কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও আগামীর করণীয়

টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও আগামীর করণীয়
মোঃ সায়েদুল ইসলাম
বাংলাদেশ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় (এফএও) ১৯৭৩ সালে যোগদানের পর এই প্রথমবারের মতো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক খাদ্যনিরাপত্তা সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সঙ্গে যৌথভাবে ৩৬তম ওই সম্মেলনে বিশ্বের ৪৬টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেবেন। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারী ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে এতে যোগ দেবেন। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক সম্মেলনের ৩৬তম অধিবেশনটি অত্যন্ত অর্থবহ। কারণ সদস্য দেশ ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের কৃষির অবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। বৈশ্বিক করোনা অতিমারির প্রেক্ষাপটে এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে অংশীদারিত্ব, উদ্ভাবন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদাহরণকে তুলে ধরার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি উন্নয়নে অবদান রাখবে। 

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রগাঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন কৃষি উন্নয়ন ব্যতীত বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি স্বাধীনতা-উত্তর দেশ পুনর্গঠনে গভীরভাবে মনোযোগী হয়েছিলেন বাংলার কৃষি উন্নয়নে। এ কারণেই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক দিয়ে কালজয়ী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কৃষি উন্নয়নের এ ধারা বজায় রেখেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা কৃষকবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা অতিমারির প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আপনার সুদক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। আপনার দূরদর্শী নীতি ও পরিকল্পনায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণে টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের কৃষি উন্নয়ন অগ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান সরকার কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সারসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস ও সহজলভ্যকরণ, কৃষকদের উন্নয়ন সহায়তা প্রদান, গবেষণা কার্যক্রম  জোরদারকরণ, উন্নত জাত ও কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিস্তৃতকরণ, ই-কৃষির প্রচলন, কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ ও অন্যান্য নীতিমালা প্রণয়নসহ বহুমুখী কৃষি কল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে তৃতীয়, শাকসবজি উৎপাদন বৃৃৃৃদ্ধির হারে তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় ও কাঁচা পাট রপ্তানিতে প্রথম, আম ও আলু উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম। সম্প্রতি পেঁয়াজ উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উন্নীত হয়েছে। শুধু খাদ্যশস্যই নয় বৃহত্তর কৃষির আঙিনায় মাছ, মাংস, দুধ, ডিম এসবেরও উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ। 

খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য আমরা কাজ করছি। মুজিব শতবর্ষে অনাবাদি পতিত, বসতবাড়ির আঙিনাসহ প্রতি ইঞ্চি জমি চাষের আওতায় নিয়ে এসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরও পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পারিবারিক পুষ্টি বাগান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পুষ্টি চাহিদা পূরণে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে আরও কয়েকটি প্রকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এসডিজির  লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কফি, কাজুবাদামসহ রপ্তানির সম্ভাবনাময় উচ্চমূল্যের ফসল/প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে কৃষি মন্ত্রণালয় সচেষ্ট রয়েছে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অনেক প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিষয়ে সাদৃশ্য বিদ্যমান। সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে যৌথ কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি সুষম ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্বল্প উপকরণ ব্যবহারে অধিক খাদ্য উৎপাদন কৌশল বের করতে হবে। উন্নত বিভিন্ন প্রযুক্তি যেমন- তথ্য প্রযুক্তি, ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা, প্রিসিশন এগ্রিকালচার, জৈবপ্রযুক্তি, দক্ষ সেচব্যবস্থা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত কৃষিযন্ত্রপাতি ইত্যাদি বিষয়ে সদস্য দেশগুলো যৌথ কার্যক্রম গ্রহণ করে পারস্পরিক লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, শস্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে অপচয় হ্রাস, বিশেষ করে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার বিষয়েও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আগামীতে আরও প্রসারিত করতে হবে। এছাড়া ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের ধারণা বাস্তবায়নে কৃষিকে ভবিষ্যতে অটোমেশনে আনায়নের প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন চলমান রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)তে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ এবারই প্রথম অচজঈ এর এই সম্মেলন আয়োজন করার সুযোগ লাভ করল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয় এই আয়োজন করতে পেরে আন্তরিকভাবে আনন্দিত ও গর্বিত। আমি মনে করি বর্তমান সরকারের কৃষি উন্নয়নের সাফল্যের পাতায় এটিও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পরিশেষে, এ আয়োজনের সাথে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন, সকলকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি ও সম্মেলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।

লেখক : সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা

 

বিস্তারিত
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ভূমিকা

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ভূমিকা
ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার 
স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে সদ্য ভূমিষ্ঠ বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কৃষির উন্নয়ন যে অনস্বীকার্য তা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খুবই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন কৃষিনির্ভর এই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভীত কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমেই রচিত হবে। তাই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতের উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন এবং নানাবিধ যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করেন যা স্বাধীনতা উত্তরকালে একটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর এই পদক্ষেপের ফলে কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। দেশের সামগ্রিক কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকা-কে অধিকতর গতিশীল, যুগোপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ       কৃষি গবেষণা কাউন্সিল আইন ১৯৯৬ সালে এবং সর্বশেষ ২০১২ সালে সংশোধনের মাধ্যমে দেশে কৃষি গবেষণা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের গবেষণা কর্মকা-ের মাঝে সমন্বয় সাধনের কাজ করতে থাকে। 

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল আইন ১৯৯৬ সালে পাসের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বর্তমানে নার্স এর শীর্ষ সংস্থা (অঢ়বী ইড়ফু) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড এবং রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকা-ের সমন্বয় সাধন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বর্তমানে একটি দক্ষ, কার্যকরী এবং টেকসই কৃষি গবেষণা সিস্টেম প্রতিষ্ঠার দর্শন নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় কৃষির উন্নয়নকল্পে উন্নত জাত ও লাগসই প্রযুক্তি এবং তথ্য উদ্ভাবনের লক্ষ্যে নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠান, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি সংস্থা এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহের সংগে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গবেষণা সক্ষমতা জোরদারকরণে সদা সচেষ্ট রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। পরিকল্পনা ও সম্পদের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জাতীয় কৃষি গবেষণা সক্ষমতা জোরদারকরণ বিএআরসির দায়িত্ব যা একই ছাতার নিচে দেশের সমগ্র কৃষি গবেষণা সিস্টেমের সমন্বয় সাধনের একটি প্রয়াস। এতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যেমন:কৃষি, পরিবেশ ও বন, মৎস্য ও প্রাণিস¤পদ, পল্লী উন্নয়ন, শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদির সমন্বিত কার্যক্রম যুক্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম সুসংহত এবং জোরদারকরণ; পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান সমন্বয় এবং পরিবীক্ষণ; ক্লায়েন্টভিত্তিক বা চাহিদামাফিক লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন; গবেষণা ফলাফল লিপিবদ্ধকরণ এবং সুবিধাভোগীদের মধ্যে প্রচার করা; গবেষণার সুবিধার্থে প্রশাসনিক ও আর্থিককাঠামো সুসংহতকরণ এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণের মাধ্যমে গবেষণা উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সবসময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর বাণী  ‘কৃষক বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে তা না হলে বাংলাদেশ বাঁচতে পারবে না।’ তার দূরদর্শী সিদ্ধান্তে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ কৌশল প্রবর্তনের মাধ্যমে টেকসই কৃষির যাত্রা সূচিত হয়। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়ে কৃষি গবেষণায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবতারণা হয়। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার দেশের কৃষির উন্নয়নের উপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করে। ফলে কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অর্জিত হয় এর বহিঃপ্রকাশ আজকের বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে অন্যান্য সহযোগী কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় সাধন করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছে। এক ও দুই ফসলি জমি অঞ্চল বর্তমানে চার ফসলি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দশম যা সম্ভব হয়েছে কৃষি গবেষণার নিরলস প্রচেষ্টায়। কৃষি গবেষণার গুণগত উন্নয়নের দরুন খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে ৩য়, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আলু উৎপাদনে ৭ম, আম উৎপাদনে ৭ম এবং মাছ উৎপাদনেও সফলতা অর্জন করেছে। যা দেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক অসংখ্য লাগসই প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে যা দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ দেশের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করছে। সেইসাথে পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক গবেষণার ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফলদ ও শাকসবজির বিভিন্ন মৌসুমে চাষোপযোগী পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত বের হয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে বর্তমানে সারা বছর বিভিন্ন শাকসবজি ও ফল-ফলাদির চাষ হচ্ছে যা দেশের সার্বিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে । 

বিএআরসি কৃষি গবেষণায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখছে। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদীয়মান বিজ্ঞানীদের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা যেমন পিএইচডি, মাস্টার্স ও বিশেষ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ আয়োজন করে চলেছে। এতে দেশের কৃষি গবেষণার দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি গবেষণায় ও উন্নয়নে বিএআরসি বিভিন্ন নীতিমালা বা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিয়ে চলেছে। জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের গবেষণা কর্মসূচি পরিবীক্ষণপূর্বক অনুমোদন ও পরামর্শ দিয়ে থাকে। জাতীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সমন্বয় সাধন করছে বিএআরসি। কৃষি মন্ত্রণালয় স¤পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর নিয়মিত বিএআরসি থেকে দেয়া হয়। কৃষি গবেষণা লব্ধ ফলাফল বা প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কর্মকা- বিএআরসিতে চলমান রয়েছে এবং কীটনাশক, সার, বীজ ইত্যাদি কৃষি উপকরণের মান নির্ধারণসহ নীতি প্রণয়ন সরকারকে পরামর্শ প্রদান করে চলেছে। 

বিএআরসি গত ১০ বছরে নোটিফাইড ৭টি ফসলের (ধান, গম, আলু, ইক্ষু, পাট, কেনাফ ও মেস্তা) ফলন ও মান নিশ্চিতপূর্বক বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত ১৭০টিরও বেশি জাত ছাড় করেছে। বিএআরসি ১৯৭৯ সাল থেকে সার সুপারিশমালা ‘হাতবই’ প্রণয়ন করে আসছে যা সার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ রোডম্যাপ ২০২১, ২০৩১ ও ২০৪১ প্রণয়ন করেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি দেশে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা তথা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। কৃষি খাত ৪র্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।     কৃষিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্তকরণ এবং শোধনসহ ন্যানো প্রযুক্তির সার, বালাইনাশক উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মাধ্যমে উপকরণ দক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। পলিহাউজ, হাইটেক গ্রিনহাউজ ফার্মিং, বায়োফার্টিলাইজার, বায়োপেস্টিসাইড ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ব্যবহার বৃদ্ধি কার্যক্রম চলমান আছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় তৈরি হওয়া শত বছরের বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্লান ২১০০ এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ফসলি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোদগের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই লবণাক্ততা, জলমগ্নতা, খরাসহিষ্ণু ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ধাবন এবং তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। ইতোমধ্যে লবণাক্তসহিষ্ণু ব্রি ধান-৬৭, বিনা ধান-১০, বারি ভুট্টা-১৬; জলমগ্নতাসহিষ্ণু বিনা ধান-১১; খরাসহিষ্ণু বিনাধান-১১ ইত্যাদির পাশাপাশি নতুন ধরনের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য সকল ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ১০০ কৃষি প্রযুক্তি এটলাস, ১০০ ুবধৎং ড়ভ অমৎরপঁষঃঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ রহ ইধহমষধফবংয, কৃষি গবেষণা অগ্রাধিকার দলিল, ক্রপ জোনিং ম্যাপ, সার সুপারিশমালা হাতবই ২০১৮, কৃষি প্রযুক্তি হাত বই প্রকাশ করেছে। এসকল কাজ কৃষক এবং কৃষির সাথে সম্পৃৃক্ত সকলকে উপকৃত করেছে এবং প্রশংসিত হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন সাফল্যের ফলস্বরূপ ২০২১ সালে গবেষণা ও প্রশিক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল।

দেশের চাহিদাভিত্তিক গবেষণা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় গবেষণা যন্ত্রপাতি ক্রয়, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ইত্যাদি কাউন্সিলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত আছে। ভবিষ্যৎ চাহিদার আলোকে গবেষণার ক্ষেত্র নির্ধারণে “ভিশন ডকুমেন্ট ২০৩০” ও বিজ্ঞানীদের দক্ষতা উন্নয়নে “মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫” ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, পরিবেশবান্ধব গবেষণা কর্মসূচি যেমন সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা ( আইপিএম) এবং এড়ড়ফ অমৎরপঁষঃঁৎধষ চৎধপঃরপব (এঅচ), ডেল্টা প্লান ২১০০ কে গুরুত্ব প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবিলার জন্য উপযোগী জাত উদ্ভাবনে উদ্যোগ নেয়া, ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাইব্রিড জাত ও উন্নত জাত উদ্ধাবন করার পাশাপাশি উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ধাবনে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, জীব নিরাপত্তা (ইরড়ংধভবঃু) সুসংহত করার লক্ষ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নীতি/আইনের সাথে সামঞ্জস্য বিধান, বর্ধিত হারে প্রজনন বীজ (ইৎববফবৎ ঝববফ)/ ভিত্তিবীজ (ঋড়ঁহফধঃরড়হ ঝববফ) উৎপাদন এবং সাম্প্রতিক উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি হস্তান্তরকে গুরুত্ব প্রদান করা হবে।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তালমিলিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মানসম্মত কৃষি গবেষণার কোন বিকল্প নেই। কৃষি গবেষণাকে আরো যুগোপযোগী করে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় আরো বেশি সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। 

জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ জাতির পিতার স্বপ্নের কৃষি নীতির প্রতিফলন। কৃষি মন্ত্রণালেয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সমন্বয়ে জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ প্রণীত হয়েছে। এ নীতিতে কৃষিকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত বিভিন্ন প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চত করার লক্ষ্যে কৃষি নীতিতে নতুন করে ন্যানো প্রযুক্তির মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ নীতিতে কৃষি খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা, গবেষণা ও উন্নয়ন, কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষিতে সমবায়, কৃষি বিপণন, বিশেষায়িত কৃষি যেমন- ছাদে কৃষি, হাইড্রোপোনিক, অ্যারোপোনিক, সংরক্ষণমূলক কৃষি, ভাসমান কৃষি, প্রিসিশন কৃষি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ, শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল টেকসই কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন কৃষি নীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে মেধা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ের উপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক গবেষণার ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফলদ ও শাকসবজির সব মওসুমে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত বের হয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে বর্তমানে সারা বছর বিভিন্ন শাকসবজি ও ফল-ফলাদির চাষ হচ্ছে যা দেশের সার্বিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের পথে হাঁটছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত হবে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল অন্যান্য জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। 

লেখক : নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফোন : ২২২২২৪২৬৬, ই-মেইল : cc-barc@barc.gov.bd

বিস্তারিত
কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনায় কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন

কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনায় কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন
এ এফ এম হায়াতুল্লাহ
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন নামে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ (ই.পি. অধ্যাদেশ ঢঢঢঠওও, ১৯৬১) এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) নামে অভিহিত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএডিসির ভিত্তি ঢাকা শহর কেন্দ্রিক হলেও এর সেবার পরিধি সমগ্র  দেশে বিস্তৃত। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে আরও প্রত্যন্ত এলাকায় বিএডিসির অফিসের সুবিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। বর্তমান সরকারের বিগত আমল থেকে কৃষি উন্নয়ন ও কৃষকের স্বার্থে বিএডিসির কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত করে যাচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে উন্নত মানের বীজ ও সারের ব্যবহার এবং সেচ ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণে বিএডিসির বলিষ্ঠ ভূমিকা সর্বমহলে স্বীকৃত।
বিএডিসির রূপকল্প এবং অভিলক্ষ্য
রূপকল্প : মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ জোগান ও দক্ষ সেচ ব্যবস্থাপনা করা।
অভিলক্ষ্য : উচ্চফলনশীল বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ বৃদ্ধি করা, সেচ প্রযুক্তি উন্নয়ন, ভূপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার, জলাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে সেচ দক্ষতা ও সেচকৃত এলাকা বৃদ্ধি এবং কৃষক পর্যায়ে মানসম্পন্ন নন-নাইট্রোজেনাস সার সরবরাহ করা। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকেই বিএডিসি ফসল উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ উন্নত বীজ, সুষম সার ও ক্ষুদ্র সেচ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন ফসলের গুণগত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও কৃষক পর্যায়ে বিতরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় বীজ, চারা ও কলম পৌঁছে দেয়া, ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার করে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভতুর্কিমূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন নন-নাইট্রোজেনাস সার আমদানি ও  কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করে খাদ্য উৎপাদনে বিএডিসি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিগত ১৩ বছরে (২০০৯-২০২১) বিএডিসি নিম্নবর্ণিত বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে।
বীজ ও উদ্যান উন্নয়ন কার্যক্রম
মানসম্পন্ন ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, সবজি, ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন করে কৃষকের হাতে তুলে দিতে বিএডিসি ৩৪টি ভিত্তিবীজ বর্ধন ও উৎপাদন খামারের মাধ্যমে বিভিন্ন ফসল এবং জাতের বীজ উৎপাদন করছে। খামারে উৎপাদিত ভিত্তিবীজ চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে পরবর্তী বছর প্রত্যায়িত ও মানঘোষিত শ্রেণির বীজ উৎপাদন করা হয়ে থাকে। চুক্তিবদ্ধ বীজ উৎপাদন পদ্ধতির আওতায় ১ লাখ ১০ হাজার একর কমান্ড এরিয়া নিয়ে ৮৬টি কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ও ৯৮ হাজার ৬৯৩ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষক যুক্ত আছেন। ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬২ মে. টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৪৮টি আধুনিক বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, ৩টি অটো সিড প্রসেসিং প্লান্ট, ৩০টি বীজআলু হিমাগার এবং ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার ও দেশব্যাপী ট্রানজিট বীজ গুদামসহ ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, ৮ হাজার ৩০৫ জন বীজ ডিলার নিয়ে একটি সুসংগঠিত মার্কেটিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪টি এগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও ৯টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি নানান জাতের ফল-ফুল, বনজ, ঔষধি, মসলা ও সবজি চারা/কলম উৎপাদনসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ প্রর্দশনী ও সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বিগত ১৩ বছরে (২০০৯-২০২১) বিএডিসি সর্বমোট ১৬,১৮,৯৯৬ মেট্রিক টন দানাদার ফসলের বীজ, ৪০,৯২৫ মে. টন ডাল জাতীয়, ৪৬,৫১১ মে. টন তেলজাতীয় বীজ, ৯,৮০,৮৯০ মে. টন আলুবীজ, ১০,৯৪৪ মে. টন পাটবীজ, ১,২৩৭ মে. টন সবজি বীজ ও ২,০০৯ মে. টন মসলা বীজ  কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করেছে। বিএডিসি বিগত ২০১০-১১ হতে ২০২০-২১ সময়ে সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প ও এগ্রো সার্ভিস সেন্টার কার্যক্রমের মাধ্যমে ৩২.২২ লাখ মে. টন সবজি; ০.০৫৬ লাখ মে. টন মসলা; ৫.৪৩ লাখ মে. টন ফল; ৩৩২৮.৭২ লাখ সবজি চারা/চারা/কলম/গুটি ও ৪৪.৬৪ লাখ নারিকেল চারা উৎপাদন ও বিতরণ করেছে। ফলে সময়ের সাথে সাথে সবজি, ফল, মসলা ইত্যাদির জাতীয় উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন উদ্যান ফসলের চারা বিতরণের ফলে দেশব্যাপী উদ্যান ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। বিএডিসির গবেষণা সেলের মাধ্যমে ৪২টি গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে বিএডিসির নামে ফলের ৬টি জাত এবং সরিষার ১টি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরিসহ আরও ৪টি টিস্যু কালচার ল্যাবেরেটরির মাধ্যমে আলুবীজের প্লান্টলেট এবং বিভিন্ন ফলের চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন বিদেশ থেকে বীজআলু আমদানি শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রম 

বিএডিসির মাধ্যমে ১৯৬০ এর দশকে মাত্র ১,৫৫৫টি শক্তিচালিত পাম্পের সাহায্যে বাংলাদেশে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। এ পরিক্রমায় বর্তমানে ২০২০-২১ সেচ মৌসুমে দেশের প্রায় ৫৬.৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হয়েছে। ক্ষুদ্র সেচের মাধ্যমে বোরো মৌসুমে দেশের প্রায় ৭২.৫% সেচযোগ্য জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। রবি মৌসুমে ক্ষুদ্র সেচের মাধ্যমে ৯৫% এবং বৃহৎ সেচের মাধ্যমে ৫% জমিতে সেচ প্রদান করা হয়। তন্মধ্যে ভউপরিস্থ পানির সাহায্যে ২৭.১০% এবং ভূগর্ভস্থ পানির সাহায্যে ৭২.৯০% জমিতে সেচ প্রদান করা হয়েছে।
বিএডিসি কর্তৃক ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্যে মোট ৯৫টি ক্ষুদ্রসেচ প্রকল্প এবং ১৫৯টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। 
বিগত ১৩ বছরে (২০০৯-২০২১) বিএডিসির মাধ্যমে সেচকৃত এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে :

ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে অতিরিক্ত জমি চাষের আওতায় আনার লক্ষ্যে ৯,৫৬২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করে ১,৪৮,১০০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা হয়েছে। বিএডিসি ১২টি খাল/নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণ করেছে। উক্ত ১২টি রাবার ড্যাম চালুর মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় ৮,৩০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে এবং আগাম বন্যার হাত হতে ৭০০০ হেক্টর জমির ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

দেশে প্রথমবারের মত বিএডিসির মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলায় ভরাশঙ্খ খালে এবং কক্সবাজার জেলার চকোরিয়ায় অত্যাধুনিক পযুক্তিনির্ভর দুইটি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। উক্ত ড্যাম দুইটি নির্মাণের ফলে অতিরিক্ত ২,০৫০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে

বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে ২,৯১২ কিলোমিটার ভূউপরিস্থ পাকা সেচনালা এবং ১০,৪৯১ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ (বারিড পাইপ) সেচনালা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পানির অপচয় হ্রাস ও সেচদক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। ২৯০টি বিভিন্ন ক্ষমতার সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প স্থাপন, ২৪০ কিলোমিটার ফসল রক্ষাবাঁধ নির্মাণ এবং ৮,৬৬৮টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব সেচ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে সাবমার্জড ওয়্যার, স্লুøুইচগেট, বক্স কালভার্ট, পাইপ কালভার্ট, ক্যাটল ক্রসিং ইত্যাদি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী জেলার তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কুলিং কাজে ব্যবহৃত গরম পানি পানি ঠান্ডা করে বিএডিসির নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী জেলার প্রায় ২২,০০০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা হয়েছে। গ্র্যাভিটেশনাল ফ্লোর মাধ্যমে অধিকাংশ স্থানে সেচ দেয়া হচ্ছে। এতে নামমাত্র মূল্যে  কৃষক সেচ সুবিধা পাচ্ছে। 

পার্বত্য এলাকা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার পাহাড়ি এলাকায় ৮৬টি ঝিরিবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ছোট ছোট ঝরনায় এসব বাঁধ নির্মাণ করে ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ফসলে সেচ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ফলে উক্ত এলাকায় ১৫০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ৪৭৫টি আর্টেশিয়ান নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। কোন সেচযন্ত্র ছাড়াই আর্টেসিয়ান নলকূপের মাধ্যমে ক্রমাগত পানি উঠে আসে। এ পানি ব্যবহার করে প্রায় ৬৭৫ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। ২,৪৫৮টি গভীর নলকূপে স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের ফলে সেচচার্জ আদায় সহজতর হয়েছে। কৃষকগণ ফসলে সঠিক সময়ে ও পরিমাণমতো সেচ দিতে সক্ষম হচ্ছেন। ফলে কৃষি ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। যে সমস্ত এলাকায় পর্যাপ্ত ভূউপরিস্থ পানি নেই, সেই সকল এলাকায় বিএডিসির মাধ্যমে ৬৮টি ডাগওয়েল ও ১০১টি সৌরশক্তি চালিত ডাগওয়েল নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণকৃত ডাগওয়েলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ২০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

বিএডিসির মাধ্যমে ভূউপরিস্থ পানি সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য ৭,১৫২টি শক্তিচালিত এলএলপি স্থাপন, ১,৬৪৭টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং ১,৬৬৮টি গভীর নলকূপ পুনর্বাসন ও ২০২টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। বিএডিসির মাধ্যমে সেচের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ৯টি স্প্রিংকলার সেচ ব্যবস্থার প্রদর্শনী প্লট, ৮৭টি ড্রিপ সেচ ব্যবস্থার প্রদর্শনী প্লট ও ৭টি নিরাপদ ফুল ও সবজি উৎপাদন পলিশেড নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ৯৩টি সেচের অফিস ভবন নির্মাণ ও ৩৫টি ভবন সংস্কার করা হয়েছে। 

বিএডিসির ক্ষুদ্র সেচ উইংয়ের মাধ্যমে ১,৩২,৯৩৪ জন কৃষককে বিভিন্ন প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাস ও কৃষক পর্যায়ে সেচদক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। জরিপ ও পরিবীক্ষণ ডিজিটালাইজেশনকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে ৪০০টি ডাটা লগার স্থাপনপূর্বক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভূগর্ভস্থ পানির লেভেলের গভীরতা নির্ণয় করা হচ্ছে এবং বিএডিসির কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত তথ্য উপাত্ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণপূর্বক বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে।

বিএডিসি সারাদেশে উপরোক্ত কার্যক্রমের গুণগতমান শতভাগ ঠিক রেখে সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করেছে। বিএডিসির কারিগরি সহায়তায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সেচ এলাকা ৫১.২৬ লাখ হেক্টর হতে ৫৬.৫৪ লাখ হেক্টর, সেচদক্ষতা ৩৫% হতে ৩৮% এবং ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার ২১% হতে ২৭% উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে।
সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম

বিএডিসি সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশ হতে গুনগত মানসম্পন্ন নন-নাইট্রোজেনাস সার (টিএসপি, ডিএপি এবং এমওপি) আমদানি করে। বিএডিসি কর্তৃক তিউনিশিয়া ও মরক্কো হতে টিএসপি, বেলারুশ, রাশিয়া ও কানাডা হতে এমওপি, সৌদি আরব ও মরক্কো হতে ডিএপি সার আমদানি করা হয়। আমদানিকৃত নন-নাইট্রোজেনাস সার সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভতুর্কি মূল্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ মোতাবেক কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়। সরকারি ভতুর্কি মূল্যের ফলে কৃষি জমিতে রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও উর্বরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অবদান রাখছে। কৃষক পর্যায়ে নন-নাইট্রোজেনাস সারের হ্রাসকৃত মূল্যের তালিকা সারণি দ্রষ্টব্য। ২০০৯ সালে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার গঠনের পর কৃষকদের নিকট গুণগত মানসম্পন্ন টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারের দাম দফায় দফায় হ্রাস করা হয়।

বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী গুদাম/স্থাপনা পুনরায় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে যেখানে বিএডিসির গুদামের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৯৮,০০০ মে. টন সেখানে বর্তমানে বিএডিসির ১৩২টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ২,০৯,৬৩৩ মে. টনে উন্নীত হয়েছে। আরও ১ লাখ মে.টন সার গুদাম নির্মাণ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। অধিকন্তু ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে তা ৮ লাখ মে. টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামারগুলোতে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে।
বিএডিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কৃষকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন ফসলের মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহের নিমিত্ত নতুন খামার ও কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের  উদ্যোগ গ্রহণ। প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাতের বীজ উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধিকরণ। জীবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে টিস্যুকালচার ল্যাবের মাধ্যমে আলুবীজের মৌল শ্রেণির রোগমুক্ত বীজ উৎপাদন ও বিতরণের মাধ্যমে বিদেশ হতে প্রজনন শ্রেণির আলুবীজ আমদানি নির্ভরতা কমানো।

এ ছাড়া এসডিজি, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ও অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অংশ হিসেবে ফসলের উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে বীজ ও উদ্যান উইং এর আওতায় বীজ সংগ্রহ ১৪৯৫০২.১৪ মে. টন হতে বৃদ্ধি করে ২০৫০০০.০০ মে. টন উন্নীত করাসহ আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে পোস্ট হার্ভেস্ট লস কমানো এবং লেবার প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও বিএডিসির খামার, উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের খাদ্য চাহিদা ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্রসেচ উইং এর আওতায় ৬.১৪ লাখ হেক্টর সেচ এলাকা টেকসইকরণ, সেচ দক্ষতা ৩৮% হতে ৫০% উন্নীতিকরণ, সেচ কাজে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার ৩০% এ উন্নীতিকরণ এবং সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ৭০% এ হ্রাস করাসহ নানাবিধি বহুমূখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ সকল কার্যক্রম পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ বা এসডিজি গোল ৬.৪ বাস্তবায়ন সহায়তা করবে এবং কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সার ব্যবস্থাপনা উইং এর আওতায় ০২ লাখ মে. টন হতে ০৭ লাখ মে. টন ধারণ ক্ষমতায় উন্নীতকরণের মাধ্যমে সার সরবরাহ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার টেকসই রূপ দিতে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ, যান্ত্রিকীকরণ এবং রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের উপকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএডিসির কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার মহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালনে বিএডিসির আন্তরিক প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।


লেখক : চেয়ারম্যান, বিএডিসি, ফোন : ২২৩৩৮৪৩৫৮, ই-মেইল :chairman@badc.gov.bd

বিস্তারিত
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও সাফল্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও সাফল্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
মোঃ বেনজীর আলম
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। শ্রমশক্তির ৪০.৬২ শতাংশ এখনও কৃষিকাজ নির্ভর (২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী)। অনেক ধরনের প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও বাংলাদেশ বিগত ৫০ বছরে খাদ্য উৎপাদনে দৃষ্টান্তমূলক অগ্রগতি অর্জন করেছে। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩.৪৭%। স্থিরমূল্যের ভিত্তিতে, ২০২০-২১)। ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার বিপরীতে জিডিপিতে ধনাত্মক ধারা অব্যাহত রেখে যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি তা একটা বিশ্ব অঙ্গনে বড় অর্জন।
অন্যান্য দেশের তুলনায় মোট জমি কম হলেও সম্প্রতি কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব পর্যায়ে ধান, পাট, কাঁঠাল, আম, পেয়ারা, আলু, সবজি ও মাছ উৎপাদনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে ৩য়, পাট উৎপাদনে ২য়, পাট রপ্তানিতে ১ম, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আলু ও আম উৎপাদনে ৭ম, পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম এবং মোট ফল উৎপাদনে ২৮তম স্থান র্অজন করছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের যে ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক দুঃসময়ে দেশের হাল ধরে দূরদর্শী ও সাহসী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্ব দরবারে দেশকে এক বিশাল সফলতায় নিয়ে গেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই স্বল্পকালীন গত ১০-১২ বছরের শাসনের সাফল্যও অনেক। কৃষিতে সাফল্য বিবেচনায় প্রধান প্রধান কয়েকটি ফসলের ২০০৯ সালের সাথে তুলনায় ২০২০ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চালের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩%, গমের ৪৫%, ভুট্টার ৭৭৫%, আলুতে ১০১%, ডালে ৩৭৫%, তেলবীজে ৮১%, সবজির ক্ষেত্রে ৫৭৮% যা বিশ্বে অভাবনীয়। 
এ দেশে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। কৃষিবান্ধব নীতি ও কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশ এখন দানাশস্য, সবজি, মাছ ও মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সারা বছর এখন শাকসবজি ফলমূল যে কোন মানুষের জন্য সহজলভ্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় এবং  কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি মহোদয়ের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সকল দপ্তর-সংস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছে বিধায় দেশে এখন খাদ্য নিরাপত্তা বিরাজমান।
স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকা-কে জোরদার করার লক্ষ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড এবং ১৯৭৫ সালে কৃষি পরিদপ্তর (পাট উৎপাদন), কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা) নামে ফসলভিত্তিক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানসমূহ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে ফসল প্রযুক্তি সম্প্রসারণে নিয়োজিত ছয়টি সংস্থা যথা কৃষি পরিদপ্তর (পাট উৎপাদন), কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, হর্টিকালচার বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং সার্ডি ঈঊজউও (ঈবহঃৎধষ ঊীঃবহংরড়হ জবংড়ঁৎপবং উবাবষড়ঢ়সবহঃ ওহংঃরঃঁঃব) একীভূত করে বর্তমান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মিশন বা অভিলক্ষ্য হলো ‘টেকসই ও লাভজনক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে দক্ষ, ফলপ্রসূ, বিকেন্দ্রীকৃত, এলাকানির্ভর, চাহিদাভিত্তিক এবং সমন্বিত কৃষি সম্পসারণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে সকল শ্রেণির কৃষকের প্রযুক্তি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ।’ কৃষি বিভাগ হিসেবে পূর্বে প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন (টিএন্ডভি) পদ্ধতির মাধ্যমে এবং বর্তমানে ‘দলীয় সম্প্রসারণ পদ্ধতি’র মাধ্যমে দেশের কৃষি ও কৃষককে অত্যন্ত সফলতা ও সুনামের সাথে সেবা প্রদান করেছে। এক কথায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো সকল শ্রেণির চাষিদেরকে তাদের চাহিদাভিত্তিক ফলপ্রসূ ও কার্যকর সম্প্রসারণ সেবা প্রদান করা যাতে তারা তাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে স্থায়ী কৃষি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন দেশের সর্ববৃহৎ কৃষি সম্প্রসারণ সেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে দেশের কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সংস্থাটি দলভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবা প্রদান পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত লাগসই সকল প্রযুক্তিসহ এই সময়ে ২০০টিরও বেশি ফসলের উৎপাদনে বীজ ব্যবস্থাপনা; মাটি, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা; ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ সহজলভ্যকরণ ও বিপণন প্রযুক্তির সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন দুর্যোগে কৃষকের পাশে থেকে সেবা প্রদানের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
এই অধিদপ্তর মাঠ ফসলের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন ফসলের এলাকাভিত্তিক অভিযোজন কলাকৌশলও মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করছে। এছাড়াও ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি ও মসলা চাষ সম্প্রসারণ করে সবজি ও মসলা উৎপাদন বৃদ্ধি করার কাজ চলমান রয়েছে। প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি উচ্চমূল্যের সবজি চাষ এবং অপ্রচলিত ও ট্রপিক্যাল অঞ্চলের বিদেশি ফলমূল জনপ্রিয় করাসহ এর উৎপাদন বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচকাজে ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির সুসমন্বিত ও সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিতকরণে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটির বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে দেশের কৃষি জমি চাষাবাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৫% যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়েছে। ফসল সংগ্রহ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ৫০-৭০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তা (ভর্তুকি) প্রদান করা হচ্ছে। 
বর্তমান কৃষি বান্ধব সরকার ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেই কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নানামুখি পরিকল্পনা ও কার্যক্রম শুরু করে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ তার মধ্যে অন্যতম। জুলাই, ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, পাওয়ার টিলারসহ মোট ৭৪৯৮০টি কৃষি যন্ত্রপাতি ডিএই’র মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। যািন্ত্রকীকরণ তরান্বিত করতে গত দুই বছরেই বিতরণ করা হয়েছে ৩৮৬৫টি কৃষি যন্ত্র। ২০২০-২৫ বছরের মধ্যে মোট ৫১৩০০টি কৃষি যন্ত্র বিতরণের জন্য একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কৃষি উপকরণ ও কৃষি ঋণ সহজে বিতরণের লক্ষে সংস্থাটি ইতোমধ্যে ২,০৫,৯৯,৮৬৯ জন কৃষকের মধ্যে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করেছে এবং দেশের কৃষকগণের মাঝে নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও আপৎকালীন কৃষি সহায়তা প্রদানে নিয়মিত প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির (ঝউএ) লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা প্রণয়নসহ তা বাস্তবায়ন করছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কর্মপরিকল্পনাসমূহ হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষিজ উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করা; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ; প্রতিকূলতাসহিষ্ণু নতুন নতুন জাত ও কৃষিনীতি বাস্তবায়ন করে উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি; চরাঞ্চলে ও পাহাড়ে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ; সরিষা, বাদাম, তিল ও অন্যান্য তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ; দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ও হাওরাঞ্চলে ভাসমান সবজি চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ; রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমানো নিশ্চিতকরণ; মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ; কৃষি জমির সর্বোত্তম/সুষ্ঠুব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পতিত জমি শতভাগ চাষের আওতায় আনয়ন; মোবাইলসহ ই-কৃষির মাধ্যমে               কৃষকদের তথ্য প্রাপ্তির ব্যবস্থা জোরদারকরণ; সমন্বিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে তা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কৃষি পণ্যভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’। এই আদেশ পালনের জন্য দেশের যে কোন সময়ের সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবিলায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রী মহোদয়ের পদক্ষেপগুলো আস্থার সাথে বাস্তবায়ন করছে। কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বসতবাড়ির আঙ্গিনাসহ পতিত জমিতে তৈরি করা হচ্ছে পারিবারিক পুষ্টি বাগান। যেখানে বাড়ির পাশে শাকসবজি ও  ফুল ফল চাষ করে বারো মাসের পুষ্টির চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাঠ পর্যয়ের কর্মীদের মাধ্যমে কৃষকদের ফেলে রাখা বাড়ির আঙিনাসহ পতিত জমিতে পারিবারিক পুষ্টি বাগান তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। কৃষকের বাড়িতে এই পারিবারিক পুষ্টি বাগান তৈরির করতে প্রণোদনা প্যাকেজসহ সার্বক্ষণিক কাজ করছেন কৃষি কর্মকর্তাগণ। এর আওতায় গ্রামের মানুষ বসতবাড়ির আঙিনা, পুকুর ও খালের পাড়, বাড়ির আশপাশ, প্রতি ইঞ্চি অব্যবহৃত ও অনাবাদি জমিতে শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদন করবেন। এতে মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। এখানে পুষ্টি মডেল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে একজন কৃষক সারা বছর এখান থেকে কিছু না কিছু পাবেন। কখনো শাকসবজি থাকবে, আবার কখনো থাকবে ফল। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যেসব পরিবারের এক থেকে দেড় শতাংশ পরিমাণ পতিত জমি আছে, তারা এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধা পাবে।
বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য সহায়তামূলক নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয় সরকার। কৃষকদেরকে এসব সহায়তা প্রদানের একমাত্র মাধ্যম হলো ডিএইর সম্প্রসারণ কর্মীরা। ডিএইর কর্মীরা প্রধানত কয়েকটি কাজ করে থাকে যার মধ্যে অন্যতম হলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন। অন্যটি কৃষকদের অনুপ্রেরণার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি। এভাবে কৃষকের চাহিদা সম্পর্কে জানার পর প্রয়োজনীয় সরকারি দিকনির্দেশনা বা কর্মসূচির বাস্তবায়ন তাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। উচ্চফলনশীল শস্যের নতুন জাত ও আবাদের পদ্ধতি সম্পর্কিত প্রায় সব তথ্যই কৃষকরা তাদের কাছে পাচ্ছেন। জানতে পারছেন মাটির গুণাগুণ, সার, কীটনাশক ও বীজ ব্যবহার এবং উৎপাদিত শস্যের বাজারজাতের তথ্য। ফসল আবাদে নানা ধরনের পরামর্শ ও তথ্য দিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীরা। এভাবেই টেকসই হচ্ছে দেশের কৃষি পণ্য উৎপাদন।
রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হলে কৃষি পণ্যের মান বাড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে দপ্তরটি। সেক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায় থেকে জাহাজীকরণ পর্যন্ত পণ্যের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে সক্ষমতা তৈরি করতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সকল পর্যায়েই। ইতোমধ্যে এঅচ এর মাধ্যমে কৃষি পণ্য উৎপাদন করতে আমাদের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়ায় আম উৎপাদন করে ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান বিভিন্ন চেইন মার্কেটে বিক্রি করে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। সরকারের সরাসরি উদ্যোগে চেষ্টা হচ্ছে পণ্য ও সেবার পরিধি বাড়াতে।
কৃষি সম্প্রসারণে আইসিটি ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া ব্যবহারেও সংস্থাটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে ডিএইর সহায়তায় “কৃষি বাতায়নে” প্রায় ৮০ লক্ষ কৃষকের তথ্যাদি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এ ছাড়া, ফসলের সমস্যার সমাধানকল্পে সংস্থা কর্তৃক উদ্ভাবিত “কৃষকের জানালা”, “কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা”, “ডিজিটাল বালাইনাশক নির্দেশিকা” ব্যবহার হচ্ছে এবং এগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে।
কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এবং লাগসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সকল ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই কৃষিতে সাফল্য বয়ে আনছে ডিএই। কৃষি ক্ষেত্রে সরকারের লিড এজেন্সির ভূমিকায় থেকে সব ধরনের দুর্দিন ও সুদিনে কৃষকের পাশে থাকেন ডিএইর কর্মীরা। গবেষণা কার্যক্রম ও কৃষকের মধ্যে তারা যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেন। সম্প্রসারণ কর্মীরা কৃষকদের সঙ্গে নিজেদের কতটুকু মানিয়ে নিচ্ছেন, সেটির ওপর নির্ভর করে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও  খাদ্যনিরাপত্তা। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সম্প্রসারণ কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে আরও দক্ষ করে তুলতে কাজ করছে সংস্থাটি। এতে যেমন কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়, তেমনি সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নও সহজ হয়।
কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশের সার্বিক সাফল্যে আন্তর্জাতিক অনেক স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো এসডিজি বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার এবং জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি কর্তৃক ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের  স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক ‘সেরেস’ (ঈঊজঊঝ) পদক প্রাপ্তি, যা  কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির একটি বড় অর্জন। এখানে কাজের অংশীদার হতে পেরে ডিএই পরিবার গর্বিত। 
বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ এর জাতীয় উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথেও রয়েছে সংস্থাটি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ’ এর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার অনুসৃত নীতিমালার আলোকেই বর্তমান সরকার কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ডিএই সরকার কর্তৃক গৃহীত সকল পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ফলে গ্রামীণ ও সর্বোপরি দেশের সার্বিক সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। দেশে বিদ্যমান যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আধুনিক, ব্যয় সাশ্রয়ী ও লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের ক্ষেত্রে প্রণীত রোডম্যাপ কার্যকর করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দীপ্ত পায়ে সার্বক্ষণিক সরকার ও কৃষকের সাথে থেকে কাজ করে যাবে।


লেখক : মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ০২৫৫০২৮৩৬৯, ই-মেইল :dg@dae.gov.bd

বিস্তারিত
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অগ্রগতি ও সাফল্য

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অগ্রগতি ও সাফল্য
ড. দেবাশীষ সরকার১ ড. দিলোয়ার আহমদ চৌধুরী২
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিধ ফসলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জারিকৃত ঐতিহসিক ও যুগান্তকারী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে নং-৩২ বলে কৃষি গবেষণার পর্যাপ্ত  সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নং-৬২ এর মাধ্যমে স¦ায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দানাজাতীয় শস্য, সবজি, কন্দাল ফসল, ডাল, তেলবীজ, মসলা, ফল ও অন্যান্য ফসলসহ ২১১টি  ফসলের উপর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিধি ব্যাপক। উদ্ভিদ প্রজনন, ফসলের পরিচর্যা, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসলকে  রক্ষা করা, জীবপ্রযুক্তি প্রযোগ করে ফসলের কাক্সিক্ষত  জাত উদ্ভাবন, মৃত্তিকা ও সেচ ব্যবস্থাপনা, কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত ফসল বিন্যাস ও খামার পদ্ধতি উন্নয়ন, শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তির আর্থসামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি এই ইনস্টিটিউটের গবেষণার আওতাভুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে ৬টি ফসল গবেষণা কেন্দ্র (কন্দাল, উদ্যানতত্ত্ব, ডাল, তেলবীজ, মসলা, উদ্ভিদ কৌলি সম্পদ), ৮টি আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ৩০টি গবেষণা উপকেন্দ্র ৯টি ফার্মিং সিস্টেম গবেষণা সাইট ও ৮২টি বহুস্থানিক পরীক্ষা কেন্দ্র আছে এবং ৭০০ এর অধিক বিজ্ঞানী গবেষণা কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

বারি এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৬০২টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৫৭৬টি ফসল উৎপাদন প্রযুক্তি  উদ্ভাবন করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের সময়ে (২০০৯-২০২১) বিভিন্ন ফসলের ৩০২টি উন্নত জাত এবং ২৭০টি ফসল উৎপাদন প্রযুক্তিসহ মোট পাঁচ শতাধিক প্রযুক্তি বিএআরআই উদ্ভাবন করেছে। 

কন্দাল ফসলের মধ্যে আলু, মিষ্টিআলু এবং কচু খাদ্য ও সবজির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিএআরআই এ পর্যন্ত আলুর ৯১টি, মিষ্টিআলুর ১৭টি এবং বিভিন্ন কচুর ১১টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে যা বর্তমানে এ সকল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যপক ভূমিকা রাখছে। আলুর ৫টি জাত (বারি আলু ৩৫, বারি আলু ৩৬, বারি আলু ৩৭, বারি আলু ৪০ ও বারি আলু ৪১) বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংকরায়নের মাধ্যমে ক্লোনাল হাইব্রীড জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর গড় ফলন প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে ২০-৩০% বেশি। এ ছাড়া আলুর মড়ক রোগ প্রতিরোধী জাতও উদ্ভাবিত হয়েছে। উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে স্টার্চ ও ড্রাই মেটারের পরিমাণ বেশি বলে বিদেশে রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী। 

বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আমিষের প্রধান উৎস ডাল। বিএআরআই এ পর্যন্ত ৬টি ডাল ফসলের ৪৩টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করছে। বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮, বারি খেসারি-৩, বারি ছোলা-৯ ও বারি ছোলা-১০ ফলন বেশি বলে দেশের বিভিন্ন  এলাকায় চাষাবাদ হচ্ছে। সম্প্রতি উদ্ভাবিত বারি মসুর-৯ অধিক পরিমাণ জিঙ্ক ও আয়রণ সমৃদ্ধ এবং স্বল্পমেয়াদি জাত  বলে ধানভিত্তিক ফসল বিন্যাসে সহজে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বারি মুগ-৬ কৃষকপর্যায়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি জাত এবং সারা দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে চাষাবাদ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মসুর, খেসারি, মুগ ও ছোলার জাত চাষ করে ২৫-৩০% ডালের ফলন বাড়ানো সম্ভব। 

বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে তেল ফসল খুবই গুরুত্বপূর্র্ণ। বর্তমানে  যে তেলবীজ উৎপাদিত হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বিএআরআই এ পর্যন্ত ৮টি তেলবীজ ফসলের ৪৯টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫ ও বারি সরিষা-১৭, রোপা আমন-বোরো ধান শস্য বিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করে সরিষার উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব এবং বর্তমানে সারা দেশে কৃষকের জমিতে জনপ্রিয় এ জাতগুলোর সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি উদ্ভাবিত কেনোলা গ্রুপের বারি সরিষা-১৮, অন্যান্য জাতের তুলনায় খুবই অল্প পরিমাণ ইরুসিক এসিড আছে (১.০৬%)। এ ছাড়া বারি সূর্যমুখী-৩ খাটো এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু বলে দেশের উপকূলীয় এলাকার জন্য খুবই উপযোগী। 

সবজি ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য যা মানুষের পুষ্টির জন্য অপরিহার্য। সবজির ঘাটতি পূরণের জন্য বিএআরআাই এ পর্যন্ত ২৯টি সবজি ফসলের মোট ১২৭টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। টমেটো, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য সবজির ২৩টি হাইব্রিড জাত অবমুক্ত করেছে। বারি উদ্ভাবিত গ্রীষ্মকালীন টমেটো সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং এর আবাদ করে সারা বছর টমেটোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে অমৌসুমে টমেটোর আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে।

সবজির মত ফলও ভিটামিন ও খনিজের প্রধান উৎস এবং পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ যাবৎ ২৭টি ফলের ৯৩টি উন্নত জাতসহ ফল উৎপাদনের বেশ কিছু কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে। বারি উদ্ভাবিত বারি মাল্টা-১, বারি পেয়ারা-২, বারি আম-৪ (হাইব্রিড), বারি লিচু-৪ ইতোমধ্যে সারা দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত বারি আম-১১ (বারোমাসী), বারি আম-১২ (নাবি জাত), বারি লিচু-৫, বারি কাঠাল-২ (অমৌসুমি জাত) এবং বারি পেয়ারা-৪ (বীজবিহীন) দেশে ফলের উৎপাদন ও সারা বছর ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া বারি বিভিন্ন বিদেশী ফল যেমন স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, এভোকেডো ও রামবুতানের বেশ কয়েকটি জাত অবমুক্ত করেছে।

আমাদের দেশে ফুলের গবেষণা একটি নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এই ক্ষেত্রটির সম্ভাবনাসমূহ চিহ্নিত করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিএআরআই বিভিন্ন ফুলের ২২টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকার ২টি, এ্যালপেনিয়ার ১টি, গাঁদার ১টি, লিলির ১টি, ডালিয়া ও জারবেরার ২টি ও গ্লাডিওলাসের ৩টি জাত উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশে মসলা খুবই জনপ্রিয় ফসল। বিএআরআই তে মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পর পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ ইত্যাদি ফসলের ৪৭টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের ২টি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে যার ফলে সারা বছর পেয়াজ আবাদ করা সম্ভব হবে, যা দেশের পেঁয়াজের ঘাটতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। 

দানাজাতীয় ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বারি গমের ৩৩টি উন্নত জাত এবং ভুট্টার ১৬টি হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছে। যদিও গম এবং ভুট্টা অতি সম্প্রতি বিএআরআই থেকে আলাদা হয়ে বিডব্লিউএমআরআই এর অধীনে ন্যাস্ত করা হয়েছে। বারি বিভিন্ন মাইনর সিরিয়েলের ওপর গবেষণা পরিচালনা করে আসছে এবং ইতোমধ্যে বার্লির ১০টি, কাউনের ৪টি, সরগামের ১টি জাত উদ্ভাবন করেছে, যা দেশের চরাঞ্চল, খরা ও লবণাক্ত এলাকায় চাষের জন্য উপযোগী। 

বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের বেশ অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সময় ও শ্রম সাশ্রয় করে কৃষিকাজ লাভজনক করার জন্য ৪৮টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিএআরআই উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতির মধ্যে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, শক্তি চালিত ভুট্টা মাড়াইযন্ত্র, আলু রোপণ যন্ত্র ও হারভেস্টার, ভেজিটেবল ওয়াশিং মেশিন, ফল শোধন যন্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা কৃষকপর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। কৃষিকাজে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সময়ের সাশ্রয় হবে অপরদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফসল উৎপাদন সমস্যা যথা- লবণাক্ততা, উষ্ণতা, খরা, ভূগর্ভস্থ’ পানির সমস্যা ও বন্যা প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উপর জোর দেয়া হয়েছে। বিএআরআই বিভিন্ন ফসলের প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী ৩০টি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে  বারি গম ২৫, বারি গম ২৬, বারি গম ২৭, বারি গম ২৮, বারি আলু ২৮, বারি সরিষা ১১, বারি সরিষা ১৬, বারি তিল ৪, বারি মুগ ৬, বারি ছোলা ৯ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব জাত জলবায়ুূ পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

রোগবালাই প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনেBiotechnology গবেষণার প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিএআরআই কর্নেল ইউনির্ভাসিটির সহযোগিতায় ইতোমধ্যে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী Bt Brinjal এর ৪টি ট্রানজেনিক জাত উদ্ভাবন করেছে যা বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী। Bt Brinjal বর্তমানে সারাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং কৃষকরা সফলভাবে চাষাবাদ করছে।

আগামী দিনের বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্যনিরপিত্তা নিশ্চিত করতে নিবিড় ফসলধারা উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম চলছে। বছরে একই জমি থেকে ২-৩টি ফসলের  জায়গায় কিভাবে ৪টি ফসল আবাদ করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চার ফসলভিত্তিক বেশ কয়েকটি ফসলধারা উদ্ভাবিত হয়েছে যা দেশের ফসলের নিবিড়তা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখবে।

বালাইনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে পরিবেশবান্ধব আইপিএম পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এক্ষেত্রে সবজি ও ফলের বেশ কয়েকটি ফসলের সমন্বিত বালাই  ব্যবস্থাপনা (IPM) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যা মাঠপর্যায়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। 

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বারি উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ কৃষকপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ই-এগ্রিকালচার চালু করা হয়েছে এবং মোবাইল অ্যাপস কৃষি প্রযুক্তি ভান্ডার তৈরি করা হয়েছে যার মাধ্যমে কৃষকেরা কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য ও সমস্যার সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে থাকে।

উদ্যানতত্ত্ব ফসলের উপর গবেষণা করে শাকসবজি ও ফল উৎপাদনে বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিএআরআই গত ২৯ এপ্রিল ২০১২ বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণ পদক) ১৪১৭ অর্জন করে। তা ছাড়া ২০১৪ সালে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য বিএআরআই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১৪ লাভ করে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রেখে দেশের জনগণের পুষ্টির চাহিদা পূরণে গবেষণা জোরদার করেছে। বারি উদ্ভাবিত পুষ্টিমান সমৃদ্ধ শাকসবজি, মসলা ও ফল এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার জন্য উপযোগী ১২টি হোমস্টেড মডেল বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

ক্রম হ্রাসমান কৃষি জমি থেকে ক্রম বর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা অর্জনে এবং সরকারের এসডিজি ২০৩০, রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ অর্জনে বিএআরআই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে রোগবালাই ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশে উপযোগী জাত উদ্ভাবন, নিরাপদ খাদ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন, পোস্ট হারভেস্ট প্রসেসিং ও মূল্য সংযোজন, হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্টু ব্যবস্থাপনা, প্রভৃতি বিষয়ের ওপর ভবিষ্যৎ গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করবে।

লেখক : ১মহাপরিচালক, বিএআরআই। ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বিএআরআই, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১১৩১৮৬৮৫, ই-মেইল : dilwar92@yahoo.com

বিস্তারিত
ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে ব্রি’র অবদান

ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরে ব্রি’র অবদান
ড. মো. শাহজাহান কবীর১ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন২

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। উপরন্তু, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। কৃষি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় দেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষি এবং বেশির ভাগ মানুষ তাদের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই কৃষিভিত্তিক শিল্পে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং প্রণোদনা আমাদের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে এবং সেইসাথে একটি ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে পারে, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি

বাংলাদেশ কমপক্ষে ৬৮,০০০ গ্রাম দ্বারা বেষ্টিত। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে  কৃষির সঙ্গে জড়িত। তাই ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের কথা আসলে প্রথমেই আসে খাদ্য নিরাপত্তার কথা। আর খাদ্যশস্য বলতে আমরা ধানকেই বুঝে থাকি। ধান এদেশের মানুষের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে চাল বা ভাতের নিরাপত্তাকে বুঝায়। কেননা, আমাদের প্রাত্যহিক চাহিদার শতকার ৭০-৭৫ ভাগ শর্করা, ৬০-৬৫ ভাগ প্রোটিন, ৮ ভাগ ফ্যাট, ৫.৮ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং ৯১.৬ ভাগ ফসফরাস চাল থেকে পাওয়া যায়। 

আগেই বলেছি, মানুষের ক্যালরির চাহিদার বেশির ভাগ আসে ভাত থেকে। দেশে বছরে মাথাপিছু চালের চাহিদা ১৩৪ কেজি। এছাড়া চাল থেকে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার রয়েছে, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের দৈনিক ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে। তাই বিনা দ্বিধায় বলা যায় ধানই বাংলাদেশের প্রাণ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং পুষ্টি নিরাপত্তার অর্জনের জন্য আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি ধান উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

ধান উৎপাদন মওসুম ও পরিবেশ উপযোগী আধুনিক ধান এবং লাগসই ধান উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ১ অক্টোবর ১৯৭০ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশবাসীর খাদ্যচাহিদা পূরণ ও পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে তালমিলিয়ে ধানের ফলন, উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ব্রত নিয়ে এ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে ব্রি এ পর্যন্ত ৭টি হাইব্রিড ও ১০১টি ইনব্রিড জাতসহ মোট ১০৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। খাদ্য নিরাপত্তাকে টেকসই করার জন্য বিভিন্ন ঘাতসহনশীল ও স্থানভিত্তিক (Location specific) জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গত তেরো বছরে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। যেমন- খরা, বন্যা, লবণাক্ততাসহিষ্ণু, জিংকসমৃদ্ধ, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চফলনশীল। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১২টি লবণাক্ততাসহিষ্ণু, ৩টি খরাসহনশীল, ৩টি বন্যাসহনশীল, ২টি  Tidal Submergence tolerant জাত ও ৩টি ঠান্ডা সহনশীল উদ্ভাবন করেছে। উচ্চতাপমাত্রা বা হিটশক ঝুঁকি এড়াতে উচ্চতাপমাত্রা সহনশীল একটি জাত ছাড়করণের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

ব্রি উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২%। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিঞ্চু জাতগুলো সম্প্রারণের মাধ্যমে ১২% আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে যেখান থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০%। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬% এলাকা চাষের আওতায় এসেছে যেখানে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯%। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত (ব্রি ধান৭৬, ৭৭) সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ৫৭০০০হে. জমি এই ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি, ২০২০-২১ সালে উচ্চফলনশীল ধানের জাতসমূহ দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়েছে এবং এ থেকে পাওয়া গেছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯১ ভাগ। ঘাতসহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-২১ পর্যন্ত ৬.০ লক্ষ টন হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। 
খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকা উন্নয়নে উদ্ভাবনী উদ্যোগ

ঘাত সহনশীলতা এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবনই নয় কৃষক সমবায় সংগঠনভিত্তিক যুব উদ্যোক্তা (জীবিকার মাঠ স্কুল, আইপিএম ক্লাব, আইসিএম ক্লাব, ইত্যাদি) বিকাশের মাধ্যমে জীবিকার উন্নতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছে ব্রি। ব্রি উদ্ভাবিত উদ্ভাবনী প্রযুক্তিসমূহ শুধুমাত্র অনুকূল নয় বরং প্রতিকূল ইকোসিস্টেমেও ক্রমাগত বর্ধিত ধান উৎপাদনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।   ১৯৭০-৭১ সালের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, জনসংখ্যা দ্বিগুণ বাড়লেও ধান উৎপাদন প্রায় চারগুণ হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তায় ব্রির অসামান্য অবদানের কারণে অতীতের তীব্র খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। 
তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার যে দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অবজ্ঞা করেছিলেন পঞ্চাশ বছর পরে সে দেশটি কে একই দেশের একটি নেতৃস্থানীয় সংবাদপত্র ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের জন্য রোল মডেল বলে আখ্যায়িত করেছে’ (The Christian Science Monitor,17 June 2015)। একসময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি এখন শক্ত ভিত্তির উদ্বৃত্ত খাদ্যের বাংলাদেশ; ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় এবং গড় ফলনের হিসেবে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রথম। স্বাধীনতার পর আমাদের জাতীয় জীবনে অন্যতম অসামান্য অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি জাতির পিতার সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা, বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ধান বিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম। এই অসামান্য অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষকপর্যায়ে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে। 
উন্নত জীবিকা এবং অর্থনীতির রূপান্তর
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধানভিত্তিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে আমাদেরও ধান চাষে আধুনিক জাত এবং প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশেই বিদেশের তুলনায় বেশি আয় করা সম্ভব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা মানুষ এখন টেলিভিশন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের মতো উন্নত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে। ক্রমবর্ধমান ধান উৎপাদনের মাধ্যমে ক্ষুধা মেটানো এ ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যেখানে ব্রির একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে দেশে খাদ্য আমদানি হ্রাস পাওয়ায় সঞ্চিত অর্থ দিয়ে সরকার দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে অবদান রাখছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। 
ক্ষুধামুক্ত জাতি গঠনে ধানভিত্তিক খামার ব্যবস্থা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়েছে উচ্চফলনশীল ধানের একাধিক জাত ও লাভজনক শস্যক্রম। যেমন- স্বল্প জীবনকালের খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬/খরা পরিহারকারী ব্রি ধান৫৭ এবং জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ চাষ করে বৃষ্টিনির্ভর বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিনা সেচে ছোলা এবং মসুর চাষ করা যায় এমন একটি অধিক লাভজনক শস্যবিন্যাস তৈরি করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। এ শস্যবিন্যাস অবলম্বন করে একটি জমির উৎপাদনশীলতা ১৮-৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব (আরএফএস বিভাগ, ব্রি)। 

উত্তরের জেলাগুলোতে যেখানে বৃষ্টিনির্ভর স্বর্ণা জাতের প্রচলন ছিল সেখানে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক আমন জাতগুলো যেমন- ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫,  ব্রি ধান৯৩ এবং ব্রি ধান৯৪ জাতগুলো প্রবর্তন করার মাধ্যমে ফলনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এ জাতগুলোর ফলন জাতভেদে ৪.৫ থেকে ৬.০ টন/হেক্টর এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই পুরনো জাতের পরিবর্তে ব্রি উদ্ভাবিত এসব জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। এছাড়া অঞ্চলভেদে খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ ও ব্রি ধান৭৯, লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৪ এবং ব্রি ধান৭৩, বন্যাত্তোর বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪১ এবং লবণাক্ত জোয়ার-ভাটা কবলিত যে সব এলাকায় জোয়ারের পানি জমে যায় সেসব এলাকায় ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ চাষ করে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।

উত্তরাঞ্চলের বিশেষ সময়ের খাদ্যাভাব বা মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩/ব্রি ধান৬২-আগাম আলু-মুগ-ব্রি ধান৪৮ অধিক লাভজনক ধানভিত্তিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, যেটি অনুসরণ করে ওই এলাকার কৃষকরা মঙ্গা চিরতরে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের শহরমুখী বা দেশান্তরী হওয়ার যে প্রবণতা পূর্বে ছিল তা হ্রাসে দারুণ কাজে লেগেছে এ চার ফসলি শস্যক্রম। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ধান চাষের সুযোগ ও সম্ভাবনার বিষয়টি চোখে পড়ে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে। গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ধানের ফলন ও উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে যা যথাক্রমে বার্ষিক ০.০৭ টন/হেক্টর ও ০.৯ মিলিয়ন টন/বছর।
আবার বোরো মৌসুমে মেগা জাত (সর্বাধিক জনপ্রিয়) হিসেবে খ্যাত ব্রির জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এর চেয়েও অনেক ভালো জাত বর্তমানে রয়েছে, যার মধ্যে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৮, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২, ব্রি ধান৯৬, বঙ্গবন্ধু ধান১০০, ব্রি ধান১০১, ১০২ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ উল্লেখযোগ্য। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৪৭ এর আধুনিক সংস্করণ ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭ এবং ব্রি ধান৯৯। আউশে পারিজা, জামাইবাবু ও বিআর২৬ এর পরিবর্তে যথাক্রমে ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৬৫, ব্রি ধান৮২, ব্রি ধান৮৩ এবং ব্রি ধান৯৮ চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব।
সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চাল
চাল ছেটে যাতে চিকন করতে না হয় সেজন্য ব্রি ইতোমধ্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন চিকন ও সরু চালের প্রায় ১২টি জাত উদ্ভাবন করেছে। অধিকন্তু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এমন কিছু ধান জাত উদ্ভাবন করেছে যেগুলো উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব ধান জাতের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ করেও লাভজনক খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। যেমন- ব্রি উদ্ভাবিত বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৩ ও ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি  ধান৮০, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৬ ও ব্রি ধান৯০ প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন জাত। বিআর১৬, ব্রি ধান৪৬ ও   ব্রি ধান৬৯ লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (লো-জিআই) গুণসম্পন্ন জাত, এসব জাতের চালের ভাত ডায়াবেটিক রোগীরা নিরাপদে খেতে পারেন। ব্রি উদ্ভাবিত জিংকসমৃদ্ধ সাতটি ধানের জাত ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪, বঙ্গবন্ধু ধান১০০ এবং ব্রি ধান১০২ এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জাতগুলোর ভোক্তা চাহিদা বেশি, বাজারমূল্যও অধিক। তাই ধানভিত্তিক খামার বিন্যাসে এ জাতগুলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অভিবাসনের অন্যতম বিকল্প হতে পারে। এ খাতে বর্ধিত হারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত পুঁজি লাভসহ তুলে আনা সম্ভব। এছাড়া শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করে উদ্ভাবনকৃত জাতগুলো অবমুক্তকরণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া চাল থেকে এনার্জি ডেনস বিস্কুট, কেক, নুডুলস, মুড়ি, চিড়া ও খই তৈরির মাধ্যমে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কাজ করছে ব্রি।

কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে বাড়াচ্ছে কর্মসংস্থান ও আয়
ব্রি বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত দেশের কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী ৩৫টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে  কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করছে। চারা রোপণ, আগাছা নিধন থেকে ধান কাটা ও মাড়াই সব কিছুতেই লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। অভিবাসনের চিন্তা পরিহার করে সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কেনা একটি রাইস টান্সপ্লান্টার বা কম্বাইন হার্ভেস্টার স্ব-কর্মসংস্থানের অন্যতম উপায় হতে পারে। এছাড়া যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বর্তমানে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র বা ট্রান্সপ্লান্টার, রোটারি টিলার, ধান-গম কাটার যন্ত্র, ধান-গম মাড়াই যন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টার ও আগাছা দমন যন্ত্র বা উইডার ইত্যাদি। কৃষকরা এসব যন্ত্র নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও অন্যদের এসব সেবা প্রদান করে লাভবান হতে পারেন।
স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি

আমাদের কৃষকরা প্রায়ই মানসম্পন্ন বীজের অভাবে প্রতারিত হন। এখন পর্যন্ত মাত্র ৬৩ শতাংশ কৃষক মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারছেন। বাকি ৩৭ শতাংশ অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বীজের উপর নির্ভরশীল। আমন মৌসুমে ২৯.৭২ শতাংশ, আউশে ৫৯.৯৮ শতাংশ এবং বোরোতে ৯৯.৮ শতাংশ কৃষক মানসম্পন্ন বীজ পাচ্ছেন। অথচ কথায় বলে, ভালো বীজে ভালো ফলন। এই বিষয়টি মাথায় রেখে, ব্রি প্রতি বছর ২০০ টনের বেশি ব্রিডার বীজ উৎপাদন করছে এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রি থেকে ব্রিডার বীজ, ভিত্তি বীজ এবং টিএলএস সংগ্রহ করে বীজ ব্যবসায় অল্প পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে, বীজ উৎপাদন এবং সরবরাহের মাধ্যমে আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।

ধানভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ব্রি গত ৫০ বছরে এ পর্যন্ত ২৫টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া ২০২০ সালের গ্লোবাল গো টু থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সূচক রিপোর্ট এ ব্রিকে দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা (১ম অবস্থান), এশিয়ায় ২য় এবং বিশ্বের ১৬তম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ঘোষিত আসন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, এসডিজি-২০৩০, ভিশন-২০৪১, ডেল্টা প্লান-২১০০ সহ সকল মাইলফলক অর্জনে ব্রি অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে কাজ করে যাবে। 

লেখক : মহাপরিচালক১ ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা২, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ফোন: ০১৭১৬৫৯০৩৮০, ইমেইল : dg@brri.gov.bd

বিস্তারিত
কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর

কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর
আঃ গাফ্ফার খান
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রূপকল্প হচ্ছে উৎপাদক, বিক্রেতা ও ভোক্তা সহায়ক কৃষি বিপণন ও কৃষি ব্যবসা উন্নয়ন। সে সাথে আধুনিক সুবিধা সংবলিত বাজার অবকাঠামো নির্মাণ এবং কৃষিপণ্যের বিপণন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের চাহিদা ও জোগান নিরূপন, মজুদ ও মূল্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও অত্যাবশ্যকীয়  কৃষিপণ্যের মূল্য ধারার আগাম প্রক্ষেপণ এবং এ বিষয়ক তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রচার করাই হলো এ প্রতিষ্ঠানের অভিলক্ষ্য। 
প্রধান কার‌্যাবলী 
কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ অনুসারে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার‌্যাবলি হচ্ছে : কৃষি বিপণন তথ্য ব্যবস্থাপনা; কৃষিপণ্যের মূল্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; কৃষি বিপণন ও কৃষি ব্যবসা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; কৃষক ও কৃষিপণ্যের বাজার সংযোগ সৃষ্টি ও সুষ্ঠু সরবরাহের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান; কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং বিপণন ও ব্যবসা সম্পর্কিত অর্থনৈতিক গবেষণা পরিচালনা; কৃষিপণ্য উৎপাদন ও ব্যবসায় নিয়োজিত কৃষক, কৃষি ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকারী, রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ী সমিতিসমূহের সহিত নিবিড় সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ; সুষ্ঠু বিপণনের স্বার্থে কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকায় বাজার অবকাঠামো, গুদাম, হিমাগার, কুলচেম্বার ইত্যাদি নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ; কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের মজুদ বা গুদামজাতকরণ, পণ্যের গুণগতমান, মেয়াদ, মোড়কীকরণ ও সঠিক ওজনে ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিবীক্ষণ;কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন; কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান; কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ; বাজারকারবারি অথবা কৃষি ব্যবসায়ী সংগঠন, সমিতি, সংস্থা, কৃষিভিত্তিক সংগঠন ও সমবায় সমিতিসমূহকে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে, তালিকাভুক্তকরণ এবং প্রয়োজনে জাতীয় এবং জেলা পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক সংগঠন সমূহের ফেডারেশন অথবা কনসোর্টিয়াম গঠন; বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সুপারশপে সংরক্ষিত কৃষিপণ্যের গুণগতমান, নির্ধারিত মূল্য ও বিপণন কার্যক্রম পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পরামর্শ প্রদান; কৃষিপণ্য ও কৃষি উপকরণের বিপণন কার্যক্রম সংক্রান্ত মান সংরক্ষণ, পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ এবং সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন করা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উল্লেখযোগ্য অর্জনসমূহ
কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তার স্বার্থে কৃষি বিপণন আইন, ২০১৮ এবং কৃষি বিপণন বিধিমালা, ২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের খুচরামূল্য সহনীয় রাখতে কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্য প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে; নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে স্থানীয় জেলা প্রশাসন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য দপ্তরের প্রতিনিধিদের সাথে যৌথভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে; ০৪ আগস্ট, ২০২১ তারিখে চালু হয়েছে কৃষিপণ্য কেনাবেচার ডিজিটাল প্লাটফর্ম সদাই। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক চালুকৃত এ প্লাটফর্মে কৃষিপণ্য অর্ডার, উদ্যোক্তা নিবন্ধন, অর্ডার ট্র্যাকিং, মাননিয়ন্ত্রণ, ভোক্তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়াসহ প্রভৃতি সুবিধা রয়েছে; কোভিড-১৯ কালীন সময়ে নিরাপদ কৃষি বিপণন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে খুলনা জেলায় হাতের মুঠোয় কাঁচাবাজার নামে মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক অনলাইন বিপণন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ কাঁচাবাজার চালু করা হয়েছে; কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত মাঠ পর্যায়ের ৬৪টি জেলা অফিস ও ৪টি উপজেলা অফিস হতে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক ভিত্তিতে পাইকারি, খুচরা ও কৃষকপ্রাপ্ত বাজারদর সংগ্রহ ও সংকলনপূর্বক ওয়েবসাইট ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রতি বছর ৬০,৮৭০ বাজার তথ্য ১২,০৬৫ বুলেটিন ও ৯১০টি প্রতিবেদন আকারে প্রচার করা হয়েছে; কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, দরকষাকষির সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, কৃষি ব্যবসার উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজ বিজ্ঞাপন ও বাজার সংযোগের জন্য একটি অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে।
সুষ্ঠু ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রচলিত কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ এর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রায় ১০০০টি নিয়ন্ত্রিত বাজারের প্রায় ৫০,০০০ জন কৃষিপণ্যের বাজারকারবারীদের মধ্যে লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করা হয়েছে; কৃষিপণ্যের বাজারকারবারীদের মধ্যে লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন বাবদ ২০০৯-২০২১ পর্যন্ত ১৩ বছর সময়কালে প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ননট্যাক্স রেভিনিউ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে; কৃষকদের অভাবতাড়িত বিক্রয় রোধ করার জন্য শস্য গুদাম ঋণ কার্যক্রমের আওতায় ২০০৯-২০২১ পর্যন্ত ১৩ বছর সময়কালে ৮১টি গুদামের মাধ্যমে ৮২,৯৭৭ জন কৃষকের ৮৮,৩৮৮ মে. টন শস্য জমার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে ১২,৫২৬.৭০ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে; কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, বাজার সংযোগ স্থাপন ও কৃষকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্প/কর্মসূচির অধীনে প্রায় ২০০০টি কৃষক গ্রুপ/কৃষক বিপণন দল গঠন করা হয়েছে। এ সকল গ্রুপে সর্বমোট ৫০০০০ জন কৃষক সদস্য রয়েছেন; কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্প/কর্মসূচির আওতায় কর্তনোত্তর প্রযুক্তি, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, শাকসবজি ও ফলমূল প্যাকেটজাতকরণ, ফ্রেশকাট, মিক্সড সবজি ও ফলমূল বিপণন, বাজার ব্যবস্থাপনা, মূল্য সংযোজন, উচ্চমূল্যের ফসল সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় ৯৫,০০০ জন কৃষক/ উদ্যোক্তা/বাজারকারবারি/সুপারশপ প্রতিনিধি/বাজার কমিটির সদস্যগণকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।                   
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং ভোক্তাদের নিরাপদ শাকসবজি প্রাপ্তির লক্ষ্যে সরাসরি কৃষকের অংশগ্রহণে ঢাকাস্থ মানিক মিয়া এভিনিউতে কৃষকের বাজার চালু করা হয়েছে; কৃষকদের বিপণন অবকাঠামো সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প/কর্মসূচির আওতায় ১৮টি অ্যাসেম্বল সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এ সকল অ্যাসেম্বল সেন্টারে কৃষক ও ব্যবসায়ী সরাসরি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা পাচ্ছে; কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ০৬টি গবেষণা শাখা ও অন্যান্য শাখা ও জেলা হতে থেকে প্রতি অর্থবছরে কৃষিপণ্যের মূল্যভিত্তিক ৩০০টি প্রতিবেদন এবং ২০,০০০টি পোস্টার, হ্যান্ডবিল, স্টিকার, ব্রুশিয়ার, বুকলেট ইত্যাদি প্রকাশ করা হয়েছে; বাংলাদেশের ফুল বিপণন ব্যবস্থা উন্নয়নে ঢাকার গাবতলীতে ফুলের পাইকারি বাজার এবং প্রসেসিং সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং ঢাকার সাভারে ফুলের মোট ০৫টি অ্যাসেম্বল সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে; খুচরা বাজারে কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে খুচরা, পাইকারি, আড়তদার, সুপারশপ ও অন্যান্য কৃষি ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপ আলোচনা করে কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তদানুযায়ী সারা দেশে বাজার মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
স্বল্পমেয়াদি (০১ বছর) : উদ্ভাবনীমূলক কৃষি বিপণন সেবা প্রদানে জেলা, উপজেলা, বিভাগ ও প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদেরকে সার্টিফিকেট ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান; স্বল্পমূল্যে বিআরটিসির ট্রাক, ডাক বিভাগের কৃষক বন্ধু ডাক সেবা ও রেলগাড়িতে কৃষিপণ্য পরিবহন প্রতিটি জেলায় প্রচার প্রচারণা চালানো ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা এবং কৃষিপণ্যের নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ওয়েবসাইট, ইলেক্ট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড ও বুলেটিন আকারে মূল্য প্রচার। আমদানিকৃত কৃষিপণ্য/উপকরণের পরিমাণ ও মূল্য সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও সংকলন করা; মূল্য, গুণগত মাননিয়মিত মনিটরিং করা ও কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যারিফ কমিশন ও আমদানি/রপ্তানি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে সমন্বয় করা। ধান ও চালের সঠিক উৎপাদন খরচ নির্ণয় করে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া, কৃষকপ্রাপ্ত বাজার দর ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও তুলনামূলক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা। চালের দাম বৃদ্ধি/অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে চালকল মালিক, আড়তদারদের ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে কারণ ও করণীয় নির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করা। কৃষক বিপণন গ্রুপ/দল গঠন এবং উৎপাদক ও বিক্রেতার সাথে ভোক্তার সংযোগ স্থাপনে সহায়তা প্রদান, ছোট, মাঝারি ও বড় বাণিজ্যিক কৃষক চিহ্নিত করে আলাদা বিপণন দল গঠন ও সমবায় বিপণনে উৎসাহ প্রদান করা; কৃষি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহজ শর্তে ঋণ প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাথে সভা/সেমিনার করা এবং কৃষি বিপণন ঋণ প্রাপ্তিতে সহায়তা করা; সেনাবাহিনী, পুলিশ, জেলখানা, হাসপাতাল ও এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃকক্রয়কৃত প্রতিদিনের সবজি যেন সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করা হয় সে বিষয়ে পত্র প্রেরণ ও মধ্যস্থতাকারীর কার্যকর ভূমিকা পালন করা; কৃষকের বাজার জেলা/উপজেলা পর্যায়ে বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের পদক্ষেপ গ্রহণ ও স্বল্প পরিসরে প্রতিটি জেলায় কার্যক্রম শুরু করা; কৃষকের বাজার পরিচালনায় আপদকালীন সময়ে রাজস্ব বাজেট থেকে অর্থের সংস্থান করা। প্রতিটি জেলায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমান কৃষিপণ্যের বাজার কার্যক্রম আরও জোরদারকরণ; সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সবজি ক্রয় করে অন্তর্ভুক্তকরণে মন্ত্রণালয়/জেলা/উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংগঠনগুলোকে উদ্বুদ্ধকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা।
মধ্যমেয়াদি (২-৩ বছর) : জেলাভিত্তিক নিত্যপ্রয়োজনীয়  কৃষিপণ্যের চাহিদা নির্ণয় এবং সে অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিতকরণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করা; ফসল সংগ্রহোত্তর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ও অধিক মূল্য পেতে প্রক্রিয়াজাতকরণে দেশে-বিদেশে প্রচলিত বিভিন্ন প্রযুক্তি বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা করা; কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়নে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা এবং জেলা পর্যায়ে নির্মাণাধীন প্রসেসিং কাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা গ্রহণ; কৃষি যান্ত্রিকীকরণে উদ্যোক্তা গঠন ও মেরামত ও চালনা প্রশিক্ষণ। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ও কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়নে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা এবং জেলাপর্যায়ে নির্মাণাধীন প্রসেসিং কাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা গ্রহণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে উদ্যোক্তা গঠন এবং মেরামত ও চালনা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ।
কৃষিপণ্য উৎপাদক, মধ্যস্থকারবারী ও ব্যবসায়ীদের ডাটাবেজ তৈরিকরণ। কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইনের সকল অংশীজনের বিস্তারিত তথ্য সংবলিত ডাটাবেইজ তৈরিপূর্বক ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এবং এ সংক্রান্ত ডায়েরি প্রস্তুত করা; সুপারশপ, ই-কমার্স ও বড় বড় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান যাতে সরাসরি কৃষকের সাথে চুক্তিভিত্তিক চাষ পদ্ধতিতে যায় সেজন্য উভয়পক্ষের মধ্যস্থতা করা, মনিটরিং করা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া; কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি ও রপ্তানি সম্প্রসারণ সহায়ক সেবা জোরদারকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গ্রেডিং, সর্টিং, প্রমিতকরণ ও মোড়কীকরণ বিষয়ে ভিডিও/ডকুমেন্টারি সংকলন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটটিকে সংস্কার করে আধুনিক রূপরেখা প্রদান করা; ই-কৃষি বিপণনের আওতায় উন্নয়নকৃত প্লাটফর্মের সাথে সমন্বয় করা। দেশের সকল কৃষিপণ্য, উপকরণ ও কৃষি যন্ত্রপাতির বাজারজাতকরণ সেবাকে ই-মার্কেটিংয়ের আওতায় আনা। দেশে-বিদেশে আধুনিক কৃষি বিপণন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে বিপণনকর্মী মনোনয়ন ও প্রশিক্ষণ খাতে অর্থসংস্থান বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ। আঞ্চলিক ও জেলা প্রশিক্ষণ সেন্টারের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ ও কার্যক্রম বৃদ্ধি করা। 
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের গবেষণা শাখাকে শক্তিশালী করা ও গবেষণার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়মিত কৃষিপণ্যের সাপ্লাই চেইন, ভ্যালু চেইন ও টেকসই বাজারজাতকরণ নিয়ে গবেষণা করা ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি করা; নারী কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা এবং কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ; কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি, কর্তনোত্তর ক্ষতি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা, কৃষি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, মূল্য সংযোজন, বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের দক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা তথা উদ্ভাবনমূলক কৃষি বিপণন গবেষণার উন্নয়ন। উক্ত বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা করা এবং বিভিন্ন মিডিয়া ও জার্নালে প্রকাশের ব্যবস্থা করা। অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করা।
দীর্ঘমেয়াদি (৪-৫ বছর) : পলিশেড নির্মাণের মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদন কার্যক্রম গ্রহণ। পলি শেডে উৎপাদিত রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ সবজির সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, মূল্য সংযোজন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তা করা; উচ্চমূল্য ফসলের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়মিত রাখা, বাজার সংযোগ করে দেয়া ও মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট অব্যাহত রাখা; বাজার অবকাঠামো, সংরক্ষণাগার ও বিশেষায়িত কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও সেবা সম্প্রসারণ করা; কৃষিপণ্য সংরক্ষণের স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সচেষ্ট হওয়া, যার মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। কৃষিপণ্যের মূল্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রূপরেখা তৈরি, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করা। 
কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে অবকাঠামো ও লজিস্টিক খাতসহ মূলধন খাতে পিপিপির ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ; প্রয়োজনে ভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর; বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অবকাঠামো ও লজিস্টিকসহ মূলধন খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারস্পারিক সম্পর্ক জোরদার করা। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে প্রক্রিয়াজাতকরণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে কর্মসূচি/প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ। মৌসুমভিত্তিক বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন খরচ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা ও আর্থিকভাবে লাভ-ক্ষতির তুলনামূলক বিশ্লেষণযুক্ত গবেষণা করা ও কৃষক এবং ব্যবসায়ীদেরকে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণে সাহায্য করা। হাওর অঞ্চলে ভাসমান বাজার স্থাপনে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া। শস্য সংরক্ষণ ও লাভজনক সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নিয়মিত গবেষণা করা ও অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি করা।
বহু বছরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, সুদীর্ঘ পরিকল্পনা, আর খেটে খাওয়া মেহনতি কৃষকের শ্রম, ঘাম আর রক্তের বিনিময়ে আমাদের কৃষিতে আজকের এ অর্জন। কৃষি, কৃষক, কৃষি ব্যবসায়ীর উন্নয়নে একটি কার্যকর বিপণন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : মহাপরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ০২৫৫০২৮৪৫৫, ই-মেইল : dg@dam.gov.bd

বিস্তারিত
কৃষিতে পরমাণু শক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার

কৃষিতে পরমাণু শক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার
ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম
জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। রেডিও-ট্রেসার ল্যাবের ছোট পরিসরে ১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করে দীর্ঘ ৫০ বছরে  বিনা তার বর্তমান স্তরে উপনীত হয়েছে। বিনা আজ প্রয়োজনীয় ল্যাব ও পরীক্ষণ খামারে সমৃদ্ধ, দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশগত অঞ্চলে এর ১৩টি উপকেন্দ্র ও ১টি আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে বিনার তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিতভাবে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। বিনা বাংলাদেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলেছে। দেশের কৃষি সমস্যার সমধানে স্বল্পসময়ে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় নিউক্লিয়ার পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে বিনা যুগোপযোগী, টেকসই এবং নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এগিয়ে যাচ্ছে।
লক্ষ্য
পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বংশগতি ধারায় স্থায়ী পরিবর্তন আনয়ন করত উন্নতমানের অধিক ফলনশীল ধান, পাট, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও মসলাজাতীয় শস্যের জাত উদ্ভাবন, মাটির ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যাবলী নিরূপণ, বিভিন্ন ফসলের জন্য সার সুপারিশমালা প্রণয়ন, রোগ ও পোকামাকড় দমনের পদ্ধতি নির্ণয়, সুষ্ঠু সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন, উদ্ভাবিত নতুন জাতসমূহের কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন অঞ্চলের মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো, আর্থসামাজিক গবেষণা এবং কৃষকদের নিকট উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর করা।
উদ্দেশ্য
ফসলের উচ্চফলনশীল, পুষ্টিমান সম্পন্ন, প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন; ফসলভিত্তিক উন্নত, আধুনিক ও টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও লাগসই ফসল বিন্যাস নির্ধারণ; পরিবেশবান্ধব শস্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি উদ্ভাবন; মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; শস্য সংগ্রহত্তোর ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন; উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন।
সাফল্য 
বিনা এ যাবৎ ধান, পাট, গম, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও মসলাজাতীয় শস্যের ১৮টি ফসলের উচ্চফলনশীল এবং উন্নত গুণাবলী সম্পন্ন ১১৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে। ফসলের উন্নত এ জাতগুলো ছাড়াও ডাল ও শিমজাতীয় তেল ফসলের নাইট্রোজেনের বিকল্প হিসেবে ইনস্টিটিউট থেকে ১০টি জীবাণুসার উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমানে ছোলা, মসুর, চীনাবাদাম, সয়াবিন, মুগ, মাষকলাই, বরবটি ও ধৈঞ্চার জীবাণুসার ইনস্টিটিউট থেকে তৈরি এবং সরবরাহ করা হচ্ছে। এ সকল জীবাণুসার প্রয়োগে সয়াবিনে ৭৫-১৫০%, অন্যান্য ডাল ও শিমজাতীয় শস্যে ২০-৪৫% পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। জীবাণু সার প্রয়োগ করলে ইউরিয়া সার দেয়ার প্রয়োজন হয় না। ফসফো-ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ফসফেটিক সারসহ অন্যান্য রাসায়নিক সারের সাশ্রয় হয়। এছাড়াও বিনা অদ্যাবধি ৫৭ (সাতান্ন)টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
বিনা উদ্ভাবিত উল্লেখযোগ্য কিছু প্রযুক্তিসমূহ
প্রধান প্রধান শস্য পরিক্রমায় সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, ধানভিত্তিক শস্য পরিক্রমায় ফসফেট সারের ব্যবস্থাপনা, ধান চাষে নাইট্রোজেন সারের ব্যবস্থাপনা; ফসফেটিক জীবাণু সার, লবণাক্ত জমিতে গম চাষ, মাটিতে দস্তার প্রয়োজনীয়তা নির্ণয়, পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বরেন্দ্র এলাকার জন্য নতুন শস্য পরিক্রমা, আর্সেনিকমুক্ত পানি উত্তোলনের জন্য অগভীর নলকূপ স্থাপন, ধানগাছ কর্তৃক আর্র্সেনিক শোষণ এবং মাটি-উদ্ভিদে আর্সেনিকের স্থানান্তর, লবণাক্ত এলাকায় ফসলের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় টমেটোর ঢলে পড়া রোগ দমন, রোগ প্রতিরোধী শস্য জাত উদ্ভাবন ও বিস্তার, মাটির স্বাস্থ্য সেবা, লবণাক্ত এলাকায় সূর্যমুখী, ভুট্টা ও সয়াবিন চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা; লবণাক্ত এলাকায় ফারো রোপণ পদ্ধতি, লবণাক্ত এলাকায় গম চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, মাল্টার কলম করার কলাকৌশল, সফেদার বংশবিস্তার কলাকৌশল। 
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা 
প্রতিকূল জলবায়ু সহিষ্ণু বিশেষ করে লবণাক্ততা, জলমগ্নতা, ঠা-া ও খরাসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করা; রোগবালাই ও পোকামাকড় সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করা; শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা; গুরুত্বপূর্ণ জিন পৃথকীকরণ ও জেনিটিক্যালি মডিফাইড ফসল উদ্ভাবনসহ সহযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন; অধিক ফলনশীল ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের জাত উদ্ভাবন করা; বিভিন্ন ফসল বিশেষ করে পিয়াজ, আলু এবং অন্যান্য পচনশীল ফল ও ফসল সংরক্ষণের জন্য ইরেডিয়েশন সেন্টার স্থাপন করা, যাতে বিকিরণ পদ্ধতিতে ফসল সংরক্ষণের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা যায়; বাংলাদেশের চরভূমি, হাওর ও পাহাড়ি এলাকায় মানসম্পন্ন খাদ্য, পুষ্টির ব্যবহার দক্ষতা এবং ট্রেসার কৌশল ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। টেকসই ফসল উৎপাদন এবং মাটির স্বাস্থ্যের জন্য পারমাণবিক কৌশল ব্যবহার করে ফসল, মাটি এবং জলের উপর কীটনাশকের প্রভাব নির্ধারণ করা। টেকসই ফসল উৎপাদন এবং মাটির উর্বরতা পুনরুদ্ধারের জন্য জৈবসার তৈরি করা; উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা এবং তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এর প্রভাব নিরূপণ করা।
উদ্ভূত সমস্যা মোকাবেলায় বিনা উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ চলমান কৃষির হুমকিসমূহ মোকাবেলায় অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ফসলের নিবিড়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিনার জাতসমূহ চাষাবাদের ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হচ্ছে।

লেখক : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ, ফোন : ০৯১৬৭৮৩৪, ই-মেইল : dg@bina.gov.bd

বিস্তারিত
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা 
সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা 
কৃষিবিদ মোঃ রফিকুল ইসলাম১ ড. এ. টি. এম. মোরশেদ আলম২
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) দেশের অন্যতম প্রাচীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯০৪ সালে স্যার আর.এস. ফিনলোর নেতৃত্বে ঢাকায় প্রথম পাটের গবেষণা শুরু হয়। অতঃপর ১৯৩৬ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির (ওঈঔঈ) আওতায় ঢাকায় জুট এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পাটের গবেষণা শুরু হয়। ১৯৫১ সালে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল জুট কমিটির (ওঈঔঈ) স্থলে পাকিস্তান সেন্ট্রাল জুট কমিটি (চঈঔঈ)  গঠিত হয় এবং বর্তমান স্থানে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। বর্তমানে বিজেআরআই তিনটি ধারায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে : (১) পাটের কৃষি তথা পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা; (২) পাটের কারিগরি তথা মূল্য সংযোজিত বহুমুখী নতুন নতুন পাট পণ্য উদ্ভাবন এবং প্রচলিত পাট পণ্যের মানোন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা এবং (৩) পাটের টেক্সটাইল অর্থাৎ পাট এবং তুলা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আঁশের সংমিশ্রণে পাটজাত টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদন সংক্রান্ত গবেষণা এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। 

বর্তমানে বিজেআরআই এর কৃষি গবেষণায় ৬টি, কারিগরি গবেষণায় ৫টি, জুট টেক্সটাইল গবেষণায় ১টি এবং পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ উইং-এ ১টিসহ মোট ১৩টি বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়াও কৃষকদের সময় উপযোগী চাহিদা ও প্রয়োজন মোতাবেক পাটের অঞ্চল ভিত্তিক কৃষি গবেষণার জন্য মানিকগঞ্জে পাটের কেন্দ্রীয় কৃষি পরীক্ষণ স্টেশন এবং রংপুর, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ ও চান্দিনায় (কুমিল্লা) চারটি আঞ্চলিক পাট গবেষণা কেন্দ্র এবং তারাবো (নারায়ণগঞ্জ), মনিরামপুর (যশোর) ও কলাপাড়ায় (পটুয়াখালী) তিনটি পাট গবেষণা উপকেন্দ্র এবং নশিপুরে (দিনাজপুর) একটি পাট বীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। উল্লেখ্য যে, পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের দেশী-বিদেশী বীজ সংরক্ষণ ও উন্নত জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য বিজেআরআইতে একটি জিন ব্যাংক রয়েছে। এ জিন ব্যাংকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত পাট ও সমগোত্রীয় আঁশ ফসলের প্রায় ৬০০০-এর অধিক জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে। সম্প্রতি বিজেআরআই           কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন “পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা” প্রকল্পের অর্থায়নে গবেষণার মাধ্যমে জীব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশি ও তোষা পাট এবং ধৈঞ্চার জিনোম সিকুয়েন্স উন্মোচন করে গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করা হয়েছে, যা  বিশ্বে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। 
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এর রূপকল্প, অভিলক্ষ্য এবং কার‌্যাবলী 
রূপকল্প : পাটের গবেষণা ও উন্নয়নে উৎকর্ষ অর্জন। 

অভিলক্ষ্য : পাটের কৃষি ও কারিগরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও হস্তান্তরের মাধ্যমে কৃষক ও পাট সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীদের উপার্জন বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষা করা।  
উদ্দেশ্য ও কার‌্যাবলী : পাট ও সমশ্রেণির আঁশ ফসলের কৃষি, কারিগরি ও অর্থনৈতিক গবেষণা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ও পরিচালনা এবং আঁশজাত ফসল উৎপাদন এবং গবেষণার ফলাফল সম্প্রসারণ; উন্নতমানের কৌলিতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা বজায় রেখে পাট বীজ উৎপাদন, পরীক্ষণ, সরবরাহ, পরিচালন এবং সীমিত আকারে উন্নতমানের পাটবীজ উৎপাদন ও সংগ্রহ এবং বোর্ড কর্তৃক নির্বাচিত চাষি, স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান এবং অনুমোদিত এজেন্সির নিকট বিতরণ করা; পাট ও সমশ্রেণির আঁশ ফসল, পাটজাত পণ্য ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে গবেষণার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন; পাটের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত নুতন জাতের পাট প্রদর্শন (উবসড়হংঃৎধঃরড়হ) এবং উক্ত জাতের পাট চাষাবাদের জন্য  কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ; প্রবন্ধ (সড়হড়মৎধঢ়য), বুলেটিন এবং পাট গবেষণা সম্পর্কিত অন্যান্য প্রকাশনা প্রকাশ ও প্রচার; পাট ও সমশ্রেণির আঁশ ফসল চাষের উন্নত পদ্ধতি সম্পর্কে ইনস্টিটিউটের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ পাট সংক্রান্ত কারিগরি গবেষণার ফলাফল ও উহার ব্যবহার সম্পর্কে পাট ও পাটপণ্য উৎপাদন সংশ্লিষ্ট সুফলভোগীদের প্রশিক্ষণ প্রদান; জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠনসমূহের সহযোগিতায় গবেষণা কর্মসূচি গ্রহণ করা। 
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের উল্লেখযোগ্য সাফল্য

উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন :  বিজেআরআই প্রতিষ্ঠার পর থেকে মোট ৫৩টি পাট ও পাটজাতীয় আঁশ ফসলের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করা হয়েছে। তন্মধ্যে বর্তমানে ২৪টি (১১টি দেশি পাট, ৮টি তোষা পাট, ৩টি কেনাফ ও ২টি মেস্তা) উন্নত জাত বর্তমানে কৃষকপর্যায়ে চাষাবাদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশকৃত এই ২৪টি উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে বর্তমান সরকারের সময়কালে ১৩টি জাত (দেশি পাটের-৬টি, তোষা পাটের-৩টি, কেনাফের-২টি এবং মেস্তার-২টি) উদ্ভাবিত হয়েছে। 

পাটের জীবন রহস্য (এবহড়সব ংবয়ঁবহপরহম) উন্মোচন : পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণার সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানীরা ২০১০ সালে তোষা পাটের, ২০১২ সালে পাটসহ পাঁচশতাধিক ফসলের ক্ষতিকারক ছত্রাক গধপৎড়ঢ়যড়সরহধ চযধংবড়ষরহধ এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জিনোম সিকুয়েন্স উন্মোচন করেছেন। (এ ছাড়া জিনোম গবেষণায় জড়িত বিজ্ঞানীরা ২০১৮ সালে ধৈঞ্চার (ঝবংনধহরধ নরংঢ়রহড়ংধ) জীবন নকশা উন্মোচন অর্থাৎ জিনোম সিকুয়েন্সিং সম্পন্ন করিয়া ইহার জিনসমূহ শনাক্ত করিতে সক্ষম হয়েছেন। ধৈঞ্চার জিনোম গবেষণার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো। বায়ুম-লে থাকা ৭৬ ভাগ নাইট্রোজেন প্রচলিত ফসল সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু দেশে প্রাচীনকাল হইতে সবুজ সার হিসাবে ব্যবহৃত ধৈঞ্চার শিকড় ও কা-ে এক ধরনের নডিউল বা গুটি তৈরি হয় যাতে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া বায়ুম-লের নাইট্রোজেন সঞ্চয়পূর্বক গাছকে সরবরাহ করে। ধৈঞ্চার এই বৈশিষ্ট্য অন্যান্য ফসলে প্রয়োগের লক্ষ্যে ধৈঞ্চার জিনোম সিক্যুয়েন্স গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য পূরণে এবং রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ গবেষণা অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করা যায়)। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে আর্বিভূত করোনা ভাইরাসের ৭টি স্ট্রেইনের জিনোম তথ্য উন্মোচন করা হয়েছে যা ভেক্সিন তৈরি এবং ড্রাগ ডিজাইনে ব্যবহার করা যাবে।

লবণাক্ততাসহিষ্ণু পাট জাতের সম্প্রসারণ : বিজেআরআই উদ্ভাবিত ‘বিজেআরআই দেশি পাট-৮’ কে দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলার ৬টি উপজেলায় গত ৪ বছর চাষাবাদে কৃষক ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। ফলে উপকূলীয় এলাকার বিস্তর এক ফসলি জমিতে ২টি ফসল আবাদ করা যাবে। এতে ওই এলাকার কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

প্রযুক্তি উদ্ভাবন : বিগত তেরো বছরে ৭৫টি কৃষি প্রযুক্তি এবং ৪০টি শিল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। পাটভিত্তিক চার ফসলি শস্যবিন্যাস (আলু-পাটশাক-পাট-রোপা আমন) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে যা ব্যবহার করে কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। সম্প্রতি লবণাক্ততাসহিষ্ণু পাটের জাত ‘বিজেআরআই দেশি পাট-১০’ উদ্ভাবন করা হয়েছে। চাহিদাভিত্তিক পাট পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কম লিগনিন যুক্ত পাট জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে ল্যাবরেটরি ও মাঠপর্যায়ে গবেষণা কাজ অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া স্বল্পমূল্যের হালকা পাটের শপিং ব্যাগ,প্রাকৃতিক উৎস হতে রং আহরণ করে পাটপণ্য রঞ্জন পদ্ধতি, পাটজাত শোষক তুলা, অগ্নিরোধী পাটবস্ত্র ইত্যাদিসহ ৬টি নতুন পাট পণ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ সম্প্রসারিত হলে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। জেটিপিডিসি উইং এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত কটন কাউন্টের ১০, ১২, ১৫, ১৬, ২০, ২২ কাউন্ট পর্যন্ত মিহি সুতা উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাপড় যেমন- শার্টের কাপড়, স্যুটের কাপড়, পাঞ্জাবির কাপড় এবং অন্যান্য পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। 
প্রযুক্তি হস্তান্তর : পাট আঁশ ও বীজ উৎপাদন, রিবন রেটিং পদ্ধতি ও অন্যান্য কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ৩০৩৫০ (ত্রিশ হাজার তিনশত পঞ্চাশ) জন পাটচাষি, ৭৫৫০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, ১২০০ জন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাকে এবং এছাড়া মানসম্পন্ন পাটপণ্য উৎপাদন, রঞ্জন, ডিজাইন ইত্যাদি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য ৩০০০ (তিন হাজার) জন পাটপণ্য উৎপাদন কর্মী এবং ৩০০ জন উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন : জিনোম গবেষণার জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউ কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘পাট বিষয়ক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অত্যাধুনিক বায়োটেকনোলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত ল্যাবরেটরিতে জিনোম গবেষণার উপযুক্ত জনশক্তি উন্নয়ন ও ডাটাবেইজ ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এই ল্যাবরেটরিতে পাট ছাড়াও অন্যান্য ফসলের জিনোমভিত্তিক গবেষণা কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে এবং এর সুফল কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হইলে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। 
পাট, কেনাফ ও মেস্তার প্রজনন বীজ এবং মানঘোষিত বীজ (ঞখঝ) উৎপাদন ও বিতরণ : বিগত তেরো বছরে পাট, কেনাফ ও মেস্তার ২১,৮৫০ কেজি প্রজনন বীজ উৎপাদন এবং বিএডিসিসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে এবং গত ১৩ বছরে প্রায় ৮৫ টন মানঘোষিত বীজ (ঞখঝ) উৎপাদন করিয়া  কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম দেশের পাট বীজের ঘাটতি মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করেছে।
পাটের কৃষি প্রযুক্তি এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর : পাটের বহুমুখী ব্যবহার সংক্রান্ত প্রযুক্তি এবং পাটের কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সাথে ৯টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যা বাণিজ্যিকভাবে পাটপণ্য উৎপাদনে এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করিয়া পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে।
কৃষককে সহায়তা প্রদানকারী অন্যান্য কার্যক্রম

বিগত ১৩ বছরে সারা দেশে ৬২৬টি জুট ব্লক প্রদর্শনীর মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবিত জাতসমূহের মাঠ পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা এবং  কৃষক পর্যায়ে পরিচিতি এবং সম্প্রসারণের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। বিজেআরআই কর্তৃক উদ্ভাবিত পাট ও সমজাতীয় আঁশ ফসলের নতুন জাতসমূহকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত বিজেআরআই এর আঞ্চলিক ও উপকেন্দ্রের মাধ্যমে বিগত ১৩ বছরে ২৬৩৩৩টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষ্যে বিজেআরআই-এর বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাট চাষিদের মাঝে ১৯৯০ কেজি বীজ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। 

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পাটের কৃষি গবেষণায় : পরিবর্তিত জলবায়ু ও কৃষি ব্যবস্থার আলোকে গবেষণা পরিচালনা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন; প্রচলিত ও জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্পজীবন কালে সম্পন্ন, প্রতিকূল (বায়োটিক ও এ্যবায়োটিক) পরিবেশ উপযোগী, অধিক ফলন ও মানসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন; পাট, কেনাফ ও মেস্তা জাতীয় ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থাপনার গবেষণা, বীজ সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ; জিনব্যাংকে সংরক্ষিত জার্মপ্লাজমসমূহের অংগসংস্থানিক এবং মলিকুলার বৈশিষ্ট্যায়ন, ডকুমেন্টেশন ও ব্যবস্থাপনা। দেশের চাহিদামাফিক প্রজনন বীজ উৎপাদন এবং দেশের  পাট বীজ ঘাটতি মোকাবিলায় সীমিতপর্যায়ে পাট বীজ উৎপাদন ও কৃষকদের মাঝে বিতরন। দেশের সমগ্র পাট চাষকৃত এলাকায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন, নুতন কেন্দ্র স্থাপন ও অপ্রচলিত এলাকায় পাট চাষ সম্প্রসারণ করা। 

পাটের কারিগরি গবেষণার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : বর্তমান চাহিদার প্রেক্ষিতে নব নব বহুমুখী পাট জাতীয় পণ্য উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা প্রদান; প্রচলিত পাট পণ্যের মান উন্নয়ন এবং পাট পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সহজীকরণের জন্য জুট মিলসমূহের যন্ত্রপাতির মান উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন; পাটের সূক্ষ¥ বা চিকন সুতা উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং প্রচলিত বহুমুখী পাট জাত পণ্যের মান উন্নয়নপূর্বক উৎপাদন খরচ হ্রাস। পাট আঁশ, পাট সুতা এবং পাটের কাপড়ের রঙ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা। জুটস্পিনিং পদ্ধতিতে অর্থাৎ শুধু জুট প্রসেসিং মেশিন ব্যবহার করে পাট ও উল (ভেড়ার পশম) মিশ্রিত সুতা তৈরি করে ব্যাপকভাবে শীতবস্ত্র (কম্বল) ও অন্যান্য পাটপণ্য উৎপাদন করা। হালকা এবং স্বল্পমূল্যের জুট কম্পোজিট উদ্ভাবন এবং বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল ও আসবাবপত্রের কাঁচামাল হিসাবে এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রযুক্তি উদ্ভাবন। প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে পাট ও পাট বস্ত্র রঞ্জিত করে মূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করা। 
জেটিপিডিসি উইংয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : পাটের সাথে তুলা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আঁশের সংমিশ্রণে টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনের উপযোগী সুতা উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্বারা তৈরি প্রোডাক্টের বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা প্রদান; আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠাকরণ; যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন এবং উন্নতকরণ করা।

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। ফলে কৃষক আবার পাট চাষে উৎসাহিত হচ্ছে এবং আবাদি জমির পরিমাণ ও ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাট আগামীতে ব্যবহারিক ও পরিবেশ রক্ষায় বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে ডায়মন্ড তন্তু হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হবে বলে বিজেআরআই বিশ্বাস করে। 

লেখক : ১মহাপরিচালক, বিজেআরআই, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগ বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৪০৫৫৯১৫৫, ই-মেইল :morshedbjri@gmail.com 

বিস্তারিত
উন্নত মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সফলতা ও সম্ভাবনা

 উন্নত মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সফলতা ও সম্ভাবনা
ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের অন্যতম সেবাদানকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সূচিত পথ ধরে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা-এর যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, সুষম পুষ্টি, বেকার সমস্যার সমাধান ও আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কৃষি জমির উর্বরতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিকশিত স্মৃতিশক্তি ও উন্নত মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং দুধ উৎপাদনে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিগত ২০২১ সালে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর- জলবায়ু পরিবর্তন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রাণিসম্পদের টেকসই, বেকার জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থান, আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বলয় সৃজন এবং সর্বোপরি, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিম্নবর্ণিত স্লোগান অনুযায়ী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
“মুজিববর্ষের অঙ্গীকার
নিরাপদ প্রাণিজ পুষ্টি হবে সবার”
রূপকল্প 
সকলের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন প্রাণিজ আমিষ সরবরাহকরণ।
অভিলক্ষ্য 
প্রাণিসম্পদের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
গবাদিপশু-পাখির উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি; গবাদিপশু-পাখির রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ; মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি; নিরাপদ প্রাণিজাত পণ্যের (দুধ, মাংস ও ডিম) উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা; গবাদিপশু-পাখির জেনেটিক রিসোর্স সংরক্ষণ ও উন্নয়ন।
প্রধান কার‌্যাবলী
প্রাণিজ আমিষ তথা দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ; গবাদিপশু-পাখির চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ; উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গবাদিপশু-পাখির জাত উন্নয়ন এবং    কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ; গবাদিপশু-পাখির পুষ্টি ও পশুখাদ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন; প্রাণিসম্পদ সেক্টরে দক্ষ জনবল সৃষ্টি; প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ; প্রাণিজাত খাদ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও মূল্য সংযোজনে উদ্যোক্তা তৈরি; এঅচ/এখচ প্রচলনের মাধ্যমে খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সাধন; প্রাণিসম্পদ সম্পর্কিত গবেষণার চাহিদা নিরূপণ ও উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্প্রসারণ; সরকার গৃহীত দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা ও সেক্টরাল কর্ম-কৌশলের আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন; প্রাণিসম্পদ সেক্টরে আইন, বিধি, নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রণয়ন, হালনাগাদকরণ এবং বাস্তবায়ন।
মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে বিনামূল্যে প্রাণি চিকিৎসাসেবা জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছানো 
মুজিববর্ষে প্রাণি চিকিৎসাসেবা জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের সকল উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের তত্ত্বাাবধায়নে প্রতিসপ্তাহে ১টি করে ইউনিয়নে ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন কার্যক্রম কে ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উক্ত কর্মসূচীর আওতায় এ পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৭,০৯৪টি ফ্রি ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
খামারিদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ মাংস উৎপাদনের নিমিত্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নিরাপদ প্রাণিজ পুষ্টি ভোক্তার দোড়গোড়ায় পৌঁছাতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স¦ার্থে খামারিদের দক্ষতা উন্নয়ন যেমন জরুরি তেমনি প্রাণিজাত পন্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট জনবলের দক্ষতা উন্নয়ন ও জরুরি। এ প্রেক্ষিতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রাণিজ পণ্যের পুষ্টি ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণে সারা দেশে মোট ৩.৫১ লাখ পোল্ট্রি ও ডেইরি খামারিদের এবং ৩০,২২১ জন মাংস প্রক্রিয়াজাতকারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। গুনগত ও মানসম্মত প্রাণিজ আমিষের উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
জনসচেতনতা তৈরিতে উন্নত জাতের বাছুরের প্রজেনী ও কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারণ, ভ্রুণ স্থানান্তর সংক্রান্ত তথ্য সম্প্রচার 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে প্রাণিসম্পদ প্রযুক্তি ও সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারে দুধের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে অধিক উৎপাদন দক্ষতা ও প্রজনন ক্ষমতা সম্পন্ন গরুর জাত উন্নয়ন এবং উন্নত জাতের বাছুরের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। এ প্রেক্ষিতে মুজিবর্ষে সারাদেশে ৪৪ লাখ কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ১৬ লাখ ৩৭ হাজার সংকর জাতের বাছুর উৎপাদিত হয়েছে যা বিগত সালের তুলনায় ১ লক্ষ ৫৭ হাজার বেশি। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে, কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারণ ও ভ্রুণ স্থানান্তর প্রযুক্তি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৪টি ভিডিও ক্লিপ ও টিভি ফিলার প্রস্তুত করা হয়েছে। তা বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে।
ছাগলের পিপিআর মুক্তকরণ এবং গবাদিপশুর এফএমডি নিয়ন্ত্রণ  
বাংলাদেশসহ বিশ^ব্যপী প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা হলো বিভিন্ন প্রাণিরোগের সংক্রমন। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধে টিকা বিতরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ছাগলের প্রানঘাতি রোগ (পিপিআর) ও গবাদিপশুর মারাত্মক সংক্রামক রোগ (এফএমডি) নিয়ন্ত্রনে ভলেন্টিয়ার-ভ্যাক্সিনেটর প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ৭০ লাখ ছাগলকে পিপিআর এবং ১ কোটি ৫ লাখ গবাদিপশুকে ক্ষুরারোগের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে, একদিকে যেমন দেশের প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হয়েছে অপরদিকে প্রাণিরোগ জনিত আর্থিক ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে।
স্কুল মিল্ক ফিডিং এবং স্কুল এগ ফিডিং কর্মসূচি 
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, “বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিই নয়, বরং সারা বিশ্বের নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির কন্ঠস্বর। তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বছরব্যাপী নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে এ মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থা। উক্ত কর্মসূচীর মধ্যে অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থদের মাছ বিতরণ ও দুধ খাওয়ানো অন্যতম”। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়নে ঢাকায় ও স্থানীয়ভাবে প্রতিজেলায়, বিশ^ দুধ ও ডিম দিবসে স্কুল, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে র‌্যালি, সমাবেশের পাশাপাশি “স্কুল মিল্ক ফিডিং ও স্কুল এগ ফিডিং” ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
গবাদি পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন প্রতি উপজেলায় একটি স্মার্ট লাইভস্টক ভিলেজ স্থাপন  
প্রাণিসম্পদ খাতে লাগসই প্রযুক্তি ও সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারে প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির নিমিত্তে সারাদেশে প্রতি উপজেলার একটি গ্রামে স্মার্ট লাইভস্টক ভিলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শতভাগ টিকা, কৃমিনাশক প্রদান, বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনসহ সহজলভ্য প্রাণিসম্পদ প্রযুক্তিসমূহ হাতে কলমে খামারিদের শেখানো হয়েছে। সারা দেশে মোট ৪৮৯টি স্মার্ট লাইভস্টক ভিলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত লাইভস্টক ভিলেজে প্রাণিসম্পদ প্রযুক্তিসমূহ মডেল আকারে প্রদর্শন করা হয়েছে।
এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় ফারমার্স ফিল্ড স্কুল কার্যক্রম জোরদারকরণ 
প্রাণিসম্পদজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাণিজাত পণ্যের মার্কেট লিংকেজ ও ভ্যালু চেইন সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ প্রাণীজ খাদ্য উৎপাদন এবং বেসরকারি উদ্দ্যেক্তাগণের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন ও বাংলাদেশকে দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। দেশের ডেইরি শিল্পের উন্নয়নে বিশ^ ব্যাংকের অর্থায়নে (৪২৮০ কোটি টাকা) “প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প” এর মাধ্যমে উক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ে ফার্মারস ফিল্ড স্কুল বাস্তবায়নে ঋঅঙ এর সাথে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে এবং ফিল্ড স্কুল প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। 
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক বিনামূল্যে পশু-পাখির প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার প্রদানের লক্ষ্যে মোবাইল এসএমএস সার্ভিস চালুকরন
ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিনামূল্যে পশু-পাখির প্রাথমিক চিকিৎসা সেবাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম খামারিদের মাঝে পৌঁছানোর জন্য মোবাইল এসএমএস সার্ভিস চালু করেছে। দেশের আপামর জনগন প্রাণিসম্পদের নানাবিধ কার্যক্রম সর্ম্পকে ১৬৩৫৮ নাম্বারে এসএমএস করে বিনামূল্যে সেবা প্রাপ্ত হচ্ছেন। এছাড়া প্রাণিসম্পদের সেবাদান কার্যক্রমের অংশ হিসাবে গ্রাম ভিত্তিক গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির রোগপ্রতিরোধ এবং চিকিৎসা সেবায় প্রাণিসম্পদ সেবা ক্যাম্প ও পরিচালনা করা হচ্ছে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আগামী ২০৪১ সালে উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে প্রাণিসম্পদ সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই করোনা মহামারির মধ্যেও মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আপামর জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, চামড়া এবং চামড়াজাত দ্রব্যাদি উৎপাদন ও রপ্তানিতে এবং বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। 

লেখক : মহাপরিচালক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি খামার সড়ক, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ৯১০১৯৩২, ই-মেইল :dg@dls.gov.bd

বিস্তারিত
দেশের অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় মৎস্যখাত

দেশের অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় মৎস্যখাত 
খঃ মাহব্বুুল হক
বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণের স্বপ্নপূরণের ধারাবাহিকতায় তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং গতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়েছে। অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় মৎস্যখাতও একটি অংশীদার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রতিপালন এবং অভ্যন্তরীণ এবং সামুদ্রিক জলাশয়ের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার জন্য সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। 
মৎস্য অধিদপ্তরের রূপকল্প, অভিলক্ষ্য, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
রূপকল্প : মৎস্যজাত উৎস হতে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি।
অভিলক্ষ্য : মৎস্য ও চিংড়িসহ অন্যান্য জলজসম্পদের স্থায়িত্বশীল উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অভীষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে উন্মুক্ত জলাশয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ক্ষেত্র হতে প্রাপ্ত সুফলের মাধ্যমে দরিদ্র মৎস্যজীবী ও মৎস্যচাষি তথা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য : আধুনিক মৎস্যচাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ এবং টেকসই সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি; প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ; পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ; মানব সম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি; মৎস্য রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ; মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও মৎস্যজীবীদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন।
মৎস্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্জন : সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, রূপকল্প ২০২১ ‍ও ২০৪১, এসডিজি এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লিখিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর নানাবিধ কর্মসূচি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মৎস্যখাতে সরকার কর্তৃক গৃহীত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের সফল বাস্তবায়নের ফলে এখাতে নিম্নরূপ উল্লেখযোগ্য অর্জন সাধিত হয়েছে।
মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও অগ্রগতিশীল    নেতৃত্বে ২০১৬-১৭ সালে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (৪০.৫০ লাখ মে.টন)-এর বিপরীতে ৪১.৩৪ লাখ মে.টন মাছ উৎপাদিত হয়। ফলে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। বিগত ৫০ বছরে মাছের উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে পাঁচ গুণেরও বেশি। মৎস্য খাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬.১০%। দেশের জিডিপির ৩.৫০% এবং  কৃষিজ জিডিপির ২৬.৫০% মৎস্য উপখাতের অবদান। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ ১৯৫ লাখ বা ১২ শতাংশের অধিক লোক এখাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন হয়েছে ৪৬.২১ লাখ মে.টন; যা ২০০৮-০৯ সালের মোট উৎপাদনের (২৭.০১ লাখ মে.টন) চেয়ে ৭১.০৮% বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে অভ্যন্তরীণ মুক্তজলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ ৩য়; বিগত ১০ বছরের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে ২য় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম স্থানে রয়েছে। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১ম; তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৪র্থ এবং এশিয়ায় ৩য় স্থানে রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মৎস্য অধিদপ্তর বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার ১৪২৩-এ স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হয়েছে।
ইলিশ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে রোল মডেল : ‘বাংলাদেশ ইলিশ’ নামীয় জিআই সনদপ্রাপ্ত ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল। দেশের জিডিপিতে ইলিশের অবদান ১%-এর অধিক। একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫.৬৫ লাখ মে.টন ইলিশের উৎপাদন হয়েছে; যা ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদনের (২.৯৯ লাখ মে.টন) চেয়ে ৮৫.৯৫% বেশি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৎস্যবান্ধব সরকার প্রান্তিক জেলে সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে দেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তন্মধ্যে প্রকৃত জেলেদের শনাক্তকরণে আইডি কার্ড প্রদান, নিহত/আহত জেলেদের আর্থিক সহায়তার জন্য কোড সৃষ্টি, জেলেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন অন্যতম। চলমান কার্যক্রমের আওতায় ১৬.৮০ লাখ জন জেলের নিবন্ধন এবং ১৪.২০ লাখ জন জেলের পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন বিগত ১২ বছরে ৪,১১,৪০৭.৪৮ মে.টন এবং মা ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালীন বিগত ছয় বছরে ৫৬৫৪৭.৭০ মে.টন ভিজিএফ খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
ব্লু-ইকোনমি এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে বঙ্গোপসাগরে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিমি. এলাকায় মৎস্য আহরণে আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাতিয়া উপজেলাধীন নিঝুম দ্বীপ ও তৎসংলগ্ন ৩,১৮৮ বর্গ কিমি. এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন। ‘গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণে পাইলট’ শীর্ষক প্রকল্পটি মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা সুনীল অর্থনীতিতে নবদিগন্ত উন্মোচিত হবে। 
মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি এবং স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ মাছ সরবরাহ : নিরাপদ ও মানসম্পন্ন মৎস্য ও মৎস্যপণ্যের উৎপাদন এবং মাননিশ্চিত করা মৎস্য অধিদপ্তরের অন্যতম ম্যান্ডেট। এ লক্ষ্যে দেশে চিংড়ি উৎপাদনের সকল স্তরে উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলন (এঅচ), এসওপি ম্যানুয়াল, প্রটোকল/গাইডলাইন্স ও হ্যাসাপভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কার্যকর করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে আর্থিক মন্দাবস্থা থাকা সত্ত্বেও ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫০টিরও বেশি দেশে ৭৬,৫৯১.৬৯ মে.টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪০৮৮.৯৬ কোটি টাকা।
বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ‘হালদা নদীর  প্রাকৃতিক  মৎস্য প্রজননক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কোভিডকালীন চিংড়ি চাষি ও মৎস্য চাষিদেরকে প্রণোদনা প্রদান : ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রয়কেন্দ্র/গ্রোথ সেন্টারের মাধ্যমে ৩৭৩০২.৭১৪ মে.টন মাছ বিক্রয় (বাজারমূল্য ৮৩০.৩০ কোটি টাকা); অনলাইনে মাছ বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ৪০৪.৫৭৩ মে.টন মাছ বিক্রয় (বাজারমূল্য ৭.৫২ কোটি টাকা); ৪৭৫২ জন দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে ৬১৬৮ কেজি মাছ ত্রাণের সাথে বিতরণ করা হয়েছে। মৎস্য সেক্টরে কোভিড-১৯ এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এসসিএমএফ প্রকল্প থেকে ৭৭৮২৬ জন খামারিকে ৯৯.৭০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্রদান এবং সরকার ঘোষিত ৫০০০ কোটি টাকা প্রণোদনার মধ্যে মৎস্যখাতে ৬৪৩৮ জন মৎস্যচাষিকে ১৫৩.৭২ কোটি টাকা প্রণোদনা (৪% সুদসহ ঋণ) প্রদান করা হয়েছে।
মৎস্যখাতের উন্নয়নে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : নদীমার্তৃক বাংলাদেশ বিশাল জলসম্পদেসমৃদ্ধ এবং জলজ জীববৈচিত্র্যম-িত। দেশের জলজসম্পদ হলো অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়, যা নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর, কাপ্তাই লেক, প্লাবনভূমি, সুন্দরবন, উপকূলীয় মোহনা অন্তর্ভুক্ত এবং বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে আছে- পুকুর, দীঘি, বাঁওড়, চিংড়ি ঘেরের পাশাপাশি রয়েছে দক্ষিণে বিশাল সামুদ্রিক এলাকা- বঙ্গোপসাগর। সম্ভাবনাময় এ সেক্টরের সার্বিক উন্নয়নে নিম্নরূপ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। 
অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় ব্যবস্থাপনা
সার্বিক পরিকল্পনা : ১) বিল ও অনুরূপ জলাশয়ের মাঝে কানেকটিভিটি উন্নয়ন, মাছের আবাসস্থল, নার্সারিক্ষেত্র, প্রজননক্ষেত্র, বিচরণক্ষেত্র, মাছের মাইগ্রেটরি রুট সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ। ২) নির্দিষ্ট এলাকায় মাছের প্রজনন নির্বিঘœ করতে প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা। ৩) বাস্তুসংবেদনশীল এলাকা জুড়ে মৎস্য ও জলজ অভয়াশ্রম স্থাপন; দেশি জাতের মাছের বংশবৃদ্ধি ও সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণ। ৪) মার্কেট চেইন ডেভেলপমেন্টের জন্য বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তিন ক্যাটাগরির মডেল ফিস মার্কেট স্থাপন। মডেল ফিস মার্কেট স্থাপন ও মার্কেট চেইনের মাছের সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য সার্টিফাইড ফিস সাপ্লাইয়ার তৈরি। ৫) উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বাগদা চিংড়ি, হরিণা চিংড়ি, চাকা চিংড়ি, কুচিয়া ও কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ। ৬) সুন্দরবন এলাকায়            প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় সুন্দরবন সার্ভিলেন্স ও ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ৭) সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবস্থাপনায় জয়েন্ট ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট সেন্টার কার্যকরণ। ৮) দেশীয় বাজারে ভ্যালু অ্যাডেড ফিস প্রোডাক্ট তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাইলট প্রকল্প গ্রহণসহ সুপারসপ ও বিভিন্ন চেইনসপে ভ্যালু অ্যাডেড ফিস প্রোডাক্ট বিক্রয়ের জন্য উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ। ৯) মাছ আহরণ নিষিদ্ধকালীন মৎস্যজীবীদের বিকল্প জীবিকায়নের ব্যবস্থাকরণ। ১০) কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জেলেদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ।
হাওর এলাকায় পরিকল্পনা : ১) হাওর এলাকার দেশীয় মৎস্য সংরক্ষণের জন্য ফিস কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। ২) হাওর এলাকায় প্রাক-যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয়পূর্বক উপযুক্ত স্থানে খনন পরিকল্পনা গ্রহণের সহায়তা প্রদান। ভূমি পুনরুদ্ধার, ফিস পাস, ফিস ফ্রেন্ডলি অবকাঠামো তৈরি, মৎস্য অভয়াশ্রম তৈরি এবং মাছ সংরক্ষণের আওতায় আনয়নে উদ্যোগ গ্রহণ। ৩) হাওর এলাকায় দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে ইন-সিটো কনজারভেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ। হাওর বেসিনে উপযুক্ত সংখ্যক হ্যাচারি স্থাপন এবং সার্টিফাইড মাছের পোনা অবমুক্তকরণ। ৪) ইকো ট্যুরিজমের অংশ হিসেবে হাওর ও সোয়াম্প এলাকায় ফিস ট্যুরিজমের প্রচলন। ৫) হাওর এলাকায় তিন মাস (বৈশাখ হতে আষাঢ়) পর্যন্ত মাছধরা নিষিদ্ধকরণ এবং মাছধরা হতে বিরত জেলেদের ভিজিএফ সহায়তা প্রদান। ৬) হাওর অঞ্চলে মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে সমাজভিত্তিক সহব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ।
নদী এলাকায় পরিকল্পনা : ১) নদী এলাকায় দেশীয় মৎস্য সংরক্ষণে ফিস কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। ২) নদী এলাকায় প্রাক-যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয়পূর্বক উপযুক্ত স্থানে খনন পরিকল্পনা গ্রহণ, ভূমি পুনরুদ্ধার, মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন ও উন্মুক্ত জলাশয়ে সার্বিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ গ্রহণ। ৩) প্রজাতিভিত্তিক মাছগুলোর প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণ।
সামুদ্রিক এলাকায় পরিকল্পনা : ১) সামুদ্রিক মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থাপনায় যুগোপযোগী কার্যক্রম গ্রহণ এবং মাছের নার্সারি গ্রাউন্ডের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণ। ২) ভেটকি, মুলেট ও অন্যান্য উপকূলীয় চাষযোগ্য প্রজাতির চাষ প্রবর্তনে হ্যাচারি স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ। ৩) সামুদ্রিক শৈবাল, ওয়েস্টার ইত্যাদি চাষ সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণের ব্যবস্থা গ্রহণ। ৪) গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় মাছের ব্যবস্থাপনা ও আহরণ জোরদারকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ। ৫) সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদকে গ্লোবাল অ্যাসেট হিসেবে পরিণতকরণে আন্তর্জাতিক মহলে গবেষণা কার্যক্রম ও যোগাযোগ বৃদ্ধিকরণ। ৬) ওটট ফিসিং রোধকরণে মেরিন সার্ভিলেন্স সেন্টার স্থাপন ও মনিটরিং বৃদ্ধিকরণ। ৭) সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের মজুদ নিরূপণ করে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন না করে অপটিমাম ফিসিং নিশ্চিতকরণ। ৮) বঙ্গোপসাগরে পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ।
অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্যচাষ : ১) মৎস্য খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ এবং মৎস্যস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ২) চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আওতায় মৎস্যচাষে আইওটি ও এআই প্রবর্তনসহ আইপিআরএস, বটম ক্লিন সিস্টেম চালুকরণ। ৩) মৎস্যচাষে আইসিটি, সিআইএস, অ্যাপস উন্নয়ন ও ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান। ৪) উন্নত চাষ প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করার জন্য চাষি/উদ্যোক্তাদের জন্য উদ্দীপনামূলক কার্যক্রম গ্রহণ। ৫) বেকার যুবক ও যুবমহিলাদের জন্য অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মৎস্যচাষে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। ৬) দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদার নিরিখে মৎস্য ও মৎস্যপণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদারকরণ। ৭) মাছ/চিংড়ি উৎপাদনের সকল স্তরে উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলন (এঅচ) ও হ্যাসাপভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি কার্যকরকরণ। ৮) মাছ আহরণ পরবর্তী অপচয় কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ।
রপকল্প ২০৪১-এ সুখীসমৃদ্ধ উন্নত সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এবং সুস্থ-সবল ও মেধাসম্পন্ন জাতি গঠনে সকলের ঐকান্তিক অংশগ্রহণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও দিকনির্দেশনায় মৎস্য অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে যাবে- এটা মৎস্যষ্ট সবার দৃঢ়অঙ্গীকার।

লেখক : মহাপরিচালক, মৎস্য অধিদপ্তর, ঢাকা। ফোন : ২২৩৩৮২৮৬১, ই- মেইল : bfdc-64@yahoo.com

বিস্তারিত
কৃষি তথ্য বিস্তারে কৃষি তথ্য সার্ভিস

কৃষি তথ্য বিস্তারে কৃষি তথ্য সার্ভিস
কৃষিবিদ মোঃ শাহজাহান আলী বিশ্বাস
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক সম্মেলন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আঞ্চলিক সম্মেলন এমন একটি আনুষ্ঠানিক ফোরাম যেখানে সদস্য দেশসমূহের সম্মানিত কৃষিমন্ত্রী এবং অন্যান্য সিনিয়র কর্মকর্তাগণ খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ ও সমাধান নিয়ে বৈঠকে মিলিত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে এবং স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বছরে এই আয়োজন দেশের জন্য বিরাট গর্বের ও সম্মানের। ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ৩৬তম অধিবেশনে ৪৬টি দেশের কোভিড-১৯ এর প্রভাব, কৃষির অবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে মতবিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ। উন্নয়নে নতুন সোপান রচিত হয়েছে এ দেশের কৃষি খাতেও। কৃষিতে সমৃদ্ধ আজকের এ বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। হাজার বছরের অবহেলিত ও শোষিত এ বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ও সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্বাধীনতার মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করেছিলেন কৃষির উন্নতিই হচ্ছে কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি। কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি মানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য হবে আরও প্রজ¦লিত। বর্তমান           কৃষিতে দেশের যে অনন্য সাফল্য তা বঙ্গবন্ধুরই চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নিরলস প্রচেষ্টা করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগোপযোগী নির্দেশনায় কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষি মন্ত্রণালয় নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় বৈশ্বিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও করোনা মহামারি মোকাবিলা করে গত এক দশকে কৃষিক্ষেত্রে ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছে। এ সাফল্যের অংশীজনের অংশীদার হিসেবে কৃষি তথ্য সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।  

কৃষি তথ্য ও প্রযুক্তি বিস্তারে নিয়োজিত কৃষি তথ্য সার্ভিস গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি স্বতন্ত্র সংস্থা। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত আধুনিক লাগসই কৃষি তথ্য ও প্রযুক্তি সহজ, সরল ও সাবলীলভাবে অভীষ্ট দলের বোধগম্য আকারে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাহায্যে বিভিন্ন আঙ্গিক ও কৌশলে উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্বুদ্ধ করাই হচ্ছে কৃষি তথ্য সার্ভিসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ১৯৬১ সালে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে এক-তৃতীয়াংশ জনবল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চলে যায়। ২০০৮ সালের পূর্বে সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, পাবনা, ময়মনসিংহ ৬টি আঞ্চলিক অফিস এবং ঠাকুরগাঁও ও কক্সবাজার  লিয়াজোঁ অফিস ছিল। বর্তমানে বরিশাল, রংপুর, ঢাকা, কুমিল্লা ও রাঙ্গামাটিতে পাঁচটি আঞ্চলিক অফিসসহ ১১টি আঞ্চলিক অফিস ও ২টি লিয়াজোঁ অফিস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কৃষি তথ্য সার্ভিসের মিডিয়াভিত্তিক কার্যক্রম সুচারুভাবে চলছে। 
কৃষি তথ্য সার্ভিসের বিশেষত্ব 

প্রচারই প্রসার এ সত্যকে ধারণ করে কৃষি তথ্য সার্ভিস প্রিন্ট, বেতার, টেলিভিশন, প্রোডাকশন ও প্রজেকশন, আইসিটি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি বিস্তারের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার কাজ করে যাচ্ছে। এসব কার্যক্রম কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে নানাভাবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রচার মাধ্যমগুলোর কার্যক্রমের বিবরণ-

প্রিন্ট মাধ্যম : বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ফার্ম ম্যাগাজিন মাসিক কৃষিকথা প্রকাশ এবং নামমাত্র মূল্যে বিতরণ করা হয়। মাসিক কৃষিকথা ১৯৪১ সাল থেকে কৃষক ও কৃষি সমৃদ্ধিতে আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, আগামীর কৃষি ভাবনা, উচ্চমূল্যের ফসল চাষাবাদ, সফল কৃষকের গল্প, নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় করণীয় প্রভৃতি তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ এবং নিয়মিত বিভাগ তথ্য ও প্রযুক্তি, প্রশ্নোত্তর এবং আগামী মাসের কৃষি দিয়ে সাজানো হয় কৃষিকথা।  বর্তমান কৃষিকথার গ্রাহক সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি। আর এর পাঠকের সংখ্যা ১৫ লাখেরও বেশি। জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুন ২০২১ পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী মাসিক ‘কৃষিকথা’ পত্রিকার প্রায় ৬৬.২৭ লাখ কপি মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়েছে। মাসিক বিভাগীয় নিউজ বুলেটিন চার রঙে প্রকাশ ও বিতরণ করা হয়। কৃষি উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, সফলতা, বিভিন্ন ইভেন্টসের হালনাগাদ খবর নিয়ে সম্প্রসারণ বার্তা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুন ২০২১ পর্যন্ত মাসিক সম্প্রসারণ বার্তার ১.৫৯ লাখ কপি প্রকাশ ও বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও কৃষক ও কৃষিকর্মী এবং আগ্রহীদের চলমান চাহিদামাফিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর বই, বুকলেট, পোস্টার, লিফলেট, ফোল্ডার, স্টিকার, ম্যাগাজিন, ব্যানার, ফেস্টুন মুদ্রণসহ বিনামূল্যে বিতরণের মাধ্যমে প্রযুক্তি বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আলোচ্য সময়ে কৃষি প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন লিফলেট, পোস্টার, বুকলেট ইত্যাদির প্রায় ৫৬.০৩ লাখ কপি মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়েছে।

ইলেকট্রনিক মাধ্যম : কৃষি তথ্য সার্ভিসের সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং সহায়তায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান সপ্তাহে   ৫ দিন সম্প্রচারিত হচ্ছে। এ ছাড়া ২০১৪ সাল থেকে বিটিভিতে প্রতিদিনের কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘বাংলার কৃষি’ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলার কৃষি প্রতিদিন সকাল ৮টার বাংলা সংবাদের পূর্বে ৭.৪০ মিনিটে এবং ‘মাটি ও মানুষ’ রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬.২০ মিনিটে প্রচারিত হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলার কৃষি অনুষ্ঠানে প্রযুক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও সফলতা ফেসবুক এ লাইভ সম্প্রচারিত হচ্ছে।  বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের ৩৩৩৪টি পর্ব এবং ‘বাংলার কৃষি’ অনুষ্ঠানের প্রায় ২৭৮৫টি পর্ব সম্প্রচারের যাবতীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ বেতারের জাতীয় ও আঞ্চলিক কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান নির্মাণে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রতিদিন জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বেতার কেন্দ্র থেকে দৈনিক প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হচ্ছে। ‘আমার রেডিও আমার কথা বলে’ এ স্লোগানকে ধারণ করে বরগুনা জেলার আমতলীতে স্থাপিত কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে কৃষি রেডিও এফএম ৯৮.৮ নামে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার ১২টি উপজেলায় গ্রামীণ কল্যাণ ও চাহিদাভিত্তিক কৃষিসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান দৈনিক ৮ ঘণ্টা সম্প্রচার করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন ভিডিও, ডকুমেন্টারি, ফিল্ম, ফিলার, নাটক, টকশো নির্মাণ এবং গণমাধ্যমে সম্প্রচার করা হচ্ছে। এ ভিডিওগুলো গ্রামীণ পর্যায়ে মোবাইল সিনেমা ভ্যানের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। আলোচ্য সময়ে কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর ভিডিও ফিল্ম ও ফিলার ২৩৫টি নির্মাণ ও সম্প্রচার করা হয়েছে। এ সময়ে ১০৭৭০টি ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে আধুনিক কৃষি তথ্য প্রযুক্তি সম্প্রচারের কাজ চলমান রয়েছে। 

আইসিটি ও ইনোভেশন মাধ্যম : কৃষি তথ্য সার্ভিসই প্রথম গ্রামপর্যায়ে ৪৯৯টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে আইসিটি ব্যবহার করে গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে কৃষি তথ্য বিস্তারের কার্যক্রম শুরু করেছে। এসব কেন্দ্রে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট মডেম, মাল্টিমিডিয়া সামগ্রী ইত্যাদি প্রদান করে ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ  দেয়া হয়েছে। এ মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫-২০ জন কৃষিবিষয়ক তথ্য সেবা পাচ্ছেন। সেসঙ্গে সরাসরি কৃষি বিশেষজ্ঞদের (কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ) সঙ্গে কথা বলে তাৎক্ষণিকভাবে কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কৃষি কল সেন্টার-১৬১২৩। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যেকোনো মোবাইল অপারেটর মাধ্যমে মাত্র ২৫ পয়সা/মিনিট হারে কল করতে পারেন ১৬১২৩ নম্বরে। প্রতিদিন প্রায় ২০০-২২০টি করে কলের সমাধান এখান থেকে প্রদান করা হচ্ছে । বিগত ২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন ফসল ও প্রযুক্তিনির্ভর ১০৯টি মাল্টিমিডিয়া ই-বুক তৈরি করা হয়েছে। যা সিডি আকারে সব ক’টি এআইসিসিতে বিতরণ করা হয়েছে। এআইএসটিউব কৃষি তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক তথ্য ভান্ডারের একটি ডিজিটাল ওয়েবপোর্টাল। এই আর্কাইভে কৃষি বিষয়ক আধুনিক তথ্য চিত্র আকারে উপস্থাপিত রয়েছে। এখান থেকে উপকারভোগীরা সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নিতে পারবে। কৃষির বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংবলিত একটি সুবিশাল ওয়েবপোর্টাল িি.িধরং.মড়া.নফ নির্মাণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও কৃষিকথা ও কৃষি তথ্য সার্ভিস নামে দুটি মোবাইল অ্যাপস নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দশটি কৃষি অঞ্চলে দশটি আধুনিক আইসিটি ল্যাব ও সহজেই তথ্য গ্রহণের জন্য ১১টি কিয়স্ক স্থাপিত হয়েছে। মুজিববর্ষে কৃষি তথ্য সার্ভিসের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে রয়েছে ১৭ মার্চ ২০২০ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন চ্যানেলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক নির্দেশনায় কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক কৃষিভিত্তিক একটি নতুন অনুষ্ঠান ‘মাটির সাথে মানুষের সাথে’ উদ্বোধন করেন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী। অনুষ্ঠানটিতে কৃষিভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তি, সফলতা, কৃষিতে সরকারের উন্নয়ন পদক্ষেপ ইত্যাদি সম্প্রচারিত হয়।  
তথ্য ও প্রযুক্তি বিস্তারে সম্ভাবনা ও করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি প্রযুক্তি। প্রয়োজনের তাগিদে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে দিয়ে বৃহৎ সংখ্যক কৃষককে আধুনিক কৃষিতে সম্পৃক্ত করে কৃষির উন্নয়নে কৃষি তথ্য সার্ভিস জন্মলগ্ন থেকেই কাজ করে আসছে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সঠিক দিকনির্দেশনা, সময়োপযোগী নীতিমালা গ্রহণ করার ফলে কৃষি তথ্য সার্ভিস স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে (সারণি দ্রষ্টব্য)। তথ্য প্রযুক্তির যুগে দেশের সব ক্ষেত্রেই তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্তার ঘটেছে। কৃষির সমসাময়িক বিষয়ের উপর কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পর্যায়ে মোবাইল এসএমএস এর মাধ্যমে তথ্য প্রেরণের কার্যক্রম সীমিত পর্যায়ে চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অ্যাগ্র ডিরেক্টরি এন্ড ইনফরমেশন অ্যাপসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ সহজীকরণের উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের “Integrated Digital Service Delivery Platform for Ministry of Agriculture" বাস্তবায়নে দপ্তর/সংস্থাসমূহের সরকারি ই-সার্ভিস ডেভেলপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যা কৃষি ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

কৃষি তথ্য সার্ভিস কৃষির অগ্রযাত্রার গৌরবোজ্জ্বল অংশীদার। সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে কৃষি তথ্য সার্ভিস অর্জন করেছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক (স্বর্ণপদক), ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০২০- এ আইসিটি ব্যবহারে সেরা প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী পদকসহ নানা স্বীকৃতি। এ ছাড়াও ডিজিটাল কৃষি তথ্য বিস্তারে উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ কৃষি তথ্য সার্ভিস ভারতের ম্যান্থন পুরস্কারে ভূষিত হয়। বর্তমান সরকারের কৃষি উন্নয়নের অব্যাহত ধারায় এআইএস কৃষি তথ্য বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সেবার মান সময় উপযোগী, আধুনিক, সহজলভ্য ও গ্রহণ উপযোগী  করা হচ্ছে। বহুবিধ সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও কৃষির উন্নয়নের জন্য কৃষি তথ্য সার্ভিস নিরলস কাজ করছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বর্তমান সরকারের ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবো।

লেখক : পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন : ৫৫০২৮২৬০, ই-মেইল : dirais@ais.gov.bd

বিস্তারিত
হর্টেক্স ফাউন্ডেশন : অর্জন ও উদ্যোগ

হর্টেক্স ফাউন্ডেশন : অর্জন ও উদ্যোগ
মো. মনজুরুল হান্নান
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে এ ভূখন্ডের মানুষ খাদ্যের অভাবে ভুগতেন। দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য চাহিদা মেটাতে সক্ষম হতো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য অধিক ফসল উৎপাদনের ডাক দেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শাকসবজি, ফলমূলের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ছিল কম। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে সবজি ও ফলমূলের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে এবং বিভিন্ন দেশে তা রপ্তানি হতে শুরু করে। উৎপাদক এবং রপ্তানিকারকদের মধ্যে দুর্বল সংযোগ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষমতা না থাকার কারণে শাকসবজি রপ্তানি বাধার সম্মুখীন হচ্ছিল। এসব বিষয় সমাধানের জন্য একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার তীব্রতা সংশ্লিষ্ট মহল অনুধাবন করতে থাকে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৩ সালে হর্টিকালচার এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন সংক্ষেপে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি অলাভজনক এবং কোম্পানি আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।
লক্ষ্য
প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত পরামর্শমূলক সেবা দানের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি ও কৃষকের আয়বৃদ্ধিতে রপ্তানির জন্য উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যসহ কৃষি ব্যবসা উন্নততর ও বহুমুখী করা।
উদ্দেশ্য
গুণগত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তাজা, প্রক্রিয়াজাতকৃত ও হিমায়িত শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণে কৃষক, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, বাজার তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সেবা প্রদান।
মূল কার্যক্রম
তাজা শাকসবজি, ফলমূল,আলু, হিমায়িত এবং প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষক রপ্তানিকারকসহ অন্যান্য অংশীজনদের দক্ষতা উন্নয়ন; বাজার জ্ঞান/বুদ্ধিমত্তা এবং ব্যবসা পরিকল্পনা প্রণয়নে রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা; রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষক, রপ্তানিকারকসহ অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি; রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন সেবা প্রদান; অংশীজনদের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি বাণিজ্যকে টেকসই করতে সহযোগিতা করা। 
চুক্তিবদ্ধ চাষাবাদের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন করা এবং খামার তথ্যাদি সংরক্ষণে কৃষক, রপ্তানিকারক ও কৃষি ব্যবসায়ীকে সহায়তা; হটেক্স ফসলের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গুণগত মানসম্পন্ন সবজি ও ফল দেশে-বিদেশে বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি করে; সংগ্রহোত্তর অপচয় রোধ করতে  কৃষক ও সরবরাহ শৃঙ্খলের অংশীজনদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা; নতুন ধারণা এবং সময়োপযোগী রপ্তানিমুখী কৃষি গবেষণা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা এবং কৃষি বাজার বিশ্লেষণ, বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ ও সমীক্ষা করে কৃষি বাজার উন্নয়নে সহায়তা করা। কর্মশালা, সেমিনারের মাধ্যমে বিশেষায়িত জ্ঞান আহরণ ও প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে উদ্বুদ্ধ করা।

অর্জন এবং উদ্যোগ
হর্টেক্স ফাউন্ডেশন শুরু থেকেই সবজি ও ফল রপ্তানিকে প্রাধান্য দিয়ে বেশ কিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এসব উদ্যোগ এবং অর্জনের সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ-
১৯৯৬ সালে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের সহায়তায় চান্দিনা এবং কালিগঞ্জ এলাকার বেশ কিছু কৃষক এবং ব্র্যাকের সাথে চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করানো হয়। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন আইডিএ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্র্যাককে সহযোগিতা করে ব্র্যাককে ১০,০০০ মেট্রিক টন সবজি ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করতে ভূমিকা রাখে। সবজির ভ্যালু চেইন উন্নয়নে উৎপাদন উপকরণ সরবরাহসহ অংশীজনদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। সে সাথে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র (গ্রামীণ প্যাক হাউজ) স্থাপন করে সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের সংগ্রহোত্তর অপচয় হ্রাস করার সাথে সাথে সবজি ও ফলের গুণগতমান ও নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। সবজি রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য হর্টেক্স ফাউন্ডেশন ৫ লক্ষ কার্টুন/প্যাকেট বিনামূল্যে এবং স্বল্পমূল্যে কৃষিপণ্য রপ্তানিকারকদের নিকট সরবরাহ করে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা করে আসছে। শাকসবজি, ফলমূল প্যাক হাউজ থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন সেবাপ্রদান অব্যাহত রেখেছে।
সবজি রপ্তানি উন্নয়নে হর্টেক্সফাউন্ডেশন ১৯৯৬ সাল হতে সরাসরি কৃষিপণ্য রপ্তানি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের সাথে তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। জ্ঞান ও দক্ষতা উনয়নের জন্য এ পর্যন্ত ৩১১৬৫ জন কৃষককে রপ্তানির জন্য ফসল উৎপাদন, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্পের নির্দিষ্ট বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ২০৫ জন কৃষি ক্যাডার অফিসারকে টিওটি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষি ক্যাডার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫৪০ জন কর্মকর্তাকে ভ্যালু চেইন উন্নয়ন ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ডিএই এর ৬৩০ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ ৩৭২০ জন প্রোডিউসার অর্গানাইজেশন সদস্য এবং ১২০০ জন বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীকে তাদের দক্ষতা উনয়নের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ৪১ জন কর্মকর্তা, রপ্তানিকারক ও কৃষককে বিভিন্ন দেশে কৃষি বাজার সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেয়ার জন্য সফর করানো হয়েছে। সাইট্রাস ক্যাংকার রোগের জন্য ২০০৮ সালে বাংলাদেশ হতে ইউরোপে লেবু রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে যৌথভাবে কাজ করে ২০১১ সালে পুনরায় লেবু রপ্তানি শুরু হয়। এজন্য হর্টেক্স ফাউন্ডেশন ১০ কেজি ঝঙচচ চীন থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিকট হস্তান্তর করে। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে এফএও, ডিএই এবং হর্টেক্স ফাউন্ডেশন এর যৌথ সহায়তায় দীপ ইন্টারন্যাশনাল নামের রপ্তানিকারক প্রথমবারের মতো ডঅখগঅজঞ অঝউঅ সুপার শপ ইউকেতে আম রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। মারুহিশা প্যাসিফিক কোম্পানি লিমিটেডের অনুরোধে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন ডিএই শেরপুরের সহযোগিতায় জাপানি মিষ্টিআলু ধহহড়নবহর এর মাঠ পরীক্ষা সম্পন্ন করে। মিষ্টি আলুর জাতটি এখন আবাদ এবং রপ্তানি হচ্ছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ১৩০টি কর্মশালা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম সফলভাবে আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া ফসলের ভ্যালু চেইন, বাজার সমীক্ষা বিষয়ে ৪১টি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই ঘঅঞচ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে ২২টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৩০টি কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র (সিসিএমসি) এবং ৩০টি কালেকশন পয়েন্ট স্থাপন করে ডিএই এর সহায়তায় সিআইজি কৃষকদের নিয়ে ফসলের ভ্যালু চেইন উন্নয়ন এবং সম্মিলিতভাবে বাজার সংযোগ উন্নয়নের কাজ চলছে। এসব মডেল গ্রামীণ প্যাক হাউজ (সিসিএমসি) হতে ৩০,০০০ টন নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন সবজি ও ফল দেশের অভ্যন্তরে বিপণন করা হয়েছে ও ২৫০০ টন বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এ কার্যক্রমটি এখন চলমান আছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কৃষিপণ্যের উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যবসা ইনকিউবেশন সেন্টার হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া এ প্রতিষ্ঠানটিকে ফসলের ভ্যালু চেইন ও রপ্তানি উন্নয়নের “সেন্টার অব একসিলেন্স” প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। 
বাংলাদেশ সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, পদক্ষেপ ও কৌশলের কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- কৃষিপণ্য উৎপাদনের বৃদ্ধির সাথে সাথে বিদেশে যাতে পণ্যের সুখ্যাতি বৃদ্ধি পায় সেভাবে সবাইকে কাজ করতে হবে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে কৃষিপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির কাজ অক্লান্তভাবে করে যাচ্ছে।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, সেচ ভবন, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা। ফোন : ৪৮১১৩২৩৯, ই-মেইল : hortex@hortex.org

বিস্তারিত
বাংলাদেশে কাজুবাদাম চাষের সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বাংলাদেশে কাজুবাদাম চাষের সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
কৃষিবিদ রেজওয়ানুল ইসলাম মুকুল
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের যুগোপযোগী নীতির কারণে বাংলাদেশের কৃষি আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃষির সকল সেক্টরেই আমাদের সফলতা অভাবনীয়। কৃষি মন্ত্রণালয় দেশে অপ্রচলিত ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং এ রকমই সম্ভাবনাময়, রপ্তানিযোগ্য অপ্রচলিত এবং উচ্চমূল্যের একটি ফসল যার নাম কাজুবাদাম। কাজুবাদামে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সে সঙ্গে ওষুধি গুণাগুণ থাকায় বিশ্ববাজারে কাজুবাদামের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং দিন দিন চাহিদা বেড়েই চলেছে। কাজুবাদাম একটি গ্রীষ্মম-লীয় ফসল, যার চাষাবাদ এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো পুষ্টিকর এই কৃষিপণ্যটির জন্য মূলত এই দুই মহাদেশের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
বৃক্ষজাতীয় ফলের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজুবাদামের স্থান তৃতীয়। আর বাদামজাতীয় ফসলের মধ্যে কাজুবাদাম প্রথম স্থানে। আমাদের দেশে এক কেজি প্রক্রিয়াজাত করা প্যাকেটকৃত বাদামের মূল্য প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। সাধারণ কৃষকরা প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলেও শুধু বাদাম বিক্রি করে টনপ্রতি প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পেয়ে থাকেন। তবে এর বাজার বেশ পরিবর্তনশীল। বর্তমানে কাজুবাদামের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য রয়েছে প্রায় ১৪.৯ বিলিয়ন ডলার যেখানে, ভিয়েতনাম এককভাবে ৪ বিলিয়ন ডলারের কাজুবাদাম রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ ২০১৯-২০ সালে ভিয়েতনামে ও ভারতে কাঁচা কাজুবাদাম যেখানে রপ্তানি করেছে মাত্র ৩ দশমিক ৫৭ লাখ ডলারের, সেখানে প্রস্তুত বাদাম আমদানিই করেছে ভিয়েতমান থেকে ৮৫৭ টন। আমদানি-রপ্তানির এই পরিসংখ্যান থেকে কাজুবাদামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করাটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। ২০২০ সালের উৎপাদন হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে কাজুবাদামের ফলন প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ৩২৩ টন (সূত্র : একটি জাতীয় দৈনিক, ১৫ আগস্ট ২০২০)। ২০২০ সালে বিশ্বের শীর্ষ প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে ভিয়েতনাম এবং শীর্ষ আমদানিকারক দেশ আমেরিকা। আফ্রিকার দেশগুলো বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন কাঁচা কাজুবাদাম উৎপাদন করে কিন্তু প্রক্রিয়াজাতের তেমন আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত কাঁচা কাজুবাদামের ৯০ শতাংশই রপ্তানি করে।
বাংলাদেশেও কাজুবাদামের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ২০১৪-১৫ সালে দেশে মাত্র ১৮,০০০ কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি হয়, যা ২০১৮-২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮০ হাজার টনে। ২০১৯-২০ সালে কাজুবাদাম আমদানি হয় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন অথচ বাংলাদেশ কাজুবাদাম উৎপাদনের এক সম্ভাবনাময় উর্বর ভূমি।
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবন, রাঙ্গামাটি ও  খাগড়াছড়ির মোট আয়তন ১৩,৩৪,৪০০ হেক্টর যার মাত্র ৫ শতাংশ সমতল ফসলি জমি এবং বাকিটা পাহাড়ি এলাকা। কাজুবাদাম চাষের জন্য যে রকম মাটি, তাপমাত্রা ও বৃষ্টি দরকার তার সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে এই পাহাড়ি এলাকায়। তিন পাবর্ত্য জেলার কমপক্ষে ২২ শতাংশ জমিতে এখনি কাজুবাদাম চাষের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার মাটিও কাজুবাদাম চাষের অনুকূলে। অর্থাৎ সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে ভিয়েতনামের সফলতার গল্প শুনতে হবে না বরং বাংলাদেশ আগামীদিনে ভিয়েতনামের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২০১৯ বছরে দেশে কাঁচা কাজুবাদামের উৎপাদন ছিল ৯৬২ মেট্রিক টন, যা ২০১৯-২০ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৩২৩ মেট্রিক টনে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় অপ্রচলিত ফসলের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক ২১১ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দেশে কাজুবাদামের প্রক্রিয়াজাত সহজতর করা এবং প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার জন্য কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর শুল্কহার ৯০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে যে কয়েকটি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত প্লান্ট স্থাপিত হয়েছে এবং বর্তমানে দেশীয় কাজুবাদামের যে উৎপাদন তা এই কারখানাগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়। নীলফামারী জেলায় জ্যাকপট কাজুবাদাম ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি প্রক্রিয়াজাত ফ্যাক্টরি গড়ে উঠে। ২০১৯ সালে গ্রিন গ্রেইন গ্রুপ চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় আধুনিক মানের একটি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলে। বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম) কাজুবাদাম প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপনের জন্য চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে ১৫ একর জমি লিজের জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বান্দরবন ও রাজশাহীতেও একটি করে প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠেছে।
দেশে কাজুবাদামের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এটিকে কৃষির বাণিজ্যিক পণ্য হিসাবে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রচলিত কাজুবাদামের উৎপাদন ক্ষমতা অন্যান্য দেশের বিশেষ করে ভিয়েতনাম এবং ভারতের প্রচলিত জাতের তুলনায় অত্যন্ত কম। আমাদের দেশে যে জাত পার্বত্য এলাকায় চাষ হয় তার শেল কাজুবাদামের আকার ছোট (৩-৪ গ্রাম) এবং প্রতি গাছে শেল কাজু পাওয়া যায় ৪-৫ কেজি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে জাতটি বেশি ফলন দেয় তার নাম জারগ্রাম-২। এ জাতটি গাছপ্রতি ১২-১৪ কেজি শেল কাজু ফলন দেয় এবং প্রতি শেল কাজুর গড় ওজন ৮-১০ গ্রাম। ভিয়েতনামে ৫টি উচ্চফলনশীল কাজুবাদাম চাষ করা হয় যার মধ্যে ৪টির ফলন অন্যান্য যে কোন দেশের চেয়ে অনেক বেশি। ভিয়েতনামের এই ৪টি জাতের নাম ঝববফ ঊঝ০৪, ঝববফকচ১২, ঝববফকচ১১ এবং ঝববফইউ০১ যাদের গাছপ্রতি শেল কাজু পাওয়া যায় ৪৫-৬৫ কেজি। ভিয়েতনামের এই জাতগুলো দেশে প্রবর্তন করার ব্যবস্থা করা হলে কাজুবাদামের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। পার্বত্য তিন জেলার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, শেরপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা সেইসঙ্গে নরসিংদী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জের লালমাটি এলাকায় যে পতিত জমি রয়েছে- তা কাজুবাদাম চাষের আওতায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কাজু বাদামের পুষ্টিগুণ : শরীরিক উপকারিতার দিক থেকে কাজুবাদামের কোনো বিকল্প হয় না। এতে উপস্থিত প্রোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজ এবং ভিটামিন নানাভাবে শরীরের উপকার হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, কাজুবাদামে ভিটামিনের মাত্রা এত বেশি থাকে যে চিকিৎসকরা একে প্রাকৃতিক ভিটামিন ট্যাবলেট নামেও ডেকে থাকেন। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত যদি কাজুবাদাম খাওয়া যায়, তাহলে শরীরে নানা পুষ্টিকর উপাদানের ঘাটতি দূর হয়, সেই সঙ্গে অনেক উপকার পাওয়া যায়। খাদ্য মানের দিক দিয়ে কাজুবাদাম অতি পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর। এ বাদামে শতকরা ২১ ভাগ আমিষ, ৪৭ ভাগ স্নেহ, ২২ ভাগ শর্করা, ২.৪ ভাগ খনিজ পদার্থ ০.৪৫ ভাগ ফসফরাস, ০.৫৫ ভাগ ক্যালসিয়াম এবং প্রতি ১০০ গ্রাম বাদামে ৫ মিলিগ্রাম লৌহ, ৭৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১, ১১০ মিলিগ্রাম রাইবোফ্লোবিন রয়েছে। প্রচুর শর্করা, আমিষ, স্নেহ, খনিজ পদার্থ, ভিটামিনসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য রক্ষায় উপকারী অনেক ফাইটোক্যামিক্যাল্স রয়েছে যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাস্থ্যের জন্য কাজুবাদাম বিভিন্নভাবে কাজ করে থাকে।
কাজুবাদামে থাকা ফসফরাস, ভিটামিন-ই ও বি, ফলিক এসিড হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। কাজুবাদামে ওলিসিক এসিড নামে একধরনের মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড আছে, যা খারাপ কোলেস্টেরল অর্থাৎ এলডিএল ও ট্রাইগিসারাইডকে কমিয়ে দেয়। হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ হার্ট অ্যাটাক রোগ থেকে রক্ষা করে। 
কাজুবাদামের ক্যালসিয়াম, কপার, জিংক এবং ম্যাগনেসিয়াম হাড়কে শক্ত ও মজবুত করে। ফসফরাস দাঁতের বৃদ্ধি ঘটায়। দাঁতকে শক্ত করে ও সুন্দর করে। হাড় এবং দাঁতের গঠনে সাহায্য করে। বয়স্ক লোকের অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো হাড়ের রোগ প্রতিরোধে কাজুবাদাম বেশ কার্যকর। কপার ও ক্যালসিয়াম অস্টিওপরোসিস রোগ কমায়।
কাজুবাদামে থাকা প্রচুর মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট- যা ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এতে কম সোডিয়াম এবং বেশি পরিমাণে থাকা ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া কাজুবাদাম ইউরিক অ্যাসিড তৈরি বন্ধ করার ফলে রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
কাজুবাদামের ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ু ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ব্রেনের শক্তি বৃদ্ধি পেলে বুদ্ধি, স্মৃতি শক্তি এবং মনোযোগ বাড়ে। কাজুবাদামের উপকারী ফ্যাটি এসিড ব্রেনের শক্তি বাড়ায় এবং রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। এটি শরীরের শর্করা এবং চর্বি বিপাকে সহায়তা করে। কাজুবাদামের ম্যাগনেসিয়াম    ইনসুলিনের মাত্রা এবং কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়, যাতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয়।
কাজুবাদামের প্রোটিন, কপার, জিংক এবং সেলিনিয়াম চুলের ঔজ্জ্বল্য বাড়ানোর পাশাপাশি চুলের গোড়াকে শক্ত করে। কাজুবাদামের ভিটামিন-সি, কপার, কোলাজেন, ইলাসটিন, জিংক, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস এবং সেলেনিয়াম ত্বকের রঙ বাড়ায় এবং ত্বক ফাটা রোধ করে।
মানবদেহের ওজনের ভারসাম্য রক্ষা করতে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন দৈনিক ৪ থেকে ৫টি কাজুবাদাম খাওয়া উত্তম। কাজুবাদাম খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। নিয়মিত কাজুবাদাম খেলে চোখ বেশ সবল থাকে এবং ক্ষতিকর বিকরিত রশ্মি থেকে চোখকে রক্ষা করার ক্ষমতা অর্জন করে।
কাজুবাদামের জিংক ও এন্টিঅক্সিডেন্ট ভাইরাসের আক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে। কাজু বাদামে প্রচুর ভিটামিন থাকে, যা ব্যাকটেরিয়া গঠিত মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এভাবে মানব শরীর সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে।
আগামীর কৃষিতে কাজুবাদামই হতে পারে বাণিজ্যিক কৃষির দ্বার উন্মোচনের সূত্রপাত। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় যেমন- কৃষককে নিয়ে ভাবছেন তেমনিভাবে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি বাণিজ্যিকায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
উদ্যান ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলা, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য গুণগতমান সম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য চাহিদা পূরণ, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরিত করতে কৃষি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের ফলে কাক্সিক্ষত কৃষি প্রবৃদ্ধি অর্জন ত্বরান্বিত হবে, মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ বাড়বে তথা দেশের সামগ্রিক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। য়

লেখক : পরিচালক (অবঃ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১১১৯৬১১০; ইমেইল : robibaubd@gmail.com

বিস্তারিত
দার্জিলিং কমলা বাংলাদেশে আবাদের সূচনা ও সফলতা

দার্জিলিং কমলা বাংলাদেশে আবাদের সূচনা ও সফলতা
কৃষিবিদ রাজেন্দ্র নাথ রায়
২০১২ সালের কথা। পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমাপ্তকৃত কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু দার্জিলিং জাতের কমলার চারা হর্টিকালচার সেন্টার, ঠাকুরগাঁও এ অতিরিক্ত ছিল। তখন হর্টিকালচার সেন্টার থেকে অনেকটা উদ্বুদ্ধ করেই পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের আগ্রহী কৃষক আবু জাহিদ ইবনে নূর জুয়েলকে দেয়া হয়। হর্টিকালচার সেন্টার কর্তৃপক্ষের কথামতো জুয়েল সাহেব তার ৩ একর ধানের জমির আইলগুলোতে ৩০০টি দার্জিলিং জাতের কমলার চারা রোপণ করলেন। সঠিক পরিচর্যার কারণে রোপণের ৩ বছর পর থেকেই গাছগুলো ফল দেয়া শুরু করল। ৭-৮ বছর পরেই তার বাগানের কমলা মানুষের আকর্ষণ বিন্দুতে পরিণত হলো। বর্তমানে, ১০ বছর পরে প্রত্যেকটি গাছে থোকায় থোকায় প্রায় ৮০০-৯০০টি কমলা ধরেছে। কমলাগুলো বেশ বড় আকৃতির, এক কেজিতে ৫-৬টি অর্থাৎ প্রত্যেকটির ওজন ২০০-২৫০ গ্রাম। কমলাগুলো সুমিষ্ট, তবে গাছ থেকে পাড়ার ২-৩ দিন পরে খেলে বেশি মিষ্টি হয়। কমলার কোয়াগুলো ঠোঁটের মতো রসালো টসটসে, তাই খুবই আকর্ষণীয়। তাছাড়া, কমলার আঁশ কম হওয়াতে খোসা খুব সহজে ছাড়ানো যায়। প্রথমদিকে জুয়েল সাহেব কমলাগুলো বাজারে বিক্রি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০২০ সালে, মৌসুমের শুরুতে (নভেম্বর মাসে) ২০০ টাকা/কেজি দরে বিক্রি শুরু করলেও, পরে দাম কমে ১২০ টাকা/কেজি হয়। কিন্তু ২০২১ সালে মৌসুমের শুরুতে ২০০ টাকা/কেজি দরে বিক্রি শুরু করে চারিদিকে এই কমলার খ্যাতির জন্য দাম বেড়ে হয় ২৫০ টাকা/কেজি। প্রতিদিন প্রায় ২০০০ জন মানুষ তার বাগানের কমলা দেখতে আসেন। তিনি বর্তমানে, কমলা বাগানটি কৃষি-পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করছেন। জুয়েল সাহেব বর্তমানে দার্জিলিং এই কমলার ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি ইতোমধ্যে ২০০০টি অরিজিনাল কমলার চারা উৎপাদন করেছেন। তার মতে, যেহেতু উত্তরাঞ্চলে হিমালয়ের পাদদেশে সমতল ভূমি রয়েছে, তাই দার্জিলিং কমলা উত্তরাঞ্চলে হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। 
কৃষি অফিসারের মতে, উত্তরাঞ্চলের মাটির পিএইচ অম্লমান হওয়ায় এবং হিমালয়ের শীতার্ত   আবহাওয়া বিরাজমান থাকায় ভারতের দার্জিলিং জাতের কমলার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের পক্ষ থেকে লেবুজাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের সহযোগিতায় জুয়েল কৃষককে পুরাতন বাগান পরিচর্যার জন্য সার, বাডিং নাইফ, সিকেচার, ফেরোমন ফাঁদ, মালচিং বাবদ টাকা ও এক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।       
উদাহরণস্বরূপ নীলফামারী সদরে ২০১৩ সালে এ আর মামুন নার্সারির মালিক লেবু মিয়া সরাসরি দার্জিলিং এর ছিটং থেকে দার্জিলিং কমলার চারা নিয়ে এসে ১৬ শতকের একটি কমলা বাগান সদর, নীলফামারীতে স্থাপন করেন। ২০১৮ সাল থেকে বাগানটিতে পুরোদমে কমলা উৎপাদন হচ্ছে। সুমিষ্ট, রসালো ও আকর্ষণীয় এই কমলা ইতোমধ্যে নীলফামারীতে সাড়া ফেলেছে। বর্তমানে লেবু মিয়া অরিজিনাল দার্জিলিং কমলার চারা উৎপাদন করে বিক্রয় করছেন। এ ছাড়াও লালমনিরহাট সদরে শোভাবর্ধন নার্সারির মালিক একরামুল হক ২০১৯ সালে যশোর থেকে দার্জিলিং কমলার ২০০টি চারা এনে লালমনিরহাট সদরে ৬ একরের একটি কমলা+মাল্টা মিশ্রবাগান করেন। মাত্র ২.৫ বছরেই গাছগুলো অনেক বড় হয় এবং ফল ধরে। প্রতিটি গাছে ২৫০-৩০০টি কমলা ধরেছে। 
তবে তার কমলাগুলোর রস একটু কম, কিন্তু বড় আকারের ও সুমিষ্ট। তিনিও দার্জিলিং কমলার চারা তার নার্সারির মাধ্যমে বিক্রয় করছেন।
দার্জিলিং কমলা বাগান স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য কয়েকটি বিষয়, যেমন : দেশের উত্তরাঞ্চল দার্জিলিং কমলার জন্য বেশি উপযোগী। অরিজিনাল দার্জিলিং কমলার চারা হতে হবে। কমলার চারা সঠিক পদ্ধতিতে রোপণ করতে হবে ও চুন দিতে হবে। 
সানবার্ন কমাতে বাগানে শেড ট্রি দিতে হবে; কমলায় রস হওয়ার জন্য শীতকালেও ফ্লাডিং পদ্ধতিতে সেচ দিতে হবে; বাগানের ওয়াটার সাকার নিয়মিতভাবে ছাঁটাই করতে হবে; কমলার ফ্রুট ফ্লাই দমনের জন্য ইস্পাহানির ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা যেতে পারে; বছরে কমপক্ষে ৩ বার সার দিতে হবে, মিষ্টতা বাড়ানোর জন্য প্রচুর জৈবসার দিতে হবে; স্ক্যাবিস রোগ দমনে গাছে নিয়মিতভাবে বোর্দো মিক্সচার দিতে হবে। য়লেখক : উপজেলা কৃষি অফিসার, পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও। মোবাইল: ০১৭১৭৫২৭৩৬১, ই-মেইল: royrazen.dae@gmail.com

 

বিস্তারিত
তথ্য ও প্রযুক্তি পাতা
তথ্য ও প্রযুক্তি পাতা
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন
ধান
 যারা শীতের কারণে দেরিতে চারা রোপণ করেছেন  তাদের ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করুন। 
 ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখুন।  বোরো ধানের জমিতে গান্ধি পোকা দমনে আলোক ফাঁদ, বিষটোপ ব্যবহার করুন। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক স্প্রে করুন।
বন্যাপ্রবণ নিচু এলাকায় অল্পদিনে পাকে এমন আগাম জাতের আউশ ধান (ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান ৬৫, ব্রি ধান৮২, ব্রি ধান৮৩, বিনা ধান-১৯, বিনা  ধান-২১) চাষ করুন।
গম
 দেরিতে বপন করা গম পেকে গেলে রিপারের সাহায্যে সংগ্রহ করুন। এতে বিঘা প্রতি খরচ হবে মাত্র ২০৪ টাকা। 
ভুট্টা (রবি)
 বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় জমিতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে মোচা সংগ্রহ করুন। 
ভুট্টা (খরিফ)
 গ্রীষ্মকালীন ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এ মাসে বীজ বপন করতে হবে। খরিফ মৌসুমের জন্য ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫, বারি হাইব্রিড          ভুট্টা-১৭ এসব। 
পাট
 চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপন করা যায়। 
 পাটের ভালো জাতগুলো হলো ও-৯৮৯৭, বিজেআরআই তোষা পাট-৪, বিজেআরআই তোষা পাট-৫, বিজেআরআই তোষা পাট-৬, বিজেআরআই দেশি   পাট-৫, বিজেআরআই দেশি পাট-৬, বিজেআরআই দেশি পাট-৭, বিজেআরআই দেশি পাট-৮। 
 ভালো ফলনের জন্য প্রতি একরে ৭০ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি এমওপি, ১৮ কেজি জিপসাম এবং প্রায় ৪.৫ কেজি জিংকসালফেট সার প্রয়োগ করতে হবে।
শাক-সবজি
 পানির অপচয় কমাতে তরমুজ, কুমড়া. শসা, ঝিঙা, করলা, লাউ গর্ত পদ্ধতিতে বপন করুন।
 লতা জাতীয় শাকসবজির জন্য মাচার ব্যবস্থা করুন।
গাছপালা 
 এ সময় বৃষ্টির অভাবে মাটিতে রসের পরিমাণ কমে আসে, তাই গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দেয়ার ব্যবস্থা করুন। 
 আম গাছে হপার পোকার আক্রমণ হলে অনুমোদিত কীটনাশক যেমন- সিমবুস/ফেনম/ডেসিস/ফাইটার ২.৫ ইসি প্রভৃতি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিন। 
 আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার পূর্বেই একবার এবং এর একমাস পর আর একবার প্রতি লিটার পানির সাথে ১.০ মিলি সিমবুস/ফেনম/ডেসিস/ফাইটার ২.৫ ইসি মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপাল ভালোভাবে ভিজিয়ে ¯েপ্র করুন। 
 এ সময় আমে পাউডারি মিলডিউ ও এ্যাথ্রাকনোজ রোগ দেখা দিতে পারে। টিল্ট, রিডোমিল গোল্ড, কান্্জা বা ডায়থেন এম ৪৫ অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করুন। 
 এ মাসে পেঁপের চারা রোপণ করতে পারেন । 
বিবিধ
 উচ্চমূল্যের ফসল আবাদ করুন, অধিক লাভবান হন।
 স্বল্পকালীন ও উচ্চফলনশীল জাত নির্বাচন করুন অধিক ফসল ঘরে তুলুন।
 শ্রম, সময় ও খরচ সাশ্রয়ে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে আবাদ করুন।
 
লেখক : তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৯১১০১৯৬১০, ই-মেইল :manzur_1980@yahoo.com
বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর

প্রশ্নোত্তর 
কৃষিবিদ মোঃ আবু জাফর আল মুনছুর
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য আপনার ফসল, মৎস্য ও প্রাণীর ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাইব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুণ।
মো: গণি মিয়া, গ্রাম: ইমাদপুর, পো: মিঠাপুকুর, উপজেলা: মিঠাপুকুর, জেলা: রংপুর।
প্রশ্ন : আমার একটি আলু খেত আছে। কিছুদিন হল আলুর গাছের গোড়ায় লম্বা লালচে বর্ণের দাগ বা ক্ষত হচ্ছে করণীয় কী?
উত্তর : ছত্রাকের আক্রমণের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে। আলুর স্টেফ ক্যাংকার স্কাম রোগ বলে। আগাম প্রতিরোধ হিসেবে বীজ আলুকে ভালোভাবে অঙকুরিত হতে হবে এবং বেশি গভীরে আলু রোপণ পরিহার করতে হবে। বীজ আলুটা ৩% বোরিক এসিড দিয়ে শোধন করে নিতে হবে। জমিতে এ লক্ষণ দেখা দিলে ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন বা ২ গ্রাম ব্রিটক্স বা ২ গ্রাম কমপ্যানিয়ন বা ১ মিলি এমিস্কার টপ গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে।
মো: আফজাল হোসেন, গ্রাম: আইচগাতি, পো: রুপসা, উপজেলা: রুপসা, জেলা: খুলনা।
প্রশ্ন: লিচুর পাতায় মখমলের মতো রঙ ধারণ করা এবং পাতা কোকড়ানোর জন্য করণীয় কী?
উত্তর : সাধারণত পূর্ণ বয়স্ক ও বাচ্চা মাকড় কচি পাতায় আক্রমণ করে ও পাতায় রস চুষে খাওয়ার কারনে এটি হয়। ফলে পাতায় মখমলের মতো এক ধরনের আবরণ তৈরি হয় এবং পাতা কুঁকড়িয়ে যায়। প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুতে ফেলতে হবে। জৈব বালাইনাশক হিসেবে বাইকাও বা নিমবিসাইডিন ব্যবহার করতে হবে (১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম)। এ ছাড়া ভাদ্র-কার্তিক মাস এবং মাঘ মাসের শেষ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত গাছে ২/৩ বার মামড়নাশক হিসেবে ওসাইট ২ মিলি বা ২ গ্রাম থিওভিট বা ভাটিমেক ১.২৫ মিলি ১ লিটার পানিতে ব্যবহার করতে হবে।
প্রশান্ত কুমার, গ্রাম: রাগন, পো: ত্রিশাল, উপজেলা: ত্রিশাল, জেলা: ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: আমার রসুনের জমি আছে। রসুনের পাতায় পানি ভেজা বা কালচে দাগ দেখা যাচ্ছে পরামর্শ চাই।
উত্তর : সাধারণত ছত্রাকের আক্রমণের কারণে এ রোগ হয়। রসুনের লিফ ব্রাইট বলা হয় এ রোগকে। আগাম প্রতিরোধ হিসেবে রসুন কশকে ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম ব্যাভিটিন বা ২.৫ গ্রাম প্রোভেক্স ২০০ গ্রাম দ্বারা শোধন করা। আর এ রোগ দেখা দিলে ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম ইপ্রোডিয়ন (ইভারাল, রোভবান) একক ভাবে বা ২ গ্রাম রিভোনিল গোল্ড একসাথে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। 
মো: সুরাদুল ইসলাম, গ্রাম: রামচন্দ্রপুর, পো: পবা, উপজেলা: পবা, জেলা: রাজশাহী।
প্রশ্ন : আমার ভুট্টার ক্ষেত্রে মরা মাইজ দেখা দিচ্ছে এবং পাতার হাকলা টান দিলে সহজে উঠে আছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?
উত্তর : ভুট্টার ক্ষেত্রে মাজরা পোকার আক্রমণে মরা মাইজ দেখা যায় এবং মধ্য পাতা হালকাভাবে টান দিলে সহজেই উঠে আসে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত বালাইনাশক হিসেবে ডায়াজিনন, মার্শাল সুমিথিয়ন ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।
মাহিনুর রহমান, গ্রাম: মাইজগাও, পো: মাইজাগাও, উপজেলা: ফেঞ্চুগঞ্জ, জেলা: সিলেট।
প্রশ্ন: মাছের পেট ফোলা রোগে করণীয় সমন্ধে জানতে চাই।
উত্তর : আপনাকে প্রথমে খালি সিরিঞ্জ দিয়ে মাছের পেটের পানি বের করে নিতে হবে। অত:পর প্রতি কেজি মাছের জন্য ২৫ মিলিগ্রাম হারে ক্লোরেম ফেনিকল ইনজেকশন দিতে হবে অথবা প্রতি কেজি সম্পূরক খাবারের সাথে ২০০ মিলিগ্রাম ক্লোরেম ফেনিকল পাউডার মিশিয়ে মাছকে খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া পুকুরে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনসহ মাছকে নিয়মিত সুষম খাদ্য প্রদানের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
মো: আব্দুলাহেল কাফি, গ্রাম : কালির তোলা, উপজেলা : বোদা, জেলা : পঞ্চগড়।
প্রশ্ন : ফাউল পক্স রোগ সম্বন্ধে জানতে চাই।
উত্তর : ফাউল পক্স একটি তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে সংক্রমিত ভাইরাসঘটিত সংক্রমণ যা বেশির ভাগ পাখির প্রজাতিকে আক্রান্ত করে। ফাউল পক্স আভিপক্স ভাইরাস নামক একটি ভাইরাসের কারণে ঘটে যা পক্সভিরিডা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এ রোগটি মানুষের গুটিবসন্ত রোগের মতো। এটি মুরগি জাতীয় পাখির একটি বিশ^ব্যাপী রোগ। এই রোগের কয়েকটি সম্ভাব্য হোস্ট (সংক্রমিত পাখি)-মুরগি, টার্কি, কোয়েল, ক্যানারি, পায়রা এবং আরও অনেক প্রজাতির পাখি।

লেখক : তথ্য অফিসার (পিপি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫। মোবাইল : ০১৭১৪১০৪৮৫৩; ই-মেইল :iopp@ais.gov.bd

বিস্তারিত
বৈশাখ মাসের কৃষি (১৪ এপ্রিল- ১৪ মে)


 বৈশাখ মাসের কৃষি    
  (১৪ এপ্রিল- ১৪ মে) 
কৃষিবিদ ফেরদৌসি বেগম
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ...। বৈশাখ ১৪২৯ নতুন বছরের আগমন। পুরনো বছরের ব্যর্থতাগুলো ঝেড়ে নতুন প্রত্যাশার উল্লাসে কৃষক ফিরে তাকায় দিগন্তের মাঠে। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। সেই সাথে আসুন এক পলকে জেনে নেই বৈশাখে কৃষির করণীয় দিকগুলো।
বোরো ধান 
ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। নাবি বোরো ধানের থোড় আসার সময় পানির অভাব না হয় তাই আগে থেকেই সম্পূরক সেচের জন্য মাঠের এক কোণে মিনি পুকুর তৈরি করতে হবে। ধানের দানা শক্ত হলে জমি থেকে পানি বের করে দিতে হবে। এ মাসে বোরো ধানে মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, সবুজ পাতাফড়িং, গান্ধিপোকা, লেদাপোকা, ছাতরাপোকা, পাতা মোড়ানো পোকার এবং এ সময় ধানক্ষেতে উফরা, বাদামি দাগ রোগ, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগের আক্রমণ হতে পারে। বালাই দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। বালাই আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে প্রয়োগ করতে হবে। এ মাসে শিলাবৃষ্টি হতে পারে, বোরো ধানের ৮০% পাকলে তাড়াতাড়ি কেটে ফেলতে হবে।
আউশ ধান
আউশ ধানের জমি তৈরি ও বীজ বপনের সময় এখন। বোনা আউশ উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি এবং রোপা আউশ বন্যামুক্ত আংশিক সেচনির্ভর মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিম্ন জমি আবাদের জন্য নির্বাচন করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষের সময় শতাংশপ্রতি ৬০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি ও ৩০০ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। বৃষ্টিনির্ভর বোনা আউশ এলাকায় ইউরিয়া দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করত হবে। প্রথম কিস্তি শেষ চাষের সময় এবং দ্বিতীয় কিস্তি ধান বপনের ৩০-৪০ দিন পর। জমিতে গন্ধক এবং দস্তার অভাব থাকলে শতাংশ প্রতি ১৩৫ গ্রাম জিপসাম ও ২০ গ্রাম জিঙ্ক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। আউশের উন্নত জাত হিসাবে বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩ ও ব্রি ধান৮৩ এবং রোপা হিসেবে বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৮২, ব্রি ধান৮৫, ব্রি ধান৯৮ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৭ । এ ছাড়াও খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকাসহ, পাহাড়ি এলাকার জমিতে বিনা ধান-১৯, বিনা ধান-২১ চাষ করতে পারেন তবে বীজ প্রাপ্তির জন্য উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। 
ভুট্টা (খরিফ) 
খরিফ ভুট্টার বয়স ২০-২৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে রসের ঘাটতি থাকলে হালকা সেচ দিতে হবে। জমিতে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং একই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে।
পাট
বৈশাখ মাস তোষা পাটের বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। ফাল্গুনী তোষা ও-৯৮৯৭, বিজেআরআই তোষা পাট-৫, বিজেআরআই তোষা পাট-৮ (রবি-১) ভালো জাত। 
দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে তোষা পাট ভালো হয়। 
বীজ বপনের আগে প্রতি কেজি বীজ ৪ গ্রাম ভিটাভেক্স বা ১৫০ গ্রাম রসুন পিষে বীজের সাথে মিশিয়ে শুকিয়ে নিয়ে জমিতে সারিতে বা ছিটিয়ে বুনতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫-৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে ৩৫-৪০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। ভালো ফলনের জন্য  শতাংশপ্রতি ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি সার শেষ চাষের সময় মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমিতে সালফার ও জিংকের অভাব থাকলে জমিতে সার দেয়ার সময়  শতাংশপ্রতি ৪০০ গ্রাম জিপসাম ও ৫০ গ্রাম দস্তাসার দিতে হবে। শতাংশপ্রতি ২০ কেজি গোবর সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের পরিমাণ অনেক কম লাগে।  
শাকসবজি 
বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে ডাঁটা,      কলমিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। মাদা তৈরি করে চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, চাল কুমড়ার বীজ বুনে দিতে পারেন। আগের তৈরি করা চারা থাকলে ৩০/৩৫ দিনের সুস্থ সবল চারাও রোপণ করতে পারেন। লতানো সবজির জন্য  মাচা তৈরি করে নিতে হবে। দৈহিক বৃদ্ধি যত বেশি হবে তার ফুল ও ফল ধারণক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য গাছের বাড়বাড়তি বেশি হলে ১৫-২০ শতাংশ পাতা লতা কেটে দিতে হবে। 
কুমড়াজাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করে পাপড়িগুলো ফেলে দিয়ে পরাগমু-টি স্ত্রী ফুলের গর্ভমু-ে ঘষে হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।      কুমড়াজাতীয় ফসলে মাছি পোকা দমনে জমিতে খুঁটি বসিয়ে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। এছাড়া সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করেও এ পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়। 
গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে চাইলে বারি হাইব্রিড টমেটো ৪, বারি হাইব্রিড টমেটো ৮, বারি হাইব্রিড টমেটো-১০ বা বিনা টমেটো ৩, বিনা টমেটো ৪-এর চাষ করতে পারেন। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে হলে পলিথিনের ছাওনির ব্যবস্থা করতে হবে সে সাথে এ ফসলটি সফলভাবে চাষের জন্য টমেটোটোন নামক হরমোন প্রয়োগ করতে হবে। স্প্রেয়ারের সাহায্যে প্রতি লিটার পানিতে ২০ মিলি টমেটোটোন মিশিয়ে ফুল আসার পর ফুলের গায়ে ৫-৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
গাছপালা 
এ মাসে আমের মাছি পোকাসহ অন্যান্য পোকার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। মাছি পোকা দমনের জন্য সবজি খেতে যে রকম বিষটোপ ব্যবহার করা হয় সে ধরনের বিষটোপ বেশ কার্যকর। ডিপটরেক্স, ডারসবান, ডেনকাভেপন সামান্য পরিমাণ দিলে উপকার পাওয়া যায়। এ সময় কাঁঠালের নরম পচা রোগ দেখা দেয়। এলাকায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলে ফলে রোগ দেখা দেয়ার আগেই ফলিকুর ০.০৫% হারে বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ বা রিডোমিল এম জেড-৭৫ প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। বাড়ির আঙিনায় সুস্থ সবল, উন্নত নারিকেল চারা এবং গ্রামের রাস্তার পাশে    পরিকল্পিতভাবে খেজুর ও তালের চারা এখন লাগাতে পারেন। যত্ন, পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে ৩-৪ বছরেই গাছগুলো অনেক বড় হয়ে যাবে। বৃষ্টি হয়ে গেলে পুরনো বাঁশ ঝাড় পরিষ্কার করে মাটি ও কম্পোস্ট সার দিতে হবে এবং এখনই নতুন বাঁশ ঝাড় তৈরি করার কাজ হাতে নিতে হবে। যারা সামনের মৌসুমে গাছ লাগাতে চান তাদের এখনই জমি নির্বাচন, বাগানের নকশা প্রস্তুত এবং অন্যান্য প্রাথমিক কাজগুলো সেরে রাখতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
ব্রুডার হাউজের শেডে মুরগির বাচ্চা তোলার সাথে সাথে পরিমাণ মতো ভিটামিন সি ও গ্লুকোজ খাওয়াতে হবে। অতিরিক্ত গরমে লেয়ার হাউজে শেডের চাল বা ছাদে তাপ বিকিরণ করতে পারে এমন সাদা, অ্যালুমিনিয়িাম রঙ এবং প্রয়োজনে পাইপ বা ঝর্ণার মাধ্যমে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া জরুরি। সেজন্য পোলট্রি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে উপযুক্ত টিকা প্রদানের পাশাপাশি পুষ্টি ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার দিকে অধিকতর নজর দিতে হবে।
গোখাদ্যের জন্য নেপিয়ার, বাজরা, প্যারা, ভুট্টা, ইপিল ইপিলের চাষ করার ভালো সময় এখন। বাড়ির আশপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে, পতিত জায়গায় গোখাদ্যের চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। গাভীকে ক্রিমির ওষুধ খাওয়ানো না হয়ে থাকলে প্রতি দুই মাস অন্তর পানি বা খাদ্যের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। এ সময়ে গবাদি পশুর ক্ষুরারোগ ও ভাইরাস রোগ দমনে ভেটেরনারি চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত টিকা প্রদান করতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
বৈশাখ মাস পুকুরে মাছ ছাড়ার উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে পুকুর তৈরি অর্থাৎ কাদা সরিয়ে, চুন প্রয়োগ করে, আগাছা পরিষ্কার, পানি দেয়া, পানি পরীক্ষা, পরিমাণ মতো সার দেয়া, পুকুর পাড়ে নিত্য পাতা ঝরা গাছ ছাঁটাই বা কেটে ফেলাসহ অন্যান্য কাজগুলো করতে হবে। এরপর প্রতি শতকে মিশ্রচাষের জন্য ৩০-৪০টি ৪-৫ ইঞ্চি বড় সুস্থ সবল পোনা ছাড়তে হবে। পানির ৩ স্তরের কথা বিবেচনা করে তেলাপিয়া, সরপুঁটি, নাইলোটিকা, কার্পজাতীয় মাছ, রুই, কাতল, মৃগেল, কালো বাউস এবং সম্ভব হলে চিংড়ি পোনাও ছাড়া যাবে। পোনা সংগ্রহের সময় বিশ্বস্ত উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করতে হবে।
প্রিয় পাঠক, বৈশাখ নতুন আবাহনের  সৌরভের পাশাপাশি নিয়ে আসে কালবৈশাখীকে। কালবৈশাখীর থাবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কৃষিতে আগাম বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সুবিবেচিত লাগসই কৌশল আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সব বাধা ডিঙিয়ে আমরা কৃষিকে নিয়ে যেতে পারব সমৃদ্ধির ভুবনে। আপনাদের সবার জন্য নতুন বছরের শুভ কামনা। 

লেখক : সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা। টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, ই-মেইল : editor@ais.gov.bd

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook