কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

শাকসবজির পুষ্টিমান

শরীরের দৈনিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে শাকসবজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শাক সবজিতে দেহের জন্য প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, খনিজ লবণ ও আঁশ রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ শাকসবজি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়াও খাদ্যদ্রব্য হজম, পরিপাক ও বিপাকে সহায়তা, শর্করা-আমিষ ও তেলকে ক্যালরিতে (শক্তি) পরিণত করতে, খাবারে রুচি বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।


উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ যেমন- মূলা, ডাঁটা, পাতা, ফুল, ফল, বিচি সবই শাকসবজি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। উদ্ভিদের ভক্ষণযোগ্য অংশ অনুসরণে শাকসবজিকে নিম্নলিখিতভাবে শ্রেণিকরণ করা হয়েছে-


১. পাতাজাতীয় : পালংশাক, লাউশাক, মুলাশাক, লালশাক, বাঁধাকপি, ধনেপাতা, পেঁয়াজপাতা ইত্যাদি।
২. কন্দ বা শিকড় : গাজর, আলু, শালগম, মুলা, ওল, কচু, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি।
৩. ফুলজাতীয় : ফুলকপি, শাপলা।
৪. ফলজাতীয় : লাউ, ঝিঙা, শসা, টমেটো ইত্যাদি।
৫. শুঁিট ও বীচিজাতীয় : শিম, মটরশুঁটি, বরবটি ইত্যাদি।
শাকসবজিতে পানি, শর্করা, সেলুলোজ, পেকটিন, খনিজ উপাদান, ভিটামিন কম-বেশি পরিমাণে থাকে। তবে শাকসবজির কোষে নিম্নলিখিত উপাদানগুলোও থাকে।
১. উদ্ভিদ কোষের প্রাচীর সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। এর ফলে কোষ প্রাচীর কঠিন ও অস্থিতিস্থাপক হয়। প্রাচীরে হেমিসেলুলোজও থাকে।
২. প্রাচীরের নিচে পেকটিন জাতীয় শর্করা থাকে যা আঠার মতো কাজ করে এবং সবজির খোসাকে ভেতরের অংশে আটকে রাখে। সবজি পরিপক্ব হলে পেকটিন দ্রবীভূত হয় এবং খোসা ঢিলে হয়ে পড়ে।
৩. প্রাচীরের ভেতর Protoplasmic Membrane থাকে যা Protoplasm-কে ধরে রাখে। এতে Plastids ও থাকে, যাতে ওই শাকসবজির রঞ্জক পদার্থ অবস্থান করে। এগুলো হচ্ছে-
ক. কেøারোপ্লাস্টস- এতে সবুজ রঞ্জক পদার্থ কেøারোফিল থাকে। পাতায় এই পদার্থ বেশি থাকে।
খ. ক্রোমোপ্লাস্টস- এতে পানিতে অদ্রবণীয় হলুদ, কমলা বর্ণের ক্যারোটিন থাকে যেমন- মিষ্টিকুমড়া, গাজর ইত্যাদি।
৪. লিউকোপ্লাস্টস-বর্ণহীন, এতে এ্যানথোসায়ানিন ও ফ্লেভোনস জাতীয় বর্ণহীন উপাদান থাকে যেমন আলু, শালগম, মুলা ইত্যাদি। এ্যানথোসায়ানিন অবশ্য লাল, বেগুনি রঞ্জক পদার্থের উপাদান, যেমন-বীট, লালশাক, বাধাঁকপি ইত্যাদিতে থাকে।
৫. কোষের ভেতর বেশির ভাগ জায়গাজুড়ে Vacuoles থাকে যাতে সেলুলোজ, কিছু প্রোটিন ও চর্বির মিশ্রণ থাকে।
বেশির ভাগ শাকসবজিতে পানির পরিমাণ বেশি (>৮০ শতাংশ) এবং প্রোটিন ২-৩ শতাংশ। বিচি, শিম-এ প্রেটিন বেশি থাকে। কন্দ ও মূলজাতীয় সবজিতে শ্বেতসার প্রচুর থাকে। ডাঁটা, পাতায়, সবজির খোসায় সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, পেকটিন, গাম থাকে যা সবজির কাঠিন্য ও আকার ঠিক রাখে। এছাড়াও কিছু এনজাইম  ও inhibitors থাকে।


সবুজপাতায়, পালংশাকে, বিট, সবুজ বীজে oxalic acid থাকে। খনিজ উপাদানের মধ্যে K, Ca, Fe, Na ইত্যাদি থাকে লবণরূপে যেমন phosphates, chlorides, carbonates ইত্যাদি। Phenolic যৌগ hydroxyl acids, flavones সবজিতে থাকে। সালফারজাতীয় যৌগের জন্য সবজিতে বিশেষ ধরনের গন্ধ পাওয়া যায়। আলুতে 2-isopropyl-3-me thoxypyrazine, বাঁধাকপিতে dimethyl sulfide, পেঁয়াজে thriopropanal-s-oxide অথবা এদের মিশ্রিত যৌগ থাকে। পেঁয়াজ, বাঁধাকপি, মুলা, সরিষা প্রভৃতিতে উদ্বায়ী সালফার যৌগ থাকে যার গন্ধ রান্নার সময় ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাইকোসাইড জাতীয় উপাদানের জন্য করলা, লেবুর খোসা তেতো লাগে।


উদ্ভিদের অন্যান্য অংশ হতে সবুজশাক পাতায় খাদ্য উপাদান বেশি থাকে। ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফলিকএসিড, ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-কে প্রভৃতি ভালো পরিমাণ থাকে। গাঢ় সবুজ রঙের পাতায় এই সকল উপাদান হালকা সবুজপাতা হতে বেশি পরিমাণে থাকে। ভিটামিন-সি এর জন্য শাকপাতায় লৌহের শোষণ সম্ভব হয়। সবুজ, হলুদ, শাকসবজির প্রধান অবদান হচ্ছে ক্যারোটিন। ক্যারোটিন দেহে ভিটামিন ‘এ’-তে রূপান্তরিত হয়। শাকপাতায় ভিটামিন-সি এবং ফলিকএসিড থাকে, যা শস্যে এবং ডালে কম থাকে। তাই শাকসবজি ডাল ভাতের পরিপূরক।


মূল ও কন্দ জাতীয় খাদ্য উদ্ভিদের পুষ্টিভাণ্ডার; বিশেষ করে আলু, কচু, মিষ্টিআলু প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণ শ্বেতসার জমা থাকে। পৃথিবীর বহু দেশে আলু প্রধান শক্তিদানকারী খাদ্যরূপে গ্রহণ করা হয়। নতুন আলুতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। পুরনো আলুর শ্বেতসার বিশ্লেষিত হয়ে মালটোজ ও কিছ গ্লুকোজ উৎপন্ন করে। এ কারণে পুরানো আলু, নতুন আলুর অপেক্ষা স্বাদে মিষ্টি। আলুতে ২%-এর মতো প্রোটিন থাকে, কিন্তু এই প্রোটিন উচ্চ জৈব মানের। নতুন আলুতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৫-৩০ মিগ্রা. পর্যন্ত ভিটামিন‘সি’ থাকে। আলু পটাশিয়ামের ভালো উৎস। অন্যান্য পুষ্টি উপাদান, যেমন- ক্যালসিয়াম, লৌহ, বি-ভিটামিন কম পরিমাণে থাকে। আলুর খোসার নিচেই প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে, তাই খোসা সমেত আলু সিদ্ধ করা হলে, এসকল পুষ্টি উপাদানের অপচয় কম হয়।


বিভিন্ন প্রকার ফল সবজিতে শ্বেতসার, ভিটামিন ও খনিজলবণ থাকে। রঙিনসবজি, যেমন- গাজর, মিষ্টিকুমড়া, টমেটো প্রভৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমান ক্যারোটিন থাকে। কাঁচামরিচ, টমেটো, বাঁধাকপি, ভিটামিন-সি এর ভালো উৎস। সব সবজিতে ভালো পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে। শাকসবজিতে পানির পরিমাণ বেশি বলে প্রোটিন ও শক্তিমূল্য কমে যায়। এজন্য লাউ, শশা, ঝিঙা প্রভৃতি সবজির ক্যালরি ও প্রোটিনের মান খুবই কম।


বাংলাদেশের জাতীয়খাদ্য গ্রহণ নির্দেশিকা-২০১৫ অনুযায়ী দৈনিক অন্তত ১০০ গ্রাম বা ১ আটিশাক এবং ২০০ গ্রাম বা ২ কাপ সবজি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু Income & Expenditure Survey (HIES)-2016 এর তথ্যানুযায়ী একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক গড়ে ১৬৭.৩০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুব অল্প। যদিও বিগত দশ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে দৈনিক সবজি গ্রহণের প্রবণতা খুব বেশি বৃদ্ধি পায় নাই।  HIES-2005 এবং HIES-2010 এর তথ্যানুযায়ী দৈনিক সবজি গ্রহণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৫৭.০০ এবং ১৬৬.০৮ গ্রাম। পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষ সম্ভবত এত কম পরিমাণ শাকসবজি খায় না। সাধারণত আমাদের খাদ্য তালিকায় ভাত জনপ্রিয়তার শীর্ষে, সেই তুলনায় শাকসবজির গ্রহণের চাহিদা একেবারেই কম।


বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক চাহিদানুযায়ী শাকসবজি গ্রহণের ফলে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনী রোগ, ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।   শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে আঁশও থাকে, যা মলাশয়ের ক্যান্সার, মূত্রনালীর পাথর, ডায়াবেটিস, স্থুলকায়ত্ব, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগপ্রতিরোধ করতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে দেহকে সুস্থ ও সতেজ রাখে। এছাড়াও শাকসবজিতে বিদ্যমান আঁশগ্রহণকৃত খাদ্য দ্রবের মধ্যস্থিত অতিরিক্ত কোলেস্টেরল/চর্বিসহ অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিকের সাথে যৌগ তৈরি করে শরীর থেকে নিষ্কাশন করার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। শাকসবজিতে বিদ্যমান ভিটামিন ই, সি এবং বিটাক্যারোটিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার যেমন-প্রস্টেট, ওভারিয়ান, স্তন এবং বিশেষ করে ত্বকের ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।


শিশুদের অপুষ্টিজনিত রাতকানা, অন্ধত্ব, রিকেট, বিভিন্ন প্রকার চর্মরোগ, স্কার্ভি, মুখ ও ঠোঁটের কোণে ঘা, রক্তশূন্যতা দূরীকরণেও শাকসবজি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

 

ফারজানা রহমান ভূঞা

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ফলিতপুষ্টি ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান), মোবাইল নং: ০১৮৩২-২৭২১৪২ ইমেইল: farjanarb@yahoo.com

 

 

বিস্তারিত
পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ সবজি

বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সুনাগরিক প্রয়োজন। সুনাগরিক হতে হলে স্বাস্থ্যবান হতে হবে, সুস্থ চিন্তা করতে হবে এবং সুকর্ম করতে হবে। স্বাস্থ্যবান থাকা বা সুস্থ চিন্তা এসবের জন্য মূলত অবদান থাকে খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা ও পরিবেশের। একটা শিশুর  মস্তিষ্ক বিকাশের সময় হলো ৫ বছর বয়স পর্যন্ত। এই সময়ে যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে পুষ্টি সমৃদ্ধ/সুষম খাবার না দেয়া হয় তবে পুষ্টি ঘাটতির ফলে কম  মেধা নিয়ে তারা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে আমাদের পরিবার বা জাতীয় পর্যায়ে তার অবদান রাখার ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ সুনাগরিক হতে সুষম খাবার গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে খাবার হওয়া চাই নিরাপদ। খাবারের  জোগান দিচ্ছে আমাদের কৃষক এবং কৃষি। এজন্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মানসম্পন্ন কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার ১ম বৈঠকই তিনি কৃষি পণ্য উৎপাদনে সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকা সারের মূল্য ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে ও হাতের নাগালের নিয়ে এসেছেন। সুষম সারের ব্যবহার যেন আরও বেশি হয় সেজন্য এ বছর বিজয়ের মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের অনুসৃত নীতি ও মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক মহোদয়ের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ডিএপি সারের দাম আরও একধাপ কমিয়ে আনা হয়। সরকার এ নিয়ে পাঁচ দফায় সারের মূল্য কমালো। সারে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে ৮০ টাকার টিএসপি সার ২২ টাকা, ৭০ টাকার এমওপি ১৫ টাকা ও ৯০ টাকার ডিএপি ১৬ টাকায় নির্ধারণ করায় কৃষকগণ তাদের ফসল ক্ষেতে সুষম সার প্রয়োগ করতে পারছে।


বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব এবং সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী একজন কৃষি বিজ্ঞানী। মন্ত্রী মহোদয় জানেন নিরাপদ কৃষি পণ্য উৎপাদনের প্রথম শর্তই হলো কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণগুলো মাটি, মানব স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য নিরাপদ হয়। সারের দাম বেশি হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল ও নিম্নমানের সার কমদামে দরিদ্র কৃষকদের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করে। ভেজাল সার ব্যবহারের ফলে সুষম পুষ্টির অভাবে ফসল তার শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যার জন্য বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। এগুলো ঠেকাতে কৃষকগণ আবার অধিক পরিমাণে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এতে একদিকে মাটি, মানব ও প্রাণিস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সবই হুমকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে কৃষি পণ্য বিশেষত শাকসবজি গ্রহণ আর নিরাপদ থাকে না। অনেক ভোক্তা না জেনে এই ধরনের সবজি খেয়ে বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগতে থাকে আবার অনেকে শাকসবজিতে অনিয়ন্ত্রিত   বালাইনাশক ব্যবহারের কথা  ভেবে এগুলো না খেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে থাকেন।


জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ এবং ৭৫ ভাগ মহিলা আয়রন স্বল্পতায় ভুগছে। ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি ৮৮% পরিবারে এবং ভিটামিন ‘সি’ এর ঘাটতি ৯০% পরিবারে বিদ্যমান। মহিলাদের মধ্যে জিংক স্বল্পতা ৫৭.৩% এবং ৫ বছরের নিচের শিশুদের জিংক স্বল্পতা ৪৪%। এভাবে সকল প্রকার ভিটামিনেরই ঘাটতির চিত্র আছে। খর্বকায় শিশুর হার এখনও ৩১% এবং কৃশকায় শিশুর হারও ১৪%। ধারাবাহিকভাবে তীব্র অপুষ্টির শিকার হলে বয়সের তুলনায় শিশুরা খর্বকায় হয়। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা নয়। দেশে যথেষ্ট পরিমাণে বিভিন্ন রকম শাকসবজি ও ফলমূলের সরবরাহ আছে। যা দ্বারা সকল প্রকার পুষ্টি উপাদান পাওয়া সম্ভব। কিন্তু শাকসবজি ও ফলমূল নিরাপদ না থাকায় মানুষ গ্রহণ করছে না। যে কারণে এখন সময় এসেছে নিরাপদ ফসল উৎপাদন জোর দেয়ার এবং পুষ্টি বিবেচনা করে খাদ্য গ্রহণ করার। শুধুমাত্র ভাত আর যে কোনো ধরনের একটি তরকারি হলেই আমরা খুশি। এই মানসিকতায় আমরা আজ পুষ্টিহীনতার শিকার এবং অতিরিক্ত কার্বহাইড্রেট জাতীয় খাবার গ্রহণের কারণে আমরা স্থূলকায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছি। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগী এখন শতকরা ৭.৯ এবং স্থূলকায় মানুষের সংখ্যা শতকরা ৩৯ ভাগ। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ‘মায়ের পুষ্টি শিশুর তুষ্টি’। অর্থাৎ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবতী মা-ই কেবলমাত্র স্বাস্থ্যবান সন্তানের জন্ম দিতে পারে। পুষ্টিহীন মায়ের সন্তানের জন্মকালীন ওজন কম এবং অসুস্থ, হাবাগোবা, রুগ্ণ হয়ে জন্মায়। পরে নানা রোগে ভোগে। প্রসূতি মায়েদেরও নানা রকম জটিলতা দেখা যায়। গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী অবস্থায় মায়েদের খাবারের প্রয়োজন সাধারণ অবস্থার চেয়ে বেশি থাকে। এ সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন, জিংকসমৃদ্ধ খাবার খেতে হয়। অনেক সময় পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে পুষ্টির অভাবে নিজের চাহিদার ঘাটতির সঙ্গে সন্তানও পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি নিয়ে জন্মায়। মাকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন রঙিন শাকসবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, পানি ও পানিজাতীয় খাবার প্রয়োজন অনুযায়ী খেতে হয়।


আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর জন্য জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই যথেষ্ট এবং ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিতে হবে। সেই সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি না ঘটার কারণে আত্মকেন্দ্রিকতা, অবসাদ, ব্যক্তিত্বহীনতা দেখা যায় এবং মেধাশক্তি বিকশিত হতে পারে না। ফলে এসব  ছেলেমেয়ে অলস ও উদাসীন, পরনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে। যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার না দেয়া হয় তবে পুষ্টি ঘাটতির ফলে কম মেধা নিয়ে তারা গড়ে উঠে। পরবর্তীতে আমাদের পরিবার বা জাতীয় পর্যায়ে তার অবদান কমে যায়। এই ঘাটতি কিন্তু আজও আমরা বয়ে চলেছি। এ  থেকে উত্তোরণের একমাত্র উপায় হলো জাতিকে পুষ্টি শিক্ষাসহ সুশিক্ষিত করা। আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদনের সাথে নিয়োজিত শ্রম শক্তি এখনও ৪০.৬%। এই ৪০% জনশক্তি, গ্রামীণ মহিলা এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদের যদি সঠিকভাবে পুষ্টিশিক্ষা দেয়া যায় তবে আমাদের দেশের জনগণের পুষ্টিহীনতা দূর হতে বেশি সময় লাগবে না। স্কুল প্রাঙ্গণে শাকসবজি, ফলচাষের প্রদর্শনী দিয়ে শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পুষ্টিশিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। বসতবাড়ির আঙিনায় শাকসবজির চাষ ও পুষ্টি জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে মহিলাদের তথা পরিবারের সব সদস্যদের সম্পৃক্ত করা যায়। এ ছাড়াও শহর এলাকায় বাড়ির ছাদ উপযোগী শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে পরিবারের সকলকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা যায়।


খাদ্য ও পুষ্টিবিদদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পুষ্টির চাহিদা তার দৈনিক পরিশ্রম, দেহের ওজন ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। পুষ্টি গবেষকদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির জন্য খাবার তালিকায় থাকা উচিত  চাল ৩০০-৪০০ গ্রাম, আটা ১৫০ গ্রাম, ডাল ৫০-৬০ গ্রাম (কাঁচা), মাছ/মাংস/ডিম ৭০-১০০ গ্রাম, শাক ১০০ গ্রাম, অন্যান্য সবজি ১০০ গ্রাম, আলু ৮০-১০০ গ্রাম, ফল ১৫০-২০০ গ্রাম, তেল ৪০ গ্রাম, চিনি/গুড়/মিষ্টি ৩০ গ্রাম। পুষ্টিবিদরা সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন সুষম খাবার গ্রহণের কথা বলেন। সুষম খাদ্যের অর্থই হলো দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতি বেলায় খাদ্যের প্রত্যেকটি উপাদান খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে শাকসবজির পরিমাণ কিন্তু সবার জন্য নির্ধারিত।


শাকসবজি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো কিন্তু সচরাচর আমরা যেসব শাকসবজি খাচ্ছি তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো আর কতটা নিরাপদ? কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ছাড়াই অনেকে শাকসবজি উৎপাদনে ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেন। ফসল সংগ্রহোত্তর সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন না করায় বাড়ছে শাকসবজি সংগ্রহের পর তাতে বিভিন্ন জীবাণুর উপস্থিতি ও পচন। শাকসবজি পরিষ্কার করার জন্যও অনেক সময় ব্যবহৃত হচ্ছে দূষিত পানি। বিভিন্ন পর্যায়ে শাকসবজি গ্রহণ তাই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে।


অনেকে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদের কথা বলেন। তবে মনে রাখা দরকার যে, নিরাপদ শাকসবজি মানে শুধু জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা শাকসবজিকে বুঝায় না। জৈব শাকসবজিও ক্ষেত থেকে তোলার পর খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত নানাভাবে অনিরাপদ হতে পারে।


বিগত এক দশকে দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে অভাবনীয় সফলতার সাথে সাথে কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং দানাজাতীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতোমধ্যে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে এগিয়ে গেলেও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে এখনো অনেক পিছিয়ে। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। পুষ্টি নিরাপত্তা ব্যতীত খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২০৩০ এর অন্যতম উদ্দেশ্য হল টেকসই কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন। এদেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পরিমিত পরিমাণ সবজি ও ফল খাওয়ার কোনো বিকল্প নাই। এজন্য দরকার বসতবাড়ি আঙিনায় সারাবছর  সবজি ও ফলের চাষ বৃদ্ধি করা। বছরব্যাপী সবজি ও ফল চাষ পারিবারিক পুষ্টি চাহিদার পাশাপাশি দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এক বিরাট সমস্যা পুষ্টি ঘাটতি। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও খাদ্য তালিকায় রকমারি ফল ও সবজি জাতীয় খাবারের ব্যবহার। শাকসবজি ও ফলমূলের পারিবারিক চাহিদা মেটাতে খুব একটা বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। আমাদের বাড়ির আনাচে কানাচে পড়ে থাকা জমিগুলো পরিকল্পিতভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল চাষের আওতায় আনা হলে তা থেকে সারা বছর পরিবারের সবার চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে সরকারি কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলেই পুষ্টিকর খাদ্য  জোগানের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত জনপদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।


সম্প্রসারণকর্মী ও প্রশাসনিক সঠিক পদক্ষেপ নিলে কি লাভ হতে পারে আমরা আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেখেছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে (Good Agriculture Practices) সম্প্রসারণের ফলে কম দামে সঠিক স্বাদযুক্ত আম দরিদ্র মানুষসহ আমরা সবাই এখন  খেতে পারছি। কিন্তু শাকসবজির যথেষ্ট উৎপাদন থাকার পরও অনেক মানুষ তা খেতে কুণ্ঠাবোধ করে, তার কারণ নির্বিচারে বালাইনাশকের ব্যবহার। এখানে আমাদের যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হবে। শিশুরা, মায়েরাসহ সকল মানুষ পুষ্টিতে বলীয়ান হতে পারলে প্রত্যেকের লাভ, সমাজের লাভ, দেশ ও জাতীয় লাভ। সুতরাং আমরা যদি যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি তবে আমরা সকলেই লাভবান হবো এবং দেশও লাভবান হবে।


কৃষি ক্ষেত্রে সবজি চাষে বালাই ব্যবস্থাপনায় শুধুমাত্র বালাইনাশকের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন ব্যয়বহুল তেমনি পরিবেশের জন্য দূষণীয় ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ কারণে পরিবেশবান্ধব উপায়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে কৃষকদের সক্ষম করে তোলা এবং কৃষকদের আর্থিক অবস্থার টেকসই উন্নয়ন ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করার লক্ষ্য নিরাপদ সবজি উৎপাদনের এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো- কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; পরিবেশের কোনরূপ ক্ষতি না করে সবজির স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সবজি রপ্তানিতে সহায়তা করা; টেকসই ও পরিবেশ সম্মত উপায়ে   কৃষকের সবজি উৎপাদন এবং আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করা; মানসম্মত সবজি উৎপাদনের জন্য জৈব কৃষি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করা। এর ফলে ‘নিরাপদ সবজি উৎপাদন’  কার্যক্রম জোরদার করায় কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন করে মাটিতে প্রয়োগ করায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে ও মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। পোকা দমনে জৈব বালাইনাশক ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের ফলে কীটনাশকের ব্যবহার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস অথবা অনেক  ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না বিধায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা পাবে এবং সর্বোপরি কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকের টেকসই উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মান উন্নীত হবে। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হতে ৩২টি জৈব বালাইনাশকের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলার দুটি গ্রাম নিরাপদ পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে মডেল ইউনিয়ন স্থাপন বাস্তবায়নের কার্যক্রম চালু হয়েছে। এতে ফসলের পোকা দমনে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ, সাদা ও আঠালো ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। এ পদ্ধতিতে কীটনাশক খরচ না থাকায় সবজির উৎপাদন খরচ কম হয়, কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসসহ উৎপাদিত সবজি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হবে এবং কৃষকগণ সঠিক বাজারমূল্য পাবেন বলে আমরা আশাবাদী। এলাকার   কৃষকগণ তাদের উৎপাদিত নিরাপদ সবজি যাতে সরাসরি ভোক্তাদের হাতে তুলে দিতে পারে এজন্য ঢাকাসহ, সারাদেশের জেলা ও উপজেলা সদরে চালু হচ্ছে সাপ্তাহিক কৃষকের বাজার। যেখান থেকে ভোক্তাগণ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনতে পারবেন নিরাপদ সবজি। নিরাপদ সবজি পূরণ করবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা। দেশ ও জাতি পাবে স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী সুনাগরিক।

 

কৃষিবিদ ড. মোঃ আবদুল মুঈদ

মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, ফোন-৯১৪০৮৫০, ই- মেইল : dg@dae.gov.bd

 

বিস্তারিত
নিরাপদ ও সুস্থ পৃথিবী

মৌলিক খাদ্য গোষ্ঠীতে বিদ্যমান খাবারের সবকটি উপাদান যেমন-কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেলসের সমন্বয়ে সুষম খাবার গঠিত হয় এবং এই খাবার দেহে শক্তি উৎপাদান, বৃদ্ধি সাধন, রোগ প্রতিরোধ, ক্ষয় পূরণ করে। সুস্থ থাকা ও সঠিকভাবে কাজ করার জন্য এবং দেহের প্রতিটি কোষ, কলা  ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জন্য সুষম খাবারের প্রয়োজন। উপযুক্ত পুষ্টিকর খাবার না খেলে খুব সহজেই মানুষ রোগাক্রান্ত হতে পারে, এছাড়া ইনফেকশন, অবসাদ ও দুর্বল কার্যক্ষমতা দেখা দেয়। যেমন- গর্ভবতী মায়ের গর্ভের শিশুর উপযুক্ত বৃদ্ধি ও মায়ের সুস্থতার জন্য অতিরিক্ত সুষম খাবার না খেলে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না বরং মা ও শিশু দুজনেই নানা রকম পুষ্টিহীনতায় ভোগে। স্তন্যদাত্রী মায়ের শিশুকে পর্যাপ্ত দুধ সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত খাবার না দিলে শিশু পর্যাপ্ত দুধ থেকে বঞ্চিত হয়। ঠিক তেমনি বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও সুষম খাবারের অভাবে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ও কিশোর কিশোরীদের ঠিকমতো বেড়ে ওঠা ব্যাহত হয় এবং নানা রকম পুষ্টিহীনতার উপসর্গ দেখা দেয়। এছাড়াও বৃদ্ধদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগ অনুযায়ী যথার্থ সুষম খাবারের প্রয়োজন। এই সুষম খাবার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকা বাঞ্ছণীয়।


সুষম খাবার মানুষের বয়স, ওজন, উচ্চতা, কাজের ধরন, আবহাওয়া ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। খাবারের মেনু পরিকল্পনা যে বিষয়ের ওপর নির্ভর করে তা হচ্ছে -  ১. উপযুক্ত পুষ্টি জ্ঞান ২. পরিবারের সদস্যদের পছন্দ রুচি  ৩. খাদ্য উপাদান ৪. দেশের অর্থনীতি ৫. খাদ্য সরবরাহ  ৬. খাবারের পর্যাপ্ততা ৭. খাদ্য বিনিময় সম্পর্কে ধারণা         ৮. মৌলিক খাদ্য গোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণা ৯. আবহাওয়া  ১০. দুর্যোগ ১১. সংস্কৃতি ইত্যাদি।
এছাড়াও পরিবারের সদস্যদের ওপর ভিত্তি করে মেনু পরিকল্পনা করতে হয়। যেমন-
ক. শিশুর জন্য পরিপূরক খাবার
খ. গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়ের খাবার
গ. কিশোর কিশোরীদের খাদ্য
ঘ. বৃদ্ধদের জন্য সহজপাচ্য খাদ্য
ঙ. রোগীর রোগ অনুযায়ী পথ্য।


মাতৃগর্ভ থেকেই শিশুর পুষ্টি শুরু হয়। কাজেই গর্ভে থাকা শিশুর পুষ্টি ও মায়ের সুস্থতার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে ‘পুষ্টি চাহিদা অনেকটা বেড়ে যায়, যেমন- গর্ভকালীন হরমোনের ক্ষরণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মায়ের জরায়ু, স্তন্য, নাভী রজ্জু ইত্যাদি অঙ্গের বৃদ্ধি ও বিপাক ক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি পায়। তাই এসব কার্যকলাপের জন্য ক্যালরির চাহিদা বেশি থাকে। এছাড়া গর্ভস্থ সন্তানের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, গ্রন্থি, কলা ও কোষের গঠন ও বৃদ্ধির জন্য এবং মায়ের শিশুর পর্যাপ্ত  রক্ত গঠনের জন্য অতিরিক্ত প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। এজন্য উচ্চ জৈব মূল্যের প্রোটিন যেমন  মাছ, মাংস, ডিম, লৌহ ও ফলিক এসিডের জন্য কলিজা, ভিটামিন ‘সি’ এর জন্য লেবু, আমলকী, পেয়ারা, কাচামরিচ ইতাাদি খাওয়া যায়। বাচ্চার হাড়  হাড্ডি, দাঁত, নখ, চুল যাতে ঠিকমতো গঠন হয় এবং মায়ের হাড় ক্ষয় বা পাতলা না হয় তার জন্য ক্যালসিয়াম, ফরফরাস ও ভিটামিন ‘ডি’ এর প্রয়োজন হয়। আর যদি এসবের অভাব হয় তাহলে মায়ের হাড় থেকে ভ্রƒণের দেহে এসব ব্যবহৃত হয়। ফলে মা ও শিশু দুইজনেরই হাড় দুর্বল হয়। অনেক বাচ্চাকে দেখা যায় একটু দৌড়ালেই তাদের পা  ব্যথা হয়। এজন্য গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত দুধ, ছোটমাছ, ‘ডি’ এর জন্য কডলিভার অয়েল, সবুজ ও রঙিন শাকসবজি খেতে হয় এবং প্রায় প্রতিদিন সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অন্তত ১৫-২০ মিনিট রোদে থাকতে হয় যাতে   চামড়ায় সরাসরি রোদ লাগে। এতে শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরি হয়। থাইরয়েড হরমোনের ক্ষরণ বৃদ্ধির জন্য আয়োডিন যুক্ত খাবার খেতে হয়। গর্ভবতী অবস্থায় সব ধরনের পুষ্টি চাহিদা  বৃদ্ধি পায় এবং সেটা মেটানো কঠিন কিছু নয়। সুষম খাদ্য তালিকার মাধ্যমে এই সময়ে ক্যালরি, প্রোটিনসহ অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়াতে হয়। সঙ্গে মৌসুমি   শাকসবজি ও ফলমূল অবশ্যই খেতে হয়। স্তন্যদানকারী মায়ের খাবারের চাহিদা বিশেষ করে ক্যালরি, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ লবণের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। কারণ- ১. বুকের দুধ নিঃসৃত করবার কাজটি করতে তাকে প্রচুর শক্তি ক্ষয় করতে হয়। প্রায় প্রতিদিন ৬৫০-৮৫০ মিলি লিটার দুধ উৎপাদন করতে হয় তাকে। এর জন্য অতিরিক্ত ২০০-৪০০ ক্যালরি প্রয়োজন হয়। এর দৈনিক স্তন্যদানকারী মায়ের খাদ্য প্রায় ৭০০-১০০০ ক্যালরি সরবরাহ থাকা উচিত। অবশ্য বাচ্চার বয়স ৬ মাস পেরিয়ে গেলে যখন বুকের দুধের পরিমাণ কমে যায় তখন ক্যালরির পরিমাণও কমে যায়।


২. বুকের দুধে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে উৎকৃষ্টমানের প্রোটিন, ক্যালরি, ভিটামিন ও মিনারেল।
৩. মায়ের নিজের দেহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সব ধরনের পুষ্টি প্রয়োজন।
এই সমস্ত চাহিদা পূরণের জন্য স্তন্যদানকালে প্রসূতি মায়ের যে চাহিদা থাকে তা গর্ভাবস্থার চেয়ে অনেক বেশি।
জন্ম থেকে ৬ মাস পর্যন্ত শিশুর ওজন বৃদ্ধির হার উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়। এর কারণ        ৬ মাস বয়সের পর শিশুর বিশেষ পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব। মাতৃগর্ভ থেকে যেসব উপাদান নিয়ে শিশু জন্ম নেয় তা ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধ শিশুকে নানা রকম অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা করে। তাই পরবর্তীতে বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্য মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবার দেয়া হয়। এই খাবার দেয়ার উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক খাবারে অভ্যস্ত করানো যাতে শিশুর পুষ্টি চাহিদা অনুযায়ী তার সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকে।
জন্মের পর থেকে বাচ্চাদের যে বর্ধন প্রক্রিয়া চলে তা প্রায় ১৮/১৯ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। এই সময় পুষ্টির চাহিদাও বেশি থাকে। কৈশোরে যদি এই চাহিদা পূরণ না হয়, তবে দেহ গঠন ও বর্ধন যথাযথভাবে হবে না। বরং নানারকম     অপুষ্টির লক্ষণ দেখা দিবে এবং দুর্বল ও অপুষ্ট হওয়ায়  সংক্রামণ ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হবে। ফলে সারা জীবনই দুর্বল ও রোগা হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। অবশ্য কৈশোরে সবার পুষ্টি চাহিদা একরকম হয় না। এটা নির্ভর করে ১. ছেলে মেয়ে ভেদে, ২. বয়স ভেদে, ৩. আকৃতি ভেদে। এসব বিষয় অনুযায়ী পুষ্টি চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় হয়। তবে কৈশোরে ছেলে মেয়েদের খাবারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থাকতে হবে।
ক্স কর্মশক্তি জোগাবার  জন্য খাবার ক্যালরি বহুল হতে হবে।
ক্স ক্ষয়পূরণ ও দ্রুত বৃদ্ধি সাধনের জন্য খাবারে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকতে হবে।
ক্স যেহেতু এই সময় হাড়ের বর্ধন হয় এজন্য ক্যালসিয়াম, ফরফরাস, ভিটামিন ডিসহ অন্যান্য ভিটামিন ডি সহ অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ লবণের প্রাচুর্যতা থাকতে হবে।
কিশোর কিশোরীদের খাবারে বেশ যত্নশীল হতে হয়-কারণ এই সময় তাদের ছেলে মেয়ে ভেদে বেশ কিছুটা শারীরিক পরিবর্তন হয়।
প্রাপ্ত বয়স্কদের পুষ্টি চাহিদা নির্ভর করে- ১. লিঙ্গ, ২. বয়স,    ৩. ওজন, ৪. উচ্চতা, ৫. শারীরিক পরিশ্রম এবং যদি কোনো ব্যক্তি কোনো ধরনের রোগে আক্রান্ত হয় তবে তার কি ধরনের রোগ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।


৬০ বছর বয়স হলেই তাকে বৃদ্ধ বলা হয়। ৪০-৪৫ বছর হতে দেহের বিভিন্ন গ্রন্থি ও কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যভাসের দরুন যদি কারো কোনো একটি খাদ্য উপাদানের অভাব থাকে বা দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তবে তার প্রভাব বয়স বাড়ার  সাথে সাথে দেহে ফুটে ওঠে। বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে যার ফলে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। কাজেই দেশে বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা নেহায়েতই কম নয়। জীবনের বিভিন্ন সময়ের মতো বার্ধ্যক্যেও সুষম খাবার তৈরি করতে খাদ্যের মৌলিক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই সময় অনেকেরই অরুচি ও পরিপাকে অসুবিধার দরুন খাদ্য গ্রহণে আগ্রহ কমে যায়। দাঁতও সব থাকে না বা থাকলে হয়তো শক্ত খাবার খাওয়ার মতো অবস্থায় থাকে না। আবার এই বয়সে হাঁড়ের ক্ষয়জনিত রোগেও ভোগেন তারা। তাই এসব বিষয়ের ওপর খেয়াল রেখে খাবার এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে করে খাবার নরম ও সহজপাচ্য হয় এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ জাতীয় উপাদান সমৃদ্ধ হয়। ক্যালসিয়ামের জন্য দুধ ও দুধের তৈরি খাবার যেমন- ছানা, পনির, পায়েস, দই এসব খাওয়া যায়। ছোট মাছ ও খাওয়া ভালো। লৌহের জন্য মাঝে মাঝে কলিজা দেয়া যেতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য মৌসুমি শাকসবজি ও ফল খাওয়া যেতে পারে। ওজন বেশি থাকলে বাড়তি ওজন কমিয়ে  ফেললে ভালো হয়। দৈনিক হাঁটাচলা ও কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম সুস্থ থাকার জন্য আবশ্যক। এই বয়সে- আলগা লবণ ও লবণাক্ত খাবার, চিনি-মিষ্টি-মধু-মিষ্টান্ন, মিষ্টি ফল কম খাওয়া উচিত। মদ, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন বাদ দেওয়া উচিত।


বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। সাথে সাথে মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। বর্তমানে দেশের সব জেলাতেই খাদ্যের সব মৌলিক উপাদান সংবলিত খাবারের প্রাচুর্যতা রয়েছে। কারন দেশের যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও ব্যপক উন্নতি হয়েছে। এক জেলার খাবার অন্য জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে। নিরাপদ ও সুস্থ পৃথিবী গড়তে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সচেতন থাকতে হবে।
ক. খাদ্যের মৌলিক গোষ্ঠী সম্পর্কে পর্যাপ্ত পুষ্টিজ্ঞান।
খ. শুধু একই ধরনের খাবার না খাওয়া।
গ. খাদ্যের প্রাপ্ততা অনুযায়ী সুষম খাবার তৈরি।
ঘ. খাদ্য বিনিময় সম্পর্কে সঠিক ধারণা।
ঙ. বেশি দামি খাবারকে বেশি পুষ্টিকর মনে না করা।
চ. পরিবারের আয় অনুযায়ী অল্প দামি খাবার দিয়ে সুষম খাবার তৈরি করা।
ছ. খাবার তৈরির আগে ও খাবারের সময় সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
জ. শাকসবজি সঠিক নিয়মে ধোয়া এবং সঠিক উপায়ে রান্না করা।
ঝ. নিয়মিত কৃমির ওষুধ খাওয়া।

 

খালেদা খাতুন

প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা, বারডেম, শাহবাগ, ঢাকা, মোবাইল-০১৭০৩৭৯৬২৬৯, ই- মেইল-birdem@yahoo.com

 

বিস্তারিত
সবজি দিয়েই মিষ্টিমুখ

খাদ্য তালিকায় সবজি রাখেন না এমন মানুষ খুজে পাওয়া দায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিদিন একজন সুস্থ সবল মানুষের ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ করা উচিত। তবে বর্তমানে আমাদের দেশে মাথাপিছু  দৈনিক সবজি খাওয়ার পরিমাণ ৭০ গ্রাম। দেশের প্রেক্ষাপটে  সবজি কাঁচা ও রান্না উভয়ভাবেই খাওয়া হয়। সবজি দিয়ে বৈচিত্র্য আইটেম তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে তেমনি অর্থনীতিতে রাখবে উল্লেখযোগ্য অবদান। আজকালকার যুগে শিশুরা প্রায় সবজি খেতে চায় না বললেই চলে, তবে মিষ্টি তাদের খুব পছন্দ। শিশুসহ সবার পুষ্টির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যেই সবজি দিয়ে তৈরি কয়েকটি মিষ্টি খাবারের প্রস্তুত প্রণালী উপস্থাপন করলাম। রেসিপিগুলো আপনারা অতিথি আপ্যায়ন কিংবা নিজেদের খাওয়ার জন্য ঘরে বসে অনায়াসে তৈরি করতে পারেন।
 

ক. লাউয়ের পায়েশ
উপকরণ : কচি লাউ-৫০০ গ্রাম, দুধ-১ কেজি, চিনি-৩০০ গ্রাম, বাদাম- ২৫ গ্রাম, গাজর-১ চা চামচ, ঘি- ৫০ গ্রাম, সুজি- ১০০ গ্রাম, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : সুজি হালকা করে ভেজে নিতে হবে। বাদাম গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে লাল অংশ তুলে ফেলে পেষ্ট করে নিতে হবে। কচি লাউয়ের খোসা ছাড়িয়ে ভেতরের নরম সাদা অংশ ফেলে দিয়ে বাকি অংশ মিহি  কুচি করে নিতে হবে। গাজর মিহি কুচি করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আঁচে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে লাউ এবং গাজর ভেজে নিতে হবে। চুলায় দুধ জাল করে যখন ফুটতে শুরু করবে তখন এর মধ্যে লাউ এবং গাজর কুচি দিতে হবে। লাউ এবং গাজর অর্ধসিদ্ধ হলে সুজি এবং বাদাম বাটা দিয়ে চুলার আঁচ অল্প করে অনবরত নাড়তে হবে। সম্পূর্ণ সিদ্ধ হয়ে ঘন হয়ে এলে এর মধ্যে চিনি এবং কিশমিশ, কাজুবাদাম দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার লাউয়ের পায়েশ।
 

খ. চাল কুমড়ার মোরব্বা
উপকরণ : চাল কুমড়া-২ কেজি, চিনি- ৪ কাপ।
প্রস্তুত প্রণালী : বয়স্ক চাল কুমড়ার খোসা ছাড়িয়ে বীজসহ ভেতরের নরম অংশ কেটে ফেলে দিয়ে শক্ত অংশ ছোট ছোট টুকরো করে (১-১.৫ ইঞ্চি) কেটে নিতে হবে। টুকরোগুলো কাঁটা চামচ দিয়ে ভালোভাবে খুচিয়ে নিতে হবে। পরিমাণমতো পানি নিয়ে তাতে ২ চা চামচ চুন দিয়ে সেই পানিতে চাল কুমড়ার টুকরোগুলো সারারাত ভিজিয়ে রাখতে হবে। ভেজানো টুকরোগুলো পানি থেকে তুলে ভালোভাবে কয়েকবার ধুয়ে নিতে হবে যেন চুনের দ্রবণ সম্পূর্ণ চলে যায়। এবার টুকরো গুলো ফুটন্ত গরম পানিতে ৩০ মিনিট ফুটাতে হবে (পানি বেশি করে দিতে হবে যেন টুকরোগুলো সম্পূর্ণরূপে পানিতে ডুবে থাকে)। এরপর  টুকরোগুলো পানি থেকে তুলে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। চুলায় প্যান বসিয়ে তাতে ৪ কাপ পানি এবং ৪ কাপ চিনি দিয়ে অল্প আচে জ¦াল দিয়ে ফুটতে শুরু করলে এর মধ্যে চাল কুমড়ার টুকরোগুলো দিয়ে অল্প আচে জ¦াল দিতে হবে যতক্ষণ না সিরাপ ঘন সিরায় পরিণত হয়। এরপর চুলা বন্ধ করে টুকরোগুলো ওভাবেই সিরার মধ্যে ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। ১০-১২ ঘণ্টা পর টুকরোসহ সিরা পুনরায় ১০ মিনিট জ¦াল দিয়ে টুকরোগুলো তুলে একটি ছাকনির মত পাত্রে রেখে বাতাসে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে চাল কুমড়ার মোরব্বা।

 

গ. গাজরের হালুয়া
উপকরণ : গাজর-৫০০ গ্রাম, দুধ-১ কেজি, চিনি-২৫০ গ্রাম, গুড়-৫০ গ্রাম, বাদাম-২৫ গ্রাম, ঘি-৫০ গ্রাম, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : গাজর সিদ্ধ করে পেস্ট করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আচে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে গাজর এবং দুধ দিয়ে নাড়তে হবে। মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে এর মধ্যে চিনি, গুঁড়, কিশমিশ, কাজুবাদাম দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার গাজরের হালুয়া।
 

ঘ. বাঁধাকপির পায়েশ
উপকরণ : বাঁধাকপি-১ কাপ, দুধ-১ কেজি, চিনি-২৫০ গ্রাম, বাদাম ২৫ গ্রাম, গাজর-১ চা চামচ, এলাচ, তেজপাতা,      কিশমিশ, কাজুবাদাম, সুজি- ১০০ গ্রাম।
প্রস্তুত প্রণালী : সুজি হালকা করে ভেজে নিতে হবে। বাদাম গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে লাল অংশ তুলে ফেলে পেষ্ট করে নিতে হবে। বাঁধাকপি মিহি  কুচি করে নিতে হবে। গাজর মিহি কুচি করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আচে বাঁধাকপি এবং গাজর ভেজে নিতে হবে। চুলায় দুধ জ¦াল করে যখন ফুটতে শুরু করবে তখন এর মধ্যে বাঁধাকপি এবং গাজর কুচি দিতে হবে। বাঁধাকপি এবং গাজর অর্ধসিদ্ধ হলে সুজি দিয়ে চুলার আঁচ অল্প করে অনবরত নাড়তে হবে। সম্পূর্ণ সিদ্ধ হয়ে ঘন হয়ে এলে এর মধ্যে চিনি এবং কিশমিশ, কাজুবাদাম দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার বাঁধাকপির পায়েশ।
 

ঙ. কাঁচা পেঁপের জর্দা
উপকরণ : কাঁচা পেঁপে-৫০০ গ্রাম, চিনি-৩০০ গ্রাম, ঘি-৫০ গ্রাম, ফুড কালার (সবুজ)- ০.৫ চা চামচ, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : পেঁপে খোসা ছাড়িয়ে মিহি কুচি করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আঁচে কাজুবাদাম এবং কিশমিশ ভেজে তুলে নিতে হবে। পুনরায় ঘি দিয়ে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে পেঁপে দিয়ে নাড়তে হবে। ১৫-২০ মিনিট অল্প আঁচে ভাজার পর  এর মধ্যে চিনি, কিশমিশ, কাজুবাদাম এবং  ফুড কালার দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার পেঁপের জর্দা।
 

চ. মিষ্টিআলুর হালুয়া
উপকরণ : মিষ্টিআলু-৫০০ গ্রাম, দুধ-১ কেজি, চিনি-২০০ গ্রাম,
ঘি-৫০ গ্রাম, ফুড কালার (কমলা/লাল)-০.৫ চা চামচ, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : মিষ্টিআলু সিদ্ধ করে পেস্ট করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আচে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে মিষ্টিআলু এবং দুধ দিয়ে নাড়তে হবে। মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে এর মধ্যে চিনি, কিশমিশ, কাজুবাদাম এবং ফুড কালার দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার মিষ্টিআলুর হালুয়া।
 

ছ. পেঁপের হালুয়া
উপকরণ : অর্ধপাকা পেঁপে-৫০০ গ্রাম, দুধ-১ কেজি, চিনি-৩০০, গ্রাম, ঘি-৫০ গ্রাম, ফুড কালার (কমলা)-০.৫ চা চামচ, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : পেঁপে খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। প্রেসার কুকারে পরিমাণ মতো পানি দিয়ে পেঁপে সিদ্ধ করে পেস্ট করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আচে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে পেঁপে এবং দুধ দিয়ে নাড়তে হবে। মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে এর মধ্যে চিনি, কিশমিশ, কাজুবাদাম এবং ফুড কালার দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার পেঁপের হালুয়া।
 

জ. গাজরের জর্দা
উপকরণ : গাজর-৫০০ গ্রাম, গুঁড়া দুধ-২৫০ গ্রাম, চিনি-২০০ গ্রাম, গুড়-৫০ গ্রাম, ঘি-৫০ গ্রাম, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : গাজর মিহি কুচি করে সিদ্ধ করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আঁচে কাজুবাদাম এবং কিশমিশ ভেজে তুলে নিতে হবে। পুনরায় ঘি দিয়ে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে গাজর দিয়ে ভাজতে হবে। গাজর মোটামুটি ঝরঝরে হয়ে গেলে এর মধ্যে গুঁড়া দুধ, চিনি, গুড়, কিশমিশ, কাজুবাদাম দিয়ে অল্প আচে বারবার নাড়তে হবে। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার গাজরের জর্দা।
 

ঝ. গোলআলুর হালুয়া
উপকরণ : গোলআলু-৫০০ গ্রাম, দুধ-১ কেজি, চিনি-৩৫০ গ্রাম, ঘি-৫০ গ্রাম, ফুড কালার (কমলা/লাল)- ০.৫ চা চামচ, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : গোলআলুর খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে টুকরো টুকরো করে নিতে হবে। চুলায় দুধ দিয়ে এর মধ্যে আলুর টুকরোগুলো দিয়ে সিদ্ধ করে নিতে হবে। একদম ঘন হয়ে এলে দুধসহ সিদ্ধ করা আলু ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আঁচে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে ব্লেন্ড করা আলু দিয়ে নাড়তে হবে। কিছুক্ষণ পর এর মধ্যে চিনি, কিশমিশ, কাজুবাদাম এবং শেষে ফুড কালার দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার গোলআলুর হালুয়া।
 

ঞ. কাঁচা পেঁপে/পাকা পেঁপের বরফি
উপকরণ : কাঁচা পেঁপে/ অর্ধপাকা পেঁপে-৫০০ গ্রাম, গুঁড়া দুধ-২৫০ গ্রাম, চিনি-৩০০ গ্রাম, ঘি-৭০ গ্রাম, ফুড কালার (কমলা/সবুজ)- ০.৫ চা চামচ, এলাচ, তেজপাতা, কিশমিশ, কাজুবাদাম।
প্রস্তুত প্রণালী : পেঁপে খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। প্রেসার কুকারে পরিমাণ মতো পানি দিয়ে পেঁপে সিদ্ধ করে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। ঘি দিয়ে অল্প আচে কাজুবাদাম কুচি এবং কিশমিশ ভেজে তুলে নিতে হবে। পুনরায় ঘি দিয়ে তেজপাতা, এলাচ ভেজে নিয়ে এর মধ্যে বেলণ্ড করা পেঁপে দিয়ে নাড়তে হবে। ১৫-২০ মিনিট অল্প আঁচে ভাজার পর এর মধ্যে চিনি দিয়ে আবার ভাজতে হবে। গুড়া দুধ দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়ার পর কিশমিশ, কাজুবাদাম এবং ফুড কালার ( কাচাঁ পেঁপে হলে সবুজ, অর্ধপাকা পেঁপে হলে কমলা) দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিতে হবে। একটি পাত্রে অল্প কিছু ঘি মেখে এর মধ্যে পেঁপের মিশ্রণটি রেখে ঠাণ্ডা করে নিয়ে পছন্দ মতো বরফির আকারে কেটে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মজাদার পেঁপের বরফি।

 

সুমাইয়া শারমিন

পাবলিকেশন অফিসার, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি (নাটা), গাজীপুর-১৭০১, মোবাইল:০১৭৩৮১৩৫২০৪, sumayabau@gmail.com,

 

বিস্তারিত
সবজির টেকসই উৎপাদন

পীরগঞ্জের কৃষক সাদেক মিয়া নদীর ধারে এক বিঘা জমি নিয়ে বেশ চিন্তিত। কারণ নদীর উপকূলবর্তী হওয়ায় বোরো ছাড়া আর কোনো ফসল হয় না। জমিটি রাস্তার ধারে হওয়ায় বন্যার সময় রাস্তারও ক্ষতি হয়। এমতাবস্থায় পরামর্শ অনুযায়ী তিনি রাস্তার ধারে সবজির চাষ শুরু করেন। সফল হন সাদেক মিয়া। বিক্রি করেন প্রায় ১০ হাজার টাকার সবজি। বর্ষাকালে আশপাশের সব জমি পানিতে নিমজ্জিত হলেও তার সবজির মাচা ভাসমান ভেলার মতো জেগে থাকে।


বাংলাদেশে প্রায় ৩,৭৯০ কিমি. জাতীয়, ৪,২০৬ কিমি. আঞ্চলিক, ১৩,১২১ কিমি. জেলা ও ৩,৩৩,৫৮৯ কিমি. স্থানীয় সড়ক এর পাশাপাশি প্রায় ২৮৩৫ কিমি. রেলপথ রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য পুকুর এবং দক্ষিণাঞ্চলের ঘের। এগুলো প্রায় সবসময়ই পতিত থাকে। এগুলোকে সবজি চাষের আওতায় আনা গেলে একদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হবে কৃষক, অন্যদিকে পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হবে।


বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে গত এক যুগে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়; চীন ও ভারতের পরেই এর অবস্থান। গত ৪০ বছরে সবজির উৎপাদন বেড়েছে ৫ গুণ। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে সবজি উৎপাদন ছিল ১০৬.২২ লক্ষ মে.টন, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ (১ কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার টন) সবজি উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত       শাকসবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ্বজোড়া। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ প্রায় ৫০ টি দেশে সবজি রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়,  ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, যদিও দেশে মোট আবাদির মাত্র ৯ ভাগ জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে এবং ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষক পরিবার এই সবজি উৎপাদন করছে।


কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই কমে যাচ্ছে কৃষি জমি (বার্ষিক ০.৭৩% বা ৬৮,৭৬০ হেক্টর হারে) (সূত্র-এসআরডিআই, ২০১৩)। ১৯৬০ সালে পরিবার প্রতি কৃষি জমির পরিমাণ ছিল  ১.৭০ হেক্টর, যা কমে ২০০৮ সালে ০.৪০ হেক্টরে উপনীত হয়েছে।


বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের যে অভিঘাত দৃশ্যমান তার সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হলো বাংলাদেশ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি প্রভৃতি চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন বাংলাদেশ। এরূপ বাস্তবতায় এসডিজিতে ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে কৃষি সম্পর্কিত অন্যতম অভীষ্ট হলো অভীষ্ট-২: ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার। এখানে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। সময় বাকি মাত্র ১১ বছর। পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে পতিত জমিতে সবজি উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই।


সাদেক মিয়ার সফলতাকে সম্প্রসারণের জন্য ইতোমধ্যেই এটুআই প্রকল্পের পৃষ্ঠপোষকতায় গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলায় ‘অব্যবহৃত জায়গায় সবজি চাষ, মিলবে পুষ্টি বারোমাস’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ৫০ জন কৃষক নিয়ে অব্যবহৃত জায়গায় সবজি চাষের পাইলটিং চলছে। এর ফলাফলও বেশ আশাব্যঞ্জক। ধারণাটিকে যদি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা যায় তবে কৃষির উৎপাদন সবজির উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। রাস্তা সংলগ্ন জমির মালিক, পুকুরের মালিক ও ঘেরের মালিককে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে ঐসব জায়গায় সবজির চাষাবাদ শুরু করা গেলে তা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বাড়বে কৃষকের আয়, মিটবে পুষ্টির চাহিদা। পুকুরপাড়, ঘের ও রাস্তা সংলগ্ন জমির এক ইঞ্চিও পতিত না রাখলে ২০২০ সালে ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ সুখী, সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

মো. রেজওয়ানুল ইসলাম
 
কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার, সংযুক্ত, ব্লু গোল্ড প্রোগ্রাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল: ০১৭১৪৫৯৩৭৯৬,   ই-মেইল:
rezwandae@gmail.com

 

 


 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

 

 

বিস্তারিত
নিরাপদ সবজি মাশরুম

মাশরুম হলো খাবার উপযোগী ছত্রাকের ফলন্ত অঙ্গ যা অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণসম্পন্ন। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ মুখোরোচক খাবার হিসেবে মাশরুম গ্রহণ করে আসছে এবং বর্তমান বিশ্বে সব দেশের মানুষই মাশরুম খেয়ে থাকে। পবিত্র কোরআন ও  হাদিসে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ খাবার হিসেবে মাশরুমের কথা উল্লেখ আছে।


বাংলাদেশ একটি ঘন বসতিপূর্ণ দেশ। এদেশের প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১০৯০ জন মানুষ বাস করে এবং প্রতি বছরে ১.৩৭% হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এদেশে চাষের আওতায় জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ক্রমবর্ধমান এ জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি জোগানের জন্য এমন একটি ফসল দরকার যা পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন এবং যা আবাদের জন্য কোন উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না। সেক্ষেত্রে মাশরুম সবজি চাহিদা পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
 

মাশরুমের পুষ্টি ও ঔষধিগুণ
মাশরুমে প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের পরিমাণ খুব বেশি। অপরপক্ষে চর্বির পরিমাণ খুব কম, নাই বললেই চলে। মাশরুমের প্রোটিন হলো অত্যন্ত উন্নত, সম্পূর্ণ এবং নির্দোষ। মানব দেহের অত্যাবশ্যকীয় ৯টি এমাইনো এসিডের সবগুলোই মাশরুমে আছে। প্রাণিজ আমিষ যেমন- মাংস ও ডিমের আমিষ উন্নত ও সম্পূর্ণ হলেও তার সঙ্গে সম্পৃক্ত চর্বি থাকায় দেহে কোলেস্টেরল সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, মেদভুঁড়ি ইত্যাদি জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পক্ষান্তরে মাশরুমের প্রোটিন নির্দোষ। চর্বি ও কার্বোহাইড্রেটের নিম্ন উপস্থিতি এবং কোলেস্টেরল ভাঙ্গার উপাদান লোভাস্টাটিন, এন্টাডেনিন, ইরিটাডেনিন ও নায়াসিন থাকায় শরীরে কোলেস্টরল জমার ভয় থাকে না। এ কারণে প্রোটিনের অন্যান্য সব উৎসের তুলনায় মাশরুমের প্রোটিন উৎকৃষ্ট ও নির্দোষ। নিয়মিত খেলে মাশরুম ডায়াবেটিস  ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে;  ক্যান্সার, জন্ডিস ইত্যাদি প্রতিরোধ করে; হৃদরোগ, টিউমার, যৌন অক্ষমতা, রক্তস্বল্পতা ও মেদভুঁড়ি ইত্যাদি প্রতিরোধ ও নিরাময় করে; হাড় ও দাঁত শক্ত করে এবং চুল পাকা ও চুলপড়া রোধ করে।

 

বাংলাদেশে মাশরুম চাষ
বাংলাদেশে প্রকৃতিকে ব্যবহার করেই বিভিন্ন প্রকার মাশরুম চাষ করা যায়। বর্তমানে মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে ৭ প্রকারের মাশরুম চাষের জন্য পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ঋতুভেদে উপযুক্ত মাশরুম চাষ করতে পারলে উচ্চমূল্যের এবং ব্যয়বহুল শীতলীকরণ যন্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। ওয়েস্টার ও কান মাশরুম সারা বছরই চাষ করা যায় যদিও পিংক ও পিও-১০ ওয়েস্টার ব্যতীত সকল ওয়েস্টারের ফলন গরমকালে একটু কমে যায়।  গ্রীষ্মকালে মিল্কি, স্ট্র ও ঋষি মাশরুম এবং শীতকালে শীতাকে ও বাটন মাশরুম চাষ করা যায়।
মাশরুম চাষ পদ্ধতি
বীজ উৎপদন/ সংগ্রহ : মাশরুম উৎপাদন করার জন্য স্পন বা বীজের প্রয়োজন হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি মাশরুম ইনস্টিটিউট  বা বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা মাশরুম ফার্ম থেকে বীজ সংগ্রহ করে মাশরুম চাষ করা যাবে। তবে নিজের বীজ নিজে তৈরি করে নেয়াই ভালো। এজন্য মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে সহজ পদ্ধতিতে ধানের খড়ে এবং কাঠের গুঁড়ায় মাশরুম বীজ উৎপাদন কৌশল হাতে কলমে শিখে নিতে হবে।


ধানের খড়ে ওয়েস্টার মাশরুম চাষ : খড় বাংলাদেশের সর্বত্র পাওয়া যায় এবং দামও তুলনামূলকভাবে সস্তা। খড় দিয়ে একজন লেখাপড়া কম জানা মানুষও সহজেই নিজের   প্রয়োজনীয়   মাশরুম বীজ নিজে তৈরি করে নিতে পারেন।
প্রয়োজনীয় উপকরণ : একটি বড় ড্রাম (২০০ লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন), ড্রামের সমান মাপের নেট ব্যাগ, কয়েকটি ইট/ পাথর টুকরো, চুলা, থার্মোমিটার, রশি, পিপি ব্যাগ, রাবার ব্যান্ড, খড় কাটার যন্ত্র/ কাস্তে, খড়, পানি, ইত্যাদি।


খড় প্রক্রিয়াকরণ : একটি বড় ড্রাম একটি চুলার ওপর বসিয়ে তাতে ১৬০ লিটার পানি নিয়ে তাপ দিতে হবে। পানির তাপমাত্রা ৬০০ সে. অথবা ১৪০০ ফা. হলে ১২ কেজি চকচকে সোনালি রঙের কাটা খড় (২/৩ ইঞ্চি করে কাটা) একটি নেটের ব্যাগে ভরে ওই পানিতে ডুবিয়ে দিতে হবে এবং ড্রামের মুখ একটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। পানির তাপমাত্রা মাপার জন্য থার্মোমিটার ব্যবহার করতে হবে (থার্মোমিটার বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির দোকানে পাওয়া যায় তবে বর্তমানে দেশের সর্বত্রই পোলট্রি ফিড/ উপকরণের দোকানে পাওয়া যায়)। খড় ভর্তি নেটের ব্যাগটি গরম পানিতে ডুবানোর জন্য ভালোভাবে পরিষ্কার করা কয়েকটি ইট বা পাথর টুকরা ব্যবহার করা যেতে পারে। এসময় লক্ষ্য রাখতে হবে, পানির তাপমাত্রা যেন ৬০ ডিগ্রি  সে. এর উপরে উঠে না যায়। এজন্য খড় পানিতে ডুবানোর সাথে সাথে চুলা বন্ধ করে দিতে হবে।  খড় পানিতে ডুবানের ঠিক এক ঘণ্টা পর নেটের ব্যাগটি পানি থেকে তুলে সাথে সাথে ঝুলিয়ে দিতে হবে এবং ঝুলন্ত অবস্থায় ২০/২২ ঘণ্টা রাখতে হবে। ঝুলিয়ে রাখার সময় যেন কোন ক্রমেই ১৬ ঘণ্টার কম না হয়। ঝুলন্ত খড় নেটের ব্যাগ থেকে বেড় করে পানির পরিমাণ পরীক্ষা করে নিতে হবে। খড়ে পানির পরিমাণ এমন থাকতে হবে যাতে এক মুঠো খড় দুহাতে ধরে জোরে চিপ দিলে হাতে পানির রেখা দেখা দিবে কিন্তু ফোঁটা পড়বে না। খড়ে পানির পরিমাণ বেশি থাকলে একটু হালকা রোদে নেড়ে নেয়া যেতে পারে।


প্যাকেট তৈরি ও ইনকুবেশন : সাধারণত ৯ ঢ ১২" অথবা  ১২ ঢ ১৮" সাইজের পিপি ব্যাগে প্যাকেট তৈরি করা হয়। ৯ ঢ ১২" সাইজের ব্যাগের জন্য ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম এবং  ১২ ঢ ১৮" সাইজের ব্যাগের জন্য ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম মাদার কালচার ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। মাদার কালচার সরকারি বা বেসরকারি ফার্ম থেকে সংগ্রহ করতে হবে। এসব ফার্মের কাঠের গুঁড়ায় তৈরি বাণিজ্যিক স্পন প্যাকেটও খড়ের প্যাকেটের মাদার কালচার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মাদার কালচার খড়ের প্যাকেটে স্তরে স্তরে অথবা সম্পূর্ণ মিশ্রিত করে দেয়া যেতে পারে। মাদার কালচার মিশ্রিত খড় দিয়ে প্যাকেট ভর্তির পর প্যাকেটের মুখ রাবার ব্যান্ড বেঁধে দিতে হবে এবং প্যাকেটের গায়ে কাঠি (বল পয়েন্ট কলম) দিয়ে ৪ থেকে ৬টি ছিদ্র করে দিতে হবে। এসব ছিদ্রের ২/১ টি যেন প্যাকেটের তলায় থাকে। অতঃপর  প্যাকেটগুলোকে একটি ঘরে র‌্যাকের তাকে সাজিয়ে রাখতে হবে। গরমকালে প্যাকেটের তাপমাত্রা যাতে বেড়ে না যায় এজন্য ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তৈরির ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্যাকেট সম্পূর্ণ সাদা হয়ে যায় অর্থাৎ মাশরুমের মাইসেলিয়াম দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়।


প্যাকেট কর্তন ও পরিচর্যা : প্যাকেট সম্পূর্ণ সাদা হওয়ার ৫-৭ দিন পর প্যাকেটের গায়ে ৪ থেকে ৮ জায়গায় ১ঢ১" করে কেটে চেঁছে দিতে হবে। কাটার স্থানটি যে স্তরে মাদার কালচার দেয়া হয়েছিল সে স্তর বরাবর হলে ভালো হয়। অতঃপর প্যাকেটগুলো চাষ ঘরের তাকে সাজিয়ে অথবা ছিকায় ঝুলিয়ে দিনে ৩ থেকে ৮ বার হালকা পানি স্প্রে করতে হবে যাতে ঘরে উচ্চ আর্দ্রতা বজায় থাকে। ঘরে সর্বদা উচ্চ আর্দ্রতা বজায় রাখলে, দিনের বেলা প্রয়োজনীয় আলো থাকলে, ঘর থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড বেড় করে দেয়ার ব্যবস্থা রাখলে ২/৪ দিনের মধ্যেই মাশরুমের অঙ্কুর দেখা যাবে এবং পরবর্তী ২/৪ দিনের মধ্যে মাশরুম সংগ্রহ করা যাবে। একবার মাশরুম সংগ্রহের পর সংগৃহীত স্থান থেকে মাশরুমের গোড়া, ময়লা, ইত্যাদি চেঁছে পরিষ্কার করে আবার তাকে বসায়ে পানি স্প্রে করতে হবে। তাতে আবার মাশরুম আসবে। এভাবে একই প্যাকেট থেকে ৪ থেকে ৭ বার মাশরুম সংগ্রহ করা যাবে এবং প্রতি কেজি খড় থেকে অন্তত এক কেজি মাশরুম পাওয়া যাবে।


বিশেষ সতর্কতা : (১) খড়গুলো যেন চক চকে সোনালি রঙের হয়, (২) প্রতি ব্যাগে খড়ের পরিমাণ যেন ১০ থেকে ১৪ কেজির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, (৩) পানির তাপমাত্রা যেন ৬০ ডিগ্রি সে. বা ১৪০ ডিগ্রি ফা. এর বেশি এবং ৫৫ ডিগ্রি সে. বা ১৩১ ডিগ্রি ফা. এর কম না হয়, (৪) গরম পানিতে যেন এক ঘণ্টার বেশি বা কম সময় না থাকে, (৫) খড়ের ব্যাগ ঝুলন্ত অবস্থায় যেন কোন ক্রমেই ১৬ ঘণ্টার কম না থাকে।


খড়ে মিল্কি মাশরুম চাষ করতে হলে খড় প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেট তৈরি ওয়েস্টার মাশরুমের মতোই হবে। মাইসেলিয়াম রান পূর্ণ হলে প্যাকেট কর্তনের পরিবর্তে খুলে দিয়ে এক থেকে দেড় ইঞ্চি পুরু করে কেজিং সয়েলের স্তর দিতে হবে এবং দিনে ২/ ১ বার হালকা পানি স্প্রে করতে হবে।


মাশরুমের ভালো ফলন পাওয়ার উপায়
মাশরুমের ভালো ফলন পাওয়ার জন্য (১) উন্নত জাতের ভালো মানের বীজ সংগ্রহ/ তৈরি করতে হবে; (২) মৌসুম  অনুযায়ী মাশরুম ও তার জাত নির্বাচন করতে হবে এবং (৩) চাষ ঘরে উচ্চ আর্দ্রতা বজায় রাখতে হবে, মাশরুম অনুযায়ী প্রয়োজনী তাপ ও আলো বজায় রাখতে হবে এবং পরিমিত অক্সিজেন প্রবেশের এবং অতিরিক্ত কার্বনডাই অক্সাইড বেড় করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।


মাশরুম সংগ্রহ ও সংরক্ষণ : মাশরুম যথেষ্ট বড় হয়েছে কিন্তু মাশরুম পিলিয়াসের কিনারা পাতলা হয়ে ফেটে যায়নি এমতাবস্থায় মাশরুম সংগ্রহ করতে হবে। এক হাতে প্যাকেট ধরে অন্য হাতের পাঁচ আঙুলের সাহায্যে আলতো মোচড় দিয়ে মাশরুম তুলে নিতে হবে।  সংগৃহীত মাশরুম গোড়া কেটে পরিচ্ছন্ন করে  গ্রেডিং করতে হবে এবং গ্রেড অনুযায়ী পিপি ব্যাগে ভরে সিলিং করতে হবে এবং তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে। রেফ্রিজারেটরে মাশরুম সংরক্ষণ করতে চাইলে রেফ্রিজারেটরের সাধারণ তাপে (৯-১১ ডিগ্রি সে. তাপে) রাখতে হবে। মাশরুম শুকিয়ে এবং শুকনো মাশরুম পাউডার করে সংরক্ষণ করা যায়। য়

 

ড. নিরদ চন্দ্র সরকার
উপপরিচালক, মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, ডিএই, সাভার, ঢাকা, ফোন ঃ ০১৫৫২৪০৮১৫২ , ইমেইল :  nirod_chndra@yahoo.com

বিস্তারিত
বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে নিরাপদ বেবী ভুট্টা

যে  সকল ভুট্টার মোচা কঁচি  অবস্থায় (পরাগায়ণ হয়তো  কেবলমাত্র সংঘটিত হয়েছে অথবা হয়নি) ব্যবহার করা হয় তার  নামকরণ  হয়েছে বেবী ভুট্টা (baby)। সাধারণ ভুট্টা (field corn), মিষ্টি ভুট্টা (sweet corn) অথবা খই ভুট্টা (pop corn) এর হাইব্রিড বা মুক্ত পরাগায়িত  যে কোন জাতকেই বেবী ভুট্টা  হিসেবে ব্যবহার করা যায় যদি তা থেকে গুণগত মানসম্পন্ন মোচা পাওয়া যায়। তবে শুধুমাত্র বেবী ভুট্টা  হিসেবে ব্যবহারের জন্য উদ্ভাবিত জাতও আছে। বেবী ভুট্টা হিসেবে চাষকৃত জাতের কিছু  বৈশিষ্ট্য হলো এ জাতগুলো আগাম প্রকৃতির ও মাঝারি উচ্চতা বিশিষ্ট হয় এবং  গড়ে প্রতি গাছে ৩-৪টি মোচা ধরে, ফলে অধিক ফলন পাওয়া যায়।  জাতগুলো হাইব্রিড হলে মোচার গুণগত মানের ও ফসল সংগ্রহের সমতা থাকে বলে গ্রহণযোগ্যতা বেশি হয়। বেবী ভুট্টার খাদ্যমান ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমাটো, বেগুন ও  শসার সাথে তুলনীয়। বেবী ভুট্টা  সংগ্রহের সময় পুরো গাছটি এবং মোচার খোসা (husk) কাঁচা থাকে বিধায়  উওম গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় যা  একটি বাড়তি লাভজনক দিক।


থাইল্যান্ড বর্তমানে বিশ্বের প্রধান বেবী ভুট্টা উৎপাদক দেশ এবং বিশ্ব রপ্তানি বাণিজ্যের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রধানত বেবী ভুট্টার ভোক্তা হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোই এর উৎপাদক। বাংলাদেশে  আমদানিকৃত বেবী ভুট্টার পুরোটাই ক্যানিং করা থাকে। এ দেশে উৎপাদিত বেবী ভুট্টা খোসাবিহীন অবস্থায় পলিব্যাগে বাজারজাত করা হয় যার প্রধান ক্রেতা চাইনিজ রেস্তোরাঁগুলো। বেবী ভুট্টার উপাদেয় ও সুমিষ্ট স্বাদ ভোজনরসিকদের কাছে সমাদৃত করেছে। বেবী ভুট্টাকে সবজি হিসেবে বা স্যুপ তৈরির উপাদান হিসেবে যেমন ব্যবহার করা যায় তেমনি টাটকা বেবী ভুট্টা সালাদ হিসেবে বা আচার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া  সীমিত আকারে যুক্তরাষ্ট্র ও  ইউরোপে হিমায়িত বেবী ভুট্টা প্রায়শ বিভিন্ন  খাবার তৈরীর উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ কয়েক বছর হতে বেবী ভুট্টার উপযোগী জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে  কাজ করছে। থাইল্যান্ড থেকে আনা কিছু হাইব্রিড ও মুক্ত পরাগায়িত  জাত হতে বাছাইয়ের মাধ্যমে  ২টি মুক্ত পরাগায়িত জাত (বিবিসি ০১ ও বিবিসি ০২) বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভালো বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কৃষক পর্যায় চাষাবাদের জন্য ছাড়করণের পূর্বে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার  প্রয়োজন।  


চাষাবাদ পদ্ধতি
বেবী ভুট্টার চাষাবাদ অর্থাৎ জমি তৈরি, বীজ  বপনের  সময়, আন্তঃপরিচর্যা, কীটপতঙ্গ, রোগ ও বালাই দমন  সাধারণ  ভুট্টা চাষের অনুরূপ। তবে জমিতে গাছের ঘনত্বের উপর বপন পদ্ধতি, সারের  মাত্রা ও বীজের পরিমাণের তারতম্য হয়। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি বলে বছরে একই জমি থেকে কমপক্ষে ৩টি ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব। বেলে ও  ভারী এঁটেল মাটি ছাড়া অন্যান্য সব মাটি বেবী ভুট্টা  চাষের উপযুুুক্ত  হলেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাযুক্ত উর্বর বেলে দোঁআশ  বা দো-আঁশ মাটিই উত্তম। মাটি ৩ - ৪টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে বীজ বপনের আগে ঝুরঝুরে ও সমান করে নিতে হয় যাতে সেচ ও বৃষ্টির পর জমিতে পানি না দাঁড়ায়। খরিপ  মৌসুমে উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করতে  হবে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় প্রায় সারা বছরই বেবী ভুট্টা চাষ করা গেলেও রবি মৌসুমে ফলন বেশি হয়। সাধারণ  ভুট্টার মত রবি (অক্টোবর-নভেম্বর)  খরিপ -১ (১৫ই ফেব্রæয়ারী-১৫ই মার্চ) ও  খরিপ- ২ ( জুলাই-আগস্ট) মৌসুমে বীজ বপন করা সম্ভব । অতি বৃষ্টিতে বীজ পঁচে যেতে পারে ও নিম্ন তাপমাত্রায় অঙ্কুরোদগমে সমস্যা হয় বিধায়  এ সময় বীজ  বপন  না করাই উত্তম। সারি থেকে  সারির দূরত্ব ৫০-৬০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছের দুরত্ব ১৫-২০ সেমি. অনুসরণ করা যেতে পারে। সারিতে ২.৫-৩.০ সেমি. গভীরে  প্রতি গোছায় ১-২টি বীজ বপন করতে হবে।  বেবী ভুট্টা চাষে বিভিন্ন রাসায়নিক  সারের মাত্রা ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সালফেট, বরিক এসিড যথাক্রমে ২২০-৩৫০, ১৪০-২২৫, ১০০-১৬০, ৭৫-১২০, ১০-১৪, ৫-৮ কেজি /হেক্টর। বীজ রোগবালাইমুক্ত করার জন্য বপনের আগে শোধন করা উচিত, যা চারা গাছকে প্রাথমিকভাবে রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। জমিতে গাছের ঘনত্ব ও জাতভেদে হেক্টরপ্রতি ৩৫-৬০ কেজি  বীজের  প্রয়োজন হয়। তবে অঙ্কুরোদগম ৯০ শতাংশের কম হলে   আনুপাতিক হারে বীজের পরিমাণও বাড়বে। রবি মৌসুমে মাটিতে রসের তারতম্য  ভেদে ১-২ বার  সেচের প্রয়োজন হতে পারে। বীজ বপনের আগে জো না  থাকলে হালকা সেচ দিয়ে জো হওয়ার পর বীজ বপন করলে অংকুরোদ্গম ভাল হবে। বীজ গজানোর ২০-২৫ দিন পর প্রথম সেচ এবং ৫০-৫৫ দিন পর দ্বিতীয় সেচ প্রয়োগ করা যেতে পারে।
মঞ্জুরিদণ্ড অপসারণ (Detasseling)  
পরাগায়ণ  রোধে বেবী ভুট্টা  চাষে সাধারণত মঞ্জরিদণ্ড (tassel) অপসারণ করা হয়। কারণ পরাগায়ণ হলে ডিম্বকের নিষিক্তকরণ ও গর্ভাশয় বৃদ্ধির ফলে মোচার গুণগতমান খারাপ হয় এবং বাজারমূল্য কমে যায়। কাজেই পুরুষফুল হতে পরাগরেণু ঝরার পূর্বে এবং মোচার মাথায় সিল্ক বের হওয়ার পূর্বেই  হাত দিয়ে টেনে মঞ্জরিদণ্ড অপসারণ করতে হয়। মঞ্জরিদণ্ড অপসারণ আগাম ফসল  পেতে  ও মোচার সুষম বৃদ্ধিতে  সহায়তা করে । তাছাড়া এর ফলে গাছে মোচার সংখ্যা ও গুণগতমান বৃদ্ধি  পায় ।
 

মোচা সংগ্রহ
মোচার মাথায় সিল্ক আসার পূর্বে অথবা সিল্ক আসা মাত্রই (১-২ দিন) এবং পরাগায়ণের পূর্বে মোচা সংগ্রহ করতে হয়। জাতভেদে  এই সময়  সিল্কের দৈর্ঘ্য ১-৩ সেমি.   হয়ে থাকে। সাধারণত পুরুষফুল  অপসারণের ৩ থেকে  ৫ দিনের  ভেতর মোচা সংগ্রহের উপযুক্ত হয়ে  থাকে ।  ভুট্টার মোচা এত দ্রুত বৃদ্ধি পায় যে, উপযুক্ত  সময়ের ১ থেকে ২ দিন পর সংগৃহীত  মোচা মানসম্পন্ন থাকে না এবং স্বাভাবিকভাবে বাজারমূল্য কমে যায়। জাতভেদে মোচা  সংগ্রহের সময়ের তারতম্য হওয়ায় সতর্ক ও যথাযথ  পর্যবেক্ষণের  মাধ্যমে উপযুক্ত সময় ঠিক করে নিতে হয়। সকালের ঠাণ্ডা আবহাওয়া মোচা  সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। কারণ এই সময় মোচার আর্দ্র্রতার পরিমাণ সর্বাধিক থাকে। গাছের উপর হতে মোচা সংগ্রহ শুরু হয় এবং ক্রমে তা নিচের দিকে প্রসারিত হয়।  প্রতিদিন মোচা সংগ্রহ করা ভাল। প্রথম মোচা সংগ্রহের ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে  গাছের বাকি মোচাগুলো সংগ্রহ করা যায়।  প্রতি গাছে ৩-৪ টি মোচা থাকলেও  গড়ে  ২-৩ টির বেশি বেবী ভুট্টার জন্য মানসম্পন্ন মোচা সংগ্রহ করা যায় না। মোচা ছুরি বা সিকেচার দিয়ে  কেটে সংগ্রহ করা ভাল। হাত দিয়ে মুচড়িয়ে  ছিঁড়ে ফেলা ঠিক নয়। এতে আঘাতজনিত কারণে মোচা পরবর্তীতে নষ্ট  হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।মোচা সংগ্রহের পর পুরোগাছ, মোচা হতে ছাড়ানো খোসা ও বাতিলকৃত মোচা উওম গো-খাদ্য হিসেবে  ব্যবহার করা যায়।                                                                                                                                                                                                                           
 

প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মোচা সংরক্ষণ
খোসাসহ বা খোসাবিহীন  মোচার তাপমাত্রা মাঠ থেকে সংগ্রহের ১ হতে ২ ঘণ্টার মধ্যেই ঠাণ্ডা পানি বা বরফযোগে  কমিয়ে ০ থেকে ১ ডিগি সেন্ট্রিগ্রেড এর মধ্যে আনতে হয়। এই প্রক্রিয়া প্রিকুলিং  নামে পরিচিত। তবে ঠাণ্ডা পানিযোগে প্রিকুলিং প্রক্রিয়া অধিক ফলপ্রসূ হয়। এই প্রক্রিয়ায় মোচাগুলো ঠাণ্ডা পানিতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হয়। স্বাভাবিকভাবে খোসাসহ  মোচা  অপেক্ষা  খোসাবিহীন মোচার প্রিকুলিং দ্রুত  সম্পন্ন হয়। তবে খোসাবিহীন  মোচার ক্ষেত্রে অধিক  সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। ফসল সংগ্রহের পর  প্রিকুলিং প্রক্রিয়ার প্রতি  ঘণ্টা বিলম্বের কারণে মোচার  সংরক্ষণের  সময় (self life) ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত  কমে যায়। তাছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির  সাথে সাথে মোচায় বিদ্যমান চিনি  (sugar) দ্রুত স্টার্চে  রূপান্তরিত হয়। ফলে মিষ্টতা  কমে যাওয়ায়  মোচার স্বাদ ও গুণাগুণ নষ্ট হয়। তাই টাটকা  মোচার ক্ষেত্রে সংগ্রহের  পর হতে ভোক্তার  হাতে পৌঁছার পূর্ব  পর্যন্ত বাজারজাতকরণের  সকল স্তরে নিম্ন তাপমাত্রায় (৫-৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) ও উচ্চ আপেক্ষিক  আর্দ্রতায় (৯০ শতাংশ)  সংরক্ষণ করতে  পারলে ৭ থেকে ১০ দিন ভাল থাকে।   
 

ফলন
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে বাছাইকৃত জাতগুলো হতে হেক্টর প্রতি খোসাসহ ৩-৭ টন এবং খোসাবিহীন অবস্থায় ০.৬-১.৮ টন পর্যন্ত মোচা পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া একই সাথে গো-খাদ্য হিসেবে হেক্টরপ্রতি ১৫-২৫ টন সবুজ গাছ পাত্তয়া সম্ভব।   

                                                                                              
বাংলাদেশে বেবী ভুট্টার চাষকৃত জাত থাইল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত এবং বাজারমূল্যও অনেক। সুতরাং বিভিন্ন উৎস থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও মূল্যায়ন, সংকরায়ণের  মাধ্যমে উপযোগী নতুন জাত সৃষ্টি এবং কৃষক পর্যায়ে তা সহজলভ্য করতে পারলে বীজ আমদানিতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্র্রয় হবে। সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেবী ভুট্টা হতে তৈরি বিভিন্ন খাবার এবং প্রস্তুতপ্রণালী সাধারণ মানুষের গোচরে আনার ও খাবার হিসেবে একে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করা যেতে পারে। একই সাথে কৃষকদের  মাঝে  প্রচলিত অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেবী ভুট্টা চাষে অর্থনৈতিক লাভ তুলে ধরতে  পারলে তা এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এছাড়া নতুন ফসল বলে কৃষক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, উৎপাদিত  পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা প্রদানের ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে বেবী ভুট্টা পুষ্টির চাহিদা ও খাদ্য ঘাটতি মিটাতে যেমন সাহায্য  করবে তেমনি গ্রামীণ দরিদ্র  জনগোষ্ঠীর বিকল্প নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানির মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও  সহায়তা করতে পারবে।

ড. মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম মতিন১
        ড. মো. আমিরুজ্জামান২

১বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মহাপরিচালকের দপ্তর, ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর, মোবাইল নম্বর ০১৭১৮-৩৫৮৪৫৬ ই-মেইল: quamrul_islam76@yahoo.com

 

বিস্তারিত
সবজি ও শোভার জন্য শাপলা

সাদা শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। নীল শাপলা শ্রীলংকার জাতীয় ফুল ও সাদা শাপলা ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্য ফুল। জাতীয় ফুল হলেও এদেশে শাপলা এক অবহেলিত উদ্ভিদ। প্রাপ্ত বিভিন্ন জীবাশ্ম সাক্ষ্য দেয়, আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর বুকে শাপলা গাছের অস্তিত্ব ছিল। প্রাচীন মিসরে সাদা ও নীল শাপলার আদি অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়ার বহুদেশে শাপলা জন্মে। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডেও শাপলা আছে। এ দেশের প্রায় সর্বত্র জলে-ডোবায়, বিলে-ঝিলে, পুকুরে-খালে শাপলা জন্মে থাকে। শাপলা ফুল দেখতে খুবই সুন্দর। শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে তাই জলজ উদ্যানে লাগানো হয়। এর কন্দ ও পুষ্পনাল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়।
 

গাছের পরিচয়
সারা বিশ্বে প্রায় ৫০-৬০ প্রজাতির শাপলা আছে। আমাদের দেশে সাদা শাপলা (Nymphaea alba, Nymphaea pubiscence), লাল শাপলা (Nymphaea rubra), নীল শাপলা (Nymphaea nouchali ও Nymphaea capensis) ও হালকা নীল শাপলা (Nymphaea stellata) দেখা যায়। দুর্লভ হলুদাভ শাপলাও (Nymphaea amazonum) মাঝে মাঝে কোথা কোথাও দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সাদা শাপলা। এরপর পাওয়া যায় লাল শাপলা  এবং নীল শাপলার বিচরণক্ষেত্র সীমিত। হালকা নীল শাপলা মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে নোয়াখালী, খুলনা, সাতক্ষীরা, সিলেট প্রভৃতি এলাকায় দেখা যায়।


শাপলা একটি জলজ বিরুৎ। একবার কোথাও জন্মালে তার মূল সম্পূর্ণ না উঠানো পর্যন্ত সেখানে গাছ জন্মাতে থাকে। গাছের কন্দ বা মোথা জলের তলে মাটি বা কাদায় থাকে, পাতা জলের উপরে ভাসতে থাকে, নলের মতো পত্রনাল ও ফুলের লম্বা বোঁটা জলের ভেতরে থাকে, ফুল ফোটে জলের উপরে। জল পেলে পত্রনাল ২-৩ মিটার লম্বা হতে পারে। পুষ্পনাল ও পত্রনালের ভেতরে অনেকগুলো ফাঁপা নল থাকে। পুষ্পনাল বা ফুলের বোঁটাকে স্থানীয় ভাষায় ‘নাল’ বা ‘নাইল’ বলে। পাতা গোলাকার হলেও বোঁটার দিকটা হৃৎপিণ্ডকার, পাতার কিনারা ঢেউ খেলানো। ফুল দেখতে অনেকটা পদ্মফুলের মতো। তবে পাপড়ি পদ্মফুলের চেয়ে চিকন ও শক্ত। ফুল দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। বসন্তের শেষ থেকে শরতের প্রথম পর্যন্ত ফুল ফুটলেও বর্ষাকালে বেশি ফোটে। গাছের সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটে বর্ষাকালে। সাদা শাপলা ফুল ফোটে রাতে, দিনে বুজে যায়। এজন্য সাদা শাপলাকে বলে কুমুদ।  লাল ও নীল শাপলা ফুল ফোটে দিনে। ফলগুলো স্পঞ্জের মতো ফাঁপা, সবুজ ও গোলাকার, অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় ভেসে থাকে, পাকলে ফল ফেটে যায়। ফলের মধ্যে অনেকগুলো কোষ থাকে। সেসব কোষে প্রচুর বীজ থাকে। বীজের রঙ কালো বা বাদামি, ক্ষুদ্র, ব্যাস প্রায় ১ মিলিমিটার।


পুষ্টিমূল্য
শাপলা গাছের বিভিন্ন অংশের পুষ্টিমান বিভিন্ন রকম। জলীয় উপাদান সবচেয়ে বেশি থাকে মোথা বা কন্দে (২০.৪%) ও সবচেযে কম থাকে বীজে (৪.১৮%)। ফ্যাট বেশি থাকে বীজে। প্রোটিন সবচেয়ে বেশি আছে পাতায় (২৫.৪%) ও সবচেয়ে কম আছে নাইলে (১০.০%)। খাদ্য আঁশ আছে ৯.৫-১৫.১%। নাইলে খনিজ উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে পটাশিয়াম (১.৫৬- ৪.৬৩%) ও সোডিয়াম (১.৯-৪.২১%)। এ ছাড়া রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে  ক্যালসিয়াম, জিংক, আয়রন ও সোডিয়াম।


ব্যবহার
প্রাচীনকাল থেকে শাপলা মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষত দুর্ভিক্ষের সময় শাপলা খাদ্য হিসেবে অনেক মানুষের জীবন বাঁচায়। আফ্রিকায় অনেকে তাদের স্থানীয় বুনো শাপলার মোথা খায়। খাদ্যের জন্য আফ্রিকায় কেউ কেউ শাপলার চাষ করে। মোথা বা কন্দ অনেক দেশে সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়, সালাদেও খাওয়া হয়। মোথা ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। সবজি হিসেবে এদেশে পুষ্পনাল বা ফুলের বোঁটাকে পল্লী অঞ্চলে ব্যাপকভাবে খাওয়া হয়। নাইলের খোসা তুলে তা টুকরো করে কেটে চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করলে অত্যন্ত সুস্বাদু হয়। সরষে ফোঁড়নে নারকেল দিয়েও রান্না করা হয়। নাইলের কাটা টুকরো নারিকেল পাতার শলা বা টুথপিক দিয়ে গেঁথে ভেলার মতো বানিয়ে তা বেসন বা চালের গুঁড়ো দিয়ে মেখে তেলে ভেজে বেগুনির মতো খাওয়া হয়। সাদা শাপলা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। লাল ও নীল শাপলা সাধারণত খাওয়া হয় না।


ভেষজ গুণ
পল্লী অঞ্চলে একসময় শাপলা গাছের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো। এর শুকনো ফুলের গুঁড়ো ঠাণ্ড ও কষায় উপকার করে। কলেরা, জ্বর ও যকৃতের অসুখ সারাতে শাপলার ফুল ব্যবহৃত হয়। বীজ বিভিন্ন চর্মরোগ এমনকি কুষ্ঠ রোগের ঔষধ। ডাঁটা বা নাল খেলে পাকস্থলী থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। তবে সবচেয়ে উপকারী হলো শাপলা মোথা বা মূল। অর্শ, অজীর্ণ, শুক্রতারল্য ইত্যাদি রোগ নিরাময়ে মোথা কাজে লাগে।


বংশবৃদ্ধি
দুভাবে শাপলার বংশবৃদ্ধি ঘটে- বীজ থেকে ও অঙ্গজ উপায়ে। শাপলা ফুল ফোটার পর ৩-৪ দিনের বেশি তা থাকে না। ফোটার প্রথম দিনেই ফুল থেকে এক ধরনের মিষ্টি সুগন্ধ বের হয় যা পরাগায়ণকারী বিভিন্ন পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। ফুলের সৌন্দর্য ও সৌরভে আকৃষ্ট হয়ে পোকারা ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায় ও পরাগায়ণ ঘটায়। ফুল ফাটার পরের দিন পুরুষ স্তবক পরাগরেণু উৎপাদন করে যা এসব পোকাদের দ্বারা বাহিত হয়ে স্ত্রীকেশরের গর্ভমুণ্ডে পড়ে ও গর্ভাধান সম্পন্ন হয়। এর ৩-৪ দিন পর ফুল থেকে ফল গঠন শুরু হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে একটি ফলের ভেতরে প্রায় ২০০০ বীজের গঠন চলতে থাকে। ফল পাকলে তা জলের উপরে ভেসে ওঠে ও ফেটে যায়। প্রাকৃতিকভাবে সেসব ফলের বীজ জলে ছড়িয়ে পড়ে ও বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়। চারা তৈরি করতে চাইলে ফাটার আগেই পাকা ফল সংগ্রহ করে রোদে শুকালে তা ফেটে সরষে দানার মতো বীজ বেরিয়ে যায়। সেসব বীজ সংগ্রহ করে জলমগ্ন কাদায় ছড়িয়ে দিলে তা থেকে চারা তৈরি হয়।


চারা তৈরির দ্বিতীয় উপায় হলো এর মোথা বা গেঁড় থেকে। শাপলা গাছের গোড়ায় মাটির ভেতরে শিকড়শুদ্ধ এই মোথা বা রাইজোম থাকে। প্রাকৃতিকভাবে তা থেকে পুনরায় শাপলা গাছ জন্মে।  এসব গেঁড় তুলে আস্ত বা টুকরো করে কেটে লাগালে তা থেকে আবার নতুন গাছ জন্মায়। এ ছাড়া জলের নিচে এসব গেঁড় বা মোথা থেকে যেসব চারা বের হয় সেগুলো সাবধানে আলাদা করে লাগালে তা থেকেও নতুন গাছ জন্মায়। ধীরক্ষয় সম্পন্ন সার বা ট্যাবলেট সার মাটিতে পুঁতে প্রয়োগ করতে পারলে এসব চারা থেকে জন্মানো গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।


চাষাবাদ
অন্য ফসলের মতো এ দেশে শাপলা চাষ করা হয় না, প্রাকৃতিকভাবে জলাশয়ে প্রচুর জন্মে থাকে। বরং কখনো কখনো তা আগাছা হিসেবে আপদের মতো আবিভর্‚ত হয়। বাড়ির আশেপাশে পড়ে থাকা ডোবা বা জলাশয় থাকলে সেখানে শাপলা চাষ করে সবজি হিসেবে খাওয়ার জন্য নাইল উৎপাদন করা যেতে পারে, পুকুরেও চাষ করা যেতে পারে। উদ্যানের ছোট জলাশয়ে বা ডোবার পাঁকে সরাসরি মোথা বা কন্দ পুঁতে শাপলা জন্মানো যায়। আবার আলাদা একটি পাত্রে চারা জন্মিয়ে সেই পাত্রসহ চারাকে জলাশয়ের জলের তলায় মাটিতে পুঁতে দেয়া যায়। পুকুরে, পাত্রে ও জলোদ্যানে শাপলা চাষ করতে চাইলে নি¤œলিখিত ধাপসমূহ অনুসরণ করা যেতে পারে।


লাগানোর পাত্র ও স্থান নির্বাচন- সরাসরি কাদায় না পুঁতে পাত্রে গাছ লাগাতে চাইলে ১৪ থেকে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাত্র নিতে হবে। মাটির পাত্র হলে ভাল। বাজারে মাটির যে গামলার মতো পাত্র কিনতে পাওয়া যায় ছিদ্রহীন সেসব পাত্র নেয়া যেতে পারে। ছাদে বা বাড়ির বাগানের কোন অংশে শাপলা ফোটাতে চাইলে নিতে হবে ২ থেকে ৩ ফুট ব্যাসযুক্ত মুখের বড় কোন পাত্র বা মাটির চাড়ি, যেরূপ চাড়ি বা পাত্রে গরুর খাবার দেয়া হয়। যে জলাশয়ে লাগানো হবে তার আয়তন যেন কমপক্ষে দুদিকে ৬-৮ ফুট হয়। কেননা, একবার লাগিয়ে অন্তত ৫ বছর পর্যন্ত বাগানে শাপলা ফুল ফোটানো বা নাইল উৎপাদন করা যায়। এ সময়ের মধ্যে শাপলা গাছের শিকড়ের বিস্তৃত হয় প্রায় ১৫ ফুট পর্যন্ত। ছায়ায় শাপলা ভাল হবে না- তাই রোদ পড়ে এমন জায়গা চাষের জন্য বেছে নিতে হবে।


পাত্রে চারা রোপণ- পাত্র সংগ্রহ  করার পর তার তলায় পুকুরের পাঁক বা কাদা কিছুটা দিয়ে তার মধ্যে শাপলার মোথা বা চারা পুঁততে হবে। কাদার সাথে কাদার চার থেকে পাঁচ ভাগের একভাগ পরিমাণ কেঁচোসার বা ভার্মিকম্পোস্ট মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে। বিদেশে একোয়াটিক কম্পোস্ট ব্যবহার করা হয়, এদেশে এটা পাওয়া যায় না। এপ্রিল-মে মাস চারা লাগানোর উত্তম সময়। চারা লাগানোর পর পাত্র জল দিয়ে ভরে দিতে হবে। তবে জল ভরার আগে কাদার উপর পাতলা এক স্তর নুড়ি পাথর বিছিয়ে দিতে পারলে ভাল হয়। এতে কাদা গুলে জল নোংরা হবে না। পুকুরের তলার মাটিতে বা কাদায় সরাসরি মোথা পুঁতে দেয়া যায়।


পরিচর্যা- পাত্রের জায়গা ও কাদার পরিমাণ কম বলে গাছের খাবার পায় কম ও বাড়েও কম। পাত্র গভীর হলে ভালো। তাতে কাদার পরিমাণ বেশি দেয়া যায়। এক্ষেত্রে এ দেশে সিমেন্টের এক ধরনের স্যানিটারি রিং বিক্রি হয়। দু-তিনটি রিং জোড়া দিয়ে তলাটা ঢালাই করে বন্ধ করতে হবে। এভাবে শাপলা লাগানোর উপযোগী গভীর একটি পাত্র তৈরি করে নেয়া যায়। তবে কোনভাবেই সে পাত্র থেকে যেন জল না বের হয় সেভাবে নিñিদ্র করতে হবে। কাদার ভেতরে ৩-৪টি ট্যাবলেট সার পুঁতে দিলে এক বছরের জন্য আর কোন সার দিতে হবে না। এছাড়া কাদার ভেতরে বিভিন্ন রাসায়নিক সার মিশিয়ে তা বল বানিয়ে রোদে শুকিয়ে সেসব বল বছরে ২-৩ বার পাত্রের কাদার মধ্যে পুঁতে দেয়া যায়। জলাশয়ের কাদাতেও এরূপ সারের বল পুঁতা যায়। এতে গাছের বাড়-বাড়তি বেশি হয় ও ভালো ফুল ফোটে। পাত্র বা জলাশয়ের জল কমে গেলে জল দিতে হবে। ৪ থেকে ৫ বছর পর পর পাত্র বা জলাশয়ের সব গাছ উপড়ে ফেলে আবার কাদাতে সার মিশিয়ে তৈরি করে  পুনরায় শাপলা গাছ লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে যে রঙের শাপলা ছিল তার বদলে অন্য রঙের বা জাতের শাপলা লাগিয়ে জলজ বাগানে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে।

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকল্প  পরিচালক, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোন্টে অঙ্গ (২য় পর্যায়) প্রকল্প, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা : ০১৭১৮২০৯১০৭, ই-মেইল : Kbdmrityun@yahoo.com

বিস্তারিত
গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ কৃষক খামারি সচেতনতা

সাম্প্রতিককালে দেশের সব জায়গায় গরুর এলএসডি আক্রান্ত হয়েছে। এলএসডি গরুর জন্য একটা ভয়ংকর ভাইরাস বাহীত চর্মরোগ যা খামারের ক্ষতির কারণ। এই রোগের গড় মৃত্যুহার আফ্রিকাতে ৪০%। মূলত আফ্রিকায় একাধিকবার মহামারী আকারে দেখা গেলেও আমাদের দেশে গরুতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কখনো মহামারী আকারে দেখা যায় নাই। একটা খামারকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দেয়ার জন্য এফএমডি বা খুরা রোগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর রোগ হিসেবে ধরা হয়।
১৯২৯ জাম্বিয়া প্রথম অফিসিয়ালি শনাক্ত হওয়া এই রোগ ১৯৪৩ সাল থেকে ৪৫ সালের মধ্যে মহাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, মোজাম্বিকসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে হাজার হাজার গরু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং শত শত খামার বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সত্তর এবং আশির দশকে আফ্রিকার প্রায় সব দেশের গরু এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে যায় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রোগের কারণ
 মূলত এক প্রকার পক্স ভাইরাস বা এলএসডি ভাইরাসের সংক্রমণে গবাদিপশুতে এই রোগ দেখা দেয় এবং এক গরু থেকে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে।
রোগের সময়  
প্রধানত বর্ষার শেষে, শরতের শুরুতে অথবা বসন্তের শুরুতে যে সময়ে মশা মাছি অধিক বংশবিস্তার সেই সময়ে প্রাণঘাতী এই রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
রোগের লক্ষণ
এলএসডি আক্রান্ত গরু লক্ষণ শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে  প্রকাশ করে :
১. আক্রান্ত গরু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং খাবার রুচি কমে যায়।
২. জ্বরের সাথে সাথে মুখ দিয়ে এবং নাক দিয়ে লালা বের হয়। পা ফুলে যায়। সামনের দু’পায়ের মাঝ স্থান  পানি  জমে যায়।
৩. শরীরের বিভিন্ন জায়গা চামড়া পিণ্ড আকৃতি ধারণ করে, লোম উঠে যায় এবং ক্ষত সৃষ্ট হয়। ধারাবাহিকভাবে এই ক্ষত শরীরের অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়ে।
৪. ক্ষত মুখের মধ্যে, পায়ে এবং অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫. ক্ষত স্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে। শরীরে কোথায় ফুলে যায় যা ফেটে টুকরা মাংসের মতো বের  হয়ে  ক্ষত হয়, পুঁজ কষানি বের  হয়।
৬. পাকস্থলী অথবা মুখের ভেতরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে গরু পানি পানে অনীহা প্রকাশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।
কিভাবে ছড়ায়  
লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে রোগটি অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগ এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যমগুলো হচ্ছে :
১.  মশা ও  মাছি : এই রোগের ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসাবে মশা মাছিকে দায়ী করা হয়। অন্যান্য কীট পতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. লালা : আক্রান্ত গরুর লালা খাবারের মাধ্যমে অথবা খামারে কাজ করা মানুষের কাপড়ের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়াতে পারে।
৩. দুধ : যেহেতু আক্রান্ত গাভীর দুধে এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে তাই আক্রান্ত গভীর দুধ খেয়ে বাছুর দুধ খেয়ে আক্রান্ত হতে পারে।
৪. সিরিঞ্জ : আক্রান্ত গরুতে ব্যবহার করা সিরিঞ্জ থেকে এই ভাইরাসবাহিত হতে পারে।
৫. রক্ষণাবেক্ষণকারী : খামারে কাজ করা মানুষের পোশাকের মাধ্যমে আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৬. আক্রান্ত গরুর সিমেন : ভাইরাস আক্রান্ত ষাঁড়ের সিমেন এই রোগের অন্যতম বাহন, কারণ আক্রান্ত গরুর সিমেনেও এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে।
৭. শুধুমাত্র  গরু  মহিষ আক্রান্ত হয়, মানুষ হয় না।
প্রতিকারে  কৃষক সচেতনতা ও করণীয়  : যেকোন রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিকার সব সময় অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
১. আক্রান্ত গরুকে নিয়মিত এলএসডি ভ্যাকসিন দেয়া। আমাদের দেশে ইতঃপূর্বে রোগটির প্রাদুর্ভাব কম দেখা গেছে তাই এই রোগের ভ্যাকসিন সহজলভ্য নয়।
২. খামারের ভেতরের এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যেন মশা মাছির উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৩. আক্রান্ত খামারে যাতায়াত বন্ধ করা এবং আক্রান্ত খামার থেকে আনা কোনো সামগ্রী ব্যবহার না করা।
৪. আক্রান্ত গরুকে শেড থেকে আলাদা স্থানে মশারি দিয়ে ঢেকে রাখা মশা মাছি কামড়াতে না পারে। কারণ আক্রান্ত গরুকে কামড়ানো মশা মাছি সুষ্ঠু গরুকে কামড়ালে এই রোগের সংক্রমণ হতে পারে।
৫. আক্রান্ত গভীর দুধ বাছুরকে খেতে না দিয়ে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দেয়া।
৬. আক্রান্ত গরুর পরিচর্যা শেষে একই পোশাকে সুষ্ঠু গরুর মধ্যে প্রবেশ না করা।
৭. আক্রান্ত গরুর খাবার বা ব্যবহার্য কোনো জিনিস সুষ্ঠু গরুর কাছে না আনা।
৮. ক্ষতস্থান টিনচার আয়োডিন মিশ্রণ দিয়ে পরিষ্কার রাখা।


চিকিৎসা  
এলএসডি আক্রান্তের লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

মো: মোস্তাফিজুর রহমান

এলএফএআই, ঝিকরগাছা  উপজেলা  সমবায়  অফিস, যশোর: ০১৯১৬৮৮৩৪৩৮, mustakmahammad@gmail.com

 

বিস্তারিত
ফাল্গুন মাসের কৃষি

গাছে গাছে নতুন পাতা, মুকুলসহ বিভিন্ন প্রস্ফুটিত ফুলের বর্ণিল রঙে প্রকৃতিকে রাঙাতে ঋতুরাজ বসন্ত এসেছে আমাদের মাঝে। নতুন প্রাণের উদ্যমতা আর অনুপ্রেরণা প্রকৃতির সাথে আমাদের কৃষিকেও দোলা দিয়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন ফাল্গুনের শুরুতেই আসুন সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেই বৃহত্তর কৃষি ভুবনে করণীয় দিকগুলো।
 

বোরো ধান
ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। ধানের কাইচ থোড় আসা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত ক্ষেতে ৩/৪ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে (আলোর ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, উপকারী পোকা সংরক্ষণ করে, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে) ধানক্ষেত বালাইমুক্ত রাখতে হবে। এ সময় ধান ক্ষেতে উফরা, ব্লাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগ দেখা দেয়। জমিতে উফরা রোগ দেখা দিলে যেকোন কৃমিনাশক যেমন- ফুরাডান ৫ জি বা কিউরেটার ৫ জি প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে এবং একরপ্রতি ১৬০ গ্রাম ট্রুপার বা জিল বা ন্যাটিভ বা ব্লাসটিন ১০-১৫ দিনের ব্যবধানে দু’বার প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে পাতাপোড়া রোগ হলে অতিরিক্ত ৫ কেজি/বিঘা হারে পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে এবং জমির পানি শুকিয়ে ৭-১০ দিন পর আবার সেচ দিতে হবে। টুংরো রোগ দমনের জন্য এর বাহক পোকা সবুজ পাতাফড়িং দমন করতে হবে।

 

গম
এ মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম পাকা শুরু হয়। গম শীষের শক্ত দানা দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট কট শব্দ হয় তবে বুঝতে হবে গম কাটার সময় হয়েছে। সকালে অথবা পড়ন্ত বিকেলে ফসল কাটা উচিত। বীজ ফসল কাটার পর রোদে শুকিয়ে খুবই তাড়াতাড়ি মাড়াইঝাড়াই করে ফেলতে হবে। সংগ্রহ করা বীজ ভালো করে শুকানোর পর ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ করতে হবে।

 

ভুট্টা (রবি)
জমিতে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে হবে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে শুকনো আবহাওয়ায় মোচা সংগ্রহ করে ফেলতে হবে। সংগ্রহ করা মোচা ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। মোচা সংগ্রহের পর উঠানে পাট বিছিয়ে তার উপর শুকানো যায় অথবা জোড়া জোড়া বেঁধে দড়ি বা বাঁশের সাথে অথবা টিনের চাল বা ঘরের বারান্দায় ঝুলিয়ে শুকানোর কাজটি করা যায়।

 

ভুট্টা (খরিপ)
খরিপ মৌসুমে ভুট্টা চাষ করতে চাইলে এখনই বীজ বপন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে হবে। বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫ এসব হলো ভুট্টার উন্নত জাত।

 

পাট
ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। ফাল্গুন মাসে বপন উপযোগী পাটের ভালো জাতগুলো হলো সিসি-৪৫, বিজেআরআই দেশী পাট শাক-১ (বিজেসি-৩৯০), ফাল্গুনী তোষা (ও-৯৮৯৭), বিজেআরআই তোষা পাট-৪ (ও-৭২)। পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়িভাবে ৫-৬টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে আরেকটু বেশি অর্থাৎ ৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। পাটের জমিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ ফুট) এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭ সেন্টিমিটার (প্রায় ৩ ইঞ্চি) রাখা ভালো। ভালো ফলনের জন্য প্রতি একরে ৭০ কেজি   ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি, ১২ কেজি এমওপি, ১৮ কেজি জিপসাম এবং প্রায় ৪.৫ কেজি জিংকসালফেট সার প্রয়োগ করতে হবে।

 

শাকসবজি
এ মাসে বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে ডাঁটা, কমলিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। মাদা তৈরি করে চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়ার বীজ বুনে দিতে পারেন। সবজি চাষে পর্যাপ্ত জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে জৈব সার ব্যবহার করলে সবজি ক্ষেতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না।


গাছপালা
আমের মুকুলে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ এ সময় দেখা দেয়। এ রোগ দমনে গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার পূর্ব পর্যন্ত আক্রান্ত গাছে  প্রোপিকোনাজল আথবা মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া আমের আকার মটর দানার মতো হলে গাছে ২য় বার স্প্রে করতে হবে। এ সময় প্রতিটি মুকুলে অসংখ্য হপার নিম্ফ দেখা যায়। আম গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে কিন্তু ফুল ফোটার আগেই একবার এবং এর এক মাস পর আর একবার সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক পানির সাথে মিশিয়ে গাছের পাতা, মুকুল ও ডালপালা ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। কাঁঠালের ফল পঁচা বা মুচি ঝরা সমস্যা এখন দেখা দিতে পারে। কাঁঠাল গাছ এবং নিচের জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত ফল ভেজা বস্তা জড়িয়ে তুলে মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করতে হবে। মুচি ধরার আগে ও পরে ১০ দিন পর পর ২/৩ বার বোর্দো মিশ্রণ বা মেনকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বাডিং পদ্ধতিতে বরই গাছের কলম করতে পারেন। এজন্য প্রথমে বরই গাছ ছাঁটাই করতে হবে এবং পরে উন্নত বরই গাছের মুকুল ছাঁটাই করে দেশী জাতের গাছে সংযোজন করতে হবে।


প্রাণিসম্পদ
এ সময় মুরগির রাণীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব রোগ দেখা দিতে পারে। সে কারণে প্রয়োজনীয় টিকা প্রদান করতে হবে। খাবারের সাথে  ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই সরবরাহ করতে হবে। এসময় গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) পক্স ভাইরাস সংক্রমণে এক গরু হতে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত প্রাণি সম্পদ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। গবাদিপশুকে প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন দিতে হবে এবং কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। গবাদিপশুকে উন্নত খাবার যেমন-সবুজ ঘাস, ইউরিয় মোলাসেম স্ট্র, ইউরিয়া মোলাসেম ব্লক এসব খাওয়াতে হবে।


মৎস্যসম্পদ
মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি ও সংস্কার করার উপযুক্ত সময় এখন। পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে নিচ থেকে পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে এবং শতাংশপ্রতি ১ কেজি চুন ও ১০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে। পানি ভর্তি পুকুরে প্রতি শতাংশে ৬ ফুট পানির জন্য ১ কেজি চুন গুলে ঠাণ্ডা করে দিতে হবে। এছাড়া শতাংশপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম টিএসপি একসাথে মিশিয়ে পানি ভর্তি পুকুরে দিতে হবে। শীতের পর এ সময় মাছের বাড়বাড়তি দ্রুত হয়। তাই পুকুরে প্রয়োজনীয় খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।


সুপ্রিয় পাঠক, কৃষিকথায় প্রতি বাংলা মাসেই কৃষি কাজে অনুসরণীয় কাজগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়। এগুলোর বিস্তারিত ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণের জন্য আপনার কাছের কৃষি বিশেষজ্ঞ, মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও প্রাণি সম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে জেনে নিতে হবে। আমাদের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের শীর্ষে। আবার কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা।

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন:০২৫৫০২৮৪০৪, মেইল: editor@ais.gov.bd

বিস্তারিত
হাইব্রিড বীজ : সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির এক অনন্য হাতিয়ার

সুস্থসবল জীবনের জন্য প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণ বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়া অপরিহার্য। কারণ জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণের অন্যতম উৎস হলো সবজি। বর্তমানে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সবজির চাহিদা পূরণ করতে হলে ১১.২৪ মিলিয়ন টন সবজির প্রয়োজন। সবজি উৎপাদন হয় ৪.০৫ মিলিয়ন টন। ক্রমহ্রাসমান আবাদি ভূমির চাপকে সমান রেখে সবজির উৎপাদন প্রায় ৩ গুণ বাড়াতে হবে। এই পরিস্থিতিতে একমাত্র হাইব্রিড সবজির জাত ব্যবহার ও উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তির মাধ্যমেই এই বিশাল সবজির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকরা খুব অল্প পরিমাণে (৩০-৪০%) সবজির হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করেন। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই শতভাগ পর্যন্ত সবজির হাইব্রিড জাত ব্যবহার হচ্ছে।
 

সংকর (হাইব্রিড) ও  সংকরায়ন
সংকরায়ন হলো একটি উদ্ভিদ প্রজনন প্রদ্ধতি, যার মাধ্যমে দুই বা ততোধিক ভিন্ন রকম জেনোটাইপ সম্পন্ন উদ্ভিদসমূহের যৌন মিলনের ফলে নতুন ধরনের জাত সৃষ্টি করা। এর ফলে যে নতুন জাত সৃষ্টি হয় তা হলো সংকর বা হাইব্রিড, আর এ প্রক্রিয়াটি হলো সংকরায়ন (Hybridization)।

 

সংকরায়নের উদ্দেশ্য
*সংকরায়নের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কৌলিক বিভিন্নতা সৃষ্টি করা।
*সংকরায়নের মাধ্যমে কোন একটি জাতে অন্যান্য জাতসমূহ বা বন্য প্রজাতিসমূহ থেকে এক বা একাধিক বৈশিষ্ট স্থানান্তরিত করা যায়।
*সংকরায়নের অন্য একটি উদ্দেশ্য হলো প্রজনকদ্বয় অপেক্ষা উন্নতর বা অধিক ফলনশীল (১০-৫০%) পর্যন্ত জাত সৃষ্টি করা।
সংকরায়ন করার পূর্বে নিম্নোক্ত তথ্যাবলি জানা একান্ত প্রয়োজন
*পুং-প্রজনক (Male line) সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান
*স্ত্রী-প্রজনক (Female line) সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান
*গাছসমূহ এক লিঙ্গ না উভয়লিঙ্গ
*ফুল প্রস্ফুটিত  হওয়ার সময়
*ফুল স্বপরাগী (self pollinated)  বা পরপরাগী (Cross pollinated)
ফসল সংগ্রহের সময়  যে কোনো ফসলের হাইব্রিড জাত তৈরি বা সংকরায়নের জন্য অনেকগুলি ধাপ আছে। প্রতিটি  ধাপ সতর্কতার সাথে অতিক্রম করলেই কেবল সংকরায়নে     কৃতকার্যতা আসতে পারে। ধাপগুলো নিম্নে বর্ণনা করা হলো:


প্রজনক নির্বাচন : সংকরায়নের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রজনক নির্বাচন। উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে প্রজনক নির্বাচন করতে হয়। যদি আমাদের উদ্দেশ্যে হয় সবজির ফলন বৃদ্ধি, তবে যে লাইনদ্বয়ের ফলন বেশি কেবল মাত্র তাদেরকেই নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে একটিকে পুরুষ লাইন হিসাবে নির্বাচন করতে হবে এবং অন্যটিকে স্ত্রী লাইন নির্বাচন করতে হবে। তবে উভয় লাইন অবশ্যই সমস্বত্ব   (Homozygous) হতে হবে। নির্দিষ্ট লাইন দুটি যদি সমস্বত্ব (Homozygous) না  হয় তবে কখনই সংকর বা হাইব্রিড জাত তৈরি করা যাবে না।


স্ত্রী ও পুরুষ ফুলকে সংকরায়নের জন্য উপযুক্তকরণ ঃ নির্বাচিত স্ত্রী লাইন ও পুরুষ লাইনের স্বস্ব ফুলকে সংকরায়নের জন্য উপর্যুক্ত করে নেওয়া সংকরায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এক্ষেত্রে ফুলের বৈশিষ্ট্যর জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি। কোন কোন সবজিতে একই ফুলে পুরুষ (পুংকেশর) ও স্ত্রী (গর্ভমুণ্ড) অংগ বিদ্যমান (যেমন- টমেটো, বেগুন ইত্যাদি) আবার কোন কোন সবজিতে পুরুষ ফুল ও স্ত্রী ফুল একই গাছে আলাদা আলাদা ভাবে থাকে (যেমন- কুমড়াজাতীয় ফসল), আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী গাছেই আলাদা  (যেমন- পটোল, কাকরোল ইত্যাদি)। সবজির প্রকারভেদ অনুযায়ী কাজের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, টমেটো ও বেগুনের ক্ষেত্রে ফুল ফোটার পূর্বের দিন স্ত্রী লাইনের ঐ নির্দিষ্ট ফুল হতে পুরুষ অঙ্গ (পুংকেশর) চিমটার সাহায্যে অপসারণ করা হয়। এই কাজটিকে বলা হয় পুংহীনকরণ (Emasculation) এই পুংহীনকরণ কাজটি বিভিন্নভাবে করা যেতে পারে। তবে চিমটার সাহায্যে অপরিণত ফুল হতে পুরুষ অঙ্গ (পুংকেশর) অপসারণ বেশ প্রচলিত। কিন্তু কুমড়াজাতীয় সবজির ক্ষেত্রে এই কাজটি করা হয় ভিন্নভাবে। এক্ষেত্রে যে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল পরের দিন ফোটার সম্ভাবনা আছে, এমন পুরুষ ও স্ত্রী ফুলকে এক বিশেষ ধরনের কাগজের ব্যাগ (Butter paper bag) দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে কোন ভাবেই প্রাকৃতিক ভাবে পরাগায়ন না হতে পারে। কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে এই ধরনের কাগজের ব্যাগকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।


পরাগায়ন :  প্রত্যেক সবজির পরাগায়নের সময় নির্দিষ্ট এবং এই সময়কাল ২-৩ ঘণ্টা হয়ে থাকে। ঐ নির্দিষ্ট সময়ে মধ্যে পরাগায়ন না হলে ফল সেট হয় না। যেমন- মিষ্টিকুমড়ার ক্ষেত্রে সকাল ৬ টা হতে সকাল ৯.৩০ পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী সময়। এর আগে বা পরে পরাগধানী ও পরারেণু কার্যকর অবস্থায় থাকে না। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (টমেটো ও বেগুনের ক্ষেত্রে (সকাল ৮.৩০ হতে ১০.৩০ পর্যন্ত) ফুটন্ত স্ত্রী ফুল যা পূর্বে পুংহীন করা হয়েছে, তার গর্ভমুণ্ডের উপর কাক্সিক্ষত পুরুষ লাইনের গাছ হতে পুংরেণু (pollen) সংগ্রহ করে তা ভালোভাবে লাগিয়ে দিতে হবে। এরপর বেগুনের ক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রী ফুলটিকে পূর্বে উল্লেখিত বিশেষ ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দিতে হবে কিন্তু টমেটোর ক্ষেত্রে তার প্রয়োজন হয় না। কুমড়াজাতীয় সবজির ক্ষেত্রে, পরাগায়নের পূর্বের দিন ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা স্ত্রী ফুলটিকে নির্দিষ্ট সময়ে খুলে কাক্ষিত পুরুষ লাইন হতে পুরুষ ফুলটিকে ছিঁড়ে পাপড়িগুলোকে আলাদা করে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডের ওপর ভালোভাবে লাগিয়ে দিতে হবে এবং স্ত্রী ফুলটিকে পুনরায় ঢেকে দিতে হবে। এক্ষেত্রে একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ২-৩টি স্ত্রী ফুলকে পরাগায়ন করা যায়। ফুল ঢাকার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, তা হলো ফুল ঢাকার পর ফুলের ভেতর যাতে কোন পিঁপড়া বা অন্য কোন পোকা প্রবেশ করতে না পারে। কাক্সিক্ষত সংকর (হাইব্রিড) ফল সেট হওয়ার ৩-৪ দিন পর ব্যাগ অপসারণ করে দিতে হবে। সংকরায়িত ফলে অবশ্যই বিভিন্ন তথ্য সম্বলিত একটি ট্যাগ ঝুলিয়ে দিতে হবে। ট্যাগের মধ্যে পরাগায়নের তারিখ ও প্রজনক দ্বয়ের নাম অবশ্যই লিখে রাখতে হয়।


বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ : বীজ পরিপক্ব হলে প্রতি গাছের বীজ আলাদা আলাদা ব্যাগে ট্যাগ সহকারে সংগ্রহ করা হয়। বীজ শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় যেন তা অন্যান্য বীজের সঙ্গে মিশে যেতে না পারে এবং পোকামাকড় কর্তৃক আক্রান্ত হতে না পারে।


 হাইব্রিড বীজের ব্যবহার :  উপরোক্তভাবে উৎপাদিত সংকর (হাইব্রিড) বীজকে শুধুমাত্র একবারেই  ব্যবহার করা যাবে। কোনভাবেই পরবর্তী বছর তা থেকে বীজ রাখা যাবে না এবং খাবারের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।


দিন দিন আমাদের দেশে হাইব্রিড সবজি চাষাবাদ বাড়ছে। আমাদের দেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে সবজি উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়াতে  হবে। আর এক্ষেত্রে অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে সবজিতে শতভাগ হাইব্রিড বীজের ব্যবহার। হাইব্রিড বীজকে কৃষকের মাঝে জনপ্রিয় করতে হবে এবং সেই সাথে হাইব্রিড সবজি বীজের প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি ভ্রান্তধারণা প্রচলিত আছে যে হাইব্রিড সবজির স্বাদ দেশি সবজির মতো হয় না। এ ধারণা সঠিক নয়। হাইব্রিড সবজির স্বাদ নির্ভর করে প্রজনক দ্বয়ের স্বাদের ওপর এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ওপর। মাত্রাঅতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারের কারণে সবজির স্বাদে কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওয়াতাধীন বিএডিসি ‘বিএডিসির সবজি বীজ বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে হাইব্রিড সবজি বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আশা করা যায় এই প্রকল্পের গবেষণা প্রান্তিক পর্যায়ে হাইব্রিড সবজি বীজের স্বল্পমূলে প্রাপ্যতা নিশ্চিত হবে এবং দেশে সবজি চাহিদাপূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

 

ড. বাহাউদ্দিন আহমদ       

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সবজি বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র বিএআরআই, জয়দেবপুর, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৫৫৬৩৬৩৯০১, ই-মেইল : bahauddinmed57@yahoo.com

বিস্তারিত
নিরাপদ সবজি চাষে বাংলাদেশ উত্তম কৃষিচর্চা ও শহরকৃষি

আধুনিক কৃষির এক প্রত্যাশিত লাভজনক ও নিরাপদ ফসল উৎপাদনের অনন্য বিষয় নগর কৃষি। নিরাপদ চাষ দিকটি সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিলে অবধারিতভাবে চলে আসবে বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা অর্থাৎ ইধহমষধফবংয এঅচ এর বাস্তবায়নের বিষয়টি।


বাংলাদেশের সর্বত্র এখন দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি বিশ্বের দূষিত শহরের শীর্ষে রয়েছে রাজধানী। তাই এই প্রভাব মোকাবিলায় সবুজ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। শহরে সবুজ বাড়ানোর কারিগরদের মধ্যে নিঃশব্দে যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের সর্বাগ্রে রয়েছে ছাদ-বাগানি। যাদের মধ্যে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগই রয়েছেন গৃহিণী কিংবা মহিলা যাদের বলা হয় সবুজ আর্মি (এৎববহ ধৎসু)। পরিকল্পিত ও মডেল ছাদ-বাগান কখনই ছাদ-কিংবা পরিবেশ নষ্ট করে না বরং ছাদ ঠাণ্ডা ও পরিবেশবান্ধব ভাবেই শহরকে রক্ষা করবে এবং বায়ুদূষণ কমানোর লক্ষণীয় রক্ষাকবচ। ঢাকা শহরে কমপক্ষে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ছাদ রয়েছে (সাড়ে চার হাজার হেক্টরের বেশি) যা  দেশের কোন একটি উপজেলার সমান বা বেশি। বিল্ডিং কোডে ২০% সবুজ থাকার কথা থাকলেও মানার বিষয়টি আশাব্যঞ্জক নয়। নগরে সবুজের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু এর সাথে সাথে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। নগরে জলবায়ু পরিবর্তনের  সাথে খাপখাওয়াতে সক্ষম সবজি চাষের জন্য ছাদ-বাগানসহ নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল নগরে টেকসই ও জনপ্রিয় করতে হবে।


বাংলাদেশ-উত্তম কৃষি চর্চা (ইধহমষধফবংয এঅচ) : বিশ্ব উত্তম   কৃষি চর্চা (এষড়নধষ এঅচ) সারা প্রথিবীতে নিরাপদ কৃষি পণ্য  উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়টি কঠোরভাবে অনুসরণ করে এবং ইহা সবার নিকট গ্রহণযোগ্যও বটে। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশেও রয়েছে নিরাপদ খাদ্যমান নিশ্চিতকরণের নিজস্ব উত্তম কৃষি চর্চা। নিরাপদ খাদ্যমান নিশ্চিতকরণে কিছু জনপ্রিয় সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ যেমন- হেচাপ, আইএসও যা গুদাম সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণকে নিরাপদতা প্রদান করে। এ সকল নিরাপদ মানদণ্ড নিশ্চিতে বিশেষ করে ফসল মাঠে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ কৃষি পণ্য উৎপাদনের সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য  প্রতিষ্ঠান বা পদ্ধতিই হলো বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা (ইধহমষধফবংয এঅচ)। বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা (ইধহমষধফবংয এঅচ) এর বেশ কয়েকটি ধারা বা পর্যায় রয়েছে-


*উত্তম কৃষি চর্চা মানদণ্ড (চঅজঞ ও- এঅচ ংঃধহফধৎফং);
*বাংলাদেশে উত্তম কৃষি চর্চা বাস্তবায়ন কাঠামো (চঅজঞ ওও ঝঃৎঁপঃঁৎব ভড়ৎ রসঢ়ষবসবহঃরহম এঅচ রহ ইধহমষধফবংয) [ধারা-১: স্কিম মালিকের জন্য নীতিমালা প্রতিষ্ঠাকরণ (ঝঊঈঞওঙঘ ১. এঁরফধহপব ভড়ৎ ঊংঃধনষরংযরহম ধ ঝপযবসব ঙহিবৎ); ধারা-২: চালনা কাঠামো (ঝঊঈঞওঙঘ ২.এড়াবৎহরহম ঝঃৎঁপঃঁৎব)


*উত্তম কৃষি চর্চা সার্টিফিকেট প্রদান (চঅজঞ ওওও  ঈবৎঃরভরপধঃরড়হ ড়ভ এঅচ ) যার অর্ন্তগত [ধারা-১-সার্টিফিকেট প্রদান বৈশিষ্ট্য (ঝবপঃরড়হ ১. ঈবৎঃরভরপধঃরড়হ ঈৎরঃবৎরধ); ধারা-২-সার্টিফিকেট পাওয়ার নিয়মাবলি; (ঝবপঃরড়হ ২. ঈবৎঃরভরপধঃরড়হ চৎড়পবংং); ধারা-৩-সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কমিটি (ঝবপঃরড়হ ৩. জবয়ঁরৎবসবহঃং ভড়ৎ ঈবৎঃরভরপধঃরড়হ ইড়ফরবং); ধারা-৪-নিরাপদতার নিশ্চয়তা চিহ্ন ব্যবহারের নিয়মাবলি (ঝবপঃরড়হ ৪. জঁষবং ভড়ৎ টংব ড়ভ ঈবৎঃরভরপধঃরড়হ গধৎশ)]
সবজি ও ফল এর স্থানীয় বা এলাকাভিত্তিক উত্তম কৃষি চর্চা স্কিম ২০১৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বিশ্ব খাদ্য সংস্থার আর্থিক সহায়তায় ইধহমষধফবংয এঅচ বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ চাষাবাদ ম্যানুয়াল কৃষি সেক্টরের প্রায় সকল অভিজ্ঞ কৃষিবিষয়ক ব্যক্তিবর্গ মিলে তৈরি করেন। বাংলাদেশ গ্যাপ নিয়ে প্রমোশন করতে গিয়ে দেখেছি, মাঠ হতে সংরক্ষণাগার পর্যন্ত নিরাপদতা সবচেয়ে বেশি দরকার কারণ উৎপাদন নিরাপদ না হলে পরে যতই চেষ্টা করি না কেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন টেকসই করা কখনই সম্ভব নয়। ইধহমষধফবংয এঅচ প্রযুক্তিটি বর্তমানে খুবই কার্যকর। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর উত্তম কৃষি চর্চা মানদণ্ড- খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্যের গুণাগুণ, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, বাগানি বা কৃষক এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং প্রত্যেকের জন্য আলাদা বা গুচ্ছভাবে ওয়েলফেয়ার মডিউল বাস্তবায়ন মডিউল নিয়ে করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও গুণাগুণ এর গুরুত্ব বিবেচনা করে ৩টি   ক্যাটাগরি যেমন- সংকটাপূর্ণ (ঈৎরঃরপধষ), মুখ্য (গধলড়ৎ), গৌণ (গরহড়ৎ) এ ভাগ করা হয়েছে। এখানে সংকটাপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সেসব বৈশিষ্ট্য ফসলের/ফল নিরাপত্তার পূর্বশর্ত মেনে না চলার কারণে খাদ্য নিরাপত্তা বিনষ্ট হবে। এ শর্ত শতকরা ১০০ ভাগ মেনে চলতে হবে। মুখ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ মেনে ফসল/ফল উৎপাদন বাধ্যতামূলক এবং গৌণ বৈশিষ্ট্যসমূহ মেনে ফসল/ফল উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ফসল/ফল  এর ধরন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়।


খাদ্য নিরাপত্তা মডিউল মধ্যে ফসল/ফল উৎপাদনের সকল লক্ষণীয় বিষয় যেমন- ফল-ফসল উৎপাদন এলাকার ইতিহাস ও ব্যবস্থাপনা (ঝরঃব যরংঃড়ৎু ধহফ সধহধমবসবহঃ), রোপণ বা বপনযোগ্য বীজ বা প্রজনন উপাদান (চষধহঃরহম সধঃবৎরধষং), এগঙ, সার ও মাটি অনুষঙ্গ (ঋবৎঃরষরুবৎং ধহফ ংড়রষ ধফফরঃরাবং), সেচ-পানি (ওৎৎরমধঃরড়হ ডধঃবৎ), রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার (ঈযবসরপধষং), ফসল সংগ্রহ ও হ্যান্ডলিং পদ্ধতি (যধৎাবংঃরহম ধহফ যধহফষরহম ঢ়ৎড়পবফঁৎব), প্রশিক্ষণ (ঞৎধরহরহম), ফল-ফসল অনুসরণযোগ্যতা এবং পণ্যপ্রত্যাহার (ঞৎধপবধনরষরঃু ধহফ ৎবপধষষ), কাগজ ও নথিপত্র সংরক্ষণ (ফড়পঁসবহঃং ধহফ ৎবপড়ৎফং), অনুশীলন পর্যালোচনা (ৎবারবি ড়ভ ঢ়ৎধপঃরপবং) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যান্য মডিউলে    প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী পরিত্যক্ত উপকরণ ব্যবস্থাপনা (ডধংঃব সধহধমবসবহঃ), শক্তির দক্ষতা (ঊহবৎমু বভভরপরবহপু), জীব বৈচিত্র্যতা (নরড়ফরাবৎংরঃু), বায়ু ও শব্দদূষণ (অরৎ/হড়রংব) সকল কৃষি সংশ্লিষ্ট নিয়ামকসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে।


উদাহরণস্বরূপ : নিরাপদ ফসল উৎপাদনের প্রধান উপকরণ বীজ বা রোপণ/বপন উপাদান যে কোন রোগ-পোকামাকড় আক্রান্ত চিহ্ন মুক্ত থাকতে হবে। সঠিক ও সার্টিফিকেটধারী নার্সারি (সরকারি/বেসরকারি/কৃষি প্রতিষ্ঠান/স্বীকৃত টিস্যু কালচার ল্যাব হতে সংগৃহীত) ভালো গুণাগুণ সম্পন্ন রুট স্টক এবং সায়ন সংগ্রহ করতে হবে। এই নিয়ামকটি মুখ্য বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ ইহার স্কোর হবে ৯০% যা অবশ্যই পালন বাধ্যতামূলক কোন উৎপাদক নিরাপদ ফল-ফসল উৎপাদনের শর্তপূরণের একটি শর্তপূরণ করলেন বলে লিপিবদ্ধ করা হবে। এভাবে প্রত্যেকটি মডিউলে উল্লেখিত নিয়াবলি পালন করে একজন উৎপাদক বাংলাদেশ সরকারের নিরাপদ ফল-ফসল উৎপাদনের সার্টিফিকেট ও মানদণ্ড চিহ্ন ব্যবহারের অনুমতি পাবেন। উৎপাদকের মাঠে সরকারিভাবে চিহ্নিত এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন অডিটর বা সরকার কর্তৃক নির্বাচিত ৩য় কোন অডিটর পর্যায়ক্রমে সকল ধাপ পরীক্ষা, পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করে তার ভুলত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে নিরাপদ  ফল-ফসল উৎপাদনে উৎপাদককে উৎসাহিত করবেন। যদিও এখন পর্যন্ত  ইধহমষধফবংয এঅচ ভধৎস ধংংঁৎবৎ ড়ৎ ধঁফরঃড়ৎ ংবষবপঃরড়হ এবং  ধপপৎবফরঃধঃরড়হ নড়ধৎফ, পবৎঃরভরপধঃরড়হ নড়ধৎফ ইত্যাদি গঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে । মনে রাখতে হবে ওঝঙ, ঐঅঈঈচ,  ইঝঞও এসকল প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত ফল-ফসল, উপাদান বা গুদাম থেকে বাজারজাতকরণ সার্টিফিকেট প্রদান করে কিন্তু বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা বা বাংলাদেশ গ্যাপ (ইধহমষধফবংয এঅচ) কৃষক, বাগানি বা উৎপাদককে মাঠে নিরাপদ ফলসবজি চাষে উৎপাদনকারীকে উৎসাহিত ও সার্টিফিকেট প্রদানে একমাত্র প্রতিষ্ঠান হবে, যা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের সাথে যুগপৎভাবে কাজ করতে সক্ষম।


ইধহমষধফবংয এঅচ ও নিরাপদ সবজি চাষে প্রথম সাহসী পদক্ষেপ- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নরসিংদীর একটি উপজেলায় পরিবেশবান্ধব সবজি ও ফসল উৎপাদন প্রকল্পের আওতায় ৫০০ জন কৃষক নিয়ে নিরাপদ সবজি চাষে ইধহমষধফবংয এঅচ এর ব্যবহার শুরু করেছে। যেখানে  কৃষককে বা উৎপাদককে নির্দিষ্ট ফসলের জন্য নিরাপত্তা সার্টিফিকেট নিতে হবে যেমন- গ্যাপ টমেটো, গ্যাপ লাউ, গ্যাপ বেগুন ইত্যাদি।


নিরাপত্তা ও আধুনিক সবজি চাষ : একবিংশ শতাব্দীতে আরো দ্রুত নগরায়ণের এবং জনসংখ্যা ২০৫০ সালে ৮.৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। নির্দিষ্ট  কৃষি জমি ফলে বাণিজ্যিক ভার্টিক্যাল চাষাবাদ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই, যা অবশ্যই নগর কৃষির অন্তর্গত। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী সুউচ্চ ৩০ তলা ভবনে ২৭,৮০০০,০০০ বর্গমিটার ভার্টিক্যাল ফার্ম স্থাপন করা যায়, যা দিয়ে ৫০,০০০ মানুষকে খাওয়ানো যাবে যেখান থেকে প্রত্যেক জনকে ২০০০ ক্যালরি প্রতিদিন দেয়া সম্ভব। সুতরাং, ভবিষ্যতের জন্য একমাত্র মাধ্যম হবে নগর ভার্টিক্যাল কৃষি ফার্ম।


বাণিজ্যিক নগর কৃষি আরো টেকসই করা সম্ভব কারণ এত সেচের পানির অপচয় ৪০-৬০% কমিয়ে এনে ৩-৪ গুণ ফলন বাড়ানো যায় যেখানে হাইড্রোপনিক্যালি পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ পানিকে অটোমেটিক এবং জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত বিল্ডিংয়ে সংরক্ষণ করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। যদিও আধুনিক এই প্রযুক্তির ইনডোর ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ে খঊউ ষরমযঃ, ধৎঃরভরপরধষ রহঃবষষরমবহপব (অও), স্বয়ংক্রিয় ড্রিপ সেচ ব্যবহারের কারণে এককালীন খরচ বেশি মনে হলেও তা কিন্তু ক্যাপিটাল খরচ অর্থাৎ প্রথম বছরই এই খরচ হবে, এর পরের বছর থেকে কমপক্ষে ৫-১০ বছর তা ব্যবহার করা যায় এবং উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন থাকে বিধায় লোকসান নেই এবং সকল স্থাপনা ও প্রযুক্তি স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি করা যায়। বাণিজ্যিক নগর ভার্টিক্যাল ডিভাইস, গ্রিনহাউস হাইড্রোপনিক, একুয়াপনিক্স, ছাড়াও স্মার্ট ফার্মিং ডিভাইস, স্বয়ংক্রিয় সেচসমৃদ্ধ ভার্টিক্যাল লাইন ডিভাইস, স্বয়ংক্রিয়  ছাদ-বাগান ঠাণ্ডাকরণ ডিভাইস ইত্যাদি ব্যবহার করে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বিদেশি ব্রাসেলস স্প্রাউট, লেটুস, লাল টমেটো, কালো টমেটো, শসা, লালশাক, ডাঁটাশাক, ধনিয়াপাতা, ক্যাপসিকাম, চাইনিজ বাঁধাকপি, ছাড়াও সালাদ অনুসঙ্গ পুদিনা, সেলেরি, পিয়াজপাতা সবজি চাষাবাদ এখন আমাদের দেশেই সম্ভব ।


নিরাপদ সবজি চাষাবাদ ও রোগ-পোকামাকড় দমন : বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা মডিউলে রাসায়নিক সার ও মাটিতে সংযোজিত অন্যান্য বস্তু ব্যবহার করার সময় বাগানি বা কৃষককে মাটি জীবাণুমুক্ত করা, ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টি সংকটপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবজি চাষের ক্ষেত্রে মাটি শোধনের পাশাপাশি গ্রোয়িং মিডিয়ার গুণাগুণ ও স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে। ভার্মি কম্পোস্ট, রান্নাঘর ও খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে বানানো সার, চা-কম্পোস্ট, ডিম খোসা ভাঙা মিশানো, নতুন মাশরুম কম্পোস্ট (পটাশ ও   ফসফরাস আধিক্য), নিম খৈল, সরিষা খৈল, ইত্যাদি ছাড়াও যে কোন বায়োলজিক্যাল কম্পোস্ট উৎস সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে ব্যবহার করতে হবে। রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বোতলের গায়ের নিয়মাবলি কঠোরভাবে পালন করতে হবে। নিয়ম মেনে রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহার করতে হবে। বালাইনাশক ব্যবহারের পর পাতা ও ফল-জাতীয় সবজি আহরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করতে হবে। পোকা দমনে ফ্লাইং ইনসেক্টের জন্য ফেরোমন ট্রাপ, সোলার লাইট ট্রাপ, আঠালো ট্রাপ, পেয়াজ পাতার ও ছোলা পেস্ট বা নির্যাস, রসুনের, গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার (সর্বাধিক কার্যকরী-ফুলের দোকানে ফেলে দেয়া ফুল সংগ্রহ) ফুলের নির্যাস ভালো কাজ করবে।


গবেষণায় জানা যায়, ঢাকা শহরের ৭৬% ছাদ-বাগানি প্রশিক্ষণ নিতে চায়। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য নিকটস্থ’ কৃষি অফিস, হর্টিকালচার সেন্টার ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগসহ ফেসবুক গ্রুপগুলো পরামর্শ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করে। অনলাইন পোর্টাল করে, ফেসবুকে গ্রুপ করে ফসল/ফল সমস্যা সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান করা যেতে পারে। সম্প্রতি উঅঊ নগর কৃষি পাইলট প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় শুরুতে ঢাকা শহরে প্রায় ৬০০ ছাদ-বাগান টার্গেট করে কাজ শুরু করেছে।

 

ড. এ এইচ এম সোলায়মান

অধ্যাপক, উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭, মোবাইল : ০১৭১১০৫৪২১৫, ই-মেইল :  Solaimarsau@gmail.com

বিস্তারিত
নিরাপদ সবজি চাষে নারীর সফলতা

নারীর হাতে কৃষির গোড়াপত্তন। অনেক আগের কথা। আদিযুগের কৃষি ছিল প্রকৃতির ওপর নির্ভর। তখনকার মানুষেরা জীবিকার জন্য বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। পশু শিকার এবং ফলমূল সংগ্রহ করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। এগুলো করতেন পুরুষরা আর নারীরা সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি ফলের বীজ মাটিতে পুঁতে রাখতেন। বীজ হতে গজানো চারা বড় হয়ে যখন ফলধারণ করত তখন তারা এ কাজে হতেন আরো উৎসাহিত। সে থেকেই কৃষিকাজে নারীর পথ চলা। অবিরাম চলছে বংশপরম্পরায়। পুরুষশাসিত সমাজে স্বীকৃতি না পেলেও কৃষিতে তাদের অবদান ঢের বেশি। বিশেষ করে সবজি চাষে।


দেশে প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ   কৃষক পরিবার আছে। তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় শাকসবজি চাষ হয়। এতে সম্পৃক্ত অধিকাংশই নারী। সবজি চাষে শুধু ক্ষুদ্র-প্রান্তিকরাই নয় বিলাসী নারীদেরও অবদান আছে। ছাদকৃষি এর উদাহরণ। বর্তমানে এর সম্প্রসারণ হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। যার উৎপাদিত ফসলের সিংহভাগ শাকসবজির দখলে থাকে। ছাদকৃষির যত্ন-আত্তি করে নারীরা সময় কাটান। এতে তাদের মানসিক প্রশান্তি আসে। পাশাপাশি সংগ্রহ করেন টাটকা এবং নিরাপদ ফসল। সবজি এবং নারীর সম্পৃক্ততা সারাদেশে বিরাজমান। তবে দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকার চিত্র অবাক করার মতো। ‘ধান নদী খাল’ এই তিনে বরিশাল। পানিবেষ্টিত এ অঞ্চল প্রাকৃতিক কারণে সবজি আবাদের পরিবেশ প্রতিকূল। তবুও থেমে নেই এখানকার নারীরা। বৈরী পরিবেশে করছেন চাষাবাদ। তাই তো মাঠে মাঠে সবজিতে ছড়াছড়ি। নিচু হওয়ায় ধান ছাড়া অন্য ফসল চাষে যেখানে অন্তরায়, সে জমিতে সর্জান পদ্ধতিতে বারোমাস সবজি আবাদ হচ্ছে। এমনও স্থান আছে পানির গভীরতার কারণে স্বাভাবিকভাবে ফসল উৎপাদনে অনুপযোগী। সে সব জায়গাও এখন চাষের আওতায়। এমন দু’টি উপজেলা হচ্ছে  ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের  নেছারাবাদ। ওখানের অধিকাংশ গ্রামের নারীরা পুরুষের সাথে কাজ করছেন সমানতালে। কিছু জায়গা আছে যেখানে বীজ বপন থেকে শুরু করে সার দেয়া, পরিচর্যা, রোগপোকা দমন, ফসল তোলা, বীজ সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এমনকি  বিপণনের কাজ নারী একাই করেন। স্বামী-স্ত্রী প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে মাঠে বেরিয়ে পড়েন। তখন চারদিকে তাকালে শুধু সবজি আর মানুষের সমারোহ। ঝালকাঠির প্রায় ৪০টি গ্রামের দৃশ্য এমনই।


এসব গ্রামের চাষিরা সর্জান পদ্ধতি চাষাবাদ করেন। সাধারণত বেডগুলো হয় ১০-১২ ফুট প্রস্থ। দুই বেডের মাঝখানে ৮-৯ ফুট বেড় বা নালা থাকে। তাদের ভাষায় পাইকা। দৈর্ঘ্যরে মাপ হয় জমি অনুযায়ী। নালার মাটি দিয়ে বেড এমনভাবে উঁচু করা হয়, যেন জোয়ার কিংবা বন্যার পানি প্লাবিত হতে না পারে। বেড বা কান্দিতে লাইন করে সবজির চারা রোপণ করা হয়। ‘বাতায়’ লাগানো হয় লতাজাতীয় সবজি। কান্দির দুইপাশের জায়গাকে স্থানীয় ভাষায় ‘বাতা’ বলে। নালার উপর থাকে মাঁচার ব্যবস্থা। তাদের ভাষায় ‘গুইররা’। নালার পচা মাটি বেডে লেপ্টে দেয়। তারা বলেন- লাতা দেওয়া। এতে জৈবসারের কাজ করে। সবজির গুণগতমান বজায় থাকে।


ডুমুরিয়া এবং ভিমরুলি গ্রামমিলে কৃষাণীর সংখ্যা ৪ শতাধিক। কথা হয় ডুমুরিয়ার নারীচাষি নমিতা মিস্ত্রি এবং রেখা মিস্ত্রির সাথে। তখন তারা মাঠের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। রেখা জানান, তিনি প্রায় ২৫ বছর যাবত সবজি চাষ করে আসছেন। দাম্পত্য জীবনের ৮ বছর আগ থেকে এ কাজে সম্পৃক্ত। তিনি সারা বছর শাকসবজি চাষ করেন। তার জমির পরিমাণ  প্রায় ৪ একর। পুরো অংশই সর্জান পদ্ধতি তৈরি। তার আবাদকৃত সবজির মধ্যে মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শালগম, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, ধনিয়া, শিম, করলা, কাঁকরোল, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, পেঁপে, গোলআলু, ঝিঙা, কচু, কাঁচকলা অন্যতম। সে সাথে আছে বারোমাসি মরিচ, মোম্বাই মরিচ এবং আখ।  তিনি প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেন। আর আখ বিক্রি করে পান ২ লাখ টাকা। মোট উৎপাদন খরচ ছিল মাত্র ২ লাখ টাকা। তার জমিতে কাজ করা শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। একই গ্রামের অসংখ্য কৃষাণীরা সবজি চাষে অভাবনীয় সফলতা ধরে রাখছেন। তাইতো কোনো অভাব নেই। তারা এখন বেশ সচ্ছল। ফসল সংগ্রহ করে তারা নৌকাযোগে ডুমুরিয়া বাজার নিয়ে যান। সেখান থেকে ভিমরুলী বাজার, আটঘর হাট, কুড়িয়ানা বাজার, ঝালকাঠি, রাজাপুর, বাউকাঠি হাট, শশীদহাট, কাউখালী, স্বরূপকাঠি বাজার, কড়িপাশা বাজারে চলে যায়।


এ অঞ্চলে সর্জান পদ্ধতির চাষাবাদ প্রায় দু’শত বছর পুরনো। যদিও শুরুতে পেয়ারা আবাদ হতো। কম সময় এবং বেশি লাভ হওয়ায় তারা এখন সবজি চাষের ঝুঁকে পড়েছেন। এখানে অধিকাংশ চাষি নারী। পুরুষের পাশাপাশি কাজ করার কারণে পরিবারের তাদের  গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চলমান আছে। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে তারা লাভবান হচ্ছেন।


সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নারী চাষিদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছেন। সময়মতো বীজ বপন, সুষমসার ব্যবহার, পরিচর্যা এবং রোগপোকা দমনের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বালাই ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তারা বিষটোপ, ফেরোমন ফাঁদসহ  জৈবিক ও যান্ত্রিক বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।  কীটনাশকের প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময়ের পর ফসল সংগ্রহ করা হয়। ফলে তাদের শাকসবজি থাকে নিরাপদ। তাই বাজারে এর  চাহিদা বেশি থাকে। দামও পান কাক্সিক্ষত।


বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মধ্য রাকুদিয়ার সফল চাষি রিতা ব্রহ্ম বলেন, বিয়ের পরে স্বামীর সংসারে এসে দেখেন অভাবের কমতি নেই। স্বামীর ছিল পানের বরজ। তাতে যৌথ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন চিন্তা করলেন স্বামীর পাশাপাশি তারও কিছু করার দরকার। প্রথমে বাড়ির পাশের মেহগনি গাছ কেটে সেখানে বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করেন। তাতে প্রায় ১০ হাজার টাকা লাভ হয়। উৎসাহিত হয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতায় সবজি চাষের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি সারাবছর সবজি চাষ করে আসছেন। এখন তিনি অন্য ফসল বাদে সবজি থেকে লাভ হয় প্রায় লাখ টাকা। সংসার এখন  সচ্ছলতায় ভরপুর হয়েছেন  প্রশিক্ষিত। একই গ্রামের তার মতো আরো অনেকে সবজি চাষ করেন। তাদের একটি কালেকশন পয়েন্ট আছে। সবার উৎপাদিত সবজি ওখানে আনা হয়। সেখান থেকে পাইকাররা কিনে নেয়। ঠকতে হয় না তাদের। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রে সভাপতির পদ। ইতোমধ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া ঘুরে এসেছেন। এ ছাড়া বিশ^ ব্যাংকের আহ্বানে আফ্রিকার দেশ সেনেগালে ভ্রমণের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তিনি মনে করেন, সবজি চাষের মাধ্যমেই তার ভাগ্যের পরির্বতন হয়েছে।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক সমীক্ষা মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মক্ষেত্রে নারীর অবদান বেড়েই চলছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি ৬৮ লাখ নারী কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতে কাজ করছেন। বর্তমানে জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশের বেশি। কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন প্রায় ৯০ লাখ ১১ হাজার। গত এক যুগে এদেশে কৃষির নারীকরণ হয়েছে। গত ১০ বছরে ফসল উৎপাদনে তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে প্রায় ১০৮ শতাংশ।


প্রান্তিক নারীদের উৎপাদিত সবজি ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয়    হাট-বাজারে। সেখান থেকে বন্দরে, রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের, এমনকি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে, বাংলাদেশর সবজি এবং ফল বিশে^র অর্ধশতাধিক দেশে রফতানি হয়ে থাকে। এসব দেশের মধ্যে  যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জামানি, সুইডেন, ইতালি, মালয়েশিয়া, নেপাল, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান অন্যতম।


অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। কিষানের পাশাপাশি কিষানিরাও  মূল চালিকাশক্তি। তাই তাদের উৎসাহিত করা দরকার। সে সাথে মর্যাদা এবং সহযোগিতার প্রয়োজন। কাজের স্বীকৃতি ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে সবজিসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদে তারা আরো আগ্রহী হবেন। ফলে উৎপাদনে আসবে  ঈর্ষনীয় সফলতা। সংসারে আসবে স্বচ্ছলতা। নিজেদের হবে জীবনমানের উন্নয়ন। বাড়বে নারীর ক্ষমতায়ন। দেশ হবে খাদ্যে উদ্বৃত্ত। আরো সম্পদশালী।


 নাহিদ বিন রফিক

টেকনিক্যাল পার্টিসিপেন্ট, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বরিশাল; মোবাইল নম্বর: ০১৭১৫৪৫২০২৬; ই. মেইল:tpnahid@gmail.com

 

বিস্তারিত
নিরাপদ সবজিসহ ফসল উৎপাদনে চরাঞ্চল

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। আবহমানকাল হতে অসংখ্য নদনদী এ দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহমান। চলমান নদনদীর কোলজুড়ে রয়েছে অসংখ্য চর। ধারণা করা হয় বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর চর এলাকা রয়েছে। এসব চর এলাকায় প্রচুর সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে চরের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের উন্নয়নে চর এলাকাগুলোর অবদান বহুলাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।


চর এলাকায় কৃষি উন্নয়নের অন্তরায়
চর এলাকার মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের স্বল্পতা বিশেষ করে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, সালফার, বোরন এবং জিংক। অন্যান্য পুষ্টি উপাদানেরও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তবে বিশেষ করে নাইট্রোজেন এবং জিংকের অবস্থা বেশি শোচনীয়। ভূমির বন্ধুরতা ও মাটির প্রকৃতি উত্তম সেচ ব্যবস্থাপনার জন্য সহায়ক নয়। বেলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধার অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। চর এলাকায় চাষিদের মধ্যে রোগবালাই প্রতিরোধে উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত ও ফসল উৎপাদন এবং সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব বা অপ্রতুলতা রয়েছে। আধুনিক ও উচ্চফলনশীল জাতের মানসম্মত বীজের অভাব কৃষি উৎপাদনের অন্যতম অন্তরক। কৃষি তথ্য সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সঠিক সময়ে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ ও কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণের সুফল চরবাসী পায় না। ফলে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে বহুকষ্টে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম থেকে তারা বঞ্চিত হয় বলে পরবর্তীতে ওই ফসল চাষে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের এ চরাঞ্চলে আনতে পারে নতুন সম্ভাবনাময় কৃষি।


চর এলাকায় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে করণীয় : চর এলাকার মাটি, আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিবেশের সাথে মানানসই ফসল ধারা প্রবর্তন করতে হবে। মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে চর এলাকার জন্য প্রয়োজনে আলাদা সার সুপারিশমালা প্রণয়ন করতে হবে।  অধিক উৎপাদনশীলতার জন্য চরে প্রত্যেক ফসলের ক্ষেত্রে মুখ্য ও গৌণ সারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। চর এলাকায় চাষের উপযোগী খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু অধিক পুষ্টিমানসমৃদ্ধ (Bio-fortified) ও স্বল্পকালীন জাতের প্রবর্তন জরুরি। স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের প্রবর্তন এবং সম্প্রসারণ করতে হবে। ভালো বীজের সংস্থান নিশ্চিত করাও দরকার। চর জেগে ওঠার সাথে সাথে যেহেতু কৃষিকাজ শুরু হয়ে যায়, কাজেই সময়মতো পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জমি তৈরি, শস্য বপন, ফসল পরিচর্যা, শস্য কর্তন ও কর্তন পরবর্তী শস্য ব্যবস্থাপনায়  আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির প্রয়োগ বাড়াতে হবে। মিশ্র ফসল, আন্তঃফসল ও রিলে ফসল প্রবর্তনের মাধ্যমে শস্য বহুমুখীকরণ ও প্রচলিত পদ্ধতির উন্নয়ন করতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক ও সমন্বিত কৃষি প্রযুক্তি প্রবর্তনের মাধ্যমে বিদ্যমান কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর পাশাপাশি সমন্বিত শস্য ও বালাই ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন ও প্রায়োগিক সুফল বিষয়ক জ্ঞানের বিস্তার দরকার। রোগবালাই, বন্যা, খরা ও তাপসহিষ্ণু জাত নির্বাচন করতে হবে। উন্নত জাত, বিকল্প ফসল ধারার প্রবর্তন ও শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে তিন বা চার ফসলভিত্তিক শস্য বিন্যাস প্রবর্তন করে উৎপাদনশীলতা চরাঞ্চলে সহজেই বাড়ানো সম্ভব।


চর ও সমতলের কৃষির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যেহেতু চরগুলো ডুবে বা নিমজ্জিত থাকে, তাই এসব চরের বেশিরভাগ এলাকায় কোনো ফসল থাকে না। কাজেই বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে সেখানে চাষবাস শুরু হয়। এ জন্য কৃষকের সুবিধার্থে চরসংশ্লি­ষ্ট এলাকার বাজারগুলোতে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ যেমন- বীজ, সার, বালাইনাশক প্রভৃতির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। বাজার সংশ্লি­ষ্ট এলাকায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ফসল সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে ভ্যালু চেন তৈরির মাধ্যমে কৃষকেরা যাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে।


প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চর এলাকার কৃষকের মাঝে আধুনিক জাত ও উৎপাদন কলাকৌশল বিষয়ক কারিগরি জ্ঞানের প্রসার খুব বেশি প্রয়োজন। চর এলাকার পতিত জায়গাগুলোর  সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে চর এলাকায় প্রচলিত শস্যবিন্যাসে বিদ্যমান পতিত স্থানগুলো স্বল্পকালীন অথবা প্রতিকূল পরিবেশে হয় এমন ফসল দ্বারা উৎপাদনের আওতায় আনা দরকার। যেমন-বোরো ধান-পতিত ফসল ধারায় রোপা আমন অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, ভুট্টা- পতিত ফসল ধারার পরিবর্তে ভুট্টা/লালশাক/ডাঁটা, বাদাম-পতিত ফসল ধারার পরিবর্তে বাদাম/মসুর-তিল অথবা বাদাম-তিল/পাট অথবা বাদাম-রোপা আমন, মিষ্টিকুমড়া-পতিত ফসল ধারার পরিবর্তে মিষ্টি কুমড়া/করলা-রোপা আমন ফসল ধারার প্রবর্তন করা যেতে পারে। বর্ষা মৌসুমে অধিকাংশ চর এলাকা নিমজ্জিত থাকে বলে ওই সময়ে শস্য বহুমুখীকরণের সুযোগ সীমিত। কিন্তু বর্ষার পানি যখন ধীরে ধীরে নেমে যেতে থাকে তখন চরগুলো জেগে ওঠা শুরু করে। শুকনো মৌসুমে সেখানে শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। মিশ্র চাষ, আন্তঃফসল চাষ ও রিলে পদ্ধতি ব্যবহার করে শস্য নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পেঁয়াজের সাথে বাদাম অথবা কালোজিরার মিশ্রচাষ, পেঁয়াজের সাথে রিলে ফসল হিসেবে কাউন, বাদাম ও মসুরের মিশ্র চাষ, পাট ও ভুট্টা, আলুর সাথে রিলে করলা ও ভুট্টা, ভুট্টার সাথে রিলে ফসল হিসেবে ডাঁটা, লালশাক, নাপাশাক, ধনিয়া, পাট প্রভৃতি, বেগুন, মরিচ ও ধনিয়ার মিশ্র চাষ, আখের সাথে আন্তঃফসল হিসেবে মিষ্টি আলু, লালশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পাটশাক প্রভৃতি চাষ করে চর এলাকায় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের অতিরিক্ত আয় করার বিশাল সুযোগ রয়েছে। এছাড়া সাথী ফসল বিক্রি করে সংসারের খরচ পূরণের পাশাপাশি মূল ফসলের উৎপাদন খরচ মেটানো যায় ফলে সংসারের অতিরিক্ত খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়।


নানা ধরনের প্রতিকূলতা নিয়েই চরের জীবন। এখানে একদিকে যেমন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তেমনি অফুরন্ত সম্ভাবনাও বিরাজমান। সম্ভাবনাগুলোকে খুঁজে বের করে কাজে লাগাতে হবে। চর এলাকার উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। চরের সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে চলার উপায়সমূহ নির্ধারণ, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে চরের স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সঠিক পরিকল্পনা।

মোঃ আমিনুল ইসলাম

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সগবি, বারি, গাইবান্ধা, মোবাইল ঃ ০১৮৪৭১৫৫১৪২, মেইল : amin.agron@gmail.com

 

বিস্তারিত
বসতবাড়িতে নিরাপদ সবজি ও ফল চাষ মডেল

নিরাপদ খাদ্যকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশ কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, দূষণকারী বস্তু, অণুজীব, রোগ ও পোকা ইত্যাদির পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করছে। বিধায় আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অপরিকল্পিতভাবে নানা গাছ গাছড়া দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। এতে করে বাড়িতে তেমন আলো বাতাস পড়ে না কোথাও কোথাও ফাঁকা পতিত পড়ে আছে যেখানটা সহজেই আবাদের আওতায় আনা যায়। এতে করে আমাদের বসতবাড়ির উৎপাদন ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। এই অসুবিধা দূর করে বসতবাড়ির বিভিন্ন স্থানসমূহের সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সহজেই উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। বসতবাড়ির বিভিন্ন অব্যবহৃত স্থানসমূহের ব্যবহার পরিকল্পনায় পরিকল্পিতভাবে কোন স্থানে কী কী সবজি ও ফল আবাদ করা সম্ভব সেগুলো চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন।


বসতবাড়ির কোন স্থানে কোন সবজি ও ফল চাষ করা যায় তার বিবরণ
রৌদ্রজ্জ্বল স্থান/ খোলা জায়গা : বিভিন্ন প্রকার পাতা জাতীয় সবজি পুঁইশাক, লালশাক, পালংশাক, কলমিশাক, বাটিশাক, বেগুন, টমেটো  ইত্যাদির বেড করে আবাদ করা সম্ভব।
ছায়াযুক্ত/অর্ধছায়াযুক্ত স্থান/ মাচার নিচে : আদা, হলুদ, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি।
স্যাঁতসেঁতে স্থান : বিভিন্ন প্রকার কচু।
মাচায়/পুকুর পাড়ে মাচায় : বিভিন্ন প্রকার কুমড়াজাতীয় সবজি,  পুঁইশাক, শিম, বরবটি ইত্যাদি।
ঘরের চালে : চালকুমড়া,  মিষ্টি কুমড়া, লাউ, দেশি শিম,  পুঁইশাক ইত্যাদি।
বেড়া/প্রাচীর : কুমড়া জাতীয় সবজি, পুঁইশাক, শিম, বরবটি ইত্যাদি।
ঘরের পীড়ায় : পেয়ারা, ডালিম, সজিনা, পেঁপে, বেগুন, বারোমাসি মরিচ, মানকচু, ফেনকচু, দুধকচু ইত্যাদি।
বাড়ির সীমানায় : সজিনা, পেঁপে ইত্যাদি।
গর্তে নিচু জায়গায় : পানিকচু, হেলেঞ্চা ইত্যাদি।
অফলা গাছে : মেটে আলু, মৌসুমি, ছুই, ধুন্ধল, গাছ আলু ইত্যাদি।
পতিত জায়গা : লেবু, কুল ইত্যাদি।
পুকুর পাড়ে : লেবু, পেয়ারা ইত্যাদি।
এতে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি ও ফল পাওয়াসহ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। উত্তম কৃষি পদ্ধতি সামগ্রিক কৃষি কার্যক্রম যা অনুসরণে নিরাপদ এবং মানসম্পন্ন খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত কৃষিজাত পণ্য সহজলভ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং সমাজ সুসংহত হবে। য়

 

ড. জগৎ চাঁদ মালাকার

উপপরিচালক(এল.আর.), ডিএই, মোবাইল : ০১৭১৬০০৪৪০০, ই-মেইল : Jagot_mala @yahoo.com

 

 

বিস্তারিত
ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন

মিঠা পানির জলাশয়ে যে মাছগুলো পাওয়া যায় তাদের মধ্যে ট্যাংরা অন্যতম। মাছটি খুবই সুস্বাদু, মানব দেহের জন্য উপকারী অণুপুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ এবং কাটা কম বিধায় সবার নিকট প্রিয়। এক সময় অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত কিন্তু শস্য ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা, বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় এ মাছের প্রাচুর্যতা ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। এমতাবস্থায় প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এবং চাষের জন্য পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ট্যাংরার কৃত্রিম প্রজনন, নার্সারি ব্যবস্থাপনা ও চাষের কলাকৌশল উদ্ভাবন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রজাতিটির সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্বাদুপানি উপকেন্দ্র, সৈয়দপুরে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মাছটির কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও পোনা প্রতিপালন কলাকৌশল উদ্ভাবনে সফলতা লাভ করেছেন।


খরাপ্রবণ রংপুর অঞ্চলে বেশির ভাগ জলাশয়ে ৫-৬ মাস পানি থাকে এবং এ অঞ্চলে মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি রয়েছে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ট্যাংরা পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে মৌসুমি জলাশয়ে চাষের আওতায় অন্যান্য মাছের বিকল্প হিসেবে মজুদ করতে পারলে এ অঞ্চলে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে।


ট্যাংরা মাছের বৈশিষ্ট্য
অর্থনৈতিক, সুস্বাদু ও পুষ্টিমান বিবেচনায় ট্যাংরা মাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
নিম্নে এই মাছের বৈশিষ্ট্য দেয়া হলো :
* হ্যাচারি ও পুকুর মালিকদের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
মিানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় আমিষ ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বিদ্যমান থাকে।
* ছোট এবং মৌসুমি জলাশয়ে সহজ ব্যবস্থাপনায় চাষ করা যায়।
* খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ক্রেতারা বড় মাছের তুলনায় এই মাছগুলো বেশি পছন্দ করে।
* বাজারে প্রচুর চাহিদা ও সরবরাহ কম থাকায় এর মূল্য অন্যান্য মাছের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি।
ট্যাংরা মাছের ব্রুড প্রতিপালন, কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন :
ট্যাংরা  মাছের ব্রুড প্রতিপালন, কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন কৌশলের জন্য নিম্নের পদ্ধতিসমূহ অনুসরণ করতে হয়:
পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি
ব্রুড প্রতিপালন পুকুরের আয়তন ৮-১০ শতাংশ ও গড় গভীরতা ১.০ মিটার রাখা হয়।
ব্রুড মাছ ছাড়ার আগে পুকুর শুকিয়ে প্রথমে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগের ৫ দিন পর শতাংশে ইউরিয়া ১০০ গ্রাম, টিএসপি ৭৫ গ্রাম ও গোবর ৪ কেজি ব্যবহার করা হয়।
ব্রুড প্রতিপালন পুকুরের চারপাশে জালের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা দিতে হবে।
ট্যাংরা মাছের ব্রুড মজুদ
বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ট্যাংরা মাছের    প্রজননকাল হিসেবে স্বীকৃত। প্রজনন মৌসুমের পূর্বেই অর্থাৎ জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারি মাসে  প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত ৮-১০ গ্রাম ওজনের ট্যাংরা মাছ সংগ্রহ করার পর প্রস্তুতকৃত পুকুরে প্রতি শতাংশে ৮০-১০০টি ট্যাংরা মজুদ করে কৃত্রিম প্রজননের জন্য ব্রুড তৈরি করা হয়।
খাদ্য প্রয়োগ ও পরিচর্যা
ব্রুড মাছের পরিপক্বতার জন্য প্রতিদিন দুই বার করে খাবার হিসেবে চালের কুঁড়া ২৫% ফিসমিল ৩০%, সরিষার খৈল ২০%,মিট এন্ড বোনমিল ২৫% হারে মিশিয়ে প্রয়োগ করা হয়। মাছের দৈহিক ওজনের ৮-৫% হারে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। মজুদের ২ মাস পর থেকে প্রতি ১৫ দিন পরপর জাল টেনে ব্রুড মাছের দেহের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। নিয়মিত পানির গুণাগুণ যেমন তাপমাত্রা, পিএইচ, দ্রবীভূত অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া ও মোট ক্ষারত্বের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
কৃত্রিম প্রজনন কৌশল
প্রজনন মৌসুমের পূর্বে পরিপক্ব পুরুষ ও স্ত্রী ব্রুডের প্রতিপালন পুকুর থেকে সিস্টার্নে স্থানান্তর করা হয়। পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে যথাক্রমে ২ঃ১ অনুপাতে মসৃণ জর্জেট হাপায় স্থানান্তর করা হয়। সিস্টার্নে অক্সিজেন নিশ্চিত করতে কৃত্রিম ঝর্ণা ব্যবহার করা হয়। ট্যাংরার স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড (পিজি) অথবা ওভাটাইডের দ্রবণ বক্ষ পাখনার নিচে ইনজেকশন হিসেবে প্রয়োগ করা হয়।
সারণি ১ : ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজননে একক মাত্রার পিজি অথবা ওভাটাইড হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ
হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করার ৮-৯ ঘণ্টা পর স্ত্রী ট্যাংরা ডিম ছাড়ে। ডিম আঠালো অবস্থায় হাপার চারপাশে লেগে যায়। ডিম দেয়ার পর হাপা থেকে ব্রুডগুলো সরিয়ে নিতে হয়।
ডিম ছাড়ার ২০ থেকে ২২ ঘন্টা পর ডিম ফুটে রেণু বের হয়।
রেণুর ডিম্বথলি নিঃশোষিত হওয়ার পর রেণুকে খাবার দিতে হবে। রেণু পোনাকে সিদ্ধ ডিমের কুসুমের কুসুমের দ্রবণ দিনে ৬ ঘণ্টা পর পর ৪ বার দেয়া হয়। হাপাতে রেণু পোনাকে এভাবে সপ্তাহব্যাপী রাখার পর নার্সারি পুকুরে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেয়া হয়।
ট্যাংরা মাছের নার্সারি ব্যবস্থাপনা
নার্সারি পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি
পোনা প্রতিপালন পুকুরের আয়তন ৪-৮ শতাংশ, গড় গভীরতা ১.০ মিটার রাখা হয়। পুকুর প্রস্তুতির জন্য পুকুর শুকিয়ে প্রতি শতকে ১ কেজি চুন দেয়া হয়। এরপর শতাংশে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৭৫ গ্রাম টিএসপি ও ৬-৮ কেজি গোবর সার ব্যবহার করা হয়। পুকুরের চারপাশে নাইলন নেট দিয়ে ঘিরে দিতে হবে।
পোনা সংগ্রহ ও নার্সারি পুকুরে মজুদ
হ্যাচারিতে উৎপাদিত ৭ দিন বয়সের রেণু পোনা প্রতি শতাংশে ৮,০০০-১২,০০০টি হারে মজুদ করা যায়।
নার্সারি পুকুরে মজুদের সময় পোনাকে পুকুরের পানির তাপমাত্রার সঙ্গে ভালোভাবে খাপখাওয়ানোর পর ছাড়তে হবে।
নার্সারি পুকুরে খাদ্য প্রয়োগ
হ্যাচারীতে উৎপাদিত ৭ দিন বয়সের রেণু পোনা নার্সারি পুকুরে মজুদের পর প্রতি ১০,০০০টি পোনার জন্য খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে।
সরণি ২ : ট্যাংরা মাছের নার্সারি পুকুরে খাদ্য প্রয়োগ মাত্রা
রেণু পোনা ছাড়ার ৫৫-৬০ দিন পর আঙুলে পোনায় পরিণত হয়, যা চাষের পুকুরে মজুদের জন্য উপযোগী এবং বাঁচার হার শতকরা ৫৫-৬০%।
ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা
পোনা মজুদের ১৫ দিন পর থেকে প্রতি ১৫ দিন পর পর জাল টেনে মাছের দেহের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিয়মিত পানির গুণাগুণ যেমন তাপমাত্রা, পিএইচ, দ্রবীভূত অক্সিজেন, অ্যামেনিয়া ও মোট ক্ষারত্বের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে।
পোনা উৎপাদন ও আহরণ
নার্সারি পুকুরে পোনা মজুদের ৫৫-৬০ দিন পর পুকুর সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে ৫-৬ সেমি. আকারের ট্যাংরা মাছের পোনা পাওয়া যায়।
ইনস্টিটিউট কর্তৃক গবেষণালব্ধ কৌশল অনুসরণ করলে ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সরকারি মৎস্য হ্যাচারিসমূহে ট্যাংরা মাছের পোনা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্প্রসারণ করা গেলে চাষের মাধ্যমে এতদাঞ্চল তথা দেশে প্রজাতিটির উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং বিপদাপন্ন অবস্থা থেকে এ প্রজাতির উত্তরণ ঘটবে বলে আশা করা যায়।

কমর-উন-নাহার

মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ, মোবাইল : ০১৮১৮৪৪০০৭২, ই-মেইল : qunahar8@gmail.com

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook