কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

নিরাপদ বেগুন চাষ

নিরাপদ বেগুন চাষ
প্রফেসর ড. মো. সদরূল আমিন (অব:)

বেগুন বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় সবজি। সারা বছরই এর চাষ করা যায়। নিরাপদ বেগুন চাষের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- জাত ও জাতের বৈশিষ্ট্য, বালাই দমন ও সার প্রয়োগ। যা এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল। বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক জাতের বেগুন পাওয়া যাবে। যেমন- পটলা, ঝুপি, তারাপুরী, কাজলা,  ইসলামপুরী  নয়নতারা, খটখটিয়া, শিংনাথ এসব স্থানীয়, স্থানীয় উন্নত, বারি ও হাইব্রিড জাত সারা দেশে সারা বছর চাষ হয়। বাংলাদেশে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগের তীব্রতার বিবেচনায় বেগুনের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। বেগুনের জাতভিত্তিক রোগ ও পোকা আক্রমণের তীব্রতা সারণি : ১ দ্রষ্টব্য।    
চারা উৎপাদন ও সার প্রয়োগ
জমি তৈরি : আগাছা বেছে মাটি তৈরি করতে হয়। শীতকালীন বেগুন আগস্ট-অক্টোবর ও বর্ষাকালীন জানুয়ারি-এপ্রিলে বীজতলায় বীজ বপন করতে হয়। ২৫ গ্রাম বীজ ৩ বর্র্গ মি. বীজতলায় বুনতে হয়। বীজতলায় ৫০ মেস নাইলন নেট দিয়ে ঢেকে চারা উৎপাদন করলে চারা অবস্থায় ভাইরাস রোধ করা যায়। গজানোর   ১০-১২ দিন পর চারা দ্বিতীয় বীজতলায়  লাগাতে হয়। চারার বয়স ৩০-৪০ দিন অথবা   ৪-৬টি পাতা হলে রোপণ করতে হবে।      
সার : জাতের ফলন ক্ষমতা ও অপুষ্টি লক্ষণ দেখে সার দিতে হবে। সারের পরিমাণ সারণি-২ দ্রষ্টব্য। গাছে অপুষ্টি লক্ষণ দেখে সার ও চুন  প্রয়োগ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বেগুনের রোগ  দমন ব্যবস্থাপনা  
গোড়া পচা, ঢলেপড়া ও ক্ষুদে পাতা রোগ : গোড়া পচা দমনের জন্য অটোস্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ঢলেপড়া রোগ ও খাটো আকৃতির পাতা রোগ দমনে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকনাশক এবং ভাইরাস বাহক সাদামাছি ( ইমিটাফ/নাইট্রো প্রয়োগ) দমন করতে হবে।    
ফমপসিস রোগ (
Phomopsis) : ফমপসিস রোগ দমনে বীজ শোধন করার জন্য গরম পানিতে ( ৫১ডিগ্রি সে) ১৫ মিনিট রাখা, অটোস্টিন ০.১ গ্রাম/৫০ গ্রাম বীজ, মূূল জমিতে অটোস্টিন ১০ গ্রাম/৫লিটার পানি স্প্রে করতে হবে।
ডেম্পিং অফ বা চারা ধ্বসা/ঢলে পড়া রোগ : বীজতলায় ‘ডেম্পিং অফ’ ছত্রাক রোগের আক্রমণ হয়। চারার কাণ্ড ও শিকড়ে  রোগ ছড়িয়ে চারা  মারা যায়। রোভরাল (২ গ্রাম/লি) বা কম্প্যানিয়ন (২ গ্রাম/লি) ৮ দিন পর পর প্রয়োগ করতে হবে। অটোস্টিন  দিয়ে  বীজ শোধন করতে হবে ।    
বেগুনের পোকা
ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা, মেলিবাগ, বিটল, সাদা মাছি ও জেসিড। এসব পোকা দেখা গেলে যথানিয়মে ট্রেসার ২টি স্প্রে তারপর  মারশাল এই চক্র অনুসরণ করে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।     
বেগুনের ডগা ও ফলের মাজরা পোকা : এই পোকার আক্রমণ অধিক হলে এই পোকা দ্বারা সর্বাধিক ৬৩% পর্যন্ত ফলন ক্ষতি হতে দেখা গেছে। বেগুন ছাড়াও এ পোকা টমেটো, আলু, মটরশুটি ইত্যাদি সবজিকেও আক্রমণ করতে পারে (বারি)। ফল বিস্বাদ, খাওয়ার অনুপোযুক্ত হয়ে যায়। বেগুনের ডগা ও ফল মাজরা পোকা গাছে মাটি থেকে নেয়া পানি চলাচল ব্যহত হয় এবং ডগা, পাতা ঢলে পড়ে মারা যায়। ছিদ্রের মুখে কীড়ার মল দেখা যায়।  গাছে ফুল ধরতে বিলম্ব হয়। ক্রীড়া ফুলের কুঁড়ি এবং পরে বৃতির মাধ্যমে বর্ধনরত ফলের মধ্যে প্রবেশ করে। বর্ধনরত ফল আক্রান্ত হলে তাতে ছিদ্র দেখা যায়। বেগুনের এই একটি পোকা দমন করতে ১-২টি ফসল মৌসুমে গড় দৈনিক হিসাবে শতাধিক বার অতি বিষাক্ত কীটনাশক স্প্রে করার উদাহরণ রয়েছে। অথচ বায়োলজিক্যালি অতি কম বিষাক্ত ট্রেসার প্রয়োগ করে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তা দমন করা সম্ভব।
ট্রেসার মার্শাল প্রয়োগ : চারা রোপণের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে জমিতে মথ দেখার সাথে সাথে ট্রেসার ১০ লিটার পানিতে ৪ মিলি হারে স্প্রে করতে হবে। জমিতে লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত ডগা অপসারণ করে একই হারে পুনরায় ট্রেসার প্রয়োগ করতে হবে। এর ৭-১০ দিন পর মার্শাল ২০ ইসি ১০ লিটার পানিতে ৩০ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। রোপণের কয়েক দিন পর থেকেই এ পোকার আক্রমণ হয় এবং শেষ ফলটি সংগ্রহ করার আগ পর্যন্ত এর আক্রমণ চলতে থাকে। গ্রীষ্মকালে জীবনচক্র সম্পন্ন করতে ২০-৩০ দিন এবং শীতকালে ৩৪-৪৫ দিন লাগে। বছরে এরা ৫ বা বেশি বংশবিস্তার করতে পারে। মে-অক্টোবর ৩টি বংশ এবং নভেম্বর-এপ্রিল মাসের মধ্যে ২টি বংশবিস্তার হয়। স্ত্রী মথ পাতার উল্টো দিকে, কুঁড়িতে, বোঁটায় ও ডগায় ডিম পাড়ে। গ্রীষ্মকালে ৩-৫ দিন এবং শীতকালে ৭-৮ দিনে ডিম ফুটে কীড়া বের হয়।    

 

সারণি ১ : জাতভিত্তিক রোগ ও পোকা আক্রমণের তীব্রতা

জাত ঢলেপড়া রোগ রোধ ফল ও কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকারোধ
উত্তরা সহনশীল মাঝারিরোধক
তারাপুরী প্রতিরোধক প্রতিরোধক নয়
কাজলা সহনশীল মাঝারিরোধক
নয়নতারা মাঝারিরোধক মাঝারিরোধক
ইসলামপুরী মাঝারিরোধক প্রতিরোধক নয়
শিংনাথ মাঝারিরোধক মাঝারিরোধক
খটখটিয়া মাঝারিরোধক মাঝারিরোধক
ভাংগুরা মাঝারিরোধক প্রতিরোধক নয়


সমম্বিত বালাই দমন  
বেগুন ক্ষেতে প্রতি সপ্তাহে পোকার উপস্থিতি যাচাই করতে হবে। আক্রান্ত ডগা ও  ফল কীড়াসহ ছিঁড়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। নিরাপদ বেগুন উৎপাদনে ব্যাগিং ও অর্গানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। বেগুনের জমি গভীরভাবে চাষ-মই দিয়ে সমান করে আগাছামুক্ত করতে হবে। বেগুনের জমি স্বল্প ব্যয়ে আগাছামুক্ত রাখতে চাইলে চারা রোপণের ২-৩ দিনের মধ্যে মাটিতে পানিডা ৩৩ ইসি বিঘাতে ৩০০ মিলি প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষে কার্বোটাফ ৫জি ১.৫ কেজি/বিঘা দিতে হবে। সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া অতিরিক্ত দেয়া যাবে না। রোপণের ১৫ দিন থেকে সপ্তাহে একদিন ক্ষেতে জরিপ করতে হবে। ক্ষেত আগাছানাশক (পানিডা) দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ফুল আসার আগে ডগা বা পাতায় পোকা দেখলে পোকা ধ্বংস করাসহ বালাইনাশক দিতে হবে।

 

নিরাপদ বেগুন চাষে কিছু বাড়তি পরিচর্যা প্রয়োজন। যেমন : হরমোন (বায়োজাইম/ওকোজিম)। তরল জৈবসার। শিকড় অধিক বিস্তৃত হয়। ফলের আকার ও ওজন বাড়ে। ফুল ধরার সময় ১ বার, ১ম স্প্রে করার ২১ দিন পর এবং ৪২ দিন পর ¯েপ্র করতে হবে। মিরাকেল গ্রো/বায়োলিনফা/জোবস/সুপার থ্রাইব/বুস্ট পেক রোপণের ১৫ দিন পর থেকে ১০-১৫ দিন পরপর ৪-৫ বার দিলে বিঘাপ্রতি ১৫-২৫ মিলি প্রয়োজন হয়। রোগা গাছে হরমোন দেওয়া যাবে না। ভিজা চটে বেশি সময় সতেজ থাকে।     


বেগুন ছায়ায় রাখলে গরমকালে ১-৩ দিন ও শীতে ৩-৫ দিন সতেজ থাকে। ১৩ সেন্ট্রিগ্রেড তাপে ও ৯০% আর্দ্রতায় ২৫ দিন রাখা যায়     

সারণি ২ : উফশী জাতে সার

সারের নাম পরিমাণ/টব পরিমাণ/হেক্টর
গোবর/ কম্পোস্ট ১.৫ কেজি, ১০,০০০ কেজি
ইউরিয়া ৪০ গ্রাম ৩০০ কেজি
টিএসপি ৪০ গ্রাম ২৫০ কেজি
এমওপি ৩০ গ্রাম ২০০ কেজি
জিপসাম ৬ গ্রাম ১০০ কেজি
বোরিক এসিড (বোরন) - ১০ কেজি


বীজ উৎপাদনে করণীয়
পরিপক্ব ফল হলদে হলে সংগ্রহ করা। সপ্তাহপর ফলের চামড়া ছিলে বীজসহ মাংসল অংশ কেটে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে।  রোদে শুকিয়ে আর্দ্রতা ৮% হবে।     
পরিশেষে বিটি বেগুন ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধ যা জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছে। বিটি (ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস) ব্যাকটেরিয়া থেকে জিনকে পৃথক করে বেগুনে স্থানান্তর করা হয়। এই জিন বেগুনে পোকানাশক প্রোটিন তৈরি করে যা ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকাকে প্রতিরোধ করে। বারি জাত, ছিদ্রপোকা-ট্রেসার, সুষম সার দ্বারা এভাবে বেগুন চাষ করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।


হাজী মো. দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। মোবাইল : ০১৯৮৮৮০২২৫৩, ই- মেইল : Sadrulamin47@gmail.com

বিস্তারিত
কৃষক গ্রুপসমূহের করণীয় কার্যক্রম

কৃষক গ্রুপসমূহের করণীয় কার্যক্রম
রাজেন্দ্র নাথ রায়

বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তর গ্রুপ কৃষকদের নিয়েই অধিকাংশ কাজ করছে। আগে প্রদর্শনী এবং কৃষি যন্ত্রপাতি একক কৃষককে দেয়া হলেও, বর্তমানে গ্রুপ কৃষকদের দেয়া হচ্ছে। আধুনিক এই কৃষি সম্প্রসারণ নীতির অনেক ভালো দিকও রয়েছে। কারণ কৃষক গ্রুপে কোন উপকরণ/প্রদর্শনী/কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হলে, এর সুফল গ্রুপে থাকা প্রায় ২০-৩০ জন কৃষক পেয়ে থাকে। তবে কোনো গ্রুপে সদস্যদের মধ্যে কোন্দল থাকলে, সে গ্রুপের পারফরম্যান্স তেমন ভালো হয় না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চলমান অধিকাংশ প্রকল্পগুলো যেমন : রাডারডিপি, এনএটিপি, জিকেবিএসপি, ব্লুগোল্ড, আইএফএমসি, ধান, গম ও পাট ও ডাল, তেল ও মসলা ইত্যাদি প্রকল্পগুলো গ্রুপ কৃষক নিয়ে কাজ করছে। গ্রুপের সফলতা নির্ভর করে সেই গ্রুপে থাকা সদস্যদের কাজের পারফরম্যান্সের ওপর। তাই, সদস্য কৃষকরা গ্রুপে থেকে কি কি কাজ করবে, গ্রুপ মিটিং এ কি করবে, সঞ্চয় কোন কোন খাতে ও কোন পদ্ধতিতে খরচ করবে এসব সুস্পষ্টভাবে জানা দরকার।
কৃষক গ্রুপগুলোর ৩ ধরনের কাজ করা প্রয়োজন।
ক) কৃষি বিষয়ক কাজ
যেকোন কৃষক গ্রুপের কৃষি বিষয়ক কাজগুলোই হচ্ছে প্রধান কাজ। কৃষিবিষয়ক কাজগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা বিভিন্ন রকম ফসল যেমন : দানা ফসল, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি উৎপাদন করে। কৃষি বিষয়ক কাজগুলো সফলতার সাথে করতে পারলে পরবর্তিতে কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ এবং সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজের সফলতা আশা করা যায়। কৃষিবিষয়ক কাজগুলো হচ্ছে : শাকসবজি আবাদ, নতুন ফসল (যেমন : ক্যাপসিকাম/সূর্যমুখী), ফসলের নতুন আধুনিক জাত চাষাবাদ  (যেমন: রেডলেডি পেঁপে/বারি ১৪ সরিষা/ ৮৯ ধান/থাই পেয়ারা), উচ্চমূল্য ফসল আবাদ (যেমন: কাজুবাদাম), উচ্চ পুষ্টিসম্পন্ন ফসল আবাদ (যেমন: সজিনা), পারিবারিক সবজি বাগান/৫ বেডে ৫ শাকসবজি ও মাচায় লাউ/শসা/শিম,  বিষমুক্ত/নিরাপদ ফসলের চাষাবাদের ক্ষেত্রে জৈবিক পদ্ধতি অনুসরণ (যেমন: লিউর, পার্চিং, আলোক ফাঁদ, ছাই/নিম/মেহগনি/ বিষকাটালী ব্যবহার), কম বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার (যেমন: সাকসেস/ট্রেসার), সমকালীন চাষাবাদ (যেমন: একসাথে বীজতলা তৈরি ও চারা লাগানো), কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার (যেমন: কম্বাইন হারভেস্টার), কম্পোস্ট/কেঁচো কম্পোস্ট, কৃষি ভিজিট/মোটিভেশনাল ট্যুর (১৩টার মধ্যে কমপক্ষে ১০টা করতে হবে)
বিষমুক্ত/নিরাপদ ফসল আবাদ এর গুরুত্ব : প্রতিদিন বিষ খাওয়া হচ্ছে, তাই আমাদের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হচ্ছে। অবস্থা এত খারাপ যে, যেকোন কৃষক গ্রুপে গিয়ে ১০০% সুস্থ ব্যক্তিদেরকে হাত তুলতে বললে, কেউ হাত তোলে না যুবক থেকে বৃদ্ধ সবাই বলে, তাদের কোন না কোন অসুখ আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন হলো স্বাস্থ্যের এমন খারাপ অবস্থা? সত্যি কথা বলতে, আমরা কেউই কীটনাশক বোতলের এক চামচ কীটনাশক খাওয়াার সাহস রাখি না। কিন্তু পরোক্ষভাবে সবাই বিষাক্ত খাবার দিন-রাতে ৩বার খাচ্ছি। বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায় যে, আমরা শাকসবজি ও বিভিন্ন ফসলে যে কীটনাশক স্প্রে করে থাকি তার কিছু অংশ বিষ রান্না করার পরেও রয়ে যায় যাকে ইংরেজিতে বলে রেসিডিউয়াল ইফেক্ট এবং এই বিষাক্ত ফসল আমরা দিন-রাতে ৩ বার খাই। এজন্যই আমাদের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি হচ্ছে। তাই নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসল উপাদনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা/উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করা বাঞ্চনীয়।
খ) কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজ
কৃষিবিষয়ক কাজের মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজগুলো করা প্রয়োজন। একাজগুলো হচ্ছে : উপজেলা শহর/ জেলা শহর/ বিভাগীয় শহর/ রাজধানী শহরে (ঢাকায়) ফসল বিক্রয়, কৃষি খামার গঠন, কৃষি ভ্যান চালুকরণ, কৃষিযন্ত্র ভাড়া দেয়া, প্রতি মাসে মিটিং ও সঞ্চয় জমা করা, কৃষি লোন (৪% সুদ মাত্র) গ্রহণ, বীজ উৎপাদন ও বিক্রয় (যেমন: এসএমই সরিষা/রসুন/ধান) (৭টার মধ্যে কমপক্ষে ২টা করতে হবে)
উদাহরণস্বরূপ জাপানের কৃষক গ্রুপ কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজের মধ্যে -বিষমুক্ত/নিরাপদ ফসলের হোটেল, অটো রাইস মিল, কৃষি খামার, কৃষি পর্যটন, মাইক্রো ক্রয় ও পরিবহণ ইত্যাদি কাজ করছে।
গ) সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজ
কোন কৃষক গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে সেই কৃষক গ্রুপ দ্রুত সফল হয়। এজন্য সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজগুলো করা প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে: বাল্যবিবাহ রোধ, নববর্ষ উদ্যাপন, পিকনিক, গরিব-অসহায়কে সাহায্য, জাতীয় দিবস উদ্যাপন ইত্যাদি (৫ টার মধ্যে কমপক্ষে ১টা করতে হবে)
রেজিস্টারের তথ্য পূরণ
কৃষক গ্রুপের বিভিন্ন তথ্য, আয়-ব্যয় ও অন্যান্য বিষয়ের রেকর্ড রাখার জন্য রেজিস্টারে তথ্য পূরণ করা একান্ত প্রয়োজন। গ্রুপে বিভিন্ন রকম রেজিস্টার থাকে। রেজিস্টারের নাম, উদ্দেশ্য এবং রেজিস্টারের তথ্য আপডেট করার সুবিধা সারণি-১ দ্রষ্টব্য।     
গ্রুপ মিটিংয়ে করণীয়
গ্রুপ মিটিং হচ্ছে কৃষক গ্রুপের জন্য অনেক কাক্সিক্ষত একটি দিন। কারণ এদিন সকল সদস্য একত্র হয় এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গ্রুপ মিটিং প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনে যেমন: ০১ তারিখে করলে ভালো হয়। গ্রুপ মিটিং এ করণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে: ১। কৃষি বিষয়ক/কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ/সমাজ সচেতন বিষয়ক আলোচনা এবং নিজেদের পারফরম্যান্স এবং স্কোর নির্ধারণ করা; ২। গ্রুপে আবাদকৃত সকল ফসলের বর্তমান ও আগামী ১ মাসের পরিচর্যা সম্বন্ধে আলোচনা- উৎপাদন রেজিস্টারে আয়-ব্যয় হিসাব করা; ৩। ট্রেনিং ম্যানুয়াল নিয়ে এসে আলোচনা করা; ৪। উপসহকারী কৃষি অফিসার/কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার/উপজেলা কৃষি অফিসার কে আমন্ত্রণ জানিয়ে ফ্রি পরামর্শ গ্রহণ করা; ৫। সঞ্চয় ও খরচের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে তা রেজিস্টারে পূরণ করা; ৬। প্রয়োজনে ভোটের মাধ্যমে সভাপতি/ সেক্রেটারি/ক্যাশিয়ার পাল্টানো; ৭। সভাপতি/সেক্রেটারির মাধ্যমে কৃষি অফিস/ডিলার/কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করা; ৮। কৃষি অফিসার ও ডিলার এর সাথে যোগাযোগ করে ন্যায্যমূল্যে সার বীজ ক্রয় করা, যাতে দাম ১ টাকা বেশি না লাগে; ৯। কৃষি অফিস হতে বিনামূল্যে বরাদ্দকৃত কৃষি প্রণোদনা/পুনর্বাসন কর্মসূচির সার বীজ পেতে ইউপি চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানানো এবং মাঝেমাঝে যোগাযোগ করা; ১০। ফসলের সমস্যায় কৃষি পরামর্শ/প্রেসক্রিপশন গ্রহণ করা; ১১। কৃষি অফিস হতে কৃষক গ্রুপে দেয়া প্রদর্শনী প্লট সকল সদস্য মিলে পরিদর্শন করে প্রদর্শনীর বিশেষ/ভালো বৈশিষ্ট্য সকল সদস্যকে জানতে হবে; ১২। প্রদর্শনী ফসল ভালো মনে হলে বীজ সংরক্ষণ করে আগামী বছর সকল সদস্য মিলে চাষাবাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সঞ্চয় কাজে লাগানোর পরামর্শ
সঞ্চয়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো কোন একটি কৃষক গ্রুপের বড় একটি সফলতা। তাই সঞ্চয় কাজে লাগানোর ভালো একটি পরিকল্পনা থাকতে হবে; ১। কৃষিবিষয়ক যেকোন ১০টি কাজের জন্য ভালো কোম্পানির ভালো জাতের শাকসবজির বীজ/চারা ক্রয় ও সকলে মিলে আবাদ করা। অনুরূপভাবে,  কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজ ও সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজে বিনিয়োগ করা যেতে পারে; ২। পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিতকরণে ভালো জাতের শাকসবজির বীজ/চারা ক্রয়, লিউর ক্রয়, সার ক্রয় করে সকল সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে- ৫ বেডে ৫ রকম শাকসবজি ও মাচায় লতাজাতীয় সবজি আবাদ করতে হবে; ৩। বসতবাড়ির ফলগাছ পরিচর্যার জন্য একসাথে সব বাড়ির জন্য সার কিনে প্রয়োগ, মুকুল ঝরে যাওয়া রোধে স্প্রে (যেমন: ফ্লোরা) করা; ৪। ৫/৭ জনকে লটারির মাধ্যমে গরু/ছাগল/মুরগি/হাঁস/ভেড়ার বাচ্চা ক্রয় ও বিতরণ; ৫। নিজস্ব পুকুরে মাছ চাষ করা; ৬। ১/২ সদস্যকে ভ্যান/অটোরিকশা ক্রয় ও বিতরণ; ৭। জমি লিজ/অন্য পুকুর/জলাশয় লিজ নিয়ে চাষাবাদ করা; ৮। কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া হিসেবে পরিচালনা করা।    
কৃষক গ্রুপের মূল্যায়ন/স্কোর নির্ধারণ
কোন কৃষক গ্রুপ ভালো না মন্দ তা জানার জন্য কৃষক গ্রুপের মূল্যায়ন/স্কোর নির্ধারণ প্রয়োজন। একটি ভালো   কৃষক গ্রুপের স্কোর কমপক্ষে ৮০ হতে হবে।
স্কোর নির্ধারণের সূত্র নিম্নরূপ
কৃষক গ্রুপ স্কোর= কৃষিবিষয়ক কাজের সংখ্যা ী ৬ + কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজ ী ৭+ সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজ ী৬।
হাজীপাড়া কৃষক গ্রুপ যদি কৃষি বিষয়ক কাজ ১১টি, কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজ ১টি ও সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজ ১টি করে তাহলে গ্রুপটির স্কোর হবে=১০ী৬ + ১ী৭ +১ী৬= ৭৩। (এখানে উল্লেখ্য যে, হাজীপাড়া কৃষক গ্রুপ ১১টি কৃষি বিষয়ক কাজ করলেও সারণি-২ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০টির স্কোর পেয়েছে)।
সোনারায় কৃষক গ্রুপ যদি কৃষি বিষয়ক কাজ ১০টি, কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজ ৩টি ও সমাজ সচেতন ও ঐক্য স্থাপন বিষয়ক কাজ ১টি করে তাহলে গ্রুপটির স্কোর হবে=১০ী৬ + ২ী৭ +১ী৬= ৮০ (অনুরূপভাবে, সোনারায় কৃষক গ্রুপ ৩টি কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বিষয়ক কাজ করলেও সারণি-২ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২টির স্কোর পেয়েছে)।
পরিশেষে কৃষক গ্রুপসমূহের করণীয় কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় নিরাপদ ফসল ও প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন ও আহারের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে। কৃষিপণ্য বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি সম্ভবপর হবে। পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার, নাগেশ্বরী, কৃড়িগ্রাম। মোবাইল : ০১৭১৭৫২৭৩৬১, ই-মেইল : royrazen.dae@gmail.com

বিস্তারিত
সম্ভাবনাময় ভোজ্যতেল ফসল পেরিলা

সম্ভাবনাময় ভোজ্যতেল ফসল পেরিলা
মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম মজুমদার

পেরিলা বাংলাদেশে অভিযোজিত একটি নতুন ভোজ্যতেল ফসল। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের অনুকূলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) নামে বাংলাদেশে প্রথম পেরিলার একটি জাত নিবন্ধিত হয়।
পেরিলা মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার জাত যা কোরিয়ান পেরিলা নামে পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Perilla frutescens (L.) Britton এবং এটি Lamiaceae (Mint) পরিবারভুক্ত। পেরিলা তেল দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে ব্যবহার করা হয়। পেরিলা তেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি উচ্চ মাত্রার ৫০-৬০% ওমেগা-৩ এবং ফ্যাটি এসিড বা α-লিনোলিনিক এসিড সমৃদ্ধ ও ২২-২৩% ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড বা লিনোলিক এসিড এবং ক্ষতিকারক ইরোসিক এসিড মুক্ত। এই তেলের ৯২% ই অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড। উচ্চ মাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডসমৃদ্ধ হওয়ায় পেরিলা তেল মানব শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি কমানোতে এই তেলের অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশে বার্ষিক ভোজ্যতেলের গড় চাহিদা প্রায় ২.২ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২.০-২.৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন ক্রুড সয়াবিন তৈল এবং পাম ওয়েল আমদানি করা হয়। এছাড়া সরিষা, সূর্যমুখী, রাইচ বার্ন ওয়েলসহ অন্যান্য ভোজ্যতেল আমদানি করা হয় (সূত্র : দি ফাইন্যাসিয়াল এক্সপ্রেস, ৬ জানুয়ারি ২০২১)। বাংলাদেশে প্রচলিত যে সকল তেল ফসল রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সরিষা, তিল, তিসি, বাদাম ইত্যাদি। এই সকল তেল ফসল হতে নিজস্ব চাহিদার মাত্র ১০% পূরণ করে থাকে। বাংলাদেশে তেল ফসলের মধ্যে তিল ছাড়া অন্যান্য ফসল রবি মৌসুম বা শীতকালে হয়ে থাকে। রবি মৌসুমে আন্তঃফসলের প্রতিযোগিতার জন্য চাইলেও তেল ফসলের জমি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
পেরিলার জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন (বীজতলা ২৫-৩০ দিন এবং মূল জমি ৭০-৭৫ দিন)। পেরিলা বীজে তেলের পরিমাণ প্রায় ৪০%। বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষ হয়। আউশ ধান কর্তন করার পর এর বেশির ভাগ জমি প্রায় আড়াই মাস পতিত থাকে। এরপর নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সরিষা বপন করা শুরু হয়। মূল জমিতে পেরিলার জীবনকাল মাত্র     ৭০-৭৫ দিন হওয়ায় সহজেই এর বেশির ভাগ জমিতে সরিষা লাগানোর পূর্বে পেরিলা রোপণ করে কর্তন করা যায়। লবণ সহনশীল হওয়ায় উপকূলীয় বন্যামুক্ত পতিত জমি সহজেই পেরিলার আওতায় আনা সম্ভব। এ ছাড়া আমন ধান হয় এমন উঁচু জমি যেখানে সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হয় এবং খরচ অপেক্ষাকৃত বেশি সে সকল জমি পেরিলার আওতায় নিয়ে আসলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আমন ধান রোপণ করার পর পতিত বীজতলাসমূহ পেরিলা চাষের আওতায় আনলে দেশে তেল ফসলের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে একটি সামর্থ্যবান বড় ভোক্তা শ্রেণী রয়েছেন যারা দেশের বাইরে থেকে আগত অলিভ তেল, ক্যানোলা তেল, সূর্যমুখি তেল খেয়ে থাকেন। এগুলোর বাজারমূল্যও অনেক বেশি। পেরিলা তেলের আবাদ যদি বাংলাদেশে বাড়ানো যায় তাহলে সামর্থ্যবান ভোক্তা শ্রেণীর মধ্যে এই উচ্চ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ পেরিলা তেলে আগ্রহ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এতে দেশের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি কৃষকও তার ফসল অধিক লাভে বিক্রি করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে শিক্ষিত বেকার যুবক শ্রেণী যারা রয়েছেন তাদের পেরিলা ফসলের চাষ এবং তেলের ব্যবসায় স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া পেরিলার বাজারমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় দেশে এবং আর্ন্তজাতিক পর্যায়ের বাজারজাতকরণে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সন্তোষজনক মুনাফা লাভের সুযোগ রয়েছে। পেরিলা তেল ক্রুড বা রিফাইন ছাড়া খাওয়া যায়। ফলে কৃষক বা গ্রামের জনগণ দেশে প্রচলিত যন্ত্র থেকে সহজেই পেরিলা বীজ হতে তেল আরোহণ করে খেতে পারবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে পেরিলা চাষের সম্প্রসারণের উদ্যেগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে উচ্চ গুণাগুণ সমৃদ্ধ পেরিলা তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।   
সাউ পেরিলা-১ (গোল্ডেন পেরিলা বিডি) এর উৎপাদন প্রযুক্তি
পানি জমে থাকে না এমন প্রায় সব ধরনের মাটি এ ফসল চাষের উপযোগী। তবে বেলে দোঁ-আশ বা দোঁআশ  মাটি পেরিলা চাষের জন্য বেশি উপযোগী।
বীজতলা তৈরি, বীজ বপন ও জমি তৈরি :  খরিপ-২ মৌসুম, বীজ বপনের উপযুক্ত সময় ১০ জুলাই-২৫ জুলাই। পেরিলা অত্যন্ত ফটোসেনসেটিভ ফসল। সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে পেরিলা গাছে ফুল আসা শুরু হয়। কাজেই গাছের পর্যাপ্ত অংগজ বৃদ্ধি এবং কাক্সিক্ষত মাত্রার ফলন পেতে হলে  নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশ্যই বীজ বপন করতে হবে। প্রতি হেক্টরে ১-১.৫  কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। বীজতলার প্রস্থ ১-১.৫ মিটার এবং দৈর্ঘ্য জমির আকার অনুযায়ী যে কোন পরিমাণ নেয়া যাবে। বীজতলায় জৈবসারের ব্যবস্থা করলে স্বাস্থ্যবান চারা পাওয়া যাবে। বীজতলায় দুই বেডের মাঝে নালার ব্যবস্থা রাখতে হবে যেন বৃষ্টি হওয়ার পর অতিরিক্ত পানি বীজতলায় জমে না থাকতে পারে। বীজের আকার ছোট হওয়ায় মাটি যথাসম্ভব ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। পিঁপড়ার আক্রমণ যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খরিপ-২ মৌসুমে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় বীজ বপনের পর প্রথম ১৫ দিন পর্যন্ত বীজতলার চার পাশে খুঁটি দিয়ে উঁচু করে পলিথিন দেয়া যেতে পারে। ১/৪ ইঞ্চি গভীর লাইন করে বীজ বপন করলে বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা বাড়ে। অথবা বীজ ছিটিয়ে দিয়ে ঝুরঝুরে মাটি উপর দিয়ে দিতে হবে। বীজবপনের পর বীজতলায় হালকা করে পানি দিতে হবে। বীজ তলা যেন একেবারে শুকিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল করতে হবে।
৪-৫টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হবে। জমির চার পাশে নালার ব্যবস্থা করলে পানি নিষ্কাশনের জন্য সুবিধা হবে। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩০-৪০ সেমি. এবং লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ৩০-৪০ সেমি. বজায় রেখে চারা রোপণ করতে হয়।    
চারা রোপণ
বীজ বপণের ২৫-৩০ দিন পর চারা রোপণের উপযোগী হয়। এই সময় প্রতিটি চারায় ৫-৬টি পাতা হয়। চারা উত্তোলনের সাথে সাথেই রোপণ করতে হবে। চারা উত্তোলনের পর চারার আটি বাধার সময় শিকড়ে মাটি রেখে দিলে রোপণের পর গাছের দ্রুত বৃদ্ধিতে উপকার হয়। মূল জমিতে সাধারণত ২ মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করে চারা রোপণ করলে পানি নিষ্কাশনের জন্য ভালো হয়। দুই বেডের মাঝে ২০-৩০ সেমি. প্রশস্তনালা রাখতে হবে। সাধারণত বেড তৈরি ছাড়াও চারা রোপণ করা যায় তবে সেক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চারা রোপণের পর পরই হালকা সেচ দিতে হবে।
সেচ ও নিষ্কাশন
বর্ষাকাল বা খরিপ-২ মৌসুমে পেরিলার চাষ হওয়ায় সাধারণত সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে ফুল আসার সময় একটানা    ১৫-২০ দিন বৃষ্টি না হলে ফুল আসার সময় হালকা সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হতে পারে। জমিতে যেন পানি জমে না থাকে সেজন্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
অন্যান্য পরিচর্যা
চারা রোপণের ১০-১৫- দিন পর একবার এবং ২৫-৩০ দিন পর দ্বিতীয় বার নিড়ানি দিতে হয়। এ ফসলে সাধারণত রোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ খুবই কম হয়। তবে কাটুই পোকা, হক মথ, বিছা পোকা প্রভৃতি পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। ক্ষতির ধরন দেখে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নিতে হবে।
বীজ বা ফসল পরিপক্বতার সময়
চারা রোপণের ৭০-৭৫ দিনের মধ্যে পেরিলা ফসল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত বীজ পরিপক্বতার সময় গাছের  পাতা ঝরে  যায়। গাছের পাতা যদি কমপক্ষে ৮০% হলুদ হয় তখনই বীজ ধূসর রং ধারণ করে এবং বীজ সংগ্রহের উপযোগী হয়। বাহির দিক থেকে বীজ দেখা যায় বিধায় বীজের পরিপক্বতা সহজেই বুঝা যায়।
ফসল মাড়াই/সংগ্রহ পদ্ধতি
বীজের পরিপক্বতা আসার পর গাছের গোড়া কেটে দিতে হয় অথবা পুরো গাছ উপড়ে ফেলতে হয়। তারপর শক্ত চটের বস্তা অথবা শক্ত পলিথিন বা ত্রিপল বিছিয়ে গাছগুলো ধরে হালকাভাবে পিটিয়ে বীজ সহজেই সংগ্রহ করা যায়। হেক্টরে ১.৩-১.৫ টন ফলন হয়ে থাকে।
বীজ সংরক্ষণ
বীজ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। বীজের আর্দ্রতা ৭-৮% আসার পর বীজ টিন অথবা প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ সংরক্ষণের পাত্রে বাতাস যেন চলাচল না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সংরক্ষিত বীজ যথাসম্ভব আর্দ্র নয় এমন ঠাণ্ডা জায়গায় রাখতে হবে। সংরক্ষণের জন্য বীজ ভর্তি পাত্র মাটির সংস্পর্শে রাখা বাঞ্ছনীয়।

পিএইচডি ফেলো ইন পেরিলা অয়েল ক্রপ  (শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়) ও উপজেলা কৃষি অফিসার (এলআর), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। মোবাইল : ০১৯১৫১৭৬৩২০, ই-মেইল : kaioumbaudae27@gmail.com

বিস্তারিত
ছাদে ছাগল পালন সাথে হাইড্রোপনিক ঘাস চাষ

ছাদে ছাগল পালন সাথে হাইড্রোপনিক ঘাস চাষ
ডা: মনোজিৎ কুমার সরকার

শহরে ছাগল পালনের জন্য বাসার ছাদকে ব্যবহার করা সম্ভব। ছাদ বাগানের জন্য প্রচুর পরিমাণে জৈবসার প্রয়োজন, যা ছাগলের মল থেকে সহজেই পাওয়া সম্ভব। ছাদ বাগানের লতাপাতা, বাসার উচ্ছিষ্ট খাদ্য, ছাগলের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। উচ্চতা ছাগল পালনের জন্য কোন সমস্যা হবে না।
ছাগল শুধু গরিবের গাভী নয় ধনীদেরও গাভী। ছাগল উৎপাদন করে গ্রামের দরিদ্র মানুষ আর ভোগ করে শহরের বিত্তশালী মানুষ। ছাগলের মাংসের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মূল্য ৭০০-৮০০ টাকা কেজি। দেশে ছাগলের মাংসের চাহিদা পূরণ করতে হলে শহরের ছাদকে আমরা ব্যবহার করতে পারি।
ছাগল পালন করা খুবই সহজ কাজ, খাদ্য খরচ কম, রোগ বালাই কম, বংশবৃদ্ধির হার বেশি, ছাগল ছোট প্রাণী হওয়ায় ছাদে উঠানো ও নামানো সহজ হবে।
ছাদে ঘর তৈরি
প্রতিটি ছাগলের জন্য ৫-৬ বর্গফুট জায়গা প্রয়োজন। ছাগলের সংখ্যা ও ছাদের আকার অনুযায়ী ঘর তৈরি করতে হবে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করে আরামদায়ক পরিবেশ প্রদান করতে হবে। ছাগলের  সংখ্যা অনুযায়ী কম খরচে মাচা তৈরি করতে হবে। ছাদের নিরাপত্তা প্রাচীর ৩-৪ ফুট উঁচু করে বানাতে হবে, যাতে লাফিয়ে পড়ে না যায়। প্রয়োজনে প্লাস্টিক নেট ব্যবহার করা যাবে। ছাদে ঘর তৈরির জন্য সিমেন্ট সিট ব্যবহার করা ভাল, ঘর ঠাণ্ডা থাকবে, প্রয়োজনে ককসিট দিয়ে ছাদ দিতে হবে। ঘর দোচালা করাই ভাল।
উপযুক্ত জাত
ছাদে পালনের জন্য ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলই উপযুক্ত, আকারে মাঝারি, কষ্টসহিষ্ণু খাদ্য গ্রহণে বাদ-বিচার করে না, রোগবালাই কম, বছরে ২ বার বাচ্চা দেয়। দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের রং কালো, সাদা-কালো, খয়েরি হতে পারে। শিং ও কান ছোট, ওলান বড়। ২০০-৩০০ মিলি. দুধ দেয়। ২-৩ মাস পর্যন্ত দুধ দেয়। প্রথমবার ছাগী ১টি পরে ২-৩টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। ছাগল জবাই করার পর ৪৫-৪৭% মাংস পাওয়া যায়। ছাগী গরম হলে প্রজনন করানোর জন্য সঙ্গে ১টি পাঠা পালন করা যেতে পারে অথবা পাঠা পালনকারীর মোবাইল নং রাখতে হবে। প্রজননের ঝামেলা এড়াতে শুধু খাসি সংগ্রহ করে পালন করা যেতে পারে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা
প্রতিটি ছাগলের জন্য দৈনিক ৩০০-৫০০ গ্রাম দানাদার খাদ্য মিশ্রণ, ১-২ কেজি কাঁচা ঘাস বা লতাপাতা ও ১-১.৫ লিটার পানি সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্য মিশ্রণ ফরমুলা সারণি-১ দ্রষ্টব্য।
সতর্কতা : ছাগলকে বেশি পরিমাণে ভাত, পোলাও, চাল, গম, আলু খাওয়ালে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়বে। নবজাত বাচ্চাকে প্রতিটি ৩০০-৫০০ মিলি. দুুধ খাওয়াতে হবে। প্রয়োজনে মিল্ক রিপ্লেসার খাওয়াতে হবে। দুধ ছাড়ানোর পর পরিমাণ মতো দানাদার খাদ্য খাওয়ালে গড়ে দৈনিক ৫০-৬০ গ্রাম করে ওজন বৃদ্ধি পাবে। এক বছরের মধ্যে ১৮-২০ কেজি ওজনের হতে পারে। পাঠাকে দানাদার ও ঘাসের পাশাপাশি দৈনিক ২০ গ্রাম অংকুরিত ছোলা দেয়া উচিত। খাদ্য খাওয়ানোর সময় সারণি-২ দ্রষ্টব্য।
খাবার পাত্র দৈনিক পরিষ্কার করতে হবে। সকালে-বিকেলে ছাগলের আচরণ পরীক্ষা করতে হবে।
ছাদে ছাগল পালনে সবুজ ঘাসের চাহিদা পূরণ করতে খুব সহজেই হাইড্রোপনিক ঘাসের চাষ করা যায়।
হাইড্রোপনিক ঘাস চাষ পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে মাটি ও জমি ছাড়াই ঘাস উৎপাদন করা হয়, সব ধরনের খামারি এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। উৎপাদিত ঘাসে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান রয়েছে। উৎপাদন খরচও খুব কম, প্রতি কেজি   ২-৩ টাকা। ঘরের ছাদে, ঘরের ভেতরে, বারান্দায়, মাটির পাতিল, পানির বোতল ইত্যাদি উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত বীজ যেমন : ভুট্টা, গম, ছোলা, সয়াবিন, খেসারি, মাসকলাই এবং বার্লি প্রভৃতি বপন করা যেতে পারে।
উৎপাদন পদ্ধতি
বীজ ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর পানি ঝরিয়ে ভেজা চটের বস্তা বা কালো কাপড়ে বেঁধে ২৪ ঘণ্টা অকারে রাখতে হবে। নির্ধারিত টিন, প্লাস্টিক বা কাঠের তৈরি ট্রেতে বীজ বিছিয়ে দিয়ে ২ দিন কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, যেন আলো বাতাস না লাগে, কাপড় সর্বদা ভিজা রাখতে হবে। তৃতীয় দিন কাপড় সরিয়ে আধা ঘণ্টা পরপর পানি ছিটাতে হবে। বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তাক বানিয়ে ট্রেগুলো সাজিয়ে রাখা যায়। ৯ দিন পর ৭-৮ কেজি কাঁচা ঘাস পাওয়া যাবে। ৫ বিঘা জমিতে যে পরিমাণ ঘাস উৎপাদন হয়, মাত্র ৩০০ বর্গফুট টিন শেডে সমপরিমাণ ঘাস উৎপাদন সম্ভব।

ছাগলে রোগবালাই
ছাগলের রোগবালাই কম, ছাদে পালন করলে রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরও কম। পিপিআর, বসন্ত একথিওমা, ক্ষুরারোগ, ওলান পাকা রোগ, চর্মরোগ, কৃমি, উকুন, সর্দিকাশি, আমাশয়, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি রোগ হয়ে থাকে।
বছরে ১ বার পিপিআর ও ২ বার ক্ষুরা রোগের টিকা দিতে হবে। ৪ মাস পরপর কৃমিনাশক বড়ি খাওয়াতে হবে।
দেশের সকল উপজেলায় ব্ল্যাকবেঙ্গল জাতের ছাগল উন্নয়ন প্রকল্প উন্নতমানের পাঠা সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। যে কোনো সমস্যায় নিকটস্থ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করতে হবে। য়
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, কাউনিয়া, রংপুর। মোবাইল : ০১৭১৫২৭১০২৬, ই-মেইল : drmonojit66@gmail.com

 

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের সম্ভাবনা ও করণীয়

খাদ্য নিরাপত্তায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের সম্ভাবনা ও করণীয়
ড. মোঃ নুর আলম চৌধুরী

বাংলাদেশে পেঁয়াজ একটি উচ্চমানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী মসলা ফসল। পেঁয়াজ কন্দের আকার আকৃতি স্বাদ, গন্ধ, পুষ্টিমান, পরিবহণ সুবিধা এবং সংরক্ষণ গুণের কারণে দ্রুত এর চাষাবাদ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অধিকাংশ দেশেই কম বেশি পেঁয়াজের আবাদ পরিলক্ষিত হলেও চীন (২৫%) এবং ভারতে (২৩%) বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। খাদ্য পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিবেচনায় পেঁয়াজের গুরুত্ব অপরিসীম।   পুষ্টিমানের দিক থেকে ইহা যথেষ্ট পুষ্টিসমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী পেঁয়াজে ৯.৩৪ গ্রাম শ্বেতসার, ৪.২৪ গ্রাম চিনি, ১.৭ গ্রাম আঁশ, .০১ গ্রাম চর্বি, ১.১ গ্রাম আমিষ এবং যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন রয়েছে। এ ছাড়াও পেঁয়াজে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফাইটোকেমিক্যালস, পলিফেনল, হলুদ পেঁয়াজের ফ্লাভেনয়েড, লাল পেঁয়াজের এন্থোসায়ানিন এবং আরো ২৫ ধরনের বিভিন্ন জটিল যৌগ যা আমাদের নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ ও উপশমে সহায়তা করে। পেঁয়াজ এমন একটি ফসল যা কৃষক তার ঘরে রেখে প্রয়োজনে বাজোরে বিক্রি করে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদনের চাহিদা পূরণ করে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষাবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধিসহ পেঁয়াজের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। নিম্নে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের সম্ভাবনা, করণীয় ও এর চাষাবাদের আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের সম্ভাবনা
আমাদের দেশে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। আমাদের দেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ২.৩৮ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ২৫.৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপন্ন হয়। যার গড় ফলন ১০.৭৬ টন/হেক্টর (কৃষি ডাইরি, ২০২১)। উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় শতভাগ পেঁয়াজই শীতকালে উৎপাদিত হয়। শীতকালে তিন পদ্ধতিতে মূলত পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়ে থাকে যথা : চারা থেকে পেঁয়াজ, মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং সরাসরি বীজ বপন করে কন্দ উৎপাদন। উৎপাদন ও আমদানি বিবেচনায় এদেশের বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন। এ ৩৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে মোট দেশজ উৎপাদন ২৩-২৪ লাখ টন হলেও সংগ্রহোত্তর ২৫-৩০% অপচয়ের ফলে ব্যবহার উপযোগী উৎপাদন দাঁড়ায় ১৭-১৮ লাখ টন। প্রতি বছর প্রায় ১১-১২ লাখ টন পেঁয়াজে ঘাটতি বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়ে থাকে। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে যথাক্রমে প্রায় ১১ ও ১২ লাখ টন। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষাবাদ এবং এর আওতায় জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করে উল্লেখিত ঘাটতি সহজেই মেটানো সম্ভব। কারণ শীতকালীন পেঁয়াজ শুধু শীতকালেই চাষাবাদ করা সম্ভব। কিন্তু  গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ সারা বছর চাষ করা যায়, (রবি মৌসুমে এবং খরিপ-১ ও   খরিপ-২)। তবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য উঁচু এবং মধ্যম উঁচু জমির প্রয়োজন। কারণ পেঁয়াজ দাঁড়ানো পানি মোটেও সহ্য করতে পারে না। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে পানি জমে থাকলে পেঁয়াজের চারা বা কন্দ পচে যায়। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের জন্য বেলে     দো-আঁশ থেকে দো-আঁশ মাটি উপযুক্ত। মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, শিবগঞ্জ, বগুড়া থেকে বারি পেঁয়াজ-৫ নামে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবন করা হয়। আমাদের দেশে পাহাড়ি এলাকায় সমতল ভূমি, ছাদ বাগানে, বসতবাড়িসহ সাথী/আন্তঃফসল হিসাবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে সম্ভাবনা আছে। নিম্নে আলোকপাত করা হলো।
পাহাড়ি এলাকায়
পাহাড়ি এলাকায় মোট জমির প্রায় ০.০২৪ হেক্টর (৬ শতাংশ) সমতল জমি বিদ্যমান। এই সমতল জমিতে সহজেই আমরা গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করতে পারি। তাছাড়া লেট খরিপে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করে হেক্টরপ্রতি ৩০-৩৫ টন ফলন পাওয়া সম্ভব। পাহাড়ি এলাকায় গ্রীষ্ম/বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হওয়া সত্ত্বেও পাহাড়ি জমি উঁচু হওয়ায় পানি দ্রুত লিচিং হয়ে পানি নিচে চলে যায়। ফলে পেঁয়াজের চারা বা কন্দ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পাহাড়ে সীমিত আকারে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষাবাদ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে মসলা জাতীয় ফসলের গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায়   পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষাবাদ সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।    
ইক্ষুর সাথে সাথী/আন্তঃফসল হিসাবে
ইক্ষু একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। ইক্ষু লাগানো থেকে কর্তন করা পর্যন্ত প্রায় ১৪ মাস সময় লাগে। এই সময়ে আমরা সহজেই ইক্ষুর সাথে সাথী/আন্তঃফসল ফসল হিসাবে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করতে পারি। বাংলাদেশে প্রায় (৫.৫১ লাখ) হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়ে থাকে (বিবিএস, ২০১৯)। ইক্ষু সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে নালা করে এক/দুই সারিতে রোপণ করা হয়। রোপণ পরবর্তীতে প্রায় চার মাস (জানুয়ারি-এপ্রিল) সময় আখের অংকুরোদগম তথা দৈহিক বৃদ্ধি অত্যন্ত ধীরগতিতে হয়। এ সময় ১ বা ২ সারি ইক্ষুর মাঝের ফাঁকা স্থানটিতে সহজেই আন্তঃ/সাথী ফসল হিসাবে স্বল্পমেয়াদি  গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করা সম্ভব। চারা লাগানোর ৬৫-৭০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। কাজেই ইক্ষু রোপণের পর থেকে মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। একজোড়া ইক্ষুর সারির দুই লাইনের মাঝে ৭০ সেমি. দূরত্ব এবং দুই জোড়া ইক্ষুর সারির মাঝে ১৩০ সেমি. দূরত্ব রাখতে হয়। কাজেই এক সারি বা দুই সারির মাঝে ফাঁকা জায়গায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করে পেঁয়াজের ঘাটতি মেটানোসহ আখ চাষির অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।
বসতবাড়িতে
এ বসতবাড়ির আশেপাশে মাত্র ৫ মি.ঢ২মি. (১০ হাতঢ৪ হাত) পরিমাণ জায়গা থাকলে একই জমিতে ফেব্রুয়ারি (মাঘ) মাসে চারা রোপণ করে ১৫-২০ কেজি, জুন (জ্যৈষ্ঠ) মাসে চারা রোপণ করে ১৫-২০ কেজি এবং সেপ্টেম্বর মাসে চারা রোপণ করে ২০-২৫ কেজি ফলন পাওয়া যায় এ হিসাবে ৫ মি.ঢ২ মি. জমিতে সারা বছর বারি পেঁয়াজ ৫ জাতের চাষ করে সর্বমোট ৬০-৬৫ কেজি ফলন পাওয়া যায়। একটি পরিবারের ৪-৫ জন সদস্যর জন্য মাসে গড়ে ৪ কেজি পেঁয়াজ কন্দের প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে একটি পরিবারের বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা ৪৮ কেজি। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের প্রতিটি পরিবার নিজেদের বার্ষিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে।
ছাদ বাগানে
রুফটপ গার্ডেনিং বা ছাদ কৃষি আমাদের দেশে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সিটি কর্পোরেশন এলাকাসহ জেলা ও উপজেলায় ছাদ কৃষির প্রসার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউনাইটেড নেশনের তথ্য অনুযায়ী সারা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫৪% লোক শহর এলাকায় বসবাস করে। শহর এলাকায় এই বসবাসের পরিমাণ ২০৫০ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬৬ শতাংশ (United Nation, 2014) ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ছাদ বাগানে পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে পেঁয়াজের ঘাটতি অল্প পরিসরে হলেও পূরণ করা সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী ছাদ বাগানকে শাকসবজি, ফলমূল, মসলাজাতীয় ফসল এবং ফুল চাষের জন্য ব্যবহার করা। ছাদ বাগান, ছাদের তাপমাত্রা হ্রাসসহ পারিপাশির্^ক আবহাওয়াকে ঠাণ্ডা রাখে। ইহা পরিবেশে বিদ্যমান বিষাক্ত কার্বন শোষণসহ শব্দ দূষণ হ্রাস করে। ছাদ বাগানে ১ মিটারঢ০.৬ মিটার আকারের ৪টি ট্রেতে ৭০-৮০ দিন পর ২.৫-৩.০ কেজি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন করা সম্ভব যা   ৪-৫ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের মাসিক পারিবারিক চাহিদার চাহিদা মেটানো সম্ভব।
গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজসহ পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো এবং উৎপাদন স্থিতিশীল রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন : ১) যথাসময়ে উন্নতজাতের ও গুণগতমানের বীজ কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বারি, বিএডিসিও ডিএই এর সমন্বয়ে কৃষকপর্যায়ে গুণগতমান সম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। ২) বিএডিসির গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন ও বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বীজ উৎপাদনের জন্য জাত নির্বাচনে প্রাতিষ্ঠানিক লাভের চেয়ে কৃষকের সুবিধা বিবেচনা করা বেশি প্রয়োজন। ৩) পতিত জমি ব্যবহার ও আন্তঃফসল (আখ, মুখিকচু, আদা, হলুদ, মরিচ এর সাথে) হিসেবে, ছাদ বাগানে। ৪) বসতবাড়িতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজচাষের এলাকা বাড়ানো যেতে পারে। ৫) সময়মতো অল্পসুদে (৪%) মসলা ফসল চাষের ওপর ঋণ সুবিধা প্রদান এবং ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি ও ঝামেলমুক্তভাবে ঋণ প্রাপ্তি সহজতর করা আবশ্যক। ৬) পেঁয়াজ সংগ্রহ মৌসুমে পেঁয়াজে আমদানি বন্ধ রেখে পেঁয়াজ চাষিদের স্বার্থ রক্ষা তথা পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। ৭) পেঁয়াজ সংরক্ষণে টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণায় বিনিয়োগসহ পেঁয়াজ চাষে উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণে কৃষক/কৃষিকর্মীসহ পেঁয়াজ উৎপাদনের সাথে জড়িত সকলকে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। পেঁয়াজের জমি চাষ ও শ্রমিক খরচ কমানোর জন্য হাইস্পিড রোটারি টিলার ও পাওয়ারটিলার চালিত বীজ বপনযন্ত্র ব্যবহার উৎসাহিত করা যেতে পারে। ৮) পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য উৎপাদন (পাবনা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী) এলাকায় বিশেষ ধরনের কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করতে হবে, যাতে ঘাটতি মৌসুমে উক্ত সংরক্ষিত পেঁয়াজ সরবরাহ করা যায়। ৯) পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। য়

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা কেন্দ্র, শিবগঞ্জ, বগুড়া। মোবা: ০১৭১১২৪৬৩৫২, মেইল: dmnalam@yahoo.com

বিস্তারিত
পরিবেশ সুরক্ষায় ধান চাষে করণীয়

পরিবেশ সুরক্ষায় ধান চাষে করণীয়
ড. মো. শাহজাহান কবীর

বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে যাচ্ছে এবং চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে উদ্বৃত্ত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৮০-৮৫ ভাগ জমিতে ধান চাষ করা হয়। এ সমস্ত জমি থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাস-মিথেন (CH4), কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) ও নাইট্রাস অক্সাইড (N2O) যেমন নিঃসরিত হয় তেমনি ধান গাছ তার শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড ফর্মে এসব গ্যাস শোষণ করছে। ধান গাছ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের চেয়ে বেশি শোষণ করে প্রকৃত ব্যাখ্যা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হলো। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ ২০১৩ সাল থেকে এর উপর গবেষণা করে আসছে। যেখানে তারা দেখেছে ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে ৬৬৬ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড, ৫৩ গ্রাম মিথেন এবং ০.৫ গ্রাম নাইট্রাস অক্সাইড ধানক্ষেত থেকে নিঃসরিত হয়। অন্যদিকে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে ধানগাছ ২২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড ফটোসিনথেটিক প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। এছাড়া মিথেন বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস ও হাইড্রোজেন গ্যাসে রূপান্তরিত হয়, যা ধান ও অন্যান্য গাছ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গ্রহণ করে। একইভাবে নাইট্রাস অক্সাইড বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে এমোনিয়াম ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে এবং এই এমোনিয়াম বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে এমোনিয়ায় রূপান্তরিত হয় এবং বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে আসে যা গাছ গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রেও ধান গাছের অ্যারেনকাইমা ((Aerenchyma)) চ্যানেল দিয়ে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ধান গাছের শিকড়ের মাধ্যমে মাটিতে আসে যা মিথেনের সাথে বিক্রিয়া করে মিথানোট্রফিক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা কার্বন  ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে যা গাছ গ্রহণ করে এবং এই প্রক্রিয়া বায়ুমণ্ডলে মিথেন নিঃসরণে বাধা দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধান চাষাবাদে ধানগাছ মাত্র ৫-১০% মিথেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে বাকি ৯০-৯৫% মিথেন মাটি থেকে আসে। জলাবদ্ধ জমিতে লেবাইল জৈব কার্বন 
(Labile organic carbon) এবং মিথানোজেনিক ব্যাক্টেরিয়া মিথেন উৎপন্ন করে। অতএব, দেখা যায়, ধান চাষের চেয়ে পতিত জমি মিথেন নিঃসরণের জন্য বেশি দায়ী।


বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এই তিন মওসুম মিলিয়ে পাঁচ কোটি টনের অধিক ধান উৎপাদন হয়। সে হিসাবে মোট পাঁচ কোটি টন ধান উৎপাদনে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ ৩৩.৩ মিলিয়ন টন, মিথেন ২.৬৫ মিলিয়ন টন এবং নাইট্রাস অক্সাইড এর পরিমাণ ০.০২৫ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল ফর্মুলা অনুযায়ী এই তিনটি   গ্রিনহাউজ গ্যাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণের পরিমাণ ১০৬.২ মিলিয়ন টন। অপরদিকে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ধানগাছ ২২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। অতএব মোট পাঁচ কোটি টন ধান উৎপাদনে প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডল থেকে শোষিত হয়। উল্লিখিত হিসাব অনুযায়ী ধান চাষে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের তুলনায় ৩.৮ (১১০.০-১০৬.২) মিলিয়ন টন বেশি গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করে। ফলশ্রুতিতে ধান চাষ বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের চেয়ে অনেক বেশি শোষণ করে বরং বায়ুমণ্ডলকে পরিচ্ছন্ন করছে।


উদাহরণস্বরূপ খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের মহারাজপুর বিল। বিলটিতে আবাদি জমির পরিমাণ দুই হাজার বিঘার বেশি। পাশেই পশ্চিম মহারাজপুর। সেখানে জমির পরিমাণ ছয় হাজার বিঘার মতো। লবণাক্তপ্রবণ ওই বিলসহ আশপাশের বিলে একসময় মাত্র একটি ফসল হতো। আর সেটি হলো বর্ষায় আমন ধান। এরপর পুরো বছরই জমি পড়ে থাকে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গরম বাতাস আর ধূলিঝড় ছিল সেখানে নিত্যকার ঘটনা। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্রি বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো পূর্ব মহারাজপুর বিলে বোরো ধানের চাষ করেন কৃষকেরা। বর্তমানে মহারাজপুর গ্রামে প্রায় প্রতিটি বিলেই ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯ ও বিনাধান-১০সহ অন্যান্য ধান চাষাবাদ হচ্ছে যেখানে আগে কখনও বোরো ধান আবাদই হতো না। ওই জমিতে কৃষক বিঘাপ্রতি (০.১৩৭৫ হেক্টর) ২২ থেকে ২৫ মণ (৮.২১১ থেকে ৮.৩৩১ মেট্রিক টন) ফলন পাচ্ছেন উপরন্তু যেখানে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে গরম বাতাস আর ধূলিঝড়ের কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারতো না, মহিলারা দিনের বেলায় চুলা জ¦ালাতে পারত না। আর এখন ধান চাষের কারণে ধূলিঝড় নেই, পরিবেশও আগের তুলনায় অনেক ঠাণ্ডা ও নির্মল হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি ধান চাষই এ বিলের বায়ুমণ্ডলকে পরিছন্ন করেছে। এ ধরনের অনেক উদাহরণ খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায় রয়েছে।


অনুরূপভাবে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের। যেখানে রাজশাহীতে মরুকরণ ঠেকানোর জন্য কত পরিকল্পনা, কত প্রকল্প নেয়া হলো কিন্তু যখন থেকে বোরো ধান চাষাবাদ শুরু হলো তখন থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে আগের ধুলোও নেই, এত গরমও নেই, যা ধান আবাদেরই সুফল। অধিকন্তু দেশের খাদ্য উৎপাদনের বিশাল একটি অংশ আসে বরেন্দ্র অঞ্চলের বোরো আবাদ থেকেই।


যে বিষয়টির প্রতি আমাদের সবচেয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন তা হলো সবকিছু ঠিক রেখে কিভাবে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানো যায়। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং তা বাস্তবায়নে বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। যেমন-ব্রি এমন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছে যা বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে। কারণ আমরা জানি ধানগাছ একটি C3 উদ্ভিদ। বায়ুতে CO2 এর পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে সাথে ধানগাছ বেশি পরিমাণে CO2 শোষণ করে নেয় এবং অধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট উৎপন্ন করে। এর ফলে ধানের ফলন বৃদ্ধি পায়। অধিক ঈঙ২ শোষণকারী জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ব্রি জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত জার্মপ্লাজম থেকে পরীক্ষণের মাধ্যমে এমন জাত শনাক্ত করেছে যাদের CO2 এর প্রতি Responsiveness বেশি এবং অধিক উৎপাদনক্ষম। ভবিষ্যতে অধিক CO2 শোষণকারী এবং অধিক উৎপাদনক্ষম জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে এ জার্মপ্লাজমগুলো ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ধানচাষ থেকে আরো কম গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানোর পদ্ধতি ব্যবহার, পরিমিত ও ব্যালেন্স সার ব্যবহার, ইউরিয়া সার ছিটিয়ে ব্যবহারের পরিবর্তে মাটির গভীরে প্রয়োগ এবং Good Agriculture Practices (GAP) অর্থাৎ উত্তম কৃষি চর্চা ব্যবহারের জন্য কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।


আমরা এখন ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের (4IR) দ্বারপ্রান্তে এবং বাংলাদেশ এরই মধ্যে এর সাথে যুক্ত হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ আশাতীত কমে যাবে বলে আমি মনে করি কেননা এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রিসিশন এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস নিশ্চিত হবে। জেনোম এডিটিং এর মাধ্যমে গ্রিনহাউজ গ্যাস শোষণকারী কাক্সিক্ষত জাত উদ্ভাবন এবং ন্যানো টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমেও নিঃসরণ কমানো যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ব্যবহারের মাধ্যমে কৃত্রিম বৃষ্টিপাত (Artificial rainfall) ঘটানো সম্ভব হবে, ডি-স্যালিনাইজেশন (De-Salinization) প্রক্রিয়া সহজতর হবে এবং সোলার এনার্জি (Solar energy) এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং আশাহত না হয়ে আশান্বিত হয়ে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করাই শ্রেয়। য়

মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর। ফোন : ৪৯২৭২০৪০, ই-মেইল : dg@brri.gov.bd

বিস্তারিত
ধান উৎপাদনে খরচ কমানোর উপায়সমূহ

ধান উৎপাদনে খরচ কমানোর উপায়সমূহ

কৃষিবিদ অসিত কুমার সাহা

আমাদের দেশে কৃষি উৎপাদনে অনেক অর্জন রয়েছে। স্বাধীনতার আগে দেশের লোকসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি বা তার চেয়ে বেশি কিছু হবে। তখন দানাজাতীয় ফসল উৎপাদন ১ কোটি টন থেকে দশ-পনেরো লাখ টন কম ছিল। দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে ধান ফসলই প্রধান ছিল। সামান্য কিছু জমিতে গম চাষ হতো। এখন আমরা  ধান,  গম, ভুট্টা চাষ করে প্রায় ৪ কোটি টন উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। প্রায় চার গুণ দানাজাতীয় ফসল উৎপাদন করেছেন এদেশের কৃষক। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা এবং প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ লাখ লোকসংখ্যা যোগ হচ্ছে। বর্তমান সরকারের অদম্য প্রচেষ্টায় ধান উৎপাদনে বিশে^ তৃতীয় স্থান অধিকার করে নিয়েছে। এ অর্জন করার পরও আমাদের ধানচাষিরা ধানের যথাযথ মূল্য না পাওয়াতে নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়। সে কারণে ধান উৎপাদনে খরচ কমানোই আজকের আলোচ্য বিষয়। ধান উৎপাদনে বীজ নির্বাচন, জমির ধরন, স্থানীয় আবহাওয়া, ধানের জীবনকাল, ধানের ফলন এর টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) বিবেচনায় এনে ধান বীজের জাত নির্বাচন করলে খরচ কমানো সম্ভব। স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে ক্রয় করার সময় অবশ্যই বীজের মূল্য, বীজ গজানোর হার হেক্টরপ্রতি ফলন অবশ্যই ধানবীজের বস্তার গায়ে উল্লেখ থাকতে হবে। ক্রয় রসিদে বীজের মূল্য উল্লেখ থাকতে হবে। বিএডিসির বীজের ট্যাগ লাগানো আছে কি না দেখে কিনতে হবে।
বীজ শোধন : বীজ শোধন করে নিলে বীজে রোগের আক্রমণ কম হয়। চারা সুস্থ, সবল হয়। বীজ শোধনকারী দিয়ে অথবা প্রতি কেজি ধান বীজের জন্য ১ গ্রাম হারে তুতের গুঁড়ো দিয়ে বীজ শোধন করা যেতে পারে।
বীজতলার যত্ন : বীজতলা উত্তমরূপে চাষ দিতে হয়, উপরিভাগ  সমতল হতে হবে। দুটি বীজতলার মধ্যে নালা বা ড্রেন রাখলে বীজতলায় সেচ প্রদান করতে সুবিধা হয় এবং অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব।
আদর্শ বীজতলায় ১০-১৫% কম বীজ প্রয়োজন  হয়। এতে উৎপাদন  খরচ কম হয়।
চারার বয়স : মৌসুম, ধানের জাতের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে চারার বয়স। বেশি বয়সের চারা রোপণ করতে নাই। আমন মৌসুমে ২০-২৫ দিনের, বোরো মৌসুমে ২৫ থেকে ৩০ দিনের চারা নির্বাচন করতে হয়।
চারার সংখ্যা : প্রতি গর্তে সুস্থ-সবল-নিরোগ চারা, রোপা আমন মৌসুমে ২টি দিতে হয়। গর্তে বেশি চারা দিলে ফলন বেশি হয় না। সে কারণে সঠিক চারার সংখ্যা নির্ধারণ করে উৎপাদন খরচ কমানো যায়।
রোপণ দূরত্ব : মৌসুম, জাতের বৈশিষ্ট্য জীবনকালের ওপর ভিত্তি করে ধানের চারার রোপণ দূরত্ব নির্ধারণ করতে হয়। সারি থেকে সারি ২৫ সেন্টিমিটার, গাছ থেকে গাছ ২০ সেন্টিমিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ করা হলে চারার সংখ্যা কম লাগে। এতে চারার খরচ কমে যায়।
সার প্রয়োগ পদ্ধতি : সার হলো গাছের খাদ্য। গাছ মাটি থেকে শিকড়ের মাধ্যমে সার গ্রহণ করে। জমি ভালোভাবে প্রস্তুত করা হলে অতি সহজে শিকড় মাটি থেকে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। ধান ফসলে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের ২৫ থেকে ৩০ ভাগ কাজে লাগে। ধানের জমিতে সার প্রয়োগের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে। ধানের চারা রোপণের ১০ থেকে ১২ দিন পর প্রথম ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করলে ভালো হয়। ওই সময় জমিতে ছিপছিপে ২ ইঞ্চি পানি থাকলে ভালো হয়। গুটি     ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে সারের কার্যকারিতা বাড়ে, ফলন বাড়ে। ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ইউরিয়া সারের পরিমাণ কম লাগে। এতে করে সারের খরচ অনেকটা কমে যায়।
খরচ কমাতে সেচ ব্যবস্থাপনা : সেচ খরচ কমানোর জন্য সঠিকভাবে ধানের জীবনকাল এর স্তর অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হয়। যদি সম্ভব হয় পর্যায়ক্রমে জমি শুকনো ভেজা করলে ভালো হয় (কাঁইচ থোড় আসার পূর্ব পর্যন্ত)। বীজতলা তৈরির সময়, বীজ বপনের পর শুকিয়ে গেলে ২বার। জমি কাদা করবার সময় ১ বার। রোপণের সময় প্রায় ৭.৫ সেমি. পানি থাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ৪-৫ বার সেচ দেয়া যেতে পারে। রোপণের পর হইতে দানাপুষ্ট হইবার পূর্ব পর্যন্ত ৫-৭.৫ সেমি. পানি থাকা প্রয়োজন। ফসলে সার প্রয়োগের সময় পানি  বের করে দিতে হবে। সার প্রয়োগের ২-৩ দিন পর পুনরায় পানি দিতে হবে ৭-৮ বার।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধানের স্তর হলো ফুল ও দুধ অবস্থা। ফুল অবস্থায় বোরো ধানের/রোপা আমন ধানের জমিতে কমপক্ষে ২ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখলে ভালো হয়। বিকালে সেচ দিলে পানি বাষ্পীভবন কম হয়। মাটির গর্ত বা ফাটল বন্ধ করা উচিত। জমির আইল ঠিক রাখতে হবে। রোপা আমন মৌসুমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় খরচ কমানোর উপায় : ধান ফসল উৎপাদনে রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমণে প্রায় ১৫ থেকে ২০% উৎপাদন খরচ হয়। ধানক্ষেত থেকে ২০০ থেকে ৩০০ মিটার দূরে আলোক ফাঁদের ব্যবস্থা করতে হবে। সবুজপাতা ফড়িং, মাজরা পোকার মতো পাতা মোড়ানো পোকা আলোকে আকৃষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। পার্চিং বা ডাল পুঁতে দিতে হবে ধানক্ষেতে। হাতজাল দ্বারা পোকার মথ ধরে মারতে হবে।
লোগো পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপণ করতে হবে। এতে ধানক্ষেতে আলো ও বাতাস প্রবাহিত হবে। বাদামি গাছফড়িং এর আক্রমণ কম হবে। বাদামি গাছফড়িংয়ের আক্রমণকালে ধানের জমিতে পানি থাকলে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেয়া। এই সময় ইউরিয়া সার প্রয়োগ বন্ধ রাখুন। কীটনাশক প্রয়োগ করার সময় গাছের গোড়ায় কীটনাশক দিতে হবে। জমির আইলে কিছু নাড়া খড়কুটো দিয়ে রাখলে শীষকাটা লেদা পোকার কীড়া এখানে আশ্রয় নেয়।
ধান কাটার পর ধানের খড় সম্ভব হলে পুড়িয়ে ফেলুন। শীষকাটা লেদাপোকা গাছ বেয়ে ওপরে উঠে এবং শীষ কেটে দেয়। সম্ভব হলে ধানগাছ বাঁশ দিয়ে শুইয়ে দিন। চুঙ্গি পোকার ধানক্ষেতে দেখা দিলে জমির পানি শুকিয়ে দিন। ক্ষেতে পানি না থাকলে পোকার কীড়া পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না।
ধানের রোগ দমন ব্যবস্থাপনা : ধানের রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার বাড়াতে হবে। অধিক মাত্রায় নাইট্রোজেন জাতীয় সার প্রয়োগ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। ঝড়ের পর নাইট্রোজেন জাতীয় সার উপরিপ্রয়োগ করা যাবে না। ফসল সংগ্রহের পর জমির নাড়া পুড়িয়ে দিতে হয়।
ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে বিঘাপ্রতি (৩৩ শতাংশ) ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করে  দিতে হবে। ব্লাস্ট রোগসহনশীল ধানের জাত ব্রি ধান ২৮, বিআর১৬ ব্যবহার করতে হবে। এই রোগ দেখা দিলে জমিতে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। যে সকল ধানের জমিতে নাইট্রোজেন ও পটাশ সারের ঘাটতি রয়েছে, ঐ সব জমিতে বাদামি দাগ রোগ দেখা যায়। সে কারণে দাগি ধানবীজ ব্যবহার করা যাবে না। সুস্থ-সবল বীজ ব্যবহার করুন। জমিতে অনুমোদিত মাত্রায় ইউরিয়া ও পটাশিয়াম ব্যবহার করুন। খোল পচা রোগের ক্ষেত্রে রোগ সহনশীল জাত যেমন- ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১ ব্যবহার করতে হবে।
উফরা রোগ, এটি কৃমিবাহিত (নিমাটোড) রোগ। আক্রান্ত ক্ষেতের পানি অন্য ক্ষেতে দেওয়া যাবে না। জমির ফসল সংগ্রহের পর অন্য ফসল চাষের পূর্বে জমি চাষ দিয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন ফেলে রাখতে হবে।
ধানের জমিতে  আগাছার আক্রমণে নিচু জমিতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০% ফলন কম হতে পারে। আগাছা মুক্ত ধানবীজ ব্যবহার করতে হবে কৃষি যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে ব্যবহার করতে হবে, আইল, সেচনালা পরিষ্কার রাখতে হবে। আধা পচা গোবর সার ব্যবহার না করা।  সার উপরি প্রয়োগকালীন একই সময় হাত দিয়ে আগাছা তুলে মাটি চাপা দেয়া যেতে পারে।
ধানক্ষেতে চারা রোপণের পর কিছুদিন পানি রাখলে আগাছা কম হয়। আগাছার ফুল অথবা পরিপক্ব হওয়ার আগে তুলে ফেলতে হবে।
ওপরের ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়ন করলে ধান উৎপাদনে খরচ অনেকটা কম হবে। য়

 সাবেক উপপরিচালক, ডিএই, গোপালগঞ্জ। মোবাইল : ০১৭১২২৫৭০৬২  ই-মেইল : ashit.saha001@gmail.com

বিস্তারিত
মাসকলাইয়ের নতুন জাত বিনামাস-২ এর চাষাবাদ প্রযুক্তি

মাসকলাইয়ের নতুন জাত বিনামাস-২ এর চাষাবাদ প্রযুক্তি
ড. এম. মনজুরুল আলম মন্ডল

ডাল বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় উদ্ভিদ উৎস থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮.২ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১০.৬৫ লক্ষ টন ডাল উৎপাদিত হয়, যা চাহিদার  এক-চতুর্থাংশ। অপরদিকে ৪৬,৭০০ হেক্টর জমিতে মাসকলাইয়ের উৎপাদন মাত্র ৫৩,৭০০ টন মাত্র। উপরন্তু প্রতি বছর দেশে ডাল উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ খুবই কম কিন্তু বাড়ছে ডালের চাহিদা। চাহিদার তুলনায় মাসকলাই এর আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো মাসকলাই আমন ধানের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে বিগত কয়েক বছরে মাসকলাইয়ের আবাদ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমান  প্রচলিত জাতগুলোর ফলন খুবই কম।  মাসকলাইয়ের ফলন যেন বৃদ্ধি পায় সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ গবেষণার মাধ্যমে একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন যা স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন এবং ফলনও ভাল। নতুন জাতটি জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক ২০২১ সালে খরিফ-২ মৌসুমে চাষের জন্য বিনামাস-২ নামে নিবন্ধন লাভ করে। জাতটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জাতটির উদ্ভাবক ড. স্নিগ্ধা রায়, সিএসও বলেন যে,  স্থানীয় জাতের মতো লতানো হয় না। এ জাতটির গাছ খাড়া ও ছোট, জীবনকাল কম (বীজ বপন থেকে পরিপক্ব পর্যন্ত সময় লাগে ৭৫-৭৮ দিন), বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয়ে বড় ও বীজত্বক চকচকে কাল। বিনা মাস-২ বীজে আমিষের পরিমাণ ২২-২৪%। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১.৫ টন এবং পাতা হলুদ মোজাইক ভাইরাস সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন।
চাষাবাদ পদ্ধতি
বৃষ্টির পানি জমে থাকে না এরূপ যে কোন জমিতেই মাসকলাই এর চাষ করা যায়। তবে বেলে দো-আঁশ ও পলি দো-আশ মাটি, মাঝারি উঁচু এবং সুনিষ্কাশিত জমি মাসকলাই আবাদের জন্য উপযোগী। জমির অবস্থাভেদে ২-৪টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। মাসকলাই চাষের জন্য ২টি চাষই যথেষ্ট তবে পতিত জমির জন্য ৩-৪টি চাষ লাগে।
বীজ শোধন ও বীজ বপন : বীজবাহিত রোগ দমনের জন্য বীজ শোধন করে বপন করা দরকার। প্রতি কেজি বীজের জন্য       ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন বা অন্য কোন উপযোগী বীজ শোধক ছত্রাকনাশক পরিমাণমতো প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২ ঘণ্টা রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে বীজ শোধন করা যায়। ছিটিয়ে এবং সারি করে বীজ বপন করা যায়। সারিতে বপনের ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ১২ ইঞ্চি রাখতে হবে। প্রতি একরে ১৪-১৬ কেজি বীজ দরকার হয়। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে বীজের পরিমাণ কিছুটা বেশি দিতে হয়। বপনের সময় অঞ্চলভেদে কিছুটা তারতম্য হয়।    খরিফ-২ মৌসুমে ১ ভাদ্র থেকে ১৫ই ভাদ্র (আগস্টের       ১৫-৩১) পর্যন্ত বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বপন করা যায়। আগস্টের পরে বীজ বপন করলে ফলন হ্রাস পায়।
সার প্রয়োগ : জমির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে সারের তারতম্য করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সার সুপারিশমালা অনুসরণ করতে হবে। তবে সাধারণভাবে অনুর্বর জমিতে একরে ১৬-২০ কেজি ইউরিয়া, ৩৪-৩৮ কেজি টিএসপি,    ১২-১৬ কেজি এমওপি ও ৫ কেজি জিপসাম সার শেষ চাষের সময় সমুদয় সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। অপ্রচলিত এলাকায় আবাদের জন্য জীবাণুসার প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রতি কেজি বীজের জন্য ৫০-৮০ গ্রাম হারে অণুজীব প্রয়োগ করা যেতে পারে। জীবাণুসার ব্যবহার করলে ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন নাই।
জীবাণুসার প্রয়োগ ও ব্যবহার পদ্ধতি : এক কেজি ভিজা মাসকলাই বীজের মধ্যে ৫০-৮০ গ্রাম জীবাণুসার ছিটিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করতে হবে যাতে বীজের গায়ে সমভাবে মিশে যায়। জীবাণুসার মেশানোর পর বীজ বেশি সময় রোদে ফেলে রাখলে গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই তাড়াতাড়ি বীজ বপন করতে হবে।
অন্যান্য পরিচর্যা : চারা গজানোর পরে জমিতে আগাছা দেখা দিলে ১৫-২০ দিন পর নিড়ানি দিয়ে হালকাভাবে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। এতে ভাল ফলন পাওয়া যায়।  বিনামাসকলাই-২ এ পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম। বিছাপোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা এবং ফল ছিদ্রকারী পোকা মাসকলাই মারাত্মক ক্ষতি করে। বিছাপোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা ডিম থেকে ফোটার পর ছোট অবস্থায় পোকাগুলো একস্থানে দলবদ্ধভাবে থাকে এবং পরবর্তীতে আক্রান্ত গাছের পাতা খেয়ে জালের মতো ঝাঁঝরা করে ফেলে। এ পোকা দমনের জন্য আক্রান্ত পাতা দেখে পোকাসহ পাতা তুলে পোকা মেরে ফেলতে হবে। প্রতি বিঘায় ৮-১২টি গাছের ডাল বা কঞ্চি পুঁতে দিলে পোকাভোজী পাখি কীড়া খেয়ে দমন করতে পারে।  আক্রমণ খুব বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক এ্যাডমায়ার ২০০এসএল@ ০.৫০ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩ বার ১০ দিন অন্তর অন্তর স্প্রে করে অথবা রিপকর্ড ১০ইসি বা পারফেকথিয়ন ৪০ইসি ২০মিলি প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ক্ষেতে ১০ দিন অন্তর অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করেও পোকা দমন করা যায়।
রোগ দমন : বিনামাসকলাই-২ পাতার সার্কোস্পোরা দাগ রোগ ও পাউডারি মিলডিউ রোগ প্রতিরোধ  ক্ষমতাসম্পন্ন এবং হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগ সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন। মোজাইক ভাইরাস রোগ দেখা দেয়া মাত্র গাছ উপড়ে ফেলতে হবে। সাধারণত কোন ছত্রাকনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না তবে ছত্রাকের (সার্কোস্পোরা দাগ রোগ) মারাত্মক আক্রমণ হলে যে কোন ছত্রাকনাশক (ডাইথেন এম ৪৫, বেভিস্টিন ৫০) ৭-১০ দিন পর পর দুবার প্রয়োগ করা যেতে পারে। পাউডারি মিলডিউ রোগ দমনের জন্য টিল্ট-২৫০ বা থিওভিট (০.২%) ১০ দিন পরপর ২ বার স্প্রে করতে হবে।      
ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ : খরিফ-২ মৌসুমে মধ্য কার্তিক (অক্টোবর মাসের শেষে) ফসল সংগ্রহ করতে হয়। ফসল পরিপক্ব হলে শুঁটি কাল হয়ে আসে। এ সময় মাসকলাই এর গাছ মাটির উপর হতে কেটে অথবা উপড়ে সংগ্রহ করতে হবে। ৩-৪ দিন রোদে শুকিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে দানাগুলো আলাদা করতে হবে। মাড়াই করা বীজ রোদে ভালো করে শুকিয়ে ঠাণ্ডা করে গুদামজাত করতে হবে। বীজ সংরক্ষণ করতে হলে কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। যথা: ১) বীজ এমনভাবে শুকাতে হবে যাতে বীজের আর্দ্রতা ১২% এর বেশি না থাকে। ২) পলিথিনের ব্যাগ, টিনের ড্রাম, আলকাতরা মাখা মাটির মটকা বা কলসীতে বীজ সংরক্ষণ করে মুখ ভালোভাবে আটকিয়ে রাখতে হবে যেন কোনভাবেই ভেতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। বীজ শুকানোর পর গরম অবস্থায় সংরক্ষণ না করে ঠাণ্ডা হলে সংরক্ষণ করতে হবে। ৩) বীজের পাত্র অবশ্যই ঠাণ্ডা অথচ শুষ্ক জায়গায় রাখতে হবে। সরাসরি মেঝেতে না রেখে মাচা বা কাঠের তক্তার উপর রাখলে ভালো হয়। ৪) মাঝে মধ্যে বীজের আর্দ্রতার দিকে নজর রাখতে হবে। বীজের আর্দ্রতা বেড়ে গেলে প্রয়োজনমতো রোদে শুকিয়ে পূর্বের মতো একই নিয়মে পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। য়


চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১৬৭৪৯৪২৯
ই-মেইল :  mmamondal@gmail.com

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি

মাসিক ‘কৃষিকথা’য় লেখা আহ্বান

সম্মানিত লেখক/পাঠকগণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, কৃষিকথা পত্রিকাটি কৃষি তথ্য সার্ভিসের একটি ঐতিহ্যবাহী মাসিক কৃষি বিষয়ক ম্যাগাজিন। পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠানের গর্বিত অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক কৃষিকথা পত্রিকাটি বাংলা মাস অনুযায়ী প্রতি মাসে প্রকাশিত হয়ে থাকে। এতে বরেণ্য কৃষি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ, কৃষি অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, মাঠকর্মী, কৃষকসহ সংশ্লিষ্ট কৃষিজীবীরা বিভিন্ন বিষয়ে লিখে থাকেন। আপনি/আপনার প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত নতুন তথ্য ও প্রযুক্তি কৃষিকথায় প্রকাশের মাধ্যমে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে লেখদের সম্মানীভাতা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষিকথায় প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্টের জন্য অনুমোদিত হারে লেখক সম্মানী প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
তাই আপনি/ আপনার প্রতিষ্ঠানের কৃষি বিষয়ক সময়োপযোগী ও উপযুক্ত কনটেন্ট যেমন- প্রবন্ধ/নিবন্ধ/কৃষিতে নারী উদ্যোক্তা/সফলতা/নাটিকা/ছড়া ইত্যাদি এবং মানসম্মত ছবি সম্বলিত লেখা SutonnyMj ফন্টে প্রমিত বাংলায় প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ শব্দের মধ্যে editor@ais.gov.bd অথবা ass.editorais21@gmail.com ই-মেইল ঠিকানায় প্রেরণ করবেন। উল্লেখ্য উক্ত লেখা যে মাসে ছাপানোর উপযোগী তার কমপক্ষে দুই মাস আগে প্রেরণ নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
অথবা
ডাকযোগে প্রেরণ : পরিচালক অথবা সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় প্রেরণ করতে হবে। সম্মানিত লেখকের নাম, পদবি, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর/নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বর, ই-মেইল আবশ্যক।    
    -সম্পাদক

বিস্তারিত
বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় এক পবিত্র ফল ত্বীন (ডুমুর)

বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় এক পবিত্র ফল ত্বীন (ডুমুর)
ড. শামীম আহমেদ
বাংলাদেশ আয়তনের তুলনায় বেশ ছোট একটি দেশ, তার উপর প্রবল জনসংখ্যার চাপ ও শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনার কারণে ফসলি কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে গত এক দশকে প্রতি বছর গড়ে ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর। এত কিছুর পরও বাংলাদেশর স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে সীমিত সাধ্য নিয়েই কৃষি খাতে বিশ্বের দরবারে গৌরবোজ্জ্বল ও ঈর্ষণীয় অবস্থান তৈরি করেছে। কৃষিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পাট রপ্তানিতে ১ম, পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে ২য়, ধান ও সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম ও আলু উৎপাদনে ৭ম, পেয়ারা উৎপদনে ৮ম ও ফল উৎপাদনে ২৮ তম। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং  কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সফলতা অনেকটা সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। জমির বিবেচনায় মূল্যায়ন না করে  ছোট, মাঝারি ও মধ্যমমানের পাহাড়ি এলাকা এবং বাড়ির আঙ্গিনাতে ছোট ছোট ফলের বাণিজ্যিক ক্ষেত্র গড়ে তোলার এক দুর্দান্ত সম্ভাবনা রয়েছে। আজকাল কিছু গ্রাহক তৈরি হয়েছে যাদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বাজার রয়েছে যেখান থেকে তারা কৃষকদের নিজের উদ্ভিদ থেকে বা বাগান থেকে তাজা ফল সংগ্রহ করে উপভোগ করতে পছন্দ করেন। এসব ফলকে কেউ কেউ ফার্মফ্রেশ বা অর্গানিক বাগান নামে পরিচয় দেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব স্থানে এগ্রো টুরিজমও গড়ে উঠেছে।  এসব বাগানে অনেক প্রকৃতির এক্সোটিক ফল বা গৌণ ফলের চাষাবাদ হচ্ছে। এমনই এক এক্সোটিক ফলের নাম ত্বীন বা ডুমুর। ইংরেজিতে এই ফলকে বলা হয় ঋরম যার  বৈজ্ঞানিক নাম ভরপঁং পধৎরপধ যা গড়ৎধপবধব পরিবারের অন্তর্গত। এর মধ্যে রয়েছে ৬০০  থেকে ১৯০০ এরও  বেশি জাত, যার বেশির ভাগ জন্মে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উদ্যানতত্ত্বের সাথে ডুমুর ফলের নাম দীর্ঘকাল ধরে জড়িত। সৌদি আরব ও বাংলাদেশ এই ফলকে ত্বীন (ডুমুর) নামে ডাকলেও অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে ভারত, তুরস্ক, মিসর, জর্দান ও যুক্তরাষ্ট্রে এটি আঞ্জির নামে পরিচিত।   
পবিত্র কুরআন মাজিদের আত-ত্বীন সূরায় বর্ণিত ত্বীন ও জয়তুন ফলের গুণাগুণ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। সেই ত্বীন বা ডুমুর গাছগুলো সাধারণত পাতলা, দ্রুত বর্ধনশীল এবং বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যার ফলে গাছগুলো উচ্চতার চেয়ে প্রস্থে বেশি হয়ে থাকে। ত্বীন চরম জলবায়ু অর্থাৎ শুষ্ক ও শীত প্রধান দেশে চাষ হলেও আমরা প্রমাণ করেছি নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতেও ৩৬৫ দিন এ ফল উৎপাদন সম্ভব।
ডুমুরের অনুমোদিত কোনো জাত নাই। তবে বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে ডুমুরের যে গাছগুলো হয় সে ডুমুরগুলো হলো জগডুমুর। এর বৈজ্ঞানিক নাম ঋরপঁং ৎধপবসড়ংধ। জগডুমুরের বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। কোনোটি বিশ-ত্রিশ গ্রাম, আবার কোনোটি   পঞ্চাশ-ষাট গ্রাম ওজনের হয়। পাকলে কোনোটি লাল, আবার কোনোটি হলুদ রঙ ধারণ করে।
এ ছাড়াও আরেক প্রজাতির মূল্যবান ডুমুর আছে, যেটিকে   মিসরীয় ডুমুর (ঊমুঢ়ঃরধহ ঋরপঁং) বলা হয়। এটি খুব রসালো ফল ও অনেক বড় হয়। এটি দু’ভাবে খাওয়া যায়। একটি হলো কাঁচায় সরাসরি খাওয়া যায়। অন্যটি হলো রোদে শুকিয়ে কাঁচের কন্টেইনারে রেখে সারা বছর খাওয়া যায়।
প্রতিটি গাছ থেকে প্রথম বছরে এক কেজি, দ্বিতীয় বছরে        ৭  থেকে ১১ কেজি, তৃতীয় বছরে ২৫ কেজি পর্যন্ত ফল ধরে। এভাবে ক্রমবর্ধিত হারে একটানা ৩৪ বছর পর্যন্ত ফল দিতে থাকে। গাছটির আয়ু হলো প্রায় ১০০ বছর। তিন মাসের মধ্যেই শতভাগ ফলন আসে। আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ডুমুর আকৃতির এই ফল সবার দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিটি পাতার গোড়ায়  গোড়ায় ত্বীন ফল জন্মে থাকে।
ত্বীন বা ডুমুরের জৈবিক বৈশিষ্ট্য
ডুমুর ফল একটি সমন্বিত বা কম্পোজিট আকৃতির ফল যা মূলত : ফাঁকা শেলের মধ্যে অভ্যর্থনা টিস্যু বা ৎবপবঢ়ঃধপষব ঃরংংঁব   দ্বারা ঘেরা পৃথক পৃথক স্ত্রী ফুল থেকে শত শত পৃথক পেডিকেলেট ড্রপলেটস আকারের অভ্যর্থনা প্রাচীরের আস্তরণ থেকে বিকাশ লাভ করে।  কম্পোজিট আকৃতির ফলকে বলা হয় ‘ংুপড়হরঁস’। একটি পরিপক্ব ডুমুর ফলের ত্বক শক্ত চামড়া বিশিষ্ট সাদা রঙের হয়ে থাকে। ভেতরে একটি মিষ্টি জিলেটিনাস সজ্জা সমন্বিত পৃথক পৃথক পাকা ড্রপলেটের অস্তিত্ব বিশিষ্ট বীজ বিদ্যমান। এই পুরো অভ্যন্তরীণ অংশটিই ভক্ষণযোগ্য। স্বতন্ত্র ফলের পাশাপাশি ডুমুর পরাগায়ন বায়োলজিও বেশ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। জংলি ডুমুর গাছে একই  ‘ংুপড়হরঁস’ এ কার্যকরী পুরুষ ও স্ত্রী উভয় ফুলই বিদ্যমান। ভক্ষণযোগ্য ডুমুরের স্ত্রী ফুল সাধারণত বড় আকৃতির হয় এবং রসালো ফ্রুটলেট তৈরি করে।
ত্বীন বা ডুমুর গাছের আকৃতি ও চারা মূল্য
ত্বীন গাছগুলো দ্রুতবর্ধনশীল, ঝোপালো আকৃতির হওয়ায় এই গাছগুলো যেমন বৃদ্ধি কম হয়, তেমনি এর কাণ্ড খুব নরম     প্রকৃতির হয়। তাই ত্বীন বা ডুমুরের যেমন কাটিং করে বংশবিস্তার করা যায় তেমনি বীজ থেকেও চারা উৎপাদন করা যায়। প্রতিটি গাছ ছয় থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। প্রতিটি গাছে ন্যূনতম ৭০ থেকে ৮০টি ফল ধরে।  খোলা মাঠ ছাড়াও টবের মধ্যে ছাদ বাগানে ত্বীন চাষ করে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। দুই মাস বয়সি চারার পাইকারি মূল্য ৫২০ টাকা ও খুচরা মূল্য ৭২০ টাকা।
মাটিতে কিংবা টবে ত্বীন বা ডুমুর ফলের চাষাবাদ পদ্ধতি
কোনো রাসায়নিক সার ছাড়াই, মাটিতে জৈব ও কম্পোস্ট সার মিশিয়ে রোদে মাঠে ও ছাদে টবে লাগিয়ে ত্বীন ফল উৎপাদনে সাফল্য পাওয়া গেছে। তাই ছাদবাগানীদের মধ্যে  বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। সেক্ষেত্রে অন্যান্য ফল গাছের তুলনায় ডুমুর গাছে খুব দ্রুত ফল ধরে। একটি ডুমুরের কাটিং চারা লাগানোর      ৪-৫ মাস পর থেকেই ফল দিতে শুরু করে। তাই গাছ লাগানোর ২-৩ মাস পর থেকেই টবের গাছকে নিয়মিত অল্প করে সরিষার খৈল পচা পানি দিতে হবে।  সে অনুযায়ী ১০-১৫ দিন পর পর সরিষার খৈল পচা পানি প্রয়োগ করতে হবে। সরিষার খৈল গাছে দেওয়ার কমপক্ষে ১০ দিন আগেই পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরে সেই পচা খৈলের পানি পাতলা করে গাছের গোড়ায় দিতে হবে। ১ বছর পর টবের আংশিক মাটি পরিবর্তন করে দিতে হবে। ২ ইঞ্চি প্রস্থে এবং ৬ ইঞ্চি গভীরে শিকড়সহ মাটি ফেলে দিয়ে নতুন সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে তা ভরে দিতে হবে। টবের মাটি পরিবর্তনের কাজটি সাধারণত শীতের আগে ও বর্ষায় শেষ করাই ভালো হয় । টব বা ড্রামের মাটি ১০-১৫ দিন পর পর কিছুটা খুঁচিয়ে দিতে হবে।
ত্বীন বা ডুমুরের পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা
পোকামাকড়ের মধ্যে গবষড়রফড়মুহব, ঘবসধঃড়ফধ দ্বারা ডুমুর গাছের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। অৎঃযৎড়ঢ়ড়ফ এর দ্বারাও ডুমুর গাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হলে ফল ভেঙে যাওয়া রোগ (ভৎঁরঃ ংঢ়ষরঃঃরহম) হতে দেখা যায়। অষঃবৎহধৎরধ,    অংঢ়বৎমরষষঁং, ইড়ঃৎুঃরং, এবং চবহরপরষষরঁস  ছত্রাক রোগ দমনে ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হয়। ডুমুরের আর একটি কমন রোগ হলো ভরম সড়ংধরপ ফরংবধংব (ঋগউ) যা হলে ডুমুর গাছ মোজাইকের মতো হলুদ রং ধারণ করে। এ সমস্ত রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে নিকটবর্তী কৃষি অফিসে   যোগাযোগ করে পরিমিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।
ত্বীন বা ডুমুর ফলের পুষ্টি গুণাবলি
ডুমুরে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি ১, ভিটামিন বি ২, ছাড়াও প্রায় সব রকমের জরুরি নিউট্রিশনস যেমন ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, সোডিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম ইত্যাদি আছে। ভিটামিন-এ, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের অভাবজনিত রোগে এটি বেশ কার্যকরী। কার্বোহাইড্রেট, সুগার, ফ্যাট, প্রোটিন, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ছাড়াও বিভিন্ন পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ডুমুর। পুষ্টিগুণের পাশাপাশি ডুমুরের অনেক ঔষধি গুণও রয়েছে। ডুমুর কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে সহায়তা করে। ডুমুর দেহের ওজন কমানো, পেটের সমস্যা দূর করা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখাসহ নানা উপকার করে থাকে। মৃগীরোগ, প্যারালাইসিস, হৃদরোগ, ডিপথেরিয়া, প্লীহা বৃদ্ধি ও বুকের ব্যথায় ডুমুর কার্যকরী। ডুমুর শরীরে এসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। শরীরে পিএইচের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। ডুমুর পাতা ডায়াবেটিক রোগীদের ইনসুলিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালের নাশতার সঙ্গে ডুমুরের পাতার রস খেতে হবে। ডুমুর ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়াও ডুমুর গাছের কষ পোকার কামড় বা হুল ফুটানো ব্যথা নিরাময়ে কার্যকরী।
ত্বীন বা ডুমুরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ব্যাপক ত্বীন চাষাবাদের ফলে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি বিকল্প আরেকটা সম্ভাবনা হিসেবে ত্বীন ফলের চাহিদা দেখা দিয়েছে। সরকারের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ফল রপ্তানি করে আন্তর্জাতিকভাবে বাজার ধরা সম্ভব। ত্বীন একটি সম্ভাবনাময় ফসল। যা চাষ করে দেশের বেকারত্ব দূর এবং রপ্তানি করে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে চাষাবাদকৃত ত্বীন বা ডুমুরের জাতগুলোর মধ্যে ফল নীল, মেরুন, লাল, হলুদসহ বিভিন্ন বর্ণের হয়ে থাকে। এখানকার গাছে প্রতিটি ত্বীন ফল ওজনে ৭০ থেকে ১১০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। ডুমুরের প্রতি কেজির মূল্য এক হাজার টাকা। ফলের পাশাপাশি শৌখিন চাষিরা চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ১০ থেকে ২০ হাজার টাকায় টবসহ ফল ধরা চারা বিক্রি হচ্ছে। রমজানে পবিত্র ফল হিসেবে খেজুরের পাশাপাশি ত্বীন ফলকে নিয়েও অনেকে ভাবছেন। দেশের প্রচার মাধ্যমে ত্বীন ফলের চাষ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়াও বিদেশ থেকে ত্বীনের আমদানি নির্ভরতা কমে আসার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে ঘরোয়া বাজারেও এই ত্বীন ফলের একটি বড় ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে। এক্সোটিক বা গৌণ ফল হিসেবে স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুটস কিংবা এভোকেডোর চেয়ে ত্বীন ফলের চাহিদা বেশি। য়
অতিরিক্ত উপপরিচালক, হর্টিকালচার উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি। মোবাইল : ০১৭১১১৭৪৩৪৫
ইমেইল : ashamim.uni@gmail.com

বিস্তারিত
বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান-২১০০ সঠিক বাস্তবায়ন : মৎস্য সেক্টরে উজ্জ্বল সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান-২১০০ সঠিক বাস্তবায়ন : মৎস্য সেক্টরে উজ্জ্বল সম্ভাবনা

মো. সাইফুল ইসলাম১ পারভেজ চৌধুরী২ মো: হাসিবুর রহমান৩

ডেল্টা প্লান ২১০০ হচ্ছে বাংলাদেশের শতবর্ষ মেয়াদি একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা। সামনের দিনে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও আর্থসামাজিক দলিল হিসেবে এ পরিকল্পনা বিবেচিত হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে দেশের ৮টি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ধরে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির মাত্রা চিহ্নিত করা হয়েছে যা কৃষি তথা মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলোকে অভিন্ন গ্রুপ বা হটস্পটে চিহ্নিত করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। বদ্বীপ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হবে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরিবর্তিত জলবায়ু মোকাবিলার মাধ্যমে যা দেশে ক্রমবর্ধমান মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া এ পরিকল্পনার হটস্পট খড়াপ্রবণ এলাকায় পানির সুব্যবস্থা, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবাযুর প্রভাব হ্রাস ও হাওড় অঞ্চল সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৎস্য খাতের উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।
ডেল্টা হটস্পট বাস্তবায়ন এবং মৎস্য সেক্টরে ভূমিকা
বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের অন্যতম হলো আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় অঞ্চল, হাওড় ও প্লাবনভূমি রক্ষা। এ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে দেশীয় মাছসহ অন্যান্য মাছের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাচুর্যতা বৃদ্ধি পাবে। ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা চিহ্নিত হটস্পট উপকূলীয় অঞ্চল ১৯টি জেলার ২৭,৭৩৮ বর্গকিলোমিটার, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল ১৮টি জেলার ২২,৮৪৮ বর্গকিলোমিটার, হাওড় এবং আকস্মিক বন্যা প্রবণ ৭টি জেলার ১৬,৫৭৪ বর্গকিলোমিটার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ৩টি জেলার ১৩,২৯৫ বর্গকিলোমিটার, নদী অঞ্চল ও মোহনা ২৯টি জেলার ৩৫,২০৪ বর্গকিলোমিটার এবং নগর এলাকাসমূহ ৭টি জেলার ১৯,৮২৩ বর্গকিলোমিটার            প্রভৃতি এলাকাসমূহ যথাযথ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে।     
উপকূলীয় অঞ্চল
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বর্তমানে  হেক্টরপ্রতি চিংড়ির উৎপাদনের হার পাশ্ববর্তী চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। তবে উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের ম্যধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। একইসাথে উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্পবর্জ্য, নৌযান থেকে চুইয়ে পড়া তেল, সুন্দরবনে বেআইনি মাছ আহরণ, উজান থেকে বেশি পরিমাণে পলি জমা, বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ সম্পর্কে অজ্ঞতা, দূষণ ইত্যাদি প্রধান সমস্যারূপে দেখা দিয়েছে।
বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল
জলাবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব বিবেচনায় পরিবেশগত সঙ্কটাপন্ন দেশের বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে মৎস্য চাষের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাঞ্চলে ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিল, প্লাবনভূমি ও মরা নদীতে মাছ চাষে উদ্যোগ গ্রহণ করলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র/প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মাছ চাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
হাওড় এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাসমূহ
বাংলাদেশের বিস্তৃত হাওড় ও প্লাবনভূমি অঞ্চলে মাছের উৎপাদন ঋতুভিত্তিক এবং তা অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও অনাবৃষ্টির কারণে জীববৈচিত্র্য ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্লাবনভিত্তিক মৌসুমি কাদাযুক্ত এলাকা, গভীর-অগভীর জলাশয়, প্লাবনভূমি ও হাওড়ে                 প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণের লক্ষ্যে স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
নদী অঞ্চল এবং মোহনা
বাংলাদেশ মূলত নদী বিধৌত দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনসহ মানবসৃষ্ট কারণে দেশের নদ-নদী হতে মাছের উৎপাদন ক্রমহ্রাসের সাথে সাথে জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষাকালে প্রায় সব নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে, আবার শীতকালে পানি কমে যাওয়ায় নদী শুকিয়ে পলি জমে নদীর মুখ ও মোহনা ভরাট হয়। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই নদীর পানির স্রোত  আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় ফলে নদী ও মোহনা ভরাট হওয়ায় মৎস্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই নদী ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রয়োগে এ হতে মৎস্যসম্পদের উৎপাদনবৃদ্ধি করা যাবে বলে আশা করা যায়।
ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নে মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন কর্মকৌশল
নদীমাতৃক বাংলাদেশে খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান, কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর     জীবনমান উন্নয়নে মৎস্যচাষ একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে মিঠাপানিতে চাষের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২য়। পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ ও নদী বিধৌত এদেশে কৃষি ও অর্থনীতিতে নদী, বিলÑহাওড় ও উপকূলীয় জলাভূমির প্রভাব অপরিসীম। কিন্তু প্রতি বছর বাংলাদেশে দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর কারণে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিবর্তিত জলবায়ু প্রভাব ও হটস্পটগুলো সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে কৃষি ও মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভবপর হবে। ডেল্টা প্লান-২১০০ বাস্তবায়নে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির নিমিত্তে ৯টি কৌশলগত উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এগুলো হলো-প্রাকৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার; জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ; নতুন সমুদ্র সীমানায় মৎস্যসম্পদ আহরণ; মানবসম্পদ উন্নয়ন; বর্ধিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; জেলে সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন; মৎস্য ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নয়ন; বৃহৎ মৎস্য গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন; মৎস্য ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় বৃদ্ধি।
ডেল্টা প্লান বাস্তবায়ন ও মৎস্য সেক্টরে সম্ভাবনা
ডেল্টা প্লান সরকারের রূপকল্প ২০৪১, এসডিজি ২০৩০ এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে প্রতিনিধিত্ব করে বিধায় জলবায়ু পরিবর্তন, সুনীল অর্থনীতি এবং টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। এই পরিকল্পনা প্রণয়নে দেশের ৮টি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ধরে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির মাত্রা চিহ্নিত করা হয়েছে যা কৃষি তথা মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি বদ্বীপ-২১০০ উল্লিখিত মৎস্য কর্মকৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অর্জিত হতে পারে। যেমন : ১. বর্তমানে ব্লু ইকোনমি এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এর অপার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামুদ্রিক মৎস্য ও মৎস্যপণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির অন্যতম খাত হতে পারে। ২. আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে দেশীয় মাছসহ অন্যান্য মাছের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাচুর্যতা বৃদ্ধি পাবে। ৩. উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। একইসাথে উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্পবর্জ্য, নৌযান থেকে চুইয়ে পড়া তেল, সুন্দরবনে বেআইনি মাছ আহরণ, উজান থেকে বেশি পরিমাণে পলি জমা, বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ সম্পর্কে অজ্ঞতা, দূষণ রোধ সম্ভব হবে। ৪. বিল, প্লাবনভূমি ও মরা নদীতে মাছ চাষে উদ্যোগ গ্রহণ করলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র/প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মাছ চাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ৫. হাওড়সহ মৌসুমি কাদাযুক্ত এলাকা, গভীর-অগভীর জলাশয় ও প্লাবনভূমিতে প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণের লক্ষ্যে স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে তা মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় তৈরি হওয়া ‘ডেল্টা প্লান ২১০০’ দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’র সফল বাস্তবায়নে কার্যকরী কৌশল অবলম্বন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ন্যায়সঙ্গত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জলাভূমির সর্বোচ্চ ও যথোপযুক্ত ব্যবহার ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। পরিশেষে বলা যায় ‘ডেল্টা প্লান ২১০০’ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে টেকসই মৎস্যসম্পদ উৎপাদনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। য়

১,২,৩বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭৪৪১৪৫৪৭৮, ই-মেইল : kasibkhan94bfri@gmail.com

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর কৃষি উন্নয়ন দর্শনে কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকার

বঙ্গবন্ধুর কৃষি উন্নয়ন দর্শনে কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকার

কৃষিবিদ মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। বিপন্ন জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জনগণের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। এ জন্য জীবনের একটি বড় সময় জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন এ দেশের শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত               কৃষকদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তাই তিনি সর্বদা কৃষির প্রতি শ্রদ্ধা ও অগ্রাধিকার প্রদান করতেন। বিখ্যাত দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও গৌরবমণ্ডিত শিল্প হচ্ছে             কৃষি।” বঙ্গবন্ধু দার্শনিক রুশোর বাণীকে লালন করতেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে কৃষির উন্নয়ন  অপরিহার্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, গতানুগতিক কৃষি ব্যবস্থা দ্বারা বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য তিনি কৃষির আধুনিকায়নে মনোনিবেশ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কৃষি উন্নয়নের একমাত্র কারিগর হচ্ছেন এদেশের কৃষক ও             কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটরা।
কৃষিতে বঙ্গবন্ধুর গৃহীত কার্যক্রম
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করেন, ফলে কৃষি শিক্ষায়  মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলে এ দেশের কৃষক ও কৃষির উন্নয়নে যে সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটের ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ১০১ কোটি টাকা রেখেছিলেন কৃষি উন্নয়নের জন্য, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণের প্রবর্তন, স্বাধীনতা পরবর্তীতে ২২ লাখ কৃষককে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ, ১৯৭২ সালে কৃষকদের মাঝে ধান, গম ও পাটবীজ বিতরণ, বৃক্ষ রোপণ অভিযান চালুকরণ, কৃষিতে ভর্তুকির ব্যবস্থা গ্রহণ, সার,      কীটনাশক ও সেচযন্ত্র সরবরাহ এবং গ্রামভিত্তিক সবুজ    বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, খাদ্যের অভাব হলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। সে জন্য তিনি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার জন্য বাঙালি জাতি যখন অগ্রসরমান, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ঘাতকরা তাঁকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী মহলের হস্তক্ষেপে তাঁর সোনার বাংলা আর আশার আলো দেখেনি। কৃষি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ফলে বিগত দিনগুলোতে বিপুল সম্ভাবনাময় কৃষি খাতে উন্নয়নের ভাটা পড়ে।
কৃষিতে বর্তমান সরকারের সাফল্য ১৯৯৬ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এ লক্ষ্যে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি উন্নয়ন, মহিলাদের কৃষিতে অংশগ্রহণ ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২০০৮ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার আরো এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কৃষি খাতে আবার ভর্তুকি, সার বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, শস্য বহুমুখীকরণসহ অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৭২ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে যেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল প্রায় এক কোটি  টন সেখানে শস্যের উৎপাদন বর্তমানে প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে এ যুগান্তকারী সাফল্য বঙ্গবন্ধুর অবদান। বাঙালি জাতি চিরদিন তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
কৃষিতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে, ফল ও মাঠ ফসলের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩.০২ শতাংশ (তথ্য সূত্র : কৃষি ডাইরি-২০২১)। কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণ সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০ এবং রূপকল্প-২০৪১ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ  হাসিনার নানা পদক্ষেপের ফলে কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হয়েছে। কৃষিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারও কৃষকদের উৎসাহিত করেছে।
বর্তমান সরকারের আমলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কারণ
বর্তমান সরকারের আমলে চারটি প্রধান কারণে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে- ১. ফসল আবাদের জন্য কৃষক এখন বেশি পরিমাণ গুণগত মানসম্পন্ন ফসলের বীজ পাচ্ছেন, ২.              কৃষি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ফসলের অধিকসংখ্যক জাত উদ্ভাবন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে, ৩. সারের মূল্যহ্রাস ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় কৃষক তার জমিতে স্বল্পমূল্যে সুষম সারপ্রয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে, ৪. বেসরকারি বীজ আমদানিকে উৎসাহিত করায় দেশে ভুট্টা, সবজি,       গোলআলু এবং পাটবীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বীজ ব্যবস্থাকে বিশেষ সুযোগ প্রদান করায় প্রাইভেট সেক্টর দেশে প্রচুর সবজি বীজ আমদানির মধ্য দিয়ে কৃষকের কাছে সবজি বীজের জোগান বৃদ্ধি করতে পেরেছে। ফলে দেশে মুক্ত পরাগী বীজের পাশাপাশি হাইব্রিড সবজি বীজের সরবরাহও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সবজি উৎপাদন বেড়েছে।
দেশে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার আরও যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে      ৫০-৭০% ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ,   কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার জন্য বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ফসল উৎপাদনে প্রণোদনা প্রদান এবং কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা। ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রম জোরদারকরণ, জলাবদ্ধ এলাকা, হাওড় ও দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র  সেচ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার উৎসাহিতকরণ। সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য সেচের আওতা বাড়ানো, পাহাড়ে ঝিরি বাঁধ, রাবার ড্যাম ইত্যাদি নির্মাণ করা।
কৃষি পণ্যের বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য। পাইকারি বাজার সৃষ্টি, গ্রোয়ার্স মার্কেট, কুল চেম্বার স্থাপন, রিফার ভ্যানে পণ্য বিপণন, নতুন উদ্যোক্তা      সৃষ্টি ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপণন ব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। কৃষি জমি ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে বলে বৃহত্তর বরিশাল, খুলনা ও সিলেট জেলার পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু করা হয়, দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার কৃষির সার্বিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ২০১৩ সনে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ         মহাপরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি জেলায়       সামগ্রিকভাবে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে কর্মকাণ্ড শুরু করা হয়।
কৃষিতে বর্তমান সরকারের ডিজিটাল কার্যক্রম
বর্তমান সরকারের আমলে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে কৃষক ফসল উৎপাদন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সহজে গ্রহণ করতে পারছে। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে কৃষি বিষয়ক তথ্যপ্রবাহকে গতিশীল করতে না পারলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া প্রায় অসম্ভব। তাই ডিজিটাল কৃষি এখন সময়ের চাহিদা। কৃষি একটি গতিশীল বিজ্ঞান। গবেষণার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি সময়মতো কৃষকের কাছে না পৌঁছালে এর সুফল পাওয়া যাবে না। এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকার ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার জনপ্রিয় করছে।
কৃষি খাতে ৪র্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা
সরকার কৃষি খাতে ৪র্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রিসিশন ফার্মিং নিশ্চিতকরণ, কৃষিতে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্তভাবে জমিতে কীটনাশক ব্যবহার, বায়োটেক গবেষণা জোরদারকরণ, বায়োটেক প্রযুক্তি বিস্তার, সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হ্রাস, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি, ক্রপ মডেলিং, মলিকুলার ব্রিডিং, নিরাপদ খাদ্য, চাহিদা নিরূপণ, মূল্য সংযোজন, লবণাক্ততা/খরা/জলমগ্নতা ব্যবস্থাপনা, কৃষি বাণিজ্য, বীজ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে ৪র্থ শিল্পবিপ্লব প্রযুক্তি ব্যবহার সরকারের পদক্ষেপের একটি অংশ। কৃষিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্তকরণ এবং শোধনসহ ন্যানো প্রযুক্তির সার, বালাইনাশক উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মাধ্যমে উপকরণ দক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। পলিহাউজ, হাইটেক    গ্রিনহাউজ ফার্মিং, বায়োফার্টিলাইজার, বায়োপেস্টিসাইড ও     মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ব্যবহার বৃদ্ধি, ভার্টিক্যাল ফার্মিং, রিসাইক্লিং এগ্রিকালচার, কৃষকের ডাটাবেজ, ডিজিটাল আইডি কার্ড প্রবর্তন, কৃষি সংশ্লিষ্ট জনবলের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি কার্যক্রম চলমান আছে।       
সরকার কর্তৃক কৃষিক্ষেত্রে গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে বর্তমানে কৃষির প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রত্যেকটি খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হওয়ায় এখন বাংলাদেশ কেবল খাদ্য নিরাপত্তা নয় বরং পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। য়

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা।
মোবাইল :  ০১৬৭৫৭৫১৩২২; ই- মেইল : Jahangirhossain dae@gmail.com

 

বিস্তারিত
তালের চারা উৎপাদন কলাকৌশল

তালের চারা উৎপাদন কলাকৌশল
ড. মো. শামসুল আরেফীন

তালগাছ লম্বাকৃতির সোজা পাম ((Palm) জাতীয় উদ্ভিদ। তালগাছ বাংলাদেশের সকল এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে জন্মাতে দেখলেও সমুদ্রের তীরবর্তী জেলাগুলোতে ব্যাপকভাবে জন্মে থাকে। এ গাছ পানি ছাড়াই দীর্ঘদিন বাঁচতে পারে। আবার গাছের গোড়ায় পানি দাঁড়ালেও সহজে মারা যায় না। তাই তাল বরেন্দ্র এলাকা হতে শুরু করে ঝড়-ঝঞ্ঝা-লবণাক্তপ্রবণ দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের সকল অঞ্চলে জন্মে থাকে। বাংলাদেশে তালগাছ সাধারণত মিষ্টি রস ও সুস্বাদু গুড়ের জন্য জনপ্রিয় হলেও তালগাছের কোন কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। হাতপাখা ও ঘরের ছাউনি তৈরিতে তালের পাতার ব্যাপক ব্যবহার হয়। তালগাছের কাণ্ডও ঘর তৈরিতে ব্যবহার হয়। তালের রস গ্রামাঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন প্রিয় পানীয়। গ্রামবাংলায় পাকা তালেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তালের পিঠা গ্রাম বাংলায় খুবই জনপ্রিয় ও বহুল আদৃত। পাকা তালের পাশাপাশি কাঁচা তালও গ্রাম বাংলায় ছোট বড় সকল শ্রেণির মানুষের নিকট অতি জনপ্রিয়। কাঁচা তালের শাঁস গ্রীষ্মকালের একটি সুমিষ্ট খাদ্য। তালের রস থেকে তৈরিকৃত গুড় আখের গুড়ের চাইতে সুমিষ্ট, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। খাদ্য হিসাবে তালের রস, কাঁচা তালের শাঁস ও পাকা তাল জনপ্রিয় হলেও তালমিছরি আরও বেশি জনপ্রিয় এবং তালের রস থেকেই তালমিছরি তৈরি করা হয়। কাজেই বাংলাদেশে তাল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তালের উৎপাদন প্রযুক্তি অন্যান্য ফসলের তুলনায় একটু ব্যতিক্রম ধরনের।
তালের উৎপাদন সাধারণত বীজ থেকে সরাসরি হয়ে থাকে। কিন্তু সেখানে ইহার বেঁচে থাকার ক্ষমতা খুবই কম। অনেক সময় চারা গজালেও বিভিন্ন প্রতিকূলতায় বিশেষ করে লবণাক্ত পানির জোয়ারের কারণে চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। সুতরাং তাল চাষ বৃদ্ধি করতে হলে তালের চারা তৈরির সহজ কৌশল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফিজিওলজি এন্ড সুগার কেমিস্ট্রি বিভাগ পলি ব্যাগে তালের চারা তৈরির সহজ  কৌশল উদ্ভাবন করেছে, যা তালের চারা বেঁচে থাকার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বীজ নির্বাচন
আগস্ট মাস থেকে তাল পাকতে শুরু করে এবং অক্টোবর মাস পর্যন্ত পাকা তাল পাওয়া যায়। তালবীজ সংগ্রহ করে নির্বাচন করা উত্তম। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নির্বাচিত মাতৃগাছ হতে তালের বীজ সংগ্রহ করা উচিত। মাতৃগাছ নির্বাচনকালে তালের আকার-আকৃতি, ফলের রসে চিনির পরিমাণ, ঘ্রাণ, স্বাদ, প্রতি গাছে তালের সংখ্যা, কাণ্ডের আকৃতি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলো অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
বীজ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ
উত্তম মাতৃগাছ হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।  পরিপক্ব তাল হতে বীজ সংগ্রহ করে পাকা তালের উপরের শক্ত খোসা ছাড়িয়ে কিছু সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং পরে হাত দ্বারা কচলিয়ে আঁশ হতে রস বের করতে হবে। প্রতিটি তালে সাধারণত তিনটি করে বীজ থাকে এবং রস সংগ্রহ করার সময় বীজগুলো পৃথক হয়ে যাবে। বীজ সংগ্রহের পরপরই বীজতলায় বপন করতে হবে। বীজ শুকিয়ে গেলে অংকুরোদগম হবে না। তাই সংগৃহীত বীজ সতেজ অবস্থায় বীজতলায় রোপণ করতে হবে। পরিপক্ব তালবীজের অংকুরোদগমের হার সাধারণত    ৭০-১০০ ভাগ।
বীজতলা তৈরি ও চারা উৎপাদন
পাকা অথবা ইট বিছানো মেঝেতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। মাটির উপরও বীজতলা তৈরি করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে চারার শিকড় যাতে বীজতলার তৈরি মাটিতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য প্রথমেই মোটা পলিথিন শিট বিছিয়ে দিতে হবে। এরপর ১২-১৩ ইঞ্চি বেলে মাটি অথবা কম্পোস্ট দিয়ে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বীজতলার আকার হবে ১.২ মিটার প্রস্থ এবং ১২ মিটার অথবা জমির সাইজ অনুযায়ী দৈর্ঘ্য হতে পারে। এ আকারের একটি বীজতলা প্রায় ১০০০টি বীজ রোপণ করা যায়। সংগৃহীত বীজ পাশাপাশি রেখে বীজতলার উপর সাজিয়ে বীজকে ওপর থেকে হাল্কাভাবে চাপ দিয়ে বসাতে হবে এবং পরে বীজের উপর ২-৩ সেন্টিমিটার শুকনা খড় অথবা আখের মরা পাতা দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। বীজতলা সবসময় ভিজিয়ে রাখতে হবে। ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যেই বীজ অংকুরিত হতে শুরু করবে। বীজ অংকুরোদগমের সময় বীজপত্রের যে আবরণী বের হয়ে আসে তা দেখতে শিকড়ের মতো কিন্তু আসলে তা শিকড় নয়। এই বীজপত্রের আবরণীর মাঝে ফাঁপা থাকে, অগ্রভাগে ভ্রƒণ অবস্থান করে এবং টিউবের আকৃতিতে বৃদ্ধি পায়। হলদে     রং-এর জার্মটিউবের অগ্রভাগে ভ্রƒণ আবৃত থাকে এবং তা সাধারণত মাটির নিচের দিকে বৃদ্ধি পায়। জার্মটিউব লম্বা হওয়ার পরেই ঈড়ষবড়ঢ়ঃরষব (ভ্রƒণের কাণ্ডের আবরণী) এবং ঈড়ষবড়ৎযরুধ (ভ্রƒণ মূলের আবরণী) এর বৃদ্ধি শুরু হয়। জার্মটিউবের মতো ঈড়ষবড়ঢ়ঃরষব ১৫-৪০ সেমি. লম্বা হয়ে থাকে। ঈড়ষবড়ৎযরুধ ও শিকড় এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে, এদের পৃথক করা কঠিন এবং বীজতলার নিচের মেঝেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। জার্মটিউব লম্ব^া হওয়ার ১০-১৫ সপ্তাহের মধ্যে ঈড়ষবড়ঢ়ঃরষব এর উপরে একটি পাতলা আবরণীতে পরিণত হয়। এ অবস্থায় চারায় কেবল ১টি ঈড়ষবড়ঢ়ঃরষব ও ১টি শিকড় থাকে। চারার গোড়া ও শিকড়ের গা হতে ছোট ছোট অনু শিকড়ও গজাতে শুরু করে। ঈড়ষবড়ঢ়ঃরষব এর বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হলে বীজের সাথে জার্মটিউবের সংযোগ স্থানে পচতে/শুকাতে আরম্ভ করলে চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে।
চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর ও নার্সারিতে পরিচর্যা
বীজতলার উৎপাদিত চারা পচা গোরব সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে ভরা ১২ ইঞ্চি দ্ধ ৯ ইঞ্চি আকারের পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। ব্যাগের পুরুত্ব হবে ০.০৬-০.০৭ মিলিমিটার। প্রতিটি পলিব্যাগের নিচের দিকে চার জোড়া ছিদ্র রাখতে হবে। ব্যাগে ভরার জন্য ৫০% মাটির, ২৫% কাঠের গুঁড়া, ২০% পচা গোবর সার এবং ৫% ছাই (এ্যাশ) মিশ্রণ ব্যবহার করতে হবে। এই মাটি ব্যাগে ভরার আগে মাটিতে তালের চারার শিকড় দ্রুত বৃদ্ধির জন্য শিকড়ের দ্রুত বর্ধনশীল হরমোন রোটন ব্যবহার করতে হবে। প্রতি ৪০ কেজি মাটিতে ৫০ গ্রাম রোটন পাউডার ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। তালের চারা পলি ব্যাগে স্থানান্তর করার জন্য প্রথমে বীজতলা খনন করে বেলেমাটি/কম্পোস্ট সরিয়ে চারা উন্মুক্ত করতে হবে। বীজ থেকে চারা আলাদা করার জন্য জার্মটিউবের উপরে অর্থাৎ বীজ সংলগ্ন চিকন, পচা/শুকনো স্থানে কাটতে হবে। যদি চারার শিকড় বেশি লম্বা হয় তাহলে ১০-১৫ সেমি. শিকড় রেখে বাকি অংশ ধারালো চাকু দিয়ে কেটে ফেলতে হবে। পরবর্তীতে এই চারা ছত্রাকনাশক অ্যামিস্টারটব প্রতি লিটার পানিতে             ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে যাতে চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর করার পর ছত্রাক আক্রমণ না করে। এরপরে চারা পলিব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। পলিব্যাগের প্রথমে ১/৩ অংশ গোবর মিশ্রিত মাটি ভরতে হবে। এরপর চারাটি পলিব্যাগের মাঝামাঝি এমনভাবে রাখতে হবে যেন চারার গোড়া প্রায় ৫ সেন্টিমিটার ব্যাগের মধ্যে থাকে। অতঃপর গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে ব্যাগের বাকি অংশ ভরে দিতে হবে। পলিব্যাগে চারা স্থানান্তরের পরে নার্সারিতে সাজিয়ে রাখতে হবে এবং ২-৩ সপ্তাহ আংশিক ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পানি দিয়ে পলিব্যাগের মাটি আর্দ্র রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। পলিব্যাগের চারা সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে এবং রোগবালাই দমন করতে হবে। রোগবালাই এর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রতি লিটার পানিতে অ্যামিস্টারটব মিশিয়ে প্রতি সপ্তাহে একবার তালের চারায় স্প্রে করতে হবে। পলিব্যাগে চারা লেগে যাওয়ার ৩০ দিন পর প্রতি ব্যাগে ৫-১০ গ্রাম ইউরিয়া সার দিলে চারার স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
মাঠে চারা রোপণ
মৌসুমি বৃষ্টিপাত আরম্ভ হওয়ার পরপরই পলিব্যাগে উত্তোলিত ৩০-৩৫ সেন্টিমিটার লম্বা পাতাবিশিষ্ট চারা মাঠে রোপণ করা উচিত। তবে মাটিতে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্রতা থাকলে অথবা পানি সেচের ব্যবস্থা থাকলে চারা এপ্রিল-মে মাসেও লাগানো যেতে পারে। সমতল ভূমিতে অন্যান্য বৃক্ষ প্রজাতির পলিব্যাগের চারার মতোই এ চারা লাগাতে হবে। চারা লাগানোর ৭-১৫ দিন আগে চারা লাগানোর নির্দিষ্ট স্থানে ১৮ ইঞ্চি দ্ধ ১৮ ইঞ্চি দ্ধ ১৮ ইঞ্চি আকারের গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে পচা গোবর সার বা কম্পোস্ট ভালোভাবে মিশিয়ে মাটি দ্বারা গর্তটি ভরাট করে রেখে দিতে হবে। ৭-১৫ দিন পর পুনরায় গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশ্রিত মাটি তুলে গর্তে পলিথিন ছিঁড়ে পলিব্যাগের মাটিসহ চারা গর্তে বসাতে হবে। গোবর সার বা কম্পোস্ট মিশ্রিত গুঁড়ো মাটি দিয়ে গর্তের ফাঁকা ভরাটসহ ভালোভাবে চারার গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। চারাগুলো আগাছামুক্ত রাখা ও গবাদিপশুর উপদ্রব থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর প্রথম তিন বছর রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণের হাত হতে চারা রক্ষা করা আবশ্যক। য়
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইলঃ ০১৭১১-৩০৩৯৪০
ই-মেইল : arefinbsri@gmail.com

বিস্তারিত
কবিতা ১৪২৮ (ভাদ্র)

১৫ আগস্টের গীতিকবিতা
কৃষিবিদ ড. কাজী আফজাল হোসেন

১।
সূর্যটা হলো রক্তাক্ত
গুলিতে নিহত হলো ভোর
দিনের বৃন্ত থেকে পাপড়ি
ঝরে পড়ে ধুলায় ধূসর

চিৎকার করে ওঠে শ্রাবণ আকাশ
পবিত্র পলিতে অশ্রুবিলাপ
না ফোটা ভোরের আলো ঘোর সন্ধ্যা
নামায় যেন বিধাতার অভিশাপ
না চেনে অর্বাচীন সোনার মোহর

মুখ থুবড়ে পড়ে উদয়ের পথ
ধসে পড়ে বিশ্বাস আর হিমালয়
আযান, ওজুর পানি, কান্না মিশে
ঘুমভাঙ্গা পাখিদেরও শেষ ঘুম পায়
পদ্মা যমুনা বহে শোকের পাথর

ছিটকে পড়ে থাকা ভারি চশমায়
প্রতিফলিত হলো প্রশ্নবাণ
 স্নেহের ছায়ায় বসে কাঠুরিয়া
বৃক্ষবিনাশী এই দেয় প্রতিদান?
সিঁড়িতে আছড়ে পড়ে হাজার বছর

২।
কোন কফিনে কান্ধে নিয়া
কোন সাবানে গোসল দিয়া
কোন কাপড়ে সাজাইয়া
বিদায় দিলা তাঁরে
আমি কেন কোনো কিছুই
তাহার হইলাম না রে

কোন বনের কোন বৃক্ষ চিরে
বানানো তাঁর কফিনটিরে
আমি কেন সেই বাহনের
কাষ্ঠ হইলাম না রে।।

৫৭০ সাবান মেখে
নাওয়াইলা কওনা কে কে
আমি কেন সেই রকমের
সাবান হইলাম না রে।।

দানের মার্কিন কাপড়ে
জড়াইয়া রাখলা কবরে
আমি কেন সেই বাদামি
কাপড় হইলাম না রে ॥

কৃষির নতুন আপদ : স্পাইরালিং হোয়াইট ফ্লাই
ড. মোঃ আলতাফ হোসেন
আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে এসেছে নতুন এক পোকা
সাদা পোকার কালো লক্ষণ কৃষককে বানাচ্ছে বোকা।
শুভ্র রংয়ের মাছি পোকা নাম তার- ‘স্পাইরালিং হোয়াইট ফ্লাই’
এই পোকাটির বিস্তারিত এখন তুলে ধরতে চাই।
অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকাসহ বিস্তৃত হয়েছে আফ্রিকার অনেক দেশে
আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে ভারত হয়ে এসেছে বাংলাদেশে।
পৃথিবীতে শতাধিক পোষক উদ্ভিদ আক্রান্ত হয়েছে এদের দ্বারা
এদেশে বেশি আক্রান্ত হয়েছে নারিকেল, শরিফা, কলা ও পেয়ারা।
স্ত্রীপোকা পাতার নীচের পৃষ্ঠে ডিম পাড়ে- ‘সর্পিলাকারে’
ডিম ফুটে নিম্ফ বের হয়ে পাতার শিরায় রস খাওয়া শুরু করে।
আক্রমণের শুরুতে সর্পিলাকারে ডিম পাড়ার দৃশ্য চোখে খুব পড়ে
দৃশ্যমান হয় সেটা পাতার নিচের পৃষ্ঠে এবং সবজি ও ফলের উপরে।
নিম্ফ ও পূর্ণপোকা রস খেয়ে ত্যাগ করে মধুরস- আঠালো
যার উপর শুটি মোল্ড ছত্রাক জন্মাতে পারে বেশ ভালো।
পাতার উপরে শুটি মোল্ড এর কারণে পাতা দেখায় কালো
খাদ্য তৈরির জন্য পাতায় ঢুকতে পারে না প্রয়োজনীয় আলো।
ক্রমাগত রস চুষে খায় আর পাতার নিচে নিজেকে রাখে লুকিয়ে
সরাসরি আক্রমণ এবং শুটি মোল্ডের কারণে পাতা যায় মরে শুকিয়ে।
আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে গিয়ে গাছ হয়ে পড়ে দুর্বল
দিতে পারে না তারা কাক্সিক্ষত মাত্রায় ফুল ও ফল।
কম বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ও উচ্চতাপমাত্রায় আক্রমণ যায় বেড়ে
ঠাণ্ডা ও বৃষ্টিবহুল আবহাওয়ায় বংশবৃদ্ধির গতি হয়ে যায় ধীরে।
এদের আক্রমণে নারিকেল চাষ আজ হুমকীর সম্মুখীন
আক্রান্ত পাতা মরে শুকিয়ে গিয়ে অবস্থা হচ্ছে সঙ্গিন।
ব্যবস্থাপনা করা যায় এদের- বিভিন্ন পদ্ধতি মেনে
কিভাবে কি করা যায় সেটা, এখন যান জেনে।
উদ্ভিজ তেল ও সাবান পানি দিয়ে করতে হবে স্প্রে
রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করবেন সঠিক নিয়ম জেনে।
সজোরে পানি স্প্রে করেও করা যায় এদের নিয়ন্ত্রণ
পরজীবী ও পরভোজী বন্ধু পোকাদের দ্বারা স্থায়ী হয় দমন।
কোনো একক পদ্ধতি ব্যবহারে সুফল তেমন পাওয়া যাবে না
সমন্বিতভাবে করতে হবে এদের দমন ব্যবস্থাপনা। য়

উপপরিচালক (এলআর), ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১৫০৫০৯৬৬, ই- মেইল :quazi.afzal.bd.kobi@gmail.com, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কীটতত্ত্ব বিভাগ, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইল : ০১৭২৫-০৩৪৫৯৫ , ই-মেইল: hossain.draltaf@gmail.com

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর কৃষিবিদ ড. মো. তৌফিক আরেফীন

প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ ড. মো. তৌফিক আরেফীন

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো. জাহাঙ্গীর আলম, গ্রাম : এলাইগা, উপজেলা : পীরগঞ্জ, জেলা : ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : লেবু গাছে এক ধরনের পোকা পাতায় আঁকাবাঁকা সুরঙ্গ তৈরি করে। এ পোকা দমনে কী করণীয় ?
উত্তর : এ পোকাকে লিফ মাইনর পোকা বলে। লেবুজাতীয় ফসলের জন্য এ পোকা মারাত্মক। এ পোকার আক্রমণ বেশি হলে পাতা কুঁকড়ে যায় ও বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। এমনকি আক্রান্ত পাতায় ক্যাংকার হয়ে গাছ দুর্বল হয় এবং গাছের বাড়বাড়তি কমে যায়। এ পোকা দমনে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা দরকার। আর প্রাথমিক অবস্থায় লার্ভাসহ আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তারপরও যদি পোকার আক্রমণ বেশি হয় তবে ১ লিটার পানিতে ০.২৫ মিলি এমিয়ার বা ২ মিলি কিনালাক্স ২৫ ইসি মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর ৩ থেকে ৪ বার কচি পাতায় স্প্রে করতে হবে। তবেই আপনি উপকার পাবেন।  
মোঃ অমির অলী, গ্রাম: করোলিয়া, উপজেলা: তেরখাঁদা, জেলা: খুলনা
প্রশ্ন : করলা গাছের কচি পাতায় এক ধরনের পোকা পাতার রস চুষে খায়। ফলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়। কী করব?  
উত্তর :  সাধারণত করলার জাব/জ্যাসিড পোকার আক্রমণ হলে এ সমস্যা হয়ে থাকে। এ পোকা দমনের জন্য জৈব বালাইনাশক যেমন : বাইকাও ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া পোকার আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রুপের এমিটাফ/টিডো/ এডমায়ার ০.৫ মিলি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে উপকার পাবেন।  
মো: রহমত হোসেন, গ্রাম : কেরাদারি, উপজেলা : রাজারহাট, জেলা : কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন : এক প্রকার রোগের কারণে মরিচ গাছ এক পাশে বা সম্পূর্ণ গাছ ঢলে পড়ে। এমনকি গাছও মারা যাচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান জানাবেন।   
উত্তর :  এ রোগে আক্রান্ত মরিচ গাছ সম্পূর্ণ তুলে ফেলে নষ্ট করতে হবে। তবে সুস্থ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করলে এ সমস্যা কমে যায়। আর মরিচ গাছ লাগানোর আগে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন/নোইন বা প্রোভেক্স ২০০ মিশিয়ে চারা শোধন করা যায়। তাহলে এ ধরনের সমস্যা দূর হবে।       
মো: ইছাহাক হোসেন, গ্রাম : বামনডাঙ্গা, উপজেলা : আশাশুনি, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : বেগুনের ঢলে পড়া রোগ দমনের পরামর্শ চাই।
উত্তর : বেগুনের ঢলে পড়া রোগ হলে আক্রান্ত গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়। এ রোগে বেগুন গাছের এক প্রান্ত ঢলে পড়ে এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ গাছটি ঢলে পড়ে ও মারা যায়। এ সমস্যা রোধে বেগুন গাছের জমিতে শস্যপর্যায় অবলম্বন করা দরকার। দুই একটি গাছ এ অবস্থায় দেখা দিলে তা তুলে ফেলে গর্তে পুতে রাখা দরকার। পরবর্তীতে কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন নোইন দ্বারা বীজ শোধন করলে এ রোগ কম হবে। এ ছাড়া জমি চাষের আগে প্রতি শতক জমিতে ১ থেকে ২ কেজি ডলো চুন ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। আর যদি রাসায়নিকভাবে দমনের প্রয়োজন হয় তবে আক্রান্ত গাছে কপার হাইড্রোক্সাইড গ্রুপের যেমন চ্যাম্পিয়ন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যাবে।   
মো.  পান্না মিয়া, গ্রাম : পিরোজপুর, উপজেলা : মেহেরপুর সদর, জেলা : মেহেরপুর
প্রশ্ন :  পান গাছে এক ধরনের কালো মাছি পোকা আক্রমণ করেছে। এ অবস্থায় কী করণীয় ?
উত্তর : পান গাছের কালো মাছি পোকা পূর্ণ বয়স্ক ও কীড়া উভয় অবস্থায় ক্ষতি করে থাকে। পান পাতার রস চুষে খায় এবং পাতা হালকা বাদমি রঙের হয়। সেজন্য পোকার আক্রমণ হলে আক্রান্ত পাতা ধ্বংস করা দরকার। পানের বরজ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখাও জরুরি। কিন্তু পোকার আক্রমণ বেশি হলে টলস্টার মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিকভাবে স্প্রে করলে এ পোকা দমন করা সহজ হবে।  
মৌমিতা রায়, গ্রাম : মৌতলা, উপজেলা : কালিগঞ্জ, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : মুগ ডালের পাতায় পাউডারের মতো দাগ দেখা যায় এবং পাতাগুলো কালোও দেখায়। এ অবস্থায় কী করণীয়?   
উত্তর : এ ধরনের রোগকে পাউডারি মিলডিউ বলে। আমাদের দেশে খরিফ-২ মৌসুমে এটি বেশি দেখা যায়। এ রোগে পুরো পাতা আক্রান্ত হয়। পরবর্তীতে পাতা, কাণ্ড ও ফুল-ফলে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পাতার উপরে সাদা পাউডার ধীরে ধীরে ছাই রঙ ধারণ করে। এ রোগের কোনো প্রতিরোধী জাত নেই। তবে ভাদ্র মাসের শুরু থেকে আশি^ন মাসের ১ম সপ্তাহে বোনা ফসলে এ রোগের পরিমাণ কম হয়। এ রোগ দমনে প্রপিকোনাজল গ্রুপের যেমন টিল্ট/প্রাউড প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যায়।
মৎস্য বিষয়ক
মো. লিটন মিয়া, গ্রাম : ফুলবাড়ি, উপজেলা : গোবিন্দগঞ্জ, জেলা : গাইবান্ধা
প্রশ্ন : কাতলা মাছের ফুলকার উপর বাদামি গুটি দেখা যাচ্ছে ও ফুলকা পচে যাচ্ছে। কিছু মাছ মারাও যাচ্ছে। কী করব?
উত্তর : এ রোগের নাম মিক্সোবলিয়াসিস। মিক্সোবলাস প্রজাতির এক ধরনের এককোষী প্রাণী রুইজাতীয় মাছের বিশেষ করে কাতলা মাছের ফুলকার উপর সাদা বাদামি গুটি তৈরি করে। এত করে ওই গুটির প্রভাবে ফুলকায় ঘা দেখা যায় ও ফুলকা খসে পড়ে। শ^াস প্রশ^াসের ব্যাঘাত ঘটার কারণে মাছ অস্থিরভাবে ঘোরাফেরা করে ও শেষ রাতের দিকে ব্যাপক মড়ক দেখা যায়। অদ্যাবধি এ রোগের কোনো চিকিৎসা সরাসরি আবিষ্কৃত হয় নি। তারপরও শতকপ্রতি ১ কেজি হারে চুন দিলে পানির অম্লত্ব দূর হয়ে পরজীবীগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় ও মাছ নিষ্কৃতি লাভ করে।
মোঃ অনোয়ার হোসেন, গ্রাম : চরপাড়া, উপজেলা : নান্দাইল, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : মাছ পেট ফুলে মারা যাচ্ছে। কী করব ?
উত্তর : অ্যারোমনাডস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া এ রোগের কারণ। এ রোগে মাছের দেহের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে পানি সঞ্চালনের মাধ্যমে মাছের পেট ফুলে উঠে। ফলে মাছ ভারসাম্যহীনভাবে চলাফেরা করে ও পানির উপর ভেসে থাকে। ফলে অচিরেই মাছ মারা যায়। আক্রান্ত মাছকে প্রতি কেজি খাবারের সাথে মেট্রোনিডাজল/অক্সিটেট্রাসাইক্লিন গ্রুপের ওষুধ মিশিয়ে সাত দিন খাওয়াতে হবে। অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ২০ থেকে ১০০ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫দিন ব্যবহার করলে ভালো উপকার পাওয়া যায়।   
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
মোছাঃ শেফালী বেগম, গ্রাম : বাইয়ারা, উপজেলা : সোনাইমুড়ি, জেলা : নোয়াখালী
প্রশ্ন : আমার ছাগলের বয়স ২ বছর। ছাগল প্রথমে দাঁড়ানো অবস্থায় চতুর্দিকে ঘুরছিল। শরীর কাঁপছিল, পাতলা পায়খানা হচ্ছিল। পেট ব্যথার কারণে শুয়ে পা ছোড়াছোড়ি করছিল এবং কিছু সময় পরেই মারা গেল। এ অবস্থায় কী করণীয় ?
উত্তর : যেহেতু এ রোগ হলে হঠাৎ করে মারা যায়। সেজন্য সাধারণত কোনো চিকিৎসা করা যায় না। তবে প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগ শনাক্ত করা গেলে এট্টোফিন সালফেট ইনজেকশন ৩ মিলি ৬ ঘন্টা পর পর এবং শিরায় অ্যালাইল দিলে অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অসুস্থ ছাগলকে সুস্থ ছাগল থেকে আলাদা করে রাখা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত দানাদার খাদ্য সরবরাহ না করা।
মোঃ ফজলুল হক, গ্রাম : হজরতপুর, উপজেলা : ফুলবাড়ী, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : আমার লেয়ার মুরগিগুলো নিজেদের মধ্যে খুব ঠোকরাঠুকরি করছে এবং দেহের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় কী করণীয়?    
উত্তর : এদেরকে ঠোঁট কাটতে হবে অর্থাৎ ডিবিকিং। খামারে যথাযথ আলো ও প্রাকৃতিক বাতাস প্রবেশ করা নিশ্চিত করতে হবে। বাচ্চার ৬ থেকে ১০ দিন বয়সে ঠোঁট কাটা, ঘরে লাল আলো ব্যবহার, আলোর তীব্রতা কমানো ও প্রতিটি মুরগির জন্য পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। ইলেকট্রোলাইট ও মিনারেলের ঘাটতি দুর করার জন্য ইলেকট্রোমিন পাউডার ও ক্যালপি পাউডার খাওয়াতে হবে।
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত এবং কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন কৃষি তথ্যসার্ভিসের কৃষি কল সেন্টার ১৬১২৩ এ নাম্বারে)। য়

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫,  ফোন নং: ০২-৫৫০২৮৪০০, ই মেইল :taufiquedae25@gmail.com

 

বিস্তারিত
আশ্বিন মাসের কৃষি (১৬ সেপ্টেম্বর - ১৬ অক্টোবর)

আশ্বিন মাসের কৃষি
(১৬ সেপ্টেম্বর - ১৬ অক্টোবর)

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

আশি^ন মাস। প্রকৃতিতে সবুজের সমারোহ, শুভ কাশফুল, সুনীল আকাশের সাদা মেঘ জানান দেয় শরৎকাল ঋতুর রাজত্ব। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের সবার জন্য সাদা কাশফুলের শুভেচ্ছা। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে এবং চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে কার্যকরী প্রস্তুতি নেবার সময় এখন। এ প্রেক্ষিতে আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই আশ্বিন মাসের বৃহত্তর কৃষি ভুবনের করণীয় বিষয়গুলো।
আমন ধান
আমন ধানের বয়স     ৪০-৫০ দিন হলে      ইউরিয়ার শেষ কিস্তি প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে। এ সময় বৃষ্টির অভাবে খরা দেখা দিতে পারে। সে জন্য সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। ফিতাপাইপের মাধ্যমে সম্পূরক সেচ দিলে পানির অপচয় অনেক কম হয়। শিষ কাটা লেদাপোকা ধানের জমি আক্রমণ করতে পারে। প্রতি বর্গমিটার আমন জমিতে ২-৫টি লেদা পোকার উপস্থিতি মারাত্মক ক্ষতির পূর্বাভাস। তাই সতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সময় মাজরা, পামরি, চুঙ্গী, গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে, জমিতে খুঁটি দিয়ে, আলোর ফাঁদ পেতে, হাতজাল দিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খোলপোড়া, পাতায় দাগ পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। সঠিক রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
নাবি আমন রোপণ
কোন কারণে আমন সময়মতো চাষ করতে না পারলে অথবা নিচু এলাকায় আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান৪৬, বিনাশাইল বা স্থানীয় জাতের চারা রোপণ করা যায়। গুছিতে ৫-৭টি চারা রোপণ করতে হবে। অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি ইউরিয়া প্রয়োগ ও অতিরিক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায় এবং দেরির ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়।
তুলা
এ সময় তুলাক্ষেতে গাছের বয়স ৬০ দিন পর্যন্ত আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। গোড়ার সবচেয়ে নিচের ১-২টি অঙ্গজ শাখা কেটে দেয়া ভালো। লাগাতার বৃষ্টি এবং ঝড়ো বাতাসের কারণে গাছ হেলে পড়লে পানি নিষ্কাশনসহ হেলে যাওয়া গাছ সোজা করে গোড়ায় মাটি চেপে দিতে হবে।    ইউরিয়া, এমওপি ও বোরনসহ অন্যান্য অনুখাদ্য নিয়মিতভাবে পাতায় প্রয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ সময় রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা গেলে সঠিক বালাই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাট
নাবি পাট ফসল উৎপাদনে এ সময় গাছ থেকে গাছের দূরত্ব সমান রেখে অতিরিক্ত গাছ তুলে পাতলা করে দিতে হবে। দ্বিতীয় কিস্তির ইউরিয়া সার ১৫-২০ দিনে এবং তৃতীয় কিস্তির ইউরিয়া সার      ৪০-৪৫ দিনে প্রয়োগের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে। এ সময় সবজি ও ফল বাগানে সাথী ফসল হিসেবে বীজ উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন।
আখ
আখের চারা উৎপাদন করার উপযুক্ত সময় এখন। সাধারণত বীজতলা পদ্ধতি এবং পলিব্যাগ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা যায়। পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করা হলে বীজ আখ কম লাগে এবং চারার মৃত্যুহার কম হয়। চারা তৈরি করে বাড়ির আঙ্গিনায় সুবিধাজনক স্থানে সারি করে রেখে খড় বা শুকনো আখের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। চারার বয়স ১-২ মাস হলে মূল জমিতে রোপণ করা উচিত। কাটুই বা অন্য পোকা যেন চারার ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
বিনা চাষে ফসল আবাদ
মাঠ থেকে বন্যার পানি নেমে গেলে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় বিনা চাষে অনেক ফসল আবাদ করা যায়। ভুট্টা, গম, আলু, সরিষা, মাসকালাই বা অন্যান্য ডাল ফসল, লালশাক, পালংশাক,     ডাঁটাশাক বিনা চাষে লাভজনকভাবে আবাদ করা যায়। সঠিক পরিমাণ বীজ, সামান্য পরিমাণ সার এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে লাভ হবে অনেক। যেসব জমিতে উফশী বোরো ধানের চাষ করা হয় সেসব জমিতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা  জাত (বারি সরিষা-৯, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৭, বারি সরিষা-১৮, বিনা সরিষা-৪, বিনা সরিষা-৯ ইত্যাদি) চাষ করতে পারেন।
শাকসবজি
আগাম শীতের সবজি উৎপাদনের জন্য উঁচু জায়গা কুপিয়ে পরিমাণ মতো জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে শাক উৎপাদন করা যায় যেমনÑ মুলা, লালশাক, পালংশাক, চীনাশাক,         সরিষাশাক অনায়াসে করা যায়। সবজির মধ্যে ফুলকপি,           বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো, বেগুন, ব্রোকলি বা সবুজ          ফুলকপিসহ অন্যান্য শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করে মূল জমিতে বিশেষ যত্নে আবাদ করা যায়।
কলা
অন্যান্য সময়ের থেকে আশ্বিন মাসে কলার চারা রোপণ করা সবচেয়ে বেশি লাভজনক। এতে   ১০-১১ মাসে কলার ছড়া কাটা যায়। ভালো উৎস বা বিশ্বস্ত কৃষক-কৃষানির কাছ থেকে কলার অসি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। কলার চারা রোপণের জন্য ২-২.৫ মিটার দূরত্বে ৬০ সেমি. চওড়া এবং ৬০ সেমি. গভীর গর্ত করে রোপণ করতে হবে। গর্ত প্রতি ৫-৭ কেজি গোবর, ১২৫ গ্রাম করে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার এবং ৫ গ্রাম বরিক এসিড মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে ৫-৭ দিন পর অসি চারা রোপণ করতে হবে। কলাবাগানে সাথী ফসল হিসেবে ধান, গম, ভুট্টা ছাড়া যে কোন রবি ফসল চাষ করা যায়।
গাছপালা
বর্ষায় রোপণ করা চারা কোনো কারণে নষ্ট হলে সেখানে নতুন চারা রোপণ করতে হবে। বড় হয়ে যাওয়া চারার সঙ্গে বাঁধা খুঁটি সরিয়ে দিতে হবে এবং চারার চারদিকের বেড়া প্রয়োজনে সরিয়ে বড় করে দিতে হবে। মরা বা রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে। চারা গাছসহ অন্যান্য গাছে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় এখনই। গাছের গোড়ার মাটি ভালো করে কুপিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে। দুপুর বেলা গাছের ছায়া যতটুকু স্থানে পড়ে ঠিক ততটুকু স্থান কোপাতে হবে। পরে কোপানো স্থানে জৈব ও রাসায়নিক সার ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
হাঁস-মুরগির কলেরা, ককসিডিয়া, রানীক্ষেত রোগের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রাথমিকভাবে টিকা প্রদান, প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক। এ মাসে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফুটানোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। বাচ্চা ফুটানোর জন্য অতিরিক্ত ডিম দেয়া যাবে না। তা ছাড়া ডিম ফুটানো মুরগির জন্য অতিরিক্ত বিশেষ খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
আশ্বিন মাসে গবাদিপশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো দরকার। গবাদি পশুকে খোলা জায়গায় না রেখে রাতে ঘরের ভেতরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পানিতে জন্মানো গোখাদ্য এককভাবে না খাইয়ে শুকিয়ে খরের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। এ সময় ভুট্টা, মাসকলাই, খেসারি বুনো ঘাস উৎপাদন করে গবাদিপশুকে খাওয়াতে পারেন। গর্ভবতী গাভী, সদ্য ভূূমিষ্ঠ বাছুর ও দুধালো গাভীর বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এ সময় গবাদি প্রাণীর মড়ক দেখা দিতে পারে। তাই গবাদিপশুকে তড়কা, গলাফুলা, ওলান ফুলা রোগের জন্য প্রতিষেধক, প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চত করতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
বর্ষায় পুকুরে জন্মানো আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং পুকুরের পাড় ভালো করে বেঁধে দেয়া প্রয়োজন। পুকুরের মাছকে নিয়মিত             পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার সরবরাহ করা দরকার। এ সময় পুকুরের           প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগ সারাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি মাছের খামার থেকে জিওল মাছের পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে পারেন।
আশ্বিন মাসে নিয়মিত কৃষি কাজের পাশাপাশি সারা দেশজুড়ে ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়। করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তায় ইঁদুরের হাত থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য এ অভিযান খুবই জরুরি। এককভাবে বা কোন নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুর দমন করলে কোন লাভ হবে না। ইঁদুর দমন কাজটি করতে হবে দেশের সকল মানুষকে একসাথে মিলে এবং ইঁদুর দমনের সকল পদ্ধতি ব্যবহার করে। আসুন সবাই একসাথে ইঁদুর দমন করি। সবাই ভালো থাকি। য়

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪; ই-মেইল : editor@ais.gov.bd.

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook