কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বিজয়ের ৫০ বছরে বিপুল অর্জন কৃষি খাতে

বিজয়ের ৫০ বছরে বিপুল অর্জন কৃষি খাতে
ড. জাহাঙ্গীর আলম

বাংলাদেশ বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের দ্বারপ্রান্তে। ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের ৫০তম বার্ষিকী। এ পথপরিক্রমায় অনেক গৌরবময় অর্জনের সাফল্যগাথা রচনা করেছে বাংলাদেশ। এক সময় এ দেশের পরিচয় ছিল অতি দরিদ্র একটি দেশ হিসেবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে ঠাঁই করে নেয় বাংলাদেশ। এখন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এ বছর তা অনুমোদন করেছে জাতিসংঘ। সাধারণ পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্লেনারি সেশনে গৃহীত হয় আমাদের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এই প্রস্তাব। আগামী ২০২৬ সালে স্থায়ীভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। এর আগে ২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানদণ্ডে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সকল শর্ত পূরণ করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২০ শতাংশে। আগামী ২০ বছর পর দেশে আর কোনো দরিদ্র থাকবে না। এখন থেকে ৫০ বছর আগে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল গড়ে মাত্র প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার। এখন তা উন্নীত হয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ ডলারে। দেশের ২য় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২০৩১ সালে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং আগামী ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে স্থান করে নেবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার কোনো উল্লেখযোগ্য মজুদ ছিল না। এখন তা ৪৮ হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। বছরের পর বছর আমাদের রফতানি আয় দ্রুত বাড়ছে। সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে রেমিট্যান্স আয়। এক সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ছিল ছনের ছাউনি দেয়া ঘর। এখন তা আর চোখে পড়ে না। শিক্ষার প্রসার, শিশু মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাশের দেশ ভারতকেও টপকে গেছে বাংলাদেশ। নারীর ক্ষমতায়ন বিবেচনায় বিশ্বের অনেক  উন্নত দেশের উপরে আমাদের অবস্থান। গত ১৩ বছর ধরে এ দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬ থেকে ৮ শতাংশ হারে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩৩ সালে তা ৮৫৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান হবে ২৫তম। সাম্প্রতিক করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে অনেকটা স্থবির, বাংলাদেশ সেখানে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও জিডিপির উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.২ শতাংশ। এরই মাঝে ক্ষুধা সূচকে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। হ্রাস পেয়েছে পুষ্টিহীনতা। লাগাতার বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের খাদ্য ও কৃষি উৎপাদন। শিল্প উদ্যোগ এবং অবকাঠামো বিনির্মাণেও বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। আগামী বছরই নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু। এ ছাড়াও মেট্রো রেল, এলিভিয়েটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ১০-১২টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে চলছে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।


১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর দেশের বিভিন্ন খাতে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান খাতটি হলো কৃষি খাত। অতীতে বাংলাদেশ ছিল একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ। এ অঞ্চলে প্রতি বছর গড়ে খাদ্য আমদানি করা হতো ১৫ থেকে ২০ লাখ টন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদেশে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় কৃষির উৎপাদন। ফলে ১৯৭১-৭২ সালে দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখ টন। এটি ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় ত্রিশ শতাংশ। বর্তমানে সে ঘাটতির হার নেমে এসেছে ১৫ শতাংশেরও নিচে। স্বাধীনতার পর দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ টনে। গত ৫০ বছরে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রতি বছর গড়ে ৩ শতাংশ হারে। যে কৃষক আগে খাদ্য ঘাটতিতে ছিল সে এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত। যে শ্রমিকের দাবি ছিল দৈনিক ৩ কেজি চালের সমান মজুরি, সে এখন কাজ করে ১০ কেজি চালের সমান দৈনিক মজুরিতে। কী কৃষক, কী শ্রমিক-কারোরই আর তেমন খাদ্যের অভাব হয় না। না খেয়ে দিন কাটে না কোনো মানুষেরই। কৃষি খাতে এখন উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার উপরে। তাছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, গম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পর থেকে এ নাগাদ চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ, গম দুইগুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। আলু, মৎস্য, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। চিরকালের দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা আর ক্ষুধার দেশে এখন  ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে। প্রতি বছর এ দেশে মানুষ বাড়ছে ২০ লাখ। কৃষি জমি কমছে ৮ লাখ হেক্টর। তারপরও জনপ্রতি সরবরাহ কমছে না কৃষিপণ্যের। বরং তা বাড়ছে নিরন্তর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জনপ্রতি আমাদের খাদ্যশস্যের প্রাপ্যতা ছিল দৈনিক ৪৫৬ গ্রাম, ২০০০ সালে তা ৫২২ গ্রাম এবং ২০২০ সালে তা ৬৮৭ গ্রামে বৃদ্ধি পায়। এর কারণ দ্রুত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি। সম্প্রতি নতুন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে আমাদের কৃষি খাতে। আগের খোরপোশ পর্যায়ের কৃষি এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক কৃষিতে। এক নীরব বিপ্লব সূচিত হয়েছে  কৃষির প্রতিটি উপখাতে। দানাদার খাদ্যশস্যের পর আলুর উৎপাদনে বিপুল উদ্বৃত্ত অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করার মতো। দেশের মানুষের দৈনিক জনপ্রতি আলুর চাহিদা হচ্ছে ৭০ গ্রাম, প্রাপ্যতা অনেক বেশি। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে আমাদের আলুর মোট উৎপাদন ছিল প্রায় অর্ধকোটি টন। এখন তা ১ কোটি ৯ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে এখন আলু রফতানি হচ্ছে বিদেশে। ফলে প্রতি বছর গড়ে আমাদের আয় হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। তাছাড়া আলুর উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে এর ব্যবহারও বহুমুখী হচ্ছে। আগে আলুর ব্যবহার হতো মূলত সবজি হিসেবে। এখন তা চিপস ও পটেটো ক্রেকার্স হিসেবেও অনেক সমাদৃত। বিদেশিদের মতো অনেক বাংলাদেশিও এখন মূল খাদ্য হিসেবে রোস্টেড পটেটো খেতে পছন্দ করেন। আলু উৎপাদনে গত ২০ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ।


খাদ্যশস্যের আর একটি বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে সবজি উৎপাদনে। ২০০৮-০৯ সাল থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত সবজি উৎপাদন প্রতি বছর গড়ে ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন ও ভারতের পর বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান  তৃতীয়। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির দাম ভালো থাকায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সবজি রফতানি সম্প্রসারিত হওয়ায় দেশের কৃষকগণ এখন সবজি চাষে বেশ উৎসাহিত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন আধুনিক সবজি চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে স্বীয় উদ্যোগে এরা গড়ে তুলছেন সবজি খামার।


বাংলাদেশে সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য  অগ্রগতি হয়েছে ফলের উৎপাদনে। বর্তমানে এ দেশে ফলের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান। গত ২ দশক ধরে এ দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল বছরে গড়ে ১১ শতাংশের উপরে। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলের মাথাপিছু প্রাপ্যতা সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। ২০০৬ সালে আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৫৫ গ্রাম, ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে ৮৫ গ্রামে। তাতে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে আমাদের পুষ্টিহীনতা। বর্তমানে আমাদের দেশে আমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চিরায়তভাবে গড়ে ওঠা রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুরের বাগানগুলো ছাপিয়ে এখন প্রচুর আম উৎপাদিত হচ্ছে সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায়। তা ছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক ধানী জমি পরিণত হয়েছে আম বাগানে। অধিকন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ করা হচ্ছে নতুন ফল স্ট্রবেরি। আরো চাষ করা হচ্ছে রাম্বুতান, ড্রাগন ফল ও এভোকেডো। মানুষ আপেলের পরিবর্তে বেশি করে খাচ্ছে কাজী পেয়ারা। তাতে বিদেশি ফলের আমদানি হ্রাস পাচ্ছে। সাশ্রয় হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা।


এ দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। দীর্ঘ মেয়াদের আবাদি এলাকা কমেছে। তবে একরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে। ২০১০ সালে পাটের জিন রহস্য উন্মোচনের ফলে এর উৎপাদন বৃদ্ধির পথ আরো সুগম হয়েছে। বিশ্ববাজারে এখন পাটের চাহিদা বাড়ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ। বর্তমান করোনাকালেও পাটের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজার বেশ চড়া। এখন দেশে কৃষকের খামার প্রান্তে কাঁচা পাটের মূল ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা প্রতি মণ। এটা বেশ লাভজনক মূল্য। বর্তমানে দেশে পাটের উৎপাদন প্রতি বছর ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল। আগামীতে এর উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। অদূর ভবিষ্যতে আবার ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের পাট খাত।


কেবল শস্য খাতই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে কৃষির সকল উপখাতেই বিপুল উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে এ দেশে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ২৫ লাখ টন। ২০১৯-২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টনে। মৎস্য খাতে বর্তমানে গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫ শতাংশ। হিমায়িত খাদ্য ও চিংড়ি রফতানি থেকে প্রতি বছর আমাদের আয় ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ইলিশের উৎপাদনে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল চোখে পড়ার মতো। সরকারের ডিমওয়ালা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জাটকা নিধন নিষিদ্ধকরণের নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এখন ইলিশের উৎপাদনে বহুল পরিমাণে বেড়েছে। তাছাড়া পুষ্টির অন্যান্য উপাদান ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদনে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ এখন ডিম ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ম্ভর। দুগ্ধ উৎপাদনে এখনো ঘাটতি আছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে যে হারে উৎপাদন বাড়ছে তাতে এর ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে অচিরেই। বন খাতে বৃক্ষের মোট আচ্ছাদিত এলাকা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১২ বছর আগে দেশের ৭/৮ শতাংশ এলাকা বনরাজির আওতায় ছিল বলে ধরে নেয়া হতো। এখন তা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭ শতাংশে। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী এবং গ্রামীণ কৃষি বনায়ন দেশের পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।


কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার এখন অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। ভূমি কর্ষণ, ফসল কর্তন ও মাড়াই, ধান ভানা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই এখন কায়িক শ্রমের ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে। বাড়ছে যন্ত্রের ব্যবহার। স্বাধীনতার পর ভূমি কর্ষণের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন করা হতো কাঠের লাঙল দিয়ে। ব্যবহার করা হতো পশুশক্তি। এখন পশুশক্তির ব্যবহার হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে ৫ শতাংশে। বাকি ৯৫ শতাংশই আবাদ হচ্ছে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। ধান কাটা ও মাড়াই ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখন বেশ প্রচলিত। তবে তার পরিধি এখনও বেশ সীমিত। বর্তমানে কৃষিযন্ত্র সংগ্রহে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য সরকার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে যন্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। হাওর, চরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় ভর্তুকির পরিমাণ বেশি। তবে এর সুবিধাভোগীর সংখ্যা খুবই কম। এটি বাছাইকৃতভাবে এখনও কার্যকর হচ্ছে গ্রামীণ এলাকায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে চলছে শ্রমিক সংকট। তাতে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের মজুরি। তদুপরি ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে সময়ক্ষেপণ, অপচয় ও অদক্ষতার কারণে কৃষির উৎপাদনে লাভজনকতা হ্রাস পাচ্ছে। এমতাবস্থায় কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত করা দরকার। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্প্রতি ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রহণ করা হয়েছে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’। ভবিষ্যতে আরো বড় আকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে। যে কোনো কৃষক তার প্রয়োজন অনুসারে ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র ক্রয় করতে সক্ষম হবেন।


একসময় নতুন কৃষি প্রযুক্তি প্রসারের একমাত্র বাহন ছিল কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী। এখন তাতে যোগ হয়েছে ই-কৃষি। কৃষি সমস্যা সমাধানের জন্য মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে বাড়ি থেকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন গ্রামের কৃষক। তাদের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগে স্থাপিত হয়েছে ‘কল সেন্টার’। যেখান থেকে টেলিফোনে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেয়া হচ্ছে কৃষকদের। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বিপণনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে ই-কমার্স। এর মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশু। শাকসবজি এবং ফলমূলও এসেছে  ই-কমার্সের আওতায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এগিয়ে চলার পাশাপাশি কৃষিকাজের ও পণ্য বিক্রির প্রক্রিয়াও চলে এসেছে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায়। তবে এক্ষেত্রে দেশের মোট কৃষকদের অংশগ্রহণ খুবই কম। অনেকের স্মার্টফোন নেই। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নেই। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে ১ হাজার গ্রামকে স্মার্ট-ফার্মিংয়ের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ছোট কৃষকদের অংশগ্রহণ খুবই প্রয়োজন। এর জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। আর্থিক সহায়তা দিয়ে স্মার্টফোন সংগ্রহে তাদের উৎসাহিত করা দরকার। বাংলাদেশের ছোট কৃষকরা অধিক উৎপাদনশীল। তারা কৃষিকাজে নিজেরাই শ্রম দেন। উৎপাদন পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি করেন তারাই। ফলে তাদের খামারে প্রতি ইউনিট উৎপাদন বেশি। খরচ কম। উৎপাদন দক্ষতাও বেশি। কিন্তু সমস্যা পুঁজিস্বল্পতা। নতুন প্রযুক্তি ধারণ ও বিস্তারে ছোট কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণে তাদের অভিগম্যতা। এটা নিশ্চিত করার জন্য ছোট কৃষকদের অনুকূলে নগদ সহায়তা প্রদান ও বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতিবাচক নীতিমালা গ্রহণ করা দরকার।

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। মোবাইল : ০১৭১৪২০৪৯১০, ই-মেইল :  alamj52@gmail.com

 

বিস্তারিত
স্বাধীনতার ৫০ বছর ও আমাদের কৃষি

স্বাধীনতার ৫০ বছর ও আমাদের কৃষি

মোঃ আসাদুল্লাহ১  ড. শামীম আহমেদ২

এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। স্বাধীন হওয়ার পরপর অনেক তীব্র সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল শূন্য থেকে। সে সময় যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য দিয়েছিল বহু দেশ। কিন্তু তার অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের নাম দিয়েছিলেন ‘তলা-বিহীন ঝুড়ি।’ তার ধারণা ছিল যে, যতোই সাহায্য করা হোক না কেন, বাংলাদেশ কখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু আজ বাংলাদেশকে দেখে সমগ্র বিশ্ব বিস্মিত হচ্ছে। উন্নয়নের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। সে ক্রমে উপরে উঠছে, আরও উপরে যাবে। অজস্র তার অর্জন। বাংলাদেশের বিগত পঞ্চাশ বছরের কৃষিকে আমরা স্বাধীনতাপূর্ব ও স্বাধীনতা-উত্তর তুলনাচিত্রে চিহ্নিত করতে পারি। এই পঞ্চাশ বছরের ব্যবধানে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের কৃষি যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা এককথায় অনন্য। এই অগ্রগতি অর্জনের প্রধান প্রেরণা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ ও জাতির মর্যাদা অর্জন, আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার সামর্থ্য।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কৃষি ও কৃষকবান্ধব মানুষ। সমৃদ্ধ ও স্বনিভ্রর উন্নত বাংলাদেশ এবং সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য কৃষির উন্নতির কোন বিকল্প ছিল না তাঁর কাছে। সেই লক্ষ্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল তাঁর অন্যতম কাজ। তিনি জানতেন মানুষের প্রথম চাহিদা খাদ্য আর খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে তিনি কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে যুদ্ধবিদ্ধস্ত এই দেশকে কৃষি অর্থনীতিতে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ করেন।


সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর বৃহৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সবার আগে দরকার আমাদের টোটাল জরিপ। জরিপ ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না। সেজন্য সব কাজ করার আগে আমাদের সুষ্ঠু জরিপ করতে হবে। ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ কোটি টাকা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল। তার মধ্যে ১০১ কোটি টাকা শুধু কৃষি উন্নয়নের জন্য রাখা হয়েছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ “এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে” এই প্রতিপাদ্যকে পালনের জন্য দেশের এই মহামারিতে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলায় মাননীয় কৃষি মন্ত্রীর পদক্ষেপগুলো রীতিমতো বিশ্বে নজির হিসেবে ইতোমধ্যে সমাদৃৃত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন দানাদার শস্য ধান উৎপাদনে বিশ্বে ৩য় স্থান অর্জনকারী দেশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১১৮.১৫ লক্ষ হেক্টর জমির আবাদ লক্ষমাত্রাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন চাহিদা ছিল ৩৯৬.৪৪ লক্ষ মে. টন, সেখানে আমরা এখন পর্যন্ত উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছি ৩৮৬.০৮ লক্ষ মে. টন। এবছর জাতীয় গড় ফলন পাওয়া গেছে প্রতি হেক্টরে ৪.২৯ মেট্রিক টন। গত বছর দেশে বোরো ধানের জাতীয় গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৪.১২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে উৎপাদন বেড়েছে এবছর ০.১৮৫ মেট্রিক টন (৮.০৬ শতাংশ)। গত কয়েক বছরের ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ। ফলে বোরো ধান উৎপাদনে দেশ এবার নতুন রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছে। এই উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের ধারাবাহিক সফলতার কারণে গত বছর আমাদের ১৯.৩ লক্ষ টন ধারণক্ষমতার মধ্যে ১২.৬৫ লক্ষ টন মজুদ করা সম্ভব হয়েছে। বিগত দশ বছরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ফসলের আবাদ এলাকা (মিলিয়ন হেক্টর) চিত্র এবং উৎপাদন ( মিলিয়ন মেট্রিকটন/হেক্টর) সারণি দ্রষ্টব্য।


চিত্র : বিগত দশ বছরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ফসলের আবাদ এলাকা (মিলিয়ন হেক্টর)
কৃষিনির্ভর এই বাংলাদেশ যেন করোনাকালে কোনরূপ খাদ্য সংকটে না পড়ে তার পূর্ণ প্রস্ততি ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করোনার বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই যুদ্ধ করতে গিয়ে গত  ১২ জুলাই, ২০২০ তারিখের হিসাব মতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এতো ভয়াবহতার পরও থেমে নেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম। গত ৭ জুলাই ২০২০ তারিখে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষ্যে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কর্তৃক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে গণভবন প্রাঙ্গণে একটি ফলদ একটি বনজ এবং একটি ঔষধি গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে সারাদেশে ১ কোটি চারা বিতরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ সালের হিসাব মতে মোট ৭ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফলের আবাদ হয়েছিল, যার মধ্যে প্রধান ফল হিসেবে আম আবাদের জমি ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর আর উৎপাদন ছিল ২২ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন। এ বছর ২০১৯-২০ সালে সেই লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন ২২ লক্ষ ৩২ হাজার মে.টন। দেশে প্রতি বছর আমের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে আম উৎপাদনে ৭ম স্থান অধিকার করেছে। কিন্তু বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হলেও এর পরিমাণ উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম। ২০১৯-২০ সালে দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হলেও রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৭৯ মেট্রিক টন। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে থাইল্যান্ড সর্বোচ্চ ৭৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আম রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত ১৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও পাকিস্তান ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আম রপ্তানি করেছে। সেখানে বাংলাদেশ মাত্র ৫০ হাজার ডলারের আম রপ্তানি করেছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাসমুহ নিরসনে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রপ্তানি বৃদ্ধিতে আধুনিক কৃষি চর্চা মেনে ফসল উৎপাদন, রপ্তানি উপযোগী  জাতের ব্যবহার, আধুনিক প্যাকিং হাউজ নির্মাণ, অ্যাক্রিডিটেড ল্যাব স্থাপনসহ বহুমুখী  কাজ চলমান আছে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৫০ আলু রপ্তানি ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষিপণ্যের রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে ২টি খসড়া রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে।


ইউরোপের বাজারে কৃষিপণ্যের রপ্তানি এবং কৃষি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্প্রতি বিগত ০৯-১৮ নভেম্বর ২০২১ নেদারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সফর করেছেন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি এর নেতৃত্বে সরকারি ও বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাদের একটি প্রতিনিধিদল। এ বিদেশ সফর ও কৃষির সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, নেদারল্যান্ডস বেসরকারি খাত থেকে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, সংগ্রহ, সংগ্রহত্তোর প্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ তৈরির প্রযুক্তিগত দিক, রিয়েল টাইম স্বয়ংক্রিয় রিপোর্টিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষায় সহায়তা পাওয়া যাবে। এসব বিষয়ে ওখেনিঙেন বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চের সাথে সমঝোতা স্মারক শিগগিরই স্বাক্ষর হবে। এ ছাড়া দেশে ঘাটতি হলে সেপ্টেম্বর মাসে নেদারল্যান্ডসে উৎপাদিত নতুন পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণে ডাচ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে (সোমবার, ১৬ নভেম্বর  ২০২১, প্রেস বিজ্ঞপ্তি, কৃষি মন্ত্রণালয়)।


অপরদিকে কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করতে কৃষি প্রণোদনা অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় এবার সরকারে ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। করোনাকালে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকের আস্থা ধরে রাখতে এই প্রণোদনা প্রাণের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ করেছে।  চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৭ অক্টোবর ২০২০ রবি/২০২০-২১ মৌসুমে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, শীতকালীন মুগ, পেঁয়াজ ও পরবর্তী খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মুগ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ সহায়তা প্রদান বাবদ কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ৮৬৪৩.০০ লক্ষ (৮৬ কোটি ৪৩ লক্ষ ৩০ হাজার) টাকার অর্থ ছাড় করা হয়। এই অর্থ দেশের ৬৪টি জেলায় ৮ লক্ষ উপকারভোগীর মাঝে উল্লিখিত ৯টি ফসল চাষের জন্য সহায়তা বিতরণ করা হয়। ফসলভেদে বিভিন্ন পরিমাণে বীজ সহায়তা, ডিএপি ও এমওপি সার সহায়তা এই করোনাকালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি কৃষকের মাঝে পৌঁছে দেন। পরবর্তীতে একইভাবে এই প্রণোদনা ১৭ নভেম্বর ২০২০ রবি মৌসুমে বোরো ধানের হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহারকারীদের মাঝে ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চৌদ্দ লক্ষ সাতানব্বই হাজার কৃষকের মাঝে ৭৬ কোটি ৪ লক্ষ ৬০ হাজার ৭৬০ টাকা, ২৩ নভেম্বর ২০২০ রবি মৌসুমে পেঁয়াজ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পঞ্চাশ হাজার কৃষকের মাঝে ২৫ কোটি ১৬ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ও ২৫ মার্চ ২০২১ খরিফ-১ মৌসুমে আউশ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার কৃষকের মাঝে ৩৯ কোটি ৩৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার সার ও বীজ সহায়তা বিতরণ করা হয়। করোনা মোকাবিলায় এই প্রণোদনার সুফল বাংলাদেশের কৃষক পেতে শুরু করেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার  হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। একই সাথে, গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে হাইব্রিডের আবাদ বেড়েছে। হাইব্রিড ধানের আবাদ এবার বেড়েছে তিন লাখ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে হাইব্রিডের উৎপাদন প্রায় পাঁচ টন করে হয়। ফলে তিন লাখ হেক্টরে প্রায় ১৫ লাখ টন ধান বেশি উৎপাদন হয়েছে।


কৃষিবান্ধব সরকার বিশ্বাস করেন, যে কোন দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষি হবে প্রধান রক্ষাকবোজ হাতিয়ার। ‘কৃষিতেই হবে সমৃদ্ধ আগামীর বাংলাদেশ’ মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

 

লেখক : ১মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ২অতিরিক্ত উপপরিচালক (কন্দাল, সবজি ও মসলাজাতীয় ফসল), হর্টিকালচার উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৭১১১৭৪৩৪৫, ই-মেইল : ashamim.uni@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নিরাপদ খেজুরের রস ও গুড়

পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নিরাপদ খেজুরের রস ও গুড়

ড. মো. আমজাদ হোসেন১ ড. সমজিৎ কুমার পাল২ ড. মোছা. কোহিনুর বেগম৩ ড. মো. শামসুল আরেফীন৪


স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত মানের খেজুরের গুড় বা সিরাপ উৎপাদনের জন্য রস সংগ্রহ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য কমপক্ষে ৫-৭ বছর বয়সের সুস্থ গাছ নির্বাচন করা উচিত। সুস্থ সবল গাছ নির্বাচন করলে অধিক রস আহরণ করা সম্ভব। পাশাপাশি গাছী  নির্বাচন  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ রস সংগ্রহ গাছীর দক্ষতার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খেজুরের রস সংগ্রহ গাছ কাটার উপর নির্ভর করে। অধিক রস আহরণের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে গাছ কেটে রস সংগ্রহ করার চেয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে গাছ কেটে রস সংগ্রহ অতি প্রয়োজন। এজন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ গাছী  দিয়ে গাছ কাটা ও রস সংগ্রহ করলে রস আহরণ হার ও গাছের স্থায়িত্ব উভয়ই বৃদ্ধি পায়।


খেজুর রস সংগ্রহের জন্য কিভাবে গাছ কাটতে হবে, গাছের কোন অংশে কতটুকু কোন সময়ে, কাটতে হবে, বেশি পরিমাণ রস এবং সর্বোপরি গাছটি কিভাবে বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী হয় সে ধারণা থাকতে হবে। এসব ধারণা বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান না থাকলে গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমনকি গাছ মারাও যায়। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে খেজুরের রস সংগৃহীত হয়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি অর্থাৎ কার্তিক মাসের প্রথম দিকে গাছ পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। গবেষণায় দেখা গেছে  গাছের বেড়ের ১/৩ অংশ লম্বা ও ৭.৫ সেমি. প্রস্থ করে গাছ কাটলে বেশি পরিমাণ রস পাওয়া যায় এবং গাছের কোন ক্ষতিও  হয় না।


অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি (কার্তিক মাসের প্রথম দিকে) গাছ পরিষ্কার এর কাজ শুরু করা দরকার। গাছ পরিষ্কার করার পর পর্যায়ক্রমে প্রতিদিন গাছ ছাঁটতে হয় যাতে গাছ থেকে রস  নিঃসরণ শুরু হয়। কোন কোন গাছ ছাঁটা শুরুর ৩-৪ দিনের মধেই রস নিঃসরণ শুরু হয়। এরপর ছাঁটা অংশের যেখানে রস নিঃসরণ শুরু হয় সেখানে একটি ইউ (ঁ) আকৃতির চিকন প্রায় ৭-৮ ইঞ্চি বাঁশের কাঠির আধা ইঞ্চি পরিমাণ গাছে ঢুকিয়ে দিতে হবে। ইউ আকৃতির কাঠির মধ্য দিয়ে রস ফোঁটায়     ফোঁটায় গাছের ঝুলন্ত হাঁড়িতে জমতে থাকে। তবে গাছ একবার ছেঁটে ৩-৪ দিন রস সংগ্রহ করা উচিত এবং পরবর্তী ২-৩ দিন গাছ শুকাতে দিতে হয়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে গাছ দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রাপ্ত বয়স্ক একটি


গাছে দৈনিক ১০-২০ লিটার রস নভেম্বর মাস হতে মধ্য মার্চ মাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। রস সংগ্রহের পর মাটির হাঁড়ি প্রতিবার ধুয়ে পরিষ্কার করে রৌদ্রে শুকাতে হবে অথবা আগুনে সেঁকে নিতে হবে। এতে সংগৃহীত রস নষ্ট হবে না। অনেক সময় কাঠবিড়ালী, বুলবুলি, কাক, কাঠঠোকরা ইত্যাদি পাখি খেজুরের হাঁড়িতে বা রসের নলে বসে রস খায়। এসব পশু পাখির মাধ্যমে যেন কোন রোগ জীবাণু না ছড়ায় বা রস দূষিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য  খেজুরের গাছে হাঁড়ি ঝুলানোর সময় রসের হাঁড়ির মুখে জাল বা নেট দ্বারা এমনভাবে ঢেকে দিতে হবে যাতে কাঠি থেকে হাঁড়িতে রস পড়তে কোন অসুবিধা না হয় বা নেটের সঙ্গে রস লেগে না যায়।


খেজুরের গুড়/পাটালি তৈরি করতে খেজুরের রস/সিরাপ ভালোভাবে ছেঁকে নিয়ে কড়াইয়ের মধ্যে রেখে জ্বাল দিতে হবে। ফুটন্ত ঘনীভূত রস হাতলের সাহায্যে লাগাতার নাড়তে হবে এবং চুলার তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। চুলা থেকে গুড় নামানোর সময় মিশ্রিত করতে চাইলে হাতলের সাহায্যে গুড় অর্থাৎ এক চিমটি পরিমাণ গুড় ২০০ মিলিলিটার পানিতে ছেড়ে দিতে হবে। পানিতে গুড় দ্রুত জমাটবদ্ধ হলে বুঝতে হবে গুড় চুলা থেকে নামানোর উপযোগী হয়ে গেছে এবং চুলা থেকে গুড়সহ কড়াই দ্রুত নামিয়ে ঠান্ডা করতে হবে এবং ছাঁচে ঢালতে হবে। পুষ্টিগুণ বিচারে খেজুরের রস থেকে প্রস্তুতকৃত গুড় উৎকৃষ্টমানের। এতে বিদ্যমান প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রনের পরিমাণ অনেক বেশি। খেজুরের গুড় সাদা চিনির একটি চমৎকার পরিপূরক। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ বিদ্যমান।


প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুরের রসে প্রোটিনের পরিমাণ ১.০৮ গ্রাম, লিপিডের পরিমাণ ১.১৫ গ্রাম, ফাইবার ০.১৮ গ্রাম, অ্যাস ০.৪৬ গ্রাম, শর্করা ৮৫.৮৩ গ্রাম, রিডিউসিং সুগার ৩.৯৫ গ্রাম, ক্যালরি ৩৫৮ কিলোক্যালরি। এতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন বিদ্যমান। ভিটামিন এ ৪১০ আইউ (ওট), থায়ামিন (ভিটামিন বি ১) ০.৫ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম, রাইবোফ্লোবিন (ভিটামিন বি ২) ০.৬২ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম, নিয়াসিন (ভিটামিন বি ৩) ১২.৩ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম, প্যানটোথেনিক এসিড (ভিটামিন বি ৫) ০.১২৭ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম, পাইরিডক্সিন (ভিটামিন বি ৬) ০.৪৫ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম, এসকরবিক এসিড (ভিটামিন সি) ১২.৭৫ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম । এ ছাড়াও সামান্য পরিমাণে ফলিক এসিড (ভিটামিন বি ৯), সায়ানোকোবালঅ্যামিন  (ভিটামিন বি ১২), কোলেক্যালসিফেরল (ভিটামিন ডি ২ ও ডি ৩), বায়োটিন (ভিটামিন এইচ) ও ফাইটোনাডিওন (ভিটামিন কে) রয়েছে যার পরিমাণ  নির্ণয়যোগ্য মাত্রার নিচে।


ম্যাক্রো উপাদানের মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম ৪.৭৬ মিলি.গ্রাম/১০০ গ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ২.২৩ মিলি.গ্রাম/১০০ গ্রাম, পটাশিয়াম ৮০ মি.গ্রাম/১০০ গ্রাম, ফসফরাস ১৮০.৯ মিলি.গ্রাম/লিটার। এতে সোডিয়াম ১৮.২৩ মিলিগ্রাম/১০০ গ্রাম, কপার  ২.১৩  মিলিগ্রাম/লি, জিংক ৭.২৩ মিলিগ্রাম/লি, আয়রন ১৫.৮ মিলিগ্রাম/লি।    
এটা অনেক খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি করে এবং এতে কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক অথবা কৃত্রিম উপাদান নেই। এর অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং ঔষধি গুণাগুণ বিদ্যমান। এটা শরীরের ইমিউনিটি বৃদ্ধি করে এবং ঠান্ডা, কাশি সারাতে সাহায্য করে।


খেজুরের গুড়ে উচ্চমাত্রার কম্পোজিট কার্বহাইড্রেট বিদ্যমান যা স্বাভাবিক চিনির চেয়ে খাবারকে দ্রুত হজম করে। এতে উচ্চ মাত্রার ডায়েটারি ফাইবার বিদ্যমান যা কন্সটিপেসান,    অনিয়মিত বাউয়েল মুভমেন্ট এবং অপরিপাকজনিত সমস্যা দূর করে। খেজুরের গুড় মাইগ্রেনের ব্যথা দূর করে। প্রতিদিনের ডায়েটে এক টেবিল চামচ গুড় যোগ করলেই দ্রুত এর ফলাফল পাওয়া যায়। শুষ্ক কাশি, ঠাণ্ডা এবং এজমা সারাতে খেজুর গুড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা মিউকাস দূরীকরণের মাধ্যমে শ্বাসযন্ত্রকে পরিষ্কার রাখে।


খেজুরের গুড়ে উচ্চমাত্রার আয়রন থাকায় এটা হিমোগ্লোবিন লেভেল বাড়ানোর মাধ্যমে অ্যানেমিয়া দূর করে। এতে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম নার্ভাস সিস্টেমকে পরিচালিত করে। এ গুড় একইভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং পটাশিয়ামও সমৃদ্ধ।


খেজুরের গুড় ক্যালসিয়ামের একটি চমৎকার উৎস যা হাড়কে শক্তিশালী করে। এটি আর্থারাইটিস, জয়েন্টের ব্যথা এবং অন্যান্য হাড়জনিত সমস্যাগুলোও দূর করে। পটাশিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ায়  এটা শরীরের  ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স নিয়ন্ত্রণ করে।

 

লেখক : ১মহাপরিচালক, ২পরিচালক (গবেষণা), ৩মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৪ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বিএসআরআই, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইল: ০১৭৩১৯১৯১৭৪; মেইল:  kohinoorbegum.bsri@gmail.com

বিস্তারিত
কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা

কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা
কৃষিবিদ মোঃ শাহজাহান আলী বিশ্বাস

বাংলাদেশের কৃষি বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সহায়তায় খোরপোশের কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে যাত্রা শুরু করেছে। এজন্য সরকার কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে পাশাপাশি আধুনিক জাত সম্প্রসারণ উচ্চমূল্যের ফসলের আবাদ বৃদ্ধি, যান্ত্রিকীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনসহ বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এসব উদ্যোগের সুবিধা গ্রহণ করে কৃষিকে লাভজনক করতে হলে বিদ্যমান বাজারব্যবস্থায় কৃষকের অংশগ্রহণ সময়ের দাবি। এ বিষয়ে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি ‘সদাই’ নামক একটি অ্যাপস চালু করা হয়েছে। যার সুবিধা উৎপাদক থেকে ভোক্ত পর্যায় সকলে গ্রহণ করতে পারে। তবে আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ কৃষক এসব বিষয়ে অভ্যস্ত হতে সময় লাগবে।


বর্তমান বাজারব্যবস্থায় কৃষক তার পণ্য নিকটস্থ বাজারে নিয়ে এসে মধ্যস্বত্বভোগীদের খপ্পরে পড়ে খুব নিম্নমূল্যে পণ্য বিক্রয় করতে বাধ্য হয় । অথচ ঐ পণ্যটি কয়েক জন মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে খুচরা বাজার যখন আসে তখন একজন ভোক্তা ক্ষেত্রবিশেষে ৫/৬ গুণ অধিক মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য হয়। পচনশীল ফল-ফসল, মৌসুমি সবজি এর অন্যতম উদাহরণ। এসব বৈরী ব্যবস্থা আমাদের বাজারব্যবস্থায় বিদ্যমান। এ অবস্থা কমিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য হ্রাস করে পণ্যের ন্যায্যমূল্যের প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাজারব্যবস্থায় কৃষক সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।


* প্রতিটি বাজারকেন্দ্রিক কৃষকদের একটি সংগঠন থাকতে পারে। উক্ত সংগঠনটি কৃষকদের নিকট হতে তাদের কৃষি পণ্য সংগ্রহ করে নিকটস্থ পাইকারি বাজার অথবা ঢাকায় মোকামে সরবরাহ করবে।


* পাইকারি বাজারের কৃষি পণ্যের প্রতিদিনের মূল্যতালিকা সংগ্রহ এবং তা স্থানীয় বাজারে প্রদর্শিত হবে।


* পাইকারি বাজারে পণ্য সরবরাহের জন্য কৃষক তার পণ্যটি স্থানীয় বাজারের সংগঠনের কাছে সরবরাহ করে চলে যাবে। পণ্যটি বিকেলের মধ্যে পাইকারি বাজারে বিক্রি হয়ে স্থানীয় বাজারের সংগঠনের কাছে টাকা আসবে। পরের দিন একইভাবে কৃষক তার পণ্য সংগঠনের কাছে সরবরাহ করে আগের দিনের প্রাপ্য টাকা নিয়ে যাবে। কৃষকের সাথে আলাপ করে পরিবহন খরচ ও এ কাজের পারিশ্রমিক বাবদ একটা অংশ সংগঠন রেখে বাকি অর্থ কৃষক পাবে।


* কোনো কারণে যদি পচনশীল পণ্য পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা না যায় তবে বাজারপর্যায় সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি বাজারকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র একটি সংরক্ষণাগার থাকবে যেখানে পণ্যটি সাময়িকভাবে রাখার সুযোগ থাকবে।


* কৃষককে কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য সহজ শর্তে এবং স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এভাবে যদি প্রতিটি বাজারকেন্দ্রিক একটি কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে কৃষি পণ্য স্থানীয়পর্যায় থেকে পাইকারি বাজারে সরবরাহের/বিক্রয়ের বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তবে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য যেমন পাবে পাশাপাশি মধ্যস্বত্ব ভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং এ ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত কৃষকদের একটি অংশের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং ভোক্তাপর্যায়ে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে।


* এ ব্যবস্থায় কৃষক জানতে পারবে তার পণ্যটি পাইকারি বাজারে কত টাকায় বিক্রি হলো, পরিবহন এবং সেবার জন্য কত টাকা রাখা হলো এবং কত টাকা সে নিজে পাবে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক মানিকগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার গোলরা বাজারে একজন কৃষক ঢেঁড়স বিক্রি করতে এসেছেন। বর্তমান বাজারব্যবস্থায় সে হয়তো  ১০ টাকা কেজি ঢেঁড়স বিক্রি করছেন, যা ঢাকায় কাওরান বাজারে ৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে এবং খুচরা দোকানে ভোক্তাপর্যায়ে ৫০ টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে।


আলোচ্য বাজারব্যবস্থায় এখন সে জানতে পারবে ঢেঁড়স কাওরান বাজারে ৩০ টাকায় বিক্রি হবে, যা গোলরা বাজারে প্রদর্শিত হবে। পরিবহন এবং সেবা কাজের জন্য নিয়োজিত কর্মীর পারিশ্রমিক বাবদ ১০ টাকা খরচ হবে এবং কৃষক ২০ টাকা হিসাবে দাম পাবে, ফলে কৃষক অধিক লাভবান হবে।


উপরে উল্লিখিত প্রস্তাবনাটি একান্ত আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনাপ্রসূত। এটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে বা বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। পাশাপাশি সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। মূলত যে কোনোভাবে হোক বাজার ব্যবস্থাপনায় কৃষকের নিজস্ব অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার ন্যায্যমূল্যের প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস। টেলিফোন : ৫৫০২৮২৬০, ই-মেইল : dirais@ais.gov.bd

 

বিস্তারিত
মাশরুম চাষ : আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অমিয় সম্ভাবনার হাতছানি

মাশরুম চাষ : আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অমিয় সম্ভাবনার হাতছানি

ড. মোছা: আখতার জাহান কাঁকন
কর্মসংস্থান যে কোনো দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক সীমিত। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে দেশে বেকারত্ব বেড়ে যায় এবং বলা হয় বেকারত্ব সমাজের অভিশাপ। একটি রাষ্ট্রের পক্ষে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে  প্রয়োজন আত্মকর্মসংস্থান।


আত্মকর্মসংস্থানের ধারণা হচ্ছে নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিজেই করা। একজন মানুষ শুধু নিজের বেকারত্ব দূরীভূত করা নয়, পাশাপাশি অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে সমাজ তথা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই হচ্ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম উপায়। আত্মকর্মসংস্থানে যারা জড়িত হবেন তাদের মনে আত্মবিশ্বাস তৈরি খুবই দরকার। নানা ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে আত্মবিশ্বাস। আর এ আত্মবিশ্বাস আত্মকর্মসংস্থানকে পেশা হিসেবে নিতে উৎসাহিত করে এবং ঝুঁকিও হ্রাস করে। আত্মকর্মসংস্থান এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা একই সঙ্গে আমাদের সমাজ থেকে দূর করে দিতে পারে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো বড় জাতীয় সমস্যাকে। প্রয়োজনীয় অর্থ, পুঁজি, প্রশিক্ষণ নিয়ে সরকার বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরিতে এগিয়ে আসলে, বদলে যেতে পারে সেই হতাশাগ্রস্ত মানুষের জীবন। সরকারি, বেসরকারি ব্যাংক, সরকারের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, এনজিও, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থাসহ আরও নানা প্রতিষ্ঠান পুঁজি বিনিয়োগসহ প্রশিক্ষণ, পরামর্শ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


বাংলাদেশে জমির অপ্রতুলতা, ব্যাপক বেকারত্ব, নিদারুণ পুষ্টিহীনতা, মাথাপিছু আয়ের স্বল্পতা, মহিলা ও বেকার যুবকদের আত্ম্নকর্মসংস্থান, সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় মাশরুম একটি সম্ভাবনাময় ফসল। এ দেশের আবহাওয়া মাশরুম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। অমিত সম্ভাবনাময় ফসল মাশরুম চাষের জন্য কোনো উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না বিধায় দেশে মাশরুম উৎপাদন যতই বাড়ানো হোক না কেন তাতে কোনো ফসলেরই উৎপাদন কমার সম্ভাবনা নেই। যার মোটেই চাষের জমি নাই তিনিও বসতঘরের পাশের অব্যবহৃত জায়গায় অনেক পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করতে পারেন। আবার শিল্পাকারেও মাশরুম চাষ সম্ভব। গ্রাম-গঞ্জে, শহরে এমনকি অতিমাত্রায় বিলাসীদের প্রাসাদেও মাশরুম স্থান পেয়েছে। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন খাবার। এতে আছে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল, অ্যামাইনো এসিড, অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। স্বাদ, পুষ্টি, ও ঔষধিগুণের কারণে  ইতোমধ্যে এটি সারা দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মাশরুম চাষ একটি শ্রমঘন (Labour intensive)) কাজ। অল্প জায়গায় অনেক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করা যায়। যে কোন পর্যায়ের মানুষ, ধনী-দরিদ্র, ভূমিহীন, বেকার, গৃহবধূ, প্রতিবন্ধী, সকলেই মাশরুম চাষ করতে পারেন। এজন্য মাশরুম চাষ আমাদের দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।


মাশরুম চাষ শুরু করার জন্য অধিক পুঁজির প্রয়োজন হয় না বিধায় হতদরিদ্র, ভূমিহীন মানুষও মাশরুম চাষ করতে পারেন। মাশরুম চাষে অল্প দিনেই ফলন পাওয়া যায় এবং লাভসহ পুঁজি ঘরে আসে। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণে মাশরুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।


সম্ভাবনাময় এ ফসলটির চাষ সম্প্রসারণের প্রধান অন্তরায়গুলো হলো-আমাদের খাদ্যাভ্যাসে মাশরুম না থাকা, এদেশের প্রচলিত অন্যান্য ফসলের চাষ পদ্ধতির সাথে মাশরুম চাষ পদ্ধতির মিল না থাকা এবং মাশরুম চাষে উচ্চমূল্যের যন্ত্রপাতি ও উচ্চপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন হওয়া। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এ দেশে মাশরুম চাষের উপযোগী স্বল্প খরচের যন্ত্রপাতি ও সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে, তবুও এসব যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জনগণের ব্যাপক পরিচিতির অভাব রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে, মাশরুমের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য বিশালাকার জনগোষ্ঠীকে মাশরুম চাষে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ফলপ্রসূ প্রশিক্ষণের। যেখানে সহজ সরল প্রযুক্তির প্রদর্শন থাকবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে যে কেউ মাশরুম চাষ, স্পন উৎপাদন, মাশরুম বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিখতে পারবেন।


মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রতি কর্মদিবসে ‘মাশরুম অবহিতকরণ ও কার্যক্রম প্রদর্শন’ শীর্ষক অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের অনেক মানুষ ইতোমধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বর্তমানে ‘মাশরুম অবহিতকরণ ও কার্যক্রম প্রদর্শন’ এর পাশাপাশি জুম এ্যাপ ব্যবহার করে অনলাইন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রতি কর্মদিবসে সকাল ১০.০০টা থেকে ১০:৪০ পর্যন্ত অনলাইন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, জুম আইডি ৯৮৬৭৪৫১০৭৭ ও পাসওয়ার্ড শধশড়হ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে Mushroom Development   Institute Online Training পেজ খোলা হয়েছে, সেখানে চাষিরা মাশরুম চাষ ও বিপণন সংক্রান্ত সব তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন। এটি অনলাইন মাশরুম চাষ ও বিপণনের একটি অন্যতম প্লাটফর্ম। এমনকি প্রতিদিনের অনলাইন প্রশিক্ষণের আপলোডও এই পেজে দেয়া হয় যাতে যে কোনো ব্যক্তি পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ক্লাস দেখে নিতে পারেন। এই পেজে প্রায় ৮০০০ সদস্য রয়েছে, যারা মাশরুম চাষের মাধ্যমে নিজেদের এবং অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছেন।


সম্মানিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মাশরুম উন্নয়নে বিশেষভাবে অবদান রাখছেন। বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের মাশরুম চাষিরা পেয়েছেন তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং পাশাপাশি কর্মহীন মানুষেরা পেয়েছেন কর্মসংস্থান। অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধমে দূরের এবং কাছের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ আজকের অনন্য ফসল মাশরুম চাষে অংশ নিতে পারেন। এমনকি দেশের বাইরেও অনেক মানুষ এই পেজে যুক্ত আছেন, ফলে বহির্বিশ্বের সাথে এ দেশের মাশরুম শিল্পের পরিচিতি ঘটছে বলে মনে করি।


সর্বোপরি প্রশিক্ষণ নিয়ে যে কেউ শুরু করতে পারেন এই মাশরুম চাষ। আর ঘরে বসে আয় করতে পারেন বাড়তি কিছু টাকা। একজন মানুষ যেকোনো কাজের বা চাকরির পাশাপাশি মাশরুম চাষ করে বাড়তি কিছু আয় করতে পারেন। আবার মাশরুমই হতে পারে তার আয়ের একমাত্র উৎস। এভাবে দেশের অনেকেই মাশরুম চাষ করে নিজের ভাগ্য বদল করেছেন, নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন ও অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।

লেখক : মুখ্য প্রশিক্ষক, এটিআই, মানিকগঞ্জ। মোবাইল : ০১৭১৮১৩৭১১৩, ই-মেইল :  kakon.smdp@gmail.com

বিস্তারিত
প্রযুক্তি পাতা

প্রযুক্তি পাতা
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন

বোরো ধান   

বোরো মৌসুমে ব্রি ধান২৮ এর পরিবর্তে ব্রি ধান৮৮ ও ব্রি ধান২৯ এর পরিবর্তে ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, বঙ্গবন্ধু ধান১০০ ও অনুমোদিত হাইব্রিড ধান আবাদ করুন।
* রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চাষের জন্য ট্রে-তে চারা তৈরি করুন।
*  অতিরিক্ত ঠাণ্ডার সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে রাখুন এবং বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিন।
*  প্রতিদিন সকালে চারার উপর জমাকৃত শিশির ঝরিয়ে দিন।
*  চারাগাছ হলদে হয়ে গেলে প্রতি বর্গমিটারে ৭ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করুন। এরপরও যদি চারা সবুজ না হয় তবে প্রতি বর্গমিটারে ১০ গ্রাম করে জিপসাম দিন।
*  সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করে জমি তৈরি করুন, লাভবান হোন।
*  চারার বয়স ৩৫-৪৫ দিন হলে মূল জমিতে চারা রোপণ করুন।

 

গম     
*  চারার বয়স ১৭-২১ দিন হলে প্রথম সেচ দিন।
*  একরপ্রতি ১২-১৪ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করুন এবং সেচ দিন।
*  জো-আসার পর উইডার দিয়ে গমক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করুন।


ভুট্টা
*  ভুট্টাক্ষেতের গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিন।
*  গোড়ার মাটির সাথে ইউরিয়া সার ভালো করে মিশিয়ে দিয়ে সেচ দিন।
*  গাছের নিচের দিকের মরা পাতা ভেঙে দিন।


আলু
*  চারা রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর মাটি তোলার সময় ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করুন।
*  নাবি ধসা রোগ থেকে আলু রক্ষার্থে নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া ও বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে ডায়থেন এম ৪৫ অথবা ম্যানকোজেব অথবা ইন্ডোফিল প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ¯েপ্র করুন।
*  গাছে রোগ দেখা দেওয়া মাত্রই ৭ দিন পর পর সিকিউর অথবা এক্রোভেট এম জেড ২ গ্রাম/লিটার হারে মিশিয়ে স্প্রে করুন।
*  মড়ক লাগা জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ রাখুন ।


তুলা
*  তুলা পরিপক্ব হলে রৌদ্রময় শুকনা দিনে বীজ তুলা সংগ্রহ করুন।
*  ভালো তুলা আলাদাভাবে তুলে ৩-৪ বার রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন।

 

ডাল ও তেল ফসল
*  সরিষা, তিসি এগুলো ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের ব্যবস্থা নিন।
*  ডাল ফসলের ক্ষেত্রে গাছ গোড়াসহ না উঠিয়ে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি রেখে ফসল সংগ্রহ করুন।

 

শাকসবজি
*  লালশাক, মুলাশাক, পালংশাক একবার শেষ হয়ে গেলে আবার বীজ বুনে দিন।
*  শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক নিয়মিত সেচ দিন।

 

বিবিধ
*  উচ্চমূল্যের ফসল যেমনÑ ব্রোকলি, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম, তরমুজ এসব আবাদ করুন অধিক লাভবান হন।
* স্বল্পকালীন ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন করুন অধিক ফসল ঘরে তুলুন।
*  আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করুন; শ্রম, সময় ও খরচ সাশ্রয় করুন।     

কৃষি বিষয়ক যে কোনো বিষয় জানতে নিকটস্থ উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করুন অথবা কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি কল সেন্টার ১৬১২৩ নম্বরে কল করুন।

লেখক : তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৯১১০১৯৬১০, ই-মেইল :  manzur_1980@yahoo.com

 

বিস্তারিত
কবিতা ১৪২৮ (পৌষ)

সপ্তর্ষীর অ্যাম্বুস
মোছলেহ উদ্দিন সিদ্দিকী

মাঘী পূর্ণিমার রাত
কুয়াশার চাদরে ঘেরা জ্যোৎস্নার ভরা যৌবন
ঢেলেছে শিশিরসিক্ত পত্র-পল্লব ’পরে।
নীরব নিস্তব্ধ বনবীথি-
তারি বুক চিরে বনোপথ চলে গেছে বহুদূর
এই পথে আজি রাতে পার হবে হায়েনা শকুন
এমন সংবাদ নিশ্চিতে, অ্যাম্বুস পেতে
মুক্তিসেনার দল অপেক্ষার প্রহর গুনে।  
ওরা বয়সে তরুণ, সবাই কৃষাণ
মাতৃভূমি রক্ষায়
লাঙলের হাল ছেড়ে বারুদের গন্ধ মাখে গায়
মেশিনগান রাইফেল তাক করে বসে আছে নির্ভুল নিশানায়।

তারেক-তুষার-পরিমল-জুলফিকার
রতন-দেবাশীষ, পরশ গোমেজ
সাতজন তাই, সপ্ত ঋৃষির দীপ্ত শপথে
ধর্মের বাঁধভুলে সব একাকার
এক পরিচয় জঙ্গের ময়দানে
সন্তান এই বাংলার।

দলনেতা জুলফিকার বয়সে সবার বড়
দেবাশীষ চাকমা নির্ভীক পাহাড়ি জোয়ান
তারেক তুষার যমজ দুই ভাই,
পরশ গোমেজ পড়শী এক খ্রিষ্টান।
এখন সবে এক আত্মা- এক প্রাণ
হাঁড়ির খবর ভাগাভাগী হয়
কেউ যেন কারো পর নাহি রয়।
দেবাশীষ লুকায়না ছবি আর
প্রেমিকা চয়নিকা চাক্মার।
তারেক তুষার চায় জোড়া শেরোয়ানি
পরশ গোমেজ পাবে হাঁড়ি চারখানি।
বধূর ভূষণ হবে পতাকার রঙে
জাতির পিতাও রবেন সেই আয়োজনে
সব আবদার মিটাবেন তার
ক্যাপ্টেন জুলফিকার।

রাত দ্বিপ্রহর
নিস্তব্ধতার পাঁজর ভেঙে কঁকিয়ে কাঁদে
কোন এক বিহঙ্গ নিশাচর।
দূরে, আরো দূরে বনের গহিনে
খেঁকশিয়ালের ডাক
অপেক্ষার যেন নাই শেষ ...

ধবল প্রহর,
বুটের আওয়াজ শোনা যায়
মৃদু থেকে ক্রম উচ্চে, কাছাকাছি পাক হায়েনার দল
অর্ধশত হায়নার নিশ্চিন্তে প্রবেশ অ্যাম্বুস মাঝে
গর্জে উঠে মেশিনগান, রাইফেল, গ্রেনেড
মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত বনভূমি।
লাশের পর লাশ, শত্রুসেনা সবি কুপোকাত
বিনিময়ে স্বপ্তর্ষীর দুই নক্ষত্রের বিদায়, একটি যাওয়ার অপেক্ষায়।
ভোরের আলো ফুটেছে গোলাপের শুভ্রতা নিয়ে
বুকের পাঁজর ছিঁড়ে গেছে তুষার, পরিমলের
ক্যাপ্টেনের কোলে মাথা রেখে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরায় আহত দেবাশীষ চাকমা।
সহযোদ্ধারা ঘিরে আছে শূন্যদৃষ্টি মেলে, ঝাঁপসা হয়ে আসে দেবাশীষের চোখ
আঁকড়ে ধরা চয়নিকার ছবি রক্তে লাল।
ক্ষণিকের মাঝে দেবাশীষও চলে যায় শূন্যতার গহিনে।
উন্মাদ চিৎকারে ফেটে পড়ে সহযোদ্ধারা
রতনের রাইফেল গর্জে উঠে শূন্যে গুলি ছুড়ে
ক্যাপ্টেন জুলফিকার বুকে চেপে ধরে রাখে কায়াহীন দেবাশীষ দেহ
মায়ার আলিঙ্গনে, ভেজাচোখ তার ফিরে বারবার
দৃষ্টি শূন্যতার পানে।

মুজিব চিরঞ্জীব
মো. মনজুরুল ইসলাম মিন্টু

যৌবনে ৪৩’র দুর্ভিক্ষে ছুটেছো গ্রাম থেকে গ্রাম
তাড়না ছিল খাদ্যের অভাবে
যেতে দিবে না নতুন কারও প্রাণ;
তাইতো তুমি বুভুক্ষুর মুখে তুলে দিতে আহার
সংগ্রহ করেছ প্রয়োজনীয় ত্রাণ আর খাবার।

দেশ মাতৃকা ও জনতার উন্নয়নে
সদা জাগরূকের মতো আচ্ছন্ন থেকে
অর্ধাহারে-অনাহারে শত নির্যাতন সয়ে
কাটিয়েছো দীর্ঘ সময় রাজবন্দী হয়ে
জীবন নিয়ে কত হুমকি ধমকি
সয়েছ কতসব অসহ্য যন্ত্রণা!
তবুও সজোরে বলেছ তুমি
আমি মুজিব, মরণে ভয় করি না।

ভাষা আন্দোলনে করেছ শুরু
স্বাধীনতার যুদ্ধে শেষ
ছিনিয়ে এনেছ কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা
নাম দিয়েছ বাংলাদেশ।
রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে বুকে
বুঝিয়েছ পুরো বিশ্বকে
তালবাহানা যতই করো
পরাধীনতার এখানেই হোক শেষ।

কৃষক শ্রমিক মেহনতী  আপামর জনতা
সবাইকে শুনিয়েছ তুমি সাম্যের বার্তা
তোমার পদাংক অনুসরণে
দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ
তোমার কন্যা নিয়েছে শপথ
রাখবেনা বাঙালির, কোন আকাক্সক্ষা অপূর্ণ।

প্রবাসী আয় আর ডিজিটাল সভ্যতায়
নেতৃত্বে রয়েছি আমরা অগ্রসেনার ভূমিকায়
সীমান্ত কিংবা সমুদ্র জয়ে
সবখানে সফল দৃঢ় হাসিনায়,
উন্নয়ন অগ্রযাত্রার মহাসড়কে
রয়েছ মুজিব অনুপ্রেরণা হয়ে।
নগর থেকে দেবালয়ে
সাগর কিংবা হিমালয়ে
বাজছে সুরেলা ধ্বনি
মুজিব মুজিব রব উঠেছে
তুমি যার শিরোমণি
সারা বিশ্বের বিশালতায়
তুমি রয়েছ চিরঞ্জীব
জন্মশতবর্ষে শুভেচ্ছা তোমায়
প্রিয়, শেখ মুজিব।

লেখক: ১ফিল্ম প্রোডাকশন অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৫৫৬৩৩২৯৬৯
ই-মেইল :smoslahuddin@yahoo.com
২সহকারী সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৫৪৫৪৫৯১০, ই-মেইল : mithushah910@gmail.com

 

বিস্তারিত
বাউ-সালাদকচু উৎপাদন প্রযুক্তি

বাউ-সালাদকচু উৎপাদন প্রযুক্তি
ড. এম এ রহিম১ ড. সুফিয়া বেগম২

বাউ-সালাদকচু (Colocasia gigantea) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টার কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি জাত। ইহা একটি অপ্রচলিত কন্দ জাতীয় উদ্ভিদ যা বাণিজ্যিকভাবে বৃষ্টিবহুল উচ্চজমি, বাড়ির বাগান, পতিত জমি ও ছাদ বাগান এবং আন্তঃফসল পদ্ধতিতে যেমন- কলা, আনারস বা অন্যান্য দীর্ঘতম ফসল এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ঝর্ণা ধারা প্রবাহিত জায়গায় চাষাবাদ হতে পারে। সালাদকচু ট্রপিক্যাল অঞ্চল যেমনÑ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে প্রচুর চাষ হয়। করম, পাতা এবং পাতার ডাঁটাগুলো শাকসবজি এবং ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো যেমন- বাংলাদেশের খাদ্য সুরক্ষা, দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্র্য বিমোচন মোকাবিলা করতে পারে।


জাতটি স্থানীয়ভাবে সালাদ কচু নামে পরিচিত কারণ এটি সালাদ হিসেবে খাওয়া যেতে পারে এবং গলা চুলকায় না। বাউ-সালাদকচু অৎধপবধব পরিবারের ভেষজ উদ্ভিদ। এই ফসলের পাতাগুলোর আকার ঢেউ খেলানো ও ডাটা লম্বা হয়। পাতাগুলো হৃদয়ের আকারের এবং খাঁড়া প্রকৃতির, গভীর নিলাভ সবুজ ও পাতার উপরি ভাগ গ্লেসি হয়। এই প্রজাতিটি মূলত বান্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক হয় কারণ এই অঞ্চলের লোকেরা দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটে খাদ্য হিসেবে ও ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। আন্তঃফসল হিসেবে চাষ করা যায় বলে এর উৎপাদন খরচ খুবই কম।


জমি নির্বাচন
বাংলাদেশের সর্বত্র চাষযোগ্য এবং ২৩-৩০০ সেন্টিগ্রেড, তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে চাষ করা যেতে পারে। এটি জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না এবং সামান্য ছায়া পছন্দ করে। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করা ভালো।

 

জাত : সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টার কর্তৃক বাউ-সালাদ কচু জাতটি নিবন্ধিত হয়েছে। জাতটি উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ।
 

চাষাবাদ পদ্ধতি : ৪-৫টা চাষ দিয়ে এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ বেলে দো-আঁশ ও দো-আঁশ  (১৫-২০ সেন্টিমিটার) গভীরতাসহ জমি চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। মাটির পিএইচ ৫.৫ থেকে ৬.৫ পর্যন্ত। উদ্ভিদ গ্লোবিউলাস/দীর্ঘায়িত করম এবং প্রচুর চারা উৎপন্ন করে। করম কাটিং এবং ছোট চারা বীজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বছরব্যাপী চাষাবাদ করা যায়। রোপণ দূরত্ব ৬০ী৪৫ সেমি.। অতিরিক্ত ঠান্ডা অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে রোপণ না করলেও চলে।


সার প্রয়োগ : সাধারণত জৈবসার দিলেই চলে। গোবর ১৫ টন/হেক্টর ব্যবহার করা যেতে পারে। জমি তৈরির সময় শেষ  চাষের পরে গোবর সার মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।
আন্তঃপরিচর্যা : আগাছা ১ সপ্তাহ পরপর পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে পানি সেচ ও নিষ্কাশন করতে হবে। খড়া মৌসুমে চারা লাগানো হলে প্রাথমিক বৃদ্ধি পর্যায় পানি সেচ প্রয়োজন। দেড় থেকে দুই মাস পর চারা পাতলাকরণ করে অন্য জায়গায় লাগাতে হবে।


রোগবালাই : সালাদ কচুর তেমন কোনো রোগবালাই নাই। তবে কবুতর ও মুরগি কচিপাতা ভক্ষণ করতে পারে। তাই জাল ব্যবহার করা যেতে পারে।  
ফসল সংগ্রহ : সারা বছরই নতুন লাগানো চারা থেকে পাতা-ডাঁটা, সবজি হিসেবে সংগ্রহ করা যায়। করম আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে সংগ্রহ করা যায়, যখন গাছগুলো হলুদ হয়ে যায় বা মারা যায়। হেক্টরপ্রতি ৩০-৪০ টন করম পাওয়া যায়। বাউ-সালাদকচু কাঁচা অবস্থায় সালাদ হিসেবে ভক্ষণযোগ্য এবং রান্না করে সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফসল সংরক্ষণ : সাধারণত মুখী কচুর মতোই কন্দমুখী বীজ, সাকার/ছোট চারা বীজ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এই জন্য ছোট কন্দ যদি ভিজা থাকে তবে হালকা রৌদ্রে শুকিয়ে ঠাণ্ডা স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

প্রযুক্তির সুবিধা
বাউ-সালাদকচু বাংলাদেশের আদিবাসীগণ গ্রীষ্মকালীন সবজি ফসল হিসেবে চাষ করে আসছে এবং পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি সমতল ভূমি অঞ্চলে কলা ও আনারস দিয়ে আন্তঃফসল হিসেবে বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশে COVID-19 মহামারির সময়ে উদীয়মান খাদ্য নিরাপত্তা সংকট, পরিবেশকে রক্ষা ও জাতিকে স্বাস্থ্যকর খাদ্য সরবরাহের জন্য কৃষি খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে সালাদ কচুর মতো অপ্রচলিত ফসল দিয়ে বৈচিত্র্য আনা দরকার। সালাদ কচু সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং পুষ্টিকর খাদ্য, কারণ এটি মাইক্রো-পুষ্টি যেমন : ভিটামিন এ, বি, ইত্যাদি, খনিজ পদার্থ, ক্যালসিয়াম, জিং এবং ঔষধি গুণসম্পন্ন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। সালাদ কচুর মতো একটি নতুন ফসলের আবাদ করে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও আর্থিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখা যেতে পারে।

লেখক : ১প্রফেসর, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭৭২১৮৮৮৩০, ই-মেইল : marahim1956@bau.edu.bd, ২সহকারী অধ্যাপক (অব.) একেইউ ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড কলেজ। মোবাইল : ০১৭১৬৬০৭৫৬৬, ই-মেইল : sufia_beg@yahoo.com

 

বিস্তারিত
বাংলার ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য কালিজিরা ও কাটারিভোগ চাল

বাংলার ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য কালিজিরা ও কাটারিভোগ চাল

কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্যে ঈর্ষণীয়। আর বাংলার কৃষির অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে ধান। যেহেতু ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য, দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে ধানের চাষ হয়। আমাদের খাবারের প্লেটের বেশির ভাগ জুড়ে থাকে ভাত। তাই খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আমরা ধান বা চালের নিরাপত্তাকে বুঝি। সোনালি ধান, সোনালি স্বপ্ন, এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার মাঠঘাট বছরের অধিকাংশ সময়ই সবুজ ধানে আবৃত থাকে। মাঠেঘাটের বিবর্ণ প্রকৃতিকে ঘিরে ফেলে সোনালি আভরণে। দেখে মনে হয় এ যেন, জাতির পিতা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরই স্বপ্নের সেই ‘সোনার বাংলা’।


সাম্প্রতিক সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে এখন রোল মডেল। দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনীতে শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। স্বাধীনতার পর ধানের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি। পাল্টে গেছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার চিত্র। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও চাল রপ্তানি করছে। দ্রুত নগরায়ন, মানুষের মাথাপছিু আয় বৃদ্ধি এবং রুচি ও অভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে বাড়ছে সরু ও সুগন্ধি চালের ব্যবহার।


সরু ও সুগন্ধি চালের তৈরি নানান মুখরোচক খাবার আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশে কৃষক তাঁর জমির কোণে বা কোনো একটি অংশে চাষ করে আসছে সুগন্ধি সরু বা চিকন ধান। উদ্দেশ্য ঈদ-পূজা-পার্বণসহ নানা উৎসব ও আয়োজনে অতিথি আপ্যায়নে সুগন্ধি চালের তৈরি পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি, ফিন্নি, পিঠাপুলিসহ নানান মুখরোচক খাবার পরিবেশন। কালের বিবর্তনে প্রচলিত দেশি জাতের স্থলে এসেছে উচ্চফলনশীল সুগন্ধি ধানের জাত। এখন শুধু পারিবারিক প্রয়োজনে নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরু ও সুগন্ধি ধান চাষ হচ্ছে। কারণ এই ধান চাষে সমান শ্রমে লাভ বেশি। কেননা সরু ও সুগন্ধি চালের দাম অন্য যে কোনো চালের তুলনায় অনেক বেশি। এক কেজি সাধারণ চালের দাম যেখানে ৪৫-৫০ টাকা সেখানে এক কেজি সরু ও সুগন্ধি চালের দাম ৮০-১২০ টাকা পর্যন্ত হয়। এই চালের রয়েছে দেশ বিদেশে ব্যাপক চাহিদা। গর্বের বিষয় হলো সম্প্রতি আমাদের দেশীয় দুটি সরু ও সুগন্ধি ধানের জাত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।


কোন দেশের পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে পণ্যগুলো বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করা সহজ হয়। এই পণ্যগুলোর আলাদা কদর থাকে। ওই অঞ্চল বাণিজ্যিকভাবে পণ্যটি উৎপাদন করার অধিকার এবং আইনি সুরক্ষা পায়। কোনো একটি দেশের পরিবেশ, আবহাওয়া ও সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের   (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম মেনে বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্টস, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক বিভাগ (ডিপিডিটি) এই স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি/ প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জিআই এর জন্য আবেদন করেন সেটার মেধাস্বত্ব তাদের দেয়া হয়। দেশে ২০১৩ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন প্রথম বারের মতো পাশ হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় ডিপিডিটি।


সেই মোতাবেক প্রথম বারের মতো জিআই পণ্য হিসেবে ২০১৬ সালে স্বীকৃতি পেয়েছিল জামদানি। এরপর ২০১৭ সালে ইলিশ, ২০১৯ সালে খিরসাপাতি আম, ২০২০ সালে ঢাকাই মসলিন এবং চলতি বছর নিম্নোক্ত ৫টি পণ্যকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এখন থেকে এই পণ্যগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাবে। নতুন নিবন্ধিত জিআই পণ্যগুলো হলো- রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, কালিজিরা চাল, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল এবং নেত্রকোনার সাদামাটি। আজকে নতুনভাবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া কালিজিরা ও কাটারিভোগ চাল নিয়ে আলোচনা করব।


কালিজিরা ধানটি দেখতে কালো বর্ণের এবং দানার আকৃতি ছোট হওয়ায় একে দেখতে অনেকটা কালিজিরা নামক মসলার মতো দেখায় এবং এই কালিজিরা মসলার সাথে এই ধানের বাহ্যিক সাদৃশ্য থাকার কারণেই এই ধানের নাম কালিজিরা। তবে ধানের খোসা ছাড়ালে তখন চাউলের রঙ কালো থাকে না, চালের রঙ সাদা হয়ে থাকে। কালিজিরা ধানের আদি উৎপত্তিস্থল ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত ময়মনসিংহ অঞ্চল। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত  উইলিয়াম উইলসন হান্টার সম্পাদিত ‘অ ঝঃধঃরংঃরপধষ অপপড়ঁহঃ ড়ভ ইবহমধষ’ নামক গেজেটে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কালিজিরা ধানের চাষাবাদ সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও বিশিষ্ট ধান বিজ্ঞানী ড. তুলসি দাসের ‘অৎড়সধঃরপ জরপবং’ বইটিতেও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কালিজিরা ধানের চাষাবাদের উৎস সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া যায়।
কালিজিরা ধানটি রোপা আমন মৌসুমে চাষাবাদ করা হয় এবং উৎপাদনের উপযোগী আবহাওয়া হলো সর্বোচ্চ ৩০০ সেন্টিমিটার এবং সর্বনিম্ন ১৭০ সেন্টিমিটার তাপমাত্রা এবং বার্ষিক           ২০০০-২২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। ময়মনসিংহ অঞ্চলের আবহাওয়া এবং কৃষি পরিবেশগত অবস্থা সুগন্ধি জাতের ধান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী, বিধায় যুগ যুগ থেকে ওই অঞ্চলের কৃষকের জমিতে কালিজিরা জাতের ধান চাষ হয়ে আসছে।


এই চালের মোহনীয় সুগন্ধী এবং অপূর্ব স্বাদের জন্য ইহা বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে পোলাউ, মিষ্টান্ন (যেমন :  পায়েস কিংবা ফিরনি) ইত্যাদি ভোজনাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়ে থাকে। কালিজিরা ধানের উৎপত্তিস্থল ময়মনসিংহ অঞ্চল হলেও কালের বিবর্তনে এই ধানের অতুলনীয় স্বাদ, গন্ধ এবং গুণাগুণের জন্য পরবর্তিতে এই ধান সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পরে।  


সুগন্ধি ধানের মধ্যে কাটারিভোগ একটি অন্যতম জনপ্রয়ি জাত। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইজজও) জিনব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে দিনাজপুর থেকে কাটারিভোগ ধান ইজজও জিনব্যাংকে সংগ্রহ করা হয়। তবে বিভিন্ন সময়ে ময়মনসিংহ, মাগুরা, টাঙ্গাইল, সিলেট হতেও কাটারিভোগ ধান  সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কাটারিভোগের মূল উৎপত্তিস্থল দিনাজপুর। দিনাজপুর জেলা গেজেট অনুসারে, কাটারিভোগ দীর্ঘ অনেক বছর ধরে চাষ করা হয়। কাটারিভোগ জাতটির চাল সরু ও সুগন্ধি। পূর্ববাংলা জেলা গেজেটিয়ার, ১৯১২ মোতাবেক কাটারিভোগ জাতটি দিনাজপুর জেলায় চাষাবাদ করা হয়। এ ছাড়াও, স্বাধীনতার পরে দিনাজপুর জেলা গেজেটিয়ার, ১৯৭২ মোতাবেক কাটারিভোগ জাতটি দিনাজপুর জেলায় চাষাবাদের প্রমাণ পাওয়া যায়।


নদীর অববাহিকায় অবস্থিত দিনাজপুরের মোট জমির শতকরা ৮২ ভাগ জমিতে ধান চাষ করা হয়। অধিকাংশ কৃষকই আমন ধানের চাষ করে থাকেন। দিনাজপুরে উৎপাদিত আমন ধানের মধ্যে কাটারিভোগ অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা দিনাজপুর পরিবেশগত কারণে এই জাত চাষাবাদের জন্য উপযোগী। দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর এলাকায় কৃষক জনাব মোঃ মোকলেছুর রহমান বলেন, প্রাচীনকাল হতেই এই কাটারিভোগ ধানের জাতটি দিনাজপুরে চাষ হয়ে আসছে। কৃষক তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন- এই কাটারিভোগ ধানের জাতটি দিনাজপুর ব্যতীত অন্য এলাকায় চাষ করলে সুগন্ধি কমে যায়।


নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করলে কাটারিভোগ ধানের ঘ্রাণ কিছুটা কমে যায়। শুধু গোবর সার দিয়ে এ ধান চাষ করলে তা গুণেমানে উৎকৃষ্ট হয়ে থাকে। আমাদের গবেষণায় দেখা যায় যে, বিশেষ সরু ও সুগন্ধিযুক্ত কাটারিভোগ ধান বেশি পরিমাণে ও বাণিজ্যিকভাবে দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলায়ই চাষাবাদ করা হয়ে থাকে।
কাটারিভোগ ধানের গড় জীবন কাল ১৩২ দিন। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.২ টন অথবা একর প্রতি ৩২ মণ। এ কাটারিভোগ ধানের জাতটির মরফোলজিক্যাল ও মলিকুলার বৈশিষ্ট্যায়ন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে সম্পন্ন হয়েছে।


একশত কেজি কাটারিভোগ ধান মেশিনে ভাঙিয়ে ৭০.৫ কেজি চাল পাওয়া যায়। মেশিনে আস্ত চালের  প্রাপ্তি  ৬৫.৫০%। চালের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ২.৮৯ অংশ। চালে এমাইলোজ, প্রোটিন, দস্তা এবং আয়রনের পরিমাণ যথাক্রমে ২৩%, ৭.৩%, ১৯.৫ মি.গ্রাম/কেজি, ১০.০ মি.গ্রাম/কেজি। কাটারিভোগ চালের চাহিদা সারা দেশব্যাপী তৈরি হয়েছে। বিধায় দিনাজপুরের চাল ব্যবসায়ীগণ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এ চাল গ্রাহকের নিকট পৌঁছে দিয়ে থাকেন।


বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় কালিজিরা ও কাটারিভোগসহ আধুনিক উচ্চফলনশীল সরু ও সুগন্ধি ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিদিষ্ট জেলাভিক্তিক চাষ হওয়া সুগন্ধি সরু বা চিকন ধানের আবাদ সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। সুগন্ধি ধানের ন্যায্যমূল্যে নিশ্চিত করতে সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে এবং ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে বাংলার সুগন্ধি ধানের মান, পুষ্টিগুণের কথা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। সকলের মাঝে বিদেশি সুগন্ধি জাতের চালের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলামতিসহ দেশীয় সুগন্ধি চালের তৈরি নতুন নতুন আকর্ষণীয় খাবারের প্রতি উৎসাহিত করতে পারলেই সুগন্ধি ধানের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। এতে কৃষকরা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবে তেমনি দেশের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক : ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। মোবাইল- ০১৮২৮-৩০৮৫৩০, ই-মেইল :smmomin80@gmail.com

 

বিস্তারিত
জুম চাষে ম্যাথ মডেল প্রযুক্তি

জুম চাষে ম্যাথ মডেল প্রযুক্তি

কৃষিবিদ ড. মো: জহুরুল ইসলাম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। কিন্তু কৃষিবিদদের দৃষ্টিতে বিস্তৃত এক-তৃতীয়াংশের বেশি কারণ পাহাড়ের চারপাশ ও উচ্চতায় কৃৃষিজ ফসল করা যায়। দেখা যায় যে, কোন এলাকার বা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি এবং সংস্কারবদ্ধ ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠে সেখানকার চাষাবাদ এবং জীবনধারা। তেমনি পার্বত্য এলাকায় নিজস্ব সামাজিক সাংস্কৃতিক ধারায় উপজাতি ও বাঙালিরা বসবাস এবং চাষাবাদ করে আসছে। এই এলাকার কৃষি উৎপাদনের প্রধান অন্তরায় পুরানো পদ্ধতিতে চাষাবাদ এক ফসলের এক সিজনের চাষ। একবার ‘জুম’ চাষ করে অন্য পাহাড়ে চলে যায়। কারণ সেখানে শুষ্ক মৌসুমে জ্বালিয়ে পুড়ায়ে তারা ফসল চাষ করে। এতে করে উপাদানের অবক্ষয় (ঘঁঃৎরবহঃ ইৎবধশফড়হি) হয়। মাটির পুষ্টি পরে ৩-৪ বছর সেখানে আর ফসল হয় না বা চাষাবাদ করে না। জুম চাষ অপরিকল্পিত ও অনুপযোগী বিশেষ করে প্রচলিত পদ্ধতিতে ‘জুম’ চাষ মৃত্তিকা ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে মাটির খাদ্যোপাদান কমিয়ে দেয়ার ফলে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে এবং প্রকৃতির উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু লাগসই প্রযুক্তির অভাবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাহাড়ি জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজনের তাগিদেই এখনো অনেক জায়গায় জুম চাষ করছে।
জুম চাষ জুমিয়াদের একটি সংস্কারবদ্ধ ধারণা এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের উৎস। যেমনÑ চাকমা ও তংচঙ্গা উপজাতিদের পাঙ্গপূজার বেদিমূলে পূজার উপকরণ হিসেবে প্রয়োজন পবিত্র স্থানের মাটি এবং এই মাটি অবশ্যই জুম জমি থেকে নিতে হবে। এভাবে দেখা যায় যে, জুম চাষ জুমিয়াদের একটি বহুদিনের ধ্যান-ধারণা চাকমা ও তংচঙ্গ্যা ছাড়াও অন্যান্য উপজাতীয় সংস্কৃতি জীবন ধারার সাথে জুম চাষ অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত। সুতরাং সরাসরি জুম চাষ বন্ধ হলে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে।
পাহাড়ি জমির মালিকানা চিন্তা না করে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পাহাড়ি এলাকায় বেশি জনসংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু জমির পরিমাণ বেশি। তবে আবাদি জমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। পাহাড়ি জমি সহজলভ্য হওয়ার কারণে জুমিয়ারা বেশি ফসল পাওয়ার জন্য সহজ পদ্ধতি এবং স্বল্প ব্যয়ে পাহাড়ি জঙ্গল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে জুম চাষ করে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তুলনামূলক শিক্ষায় অনুগ্রসর এবং পুরাতন সামাজিক ধ্যান-ধারণায় বিশ^াসী। অন্য কোনো পেশায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে তাদের অনীহা রয়েছে। কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান না থাকায় অন্য উপায়ে রোজগারের সুযোগ নেই। জুমিয়াদের জুম ফসল বার্ষিক খোরাক জোগায়। ফলে তাদের প্রধান আয়ের উৎস জুম চাষ। পাহাড়ে দীর্ঘদিন কর্মরত ও ব্যস্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কৃষিবিদ সমন্বয়ে সরেজমিনে বিভিন্ন জুম ক্ষেত্র পরিদর্শন ও জুমিয়াদের সাথে আলাপ আলোচনার একপর্যায়ে সাবেক স্থানীয় পরিষদ খাগড়াছড়ির সম্মানিত সদস্য জনাব মংপ্রু চৌধুরী বলেন, জুম চাষকে সরাসরি বন্ধ করা যাবে না, তবে জুমিয়াদের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক একটি বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হলে একপর্যায়ে তারা জুম চাষে আর আগ্রহী হবে না।
এমতাবস্থায়, পাহাড়ি জুমিয়াদের কথা বিবেচনা করে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের রামগড় উপকেন্দ্র খাগড়াছড়িতে আমার নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়। টিমের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নতুন ধারণার একটি লাগসই মডেল ‘ম্যাথ’ প্রযুক্তি আকারে তিন পার্বত্য অঞ্চলে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
ম্যাথ মডেল
‘ম্যাথ’ হল (গড়ফবৎহ অমৎরপঁষঃঁৎধষ ঞবপযহড়ষড়মু রহ ঃযব ঐরষষং.) পাহাড়ি অঞ্চলের উপযোগী চাষাবাদের একটি লাগসই মডেল। এই মডেল অনুসরণ করে ভূমির ক্ষয়রোধ ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে একই জমিতে বছরে কয়েকবার উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বহু ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের ব্যাপক আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। এ ছাড়া এই মডেলের মাধ্যমে জুম চাষকে সরাসরি নিরুৎসাহিত না করে পর্যায়ক্রমে জুম চাষ বিলুপ্ত করা সম্ভব।
বাস্তবায়ন পদ্ধতি
ধাপ-১ : জমি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জুম ও পাহাড়ে যেসব ফসল হয় সেগুলো চাষাবাদের ব্যবস্থা করা।
ধাপ-২ : প্রথম বৃষ্টির পর পরই ‘ম্যাথ’ মডেলের অনুসরণে দ্রুতবর্ধনশীল ফসল যেমন- পেঁপে, কলা, কাঁকরোল, বরবটি, শসা অন্যান্য শাকসবজি, স্বল্পমেয়াদি ফল ফসল যেমন- পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, গাব ইত্যাদি। দীর্ঘমেয়াদি ফল যেমন- কাঁঠাল, লিচু, সফেদা, জাম্বুরা, কমলা, মাল্টা, জাম, নাসপাতি, আম, অ্যাভোক্যাডো ইত্যাদি এবং কাঠ-বনজ গাছ জুম ক্ষেতে একই সময়ে রোপণ করা।
ধাপ-৩ : ধান, মারফা, কাউন, ভুট্টা ও তিল সংগ্রহের পর পাহাড়ের ঢালভেদে জুম ক্ষেতের মধ্যে আড়াআড়িভাবে সারিতে (ঝঃৎরঢ় ঈঁষঃরাধঃরড়হ) আনারস, অড়হর ইত্যাদি ফসল চাষ করা।
ধাপ-৪ : সময়ভেদে জুম ফসল সংহের পরপর মৌসুমভিত্তিক কচু, ঢেঁড়স, বরবটি, টমেটো, বেগুন ও মরিচ ইত্যাদি ফসলের চাষাবাদ করা।
ধাপ-৫ : স্বল্পমেয়াদি ফসল যেমন -শাকসবজি চাষের পাশাপাশি জমি পরিষ্কার করে আচ্ছাদন ফসল (পড়াবৎ পৎড়ঢ়) আনারস ও অড়হর চাষ করা।
ধাপ-৬ : যেহেতু পার্বত্য এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়, হাটবাজার সে রকম নাই বলেই চলে তাই ম্যাথ মডেলের আওতায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করার লক্ষ্যে কৃষক সমিতি করে (ঈবহঃৎধষ চৎড়পঁৎবসবহঃ ধহফ উরংঃৎরনঁঃরড়হ চড়রহঃ ঈচউচ) এর মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করা।
ধাপ-৭ : মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কর্তৃক তিন ভাগে বিভক্ত পাহাড়ের ১ম ও ২য় শ্রেণীর পাহাড়ের বেলায় ম্যাথ মডেলটি প্রযোজ্য। (ঝষড়ঢ় ৬০% উবমৎবব) পর্যন্ত ভালো ফসল করার উপযোগী।
ম্যাথ মডেলের উপকারিতা
ম্যাথ মডেলের মাধ্যমে চাষাবাদ করলে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ সম্ভব হবে। একই জমিতে বহু ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে পাহাড়ি কৃষকদের স্থায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে। শস্য পর্যায়ে (ঈৎড়ঢ় ৎড়ঃধঃরড়হ) অবলম্বনের মাধ্যমে ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি করা ও মাটির ক্ষয়রোধ সম্ভব হবে। স্থায়ীভাবে বনায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ করা ঈচউচ-এর মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যেও সমবায়ভিত্তিতে বাজারজাত করা যাবে।
১৮/২০ বছর পর মডেল থেকে কাঠ ফসল থেকে কৃষকদের আর্থিক উন্নয়ন হবে। কৃষি খাতে জিডিপিতে কয়েক এবং এ কার্যক্রম চলমান রাখার জন্য সুপারিশ উপস্থাপন করা হলো। যেমন : ১) বিএআরআই, বিআরআরআই, ডিএই, এসআরডিআই এবং বিএফআইএল থেকে সম্মিলিতভাবে সমন্বয় করে পাহাড়ি কৃষকদেরকে গড়ঃরাধঃরড়হধষ ঞৎধরহরহম দিতে হবে; ২) পাহাড়ের উপযোগী ফসলের উন্নত বীজ সরবরাহ করতে হবে; ৩) যেহেতু পাহাড়ে সেচের পানির স্বল্পতা আছে, তাই বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে সেচের ব্যবস্থা  করতে হবে; ৪) ছয় মাসের জন্য সুদ ছাড়া ফসল ঋণ দিতে হবে; ৫) স্থানীয়ভাবে ফসল উঠার পর বাজারজাত করার ব্যবস্থা করতে হবে; ৬) অম্লীয় মাটিতে প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর চুন ব্যবহার করতে হবে।
* পর্যায়ক্রমে ম্যাথ মডেলের বাস্তবায়ন হলে পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষ বিলুপ্ত হবে।
লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অব.), বারি। মোবাইল : ০১৭১৫১১০৭৪৫, ই-মেইল :  jislamhrc@gmail.com

আপডেট চলমান

বিস্তারিত
জলবায়ু পরিবর্তন ও সমন্বিতভাবে কৃষিতে খাপখাওয়ানোর টেকসই কৌশল

জলবায়ু পরিবর্তন ও সমন্বিতভাবে কৃষিতে খাপখাওয়ানোর টেকসই কৌশল

ড. জগৎ চাঁদ মালাকার

বাংলাদেশ পৃথিবীর কৃষিপ্রধান একটি দেশ। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনগোষ্ঠীর কৃষির উপর নির্ভরশীলতার কারণে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ উপরের দিকে অবস্থান করছে। খরা, লবণাক্ততা, বন্যা, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, বহিঃদেশের বালাইয়ের অনুপ্রবেশ, নদীভাঙন ইত্যাদি বাংলাদেশের  কৃষিকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি জোগানের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই ক্ষুদ্র দেশের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশিক উষ্ণতা নামে অধিক পরিচিত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে গ্রিনহাউজ প্রভাব বলা হয়। এই পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কৃষিতে জলবায়ুর প্রভাব আজ আর তেমন অজানা নয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ঝড়, বন্যা, খরাসহ বিভিন্ন প্রকার নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে প্রতি বছরে লক্ষ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আমাদের কৃষি। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এ ধরনের আকস্মিক বন্যার শিকার। জোয়ারজনিত বন্যা উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি করে। জমিতে লবণাক্ত পানির জলাদ্ধতার সৃষ্টি করে, যা ফসল চাষের জন্য অনুপযোগী। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, নীলফামারী ইত্যাদি জেলা আকস্মিক বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিপক্ব ফসল কর্তনের আগেই প্রতি বছর হাজার হাজার একর পাকা বোরো ধান আকস্মিক বন্যায় আক্রান্ত হয় ফলে চাষি হয় ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশের মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি বর্তমানে প্রায় ১০,৫০০০০ হেক্টর। গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের লোনাপানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীতে প্রবেশ করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষি ক্ষেত্রে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতে পড়ছে বিরূপ প্রভাব।  কোন এলাকায় বৃষ্টিপাতের তুলনায় বাষ্পীকরণের মাত্রা বেশি হলে সেখানে খরা দেখা দেয়। এপ্রিল থেকে মধ্য নভেম্বরের মধ্যে পরপর ১৫ দিন বৃষ্টি না হলে কৃষিতে খরা দেখা যায়। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার খরায় আক্রান্ত হয়। গাছের বৃদ্ধি পর্যায়ে গড় বৃষ্টিপাতের অভাবে মাটিতে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা গাছের ক্ষতি করে। দেশে বিভিন্ন মাত্রার খরায় আক্রান্ত ৮৩ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমির শতকরা ৬০ ভাগ জমিতে আমন ধান চাষ করা হয়। এ ছাড়াও খরা আউশ ও বোরো ধান, পাট, ডাল ও তেল ফসল, আলু, শীতকালীন সবজি এবং আখ চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উফশী ধানের ফলন কমে যাবে এবং গমের রোগের আক্রমণ বাড়বে। বাংলাদেশে বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে গম চাষ সম্ভব হবে না। ধান গাছের কচি থেকে ফুল ফোটার সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি হলে এবং অতি নিম্নতাপে (২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে। ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় যদি অতি উষ্ণ তাপ থাকে তাহলে চিটার সংখ্যা থোড় অবস্থার চেয়ে বেশি হবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ফসলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়, অতি বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হয়, খড়ায় ফসলে পোকার আক্রমণ বেশি হয়, ফসলের বৃদ্ধি কম হয় এবং ফলন কমে যায়, সঠিক সময় বীজতলা করা যায় না, বন্যা/অতিবৃষ্টিতে সবজি পচে যায়, ফলফুল ঝরে যায়, সময়মতো ফসলের চাষাবাদ করা যায় না, কুয়াশায় পরাগায়ন ব্যাহত হয়, আমের মুকুল ঝড়ে যায়, আলুর মড়ক দেখা যায়, রবি শস্যের ফলন কমে যায় প্রভৃতি। পরিবর্তিত জলবায়ুতে কৃষি ক্ষেত্রে টেকসই খাপখাওয়ানোর নিমিত্তে দুর্যোগভিত্তিক নিম্নোক্ত টেকসই কৌশল অবলম্বন গ্রহণ করতে হবে।
বন্যা জলমগ্নতা খাপখাওয়ানোর কৌশল : বন্যাসহিষ্ণু জাত রোপণ করতে হবে। উঁচুস্থানে বেড ও মাদা তৈরি করা প্রয়োজন। পলিথিন দিয়ে বেড, মাদা ঢেকে দিতে হবে। বন্যা /পানি সহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯ বিআর২২, বিআর২৩ চাষ করা। বেড়িবাঁধ ভাঙলে মেরামত করা। মাছের ক্ষেত্রে উঁচু করে পাড় মেরামত করা এবং নেট দেওয়া। স্বল্প মেয়াদি বিনা ধান-৭, বিনা ধান-১৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, বিউ ধান-১ প্রভৃতি চাষ করা। ভাসমান বীজতলা তৈরি করা। কচুরিপানায় মাদা তৈরি করা এবং ভাসমান মাদায় সবজি এবং ফল চাষ করা। পুকুর খনন করে পাড় উঁচু করা। বন্যার আগে বিভিন্ন প্রকার খাবার সংগ্রহ করে রাখা। মাছ আগে ধরে কোথাও বিক্রি করা। হাঁস-মুরগির প্রতিষেধক টিকা বন্যার আগে দেওয়া। হাঁস-মুরগির ঘরের মেঝ চুন/ছাই ছিটানো। বন্যার পানি সরে গেলে রোপা আমন মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শাইল জাতের যেমন: বিনাশাইল, নাইজারশাইল, ঝিঙাশাইল, রাজুশাইল, ইন্দ্রোশাইলসহ স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা যায়।
খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে খাপখাওয়ানোর কৌশল : মাঠের কিনারায় গভীর মিনিপুকুর খনন করা এবং ধানক্ষেতে মাছ চাষ। খড়াসহিষ্ণু ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৮৩, বিনা ধান-১৭, বিনা ধান-১৯, তিল, তিসি, ঢেঁড়স- পুঁইশাক চাষ করা। জৈবসার প্রয়োগ করা। গভীর নলকূপ, পাম্প মেশিনের মাধ্যমে সেচ দেয়া বিশেষ করে ধানের পরাগায়নের সময় ক্ষেতে পানি ব্যবস্থা রাখা। মালচিং দেয়া। খড়াসহিষ্ণু জাতের ঘাসের জাত আবাদ করা। আগাম রোপা আমন চাষ ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, বিনা ধান-১৬, জাত চাষ করা। আইল উঁচু করে পানি সংরক্ষণ করা। সেচের পানির অপচয় রোধ করা (পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানো পদ্ধতি)। খরা প্রতিরোধী কুল খেজুর, ড্রাগন ফল চাষ করা।
লবণাক্ততা বৃদ্ধি মোকাবেলায় খাপখাওয়ানো কৌশল : বেড়িবাঁধ উঁচু করতে হবে। মাঠের কিনারায় গভীর খনন করা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে সেচকাজ পরিচালনা করা। জমির আইল উঁচু করতে হবে। জমিতে জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে। লবণাক্ত সহিষ্ণু জাত ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, বিনা ধান-১০, বিনা গম-১ লাগাতে হবে। জমিতে গভীর চাষ দিতে হবে। ডালজাতীয় ফসলের আবাদ করতে হবে করা। সর্জন পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। ধানের পর গম চাষ করতে হবে- পর পর ২-৩ বছর।
শৈত্যপ্রবাহ/কুয়াশা সাথে খাপখাওয়ানোর কৌশল : শাকসবজি এবং ধানের বীজতলা ঢেকে দেওয়া। বোরো বীজতলায় সন্ধ্যে বেলায় ঢেকে দেয়া, সেচ দেয়া, ছাই দেয়া। বোরো বীজতলায় বায়ু চলাচল প্রতিবন্ধকতার জন্য বেড়া দেয়া। ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করা। আমের মুকুলে পানি স্প্রে করা। হাঁস-মুরগির ঘর চট দিয়ে ঢেকে রাখা। ছাগলের জন্য মাচার ব্যবস্থা করা।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই উৎপাদনক্ষম উত্তম কৃষি কার্যক্রম প্রবর্তন রয়েছে, যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষাসহ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। জলবায়ুর বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপখাওয়ানোর জন্য বিশেষ করে বিভিন্ন অভিযোজন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : উপপরিচালক (এলআর), ডিএই। মোবাইল : ০১৭১৬০০৪৪০০, ই-মেইল :  jagot_mala@yahoo.com

 

বিস্তারিত
করোনায় সৃষ্ট বেকারত্ব দূর করতে সক্ষম প্রাণিসম্পদ খাত

করোনায় সৃষ্ট বেকারত্ব দূর করতে সক্ষম প্রাণিসম্পদ খাত

কৃষিবিদ ডা: মনোজিৎ কুমার সরকার


স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি আজ উন্নয়নের জন্য সারা বিশে^র রোলমডেল। প্রাণিসম্পদ দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উৎপাদনে বিশে^র প্রথম দশটি দেশের কাতারে দাঁড়িয়েছে। যে দেশ আমিষের জন্য অন্যদেশের উপর নির্ভর করতো আজ সেই দেশই অন্যদেশের আমিষের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা অর্জন করছে। বিগত দেড়-দুই বছরে করোনা মহামারির কারণে শহরে বেশ কিছু শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামে শহরফেরত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে চাকরি হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। কীভাবে আয় করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না, আবার লাজ-লজ্জার ভয়ে যে কোন পেশায় হাত দিতেও সাহস পাচ্ছেন না।
সৎ ও আন্তরিকভাবে যে কোন খামার করাই লাভজনক ও সম্মানের কাজ। অল্প জমিতে বা বাড়ির সীমিত জায়গার মধ্যেই খামার স্থাপন করা যায়। এ কারণে সময় নষ্ট না করে যার যার সুবিধা মতো ও উপযোগী খামার শুরু করা উচিত।
যেসব খামার খুব সহজে ও অল্প মূলধন নিয়ে আরম্ভ করে ১ থেকে ৬ মাসের মধ্যে লাভের মুখ দেখা সম্ভব তা সারণি-১ দ্রষ্টব্য।
খামার স্থাপন বা ব্যবসায় নামার আগে যেসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো-
প্রশিক্ষণ : যে ধরনের খামার স্থাপন করতে আগ্রহী সে বিষয়ে মোটামুটি প্রশিক্ষণ বা ধারণা থাকা খুব প্রয়োজন। প্রতিটি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে শর্ট প্রশিক্ষণ প্রদানসহ প্রযুক্তিগত সকল প্রকার সহায়তা করা হয়ে থাকে। তাছাড়াও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওয়েভসাইটে (িি.িফষং.মড়া.নফ)  ও ইউটিউব থেকে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।
মূলধন : ছোট আকারের খামার শুরু করতে খুব বেশি মূলধনের প্রয়োজন হয় না। ঘর তৈরি ও খাদ্য তৈরিতে সহজপ্রাপ্য ও সস্তা দেশীয় মালামাল ব্যবহার করতে হবে। ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেই শুরু করা যায়। ঋণ করেও করা যেতে পারে।
শেড নির্মাণ : পশু-পাখিকে রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, শীত ও গরম থেকে রক্ষা করে আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিজ্ঞানসম্মত শেড প্রয়োজন। ভুলভাবে তৈরি করলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। শেডে যাতে করে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। নিকটস্থ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস অথবা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট (িি.িফষং.মড়া.নফ) থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।
উন্নত বাচ্চা সংগ্রহ : খামারের ধরন অনুযায়ী, স্বনাম ধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ করে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার থেকে সুস্থ সবল উন্নতমানের বাচ্চা সংগ্রহ করতে হবে। কথায় আছেÑ “ভালো বীজে ভালো ফসল”। সঠিক পদ্ধতিতে বাচ্চা পরিবহন ও প্রতিপালন (ব্রুডিং) করা বাঞ্ছনীয়। বাচ্চার ব্রুডিং কালকে (৩ সপ্তাহ) খামারের ভিত্তি বলা হয়। ভিত্তি দুর্বল হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।
বাচ্চার সংখ্যা অনুযায়ী স্থান, খাদ্যের পাত্র, পানির পাত্র, সরবরাহ করতে হবে। মাত্রামতো আলো প্রদান করা প্রয়োজন। খামারে পশু-পাখির কোন প্রকার সমস্যা হলো কি না তা  সকাল-বিকাল পর্যবেক্ষণ করা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কথায় আছে “সময়ের এক ফোঁড় অসময়ে দশ ফোঁড়।” ষাঁড় গরু ক্রয়ের সময় ভালো লক্ষণ দেখে সুস্থ গরু হাট থেকে না কিনে বাড়ির ওপর থেকে কিনতে হবে।
খাদ্য ও পানি : খাদ্য সর্বদা পুষ্টিকর টাটকা সুস্বাদু, ভেজালমুক্ত ও ছত্রাকমুক্ত হতে হবে। দানাদার খাদ্য মিশ্রণ ফরমুলা মুরগি, হাঁস ও গরুর জন্য ভিন্ন ভিন্ন। একটি খামারে খাদ্য খরচ           ৬০-৮০%, খাদ্য মানসম্মত না হলে উৎপাদন কমে যাবে। যথাসময়ে বয়স অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা প্রয়োজন। খাদ্য হজম ও বিপাক ক্রিয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে পরিষ্কার নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
টিকা প্রদান : পশু-পাখির টিকার গুরুত্ব অসীম, সকল প্রকার সংক্রামক রোগের টিকা সঠিক বয়সে, সঠিক মাত্রায় সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে “চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম।” উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে টিকা প্রয়োগের নির্ধারিত দিনের ১ সপ্তাহ আগেই সংগ্রহ করে রাখা ভালো। টিকা প্রদান পদ্ধতি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে হাতে-কলমে শেখানো হয়। গবাদিপ্রাণির ধরন অনুযায়ী টিকাসমূহ সারণি-২ দ্রষ্টব্য।
রোগবালাই : পশু-পাখি অসুস্থ হলে ব্যয় বেড়ে যাবে লাভ কমে যাবে। একেক খামারে রোগবালাই একেক রকম যেমন- মুরগির খামারে রানীক্ষেত, বসন্ত, কলেরা, গামবোরো, মানমোনেলা,  সর্দি-কাশি, কৃমি, উকুন, রক্ত আমাশয় ও অপুষ্টিজনিত রোগ ইত্যাদি। হাঁসের খামারে ডাকপ্লেগ, কলেরা, হেপাটাইটিস, অপুষ্টিজনিত রোগ ইত্যাদি। কোয়েলের খামারে রক্ত আমাশয়, সালমোনেলা, রানীক্ষেত ইত্যাদি কবুতরের খামারে রানীক্ষেত, কৃমি, উকুন, ছত্রাক সংক্রমণ ইত্যাদি। গরুর খামারে ক্ষুরা, লাম্পিস্কিন, তড়কা, বাদলা, গলাফোলা, পেটফাঁপা, কৃমি, উকুন ইত্যাদি।
খামারে জৈব নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মেনে চলতে হবে। খাদ্য ও ওষুধ অপচয় কৌশলে রোধ করতে হবে। উপযুক্ত হলেই সরাসরি ভোক্তার নিকট বিক্রি করতে হবে। পুনরায় নতুন করে আবার শুরু করতে হবে। এভাবে খামার স্থাপনের মাধ্যমে স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ফলে করোনায় সৃষ্ট বেকারত্ব বিমোচন  হবে।

লেখক : উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, কাউনিয়া, রংপুর। মোবাইল : ০১৭১৫২৭১০২৬, ইমেইল : drmonojit66@gmail.com

আপডেট চলমান

বিস্তারিত
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় টেকসই চিংড়ি চাষে ক্লাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় টেকসই চিংড়ি চাষে  ক্লাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ

মোঃ শফিকুল ইসলাম
বহুভাষাবিদ পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘যে দেশ তার অতীত ইতিহাস জানে না সে তার ভবিষ্যতের নবসৃষ্টির পথও খুঁজে পায় না।’ আমরা যদি আমাদের অতীত ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখা যায় অতীতে আমাদেরকে বলা হতো ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। কারণ, নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুক চিরে বয়ে চলেছে বহু নদী। কালের পরিক্রমায় ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এই তকমাটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে খাল বিলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, পানি প্রবাহ কমে যাচ্ছে নদীতে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সামুদ্রিক জোয়ারের সঙ্গে ভূভাগের অনেক গভীর মিঠাপানি অঞ্চলেও লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দূরদর্শী নেতা হিসেবে ১৯৭২ সালে কুমিল্লার এক জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘মাছ হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ।’ বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আমাদের অর্থনীতির ভিতকে আরও শক্তিশালী করতে চাই তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কম জায়গায় বেশি মাছ উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনেক সফলতা অর্জন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ৩য় স্থান ধরে রেখে বিগত ১০ বছরে স্বাদুপানির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির হারে দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম স্থান ধরে রেখেছে। ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১ম স্থান অর্জন করেছে। এ ছাড়া তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^ ৪র্থ এবং এশিয়ার মধ্যে ৩য় স্থান অধিকার করেছে। অন্য দিকে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান আশানুরূপ নয়। অথচ বিগত দশ বছরের মৎস্য রপ্তানির তথ্য হতে দেখা যায় যে, আর্থিক মূল্যমানে বাংলাদেশ হতে মোট মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানিতে চিংড়ির অবদান শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ। যেহেতু চিংড়ি একটি রপ্তানিজাত পণ্য সেহেতু এ সেক্টরের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করা সম্ভব। বর্তমানে দেশের ২,৫৮,৬৮১ হেক্টর জলাশয়ে চিংড়ি চাষ হচ্ছে, তন্মধ্যে ১,৮৪,৮১২ হেক্টর বাগদা এবং ৭৩,৮৬০ হেক্টর জলাশয়ে গলদার চাষ হচ্ছে। আমাদের দেশে চিংড়ির চাষ পদ্ধতি মূলত সনাতন ও উন্নত সনাতন। বাগদা চিংড়ির উৎপাদন গড়ে মাত্র ৩৩৪ কেজি/হে. এবং গলদা চিংড়ির উৎপাদন ৬৯৮ কেজি/হে.। অথচ আধা নিবিড় পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ির উৎপাদন গড়ে ৪৪১৪ কেজি/হে.।
বাংলাদেশে চিংড়ি চাষের বিরাজমান অবস্থা
সত্তরের দশকে দেশের দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষের সূচনা হয়। এই চিংড়ি চাষ পরবর্তীতে জাতীয় অথনৈতিক উন্নয়নে এক অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দেয়। ফলে আশির দশকের গোড়ার দিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন ঘের তৈরি করা হয় এবং স্থানীয় উপকূলীয় জলাশয় থেকে বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণ করে ঘেরে মজুদ করার মাধ্যমে চিংড়ি চাষের সূচনা হয়। এতে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে উপকূলীয় অঞ্চলে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে চিংড়ি চাষ উপযোগী ঘেরের আয়তন বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সম্ভাবনাময় এ খাতটির টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে তেমন কোন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়নি। এখন অধিকাংশ ঘেরে উন্নত সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে। এসব অধিকাংশ ঘেরের অবকাঠামো খুবই দুর্বল প্রকৃতির এবং পানির গভীরতা মাত্র ১ ফুট থেকে ১.৫ ফুট। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতি বর্ষণে এসব অধিকাংশ ঘের সহজেই প্লাবিত হয়ে যায়। এ ছাড়া এসব ঘেরে কোন বায়োসিকিউরিটি না থাকার ফলে এক ঘেরের মাছ রোগাক্রান্ত হলে রোগের সংক্রমণ অন্যান্য ঘেরেও সহজে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে শুধু চিংড়ি চাষ করার ফলে ঘেরগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি চিংড়িতে বিভিন্ন রোগের আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়। অপরিকল্পিত ঘেরগুলোর কারণে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন জায়গায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হতেও দেখা যায়। শুষ্ক মৌসুমে উপকূলীয় অঞ্চলের ঘেরগুলোয় পানির লবণাক্ততা ৮-১২ পিপিটি হওয়ার কারণে এখানে মিষ্টি পানির মাছ চাষ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে লবণাক্ততা কমে ০-৫ পিপিটি হলে লবণাক্ত পানির মাছের (বাগদা, ভেটকি, ভাঙান, পারশে ইত্যাদি) পাশাপাশি মিষ্টি পানির মাছও (কার্প, পাবদা, গলদা ইত্যাদি) চাষ করা যায়।
বাগদা চিংড়ির উৎপাদন কম হওয়ার কারণ
উপকূলীয় অঞ্চলের বাগদা চিংড়ির উৎপাদন কম হওয়ার কারণগুলো হচ্ছে- দুর্বল অবকাঠামো; মানসম্পন্ন পোনার অভাব; খাদ্যসহ চাষের বিভিন্ন উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি; সনাতন পদ্ধতির চাষ পদ্ধতি; চাষির পুঁজির অভাব; কারিগরি জ্ঞানের অভাব; আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধতা; ভাইরাসসহ বিভিন্ন কারণে চিংড়ি মারা যাওয়া।
চিংড়ির টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় করণীয়
উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের জীবন জীবিকা আবর্তিত হয় চিংড়িকে কেন্দ্র করে। এখানে চিংড়ি চাষির পাশাপাশি অনেকে রয়েছেন চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী এবং চিংড়ি ক্রেতা ও বিক্রেতা। চিংড়ির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এবং দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখার জন্য পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চিংড়ির টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধি করা একান্ত আবশ্যক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে আশা করছি।
ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ
ক্লাস্টার হলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত খামার সমষ্টি যা সাধারণত একই অঞ্চল ও পরিবেশে খুব কাছাকাছি স্থানে অবস্থিত হয়। ক্লাস্টার পদ্ধতিতে খামারগুলোর মধ্যে বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। যেমন: একই ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ বা অবকাঠামোর ব্যবহার, (যেমন- পানির উৎস, বর্জ্য নির্গমন ব্যবস্থা ইত্যাদি);  একই বা কাছাকাছি চিংড়ি চাষ পদ্ধতির অনুসরণ; একই প্রজাতির মাছ বা চিংড়ি চাষ বা মিশ্রচাষ করা; উদ্যোগী বা সম-স¦ার্থ সংশ্লিষ্ট দল হতে হবে।
চিংড়ি ক্লাস্টার এমন একটি সংগঠন যা একটি নির্দিষ্ট এলাকার চিংড়ি চাষিদের নিয়ে গঠিত হয় এবং সদস্যগণ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য  ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করে।
ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে সুবিধা
 চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদন করা সহজ হয়। বর্তমান চাষ পদ্ধতিতে যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা থেকে সম্মিলিতভাবে উত্তরণের  উপায় বের করা যায়। চিংড়ি চাষে পানির  উৎস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ সহজতর ও সাশ্রয়ী হয়। কারিগরি সহায়তা প্রাপ্তি অনেক সহজ হয়। জৈব নিরাপত্তা প্রতিপালনের মাধ্যমে রোগবালাই প্রতিরোধ করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। সম্মিলিতভাবে গুনগত মানসম্পন্ন উৎপাদন সামগ্রী সংগ্রহ করা যায় এবং উৎপাদন খরচ কমানো যায়। উৎপাদিত পণ্যের গুণমান নিশ্চিতকরণ সহজতর হয়। উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে অধিক সুবিধার পাশাপাশি যথার্থ মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। ক্লাস্টার ফার্মিং এর  আওতায় সংগঠিত চাষি দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ বা অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তি অনেক সহজ হয়। ক্লাস্টারভিত্তিক সার্টিফিকেশনের যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে পণ্যের বর্ধিত মূল্য নিশ্চিত হয়।  চাষির আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়। নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি ক্লাস্টার এক একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠে। ফলে সামাজিক সম্প্রতি বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা
চিংড়ি সেক্টর অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। এই খাতের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ না করে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট জায়গায়     পরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ করতে হবে। এর ফলে একদিকে যেমন নিরাপদ চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, অন্য দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবগুলোও মোকাবিলা করা সহজ হবে।
বিছিন্নভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/সংগঠন ক্লাস্টার ফার্ম নিয়ে কাজ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মৎস্য অধিদপ্তরের এসটিডিএফ (এফএও এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এবং ওয়ার্ল্ড ফিস ও বাংলাদেশ শ্রিম্প ও ফিস ফাউন্ডেশনের সহায়তায়) প্রকল্পের মাধ্যমে।  প্রকল্পটি ২০১৩-১৪ হতে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত ২ বছরে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাতে ৪০টি ক্লাস্টার স্থাপন করে। তন্মধ্যে সফল ক্লাস্টারসমূহে ৭০% পর্যন্ত অধিক উৎপাদন পরিলক্ষিত হয়।
ক্লাস্টার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জসমূহ
ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পারিপাশির্^কতা বিবেচনা করে উপকূলীয় অঞ্চলের লাগসই প্রযুক্তি হিসেবে ক্লাস্টারভিত্তিক মৎস্যচাষের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত চ্যালেঞ্চসমূহ আমাদের সামনে আসতে পারে। যেমন: সঠিকভাবে ক্লাস্টার নির্বাচন করা। কারণ উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ ঘেরগুলোর আয়তন অনেক বড় যেগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করাও অত্যন্ত কঠিন; ক্লাস্টারে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। কারণ অধিকাংশ পানি সরবরাহে খালগুলোয় পলি জমে ভরাট হয়ে গিয়েছে। এ ছাড়া অনেক খাল বিভিন্ন জায়গায় প্রভাবশালীদের দ্বারা দখল হয়ে গিয়েছে; ক্লাস্টারের অধিকাংশ ঘের লিজকৃত হওয়ার কারণে ঘেরের গভীরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া চাষিদের পুঁজির অভাব হয়ে থাকে।
সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্লাস্টার বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করে ক্লাস্টারভিত্তিক চিংড়ি চাষ শুরু করতে পারলে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এ খাতটিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। এই প্রযুক্তিতে চিংড়ি চাষ করতে পারলে চিংড়ির টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধি যেমন সম্ভব হবে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা। মোবাইল : ০১৭১৭-৭০৯৬০০

বিস্তারিত
ঠান্ডাজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিতে করণীয়

ঠান্ডাজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিতে করণীয়
প্রফেসর ড. মো. ফারুক হাসান১ কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম২

সারাদেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ঘনকুয়াশার চাদর মুড়িয়ে শীত এসে উপস্থিত আমাদের মাঝে। কথায় আছে, ‘মাঘের শীতে বাঘ পালায়’। কিন্তু কৃষক ভাইদের মাঠ ছেড়ে পালানোর কোন উপায় নেই। বাংলার মানুষের অন্ন জোগাতে শীতের ঠান্ডা হাওয়ায় লেপের উষ্ণতাকে ছুড়ে ফেলে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মাঠের কাজে। আর তাই তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কবল থেকে আমাদের কৃষিকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে। আসুন জেনে নেই ঠান্ডাজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় সমন্বিত কৃষির সীমানায় কোন কাজগুলো আমাদের করতে হবে।


বোরো ধান
শৈত্যপ্রবাহের সময় সাধারণভাবে কাদাময় বা ভেজা বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিনের ছাউনি দিয়ে সকাল ১০-১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। তীব্র শীতের সময় বীজতলায় সব সময় ১ থেকে ২ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে, এক্ষেত্রে গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করা উত্তম। বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিতে হবে। প্রতিদিন সকালে রশি টানা দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে চারা থেকে কুয়াশার পানি বা শিশির ঝরিয়ে দিলে চারা শীত থেকে রক্ষা পায় এবং ভালোভাবে বাড়তে পারে। ঠান্ডার কারণে বীজতলায় কিছু কিছু জায়গায় চারা ধসে পড়ে বা বসে যেতে পারে। চারায় ধসে বা বসে পড়া রোগ দেখা দিলে বীজতলা থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে এবং এক শতাংশ বীজতলা জন্য ৫০ গ্রাম হারে এমওপি বা পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। তীব্র শীতের সময় চারা পোড়া বা ঝলসানো রোগ দেখা দিতে পারে। চারা পোড়া বা ঝলসানো রোগ দমনের জন্য রোগের প্রাথমিক অবস্থায় অর্থাৎ শুরুর দিকে অ্যাজঅক্সিস্ট্রবিন জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন- এমিস্টার টপ ২ মিলি এক লিটার পানিতে মিশিয়ে দুপুরের পর স্প্রে করতে হবে। বীজতলার চারা হলুদ হলে এক শতক জমিতে ২৮০ গ্রাম হারে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া প্রয়োগের পর চারা সবুজ না হলে এক শতক জমিতে ৪০০ গ্রাম হারে জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের সময় শৈত্যপ্রবাহ থাকলে কয়েক দিন দেরি করে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে চারা রোপণ করতে হবে। রোপণের জন্য কমপক্ষে ৩৫-৪৫ দিনের চারা ব্যবহার করতে হবে। এ বয়সের চারা রোপণ করলে শীতে চারা কম মারা যায়, চারা সতেজ থাকে এবং ফলন বেশি দেয়। রোপণের পর শৈত্যপ্রবাহ হলে জমিতে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। থোড় ও ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়া থাকলে জমিতে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখলে থোড় সহজে বের হয় এবং চিটার পরিমাণ কম হয়। ভেজা বা কাদাময় বীজতলার পাশাপাশি অনেকে আবার বোরো মৌসুমে শুকনা বীজতলায় চারা উৎপাদন করে থাকেন।


শুকনা বীজতলা তীব্র শীতের সময় সার্বক্ষণিক স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে বীজতলায় রসের অভাব হয়েছে কি না। বীজতলায় রসের অভাব হলে স্প্রে করে হালকা সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কৃষিতে আধুনিক ও লাগসই যন্ত্রের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।


রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ তারই অংশ। তবে এ কাজের জন্য ট্রে-তে সুস্থ-সবল ও রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ট্রে-তে অংকুরিত বীজ ফেলানোর ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত এবং শৈত্যপ্রবাহ চলাকালীন সার্বক্ষণিক স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এরপর প্রতিনিয়ত বিকেল ৪টা হতে সকাল ৯টা পর্যন্ত স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। এ ছাড়া শুকনা মাটিতে পাতা ঝলসানো রোগটি বেশি হয় কাজেই ট্রে-তে পরিমাণমতো পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে।


আলু ও টমেটো
ঘন কুয়াশার কারণে আলু ও টমেটো ফসলে লেইট ব্লাইট (মড়করোগ) রোগের আক্রমণ হতে পারে। এ ধরনের আবহাওয়ায় আলু ও টমেটো ফসলে প্রতিরোধক হিসেবে মেনকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন- ডায়থেন এম ৪৫ বা ইন্ডোফিল এম ৪৫ এক লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ৭ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ রোগের আক্রমণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে আক্রান্ত গাছ তুলে মাটি চাপা দিতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জমিতে সেচ দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। প্রতিষেধক হিসেবে ডায়মেথিওমর্ফ বা প্রোপামোকার্ব জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন- সিকিউর ২ গ্রাম অথবা সিকিউর ১ গ্রাম + মেলোডি ডুও ২ গ্রাম একত্রে এক লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ হতে ৭ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া এন্টিস্পোরুলেন্ট হিসেবে এক্রোবেট এমজেড ৪ গ্রাম হারে এক লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। সম্প্রতি আলুর মড়ক রোগের জীবাণুর জিনোমে মেটাল্যাক্সিল জাতীয় ছত্রাকনাশক প্রতিরোধী জিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কাজেই এ জাতীয় ছত্রাকনাশক আলুর মড়ক রোগের বিরুদ্ধে আর কার্যকর হচ্ছে না। শুধু সঠিক ওষুধ সঠিক মাত্রা হলেই চলবে না সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। সম্ভব হলে পাওয়ার স্প্রেয়ার দিয়ে পাতার ওপর-নিচ ও ডালপালা উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।


সরিষা ও শিম
সরিষা ও শিম গাছে জাবপোকার আক্রমণ দেখা দিলে আঠাযুক্ত হলুদ ফাঁদ অথবা আঁধাভাঙ্গা নিমবীজের পানি (১ লিটার পানিতে ৫০ গ্রাম নিমবীজ ভেঙ্গে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ছেঁকে নিতে হবে) আক্রান্ত গাছে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। তবে আক্রমণের মাত্রা খুব বেশি হলে এক লিটার পানিতে এ্যাডমায়ার/টিডো/এমিটাফ ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


আম-লিচু-কাঁঠাল
ঘন কুয়াশার কারণে আম ও লিচুর মুকুল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরূপ আবহাওয়ায় প্রতিরোধক হিসেবে বর্দোমিক্সার অথবা সালফারঘটিত ছত্রাকনাশক যেমন-থিওভিট ৮০ ডব্লিউজি এক লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া এরূপ আবহাওয়ায় আমের শোষক পোকার (হপার) বংশ দ্রুত বৃদ্ধি ঘটতে পারে তাই গাছের কাণ্ডে ও পাতায় সাইপারমেথ্রিন ১০ ইসি গ্রুপের যেকোনো একটি কীটনাশক এক লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আম-লিচু-কাঁঠালে মিলিবাগ পোকার নিম্ফ বা বাচ্চা যেন মাটি থেকে কাণ্ড বেয়ে গাছের উপরের দিকে উঠতে না পারে সে জন্য এ সময় গাছের গোড়া পিচ্ছিল পলিথিন বা টেপ দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে।


সুপারি ও নারকেল
তীব্র শীতের কারণে অনেক সময় নারকেল-সুপারির পাতা পুড়ে যেতে পারে, এটি ঠান্ডাজনিত আঘাত। শৈত্যপ্রবাহকালীন সেচের পানি বা হালকা গরম পানি স্প্রে করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

 

পান
তীব্র শীতের কারণে অনেক সময় পানের পাতা ঝরে যেতে পারে। পানের বরজের চারপাশে বিশেষ করে উত্তর দিকের বেড়া পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিলে তীব্র শীতের হাত হতে রক্ষা করা যায়।

 

শাকসবজি
বেশি ফলন পেতে শীতকালীন শাকসবজি যেমন- ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুঁটি এসবের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক সেচ দিতে হবে।


শীতকাল আমাদের কৃষির জন্য একটি নিশ্চিত মৌসুম। আর তাই নিয়মিত সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ ও যত্নআত্মি নিতে পারলে গাছপালা ও ফল-ফসল সুস্থ সবল থাকে এবং যেকোন খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। সর্বোপরি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে তীব্র শীতে ঠান্ডাজনিত অভিঘাত হতে বিভিন্ন ফল-ফসল যেমন রক্ষা পায় ঠিক তেমনি অধিক ফলনও নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

লেখক : ১চেয়ারম্যান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর। ২অতিরিক্ত উপপরিচালক (এলআর), ডিএই প্রেষণে পিএইচডি ফেলো (এনএটিপি)। মোবাইল : ০১৭১৯৫৪৭১৭৯, ই-মেইল : sayemdae@yahoo.com

 

বিস্তারিত
ভালা বীজে ভালা ফলন ভালা বীজ চিনমু ক্যামনে (নাটিকা)

ভালা বীজে ভালা ফলন
ভালা বীজ চিনমু ক্যামনে
কৃষিবিদ শেখ মোঃ মুজাহিদ নোমানী

দৃশ্যপট
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক এবং মধ্যবয়সী সচ্ছল কৃষক। খালি গায়ে গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা মাথায় গামছা বাঁধা চিন্তাক্লিষ্ট মলিন মুখের ২-৩ জন কৃষক। একতারা হাতে বাউল-বাউলিনী ২ জন।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন। স্কুল বন্ধ। বাড়ির উঠানে গালে হাত দিয়ে চিন্তামগ্ন আছেন স্থানীয় শেরপুর সদরের সাতানীপাড়া প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার সাহেব। মাস্টার সাহেবের সম্মুখে মাথায় গামছা বাঁধা গেঞ্জি-লুঙ্গি পরা দুই-তিনজন চাষি চিন্তামগ্ন অবস্থায় মলিনমুখে বসে আছে। এ সময় বাউল-বাউলিনীর উঠানে প্রবেশ।       
বাউল : আস্সালামু আলাইকুম মাস্টার সাব। কেমন আছেন?
মাস্টার সাহেব : গালে হাত, কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলেন-আছি কোনো মতে। ভালো নাই। খুব চিন্তায় আছি।
বাউল : কি যে কন মাস্টার সাব! ইসকুলের পরীক্ষা শেষ। ইসকুল বন্ধ। তাইলে কিসের এত চিন্তা?
মাস্টার সাহেব : মাস্টার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, চিন্তার কি শেষ আছে বাউল। বীজ বপনের সময় চলছে। ধান, গম, সবজি আর আলু চাষ করতে হবে। কিন্তু ভাবছি ভালো বীজ কোথায় পামু? ভালো বীজ কেমনে চিন্বো? ভালো বীজ চেনার উপায় কি?
বাউলিনী : মাস্টার সাব, কি যে কন! এইডা একটা চিন্তার বিষয় অইলো।
মাস্টার সাহেব : কি যে কও বাউলিনী, গত বছর খারাপ বীজ কিন্যা কী যে সর্বনাশ হইছে। বীজ গজাইছে কম, চারা দুর্বল অইছে। ফলে ফলন হইছে ম্যালা কম। সারা বছর ধান কিন্যা খাইতে হইছে, সংসারে অভাব ছাড়ে নাই। খুব কষ্টে দিন গেছে। সামনে বসে থাকা ২-৩ জন কৃষক একসঙ্গে বলে উঠল, ‘মাস্টার সাব যা কইছে এক্কেবারে হাছা কথা কইছে। আমরারও খুব ক্ষতি অইছে।’
বাউল : মাস্টার সাব আপনি কোন চিন্তা কইরেন না। ভালো বীজের উপর আপনাগোর একটা গান শুনাই। গানটা শুনলে আপনার বীজের সব সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবো। ওরে বাউলিনী গলা ধর,বলে বাউল একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নেয়। তারপর পুঁথির সুরে গান ধরে-
“শোন শোন কৃষক ভাই, শোন দিয়া মন।
প্রত্যায়িত বীজের কথা, করিব বর্ণন।                                                                                                                                                                                                                                       ভালা বীজে ভালা ফসল, সুধী জনে কয়।
প্রত্যায়িত বীজই ভালো বীজ, জানিবে নিশ্চয়।
বিশ ভাগ বেশি ফলন, পাইতে হইলে ভাই,
প্রত্যায়িত বীজ ছাড়া, আর যে উপায় নাই।
প্রত্যায়িত বীজে অধিক লাভ, জানিও সবাই
থাকিবে না কোন অভাব, সন্দেহ যে নাই।
প্রত্যয়ন ট্যাগ দেখিয়া, বীজ কিনিও ভাই
টাকা দিয়া বীজ কিনিয়া, ঠকার ভয় নাই।
এই বীজে আছে ভাই, সকল ভালো উপাদান!
এই বীজের ব্যবহারে, বাড়বে দেশের মান।”
আজ তাই সব কৃষকের দৃঢ়সংকল্প “প্রত্যায়িত বীজ বিনা নাই যে বিকল্প।”
(দৃশ্য পট : দেখা গেল মাস্টার সাহেবের মুখে চিন্তার আর কোনো চিহ্ন নাই। তিনি খুব খুশি, চোখে মুখে বিরাট একটা গুপ্তধন পাওয়ার আনন্দ উচ্ছ্বাস)।                                                                                            
মাস্টার সাহেব : বাউল তাইলে শোন। দেশি-বিদেশি অনেক কোম্পানির বীজের নাম শুনছি। কিন্তু ‘প্রত্যায়িত বীজ’ এর কথা আগেতো  শুনি নাই। প্রত্যায়িত বীজ দেখতে কেমন? এই বীজ কোথায় পাবো?
বাউল : বাউল বলে, মাস্টার সাব কোনো চিন্তা কইরেন না। আপনারা হ¹লে মনোযোগ দিয়া হুনেন। ‘ভালা বীজে ভালা ফসল’। আর ‘প্রত্যায়িত বীজই অইলো ভালা বীজ।’ প্রত্যায়িত বীজ হইতাছে সেই বীজ যেডা বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী’- প্রত্যয়ন দিয়া থাকে।
মাস্টার সাহেব : তাইলে বীজ প্রত্যয়ন অফিসের কাজটা কি? কেমনে কইরা বীজের প্রত্যয়ন দেয়, একটু বুঝাইয়া কওতো দেখি।
বাউল : মাস্টার সাব তাইলে শুনেন। জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিস অইলো কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী’র একটা পুরাপুরি সরকারি অফিস। এই অফিস হইতে বাংলাদেশে যত বীজ আছে সব বীজের বিশেষ কইরা আপনাগোর ধান, পাট, গম, আলু ও কেনাপের উন্নত জাতের ভালা বীজের গেরান্টি দেয়; মানে বীজের প্রত্যয়ন বা ভালা সার্টিফিকেট উনারাই দিয়া থাকেন। ফলে এই বীজের ফলন বেশি হইবো, টাকা পয়সাও বেশি পাইবেন।
মাস্টার সাহেব : তাইলে তো এই বীজই ভালো। এই তোমরা হ¹লে শোন, এই বীজের লাইগা চলো আমরা সবাই কাইলকা জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিসে যাই।
বাউল : আগে ভালো কইরা হুনেন, তারপরে কই যাবেন ঠিক করবেন। মাস্টার সাব ঐ অফিসে যাইয়া কোন লাভ অইবো না। ওই অফিসে কোনো বীজ বেচাকেনা হয় না। উনারা শুধু বিভিন্ন সরকারি বা প্রাইভেট বীজ কোম্পানি যারা ভিত্তি ও প্রত্যায়িত বীজ উৎপাদন কইরা থাকে সেই ভালা বীজের প্রত্যয়ন অর্থাৎ সাট্টিফিকেট দিয়া থাকে। আর যেটা খারাপ বীজ সেটা উনারা বাতিল কইরা দেন। খারাপ বীজের প্রত্যয়ন তো উনারা দেনই না বরং কেউ যদি খারাপ বীজ বিক্রি করে, কৃষকদের সাথে চালাকি করে, মিথ্যা কথা কইয়া ঠকায়। তাইলে তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করে, বীজ আইনে মামলা কইরা তাদের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা কইরা থাকে।
মাস্টার সাহেব : খুশিতে বলে উঠেন, খুব ভালো কথাতো। বাউল, এর আগে আমারে তো কেউ এই সব কথা বলে নাই। তোমার কথা শুইনা আমি এখন বুঝতে পারছি ‘প্রত্যায়িত বীজ’ ছাড়া আর কোনো বীজ ব্যবহার করা ঠিক হইবো না। গত বৎসর এই ভিত্তি প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার না কইরা কি ভুলটাই না করছি। এই বীজ প্রত্যয়নের অফিসটা আরো আগে হইলে ভালো হইত।
বাউল : বাউল এবার আয়েশী ভঙ্গিতে বলে মাস্টার সাব, এই অফিসটা নতুন না, পুরানা অফিস কিন্তু আমরা অনেকেই তা জানিনা। ‘ভালো বীজে ভালো ফলন’ আর ‘প্রত্যায়িত বীজই  হইল ভালো বীজ’-এই কথাটা আমরা না বুঝলেও আমাগোর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঠিকই বুঝেছিলেন। আর চাষিরা যাতে সময়মতো ভালো বীজ পাইতে পারে তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার ২ বছর পরেই ১৯৭৪ সালে ‘বীজ অনুমোদন সংস্থা’ নামে সারা বাংলাদেশে প্রথম ৩০টি বীজের অফিস চালু করেন, শুধু তাই না ঢাকা, গাজীপুর আর পাবনার ঈশ^রদীতে বীজ পরীক্ষা ও গবেষণার জন্য বীজ পরীক্ষাগার বানাইয়া দেন।
মাস্টার সাহেব : আচ্ছা বাউল, তুমি এত কথা জানলা কেমনে! আর প্রত্যয়ন ট্যাগ জিনিসটা কি? এইডা তো বুঝাইয়া কইলা না। মাস্টার সাহেবের একরাশ প্রশ্ন।   
বাউল : হ মাস্টার সাব ঠিক কথাই কইছেন। প্রত্যয়ন ট্যাগ কেমনে চিনলাম এই কথাডা আপনারে কইতাছি । আমি গেল ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে জামালপুর জেলা স্টেডিয়ামে ৩ দিনের একটা উন্নয়ন মেলায় গেছিলাম। সেখানে জেলা বীজ প্রত্যয়নের  স্টলে যাই। ওই স্টলে যাইয়া দেখি নতুন নতুন কথাবার্তা, কিছু নতুন বড় বড় ছবি, কয়েকটা মেশিন সাজানো আছে। আর চর্তুদিকে ৮/১০টি বীজের ফেস্টুন লাগানো আছে। এর মধ্যে থাইক্যা ‘মেশিনের সাহায্যে আসল-নকল প্রত্যয়ন ট্যাগ চেনা ও প্রতারণা হতে রক্ষার আধুনিক পদ্ধতি’ আমার কাছে খুবই পছন্দ অইল।   
একটু দম নিয়ে বাউল আবার বলতে থাকে, স্টলে বসা টাক মাথার এক বীজ প্রত্যয়ন স্যারকে একটু ভয়ে ভয়ে আমি কইলাম ওই প্রত্যয়ন ট্যাগ দেইখা কেমনে ভালো বীজ চেনা যায় একটু যদি বুঝাইয়া কইতেন। তখন তিনি বললেন, বিডার বীজ বা প্রজনন বীজ এককথায় মৌল বীজ খুব যত্ন কইরা করতে হয়। এই বীজ শুধু ধান গবেষণা, পাট গবেষণা, গম গবেষণা, আলু গবেষণা এবং কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উৎপাদন করা হয়। এই বীজ বিএডিসি, বড় বড় বীজ কোম্পানি কিন্যা নিয়া প্রথমে ভিত্তি বীজ করে, ভালো ফলন পায়। পরের বছর ভিত্তিবীজ অইতে প্রত্যায়িত বীজ করে। ফসলের মাঠে ও বীজ পরীক্ষাগারে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা কইরা এই প্রত্যয়ন ট্যাগ প্রত্যেকটি বীজের ব্যাগে লাগাইয়া দেয়া হয়। এই সব বীজের প্রত্যয়ন বীজ প্রত্যয়ন অফিস দিয়া থাকে। আর এই প্রত্যয়ন পত্র অর্থাৎ গ্যারান্টি সার্টিফিকেটই হইলো ‘প্রত্যয়ন ট্যাগ’- বুঝছেন মাস্টার সাব।
দৃশ্যপট : (এই বলে বাউল একটু চুপ করে। এ সময় মাস্টার সাহেব বলে উঠেন)।
মাস্টার সাহেব : বাউল তোমারে ধন্যবাদ। এইবার বুঝছি প্রত্যায়িত বীজ আর প্রত্যয়ন ট্যাগ কি। কিন্তু প্রত্যয়ন ট্যাগ দিয়া বীজ চিনুম কিভাবে এইডা যদি একটু খোলাসা কইরা কইতা তাইলে ভালো হইতো।
বাউল : একটু দম নিয়া বাউল আবার বলা শুরু করলো, প্রত্যেকটা বীজের লাইগ্যা আলাদা আলাদা প্রত্যয়ন ট্যাগ আছে যেমন বিডার বা মৌল বীজের ট্যাগ অইবো ‘সবুজ রঙের’, ভিত্তি বীজের ট্যাগ অইবো ‘সাদা রঙের’, আর প্রত্যায়িত বীজের ট্যাগের রঙ অইবো ‘নীল রঙের’। এখন সরকারি কড়া নিয়ম অইলো যে, ২ কেজি, ১০ কেজি ধান বীজ, গমের ২০ কেজি আর ৪০ কেজি বীজ আলুর প্যাকেটের গায়ে বা উপরে এই প্রত্যয়ন ট্যাগ অবশ্যই লাগানো থাকতে অইবো। যাতে কৃষক ভাইয়েরা সহজেই এই প্রত্যয়ন ট্যাগ দেইখ্যা বুঝতে পারে কোনডা ভিত্তিবীজ, কোনডা প্রত্যায়িত বীজ আর কোনডা অপ্রত্যায়িত বীজ অর্থাৎ ‘অপ্রত্যায়িত বীজ’ অইলো ‘মানঘোষিত বীজ’। এই মানঘোষিত বীজের জন্য বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি কোনো প্রত্যয়ন ট্যাগ দেয় না। এই বীজের মান বা গুণাগুণ বীজ প্যাকেটের গায়ে বা ব্যাগের সঙ্গে লাগানো ট্যাগের মতো দেখতে হলুদ কার্ডে সব লেখা থাকে। আর এই বীজের ভালো, মন্দ বা খারাপ হওয়ার দায়দায়িত্ব বীজ উৎপাদনকারী ওই কোম্পানির। কোম্পানির বীজ খারাপ হইলে তার বিরুদ্ধে সরকার মামলা-মোকদ্দমা করে, মোবাইল কোর্ট কইরা শাস্তি দেয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বীজ ডিলার বা বীজ কোম্পানি খারাপ বীজ বেচাকেনা করতে সাহস না পায়।        
বাউল : আরেকটা কথা বীজ কিনার সময় স্যার কইছেন বীজ ব্যাগে/প্যাকেটে লাগানো প্রত্যয়ন ট্যাগ আসল না নকল তা বীজ ডিলারের দোকানে থাকা ইউভিএল(টঠখ) লাইট মেশিনে দেইখা নিতে কইছেন। তাইলে আর ঠকার ভয় নাই।
মাস্টার সাহেব : আচ্ছা, এই মানঘোষিত বীজটা কেমন?
বাউল : উত্তরে বলে, মাস্টার সাহেব এই বীজ ভালো তবে এই বীজ নিয়া খাবার ধান, গম, আলু, সবজি ও পাট ভালো অইবো কিন্তু এই বীজ অইতে আবার বীজ ফসল করলে ভালো বীজ অইবো না। তয় এই বীজ হতে খাওয়ার ধান, গম, আলুর ভোজন ফসল করা যাইবো, কোনো অসুবিধা নাই। তবে এই বীজের সঙ্গে অন্য বীজের পার্থক্য একটাই, সেটা অইলো এই মানঘোষিত বীজের জন্য সরকার কোনো প্রত্যয়ন ট্যাগ দেয় না। উৎপাদনকারী নিজেই প্যাকেটের গায়ে বীজের মান ঘোষণা কইরা দেয় অর্থাৎ হলুদ কার্ডে প্যাকেটের উপর বীজের মান লেইখা দেয়।
মাস্টার সাহেব : খুশি মনে বলে উঠেন বাউল তোমারে আবারও ধন্যবাদ। হ্যাঁ বাউল, ভালো বীজ সম্বন্ধে আমার এখন একটা পরিষ্কার ধারণা হইয়া গেল। আমরা সবাই চেষ্টা করমু অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য ভিত্তি ও প্রত্যায়িত বীজ ব্যবহার করার। এই দুইটা বীজ না পাইলে তখন আমরা এই মানঘোষিত বীজ ব্যবহার করমু। কি রহিম মিয়া, করিম মিয়া এখন বুঝলাতো প্যাকেটের বীজ পরীক্ষা না কইরা, বীজ না দেইখ্যা সহজেই ভালো বীজ মানে প্রত্যায়িত বীজ চেনার উপায়টা আমরা এখন সবাই বুঝতে পারছি।
ভালো বীজেই অধিক ফসল, দেশ ও জাতি হবে সুস্থ সবল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকারের যুগান্তকারী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে আমাদের কোন চিন্তা নাই। কালকেই আমরা সবাই মিল্যা বাজারে যাইয়া বীজ ডিলারের দোকান হইতে ভিত্তি/প্রত্যায়িত বীজ কিন্যা আনবো, ঠিক আছে না!
(বিঃ দ্রঃ : ‘ভালো বীজ তথা প্রত্যয়নকৃত বীজ চেনার সহজ উপায় এবং প্রতারণা হতে রক্ষার আধুনিক পদ্ধতি’ শীর্ষক উদ্ভাবনী উদ্যোগের আলোকে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে এই ছোট একাংকিকাটি রচনা করা হয়েছে।)

লেখক : উপপরিচালক ও জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিসার (অব.), এসসিএ, কৃষি মন্ত্রণালয়। মোবাইল : ০১৭১৮-৭৩৯৮৫৫, ইমেইল : : nomani1961@gmail.com

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর কৃষিবিদ ড. মো. তৌফিক আরেফীন

প্রশ্নোত্তর
কৃষিবিদ ড. মো. তৌফিক আরেফীন

কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো. করিম মিয়া, গ্রাম: বাকতা, উপজেলা: ফুলবাড়িয়া, জেলা: ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন : এক ধরনের পোকার আক্রমণে নারকেলের খোসাতে বেশ শক্ত দাগ এবং ফাটাফাটা দাগ দেখা যায়। কী করণীয়?
উত্তর : এ সমস্যাটি মাকড়ের আক্রমণে হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে নারকেল বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি গাছে সুষম সার প্রয়োগ করা দরকার। এসবের পাশাপাশি এবামেকটিন গ্রুপের ১.২৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করলে এ ধরনের মাকড়ের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।
মোঃ মতিন তালুকদার, গ্রাম: যাদবপুর, উপজেলা: আলমডাঙ্গা, জেলা: চুয়াডাঙ্গা।
প্রশ্ন: বাড়িতে একটা কাঁঠালগাছ আছে। কিন্তু কাঁঠাল পাকার আগে ফেটে যায়, কোষগুলোর গোড়ার দিকে শলার মতো হয় এবং রস কম হয়। এ অবস্থায় করণীয় কী ?
উত্তর: কাঁঠাল পাকার আগে ফেটে যায় শরীরবৃত্তীয় কারণে। আর বেশির ভাগ সময়েই এটি ঘটে থাকে সেচের অভাবে। সেজন্য ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে  ১৫ দিন অন্তর পানি সেচ দিলে কচি ফল ঝরা, ফলন ও ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া ফল ফেটে যাওয়াও রোধ হয়। তবে আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার, কাঁঠাল গাছের জাতভেদে ফল অনেক সময়ই ফেটে যায়। সেজন্য গাছের নিয়মিত পরিচর্যা ও বর্ষার আগে ও পরে সুষম সার প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
মো. মতিউর রহমান, গ্রাম: লাউযুতি, উপজেলা: ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
প্রশ্ন:  মিষ্টি আলুর পাতায় এক ধরনের দাগ পড়ে গাছের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে। কী করবো?
উত্তর: মিষ্টি আলুর পাতার এ রোগকে ফিদারি মোটল রোগ বলে। এ রোগটি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। জাবপোকার মাধ্যমে এ ভাইরাসটি ছড়ায়। সে কারণে বাহক পোকা অর্থাৎ জাবপোকা দমন করতে ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রুপের, যেমন এডমায়ার প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি মিশিয়ে সঠিক নিয়মে বিকেলের দিকে প্রতি ১৫ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করতে হবে। তাহলে এ  রোগ দমন করা সম্ভব হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে এ রোগ হলে মিষ্টি আলুর ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়।    
মোঃ রহমত আলী, গ্রাম: সাকোয়া  উপজেলা: বোদা, জেলা: পঞ্চগড়।
প্রশ্ন: পটোল গাছ থেকে কিভাবে শাখা কলম তৈরি করা যায়? জানাবেন।
উত্তর:  এক বছর বয়সী ভালো পটোল গাছের যে কোন শাখার মাঝামাঝি অংশ থেকে শাখা কলম তৈরি করা যায়। সেক্ষেত্রে এক মিটার বা দু’হাত লম্বা পরিমাণ শাখা পটোল গাছ থেকে সংগ্রহ করে রিং বা চুড়ি আকার তৈরি করে পিট বা মাদায় লাগানো হয়। পটোলের শাখা কলম ৫০ পিপিএম ইনডোল বিউটারিক এসিড বা আইবিএ দ্রবণে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে মাদায় বা পিটে লাগালে তাড়াতাড়ি বা বেশি সংখ্যক মূল গজায়। আর এভাবে পটোলের উন্নতমানের শাখা কলম তৈরি করে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
প্রশ্ন: গাজরের পাতায় দাগ রোগ দমনে করণীয় কী ?
উত্তর: গাজরের পাতায় দাগ রোগ দমনে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। সেজন্য গাজরের বীজ শোধন করা দরকার। আর বীজ শোধনের জন্য কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন অটোস্টিন ৫০ ডব্লিউজি অথবা কার্বোক্সিন ও থিরাম গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। শস্যপর্যায় অবলম্বনের পাশাপাশি সুষম সার প্রয়োগ করা দরকার। এছাড়া পাতায় দাগ দেখার সাথে সাথে ইপ্রোডিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন রোভরাল ২ গ্রাম অথবা ডাইফেনোকোনাজল ও এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। আশাকরি আপনি উপকার পাবেন।
প্রশ্ন: মুলা গাছের পাতায় সাদা মরিচার মতো দাগ পড়ে কি করবো? জানাবেন।
উত্তর : এ ধরনের রোগের ক্ষেত্রে সাধারণত পাতার নিচের দিকে সাদা ছত্রাকের দানা দেখা যায়। রোগের মাত্রা বেশি হলে পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে। এ সমস্যারোধে আক্রান্ত পাতা ও গাছ সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। পানি নিকাশের ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি সুষম সার ও সময়মতো সেচ সুবিধা রাখা দরকার। জমিতে রোগ দেখা দিলে মেটালেক্সিল ও মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন রিডোমিল গোল্ড ২ গ্রাম অথবা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন টিল্ট ২৫০ ইসি ০.৫ মিলিলিটার ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর মুলা গাছে ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। তাহলেই আপনি সুফল পাবেন।
মৎস্য বিষয়ক
মো: খয়বর আলী, গ্রাম: মাছহাড়ি, উপজেলা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর।
প্রশ্ন: মাছের সেপরোলে গনিয়াসিস রোগ দেখা যাচ্ছে। এর প্রতিকার কি?
উত্তর: এটি ছত্রাকজনিত রোগ। সেপরোলেগনিয়া প্রজাতি এ রোগের কারণ। কার্পজাতীয় মাছে এ রোগটি বেশি হয়ে থাকে। আক্রান্ত মাছের ক্ষতস্থানে তুলার ন্যায় ছত্রাক দেখা দেয় এবং পানির স্রোত যখন স্থির হয়ে যায় কিংবা বদ্ধ জলায় অথবা হ্যাচারি ট্যাংকে যেখানে অনিষিক্ত ডিমের ব্যাপক সমাগম ঘটে তাতে ছত্রাক রোগ দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করে। হ্যাচারিতে লালনকৃত ডিমগুলোকে ২৫০ পিপিএম ফরমালিন দিয়ে ধৌত করতে হবে। খাঁচা ও আক্রান্ত মাছগুলোকে শতকরা ৫ ভাগ লবণ পানিতে ১ মিনিট গোসল করাতে হবে।
শেফালী খাতুন, গ্রাম: সারানপুর, উপজেলা:  গোদাগাড়ী, জেলা: রাজশাহী।
প্রশ্ন: রুই মাছে সাদা দাগ রোগ হয়েছে। কী করলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাবো?
উত্তর : এ রোগে মাছের পাখনা, কানকো ও দেহের উপর সাদা দাগ দেখা যায়। মাছের ক্ষুধামন্দা এবং দেহের স্বাভাবিক পিচ্ছিলতা লোপ পেয়ে খসখসে হয়ে যায়। ইকথায়োপথেরিয়াস প্রজাতি এ রোগের কারণ। এ রোগ প্রতিকারে ১ পিপিএম তুঁতে পানিতে গোসল দেয়া কিংবা শতকরা ২.৫ ভাগ লবণ পানিতে কয়েক মিনিটের জন্য রাখা যতক্ষণ পর্যন্ত মাছ লাফিয়ে না পড়ে। এছাড়া এ ধরনের রোগ যাতে না হয় সেজন্য শামুকজাতীয় প্রাণী পুকুর থেকে সরিয়ে ফেলা। শতকরা ২.৫ ভাগ লবণ পানিতে ৫-৭ মিনিট গোসল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে পোনা মজুদ করতে হয়। তাছাড়া রোদে শুকনা জাল পুকুরে ব্যবহার করাও দরকার। আরেকটি বিষয় অনুসরণীয় সেটি হলো মাছের স্বাভাবিক সংখ্যা বজায় রেখে অতিরিক্ত মাছ সরিয়ে নেয়া।
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
মো. কালাম, গ্রাম: কালের কাঠি, উপজেলা: বাকেরগঞ্জ, জেলা: বরিশাল।
প্রশ্ন: আমার কোয়েল পাখি আছে। পাখি খুঁড়িয়ে হাঁটছে এবং এ সময় নখ বাঁকা দেখা যাচ্ছে। কী করবো ?
উত্তর: ভিটামিন বি-২ যুক্ত প্রাকৃতিক খাদ্য যেমন- প্রাণীর যকৃত, সবুজ কচিঘাস, প্রাণীর কিডনি বা মাছের গুঁড়া ইত্যাদি অথবা ভিটামিন মিনারেল প্রিমিক্স খাওয়াতে হবে। তাহলে আপনার কোয়েল পাখির উল্লিখিত সমস্যা দূর হয়ে যাবে।  
মো: ফারুক হোসেন, গ্রাম: রনসিয়া, উপজেলা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও।
প্রশ্ন: গরুর গা খসখসে এবং ঘা হচ্ছে। এ অবস্থায় কি করণীয়?
উত্তর: ইনজেকশন ভারমিক প্রতি ২৫ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ১সিসি ১বার চামড়ার নিচে পুশ করতে হবে। যদি সমস্যাটি বেশি হয় তবে ৭ দিন পর বুস্টার ডোজ আবারও ১ বার দিতে হবে। এ ছাড়া ইনজেকশন অ্যাসটাভেট ১০০ কেজি গরুর দেহের ওজনের জন্য ৫সিসি. করে দৈনিক ১ বার ৩ থেকে ৫ দিন মাংসে পুশ করতে হবে এবং ইনজেকশন অ্যামক্সিভেট ১ ভায়েল করে রোজ ১বার ৩দিন মাংসে পুশ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে আপনার গরুর সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)
কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে।

লেখক : উপপরিচালক (হর্টিকালচার), জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি (নাটা), কৃষি মন্ত্রণালয়। মোবাইল : ০১৭১১১১৬০৩২, মেইল: taufiquedae25@gmail.com

বিস্তারিত
মাঘ মাসের কৃষি (১৫ জানুয়ারি- ১৩ ফেব্রুয়ারি)

মাঘ মাসের কৃষি
(১৫ জানুয়ারি- ১৩ ফেব্রুয়ারি)

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম
মাঘ মাস। শীতের আগমন। এ মাসে জলবায়ু পরিবর্তনে শৈত্যপ্রবাহ শীতের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শীতের মাঝেও মানুষের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত করতে কৃষক-কৃষানি ব্যস্ত হয়ে পড়ে মাঠের কাজে। কেননা এ সময়টা কৃষির এক ব্যস্ততম সময়।। তাই আসুন আমরা জেনে নেই মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো।
বোরো ধান
ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। ধানের চারা রোপণের  ১৫-২০ দিন পর প্রথম কিস্তি, ৩০-৪০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং ৫০-৫৫ দিন পর শেষ কিস্তি হিসেবে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। বোরো ধানে নিয়মিত সেচ প্রদান, আগাছা দমন, বালাই ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে। রোগ ও পোকা থেকে ধান গাছকে বাঁচাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, আন্তঃপরিচর্যা, যান্ত্রিক দমন, উপকারী পোকা সংরক্ষণ, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা, আলোর ফাঁদ এসবের মাধ্যমে ধানক্ষেত বালাই মুক্ত করতে পারেন। এভাবে রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে শেষ উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
গম
গমের জমিতে যেখানে ঘনচারা রয়েছে তা পাতলা করে দিতে হবে। গম গাছ থেকে যদি শিষ বেড় হয় বা গম গাছের বয়স ৫৫-৬০ দিন হয় তবে জরুরিভাবে গমক্ষেতে একটি সেচ দিতে হবে। এতে গমের ফলন বৃদ্ধি পাবে। ভালো ফলনের জন্য দানা গঠনের সময় আরেকবার সেচ দিতে হবে। গম ক্ষেতে ইঁদুর দমনের কাজটি সকলে মিলে একসাথে করতে হবে।
ভুট্টা
ভুট্টা ক্ষেতে গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য কারণে এসময় ভুট্টা ফসলে আর্মিওয়ার্ম, ফল আর্মিওয়ার্ম ইত্যাদি পোকার আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত গাছ থেকে লার্ভাগুলো হাত দ্বারা সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে স্পেনোসেড (ট্রেসার ৪৫এসসি@ ০.৪ মিলি./ লিটার) বা এবামেকটিন বেনজোয়েট ( প্রোক্লেম ৫ এসজি বা সাহাম ৫ এসজি @ ১ গ্রাম/ লিটার) বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
আলু
আলু ফসলে নাবি ধসা রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে ¯েপ্রয়িং শিডিউল মেনে চলতে হবে। মড়ক রোগ দমনে দেরি না করে ২ গ্রাম এক্সট্রামিল অথবা ডাইথেন এম ৪৫ অথবা সিকিউর অথবা মেলুডি ডুও প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে নিয়মিত ¯েপ্র করতে হবে। মড়ক লাগা জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া আলু ফসলে মালচিং, সেচ প্রয়োগ, আগাছা দমনের কাজগুলোও করতে হবে। আলু  গাছের বয়স ৮০ দিন হলে মাটির  সমান করে গাছ কেটে দিতে হবে এবং ১০ দিন পর আলু তুলে ফেলতে হবে। খুব সহজে ও কম খরচে আলু উত্তোলন করতে পটেটো ডিগার যন্ত্র ব্যবহার করুন। ক্ষতির হার ১% এর নিচে এবং শ্রমিক ৫০% সাশ্রয় হয়। আলু তোলার পর  ভালো করে শুকিয়ে বাছাই করতে হবে এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তুলা
তুলা সংগ্রহের কাজ এ মাস থেকেই শুরু করতে হবে। তুলা সাধারণত ৩ পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। শুরুতে ৫০% বোল ফাটলে প্রথম বার, বাকি ফলের ৩০% পরিপক্ব হলে দ্বিতীয় বার এবং অবশিষ্ট ফসল পরিপক্ব হলে শেষ অংশের তুলা সংগ্রহ করতে হবে। রৌদ্রময় শুকনা দিনে বীজ তুলা উঠাতে হয়। ভালো তুলার সাথে যেন খারাপ তুলা (পোকায় খাওয়া, রোগাক্রান্ত) কখনো না মেশে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভালো তুলা আলাদাভাবে তুলে ৩-৪ বার রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরে মাচা বা দানেস এর উপর সংরক্ষণ করতে হবে। ইঁদুর নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল করতে হবে।
ডাল ও তেল ফসল
মসুর, ছোলা, মটর, মাসকালাই, মুগ, তিসি এ সময় পাকে। সরিষা, তিসি বেশি পাকলে রোদের তাপে ফেটে গিয়ে বীজ পড়ে যেতে পারে, তাই এগুলো ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাল ফসলের ক্ষেত্রে গাছ গোড়াসহ না উঠিয়ে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি রেখে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। এতে জমির উর্বরতা এবং নাইট্রোজেন সরবরাহ বাড়বে। এ সময় চর অঞ্চলে পেঁয়াজের সাথে বিলে ফসল হিসেবে বাদাম চাষ করতে পারেন।
শাকসবজি
বেশি ফলন পেতে  শীতকালীন শাকসবজি যেমন ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুঁটি এসবের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে জৈব সার,  জৈব বালাইনাশক, ফেরোমন ফাঁদ  সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বালাই দমন করতে হবে। শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক সেচ দিতে হবে।
গাছপালা
শীতে গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে। গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছামুক্ত রাখতে হবে। সাধারণত এ সময় আমগাছে মুকুল আসে। গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে টিল্ট-২৫০ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ১ মিলি কন্জা প্লাস অথবা ২ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। এসময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
শীতকালে পোল্ট্রিতে অপুষ্টি, রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব সমস্যা দেখা যায়। মোরগ-মুরগীর অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে ও ফলিক এসিড সরবরাহ করতে হবে। শীতের তীব্রতা বেশি হলে পোল্ট্রি শেডে অবশ্যই মোটা চটের পর্দা লাগাতে হবে এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পোল্ট্রি লিটারে অ্যামোনিয়া গ্যাস রোধে ১ বর্গফুট জায়গায় ১ কেজি হারে অ্যামোনিল পাউডার মিশাতে হবে। গোখামারে শীতকালে মোটা চটের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।  নাহলে গাভীগুলো তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে যাবে।
মৎস্যসম্পদ
পুকুরে পানি কমে দূষিত হয়ে যায় বলে শীতকালে মাছের বিশেষ যত্ন নিতে হবে। কার্প ও শিং জাতীয় মাছে ড্রপসি বা উদর ফোলা রোগ দেখা দেয়। মাছের ক্ষতরোগ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। আর এ রোগের প্রতিকারে প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন বা স্ট্রেপটোমাইসিন পরপর ৭ দিন খাওয়াতে হবে। মাছ চাষ বিষয়ে যে কোন পরামর্শের জন্য কাছের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
সুপ্রিয় পাঠক, অত্যন্ত সংক্ষেপে মাঘ মাসে কৃষিতে করণীয় কাজগুলোর উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হলো। আপনারা আপনাদের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে কাজ করলে সফলতা আসবেই। কৃষির যে কোনো সমস্যায় উপজেলা কৃষি অফিস, উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

লেখক : সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা।  টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, মেইল: editor@ais.gov.bd

 

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook