কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বঙ্গবন্ধু : কৃষির প্রবাদ পুরুষ

বাংলাদেশ নামের দেশটি দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের ফসল। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল যে মুক্তিযুদ্ধের, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। বাঙালি পেয়েছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশ সত্য, কিন্তু দীর্ঘ দিনের যুদ্ধ সংগ্রামে তখন বিপর্যস্ত ছিল দেশের কৃষি ও অর্থনীতি, জীবন ও জনপদ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন ও ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাজ। খুব সহজ ছিল না সে কাজ। পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর পোড়ামাটির বাংলাদেশকে তিনি সবুজে শ্যামলে ভরে দিয়ে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলেন সে যাত্রা। সে যাত্রাপথে ছেদ পড়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। কিন্তু তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সে স্বপ্নকে নিয়ে বাস্তবে রূপদান করে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন সোনার বাংলা, কৃষিতে সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। এগিয়ে চলেছে কৃষি উন্নয়নের ধারা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কৃষি ও বঙ্গবন্ধুর কৃষি বিপ্লবের ডাক
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৭২ সালে ছিল সাড়ে সাত কোটি। সে মানুষের সারা বছর খাওয়ানোর মতো কোনো খাদ্য ছিল না দেশে। তাঁর দেয়া বিভিন্ন বক্তৃতার মধ্যে সে দুরবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘গত ২৫ বছর থেকে বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি ২৫ লক্ষ টন। কিন্তু এ খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য অতীতে কোনো বন্দোবস্ত করা হয়নি। অনেকে এসেছেন, নতুন কথা বলেছেন- শুধু আমাদের সম্পদকে লুট করা নয়, আমাদের কাঁচামাল বিক্রি করে পশ্চিম পাকিস্তানকে উন্নত করা হলো। বাংলাকে মর্টগেজ রেখে পশ্চিম পাকিস্তানে আমার অর্থে গড়ে উঠল করাচি, আমার অর্থে গড়ে উঠল লাহোর, হায়দারাবাদ, ইসলামাবাদ। অর্থ কোথা থেকে এলো, কিভাবে এলো আপনারা জানেন এ ইতিহাস। আজ বাংলাদেশের অবস্থা বড় শোচনীয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ১৫০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। এর পেছনে বিরাট ষড়যন্ত্র ছিল, যাতে এ দেশ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।’ এই চরম সত্যকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন, ‘খাবার অভাব হলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। সে জন্য খাওয়ার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে অন্নহীন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে।’
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘ঞযব ঝঃধঃব ড়ভ ঋড়ড়ফ ্ অমৎরপঁষঃঁৎব ১৯৭২’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ‘বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাবস্থার কারণে কেবলমাত্র আখ ছাড়া অন্য সব কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এজন্য বাংলাদেশে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য চাষের জমি বাড়িয়ে ও উচ্চফলনশীল জাত, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো প্রত্যাশিত।’ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাই তিনি স্বাধীনতার পরপরই প্রথম গুরুত্ব দিয়েছিলেন কৃষির ওপর। কেননা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য ঘাটতিতে থাকা একটা দেশের মানুষ সব সময়ই খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকে। খাদ্যের অভাবে কিছু মানুষকে অনাহারে থাকতে হয়, এমনকি অনাহারে মৃত্যু বা দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে যে দেশের এত মানুষ মরেছে, সেখানে খাদ্যের অভাবে কোন মানুষের মৃত্যুকে তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে চাননি।
শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, সত্তরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়, বাহাত্তরের দীর্ঘ অনাবৃষ্টি- খাদ্য উৎপাদন ক্ষেত্রকে করেছিল বিপর্যস্ত। মানুষের মুখে রোজ দুবেলা আহার জোগানো ছিল সে সময়ের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু সে সময় এ কঠিন চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলার জন্য ১৯৭২-৭৩ সালে বাজেটে ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিলেন শুধু বিদেশ থেকে খাদ্য কেনার জন্য। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘গত বছর ২৭ লক্ষ টন খাদ্য আনতে হয়েছে বিদেশ থেকে কিনে, ভিক্ষা করে। এই বছর ১২৫ কোটি টাকার খাবার কেনার ব্যবস্থা করেছি বাংলাদেশের সম্পদ থেকে। জানিনা কেউ দেবে কি দেবে না? মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারি না; তাই ১২৫ কোটি টাকার খাবার কিনতে বাধ্য হয়েছি। দেশের মানুষের অবস্থা খারাপ। সাত মাস বৃষ্টি হয় নাই। বাংলাদেশে যেমন এখন পানি নাই, আবার যখন বন্যা আসে তখন সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’ এই বাস্তবতার নিরীখে তিনি তখন বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, এ দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে অন্য দেশ থেকে চাল কিনে বা খাদ্য এনে বাঁচানো যাবে না। কে কখন কতটুকু খাদ্য দেবে তা  অনিশ্চিত। তাই তিনি দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই রাগ করবেন না, দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেও আমি চাউল কিনতে পারছি না। চাউল পাওয়া যায় না। যদি চাউল খেতে হয় আপনাদের চাউল পয়দা করে খেতে হবে, না হলে মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়ালেও হবে না।’ কৃষি বিপ্লবের কথা বলে বঙ্গবন্ধু প্রকৃতই কৃষি উন্নয়নের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সে সময় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১০১ কোটি টাকাই তিনি রেখেছিলেন কৃষি উন্নয়নের জন্য যা ছিল তখনকার সময়ে এক দুঃসাহসী উদ্যোগ।
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও কৃষি উন্নয়ন
বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তার পেছনে ছিল এক জটিল ও দুঃসহ প্রেক্ষাপট- সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জের এক অষ্পষ্ট ভবিষ্যৎ। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তাঁকে ভাবতে হয়েছিল ভারত থেকে ফিরে আসা প্রায় ১ কোটি বাঙালির পুনর্বাসন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার, মুক্তিযুদ্ধের দালালদের বিচার করা ইত্যাদি। কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই তিনি প্রণয়ন করলেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। কৃষকদের ও কৃষি উন্নয়নের কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। দেশকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য বঙ্গবন্ধু সেই পরিকল্পনা গ্রহণের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। দেশের এক ইঞ্চি জমিও যাতে পড়ে না থাকে এবং জমির ফলন যাতে বৃদ্ধি পায় তার জন্য দেশের কৃষক সমাজকেই সচেষ্ট হতে হবে।’
কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব প্রদান
বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে তখন গুরুত্ব দেন কৃষি গবেষণা ও কৃষি শিক্ষার। তিনি ১৯৭৩ সালে কৃষি শিক্ষায় মেধাবীদের           আকৃষ্ট করার জন্য চাকরি ক্ষেত্রে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেন। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। পুনর্গঠন করা হয় তুলা উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে কৃষি খাতে প্রায় ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, বাড়ে খাদ্য শস্যের উৎপাদন।
কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে  ১৯৭৩ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট। এসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে দেশে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে উচ্চফলনশীল জাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের নানামুখী গবেষণার ফলে দেশ আজ মাংস, ডিম ও স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে সেচপাম্প, সার ও উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর ফলে স্বাধীনতার পর রাসায়নিক সারের ব্যবহার, সেচকৃত জমি ও উন্নত জাতের ধানের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ সময় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) কর্তৃক প্রদত্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক  ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তিনি কয়েক লক্ষ কৃষি  ঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থাও করেন। এ ছাড়া ভূমিহীন কৃষকদের নামে বন্দোবস্ত দেয়া হয় খাস কৃষিজমি। কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দানের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় জাতীয় কৃষি পুরস্কার তহবিল।
কৃষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা
বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে এ দেশের কৃষক শ্রমিকদের সম্বোধন করে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন, কৃষকদের সাথে থাকার ও কৃষকদেরও তাঁর সাথে থাকার উদাত্ত আহŸান জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন এ দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ লোক ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের কৃষক-শ্রমিকদের তিনি খুব ভালোবাসতেন ও সবসময় তাঁদের উন্নতির চিন্তা করতেন।  কৃষকদের তাচ্ছিল্য বা অসম্মান করার কথা তিনি কখনো কল্পনাও করতেন না। এ কথার প্রমাণ মেলে সে সময় জাতিসংঘে দেয়া তাঁর এক ভাষণে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজুররা করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ।’ কৃষকদের দিয়েছিলেন তিনি সোনার বাংলা গড়ার মূল কারিগরের মর্যাদা। এই যে উদারতা, বুক আগলে কৃষকদের সম্মান রক্ষা করা- এ কেবল বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব।
কৃষকদের জন্য শুধু মুখের কথা, আবেগ প্রকাশ বা হৃদয়ের উদারতা প্রকাশই নয়, বাস্তবে তাঁদের জন্য বঙ্গবন্ধু বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে বেতার-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দেন, সেখানেও তিনি কৃষকদের কথাই বলেন এভাবে, ‘আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে। সম্পদের স্বল্পতা থাকা সত্তে¡ও আমরা চাষিদের স্বল্পমেয়াদি সাহায্য দানের জন্য ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। ২৫ বিঘার কম জমি যাদের আছে তাদের খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে সমস্ত বকেয়া খাজনা মওকুফ করা হয়েছে। তাকাবি ঋণ বাবদ ১০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে এবং ১৬ কোটি টাকা টেস্ট রিলিফ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।’
সমন্বিত ভাবনা
বঙ্গবন্ধু সব সময়ই বলতেন, ‘ আমাদের দেশের জমি এত উর্বর যে বীজ ফেললেই গাছ হয়, গাছ হলে ফল হয়। সে দেশের মানুষ কেন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পাবে।’ তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে, এ দেশে যেমন সোনার মাটি ও মানুষ আছে, তেমনি আছে কৃষির অপার সম্ভাবনা। এমন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে মজবুত করতে হবে। তাঁর এক ভাষণে তিনি এ কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন ‘কৃষি ও কৃষক বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।’ তিনি এটাও বুঝতেন, কৃষির উন্নতি মানে শুধু ধান-গম বা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। ভাত-রুটি খেয়ে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু মেধাবী জাতি গঠনে দরকার সুষম খাদ্য ও পুষ্টি। এ ছাড়া  মেধাবী জাতি ছাড়া কোনো দেশের উন্নতি হয় না। সেজন্য তিনি প্রধান খাদ্যের পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদির উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেন। তিনি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। যৌথ খামার গড়ে তোলার আহŸান জানান। তিনি বলেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বুঝায় না বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি এসবকে বুঝায়। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের সমন্বিত উৎপাদনের উন্নতি করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা
বঙ্গবন্ধুর প্রথম স্বপ্ন ছিল এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও সাধারণ মানুষের মুক্তি। স্বাধীনতা অর্জনের পর তাঁর দ্বিতীয় স্বপ্ন ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। বাংলাদেশকে তিনি সোনালি ফসলের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, প্রতি ইঞ্চি জমিকে তিনি চাষের আওতায় এনে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে চেয়েছিলেন, প্রতিটি মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন উন্নত খাদ্য, আশ্রয় ও জীবন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দেশের প্রতি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে উন্নত জীবনের অধিকারী হবে- এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন।’ তিনি ৩ জুন ১৯৭২ সালে সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে তার স্বপ্নের কথা বলেন, ‘বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন, ধ্যান, ধারণা ও আরাধনার ধন। আর সে সোনার বাংলা ঘুমিয়ে আছে চির অবহেলিত গ্রামের আনাচে-কানাচে, চির উপেক্ষিত পল্লীর কন্দরে কন্দরে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির আশেপাশে আর সুবিশাল অরণ্যের গভীরে। ভাইয়েরা আমার- আসুন সমবায়ের জাদুস্পর্শে সুপ্ত গ্রাম বাংলাকে জাগিয়ে তুলি। নব-সৃষ্টির উন্মাদনায় আর জীবনের জয়গানে তাকে মুখরিত করি।’ দূরদর্শী এ ভাষণে তিনি সমবায়ের কথা বললেও তা মান্ধাতার আমলের পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে  আধুনিক জোটবদ্ধ যৌথ খামারের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন। তিনি সে সময়েই বুঝেছিলেন, মানুষকে শিক্ষিত করে তুললে তারা অন্য চাকরি করবে, ভিন্ন পেশায় চলে যাবে। কৃষির ওপর নির্ভর করবে না। দিন দিন কৃষি শ্রমিকের প্রাপ্যতা কমবে। তাই কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রম নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। যেভাবে পরিবার ও জমি ভাঙ্গছে, চাষের জমিগুলো দিন দিন আয়তনে ছোট হচ্ছে- তাতে যন্ত্রের মাধ্যমে চাষ করা কঠিন। তাই ভবিষ্যতে কৃষির উৎপাদন খরচ ও শ্রমিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হলে যৌথ বা বিশেষ সমবায় পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। তাঁর এক বক্তব্যে এই বিশেষ পদ্ধতিতে চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার কি আশ্চর্য এক সূত্র তিনি দিয়েছিলেন যার ভেতরে শুধু কৃষি উন্নয়নই নয়, স্থানীয় রাজস্বে পল্লী উন্নয়নেরও রূপরেখা নিহিত ছিল। তিনি চেয়েছিলেন ‘প্রতি গ্রামে যৌথ চাষ হবে এবং ফসলের ভাগ যাবে মালিক, শ্রমিক, গ্রাম তহবিল- এ তিন জায়গায়’। এসব স্বপ্নের মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ। তিনি বলেছিলেন, ‘এই স্বাধীনতা তখনি আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলার কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।’
সপরিবারে তাঁকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট  নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের এক জঘন্যতম কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় সেখান থেকে। যে শেখ মুজিবুর রহমান জেল, জুলুম, হুলিয়া, নির্যাতন সহ্য করেছেন তাঁর প্রিয় বাঙালিদের জন্য, তাদেরই কয়েকজন তাঁকে হত্যা করে এ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা জানতো না যে, বঙ্গবন্ধুকে কখনো মেরে ফেলা যায় না, মুছে ফেলা যায় না তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শকে, থামানো যায় না বাংলাদেশের উন্নয়নকে। তাঁর স্বপ্ন ও ভাবনাকে ভিত্তি করে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আরও বলিষ্ঠ নীতি নিয়ে এ দেশের কৃষি উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য তাঁর সরকার পরিচিতি পেয়েছে কৃষিবান্ধব সরকার হিসেবে। তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ যা বঙ্গবন্ধুরই চাওয়া ছিল। এখন আমরা মাংস উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষির নানা ক্ষেত্রে এখন অর্জিত হয়েছে অনেক সাফল্য। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল। কৃষি উৎপাদনের নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন মর্যাদার আসন লাভ করেছে। বাংলাদেশ এখন পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম ও পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম, আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, আলু উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, মৌসুমী ফলের উৎপাদনে বিশ্বে দশম। ইতোমধ্যে আমরা পাট, ধৈঞ্চা ও ইলিশের জন্মরহস্য আবিষ্কার করেছি, পেয়েছি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ইলিশ ও খিরসাপাত আমের স্বীকৃতি। এটাই তো স্বাধীনতার সার্থকতা। কৃষি উৎপাদনে এরূপ অনেক সাফল্য অর্জিত হওয়ার পর বর্তমান সরকার এখন নজর দিয়েছে পুষ্টি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপর যাতে দেশের মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে সুস্থ থাকতে পারে, গড়ে উঠতে পারে একটি মেধাবী জাতি।

 

মৃত্যুঞ্জয় রায়

উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা: ০১৭১৮২০৯১০৭, ই- মেইল :  kbdmrityun@yahoo.com

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জাতীয় অর্থনীতি ও প্রাণিজ পুষ্টি উন্নয়ন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন লালিত সোনার বাংলা তথা বিশ^ দরবারে উন্নত বাংলাদেশের আবির্ভাবের পর্যায়ে আমরা বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশ। আগামী ২০৪১ সালে বিশে^ উন্নত দেশে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়াও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ অর্জনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসডিজি এর উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়া এবং প্রতিটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের গৃহীত নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ দুধ ও ডিম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গবাদিপ্রাণি ও পোল্ট্রি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। মোট দেশজ উৎপাদনে প্রানীসম্পদ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছাড়াও, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি এবং প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। চামড়াসহ বিভিন্ন উপজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
গবাদি প্রাণী ও পোলট্রি প্রজাতি
বাংলাদেশে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য গবাদি প্রাণি ও পোলট্রি প্রজাতিগুলো হচ্ছে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মুরগি ও হাঁস। দেশে প্রতি বছর গবাদি প্রাণী ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা বেড়েই চলছে অর্থাৎ দেশে শিল্পায়ন, নগরায়ন ইত্যাদি হলেও জনগণ গবাদি প্রাণী পালন থেকে বিচ্যুত হয়নি।
জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান
স্থির মূল্যের ভিত্তিতে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৪৭%, যা টাকার অংকে প্রায় ৪৩২১২ কোটি টাকা। প্রাণিসম্পদ খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হার ছিল ৩.৪৭%। জাতীয় জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে কমলেও কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মূল্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১৩.৪৬%।
প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সুপারিশ অনুযায়ী একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন ন্যূনতম ২৫০ মিলি দুধ ও ১২০ গ্রাম মাংস এবং বছরে ১০৪টি করে ডিম খাওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোতে দুধ, ডিম ও মাংস গ্রহণের পরিমাণ এফএও এর সুপারিশের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান দেশজ উৎপাদন দুধ, মাংস ও ডিমের ন্যূনতম জাতীয় চাহিদার ৬৬.০৩, ১০৪.১৫ এবং ৯৯.৮৯% জোগান দিয়ে থাকে। বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ৩২২.৯১, ৪৯৬.৩৫ এবং ১৯৭.৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের চাহিদা উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি
দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০% সরাসরি এবং ৫০% আংশিকভাবে জীবিকার জন্য প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এক টন দুধ উৎপাদন এবং ইহার প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতের সাথে সম্পৃক্ত ৩৭টি শ্রমজীবী পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।    উল্লেখ্য যে, প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত মহিলাসহ বিপুলসংখ্যক বেকার যুবক-যুবতির কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
প্রাণিসম্পদ পণ্য ও উপজাত রপ্তানি
জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় শতকরা ২.৪৯ ভাগ অর্থাৎ ১.০১ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার সমপরিমাণ টাকা আসে বিদেশে চামড়া ও চামড়া জাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। সরকার দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে বিদেশে দুধ, মাংস ও ডিম রপ্তানি করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও প্রাণিজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের লক্ষ্যে মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার স্থাপনসহ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
টেকসই নিরাপদ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ নি¤œরূপ :
কৃষি জমির স্বল্পতা: দ্রæত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য দেশে শিল্প বিকাশের বিকল্প নাই। শিল্প বিকাশের জন্য স্থাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চাষাবাদযোগ্য জমি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে দেশে প্রতি বছর ১% হারে কৃষি জমি অন্যান্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এমতাবস্থায়, প্রাণিসম্পদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেশে দুধ, ডিম ও মাংসের জোগান নিশ্চিত করা দূরুহ হবে। কারণ প্রাণীর সংখ্যা বাড়ালে তাদের পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া সহজ হবে না। সে ক্ষেত্রে দেশের চরাঞ্চলগুলোকে মিল্কভিটার আদলে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।
দেশীয় প্রাণী ও পোলট্রি প্রজাতিসমূহের কম উৎপাদনশীলতা :  দেশে বিদ্যমান গরুর প্রায় ৫০%, মহিষের ৯০%, ছাগলের ৬০% ও ভেড়ার ৮০% দেশী জাতের। দেশী জাতের এসব গবাদি প্রাণী ও পোলট্রি প্রজাতির উৎপাদনশীলতা অনেক কম। যা লাভজনক বাণিজ্যিক খামার ব্যবস্থাপনায় পালন উপযোগী নয়। দেশে বিদ্যমান সংকর জাতের গবাদি প্রাণীগুলোর উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এদের রোগবালাই বেশি, বাচ্চা প্রদানের হার কম, পালন ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ খামারিদের জন্য সহজসাধ্য নয়।
প্রাণী ও পোলট্রি খাদ্যের ঘাটতি : আমাদের দেশে উৎপাদিত ধানের খড় গবাদি প্রাণীর আঁশ জাতীয় খাদ্যের জোগান দিয়ে থাকে। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ খড় উৎপাদিত হয় তা দিয়ে আঁশ জাতীয় খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু অধিকাংশ খড় বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত হওয়ায় প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় চাহিদার প্রায় ৫৬% ঘাটতি থাকে। সা¤প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএলআরআই উদ্ভাবিত নেপিয়ার ফডার চাষ স¤প্রসারিত হচ্ছে। অন্যদিকে দানাদার খাদ্য হিসেবে মূলত বিভিন্ন শস্য উপজাত, শস্যদানা এবং খৈল ব্যবহার হয়ে থাকে। দেশে উৎপাদিত এসব খাদ্য উপাদান জাতীয় চাহিদার মাত্র ২০.৪০% জোগান দিয়ে থাকে।
রোগনির্ণয়, চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ : দেশীয় গবাদিপশু ও পোলট্রি প্রজাতিসমূহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং চিকিৎসা ব্যয় অনেক কম। অন্যদিকে সংকর এবং বিশুদ্ধ বিদেশী জাতের গবাদিপ্রাণি ও পোলট্রির বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পালন ব্যবস্থাপনায় রোগব্যাধি বেশি হয়,  মৃত্যুহার বেশি এবং জীবদ্ধশায় বাচ্চা উৎপাদনের সংখ্যা অনেক কম। এ ছাড়াও, দেশে প্রযুক্তি নির্ভর কার্যকর রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার ব্যবহার খুবই সীমিত পর্যায়ে।
প্রাণিসম্পদ পণ্যের বহুমুখী বিপণন ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশে গবাদি প্রাণী ও পোলট্রি খামার ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যালু-এডেড পণ্য উৎপাদন এবং খামার উপজাতসমূহের     রি-সাইকেলিং বা এ থেকে ভ্যালু এডেড পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি উপেক্ষিত। এমতাবস্থায় শুধু দুধ, মাংস ও ডিম বিপণনের মাধ্যমে লাভজনক খামার পরিচালনা করা দুরুহ। এর পেছনে রয়েছে খামারিদের অসচেতনতা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তির সহজ প্রাপ্যতা অন্যতম।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশ বিশে^ সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ুর প্রভাব প্রাণিসম্পদ পালন এবং উৎপাদনে যথেষ্ট প্রভাব রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গাভীর দুধ উৎপাদন ১৪ থেকে ৩৫% কমে যায়। এমতাবস্থায়, পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে সহনশীল প্রাণী ও পোলট্রি পালন প্রযুক্তি উন্নয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।
শ্রমিকের প্রাপ্যতা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। দেশে শিল্পায়নের সম্প্রসারণের ফলে জনবলের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় কৃষি কাজে শ্রমিকের স্বল্পতা দেখা যাচ্ছে। ফলশ্রæতি ভবিষ্যৎ প্রাণিসম্পদ খামার ব্যবস্থাপনায় যান্ত্রিকীকরণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচ্য হবে।
আগামী ৫০ বছরে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে সম্ভাব্য গবেষণা ক্ষেত্রসমূহ
জলবায়ু ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য গবেষণা; প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জীবপ্রযুক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত গবেষণা; প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থায় ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ বিষয়ক গবেষণার সূচনা; প্রাণিসম্পদ গবেষণা ও উন্নয়নে আইসিটি প্রয়োগ; প্রাণিসম্পদজাত খাদ্যপণ্য এবং উপজাত প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত গবেষণা জোরদারকরণ; ভ্যাকসিন ও বায়োলজিক্স সংক্রান্ত গবেষণা আধুনিকায়ন ও জোরদারকরণ; নুতন খাদ্য উদ্ভাবন ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ বিষয়ক গবেষণা জোরদারকরণ; জলবায়ু পীড়ন সহনশীল প্রাণী ও পোল্ট্রির জাত উন্নয়ন।
মানসম্পন্ন ও নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণে আঞ্চলিক কৃষি, কৃষক ও আবহাওয়াকে সম্পৃক্ত করে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পরিবর্তনশীল প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন সমস্যাবলীর কার্যকর সমাধানের জন্য অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর জন্য দেশের গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

ড. গৌতম কুমার দেব১ ড. নাথুরাম সরকার২

১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বায়োটেকনোলজি বিভাগ, মোবা : ০১৭১৫২৩৪২৩, ই-মেইল : debgk2003@yahoo.com,   ২মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট,

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষে দৈহিক মানসিক স্বাস্থ্য ভাবনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন যেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তেমনি রাজনৈতিক মুক্তি সহ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম আশা-আকাক্সক্ষা। তাঁর এই   আশা-আক্সক্ষার প্রতিফলন দেখা যায় স্বাধীনতাত্তোর সাড়ে তিন বছরের কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে তাঁর সূদুরপ্রসারি পরিকল্পনা ও কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। তাঁর কর্ম-পরিকল্পনার মধ্যে ছিল (১) কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করা (২) ভ‚মি রাজস্বের চাপে নিষ্পিষ্ট কৃষকদের ২৫ বিঘা জমি পর্যন্ত খাজনা মাফ করা এবং বকেয়া খাজনা মওকুব করা (৩) প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার তৎপরতা চালানো (৪) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের বনজ-সম্পদ, গো-সম্পদ, হাঁস-মুরগি চাষ, দুগ্ধ ও মৎস্য খামার তৈরি ইত্যাদি। অর্থাৎ উৎপাদন ও উন্নয়নের মাধ্যমে দৈহিক ও মানসিকভাবে উন্নত জাতি গঠন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।


ঐতিহাসিকভাবে, মানুষ আদিম যুগ থেকে দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে খাদ্যের জোগাড় করে আসছে, শিকার বা সংগ্রহ এবং কৃষি। বর্তমানে, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের সিংহভাগই খাদ্য কৃষি বা  কৃষিভিত্তিক শিল্প  হতে সরবরাহ হয়ে থাকে। আমাদের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কৃষি জীববৈচিত্র্য। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের কৃষকগণ এই জীববৈচিত্র্য ধরে রেখেছেন। মানুষের প্রয়োজনেই তারা বাছাই  করে নিয়েছেন ফসল, ফসলের জাত, গৃহপালিত প্রাণী ও প্রাণীর বিভিন্ন জাত। মাছ চাষের জন্য  প্রাকৃতিক মৎস্য ভাÐার থেকে বেছে নিয়েছেন হরেক রকম মাছ। কৃষি জীববৈচিত্র্যের আরেক অংশ হলো আমাদের কৃষি বনায়ন বা সামাজিক বনায়নের জন্য বাছাই করে নেওয়া উদ্ভিদ প্রজাতি। আমাদের আবাদি জমিতে চলছে বিভিন্ন মিশ্র ফসলের চাষ, আর এই আবাদি-অনাবাদি জমিতে অবস্থানরত জীব-অনুজীবও আমাদের কৃষি জীববৈচিত্র্যের অংশ। এছাড়া আমাদের ফসলের পরাগায়নে সহায়তাকারী কীটপতঙ্গ, এমনকি ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গও এই জীববৈচিত্র্যের সদস্য।


আধুনিক কৃষিতে জীববৈচিত্র্যে আজ হুমকির মুখে, জীব বৈচিত্র্যে  ধরে রাখা অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ আধুনিক কৃষির প্রভাব আজ পড়ছে কৃষির সকল পর্যায়ে। অল্প জায়গা থেকে অধিক উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার মুখে খাদ্য তুলে দেওয়ার পাশাপাশি রয়েছে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ। ফলে আমাদের আবাদ করতে হচ্ছে উচ্চফলনশীল ফসল, মাছ ও ডিমের প্রয়োজনে গড়ে তুলতে হচ্ছে নতুন নতুন বিদেশি বা দেশি-বিদেশি সঙ্কর জাতের মুরগি খামার। একইভাবে অধিক দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনের আশায় লালন-পালন করতে হচ্ছে বিদেশি বা সঙ্কর জাতের গরু।  প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে আরও গড়ে তুলতে হচ্ছে ছোট বড় মৎস্য খামার, যেখানে বিভিন্ন মাছের বাচ্চা উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারের চাহিদা মোতাবেক বড় বড় মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। এই সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়েছে বা হচ্ছে আমাদের জনগণের খাদ্যাভাস এর কথা মাথায় রেখে। দেশের জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিধান করার লক্ষ্যে। তবে এসব করতে গিয়ে আমাদের সর্বদাই মাথায় রাখতে হবে যেন আমরা আমাদের স্থানীয় ফসলের জাত, গৃহপালিত পশুর স্থানীয় জাত, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন আবাসস্থল ইত্যাদি যেন হারিয়ে না ফেলি। এগুলো হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে কৃষি জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে টেকসই উন্নয়ন।
এবার ফেরা যাক স¦াস্থ্যের কথায়, জীবনের কথায়। দীর্ঘজীবী হতে কে না চায়? তাহলে বেশি কিছু নয় কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলেন তাহলে আপনি হবেন স¦াস্থ্যবান ও দীর্ঘজীবী, দৈনিক-
*প্রচুর পরিমাণে ফলমূল খেতে হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক পরিশ্রমী ব্যক্তির  ফল- ১৫০ গ্রাম ও শাকসবজি ২৫০ গ্রাম খেতে হবে।
*পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
* সিগারেট ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।
*পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে (৭-৮ ঘণ্টা)।
স¦াস্থ্য ভালো রাখতে লাল মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কম পরিমাণে এবং শাকসবজি, ফল, মাছ এবং শস্যদানা বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস শুধু ওজনই নিয়ন্ত্রণে রাখবে না পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শারীরিক স¦াস্থ্যের সাথে মানসিক স¦াস্থ্যের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবার স¦াস্থ্যের সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তির একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য অনেকেরই অল্প বয়সেই স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। এক্ষেত্রে সচেতনতা জরুরি। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সঞ্চালন বাড়ে ফলে স¥ৃতিশক্তি দৃঢ় হয়। অন্যদিকে রাতে টানা ৬-৮ ঘণ্টা ভালো ঘুম না হলে মস্তিষ্ক জটিল সমস্যার সমাধান বা চিন্তা করতে পারে না। মস্তিষ্ক সজাগ রাখতে সুযোগমতো বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটান, সামাজিক কর্মকাÐ বা মানবসেবায় যোগ দিন এবং প্রাণখুলে হাসুন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি সামাজিক, পরোপকারী সদা হাস্যোজ্জ¦ল তাদের মনে রাখার ক্ষমতাও প্রবল। কারণ     স্নেহ-মমতা, বন্ধুত্ব-ভালোবাসা এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম যা মানুষের মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। শারীরিক ও মানসিক চাপ স্মৃতিশক্তি হ্রাসের জন্য দায়ী। এজন্য মেডিটেশনের কোন বিকল্প নেই।
স¥ৃতিশক্তি বাড়াতে খাদ্য তালিকায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন- শিম, কুমড়ার বীজ, সয়াবিন, ব্রোকলি, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদিতে রয়েছে স্যাচুরেটেন্ড ফ্যাট। রঙিন তাজা শাকসবজি ফলমূল ও সবুজ চায়ে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে স্মৃতিশক্তি তীক্ষè করে। শিশুদের ভিডিও গেম বা সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলা করতে না দিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক খেলনা দিন এবং অনুষ্ঠান দেখান। তাদের নতুন নতুন গল্পের বা উপন্যাসের বই পড়তে দিতে পারেন এবং আপনি নিজেও শিশুদের সামনে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্রাউজিং থেকে বিরত থাকুন এবং নিজে বই পড়ুন (হার্ডকপি) তাহলে শিশুও বই পড়ায় আগ্রহ পাবে। কারণ শিশুরা সবসময় অনুকরণ প্রিয়। এছাড়া নিজে নতুন নতুন কাজের ঝুঁকি নিন কারণ নতুনত্ব একঘেয়েমিতা দূর করে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ায় ও মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
মানসিক অস্থিরতা কিংবা বিষণœতা দূর করতে আমরা মেডিটেশনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা এক মাস মেডিটেশন অব্যাহত রাখলে মস্তিকে গঠনগত যে পরিবর্তন আসে তা মানসিক ব্যাধি প্রতিকারে কার্যকরী ভ‚মিকা রাখতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে। ব্রিটিশ একদল গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই গ্রæপ ছাত্রছাত্রীদের উপর গবেষণা চালান। এক গ্রæপ এক মাসব্যাপী মেডিটেশনের অভ্যাস করে অন্য গ্রæপ করে না। গবেষকগণ লক্ষ্য করেন যে, মেডিটেশন করা গ্রæপের ছাত্রছাত্রীদের মস্তিষ্কের ¯œায়ুতন্ত্র (হোয়াট মেটার) বেশি উদ্দীপ্ত হয় এবং বেশি সঙ্কেত গ্রহণে সক্ষম হয় ফলে মস্তিষ্কের যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং তাদের আচার-আচারণের অনেক গুণগত পরিবর্তন হয়। (সূত্র : ডেইলি মেইল; ড. মজুমদার ২০১৮)।  মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখার অন্য আরও একটি কথা বলা যাক,  মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা করে রাখার অভ্যাস ভালো নয়, যা হৃদযন্ত্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। গবেষণায় দেখা গেছে ক্ষমা করার পরিবর্তে ক্ষোভ জমা করে রাখলে মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ে। ডক্টর সিমন্স বলেন ‘আপনি ভাবতেই পারবেন না মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা থাকলে তা কত দ্রæত এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের ক্ষতি সাধন করে। তাই নিজের ঘাড় থেকে এই আপদ নামিয়ে মানসিকভাবে সুস্থ থাকুন সবসময়। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্যথি হেফনার ক্ষমাশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর ফলে সামাজিকবন্ধন আরও দৃঢ় হবে যা সুরক্ষিত রাখবে হৃদযন্ত্র এবং ভালো থাকবে     মানসিক স¦াস্থ্য। পরিশেষে হেমন্তের মৃদু-মন্দ বাতাসে শীতের আগমনী বার্তায় সকলের শারীরিক ও মানসিক সুস¦াস্থ্য কামনায় ছন্দে ছন্দে বলি-
ফুলকপি ওলকপি ও আমলকী জলপাই ফল,
এসব খেলে দেহেতে বাড়ে শক্তি সাহস আর বল।
মা-শীতের দিনে নতুন ধানে পায়েস-মিঠাই করবে,
সেসব খেয়ে পেটের সাথে মনটাও তাই ভরবে।
রোগমুক্ত দেহ ও মন পেতে  নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, হাঁটা, দৌঁড়ানো, সাঁতার কাটা বা কায়িক পরিশ্রম কিংবা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন। এসব কর্মকাÐ শারীরিক এবং    মানসিকভাবে সুস্থ রাখবে এবং ডায়াবেটিস কিংবা হৃদরোগ থেকে দূরে রাখবে।

 

ড. সত্যেন মণ্ডল১ বীথিকা রায়২

১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ব্রি গাজীপুর,মোবাঃ-০১৭১২৪০৫১৪৯, ইমেইল-satyen1981@gmail.com 2সহকারী শিক্ষক, কালীগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, কালীগঞ্জ, গাজীপুর

বিস্তারিত
উপকূলীয় কৃষকের মুখে হাসি : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্যতম চালিকাশক্তি। জীবন-জীবিকার পাশাপাশি আমাদের সার্বিক উন্নয়নে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই কৃষির উন্নয়ন মানে দেশের সার্বিক উন্নয়ন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই স্বাধীনতার পরপরই কৃষিকে উন্নয়ন করতে নিয়েছিলেন নানামুখী পদক্ষেপ। তারই ধারাবাহিকতায় টেকসই কৃষি উন্নয়নে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষি ক্ষেত্রে সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং দিকনির্দেশনায় খোরপোষের কৃষি আজ বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দশম।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন চলছে সারাদেশে। মুজিববর্ষে কৃষিতে বদলাবে বাংলাদেশ, কৃষিতে বদলে যাবে উপকূল।
কপিজাতীয় ফসলের চাষে সফলতার মুখ দেখেছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপক‚লীয় এলাকার কৃষকেরা, যাদের বেশ কিছু জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত । শুকনো মৌসুমে এই বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকে লবণাক্ততার কারণে, যা এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বড় হতাশা আর দুর্ভোগ। বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলের এই সমস্যা সমাধান করে কৃষকের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইকো কোঅপারেশন দি সল্ট সলিউশন নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের ৪টি জেলার (পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট ও খুলনা) এবং ৮টি উপজেলার (কলাপাড়া, গলাচিপা,বরগুনা সদর,তালতলী, বাগেরহাট সদর, রামপাল, দাকোপ ও কয়রা)  ৫০০০ চাষিপরিবার নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোডেক এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে  নেদারল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সল্ট ফার্ম টেক্সেল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের কৃষকরা লবনাক্ততায় আক্রান্ত জমিতে শীতকালীন কপি জাতীয় ফসলের লবণ সহনশীল জাতের উন্নত চাষাবাদের জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছে । কৃষকগণ প্রকল্পের থেকে প্রাপ্ত বীজ ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করে কপিজাতীয় ফসল চাষে পাচ্ছেন সফলতা যা এই অঞ্চলের কৃষকদের পারিবারিক আয় এবং পুষ্টি নিশ্চয়তার এক অনন্য সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।


কপিজাতীয় ফসলের গুরুত্ব
বাঁধাকপি : বাঁধাকপির মূলত বাংলাদেশের একটি শীতকালীন সবজি, যা পাতাকপি নামে বেশি প্রচলিত।  বাঁধাকপি কাঁচা কিংবা রান্না করে খাওয়া যায়। ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটকেমিক্যালসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদানে ভরপুর এই সবজি। এতে রয়েছে রিবোফ্লোভিন, প্যান্টোথেনিক  অ্যাসিড, থায়ামিন, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি ও কে। এছাড়াও বাঁধাকপি আয়রনের ভাল উৎস। বাঁধাকপি ওজন কমাতে সাহায্য করে, হাড় ভালো রাখতে সহায়তা করে, আলসার নিরাময়ে উপকারী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, কিডনি সমস্যা প্রতিরোধ করে, ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
ফুলকপি : ফুলকপি রান্না বা কাঁচা যে কোন প্রকারে খাওয়া যায়, আবার এটি দিয়ে আচারও তৈরি করা যায়। সাধারণত    ফুলকপির ফুল অর্থাৎ সাদা অংশটুকুই খাওয়া হয় আর সাদা অংশের চারপাশে ঘিরে থাকা ডাঁট এবং সবুজ পাতা দিয়ে স্যুপ রান্না করা যায়,যা আমাদের দেশে ফেলে দেওয়া হয়। এতে রয়েছে ভিটামিন বি,সি,কে, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও জিংক। একটি মাঝারি আকারের ফুলকপিতে রয়েছে শক্তি-২৫ কিলোক্যালরি । এছাড়াও ফুলকপিতে রয়েছে  কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, আঁশ, ফোলেট, নিয়াসিন, থায়ামিন, প্যানথানিক এসিড। বাঁধাকপি এবং ফুলকপি উভয়ই  রক্তে প্রোথম্বিন তৈরি হতে সাহায্য করে।
ওলকপি : ওলকপিতে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, লৌহ ভিটামিন বি, সি, কে এবং ভিটামিন এ। এছাড়াও রয়েছে ডায়েটারি ফাইবার এবং ফাইটোকেমিকেলস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সহ বিভিন্ন ক্যারোটিন। গøুকোসিনোলেটস ও অ্যান্টি অক্সিডেন্টগুলো স্তন ও প্রোস্টেটসহ সব রকম  ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।  
বিটকপি/রেডবিট : তবে লবণাক্ত এলাকার জন্য এটি হতে পারে এক আশীর্বাদ, কারন এটি  প্রাকৃতিকভাবেই লবণ সহিষ্ণু। দি সল্ট সল্যুশন প্রকল্পের মাধ্যমে রেডবিটের বোরো নামক জাতটি খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে চাষাবাদ করা হয়। এতে দেখা যায় সমুদ্রের পানি দিয়ে সেচ দিলেও গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয় না। তাই দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় শুকনো মৌসুমে যখন মিষ্টি পানি থাকে না তখন সহজপ্রাপ্য লবণাক্ত পানি ব্যবহার করেই রেডবিট ফলানো সম্ভব। রেডবিট বা বিটকপির কোনো অংশই ফেলার নয় এর পাতা এবং মূল দুটোই খাওয়া যায়। শহর এলাকায় কিংবা বিভিন্ন সুপারশপে রেডবিট কেজি প্রতি ২০০-৬০০ টাকা মূল্যেও বিক্রি হয়। অতএব কৃষকের আয় বৃদ্ধিতেও রেডবিট এর সম্ভাবনা অনেক এবং এটি পুষ্টি গুণেও অনন্য। এতে রয়েছে প্রচুর আয়রন। এছাড়াও এতে রয়েছে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৬ ইত্যাদি। রক্ত পরিষ্কার করতে, যকৃতের অসুস্থতায়, কোষ্ঠকাঠিন্যে, স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় রেডবিট উপকারী।      
লবণাক্ত জমিতে কপিজাতীয় ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি
জাত পরিচিতি: আমাদের দেশে বাঁধাকপি, ওলকপি এবং ফুলকপির কোনো লবণ সহিষ্ণু জাত নেই। দি সল্ট সল্যুশন প্রকল্পের মাধ্যমে নেদাল্যান্ডস থেকে এই সকল সবজির বিভিন্ন লবন সহিষ্ণু জাত এনে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের দেয়া হয় এবং লিড ফার্মারের মাধ্যমে প্রদর্শনী প্লট বাস্তবায়ন করা  হয়।
চারা উৎপাদন পদ্ধতি :  বাঁধাকপি, ওলকপি এবং ফুলকপির  চারা বীজতলায় উৎপাদন করে জমিতে লাগানো হয়। সীড ট্রে তে করে চারা উৎপাদন করাই সবচেয়ে উত্তম। অধিক পরিমাণে জৈব উপাদান সমৃদ্ধ মাটিতে ০.৫-১.৫ সেমি গভীরে বীজ বপন করতে হবে। প্রতিটি গর্তে বা বক্সে ১-২টি বীজ রোপণ করতে হবে। বীজতলায় বীজ অবশ্যই লাইন করে রোপণ করতে হবে। অনেকেই এলমেলোভাবে বীজ বপন করে এতে চারা খুব ঘন হয় এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় সহজেই।
বীজতলার আকার ১ মিটার পাশে ও লম্বায় ৩ মিটার হওয়া উচিত। সমপরিমাণ বালি, মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে ঝুরাঝুরা করে বীজতলা  তৈরি করতে হয়। বীজতলায় চারা রোপণের আগে ৭/৮ দিন পূর্বে প্রতি বীজতলায় ১০০ গ্রাম  ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। পরে চারা ঠিকমত না বাড়লে প্রতি বীজতলায় প্রায় ১০০ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দেয়া ভাল। রেড বিটের বীজ সাধারনত সরাসরি বুনতে হয় তবে চারা উৎপাদন করেও রেডবিট আবাদ করা যায়।  
জমি তৈরি ও চারা রোপণ : গভীর ভাবে ৪-৫টি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করতে হবে। বীজ বপনের ৩০-৩৫  দিন পর বা দুই থেকে তিনটি পাতা সমৃদ্ধ প্রায় ১০ সেমি লম্বা সুস্থ সবল চারা রোপন করতে হবে। লবনাক্ততা মোকাবেলায়  রিজ-ফারো পদ্ধতিতে জমি তৈরি করতে হবে। এ পদ্ধতিতে বাঁধাকপি ও ফুলকপির জন্য বেডের সাইজ একই এবং রেডবিট, ওলকপির জন্য আলাদা। চারা আঁকাবাঁকা বা জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে রোপণ করতে হবে  চারা থেকে চারার দূরত্ব হলো- বাঁধাকপি: ১৮-২০ ইঞ্চি, ফুলকপি:  ২০-২২ ইঞ্চি, ওলকপি:  ৯-১২ ইঞ্চি, রেডবিট:  ৩-৪ ইঞ্চি।
সার প্রয়োগ ও সেচ দেয়া : মাটি পরীক্ষা করে অথবা এস আর ডি আই কর্তৃক নির্দেশকৃত সার ব্যবহার করতে হবে । তবে লবণাক্ত মাটিতে শতাংশ প্রতি ২৫-৩০ কেজি জৈবসার এবং ৪-৬ কেজি জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া  সার ২ কিস্তিতে চারা রোপণের ২০-২৫ দিন পর একবার এবং  ৩০-৪০ দিন পর আর  একবার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া বাদে বাকি সার জমি প্রস্তুতির সময় প্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার পরপরই সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া ২-৩ দিন পর পরই সেচ দিতে হবে।
কৃষিতাত্তি¡ক পরিচর্যা : সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা : সার দেয়ার পরপরই সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। জমিতে পানি বেশি সময় ধরে যেন জমে না থাকে সেটাও খেয়াল করতে হবে। সার দেয়ার আগে মাটির আস্তর ভেঙে দিয়ে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
বিশেষ পরিচর্যা : গাছের সারির মাঝে সার দেয়ার পর সারির মাঝখানের মাটি তুলে দুইপাশ থেকে গাছের গোড়ায় টেনে দেয়া যায়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়।
রোগ ও পোকা দমন : ফসলের রোগ ও পোকা দমন করতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যেমন (১) আগাম বীজ বপন করা  (২) বীজ শোধন করে রোপণ করা (৩) সুষম সার ব্যবহার করা  (৪) সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ করা  (৫) চারা লাগানোর এক সপ্তাহের মধ্যেই জমিতে ফেরোমন ফাঁদ পাততে হবে । (৬) ফসলের ক্ষেত সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে (৭) পানি নিষ্কাশনের সুব্যাবস্থা থাকতে হবে (৮) শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে (৯) হাত দ্বারা পোকার  কীড়া ও ডিম সংগ্রহ করে ধ্বংস  করা (১০) আক্রমণের তীব্রতা খুব বেশি হলে নির্দিষ্ট মাত্রায় অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।

কৃষিবিদ মোঃ মাসুদ রানা

সিনিয়র এগ্রিকালচার অফিসার, ইকো কোঅপারেশন, বাংলাদেশ, মোবাইলঃ ০১৭১৬৩৩০৭৭৫, m.rana@icco.nl

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook