ুযধড়ড়.পড়স

বিস্তারিত
ফলগাছের অঙ্গ ছাঁটাই
ফলগাছের অঙ্গ ছাঁটাই
কৃষিবিদ খোন্দকার মোঃ মেসবাহুল ইসলাম
বাংলাদেশের শহর-নগর-গ্রাম যেদিকেই তাকানো যায় না কেন, একটা না একটা ফলের গাছ চোখ পড়বেই। এসব ফলগাছের অধিকাংশই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা। খুব কম সংখ্যক ফলগাছ আছে, যেগুলো অঙ্গ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধির সুযোগ পেয়েছে। রোপণ থেকে শুরু করে ফল ধারণ পর্যন্ত সময়কালে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে ফলগাছের বিভিন্ন অঙ্গ ছাঁটাই করতে হতে পারে। এতে গাছের যেমন একটি নির্দিষ্ট আকার-আকৃতি দেয়া যায়, তেমনি কাক্সিক্ষত বা আশানুরূপ ফল ধারণ হয় ও ফল সংগ্রহে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়।
অঙ্গ ছাঁটাই ফলগাছ ব্যবস্থাপনার একটি অন্যতম কাজ। মূলত দুটি উদ্দেশ্যে ফলগাছের অঙ্গ ছাঁটাই করা হয়ে থাকে। প্রথমত অফলন্ত ফলগাছকে একটি নির্দিষ্ট আকার আকৃতি দেয়া এবং অফলন্ত ও ফলগাছের অপ্রয়োজনীয় দুর্বল, চিকন, নরম, ভাঙা ও মরা শাখা-প্রশাখা, রোগ ও পোকা আক্রান্তা শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে গাছের ভেতরের দিকে আলো-বাতাস চলাচল স্বাভাবিক রাখা। এ দুটি উদ্দেশ্য ছাড়াও আরো কিছু কারণে ফলগাছ ছাঁটাই করতে হয়। যেমন-ফল গাছটি যদি মাতৃগাছ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ফলগাছ থেকে বেশি পরিমাণে সায়ন উৎপাদন করা; ফলগাছে প্রচুর পরিমাণে ফুল-ফল উৎপাদনক্ষম শাখা-প্রশাখার সংখ্যা বাড়ানো; ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি করা; ঝড় বা প্রবল বাতাসে যেন ফলগাছ সহজে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য গাছকে সুগঠিত ও মজবুত অবকাঠামো প্রদান করা; নির্দিষ্ট জমিতে বেশি সংখ্যক ফলগাছ রোপণ করা; ফলগাছের বিভিন্ন পরিচর্যা যেমন- বালাইনাশক স্প্রে করা, সায়ন সংগ্রহ করা ইত্যাদি কাজ সহজ করা; যেসব ফলগাছে ফল ধারণ সমস্যা আছে, সেসব গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে নতুন শাখা প্রশাখা গজানোর ব্যবস্থা করা; এক বছর পর পর যেসব গাছে ফল ধরে সেসব গাছের একান্তর ক্রমিক ফলনের প্রভাব কমানো বা ফল ধরার ব্যবস্থা করা; যেসব শাখা-প্রশাখা অন্য শাখা-প্রশাখার ভেতর ঢুকে যায় কিংবা যেসব শাখা-প্রশাখা নিম্নমুখী হয় সেগুলো ছাঁটাই করে গাছকে ঝোপালা অবস্থা থেকে মুক্ত রাখা; ফলগাছের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।
ফলগাছের বিভিন্ন অঙ্গ ছাঁটাইয়ের সময় বিভিন্ন ফলগাছের বয়স, জাত ও বৃদ্ধির স্বভাব অনুযায়ী ছাঁটাই করতে হয়। তবে লক্ষ রাখতে হয়, কখনোই যেন অতিরিক্ত ছাঁটাই করা না হয়। 
ফল ধরার আগেই ফল গাছের কাঠামোগত আকৃতি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, গাছের অগ্রভাগ বা শীর্ষ ছাঁটাই করে গাছকে খাটো রাখা। এতে গাছে সার প্রয়োগ, সেচ পদান,  স্প্রে করা এবং সহজে ফল সংগ্রহসহ অন্যান্য পরিচর্যা করা যায়। এছাড়া গাছে যদি চার থেকে সাতটি শাখা-প্রশাখা থাকে তাহলে গাছ যান্ত্রিকভাবেও দৃঢ় ও আলো-বাতাস চলাচলের জন্য খোলামেলা হয়। গাছের ভেতরের দিকে এমন কিছু শাখা প্রশাখা গজায় যেগুলো থেকে কোন ফলন পাওয়া যায় না, সেগুলোও ছাঁটাই করা উচিত। কোন কোন ফলগাছের গোড়ার দিকে কিছু কিছু কুশি বা নতুন শাখা বের হতে দেখা যায়, সেগুলো নিয়মিতভাবে ছাঁটাই করতে হয়। যেমন- ডালিম, পেয়ারা, লেবু ও কাঁঠাল গাছের গোড়ায় দুই-তিন সপ্তাহ পর পর বের হওয়া কুশিগুলো ছাঁটাই করতে হয়। 
ছাঁটাই করার সময় লক্ষ্য রাখতে হয়, গাছের সতেজতা, বয়স এবং জাত ও বৃদ্ধির স্বভাব। কম বয়সী ফলগাছে যথাসম্ভব হালকা ছাঁটাই করতে হয়। তবে কম বা বেশি যে বয়সেরই হোক না কেন গাছ মরা বা ভাঙ্গা এবং রোগ পোকা আক্রান্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাইয়ের সময় কিছুটা সুস্থ অংশসহ ছাঁটাই করতে হয়। মূল কা- এবং মোটা শাখা কখনোই ছাঁটাই করা ঠিক নয়।
বড় মোটা শাখা কাটার সময় নির্দিষ্ট জায়গা থেকে প্রায় ১ ফুট বা ৩০ সেন্টিমিটার দূরে নিচের দিক থেকে কাটা শুরু করতে হয়। কাটার গভীরতা নির্ভর করে কর্তিত শাখার অংশ নিচের দিকে বেঁকে আসা পর্যন্ত। এর পর শাখার উপরের দিকে প্রথম কাটার স্থান থেকে ১ ইঞ্চি বা আড়াই সেন্টিমিটার দূরে দ্বিতীয় কাটা দিতে হয়। এতে কাটা শাখা বাকল বা ছালের সাথে ঝুলে থাকে না। কাটা জায়গায় আলকাতরা বা ছত্রাকনাশক লাগাতে হয়। চিকন শাখাও নিচের দিক থেকে কাটলে অকর্তিত অংশের ছাল বা বাকল উঠে আসে না। কাটার সময় সুস্থ সবল কুঁড়ি বা পর্বসন্ধির ঠিক উপরেই শাখা কাটা উচিত। তবে গাছের বৃদ্ধি নির্ণয়ের জন্য শাখার কুঁড়ি বা পর্বসন্ধির নিচেই কাটতে হয়।
ফলগাছ ছাঁটাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও মৌসুমের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হয়। কারণ অসময়ে ছাঁটাই করলে সুফল পাওয়ার বদলে ফলগাছে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সে জন্য কাক্সিক্ষত ফলাফল নাও পাওয়া যেতে পারে। বর্ষার শেষে এবং শীতের আগে ফলগাছ ছাঁটাই করা উচিত। তবে ফল সংগ্রহের পরই ছাঁটাই করা সবচেয়ে ভালো। গাছে ফুল আসার আগে বা ফল ধরা অবস্থায় শাখা প্রশাখা ছাঁটাই করা ঠিক নয়। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যক ফলধারণ এবং ফলের আকার আকৃতি বড় ও গুণগতমান নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ফুল ও ফল ছাঁটাই করা যেতে পারে। এছাড়া খরা, দীর্ঘ শুকনো মৌসুম বা শীতের সময় কখনোই ছাঁটাই করা উচিত নয়। বর্ষার সময় বিশেষ করে বৃষ্টির দিন ছাঁটাই না করাই ভালো। 
বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যায়। এত সুস্থ সবল ফল গাছ থেকে ভালো ফলন পেতে জেনে নেই ফল গাছের অঙ্গছাঁটাইয়ের প্রয়োজনীয় সময়।
বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল আম। বাগান আকার ছাড়াও গ্রাম এবং শহর নগর অনেকের বাড়িতে আঙিনায় ও ছাদ বাগানে ছোট-বড় জাতের আম গাছ চোখ পড়ে। সঠিক সময়ে সঠিকভাব ছাঁটাই এবং অন্যান্য পরিচর্যা ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে এসব আম গাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। জুন মাস থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সময় বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহের পরপরই বোঁটার উপরের কিছুটা অংশসহ গাছ থেকে বোঁটা ছাঁটাই করে ফেলা উচিত। এতে নতুন যে শাখা গজায় তার বয়স ৬-৭ মাস হলেই পরের মৌসুমে মুকুল আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়া রোগ ও পোকা আক্রান্ত, মরা, আধামরা, দুর্বল-চিকন শাখা ছাঁটাই করতে হয়। গাছের নিচের আগাছা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোদাল দিয়ে হালকা করে কোপালে কিছু কিছু শিকড় কাটা পড়ে। এটি আম গাছের একান্তর ক্রমিক ফল ধারণ সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী আম গাছ বেশি ছাঁটাই করলে কলম করার জন্য ভালো সায়ন পাওয়া যায়। এছাড়া ভবিষ্যতে ভালো ফলন পাওয়ার জন্য তিন বছর বয়স পর্যন্ত আম গাছের মুকুল ছাঁটাই করতে হয়। ফল গাছ ছোট ও অপুষ্ট আম কিংবা অধিক সংখ্যক আম থেকে ছোটগুলো ছাঁটাই করলে বাকি আমগুলো আকার বড় হয়। 
জুলাই-আগস্ট মাস কাঁঠাল সংগ্রহের পর কাঁঠাল গাছের দুর্বল, মরা রোগ ও পোকা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করতে হয়। তবে সে সাথে ফলের বোঁটা এবং কা- ও গোড়া থেকে বের হওয়া নতুন শাখা ছাঁটাই করতে হয়। অনেকেই ছাগলের খাদ্য হিসেবে বছরের যে কোন সময়ই কাঁঠাল পাতার জন্য ছোট ছোট ডালসহ ছাঁটাই করে থাকেন। এতে গাছের খাদ্য উৎপাদন কমে যায় ও গাছ দুর্বল হয় ও ফল ধারণও কমে যায়। আবার কাঁঠাল ফল সংগ্রহ করার পর পুরনো গাছ এমনভাব ছাঁটাই করা হয় যে, গাছে ডালের সংখ্যা ও পাতার সংখ্যা থাকে না বললেই চলে। এটিও ঠিক নয়। জুলাই মাসের শেষে সপ্তাহে ছাঁটাই করলে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিক কাঁঠাল গাছে মুচি আসা শুরু হয় এবং পরের বছর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে কিছু সংখ্যক আগাম ও পুষ্ট কাঁঠাল পাওয়া যায়। ছাঁটাইয়ের পরপরই গাছে কপার জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়। এ ছাড়া গোড়ার চারদিকের আগাছা পরিষ্কার করার পর জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ করতে হয়। এরপর হালকা করে কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার পর সেচ দিতে হয়। 
লিচুর ফল সংগ্রহের সময় সাধারণত কিছুটা শাখাসহ ভাঙা হয়। কারণ লিচুর ফুল ফোটা অনেকাংশই নির্ভর করে নতুন শাখা প্রশাখার উপর। তবে চায়না-৩ জাতের বেলায় বেশি শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই না করাই ভালো। কারণ এ জাতটির নতুন শাখা-প্রশাখায় আমাদের দেশের আবহাওয়ায় খুব বেশি ফুল ফল ধরে না। এজন্য দুর্বল, মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করা ছাড়া চায়না-৩ জাতের লিচু সংগ্রহের সময় যতটা সম্ভব কম শাখা-প্রশাখা ভাঙ্গা বা ছাঁটাই করা উচিত।  
লেবুর কলম বা চারা  রোপণের পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত ২-৩ মাস পর পর শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে পাতলা করে দিতে হয়। ফল সংগ্রহ করার পর ফলন্ত শাখা প্রশাখাগুলো ছাঁটাই করে দিলে নতুন গজানো শাখায় পরের মৌসুমে বেশি ফলন পাওয়া যায়। এছাড়া ২-৩ সপ্তাহ পর পর গাছের গোড়ার কুশি এবং গাছের দুর্বল, শুকনো বা মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত শাখা-প্রশাখা অবশ্যই ছাঁটাই করতে হয়।
নারিকেল গাছের উপরের দিকে পুষ্পমঞ্জরীর সাথে যে জালের মতো বাদামি অংশ থাকে, সেগুলো ফল থাকা অবস্থায় পরিষ্কার না করাই ভালো, শুধুমাত্র রোগ-পোকার আক্রমণ হলেই পরিষ্কার করতে হয়। নারিকেল গাছের সবুজ পাতা এবং পুষ্পমঞ্জরির জাল কখনোই কেটে ফেলা উচিত নয়। গাছে যদি ফল সংখ্যা বেশি হয়, তাহলে চার মাস বয়সের কিছু কচি ডাব পাতলাকরণ পদ্ধতিতে ছাঁটাই করে দিতে হয়। এতে বাকি ফলগুলো ভালোভাবে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। বর্ষার আগে বা পরে গাছ পরিষ্কার করতে হয়।
প্রাকৃতিকভাবেই পেয়ারা গাছ ঝোপালো হয়। এজন্য মূল কা- ছাড়া গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া শাখা কেটে দিতে হয়। ফল সংগ্রহের পর শাখা-প্রশাখার আগা ছাঁটাই করতে হয়। গাছের অন্য শাখা-প্রশাখাও এমনভাব ছাঁটাই করতে হয় যেন দুপুর বেলা গাছের নিচে কিছু আলো কিছু ছায়া পড়ে। 
কুল গাছ ছাঁটাই করতে হয় ফল সংগহ করার পরপরই। কুল গাছ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে পরবর্তীতে নতুন শাখায় গজানো কুলের আকারে বড় হয় এবং গাছ রোগ ও পোকামাকড় মুক্ত থাকে। এছাড়া ছাঁটাই করা গাছ চারদিকে কম জায়গা জুড়ে থাকে। বেল, কদবেল, আতা ও শরীফা ফল সংগ্রহ করার পর গাছে হালকা ছাঁটাই দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ফলধরা শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগ এবং মরা, রোগাক্রান্ত ও শুকনো শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করতে হয়। 
ডালিম গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া কুশিগুলো নিয়মিতভাবে ছাঁটাই করতে হয়। এছাড়া দুর্বল, মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করতে হয়। রোগ ও পোকা আক্রান্ত ফলও ছাঁটাই করে ফেলে দিতে হয়। 
শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই ছাড়াও আরো এক ধরনের ছাঁটাই আছে। তা হলো, অতিরিক্ত ফল ছাঁটাই। পেঁপে, পেয়ারা, আম, কাঁঠাল যখন এক বোঁটায় বা একই জায়গায় ঘন হয়ে ধরে, তখন সেগুলোর মধ্য থেকে ছোট, বিকৃত কিংবা রোগ ও পোকামাকড় আক্রান্ত ফলগুলো ছাঁটাই করে ফেলে দিতে হয়। এতে অন্য ফলগুলো আকারে বড় ও ভালোভাবে পুষ্ট হওয়ার সুযোগ পায়।
সবশেষে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, ফলগাছের অঙ্গ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে গাছ যেভাবে হালকা হয়ে যায়, তাতে করে ঝড় বাতাসে গাছ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাঁটাইয়ের পর ফলগাছের পরিচর্যা সহজ হওয়ায় রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এতে ফলগাছকে সুস্থ সবল রেখে বেশি পরিমাণে ফলন পাওয়াও সম্ভব হয়। 
 
লেখক : উদ্যান বিশেষজ্ঞ, সরেজমিন উইং (সংযুক্ত), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইলঃ ০১৮১৮৭১৯৪৫৩,           ই-মেইলঃ সবংনধযঁষ৬৫@মসধরষ.পড়স
বিস্তারিত
লাভজনক উপায়ে মাছ চাষ
লাভজনক উপায়ে মাছ চাষ
মোঃ তোফাজউদ্দীন আহমেদ
বিগত কয়েক দশকে দেশে চাষের অধীনে মাছের উৎপাদনে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দেশ মাছ চাষে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় উন্নীত হয়েছে। অধিক ঘনবসতির দেশ হওয়ায় দেশের বাজারে যেমন মাছের ক্রমবর্ধমান চাহিদা আছে তেমনি গ্রামীণ বেকার যুবকের আত্মকর্মসংস্থানের অন্যতম মাধ্যম পুকুরে মাছ চাষ। অনুকূল আবহাওয়া, মাছ চাষের সহজ প্রযুক্তি, উপকরণের প্রাচুর্যতা গ্রাম পর্যায়ে মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে প্রতিনিয়ত। অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে আগামী দিনে বাজারে মাছের চাহিদাও বৃদ্ধিপাবে এটাই স্বাভাবিক। উন্নত দেশের মাথাপিছু মাছ গ্রহণের হার আমাদের চেয়েও অনেক বেশি। আমাদের দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রাকৃতিক নানাবিধ কারণে মাছের উৎপাদন কমে আসছে এবং এর বিপরীতে দেশে বাৎসরিক মাথাপিছু মাছ গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি (২০১৪-১৫ সালে ১৫ কেজি, ২০১৯-২০ সালে ২৩ কেজিতে উন্নীত) পাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ের মাছ চাষিদের সাথে মতবিনিময়ে প্রাপ্ত তথ্য ও নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যমান অবস্থার মাঝে কী উপায়ে লাভজনকভাবে মাছ চাষ করা যায় সে বিষয়ে  আলোচনা করা হলো।
চাষ প্রযুক্তি নির্বাচন
লাভজনক মাছ চাষের জন্য সঠিক মাছ চাষ পদ্ধতি নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চাষিপর্যায়ে অনেক ধরনের মাছ চাষ প্রচলিত আছে। বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এখানে কয়েকটি লাভজনক মাছ চাষের পদ্ধতি উপস্থাপন করা হলোঃ
বড় আকারের পোনা মজুদ করে কার্প মিশ্রচাষ : সাধারণত ৫-৬ ইঞ্চি আকারের শতকে ৫০-৬০ কার্পজাতীয় মাছের পোনা মজুদ করে মাছ চাষের প্রচলন আছে। কিন্তু বর্তমান এর চেয়ে ভাল পদ্ধতি ৫০০ গ্রাম এর বড় পোনা কম ঘনত্বে (শতকে ১০-১২টি; যাতে ২টি হবে উপরের স্তরের মাছ, ৭টি মধ্যস্তরের রুই এবং নিচের স্তরের ১টি মৃগেল ও ১টি কার্পও এবং সর্বস্তরের ১টি গ্রাসকার্প) ছেড়ে অধিক বড় আকারের মাছ উৎপাদন। যত বড় আকারের পোনা মজুদ করা যাবে তত বেশি বড় আকারের দামি মাছ উৎপাদন করা যাবে। 
 তেলাপিয়ার সাথে কার্প মিশ্র চাষ : একক মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষে অনেকে শতকে ২০০-৩০০ পোনা মজুদ করে চাষ করে  থাকেন এটা এখন আর লাভজনক হচ্ছে না। তেলাপিয়া মজুদ কমিয়ে শতকে ১৫০টি (১০ গ্রাম আকারের পোনা) এবং তার সাথে বড় আকারের কাতল ২টি, রুই ৭টি পোনা মজুদ (২৫০-৪০০ গ্রাম ওজনের) করে ৩-৪ মাস চাষ করে যখন তেলাপিয়ার ৩-৪টিতে কেজি হবে তখন ১/৩ ভাগ তেলাপিয়া বিক্রয় করে দিয়ে আবার কয়েক মাস পরে যখন ২টিতে কেজি হবে তখন বাকি ২/৩ ভাগ হতে অর্ধেক তেলাপিয়া মাছ বিক্রয় করে দিতে হবে এবং পরিশেষে অবশিষ্ট তেলাপিয়া প্রত্যেকটি যখন ১ কেজি হবে তখন সম্পূর্ণ মাছ বিক্রয় করে অধিক লাভবান হওয়া যেতে পারে। 
শিং, পাবদা এবং গুলসার সাথে কার্প মিশ্রচাষ : শিং, পাবদা ও গুলশা একক চাষে শতকে ১০০০-১৫০০ পোনা মজুদ করে পুকুরে মাছ চাষ প্রচলন আছে । এ ক্ষেত্রে মূল প্রজাতির (ধরুন পাবদা) মাছ কিছুটা কম মজুদ করে (শতকে ৬০০-৭০০টি) সাথে ৩০০-৫০০টি শিং বা গুলসা এবং তার সাথে ১টি কাতল, ৩টি রুই ও ১টি মৃগেল এবং ১৫-২০টি তেলাপিয়া মজুদ করে চাষে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে। চাষের সময় ৬-৭ মাসে রুইজাতীয় মাছ ১.৫-২ কেজি হচ্ছে এবং তেলাপিয়া ১ কেজির উপরে বড় হচ্ছে। অনেকে বছরের শুরুতে ৩ মাসে একক কৈ মাছ চাষ করে একটি ফলন তুলে পুকুর পুনরায় প্রস্তুত করে এ পদ্ধতিতে চাষে যথেষ্ট লাভবান হচ্ছেন। 
পাংগাস মাছের সাথে অন্য প্রজাতির মাছের মিশ্রচাষ : শতকে ২০০-৩০০টি পোনা মজুদ করে একক পাংগাস চাষ এখন আর নাই বললেই চলে। অনেকেই পাংগাস চাষ সম্পূর্ণ ছেড়েও দিয়েছেন। আবার অনেকে সমস্যার মধ্যে থেকেও চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা একক চাষের পরিবর্তে পাংগাসের সংখ্যা শতকে ৭০-১২০টিতে নামিয়ে সাথে ৫০-১০০টি তেলাপিয়া এবং ৮-১২টি বড় আকারের রুইজাতীয় মাছের পোনা মজুদ করে চাষ করছেন এবং লাভবান হচ্ছেন। এখানে পাংগাস মাছকে লক্ষ করে গরম কালে ডুবন্ত বা ভাসমান এবং শীতে ভাসমান খাবার প্রয়োগ করে বছরে একটি ফসল চাষ করছেন। এক্ষেত্রে একক পাংগাস চাষের থেকে বিনিয়োগ কমে আসছে এবং মোট উৎপাদন কম হলেও চাষি লোকসানের হাত থেকে মুক্ত হয়ে লাভজনকভাবে মাছ চাষ করতে পারছেন। পাংগাস মাছ বিক্রয়ে বিনিয়োগ উঠছে এবং অন্য প্রজাতির মাছসমূহ বিক্রয়ের অর্থ সম্পূর্ণটা লাভ হচ্ছে।
কার্পজাতীয় মাছের সাথে অন্যান্য মাছের মিশ্রচাষ : প্রথমে কার্পজাতীয় মিশ্র চাষের সাথে শিং অথবা পাবদা অথবা গুলসা শতকে ৫০০-৭০০টি মজুদ করে সান্ধ্যকালীন এ মাছের জন্য নির্ধারিত পৃথক খাবার প্রয়োগ করেও সফলভাবে মাছ চাষ করা যেতে পারে। 
গলদা চিংড়ি ও কার্প মিশ্রচাষ : কার্প মাছের সাথী ফসল হিসাবে গলদা চিংড়ি চাষ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কার্পজাতীয় মাছ মজুদের আগে শতক প্রতি ৭০-১০০টি হারে গলদা চিংড়ির পিএল ছেড়ে একমাস নার্সারিং করার পরে কার্পজাতীয় মাছ মজুদ করতে হবে। বাজারে এ মাছের ব্যাপক চাহিদার কারণে দাম পাওয়া যায় ভাল। 
মাছ চাষ সম্পর্কে সঠিক ধারণা গ্রহণ
মাছ চাষের একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা গ্রহণ করে চাষে নামতে হবে। শুরুতে স্বল্প পরিসরে মাছ চাষ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে বড় পরিসরে যেতে হবে। 
উপযুক্ত পুকুর নির্বাচন
যে প্রজাতির মাছ চাষ করা হবে তার জন্য উপযুক্ত পুকুর নির্বাচন করতে হবে। সব পুকুরে সব ধরনের মাছ চাষ করা যায় না। যেমন কৈ মাছ চাষের জন্য নিয়মিত পুকুরের পানি বের করে দেবার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত আলো বাতাস সমৃদ্ধ উন্মুক্ত জায়গাতে কার্পজাতীয় মাছসহ পাবদা, গুলসা, চিংড়ি চাষ করলে ভাল হবে। কিছুটা ছায়াযুক্ত জায়গা হলেও শিং, তেলাপিয়া বা শোল মাছ চাষ করা যায়। পুকুরে পানির গভীরতা সব সময়  ৬-৭ ফুট হতে হবে। কম গভীরতার পুকুরে মাছ চাষ হয় তবে রোগ-ব্যাধিসহ অন্যান্য সমস্যা বেশি দেখা দেয়। বেশি গভীর পুকুরে পাংগাস মাছ ভাল হলেও অন্যান্য মাছের ফলন ভাল হয় না।
মাছ চাষের সময় নির্বাচন
বছরের সব সময় বাজারে মাছের দাম একই রূপ থাকে না। এজন্য মাছ কখন চাষ শুরু করতে হবে কখন বিক্রয় করতে হবে সে বিষয়ে আগেই হিসাব করে মাছ চাষ করতে হবে। সাধারণত মার্চ মাসের দিকে মাছের দাম বাড়তে থাকে এবং আগস্ট পর্যন্ত দাম ভাল থাকে এসময় মাছ বিক্রয় করা যাবে এভাবে হিসাব করে মাছ চাষ করতে হবে 
পুকুরে মাছ চাষের ঘনত্ব
মাছ চাষে একেক প্রজাতির মাছ একেক ঘনত্বে মজুদ করতে হয়। তবে চাষের পুকুরে মাছের ঘনত্ব, মাছের উৎপাদন এবং প্রয়োগকৃত খাদ্যের খাদ্য রূপান্তর হারের (ঋঈজ) একটি সম্পর্ক আছে। মাছের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে মাছের মোট উৎপাদন বেশি করা সম্ভব কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত খাদ্যের রূপান্তর হার ভাল হয় না, ফলে মাছ চাষে লাভ কমে যেতে পারে। মাছ চাষে উপযুক্ত ঘনত্বের বেশি মাছ ছাড়লে পুকুরের পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ে এবং পরিবেশ ভাল রাখার জন্য নানা প্রকার ব্যবস্থাপনার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় এর ফলে চাষ ব্যবস্থাপনার খরচ বেড়ে যায়, মাছের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতেও পারে।  মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনা
মাছ চাষে মোট বিনিয়োগের ৭০% অধিক খাদ্য খরচ হয়। সে জন্য কোন খাদ্য প্রয়োগ করলে মাছ চাষে লাভ করা যাবে তা মাছের বাজার দর, মাছের প্রজাতি ও চাষ পদ্ধতি বিবেচনায় রেখে নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান সময়ে মাছের বাজার দর বিষয়টিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। বিদ্যমান অবস্থার মাঝে মাছ চাষিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মাছের খাদ্য নির্বাচন করতে হবে। 
মাছ চাষের পুকুরের পানি পরিবর্তন
আধুনিক মাছ চাষ সম্পূর্ণভাবে, পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। মাছ চাষের পুকুরে প্রতিদিন খাবার প্রয়োগ করতে হয়। মাছ পুকুরের পানিতেই পায়খানা করে। অবশিষ্ট খাবার এবং মাছের পায়খানার (ঊীপৎবঃধ) কারণে পুকুরের পানি সহজে ভারী হয়ে দূষিত হয়ে যায়। পানি পরিবর্তন করলে পুকুরের এ সমস্যাসহ অনেক সমস্যাই সহজে সমাধান করা যায়। মাছের যে কোন রোগ দেখা দিলে পানি পরিবর্তন সর্বোত্তম সমাধান। শীতের সময় পুকুরে পানি দিতে পারলে মাছ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং খাবার গ্রহণ হার বৃদ্ধি পায়। পুকুরের পানির অক্সিজেন মাত্রা বাড়াবার সহজ উপায় পুকুরে পানি সরবরাহ। তবে সরবরাহকৃত পানি অবশ্যই আয়রন মুক্ত হতে হবে।
 মাছ চাষের পুকুরে এ্যারেটর স্থাপন   
মাছ চাষের পুকুরে এ্যারেটর সংযোজন করতে পারলে নিরাপদ মাছ চাষে কয়েকধাপ এগিয়ে যাওয়া যায়। মাছ চাষের পুকুরে দ্রবণীয় অক্সিজেনের অভাব একটি সাধারণ সমস্যা। যান্ত্রিক এ্যারেটর এ সমস্যা দূর করা ছাড়াও পুকুরের সাধারণ অক্সিজেনের মাত্রা (৫ পিপিএম) বাড়িয়ে দেয় ফলে মাছের খাদ্য গ্রহণ হারসহ খাদ্যের হজম হার বৃদ্ধি পায়। মাছের শরীরে খাদ্যের আত্ত্বীকরণ (অংংরসরষধঃরড়হ) বৃদ্ধি পায় ফলে সার্বিকভাবে খাদ্যের ঋঈজ এর মান ভাল হয়। ফলে কম খাবারে মাছের অধিক উৎপাদন পাওয়া যায়।
নিয়মিত প্রবায়োটিক্স ব্যবহার
বর্তমান মাছ চাষে প্রবায়োটিক্সের ব্যবহার মাছের পুকুরের পরিবেশ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রবায়োটিক্স হচ্ছে পুকুরে উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার পরিমাণ বৃদ্ধির উপকরণ। মাছ চাষের পুকুরের তলদেশে প্রতিনিয়ত জৈব পচনশীল দ্রব্য জমতে থাকে। এই জৈব পদার্থ পুকুরের তলদেশে পচে ক্ষতিকর গ্যাসের সৃষ্টি হয় এবং পুকুরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হতে পারে। প্রবায়োটিক্স প্রয়োগের ফলে পুকুরে উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার পর্যাপ্ত সৃষ্টি হওয়ার কারণে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া উৎপাদন প্রতিহত হয়। পুকুরের পরিবেশ উন্নয়ন এবং মাছ চাষকে নিরাপদ রাখার জন্য বাজারে প্রাপ্ত যে কোন প্রবায়োটিক্স ২০-২৫ দিন পরপর প্রয়োগ করতে হবে। প্রবায়োটিক্স বাজারে দুই ধরনের আছে, কিছু আছে ব্যবহারের আগে চিনির পানিতে ২৪ ঘণ্টা প্রতিপালন করে ব্যবহার করতে হয়। আর কিছু আছে  পুকুরে সরাসরি প্রয়োগ করতে হয়। প্রবায়োটিক্স প্রয়োগের পর পুকুরে কোন প্রকার ব্যাক্টেরিয়া নাশক (ঝধহরঃরুবৎ) প্রয়োগ করা যাবে না।
বর্তমান সময়ে একটু চিন্তাভাবনা করে মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে চাষের প্রযুক্তি নির্ধারণ করে একনিষ্ঠভাবে ধৈর্যসহকারে এগিয়ে গেলে যে কেউ মাছ চাষে সফলতা লাভ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। 
 
লেখক : বিভাগীয় উপপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, রাজশাহী বিভাগ, রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭৫১৯৩৯৯৩২, ই-মেইল : ঃড়ভধু২০১০@মসধরষ.পড়স
বিস্তারিত
বাণিজ্যিকভাবে পনির উৎপাদন পদ্ধতি
বাণিজ্যিকভাবে পনির উৎপাদন পদ্ধতি
ডা: মনোজিৎ কুমার সরকার
পনির হলো দুধ থেকে উৎপাদিত দুগ্ধ আমিষ জাতীয় খাদ্য। ইহা আমিষের উত্তম উৎস। যা শিশু, কিশোর ও বয়োবৃদ্ধদের আমিষের পুষ্টি চাহিদা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মিটিয়ে থাকে। দৈনিক সামান্য পরিমাণে পনির খেয়ে আমিষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ ছাড়াও পনিরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন রয়েছে। পনির দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে অন্যতম পণ্য যা রেনিন নামক এনজাইম যোগ করে দুধ জমাট বাঁধিয়ে তৈরি করা হয়। আমাদের দেশে অষ্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঠাকুরগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে পনির তৈরি হয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে দিন দিন পনিরের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনও শুরু হয়েছে। পনিরের প্রকারভেদ আছে। তবে এদের স্বাদের খুব একটা পার্থক্য নেই। ইউরোপ, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন, আমেরিকা ও ভারতে পনিরের ব্যবহার ব্যাপক। পনির পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। গবেষকরা নিয়মিত খাদ্য তালিকায় পনির রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। খেতে সুস্বাদু হওয়ায় প্রায় সবাই পনির পছন্দ করেন।
পনিরের উপকারিতা : শরীর সুস্থ সবল রাখতে সাহায্য করে; হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে এবং হাড়ের ক্ষয়রোধ করে; দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং দাঁতের ক্ষয়রোধ করে; বাড়তি ওজন কমাতে সাহায্য করে; উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে; ত্বকের লাবণ্য দিপ্তি দীর্ঘদিন বজায় রাখে; নিয়মিত সেবনে (লিনোলিক ও স্পাইনগো লিপিডম) ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়; পনিরে কার্বহাইড্রেটের পরিমাণ কম থাকায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে; পনিরে বিদ্যমান বিভিন্ন ভিটামিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তবে বেশি লবণাক্ত পনির শরীরের জন্য ভালো না কারণ লবণ রক্তচাপ বাড়ায়। এ ছাড়া স্যাচুরেটেড ফ্যাটে পূর্ণ বলে বাড়াতে পারে হৃদরোগের ঝুঁকি।
পনির তৈরির উপকরণ : গরু, মহিষ বা ছাগল, ভেড়ার দুধ; জবহহবঃ অথবা মাওয়ার পানি; অ্যালুমিনিয়াম পাত্র; ভ্যাট (পানি গরম করার আধুনিক পাত্র) ও গ্যাসের চুলা; আকৃতি প্রদানের জন্য প্লাস্টিক ছাচ; প্যাকেটকরণ মেশিন; সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ এবং লবণ ইত্যাদি।
প্রস্তুত প্রণালী : পাতলা সাদা কাপড় দিয়ে দুধ ছেঁকে নিতে হবে এবং পাত্রের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী মেপে নিতে হবে। একটি বড় পাত্রে পানি নিয়ে ৪৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম করতে হবে এবং অন্য আরেকটি ছোট পাত্রে দুধ মেপে নিয়ে উক্ত গরম পানিতে রেখে দুধের তাপমাত্রাও ৪৫০ ডিগ্রি গরম করতে হবে। দুধের তাপমাত্রা ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে। পানি ও দুধের তাপমাত্রা ৪৫০ ডিগ্রি হলে দুধে মাত্রামতো জবহহবঃ আস্তে আস্তে মিশাতে হবে। ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যে ছানা হয়ে যাবে এবং জল আলাদা হয়ে যাবে। আবার তাপমাত্রা বাড়িয়ে (চুলা জ্বালিয়ে) ৫৫০ ডিগ্রি করতে হবে এবং চুলা বন্ধ করে দিতে হবে। ২ ঘণ্টা পরে পনির আঠালো চুইংগামের মতো হবে। পাতলা সাদা সুতির কাপড় দিয়ে পনির ছেঁকে পুঁটলি বানিয়ে চাপ দিয়ে রাখতে হবে, ৪-৫ ঘণ্টা পরে সব পানি বের হয়ে যাবে। ট্রেতে করে ফ্রিজে রাখতে হবে পরের দিন। জীবাণুমুক্ত করার জন্য লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। সুবিধাজনক আকার ও পরিমাণ তৈরি করতে ছাঁচ (প্লাস্টিকের) ব্যবহার করতে হবে। শক্ত করে ছাঁচে ভর্তি করতে হবে। শক্ত আকৃতি পাওয়ার পর ফুড গ্রেড পলিথিনে বায়ুরোধক প্যাক তৈরি করতে হবে। তবে ঈযববংব ঢ়ধঢ়বৎ অথবা ডধী অথবা চধৎপযসবহঃ ঢ়ধঢ়বৎ দিয়ে মোড়ানোই উত্তম। শেষে, প্রতিষ্ঠানের নাম, ইঝঞও এর রেজি: নং, উৎপাদনের ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ যুক্ত স্টিকার লাগিয়ে বাজারজাত করতে হবে।
পনির সংরক্ষণ : স্বাভাবিক তাপমাত্রায় শীতকালে ২০ দিন গ্রীষ্মকালে ১০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ২-৪ মাস এবং শক্ত পনির ৬-৯ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। পনির ড্রিপ ফ্রিজে রাখা যাবে না। দুধ একটি আদর্শ পানীয় কিন্তু অল্প সময়েই (৬-৭ ঘণ্টা) নষ্ট হয়ে যায়, সেখানে পনির অনেক দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তাছাড়া জায়গা কম লাগে, পরিবহন করাও সহজ। পনির তৈরিতে অল্প মূলধন লাগে। খুব সহজেই একজন বেকার যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে এ কাজ করে সংসার আয় বাড়াতে পারেন। দেশের যে সব স্থানে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিলিংপ্ল্যান্ট নেই বা দই মিষ্টির কারখানা নেই সেখানে পনির উৎপাদনের মাধ্যমে দুধকে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব। অনেক ভোক্তাই পনির কোনোদিন চোখে দেখেনি, স্বাদ কেমন? কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা জানে না, তাই পনিরের উপকারিতা ও ব্যবহার বিধি বিষয়ে অবগত করানো আমাদের দায়িত্ব। এ জাতীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
আয় ব্যয়ের হিসাব  
১. দুধ ২০০ লি. ী ৫০ = ১০,০০০/-
২. জবহহবঃ +জ্বালানি+শ্রমিক =  ১,০০০/-
                  ব্যয় = ১১,০০০/-
২০০ লি. দুধ থেকে উৎপাদিত পনির = ২৫ কেজি ী ৬৫০/- = ১৬,২৫০/-
মূনাফা = ৫,২৫০/-
পরিশেষে উৎপাদিত পনির বিপণনের জন্য বিভিন্ন বেকারি শপ, দই-মিষ্টির দোকান, মেগাশপ ও বিভিন্ন ফাস্ট ফুডের কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করতে হবে। ফেসবুক, অনলাইন, বেতার, টিভি ও বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব।
 
লেখক : ভেটেরিনারি অফিসার, জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ঝিনাইদহ, মোবাইল : ০১৭১৫২৭১০২৬; ই-মেইল : ফৎসড়হড়লরঃ৬৬@মসধরষ.পড়স
বিস্তারিত
ফল উৎপাদনে বিপুল অগ্রগতি ও সম্ভাবনা

ফল উৎপাদনে বিপুল অগ্রগতি ও সম্ভাবনা
ড. জাহাঙ্গীর আলম
পঞ্জিকান্তÍরে জ্যৈষ্ঠ মাস মধুমাস। বিভিন্ন রসালো ফলের প্রচুর জোগান শুরু হয় জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু থেকে। এখন নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও ফলের অঢেল সরবরাহ থাকে বাজারে। তাই মধুমাস এখন সম্প্রসারিত। বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। এর ৫০ শতাংশই উৎপাদিত হয় জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাসের মধ্যে। বাকি ৫০ শতাংশ উৎপাদিত হয় অবশিষ্ট ৯ মাসে। ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। গত ১২ বছরে এ দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার গড়ে ১০ শতাংশের উপরে ছিল। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। তাতে হ্রাস পেয়েছে আমাদের পুষ্টিহীনতা। তবু ঘাটতি আছে ফলের। এ দেশে মোট ৭২ জাতের ফল সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয়। এর মধ্যে ৯টি প্রধান এবং ৩৬টি অপ্রধান। প্রধান ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে- আম, কলা, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, পেয়ারা, নারিকেল, কুল ও লিচু। এগুলো প্রায় শতকরা ৭৯ ভাগ জমি দখল করে রয়েছে। অবশিষ্ট শতকরা ২১ ভাগ জমিতে হয় অপ্রধান ফলগুলোর চাষ। অপ্রধান ফলগুলোর মধ্যে যেগুলো সচরাচর দৃশ্যমান সেগুলোর মধ্যে আছে- সফেদা, কামরাঙা, লটকন, আমড়া, বাতাবিলেবু, কদবেল, আমলকী, বাঙ্গি, তরমুজ ইত্যাদি। বাকি ফলগুলো খুবই কম চাষ হয়, যেগুলো আমরা অনেকে চিনি, আবার অনেকেই চিনি না। এগুলোর মধ্যে আছে- অরবরই, গাব, বিলেতি গাব, আতা, শরিফা, কাউফল, তৈকর, চালতা, ডুমুর, পানিফল, মাখনা, বকুল, লুকলুকি, ডেউয়া, করমচা, কাঠবাদাম, গোলাপজাম, তুঁত, মনফল ইত্যাদি। ইদানীং কিছু নতুন ফলের আবাদও হচ্ছে। এদের মধ্যে আছে রাম্বুটান, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল ও অ্যাভোকেডো। কিছুদিন আগেও প্রতি কেজি ড্রাগন ফলের দাম ছিল ৬০০ টাকা। এখন ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে ভ্যানে করে এই ফল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি। সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে স্ট্রবেরিও। এটি আমাদের গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি জোরদার করার জন্যই সম্ভব হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে বিদেশি ফল আমদানির পরিমাণ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। মানুষ আপেল ও আঙ্গুর কেনার পরিমাণ কমিয়ে স্থানীয় পেয়ারা ও বরই বেশি করে কিনে নিচ্ছে। ভোক্তারা মনে করেন, দেশি ফল কেমিক্যাল ও প্রিজার্ভেটিভমুক্ত।
বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রধান ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আম। ১৫ মে থেকে শুরু হয় আম পাড়া। প্রথমে গুটি, হিমসাগর, গোপালভোগ, মিশিভোগ, ল্যাংড়া ইত্যাদি আগাম জাতের আমগুলো পেড়ে নেয়া হয়। তারপর আসে হাঁড়িভাঙা ও আ¤্রপালি। তারপর ফজলি আম। বারি আম-৪ ও আশ্বিনি আসে আরও কিছুদিন পর। খিরসাপাত আম বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। এই আম শ্বাস ও আশবিহীন, রসালো। গন্ধে বেশ আকর্ষণীয় এবং স্বাদে মিষ্টি। হাঁড়িভাঙা আমও অত্যন্ত সুস্বাদু ও আঁশবিহীন। আগে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরেই ভালো জাত ও মানের আম হতো বেশি। এখন নতুন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটায় সারাদেশেই ভালো জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে। সাতক্ষীরা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় উন্নত জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে প্রচুর। বিদেশেও তা রফতানি হচ্ছে। বাংলাদেশে আমের উৎপাদন প্রায় ২৫ লাখ টন। এরপর আছে কলা। মোট উৎপাদন প্রায় ১৯ লাখ টন। পেঁপে, পেয়ারা ও আনারসে উৎপাদন যথাক্রমে ১০ লাখ, ৫ লাখ ও ৪ লাখ টন। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে আমরা দ্বিতীয় এবং আম উৎপাদনে সপ্তম স্থানে অবস্থান করছি। স্বাদে ও জনপ্রিয়তায় আমাদের দেশে লিচুর অবস্থানও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মোট উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন। আম ও লিচুর পর বাজারে আসে কাঁঠাল। এটি আমাদের জাতীয় ফল। মোট উৎপাদন পায় ১৮ লাখ টন। পেঁপে, কলা ও আনারস সারা বছরই উৎপাদিত হয় আমাদের দেশে। মধু মাসে এদের সরবরাহ বেশি থাকে। এ সময় লটকন, তরমুজ ও বাঙ্গির সরবরাহও কম নয়। সবকিছু মিলে বিভিন্ন ফলে ভরা থাকে মধু মাস। এগুলো খুবই পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এ সময়ের উষ্ণ পরিবেশে মানুষকে পরম শান্তি দান করে বিভিন্ন রসালো ফল।
ফলের উৎপাদন কৃষক পর্যায়ে বেশ লাভজনক। বাংলাদেশে ফলের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন অন্যান্য প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদনের চেয়ে বেশি। নিট আয়ও বেশি। বর্তমানে এ দেশে ধান ও গমের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন গড়ে ২.৫ থেকে ৩.৫ মেট্রিক টন। সে ক্ষেত্রে কলার উৎপাদন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৬ মেট্রিক টন। আমের উৎপাদন ৫ মেট্রিক টন। এ দুইটি ফলের নিট আয়ের পরিমাণও ধান উৎপাদনের তুলনায় যথাক্রমে ৩.৬ ও ২.৮ গুণ বেশি। কাঁঠালের ক্ষেত্রে তা ৩.২ গুণ বেশি। আমের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি প্রায় ২৫ টাকা। খামার প্রান্তে প্রতি কেজির মূল্য দাঁড়ায় ৪০ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে এর দাম শুরুতে থাকে ১০০ টাকা বেশি। ভরা মৌসুমে তা নেমে আসে ৫০ টাকায়। জাতভেদে মূল্যের পার্থক্য থাকে বিস্তর। গড়ে তা দাঁড়ায় প্রতি কেজি ৬০ টাকা। অপরদিকে ভরা উৎপাদন মৌসুমে বোম্বাই, মাদরাজি, বেদানা ও চায়না জাতের ভালোমানের ১০০ লিচুর দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা থাকে খামার প্রান্তে। ঢাকার বাজারে তা বিক্রি হয় ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায়। মৌসুমি ফল পাকা ও পাড়ার সাথে সাথেই বাজারজাত করতে হয়। এর মধ্যে আম, আনারস, লিচু ও কাঁঠাল বাজারজাত করতে হয় জরুরি ভিত্তিতে। নতুবা পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। সাধারণত মৌসুমি ফল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অপচয় হয়। বাজারজাতকরণের অনিশ্চয়তায় তা ৪০-৪৫ শতাংশে বৃদ্ধি পায়। তখন কৃষকের লোকসান হয় বিস্তর। এমন সংকটকালে ফল বিপণনে সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে।
ফলের বিপণন পার্থক্য বেশি। এর কারণ পচনশীলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এর পরিমাণ বেড়ে যায়। তাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়, ভোক্তাদের দিতে হয় অনেক বেশি দাম। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তি বিপণন খাতের পাশাপাশি সরকারের কৃষি বিপণন বিভাগ, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন এলাকার খামারপ্রাপ্ত থেকে আম, কাঁঠাল ও আনারস কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে তা বাজারজাত করা যেতে পারে। গরিব মানুষের ত্রাণ হিসেবেও আম-কাঁঠাল বিতরণ করা যেতে পারে। তা ছাড়া, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ও পার্বত্য জেলাসমূহ থেকে আম, কাঁঠাল ও আনারস পরিবহনের জন্য বিআরটিসির উদ্যোগে ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। গত বছর  আম পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেন সার্ভিস চালু করেছিল রেলওয়ে বিভাগ। কিন্তু ব্যবস্থাপনার সমস্যার কারণে তা সুখকর হয়নি। অনলাইনেও আমসহ অন্যান্য ফল বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু কুরিয়ার সার্ভিসের গাফিলতির জন্য তা সুনাম হারিয়েছে। তাই ব্যক্তি পর্যায়ে সড়কপথে ফল পরিবহনকে নির্বিঘœ ও সুলভ করা উচিত। তদুপরি আম ও অন্যান্য মৌসুমি ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে ও সংরক্ষণে নিয়োজিত বৃহৎ কোম্পানিগুলো ভরা মৌসুমে তাদের ক্রয় বাড়িয়ে স্থানীয় ফলের দরপতন ও অপচয় থেকে    কৃষকদের রক্ষা করা উচিত। তাছাড়া দেশের ফলচাষিদের সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ ও কৃষি ভর্তুকির আওতাভুক্ত করা উচিত।
ভরা মৌসুমে ফলের দরপতন ঠেকানোর একটি অন্যতম পথ হচ্ছে রফতানি বাড়ানো। বর্তমানে ফল রফতানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে বাংলাদেশ। বছরের পর বছর এ আয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের মৌসুমি ফল এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য, জার্মান, ইতালি, ফ্রান্স, সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান এবং অন্যান্য  দেশে রফতানি হচ্ছে। রফতানিকৃত ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, জড়ালেবু, এলাচি লেবু, কুল, সাতকরা, আমড়া, সুপারি, জলপাই, পেয়ারা ও কলা। দিনের পর দিন এগুলোর চাহিদা বাড়ছে বিদেশে। আগামী দিনে চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি ফল রফতানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। গত ৬ বছর যাবত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমাদের আম রফতানি হচ্ছে। রাজশাহী ও সাতক্ষীরার চাষিরা অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে উত্তম কৃষি চর্চা কার্যক্রম অনুসরণ করে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করছেন। বিদেশে এর কদর বৃদ্ধির জন্য আমাদের বিদেশি মিশনগুলো কাজ করতে পারে।
এখন একটি বিশেষ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে আম কূটনীতি। গত বছর বাংলাদেশের আম উপহার হিসেবে গেছে ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। এই উদ্যোগটি নিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রতিবেশী ও বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর রাজ্য ও সরকার প্রধানদের আম উপহার পাঠিয়ে আমাদের আনন্দ ও হৃদয়ের উষ্ণতাকে ভাগ করে নিয়েছেন তিনি। তার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এবারও এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আশা করি। 

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ; সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মোবাইল : ০১৭১৪২০৪৯১০, ই-মেইল : ধষধসল৫২@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
কৃষিপণ্য রপ্তানি : সম্ভাবনা, সমস্যা ও উত্তরণের উপায়

কৃষিপণ্য রপ্তানি : সম্ভাবনা, সমস্যা ও উত্তরণের উপায়
কাজী আবুল কালাম
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতিতে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ১৩% এবং কৃষি খাতে প্রায় ৪১% শ্রমশক্তি নিয়োজিত আছেন। ফলে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পেলেও কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের শ্রমে কৃষিতে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছেন। কৃষকগণ আবাদযোগ্য জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি,    কৃষি খাতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা এবং কৃষিমন্ত্রী মহোদয়ের সার্বিক দিকনির্দেশনায় কৃষি বর্তমানে একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এ কারণেই কৃষকগণ প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে শাকসবজি এবং ফলমূলের আবাদ করছেন। ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন শাকসবজি ও ফলমূল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানি কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করছে। 
কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি হলেও এর পরিমাণ ও আর্থিক মূল্যমান মোট রপ্তানির উল্লেখযোগ্য নয়, যদিও ক্রমান্বয়ে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন নতুন পণ্য যুক্ত হচ্ছে এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যও রপ্তানির তালিকায় অধিকহারে যুক্ত হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ বিলিয়ন ডলার কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে। সারনি-১ হতে দেখা যায় যে, কৃষিপণ্য বিভিন্ন বছরে ধারবাহিকভাবে রপ্তানি হয়েছে এবং রপ্তানির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। আশা করা যায় সকলের প্রচেষ্টায় কৃষিপণ্য রপ্তানির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শাকসবজি এগিয়ে আছে। তবে ফলমূলও রপ্তানির ক্ষেত্রে আগামী দিনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে।  
বাংলাদেশ হতে নানাবিধ কৃষিপণ্যসমূহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এরমধ্যে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চা পাতা, আম, কাঁঠাল, লেবু, লিচু, লটকন, আমড়া, পেয়ারা, শুকনা বরই, হিমায়িত সবজি আলু, কচু, পটোল, মুখীকচু, লাউ, পেঁপে, শিম, করলা, কাকরুল, চিচিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, গুড়া মসলা, কালিজিরা, হলুদের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া, শুকনা মরিচ, বিরিয়ানী
মসলা, কারি মসলা, ড্রিংকস, বিস্কুট, চানাচুর, সেমাই, পটেটো ফ্লেকস, নুডলস, ড্রাই কেক, মুড়ি, চিড়া, ফুড স্টাফ প্রভৃতি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
বাংলাদেশ হতে যে সকল দেশে শাকসবজি রপ্তানি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো- সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, সিঙ্গাপুর,  শ্রীলংকা ও নেপাল এবং যে সকল দেশে ফল রপ্তানি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো- কাতার, ভারত, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কুয়েত, সৌদি আরব ও অস্ট্রেলিয়া। 
পৃথিবীর অন্যান্য দেশও শাকসবজি এবং ফলমূল বিদেশে রপ্তানি করে। অন্যান্য দেশের রপ্তানির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ এখনও কৃষিপণ্য রপ্তানির বাজারে উল্লেখযোগ্য দেশ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেনি। সারণি-২   থেকে এ বিষয়ে ধারণা লাভ করা যেতে পারে। 
কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনার পাশাপাশি অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পণ্য রপ্তানির নিমিত্ত বিমানে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় স্পেস না পাওয়া। এছাড়াও বিভিন্ন পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় টেস্ট করার নিমিত্ত পরীক্ষাগারের অভাব, বিমানবন্দরে হিমাগারের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকা, বিভিন্ন কৃষিপণ্যের কাক্সিক্ষত জাতের অভাব, ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট প্রাপ্তি সহজীকরণ ইত্যাদি। এর পাশাপাশি এঅচ, এঐচ এবং  এগচ কার্যক্রম শুরু করা, আমদানিকারক দেশসমূহের বিভিন্ন পণ্য বিষয়ে কি কি চাহিদা রয়েছে সে বিষয়ে তথ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণসহ নতুন নতুন বাজার অন্বেষণ করা আবশ্যক। 
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিদেশে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানি এবং আলু রপ্তানির নিমিত্ত রোডম্যাপ প্রস্তুত করার জন্য ২টি কমিটি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে উভয় কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করেছে। উভয় কমিটি কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করেছে। এক্ষেত্রে গুণগত মানসম্পন্ন ও নিরাপদ সবজি ফল উৎপাদন, শ্যামপুরস্থ প্যাক হাউজের কার্যকর ব্যবহার, বিমানে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে স্পেস বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যর জন্য বিমান বন্দরে পৃথক গেট ও স্ক্যানার মেশিন স্থাপন করা, বিমানবন্দরে ইঅউঈ-এর ক্লোড  বেটারেজের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, বিমান ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, কৃষিপণ্য পরিবহনের সুবিধা বৃদ্ধি, পণ্য রপ্তানির জন্য প্যাকেজিং এর মান বৃদ্ধি, আলুর উন্নত জাতের সরবরাহ বৃদ্ধি,  বিদেশস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা বৃদ্ধি, দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। 
উল্লেখ্য যে, সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য ২০% প্রণোদনা প্রদান করছে। কৃষি মন্ত্রণালয় হতে ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে পূর্বাচলে একটি আ্যক্রিডিয়েটেড ল্যাবরেটরি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করা যায় সরকারের বিভিন্নমুখী উদ্যোগ, কৃষকের প্রচেষ্টা, কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকগণের কার্যক্রম ও প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানিসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি নতুন দুয়ার খুলে যাবে। বাংলাদেশ অচিরেই কৃষিপণ্য রপ্তানি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও সক্ষম হবে। য় 
  
লেখক : পরিচালক (যুগ্ম সচিব), কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। মোবাইল : ০১৭২৭৫৩১১০০, ই-মেইল : ফরৎ.রপভ@ফধস.মড়া.নফ

বিস্তারিত
বাংলাদেশের কিছু বিলুপ্ত প্রায় ফলের চাষ

বাংলাদেশের কিছু বিলুপ্ত প্রায় ফলের চাষ
১ড. এম. এ. রহিম, ২রেহানা সুলতানা, ৩মোঃ মনিরুজ্জামান
বিশ্ব বর্তমানে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য উৎপাদনের জন্য কয়েকটি উদ্ভিদ প্রজাতির উপর নির্ভরশীল। আমাদের প্রোটিন এবং ক্যালরির ৫০% এর বেশি আসে তিনটি উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে যেমন- চাল, গম এবং ভুট্টা। এটি অনুমান করা হয় যে বিশ্বে ১.৪ মিলিয়নেরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে আমরা বিশ্বব্যাপী মাত্র ১৫০ প্রজাতি ব্যবহার করি। সুষম পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতার কারণে খাদ্যাভ্যাসের বৈশ্বিক পরিবর্তন এবং আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তন যা ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে তা এরই মধ্যে স্পষ্ট। অতএব, উৎপাদন ও  ভোগের বহুমুখীকরণ অনিবার্য, যে কোনো দুর্যোগ ঘটার আগে পূর্ব পরিকল্পনা প্রয়োজন। 
উদ্ভিদ প্রজাতির একটি বিস্তৃত পরিসর অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উৎপাদন এবং ভোগের অভ্যাসের বৈচিত্র্যকরণ ঝুঁকিগুলো হ্রাস করতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখতে পারে, যা প্রায়ই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। এটি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, জীবিকা, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব উন্নত করতে পারে। উপরোক্ত সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে সম্ভাব্য কার্যক্রম হলো কম ব্যবহার করা বা তথাকথিত অব্যবহৃত ফসলের ব্যবহার। বিশেষ করে, এই ফসলগুলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (ঝউএঝ) অর্জনে অবদান রাখবে। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট প্রধানত ভিটামিন ও খনিজগুলোর ঘাটতি দ্বারা সৃষ্ট লুকানো ক্ষুধা মোকাবিলায় এবং ঔষধি এবং আয়বর্ধক বিকল্পগুলো সরবরাহ করার জন্য প্রচুর সম্ভাবনা সরবরাহ করে।
নি¤েœ বাংলাদেশের কিছু বিলুপ্ত প্রায় ফলের চাষাবাদ আলোচনা করা হলো।
বৈঁচি (ঋষধপড়ঁৎঃরধ রহফরপধ) : এটি আফ্রিকার বেশির ভাগ অঞ্চল এবং এশিয়ার গ্রীষ্মম-লীয় এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফুলের উদ্ভিদের একটি প্রজাতি। বাংলাদেশে এটি সাধারণত বৈঁচি নামে পরিচিত, যা একটি বড় ঝোপঝাড় বা ছোট গাছ এবং এটি ঋষধপড়ঁৎঃরধপবধব পরিবারের অন্তর্গত। ইংরেজিতে একে বলা হয় গভর্নর প্লাম। সবুজ চকচকে চামড়ার পাতা দিয়ে বৈঁচি উদ্ভিদ খুবই আকর্ষণীয়। বেশির ভাগ গাছে বড় ধারালো কাঁটা থাকে এবং তাই শ্রীলঙ্কায় একে ‘কাটুলোভি’ বলা হয়। তাজা খাওয়া হলে ফলগুলো চমৎকার এবং উচ্চমানের জ্যাম এবং জেলি প্রক্রিয়াকরণের জন্যও ব্যবহার করা যেতে পারে। সব উদ্ভিদের অংশের কিছু ঔষধি মূল্য আছে । এর ফলপ্রসূতা এবং বৃদ্ধির অভ্যাসের কারণে এটি একটি দ্বৈত উদ্দেশ্য-উদ্ভিদ, একটি হেজ হিসেবে এবং ফলের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। যাই হোক, এটি বাংলাদেশে একটি অব্যবহৃত ফলের ফসল।             
চাষাবাদ পদ্ধতি : বীজ অথবা অঙ্গজ প্রজননের উৎপন্ন চারা সাথে ৫ মিদ্ধ৫ মি. দূরে দূরে লাগানো হয়। গর্তের আকার ৬০ সেদ্ধ৬০ সেদ্ধ৬০ সে গর্তে ২০-২৫ কেজি পচা গোবর গর্তে ভর্তি করে রাখতে হবে। ৭-১৪ দিন পর গাছ লাগাতে হবে সাধারণত বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার হয়ে থাকে। এ ছাড়াও, কাটিং, গুটি কলম, বাডিং ইত্যাদির মাধ্যমে বংশবিস্তার ঘটে থাকে। 
ব্যবহার : বুড়া বাকল তাল তেলের সাথে মিশিয়ে থেকে বাতের ব্যথা ভালো হয়। ফিলিপাইনে ছাল বাকলের গুরুত্ব গারগল কাজে ব্যবহৃত হয়। শুকনা পাতার গুঁড়া ক্ষত সারাতে ব্যবহৃত হয়। অপরিপক্ব ফল ডাইরিয়া এবং আমাশায় উপশম কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকা লাল ফলফ্রেস ফল খাওয়া হয় এবং এ থেকে জ্যাম জেলি তৈরি হয়। প্রচলিত অনেক ঔষধি এই গাছ থেকে তৈরি হয়। 
চাপালিশ (অৎঃড়পধৎঢ়ঁৎ পযধঢ়ষধংযধ ঘ.) : এটা ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় বা আদি নিবাস মিয়ানমার এবং আন্দামান ও নিকোবার দীপপুঞ্জের আদি নিবাস ধরা হয়। এমন কি পূর্ব এশিয়ায় জন্মে এটা ১৬৫০ মি. উপরে ঢালেও জন্মে থাকে। একে চাপালাস, চাপালিশ, চাপলিশ বলে থাকে। এটা কমবেশী বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জন্মে থাকে। সাধারণত বীজ দিয়ে চাপালিশ বংশবিস্তার ঘটে, ফল থেকে বীজ আলাদা করার পরপরই বীজ রোপণ করা হয়। অন্যথায় সংরক্ষণকালে বীজের সজীবতা নষ্ট হয়ে যায়। 
চাষাবাদ পদ্ধতি : মে-আগস্ট মাসে রোপণের জন্য উত্তম সময় ভালো শস্যের জন্য পর্যাপ্ত সার দিতে হবে। ৮০ কেজি পচা গোবার প্রতি বছর সরবরাহ করতে হবে। নাইট্রোজেন ২৬০ গ্রাম, ফসফরাস ১৫০ গ্রাম ও পটাশ ১০০ গ্রাম হারে সার দিলে ফলন ভালো পাওয়া যায়। গরু-ছাগল থেকে রক্ষা করার জন্য বেড়া দিতে হবে। বাদামি উইভিল পোকা কচি ডগা ও কা- ছিদ্র করে। গ্রাব ও বয়স্ক পোকা সংগ্রহ করে পুরিয়ে ফেলতে হবে এবং সাইপারমেথ্রিন ২ মিলি /১ লি. পানিতে মিশ্রণ ফুল ফোটার সময় স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। 
ব্যবহার : টেবিল ফল হিসেবে চাপালিশ ব্যবহার হয়। এই গাছ থেকে ভালো কাঠ পাওয়া যায় এবং এর পাতা হাতির খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
দেওফল/ডেফল (এধৎপরহরধ ীধহঃযড়পযুসঁং) : এর একটি সাধারণ নাম ‘ডিমগাছ’ যা প্রস্তাব করে তার বিপরীতে, ডেফল ফল ডিমের আকৃতির হয়। ফল একটি বাঁকা বিন্দু প্রান্ত আছে, এতে ফলটিকে একটি উল্টানো টিয়ার-ড্রপের মতো দেখায়। ফলগুলো আপেলের মতো, সাবগ্লোবোজ আকৃতির, উপরের দিকে নির্দেশিত, ৩-৫ সেন্টিমিটার ব্যাস, পাকলে গভীর হলুদ; বীজ ১-৪, আয়তাকার। বাংলাদেশে এটি প্রধানত সিলেট অঞ্চলে জন্মে। ডেফল মূলত বীজ দ্বারা বংশবিস্তার করে। বীজ ২.০-২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ০.৭৫-১.২৫ সেমি. ব্যাস, কার্যকারিতা কম, কিন্তু ভালো নার্সারি ব্যবস্থাপনায় ৪-৬ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হতে পারে। এটি কলম, উদীয়মান বা লেয়ারিং দ্বারা বিস্তার করা যেতে পারে। 
চাষাবাদ : সাধারণত উর্বর মাটি, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ সেচ সুবিধা সংবলিত স্থান নির্বাচন করা উচিত। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং আগাছা বৃদ্ধি এড়াতে গাছের মালচিং খুবই উপকারী। ফল প্রদানকারী গাছে বছরে তিনবার সার প্রয়োগ করা হয়, যা ১. ফুল ফোটার আগে ২. ফল সেটের পরে এবং ৩.ফল সংগ্রহের পরে। প্রতিবার ০.২৫ কেজি নাইট্রোজেন/গাছ প্রয়োগ করা হয়। ফল চাষের পরে খামার সার (২০-২৫ কেজি/গাছ) এবং পি ২ ও ৫ ০.৫ কেজি/গাছ যোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ব্যবহার : ডেফল দেখতে অত্যন্ত লোভনীয় এবং প্রায়ই একটি রসালো সজ্জা রয়েছে। গার্সিনিয়া জ্যান্থোচাইমাসের ফলগুলো সংরক্ষণ এবং জ্যামে তৈরি করা হয় এবং ভিনেগার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। 
বুদ্ধের নারকেল (চঃবৎুমড়ঃধ ধষধঃধ) : ফলটি বাদামি রঙের বড়, গোলাকার এবং শক্ত অনেকটা নারকেলের মতো। বীজ দানাযুক্ত এবং অসংখ্য ফলের পাল্পের স্বাদ প্রায় নারকেলের মতো। এটি বাংলাদেশে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটের পাহাড়ি অরণ্যে পাওয়া যায়। বুদ্ধ নারকেল বীজ দ্বারা বংশবিস্তার করে, যা অঙ্কুরোদগমের জন্য ১-৩ মাস সময় লাগে। এটি ২৪-২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার আর্দ্রযুক্ত বালুকাময় এবং কাদাযুক্ত মাটিতে ভালো জন্মে। বৃক্ষটির ভালোভাবে বেড়ে উঠার জন্য পূর্ণ সূর্যের আলোর প্রয়োজন। 
পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার : স্থানীয় জনগোষ্ঠীরা বীজগুলো ভেজে খায় এবং বীজ থেকে তেল প্রস্তুত করে। এই তেল রান্নার জন্য ব্যবহার করা হয়। গবেষণাগারে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই বৃক্ষের পাতার নির্যাসগুলোতে উচ্চতর এন্টি-অক্সিডেন্ট আছে। বৃক্ষটির কাঠ শক্ত হওয়ায় তা দিয়ে আসবাবপত্র ও বিভিন্ন রকমের খেলনা বানানো হয়। 
শিমুল নাট/জংলি বাদাম (ঝঃবৎপঁষরধ ভড়বঃরফধ) : শিমুল নাট/জংলিবাদাম একটি নরম কাঠের গাছ যা ৩৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বন্য বাদাম/শিমুল নাটের আদিবাস পূর্ব আফ্রিকা। শিমুল নাট মূলত বীজ দ্বারা বংশবিস্তার করে। ভালো নার্সারি ব্যবস্থাপনায় ৪-৬ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ তৈরি করতে দীর্ঘ সময় নেয়। এটি কলম, উদীয়মান বা লেয়ারিং দ্বারা প্রচার করা যেতে পারে। কলম করার জন্য, এর জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ রুটস্টক প্রয়োজন।
চাষাবাদ : মাটির প্রকারের অবস্থান এবং উর্বরতার উপর নির্ভর করে রোপণ সাধারণত ৬ মি.দ্ধ ১০ মিটার হয়। সাধারণত উর্বর মাটি, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ সেচ সুবিধা সংবলিত স্থান নির্বাচন করা উচিত। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং আগাছা বৃদ্ধি এড়াতে গাছের মালচিং খুবই প্রয়োজন।
ঔষধিগুণ ও ব্যবহার : ইন্দোনেশিয়ার জাভাতে এই গাছের পাতা দিয়ে জ্বর, গনোরিয়া, জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীকে গোসল করানো হয়। এই গাছের বীজের তেল চুলকানি এবং অন্যান্য চর্মরোগে অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহৃত হয় এবং বীজ পেস্ট করে বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করা হয়। ঘানাতে বীজগুলো জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এই বৃক্ষের কাঠ আসবাবপত্র এবং বীজের তেল আলোকসজ্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই গাছের ছাল ম্যাট, ব্যাগ, কর্ডেজ এবং কাগজ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
খইবাবলা (চরঃযবপবষষড়নরঁস ফঁষপব) : আমাদের দেশে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। পৃথিবীর উন্নত অনেক দেশে ফলটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। গাছটি থ্যাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত ও বাংলাদেশে পাহাড়ি এবং নদী উপত্যকায় জন্মে। প্রধানত পাখির মাধ্যমে বীজ ছড়ায় এবং গাছ জন্মে। গাছটি খরাসহিঞ্চু এবং শুষ্ক মৌসুমেও বেঁচে থাকতে পারে। তবে গাছটির ভালো ফলনের জন্য মাটি থেকে ১৫০০ মিটার উচ্চতার প্রয়োজন। ফুলগুলো পড তৈরি করে, যা গোলাপি রঙে পরিবর্তিত হয় এবং পেকে গেলে বীজ বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য উন্মক্ত হয়। ফলগুলো উজ্জ্বল কালো রঙের বীজ ধারণ করে। 
ব্যবহার : ফলটি প্রধানত খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে থাইল্যান্ডে এটি রান্না করেও খায়। গাছটি কাঁটাযুক্ত হওয়ায় আমাদের দেশে ক্ষেতের বেড়া হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। গাছটির কাঠ দিয়ে ছোটখাটো আসবাবপত্র এবং খেলনা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। গাছটি অরনামেন্টাল ট্রি হিসেবে বাড়ির আঙিনায় লাগানো হয়। এটি ডায়রিয়া, এ্যাকজিমা, টনসিল, চর্মরোগ ইত্যাদি রোগের প্রতিষোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও অনেক অ্যামাইনো এসিড যেমন- ভ্যালিন, হিস্টিডিন, আইসোলিউসিন, থ্রিওনিন, লাইসিন এবং লিউসিন দেখা যায়। 

লেখক : ১প্রফেসর, ২-৩পিএইচডি (ফেলো), উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭৭২১৮৮৮৩০, ই-মেইল : 

বিস্তারিত
কর্মসংস্থান তৈরি ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

কর্মসংস্থান তৈরি ও পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ড. মো: গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, মো: হাফিজুল হক খান
বাংলাদেশের কৃষির সফলতা এখন বিশ্বে রোল মডেল। একবিংশ শতাব্দীতে ফসলের নিবিড়তা কয়েকগুণ বৃদ্ধির মাধ্যমে অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করেছে যার পিছনে রয়েছে গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিরলস প্রচেষ্টা। জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায়        কৃষির বহুমুখী কর্মকা-ের ক্ষেত্রও অনেক বেড়েছে। অনেকেই হচ্ছে উদ্যোক্তা এবং স্বপ্ন দেখছে কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণে অবদান রাখতে। 
উৎপাদিত কৃষি পণ্যকে সরাসরি প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে যথাযথ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষিপণ্য বাণিজ্যিকীকরণে রয়েছে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কৃষিপণ্যকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। উন্নত দেশে সকল পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে এবং বিপণন নীতি, মানদ- ও সার্টিফিকেশন সহজীকরণ করা হয়েছে ফলে প্রক্রিয়াজাতকৃত            কৃষিপণ্য হয়েছে মানসম্মত ও রপ্তানিযোগ্য।     
ভরা মৌসুমে কৃষিপণ্যের দাম অল্প থাকায় প্রায়ই কৃষক ন্যায্যমূল্য হতে বঞ্চিত হয়ে থাকে। ফসলের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার অভাবে অপচয়ের পরিমাণও সেই সময় বাড়তে থাকে, যা খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। শরীরকে সুস্থ রাখতে বছরজুড়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য সবার জন্য নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যপণ্য এ ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করে। কৃষিপণ্যকে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হলে তা একদিকে যেমন দেশের মানুষের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে অন্যদিকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। 
কৃষিপণ্য বাণিজ্যিকীকরণে সকল পর্যায়ের উদ্যোক্তার অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। ফসলের অপচয় কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রথমেই প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণে উৎসাহিত করা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন, উত্তম কৃষি চর্চা, স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা, উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিধিবিধান বা খাদ্য আইনবিষয়ক ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। নি¤েœ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজে ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি সরবরাহ : যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে গুণগতমানসম্পন্ন খাদ্য তৈরি করতে ড্রায়ার, স্লাইসার, রিফ্রাক্টোমিটার, জুস এক্সট্রাক্টর, সিলিং মেশিন, হাইড্রোকুলার, প্যাকেজিং মেশিন ইত্যাদি সরবরাহ করা গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ সহজেই শুকনো খাদ্যদ্রব্য যেমন- ফলমূল ও শাকসবজি শুকানো, আচার, চাটনি, জুস, জেলি, জ্যাম ইত্যাদি তৈরি করতে পারবে। ভরা মৌসুমে অনেক সময় একনাগাড়ে কয়েক দিন বৃষ্টি হলে সে সময় ড্রায়ার অপরিহার্য। এ ছাড়া রৌদ্রে শুকানোর সময় অনেক সময় পশু-পাখি, পোকামাকড়, ধুলা বালু খাদ্যদ্রব্যে পড়ার সম্ভাবনা থাকে এতে রোগ-জীবাণুর আক্রমণের ব্যাপক আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। হ্যান্ড রিফ্রাক্টোমিটার ব্যবহার করে সঠিকভাবে ফলের জ্যাম, জেলি, টমেটো সস, ড্রাইড প্রডাক্ট তৈরি করা যায়।
কাঁচামাল সরবরাহ সহজলভ্য করা : স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা ভরা মৌসুমে ফলমূল ও শাকসবজি স্বল্পমূল্যে ক্রয় করে সারা বছর ব্যবহার করার জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে পারে কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য সংগ্রহ করতে না পারায় তা সম্ভব হয় না। ফলে উদ্যোক্তা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাসায়নিক সামগ্রী সহজলভ্য করা হলে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা হলে তারা অনায়াসে ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণ করে সারা বছর মানসম্মত খাদ্য তৈরি করতে পারবে এবং তা বিপণন করতেও সক্ষম হবে।
প্যাকেজিং প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করা : অল্প পুরুত্বের পলিপ্রোপাইলিন প্যাকেটে সাধারণত খাদ্যদ্রব্য প্যাকেটজাতকরণ কাজে ব্যবহার করা হয়, যা মানসম্মত নয়। কিন্তু ফুড গ্রেড প্যাকেট আমাদের দেশে সহজলভ্য নয় আবার তা ব্যয়বহুল। প্যাকেজিং উপকরণ আমদানিতে শুল্ক হ্রাস করা বা প্রয়োজনে শুল্ক প্রত্যাহার, প্যাকেজিং উপকরণ দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ, প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি স্থাপনে উৎসাহিত করা ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্যাকেট ও প্যাকেটজাত দ্রব্য সহজলভ্য এবং ব্যাপক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হলে স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তা উৎসাহী হবে এবং ভোক্তা নির্দ্বিধায় প্রক্রিয়াজাতকরণকৃত খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করতে আগ্রহী হবে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যসামগ্রী তৈরির কাজে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান : প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজে কাঁচামাল ক্রয় করতে অর্থের প্রয়োজন। সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে উদ্যোক্তাগণ কিস্তিতে সহজেই প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যসামগ্রী বিক্রয় করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। ফলে উদ্যোক্তাগণ ধীরে ধীরে তার ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করতে পারবে যা তাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করবে।
উদ্যোক্তাদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ প্রদান : স্থানীয়পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির প্রয়োগ, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তৈরি করা, খাদ্যদ্রব্য যথাযথ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণসহ অন্যান্য মানদ- বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করার মাধ্যমে অবহিত করা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান করা। প্রশিক্ষণ প্রদানে সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন-কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা, কৃষি বিপণন, বিসিক, বারটান, বিসিএসআইআর, বিএসটিআইসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাবৃন্দ সরাসরি যুক্ত থাকলে তা অধিক ফলপ্রসূ হবে এবং উদ্যোক্তাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। প্রশিক্ষণে বিশেষ করে নারীদের অধিকহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, প্রয়োজনে পুরো পরিবারকে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সংযোগ স্থাপন : স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যসামগ্রী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিপণন ও কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তঃসংযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তা নিশ্চয়তা পেলে ভরা মৌসুমে অধিক পরিমাণে বিভিন্ন ফলমূল ও শাকসবজি সহজেই সংরক্ষণ করতে পারবে এবং তা নিজ দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করবে।
পরিপুষ্ট ফলমূল পাকাতে রাইপেনিং চেম্বার স্থাপন : অনেক সময় কৃষক ও ব্যবসায়ীগণ অধিক লাভের আশায় মৌসুমের শুরুর আগে অপরিপুষ্ট ফল ও সবজি (আম, কলা, পেঁপে, টমেটো) পাকাতে বিভিন্ন পিজিআর (চষধহঃ এৎড়ঃিয জবমঁষধঃড়ৎং) হরমোন ব্যবহার করে থাকে। গবেষণা দেখা যায়, অধিক মাত্রায় ইথোপেন ব্যবহারের ফলে অপরিপুষ্ট ফলমূলের ২-৩ দিনের মধ্যে উপরিভাগের রঙের পরিবর্তন ঘটে থাকে। কিন্তু ফলমূল যথাযথ পাকে না বিধায় পুষ্টিমানের ব্যাপক তারতম্য ঘটে থাকে।  আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হচ্ছে পরিপুষ্ট ফলমূলে পরিমিত মাত্রার ইথিলিন গ্যাস প্রয়োগ করা যেখানে রাইপেনিং কক্ষের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পাকানোর সময় নির্ধারণ করা হয়। ফলে সমভাবে ফলমূল সহজে পাকানো যায় এবং দূরত্ব অনুযায়ী ফলমূল পাকানোর মাত্রার প্রয়োগ করা যায়।
প্যাকহাউজ ও কুলবুট স্থাপন : সতেজ ফলমূল ও শাকসবজি মাঠ হতে সংগ্রহ করার পর এর শ^সন প্রক্রিয়া দ্রুত চলতে থাকে ফলে গুণগতমানের অপচয় হয় এবং দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে সংগ্রহোত্তর পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করার জন্য প্যাকিং হাউজ সুবিধা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেখানে সর্টিং, গ্রেডিং, ওয়াশিং, প্যাকিং এবং প্যাকেজিং সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। খাদ্য প্রস্তুতকরণ কাজে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণকৃত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করার জন্য প্যাকিং হাউজ ব্যবহার অপরিহার্য। কুলবুট স্থাপনা মিনি কোল্ডস্টোরেজের ন্যায় কাজ করে। একটি নির্দিষ্ট রুমকে ইনসুলেটর দিয়ে আবৃত করে উক্ত রুমে এয়ারকন্ডিশনার সংযোগ ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিলে সতেজ ও প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্যকে দীর্ঘ সময় গুণগতমান অক্ষুণœ রেখে সংরক্ষণ করা যায়। অপরদিকে ফসলের অপচয় কমাতে স্বল্পখরচে ৪-৫ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপনের মাধ্যমে কৃষক ও উদ্যোক্তা সহজেই তাদের কৃষিপণ্য বেশি সময় সংরক্ষণ করতে পারবে। বিভিন্ন চেম্বার তৈরির মাধ্যমে ফলমূল ও সবজি আলাদাভাবে সহজেই সংরক্ষণ করতে পারবে। এই চেম্বারে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ইথিলিন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকবে। অঞ্চলভিত্তিক গ্রুপ গঠন করে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাত অনায়াসে করতে পারবে। 
স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের  কৃষিপণ্য বিপণনের জন্য ন্যূনতম বিধিবিধান প্রণয়ন
প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা সম্প্রসারণে স্থানীয় পর্যায়ে বিপণনের জন্য স্বতন্ত্র বিধিবিধান বা ব্যবসা নীতি থাকা প্রয়োজন যা স্থানীয় একটি রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান (বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট-বিএসটিআইয়ের অনুরূপ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব হবে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা মেনে চলার শর্তগুলো তৈরি করা ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা এবং সেটির নাম মূল্যে লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া, লাইসেন্স নবায়ন করা ও প্রয়োজনে বাতিল করা, খাদ্য পণ্যের ন্যূনতম মানদ- (গুণগতমান) নিরূপণ করা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা, প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ভোক্তাদের অভিযোগকে তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন করা ও প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া। এই প্রতিষ্ঠানটি ন্যূনতম বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিবে যেমন- মোড়কজাতকরণ, পণ্যের তথ্যসহ মোড়কের গায়ে লেবেলিং, খাদ্যপণ্যের নির্ধারিত মূল্য, প্রক্রিয়াজাতকরণ খাবার সর্বোচ্চ কত দিন ব্যবহার করা যাবে সেটির তারিখ উল্লেখ থাকা ইত্যাদি যা প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান এর সাথে সামঞ্জ্য রেখে তৈরি করবে। এখানে স্থানীয় উদ্যোক্তা খাদ্য আইন বা বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ যেমন-ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তা প্রতি মাসে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষিপণ্য বিপণন করতে পারবে। ফলে উদ্যোক্তাগণ অতি সহজেই খাদ্যসামগ্রী তৈরি করে নিজেই বিপণন করতে আগ্রহী হবে এবং উৎসাহিত হয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্বুদ্ধ হবে।

লেখক : ১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১২২৭১১৬৩, ই-মেইল : ভবৎফড়ঁং৬১৩@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
নাশপাতি ফলের জাত পরিচিতি, চাষাবাদ পদ্ধতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

নাশপাতি ফলের জাত পরিচিতি, চাষাবাদ পদ্ধতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
ড. মো. শরফ উদ্দিন
নাশপাতি  পূর্ব এশিয়ার নাশপাতি গাছের একটি প্রজাতি। এই প্রজাতিটি এশিয়ান নাশপাতি নামে বেশি পরিচিত। সারা পৃথিবীতে নাশপাতির অনেক প্রজাতি রয়েছে। এগুলো হলো এশিয়ান নাশপাতি, জাপানিজ নাশপাতি, চীনা নাশপাতি, কোরিয়ান নাশপাতি,  তাইওয়ানের নাশপাতি, আপেল নাশপাতি, প্যাপেল নাশপাতি এবং বালি নাশপাতি। নাশপাতি মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলের ফল। তবে এগুলোর মধ্যে এশিয়ান নাশপাতি অপেক্ষাকৃত উচ্চতাপমাত্রায় জন্মাতে ও ফলন দিতে পারে। এটি একটি বিদেশী ফল হলেও আমাদের দেশে কম বেশি সকলেই ফলটির সাথে পরিচিত। আমদানিকৃত নাশপাতিগুলো কখনও স্বাদে মিষ্টি, কখনও স্বাদে কিছুটা পানসে প্রকৃতির হয়ে থাকে। তারপরও প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে এই ফলটি আমদানি করতে হয়। নাশপাতি একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল। এ ফলে শর্করা, ক্যালরি, চিনি, বিভিন্ন ডায়েটারি ফাইবার, চর্বি, প্রোটিন,  বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় ভিটামিনস এবং খনিজ বিদ্যমান। 
এ দেশের মাটি ও জলবায়ু এশিয়ান নাশপাতি জন্মানোর জন্য উপযোগী। দেশের বরেন্দ্র ও পাহাড়ি অঞ্চলে এই ফলটির চাষাবাদের সম্ভাবনা রয়েছে। নাশপাতির চাহিদা বিবেচনায় ২০০৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি নাশপাতি-১ নামে একটি জাত অবমুক্ত করেছে। আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার  এ ২০১০ সালে একটি মাতৃবাগান স্থাপন করা হয়। এই জাতটি নিয়মিত ফলদানকারী ও উচ্চফলনশীল। নাশপাতির গাছ খাঁড়া ও অল্প ঝোপাল। এই জাতটি চাষ সম্প্রসারণের জন্য এই কেন্দ্র হতে প্রতি বছর গড়ে ২০০টি করে কলম সরবরাহ করা হয়। চৈত্র মাসে ফুল আসে এবং শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে ফল সংগ্রহ উপযোগী হয়। ফলের গড় ওজন ১৩৫ গ্রাম, দৈর্ঘ্য ৮.৪০ সেমি. এবং প্রস্থ ৫.৬৩ সেমি.। ফল বাদামি রঙের, ফলের উপরিভাগের ত্বক সামান্য খসখসে। শাঁস সাদাটে, খেতে কচকচে ও সুস্বাদু এবং ব্রিক্সমান ১০%। তবে এই কেন্দ্রটিতে ব্রিক্সমান ১২% পর্যন্ত পাওয়া গেছে যা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নাশপাতির চেয়ে অনেক সুস্বাদু। গাছপ্রতি ফলের সংখ্যা ৬০-৭০টি। জাতটি চট্টগ্রাম, পার্বত্য জেলাসমূহ ও সিলেট অঞ্চলে চাষ উপযোগী।  যে কোন ধরনের সুনিষ্কাশিত মাটিতে নাশপাতি চাষ করা যায়। তবে উর্বর, সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটি উত্তম। নাশপাতি চাষের জন্য সূর্যালোক প্রয়োজন। শুষ্ক গরম বায়ু নাশপাতির জন্য ক্ষতিকর। মাটির পিএইচ মান ৫.৫-৭.৫ উত্তম। তবে এর চেয়ে কম বা বেশি হলেও নাশপাতি জন্মাতে ও ফলন দিতে পারে। নাশপাতি গাছ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না। সাধারণত স্টেম কাটিং বা শাখা কর্তন এবং গুটি কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। বর্ষাকাল কলম করার উপযুক্ত সময়। 
উৎপাদন প্রযুক্তি
নাশপাতি গাছের ডালপালা বেশ লম্বা প্রকৃতির হয়ে থাকে। লাইন হতে লাইনের দূরত্ব ৫ মিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫ মিটার হলে ভালো হয়। চারা কলম লাগানোর কমপক্ষে ১৫ দিন আগে গর্ত ভালোভাবে তৈরি করতে হবে এবং গর্তের মধ্যে ১০ কেজি পচা গোবর সার, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১৫০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে। কলমের চারা লাগানোর আগে গর্তের মাটি ভালোভাবে ওলট-পালট করে গর্তের মাঝখানে চারা রোপণ করতে হবে। এরপর একটি খুটির মাধ্যমে চারাটি সোজা করতে হবে। লাগানোর প্রথম কয়েক দিন নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। গাছের আকার ছোট রাখার জন্য গাছের উচ্চতা ৪০-৫০ সেন্টিমিটার হলে ভেঙে বা ছোট দিতে হবে। নাশপাতির খাঁড়া ডালে নতুন শাখা-প্রশাখা কম হয়। এ জন্য খাঁড়া ডালে ওজন বা টানার সাহায্যে নুয়ে দিলে প্রচুর সংখ্যক নতুন শাখা গজায়। এতে ফলন ও ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি পায়। 
ফলন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
কলমের চারা লাগানোর ৩-৪ বছরের মধ্যে গাছে ফল ধারণ শুরু হয়। ফল আলাদাভাবে এবং থোকায় থোকায় আসে। ছয়-সাত বছর বয়সী গাছপ্রতি ফলের সংখ্যা ৬০-৭০টি এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৬-৭ টন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফলনও বাড়তে থাকে। শুধুমাত্র নাশপাতির বাণিজ্যিক বাগান স্থাপন না করায় ভালো। তবে অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলের সাথে মিশ্রভাবে চাষাবাদ করলে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল : ংড়ৎড়ভঁ@ুধযড়ড়.পড়স

বিস্তারিত
সিংগাইর মিশ্র ফলবাগান স্থাপনে তরুণ উদ্যোক্তা মো: আতিকুর রহমান

সিংগাইর মিশ্র ফলবাগান স্থাপনে তরুণ উদ্যোক্তা মো: আতিকুর রহমান
শান্তা ইসলাম
মোঃ আতিকুর রহমান একজন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। পেশায় একজন কম্পিউটার অপারেটর হলেও কৃষির প্রতি তার অপরিসীম আগ্রহ ও ঝোঁক থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন আধুনিক ফলবাগান পরিদর্শন করেন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন মাঠ দিবস ও উদ্যোক্তা  প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করে কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ হন এবং ২০১৯ সালের মে মাসে উপজেলা কৃষি অফিস, সিংগাইর মানিকগঞ্জে যোগাযোগ করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শমতে ৫ জন উদোক্তা মিলে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ১৫ একর জায়গায় ৫২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে মাল্টা, পেয়ারা ও কুল গাছের চারা দিয়ে মিশ্র ফল বাগান স্থাপন করেন। কিন্তু ২০২০ সালের আগস্ট মাসের দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় বাগান প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৪২ লাখ টাকার লোকসান হয়। 
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর তরুণ এই উদ্যোক্তা যখন দিশেহারা তখন কৃষি বিভাগ তাদের পাশে দাঁড়ায়। ২০২০ সালের নভেম্বরে বন্যা বিধ্বস্ত বাগান এবং প্রায় অর্ধকোটি টাকা লোকসানের হতাশাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কৃষি বিভাগ দ্বিগুণ উদ্দীপনা দিয়ে নতুন করে বাগান করার উৎসাহ প্রদান করে। প্রথমেই বন্যা প্রতিরোধী ব্যবস্থা হিসেবে বাগানের চারদিকে বাঁধ স্থাপন এবং ফলগাছ রোপণের জন্য উঁচু বেড করে সর্জন পদ্ধতিতে সেচের ব্যবস্থা করার পরামর্শ প্রদান করা হয়। ফলবাগানের পাশাপাশি নার্সারি করার দিকনির্দেশনা দেয়া হয়।
২০২০-২১ অর্থবছরে উত্তম কৃষি চর্চা কর্মসূচির আওতায় মোঃ আতিকুর রহমানকে ১০০ শতকের একটি বাণিজ্যিক ফলবাগান প্রদর্শনী, তার বাগানের অংশীদার গাজী কামরুজ্জামান কে ১০০ শতকের একটি বাণিজ্যিক ফলবাগান প্রদর্শনী, আমজাদ হোসেনকে ১টি বসতবাড়িতে ফলবাগান প্রদর্শনী, সুমা আক্তারকে ১টি বসতবাড়িতে ফলবাগান প্রদর্শনী প্রদান করা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে আতিকুর রহমানকে পুনরায় ১টি বসতবাড়িতে ফলবাগান প্রদর্শনী দেয়া হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে অপ্রচলিত ফলবাগান কর্মসূচির আওতায় ১টি ফলবাগান প্রদর্শনী প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ২০২১-২২ অর্থবছরে পুষ্টিবাগান প্রকল্পের আওতায় নার্সারির সরঞ্জামাদি সিকেচার, বাডিং নাইফ, ফুট পাম্প, হ্যান্ড স্প্রেয়ার প্রদান করা হয় এবং এই বিষয়ে তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সার্বিক পরামর্শ ও সহযোগিতায় বর্তমানে আতিকুর রহমান তার বাগান ১৫ একর থেকে ২৫ একরে সম্প্রসারিত করেছেন। বর্তমানে তার বাগানে ১৩ ধরনের ১৫টি জাতের মোট ১২১৪০টি ফল ও অন্যান্য উচ্চমূল্য ফসলের ফলবান গাছ রয়েছে যেখান থেকে তিনি খরচ তুলেও ৮৯৫০০০০ টাকা মুনাফা অর্জন করেছেন।  তার বাগানের বর্তমানের সার্বিক চিত্র সারণি-১ দ্রষ্টব্য।
আতিকুর রহমানের হিসাব মতে, প্রতি বছর এই ২৫ একর বাগান থেকে তার আয় হবে ৫০ লাখ টাকা। আগামী ৩ বছরে তার বিগত ক্ষতি পুষিয়ে মূলধন উঠেও লাভ থাকবে প্রায় ২০ লাখ টাকা। ৪র্থ বছর থেকে পুরোটাই লাভে থাকবে। 
ফলবাগানের পাশাপাশি স্থায়ী মুনাফার জন্য কৃষি বিভাগের পরামর্শ মতে তিনি একটি সমৃদ্ধ নার্সারি গড়ে তুলেছেন যেখানে ১৮,৮৫০টি আধুনিক জাতের ফলের চারা রয়েছে। এ যাবৎ ১০০০০টি চারা বিক্রয় করে তিনি ৬৪৪৬০ টাকা মুনাফা অর্জন করেন। ভবিষ্যতে এ নার্সারি সম্প্রসারণের ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। আতিকুর রহমান এর নার্সারির বর্তমান চিত্র সারণি-২ দ্রষ্টব্য।
মোঃ আতিকুর রহমানের এই ফল বাগান দেখে অনেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এবং বাগান করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তার বাগানের সাফল্য চারদিকে ছাড়িয়ে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুযোগ্য মহাপরিচালক মোঃ বেনজীর আলম মহোদয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত কৃষি সচিব মোঃ সায়েদুল ইসলাম মহোদয়কে এই বাগান পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানান। গত  ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত কৃষি সচিব মোঃ সায়েদুল ইসলাম সবুজ বাংলা এগ্রো ফার্মটি পরিদর্শন করেন। সিংগাইর উপজেলায় এমন একটি সুদৃশ্য বাগান দেখে তিনি অভিভূত হন এবং সাধুবাদ জানান।
একজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক থেকে আতিক এখন সফল উদ্যোক্তা। দেশের বিভিন্ন স্থানে চারা সরবরাহ এবং ফল বিক্রয় করছেন। মোঃ আতিকুর রহমানের যোগাযোগের নাম্বার-০১৮১৭৫৭২৩৬৩। কৃষকের সেবায় কৃষির উন্নয়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিংগাইর, মানিকগঞ্জ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আধুনিক প্রযুক্তিসমূহ কৃষকের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিয়ে কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে নিরলস কাজ করে যাবে।

লেখক : কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার, সিংগাইর, মানিকগঞ্জ। মোবাইল : ০১৬৮০০৮৩২৪৭। ই- মেইল : ংযধহঃধরংষধস২০৭@মসধরষ.পড়স

বিস্তারিত
কবিতা, আঙিনা সাজাই ফলদ সম্ভারে

কবিতা
আঙিনা সাজাই ফলদ সম্ভারে
মোছলেহ উদ্দিন সিদ্দিকী 
বাংলা- আমার মা,
কখনো ভাবি ... এযে অপ্সরা! দারুণ সাহসী নারী! 
বৈশাখে তার রুদ্র রূপ, ফাগুনে ভরা আগুনে আঁচল, 
শরতে শান্ত দগিন্ত জুড়ে অঘ্রাণে বাজে ফসলের সুর। 
কাটিয়ে শীতের শুভ্র কুয়াশা, আমের মুকুল উঁকি দিয়ে রয়
বিকশিত হয় কাঁঠালের কুঁড়ি। 

মাগো! এতো রূপ কেমন করে পাও! 
ঋতুচক্রের নাগরদোলায় নিজেকে সাজাও 
ফুলে ফলে অঙ্গ ভরে নাও, 
কী মায়ায় ডাকো যতনে সাদরে... 
তোমার কোলেতে হামাগুড়ি দিয়ে 
বেড়ে উঠে শিশু, বৃক্ষ-লতার আদরে আদরে...।

অবশেষে মধুমাসে শাবকের ঠোঁট রাঙাও রসে
ফলদ সরসে।
কিশোরীর ঠোঁটে কতো ছড়া উঠে...
জাম-জামরুল, আতা-লিচু-কুল,
কলা-কদবেল, আরো নারিকেল, 
পেঁপে-আনারস, কতোনা সরস, 
তেঁতুল আর তাল, করেছে বেতাল 
টক্-ঝাল্ ঝাল্-টক্ - কতো সখ! 
প্রচলিত ফল, কতো ঝলমল
অপ্রচলিত তাই, যেনো না হারাই 
বিলুপ্ত খোঁজে ফিরে যেনো পাই! 
কী ঐর্শ্বয্য তোমার জননী, 
তুষ্ট করিছো, পুষ্ট করিছো, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দেহখানি। 
সবাই তুলিছে ধ্বনি
করিছে কাব্য, ধরিছে স্লোগান 
দেশি ফল বেশি খান। 
আমি বলি, খাবেন কি করে ! 
কখনোকি পড়ে মনে! 
একটি চারা উঠে ছিলো বেড়ে তোমার হাতের আদরে ? 

তোমার বাড়ির আঙিনা বিরান; পড়শীর ছায়া ঘেরা, 
তোমার ছাদটি খাঁ খাঁ রোদ্দুর; পড়শীর ছাদ বাগানে শীতল
ফল আর ফল
নানা রঙে- নানা রূপে- কতো ঝলমল...

বেশ্তো বলো- “বাংলা, আমার মা!”
তারি জন্য মিছিল স্লোগানে পিছ্পা থাকিনা। 
ফলের মেলায় আসিয়া বেড়াতে করিতো চাষের পণ   
শুধু চারা রোপণের কাজটি সারিতে পিছায় দুষ্টু মন। 

আমি বলি... ! 
বাংলা এখন আর কারোনা তোমার আমার মা! 
মায়ের অঙ্গ সাজতে কারো আহ্বান লাগেনা। 

বিস্তারিত
তথ্য ও প্রযুক্তি পাতা
তথ্য ও প্রযুক্তি পাতা
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
আউশ ধান 
 বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করুন।
আমন ধান
 আমন ধানের বীজতলা তৈরির সময় এখন। পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার কারণে রোপা আমনের বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকলে ভাসমান বীজতলা বা দাপগ পদ্ধতিতে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করুন।
 লবণাক্ত এলাকার জন্য ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩, বিনা ধান-২৩; অলবণাক্ত জোয়ারভাটা এলাকার জন্য ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭, ব্রি ধান৭৮; জলমগ্ন এলাকার জন্য ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯, বিনা ধান-১১, বিনা ধান-১২; খরাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৭১, বিনা ধান-১৭; স্বল্পমেয়াদি হিসেবে ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৭৫; জিংকসমৃদ্ধ ধানের জন্য ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭২, বিনা ধান-২০ এছাড়া অধিক ফলনের জন্য ব্রি হাইব্রিড ধান৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৬ আবাদ করুন।
ভালো চারা পেতে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করুন;
 আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণের লক্ষ্যে মূল জমিতে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিন।
 জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করুন।
পাট
 পাট গাছের বয়স চার মাস হলে ক্ষেতের পাট গাছ কাটুন। 
 পাতা ঝরে গেলে ৩/৪ দিন পাট গাছগুলোর গোড়া একফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিন। ি পাট পচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিন। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে
 যে সমস্ত জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়।
 পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য ১০০ দিন বয়সের পাট গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিয়ে দু’টি গিটসহ ৩/৪ টুকরা করে ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাঁত করে রোপণ করুন। 
ভুট্টা
 পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার আগে মোচা সংগ্রহ করে ঘরের বারান্দায় রাখুন। রোদ হলে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। 
 মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নিম্নমুখী করে দিন, এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।
শাকসবজি
 এ সময়ে উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন। এসব সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করুন এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিন। এ ছাড়া বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর আবাদ করুন।
 সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা নিন।
 আগাম জাতের শিম এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করুন। মাদা তৈরির সময় গর্তপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালোভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে প্রতি গাদায় ৩/৪টি ভালো সবল বীজ রোপণ করুন। 
গাছপালা
 এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্য খুবই উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশেপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিন। 
 চারা রোপণের লক্ষ্যে এক ফুট চওড়া ও এক ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, দিন দশের পরে চারা বা কলম রোপণ করুণ। চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দিন। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচনিকাশ নিশ্চিত করুন।
বিবিধ
 উচ্চমূল্যের ফসল আবাদ করুন, অধিক লাভবান হন।
 স্বল্পকালীন ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন করুন অধিক ফসল ঘরে তুলুন।
 শ্রম, সময় ও খরচ সাশ্রয়ে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে আবাদ করুন।
 
লেখক : তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৯১১০১৯৬১০, ই-মেইল : সধহুঁৎথ১৯৮০@ুধযড়ড়.পড়স
বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর

প্রশ্নোত্তর 

কৃষিবিদ মোঃ আবু জাফর আল মুনছুর
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো: ইসমাইল হোসেন, উপজেলা : চারঘাট, জেলা : রাজশাহী।
প্রশ্ন : কলাগাছ ফুলে ফেটে যাচ্ছে। ভেতরে পানি। করণীয় কী?
উত্তর : আপনার এ সমস্যা দু’টি কারণে হতে পারে। কলাগাছে যদি কেঁচোর আক্রমণ থাকে সেক্ষেত্রে চারিদিকে রিং করে মাটি কুপিয়ে কার্বোফুরান (ফুরাডান-১) কেজি/বিঘায় দিয়ে হালকা সেচ দিতে হবে। অন্যথায় এটা পানামা রোগ। সেক্ষেত্রে আক্রান্ত জমিতে পরবর্তীতে চারা রোপণের চারমাস আগ পর্যন্ত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত আক্রান্ত চারা গোড়াসহ তুলে ফেলতে হবে। চারা লাগানোর পূর্বে গর্তে ১% ফরমালিন ও ৫০ ভাগ পানি দ্বারা ভিজিয়ে দেয়া এবং ১০ দিন পর চারা রোপণ করতে হবে।
মো: জব্বার, উপজেলা : ঠাকুরগাঁ, জেলা : ঠাকুরগাঁ।
প্রশ্ন : ধান গাছের গোড়ায় বাদামি গাছফড়িং দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। রস চুষে খায় এবং ধানের পাতা শুকিয়ে খড়ের মতো হয়ে যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : এ রোগের জন্য ধানক্ষেতে ২-৩ হাত পরপর বিলি কেটে আলো বাতাসের ব্যবস্থা করা; ইউরিয়া ব্যবহার বন্ধ করা; পোকা দেখার সাথে সাথে পাইমেট্রোজিন (পাইরাজিন) গ্রুপের ওষুধ স্প্রে করা; আক্রান্ত ক্ষেতের ধান কাটার পর পুড়ে ফেলা।
কৃষ্ণচন্দ্র রয়, নীলফামারী সদর, নীলফামারী।
প্রশ্ন : লিচু গাছের পাতা মোটা ভেলভেটের মতো হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?
উত্তর : এ সমস্যা মাকড়ের কারণে হয়। এজন্য লিচু গাছের পাতা সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। তারপর ভার্টিমেক/থিওভিট/কুমলাস পাউডার প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
মর্জিনা আকতার, উপজেলা : ফরিদগঞ্জ, জেলা : চাঁদপুর।
প্রশ্ন : মরিচ গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে। করণীয় কী?
উত্তর : মরিচ গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেয়া যাবে না। এরপর কপার অক্সিফ্লোরাইড গ্রুপের ছত্রাকনাশক (সানভিট) প্রতি লিটারে ৪ গ্রাম হারে স্প্রে করতে হবে ৭ দিন পর পর একবার।
মো: মতিউর রহমান, উপজেলা : আত্রাই, জেলা : নওগাঁ।
প্রশ্ন : পোকার কীড়া ফলের শাঁস খায় এবং পেয়ারা কাটলে তার মধ্যে অনেক পোকা দেখা যায়। করণীয় কী?
উত্তর : পোকাযুক্ত ফল মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলা, গাছের গোড়া পরিষ্কার করে ও কুপিয়ে উল্টে পাল্টে দিতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি সনিক্রণ বা ১ মিলি ইমিজাক্লোরপ্রিড, ১ মিলি সাইপারমেথ্রিন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
বিকাশ রায়, উপজেলা : খোকসা, জেলা : কুষ্টিয়া।
প্রশ্ন :  নারিকেলের পাতায় দাগ পড়ে এবং আক্রান্ত পাতার ধূসর বর্ণের বেষ্টনি থাকে, করণীয় কী?
উত্তর : আক্রান্ত পাতা কেটে নষ্ট বা পুড়ে ফেলতে হবে। সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত গাছে রিডোমিল গোল্ড ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: কবির, উপজেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
প্রশ্ন : বেগুন গাছের ডগা ঢলে পড়ে এবং শুকিয়ে যাচ্ছে, করণীয় কী?
উত্তর : বেগুনের ক্ষেত পরিষ্কার রাখতে হবে। সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার করে পুরুষ মথ নষ্ট করা। পটাশ সার বেশি পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে। শেষ ব্যবস্থা হিসেবে আক্রান্ত গাছে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের ওষুধ প্রতি লিটারে ১ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
মো: জজ মিয়া (কৃষক), উপজেলা : কটিয়াদী, জেলা : কিশোরগঞ্জ।
প্রশ্ন : কবুতরের বাচ্চা অবস্থায় পায়খানার দরজায় আস্তে আস্তে ফুলে যায়। খাবার খাওয়া ঠিক থাকে, বাচ্চা যখন উড়াল শিখে খাদ্য নালিতে ঘা হয় এবং বোমি হয়, কিছু দিন পর মারা যায়। এ অবস্থায় করণীয় কী?
প্রশ্ন : বয়স্ক কবুতর ঘাড় বেঁকে যায়। এর সমাধান কী?
উত্তর : আপনার ১ম সমস্যাটি হলো কবুতরের ক্যনকার। এর জন্য র‌্যানামাইসিন ও মেট্রোনিডাজল গ্রুপের ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। ১০০টি কবুতরের জন্য ৪টি র‌্যানামাইসিন প্রতিদিন ও মেট্রোনিডাজল ২ বেলা করে সকালে ও বিকেলে ১০ দিন দিতে হবে। পরবর্তী সমস্যাটি হলো রানীক্ষেত রোগ। এই রোগের চিকিৎসা করে খুব একটা লাভ হবে না। এটা প্রতিরোধ করা উত্তম। এর জন্য ২ মাস বা তার বেশি বয়সী সকল কবুতরকে ১ম ডোজ টিকা দিতে হবে। এরপর প্রতি ৪-৬ মাস পরপর এই ভ্যাকসিনের বুস্টার ডোজ দিতে হবে। এরপরও আক্রান্ত সিপ্রোফ্লক/সিপ্রো-১০/রেনাফক্স ইত্যাদির যে কোন একটি ব্যবহার করলে কিছুটা লাভ পাওয়া যায়।

লেখক : কৃষিবিদ মো: আবু জাফর আল মুনছুর, তথ্য অফিসার (উদ্ভিদ সংরক্ষণ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৪১০৪৮৫৩; ই-মেইল : রড়ঢ়ঢ়@ধরং.মড়া.নফ

বিস্তারিত
শ্রাবণ মাসের কৃষি (১৬ জুলাই-১৫ আগস্ট)

শ্রাবণ মাসের কৃষি 
(১৬ জুলাই-১৫ আগস্ট)
কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে ঋতু বৈচিত্র্যময়তা ও বর্ণ বিভায় উজ্জ্বলতম বর্ষা। শ্রাবণ হলো বর্ষার সমাপ্তি। কারণ আষাঢ়ের একটানা বর্ষণের পর শ্রাবণ আসে মায়াবী জলকণার পরশ নিয়ে। বৃষ্টির সহনীয়তায় প্রকৃতিকে সাজায় বর্ণাঢ্য সাজে। কৃষি কাজে ফিরে আসে ব্যস্ততা। আর এ প্রসঙ্গে জেনে নেবো কৃষির বৃহত্তর ভুবনে কোন কোন কাজগুলো করতে হবে আমাদের।
আউশ  
এসময় আউশ ধান পাকে। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে পাকা আউশ ধান কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। 
বীজ ধান হিসেবে সংরক্ষণ করতে হলে লাগসই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে ভালো বীজ পাওয়া যাবে।
আমন ধান 
শ্রাবণ মাস আমন ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম। চারার বয়স ৩০-৪০ দিন হলে জমিতে রোপণ করতে হবে। 
রোপা আমনের অনুকূল পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত, যেমন বিআর১০, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৯০, ব্রি ধান৯১, ব্রি ধান৯৩, ব্রি ধান৯৪, ব্রি ধান৯৫, ব্রি হাইব্রিড ধান৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৬, বিনা ধান৭, বিনা ধান১১, বিনা ধান১৬, বিনা ধান১৭, বিনা ধান২২, বিনা ধান২৩ প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত চাষ করতে পারেন; খরাপ্রবণ এলাকাতে নাবি রোপার পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমনের (ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১ এসব), লবণাক্ত ও লবণাক্ত জোয়ারভাটা অঞ্চলে ব্রি ধান৭৩, ব্রি ধান৭৮, অলবণাক্ত জোয়ারভাটা অঞ্চলে ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ এবং জলাবদ্ধতা সহনশীল জাত ব্রি ধান৭৯ চাষ করা যেতে পারে;
চারা রোপণের ১২-১৫ দিন পর প্রথমবার ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এর ১৫-২০ দিন পর দ্বিতীয়বার এবং তার ১৫-২০ দিন পর তৃতীয়বার ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। 
গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে চারা লাগানোর ১০ দিনের মধ্যে প্রতি চার গুছির মাঝে ১.৮ গ্রামের ১টি গুটি ব্যবহার করতে হবে। 
পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধানের ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি বা ডাল পুঁতে দিতে পারেন যাতে পাখি বসতে পারে এবং এসব পাখি পোকা ধরে খেতে পারে।
পাট
ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি পাট গাছে ফুল আসলে পাট কাটতে হবে। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়। 
পাট পচানোর জন্য আঁটি বেঁধে পাতা ঝরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জাগ দিতে হবে। ইতোমধ্যে পাট পচে গেলে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ভালো করে ধোয়ার পর ৪০ লিটার পানিতে এক কেজি তেঁতুল গুলে তাতে আঁশ ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে, এতে উজ্জ্বল বর্ণের পাট পাওয়া যায়। যেখানে জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়। 
বন্যার কারণে অনেক সময় সরাসরি পাট গাছ থেকে বীজ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই পাটের ডগা বা কা- কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়ে তা থেকে খুব সহজেই বীজ উৎপাদন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। 
পাটের ভালো বীজ পেতে হলে দেশী পাট বীজ এ মাসে বপন করতে হবে। সারিতে বপন করলে প্রতি শতাংশ জমিতে ১৬ গ্রাম তোষা এবং ২০ গ্রাম দেশী বীজ বপন করতে হবে। আর ছিটিয়ে বপন করলে শতাংশে ২০ গ্রাম তোষ এবং ২৪ গ্রাম দেশী পাটের বীজ বপন করতে হবে।
তুলা 
রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলে আগাম শীত আসে, সে জন্য এসব অঞ্চলে এ মাসের মধ্যে তুলার বীজ বপন করতে হবে।
শাকসবজি
বর্ষাকালে শুকনো জায়গার অভাব হলে টব, মাটির চাড়ি, কাঠের বাক্স এমনকি পলিথিন ব্যাগে সবজির চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ মাসে সবজি বাগানে করণীয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে মাদায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, গাছের গোড়ায় পানি জমতে না দেয়া, মরা বা হলুদ পাতা কেটে ফেলা, প্রয়োজনে সারের উপরিপ্রয়োগ করা। 
লতাজাতীয় গাছের বৃদ্ধি বেশি হলে ১৫-২০ শতাংশ পাতা ও লতা কেটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে। কুমড়াজাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা  কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোর বেলা হাত পরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে। গত মাসে শিম ও লাউয়ের চারা রোপণের ব্যবস্থা না নিয়ে থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। শিম ও লাউয়ের বীজ পচা কচুরিপানার স্তূপে বপন করে অতপর মূল মাদায় স্থানান্তর করতে পারেন। মাদার দূরত্ব হবে ৩ ফুট, ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। সবজি ক্ষেতে বালাই আক্রমণ দেখা দিলে জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা যেমন- ফেরোমন ট্রাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। পাতায় দাগপড়া রোগ দেখা দিলে অনুমোদিত মাত্রায় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। বর্ষাকালীন সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতকালীন শাকসবজি চাষের প্রস্তুতি নিতে হবে। 
গ্রীষ্মকালীন টমেটো ফসল মাঠে থাকলে গাছ বেঁধে দিতে হবে। এ মাসে নাবী পাট বীজ ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসাবে সবজি চাষ করা যেতে পারে।
গাছপালা 
এখন সারা দেশে গাছ রোপণের কাজ চলছে। ফলদ, বনজ এবং ঔষধি বৃক্ষজাতীয় গাছের চারা বা কলম রোপণের ব্যবস্থা নিতে হবে। 
উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে একহাত চওড়া এবং একহাত গভীর গর্ত করে অর্ধেক মাটি এবং অর্ধেক জৈবসারের সাথে ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ১০০ গ্রাম এমওপি ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। সার ও মাটির এ মিশ্রণ গর্ত ভরাট করে রেখে দিতে হবে। দশ দিন পরে গর্তে চারা বা কলম রোপণ করতে হবে। ভালো জাতের মানসম্পন্ন চারা রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের পর গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে এবং খুঁটির সাথে সোজা করে বেঁধে দিতে হবে। গরু ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রোপণ করা চারার চারপাশে খাঁড়া বা বেড়া দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
আর্দ্র আবহাওয়ায় পোলট্রির রোগবালাই বেড়ে যায়। তাই খামার জীবাণুমুক্তকরণ, ভ্যাকসিন প্রয়োগ, বায়োসিকিউরিটি এসব কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হবে। 
আর্দ্র আবহাওয়ায় পোলট্রি ফিডগুলো অনেক সময়ই জমাট বেঁধে যায়। সেজন্য পোলট্রি ফিডগুলো মাঝে মাঝে রোদে দিতে হবে।
বর্ষাকালে হাঁস মুরগিতে আফলাটক্সিন এর প্রকোপ বাড়ে। এতে হাঁস মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এজন্য খাবারের সাথে সূর্যমুখীর খৈল, সয়াবিন মিল, মেইজ গ্লুটেন মিল, সরিষার খৈল, চালের কুঁড়া এসব ব্যবহার করা ভালো। 
গবাদি পশুকে পানি খাওয়ানোর ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ দূষিত পানি খাওয়ালে নানা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। গো খাদ্যের জন্য রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে বা পতিত জায়গায় ডালজাতীয় শস্যের আবাদ করতে হবে। গরু, মহিষ ও ছাগল ভেড়াকে যতটা সম্ভব উঁচু জায়গায় রাখতে হবে।
মৎস্যসম্পদ 
চারা পুকুরের মাছ ৫-৭ সেন্টিমিটার পরিমাণ বড় হলে মজুদ পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। সাথে সাথে গত বছর মজুদ পুকুরে ছাড়া মাছ বিক্রি করে দিতে হবে। পানি বৃদ্ধির কারণে পুকুর থেকে মাছ যাতে বেরিয়ে না যেতে পারে এজন্য পুকুরের পাড় বেঁধে উঁচু করে দিতে হবে অথবা জাল দিয়ে মাছ আটকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পানি বেড়ে গেলে মাছের খাদ্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় পুকুরে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। 
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের জন্য আধুনিক কৃষির কৌশলগুলো যেমন অবলম্বন করতে হবে তেমনি সকল কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। যা কৃষিকে নিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে। আর কৃষির যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার নিকটস্থ উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। এছাড়া কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নম্বরে যে কোন মোবাইল অপারেটর থেকে কল করে নিতে পারেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। 

লেখক : সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪; ই-মেইল : বফরঃড়ৎ@ধরং.মড়া.নফ

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook