কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে

ডঃ মনসুর আলম খান
কোভিড -১৯ এর সম্ভাব্য প্রথমরোগী
Patient Zero সনাক্তের পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে। ২০১৯ সালের ১লা ডিসেম্বর তারিখে চীনের উহান শহরে প্রথম রোগী শনাক্তের পর থেকে বিশ্বব্যাপী ১৯ মে ২০২০ আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ লাখের বেশি। মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের বেশি। আশঙ্কা করা হচ্ছে আরেকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার। তাছাড়া, আশঙ্কার তালিকায় আছে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা জনিত মৃত্যু। WFPGi মতে ঈড়ারফ-১৯Covid-19  pandemic could now be fusing into a hunger pandemic.International Food Policy Research Institute (IFPRI) তাদের এক প্রতিবেদনে কোবিন-১৯ প্রাদুর্ভাবকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝড় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, The COVID-19 pandemic has all the makings of a perfect storm for global malnutrition. নজিরবিহীন লকডাউনের প্রভাবে খাদ্য ও কৃষি পণ্য সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। তাছাড়া, আছে রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশংকা। Food and Agriculture Organization এর প্রধান অর্থনীতিবিদ Maximo Torero বলেছেন,The worst that can happen is that  governments restrict the flow of food”| এই প্রেক্ষাপটে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন উভয়েই দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহে বিঘœ ঘটাতে পারে এরকম রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে, ২৯ এপ্রিল ২০২০। বাস্তবতা হলো ২৯ এপ্রিল ২০২০ রাশিয়া গম, ভুট্টা, বার্লি ও আন্যান্য কৃষিজ পণ্য রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এখানে উল্লেখ্য করা যেতে পারে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাশিয়া ৩৫০ লাখ টনের বেশি গম রফতানি করেছে এবং বাংলাদেশ ৫২ লাখ টন গম আমদানি করেছে। বিশ্ব বাজারের এই চাহিদা-যোগান প্রক্রিয়া নিশ্চিত হুমকিতে আছে, করোনার প্রভাবে। এমন সময়ে আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, আগামী দিনগুলোতে আমরা কি খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারব, না করোনা আমাদের ভাতেও মারবে?


করোনা আমাদের আপাতত ভাতে মারতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশে চালের (ঈষবধহ জরপব) মজুদ সে কথাই বলে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আউশ এবং আমন উৎপাদিত হয়েছে যথাক্রমে ৩০ এবং ১৫৫ লাখ টন। চলতি বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ২০৪.৩ লাখ টন। সব মিলিয়ে ৩৮৯.৩ লাখ টন। আমাদের যে স্থায়ী অতিথি, সেই ১০-১১ লাখ রোহিঙ্গাসহ এই এক বছরে ভাতের জন্য বঙ্গদেশে (Human Consumption) দরকার প্রায় ২৫০ লাখ টন চালের। বাকি থাকে ১৩৯.৩ লাখ টন চাল। উৎপাদনের ২৬% হিসেবে গোখাদ্য, পোল্ট্রি, শিল্প কারখানা, অপচয় ইত্যাদি (Non- Human Consumption) খাতে ব্যবহৃত হবে আরও ১০১.২ লাখ টন। বাকি ৩৮.১ লাখ টন চাল থাকবে উদ্বৃত্ত। হিসাবটা কাটায় কাটায় না হলেও গত কয়েক বছর যাবতই গড়ে ৩৫ লাখ টন করে চাল উদ্বৃত্ত থাকছে। এই মুহূর্তে দেশে ৬০-৭০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত আছে। যার সাথে বোরো থেকে যোগ হতে যাচ্ছে আরও প্রায় ৩৮ লাখ টন। দেশের বর্তমান মজুতকৃত চাল দিয়ে আগামী ৭-৮ মাস নিশ্চিত থাকা যাবে। সামনে আসছে আউশ, তারপর আবার আমন। এসব কারণে করোনা আসার আগে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে কিছু চাল বিদেশে রফতানির পথ খোঁজা হচ্ছিল।


আর এখন করোনাকালে চাল রফতানির কথা মুখে নেয়া বাহুল্য। এখন দরকার বোরো ধান ঘরে তোলা। বিশেষ করে হাওরের বোরো ধান। এবছর, আমাদের বোরো আবাদ হয়েছে ৪৭.৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে। তার মাঝে হাওর এলাকায় (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়া এই সাত জেলার নিম্নাঞ্চল) ৪.৪৫ লাখ হেক্টর। ১৯৯৬-৯৭ সাল পর্যন্ত এসকল জমিতে ধানের আবাদ হতো কম। মূলত ১৯৯৮ সাল থেকে হাওরে ব্যাপকভিত্তিক বোরো আবাদ করা হয়। আর এখন দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন হাওরের উপযোগী উন্নত জাত। ১৪০-১৪৫ দিনে পরিপক্ব হয়। ফলনও আগের চেয়ে বেশি। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ ভাগ আসে এসকল হাওড় থেকে। হাওর অধিবাসিদের একমাত্র ফসল এটি। তাই হাওর থাকে আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে। হাওরের ধান ঠিক মত ঘরে উঠানো গেলো কি না এই নিয়ে থাকে সকলের উৎকণ্ঠা। কৃষক, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, পাইকার, নীতিনির্ধারক সকলেই তাকিয়ে থাকেন হাওরের দিকে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কয়েকদিন এদিক সেদিক হলে তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু হাওরে ভিন্ন। এবারের উৎকণ্ঠা ছিল আরও বেশি। করোনার কারণে।


এবার হাওরে যখন ধান পাকে-পাকে তখনই করোনার আগমন। এমনিতেই ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। এবার লকডাউনের কারণে শ্রমিক পাওয়া নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয়। শেষে সকলের সহযোগিতায় সারা দেশ থেকে বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ থেকে শ্রমিক নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু মূল কাজটি সম্পন্ন করা হয় যন্ত্র দিয়ে। আশেপাশের জেলায় যত হারভেস্টার ছিল, ছিল যত রিপার সব পাঠিয়ে দেয়া হয় হাওরে। করোনাকে ফাঁকি দিয়ে সুনামগঞ্জের শনির হাওরে ব্যস্ত সময় পার করছে জাপানিজ ইয়ানমার কোম্পানির স্মার্ট কম্বাইন হার্ভেস্টার। কৃষক নূরুজ্জামানের ধান ক্ষেতে। আর এভাবে বাংলাদেশ আপাত শঙ্কামুক্ত হয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের হাত ধরে।


আর এজন্য আমাদেরকে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ তিনিই এ অঞ্চলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন কলের লাঙ্গল, মানে ট্রাক্টর। নিজ হাতে সেই ট্রাক্টর চালিয়েছিলেন তিনি। আমাদের পতিসরে। বাংলাদেশে এখন কলের লাঙলের সংখ্যা অগণিত। প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। সারা দেশে এতদিন ছোট বড় হার্ভেস্টার ছিল আনুমানিক ২৪৫০টি এবং রিপার ৫০০০টি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে ২০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছেন সেখান থেকে দেশে যোগ হতে যাচ্ছে আরও প্রায় ১০২৫টি হার্ভেস্টার এবং ৫৫০টি রিপার। এসব যন্ত্রপাতি কিনলেই কৃষক পাচ্ছেন বিরাট অংকের ভর্তুকি। হাওর অঞ্চলের জন্য শতকরা ৭০ ভাগ আর অন্য অঞ্চলের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ। এসবের সাথে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নেয়া হয়েছে মেগা পরিকল্পনা। আশা করা যাচ্ছে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি সজ্জিত হবে নতুন রূপে। আধুনিক সব যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজবে বাংলাদেশের কৃষি।


বর্তমানে করোনাভাইরাসজনিত বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে, কৃষি সংক্রান্ত প্রধান নির্দেশনাটি হচ্ছে “খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অধিক প্রকার ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার করতে হবে। কোন জমি যেন পতিত না থাকে”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সকল নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের জন্য এরই মাঝে মাননীয় কৃষি মন্ত্রী পরামর্শ করেছেন এখাতে অভিজ্ঞজনের সাথে। জুম মিটিং প্ল­াটফর্মে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে,আলোচনা করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, এমিরিটাস অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, একাধিক সাবেক সফলকৃষি সচিব, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, কৃষি সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞ, বীজ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ বীজ এসোসিয়েশন, শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারক সমিতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ফার্মস, সুপারশপ মালিক সমিতিসহ কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গের সাথে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক এসব মতবিনিময় ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে আশা করা যায়। আগামী দিনগুলোতে বীজ, সার, সেচ ইত্যাদি কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের শর্তাবলি সহজীকরণ ইত্যাদি নানান বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সবাই গুরুত্বপূর্ণ মত দিয়েছেন। যেমনÑ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মতে     কৃষক পর্যায়ে ধানের মূল্য নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি সেচের খরচের প্রণোদনা প্রদান আবশ্যক। শুধু আলোচনা নয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রণয়ন করেছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন ‘করোনা ভাইরাস সারাবিশ্বকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে, এখানে কিন্তু খাদ্যাভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিতে পারে। আমদের মাটি উর্বর, আমরা কিন্তু নিজেদের চাহিদা পূরণ করে অনেককে সাহায্য করতে পারব।’ বাংলাদেশের কৃষি এগোচ্ছে সে পথেই।


মুশকিল হলো বাংলাদেশ চাইলেই তার প্রয়োজনীয় সকল কৃষিজ পণ্য উৎপাদন করতে পারবে না। কিছু কৃষিপণ্য আমাদের আমদানিই করতে হবে। যেমন গম। এক-দেড় মাসের শীতকালীন আবহাওয়া গম চাষের উপযোগী নয়। তাই গম চাষ এদেশে লাভজনকও নয়। যদিনা জমি পতিত থাকে। শুধু গম নয়। আরও অনেক পণ্যই আমাদের আমদানি করতে হয়, ভবিষ্যতেও করতে হবে। দেশে উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত প্রধান প্রধান কৃষিজ পণ্যের একটা নাতিদীর্ঘ তালিকা দেয়া যেতে পারে।


২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি-রফতানিকৃত বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের তথ্যঃ
 (তথ্য সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর)।
তাছাড়া, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ২৬.৫ লাখ টন ভোজ্যতেল। রফতানি হয়েছে কিছু চা, কাঁচা পাট এবং অল্প পরিমানের অন্যান্য কৃষিপণ্য। তথ্যচিত্র থেকে ধারণা করা যায় যে, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে খুব বেশি পরিবর্তন না এলে আগামী বছরেও আমদানির তালিকায় থাকবে গম, ভুট্টা, তেল ও ডাল জাতীয় দানাদার শস্য, পেঁয়াজ ও মসলা। বিগত বছরগুলোতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রণোদনামূলক কর্মসূচির কারণে ভূট্টা, তেল ও ডালজাতীয় দানাদার শস্যের উৎপাদন ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এবছর পেঁয়াজের সংকট মোকাবেলার অভিজ্ঞতা থেকে যোগ হয়েছে কিছু নতুন জাত। কৃষকও পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহিত হবে আশা করা যায়। উৎপাদনের গতিধারা পর্যালোচনা করলে বলা যেতে পারে আগামী বছর আমদানির তালিকার বড় অংশ জুড়ে থাকবে গম, ভোজ্যতেল এবং মসলা।


বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে পারস্পরিক সহযোগিতাই উন্নয়নের চালিকা শক্তি। তাছাড়া, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এত অল্প জমিতে সব ফসল করতে গেলে মূল খাদ্য চালই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। করোনা মোকাবেলার প্রধান হাতিয়ারও বৈশ্বিক সহযোগিতা। জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি Tijjani Muhammad-Bande যেমন বলেছেন,

Moving forward, I encourage all Member States to leverage South-South and Triangular Cooperation in order to strengthen agricultural systems. কৃষিতে করোনার প্রভাব মোকাবেলার জন্য সবাইকে সমভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। IFPRI তাদের এক প্রতিবেদনে কভিড -১৯ উদ্ভূত পুষ্টি সংকট মোকাবেলা করার জন্য কৃষি কেন্দ্রিক সাপ্লাই চেইন এবং ভ্যালু চেইনের সাথে সামাজিক দূরত্ব প্রয়োগ এবং স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাগুলি উন্নত করার উপর জোর দিয়েছেন। খামার থেকে শুরু করে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সকল প্রকার বাজার ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখার তাগাদা দিয়ে বলেছেন, Keep domestic and international food markets working

বাংলাদেশে কৃষির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই বাজার ব্যবস্থাপনা। দুর্বল ব্যবসায়িক নৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কৃষিজ বাজার। সকালের ৫০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ বিকালে হয়ে যায় ১৮০ টাকা। আবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সন্ধ্যায় নেমে আসে ১০০ টাকায়। ওয়াজ-নসিয়ত করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার নজির পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। যদিও কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ দেখাশোনা করার জন্য আছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এই সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবী। নচেৎ কৃষককে বারংবার হোঁচট খেয়েই যেতে হবে দোদুল্যমান বাজার ব্যবস্থার কাছে।


ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের আশার আলো দেখায়। গত বছর থেকে অন-লাইন অ্যাপ্সের ব্যবহার করা হয়েছে প্রকৃত কৃষক নির্বাচনের জন্য। পরে সরাসরি তাঁদের নিকট থেকে ধান ক্রয় হয়েছে। চারদিকে প্রশংসিত হয়েছে সরকারের এই উদ্যোগ। করোনাকালেও যোগ হয়েছে চমৎকার কিছু আইডিয়া। যেমন ত্রাণের উপকরণে যোগ হয়েছে সবজি, দুধ, ডিম, আলু। কৃষক সবজি বিক্রি করেছেন অন-লাইনে, অ্যাপ্সের মাধ্যমে। কৃষি বাতায়ন পেয়েছে কৃষক প্রিয়তা। জনপ্রিয় এসব ‘Food System Innovations’এর পেছনে কাজ করেছে মাঠ প্রশাসনের তরুণ, মেধাবী, বিচক্ষণ সরকারি কর্মকর্তাগণ।


অবশ্য কৃষি মানেই এখন শিক্ষিত, প্রাণচঞ্চল, সাহসী, উদ্যমী টগবগে যুবক-যুবতীর কর্মস্থল। তাঁদের পদচারণায় মুখর বাংলাদেশের কৃষি। এই সব যুবার হাত ধরেই দেশ আজ ফুলে-ফসলে পূর্ণ। চারদিকে চাল, ডাল, সবজির, ফলের ছড়াছড়ি। বিস্তর মাঠে দোল খায় উচ্চফলনশীল নানান জাতের ফসল। তাঁদের হাত ধরেই বাংলাদেশের কৃষি জয়ী হবে করোনা যুদ্ধে।
করোনা মহামারী বিশ্ব সভ্যতাকে দাঁড় করিয়েছে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে কৃষি অর্থনীতিতে এর প্রভাব হতে পারে অনেক গভীর। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব আছড়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষিতে। আবার একমাত্র কৃষিই হতে পারে বাংলাদেশের সামষ্ঠিক অর্থনীতির চালিকা শক্তি। করোনা মোকাবেলার হাতিয়ার। তাই কৃষি খাতের যতœ নিতে হবে শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে। গৃহীত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হবে নিখুঁত ভাবে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জন্য এ দেশের কৃষক উৎপাদন করত ১০০ লাখ টন চাল। ছিল অভাব, হাহাকার। টাকা দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা যেত না চাল। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি এক সভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান আফসোস করে বলেছিলেন, ‘দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেই আমি চাল কিনতে পারছিনা। চাউল পাওয়াযায়না। যদি চাউল খেতে হয় আপনাদের পয়দা করেই খেতে হবে।’ সেই বাংলাদেশ এখন চালে উদ্বৃত্ত। দেশ থেকে নাই হয়ে গেছে মরা কার্তিক। পালিয়ে গেছে মঙ্গা, ক্ষুধা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ আজ দানাদার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের কৃষকেরা পয়দা করে চলেছেনধান, ভুট্টা, সবজি, ফল। লাখ লাখ টন।
আন্তর্জাতিক বাজার আবারও অস্থিতিশীল হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আসন্ন এই সংকট মোকাবেলায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে।‘ এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাকে শিরোধার্য করে। নিশ্চয় একদিন করোনার আধার দূর হয়ে বাংলাদশের আকাশে উঠবে নতুন সোনালী সূর্য। আর সেদিন আমরা গেয়ে উঠবঃ
আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার প্রাণ।।
উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়, মোবাইল : ০১৮২০৮১০৫৭১, ই-মেইল : monsuralamkhan@gmail.com

বিস্তারিত
আউশ ধানের আধুনিক জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি

ড. এম. মনজুরুল আলম মন্ডল
বাংলাদেশে তিন মৌসুমে ধানের চাষ করা হয়- আউশ, আমন ও বোরো মৌসুম। বোরো ধান চাষে প্রচুর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহত হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর দিনে দিনে নিচে নামছে যা কাক্সিক্ষত নয়। যেহেতু আউশ ধানের আবাদ বৃষ্টি নির্ভর, সেহেতু এ ধান উৎপাদনে সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। ফলে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রচলিত শস্য পর্যায় পরিবর্তন করে বোরো ধানের চাষ বাদ দিয়ে শস্য পর্যায়ে আউশ ধান অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। তাছাড়া
বর্তমানে অবমুক্তকৃত উচ্চফলনশীল জাতের চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়।  
আউশ ধান দুইভাবে চাষ করা হয়। বোনা আউশ এবং রোপা আউশ। বোনা আউশের জনপ্রিয় আধুনিক জাতসমূহঃ ব্রিধান৪৩, ব্রিধান৬৫, ব্রিধান৮৩ এবং বিনাধান-১৯। রোপা আউশ ধানের আধুনিক জাতসমূহঃ ব্রিধান৪৮, ব্রিধান৮২, ব্রিধান৮৫,  বিনাধান-১৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৭।
আউশ ধানের জাতগুলোর বৈশিষ্ট্যসমূহঃ
বিনাধান-১৯ : প্রচÐ খরা সহিষ্ণু হওয়ায় খরা মাটি পছন্দ করে। বোনা ও রোপা উভয় পদ্ধতিতে চাষ উপযোগী। গাছ হেলে পড়ে না। জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন। চাল সরু ও লম্বা। ফলন ৪-৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৪৩ : জাতটি বৃষ্টি প্রবন এবং খরা প্রবন উভয অঞ্চরের জন্য উপযোগী। আগাম জাত, জীবন কাল ১০০ দিন। খরা সহিষ্ণু। কাÐ বেশ শক্ত বলে সহজে হেলে পড়ে না। ফলন ৩.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৪৮ : অধিক ফলনশীল এ জাতটি রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। জীবনকাল ১১০ দিন। কাÐ শক্ত। চাল মাঝারী মোটা ও সাদা। ফলন ৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৬৫ : বোনা আউশ মৌসুমের খরা সহনশীল জাত। গাছ খাটো ও কাÐ শক্ত হওয়ায় হেওে পড়ে না। শীষ থেকে ধান সহজে ঝড়ে পড়ে না। চাল মাঝারী চিকন ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। জীবনকাল ১০০ দিন। ফলন ৩.৫-৪ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৮২ : অধিক ফলনশীল এ জাতটি রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। গাছের উচ্চতা ১১০  সেমি.।  জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন। কাÐ শক্ত। চাল মাঝারী মোটা ও ভাত ঝরঝরে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৮৮৩ : বোনা আউশ মৌসুমের খরা সহনশীল জাত। গাছের উচ্চতা ১০০-১০৫ সেমি। কাÐ শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না এমনকি ধান পাকার পরও গাছ হেলে পড়ে না। দানার রং লালচে যা স্থানীয় কটকতারা জাতের অনুরুপ। চাল মাঝারী মোটা ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। জীবনকাল ১০৫ দিন। ফলন ৪-৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৮৫ : অধিক ফলনশীল এ জাতটি কুমিল্লা অঞ্চলসহ দেশের পূর্বাঞ্চলৈ রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। জলাবদ্ধতা সহনশীর হওয়ায় আউশ মৌসুমে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকাতেও চাষ করা সম্ভব। গাছের উচ্চতা ১১০  সেমি.। জীবনকাল ১০৮-১১০ দিন। কাÐ শক্ত। চাল মাঝারী লম্বা ও চিকন এবং ভাত ঝরঝরে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি হাইব্রিড ধান৭ : আউশ মৌসুমে চাষযোগ্য একমাত্র হাইব্রিড ধানের জাত। রোপা আউশ মৌসুমে প্রচলিত অন্যান্য জাতের চেয়ে অধিক ফলনশীন, ফলন ৬.৫-৭০ টন/হেক্টর। গাছের উচ্চতা   ১০০-১০৫ সেমি। কাÐ শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না। জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। ধানের আকৃতি সরু, লম্বা ও ভাত ঝরঝরে।
বীজ বপন : বোনা আউশের মূল জমিতে বীজ বপন ২৫ মার্চ হতে ২০ এপ্রিল, রোপা আউশের বীজতলায় বীজ বপন ৩০ মার্চ হতে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত উপযুক্ত সময়।
বীজ হার : ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে ১০ কেজি/বিঘা এবং সারিতে রোপনের ক্ষেত্রে ৬ কেজি/বিঘা।
চারার বয়স রোপণ : ১৫-২০ দিন। চারা রোপণ করতে হবে ১৫ এপ্রিল হতে ১০ মে পর্যন্ত।  প্রতি গোছায় ২টি করে ৮ ইঞ্চিদ্ধ৬ ইঞ্চি দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে।
সার ব্যবস্থাপনা  (প্রতি বিঘায়) : ইউরিয়া-১৫ কেজি, ডিএপি-৭ কেজি, এমপি-১০ কেজি, জিপসাম-৫ কেজি এবং দস্তা ০.৭ কেজি। শেষ চাষের সময় ১/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং অন্যান্য সকল সার প্রয়োগ করতে হবে। ২য় কিস্তি ইউরিয়া ৪-৫ টি কুশি দেখা দিলে (সাধারণত রোপনের ১৫-১৮ দিন পর) এবং ৩য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৬ দিন পূর্বে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে গন্ধক এবং দস্তার অভাব থাকলে শুধুমাত্র             জিপসাম এবং দস্তা প্রয়োগ করতে হবে। অন্য দিকে, বোনা আউশের ক্ষেত্রে ইউরিয়া সমান দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি শেষ চাষের সময় এবং ২য় কিস্তি ধান বপনের ৩০-৩৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
আগাছা দমন : সাধারণত হাত দিয়ে, নিড়ানী যন্ত্রের সাহায্যে অথবা আগাছানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে ৩০-৩৫ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে হবে। রোপা আইশ ধানের ক্ষেত্রে             প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসাবে বেনসালফিউরান মিথাইল+এসিটাক্লোর, মেফেনেসেট+বেনসালফিউরান মিথাইল ইত্যাদি গ্রæপের আগাছানাশক রোপনের ৩ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। বোনা আউশের জন্য                    প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসাবে পেনডামিথাইলিন, অক্সাডায়ারজিল এবং অক্সাডায়াজন গ্রæপের যে কোন আগাছানাশক বপনের ২/৩ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। রোপা/বোনা আউশ ধানের ক্ষেত্রে পোস্ট ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসাবে বিসপাইরিবেক সোডিয়াম, বেনসালফিউরান মিথাইল, ডায়াফিমনি, ইথক্সিসালফিউরান এবং ফেনক্সলাম গ্রæপের আগাছানাশক জমিতে আগাছা দেখা যাওয়ার পর প্রয়োগ করতে হবে। পরবর্তীতে  আগাছার অবস্থা বুঝে ৩৫-৪০ দিন পর একবার হাতে নিড়ানী দিতে হবে।
সেচ ব্যবস্থাপনা : চারা লাগানোর সময় বা বীজ বপনের সময় বৃষ্টিপাত না হলে সময়মত চারা রোপণ/বপনের জন্য সম্পূরক সেচ দিতে হবে। সরাসরি বীজ বপনের ক্ষেত্রে জমিতে জো অবস্থা বিরাজমান না থাকলে অংরিত বীজ জমিতে কাদা করে লাইনে/ছিটিয়ে বীজ বপন করতে হবে।
রোগ বালাই ব্যবস্থাপনা : আউশ মৌসুমে সাধারণত খোলপোড়া রোগ, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ, টুংরো এবং বাকানি রোগের প্রকোপ দেখা যায়। খোলপোড়া রোগ দমনের জন্য জমির পানি বের করে দিয়ে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে এমিস্টার টপ/টেবুকোনাজল/ফলিকুর ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। ব্যাকটেরিয়া জনিত পাতা পোড়া রোগের জন্য ৬০ গ্রাম
এমপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট এবং ২০ গ্রাম জিঙ্ক ১০ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করলে ভার ফল পাওয়া যাবে। টুংরো রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেরতে হবে। প্রয়োজনে টুংরোর বাহক সবুজ পাতা ফড়িং দমনে মিপসিন ব্যবহার করা যেতে পারে। বাকানি প্রবন এলাকায় বাকানি রোগ প্রতিরোধে অটিস্টিন নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটারে ২-৩ গ্রাম ১ কেজি বীজে মিশ্রিত কওে শোধন করা যেতে পারে।
পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা : আউশের মুখ্য পোকাগুলো- মাজরা পোকা, পামরি পোকা, থ্রিপস, গান্ধি পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং এবং বাদামি গাছ ফড়িং। পোকা দমনে আলোর ফাঁদ এবং পার্চিং ব্যবহার করতে হবে। মাজরা এবং বাদামি ঘাসফড়িং পোকা দমনের জন্য প্রয়োজনে কার্টাপ গ্রæপের        কীটনাশক সানটাপ ৫০ পাউডার এবং থ্রিপস, সবুজ পাতা ফড়িং ও গান্ধি পোকা দমনের জন্য কার্বোসালফান গ্রæপের কীটনাশক মারশাল ২০ ইসি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ধান কাটা ও মাড়াই : ৮০ ভাগ ধান পাকলে ধান কাটতে হবে। তাড়াতাড়ি মাড়াইয়ের জন্য ধান মাড়াই যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। বাদলা দিনে ধান মাড়াই করে সাধ্যমত ঝেরে বৃষ্টিমুক্ত (চালার নীচে) স্থানে ছড়িয়ে দিয়ে শুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। য়

চীপ সায়েন্টিফিক অফিসার, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১৬৭৪৯২৯, ই-মেইল : mmamondal@gmail.com

 

বিস্তারিত
বর্তমান প্রেক্ষাপটে করোনা ও খাদ্য নির্বাচন

খালেদা খাতুন
“Your Diet is a bank account. Good food choices are good investments”- Bethenny Frank
জ্যৈষ্ঠর তীব্র গরম ও কোভিড-১৯ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে শুরু হলো মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস, পবিত্র রমজান। এই বৈরী আবহাওয়ার পাশাপাশি বিশ^জুড়ে বিরাজমান করোনা মহামারী থেকে বাঁচতে ­­­­পৃথিবীময় চলছে যুদ্ধ, তবু মিলছে না মুক্তি। ইতোমধ্যে বিশ^ব্যাপী এ ভাইরাস প্রাণহানি ঘটিয়েছে প্রায় পৌনে ৩ লক্ষ মানুষের। করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য দেশব্যাপী চলছে সাধারণ ছুটি।
রোগ, রোগের ধরণ, বিস্তার ও পরিণতি
স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস জীবনযাপন মানুষকে অসুস্থতা অর্থাৎ রোগের হাত থেকে রক্ষা করে। রোগ হচ্ছে মানুষের এক ধরনের অসুস্থতা যা তার শরীরের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই অবস্থায় মানবদেহ তার প্রয়োজনীয় কার্যাবলী সঠিকভাবে সম্পাদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মানুষ সাধারণত দু’ ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়- ১. সংক্রামক রোগ ২. অসংক্রামক রোগ
সংক্রামক রোগগুলো খুব সহজেই অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে ও শরীর হতে সংস্পর্শ হাঁচি, কাশি, থুতু বা কীটপতঙ্গের মাধ্যমে অন্য মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। এগুলো জীবাণুর মাধ্যমে ছড়ায় এবং জীবাণু বাতাস, খাবার, পানি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে।
অন্যদিকে অসংক্রামক রোগগুলো সংস্পর্শে বা অন্যকোনো মাধ্যমে ছড়ায় না। এই রোগগুলো সাধারণত: মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন পদ্ধতি, জন্মগত শারীরিক অবস্থা, জিনগত বৈশিষ্ট্য বা তার চারপাশের পরিবেশ দূষণ অবস্থার কারণে সৃষ্ট রোগ। এগুলো হচ্ছে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ইত্যাদি।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, সারাবিশে^ সকল মৃত্যুহারের মধ্যে প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে মারা যাচ্ছে-৭০%। এর মধ্যে সিভিডি-১৯.৯ মিলিয়ন, সিভিডি ক্যান্সার-৯.০ মিলিয়ন ফুসফুসীয় রোগে ৩.৯ মিলিয়ন, ডায়াবেটিসে ১.৬ মিলিয়ন প্রতি বছর লোক মারা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ২০ মিলিয়ন মারা যাচ্ছে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে। এর মধ্যে ১৬ মিলিয়ন অর্থাৎ ৮০% ইনফেকশাস বা প্যারাসাইটিক রোগে মারা যাচ্ছে। এদের মধ্যে য²া-৩         মিলিয়ন, ম্যালেরিয়া-২ মিলিয়ন, হেপাটাইটিস-বি-সম্ভবত ১    মিলিয়ন প্রতি বছর মারা যাচ্ছে।
করোনাভাইরাস বলতে ভাইরাসের একটি শ্রেণীকে বোঝায় যা মানুষের মধ্যে শ^াসনালীর সংক্রমণ ঘটায়। করোনাভাইরাস রাইবোভিবিয়া পর্বের নিদুভাইরাসবর্গের  করোনাভিরিডি গোত্রের অর্থোকরোনাভিরিন্যা উপগোত্রের সদস্য।
মুকুটসদৃশ এ সংক্রামক ভাইরাসটি পজিটিভ সেন্স একক সূত্রবিশিষ্ট আবরণীবদ্ধ ভাইরাস যার উপরিভাগে প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিন সংক্রমিত হওয়া টিস্যুকে নষ্ট করে। ভাইরাসটি কোনো জীবন্ত সত্তা নয় বরং এটি প্রোটিন অনু (ডিএনএ), লিপিড এর প্রতিরক্ষা আবরণী দ্বারা আবৃত যা জেনেটিক কোড পরিবর্তন করে। এর পাতলা চর্বির স্তর দ্বারা আবৃত           বহিঃআবরণ থাকে। এ কারণে সাবান বা ডিটারজেন্ট এক্ষেত্রে উত্তম প্রতিরোধ কেননা সাবানের ফেনা চর্বি কাটাতে সাহায্য করে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে কিছু কিছু গবেষকদের মতে এর স্থায়িত্ব ২৪ দিন পর্যন্তও থাকতে পারে।  আবহাওয়া, আর্দ্রতা ও বস্তুর উপর এটি অবস্থান করে এ বিষয়গুলোর উপর ভাইরাসটির পতনকাল নির্ভর করে। দুর্বল ও ক্ষণস্থায়ী এ ভাইরাসটি নিজে নিজেই ধ্বংস হয়।
করোনা প্রতিরোধে প্রথম শর্ত হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখা। ইমিউনিটি ঠিক রাখার জন্য চাহিদা অনুযায়ী যার যতটুকু খাবার প্রয়োজন তা গ্রহণ করতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন খাবারটি ব্যালান্সড ডায়েট হয়।
উল্লেখ্য, পিএইচ ৫.৫-৮.৫ এর মধ্যে এ ভাইরাসটির                বিস্তৃতি। তাই যেসব খাদ্যে পিএইচ এর পরিমাণ ৮.৫ এর বেশি সেসব খাদ্য গ্রহণ আবশ্যক। এখানে কিছু ফল ও তাদের পিএইচ মাত্রা দেয়া হলো।
ফলের নাম                    পিএইচ মাত্রা
লেবু            ৯.৯
বাতাবি লেবু        ৮.২
আভাকাডো        ১৫.৬
রসুন            ১৩.২
আনারস            ১২.৭
কমলা            ৯.২
ঞধহমবৎরহব        ৮.৫
উধহফবষরড়হ        ২২.৭
করোনাভাইরাস যেভাবে ছড়ায়
- মূলত বাতাসের এয়ার ড্রপলেট এর মাধ্যমে
- হাঁচি ও কাশির ফলে
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে
- ভাইরাস আছে এমন কোনো কিছু স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে  মুখে, নাকে ও চোখে লাগালে।
- পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
লক্ষণ
- সর্দি, কাশি, জ¦র, মাথাব্যথা, গলাব্যথা
- মারাত্মক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে করণীয়
কিছুক্ষণ পর পর সাবান পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া। এক্ষেত্রে গরম পানি ব্যবহার অধিক শ্রেয়। কারণ, করোনাভাইরাসের বহিঃআবরণে যে পাতলা চর্বি স্তর রয়েছে তা তাপে গলে যায়। তাই সাবান বা ডিটারজেন্ট এক্ষেত্রে উত্তম প্রতিরোধক হলেও সাথে গরম পানির ব্যবহার ভাইরাস নিধনের গতিকে ত্বরান্বিত করে। তাই হাত ধোয়া, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য কাজের জন্য গরম পানি ব্যবহার করতে হবে।
- প্রচুর ফলের রস ও গরম পানি পান করা
- হাত না ধুয়ে মুখ, চোখ ও নাক স্পর্শ না করা
- হাঁচি, কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা
- মুখে মাস্ক ব্যবহার করা
- ঠাÐা বা ফ্লু আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে না মেশা
- বন্য জন্তু কিংবা গৃহপালিত পশুকে খালি হাতে স্পর্শ না করা
- মাংস, ডিম খুব ভালোভাবে রান্না করা
- হাঁচি কাশি দেয়ার পর, রোগীর সুশ্রƒষা করার পর, টয়লেট করার পর ও খাবার প্রস্তুত করার আগে ও পরে পরিষ্কার করে হাত ধুতে হবে।
- পরিষ্কার করলে যেকোন প্রকারের অ্যালকোহলিক মিশ্রণ (যাতে অ্যালকোহলের পরিমাণ ৬৫% এর উপরে) ব্যবহার করতে হবে কারণ সেটি ভাইরাসের বহিঃ স্তরকে দূরীভ‚ত করতে পারে।
সুস্থ থাকতে রমজান, গ্রীষ্মকাল, করোনা    মহামারী, লকডাউন এ সবকিছুকে মাথায় রেখে আমাদের সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা নির্বাচন করতে হবে।
করোনা প্রতিরোধে প্রথম শর্ত হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখা। শরীরকে স্ট্রেস ফ্রি রাখা। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই এ সময়ে ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, ভিটামিন এ, ই, সি, বিটা-ক্যারোটিন, জিংক, মেলেনিয়াম এগুলো অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ভিটামিন ও মিনারেল। এবারের রোজায় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সতর্কতা মেনে চলাও আবশ্যক যাতে সুস্থতার সাথে রোজা পালন করা যায়। জ্যৈষ্ঠের এই সময়ে প্রায় ১৫ ঘন্টা সময় রোজা রাখার পর ইফতার করতে হবে। তাই খাদ্য গ্রহণে লক্ষণীয় বিষয়সমূহ
- পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করে দেহের পানি স্বল্পতা দূর করা;  কেননা ডিহাইড্রেশন দেহের ইমিউনিটিকে দুর্র্বল করে দেয়। চোখ, নাক, মুখ, ফুসফুসের মিউকাস কমে যায়। ফলে জীবানু আক্রমণ দ্রæত হয়। মিউকাস দেহকে জীবাণু সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে।
- চাহিদা অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণ করা।
- অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ। ভিটামিন ও মিনারেল যেমন - ভিটামিন-এ, সি, ই, বিটা ক্যারোটিন, জিংক ও  মেলেনিয়াম ইত্যাদি।
- কড়াভাজা ও ভুনা খাবার পরিহার করা। কারণ, এগুলো শরীরে ফ্রি রেডিকেল তৈরী করে।
- প্রতিদিন ১টি ডিম খাদ্যতালিকায় রাখুন। কারণ ডিমের কুসুমে ভিটামিন এ, ডি, জিংক কোলিন, মেলেনিয়াম সমৃদ্ধ এবং ডিমের প্রোটিন উচ্চ জৈবমূল্য সমৃদ্ধ।
- তাজা রঙিন শাকসবজি ও ফল প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা। এরা ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হজমে সাহায্য করে।
- একজন ব্যক্তির বয়স, ওজন, উচ্চতা কাজের ধরন এবং বাজারে খাদ্যের প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করে চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিনের খাদ্য নির্বাচন করতে হবে। সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে তাই এ বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে সারা বছরের খাদ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
- দীর্ঘসময় পেট খালি থাকার কারণে বিপাক ক্রিয়ার গতি কমে যায়। সেই সাথে হুট করে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণে লিভার ও            কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তাই ইফতারি হতে হবে হালকা কিন্তু উচ্চ জৈবমূল্য সমৃদ্ধ খাবার। যেমন: ছোলা-খেজুর, ডিম, ফল। ইফতার শেষ করে মাগরিবের নামায এর পর খাদ্যতালিকায় নির্ধারিত সকালের খাবারটি রাখা যেতে পারে। এরপর তারাবি নামাযের শেষে বা পূর্বে রাতের খাবার খাবে। নির্ধারিত দুপুরের খাবারটি খেতে হবে সেহরীতে। খাওয়া শেষে ১ কাপ দুধ খেতে হবে। যাদের দুধে সমস্যা তারা ১ কাপ দুধের  তৈরী টকদই খেতে পারেন। সেহরিতে খুব আগে খাওয়া শেষ না করাই ভালো। সেহরিতে এমনভাবে খেতে হবে যেন সময় শেষ হবার ঠিক পূর্বমুহূর্তে খাদ্য গ্রহণ শেষ হয়। এ বিষয়টি বিশেষভাবে ডায়াবেটিক রোগীদের।
- খাদ্যতালিকা হতে কার্বহাইড্রেট কোনভাবেই বাদ দেয়া যাবে না।
ফল হলো বিভিন্ন ভিটামিন, মিনারেল, আঁশ এবং নানা রকম প্রাকৃতিক ফটোকেমিক্যাল এর উৎস। যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ  ক্ষমতা উৎপন্ন করে শরীরকে সুস্থ সবল  ও কর্মক্ষম রাখে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব। বলা হয়ে থাকে, জ্যৈষ্ঠ মাস হলো মধুমাস। তাই এ সময়ের পাকা আম, পেঁপে, কাঁঠাল, তরমুজ, বাঙি এসব ফল থেকে প্রাপ্ত বিটা-ক্যারোটিন ও লাইকোপিন শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। পেয়ারা, আমড়া, করমচা, অরবরই, পায়লা, আমলকী, কমলালেবু, জাম্বুরা ইত্যাদি টকজাতীয় ফল ভিটামিন সি এর ভালো উৎস। এবং শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টি অক্সিডেন্ট দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উৎপন্ন করে। নানারকম সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে।
সুতরাং আসুন আমরা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণ করি এবং নিজে ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রেখে সুস্থ জাতি গঠন করি যা আমাদের ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং  কে সফল করি বা সুন্দর কর্মমুখর পৃথিবীর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনি আর কিছুদিন ঘরে থাকি ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার              আইইডিসিআরের নির্দেশনা মেনে চলি। আর উপরের নিয়ম মেনে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলি। তবেই আমরা সুস্থ থাকবো আগামীর দিনগুলোতে। “আইন প্রয়োগ করে নয়, ব্যক্তিগত সচেতনতাই উন্নত জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার।” য়
প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা, বারডেম, শাহবাগ, ঢাকা, মোবাইল : ০১৭০৩৭৯৬২৬৯, ই-মেইল : birdem@yahoo.com

 

বিস্তারিত
অতি গরমে পোল্ট্রির পীড়ন/ধকল ও তার প্রতিকার (কৃষিকথা ১৪২৭ )

কৃষিবিদ মোঃ ফজলুল করিম

প্রাণিজ আমিষের বড় একটা অংশ আসে পোল্ট্রি শিল্প থেকে। প্রায় অর্ধকোটি মানুষে জীবন জীবিকা এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত তাই এ শিল্পের সুদৃঢ় ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গরমকাল এ পোলট্রি খামারে বিশেষ যতœ না নিলে কমে যেতে পারে ব্রয়লারের ওজন বৃদ্ধি এবং লেয়ার খামারের ডিম সংখ্যা। গ্রীস্মকালে আমাদের দেশে অনেক অঞ্চলের তাপমাত্রা কয়েক বছর ধরে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এর উপরে চলে যায়। এই সময় উচ্চ উৎপাদনশীল মুরগির জন্য যে সমস্যা বড় আকার ধারণ করে তা হলো হিটস্ট্রোক। এ সময় পানির দুষ্প্রাপ্রতা, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া ছাড়াও পানিতে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে মুরগি বড় ধরনের ধকলে আক্রান্ত হয়। গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে যে সময়টাতে তাপমাত্রা বেশি থাকে সেই সময় ফিড ফর্মুলেশনে নি¤œলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মুরগির হিটস্ট্রোক অনেকাংশে কমানো যায়।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও এর প্রভাব
ঘর্মগ্রন্থি না থাকার কারণে মোরগ-মুরগির অতিরিক্ত গরম অসহ্য লাগে। এতে উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত তাপে এদের পানি গ্রহণ, শ্বাস-প্রশ^াস,শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। অপর দিকে থাইরয়েড গ্রন্থির আকার রক্তচাপ, নাড়ির স্পন্দন, রক্তের ক্যালসিয়ামের সমতা খাদ্য গ্রহণ, শরীরের ওজন ও ডিমের উৎপাদন হ্রাস পায়। ১ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এদের উৎপাদন সর্বোচ্চ ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ডিমের ওজন শতকরা ৪ভাগ হারে পানি গ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পর থেকে ডিমের সংখ্যা না কমলেও প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ডিমের ্ওজন শতকরা এক ভাগ হারে করে যায়। ২৬.৫ সেলসিয়াস ডিগ্রি তাপমাত্রার পর থেকে মোরগ-মুরগির খাদ্যের রূপান্তর ক্ষমতা হ্রাস পায়। ২৭ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে প্রতি ডিগ্রি তাপ বৃদ্ধিতে ২ থেকে ৪ শতাংশ খাবার গ্রহণ কমে যায়। ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মোরগ-মুরগির জন্য অসহনীয় এবং ৩৮ ডিগ্রির পর মৃত্যু হার খুব বৃদ্ধি পায়।
তাপজনিত ধকল প্রতিরোধ
খামারের আশেপাশে ছায়াযুক্ত বৃক্ষরোপণ এবং ঘর পর্ব-পশ্চিমে হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনায় বায়ু          সিকিউরিটির কথা চিন্তা করে গাছপালা রোপণের প্রতি অনুৎসাহিত করা হয়ে থাকে। গরমে পোল্ট্রি শেডে প্রত্যক্ষ সূর্যালোক পড়া যাবে না। অত্যাধিক গরম প্রতিরোধে প্রয়োজনে শেডের ছাদে বা টিনের চালায় দিনে           ২-৩ বার পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। টিনের নিচে চাটাই বা হার্ডবোর্ড দিয়ে সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় মুরগি যখন হা  করে শ^াস-প্রশ^াস নেয় তখন ঘরে স্প্রে মেশিন দিয়ে কুয়াশার মতো করে পানি ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। পানির ড্রিংকার ও ফিডারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ঘন ঘন ড্রিংকারের পানি পাল্টাতে হবে। গরমে বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়া কারণে শেডে মেঝে অনেক সময় স্যাঁতস্যেঁতে হয়ে লিটার দ্রæত ভিজে যায়। ফলে রোগের আক্রামণও বাড়ে। সে জন্য প্রতিদিন সকালে ব্রয়লার শেডের লিটার উলোট-পালট করা প্রয়োজন। লিটারে গুঁড়ো  চুন ব্যবহার করলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। শেড থেকে  শেডের দুরূত্ব ৩০ ফুটের বেশি হলে ভালো হয়। শেডের মোরগ-মুরগির ঘনত্ব বেশি হলে তা কমিয়ে দিতে হবে। বাতাসে অবাধ চলাচল শেডের ভেতরের তাপমত্রা শীতল রাখতে সাহায্য করবে এবং পোল্ট্রির জন্য ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাসমুক্ত রাখবে। শেড স্টেন্ড ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে।
খামার ব্যবস্থাপনা   
ঠাÐা ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। যেহেতু তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এদের খাদ্য গ্রহণ কমে যায়,সেহেতু প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ৮ থেকে ১০ ভাগ শক্তি কমিয়ে প্রোটিন, খনিজ লবণ ও ভিটামিন বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ১০-১২ গ্রাম গøুকোজ ও মুরগি প্রতি ১০ গ্রাম ভিটমিন সি পানির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এছাড়া প্রাকৃতিক বিটেইনে ধনাতœক ও ঋণাত্মক আছে যা কোষের মধ্যে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে হিটস্ট্রোকের হাত থেকে এরা রক্ষা পায়। গরমে পোল্ট্রির অ্যামাইনো অ্যাসিডের চাহিদা বেড়ে যায়। বিটেইনে মিথাইল মূলক বিদ্যমান,যা মিথিওনিন ও কলিনের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। গরমে প্রয়োজনে একদিনের বাচ্চার জন্য পানিতে আখের গুড়, ভিটামিন সি অথবা ইলেকট্রোলাইট যুক্ত স্যালাইন পানি দিতে হবে। নি¤েœ গরমের সময় পোল্ট্রির পুষ্টি উপাদানসমূহ পোল্ট্রির দেহে কাজ করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে।
ক্রড প্রোটিন : গ্রীস্মকালে প্রোটিনের উৎস হিসেবে উদ্ভিজ উৎসকে বাঁছাই করলে খবুই ভালো হয়। কারণ প্রাণিজ প্রোটিন হজমের সময় বেশি হিট তৈরি হয়।
ভিটামিন সি : হিটস্ট্রেসের সময় ভিটামিন সি এর পরিমাণ কমে যায় ফলে ফিডের সাথে অতিরিক্ত ভিটামিন সি  সরবরাহ  (২০০-৪০০ গ্রাম/টন) করতে হয়। উল্লেখ থাকে যে ফিডে ভিটামিন সরবরাহ করলে পানিতে নতুন করে দেয়ার প্রয়োজন নেই।
সোডিয়াম বাই কার্বোনেট : সোডিয়াম বাই কার্বোনেট ফিডের সাথে দিলে পানি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সিস্টেমিক এসিডোসিসকে রোধ করে।
বিটেইন : বিটেইন কোষের মধ্যে পানি সামঞ্জ্যসতা ঠিক রাখে বা অসমোলাইট হিসেবে কাজ করে।
মুরগি নিজেই একটি ডিম/মাংস উৎপাদনের কারখানা। বর্তমান অধিক উৎপাদনশীল মুরগির গরম সহ্য করার ক্ষমতা খুবই কম, যার ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে গেলেই মুরগির হিট স্টোক করে। হিট স্টোক প্রতিরোধ করার জন্য একটি  কার্যকরী উপাদান হল বিটেইন।
অ্যান্টি অক্সিজেন : হিটস্ট্রেসে অক্সিডেটিভ মেটাবলিজম বেশি হয় ফলে বেশি পরিমাণে মুক্ত রেডিক্যাল তৈরি হয়। এই মুক্ত রেডিক্যালগুলো কোষের পদার্থকে নষ্ট করে দেয়। মুক্ত রেডিক্যালকে রোধ করার জন্য ফিডের সাথে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যোগ করতে হয়। অ্যান্টি অকিডেন্টের মধ্যে রয়েছে          ভিটামিন-ই, ভিটামিন-সি ইত্যাদি।
অ্যান্টি কক্সিডিয়াল : গ্রীস্মকালে নিকারবাজিন, মোনেনসিন ফিডে দেয়া ঠিক না। কারন এগুলো পানি গ্রহণের মাত্রাকে কমিয়ে দেয়।
ভিটামিন কে : গ্রীস্মকালে ঠোট কাটতে চাইলে (ডিবেকিং) ফিডে ভিটামিন কে দিতে হয়। কারণ হিট স্টেস রক্ত জমাট বাঁধার সময়কে দীর্ঘয়িত করে।
টক্্িরন বাইন্ডার : গ্রীষ্মকালে যখন আদ্রতা বেশি থাকে সেই সময় ফিডে টক্্িরন তৈরি হয় যা রোধ করার জন্য টক্সিন বাইন্ডার দিতে হয়।
পানি : গ্রীস্মকালে  পানিতে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি থাকে, ফলে পানি সঠিক মাত্রায় বিশুদ্ধ করতে হবে। তাছাড়াও পানির পাইপ ট্যাংক নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে।
লিটার ব্যবস্থাপনা : যেহেতু গ্রীষ্মকালে পানি গ্রহণ বেশি করে এবং প্রসাবের পরিমাণও বেড়ে যায় এবং অ্যামেনিয়া বেশি উৎপন্ন হয় তাই লিটার শুষ্ক রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। য়

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা, মোবাঃ ০১৭২৪-১৪১৬৬২, ই-মেইল fazlurahi@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
ধান উৎপাদনে সার সাশ্রয়ী প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া প্রযুক্তি

নূর উদ্দীন মাহমুদ১ দিপালী রানী গুপ্তা২ মোঃ তোফাজ্জল ইসলাম৩
ব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সকল পরিবেশে বিরাজমান এবং বৈচিত্র্যময় এককোষী জীব। সকল বহুকোষী জীবের সংস্পর্শে এমনকি অন্তঃকোষীয় অঞ্চলেও ব্যাকটেরিয়া বসবাস করতে পারে। এদের অধিকাংশই জীব ও পরিবেশের জন্য উপকারী এবং অপরিহার্য। উদ্ভিদের দেহের বহিঃত্বক ও অন্তঃকোষীয় অঞ্চলে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে  উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া বলা হয়।
এসব ব্যাকটেরিয়া নানাভাবে  উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে। এদের ব্যবহারে  শস্যের ফলন বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদের গুণগতমানের উন্নয়ন ঘটে। স্থানীয় পরিবেশ থেকে আহরিত এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়া দামি রাসায়নিক সারের বিকল্প অণুজীব সার বা উদ্ভিদ বৃদ্ধিকারক হিসাবে ব্যবহার করলে ফসল উৎপাদন খরচ বহুলাংশে কমানো যায়। এদের ব্যবহারে উদ্ভিদে রোগবালাইর আক্রমণ হ্রাস পায়।   প্রকৃতি থেকে আহরিত এসব মূল্যবান ‘জৈব সোনার’ ব্যবহার টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনে সহায়ক।
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বাণিজ্যিক ব্যবহারের  প্রয়োজনীয়তা
আগামী ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৭০ কোটিতে উন্নীত হবে। এ বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য খাদ্যোৎপাদন শতকরা ৭০-১০০ ভাগ বৃদ্ধি আবশ্যক। শস্য উৎপাদনে অধিক পরিমাণ কৃত্রিম রাসায়নিক সারও বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। তবে কৃষিতে রাসায়নিক পদার্থের অধিকতর ব্যবহার  পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলছে, যা টেকসই কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তার অন্তরায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর ধান ও অন্যান্য ফসলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন। তন্মোধ্যে, ৫০ ভাগের বেশি ইউরিয়া এবং প্রায় সম্পূর্ণ ফসফেট ও পটাশ সার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ফলশ্রæতিতে, একদিকে ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অপরদিকে সার আমদানিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। এক্ষেত্রে, প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া একটি সম্ভাব্য বিকল্প টেকসই প্রযুক্তি হতে পারে, যা রাসায়নিক সারের ব্যবহার বহুলাংশে কমাবে।
বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার ফসল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে কৃষিতে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াজাত সার ও বালাইনাশকের বর্তমান বাজারমূল্য ২০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। সুতরাং, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নিজস্ব পরিবেশ থেকে       আহরিত ‘জৈব সোনা’ খ্যাত উপকারী প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াকে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে ফসল উৎপাদনে ব্যবহার খুবই প্রয়োজন।
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার উৎস
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া সাধারণত দু’ধরনের হয়ে থাকে। এক. উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গের বহিঃত্বকে, এবং ২. উদ্ভিদের কোষকলার অভ্যন্তরে বিদ্যমান প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া।উদ্ভিদের বহিঃত্বকে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া সাধারণত মূল, কাÐ, পাতা, ফুল ও ফলের বহিঃত্বক হতে সংগ্রহ করা হয়। উদ্ভিদের কোষকলায় বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গের অন্তস্থ কোষকলা থেকে আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়।
প্রকৃতি থেকে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া আহরণ কৌশল
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া আলাদাকরণ ও বাছাইকরণ : সাধারণত গবেষণাগারে উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গ হতে অণুজীবীয় পদ্ধতিতে  এদেরকে আলাদা করা হয়। ব্যাকটেরিয়াকে আলাদা করে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট আবাদ মাধ্যমে এদের বিভিন্ন কার্যকারিতা যেমন: বায়ুমÐলীয় নাইট্রোজেন সংযোজন, পটাশিয়াম ও ফসফেট দ্রবীভূতকরণ, উদ্ভিদ হরমোন উৎপাদন ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে বাছাই করা হয়। সুনির্দিষ্ট আবাদ মাধ্যমে রঙের নির্দেশক এবং অদ্রবণীয় পুষ্টি উপাদান সম্বলিত যৌগ দ্রবীভ‚ত করে স্বচ্ছ অঞ্চল সৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে ব্যাকটেরিয়াগুলোর উপকারী কার্যকারিতা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণ : ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণ সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়মমাফিক পরীক্ষা যেমন- দৈহিক, শারীরবৃত্তীয় এবং জৈব রাসায়নিক পরীক্ষা এবং জিন সিকোয়েন্সিং ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করে কোন প্রজাতির তা শনাক্ত করা হয় । নিয়মমাফিক পরীক্ষার মধ্যে এদের রং,            আকৃতি, মার্জিন, উচ্চতা, দ্রবণীকরণ এলাকা, অপটিক্যাল ঘনত্ব, বায়োফিল্ম তৈরি, গ্রাম স্টেইনিং, বিভিন্ন এনজাইম ও স্টার্চ উৎপাদন, জৈব এসিডের ব্যবহার এবং এন্টিবায়োটিক উৎপাদন ক্ষমতা নির্ণয়ের মাধ্যমে এদের বাণিজ্যিক ব্যবহারে সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করা হয়। পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য বিশ্লেষণ করেও এদের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া উপকারিতা
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া নানাভাবে উদ্ভিদের উপকার করে থাকে (১) বাতাস হতে নাইট্রোজেন সংযোজন করে উদ্ভিদ পুষ্টিতে সহায়তা; (২) মৃত্তিকায় বিদ্যমান জৈব ও অজৈব অদ্রবণীয় আবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানকে দ্রবীভ‚ত করে উদ্ভিদের পরিশোষণে সহায়তা; (৩) নানারকম রাসায়নিক পদার্থ যেমন উদ্ভিদ হরমোন (অক্সিন, জিবেরেলিন ইত্যাদি) এবং অন্যান্য বৃদ্ধিকারক নিঃসরণ করে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে।
এছাড়াও এরা নানারকম এনজাইম ও গৌণ রাসায়নিক বিপাকীয় উৎপাদ (যেমন- এন্টিবায়োটিক) নিঃসরণ করে উদ্ভিদকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করে। উল্লেখ্য যে, উদ্ভিদের জিনসমূহের প্রকাশেও এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে উদ্ভিদকে জৈবিক ও অজৈবিক ঘাতসমূহ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
উদ্ভিদ বৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব
বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক এবং জিন সিকোয়েন্সিং দ্বারা শনাক্তকৃত উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে গবেষণাগারে ধানের বীজের অঙ্কুুরোদগম এবং চারার বৃদ্ধিতে পরীক্ষা করা হয়। এ পদ্ধতিতে ধানের বীজ ব্যাকটেরিয়া দ্রবণে একরাত্র ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে  জীবাণুমুক্ত পানি দিয়ে টিস্যু পেপার বা ফিল্টার পেপার ভিজিয়ে পেট্রিডিশে বীজগুলোকে রাখা হয় । এক সপ্তাহ পর ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার ব্যতীত অঙ্কুরিত চারার সাথে ব্যাকটেরিয়া সংযোজিত চারা গাছের তুলনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায় যে, ব্যাকটেরিয়া সংযোজিত বীজের অঙ্কুুরোদগম হার এবং অঙ্কুরিত চারার মূল ও কাÐের দৈর্ঘ্য এবং ওজন ব্যাকটেরিয়া ছাড়া চারার তুলনায় অনেক বেশি হয়। এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে সর্বোত্তমগুলোকে পরবর্তী গ্রীনহাউজ পরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়।
গ্রীনহাউজ ও মাঠে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার  কার্যকারিতা যাচাইকরণ
গবেষণাগারে পেট্রিডিশে যেসব ব্যাকটেরিয়া সর্বোচ্চ কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে, তাদেরকে প্রথমে গ্রীনহাউজে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ধান গাছের দৈহিক ও ফলন বৃদ্ধিতে কতটুকু প্রভাব আছে, তা পরীক্ষা করা হয়। যেসব ব্যাকটেরিয়া ভালো ফলাফল প্রদর্শন করে, সেগুলোকে বাছাই করে গবেষণা মাঠের উন্মুক্ত পরিবেশে ধান ফসলের দৈহিক বৃদ্ধি, উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদান গ্রহণ এবং ফলন বৃদ্ধিতে এদের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। পরিশেষে, গ্রীনহাউজ এবং মাঠের উভয় পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচিত ব্যাকটেরিয়া কৃষকের মাঠে ধান উৎপাদনে ব্যবহার করে চ‚ড়ান্ত মূল্যায়ন করা হয়। মাঠ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে রাসায়নিক সারের বিকল্প প্রোবায়োটিক সার উৎপাদনের জন্য উচ্চ কার্যকারিতা সম্পন্ন ব্যাকটেরিয়া নির্বাচন করা হয়।
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া থেকে জৈব সোনা সার তৈরিকরণ
বর্তমানে বায়োফার্টিলাইজার বা অণুজীব সার পাউডার অথবা তরল আকারে বাজারজাত করা হয়। অণুজীব সার তৈরির ক্ষেত্রে একক কার্যকারিতা সম্পন্ন ব্যাকটেরিয়া অথবা ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতার একাধিক ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সেক্ষেত্রে, মিশ্রণে ব্যবহৃত ব্যাকটেরিয়ার সহাবস্থান গবেষণাগারে পরীক্ষা করে নিতে হয়। সাধারণত মিশ্র অণুজীব সার অধিক কার্যক্ষম হয়, কারণ অনেকগুলো ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের শিকড়ে বসতি স্থাপন করে একাধিক কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। তাছাড়া মাটিতে অবস্থানকারী অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সাথে খাদ্য ও অবস্থানগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। এভাবে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ (যা কখনো নিঃশেষ হবার নয়) থেকে জৈব সোনা প্রোবায়োটিক সার তৈরি করা হয়। আমাদের গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, এসব সার ব্যবহারে ধান ও অন্যান্য ফসলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ কমানো সম্ভব।
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াসার ফসলে প্রয়োগ কৌশল
উদ্ভিদের প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগের বিভিন্ন কৌশলের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে এর কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং মাটিতে গাছের শিকড়াঞ্চলে এর উপস্থিতি টেকসই করা যায়। এদের ব্যবহারের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বীজ বপনের পূর্বে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে বীজের উপর আবরণ (বায়োফিল্ম) তৈরি করা। এজন্য পানিতে ব্যাকটেরিয়া দ্রবণ তৈরি করা হয়। বীজকে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টাকাল ব্যাকটেরিয়া দ্রবণে ভিজিয়ে বায়োফিল্ম তৈরিতে সহায়তা করা হয়। ব্যাকটেরিয়া সংযোজিত বীজ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বপন করা হয়। প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া চারা গাছেও ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে, বীজতলা হতে চারাগাছ শিকড়সহ উত্তোলনের পরে ভালোভাবে শিকড়ের মাটি পরিষ্কার করে ব্যাকটেরিয়ার দ্রবণে সারারাত ভিজিয়ে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। আইবিজিই উদ্ভাবিত জৈব সোনা প্রোবায়োটিক সার ব্যবহারে শতকরা ৫০ ভাগ রাসায়নিক সারের ব্যবহার হ্রাস পায়, ফলে ফসল উৎপাদনে খরচ কমে এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয়। সুতরাং, বাণিজ্যিকভাবে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন এবং কৃষক পর্যায়ে এদের ব্যবহারে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। য়

১গবেষণা সহযোগী, ইমেইল tofazzalislam@yahoo.com  ; মোবাইল ঃ ০১৭১৪০০১৪১৪, ২সহযোগী অধ্যাপক, ৩পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৬

 

বিস্তারিত
রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যবহার উপযোগী চারা উৎপাদনের কলাকৌশল

শারমিন ইসলাম১, ড. মো: দুররুল হুদা২,

ড. মো: আনোয়ার হোসেন৩, ড. মো: গোলাম কিবরিয়া ভূঞা৩, ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান৪

জনসংখ্যার দ্রæত বৃদ্ধি, ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি কৃষির অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রকৃতি নির্ভর কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থাৎ যান্ত্রিকায়নের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। সময়মতো কৃষি কাজ সম্পাদন, পণ্যের উৎপাদন খরচ কমানো ও কর্তনোত্তর অপচয় রোধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণ, শ্রমিকের কায়িক শ্রম লাঘব ও ঘাটতি পূরণ সর্বোপরি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য এর যান্ত্রিকীকায়ন অপরিহার্য। উন্নত বিশ্বে যান্ত্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমেই  কৃষিতে বিপ্লব সাধিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায় যে, দেরিতে ধান রোপণের ফলে বোরো, আমন ও আউশ মওসুমে প্রতিদিনে হেক্টরপ্রতি যথাক্রমে ৬০, ৫৫ ও ৯ কেজি ফলন কমে যায়।
দেশের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ ধানী জমি হাতে চারার রোপণের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়ে থাকে এবং বীজ তলা থেকে চারা উঠানো ও জমিতে রোপণের জন্য ধান চাষে মোট খরচের প্রায় ৩০% ব্যয় হয়ে থাকে। দেশে ধানের চারা রোপণের ভরা মওসুমে ব্যাপকভাবে শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। শ্রমিক স্বল্পতার কারণে কৃষক বিলম্বে চারা রোপণ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলশ্রæতিতে আশানুরূপ ফলন না হওয়ায় শস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণ। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের জন্য এক ধরনের প্লাস্টিক ট্রে অথবা পলিথিন সিটের ওপর বিশেষ ব্যবস্থায় চারা উৎপাদন করতে হয়, যা দেশের কৃষকের কাছে একেবারে নতুন প্রযুক্তি।
চারা উৎপাদনের কলাকৌশল
সাম্প্রতিক কালে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি উন্নত দেশে কাদা জমিতে যন্ত্রের সাহায্যে ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে, যা আমাদের দেশের প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন খরচ কমায়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ পদ্ধতি হলো যান্ত্রিক এবং কৃষিতত্তে¡র সমন্বিত প্রায়োগিক প্রযুক্তি। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের মূল বিষয় হলো ২.০ - ২.৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে সীমিত শিকড় দ্বারা আবদ্ধ মাটিযুক্ত বিশেষ ধরনের চারা উৎপাদন। এ বিশেষ ধরনের চারা এক ধরনের প্লাস্টিক ট্রে অথবা পলিথিন সিটের ওপর বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি করতে হয়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা যায়। তার মধ্যে প্লাস্টিক ট্রে ও পলিথিন ম্যাট পদ্ধতি বহুল        প্রচলিত।
প্লাস্টিক ট্রে পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে ৫৮ দ্ধ ২৮ দ্ধ ২.৫ সেন্টিমিটার আকারের প্লাস্টিক ট্রে ব্যবহার করা হয়। যার তলদেশে ২-৩ মিলিমিটার ব্যাসের ছিদ্র রয়েছে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা রাখার জন্য যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে তার আকার এবং প্লাস্টিক ট্রের আকার একই। এ পদ্ধতিতে দুই ধরনের প্লাস্টিক ট্রে ব্যবহার করা হয়- ১) শক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি রিজিড ট্রে এবং ২) নরম প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ফ্লেক্সিবল ট্রে। রিজিড ট্রের দাম ও স্থায়িত্ব ফ্লেক্সিবল ট্রের দাম ও স্থায়িত্বের তুলনায় বেশি  ।
পলিথিন ম্যাট পদ্ধতি
প্রথমে সনাতন পদ্ধতিতে বীজতলার জন্য যেভাবে চাষ দিয়ে জমি তৈরি করা হয় সেভাবে জমি তৈরি করতে হবে। আধুনিক বীজতলার ন্যায় এমনভাবে বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে যাতে দুটি ট্রে পাশাপাশি স্থাপন করা যায় অর্থাৎ ১.৪-১.৫ মিটার চওড়া লম্বা বরাবর রেইজ বেড করতে হবে। তারপর শুকনো/ভেজা নরম জমিকে রেইজ বেডের উভয় পাশে নালা তৈরির জন্য জায়গা রেখে নালার মাটি বীজতলায় উঠিয়ে এমনভাবে সমতল করতে হবে যেন বেডের উভয় পার্শ্ব একটু ঢালু থাকে। এতে করে অতিরিক্ত পানি গড়িয়ে নালায় যেতে পারে।  তারপর রেইজ বেডের ওপর পলিথিন সিট বিছিয়ে নিতে হবে। পলিথিন সিটের কারণে চারার শিকড় ইচ্ছামতো বড় হতে পারবে না এবং ট্রে পদ্ধতির ন্যায় চারার শিকড় ২.০-২.৫ সেন্টিমিটার জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা স্থাপনের জায়গার মাপ অনুযায়ী অর্থাৎ ২.৫ - ৩.০ সেন্টিমিটার উচ্চতা, ২৮ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৫৮ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠ/বাঁশের ফালি দিয়ে ট্রের ন্যায় পলিথিন সিটের ওপর স্থাপন করতে হবে যাতে সহজে ট্রের ন্যায় চারার বøক পাওয়া যায়। তারপর প্লাস্টিক ট্রের মতোই প্রথমে ২.০ সেন্টিমিটার আগাছা মুক্ত ঝুরঝুরা নরম মাটি পলিথিনের ওপর স্থাপনকৃত কাঠ/বাঁশের ফালির মধ্যে ভরাট করতে হবে। মাটি ভরাটের পর পরিমাণ মতো বীজ বপন করতে হবে। অতপর বপনকৃত বীজের ওপর ০.৫ সেন্টিমিটার ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে বীজ ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে। যান্ত্রিকপদ্ধতিতে রোপণ উপযুক্ত চারার বৈশিষ্ট্য
সফলভাবে চারা রোপণের প্রধান বিষয় হচ্ছে মানসম্পন্ন চারা।  এ ক্ষেত্রে চারার উচ্চতা, ঘনত্ব এবং মাটির পুরুত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগবালাই মুক্ত সম-ঘনত্বের সবল-সতেজ চারা হতে হবে। চারার ঘনত্ব প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে নূন্যতম ২-৩টি হতে হবে। ২.০-২.৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে সীমিত শিকড় দ্বারা আবদ্ধ মাটিযুক্ত চারা    । চারার পাতার সংখ্যা ৩-৪ টি। চারার উচ্চতা ১০-১২ সেন্টিমিটার। চারার বয়স আউশ-আমন মওসুমে ১২-১৫ দিন  এবং বোরো মওসুমে ২৫-৩০ দিন।    
চারার বøকের এমন মাত্রার ভর বহনক্ষমতা থাকতে হবে যাতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা স্থাপনের পর বøকের আকৃতির পরিবর্তন না ঘটে।    
মাটি নির্বাচন ও বীজতলা তৈরি
আগাছা, ফসলের নাড়া (ঈৎড়ঢ় ৎবংরফঁব), কাঁকর, কলকারখানার বর্জ্য মুক্ত উর্বর বেলে-দোআঁশ মাটি ট্রে’তে চারা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ করে ঢিলা ভেঙে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। ঢিলার পরিমাণ বেশি ও বড় হলে প্রয়োজনে ঢিলা ভেঙে চালনি (ঝরবাব) দিয়ে চেলে নিতে হবে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনে জৈবসার  (গোবর/কম্পোস্ট) ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। জমিতে চারা রোপণের ১০-১২ দিন আগে চারা তৈরি করতে হবে। এমনভাবে বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে যাতে দু’টি ট্রে পাশাপাশি স্থাপন করা যায় এবং বীজতলার উভয় পাশে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরির ব্যবস্থা থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ কারণে বীজতলা ১.৪-১.৫ মিটার চওড়া হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বীজ নির্বাচন
বীজ ধানের আকার অনুযায়ী ৫৮ দ্ধ ২৮ দ্ধ ২.৫ সেন্টিমিটার সাইজের প্রতি ট্রের জন্য ইনব্রিড জাত হলে ১২০-১৫০ গ্রাম এবং হাইব্রিড জাত হলে ৮০-১০০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। নির্বাচিত জাতের ধান বীজ প্রথমে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। পানি দিয়ে ভিজানোর সময় পানির ওপর ভাসমান চিটা ধান আলাদা করে নিতে হবে। কারণ চিটা ধান থেকে        সবল-সতেজ চারা উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। রোগমুক্ত        সবল-সতেজ চারা পাওয়ার জন্য বীজ ধান জাগ দেওয়ার পূর্বেই রোগমুক্ত করে নেয়া ভালো। বাঁকানি, ফলস স্মার্ট, গ্রেইন স্পট ইত্যাদি রোগবালাই থেকে চারাকে রক্ষার জন্য প্রতি কেজি বীজের জন্য ৩ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ধান বীজ ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখার পর বীজ ধান পানি থেকে আলাদা করে নিয়ে চটের বস্তায়/অন্য কোন পাত্রে অঙ্কুরোদগমের জন্য জাগ দিতে হবে। উল্লেখ্য, বীজ শোধন করা না হলে সাধারণত ভালো অঙ্কুরোদগমের জন্য জাগ দেয়ার পূর্বে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নিতে হবে। ভ্রƒণমূলের (রেডিক্যাল) দৈর্ঘ্য বীজ ধানের ১/৩ অংশ হলে চটের বস্তা থেকে অঙ্কুরোদগমকৃত বীজ ঢেলে নিয়ে দলা ছুটিয়ে আলাদা করে নিতে হবে।
বীজ বপন প্রক্রিয়া
প্রথমে ট্রেতে ২.০ সেন্টিমিটার করে মাটি ভর্তি করার পর কাঠ বা বাঁশের কাঠি দিয়ে ভালোভাবে সমতল করে নিতে হবে। এরপর প্রতিটি ট্রের জন্য নির্ধারিত বীজকে তিন ভাগে বিভক্ত করে নিয়ে ট্রের ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ট্রেতে সমভাবে বীজ পড়ে। অতপর ০.৫ সেন্টিমিটার করে শুকনো মাটি এমনভাবে বীজের ওপর ছিটিয়ে দিতে হবে যাতে করে সব বীজ মাটি দ্বারা ঢেকে যায়। এরপর সতর্কতার সঙ্গে এমনভাবে ট্রেতে পানি দিতে হবে যাতে পানি কেবলমাত্র ট্রের নিচ পর্যন্ত পৌঁছে। ট্রের নিচে যাতে অতিরিক্ত পানি না জমে থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করে দিতে হবে।
বীজতলায় চারার পরিচর্যা
অঙ্কুরোদগকৃত বীজের ভ্রƒণ ও ভ্রƒণমূল দ্রæত বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত  অধিক আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এ কারণে শীতকালে ট্রেতে বীজ বপনের পর রাত্রে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। চারার দৈর্ঘ্য ২.০-২.৫ সেন্টিমিটার হলে বীজতলায় ছিপছিপে করে পানি রাখতে হবে। শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে রাত্রিবেলায় বীজতলায় দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, আউশ ও আমন মৌসুমে রাত্রিবেলায় পলিথিন দিয়ে ট্রে ঢাকার প্রয়োজন নেই। আমরা জানি চারা গাছে নাইট্রোজেনের অধিক উপস্থিতি দ্রæত শিকড় বৃদ্ধিতে এবং অধিক পরিমাণ কার্বন চারা গাছকে রোপণের সময় ইনজুরির হাত থেকে রক্ষা করে। এ কারণে রোপণের আগে চারার পাতার রং ঘন-সবুজ আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। পাতার রং ঘন সবুজ না থাকলে রোপণের ৪-৫ দিন পূর্বে প্রতি হেক্টর বীজতলার জন্য ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া পানিতে মিশিয়ে ফলিয়ার স্প্রে করা যেতে পারে অথবা ১% ইউরিয়া ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ফলিয়ার স্প্রে করা যেতে পারে। প্লাস্টিক ট্রে কিংবা পলিথিন ম্যাটে উৎপন্ন চারা মাদুরের ন্যায় রোল করে এবং একটির উপর আরেকটি এভাবে ৩-৪টি রোল স্থাপন করে গাড়িতে করে মাঠে নিয়ে যাওয়া যায়। য়

১ কৃষি প্রকৌশলী, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, , (Sharminshikha85@gmail.com, ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৩ ঊধ্বর্তন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৪মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিআরআরআই, গাজীপুর।

 

বিস্তারিত
খাদ্য সংকট মোকাবেলায় লড়াই করছে কৃষি বিভাগ

কৃষিবিদ মোঃ মতিয়র রহমান

কিছুদিন আগেই সুন্দর পৃথিবীর জন্য সমান তালে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল বিশ্বের সমগ্র জাতি। পথিমধ্যে হঠাৎ করেই এ যেন থমকে যাওয়া। প্রতিবন্ধকতার নাম ফুসফুসের রোগ কোভিড-১৯। করোনাভাইরাস সৃষ্ট এ মহামারীর কারণে বিশ্ব মুখোমুখি হয়েছে অভাবনীয় এক সংকটের। বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রাণঘাতী করোনার কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে নতুন করে বিশ্ববিপর্যয়ের আভাস মিলছে।
ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কোটি বাড়তে পারে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার ৩ কোটি ৩০ লাখ দরিদ্র এবং এর ভিতরে ১ কোটি ৭০ লাখ অতিদরিদ্র। জাতিসংঘ আশঙ্কা করছে, করোনার পরবর্তী দিনগুলোতে বিশ্বমন্দার ভয়াল থাবার পাশাপাশি হানা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য দ‚র করার লক্ষ্যটি পূরণ করতে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। এই যখন সার্বিক প্রেক্ষাপট তখন কৃষি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশকে। এসডিজির ১৭টি অভিষ্ট্যের মধ্যে ১০টি অভীষ্টই কোনো না কোনোভাবে কৃষির সাথে জড়িত।
দেশের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী মহল তাই জোর দিয়েছেন কৃষির উপর। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য সংকট মোকাবেলায় সকলকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন দেশের কৃষি বিভাগকে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে হাতে নেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা। আর সে কর্মপরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে চারিদিকে থমথমে অবস্থার ভিতরেই দিন-রাত ছুটে চলেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সকল স্তরের কর্মকর্তারা। ১৬ কোটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে ‘খাদ্য নিরাপত্তার সৈনিক’ হিসেবে দেশ বাঁচাতে লড়াই করছেন কৃষকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
‘কৃষিই সমৃদ্ধি’ ¯েøাগান নিয়ে বিগত দিনগুলিতেও তারা একইভাবে ছুটেছেন কৃষকের মাঠে। তবে এবারের ছুটে চলার মাঝে আবেগ আছে। আছে সাড়ে ১৬ কোটি বাঙালির অস্তিস্তে¡র প্রশ্ন। আছে বীর বাঙালি জাতির মহানুভবতার প্রশ্ন। আসন্ন দুর্ভিক্ষকে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী এখন থেকেই খাবার মজুদ করে রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আহŸান জানিয়েছেন যাতে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না থাকে। প্রতিটি বাড়ির আনাচে-কানাচে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি দিয়ে ভরিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রাণিসম্পদ, মৎস্যসহ সামগ্রিক কৃষি খাত ঘিরে ঘোষণা করেছেন ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা। দুর্ভিক্ষকে প্রতিহত করতে যে কোনো উপায়ে হোক খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারলে দেশের প্রয়োজন মিটানোর পাশাপাশি অন্যদেরও সহযোগিতা করা সম্ভব হবে।
চলমান সংকটে তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বাগ্রে জোর দিয়েছেন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সময়ে সময়ে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে সাধারণ ছুটি ও যানবাহন নিয়ন্ত্রিত থাকলে জরুরি সেবা হিসেবে নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভ‚ত রাখা হয়েছে কৃষি সেক্টরের সকল কার্যক্রম ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে। স্বাভাবিক দিনগুলোর চেয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে জেলা-উপজেলা কৃষি অফিসের কার্যক্রমে। একদিকে মাঠ পর্যায়ের নিয়মিত কার্যক্রম, অন্য দিকে করোনা পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের কথা ভেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ কর্মতৎপরতা। মাঠ প্রশাসনের বৃহৎ অংশ হিসেবে সাথে রয়েছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, টিসিবি পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি তদারকি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা, করোনা প্রতিরোধে  প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ, খাদ্য গুদাম থেকে চাল সংগ্রহ ও বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্বপালন। সাধারণ ছুটির সময়ে কর্তব্যের জায়গায় দম ফেলার ফুসরত মিলছে না তাদের।
বর্তমানে মাঠে চলমান রয়েছে বোরো ধান, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, বিভিন্ন শাকসবজি ফসলের কাজ। পরিবর্তিত আবহাওয়ায় ধান ফসলের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে আকস্মিক বন্যা, কালবৈশাখী ও বিভিন্ন রোগ-বালাই। ব্লাস্ট রোগের অনুকূলে পরিবেশ বিরাজ করছে মর্মে কৃষি বিজ্ঞানীরা কিছুদিন পূর্বে সতর্কতা জারি করেছেন। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই ব্যাহত হওয়া যাবেনা। তাই কৃষকদের মাঝে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে চলছে সরাসরি কৃষি পরামর্শ সেবা ও লিফলেট বিতরণ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব, মোবাইল অ্যাপস প্রভৃতি ডিজিটাল কৃষি সেবার।
চলছে বিভিন্ন প্রকল্পের প্রদর্শনী বাস্তবায়ন, সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত প্রতি ইঞ্চি জমির ব্যবহারে কাজ করা, শ্রমিক সংকট কাটাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাস্তবায়নের সকল কার্যক্রম সম্পাদন, ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র কেনার ব্যবস্থাকরণ, জেলা-উপজেলায় কৃষি শ্রমিকের তালিকা তৈরি করে অধিক ধান উৎপাদনশীল এলাকায় শ্রমিকদের গমনের ব্যবস্থাকরণ, সেচযন্ত্রসহ সকল কৃষিযন্ত্র, জ্বালানি এবং খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়-বিক্রয় অব্যাহত রাখা, হাওর অঞ্চলে সম্ভাব্য দুর্যোগের পূর্বেই সমস্ত ধান কৃষকের ঘরে তোলার ব্যবস্থা, খাদ্য অধিদপ্তরের জন্য ধান ও গম ক্রয়ের তালিকা তৈরি, কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের বীজ সহজলভ্য করার জন্য বীজ উৎপাদন প্রদর্শনী নিয়মিত পরিদর্শন ও পরামর্শ প্রদান, ক্ষুদ্র কৃষক-কৃষি ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে ভ্রাম্যমাণ সবজি বাজার চালুকরণ প্রভৃতি। রয়েছে আগামী আউশ ধানের জন্য প্রণোদনা কার্যক্রমের বিনামূল্যে বীজ ও সার কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব। করোনা পরবর্তীকালীন খাদ্য সংকটের ঢালস্বরূপ নির্দিষ্ট সময়ে বীজতলা তৈরি করে সে ফসল ফলাতে হবে কৃষকের জমিতে। ক্ষুধামুক্ত বাংলার প্রত্যয়ে এ যেন খাদ্য নিরাপত্তা সৈনিকদের নিরন্তর ছুটে চলা। আর এ যাত্রাপথের অক্লান্ত পথিক কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীরা।   
অদৃশ্য একটি শত্রæর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সকলেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু কৃষি সেক্টর কাজ করছে পায়ের নিচের শক্ত মাটি হিসেবে। যে ভিত্তির উপর দেশ দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম কৃষি। কৃষি আমাদের মেরুদন্ড সোজা দাঁড়িয়ে রাখে বলেই আমরা মাথা উঁচু করে গর্ব করি। প্রতিনিয়ত কৃষির সবুজ জমিনের মাঝে অঙ্কিত হয় এদেশের ভবিষ্যত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে, দুর্ভিক্ষে, সংকটে সরকার প্রধানের আস্থার জায়গা            কৃষি। আমাদের মাটি আছে, আমাদের মানুষ আছে। আমরা ভয়কে জয় করার ক্ষমতা রাখি। আর এভাবেই লাল-সবুজ পতাকা সগৌরবের দাঁড়িয়ে থাকে কৃষি সেক্টরের হাতে। বিশ্বের বুকে যতবার বাংলাদেশ নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়েছে তার অধিকাংশই কৃষি বিভাগের সফলতার ফলাফল। ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম দেশ বাংলাদেশ। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে পাট উদ্ভাবনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম-এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে কৃষি বিভাগের নিবেদিত সেবা আর আন্তরিকতার কারণে। সম্ভব হয়েছে সরকার প্রধানের দূরদর্শিতা এবং বিনিয়োগের কারণে।
সামনে দিনগুলোতেও যে কোনো সময় বরাবরের মতো দেশের নেতৃত্বে থাকবে কৃষি বিভাগ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন কৃষিকে ঘিরেই দেশের উত্তরণ ঘটিয়েছিলেন, তেমনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষুায় কৃষি সেক্টর দেশের ১৬ কোটি মানুষকে নিরাপদে রাখতে সচেষ্ট থাকবে ইনশাআল্লাহ। সংকটে-দুর্ভিক্ষে লড়াই করবে দেশ বাঁচাতে। বিগত কয়েক বছর ধরে অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। দেশ এখন খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ। চলতি বোরো মৌসুমেও বাম্পার ফলন হয়েছে। হাওরের আনন্দ সুর আর মাঠে সোনালী ধানের দোলানো শীষে বিস্তৃত হাসিতে সে কথার সত্যতা ফুটে ওঠে। আধুনিক কৃষি যন্ত্র আর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শ্রমিকের কোলাহলে পুরোদমে চলছে হাওরের ধান কাটা। সোনালী ধান ঘরে উঠছে, খাদ্য নিয়ে নিশ্চিন্ত হচ্ছে রাষ্ট্র। ‘কৃষক-কৃষি গবেষক-কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী এ সমাজ যতদিন আছে, জোর দিয়ে বলতে পারি এদেশে কেউ না খেয়ে মরবে না ।
একদিন হয়তো এই মহামারী বিদায় নিবে, বিদায় নিবে দুর্ভিক্ষ। নীরবে নিভৃতে দেশের অক্সিজেনের মতো কাজ করে যাবে দেশের কৃষি বিভাগ। ১৬ কোটি মানুষের মুখে আহার নিশ্চিত করে উন্নয়নের ইতিহাস রচনা করার জন্য দুরন্ত গতিতে ছুটে চলছে কৃষি। নিবেদিতপ্রাণ সম্প্রসারণ কর্মীরা রোদে পুড়ে ঘেমে, মাঠে কর্দমায় চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মকাÐ। দেশের কল্যাণে - কল্যাণে-কৃষির কল্যাণে তাঁরা নিরন্তর কৃষকের ছুটে চলেছেন শান্তির বার্তা নিয়ে। কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে জনগণ বাঁচবে। যে কোনো সংকট মুহুর্তে কৃষি বিভাগ জনগণের পাশে ছিল-পাশে আছে, আগামীতেও পাশে থাকবে ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে। য়

কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার, গোদাগাড়ী, রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭১৫৮৭৭৬৮৯, ই-মেইল :  matiormunna@gmail.com

 

বিস্তারিত
কৃষি পণ্য উৎপাদন ও লাভজনক করার কৌশল

কৃষিবিদ ড. মোঃ ওমর আলী

দার্শনিক রুশোর ভাষায় সবচেয়ে বড় এবং গৌরবমণ্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি। কিন্তু সেই গৌরব মÐিত শিল্প আজ নানাভাবে প্রতিকূল পরিবেশে বিঘ্নিত হচ্ছে। কারণ কৃষি হচ্ছে সবচেয়ে আধুনিক আর পরিবর্তনশীল বিজ্ঞান। আধুনিকতা আর আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষির পালেও বাতাস লেগেছে, পরিবর্তিত হচ্ছে কৃষি। আজকের লাগসই প্রযুক্তি যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে এমন কথা বলা যায় না, আর চিন্তা করাও ঠিক হবে না। কারণ আজকের লাগসই প্রযুক্তি আগামী দিনের মানুষের চাহিদা পরিবর্তনের সাথে সাথে হয়তো হারিয়ে যাবে অতল গর্ভে। এছাড়াও আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে পুরানো প্রযুক্তি টিকে থাকতে না পারাই স্বাভাবিক। তাই মানুষের চাহিদা আর আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই প্রযুক্তির উন্নয়ন করা হয়। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আগের যুগের কৃষি ব্যবস্থা আর বর্তমান যুগের কৃষির মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। আগে জনসংখ্যা ছিল কম, জমি ছিল বেশি, মানুষ শুধু তার নিজস্ব প্রয়োজনেই  পরিকল্পনাহীনভাবে আবাদ করত। খুব একটা লাভ-লোকসানের হিসাব করত না। কিন্তু বর্তমানে মানধাত্মার আমলের সেই তত্ত¡ আর কাজ করে না। কারণ বর্তমানে কৃষক তার কৃষি কাজকে একটি ব্যবসায়ী চিন্তা ভাবনায় রূপ দিয়েছে এবং সে তার কাজকর্মে সব সময় লাভ-লোকসানের হিসাব খুঁজে। প্রতিটি কাজেরই একটি পরিকল্পনা থাকে, আর সেই পরিকল্পনার উপরই কাজের বাস্তবায়ন এবং লাভ-লোকসান নির্ভর করে। তেমনি               কৃষি কাজেরও রয়েছে একটি উৎপাদন পরিকল্পনা। যুগোপযোগী উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে একদিকে যেমন আসবে উৎপাদনের গতিশীলতা অন্যদিকে পরিপূর্ণ হবে লাভের প্রত্যাশা। তাই বাজার চাহিদানুযায়ী কৃষি পণ্য উৎপাদন ও লাভজনক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেসব বিষয়গুলো তাবিজের মত কাজ করবে তা হলো-
প্রথমত বাজার চাহিদা অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করতে হবে। সেই সাথে জমি এবং আবহাওয়া নির্বাচিত ফসলের উপযোগী কি না তা অবশ্যই যাচাই করতে হবে। ফসল নির্বাচনে মাটির উর্বরতা বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে মাটির উর্বরতা উন্নয়নে ফসল ধারায় একই ফসল বারবার চাষ না করে শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে এবং বছরে জমিতে কমপক্ষে একটি শিমজাতীয় ফসল যেমন ডালজাতীয় ফসল (মসুর, ছোলা, খেসারি, মুগ,এবং মাসকলাই ইত্যাদি), শিম এবং বাদাম ইত্যাদি চাষ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় কোন একটি ফসল চাষে বেশি লাভ হলে সবাই মিলে ঐ ফসলের চাষ শুরু করে, ফলে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বাজার মূল্য কমে যায়। তখন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঐ ফসল চাষ থেকে বিরত থাকে। ফলশ্রæতিতে, পরবর্তীতে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজার মূল্য বেড়ে যায়।  
নির্বাচিত ফসলের উন্নত জাতের ভালো বীজ সংগ্রহ করে ফসলের প্রয়োজন মোতাবেক ভালোভাবে জমি চাষ ও মই দিয়ে সময়মতো বীজ বপন করতে হবে। অনেকক্ষেত্রে জমি সময়মতো জো অবস্থায় না আসার কারণে সময়মত জমি চাষ দেওয়া সম্ভব নাহলে বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষণ কৃষি পদ্ধতি রয়েছে- যেমন সাথী ফসল চাষ, পাওয়ার টিলার অপারেটর চালিত বীজ বপন যন্ত্র, বেড প্ল্যান্টার ইত্যাদি জমির অবস্থাভেদে ব্যবহার করে সময়মতো ফসল বপন করা যেতে পারে। উচ্চ মূল্যমান সম্পন্ন ফসল যেমন শাকসবজি ও ফলমূল আগাম চাষ করলে বেশি লাভ করা যায়। এজন্য উঁচু জমি নির্বাচন করে আগাম ফসল চাষ করতে হবে।
জমিতে ফসলের চাহিদানুযায়ী সার ও সেচ দিতে হবে। সার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যেসব ফসল বেশি পরিমাণে খাদ্যোপাদান গ্রহণ করে যেমন আলু ও ভুট্টা ইত্যাদি চাষের ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় ফসলের ফলনও কম হবে এবং মাটির উর্বতাও নষ্ট হবে। বিশেষ করে ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে ভুট্টার মোচা সংগ্রহ করে গাছগুলোকে কেটে মাটিতে ফেলে চাষ ও মই দিয়ে মিশিয়ে দিলে কিছুটা হলেও মাটির উরর্বতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও মাটিতে মুগ, ধইঞ্চা ও শনপাট ইত্যাদি চাষ করে সবুজ অবস্থায় মাটির সাথে মিশিয়ে মাটির উরর্বতাসহ মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করা যায়, যা পরিবেশ বান্ধব কৃষি উৎপাদনে সহায়ক। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি জমি থেকে বের করে দিতে হবে। সময়মতো আগাছা, রোগ ও পোকামাকড় পরিকল্পিতভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দমন করতে হবে এবং মাঝে মাঝে ফসলের মাঠ পরিদর্শন করতে হবে।
জমি থেকে সময়মতো ফসল কাটা এবং মাড়াই যতœ সহকারে করতে হবে। কারণ সময়মতো ফসল কাটা ও মাড়াই করলে ফসলের উৎপাদনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কম হয় এবং ফসলের ফলন ও গুণাগুণ উভয়ই বাড়ে। এছাড়াও আবহাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাবে যাতে ফসল নষ্ট না হয় সেজন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সঠিকভাবে ফসল ঝাড়াই ও পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে পরিমিত আর্দ্রতায় এনে ফসল সংরক্ষণ করতে হবে। ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ এবং বেশি বাজার মূল্য পাওয়ার জন্য ফসল গ্রেডিং করতে হবে।
ভরণ পোষণের বাইরে সে সমস্ত ফসল অর্থনৈতিক লাভের জন্য করা হয় সেসব ফসল চাষের ক্ষেত্রে অবশ্যই ভালোমানের উৎপাদনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সেসাথে উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত বাজার যাচাই করে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমন্বিত শস্য ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে। এতে করে একদিকে যেমন পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে অন্যদিকে ফসল চাষও লাভজনক হবে।
সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা (যেমন- ফসল, পশুপালন, হাঁস-মুরগি এবং মৎস্য চাষ) গড়ে তুলতে হবে। এতে করে প্রত্যেকটি কম্পোনেন্ট একে অপরের পরিপূরক হবে। ফলশ্রæতিতে, খামার লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব হবে।
ধানে জমিতেও চারিদিকে আইল বেঁধে পানি জমিয়ে রেখে স্বল্পকালীন সময়ে দ্রæতবর্ধনশীল মাছ লাভজনকভাবে চাষ করা যায়। এছাড়াও গোখাদ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যান্য খাদ্যের সাথে অবশ্যই সারা বছরব্যাপী কাঁচা ঘাসের যোগান থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্যারা ও নেপিয়ার ইত্যাদি জাতীয় বর্ধনশীল ঘাসের চাষ করতে হবে।
বসতবাড়ির আশপাশের পতিত/অপরিকল্পিত ব্যবহৃত জায়গাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সবজি ও ফল মূল  চাষের আওতায় আনলে একদিকে যেমন জমির সুষ্ঠ ব্যবহার হবে অন্যদিকে সারা বছরব্যাপী প্রয়োজনীয় সবজির যোগান পাওয়া যাবে, যা পরিবারের পুষ্টি মিটানোসহ আর্থিকভাবে লাভজনক হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর সরেজমিন গবেষণা বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত এলাকাভিত্তিক ৮টি মডেল রয়েছে, যা ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত পদ্ধতিতে     বসতবাড়িতে সবজি ও ফলমূল চাষ লাভজনক করা সম্ভব।
বৃক্ষ রোপনের ক্ষেত্রে প্রথমত একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার যে,এলাকাভিত্তিক কোন ফলের চাষ বেশি উপযোগী হলে সেএলাকার জন্য সেই ফলের গাছ লাগানোই উত্তম। কারণ এথেকে একই সাথে ফল ও কাঠ দুটোই পাওয়া যাবে। যেমন রাজশাহী অঞ্চলের জন্য আম গাছ ও ভাওয়াল গড়ের জন্য কাঁঠাল ইত্যাদি এলাকাভিত্তিক উপযোগীতানুযায়ী বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। ফলের ক্ষেত্রে অবশ্য উন্নত জাতের কলম চারা লাগাতে হবে। এছাড়া যেসমস্ত অঞ্চলে ফলের খুব একটা উপযোগিতা নেই সেখানে এলাকার উপযোগীতানুযায়ী লাভের বিষয়টি মাথায় রেখেই বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। আর আবাদি জমির আইলের ধারে গাছ না লাগানোই ভালো। তবে যদি লাগাতেই হয় সেক্ষেত্রে মাটি থেকে বেশি রস ও খাদ্যোপাদান শোষণ করে এবং বেশি ডালপালা হয় এধরনের গাছ লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে। যেমন ইউক্লিপটাস ও বাঁশ ইত্যাদি গাছ মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণ রস ও খাদ্যোপাদান শোষণ করে থাকে যা ফসলের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
সঠিক উপায়ে কৃষি পণ্য সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করলে নিজস্ব আয় বাড়বে। এ ব্যপারে নিকটস্থ শস্য গুদামে ঋণ প্রকল্পের গুদামসমূহে কম খরচে শস্য পণ্য সংরক্ষণ ও ঋণ গ্রহণ করা যেতে পারে।
কৃষি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তি ও বাজারজাতকরণ দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ফলে বড় বাজারসমূহে পণ্য দেওয়া ও বিক্রি সম্ভব হবে এবং নিজস্ব আয় বাড়বে। কৃষি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় বাজার তথ্য যাচাই করতে হবে। এ ব্যাপারে পেপার, পত্রিকা, মোবাইল ও ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে হবে। পচনশীল পণ্য দ্রæত বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।
বেশি লাভ পেতে হলে গ্রামীণ পর্যায়ে মৌসুমভিত্তিক ফল, মূল ও শাকসবজির স্বাস্থ্যসম্মত ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রক্রিয়াজাতকৃত পণ্য সামগ্রী পরবর্তী সময়ে (অসময়ে) ব্যবহার বা বাজারের চাহিদা এবং মূল্য দেখে বিক্রি করলে আয় বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমান বিশ্ব যখন মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাসী তখন বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হলে পণ্যের উপযুক্ত ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বপরি, কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বিপণন খরচের খাতগুলো চিহ্নিত করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করতে হবে।এতে করে একদিকে যেমন নিজস্ব পণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে অন্যদিকে ক্রেতা সকলও অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে ক্রয় করতে পারবে। ফলশ্রæতিতে, ব্যক্তি, দেশ ও জাতি সকলেই উপকৃত হবে।
আর উপরোক্ত বিষয়সমূহে কৃষককে যুগোপযোগী করতে             আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। এব্যাপারে সরকারি, আধাসরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ এনজিওসমূহকে দায়িত্ব নিতে হবে। য়

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, ডাল গবেষণা উপকেন্দ্র, বারি, গাজীপুর, মোবাইল নং-০১৭১২৫৪৩৭২০, ই-মেইল :  omaraliprc@gmail.com

 

বিস্তারিত
মুজিববর্ষে কৃষিতে আঞ্চলিক সমন্বয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ড. এস.এম. আতিকুল্লাহ
আগামীর উন্নয়নের জন্য কৃষি বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। উন্নয়নধারায় আঞ্চলিক সমন্বয় এবং হাবভিত্তিক পরিকল্পনা এ দুটি শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে দাতাসংস্থা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে হাব শব্দটি বেশি ব্যবহার করে থাকে।  এজন্য দাতা সংস্থা আঞ্চলিক সমন্বয় ও পরিকল্পনার প্রতি বেশ জোর দিচ্ছে। হাব বলতে একটা ছোট পরিসরকে বুঝানো হয় যেমন নিঝুম দ্বীপ। পক্ষান্তরে অঞ্চল শব্দটি কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে সমতল ভ‚মি অঞ্চল। কোন অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত হলে সমগ্র দেশের অর্থনীতি মজবুত হয়। আবার কোনো একটি অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে খামার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এ দু’টি ক্ষেত্রেই টেকসই উৎপাদনের ধারা ও কৃষকের স্বার্থরক্ষায় আঞ্চলিক সমন্বয় ও পরিকল্পনা একান্ত দরকার। অবশ্য বাংলাদেশের কৃষিতে অঞ্চলভিত্তিক কার্যক্রম প্রচলিত চালু আছে।
কৃষিতে ঘনীভূত সমস্যা ও সাফল্যের অন্তরালে
সসম্যার অন্তরালে : খাদ্য উৎপাদন ও মাথাপিছু পুষ্টি প্রাপ্যতায় আঞ্চলিক বৈষম্যতা ও দারিদ্র্যের হার বেশ কয়েকটি অঞ্চল বেশ প্রকট হয়েছে। এক সময়ের সুফলা বরিশাল বিভাগের চরাঞ্চলে খাদ্য পরিস্থিতি নাজুক;  খাদ্য নিরাপত্তার সূচকে পশ্চাতপদ ও অনিশ্চিত। আবার রংপুর এবং জামালপুর অঞ্চলের মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত। বলা হয়, ‘জ্যৈষ্ঠ নেবো বাগান বাড়োয় আষাঢ় নেবো কাঁঠালে’। গ্রামের ধনী, মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারগুলোর মধ্যে জমি ও খাদ্যগ্রহণের বৈষম্য স্পষ্টতর হচ্ছে। এখনো অনেক পরিবার নিজের আয়ে বছরে গরুর মাংস ও আস্ত ডিম খেতে পারে না। সকল অঞ্চল ও মানুষের খাদ্যের মৌলিক চাহিদা সমানুপাতিক হওয়া উচিত। তা না হলে প্রজন্ম নীরব পুষ্টি হীনতায় ভুগবে যা বংশ পরম্প্ররায় বহন করতে হবে। পাশাপাশি সমতাভিত্তিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। বাধাগ্রস্ত হবে আগামীর শিক্ষা ও মেধা বিকাশ। একদিকে খাদ্যেভেজাল ও রাসায়নিক মিশ্রণ। অন্যদিকে বৈরী জলবায়ু ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে অঞ্চল ভিত্তিক প্রভাব বেশ জটিল হয়ে উঠছে। পরিবর্তিত পরিবেশ ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় কৃষকের সংকট বাড়িয়ে দেয়। বৈশি^ক পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব বৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস বিলোপ, ক্রমান্বয়ে কৃষকের দৈনতা প্রকট হয়ে উঠছে। ইউএনডিপি পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দক্ষিণের চরাঞ্চলের প্রতিটি পরিবারে বা বাড়িতে একজন সদস্য হয় মারা গেছেন নয় কোন জখমপ্রাপ্ত  অথবা কর্মক্ষম নয়। এই অঞ্চলগুলিই আগামীর খাদ্য চাহিদা পূরণে ভূমিকা পালন করতে পারে। লবণপ্রবণ এলাকায় গবাদিপশু পালনে তেমন গতি নেই। শুধু সিলেট, বরিশাল অঞ্চলের পতিত ও প্রান্তিক জমি কাজে লাগিয়ে ফসলের বহুমুখীকরণ একমাত্র আঞ্চলিক ও হাবভিত্তিক কর্মসূচির/প্রকল্পের মাধ্যমেই সম্ভব। এই লক্ষ্যে দারিদ্র্যবিমোচন, পরিবেশ সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনায়, মৎসচাষে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।
আশার কথা ইতোমধ্যে সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে শুরু করলেও অঞ্চলভিত্তিক বা হাবভিত্তিক সমন্বয়ের অভাবে তা বেশ প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারছে না। তাই কৃষি উন্নয়নে অঞ্চলভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করা, অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করা দরকার। সুসংহত আঞ্চলিক সমন্বয় যথাসময়ে সম্পদ বণ্টন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা দেয়। এই সমন্বয়             কৃষকদের অঞ্চলভিত্তিক নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা ও সামাজিক এবং প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে।  
সাফল্যের অন্তরালে : বাংলাদেশে কৃষি বিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় আজকাল খোরাকি কৃষি পরিবর্তন হয়ে বাণিজ্যিক কৃষি ধারা প্রবর্তিত হয়েছে। কৃষির আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অঞ্চলভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও বাজারমুখী সেবা ও সহায়তা প্রদানের জন্য সংগঠন তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানসমূহ নানা ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও স¤প্রসারণ করে যাচ্ছে। স¤প্রসারণ কৌশলেও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক উপকরণ যেমন সেচযন্ত্র, সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি উৎপাদন ও সরবরাহ ভর্তুকিসহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। নানাজাতীয় খাদ্য ধান, গম ও ভুট্টার গবেষণার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান। ফল ফসলসহ মসলা, গবাদিপশু ও মৎস্য গবেষণায় বেশ কিছু অঞ্চলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এ সব প্রতিষ্ঠান অঞ্চলভিত্তিক প্রযুক্তি ও কৌশল উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি পণ্যের বাজারমান নিয়ন্ত্রণ করছে। পণ্যের মান নিশ্চিত করা, বাজারমূল্য পর্যবেক্ষণ করাসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত কাজ করছে।
পাশাপাশি কৃষি শিক্ষার জন্য প্রতিটি অঞ্চলে কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এগুলোসবই হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমি এবং পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য। এ কথা সত্য এইসব সমষ্টিগত আঞ্চলিক ও জাতিগত প্রচেষ্টার সম্মিলিত ফলাফল হচ্ছে দেশে খাদ্য সংকট চিরতরে হটিয়ে দেয়া। গ্রামে খাদ্যের হাহাকার নেই। কোন কোন ফল-ফসল ইত্যাদি রপ্তানি হচ্ছে। খামারির প্রচেষ্টা, সম্প্রসারণ কর্মীর ভূমিকা, বিজ্ঞানীদের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ঐকান্তিক প্রয়াসেই কৃষিতে আমুল পরিবর্তন হয়েছে। অচিন পাড়াগায়ের বাজারে নানা জাতের চাল, রকমারি সবজি, দুধ, ডিম, সবই মিলে। সরবরাহের ঘাটতি নেই উৎপাদন হলে তো সরবরাহ বাড়বে। ঠিক তাই হচ্ছে। তাই বাংলাদেশ আজ ধান উৎপাদনে বিশ্বের চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে পঞ্চম এবং আম ও পেয়ারা উৎপাদনে যথাক্রমে নবম ও দশম।
পথের বাধা সরিয়ে কৃষকের আগমনে করণীয় : কিন্তু উৎপাদনের এই ধারাকে স্থায়িত্ব রূপ দিতে হবে। ১) উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভজনক সাশ্রয়ী কৃষি প্রবর্তন করতে হবে। ২) অঞ্চলভিত্তিক সমন্বয়। ৩) বাণিজ্যিক ও রপ্তানিমুখী কৃষির ধারা প্রবর্তন। ৪) অঞ্চলভিত্তিক এবং ফসলভিত্তিক কৃষকের সংগঠন তৈরি। মোটের ওপর মাটির ওপর চাপ কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে হবে। বিষমুক্ত নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ, ফসল আহরণ পরবর্তী অপচয় কমিয়ে আনা এগুলো হলো কৃষির আগামীর চ্যালেঞ্জ এবং তা আঞ্চলিক সমন্বয় বিশেষভাবে সফল হতে পারে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন : মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে কার্যক্রমগুলো এভাবে হতে পারে, আঞ্চলিক বিষয়ভিত্তিক মানবসম্পদ চিহ্নিত করা এ বিষয়ে যিনি কাজ করবেন এবং বিষয়ভিত্তিক কাজের সাথে খাপখাইয়ে নেয়া, কতগুলো জ্ঞান ও দক্ষতায় নিজেকে দক্ষ করা, যা সাধারণ শিক্ষায় অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ মানবসম্পদ নতুন সমস্যার মোকাবেলায় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করা এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনীর সাথে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকা। বিষয়ভিত্তিক মানবসম্পদকে চিহ্নিত করা আবার তিনি বদলি হলে তার বিকল্প তৈরি করা।
অঞ্চলভিত্তিক জাতিগোষ্ঠী, ফসলের জাত, মাটির প্রকৃতি, নদী, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি সম্পদের তারতম্য বিদ্যমান। তাই কৃষি উন্নয়নে আঞ্চলিক পরিকল্পনার কথা জোরেসোরে বলা চচ্ছে। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি কৃষকের ইচ্ছা ও উদ্যমের অভাব না ঘটলে দেশের আগামীর খাদ্য চাহিদার উপযুক্ত সমাধান সম্ভব হবে না।
মতামত ও পর্যালোচনা
ষ কৃষিতে সমস্যার সমাধান কয়েক দিনের বিষয় নয়, এজন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।
ষ    কৃষি ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও করণীয় সম্পর্কে আঞ্চলিক দলের (কৃষি, মৎস, পশুসম্পদ, পাট, গম, মসলাভিত্তিক) সমন্বয় কার্যকর প্রস্তুতির ও পদক্ষেপ নেয়ার সামর্থ্য থাকা। অঞ্চল কি নির্দেশনা দেয় তা মেনে চলা দরকার।
ষ অবহেলিত জনপদের জন্য সংবেদনশীল উন্নয়ন বরাদ্দ। অর্থনৈতিক মানদÐে পশ্চাৎপদ এই জনগোষ্ঠীর জন্য অঞ্চলভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনায়, নতুন প্রকল্প তৈরি ও বিশেষ কৃষি বরাদ্দ রাখা দরকার।
ষ প্রসঙ্গত জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজেট প্রণয়নের বিষয়ে কৃষকের অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা ও    কৃষকের অংশগ্রহণ।   
ষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ও পরবর্তিতে কৃষকের প্রয়োজন হয় দিকনির্দেশনার। এজন্য কৃষকের সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আঞ্চলিক সহায়তা প্রদান।  
ষ সরকার থানা পর্যায় ধান,পাট সংগ্রহের মূল্য নির্ধারণ করে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে। আঞ্চলিক সমন্বয় শক্তিশালীকরণ এর খানিকটা উপশম দিতে পারে।
ষ দেখা যায় প্রযুক্তি থাকা সত্তে¡ও অনেক কৃষকের চাষ পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক, তাই মাংস, হাস-মুরগি ও পশুপালন চাষি ও খামারিদের সংগঠন বিনির্মাণ অবশ্যক।
ষ    কৃষি পরিবেশ অঞ্চল এবং লবণাক্ততার মাত্রা ও খরার তীব্রতার উপর ভিত্তি করে শস্যবিন্যাস এবং বহুমুখীকরণের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া।  
ষ খরা প্রতিরোধী জাত ব্যবহার, আগাম চাষ, পানি সংরক্ষণ ইত্যাদি ইতিবাচক কাজ করার জন্য কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
ষ    মাঠ পর্যায়ে কৃষি পরামর্শকেন্দ্রে কৃষক আসার জন্য উপযোগী আস্থা তৈরি করতে হবে। কৃষি স¤প্রসারণের মাঠকর্মীর দক্ষতা বিশেষ করে ডিপ্লোমা ও স্নাতক পর্যায়ের কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন করা দরকার।
ষ    বসতবাড়ির চারিদিকে বিজ্ঞানভিত্তিক ভ‚নীতি অনুসরণ করে কৃষি-বনায়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার ।
ষ কৃষি পণ্য স্থানীয় বাজারে বেচাকেনা হয় এবং তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় মোকামগুলোতে ফসল সংরক্ষণাগার, কোল্ডস্টোরেজ তৈরি। স্থানীয়পর্যায়ের হাটবাজার ও মোকামগুলোর অবকাঠামোর উন্নতি সাধন, বিদ্যুতায়নের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া।
ষ    কৃষি ক্ষেত্রে তথ্য বিভ্রাট ও শূন্যতা সৃষ্টি পরিকল্পনা প্রণয়নের ত্রæটি থেকে যায়। আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কৃষকদের সঠিক তথ্য দেয়া। আঞ্চলিক তথ্যভাÐার তৈরি করা।  
ষ আগামীর কৃষির কথা বললে, অঞ্চলিক “ক্লাইমেট স্মার্ট” কৃষির পরিকল্পনা করা দরকার। অঞ্চলভিত্তিক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। বন্যা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সমন্বিত কৃষি-মৎস্য-পশুসম্পদ গবেষণা এবং তা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ আগামী দিনের দাবি।
ষ সরকারি গবেষণার পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণার সংগঠন তৈরি।
ষ    ক্ষেতে পরিমিত মাত্রায় সুষম সার, ওষুধ প্রয়োগের নীতি পতিপালন ও অনুসরণ আঞ্চলিকভিত্তিক সমন্বয় থাকা দরকার।
একটা চীনা প্রবাদ আছে, জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি হলো গাছের ন্যায়, কৃষি তার মূল, শিল্প তার শাখা এবং বাণিজ্য তার পাতা। সুতরাং মূলে কোন ক্ষত দেখা দিলে তা গোটা গাছটি ধ্বংস করে। জমি, জল, জনসংখ্যা আগামীর কৃষির একটি ঘনীভূত সমস্যা এবং সম্ভাবনা। প্রতি বছর ২০ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমি হ্রাস ও ২৫ লাখ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাশাপাশি পরিবর্তিত পরিবেশ এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় কৃষি-কৃষক একটি সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ সংকট মোচনের পূর্ব শর্ত হলো কৃষিতে স্থানীয় সম্পদ,  পুঁজি, প্রযুক্তি, উপকরণ ও মানবসম্পদের সুষম বিন্যাস ও ব্যবহার। আগামীর কৃষির কথা বললে কৃষি অঞ্চল তথা গ্রামের কৃষি, অর্থ, স্বাস্থ্য, পানি, বাসস্থান, জমির ব্যবস্থাপনার একটা সমষ্টিগত রূপ বিশ্লেষণ করতে হবে এবং অঞ্চলকে নিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা করার সময় এখনই তার চেয়েও বড় কথা রাষ্ট্রীয় নীতিতে কৃষি উন্নয়নের রাজনৈতিক অঙ্গীকার সমন্বত রাখা। অন্যদিকে আমাদের পূর্বে কৃষি, বন, মৎস্য সংক্রান্ত নীতিমালা ছিল না। আজ তা প্রণয়ন করা হয়েছে; তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কৃষকের স্বার্থ সরক্ষায় অন্তরায় সৃষ্টি করলে তার শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আবার নীতি, বিধান থাকলেও  ইটভাটার মালিকদের তুলনায় কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভ‚মিহীন  কৃষক।
সুতরাং মুজিব শতবর্ষে আমাদের করণীয় স্বপ্ন তিনটে হওয়া দরকার একটি হলো ১) পরিবেশসম্মত উপায়ে উৎপাদনের চাকা ঘুরিয়ে দেয়া ২) কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ উন্মুক্ত করা ৩) কৃষিকে রপ্তানির দিকে ঠেলে দেয়া। তাই প্রান্তে এসে বলি, ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। জুলি ও কুড়ি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ১৩ ফেব্রæয়ারি ১৯৭৩ কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান। তার পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমানে এক পাল কৃষি বিজ্ঞানি, ব্রিডার, ডকটর, সম্প্রসারণ কর্মী তৈরি হয়েছে। সবুজ বিপ্লবের জনক নরম্যান ই. বোরলগ, ইমেরিটাস নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন, সবাই এক সুতায় কৃষকের গাথামালা। পালের গোদা, পুবের হাওয়া, প্রভাতের সূর্য, টুঙ্গিপাড়ার শিকড় থেকে বয়ে আসা চন্দ্র কিরণ সোনালী আসের কন্যা, তুমি কৃষকের হাসি। তিনিই পারেন প্রচেষ্টার আকড়ে খাদ্য নিরাপত্তার নিগড়, কৃষকদরদি “দেশ রতœ শেখ হাসিনা”, সাবাস বাংলাদেশ।  য়

এগ্রিকালচার স্পেসালিস্ট (আইডবিøউএম), পিতা শাহ মৌলভী আহম্মদ আলী, গ্রাম পো. কালিশুরী, বাউফল mdatikullah@yahoo.com,  ০১৭১২৮৮৯৯২৭

বিস্তারিত
মাছ চাষের জন্য পুুকুর প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপ

কমর-উন-নাহার

নদীমাতৃক বাংলাদেশে এক সময় প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। তখন জনসংখ্যাও কম ছিল বিধায়, প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত মাছে আমাদের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ হতো। সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিক্ষেত্রে কীটনাশক প্রয়োগ, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নগরায়ন, কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে মাছের     প্রাকৃতিক আবাস্থল ধ্বংস হয়ে প্রাকৃতিক উৎস হতে মাছের প্রাচুর্যতা দিন দিন হ্রাস পেয়েছে। এমতাবস্তায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ প্রাকৃতিক আমিষের চাহিদা পূরণের  লক্ষ্যে আমরা পুকুরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। আমাদের খাদ্যে প্রাপ্ত প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ।
মাছ চাষ একটি লাভজনক বিনিয়োগ। কোনো জলাশয়ে বা পুকুরে প্রাকৃতিক উপায় বা স্বাভাবিকভাবে যে মাছ উৎপাদিত হয় সে জলাশয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ যোগ করে তার চেয়ে অধিক উৎপাদনের কৌশল বা পদ্ধতিকে মাছ চাষ বলা হয়। মাছ চাষের মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব।
সাধারণভাবে পুকুরের মাছ চাষ পদ্ধতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১. সনাতন পদ্ধতিতে মাছ চাষ।
২. আধা নিবিড় মাছ চাষ ।
৩. নিবিড় পদ্ধতিতে মাছ চাষ।
মাছ চাষের পূর্বশর্ত পুকুর নির্বাচন ও পুকুর প্রস্তুতি  
পুকুর নির্বাচন ও পুকুর প্রস্তুতির  ধাপগুলো সঠিকভাবে সম্পূর্ণ করলে মাছ চাষ প্রক্রিয়াটি অনেকটাই ফলপ্রসূ হয়।
পুকুর নির্বাচন : এখানে কার্প মিশ্রচাষের পুকুর নির্বাচনের ওপরে আলোকপাত করা হলো, কার্প মিশ্র চাষ বলতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালীবাউস, সিলভারকার্প, গ্রাসকার্প, কমনকার্প, রাজপুঁটি প্রভৃতি মাছকে কার্পজাতীয় মাছ বলা হয়। এসব মাছ পুকুরের বিভিন্ন স্তর থেকে বিভিন্ন খাবার খায়। এজন্য বিভিন্ন স্তরে উৎপাদিত প্রাকৃতিক খাদ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত এবং অধিক উৎপাদনের জন্য একটি পুকুরের সর্বোচ্চ ব্যবহার বাড়াতে পুকুর নির্বাচনের সময় নি¤েœাক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।
 া পুকুরটি লোকালয় বা বাড়ির কাছাকাছি হলে ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয়।
া সাধারণত দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ মাটির পুকুর মাছ চাষের জন্য উত্তম।
া যে কোনো আয়তনের পুকুরে মাছ চাষ করা যায়। তবে ৩০ শতাংশ থেকে ১ একর আকারের পুকুর বেশি উপযোগী। পুকুরের পাড় এমন উঁচু হতে হবে যাতে বন্যায় প্লাবিত না হয়।
া পানির গভীরতা ১.৫ থেকে ২ মিটার হলে ভালো।
পুকুর প্রস্তুতকরণ
া আশানুরূপ ফল পাওয়ার জন্য পুকুরের পাড় মেরামত ও তলা সমান করতে হবে।
া পুকুর পাড়ের ঝোপ ঝাড় পরিষ্কার করতে হবে। ছায়া সৃষ্টিকারী কোনো গাছ থাকলে কেটে ফেলতে হবে।
া পুরাতন পুকুরে কাদার পরিমাণ বেশি থাকে। তাই অধিক কাদা তুলে ফেলতে হবে।
া পুকুরে কোনো জলজ আগাছা, রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ রাখা যাবে না।
া পুকুর শুকিয়ে মাছ সম্পূর্ণভাবে তুলে ফেলা উত্তম।  ৪০ গ্রাম/শতাংশ/ফুট পানি হিসেবে রোটেনন প্রয়োগ করে এই রাক্ষুসে অবাঞ্ছিত মাছ দূর করা যায়। পরিমাণ মতো পানি নিয়ে তাতে রোটেনন পাউডার মিশিয়ে কাঁই তৈরি করতে হবে। তারপর ১/৩ অংশ আলাদা করে তা দিয়ে ছোট ছোট বল তৈরি করতে হবে। বাকি অংশ বেশি পানিতে গুলিয়ে পাতলা করতে হবে। এরপর কড়া রোদের সময় পাতলা অংশ সারা পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে এবং বলগুলো সমভাবে পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে।
রোটেনন প্রয়োগের সময় নাকেমুখে কাপড় ও হাতে পলিথিন বেঁধে নিতে হবে; বাতাসে অনুক‚লে ছিটাতে হবে। এসব সাবধানতা অনুসরণ করতে হবে।
চুন প্রয়োগ : মাছ চাষের ক্ষেত্রে ব্যবহারিত বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে চুন অন্যতম।
চুন প্রয়োগের উপকারিতা : পানি পারিষ্কার করে;                                     রোগবালাই দূর করে; পানির ঘোলাত্ব দূর করে; মাটি থেকে পানিতে পুষ্টি  মুক্ত করে; পুকুরের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে; মাছের আঁইশ ও কাঁটা গঠনে সহায়তা করে; পানির অ¤øøত্ব দূর করে; বিষাক্ত গ্যাস দূর করে, বাফার হিসেবে কাজ করে।
চুন প্রয়োগের মাত্রা ও পদ্ধাতি : প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে টিনের বালতি বা ড্রাম, সিমেন্টের চাড়ির মধ্যে চুন দিয়ে মুখ চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তারপর চটের বস্তার উপর আস্তে আস্তে পানি ঢালতে হবে। ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পরে আরো পানি মিশিয়ে পাতলা করে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। এ কাজটি রোদের সময় করতে হবে।
সাবধানতা : প্লাস্টিকের পাত্রে চুন ভেজানো যাবে না; মাটির চাড়ি বা টিনের বালতি বা ড্রামে চুন ভেজাতে হবে; চুন প্রয়োগের সময় নাক মুখ গামছা দিয়ে বেধে নিতে হবে; বাতাসের অনুক‚লে চুন ছিটাতে হবে, শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।
সার প্রয়োগ : চুন প্রয়োগের ৫-৭ দিন পরে সার প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগে পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়। যা কার্প মাছের পুকুরের প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক খাদ্য। এগুলো বিভিন্ন ধরনের ফাইটোপ্লাংকটন ও জুপ্লাংকটন। পুকুরের উর্বরতার ওপর সার প্রয়োগ নির্ভর করে। তবে পুকুর প্রস্তুতির সময় নিদিষ্ট মাত্রায় সার প্রয়োগ করা উত্তম।
পুকুরের প্রয়োগের কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা আগে টিএসপি ও সরিষার খৈল পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পুকুরে প্রয়োগের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি দিয়ে গুলিয়ে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সার প্রয়োগের আগে পানিতে গুলিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। কাজগুলো অবশ্যই রোদের সময় করতে হবে। সার প্রয়োগের মাত্রা সারণি-১ তে রয়েছে।
প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা : সার প্রয়োগের ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয়ে যাবে। পানির রং হালকা সবুজ, বাদামি সবুজ ও লালচে সবুজ হলে বুঝতে হবে খাদ্য তৈরি হয়েছে। পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য পরীক্ষা করা যায় ৩টি পদ্ধতিতে। যেমন : সেকি ডিস্ক পদ্ধতি, গামছা গøাস পদ্ধতি, হাত দ্বারা।
সেকি ডিস্ক পদ্ধতি : সেকি ডিস্ক একটি টিনের সাদা কালো চাকতি। যার ব্যস ২০ সেমি.। লাল, সবুজ , সাদা এই তিন রঙের সুতা দ্বারা ঝুলানো থাকে।
ি সেকি ডিস্কটি লাল সুতা পর্যন্ত ডুবতেই যদি প্লেটটি অদৃশ্য হয়ে যায় তবে বুঝতে হবে প্রাকৃতিক খাদ্য বেশি আছে। এ অবস্থায় মাছের পোনা ছাড়া যাবে না ।
ি সবুজ সুতা পর্যন্ত ডুবতেই যদি প্লেটটি অদৃশ্য হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য পরিমাণমতো আছে। মাছের পোনা ছাড়া যাবে।
ি সাদা সুতা পর্যন্ত ডুবতেই যদি প্লেটটি অদৃশ্য হয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে খাদ্য নেই। এই অবস্থায় সার প্রয়োগ করতে হবে।
কাজগুলো অবশ্যই সকাল ১০-১১ টার সময় সূর্যালোকিত দিনে করতে হবে। মেঘলা দিনে নয়।
গামছা গøাস পদ্ধতি : পুকুরের পানি স্বচ্ছ কাচের গøাসে নিতে হবে; সূর্যের আলোতে গ¬াসটি ধরতে হবে; গøাসের মধ্যে            ১০-১২টা প্রাণিকণা দেখা গেলে বুঝতে হবে পুকুরে পরিমিত খাদ্য আছে; অবশ্যই পরীক্ষাটি সকাল ১০-১১টায় সূর্যালোকিত দিনে করতে হবে; পানি ঘোলা হলে পরীক্ষার ফলাফল ভালো আসবে না ।
হাত পদ্ধতি : সকাল ১০-১১টায় সূর্যালোকিত দিনে হাতের কনুই পযন্ত পুকুরের পানিতে ডুবাতে হবে যদি হাতের তালু দেখা যায় তাহলে বুঝতে খাদ্য তৈরি  হয়নি। হাতের তালু দেখা না যায় তাহলে বুঝতে খাদ্য তৈরি  হয়েছে।
পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা : পোনা ছাড়ার একদিন আগে পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা করে নিতে হবে। একটি বালতি বা পুকুরে হাপা স্থাপন করে কিছু পোনা ছেড়ে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যদি পোনা মারা যায় বুঝতে হবে পানির বিষাক্ততা রয়ে গেছে, এই অবস্থায় পোনা ছাড়া যাবে না। কিছুদিন অপেক্ষা করে আবার পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা করে পোনা ছাড়তে হবে ।
পুকুর নির্বাচন ও পুকুর প্রস্তুতি উল্লেখযোগ্য ধাপ ও পদ্ধতিসমূহ মেনে পুকুর প্রস্তুত করলে  মৎস্যচাষের জন্য আশানুরূপ ফল পাওয়া সম্ভব। য়                                                      
মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়, সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ।  ই-মেইল :  qunahar8@gmail.com , ফোন: ০১৮১৮৪৪০০৭২                                                       

 

বিস্তারিত
আষাঢ় মাসের কৃষি (১৪২৭)

(১৫ জুন-১৫ জুলাই)
কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

আষাঢ় মাসেই নববর্ষার শীতল স্পর্শে ধরণীকে শান্ত ও শুদ্ধ করতে বর্ষা ঋতু আগমন। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ভরে ওঠে নতুন পানির জোয়ারে। গাছপালা ধুয়ে মুছে সবুজ প্রকৃতি মন ভালো করে দেয় প্রতিটি বাঙালির। সাথে আমাদের কৃষিকাজে নিয়ে আসে ব্যাপক ব্যস্ততা। প্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন আসুন আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই আষাঢ় মাসে কৃষির করণীয় আবশ্যকীয় কাজগুলো।
আউশ ধান
আউশ ধানের ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য যতœ নিতে হবে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে হবে। বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
আমন ধান
আমন ধানের বীজতলা তৈরির সময় এখন। পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার কারণে রোপা আমনের বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকলে ভাসমান বীজতলা বা দাপগ পদ্ধতিতে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করা যায়।
বীজতলায় বীজ বপন করার আগে ভালো জাতের মানসম্পন্ন বীজ নির্বাচন করতে হবে। রোপা আমনের অনুক‚ল পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত, যেমন বিআর১০, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৯০, ব্রি হাইব্রিড ধান৪, ব্রি হাইব্রিড ধান৬, বিনা ধান৭, বিনা ধান১১, বিনা ধান১৬, বিনা ধান১৭, বিনা ধান২২, বিনা ধান২৩ প্রতিক‚ল পরিবেশ উপযোগী উন্নত জাত চাষ করতে পারেন;
খরাপ্রবণ এলাকাতে নাবি রোপার পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমনের (ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১ এসব) এবং লবণাক্ত ব্রি ধান৭৩ চাষ করতে হবে;
ভালো চারা পেতে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে।
আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করা যায়;
মূল জমিতে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিতে হবে;
জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন যেন পরবর্তীতে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা যায়।
ভুট্টা
পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হবার আগে মোচা সংগ্রহ করে  ঘরের বারান্দায় সংগ্রহ করতে পারেন। রোদ হলে শুকিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নি¤œমুখী করে দিতে হবে, এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।
পাট
পাট গাছের বয়স চারমাস হলে ক্ষেতের পাট গাছ কেটে নিতে হবে।
পাট গাছ কাটার পর চিকন ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আঁটি বেঁধে দুই/তিন দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে।
পাতা ঝরে গেলে ৩/৪দিন পাট গাছগুলোর গোড়া একফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে জাগ দিতে হবে।
পাট পচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে।
যেসব জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়।    
পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য ১০০ দিন বয়সের পাট গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিয়ে দুটি গিটসহ ৩/৪ টুকরা করে ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাত করে রোপণ করতে হবে। রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে। পরবর্তীতে এসব চারায় প্রচুর ফল ধরবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।
শাকসবজি
এ সময়ে উৎপাদিত শাকসবজির মধ্যে আছে ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুন। এসব সবজির গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিতে হবে। এছাড়া বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর আবাদ করতে পারেন; উপক‚লীয় অঞ্চলে ঘেরের পাড়ে গিমাকলমি ও অন্যান্য ফসল আবাদ করতে পারেন; সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে; তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরার জন্য বেশি বৃদ্ধি সমৃদ্ধ লতা জাতীয় গাছের ১৫-২০ শতাংশের লতা পাতা কেটে দিতে হবে। কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।
আগাম জাতের শিম এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ১ ফুট চওড়া ও ১ ফুট গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা তৈরির সময় গর্তপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালোভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর প্রতি গাদায় ৩/৪টি ভালো সবল বীজ রোপণ করতে হবে।
এছাড়াও আগাম শীতকালীন সবজি উৎপাদনে টানেল টেকনোলজি ব্যবহার করা যেতে পারে।
গাছপালা
এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্য খুবই উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে; এ সময় বনজ গাছের চারা ছাড়াও ফল ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে পারেন; ফলের চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করতে হবে; সাধারণ হিসাব অনুযায়ী এক ফুট চওড়া ও এক ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, দিন দশের পরে চারা বা কলম লাগাতে হবে; বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থ-সবল চারা বা কলম রোপণ করতে হবে; চারা শুধু রোপণ করলেই হবে না। এগুলোকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচনিকাশ নিশ্চিত করতে হবে; নার্সারি মালিক যারা তাদের মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব জরুরি। সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, দুর্বল রোগাক্রান্ত ডালপালা কাটা বা ছেটে দেয়ার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
বর্ষাকালে হাঁসমুরগির ঘর যাতে জীবাণুমুক্ত ও আলো-বাতাসপূর্ণ থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে; এ মাসে হাঁস-মুরগির কৃমি, কলেরা, রক্ত আমাশায়, পুলরাম রোগ, সংক্রমণ সর্দি দেখা দিতে পারে।           চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রæত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে; বর্ষাকালে গবাদিপশুকে সংরক্ষণ করা খড়, শুকনো ঘাস, ভুসি, কুঁড়া খেতে দিতে হবে। সে সাথে কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হবে। মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়ানো যাবে না; বর্ষাকালে গবাদিপশুর গলাফোলা, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা রোগ মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে। এ জন্য প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে; এ সময় ডাইরিয়া এবং নিউমোনিয়া রোগে গবাদিপশুকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তাই গবাদিপশুকে ঠাÐামুক্ত ও শুষ্ক জায়গায় রাখতে হবে। হাল চাষের পর গরুকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; এছাড়াও যেকোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
মৎস্য সম্পদ
বর্ষা মৌসুমে পুকুরের পাড় উঁচু করে দিতে হবে; বন্যার সময় পুকুরে মাছ আটকানোর জন্য জাল, বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে; আষাঢ় মাস মাছের পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়। মাছ চাষের জন্য মিশ্র পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন; পুকুরে নিয়মিত খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে; বড় পুকুরে, হাওরে, বিলে, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন;  মাছ চাষের যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের আগাম প্রস্তুতির জন্য আগামী মাসে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেয়া হয়। বিস্তারিত জানার জন্য স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। আর একটি কথা এ সময় বীজ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণগুলো বন্যামুক্ত উঁচু বা নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।  য়

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪; ই-মেইল : fardousi30@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭)

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন
কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো. শরিফুল ইসলাম, গ্রাম : তাম্বুলখানা, উপজেলা : ফরিদপুর সদর, জেলা : ফরিদপুর
প্রশ্ন : ধান গাছের মাইজ পাতা মরে যাচ্ছে। কী করণীয়?   
উত্তর:  এটা মাজরা পোকার জন্য হচ্ছে। এই পোকা গাছের কাÐ কেটে দিচ্ছে। এই পোকা দমনের জন্য জমিতে ডাল পুতে দিতে হবে যাতে পাখি বসতে পারে এবং মাজরার লার্ভাগুলো খেতে পারে। আর রাসায়নিক ব্যবস্থা হিসেবে কার্বোসালফান গ্রæপের মার্শাল ২০ থেকে ২২ মিলি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতকে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া কারটাপ ৪৫০ গ্রাম প্রতি একরে প্রয়োগ করতে পারেন। এসব ব্যবস্থা নিলে আশা করি উপকার পাবেন।  
মো. আশরাফুজ্জামান, গ্রাম : লাউযুতি, উপজেলা : ঠাকুরগাঁও সদর, জেলা : ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন: আম গাছের পাতা, ফলে কালো দাগ পড়ছে। কী করণীয়?  
উত্তর:  এ সমস্যা ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে সুষম সার প্রয়োগ করা। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি প্রপিকোনাজল গ্রæপের যেমন টিল্ট বা কার্বেনডাজিম গ্রæপের নোইন ১ গ্রাম বা ২ গ্রাম ডায়থেন মিশিয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন পর পর সঠিক নিয়মে স্প্রে করা। এসব পন্থা মেনে চললে আপনার আম গাছের সমস্যা দূর হবে।
মো. করিম হোসন, গ্রাম : পীড়ানচর, উপজেলা : শিবগঞ্জ, জেলা : চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রশ্ন :  লিচু গাছের পাতা মোটা ভেলভেটের মতো হয়ে যাচ্ছে। কী করবো?   
উত্তর :  এ সমস্যা মাকড়ের কারণে হয়ে থাকে। এজন্য লিচু গাছের আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। তাছাড়া মাকড়নাশক যেমন ওমাইট বা ভার্টিমেক বা থিওভিট বা কুমুলাস প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম করে ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। তাহলেই আপনি উপকার পাবেন।      
মোছা : মৌপিয়া সুলতানা, গ্রাম : মৌতলা, উপজেলা : কালিগঞ্জ, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : পান গাছের কাÐ পচে যাচ্ছে করণীয় কী?
উত্তর :  এ সমস্যা ছত্রাকের কারণে হয়ে থাকে। আপনার পান গাছের কাÐের সমস্যার সমাধানের জন্য কপার অক্সিক্লোরাইড জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন সানভিট বা বিøটক্স প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম করে মিশিয়ে কাÐ ও চারপাশের মাটিতে ৭ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করা। এছাড়া বোর্দোমিক্সার অর্থাৎ ১০০ গ্রাম তুঁত ও ১০০ গ্রাম চুন ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। এসব কার্যক্রম গ্রহণ করলে আপনি উপকৃত হবেন।   
মোছা : সোনিয়া শারমিন, গ্রাম : লখাইডাঙ্গা, উপজেলা : মণিরামপুর, জেলা : যশোর
প্রশ্ন :  ভুট্টার মোচায় কীড়ার আক্রমণ করে পাতা ও মোচা খেয়ে ফেলছে। সমস্যার সমাধান জানাবেন।
উত্তর : ভুট্টা গাছে কীড়ার আক্রমণ রোধে অনুমোদিত          কীটনাশক যেমন ক্যারাটে ২.৫ ইসি ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে সঠিকভাবে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। প্রতি ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ নিয়ম মেনে চললে আপনি উপকৃত হবেন।
মো: কবির হোসেন, গ্রাম : ব্রাহ্মণগাঁ, উপজেলা :  গৌরনদী, জেলা : বরিশাল
প্রশ্ন : পটোল গাছের কাÐ ও পাতায় এক ধরনের পোকার আক্রমণে পটোল গাছের কাÐ বিবর্ণ ও শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় কী করণীয়? জানাবেন।  
উত্তর : পটোল গাছের আঁশ পোকা বা মিলি বাগ পোকার আক্রমণ হলে এমনটি হয়ে থাকে। এজন্য আক্রান্ত কাÐ ও গাছ তুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আর পোকা দমনের জন্য অনুমোদিত বালাইনাশক যেমন মার্শাল ২ মিলি বা মিপসিন ১.৫ গ্রাম কিংবা ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রæপের যেমন টিডো ১ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে। তাহলেই আপনি উপকার পাবেন।
মৎস্যবিষয়ক
মো. আসলাম উদ্দিন, গ্রাম : সরদার পাড়া, উপজেলা : বাঘা, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : পুকুরে মাছ মজুদ পরবর্তী সার প্রয়োগ করব কতটুকু ?
উত্তর : পুকুরে মাছ মজুদ পরবর্তী সার প্রয়োগ করলে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদিত হয়। সার প্রয়োগের    মাত্রা-প্রতি শতাংশে ও প্রতি সপ্তাহে: কম্পোস্ট ০.৫ থেকে    ১ কেজি; ইউরিয়া ৫০ থেকে ৭৫ গ্রাম, টিএসপি ৫০ থেকে ৭৫ গ্রাম। সার প্রয়োগ পদ্ধতি : পানিতে গুলিয়ে পুকুরের সর্বত্র মগ বা বাটি দিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে।     
রতন কুমার, গ্রাম : সাচিয়া, উপজেলা : নাজিরপুর, জেলা : পিরোজপুর
প্রশ্ন : পুকুরে অক্সিজেন স্বল্পতাজনিত সমস্যা দেখা যাচ্ছে কী করবো?
উত্তর : কলস বা পাতিল দিয়ে পুকুরের পানিতে ঢেউয়ের সৃষ্টি করতে হবে। প্রতি শতাংশে ৫ থেকে ৭ গ্রাম অক্সিফ্লো বা অক্সিলাইফ বা এসিঅক্স ব্যবহার করা যেতে পাওে অথবা সম্ভব হলে বাইরে থেকে পরিষ্কার ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ পানি পুকুরে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে এবং খাদ্য ও সার প্রয়োগ কয়েক দিন বন্ধ রাখতে হবে।
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
আরমান, গ্রাম : রাধাকান্তপুর, উপজেলা : লালপুর, জেলা : নাটোর
প্রশ্ন : আমার গাভীর হলুদ বর্ণের ¯্রাব দেখা যাচ্ছে। পেট অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জরায়ুর মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় কী করণীয় ?
উত্তর: ট্রাইসালফা এবং স্ট্রেপটোমাইসিন অথবা অক্সিটেট্রাসাইক্লিন অথবা কট্টিম ভেট খাওয়াতে হবে। সাথে ডেক্সট্রোজ স্যালাইন দিতে হবে। আশাকরি উপকার পাবেন।     
মো. আলামিন, গ্রাম : বড়গাবুয়া, উপজেলা : গলাচিপা,      জেলা : পটুয়াখালী
প্রশ্ন : আমার গাভীর কাঁধ ও মধ্যভাগের মাংসপেশির কাঁপুনি হচ্ছে। আক্রান্ত গাভীর শ^াস-প্রশ^াস, দুধ ও বাসস্থানের সর্বত্র এসিটোনের মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কী করব?    
উত্তর : গøুকোজ বা ডেক্সট্রোজ ৫০% নর্মাল স্যালাইনেসলুশন বানিয়ে ৫০০ মিলি শিরায় ইনজেকশন করলে দ্রæত সুফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রোপাইলিন গøাইকোল বা গিøসারিন ১২৫-২৫০ মিলি সমপরিমাণ পানির সাথে মিশিয়ে প্রথম দিনে ২ বার ২দিন ও পরে দিনে ১ বার ২দিন খাওয়াতে হবে।  
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল নং ০১৭১১১১৬০৩২,  ই-মেইল :aufiquedae25@gmail.com

 

বিস্তারিত
মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে আমের ফলন প্রাক্কলন

ড. মো. সেলিম উদ্দীন১ ড. মো. শরফ উদ্দিন২, শামীম আরা বেগম৩

করোনা বর্তমানে মহামারী আকারে দেখা গেছে পৃথিবীর ২১০টি দেশে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব লক্ষণীয়। কৃষি সেক্টরসহ অন্যান্য সেক্টরেও হানা করোনার। দেশের উন্নয়ন আজ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত। এক সময় মনে হচ্ছিল শ্রমিক অভাবে হাওড়-এর ধান হয়তবা ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। কিন্তু পরবর্তীতে মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বেব কৃষি যোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশের হাওড় অঞ্চলের ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। ব্যবহার হয়েছে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার। আসলে কৃষি সহজীকরণের জন্য কৃষি যান্ত্রিীকরণের বিকল্প নেই। আপনার হয়ত বা জেনে থাকবেন, আমের বাগান ১-১০ বছরের জন্য কেনাবেচা হয়। আবার এক মৌসুমেই ৩-৪ বার কেনাবেবচা হয়ে থাকে। কিন্তু করোনা প্রভাব শুরু হওয়ার জন্য এ বছর আম বাগান কেনাবেবচা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দেশের ব্যবসায়ীরা অনুমান করে আম বাগানগুলো কিনে থাকেন। এক সাথে দল বেঁধে কয়েকজন আমগাছকে তারা করেন পরে বাগান মালিকের সাথে দরদাম করে আম গাছ, আম বাগান, ক্রয় করেন। কিন্তু এই বছর জনগণের চলাচল বাধা, করোনা আতঙ্ক, আম বাজার নিয়ে দুশ্চিন্তা সব কিছুর ফলে আম বাগানগুলো অবিবক্রিত রয়েছে। আম গাছ থাকা অবস্থায় আমের ফলন অনুমান করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। কিন্তু বর্তমানে মোবাইল অ্যাপসস ব্যবহার করে আমের ফলন নিরূপণ করা যায়। যা আম বাগান কেনাবেচার কাজে অনেক সহায়ক হতে পারে।
আম এদেশের একটি গুরুত্বপূর্ন অর্থকরী ফসল। ছোট-বড় সকলের নিকট পছন্দনীয় একটি ফল। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে আম গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। বর্তমানে আম উৎপাদনে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে। আমের প্রধান চাষাবাদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের ২৩ জেলাই আমের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। আম উৎপাদনকারী প্রধান জেলাগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, কষ্টিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, টাঙ্গাইল, জামালপুর, মেহেরপুর, ঝিনাইদাহ, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবান। প্রতি বছর বাড়ছে আম চাষাবাদের এলাকা এবং সেই সাথে বাড়ছে আমের ফলন। বিবিএস, ২০১৮ অনুযায়ী এদেশে ৪১৬৭৬ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হচ্ছে এবং উৎপাদিত আমের পরিমাণ ১২.৮৮ লাখ মেট্রিকটন। এদেশে প্রতি বছর নতুন আমের বাগান সম্প্রসারিত হচ্ছে। ধানের নায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ার কারণে ধানচাষিরা ঝুকছেন আম চাষের উপর। আম গবেষকরা চেষ্ঠা চালিয়া যাচ্ছেন প্রতি বছর ফলপ্রদানকারী নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতি বছর ফলদানকারী ১২ টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। উদ্ভাবিত জাতগুলো বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ হচ্ছে। আমের গুণগতমান নিশ্চিত করণের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে আমের আধুনিক উৎপাদন কলাকৌশল যার মধ্যে সার ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন ব্যবস্থাপনা। আমকে শতভাগ মাছি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য এবং আমে বালাইনাশকের ব্যবহার কমাতে উদ্ভাবন করা হয়েছে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি। আমচাষিকে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদানের জন্য মাঠ পর্যায়ে কর্মরত আছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দক্ষ জনবল। ফলে আমচাষিরা আমের ভালোফলন পাচ্ছেন। তবে কখনও কখনও আমের নায্যমূল্য পাওয়া থেকে বিরত থাকেন। এই বিষয়টি নিয়েও গবেষকরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আমের কেনাবেচা কিন্তু অন্য ফল ফসলের মতো নয়। বহুবর্ষজীবি হওয়ায় এক বাগান কয়েকবার কেনাবেচা হয়। কোন কোন সময় দেখা যায়, এক মৌসুমেই কয়েকবার হাত বদল হয়। আবার কেউ কেউ ৩-৫ বছরের বা দীর্ঘ মেয়াদের জন্য আমবাগান বিক্রি করে থাকেন। যখনই আম বাগান কেনাবেচা হয় তারা কিন্তু আমের ফলন অনুমান করতে ক্রেতাগণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে থাকেন। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতার দামাদামি করার তেমন সুযোগ থাকে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উপায় ছিলনা আমবাগান মালিকদের। আমবাগান কেনাবেচায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কোন ভাবেই কমানো সম্ভব হচ্ছিল না। কৃষি গবেষকরা এই বিষয়ে অবগত ছিলেন কিন্তু সমাধানের তেমন কোন উপায় তাদের হাতে ছিল না। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মার্ণে রূপকল্প-২০২১ সামনে রেখে কৃষির বিভিন্ন সেক্টরে বিভিন্ন অ্যাপসের ব্যবহার শুরু হয়েছে। বারি উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোকে হাতের মুঠোই আনতে উদ্ভাবন করা হয়েছে মোবাইল ভিত্তিক অ্যাপস “কৃষি প্রযুক্তি ভাÐার”। এই অ্যাপস ব্যবহার করে পৃথিবীর যে কোন জায়গা থেকে বারি উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। চাষি ভাইয়েরা ইচ্ছে করলেই ঘরে বসে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে উদ্ভাবিত যে কোন            ফল-ফসলের চাষবাস, পরিচর্যা, রোগ-বালাই দমন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
আমবাগান কেনাবেচায় আমের ফলন নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখন থেকে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে আগাম জানা যাবে আমের ফলন। ইমেজ এনালাইসিসের মাধ্যমে যে কোন জাতের ফলন আগাম নির্নয় করা সম্ভব হবে। এই অ্যাপস দিয়ে আমের ফলন প্রাক্কলন করতে প্রয়োজন হবে আমসহ গাছের ছবি, এই ছবি এনালাইসিস করে আমের সংখ্যা বের করা হবে। আমগাছের বয়স অনেক বেশি হলে বা ক্যানোপির বিস্তার বেশি হলে একটি গাছের কয়েকটি ইমেজ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এরপর প্রত্যেক জাতের আমের গড় ওজন দিয়ে গুন করলে ফলন বের হবে। এই ম্যাগো অ্যাপস ব্যবহার করে অত্যন্ত স্বল্প খরচে ও কম সময়ে অনেকাংশে নির্ভুলভাবে আমের ফলন প্রাক্কলন সম্ভব হবে। অথচ বর্তমানে আম গাছের ফলন প্রাক্কলনের প্রধান ও একমাত্র উপায় হলো প্রতিটি গাছের আম গননা করেপ্রাপ্ত সংখ্যাকে প্রত্যেক জাতের গড় ওজন দিয়ে গুন করে ফলন প্রাক্কলন করা হয়। বাগানের মালিক এই ভাবে ফলন বের করার দুঃসাহস কখনও করেন না। শুধুমাত্র দালাল বা ফড়িয়ারা এইভাবে আমের ফলন অনুমান করে আম বাগান ক্রয় করে থাকেন। ফলে আমবাগান মালিক বা আমচাষির ক্ষতির সম্ভবনা বেশি থাকে। অপরপক্ষে দালাল বা ফড়িয়াদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। শুধু তাই নয়, এই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সারাদেশের আমের ফলন ও নির্নয় করা সম্ভব। বর্তমানে দেখা যায়, এক বছর আমের দাম বেশি হয় এবং অন্য বছর একবারে দাম কমে যায়। দেশের আগাম ফলন জানা থাকলে আম সংরক্ষন, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা করা সম্ভব। বিবিএস এর তথ্য বিশ্লেষন করে পরিকল্পনা করলে তা তেমন কাজে আসবে না। এমতাবস্থায়, বারি উদ্ভাবিত ম্যাংগো অ্যাপস (যঃঃঢ়://নধৎরঢ়ৎবপরংরড়হধমৎরপঁষঃঁৎব.ড়ৎম/) ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি আম গাছের ফলন, প্রতিটি বাগানের ফলন সঠিকভাবে প্রাক্কলন করা সম্ভব। প্রাপ্ত প্রাক্কলিত ফলনের উপর ভিত্তি করে আম বাগান কেনা-বেচা করে আম বাগান মালিক, কৃষক, আড়ৎদার, বাগানক্রেতা সকলেই প্রতারণার হাত হতে রক্ষা পাবেন।এদেশে উৎপাদিত আমের সম্ভাবনা অনেক। দেশিয় ও বিদেশি বাজারে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে সুস্বাদু আমের চাহিদা। এমতাবস্থায়, আম চাষ, আমের ব্যবসা লাভজনক হোক এমনটিই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। য়

১এসএসও, পিজিআরসি, ২এসএসও, ফল বিভাগ, এইচআরসি এবং ৩এসএসও, বীজ প্রযুক্তি বিভাগ বারি, জয়দেবপুর, গাজীপুর। মোবাইল : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল : sorofu@yahoo.com

 

বিস্তারিত
কবিতা (করোনা জয়ের কৃষি) (জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭)

করোনা জয়ের কৃষি

কৃষিবিদ মোঃ  হামিদুর রহমান১

শেখ হাসিনার আহ্বান
মানবো সবাই সপে প্রাণ।
প্রতি ইঞ্চি জমি
চাষ করবো আমি।
বসত ভিটায় বারো মাস
ফল সবজি করবো চাষ।
বাড়ির ছাদে বারো মাস
ফল সবজি করবো চাষ।
খাদ্য, পুষ্টি, অর্থ পেতে
কৃষি কাজে উঠবো মেতে।
ফলাবো ফসল বারো মাস
অভাব দুঃখ করবো নাশ।
যতই আসুক বাধা ভয়
সাহস নিয়ে করবো জয়।
হোক করোনা ভয়ঙ্কর
লড়বো তবু নিরন্তর।
কোটি প্রাণের ঐক্যতান
করোনা জয়ের অগ্নিবান।
মুজিব বর্ষে বাংলাদেশ
শক্তি সাহস অনিঃশেষ।

 

কৃষকের পাশে কৃষিবিদ
ড. সমজিৎ পাল২

বড় বড় কথা যে যাই বলুক, টক শোর শত ঋষি!
ভরসার স্থান একটাই, সেটা-
এই বাংলার কৃষি।
সাত কোটি লোক পায়নি খাবার এই বাংলার মাটিতে
সতেরো কোটিও খাচ্ছে এখন
রয়েছেও পরিপাটিতে।
কমে গেছে জমি, পাল্টেছে যুগ, পাল্টেছে জলবায়ু
পুষ্টিযুক্ত খাবার খাওয়াতে
বেড়ে গেছে তবু আয়ু।
মঙ্গা-মন্দা, মহামারী গেছে, রাজনীতি ডানে-বামে
তারপরও দেশ মাথা তুলে আছে
কৃষকের শ্রমে-ঘামে।
কৃষকের পাশে কৃষিবিদ আছে শত সংগ্রামে সঙ্গী
সুখে-দুখে আর বিপদে-আপদে
জড়িয়ে অঙ্গা-অঙ্গি।
করোনার এই মহাদুর্যোগে উভয়েই আছে মাঠে
যন্ত্রের সাথে, শত শত হাতে
ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটে।
পরের ফসল ফলাতে আবার দরকারি বীজ-সার
কৃষকের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে
সরকারি উপহার।
দুর্যোগ আর দুর্ভোগ শেষে দাঁড়াতেই হবে ঘুরে
কৃষির সকল অংশীজনের
শপথটা এক সুরে।
কাজ করে কেউ, কথা বলে কেউ, কেউ দেখে বসে রঙ্গ
সত্যিই সেলুকাস -
বড়ই বিচিত্র এই বঙ্গ.. ..! য়

১এপিএ এক্সপার্ট পুল সদস্য, কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাক্তন মহাপরিচালক, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১১৮০৩৬৯৫, ই-মেইল : hamidur2152@gmail.com ২পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইল : ০১৭১২০২১১৪০, ই-মেইল :samajitpal@bsri.gov.bd

 

ঋতুভিত্তিক ফসল চাষ

ড. মোঃ আলতাফ হোসেন১

ফসলের আছে দুইটি ঋতু- রবি ও খরিফ
ঋতুভিত্তিক ফসল চাষের ধরছি তুলে জরিপ।
রবি  ঋতু শীতের ঋতু, হাড় কাঁপে শীতে
তাপমাত্রা কমতে কমতে নেমে আসে ৪ডিগ্রীতে।
খরিফ হচ্ছে গরমের ঋতু শরীর ঘামে গরমে
রোদ, বৃষ্টি, খরা ও তাপকে রাখতে হবে স¦রণে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ ফসলই রবি ঋতুতেই হয়
ধরেছি তুলে ঋতুভিত্তিক ফসল বিন্যাসে বিজ্ঞানীরা কি কয়।
গম, সরিষা, ছোলা, মুসুর শীতের ফসল ভাই
কাঙ্খিত ফলন পেতে হলে ল¤¦া শীত চাই।
নাতিদীর্ঘ হলে শীত ফসল অকালে পরিপক্ক হয়
দানাগুলো পুষ্ট না হয়ে ছোট ছোট হয়ে রয়।
ভূট্টা বেশ শক্ত ফসল উভয় ঋতুতেই হয়
রবিতে চাষেই ফলন বেশী বিশেষজ্ঞেরা কয়।
মাসকলাই ও মুগ গ্রীষ্মকালীন ফসল বুনতে হয় খরিফে
বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে এর চাষ লেট হয় রবিতে ।
সমুদ্র উপকুলবর্তী এলাকায় ফেলনের চাষ হয়
রবিতেই চাষ সীমাবদ্ধ থাকে খরিফেতে নয়।
তিল চাষ খরিফেতে আর তিসি হয় রবিতে
সূর্যমুখী ও সয়াবিন করা যায় উভয় ঋতুতে।
শীতের সবজী- কপি, মুলা, গাজর আরও আছে সীম দেশী
আগাম চাষ করতে পারলে দাম পাওয়া যায় অনেক বেশী।
টমেটো খুব মজার সবজী রবিতেই ভাল হয়
ছাউনী ও হরমোন প্রয়োগে খরিফেতেও করা যায়।
বেগুনের আছে অনেক গুন উভয় ঋতুতেই চাষ করা যায়
খরিফেতে করলে চাষ পোকা-মাকড়ের আক্রমণ বৃদ্ধি পায়।
কুমড়া সবজী দিবস নিরপেক্ষ সারা বছরই করা যায়
জাতভেদে কেউবা রবি, আবার কেউবা খরিফে ভাল হয়।
রবি মৌসুমে মসলা  চাষে জমির সংকট হয়
গম, ভুট্টা, সবজী ও আলুতে জমি দখল করে রয়।
পিঁয়াজ, মরিচ মসলা ফসল উভয় ঋতুতেই হয়
রসুন শুধু রবিতেই হয়, খরিফেতে নয়।
রবিতে চাষ ধনিয়ার, ফুলগুলো তার সাদা
খরিফেতেই চাষ হয় শুধু হলুদ ও আদা।
আখ ফসল দীর্ঘমেয়াদী সারা বছরই লাগে
এক রবিতে রোপন করলে আরেক রবি আসে।
পাট হচ্ছে খরিফের ফসল, দিবস সংবেদনশীলতা আছে
অধিক খেয়াল রাখতে হবে এই ফসলটি চাষে।
উচ্চ ফলনশীল ধানের দিবস সংবেদনশীলতা নাই
রবি ও খরিফ উভয় মৌসুমে তাই চাষ করে যাই।

 

কৃষকের পাশে কৃষিবিদ
ড. সমজিৎ পাল২
বড় বড় কথা যে যাই বলুক, টক শোর শত ঋষি!
ভরসার স্থান একটাই, সেটা-
এই বাংলার কৃষি।
সাত কোটি লোক পায়নি খাবার এই বাংলার মাটিতে
সতেরো কোটিও খাচ্ছে এখন
রয়েছেও পরিপাটিতে।
কমে গেছে জমি, পাল্টেছে যুগ, পাল্টেছে জলবায়ু
পুষ্টিযুক্ত খাবার খাওয়াতে
বেড়ে গেছে তবু আয়ু।
মঙ্গা-মন্দা, মহামারী গেছে, রাজনীতি ডানে-বামে
তারপরও দেশ মাথা তুলে আছে
কৃষকের শ্রমে-ঘামে।
কৃষকের পাশে কৃষিবিদ আছে শত সংগ্রামে সঙ্গী
সুখে-দুখে আর বিপদে-আপদে
জড়িয়ে অঙ্গা-অঙ্গি।
করোনার এই মহাদুর্যোগে উভয়েই আছে মাঠে
যন্ত্রের সাথে, শত শত হাতে
ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটে।
পরের ফসল ফলাতে আবার দরকারি বীজ-সার
কৃষকের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে
সরকারি উপহার।
দুর্যোগ আর দুর্ভোগ শেষে দাঁড়াতেই হবে ঘুরে
কৃষির সকল অংশীজনের
শপথটা এক সুরে।
কাজ করে কেউ, কথা বলে কেউ, কেউ দেখে বসে রঙ্গ
সত্যিই সেলুকাস -
বড়ই বিচিত্র এই বঙ্গ.. ..! য়


১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত¡), ডাল গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা। মোবাইল নং ০১৭২৫-০৩৪৫৯৫,  E-mail: hossain.draltaf@gmail.com; ২উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা, মেট্রোপলিটন কৃষি অফিস, মতিহার, রাজশাহী, মোবা: ০১৭১৮৪০৮৫৪৬; ২পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা।

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook