কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী চিন্তায় পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার

১মো. ইমদাদুল হক, ২মো. কামরুজ্জামান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আইজ্যান হাওয়ার্সের ১৯৫৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এটমস ফর পিস (অঃড়সং ভড়ৎ চবধপব) বিষয়ে      বক্তৃতার মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরমাণু শক্তির সামরিক প্রয়োগে বিশ্ববাসী যে মানবিক বিপর্যয়ে ছিল তা থেকে দৃষ্টি সরানোর লক্ষ্যে, পারমাণবিক শক্তি কিভাবে শান্তিপূর্ণ পর্যায়ে ব্যবহার করা যায় সে সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে আস্থায় আনা। অপরটি হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর মাধ্যমে পরমাণু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কোনো দেশ যাতে পারমাণবিক প্রযুক্তি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) নামক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা। অতঃপর ১৯৫৭ সালে অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনামে আইএইএ নামক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশ ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সালে আইএইএর সদস্যপদ লাভ করে, কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয় ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ৩১শে আগস্ট ১৯৭৯ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
এদেশে সর্বপ্রথম ১৯৬২ সালে গবেষণা কাজে ঢাকায় বাংলা একাডেমি সংলগ্ন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র  প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ       মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার-১৫, ১৯৭৩ এর মাধ্যমে দেশে পরমাণু শক্তি শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের  প্রতি আগ্রহ এবং তাঁর জামাতা বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী       ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার পরামর্শে পরমাণু শক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আদলে দেশে পরমাণু গবেষণাগার তৈরি করার জন্য সাভারে ২৬৫ একর জমি বরাদ্দ দেন এবং সেখানে পরে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের বৃহত্তর পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অতঃপর এ প্রতিষ্ঠানেই ১৯৮৬ সালে স্থাপন করা হয় ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক গবেষণা চুল্লি। আইএইএ-র কারিগরি সহযোগিতায় পরমাণু শিক্ষা ও গবেষণা, খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন, পানিতে আইসোটোপ কৌশল প্রয়োগ, পরিবেশ সুরক্ষা,      নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিংয়ের মতো শিল্প সহায়তা, শস্য ও গবাদিপশুর উন্নয়ন এবং পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মতো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভ‚ত উন্নতি সাধন করেছে।
পুষ্টি নিরাপত্তায় পারমাণবিক কৌশল : বিজ্ঞানের ভাষায়, ফসলের বৈশিষ্ট্য সমূহ নিয়ন্ত্রিত হয় ভিন্ন ভিন্ন জিনের মাধ্যমে। সকল জিনের কাজ এক রকম নয়। কোনো জিন ফসলের ফলনের জন্য দায়ী, কোনটি উচ্চতা, কোনটি রং, কোনটি রোগ সৃষ্টির আবার কোনটি রোগ প্রতিরোধের। এ রকম হাজারো বৈশিষ্ট্যের জন্য হাজারো রকম জিন দায়ী। এ জিনগুলো চারটি নিউক্লিওটাইড : এডিনোসিন, থাইমিন গুয়ানোসিন, সাইটোসিনের দীর্ঘ চেইনের মাধ্যমে গঠিত। দীর্ঘ এ চেইনের কোথাও একটু পরিবর্তন ঘটলে এর কার্যক্রমের পরিবর্তন ঘটতে পারে। এ পরিবর্তনের ফলে নানান কিছু হতে পারে। রোগ সংবেদনশীল জিনটি রোগপ্রতিরোধী হতে পারে, প্রতিক‚ল আবহাওয়ার উপযোগী জিনের উদ্ভব ঘটতে পারে যা ফসলের জন্য কাক্সিক্ষত। তেজস্ক্রিয় রশ্মি ফসলের বীজ, কাÐ, পাতা, পরাগরেণু ইত্যাদিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করলে ক্রোমোসোমের মধ্যে এ সকল বংশগতির পরিব্যপ্তিক পরিবর্তনই ঘটে। সংখ্যায় কম হলেও দৈব এ ঘটনার মাধ্যমে ফসলের কাক্সিক্ষত জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব। প্রায় ৩০০ খ্রীষ্টপূর্বে চাইনিজ একটি বই ‘খঁষধহ’ তে সর্বপ্রথম ফসলের পরিব্যাপ্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ভাল জাত নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল। তবে বিশ্বে সর্বপ্রথম ‘টিউলিপ’ ফুলে গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে ১৯৫৪ সালে একটি মিউট্যান্ট জাত উদ্ভাবন করা হয়েছিল। আর এর পর থেকেই বিভিন্ন ফসলের গবেষণায় পরমাণু শক্তির নিয়মিত ব্যবহার হয়ে আসছে এবং এ ক্ষেত্রকে আরও গতিশীল করে তুলেছে। আইএইএ ও আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রবন্ধে বলা হচ্ছে, পরমাণু শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন শতকরা ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এছাড়াও উচ্চফলনশীল আগাম, রোগ, বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব।
বাংলাদেশে তেজষ্ক্রিয় পরমাণু থেকে নির্গত গামারশ্মি এবং অন্যান্য অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের জাত উন্নয়ন করছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা)। এটির প্রধান কেন্দ্র ময়মনসিংহের  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে অবস্থিত। এছাড়া সারাদেশে ১৩টি উপকেন্দ্র নিয়ে আঞ্চলিক গবেষণা পরিচালনা করে থাকে। বিনা খাদ্যশস্য গবেষণায় পরমাণু শক্তির ব্যবহারকারী দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। আইএইএর কারিগরি সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি উচ্চফলনশীল, লবণাক্ত ও বন্যা সহিষ্ণু শস্যের জাতের উন্নয়ন ও উদ্ভাবন  করে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এ যাবৎ ১৮টি ফসলের ১০৭টি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। যার বেশিরভাগই বৈশ্বিক উষ্ণতা  বাড়ার কারণে সৃষ্ট কৃষির হুমকিসমূহ মোকাবেলায় অত্যন্ত উপযোগী। ধানের নতুন জাত ব্যবহার ও পারমাণবিক কৌশলের       সহায়তায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে ধানের উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি করেছে। বিনা উদ্ভাবিত আমনজাতের ধান          বিনাধান-৭ উত্তরবঙ্গে মঙ্গা নিরসন করেছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে পানি নেমে গেলে কৃষক ভাইয়েরা ধানের চারা পাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়েন। এ সমস্যা নিরসনে বিনাশাইল জাতের ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। জাতটি বন্যার পরপর অর্থাৎ একটু দেরিতে রোপণ করলেও হেক্টরপ্রতি ৩.৫-৪.০ টন ফলন দিতে পারে। সমুদ্র উপক‚লীয় লবণাক্ত জেলাসমূহে ধান চাষ বিঘিœত হচ্ছে। বিনা উদ্ভাবিত বোরো মৌসুমের জন্য লবণসহিষ্ণু ধানের জাত বিনাধান-৮, ইতোমধ্যে ৮-১০ ডেসি সিমেন/মিটার (ডিএস/মি.) মাত্রায় লবণ সহনশীল এবং     বিনাধান-১০ যা  ১২-১৪ ডেসি সিমেন/মিটার মাত্রায় লবণ    সহনশীল। ইতিমধ্যে জাত দুটি উল্লেখিত জেলাসমূহে ব্যাপকহারে চাষাবাদ হচ্ছে। উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল, স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত বিনাধান-১৪। জাতটির চালেপ্রায় শতকরা ১০ ভাগ আমিষ আছে যা ধানের অন্যান্য জাতের তুলনায়প্রায় শতকরা ২ ভাগ বেশি। যদি একজন         মানুষপ্রতিদিন এ জাতের ৪৫৩ গ্রাম চালের ভাত খায় তবে অন্যান্য জাত অপেক্ষা ৯.০৬ গ্রাম বেশি আমিষ পাবে।
 লবণাক্ত এলাকায় বেশির ভাগ জমি রবি মৌসুমে খালি থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৮ ডি. এস./মি. লবণাক্ততা সহিষ্ণু একটি চীনাবাদামের জাত উদ্ভাবন সম্ভব হলে প্রায় ৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে চীনাবাদাম চাষ সম্ভব হবে যেখান থেকে ১০ লক্ষ টন বাদাম ও ৩.৫ লক্ষ টন ভোজ্য তেল পাওয়া সম্ভব। বিনার রয়েছে উচ্চ তাপমাত্রা   সহনশীল চীনাবাদামের জাত, বিনাচীনাবাদাম-১ ও বিনাচীনাবাদাম-২। গবেষণায় দেখা গেছে বাতাসের গড় তাপমাত্রা ৪০ডিগ্রী সেলসিয়াস হলেও চীনাবাদামের জাত ২টি ভালো ফলন দিতে পারে। বাংলাদেশের লবণাক্ত এলাকার জন্য বিনা উদ্ভাবন করেছে বিনাসরিষা-৫, বিনাসরিষা-৬, বিনাসরিষা-৭ ও  বিনাসরিষা-৮। চারটি জাতই ৬ ডি.এস./মি. লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় উক্ত জমিতে চাষ করা সম্ভব। পূর্বে লবণ সহিষ্ণু জাত না থাকার কারণে জমি পতিত থাকত। যা রবি মৌসুমে লবণাক্ততার কারণে পতিত থাকে চাষ করা সম্ভব। যে সব এলাকায় সেচের সুবিধা কম সেখানে খরা সহনশীল বিনার ৪টি জাত চাষের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। জাতগুলো চাষের জন্য মাত্র ১/২টি সেচই যথেষ্ট। জাতগুলোর ফলন যথাক্রমে ১.৪, ১.৮ ও ১.৭  টন/হেক্টর। বিনাতিল-১ এর বীজে তেলের পরিমাণ অন্যান্য জাত অপেক্ষা অনেক বেশি (৫০%)। বিনামুগ-৮ জাতটি উচ্চফলনশীল (হেক্টরপ্রতি গড় ফলন   ১.৮-২.০ টন) এবং অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ (২২.৫%), ফলপ্রায় একসাথে পাকে। পাতা হলুদ মোজাইক রোগ সহ্যক্ষমতা সম্পন্ন। জাতটি খরিফ ও রবি দুই মৌসুমেই চাষ করা যায়।          বিনামুগ-৮ সারাদেশে চাষ করা যায়। গম ও আলু উঠানোর পর আমন ধান রোপণের পূর্বে জমিতে এ সময় অন্য কোন ফসল না থাকায় বিনামুগ-৮ এর চাষ হয়ে থাকে। আমন ধান কর্তনের পর বরেন্দ্র এলাকায় অধিকাংশ জমিতে পানির অভাবে কোন ফসল আবাদ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বিনাছোলার জাতসমূহ চাষাবাদে কম পানির প্রয়োজন হয় বিধায় খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকায় এর ব্যাপক চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশে নতুন উদ্ভাবিত চীনাবাদাম জাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশি সমাদৃত জাত      বিনাচীনাবাদাম-৪। বিনাচীনাবাদাম-৪ সারা বছর সমান ফলন দেয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ২.৫-৩.০ টন। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪৮.৬ ভাগ ও আমিষের পরিমাণ ২৭.৫ ভাগ।          চীনাবাদাম শিকড়ের নডিউলের মাধ্যমে জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বায়বীয় নাইট্রোজেন যুক্ত করে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। বিনা উদ্ভাবিত সয়াবিন জাতগুলোতে আমিষের পরিমাণ শতকরা ৪৩-৪৪.৫ ভাগ। ফলন ২.৪-৩.০ টন/হেক্টর। বিনাপাটশাক-১ নামক সারা বছর চাষ করা যায় শাকের এ জাতটিতে অল্প সংখ্যক গাছে অনেক বেশি শাক পাওয়া যায়, প্রচুর ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ ও ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক।
পরিশেষে বলা যায় শুধু বাংলাদেশেই নয়, পরমাণু শক্তির এ রকম শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে  বিশ্বব্যাপী আজ ৩ হাজারের অধিক উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের উন্নতি করা হয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যার দ্রæত বৃদ্ধি এবং পরিবেশ আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠায় বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদা মেটানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে এই পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কলা কৌশল। য়

১বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ, বিনা, মোবা : ০১৯১৩৬৩৭৮১৫, ই- মেইল : ধঢ়ঁ.ঢ়ংঃঁ@মসধরষ.পড়স  ২ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ , বিনা, ময়মনসিংহ-২২০২, মোবাইল : ০১৭৭৬৯৬০৭৬৯

 

বিস্তারিত
সুস্বাস্থ্যে চা-এর ব্যবহার

মো. মোসারফ হোসেন১ অতিথি সাহা২

চা চিরসবুজ উদ্ভিদ প্রজাতি ঈধসবষষরধ ংরহবহংরং, যার শুকানো পাতা থেকে তৈরি হয়। জনপ্রিয় পানীয়। এটি বাংলাদেশে মূলত একটি কৃষিভিত্তিক, রপ্তানিমুখী, বহুবর্ষজীবী ফসল। চা সাধারণত সুগন্ধযুক্ত, প্রশান্তিদায়ক ও স্বাদবিশিষ্ট এক ধরনের উষ্ণ পানীয়, যা অনেকেই উপভোগ করে। ক্লান্ত দেহে যখন অলসতা এসে বাসা বাঁধে তখনই এই আলস্য দূর করতে চাই এক কাপ চা। ইংরেজিতে চা-এর প্রতিশব্দ হলো টি (ঃবধ)। গ্রিকদেবী থিয়ার  নামানুসারে এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। চীনে ‘টি’-এর উচ্চারণ ছিল ‘চি’। পরে হয় যায় ‘চা’।
বাংলাদেশে চা শিল্পের বিকাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ      মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। তিনি ৪ জুন  ১৯৫৭ সাল হতে ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রথম বাঙালি হিসাবে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থেকে বাঙালি জাতিকে সম্মানিত করেন। বঙ্গবন্ধু চা বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন চা চাষাবাদ, কারখানা উন্নয়ন, অবকাঠামো ও শ্রমকল্যাণের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কার্যকর উদ্যোগের ফলে চায়ের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে এদেশে চা শিল্পের ব্যাপক উন্নতি সাধন হয়।
পুষ্টিগুণাগুণ
স্বাস্থ্য রক্ষায় চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুষ্টিগুণ সামান্য হলেও এতে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যেমন- পলিফেনলস, ফ্ল্যাভোনয়েডস এবং ক্যাটেচিন। পলিফেনলস এবং ক্যাটেচিন ফ্রি রেডিক্যালস তৈরিতে বাধা দেয় এবং কোষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। একারণে চা ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চায়ে উপস্থিত পলিফেনলসের পরিমাণ ২৫% এরও বেশি যা দেহের অভ্যন্তরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
চায়ে ৭% থিওফাইলিন ও থিওব্রোমিন রয়েছে যা শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির জন্য অনেক উপকারী। চা এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ হলেও এতে রয়েছে ক্যাফেইন নামক উত্তেজক পদার্থ।    সাধারণত এক কাপ চায়ে রয়েছে (৩০-৪০) মিলিগ্রাম ক্যাফেইন এবং এক কাপ কফিতে এর প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ (৮৫ মিলিগ্রাম) ক্যাফেইন রয়েছে। বস্তুত ক্যাফেইনের কারনেই ঘুম কম হওয়া,হজমে ব্যঘাত ঘটা ইত্যাদি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই ক্যাফেইনের কিছু ভালো দিকও রয়েছে। এটি হৃদপিÐ ও দেহের অন্যান্য পেশি সতেজ রাখতে সহায়তা করে।
চায়ের উপকারিতা
যেহেতু চা আমাদের প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনের নিত্যসঙ্গী, সেহেতু এই চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু উপকারী এবং কতটুকু ক্ষতি করছে তা জানা অত্যাবশ্যক। আজ আসুন জেনে নিই চা পানের উপকারিতা এবং অপকারিতা সম্পর্কে।
ফিগার ঠিক রাখতে অনেকেই গ্রীন টি-এর প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। গ্রীন টি প্রথমে ছিল ওষুধ, তারপর পানীয়তে পরিণত হয়েছে। জাপানের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে দুই কাপের বেশি গ্রিন টি পান করেন তারা          মানসিকভাবে অনেক বেশি ফিট। সবুজ চায়ে রয়েছে   ভিটামিন এ, সি, ই, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ছাড়াও বিভিন্ন খনিজ উপাদান যা প্রতিটি মানুষের শরীরেই প্রয়োজন। নিয়মিত সবুজ চা পান করলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমিয়ে দেয়। এছাড়াও কিডনি রোগের জন্য উপকারী। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। পোকামাকড় কামড়ালে যদি ঐ স্থান চুলকায় ও ফুলে যায় তাহলে সবুজ চায়ের পাতা দিয়ে ঢেকে দিলে আরাম বোধ হয়। রক্তে কোলেস্টোরেলের মাত্রা কমায়। ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী।
বিভিন্ন প্রকার চায়ের গুণাবলী
১. আদা চা : আদা চা খুবই উপকারী। বিশেষ করে         সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে এটি ওষুধের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। গরম আদা চা পান করলে গলাব্যথা কমে যায়। এসিডিটির বিরুদ্ধেও আদা চা কাজ করে। আদা চা পান করলে হজমের সমস্যা কমে।
২. দুধ চা : ক্লান্তি দূরীকরণে খুবই কার্যকর। নিয়মিত চা ও কফি পানে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। চা বা কফি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫ গুণ কমিয়ে দেয়। এছাড়া এ সময় স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ানো বলে এক গবেষণায় দেখা গেছে।
৩. লাল চা : এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ফ্লু, ঠাÐা, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রমণ ও অন্ত্রের প্রদাহ থেকে প্রতিরোধ করে দেহকে সুরক্ষা রাখে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় লাল চা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ফ্লু, ঠাÐা, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রমণ থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়।
হজম ভালো করে এর মধ্যে থাকা ট্যানিন হজম প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের সমস্যা এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে। লাল চা অন্ত্রের প্রদাহ প্রতিরোধেও কাজ করে।
গবেষণায় বলা হয়, লাল চা খাওয়া কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের জারিত হওয়া প্রতিরোধে কাজ করে। নিয়মিত লাল চা খেলে হৃৎপিন্ড ভালো রাখে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান দাঁতের ক্ষয় তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া এর মধ্যে থাকা ফ্লোরাইড মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।
লাল চায়ের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রেক্টাল, জরায়ুর ক্যানসার, ফুসফুস ও বøাডার ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এটি স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার ও পাকস্থলীর ক্যানসারও প্রতিরোধে কাজ করে।
অতিরিক্ত চা খাওয়ার ক্ষতিকর দিক
১. চায়ের ক্যাফেইন ঘুমের চক্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত চা পান ঘুমের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
২. চায়ের মধ্যে থাকা থিওফাইলিন নামে একটি রাসায়নিক উপাদান শরীরে ডিহাইড্রেশনের কারণ হতে পারে যেটা হজমে সমস্যা তৈরি করে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়।
৩. ঘুমে সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফলে উদ্বেগ ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
৪. গর্ভবতী নারীদের চা পান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।     চা-তে উপস্থিত ক্যাফেইন ভ্রুণের বিকাশে বাধা প্রধান করতে পারে যেটা পরবর্তীতে গর্ভপাত ঘটাতে পারে।
৫. চায়ের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো অতিরিক্ত চা পান প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা চা পান করে না এবং যারা প্রচুর চা পান করে তাদের মধ্যে অতিরিক্ত চা পানকারীদের প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
৬. হৃৎপিÐের জন্য ক্যাফেইন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যাদের হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে বা যারা হৃদরোগ থেকে আরোগ্য লাভ করছেন তাদেরকে চা এড়িয়ে চলা উচিত।
চা সম্পর্কে ভুল ধারণা
চা সম্পর্কে আমাদের অনেকের ভুল ধারণা আছে। যেমনঃ চা খেলে রাতে ঘুম আসে না, চা লিভারের ক্ষতি করে, চা চামড়া কালো করে ইত্যাদি। যদিও চা খেলে গায়ের রং কালো হবে না। কারণ ত্বকের রঙ নির্ভর করে ম্যালানোসাইট কোষের সক্রিয়তার উপর। চা পান করলে লিভারের কোন ক্ষতি হয় না। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, অতিরিক্ত চা পান করলে বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে। যেমনঃ অবসাদ ও কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।
সঠিক সময়ে চা পান
সঠিক সময়ে বা উপায়ে চা পান না করলে তা শরীরে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঘটায়। উপকারিতার পাশাপাশি শরীরে অন্য খাবার গুলো থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া থেকে বঞ্চিত এবং হজমে বাঁধা সৃষ্টি করতে পারে। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চা পান করা উচিত না। এতে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো হতে পারে।
১. চা খাবার থেকে আয়রন শোষণ করে। কারণ চা বা কফিতে রয়েছে পলিফেনল নামক উপাদান যা আয়রন শোষণ করে বা জেস্টানিনরে সঙ্গে আয়রন মিশে শরীর থেকে বের হয়ে যায়।
২. চা শরীরে থায়ামিন বা ভিটামিন বি শোষণ রোধ করে যা বেরিবেরি রোগের অন্যতম কারণ।
৩. চা খাবার থেকে আমিষ ও ভিটামিন শোষণ করে এবং শরীর এই খাবারগুলোকে হজম করতে পারে না।
কিছু নিয়ম মেনে চললে চা পানের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। যেমনঃ
১. খাবার খাওয়ার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে অথবা খাবার খাওয়ার এক ঘণ্টা পরে চা পান করা।
২. সকাল, দুপুর এবং রাতের খাবারের ১ থেকে ২ ঘণ্টা পরে চা বা কফি পান করা।
৩. যাদের হজমে ও অ¤øত্ব বা এসিডিটির সমস্যা রয়েছে তাদেরও এই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
চায়ের সাথে দুধ মেশানো ভালো না খারাপ?
চায়ে এমন অনেক সক্রিয় উপাদান আছে যা আমাদের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব বিস্তার করে। চায়ে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন থাকে। চা ইমিউন সিস্টেম বা রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উন্নত করে, রক্তের সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে, কোষের ক্ষতি কমায় এবং কারডিওভাস্কুলার রোগ প্রতিরোধ করে। কিন্তু চায়ের মধ্যে দুধ মিশ্রিত করলে ভাস্কুলার সিস্টেম এর উপর উপকারী প্রভাব কমে যায়।
২০০২ সালে টহরঃবফ ঝঃধঃবং এর হিউম্যান নিউট্রিশন রিসার্চ সেন্টারের একটি গবেষণায় পাওয়া যায় যে, এক কাপ চায়ে ৫০ গ্রাম দুধ মেশানো হলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা ৯০% কমিয়ে দেয়। যখন চায়ের কারণে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায় তখন শরীরের ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতাও কমে যায়। য়

১অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা। মোবাইল-০১৬৭৬৭১৩২৮০,২শিক্ষার্থী , স্নাতকোত্তর, খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান।   মোবাইল- ০১৬২৭৩২৭৮০৩, ইমেইল- atihisaha9@gmail.com

 

বিস্তারিত
মুজিব শতবর্ষে মাছ চাষে করণীয়

কৃষিবিদ মোঃ আলতাফ হোসেন চৌধুরী

১৯৭২ সালের  জুলাই মাসে কুমিল্লার  এক জনসভায়  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন মাছ হবে ২য় প্রধান  বৈদেশিক  মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ । এরই অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে  গণভবনের লেকে বঙ্গবন্ধু মাছের  পোনা  অবমুক্তকরণের  মাধ্যমে মাছ উৎপাদনের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেন । দীর্ঘদিন পরে  হলেও বঙ্গবন্ধুর দুরদর্শিতা বাস্তবে  রূপ লাভ করেছে । তাই মুজিব শতবর্ষে  মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘নিরাপদ মাছে  ভরবো দেশ মুজিব বর্ষে বাংলাদেশ’। এই প্রতিপাদ্যকে  সামনে রেখে  মৎস্য অধিদপ্তর কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে ।
মাছ চাষ মূলত : তিনটি বিষয়ের উপর ওতপ্রোতভাবে জড়িত, বিষয়গুলো হলোঃ (১) ফিড (খাবার), (২) সিড (পোনা), (৩)ম্যানেজমেন্ট (ব্যবস্থাপনা)। উক্ত বিষয়গুলোর একটির ঘাটতি হলেও মাছ চাষ ব্যাহত হয়। বর্তমানে সারা বাংলাদেশে শীতকালীন মৌসুমী হাওয়া বইছে এবং এই সময়ে তাপমাত্রা ও অনেক কম থাকে বিধায় মাছ চাষে অনেক সমস্যা দেখা যায়। তাছাড়াও মাটি ও পানির ভৌত রাসায়নিক গুনাবলি মাছ চাষের জন্য বড় নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। তাপমাত্রা কম ও ভৌত রাসায়নিক গুণাবলির সঠিক সমন্বয় মাটি ও পানিতে বিদ্যমান না থাকার কারণে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং বৃদ্ধি জটিল হয়ে পড়ে। অতীতে প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে ব্যাপক মৎস্য আহরণ সম্ভব ছিল কিন্তু বর্তমানে মনুষ্য সৃষ্টি কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে।         প্রাকৃতিকভাবে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে চাষের মাছের উপরনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ। আর অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করতে এবং অধিক উৎপাদন লাভের জন্য একদিকে যেমন অধিক পুঁজির প্রয়োজন তেমনি মাছের রোগবালাইসহ বিভিন্ন সমস্যা ও দেখা যায়। মুজিববর্ষে মাছ চাষে করণীয়সমূহ আলোচনা করা হলোঃ-
মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
রোগ জীবাণু দেহে প্রবেশ করার পর মাছের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্বারা বাধাগ্রস্থ হয়। অত্যন্ত উচ্চরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মাছে রোগ জীবাণুসহ  সংক্রমণ ঘটাতে পারে না। অপর পক্ষে, মাছের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে সহজেই রোগ হয়। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মাছের সার্বিক পরিবেশ, পানি ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। উন্নত জলজ পরিবেশ, সুষম খাদ্য ও উত্তম খামার ব্যবস্থাপনার দ্বারা মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায়।
মাছের  ক্ষতরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ                                                                                                                                                         ক্ষতরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের কারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান (জরংশ ঋধপঃড়ৎ) সমূহের উপর ভিত্তি করে নিম্নলিখিত ০৪টি মৌলিক কৌশলের মাধ্যমে  রাগ প্রতিরোধ/নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১. আক্রান্ত পুকুরে বিদ্যমান রোগ জীবাণু উচ্ছেদকরণ
ষ     শুষ্ক মৌসুমে পুকুর সম্পূর্ণরূপে শুকানো,  প্রয়োজনে তলদেশের পচাকাদা অপসারণ, বার বার চাষ দিয়ে চুন প্রয়োগ (শতাংশে ১ কেজি তবে মাটি ও পানির পিএইচ মাত্রার উপর চুন প্রয়োগের মাত্রা কম বেশি হয়)।
ষ     কমপক্ষে ২/৩টি ফসল উঠানোর পর পুকুর শুকানো ও চুন প্রয়োগ (শতাংশে ১ কেজি)।
২. বাইরের রোগ জীবাণুর  প্রবেশরোধ
ষ     পুকুরের পাড় উঁচুকরণ, পাড়ের সকল রকম গর্ত ও অন্তরমুখী নালা বন্ধ করা যাতে বন্যাসহ অন্যান্য বাইরের পানি পুকুরে প্রবেশ করতে না পারে।
ষ     পুকুরে নলক‚পের অথবা শোধিত পানি সরবরাহ করা, পুকুরের সাথে নদী-নালা, খাল-বিল বা অন্য কোন নর্দমা বা ড্রেন কেটে সংযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ পানি রোগ জীবাণুর একটি অন্যতম প্রধান বাহক।
ষ     রোগমুক্ত এলাকা থেকে সুস্থ ও সবল পোনা লবণ জলেশোধন করার পর মজুদ করা (২.৫% লবণ জলে ২/৩ মিনিট বা সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী ততোধিক সময়ে গোসল করানো)।
ষ     পুকুরে সকল প্রকার বন্য মাছ,  পোকা-মাকড়, কাকড়া, সাপ ব্যাঙ ইত্যাদির প্রবেশ রোধ করতে হবে। কারণ এরা বাইরের রোগ জীবাণু পুকুরের ভিতরে নিয়ে আসে।
ষ     পুকুরে সকল গৃহপালিত/বন্য পশুপাখির আগমন রোধ করতে হবে।
ষ     প্রাকৃতিক জলাশয়, ধানক্ষেত,  হাওর, বাওড়, বিলের পানিতে কাজ করার পর পুকুরে নেমে হাত-পা বা অন্য কোন সামগ্রী ধৌত করা যাবে না।
ষ     জালসহ অন্যান্য খামার সরঞ্জাম পুকুরে ব্যবহারের পূর্বে জীবাণুমুক্ত করতে হবে (বিøচিং পাউডার, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ইত্যাদি ব্যবহার করে)।
ষ     খামারে/হ্যাচারিতে প্রবেশের পূর্বে খামার কর্মী ও দর্শানার্থদের পা, জুতা ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত করা উচিত।
ষ     রোগের যাবতীয় বাহক (ঈধৎৎরবৎ) যেমন- পানি, বন্যমাছ, মানুষ, গরু, ছাগল, পাখি, পোকামাকড় ইত্যাদি দ্বারা রোগ ছড়ানোর ব্যপারে সতর্ক হতে হবে।
৩.     পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার মাধ্যমে মাছের উপর শারীরিক চাপ পরিহার
ষ     সঠিক উপায়ে পুকুর প্রস্তুতকরণ ( পুকুর শুকানো, তলদেশের পচাকাদা অপসারণ, বার বার চাষ দিয়ে শুকানো এবং চুন প্রয়োগ)।
ষ     পানির উন্নত গুণাবলী বজায় রাখা (পিএইচ, অক্সিজেন, এ্যামোনিয়া ইত্যাদি)।
ষ     মাছকে সকল প্রকার পরিবেশগত চাপ/পীড়ন থেকে মুক্ত রাখা যেমনÑ অতিরিক্ত মাছ মজুদ না করা। পরিমিত মাত্রায় সুষম খাদ্য প্রয়োগ। অতিরিক্ত জাল টানা বানড়া চড়ানা করা, যা মাছের শরীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষতের সৃষ্টি করে। কম ঘনত্বে মসৃণ পাত্রে মাছ পরিবহন করা। একই আকারের মাছ মজুদ করা। পানিতে নিয়মিত অক্সিজেন ঘাটতি, গ্যাসের আধিক্য বা দূষণ হলে পানি পরিবর্তন করা।
ষ     শীতকালই ক্ষতরোগ সংক্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তাই ইসময়ে মাছ ও তার পরিবেশ ও ঝুঁকি পূর্ণ সকল বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা।
ষ     শীতের শুরুতে শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা (তবে এটা পানির ক্ষারত্বের উপর নির্ভর করে পরিবর্তনশীল)।
ষ     অন্যান্য রোগ ও পরজীবীর ব্যাপারে সতর্ক থাকা।
ষ     আক্রান্ত এলাকায় রোগ সহিষ্ণু  প্রজাতির মাছ মজুদ করা।
ষ     মাছ ও খামারের নিয়মিত পরিচর্যা।
৪. মাছ ও খামারের নিয়মিত তদারকি ও মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা
মাছের আচরণের দিক দৃষ্টি রাখা। মাঝে মাঝে জালটেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা। মাছ রোগাক্রান্ত  হলে তার        চিকিৎসা ততসহজ নয়। রোগের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। তাইরোগ প্রতিরোধে পানির গুণাবলি উন্নয়ন ও উন্নত ব্যবস্থাপনা অধিক গ্রহণযোগ্য। সকল মৃত ও অর্ধমৃত মাছ অপসারণ করা ও মাটির নিচে পুঁতে ফেলা। দূষিত পানি পরিবর্তনে চুন প্রয়োগ (কলিচুন)            ১ কেজি/শতক (পিএইচ ও ক্ষারত্বের উপর ভিত্তি করে)। জিওলাইট শতাংশে ১৫০-২০০ গ্রাম ব্যবহার করে পানির এ্যামোনিয়াজনিত বিষক্রিয়া কমানো যায়। এককোষী/বহুকোষী পরজীবী সংক্রমণ হলে ৫০ পিপিএম ফরমালিনে (৩৭%) ২৮ ঘণ্টা গোসল করাতে হবে। আরগুলাস (উকুন) সংক্রমণে ০.২৫ থেকে ০.৫০ পিপিএমডি পটারেক্স আক্রান্ত পুকুরে ১০/১৫ দিন অন্তর অন্তর ২/৩ বার প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাকটেরিয়াজনিত ক্ষত বা পচন হলে ৫০ মি.গ্রা.  টেট্রাসাইক্লিন/কেজি মাছকে প্রতিদিন খাবারের সাথে মিশিয়ে ৫-৭ দিন খাওয়াতে হবে। ছত্রাক সংক্রমণ করলে ২০০     পিপিএম লবণ জলে আক্রান্ত মাছকে ১ ঘণ্টা গোসল (সপ্তাহে ১ বার) অথবা আক্রান্ত পুকুরে ০.৫ পিপিএম মিথাইলিন বøু প্রয়োগ করতে হবে।
রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই অধিক শ্রেয়। মাছ চাষের ক্ষেত্রে এই প্রবাদটির গুরুত্ব অপরিসীম। মাছ একটি জলজ প্রাণী। পানির সঠিক ভৌত রাসায়নিক গুণাবলি অর্থাৎ সুস্থ জলজ পরিবেশের উপরই এদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধি পাওয়া নির্ভর করে। অতএব, উন্নত জলজ পরিবেশ ও খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাছকে সুস্থ রাখা অধিকতর সহজসাধ্য, কম ব্যয়বহুল, কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরিবেশ বান্ধব। য়
খামার ব্যবস্থাপক, মৎস্য বীজ উৎপাদন খামার, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা, মোবা : ০১৭১২৪০৮৩৫৩, ঊসধরষ: Email: Chowdhari_33@yahoo.com

 

বিস্তারিত
মুজিববর্ষে ফসল উৎপাদনে ন্যানো ফার্টিলাইজার

কৃষিবিদ এম. আব্দুল মোমিন
ন্যানো ফার্টিলাইজার বা সার হচ্ছে ‘¯েøা রিলিজার’। এটি ফসলের ক্ষেতে ব্যবহার করলে গাছের গোড়ায় জমা থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গাছকে পুষ্টি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। কোন অপচয় যেমন হবে না, তেমনি গাছটিও সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে। আকারে ছোট হওয়ায় বীজের ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে এই পার্টিকেল বীজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেও প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে। ফলে উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপ‚র্ণ উপাদান সার। আগের দিনে    কৃষক গৃহস্থালির সমস্ত আবর্জনা এক জায়গায় জমা করত পচিয়ে সার হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। গোয়াল থেকে যে সমস্ত গোবর বা গৃহপালিত পশু পাখির বিষ্ঠা আসতো সেগুলোকে পচিয়ে জমিতে দিতো, এতে ভাল ফসল হতো। ৬০ দশকের পর সার যখন বাজারে ইউরিয়া, নাইট্রেজেন, ফসফারস এবং পটাশ আসে, তখন সার দেওয়ার সাথে সাথে ফসল উৎপাদন বাড়া শুরু হলো। ৭০ দশকের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কৃষি কার্যক্রম জোরদারকরণের জন্য ‘‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’’ এ সেøাগান তুলে সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। কৃষক দরদি এ মানুষটি দেশ স্বাধীনের পর বাইশ লক্ষ কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসিত করেছিলেন। বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে তিনি উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি সরবরাহ করেছিলেন। তিনি শিক্ষিত যুবকদেরকে আধুনিক পদ্ধতিতে নিবিড় কৃষি কাজ করার জন্য প্রেরণা দিয়েছিলেন এবং উদ্বুদ্ধ করেছিলেন যেন আমাদের দেশের উর্বর মাটির এক ইঞ্চিও অনাবাদি না থাকে। জাতির জনকের নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ দেশের আপামর কৃষক সমাজ ঝাঁপিয়ে পড়ে উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন সংগ্রামে। প্রচলিত পদ্ধতির নিবিড় চাষাবাদের কারণে উর্বরতা হারাতে থাকে মাটি। মাটির উর্বরতা রক্ষা ও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উৎপাদনের তাগিদে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাসায়নিক সার। কৃষকেরা ম্যাক্রো       নিউট্রিয়েন্ট হিসেবে জমিতে রাসায়নিক সার (এনপিকে) নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম ব্যবহার বৃদ্ধি পেল। কিন্তু মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সুরক্ষার জন্য কৃষক জমিতে যে সার ব্যবহার করে তার মাত্র ৩০ থেকে ৩৪ ভাগ ফসলের কাজে লাগে। আর শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ অপচয়ের মাধ্যমে ক্ষেতের পার্শ্ববর্তী জলাশয় বা অন্যান্য পানির সঙ্গে মিশে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে থাকে।
আরেকটি ভাবনার বিষয় হচ্ছে, কৃষকদের একটা প্রচলিত ধারণা হলো বেশি সার দিলে উৎপাদন বেশি হয়। ফলে তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু সার ক্ষেতে দেওয়ার পর প্রায় ৭০ ভাগ সার গ্যাস আকারে উড়ে যায় অথবা মাটির নিচে লিচিং হয়ে মাটি ও পানিতে মিশে দূষিত করে পরিবেশ। এতে একদিকে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, আরেক দিকে অ্যামোনিয়া আকাশে উড়ে গেøাবাল ওয়ার্মিং হচ্ছে। এর কারণে বায়ুমÐলের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের উপায় বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। গেøাবাল ওয়ার্মিং এড়াতেই নতুন টেকনোলজি ‘ন্যানো সার’ বা ন্যানো ফার্টিলাইজার উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা। এটি ন্যানো মিটার দিয়ে পরিমাপ করা হয়। ১ ন্যানোমিটার সমান টেন টু দি পাওয়ার মাইনাস ৯ মিটার বা ১ বিলিয়ন অফ এ মিটার। বস্তুকে ভেঙ্গে যখন অতটা ক্ষুদ্রতর পর্যায়ে নেয়া হয় তখন তার কার্যক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যায়, অনেকটা পারমাণবিক শক্তির মতো। ন্যানো পার্টিকেলের আকার অনুর চাইতে সামান্য বড়ো।
বিশ্বের সর্বাধুনিক ন্যানো টেকনোলজির সাহায্যে উদ্ভাবিত ‘ন্যানো সার’ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আনবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কাউন্সিল ফর সাইন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর) এর বিজ্ঞানীগণ ’ন্যানো ফার্টিলাইজার’ তৈরীর পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনে যাবার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে এর গবেষণা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ন্যানো টেকনোলজি বিশ্বের অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র প্রযুক্তি যা সহজেই ফসলের মূলে প্রবেশ করে তার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে। এর ব্যবহারে তৈরি সার ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
ন্যানো ফার্টিলাইজার ধরন : এটা এমন একটি সার যেখানে ফসলের প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদানকে অনেক কম মাত্রায়, একসাথে মিশিয়ে উপাদানগুলোকে কম্প্যাক্ট করে পলিমারাইজড করা হয়। ফলে স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। ফসলের গাছ দ্রæত এটা নিতে পারছে। এটা আট মাস পর্যন্ত রাখা যায়। এতে লাভ হচ্ছে একবার সার ব্যবহার করে দুই ফসল ফলানো যাচ্ছে। কেননা আমাদের দেশে এক বছরে প্রায় দুই বা তিনটি ফসল হয়। এখন ফসলের জন্য একাধিকবার সার দিতে হয়, এতে আনুপাতিক হারে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। আবার এমোনিয়া আকাশে উড়ে, বায়ুমÐল দ‚ষিত হচ্ছে। কৃষককে কিন্তু এগুলো কিনতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়টি হলো অ্যাপ্লিকেশনের দিক দিয়ে বৈচিত্র্য আসছে। আমাদের দেশের কৃষক নাইট্রোজেন ফসফেট কিনে নিয়ে যায় বস্তা ধরে। তিনটা বস্তা নিলো, নিয়ে গিয়ে ক্ষেতের পাশে একটা চট পেড়ে নিলো। তার উপরে ঢেলে দিলো, তারপর হাত দিয়ে মিশানো শুরু করল। এখন একটা ফসফেটের দানা একটা  ইউরিয়ার দানার চেয়ে অনেক বড়। আবার একটা ইউরিয়ার দানা ফসফেটের দানার চেয়ে অনেক ছোট। আর পটাশিয়াম এর দানাটা কৃস্টাল। তিনটাকে মেশানো হলো। ছড়ানোর সময় কি হলো, বড় দানাটা আগে হাতে আসবে, তাহলে যে এলাকাতে বড় দানাটা পড়ল, সেখানে ফসফেট বেশি পড়লো। তারপর আরেক পাশে ইউরিয়া বেশি পড়ল। পরের পাশে   পটাশিয়াম বেশি পড়ল। একই ক্ষেতের মধ্যে, অর্থাৎ একটা কৃষকের ক্ষেত যদি বিশ শতক হয়, তার মধ্যে যদি তিন ভাগের এক ভাগে ফসফেট বেশি পড়ে, তারপর তিন ভাগের আরেক ভাগে ইউরিয়া বেশি পড়ে এবং তিন ভাগের অপর ভাগে    পটাশিয়াম বেশি পড়ে, ফলনের তারতম্য হবে।
ন্যানো ফার্টিলাইজার কিন্তু একটা নতুন টেকনোলজি। এটাকে কৃষকের কাছে কমিউনিকেট করতে হবে। ইদানীংকালে যেটা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে ফার্টিলাইজার আইন আছে, পলিসি আছে এবং এগুলোর একটা মানদÐ আছে। ন্যানো ফার্টিলাইজার হলো এখনকার সলিউশন বা সমাধান। ইতোমধ্যে ন্যানো ফার্টিলাইজারের টেস্ট ট্রায়েল শুরু করেছে বেসরকারি সংস্থা এসিআই লিমিটেড।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চা বাগানের গাছগুলো আলাদা আলাদা থাকে। গাছের গোড়ায় যদি ৫০ গ্রামের গ্রানয়েল (ন্যানো ফার্টিলাইজার) দিয়ে দেয়া হয়, সেটা চায়ের যে লাইফ সাইকেল আছে অর্থাৎ উৎপাদনের সময়টা সাত আট মাস, এই পুরো সময়টা চা উৎপাদন করা যাবে। চা বাগানে সার ছড়িয়ে দিলে বৃষ্টি হলে পানিতে গড়িয়ে নিচে চলে যায়। অনেক সময় লিচিং হয় না, মাটিতে মেশে না। সেক্ষেত্রে গাছের গোড়াতে ফার্টিলাইজারটা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। এই ন্যানো ফার্টিলাইজার চা বাগানে অনেক বেশি দেওয়া লাগবে না। এতে করে একদিনে একজন শ্রমিক এক একর জমিতে সার ছিটাতে যে পরিমাণ খরচ হয় তার অনেক কম খরচ হবে, বাড়তি লেবার লাগবে না, তেমনি বাড়তি সারও লাগবে না।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে অর্গানিক ফার্টিলাইজার। আমাদের জমিগুলো প্রতিনিয়ত চাষবাসের কারণে কম্প্যাক্ট হয়ে যাচ্ছে। মাটির নিচে কিন্তু অক্সিজেন দরকার এবং মাটি ফাঁপা হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে এখানে যদি অর্গানিক সার দেই তাহলে কিন্তু জমির উর্বর হবে। আমাদের দেশে কিন্তু অনেক কিছুর ওয়েস্টেজ হয়, যেমন কুসরের ছোবড়া, পাটকাঠি, বাড়ির আবর্জনা, গোবর, মুরগির বিষ্ঠা সবকিছু মিলে কিন্তু অনেক ওয়েস্ট আছে। এই ওয়েস্টগুলোকে যদি আমরা সঠিক নিয়মে একসাথে করে মাইক্রোবিল দিয়ে ট্রিট করতে পারি, তাহলে হবে কি এই সমস্ত ফার্টিলাইজার যেমন একদিকে মাটি ফাঁপা করবে। আরেকদিকে পানির রিটেনশন বাড়াবে। পানি ধারণক্ষমতা বাড়াবে। সাথে সাথে শিকড়ের সক্ষমতা বাড়াবে এবং গাছের যেসমস্ত উপাদান দরকার হয় তা সরবরাহ করবে। অন্য সার প্রয়োগের পর এই সারগুলো গাছ নিতে পারবে। তাতে ফসলের ফলন অনেক বেড়ে যাবে।
ন্যানো টেকনোলজির প্রয়োগ বিশ্বব্যাপী শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সে ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশের মতো ন্যানো ফার্টিলাইজার তৈরি করে তা দেশের কৃষকদের হাতে তুলে দিতে পারলে সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি সাধিত হবে। য়

ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর, মোবাইল : ০১৭১৬৫৪০৩৮০, ইমেইল-ংsmmomin80@gmail.com.

 

 

বিস্তারিত
মুজিববর্ষে নিরাপদ আম উৎপাদনে করণীয়

কৃষিবিদ ড. মো: শরফ উদ্দিন
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং সেই সাথে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই কৃষিবিদগণ নিজেদের অবস্থান থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাগুলো পালন করে যাচ্ছেন। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতিতে এবং এ দেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে আম একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। এসডিজি, ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ অর্জনেও এই ফলটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখে চলেছে। আম এ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল, যা ছোট-বড় সকলের নিকট পছন্দনীয়। বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান এবং স্বাদ-গন্ধে এটি একটি অতুলনীয় ফল। প্রতি বছর আমের উৎপাদন বাড়ছে ঠিকই কিন্তু গুণগতমানসম্পন্ন আমের উৎপাদন আশানুরূপভাবে বাড়ছে না। কারণ  অনুসন্ধানে দেখা যায়, আম চাষিরা এখনও গতানুগতিক পদ্ধতিতে আম বাগান ব্যবস্থাপনা করছেন। তবে বিগত কয়েক বছরে নিরাপদ, বিষমুক্ত আমের উৎপাদন বেড়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু উদ্যোগ আম চাষিদের ভালো আম উৎপাদনে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করছে। দেশে নিরাপদ ও বিষমুক্ত আমের চাহিদা বাড়ছে এবং আম রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এমতাবস্থায়,  মুজিববর্ষে গুণগতমান সম্পন্ন আমের উৎপাদন বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ষ গুণগতমানসম্পন্ন আম উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতি বছর আম গাছের বয়সানুযায়ী সুষম মাত্রার সার প্রয়োগ করা।
ষ পোকামাকড় ও রোগবালাই সময়মতো দমন করা এবং যথাসম্ভব কম পরিমাণে বালাইনাশক ব্যবহার করা।
ষ উপযুক্ত পরিপক্বতায় সঠিক পদ্ধতিতে আম সংগ্রহ করা।
আম গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও ভালমানের আম উৎপাদনের জন্য সুষম সার প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। নির্ধারিত মাত্রার সুষম সার তিন কিস্তিতে প্রতি বছর ১৫-৩০ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। একটি           ৫-৭ বছর বয়সী গাছের জন্য গোবর সার ৩৫ কেজি, ইউরিয়া ৮৭৫ গ্রাম, টিএসপি ৪৩৮ গ্রাম, এমওপি ৩৫০ গ্রাম, জিপসাম ৩৫০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১৮ গ্রাম এবং বোরিক এসিড ৩৫ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তির সার (জৈবসার, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট এবং বোরিক এসিড এর সম্পূর্ণ পরিমাণ এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও অর্ধেক এমওপি সার) প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট অর্ধেক ইউরিয়া এবং অর্ধেক এমওপি সমান দুইভাগে ভাগ করে একভাগ আমের গুটি মটরদানাকৃতি হলে এবং সংগ্রহের এক মাস আগে প্রয়োগ করতে হবে। ফলে আমের আকার ও ফলন বৃদ্ধি পাবে। কোন চাষি যদি ফুল ফোটার আগে সার প্রয়োগ না করে থাকেন তবে পরবর্তীতে বয়সানুযায়ী নির্ধারিত মাত্রার পুরোটাই প্রয়োগ করতে হবে।
নালা করে সার প্রয়োগ করা উত্তম। সার প্রয়োগের পর হালকা সেচ দিতে হবে। গাছের চারিদিকে গোড়া থেকে কমপক্ষে ১ থেকে ১.৫ মি. বাদ দিয়ে দুপুর বেলায় যে পর্যন্ত ছায়া পড়ে সেই এলাকায় সার ছিটিয়ে হালকাভাবে কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। গাছের বয়স বেশি হলে এই দূরত্ব বাড়তে পারে। ফুল আসার পূর্বে আম গাছে কোন প্রকার সার বা পানি প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। তবে এ সময়ে নিয়মিতভাবে গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
আম বাগানে হপার পোকা, মিলিবাগ ও স্কেল ইনসেক্ট যেন না থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। এদেশে জানুয়ারি-মার্চ সময়ে হপার পোকার আক্রমণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই পোকার আক্রমণ বেশি হলে আমের পাতা কালো হয়ে যায়, যা মহালাগা নামে পরিচিত। কুয়াশাছন্ন  আবহাওয়াই ইহা দ্রæত বিস্তার লাভ করে। আমবাগানে মুকুল বা পুষ্পমঞ্জরি বের হওয়ার সময় দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর থাকলে মহালাগার সম্ভাবনা কম থাকে তবে এই সময়ে তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে (৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) আমবাগানে হপার পোকার আক্রমণ বেড়ে যায়। সুতরাং এই সময়ে ঘন ঘন বাগান পরিদর্শন করতে হবে। আমবাগানে মুকুল বা পুষ্পমঞ্জরি বের হওয়ার আনুমানিক   ১৫-২০ দিন পূর্বে ইমিডাক্লোরোপ্রিড/সাইপারমেথ্রিন অথবা কার্বারিল গ্রæপের যে কোন কীটনাশক দ্বারা ভালভাবে সমস্ত গাছ ধুয়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে গাছে বসবাসকারী হপার বা শোষক পোকাসহ অন্যান্য পোকার আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। যদি সঠিক সময়ে হপার পোকা দমন করা না যায় তাহলে পরবর্তীতে আমের ফলন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। যেমন হপার পোকা আম গাছের কচি অংশের রস চুসে খেয়ে বেঁচে থাকে। আমের মুকুল বের হওয়ার সাথে সাথে এগুলো মুকুলকে আক্রমণ করে। এই পোকার আমের মুকুল থেকে রস চুসে খায় ফলে মুকুল শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। একটি হপার পোকা দৈনিক তার দেহের ওজনের ২০ গুণ পরিমাণ রস শোষণ করে খায় এবং দেহের প্রয়োজনের অতিরিক্ত আঠালো রস মলদ্বার দিয়ে বের করে দেয়, যা মধুরস বা হানিডিউ (ঐড়হবুফব)ি নামে পরিচিত। এ মধুরস মুকুলের ফুল ও গাছের পাতায় জমা হতে থাকে। মধুরসে এক প্রকার ছত্রাক জন্মায়। এই ছত্রাক জম্মানোর কারণে মুকুল, ফুল ও পাতার উপর কালো রঙের স্তর পড়ে, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
আমের ভাল ফলন পাওয়ার প্রধান অন্তরায় হলো আমের গুটি ঝরা। আমের গুটি ঝরা রোধ করতে, আম মটর দানাকৃতি অবস্থায় একবার এবং মার্বেল অবস্থায় দ্বিতীয়বার ইউরিয়া প্রতি ১ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম হারে খুব ভালভাবে মিশিয়ে স্প্রে করলে ফল ঝরা হ্রাস পাবে এবং ফলন ও ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে।
ফল মটরদানাকৃতি হলে উইভিল ও ফলছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হতে পারে। উক্ত পোকাদ্বয়ের আক্রমণ হলে ফেনিট্রোথিয়ন গ্রæপের কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ মি.লি হারে মধ্য মার্চ হতে ১৫ দিন অন্তর ২/৩ বার স্প্রে করতে হবে। আম পরিপক্ব হবার ১ মাস পূর্বে আমের মাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এক্ষেত্রে ফল সংগ্রহের অন্তত একমাস পূর্বে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ বা ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।     
আমের ভাল ফলন পেতে আম বাগানে অবশ্যই স্প্রে করতে হবে। বর্তমান সময়ে আমবাগানে বালাইনাশকের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ¯েপ্র করার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকার জন্য আমচাষিরা    কারণে- অকারণে এক মৌসুমে আমবাগানে বহুবার ¯েপ্র করে থাকেন যা কোনভাবেই কাম্য নয়। মাত্রাতিরিক্ত ¯েপ্র যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি আমের উৎপাদনকেও ব্যয়বহুল করে তোলে। কীটনাশক ¯েপ্রর বিষয়ে এখনই সচেতনতা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে ইহা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। গবেষণার ফলাফল হতে দেখা গেছে, ফুল আসার পূর্বে থেকে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত সময়মতো তিনটি ¯েপ্রই যথেষ্ট। তবে ক্ষেত্রবিশেষে আরও ১/২ টি ¯েপ্র করা লাগতে পারে। তবে ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কোনভাবেই তিনটির বেশি স্প্রে করার প্রয়োজন নেই। প্রথম ¯েপ্রটি করতে হবে আমবাগানে মুকুল বা পুষ্পমঞ্জরি বের হওয়ার আনুমানিক ১৫-২০দিন পূর্বে সাইপারমেথ্রিন/কার্বারিল/ল্যামডা সাইহ্যালথ্রিন/ইমিডাক্লোরোপ্রিড গ্রæপের কীটনাশক দিয়ে ভালভাবে সমস্ত গাছ (বাকলসহ) ধুয়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে গাছে বসবাসকারী হপার বা ফুদকি পোকাসহ অন্যান্য পোকার আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়া যাবে। আমের মুকুল যখন ১৫ সেন্টিমিটার হবে কিন্তু ফুল ফুটবে না তখন দ্বিতীয়বার একটি কীটনাশক ও সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক একত্রে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে ফলে পুষ্পমঞ্জরির বৃদ্ধি ও ফুটন্ত ফুলকে রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং আমের গুটি মটরদানার সমান হলে তখন তৃতীয়বার কীটনাশকের সাথে মেনকোজেব গ্রæপের ছত্রাকনাশক নির্দেশিত মাত্রায় ¯েপ্র করতে হবে। কারণ আমের গুটি বাধাঁর পর অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দেখা যায় ফলে গুটির উপর কালো কালো দাগ হয় ও পরে গুটি ঝরে পড়ে। আমের মুকুলের ফুল ফোটার পর কোন অবস্থাতেই ¯েপ্র করা যাবে না। আমের পরাগায়ন প্রধানত বিভিন্ন প্রজাতির মাছি ও মৌমাছি দ্বারা সম্পন্ন হয়ে থাকে। তাই ফুল ফোটার পর কীটনাশক ¯েপ্র করলে পরাগায়নে সহায়তাকারী কীটপতঙ্গ বাগান হতে ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে বা মারা যেতে পারে এবং আমের পরাগায়ন ও ফলধারণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। বর্তমানে ফলবাগানে পরাগায়নে সহায়তাকারী কীটপতঙ্গের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ¯েপ্রর ফলে এমনটি হতে পারে বলে ফল বিজ্ঞানীরা মনে করেন। এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা দরকার, কোন বাগানে ফল ছিদ্রকারী পোকা ও মাছি পোকার আক্রমণ দেখা দিলে তা দমনের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ¯েপ্র করার সময় যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হলো সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন করে নির্দেশিত মাত্রায় উপযুক্ত সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
বালাইনাশকের নির্বাচন যদি সঠিক না হয়, প্রয়োগের মাত্রা যদি কম হয় এবং সময় একটু আগে বা পরে হলে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমের বৃদ্ধি পর্যায়ে তাপমাত্রা বেশী থাকে। সঠিক বাগান ব্যবস্থাপনা না করে শুধুমাত্র ¯েপ্র করে আমে ফলন বাড়ানো সম্ভব নয়। আমচাষিরা কীটনাশক ¯েপ্র্র ব্যাপারে সঠিক পরামর্শের জন্য স্থানীয় কৃষি কর্মী বা আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত¡ গবেযণা কেন্দ্রে (আম গবেষণা কেন্দ্র), চাঁপাইনবাবগঞ্জ যোগাযোগ করা উচিত। একই কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক বার বার ¯েপ্র্র না করে মাঝে মাঝে পরিবর্তন করা উচিত কারণ একই ঔষধ বার বার ¯েপ্র্র করলে পোকা বা রোগের জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে। প্রখর রৌদ্রে ¯েপ্র করা মোটেই উচিত নয়। আমবাগানে ¯েপ্র করার সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবশ্যই মেনে চলা দরকার। গাছ থেকে ফল সংগ্রহের ১৫-২০ দিন মধ্যে গাছে কোন বালাইনাশক ¯েপ্র্র করা উচিত নয়। আম বাগানের রোগ-পোকামাকড় ব্যবস্থাপনায় প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বেশি কার্যকরী। উল্লিখিত বিষয়সমূহের উপর নজর দিলে খুব সহজেই এবং কম খরচে আমবাগানের রোগ-পোকামাকড় দমন করে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হবে।
আম সঠিকভাবে পরিপক্ব হলেই তা সংগ্রহ করতে হবে। আম সংগ্রহ হতে শুরু করে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত আমে যেন আঘাত না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আম গাছ থেকে সংগ্রহ করার সময় বিএআরআই উদ্ভাবিত আম পাড়ার যন্ত্র বা ঠুসি ব্যবহার করতে হবে। ১ ইঞ্চি বোঁটাসহ আম সংগ্রহ করতে হবে। আমের কস বা আঠা কোনোভাবেই যেন আমের গায়ে না লাগে সেইদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আম সংগ্রহ করার পরপরই আম উপুড় করে রাখতে হবে অথবা কস ঝরানো যন্ত্রের সাহায্যে আমের কস ঝরিয়ে নিতে হবে। আম পাড়ার পর গরম পানিতে ৫৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড সে. তাপমাত্রায় ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে ভালভাবে শুকিয়ে নিলে আমের সংরক্ষণকাল বেড়ে যায় এবং বোঁটাপচা রোগের আক্রমণ কমে যায়। উপরোক্ত বিষয়সমূহের প্রতি নজর দিলেই গুণগতমানসম্পন্ন আমের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দেশকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছেন তার যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য গুণগত মানসম্পন্ন আমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি অত্যন্ত কার্যকর ভ‚মিকা পালন করতে পারে। য়

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর, মোবাইল-০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল: sorofu@yahoo.com

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আধুনিক পাট উৎপাদন প্রযুক্তি

কৃষিবিদ জান্নাতুল ফেরদৌস

আমাদের দেশ স্বাধীনের পর কৃষি ছিল বন্যা, খরা, রোগবালাই, অনুন্নতবীজ ও উৎপাদন প্রযুক্তি,       উপকরণ স্বল্পতা এসব বহুবিধ সঙ্ককে জর্জরিত। বঙ্গবন্ধু দূরদৃষ্টির কারণে উন্নত জাত, উপকরণ, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল সহায়তায় আধুনিক কৃষির নতুন দ্বার উন্মচিত হয়। তাঁর সবুজ বিপ্লব, কৃষি বিপ্লব, দ্বিতীয় বিপ্লব কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষিতে আসে অভ‚ত পরিবর্তন। বাংলাদেশে উৎপাদিত অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাটের অবস্থান শীর্ষে। এক সময় এই পাটই ছিল       কৃষকের অর্থ উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় উৎস। পাটের সাথে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, এদেশের মানুষ আর আমাদের মহান স্বাধীনতার এক নিবিড় যোগসূত্র। দেশ বিভাগের পর থেকেই তৎকালীন পাকিস্তানি   ঔপনিবেশিক শাষকগোষ্ঠী এ অঞ্চলের মানুষের অধিকারও উন্নয়নের প্রশ্নে চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। দেশের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হতে অর্জিত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার ন্যায্যহিসাব থেকে বঞ্চিত করে। এ অন্যায়, অবিচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৬ দফা কর্মসূচির ৫ম দফায় বৈদেশিক মুদ্রার উপর প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন। আপামর জনগণের প্রাণের এ দাবি পরবর্তীতে জাতিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে দিক্ষিত করে।
এদেশের ফসলি জমির একটা বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে আমাদের এই পাট। দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ ধরনের মাটি বিশিষ্ট যে কোন জমিতে পাট, কেনাফ ও মেস্তা ভালো হয়। কিন্তু ভালো ফলন পেতে হলে এ ধরনের জমির মধ্যেও জাত ভেদে জমি নির্বাচন করতে হবে যেমন, তোষা এবং ধবধবে দেশি পাট জাতের জন্য বিশেষ করে যে সকল জমি ঋতুর প্রথমে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় না এবং বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। তবে এই ধরনের জমির মধ্যেও যে জমিটি তুলনামূলক উঁচু সে জমিতে তোষা এবং তুলনামূলক নিচু জমিটিতে দেশি জাতের পাট চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। বাগানের আশপাশে বা বসতবাড়ির পাশের জমিতে পাট ভালো হয় না। এর কারণ জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে ছত্রাক জাতীয় রোগ এবং কীটপতঙ্গ বিশেষ করে চেলে পোকা, মাকড় প্রভৃতির আক্রমণ অধিক হয়। অবশ্য এসব জমিতে অন্য ফসল না হলে কেনাফ ও মেস্তার চাষ করতে পারেন। মেস্তার জন্য একটু টান বা উঁচু জমি হলেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
অংকুরোদগম পরীক্ষা
পাটের বীজ বপনের আগে অংকুরোদগম পরীক্ষার মাধ্যমে বীজ ভালো কিনা তা পরীক্ষা করা উচিত। খুব সহজে এবং অল্প খরচে এই পরীক্ষা করা যায়। প্রথমে বীজের পাত্র থেকে ১০০টি বীজ গুনে নিতে হবে। এবার একটি মাটির সানকিতে এক পরত ভেজা কাপড় বা চোষ কাগজ অথবা তা না থাকলে নিউজপ্রিন্ট ২-৩ পরত বিছিয়ে পানি দিয়ে ভালো করে ভিজিয়ে নিয়ে তার উপর ওই ১০০টি বীজ ভালোভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। এবার আরেকটি সানকি দিয়ে ওই বীজসহ সানকি ঢেকে দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সানকির কাপড় বা কাগজ শুকিয়ে না যায় অথবা বীজ পানিতে ডুবে না যায়। বীজ বসানোর তিন দিন পর মোট যে ক’টি বীজ গজানো দেখা যাবে সেটাই হলো বীজ গজানোর শতকরা হার। শতকরা ৮০টির অধিক বীজ গজালে তাকে ভালোবীজ বলা যাবে। যদি শতকরা ৭০টির বেশি কিন্তু ৮০টির কম বীজ গজায় তা হলে বীজ বপনের সময় কিছু বেশি বীজ বপন করতে হবে। শতকরা ৭০টির কম বীজ গজালে ওই বীজ বপন না করাই ভালো।  
জমি তৈরি ও বীজবপন
পাটের বীজ খুব ছোট বলে পাট ফসলের জমি মিহি করে চাষ দিতে হয়। পাট গাছ চার মাসব্যাপী বৃদ্ধি পায় এবং ৩-৫ মিটার উঁচু হয় বলে এর জন্য জমি গভীর করে চাষ দেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য ভালো যন্ত্রপাতির সাহায্যে চাষ দেয়া উচিত। এপাশ ওপাশ করে ৫-৬ বা প্রয়োজনে তারও অধিক বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চাষ দিতে হয়। পাট চাষের জন্য খরচ কমাতে হলে যে সব জমিতে আলু বা সবজি করা হয় সে সব জমিতে একবার চাষ করে মই দিয়ে পাট বীজ বপন করেও ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব। এসব জমিতে আগাছা নির্মূলজনিত খরচ কম হয়। সারি করে সিড ড্রিলের সাহায্যে বীজ বপন করা হলে বীজগুলো মাটির নিচে সমান গভীরতায় পড়ে বলে সমানভাবে অংকুরোদগম হয়।
যে কোনো ফসলের মতো পাট ফসলেও যথোপযুক্ত সার   পরিমিত মাত্রায় উপযুক্ত সময়ে প্রয়োগ করে আঁশের ফলন ও মান যথেষ্ট বাড়ানো সম্ভব। পাটের উৎপাদন ও গুণগতমান বৃদ্ধির জন্য জমি তৈরির সময় শতাংশ প্রতি ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া,  ৪০০ গ্রাম টিএসপি, ৩০০ গ্রাম এমওপি, ৪০০ গ্রাম জিপসাম, সার ছিটিয়ে দিতে হবে। পাট বীজ বপনের ১৫ দিন আগে জমিতে একর প্রতি ২ টন গোবর সার প্রয়োগ করলে অন্যান্য সার প্রায় অর্ধেক হলেই চলে। পাট গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং আঁশ ফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌল। এ ছারা ফসফরাস আঁশের মানউন্নত করে এবং পটাশিয়াম ব্যবহারের মাধ্যমে রোগ হওয়ার হার কমানো যায় এবং কাÐ মজবুত হয়। বাংলাদেশের অনেক পাট চাষের জমিতে সালফার এবং জিংক কম রয়েছে। সে সব জমিতে সালফার ও জিংক প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া যায়।
জমিতে জৈব পদার্থ হিসেবে গোবর সার দিলে অবশ্যই বীজ বপনের ২-৩ সপ্তাহ পূর্বে জমিতে প্রয়োগ করে চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইউরিয়া (অর্থাৎ অর্ধেক ইউরিয়া), টিএসপি, এমওপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় কিস্তির ইউরিয়া সার বীজ বপনের ৪৫ দিন পর প্রয়োগের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ রস থাকে।
পাটের জাত ভেদে বপন সময় বিভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত দেশী পাট চৈত্র মাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এবং তোষা পাট বৈশাখ মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বপন করা হয়। তবে বেশির ভাগ পাটের জাত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি অর্থাৎ চৈত্র মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বপন করার উপযুক্ত সময়। তবে মধ্য মে বা বৈশাখের শেষ পর্যন্তও পাট বীজ বপন করা যায়। এছাড়া কেনাফ ও মেস্তার বপন সময় হচ্ছে চৈত্র মাসের প্রথম থেকে বৈশাখের শেষ পর্যন্ত দুই মাসব্যাপী।
প্রচলিত ও জনপ্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে ছিটিয়ে বীজ বপন করা। তবে সারিতে বীজ বপন করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। ছিটিয়ে বপন করলে দেশি এবং তোষা পাটের ক্ষেত্রে একরপ্রতি প্রায় আধা কেজি বীজ বেশি লাগবে ভালো মানের বীজ হলে এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে বর্তমানে পাট, কেনাফ ও মেস্তার বীজ বপনের যে হার নির্ধারণ করা হয়েছে তা হলোÑ
পাটের জমিতে পোকামাকড় বা রোগবালাই দেখা দিলে তা সাথে সাথে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে বা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ায় সোনালি আঁশ পাটের  সোনালি অধ্যায় আজ আর স্বপ্ন নয়। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অকৃত্রিম ভালোবাসা আর সময়োপযোগী ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে পাট খাত আজ দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় এক অন্যতম অনুষঙ্গ। বৃদ্ধি পেয়েছে এর বহুমুখী মূল্যবান ব্যবহার। পাট বিষয়ে আমাদের আছে দুদক্ষ পাট চাষি, আছে আধুনিক উপযোগি জাত, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা, আর আছে বহুমুখী ব্যবহারের বিভিন্ন পাটপণ্য এবং ব্যবহারের বিভিন্ন উপযোগী ক্ষেত্র। শুধু প্রয়োজন একটু প্রয়াস, একটু দেশাত্ববোধ, একটু কার্যকর আন্তরিকতা। পাট চাষ ও পাট জাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আরো বহুদূরে। য়
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, কৃষিতত্ত¡ বিভাগ,বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা, মোবা : ০১৫৫২৯৯৯১৪৯, ইমেইল : tanny.jannat92@gmail.com

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (১৪২৬)

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন
কৃষি বিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
চিত্রালী রায়, গ্রাম: মৌতলা, উপজেলা: কালিগঞ্জ, জেলা: সাতক্ষীরা
প্রশ্ন: মুগডালের পাতায় পাউডারের মতো দাগ দেখা যায় এবং পাতাগুলো কালোও দেখায়। এ অবস্থায় কি করণীয়?   
উত্তর: এ ধরনের রোগকে পাউডারি মিলডিউ বলে। আমাদের দেশে খরিফ-২ মৌসুমে এটি বেশি দেখা যায়। এ রোগে পুরো পাতা আক্রান্ত হয়। পরবর্তীতে পাতা, কাÐ ও ফুল-ফলে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পাতার উপরে সাদা পাউডার ধীরে ধীরে ছাই রঙ ধারণ করে। এ রোগের কোনো প্রতিরোধী জাত নেই। তবে ভাদ্র মাসের শুরু থেকে আশি^ন মাসের ১ম সপ্তাহে বোনা ফসলে এ রোগের পরিমাণ কম হয়। এ রোগ দমনে  প্রপিকোনাজল গ্রæপের যেমন টিল্ট/প্রাউড প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যায়।
মৃন্ময়, গ্রাম: করোলিয়া, উপজেলা: তেরখাদা, জেলা: খুলনা
প্রশ্ন: করলা গাছের কচি পাতায় এক ধরনের পোকা পাতার রস চুষে খায়। ফলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়। কি করব?  
উত্তর:  সাধারণত করলার জাব/জ্যাসিড পোকার আক্রমণ হলে এ সমস্যা হয়ে থাকে। এ পোকা দমনের জন্য জৈব       বালাইনাশক যেমন বাইকাও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া পোকার আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরপ্রিড গ্রæপের এমিটাফ/টিডো/এডমায়ার ০.৫ মিলি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করলে উপকার পাবেন।  
মো: ইছাহাক আলী, গ্রাম: কেরাদারি, উপজেলা: রাজারহাট, জেলা: কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন:  এক প্রকার রোগের কারণে মরিচ গাছ এক পাশে বা সম্পূর্ণ গাছ ঢলে পড়ে। এমনকি গাছও মারা যাচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান জানাবেন।   
উত্তর:  এ রোগে আক্রান্ত মরিচ গাছ সম্পূর্ণ তুলে ফেলে নষ্ট করতে হবে। তবে সুস্থ গাছ হতে বীজ সংগ্রহ করলে এ সমস্যা কমে যায়। আর মরিচ গাছ লাগানোর আগে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন/নোইন বা প্রোভেক্স ২০০ ডবিøউপি মিশিয়ে চারা শোধণ করা যায়। তাহলে এ ধরনের সমস্যা দূর হবে।      
মো: খাইরুল আলম, গ্রাম: এলাইগা,  উপজেলা: পীরগঞ্জ, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন:  লেবু গাছে এক ধরনের পোকা পাতায় আঁকাবাঁকা সুরঙ্গ তৈরি করে। এ পোকা দমনে কি করণীয় ?
উত্তর:  এ পোকাকে লিফ মাইনার পোকা বলে। লেবুজাতীয় ফসলের জন্য এ পোকা মারাত্মক। এ পোকার আক্রমণ বেশি হলে পাতা কুঁকড়ে যায় ও বিবর্ণ হয়ে ঝরে পড়ে। এমনকি আক্রান্ত পাতায় ক্যাংকার হয়ে গাছ দুর্বল হয় এবং গাছের বাড়বাড়তি কমে যায়। এ পোকা দমনে পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা দরকার। আর প্রাথমিক অবস্থায় লার্ভাসহ আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তারপরও যদি পোকার আক্রমণ বেশি হয় তবে ১ লিটার পানিতে ০.২৫ মিলি এডমায়ার বা ২ মিলি কিনালাক্স ২৫ ইসি মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর ৩ থেকে ৪ বার কচি পাতায় স্প্রে করতে হবে। তবেই আপনি উপকার পাবেন।   
মো. কবির হোসেন, গ্রাম: সাকোয়া  উপজেলা: বোদা, জেলা: পঞ্চগড়
প্রশ্ন:  মার্চ-এপ্রিল মাসে জায়ান্ট মিলিবাগ দমন সম্পর্কে জানাবেন।
উত্তর: মার্চ-এপ্রিল মাসে জায়ান্ট মিলিবাগ পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা ধ্বংস করার জন্য আক্রান্ত গাছসমূহে ফেব্রæয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ হতেই গোড়ার মাটি থেকে ১ মিটার উঁচুতে ৩-৪ ইঞ্চি চওড়া পিচ্ছিল র‌্যাপিং টেপ গাছের চতুর্দিকে আবৃত করে দিতে হয়। এতে করে পূর্ণাঙ্গ স্ত্রী পোকা ডিম পাড়ার জন্য গাছের উপর থেকে নেমে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং র‌্যাপিং টেপের উপরের অংশে জমা হয়। এ অবস্থায় এদের একসাথে করে  মেরে ফেলতে হয় অথবা জমাকৃত পোকার উপর জৈব বালাইনাশক পটাশিয়াম সল্ট অব ফ্যাটি এসিড যেমন ফাইটোক্লিন, প্রতি লিটার পানিতে ৮-১০ মিলি হারে মিশিয়ে ১০ দিন অন্তর ২ থেকে ৩ বার বা সংস্পর্শ কীটনাশক ক্লোরপাইরিফস প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলি হারে ৭ থেকে ৮ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার বা কার্বারাইল প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ৭ থেকে ৮ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করে দমন করা যায়। গাছে আক্রমণকালীন যে কোন সময় উল্লেখিত জৈব বালাইনাশক, ফাইটোক্লিন দিয়ে পোকাটি দমন করা যায়। জৈব বালাইনাশকের পরিমাণ কমানোর জন্য কেবলমাত্র উক্ত পোকার শরীরে জৈব বালাইনাশক স্প্রে করা দরকার।  
মোছা: রতœা বেগম, গ্রাম: মামুদপুর, উপজেলা: ক্ষেতলাল সদর, জেলা: জয়পুরহাট
প্রশ্ন: পুদিনা পাতা পোড়া রোগ দমন করব কিভাবে?
উত্তর: রোগাক্রান্ত পাতা পুড়ে ফেলতে হবে। পুদিনা পাতায় পাতা পোড়া/ঝলসানো রোগ দেখা দিলে ডাইফেনোকোনাজল ও এ্যাজোক্সিস্ট্রবিন গ্রæপের ছত্রাকনাশক যেমন-এমিস্টার টপ ৩২৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ৩-৪ বার গাছে ¯েপ্র করতে হবে। তাহলেই আপনি উপকার পাবেন।
মৎস্য বিষয়ক
মোঃ দেলোয়ার হোসেন, গ্রাম: চরপাড়া, উপজেলা: নান্দাইল, জেলা: ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: মাছ পেট ফুলে মারা যাচ্ছে। কি করব ?
উত্তর: অ্যারোমনাডস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া এ রোগের কারণ। এ রোগে মাছের দেহের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে পানি সঞ্চালনের মাধ্যমে মাছের পেট ফুলে উঠে। ফলে মাছ ভারসাম্যহীনভাবে চলাফেরা করে ও পানির উপর ভেসে থাকে। ফলে অচিরেই মাছ মারা যায়। আক্রান্ত মাছকে প্রতি কেজি খাবারের সাথে মেট্রোনিডাজল/অক্সিটেট্রাসাইক্লিন গ্রæপের ওষুধ মিশিয়ে সাত দিন খাওয়াতে হবে। অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ২০ থেকে ১০০ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাঁচ দিন ব্যবহার করলে ভালো উপকার পাওয়া যায়।   
মো. সিহাব অধিকারী, গ্রাম: ফুলবাড়ি, উপজেলা: গোবিন্দগঞ্জ, জেলা: গাইবান্ধা
প্রশ্ন: কাতলা মাছের ফুলকার উপর বাদামি গুটি দেখা যাচ্ছে ও ফুলকা পচে যাচ্ছে। কিছু মাছ মারাও যাচ্ছে। কি করব ?
উত্তর: এ রোগের নাম মিক্সোবলিয়াসিস। মিক্সোবলাস প্রজাতির এক ধরনের এককোষী প্রাণী রুইজাতীয় মাছের বিশেষ করে কাতলা মাছের ফুলকার উপর সাদা বাদামি গুটি তৈরি করে। এতে করে ঐ গুটির প্রভাবে ফুলকায় ঘা দেখা যায় ও ফুলকা খসে পড়ে। শ^াস প্রশ^াসের ব্যাঘাত ঘটার কারণে মাছ অস্থিরভাবে ঘোরাফেরা করে ও শেষ রাতের দিকে ব্যাপক মড়ক দেখা যায়। অদ্যাবধি এ রোগের কোন চিকিৎসা সরাসরি আবিষ্কৃত হয়নি। তারপরও শতকপ্রতি ১ কেজি হারে চুন দিলে পানির অ¤øত্ব দূর হয়ে পরজীবীগুলো অদৃশ্য হয়ে যায় ও মাছ নিষ্কৃতি লাভ করে।
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
বাহার মজুমদার, গ্রাম: বাইয়ারা, উপজেলা: সোনাইমুড়ি, জেলা: নোয়াখালী
প্রশ্ন: আমার ছাগলের বয়স ২ বছর। ছাগল প্রথমে দাঁড়ানো অবস্থায় চর্তুদিকে ঘুরছিল। শরীর কাঁপছিল, পাতলা পায়খানা হচ্ছিল। পেটব্যথার কারণে শুয়ে পা ছোড়াছুড়ি করছিল এবং কিছু সময় পরেই মারা গেল। এ অবস্থায় কি করণীয় ?
উত্তর: যেহেতু এ রোগ হলে হঠাৎ করে মারা যায়। সেজন্য সাধারণত কোনো চিকিৎসা করা যায় না। তবে প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগ শনাক্ত করা গেলে এট্টোফিন সালফেট ইনজেকশন ৩ মিলি ৬ ঘণ্টা পর পর এবং শিরায় স্যালাইন দিলে অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অসুস্থ ছাগলকে সুস্থ ছাগল থেকে আলাদা করে রাখা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত দানাদার খাদ্য সরবরাহ না করা।
মোঃ আতিউর রহমান, গ্রাম: হজরতপুর, উপজেলা: ফুলবাড়ি, জেলা: দিনাজপুর
প্রশ্ন: আমার লেয়ার মুরগিগুলো নিজেদের মধ্যে খুব ঠোকরাঠুকরি করছে এবং দেহের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় কি করণীয়?    
উত্তর: এদেরকে ঠোঁট কাটতে হবে অর্থাৎ ডিবিকিং। খামারে যথাযথ আলো ও প্রাকৃতিক বাতাস প্রবেশ করা নিশ্চিত করতে হবে। বাচ্চার ৬ থেকে ১০ দিন বয়সে ঠোঁটকাটা, ঘরে লাল আলো ব্যবহার, আলোর তীব্রতা কমানো ও প্রতিটি মুরগির জন্য পর্যাপ্ত জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। ইলেকট্রোলাইট ও মিনারেলের ঘাটতি দূর করার জন্য ইলেকট্রোমিন পাউডার ও ক্যালপি পাউডার খাওয়াতে হবে। য়                        
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল নং ০১৭১১১১৬০৩২, ঃ

taufiquedae25@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
শতবর্ষে কালজয়ী মহাপুরুষ মুজিব ও মুজিবের বাংলার কৃষি

ড. মোঃ আবদুল মুঈদ
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। কালের মহাপরিক্রমায় ২০২০ সালের ১৭ মার্চ পূর্ণ হতে যাচ্ছে মৃত্যুঞ্জয়ী এই মহাপুরুষের জন্মশতবার্ষিকী।
বঙ্গবন্ধু ভালো বাসতেন এ দেশের কৃষি, কৃষক,              কৃষিবিদদের। তিনি বিশ্বাস করতেন কৃষক ও                 কৃষিবিদের উন্নয়ন হলে এ দেশের কৃষির উন্নয়ন হবে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের    জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “আমার কৃষক, আমার শ্রমিক দুর্নীতি করে না। সকল শিক্ষিত লোকদের বলব, কৃষক শ্রমিকদের সাথে ইজ্জত এবং সম্মান রেখে কথা বলবেন। কারণ দেশের মালিক ওরাই, ওদের দ্বারাই আপনাদের সংসার চলে। তোমরা আজ লেখাপড়া করেছ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসার হয়েছ তাদের শ্রম আর ঘামের টাকায়।”
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টেকসই কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের ৭ নম্বর আইনের মাধ্যমে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭৩ সালের ১০ নম্বর অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ধান ব্যতিরেকে বহুমুখী ফসল গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। পুনর্গঠন করা হয় হর্টিকালচার বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন এজেন্সি, রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ গবেষণা সমন্বয়ের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ  কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। সোনালি আঁশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিষ্ঠা করেন পাট মন্ত্রণালয়।
কালজয়ী এ মহাপুরুষের প্রতিটি গৃহীত পদক্ষেপ আমাদের পথের সন্ধান দিয়েছে, প্রতিটি নির্দেশনা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, বাঙ্গালী জাতিকে দিয়েছে নতুন পথের দিশা। তার সোনার বাংলার ন্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তারই যোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দীপ্ত পদে অদম্য অপ্রতিরোধ্য দুর্বার গতিতে।
বাংলাদেশের কৃষি এখন পুরনো কৃষি ব্যবস্থা থেকে বাণিজ্যিক  কৃষিতে, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ থেকে পুষ্টিনির্ভর কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এখন উৎপাদনমুখী লাভজনক নিরাপদ কৃষির অভীষ্ট লক্ষ্যে সারাদেশে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার টেকসই কৃষি ও আধুনিকায়নের জন্য খামার যান্ত্রিকীকরণ ও নিরাপদ কৃষির দিকে জোর দিয়েছে।
বর্তমান জনবান্ধব সরকারের  কৃষি বান্ধব নীতি অনুসরণের ফলে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ফসল উৎপাদনের উপযোগিতা, টেকসই আধুনিক উৎপাদন কৌশল অবলম্বন, পরিবেশ বান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসলের নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন, শস্যবহুমুখিতা অবলম্বন, দ্রæত সম্প্রসারণ পদ্ধতি অনুসরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থপনার উন্নয়ন, প্রদর্শনী স্থাপন, প্রণোদনা পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণ, সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণ, প্রতিকূলতা সহিষ্ণু প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি নতুন প্রাণ পেয়েছে। সরকার দেশের প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ কৃষক পরিবারকে কৃষি উপকরণ কার্ডের আওতায় এনেছে। দেশের প্রায় ১২১টি কৃষি পণ্য এখন বিদেশে রপ্তানিমুখী হয়েছে। স্বাধীনতার ৪৯ বছরে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর ৩৫ লক্ষ খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ এখন ১৬ কোটি বাঙ্গালীর খাদ্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ১ কোটি ১০ লক্ষ চাল উৎপাদন থেকে এখন ৩ কোটি ৮৬ লক্ষ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম, পাট ও কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, স্বাদু পানির মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম, পেয়ারা ও আলু উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, মৌসুমি ফল উৎপাদনে বিশ্বে দশম । পাট ও ধৈঞ্চা ফসলের জীন রহস্য ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন এখন বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত।
উন্নয়নশীল বাংলাদেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার ২০২০-২১ সালকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে              মুজিববর্ষ ঘোষণা করেছে। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বর্ণাঢ্য উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বছরব্যাপী উদযাপন। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত এ বর্ষ উদযাপন করা হবে। জাতি সংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও              সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কোর ৪০তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে মুজিববর্ষ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশের ৪৫৭১টি ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু কৃষি উৎসব আয়োজনের মহাকর্ম পরিকল্পনা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কৃষি উৎসব উদযাপন উপলক্ষ্যে গ্রামীণ মেলা, দেশীয়      খেলাধুলা, নৌকা বাইচ, লোকগীতি-গম্ভীরা, স্থানীয় কৃষকের ভাবনা, কৃষকের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আালোচনা  পর্যালোচনার আয়োজন রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ বর্ষ উদযাপন ফলপ্রসূ করতে কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক প্রস্তুতকৃত কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাফল্য ও সম্ভাবনা বিষয়ক ডকুমেন্টারি কৃষি উৎসবের মেলায় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। প্রতি জেলায় বিভিন্ন ফসলের সর্বোত্তম উৎপাদনকারীকে পুরস্কার প্রদানের নির্দেশনা রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিটি সংস্থা ২০২০ সালে একটি সেবা সপ্তাহ ঘোষণা করে সে হিসেবে কাজ করবেন। কৃষির বিবর্তন, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, সেখান থেকে উত্তরণ, কৃষি বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা, কৃষি ক্ষেত্রে বর্তমান অগ্রগতি  ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে এলাকাভিত্তিক গম্ভীরা ও জারীগানের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
এ বর্ষ উপলক্ষ্যে সারা দেশব্যাপী ফসল কর্তন উৎসব পালন করা হবে। বঙ্গবন্ধুর কৃষি ভাবনা সম্পর্কিত এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের উপর ব্যানার, ফেস্টুন এবং লিফলেট ও পোস্টার বিভিন্ন স্থানে স্থাপন ও বিতরণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও এ বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কৃষি অলিম্পিয়াড আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কৃষির স্থানীয় সমস্যা, উত্তরণের উপায় এবং সম্ভাবনা, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে স্থানীয় ভ‚মিকা, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক স্মৃতিচারণ ও দেশপ্রেম ভিত্তিক রচনা, বঙ্গবন্ধুর কৃষি ভাবনা বিষয়ক বিভন্ন লেখার সমন্বয়ে বৃহৎকলেবরে একটি সুভ্যেনির রচনা করা হবে।
এছাড়াও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বছরব্যাপী সাপ্তাহিক অফিস ভবন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম, বছরব্যাপী মাসিক অফিস প্রাঙ্গণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম, বছরব্যাপী মাসিক সভার আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সর্বোপরি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সারা বাংলাদেশের জনগণের সম্মিলিত চিন্তা চেতনায়, পরিকল্পনা ও প্রয়াসে মহাকালের সেতু বন্ধন হিসেবে মুজিববর্ষ হয়ে উঠুক জাতির এ মহান পুরুষের কাল ফলক। মুজিবীয় চেতনায় বাংলার কৃষির বিকাশ ঘটুক শতাব্দী থেকে শতাব্দীতে। য়

মহাপরিচালক, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা, ফোন : ৯১৪০৮৫০, ইমেইল : ফম@ফধব.মড়া.নফ

বিস্তারিত
বাংলাদেশে হাইব্রিড ভুট্টার উৎপাদন, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা-বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা

ড. মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম মতিন

ভুট্টা একটি উচ্চফলনশীল বর্ষজীবী দানা জাতীয় খাদ্যশস্য। এদেশে প্রধান খাদ্যশস্য ধান ও গমের পরে তৃতীয় ফসল হিসেবে এর চাষাবাদের সম্ভাবনা অনস্বীকার্য। ভুট্টার অধিক ফলন ও বহুমুখী ব্যবহারের কারণে লাভজনক ফসল হিসেবে দেশে চাষীদের মাঝে এর    জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে ভুট্টা চাষেরও স¤প্রসারণ হচ্ছে। হাইব্রিড ভুট্টার ফলন অনেক বেশি এবং চাষ করেও অধিক লাভবান হওয়া যায়। দেশে ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে ভালমানের বীজের চাহিদাও বাড়ছে। হাইব্রিড ভুট্টার ফলন মুক্ত-পরাগায়িত ভুট্টার চেয়ে ২০-৩০% বেশি হওয়ায় এবং চাষ করে কৃষক অধিক লাভবান হওয়ায় এর চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভুট্টা (তবধ সধুং খ., ২হ = ২০) গাছ একটি ঈ৪ জাতীয় উদ্ভিদ যারা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অক্সালো  এসিটিক এডিস নামে ৪ কার্বন বিশিষ্ট যৌগ উৎপন্ন করে এবং এদের পাতায় বিশেষ ধরনের ক্লোরোফিলের গঠন বিদ্যমান থাকায়       ফটো-রেসপিরেসন ঈ৩ উদ্ভিদের (যেমন ধান, গম ইত্যাদি) চেয়ে কম।  ফলে ভুট্টা গাছ ঈ৩ গাছের তুলনায় অধিক ফলন দেয়। বেশিরভাগ তথ্যমতে, মেক্সিকো ভুট্টার উৎপত্তিস্থান। তবে কেউ কেউ দক্ষিণ আমেরিকা বা ওয়েষ্ট ইন্ডিজে ভুট্টার উৎপত্তি হয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করে থাকেন।
ভুট্টা পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে জন্মে। ইটা সমুদ্রসমতল থেকে ৩,৩০০ মি. উঁচুতে পর্যন্ত জন্মাতে পারে। ভুট্টা ২১-৩০০ সে. তাপমাত্রায় ভাল জন্মে। ৪৫০-৬০০ মিঃমিঃ বৃষ্টিপাত ভুট্টা চাষের জন্য উপযুক্ত। ভুট্টার বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা হল ১৮-২০০ সে.। বিভিন্ন প্রকার মাটিতে ভুট্টা জন্মায়। তবে সুনিষ্কাশিত, উত্তম বায়ু চলাচলকারী, দোঁআশ এবং পলি দোঁআশ মাটি যেখানে প্রচুর পরিমাণে জৈব পদার্থ এবং পুষ্টি উপাদান থাকে সেখানে ভুট্টা গাছ ভালো জন্মে।
ভুট্টা একটি পর-পরাগায়িত (পৎড়ংং-ঢ়ড়ষষরহধঃবফ) ফসল। একই গাছে পুরুষ ফুল ও স্ত্রী ফুল (সড়হড়বপরড়ঁং) রয়েছে। গাছের মাথায় মঞ্জুরীদÐে বিন্যস্ত থাকে পুরুষ ফুল (ঃধংংবষ) এবং গাছের মাঝামাঝি অবস্থান থেকে বের হওয়া মোচায় থাকে স্ত্রী ফুল। ভুট্টার ¯ত্রীস্তবক পরিপক্ক হওয়ার আগেই পুংস্তবক পরিপক্ক হয় অর্থাৎ ইহা চৎড়ঃধহফৎড়ঁং প্রকৃতির। প্রায় ৯৫% ডিম্বাণু পর-পরাগায়িতভাবে নিকশিত হয় (ভবৎঃরষরুধঃরড়হ) তবে ইহাতে ৫% স্ব-পরাগায়ন ঘটতে পারে। ফুল ফোটার আগেই টাসেল (ঞধংংবষ) স¤পূর্ণ বের হয়। ¯পাইকের মাঝ বরাবর থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং তারপর ¯পাইকের উপর ও নিচের ফুলগুলো ফোটে। সাধারণতঃ  ¯পাইকের কেন্দ্রের শাখাটিতে আগে ফুল ফোটে। পরবর্তীতে পার্শ¦ীয় শাখাতে ফুল ফোটে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পরাগদানী থেকে পরাগরেণু পড়তে (ংযবফফরহম) শুরু করে এবং তা কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত চলে। জোড়া ¯পাইকলেটের উপরের ফুলটি আগে উন্মুক্ত হয়। পরাগ প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সজীব থাকে। তবে খুব উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়াতে দ্রæত মারা যায়। একটি টাসেল ২-১৪ দিন পর্যন্ত পরাগ সরবরাহ করে থাকলেও  ৫-৮ দিন পর্যন্ত পরাগ ঝরে পড়ে (ংযবফফরহম) এবং তৃতীয় দিনে সবচেয়ে বেশি পরাগ ঝরে পড়ে। একটি টাসেল হতে প্রচুর পরিমাণে পরাগ উৎপন্ন হয়। স্বাভাবিক একটি গাছের একটি টাসেল প্রায় ২৫,০০০,০০০টি পরাগ উৎপন্ন করতে পারে। সুতরাং প্রত্যেক সিল্কের (ঝরষশ) জন্য ২০,০০০-৩০,০০০ রেণু বিদ্যমান।
পরাগের সজীবতা (ারধনরষরঃু) খরাতে (ফৎড়ঁমযঃ ংঃৎবংং) কম প্রভাবিত হয়, যদিও তাপমাত্রা ৩৮০ সে. এর বেশি হলে পরাগের অঙ্কুরোদগম (মবৎসরহধঃরড়হ) দ্রæত কমে যায়,       বেশিরভাগ পরাগরেণু উৎস থেকে ৫০-৭০ মিটার এর মধ্যেই পড়ে। যদি বাতাসের বেগ বেশি হয় তবে এই  দূরত্ব অবশ্যই বাড়বে। বাইরের পরাগায়নের থেকে রক্ষা করে জেনেটিক্যালি বিশুদ্ধ হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের জন্য আইসোলেশন বা সঠিক দুরত্ব একান্ত প্রয়োজন। কবের (ঈড়ন) উপরের দিকের ¯পাইকলেটের পূর্বেই গোড়ার ¯পাইকলেটগুলোর সিল্ক লম্বা হতে থাকে। অনুকূল অবস্থায় সকল সিল্ক ৩-৫ দিনের মধ্যেই উম্মুক্ত (বসবৎমব) হয় এবং পরাগরেণু গ্রহণোপযোগী (ৎবপবঢ়ঃরাব) হয় এবং ১৪ দিন পর্যন্ত এটা পরাগ গ্রহণোপযোগী থাকে। পরাগায়নের পরই সিল্ক শুকিয়ে যায় কিন্তু পরাগায়ন না ঘটলে অস্বাভাবিক লম্বা ও স্ফিত হয়। পরাগরেণু আর্দ্র ও আঠালো গর্ভমুÐতে পড়ার পরপরই অঙ্কুরিত হতে থাকে। সাধারণতঃ ডিম্বকের নিষেক প্রক্রিয়া ১২-২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘটে থাকে।
ভুট্টা গাছকে পর পর কয়েক প্রজন্ম (এবহবৎধঃরড়হং)            স্ব-পরাগায়ন করে ইনব্রেড লাইন তৈরি করা হয়। এ ধরনের লাইন থেকে বাছাইকৃত লাইনের মধ্যে সংকরায়ন করে প্রথম প্রজন্মে  (ঋ১) যে বীজ পাওয়া যায় তাই হাইব্রিড বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।  হাইব্রিড কয়েক প্রকারের হতে পারে। যথা:
ক) সিঙ্গল ক্রস হাইব্রিড: জন্মসূত্রে ভিন্ন, এরকম দু’টি লাইনের মধ্যে সংকরায়ন করে এর বীজ উৎপাদন করা হয়।
খ) ট্রিপস ক্রস/থ্রি ওয়ে ক্রস হাইব্রিড: প্রথমে দুটি লাইনের মধ্যে সংকরায়ন করে সিঙ্গল ক্রসের বীজ সংগ্রহ করতে হয়। সংগৃহীত সিঙ্গল ক্রস বীজ এবং ভিন্ন আর একটি লাইনের বীজ পাশাপাশি বপন করে এদের মধ্যে পুনরায় সংকরায়ন করা হয় এবং উৎপাদিত বীজকে ট্রিপল ক্রস/থ্রি ওয়ে ক্রস হাইব্রিড বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গ) ডাবল ক্রস হাইব্রিড:  এই বীজ উৎপাদনে মোট চারটি লাইনের প্রয়োজন হয়। প্রথমে দু’টি লাইনের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্লটে সংকরায়ন করে দু’টি সিঙ্গল ক্রসের বীজ উৎপাদন ও সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তীতে দু’টি সিংগল ক্রসের বীজ একই প্লটে পাশাপাশি বপন করে পুনরায় সংকরায়ন করতে হবে। এভাবে উৎপাদিত বীজকে ডবল ক্রস হাইব্রিড বীজ বলা হয়।
হাইব্রিড বীজ উৎপাদন মুক্ত-পরাগায়িত ভুট্টার বীজ উৎপাদন থেকে ভিন্ন। হাইব্রিড জাতের বীজ উৎপাদন ও এর প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ কাজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনশক্তির প্রয়োজন, যাতে করে গুণগত মানস¤পন্ন হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করা যায়। সঠিকভাবে হাইব্রিড বীজ উৎপাদনের জন্য আইসোলেশন জরুরি। আইসোলেশন নি¤েœর তিনভাবে স¤পাদন করা যায়। ১) নিরাপদ দূরত্ব: হাইব্রিড বীজ উৎপাদন বণ্টন অন্যান্য ভুট্টা ক্ষেত থেকে নিরাপদ দূরত্বে স্থাপন করা। সবচেয়ে বেশি, কন্টামিনেশন হয় অন্যান্য ভুট্টা থেকে ৫০ থেকে ৭০ মি. এর মধ্যে। নিরাপদ দূরত্ব ৫০০ মিটার হওয়া উচিত। ২) উপযুক্ত সময়: নিরাপদ সময় ২৫ দিন থেকে ১ মাস। এই সময় বিভিন্ন জাতের উপর নির্ভর করে কিছুটা কমবেশি হতে পারে। ৩) ভালভাবে সিনক্রোনাইজেশন।
যে সকল জাতের ভুট্টার বীজ মুক্ত-পরাগায়নের মাধ্যমে বর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় তাকে মুক্ত-পরাগায়িত জাত বলে। এ সকল জাতের বীজ কৃষকেরা নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণ করতে ও বীজ হিসেবে রাখতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত এ ধরনের মুক্ত-পরাগয়িত জাতগুলো হল বর্ণালী, শুভ্রা, খৈ ভুট্টা, মোহর, বারি ভুট্টা-৫, বারি ভুট্টা-৬, বারি ভুট্টা-৭ ও বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি বেবি কর্ণ-১। এছাড়া বারি ১৬টি হাইব্রিড ভুট্টার জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো হলো বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৩, বারি টপ ক্রস হাইব্রিড ভুট্টা-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫ (ছচগ), বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৬। এগুলোর মধ্যে বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫ (ছচগ), বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯ কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া যুগিয়েছে। সাম্প্রতিককালে উদ্ভাবিত বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪ সাদা দানা বিশিষ্ট ও খাটো প্রকৃতির। তাছাড়া বারি হাইব্রিড ভুট্টা ১৫ ও ১৬ বরেন্দ্র এলাকার উপযোগী, কম সেচে চাষাবাদ করা যায় এবং পরিপক্ক অবস্থায় গাছের পাতা সবুজ থাকে বিধায় পশু খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
ভুট্টার সাথে সাথী ফসল হিসেবে আলু, লালশাক, পালংশাক ও বরবটি চাষ করা যায়। এছাড়া আন্তঃফসল হিসেবে বাদাম, সয়াবিন, মুগ, ছোলা, মুলা, মিষ্টি আলু, মরিচ ইত্যাদির মতো লাভজনক ফসল চাষ করা যায়। উপরন্তু বিভিন্ন ফসল ধারায় ভুট্টা চাষের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন- ভুট্টা-রোপা আমন-আলু, ভুট্টা-মুগ-সরিষা, মুগ-(বৃষ্টি নির্ভর)-রোপা আমন-ভুট্টা, ভুট্টা-পতিত-গম ইত্যাদি।
বাংলাদেশে ভুট্টা ফসলে এখন পর্যন্ত মোট ২৮ ধরনের ছত্রাক, ভাইরাস ও নেমাটোডের আক্রমণ পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে এগুলো এখনো মারাত্মক আকার ধারণ করেনি। পোকার আক্রমণের মধ্যে কাটুইপোকা, স্টেম বোরার, কর্ণ এয়ারওয়ার্ম, রাইচ উইভিল, রাইচ মথ, এফিড এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সম্প্রতি ফল আর্মিওয়ার্ম নামক পোকাটি দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ভুট্টা ফসলে ব্যাপক ভাবে আক্রমণ করে। এটা দমনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যৌথভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে পোকাটির আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগ বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (অচঅ) বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের (২০১৮-১৯, ১৯-২০, ২০-২১, ২১-২২ ও ২২-২৩) মধ্যে প্রজনন বীজ ও হাইব্রিড বীজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যথাক্রমে ২.১০, ২.৬০; ২.২০, ৩.৫০; ২.৩৮, ৪.২০; ২.৬০, ৪.৫০; ও ২.৬৩, ৫.০০ মে. টন। বর্তমানে বারি’র সাথে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ব্র্যাক, লালতীর, সুপ্রীম সীড, এসিআই ও কৃষিবিদ সীড বিভিন্ন সিমিট (ঈওগগণঞ) পরীক্ষণ সম্পাদন ও বীজ উৎপাদন করে যাচ্ছে।
তাছাড়া বাংলাদেশে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানী হাইব্রিড ভুট্টার বীজ আমদানির মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে। বারি উদ্ভাবিত পিতৃমাতৃ সারি সমূহ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-কে সরবরাহ করা হয় যেন তারা বীজ বর্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন এবং বাণিজ্যিকভাবে বীজ বিক্রয় করতে পারে।
জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ অনুযায়ী বিশেষ আঞ্চলিক কৃষির আওতায় উপকূলীয় কৃষি অঞ্চলের উপযোগী ফসল এবং লাভজনক হিসেবে ভুট্টার চাষকে সুপারিশ করা হয়েছে।      ফিজিওলজিক্যাল হোমিওস্ট্যাসিস বা বাফারিং ক্ষমতা তথা উচ্চ অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়ায় ভুট্টা ফসলটি লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, খরা ইত্যাদি প্রতিকূল পরিবেশেও চাষ করা সম্ভব। তাছাড়া খরিফ-১ মৌসুমেও ভালভাবে চাষ করা যায়।
৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০১৬-২০২০ অনুযায়ী ভুট্টার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২০২১ সালে ১.৮৫ মিলিয়ন মে. টন ধরা হয়েছে যা ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে।  বর্তমান সরকারের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে খাদ্য নিরাপত্তা আইনের নিশ্চয়তার জন্য প্রতিকূল কৃষি আবহাওয়া অঞ্চল যেমন লবণাক্ত অঞ্চল, হাওড়, চরাঞ্চল, পাবর্ত্য অঞ্চল ও বরেন্দ্র অঞ্চল সমূহের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও জীবিকায়নের উপর জোর দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাইব্রিডাইজেশন ও জিএম ফুড বিষয়ক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ভুট্টা একটি আদর্শ ফসল।
বিগত কয়েক বছরে ভুট্টার উৎপাদন (লাখ মে. টন), জমির পরিমাণ (লক্ষ হে.) এবং ফলন (মে. টন/হে) ছিল যথাক্রমে ২০১৩-১৪ (২৫.১৬, ৩.৬৪, ৬.৯১); ২০১৪-১৫ (২৩.৬১, ৩.৫৫. ৬.৬৫); ২০১৫-১৬ (২৭.৫৯, ৩.৯৫, ৬.৯৮); ২০১৬-১৭ (৩৫.৭৮,৪.৩৪,৮.২৫) এবং ২০১৭-১৮ (৩৮.৯৩, ৪.৪৭, ৮.৭১)। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভুট্টার বীজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১০০ মে. টন যা এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৯-৩০ সালে ১০% বৃদ্ধি করে ১,০০০ মে. টন বীজ উৎপাদন করা প্রয়োজন।
জাতীয় কৃষি মেলা ২০১৮ এর তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ৭.৩০ লাখ মে. টন এবং ২০১৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮.৯৩ লাখ মে. টন হয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৪৫.৭৯ ভাগ।  দিন দিন ভুট্টার উৎপাদন ও চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সরকার ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে একটি নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার লক্ষে সংসদে একটি আইন পাশ করে।
 স্বাধীনতা পরবর্তী জাতির জনক উপলব্ধি করেন এদেশের     কৃষির উন্নয়ন তথা বাংলার মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যতা দূরিকরণের জন্য কৃষির উন্নয়নের বিকল্প নেই। এজন্য তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ই ফেব্রæয়ারী বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে  কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দান করেন। পাশাপাশি কৃষির বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি, কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।  তাঁর দূরদর্শিতার কারণে আজ দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষিতে এসেছে অভূতপূর্ব সাফল্য বিশেষত দানা শস্যে।
অধিক ফলন, উচ্চ অভিযোজন ক্ষমতা ও বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাত উন্নয়নে অধিক গুরুত্বারোপের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক কৃষককে আরও লাভবান করা সম্ভব।য়

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মহাপরিচালকের দপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর, ই-মেইল: quamrul_islam76@yahoo.com

 

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধু ও দৈহিক-মানসিক স্বাস্থ্য ভাবনা

ড. সত্যেন মন্ডল১  বীথিকা রায়২

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন যেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও রাজনৈতিক লক্ষ্য তেমনি অর্থনৈতিক মুক্তি সহ ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম আশা-আকাঙ্খা। তাঁর এই আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন দেখা যায় স্বাধীনতাত্তোর সাড়ে তিন বছরের কর্মকাÐে, বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে তাঁর সূদুরপ্রসারি পরিকল্পনা ও কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। তাঁর কর্ম-পরিকল্পনার মধ্যে ছিল-র) কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করা রর) ভুমি রাজস্বের চাপে নিষ্পিষ্ট কৃষকদের ২৫ বিঘা জমি পর্র্যন্ত খাজনা মাফ করা এবং বকেয়া খাজনা মওকুব করা ররর) প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার তৎপরতা চালানো রা) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের বনজ-সম্পদ,      গো-সম্পদ, হাঁস-মুরগী চাষ, দুগ্ধ ও মৎস খামার তৈরি ইত্যাদি। অর্থাৎ উৎপাদন ও উন্নয়নের মাধ্যমে দৈহিক ও মানসিকভাবে উন্নত জাতি গঠন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। তাই    মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে তাঁর প্রতি উৎসর্গকৃত আমাদের এই ক্ষুদ্র নিবেদন।
ঐতিহাসিকভাবে, মানুষ আদিম যুগ থেকে দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে খাদ্যের যোগাড় করে আসছে, শিকার বা সংগ্রহ এবং কৃষি। বর্তমানে, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের সিংহভাগই খাদ্য কৃষি বা  কৃষিভিত্তিক শিল্প  হতে সরবরাহ হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে মানুষের খাদ্য সুরক্ষা অর্জনের প্রয়াসে গত ১৬ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার পালিত হলো বিশ্ব খাদ্য দিবস । এবার খাদ্য দিবস এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘আমদের কর্মই আমাদের ভবিষৎ, পুষ্টিকর খাদ্যেই হবে আকাংখিত ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’ যা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-এর অন্যতম একটি ওয়াদা ‘পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা’ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্ব খাদ্য দিবসের বার্ষিক উদযাপন  এর অন্যতম উদেশ্য হলো- সর্বত্র মানুষকে স্বাস্থ্যকর খাদ্য সরবরাহের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা, জনগনকে খাদ্যতালিকাগত পছন্দ-অপছন্দ, পুষ্টি ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত করা।  আমাদের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কৃষি জীববৈচিত্র। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের কৃষকগণ এই জীববৈচিত্র্য ধরে রেখেছেন। মানুষের প্রয়োজনেই তারা বাছাই  করে নিয়েছেন ফসল, ফসলের জাত, গৃহপালিত প্রাণী ও প্রাণীর বিভিন্ন জাত। মাছ চাষের জন্য  প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার থেকে বেছে নিয়েছেন হরেক রকম মাছ। কৃষি জীব বৈচিত্রের আরেক অংশ হলো আমাদের কৃষি বনায়ন বা সামাজিক বনায়নের জন্য বাছাই করে নেওয়া উদ্ভিদ প্রজাতি। আমাদের আবাদি জমিতে চলছে বিভিন্ন মিশ্র ফসলের চাষ, আর এই আবাদি-অনাবাদি জমিতে অবস্থানরত জীব-অনুজীবও আমাদের কৃষি জীব বৈচিত্রের অংশ। এছাড়া আমাদের ফসলের পরাগায়নে সহায়তাকারী কীটপতঙ্গ, এমনকি ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গও এই জীব বৈচিত্র্যের সদস্য।
আধুনিক কৃষিতে জীব বৈচিত্র্যে আজ হুমকির মুখে, জীব বৈচিত্র্যে  ধরে রাখা অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। কারন আধুনিক কৃষির প্রভাব আজ পড়ছে কৃষির সকল পর্যায়ে। অল্প জায়গা থেকে অধিক উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার মুখে খাদ্য তুলে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ এর পাশাপাশি রয়েছে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ। ফলে আমাদের আবাদ করতে হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল ফসল, মাছ ও ডিমের প্রয়োজনে গড়ে তুলতে হচ্ছে নতুন নতুন বিদেশী বা দেশি-বিদেশী সংকর জাতের মুরগি খামার। একইভাবে অধিক দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনের আশায় লালন-পালন করতে হচ্ছে বিদেশী বা সংকর জাতের গরু।  প্রাণীজ আমিষের চাহিদা মেটাতে আরও গড়ে তুলতে হচ্ছে ছোট বড় মৎস খামার, যেখানে বিভিন্ন মাছের বাচ্চা উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারের চাহিদা মোতাবেক বড় বড় মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। এই সকল কর্মকাÐ পরিচালনা করতে হয়েছে বা হচ্ছে আমাদের জনগণের খাদ্যাভাস এর কথা মাথায় রেখে। দেশের জনগনের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিধান করার লক্ষ্যে। তবে এইসব করতে গিয়ে আমাদের সর্বদাই মাথায় রাখতে হবে যেন আমরা আমাদের স্থানীয় ফসলের জাত, গৃহপালিত পশুর স্থানীয় জাত, প্রাকৃতিক মৎস প্রজনন আবাসস্থল ইত্যাদি যেন হারিয়ে না ফেলি। এগুলো হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে কৃষি জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে টেকসহ উন্নয়ন।
এবার ফেরা যাক স¦াস্থের কথায়, জীবনের কথায়। দীর্ঘজীবি হতে কে না চায়? তাহলে বেশি কিছু নয় কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলেন তাহলে আপনি হবেন স¦াস্থ্যবান ও দীর্ঘজীবি, দৈনিক-
প্রচুর পরিমানে ফলমূল খেতে হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক পরিশ্রমি ব্যক্তির  ফল- ১৫০ গ্রাম ও শাকশব্জি ২৫০ গ্রাম খেতে হবে।
পর্যাপ্ত শারিরীক পরিশ্রম করতে হবে।
সিগারেট ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।
পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে (৭-৮ ঘন্টা)।
স¦াস্থ্য ভাল রাখতে লাল মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কম পরিমাণে এবং শাক-সবজি, ফল, মাছ এবং শস্যদানা বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস শুধু ওজনই নিয়ন্ত্রেণে রাখবে না পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শারীরিক স¦াস্থের সাথে মানসিক স¦াস্থের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবার স¦াস্থ্যের সাথে মানুষের স¥ৃতিশক্তির একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। অনিয়ন্ত্রিত জীবনজাপনের জন্য অনেকেরই অল্প বয়সেই স¥ৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। এক্ষেত্রে সচেতনতা জরুরী। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে মস্তিস্কে অক্সিজেন সঞ্চালন বাড়ে ফলে স¥ৃতিশক্তি দৃঢ় হয়। অন্যদিকে রাতে টানা ৬-৮ ঘন্টা ভাল ঘুম না হলে মস্তিস্ক জটিল সমস্যার সমাধান বা চিন্তা করতে পারে না। মস্তিস্ক সজাগ রাখতে সুযোগমতো বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটান, সামাজিক কর্মকান্ড বা মানবসেবায় যোগদিন এবং প্রানখুলে হাসুন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি সামাজিক, পরপোকারী সদা হাস্যোজ্জ¦ল তাদের মনে রাখার ক্ষমতাও প্রবল। কারণ স্নেহ-মমতা, বন্ধুত্ব-ভালবাসা এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম যা মানুষের মানসিক স¦াস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে। শারীরিক ও মানসিক চাপ স¥ৃতিশক্তি হ্রাসের জন্য দায়ী। এজন্য মেডিটেশনের কোন বিকল্প নেই।
স¥ৃতিশক্তি বাড়াতে খাদ্য তালিকায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন শিম, কুমড়ার বীজ, সয়াবিন, ব্রোকলি, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদিতে রয়েছে স্যাচুরেটেন্ড ফ্যাট। রঙিন তাজা ফলমুল, শাকশব্জি ও সবুজ চায়ে রয়েছে এন্টিঅক্সিডেন্ট। এসব পুষ্টি উপাদান মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে স¥ৃতিশক্তি তী² করে। শিশুদের ভিডিও গেম বা সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলা করতে না দিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক খেলনা দিন এবং অনুষ্ঠান দেখান। তাদের নতুন নতুন গল্পের বা উপন্যাসের বই পড়তে দিতে পারেন এবং আপনি নিজেও শিশুদের সামনে দীর্ঘক্ষন মোবাইল ব্রাউজিং থেকে বিরত থাকুন এবং নিজে বই পড়ুন (হার্ড কপি) তাহলে শিশুও বই পড়ায় আগ্রহ পাবে। কারণ শিশুরা সবসময় অনুকরন প্রিয়। এছাড়া নিজে নতুন নতুন কাজের ঝুঁকি নিন কারণ নতুনত্ব একঘেয়িমিতা দূর করে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ায় ও মানসিক স¦াস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে।
মানসিক অস্থিরতা কিংবা বিষণœতা দুর করতে আমরা মেডিটেশনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা এক মাস মেডিটেশন অব্যাহত রাখলে মস্তিকে গঠনগত যে পরিবর্তন আসে তা মানসিক ব্যাধি প্রতিকারে কার্যকারী ভুমিকা রাখতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভাল রাখে। ব্রিটিশ একদল গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই গ্রুপ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গবেষণা চালান । এক গ্রæপ এক মাসব্যাপি মেডিটেশনের অভ্যাস করে অন্য গ্রæপ করে না। গবেষকগন লক্ষ্য করেন যে, মেডিটেশন করা গ্রুপের ছাত্র-ছাত্রীদের মস্তিস্কের ¯œায়ুতন্ত্র (হোয়াট মেটার) বেশি উদ্দীপ্ত হয় এবং বেশি সংকেত গ্রহণে সক্ষম হয় ফলে মস্তিস্কের যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং তাদের আচার-আচারণের অনেক গুনগত পরিবর্তন হয়। (সূত্র: ডেইলি মেইল; ড. মজুমদার ২০১৮)।  মানসিক স¦াস্থ্য ভাল রাখার অন্য আরও একটি কথা বলা যাক,  মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা করে রাখার অভ্যাস ভাল নয়, যা হৃদযন্ত্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। গবেষনায় দেখা গিয়েছে ক্ষমা করার পরিবর্তে ক্ষোভ জমা করে রাখলে মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে হৃদ্ররোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ে। ডক্টর সিমন্স বলেন “আপনি ভাবতেই পারবেন না মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা থাকলে তা কত দ্রæত এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের ক্ষতি সাধন করে। তাই নিজের ঘাঁড় থেকে এই আপদ নামিয়ে মানসিকভাবে সুস্থ থাকুন সবসসময়।”এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্যথি হেফনার ক্ষমাশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর ফলে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে যা সুরক্ষিত রাখবে হৃদযন্ত্র এবং ভাল থাকবে মানসিক স¦াস্থ্য। পরিশেষে শীতের মৃদু-মন্দ বাতাসে ফাগুনের আগমনী বার্তায় সকলের শারীরিক ও মানসিক সুস¦াস্থ্য কামনায় ছন্দে ছন্দে বলি-
ফুলকপি ওলকপি ও আমলকি জলপাই ফল,
এসব খেলে দেহেতে বাড়ে শক্তি সাহস আর বল।
মা-শীতের দিনে নতুন ধানে পায়েস-মিঠাই করে,
সেসব খেয়ে পেটের সাথে মনটাও তাই ভরে।
রোগমুক্ত দেহ ও মন পেতে চান? তাহলে নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, হাঁটা, দৌঁড়ানো, সাঁতার কাটা বা কায়িক পরিশ্রম কিংবা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন। এসব কর্মকাÐ শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ রাখবে এবং ডায়বেটিস কিংবা হৃদরোগ থেকে দূরে রাখবে। য়

১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর, ২সহকারী শিক্ষক, কালীগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কালীগঞ্জ, গাজীপুর। *মোবাঃ-০১৭১২৪০৫১৪৯,ইমেইল- satyen1981@gmail.com

 

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর কৃষি ভাবনায় কৃষকের বাজার ব্যবস্থাপনা

আব্দুস সালাম তরফদার

আবহমান গ্রাম বাংলার নিভৃত পল্লীর নদী-খাল বিধৌত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। মধুমতির শাখা নদী বাঘিয়া নদীর স্বচ্ছ জলের ধারা তখন প্রবাহমান। সে বাঘিয়া নদীর স্বচ্ছ জলে পা-ডুবিয়ে, কখনও বা সাঁতার কেটে  শরীরে  শীতল জলের পরশ মেখে যে কিশোর স্বপ্ন দেখেছিলেন গ্রাম বাংলার অভাবী খেটে খাওয়া মানুষের মুখে দু-মুঠো অন্ন তুলে দেবার। সবুজের সমারোহে সোনার বাংলা বিনির্মাণে যার জীবন-যৌবনের অধিকাংশই কেটেছে জেলখানার শক্ত প্রাচীরে। বাবার অগোচরে  যে দুরন্ত কিশোর নিজেদেরই গোলার ধান বিলিয়েছেন গ্রামের অভুক্ত মানুষের ক্ষুধা লাঘবে। সেই শৈশবের জনদরদি দুরন্ত কিশোরের স্বপ্ন-সাধ ছিল গ্রাম বাংলায় থাকবে গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরুর সুখ শান্তিতে  ভরা।  গ্রামীণ জনপদের নিরন্ন মানুষগুলো যাতে দু-বেলা দু-মুঠো খাবার পেতে পারে সে স্বপ্নের বীজ তিনি তো শৈশবেই বুনে ছিলেন। শৈশব থেকে কৈশোর পেরিয়ে যুবক বঙ্গবন্ধু শেখ    মুজিবুর রহমান দেশ মাত্রিকার টানে শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে ছাত্রজীবন থেকেই ভাষা আন্দোলনসহ জনকল্যাণমুখী সকল রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।
৭ই মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে  স্বাধীনাতার যে  ডাক তিনি দিয়েছিলেন, তার সুফল হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেস্বর ৯ মাস যুদ্ধের দীর্ঘ পরিক্রমা পেরিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহান বিজয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে এদেশ থেকে চিরতরে বিতাড়িত করা সম্ভব হয়। যুদ্ধ বিব্ধস্ত এ দেশে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুবিহীন যেন কাÐারি ছাড়া হাল ভাঙ্গা নৌকার মতো। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে অবশেষে তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশের মাটিতে পা-রাখলেন। পাকিস্তানী বাহিনী আর তাদের দোষরদের ভয়াবহ তাÐবে লÐভÐ বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীনের আগে আগেই যেমন তারা সেরা বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মধ্যদিয়ে শেষ করে দিয়ে যায় তেমনি যেন শ্মশানে পরিণত হয় ক্ষেত, খামার, রাস্তাঘাট, খাদ্যগুদাম, ব্রিজ-কালভার্ট সবই।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। অসম্ভব ভালো বাসতেন তিনি শ্রমজীবী মানুষ আর কৃষকদের। তিনি তখন দেখলেন এদেশের প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে            কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাই তো তিনি প্রথমত কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া এদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির কোন পথ খুঁজে পাননি।
দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে  হায়েনাদের থাবা  তখনও সুস্পষ্ট। পাকিস্তানি বাহিনী আর দেশীয় রাজাকার দোসররা মিলে কৃষকের হালের বলদ থেকে শুরু করে দুধের গাভী পর্যন্ত জবাই করে খেয়ে ফেলে। যার ফলে রিক্ত নিঃস্ব চাষি অসহায় হয়ে পড়েন সার্বিক কৃষি পুনর্বাসনে। প্রায় ১৪ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ফসলি জমি পুরো   অনাবাদি হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু বলেন ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’ আর এ সেøাগানকে সামনে রেখে শুরু হয় সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন ব্যবস্থা।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে প্রায় ২২ লক্ষ কৃষক পরিবারকে দ্রæত পুনর্বাসনের কাজ হাতে নেন বঙ্গবন্ধু। সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনায় তিনি শুমারি বা জরিপের ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষি উন্নয়ন ক্ষেত্রে তিনি তার  ভাষণে সব সময় বলতেন যে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনার আগে আমাদের টোটাল জরিপ করা দরকার। দেশের জনসংখ্যা, বিদ্যমান সম্পদ, চাহিদা, উদ্বৃত্ত, ঘাটতি এসব বিষয় আগেই জরিপ করে সে মোতাবেক পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিতেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ছিল সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে        যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশটাকে পুনর্গঠন করে সোনার বাংলায় রূপান্তর করা। তাই তো তিনি ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের ৫০০ কোটি  টাকা উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ১০২ কোটি টাকা  শুধুমাত্র কৃষি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ প্রদান করেন। এর মাধ্যমে  তাঁর সরকার আমলের প্রথম থেকেই কৃষিবান্ধব দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায় অনায়াসেই। তিনি কৃষি উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে বিদ্যমান কৃষি বিভাগ ও কৃষি বাজার পরিদপ্তর (বর্তমান কৃষি বিপণন অধিদপ্তর) ছাড়াও কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, মৎস উন্নয়ন কর্পোরেশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান নতুন সৃষ্টি ও বিদ্যামান কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন দপ্তরসমূহের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সাধন করেন।
কৃষকদের বিভিন্ন কৃষি উপকরণ যেমন সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি যাতে কৃষক নির্বিঘেœ পেতে পারে তার জন্যে তিনি কৃষি খাতে ক্ষেত্র বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করেন। তাঁর সরকারের  শুরুর দিকে বিদেশ হতে মানসম্পন্ন বীজ আমদানির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু তার ভাষনে কৃষকগণকে নিজেদের বীজ নিজেদের ক্ষেতে উৎপাদনের পরামর্শ দিতেন। তিনি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন ও মৎস চাষে উদ্বুদ্ধকরতেন প্রতিনিয়ত তাঁর ভাষণে। তিনি  সামগ্রিক প্রশাসন যন্ত্রকে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে সেবা প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি তার ভাষনে বলতেন তাদের টাকায় সরকারি কর্মচারীদের মাহিনা হয়, তাদের টাকায়    অফিসার, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিক তৈরি হয়।
তাই তিনি তাদেরকে সম্মানের চোখে দেখে সেবা প্রদান করতে নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি অতি সহজেই কৃষক তথা শ্রমজীবী মানুষের অন্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। যার কারণে ক্ষেত-খামারের শ্রমজীবী মানুষ মনে মনে ভাবতেন বঙ্গবন্ধু তো আমাদেরই লোক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ভাবতেন কৃষকদের শিক্ষিত হতে হবে কারণ কারিগরি আর আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ক জ্ঞান ব্যতিরেকে অধিক কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়। যার কারণে তখন থেকেই কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়।
কৃষি উৎপাদন ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি
যে কোন কৃষিজাতপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির প্রধান নিয়ামক হলো কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচ হ্রাস আর বাজার চাহিদা      সৃষ্টি। সে সময় বঙ্গবন্ধু কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতে বেশ কিছু দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন যাতে কৃষকের সুষম উৎপাদন ধারার ক্রমবৃদ্ধি ঘঠে। যেহেতু নব্য স্বাধীন  দেশের শুরুতেই বড় একটা খাদ্য ঘাটতি ছিল, তাই শহর-গ্রাম উভয় অঞ্চলে কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য কিছুটা বেশি ছিল। আবার বঙ্গবন্ধুর কৃষি উপকরণে ভর্তুকি হেতু কৃষি উৎপাদন খরচ কম ছিল। যে কারণে কতিপয় কৃষি পণ্য ব্যতীত  বেশির ভাগ      কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে কৃষক বিক্রি করতে সক্ষম ছিল। তবে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে যোগাযোগের রাস্তা ও বাজার-ঘাট বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার কারণে গ্রামে উৎপাদিত কৃষি পণ্য শহরে বাজারজাত করতে বেশ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সে অবস্থা মাথায় রেখে বঙ্গবন্ধু যোগাযোগের  রাস্তা, কালভার্ট ও বাজার-ঘাট         পুনঃ নির্মাণ এবং সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটবাজার উন্নয়নে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় সবই পুনঃ প্রতিষ্ঠিত  হয়। সড়ক ও জলপথে প্রান্তিক কৃষক বিভিন্ন পাইকারী বড় মোকামগুলোতে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিপণন করতে সক্ষম হয়।
বঙ্গবন্ধুর কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে সিংহ ভাগ বরাদ্দ  এবং রাস্তাঘাট ও বাজার অবকাঠামো পুনঃনির্মাণ কার্যক্রম কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে সহযোগিতার দ্বার উন্মোচিত করে। বিদেশ হতে উন্নত জাতের বীজ আমদানির ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের প্রায় ১৪ হাজার বর্গমাইল অনাবাদি জমির অনেকাংশ পুনরায় চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়।
বাজার ব্যবস্থাপনার সেকাল-একাল
১৯৭২ সাল হতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাজার তদারকি ব্যবস্থার বেশ প্রয়োজনীতা দেখা দেয়। যেহেতু পাকিস্তানি হায়েনারা খাদ্য গুদাম পর্যন্ত পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। প্রায় ০৯ মাস যুদ্ধ কালীন দেশের ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।       গ্রাম-শহরের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়। চরমভাবে বিঘœ ঘটে সার্বিক কৃষিকাজ তথা চাষাবাদের। তাছাড়া দেশ স্বাধীনের আগে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দেশের গোটা দক্ষিণাঞ্চলে ঘঠে যায় প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ¡াস। তখন প্রায়  ১০ লক্ষ লোক প্রাণ হারায় সে মহা প্রলয়ংকারি ঘূর্ণিঝড়ের কবলে। চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র নিপীড়িত জনপদসহ ফসলি জমির সমস্ত ক্ষেত-খামার। এসব কারণে বিশাল একটা খাদ্য ঘাটতি নিয়ে নব্য স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু করতে  হয়। প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিদেশী খাদ্য ও নিত্যপণ্যাদি সাহায্যের।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকে কিছু দেশীয় ছদ্মবেশি রাজাকার, কুচক্রি মহল আর সুবিধাভোগী শ্রেণী বিভিন্ন নিত্যপণ্যের কালোবাজারী আর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে থাকে। দাম বাড়তে থাকে বিভিন্ন কৃষি পণ্যের, যা জন সাধারণের ভোগান্তিতে পরিণত হতে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে দেশের সব ডিসি/এসডিও মহোদয়গণকে কঠোর ভাবে বাজার তদারকির নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু এসব কালোবাজারি আর সুবিধাভোগীদের প্রতি চরম বিরক্ত হয়ে তাঁর ভাষণে বলতেন পাকিস্তান সব নিয়ে গেছে, চোরগুলো রেখে গেছে , এই চোরগুলো নিয়ে গেলেও বাঁচতাম। খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় আর কালোবাজারি, অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখতে বঙ্গবন্ধু সৃষ্টি করেন ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। তখন এ টিসিবির মাধ্যমে তিনি উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে খাদ্য ও নিত্যপণ্য আমদানি শুরু করেন। সেই সংস্থাটি বর্তমান তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও কৃষিজাত খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ  ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
তৎকালীন সময় মাঠপর্যায়ে প্রত্যেক জেলার ডিসি ও মহকুমার এসডিও মহোদয়ের নেতৃত্বে বাজার তদারকিতে প্রধানত ০৪টি সংস্থা নিয়োজিত ছিল। কৃষি বাজার পরিচালনালয় যা পরবর্তীতে কৃষি বাজার পরিদপ্তরের অধীন (বর্তমান কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের) জেলা মার্কেটিং অফিস, ট্রেডিং কর্পোরেশ অব বাংলাদেশ (টিসিবির অফিসার) ডিস্ট্রিক্ট ফুড অফিস (বর্তমান খাদ্য অধিদপ্তরাধীন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক) ও ডিস্ট্রিক্ট রিলিফ অফিস (ত্রাণ ও পুনর্বাসান  মন্ত্রণালয়াধীন) বর্তমান জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা।
ডিস্ট্রিক্ট মার্কেটিং অফিসার/মার্কেটিং ইনভেস্টিগেটর, টিসিবি অফিসার, ডিস্ট্রিক্ট ফুড অফিসার ও ডিস্ট্রিক্ট রিলিফ অফিসার যথাক্রমে ৪টি সংস্থার জেলা/মহকুমার প্রধান হিসেবে বাজার তদারকিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন। ডিসি ও এসডিও মহোদয়দের নির্দেশে তখন সপ্তাহান্ত  প্রতি শনিবার বিভিন্ন খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের সাপ্তাহিক বাজার পরিস্থিতি সংক্রান্ত রিপোর্ট ডিসি ও এসডিও দপ্তরে প্রেরণ করতেন কৃষি বাজার পরিদপ্তরের (কৃষি বিপণন অধিদপ্তর) ডিস্ট্রিক্ট মার্কেটিং অফিসার/মার্কেটিং ইনভেস্টিগেটরগণ। সাথে সাথে অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি সংক্রান্ত গোপনীয় তথ্য প্রদান করেও প্রশাসনকে বাজার তদারকিতে সাহায্য করতেন তৎকালীন কৃষি বাজার পরিদপ্তরের এসব কর্মকর্তা।
দুর্গম এলাকায় বাজার পরির্দশন করে খাদ্য পণ্যের সরবরাহ ও চলাচল পর্যবেক্ষণ, কালোবাজারি ও মজুদদারদের শনাক্তকরণ, বাজার নিয়ন্ত্রণে পারমিট, মার্কেটিং লাইসেন্স, ডিলিং লাইসেন্স তদন্ত করে  অবৈধ ব্যবসায়ী শনাক্তকরণ, ইত্যাদি কাজে কৃষি বাজার পরিদপ্তরের ডিস্ট্রিক্ট মার্কেটিং   অফিসার/মার্কেটিং ইনভেস্টিগেটরগণ বঙ্গবন্ধুর সরকার আমলে  উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করতেন। সাথে সাথে ১৯৬৪ সালের কৃষি পণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ডিসি/এসডিও মহোদয়গণের সহযোগিতায় অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। বিদেশ থেকে সাহায্য হিসেবে আসা রিলিফ বিতরণ তদারকি, টিসিবি কর্তৃক আমদানিকৃত খাদ্য ও ভোগ্য নিত্যপন্যের ডিলারশিপ  তদন্ত, খাদ্য বিভাগের রেশনিং/ডিলারশিপ তদারকি ইত্যাদি কাজেও বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে  কৃষি বাজার পরিদপ্তর দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দপ্তরটির গুরুত্ব অনুধাবন করে  কোন একটি অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু সরকারের  তৎকালীন মাননীয় কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী  কৃষি বাজার পরিদপ্তরটির পুনর্গঠন করে সদর দপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদ মর্যাদা বৃদ্ধিসহ দপ্তরটি আরো স¤প্রসারিত করার ঘোষণা দেন।
বর্তমান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কণ্যার সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন আর বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার শীর্ষে আহরণ করতে যাচ্ছেন অচিরেই। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত দেশের আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এতদসত্তে¡ও বঙ্গবন্ধু কন্যার         কৃষিবান্ধব পরিকল্পনা, কৃষিতে ভর্তুকি আর বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪গুন। বঙ্গবন্ধুর জনকল্যাণমুখী যাবতীয় স্বপ্ন তিনি পূরণ করে চলছেন।
আমাদের দেশ আজ সারা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অন্যতম। এদেশের উন্নয়ন আজ সারা বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। সেদিন আর দূরে নয় উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে এদেশ উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখানো সম্ভব হবে একদিন।
বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে কৃষি ভাবনার যে স্বপ্ন ছিল কৃষি বাজার পরিদপ্তরটি (কৃষি বিপণন অধিদপ্তর) পুনর্গঠিত করা তা আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার ১৯৯৬ সালে প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পরই ১৯৯৭ সালের কৃষি নীতিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পুনর্গঠন সংক্রান্ত বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। মাঝখানে জোট সরকারের আমলে সে গতিধারা শ্লথ হয়ে এক সময় পুরোটাই স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় আসার পরে  ২০১৫ সালে চ‚ড়ান্তভাবে বঙ্গবন্ধু সরকারের           কৃষি বাজার পরিদপ্তরটি (কৃষি বিপণন অধিদপ্তর) পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্গঠন হয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের শীর্ষপদ              মহাপরিচালক ও জেলা পর্যায়ে কৃষি বিপণন ক্যাডার পদ সৃষ্টিসহ ২৬০৪ জন জনবল সৃজন করত জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রæত এগিয়ে যাচ্ছে। য়

জেলা মার্কেটিং অফিসার,কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, জেলা মার্কেটিং অফিস, খুলনা, মোবা : ০১৭৪১২৭০৫২২, ই-মেইল : Storfder@gmail. com

 

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর দর্শনে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা

ড. জগৎ চাঁদ মালাকার

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তিনি দেখতে চেয়েছিলেন দেশের কৃষি ও কৃষকের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন এবং স্বনিভর্রতা। তাই তো বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কৃষি ক্ষেত্রে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহে বঙ্গবন্ধু বিশেষ ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণে তিনি কৃষি বিপ্লবের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা গ্রামই সব উন্নয়নের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যখন বেগবান হবে তখন গোটা বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে সম্মুখপানে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কৃষি শিক্ষায় আকৃষ্ট করে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মানসে জাতির পিতা এসময় কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেন। তাঁর অদম্য ইচ্ছা ছিল যে কোনো উপায়ে কৃষকের স্বার্থরক্ষা করা। কেননা কৃষকই এ দেশের আসল নায়ক যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের সবার অন্ন জোগায়। কৃষকের চলমান, চাহিদা যথোপযুক্তভাবে নিশ্চিত করতে পারলে কৃষক অনেক আগ্রহে স্বতঃস্ফূর্ততায় কৃষিতে নিজেকে বিনিয়োগ করতে পারবে, উন্নয়নের জোয়ার বইবে।  
আরেকটি কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু, গ্রামের কৃষক অনেক অভিজ্ঞ অনেক দক্ষ। তাদের সাথে শেয়ার করে সমন্বয় করে আধুনিক কৃষিতে এগোতে হবে। মানুষের ওপর জোর করে কিছুই চাপিয়ে দেয়া যাবে না এটি খুব ভালো করে জানতেন বঙ্গবন্ধু। তাই তো তিনি বলেছেন করে দেখাতে হবে, এতে  কৃষক নিজে নিজে শিখে নিজের আঙিনায় বাস্তবায়ন করবে। এক গ্রামের ২০ জনকে একসাথে ক্ষেতখামারে হাতেকলমে কাজ দেখালে পাশের অন্য কৃষক দেখে দেখে নিজের জমিতে বাস্তবায়ন করলে উৎপাদন বেড়ে যাবে। তখন সারা বাংলার অন্যরা এগিয়ে আসবে সম্পৃক্ত হবে উন্নয়নের মূলধারায়। কেননা আমাদের কৃষক দেখে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত।
সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা  হলো খামারের উপাদানসমূহে (ধান চাষ, রবিশস্য চাষ, বসতবাড়ীতে ফল মূল ও শাকসবজির চাষ, হাঁস- মুরগি পালন, গরু পালন, ছাগল/ভেড়া পালন এবং মাছ চাষ) উন্নত কলাকৌশলের সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং এদের আন্তঃ সম্পর্ক বিবেচনায় রেখে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত ফলন লাভ করাই হলো সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যদি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা না যায় তাহলে আমাদের কৃষি উন্নয়ন ব্যাহত হবে, আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারব না। আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ব। কোঅপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে আগাতে পারলে আমাদের কৃষির উৎপাদন এবং সার্বিক উন্নয়ন দুটিই মাত্রা পাবে। অধিক শস্য উৎপাদনের জন্য আমাদের সবার সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠের ফসল, গবাদিপশু, মাছ পরিবেশ সব কিছুর মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় করেত হবে। তা না হলে আমরা কাক্সিক্ষতভাবে এগোতে পারব না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, খাদ্য শুধু চাউল, আটা, নয়; মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, তরকারিও আছে। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের উৎপাদন উন্নতি করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর দর্শনেই আজ বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার (আইএফএম) মাধ্যমে কৃষক তার খামারের সম্পদসমূহ চিহ্নিত করে এদের আন্তঃসম্পর্ক বিবেচনায় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করেন। এতে খামারের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হওয়া যায়। খামারের সমস্যা সমাধানে খামারের নিজস্ব সম্পদ কি কি আছে তা দেখবেন। খামারের উপাদানের উপজাত যেমন গোবর, খড়, ছাই, কুড়া, মুরগির বিষ্ঠা, চাল ভাঙা ইত্যাদি খামারি ব্যবহার করবেন এবং খামারে নতুন কোন উপাদান যোগ করার সুযোগ আছে কি না তা দেখবেন এবং তা ব্যবহার করে খামারের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হবেন।
খামারের সকল উপাদানসমূহে (ধান চাষ, রবিশস্য চাষ, বসতবাড়িতে ফলমূল ও শাকসবজি চাষ, হাঁস- মুরগি পালন, গরু পালন, ছাগল/ভেড়া পালন এবং মাছ চাষ) ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং খামারের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করে অধিক লাভবান হবে।
নিরাপদ খাদ্যকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন দেশ কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, দূষণকারী বস্তু, অণুজীব, রোগ ও পোকা ইত্যাদির পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করছে। উত্তম কৃষি পদ্ধতি সামগ্রিক কৃষি কার্যক্রম যা অনুসরণে নিরাপদ এবং মানসম্পন্ন খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত কৃষিজাত পণ্য সহজলভ্য, পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনীতি এবং সমাজ সুসংহত হবে। নিজের বসতবাড়িতে উৎপাদিত কৃষি পণ্য নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় দারুণ ভ‚মিকা রাখবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সমন্বিত কৃষি খামারের ধারণাটি কৃষকের বাড়িতে করা যায়। দেশের নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার অপার সুযোগ হবে বলে আমার বিশ্বাস। য়

উপপরিচালক (এল.আর.), ডিএই, মোবাইল-০১৭১৬০০৪৪০০, ই-মেইল : Jagot_mala@yahoo.com

 

বিস্তারিত
মারাত্মক ক্ষতিকর ফল আর্মিওয়ার্ম পোকা হতে ভুট্টা রক্ষায় করণীয়

প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম১ প্রফেসর ড. মো. ফারুক হাসান২ কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম৩

বিশ্বব্যাপী ভুট্টার একটি মারাত্মক ক্ষতিকর ও বিধ্বংসী পোকা হলো ফল আর্মিওয়ার্ম বা সাধারণ কাটুই পোকা যার বৈজ্ঞানিক নাম ঝঢ়ড়ফরঢ়ঃবৎধ ভৎঁমরঢ়বৎফধ। অত্যন্ত ক্ষতিকর, বিকল্প পোষকের উপস্থিতি এবং সেই সাথে দমন ব্যবস্থাপনা কঠিন হলেই কেবল একটি পোকা মারাত্মক ক্ষতিকর বা মুখ্য ক্ষতিকর পোকা হয়ে উঠে। এ তিন বৈশিষ্ট্যের প্রতিটিই রয়েছে এ পোকার মধ্যে। এটি মূলত আমেরিকা মহাদেশের পোকা হলেও ২০১৬ সালে আফ্রিকা এবং ২০১৮ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশেষত ভারত, শ্রীলঙ্কায় এ পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। উদ্বেগের বিষয় হলো ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে স্থাপনকৃত ফেরোমোন ফাঁদে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহে এ পোকার উপস্থিতি দেখা যায়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে ভুট্টা উৎপাদনকারী প্রায় সব জেলাতেই এ পোকার উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে।
পোকা চেনার উপায়
এ পোকার বাচ্চা বা কীড়ার দেহের উপরিভাগে দুইপাশে লম্বালম্বিভাবে গাঢ় রঙের দাগ রয়েছে। দেহের তলপেটের ৮ম অংশের উপরিভাগে ৪টি স্পষ্ট কালো দাগ আছে। মাথায় উল্টা ণ অক্ষরের মধ্যে জালের মতো দাগ রয়েছে।
ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার আক্রমণের মাত্রা, জীবনকাল ও ক্ষতির লক্ষণ  
এ পোকা ভুট্টা, সরগম, বাদাম, তামাক, বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজিসহ প্রায় ৮০ প্রকারের ফসলে আক্রমণ করে থাকে। তবে ভুট্টায় আক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। পোকাটি বাচ্চা বা কীড়া অবস্থায় গাছের পাতা ও ফল খেয়ে থাকে। কীড়ার প্রাথমিক অবস্থায় খাদ্য চাহিদা কম থাকে, তবে কীড়া বড় হতে থাকলে বিশেষ করে শেষের দিকে চাহিদা প্রায় ৫০ গুণ বৃদ্ধি পায়। সে কারণে শেষ ধাপসমূহে (৪-৬ ধাপ) অর্থাৎ কীড়া পূর্ণাঙ্গ বা বড় আকারের হলে রাক্ষুসে হয়ে উঠে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। এমনকি এক রাতের মধ্যে সমস্ত ফসল নষ্ট করে দিতে পারে।
এ পোকার জীবনকাল ডিম-কীড়া-পুত্তলি-পূর্ণাঙ্গ পোকা এ চার ধাপে সম্পন্ন হয়। গ্রীষ্মকালে পোকাটি ৩০-৩৫ দিনে এবং শীতকালে ৭০-৭৫ দিনে    জীবনকাল সম্পন্ন করে। স্ত্রী পোকা গাছের গোড়ার দিকের কাÐের সাথে পাতার সংযোগস্থলের নিচের দিকে ১০০-২০০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বেড় হওয়া বাচ্চাগুলো পাতা খেতে শুরু করে এবং পাতায় ছোট ছোট সারি ছিদ্র (জড়ি ড়ভ যড়ষবং ষরশব ংুসঢ়ঃড়স) তৈরি করে। কচি গাছের পাতার কানের মতো মোড়ানো অংশ এবং বড় গাছের ভুট্টার মোচার চারপাশে মোড়ানো পাতা খেতে পছন্দ করে। ভুট্টার মোচার চারপাশের পাতা খাওয়ার পর এরা মোচার ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং মোচায় তৈরি হওয়া নরম দানাগুলো খেতে থাকে। এর মধ্যে ফল আর্মিওয়ার্মের কীড়াগুলো পরিণত ও বড় হয়ে পাতা খেয়ে ঝাঝরা করে ফেলে এবং ব্যাপক ক্ষতি করে ভুট্টা গাছের মাথার দিকে পৌঁছায়। কচি গাছ হলে বৃদ্ধি বন্ধ হয় এবং নতুন কোনো পাতা গজায় না। মোটামুটি ১৪ দিন পর পূর্ণাঙ্গ কীড়া পিউপা বা পুত্তলি দশায় পৌঁছার জন্য মাটিতে পড়ে। এ সময় এরা ১-৩ ইঞ্চি গভীরে অবস্থান করে। মাটি খুব বেশি শক্ত হলে ঝরে পড়া পাতা দিয়ে নিজেদের ঢেকে রাখে। এর প্রায় ৮-৯ দিন পর পূর্ণাঙ্গ মথ মাটি থেকে বের হয়ে আসে এবং পুনরায় জীবনচক্রটি শুরু করে। উষ্ণ, আর্দ্র    আবহাওয়ায় একটি ভুট্টা ফসল মৌসুমে পোকাটি ৪-৫টি জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে। এ জন্য খুব অল্প সময়ে এটি বিধ্বংসী হয়ে উঠতে পারে।
পোকা বিস্তারের মাধ্যম
পোকাটি পৃথিবীব্যাপী সংগনিরোধ বালাই হিসেবে পরিচিত। ডিম, কীড়া, পুত্তলি অবস্থায় বিভিন্ন উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত উপাদান যেমন- চারা, কলম, কন্দ, চারা সংলগ্ন মাটি ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। পূর্ণাঙ্গ পোকা অনেক দূর পর্যন্ত উড়তে পারে। এমনকি ঝড়ো বাতাসের সাথে কয়েক শত কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।
এ পোকা দমনে আমাদের করণীয়
যেহেতু পোকাটি ইতোমধ্যে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলসহ সারাদেশে ভুট্টা আবাদকৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে ব্যাপক ফসলহানির সম্ভাবনা রয়েছে। পোকাটি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাথমিক অবস্থায় পোকাটির অবস্থান চিহ্নিত করতে হবে। চারা গজানোর পর থেকে মোচা আসা পর্যন্ত নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মনে রাখবেন মোচায় আক্রমণ হলে এ পোকা দমন করা প্রায় অসম্ভব এবং ফলন শূন্যের কোঠায় চলে আসতে পারে। পোকার উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য ফসল লাগানোর সাথে সাথে ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। এজন্য ভুট্টা ও অন্যান্য পোষক ফসলের জন্য বিঘা প্রতি অর্থাৎ ৩৩ শতকে ৫ থেকে ৬ টি ফাঁদ পাততে হবে এবং সব সময়ই খেয়াল রাখতে হবে পোকার উপস্থিতি আছে কি না। পোকাটি রাতের বেলা আক্রমণ করে থাকে, দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে। তাই ভুট্টা গাছে সরাসরি খাওয়ার লক্ষণ বা এদের মল দেখেও আক্রান্ত গাছ সনাক্ত করা যায়। পূর্ণাঙ্গ পোকা, পোকার কীড়া কিংবা ক্ষতির লক্ষণ চেনার জন্য প্রয়োজনে আপনার বøকের         উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাহায্য নিতে পারেন।
ক্ষতিকর-রাক্ষুসে এ পোকাকে দমন বা নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের কী কী করতে হবে তা জানা অতি জরুরি। প্রথমত ভুট্টা লাগানোর সময় কোরাজেন (১ মিলি/কেজি বীজ) জাতীয় কীটনাশক দিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। গাছের দুই-তিন পাতা অবস্থা হতেই আক্রান্ত গাছ হতে ডিম বা সদ্য ফোটা দলাবদ্ধ কীড়া সংগ্রহ করে পিষে মেরে ফেলতে হবে অথবা এক ফুট গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। এছাড়া হাত বাছাই (ঐধহফ ঢ়রপশরহম) ভুট্টার মোচা আসা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত গাছ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় (৯০-১০০ ফুট এলাকা জুড়ে) অতিদ্রæত জৈব বালাইনাশক স্পোডোপটেরা নিউক্লিয়ার পলিহেড্রোসিস ভাইরাস (এসএনপিভি) এক লিটার পানিতে ০.২ গ্রাম হারে মিশিয়ে আক্রান্ত গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। এভাবে ৭ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার জৈব বালাইনাশক এসএনপিভি স্প্রে করতে হবে। সম্ভব হলে  উপকারী পোকা ব্রাকন হেবিটর (ইৎধপড়হ যবনবঃড়ৎ) আক্রান্ত এলাকায় ছেড়ে দিতে হবে। এরা ফল আর্মিওয়ার্মের কীড়ার গায়ে ডিম পাড়ে। ফলে ঐ কীড়াগুলো ভুট্টার ক্ষতি করতে পারে না। যদিও এ পোকা দমনে রাসায়নিক কীটনাশক তেমন কার্যকর নয়, তবে একান্ত প্রয়োজনে প্রোক্লেইম (১ গ্রাম/লি.) বা স্পিনোসেড ট্রেসার (০.৪ মিলি/লি.) বা ভিরতাকো (০.৬ গ্রাম/লি.) বা নাইট্রো (১মিলি/লি.) জাতীয় কীটনাশক আক্রান্ত জমি ও পাশ্ববর্তী এলাকায় পড়ন্ত বিকেলে ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। কারণ বিক্ষিপ্ত ভাবে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আর্থিক ক্ষতি, পরিবেশের ক্ষতি এমনকি কীটনাশকের প্রতি পোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হতে পারে। আক্রান্ত ফসলে সেচ দেয়ার সময় যতটুক সম্ভব ঢালাও বা প্লাবন সেচ দিতে হবে। পরবর্তী ফসলে ভুট্টা বা অন্যান্য পোষক ফসল চাষ না করে ধান চাষ করলে এ পোকার আক্রমণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আফ্রিকাতে স্থানীয় প্রযুক্তি হিসেবে আক্রান্ত ভুট্টা গাছের গোড়ার মাটি বা ছাই ও মরিচ বাটা বা গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে কাদা বানিয়ে বদনা বা মগ দিয়ে খোলে বা পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ৩-৪ দিনের মধ্যেই কীড়াগুলো মারা যায়। তবে এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
উপসংহার
ভুট্টা চাষিগণ চিন্তিত হবেন না, সমস্যা যেমন আছে তার উপযুক্ত সমাধানও আছে। আপনাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়ার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রস্তুত রয়েছে। পোকাটির ক্ষতির মাত্রা অনুধাবন করে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার তথা কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় ওয়েব পোর্টালে ক্ষতিকর এ পোকা সম্পর্কিও ভিডিও চিত্রটি দেয়া আছে। ১৩ ফেব্রæয়ারি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবিস্মরণীয় ভাষণে বলেছিলেন, ‘কৃষি বিপ্লবের কথা বলছি। আমাদের নজর গ্রামের দিকে দিতে হবে। কৃষকদের রক্ষা করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধুর কৃষি দর্শনকে ধারণ করে মুজিববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে প্রান্তিক কৃষকের কথা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইতোমধ্যে কৃষি, প্রাণিসম্পদ বা মৎস্য বিষয়ক যেকোন পরামর্শের জন্য ‘কৃষক সেবা কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছে। সকল শ্রেণির কৃষিজীবী বা     কৃষি অনুরাগী যে কেউই এ সেবা কেন্দ্র থেকে পরামর্শ সেবা নিতে পারবেন। য়

১ভাইস-চ্যান্সেলর ও পরিচালক, কৃষক সেবা কেন্দ্র, হাজী মোহামম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি), দিনাজপুর, ২চেয়ারম্যান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর, ৩পিএইচডি ফেলো (এনএটিপি), কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, হাবিপ্রবি, দিনাজপুর।

 

বিস্তারিত
কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের ব্যবহার ও গুরুত্ব

কম্বাইন হারভেস্টার যন্ত্রের ব্যবহার ও গুরুত্ব

ড. মো. দুররুল হুদা১, বিধান চন্দ্র নাথ২, ড. মো. গোলাম কিবরিয়া ভূঞা৩, সুব্রত পাল৪ এবং শারমিন ইসলাম৫

বাংলাদেশের কৃষি এখনও মানুষ ও পশুশক্তি, সনাতন খামার যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। গত তিন দশকে জমি কর্ষণ ও সেচব্যবস্থা যান্ত্রিকায়নের কারণে শস্যের নিবিড়তা শতকরা ১৯৩ ভাগে উন্নীত হয়েছে। শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধির কারণে দুইফসলের মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ এক ফসল কাটা ও অন্য ফসলের জন্য জমি তৈরি করে ফসল লাগানোর সময় কমে আসছে। যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশের কৃষকগণ কাস্তে দিয়ে হাতের সাহায্যে মাঠের ধান কেটে থাকেন। কিন্ত কাস্তে দিয়ে ধান কাটার কার্যক্ষমতা অত্যন্ত কম হওয়ায় ধান কাটতে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। নির্দিষ্ট সময়ে ধান কাটতে না পারলে অনেক সময় পরিপক্ব ধান মাঠে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে, কিংবা অতিরিক্ত পেকে মাঠে ঝরে পড়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ছাড়াও দেশে ধান কাটার ভরা মওসুমে শ্রমিকের অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়ায় সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিকের অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোন কোন সময় পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে ফসল কর্তন বাংলাদেশের   কৃষির প্রধান সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে ধান কাটতে কৃষককে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষক তার কাংক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রিপার বাইন্ডার ইত্যাদি যন্ত্রের সফল প্রায়োগিক ব্যবহারের মাধ্যমে কর্তন কাজ সম্পাদন করা সম্ভব। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য উন্নত দেশে যে ধরনের কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহৃত হয় সেগুলো আকারে বড় হওয়ায় আমাদের খÐ খÐ ছোট জমিতে চালানো কঠিন। এছাড়া যন্ত্র চলাচলের জন্য মাঠে রাস্তা না থাকার কারণে এক প্লট থেকে অন্য প্লটে যন্ত্র নেয়া খুবই কঠিন এবং আমাদের দেশ মূলত মাটি পলিমাটি দ্বারা গঠিত (অ্যালুভিয়াল টাইপ) হওয়ায় বড় ভারী যন্ত্র মাটিতে দেবে যাওয়ার কারণে অনেক সময় চালানো যায় না।
এসব সমস্যা দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে ধান-গম কাটার জন্য হেড ফিড মিনি কম্বাইন হারভেস্টার উদ্ভাবন করেছে, যা দিয়ে একই সঙ্গে ধান-গম কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দী করা যায় এবং খড় আস্ত থাকে। যন্ত্রটি ১৫-২০ সেমি মাটির গভীরে শক্ত স্তর (প্লাউ-প্যান) যুক্ত কাদা-মাটিতে চলতে পারে। যন্ত্রটি দিয়ে কম সময়ে অধিক জমির ধান-গম কাটা যায় বিধায় কর্তনোত্তর অপচয় হ্রাস পায় এবং সার্বিক উৎপাদন খরচ কম হয়। তাছাড়া সঠিক সময়ে দ্রæত ফসল কেটে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি থেকে শস্য রক্ষা করা যায়। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হয় এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
এটি ডিজেল ইঞ্জিনচালিত এমন একটি যন্ত্র, যা দিয়ে ধান ও গম একই সাথে কর্তন, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দী করা যায়। শস্য সংগ্রহের প্রধান চারটি কাজ (কর্তন, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দী) একই সঙ্গে করা যায় বিধায় যন্ত্রটির নাম কম্বাইন হারভেস্টার বলা হয়ে থাকে। সনাতন পদ্ধতিতে কাঁচি দিয়ে শস্য কাটার তুলনায় অল্প সময় ও কম খরচে ধান ও গম কাটা যায়। ফলে সময় ও কায়িক শ্রম লাঘব হয়। যন্ত্রটি ওই সব ফসল কাটার কাজে ব্যবহার করা যাবে  যেগুলোর উচ্চতা মোটামুটি একই রকম ও শীষ/ছড়া গাছের উপরের দিকে থাকে এবং নিচের দিকে অবশিষ্ট অংশ থাকে। যেসব শস্যের জন্য ব্যবহার করা যায় সেগুলো হলো- ধান, গম, জব, বার্লি ইত্যাদি।
কম্বাইন হারভেস্টার সাধারণত হেড ফিড ও হোল ফিড দু’ধরনের হয়ে থাকে।
হেড ফিড কম্বাইন হারভেস্টারে শুধু ধানের শীষ মাড়াই হয়ে থাকে এবং খড় নষ্ট হয় না। আমন মওসুমে শুকনো ক্ষেতে খড় আস্ত রাখতে এ যন্ত্রের উপযোগিতা রয়েছে।
অন্যদিকে হোল ফিড কম্বাইন হারভেস্টারে পুরো ধানগাছ মাড়াই হয় এবং মাড়াইকৃত খড় জমিতে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকে যা ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায় না। বোরো ও আউশ মওসুমে ধানক্ষেতে পানি থাকলে এবং হাওর অঞ্চলে এ যন্ত্রের উপযোগিতা রয়েছে।
কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ফসল সংগ্রহের প্রধান চারটি কাজ একই সঙ্গে হয়ে থাকে। এ কারণে এক কাজের সঙ্গে অন্য কাজের সমন্বয় না হলে যন্ত্রের কার্যকারিতা ভালো হয় না। পরিবহনের সময় ঝাঁকুনিতে যন্ত্রের যে কোনো অংশের সমস্যা হতে পারে। যন্ত্র মাঠে প্রবেশ করানোর আগে ইঞ্জিন চালু করে গিয়ার নিরপেক্ষ-অবস্থা (নিউট্রাল) অবস্থায় রেখে শস্য সংগ্রাহক অংশে বালুর বস্তা অথবা অন্য ভারী বস্তু স্থাপন করে হেডার উপরে-নিচে ওঠানামা করতে হবে, ইঞ্জিনের গতি বাড়িয়ে দিয়ে কাটারবারসহ ঘূর্ণায়মান অংশে গতি সঞ্চালন করে কোন অংশ থেকে কোনো প্রকার অস্বাভাবিক শব্দ আসছে কি না পরীক্ষা করতে হবে। তারপর যন্ত্র মাঠে প্রবেশ করিয়ে শস্যের উচ্চতার সঙ্গে হেডার ওঠানামা করে হেডার নিয়ন্ত্রক লিভার সমন্বয় করে নিতে হবে। অল্প শস্য কেটে যন্ত্রের মাড়াই ও ঝাড়াই কার্যক্রম দেখে শস্য কাটার প্রস্ততা ঠিক করে নিতে হবে। কাটার প্রস্ততা প্লটের আকার, শস্যের ঘনত্ব ও মাটির অবস্থার ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হয়। মাড়াই ও ঝাড়াই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে ফসল কাটার মূল কাজ শুরু করতে হবে। চালকের দক্ষতা ও সঠিক নিয়মে যন্ত্র চালানোর ওপর যন্ত্রের কার্যকারিতা ও কর্তন অপচয় নির্ভর করে।
ব্রি হেড ফিড মিনি কম্বাইন হারভেস্টার ব্রি হেড ফিড মিনি কম্বাইন হারভেস্টার এর মাঠ পরীক্ষণ    
চালানোর সময় করণীয়
কম্বাইন হারভেস্টার জ্ঞাননির্ভর একটি প্রযুক্তি। ফসল সংগ্রহের প্রধান চারটি কাজ একই সঙ্গে সম্পন্ন হয় বিধায় যন্ত্র চালকের যন্ত্রের প্রধান অংশগুলোর কাজ এবং অন্যান্য অংশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে অবশ্যই প্রাথমিক ধারণা থাকতে হবে। যন্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নাই এমন চালক দিয়ে যন্ত্র চালনা যাবে না। শস্যের ক্ষতির পরিমাণ এবং গুণগতমান নির্ভর করে যন্ত্রটির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর
ক)   জমি ও ফসলের অবস্থা
মাঠে ফসলের অবস্থা ও জমির প্রস্ততার ওপর শস্য কাটা অনেকটা নির্ভর করে। জমিতে যদি অতিরিক্ত আগাছা থাকে তবে কম্বাইন হারভেস্টার দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারে না বিধায় জমি নির্বাচনের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
৬৫ থেকে ১৩০ সেমি. দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট শস্য কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে কাটার উপযোগী;
১৩০ সেমি. দৈর্ঘ্যরে বেশি শস্যের জন্য হেডার যতটা সম্ভব ওপরে উত্থাপন  করে এবং ৬৫ সেমি এর কম দৈর্ঘ্যরে ফসল কাটাতে যতটা সম্ভব হেডার নিচু করে চালাতে হবে;
শস্য ৬০০ এর বেশি কোণে হেলে পড়লে বিপরীত দিক থেকে যন্ত্র আস্তে আস্তে চালাতে হবে।
আদ্র ও শিশির ভেজা ফসল কম্বাইন দিয়ে কাটার উপযুক্ত নয়।
স¦াভাবিক অবস্থায় ২০ সেমি. এর বেশি পা দেবে যায় এমন জমি কম্বাইন চালানোর উপযুক্ত নয়।
ফসল কর্তনের সময়
যখন শীষের ৮০% ভাগের বেশি ধান হলুদ বর্ণের হয়ে যায়, তখন জমির ফসল কাটার উপযুক্ত সময়;
ফসল বেশি পাকার পর কর্তন করলে শস্যে ঝরে পড়ে, খড় ভেঙে গিয়ে পরিষ্কারে সমস্যা হয়, ক্ষেত্র বিশেষে অংকুরোদগম হয়ে গুণগতমান নষ্ট হয়, সর্বোপরি ফসলের ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।
মাঠের বাম পাশ থেকে এমনভাবে ফসল কাটা শুরু করতে হবে যাতে খড়ওবাম পাশে পড়তে পারে। আইলের উচ্চতা যদি এমন উঁচু হয় যে খড় পড়তে অসুবিধা হবে তাহলে আইলে পাশের ০.৫ মিটার চওড়া করে আগেই ধান হাত দিয়ে কেটে নিতে হবে।
ফসল কর্তনের সময় যতটা সম্ভব যন্ত্র সোজা করে চালাতে হবে। বৃত্তাকার বা আঁকাবাঁকাভাবে ফসল কর্তন করলে শস্য ডিভাইডার ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। শস্য বাঁকা হয়ে কনভেয়ার বেল্টে প্রবেশ করলে খড় ভেঙে গিয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।
ফসল কাটার শুরুর আগে নিশ্চিত হতে হবে যে ফসল যথেষ্ট শুকনা কি না? মাড়াইকালীন শস্যের আর্দ্রতা ২৫% এর বেশি হলে শস্যেদান ভেঙে যাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়।
মাড়াই ও ঝাড়াই এর সাথে কাটার প্রস্ততা সমন্বয়
ধারকের ভেতর থেকে বের হওয়া খড় পরীক্ষা করে কাটার প্রস্ততা ঠিক করতে হবে।
মাড়াইয়ের সময় ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য ফসলের অবস্থা বুঝে সামনের চলার গতি, কর্তনের উচ্চতা, রীল ইত্যাদি সমন্বয় করতে হবে। ফসল একদম নিচ থেকে কাটা উচিত না। এতে মাটির সাথে কাটারবার আটকিয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। ভেজা পাতাযুক্ত খড় মাড়াইয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে;
প্রতিদিন কাজ শেষে ভেতরকার ময়লা, খড়কুটা, অন্যান্য বস্তু ইত্যাদি পরিষ্কার করতে হবে। পরিষ্কার করার সময় ইঞ্জিন আগে থেকেই বন্ধ রাখতে হবে, পার্কিং ব্রেক লক করতে হবে।
নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর যন্ত্র পরীক্ষা করা
মেশিনের ঘূর্ণায়মান অংশের কম্পনের কারণে পরিবহনের সময় লোড পরিবর্তন, বিভিন্ন পরিবেশে মেশিন চালানো ইত্যাদির জন্য মেশিনের কারিগরি অবস্থাগুলো খারাপ থাকলে মেশিনের দক্ষতা কমে যায়, বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয় বা গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য মেশিনটি সঠিকভাবে চালাতে হবে, সকল অংশগুলো পরীক্ষা করতে হবে এবং পরিষ্কার রাখতে হবে। বেল্টগুলো টাইট করতে হবে এবং যখন প্রয়োজন তখন যন্ত্রাংশগুলো পরিবর্তন করতে হবে।
দৈনিক করণীয়:
এয়ার ফিল্টার, ওয়েল কোলার স্ক্রিন, রেডিয়েটর এবং ইঞ্জিনের সুরক্ষা স্ক্রিন চেক এবং পরিষ্কার করা;
ইঞ্জিন ওয়েল, হাইড্রোলিক ওয়েল, রেডিয়েটর এবং পানির ট্যাংক চেক করতে হবে যাতে লিক না হয়;
মেশিনের ভেতরে আটকিয়ে থাকা সকল খড়কুটা দূর করা;
সকল চেইন এ লুব্রিকেন্ট দিতে হবে, কাটারবার থেকে কাঁদা এবং খড়কুটা দূর করতে হবে, চেইন এবং কাটার এর কোনো ক্ষতি হলে তা চেক করে প্রয়োজনে প্রতিস্থাপন করতে হবে, উপরের এবং নিচের কাঁচির মধ্যে লুব্রিকেন্ট যোগ করতে হবে (প্রতি ২ ঘণ্টা চালানোর পরপর চেইন এবং কাটারের লুব্রিকেন্ট যোগ করতে হবে);
চেইনের টান কমে গিয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা;
থ্রেসার অংশের মাড়াই দাঁত চেক করা, বিপরীত ভাবে মাউন্ট করা বা প্রয়োজন হলে তাদের প্রতিস্থাপন করা;
ক্রলারের টান চেক করা এবং প্রয়োজন হলে টাইট দেয়া;
রোলার, ক্রলার গাইড, ফ্রেম এবং ট্রান্সমিশনের মধ্যকার কাঁদা, ঘাস অথবা খড়কে সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্যথায় ক্রলার সামনে চলতে বাঁধাগ্রস্ত হবে, তার শক্তি হ্রাস পাবে;
জ্বালানি ট্যাংক পূর্ণ করা;
ইঞ্জিন এবং অন্যান্য অংশ স্বাভাবিক অবস্থায় আছে কি না তা পরীক্ষা করা;
নাট-বোল্ট আলগা হয়ে গেলে তা টাইট দিতে হবে।
পরীক্ষণ সতর্কতা
ঠাÐা না হওয়ার আগে রেডিয়েটরের ক্যাপ না খোলা। সঠিক নিয়মে ব্যাটারি লোড ও আনলোড করতে হবে। প্রথমে ধনাত্মক চার্জযুক্ত দÐটি (অ্যানোড) সংযোগ করতে হবে এবং যখন ব্যাটারি স্থাপন করা হয় তখন ঋণাত্মক চার্জযুক্ত দÐটি (ক্যাথড) সংযোগ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন করার সময় প্রথমে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত দÐটি (ক্যাথড) বিচ্ছিন্ন করতে হবে। পরে আনলোড করার সময় ধনাত্মক চার্জযুক্ত দÐটি (অ্যানোড) বিচ্ছন্ন করতে হবে;
পরীক্ষা করার সময় এবং রক্ষণাবেক্ষণের সময় ইঞ্জিন বন্ধ রাখা এবং ব্রেক প্যাডেল লক করে রাখতে হবে;
ব্রেক চেক করা এবং স্ক্রু এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা;
নিয়ন্ত্রণ লিভারগুলো চেক করতে হবে;
ব্রেক সঠিকভাবে সমন্বয় করে রাখতে হবে;
ঘুর্ণায়মান দÐ (শ্যাফ্ট) এবং অন্যান্য অংশগুলো স্পর্শ করা যাবে না;
উচ্চচাপের লিকিং ওয়েল স্পর্শ না করা;
খুলে রাখা যন্ত্রাংশ সঠিকভাবে রাখেতে হবে যেন শিশুরা এ গুলো নাড়াচাড়া করতে না পারে।
চালু অবস্থায় যন্ত্রের কোন অংশে মবিল/গ্রিজ দেয়া কিম্বা নাট-বেøাট টাইট দেয়া যাবে না। এবং কোন যন্ত্রাংশ মেরামত করা যাবে না।
দুর্ঘটনা এড়াতে শুধুমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক দিয়ে যন্ত্রটি চালাতে হবে এবং চালক উপযুক্ত পোশাক (ঢিলা পোশাক পরা যাবে না) পরিধান করে যন্ত্র চালনা করবে।
রক্ষণাবেক্ষণ সতর্কতা
অপারেশনের পরে পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্য পরিচালনা করা। কাজের শেষে মেশিনটি পরিষ্কার করুন, পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাজ করা এবং সকল সরঞ্জামাদি পরীক্ষা করতে হবে;
সমতল মাটিতে মেশিনটি সংরক্ষণ করতে হবে। কাটিং অংশটি নিচু করে রাখতে হবে এবং ব্রেক প্যাডেল লক করে রাখতে হবে;
মেশিনটি ঠাÐা না করে এর উপর কভার দেয়া ঠিক না। আগে মেশিনটি ঠাÐা করে পরে প্রয়োজনীয় কভার দিয়ে মেশিনটি ঢেকে রাখতে হবে।
ব্রি উদ্ভাবিত যন্ত্রটি স্থানীয়ভাবে দেশীয় মালামাল দিয়ে তৈরি বিধায় এর দাম দেশের কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। নতুন উদ্ভাবিত যন্ত্রটি কৃষি যান্ত্রিকীকরণে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে এবং এর মাধ্যমে খোরপোশের কৃষি হতে বাণিজ্যিক কৃষিতে উত্তরণ এবং প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতিকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উন্নীতকরণে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে যন্ত্রটির ব্যাপক সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। য়

১প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ,বিআরআরআই,গাজীপুর,(সফঁৎৎঁষয@যড়ঃসধরষ.পড়স; ০১৭১৯৭৮৩৫৫৮)।২ উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিআরআরআই, গাজীপুর।৩ কৃষি প্রকৌশলী, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিআরআরআই, গাজীপুর

 

বিস্তারিত
বৈশাখ মাসের কৃষি ( বৈশাখ ১৪২৬)

 বৈশাখ মাসের কৃষি                                                      
কৃষিবিদ ফেরদৌসি বেগম

বৈশাখ মাস দিয়ে শুরু হয় বাংলা বর্ষ। নতুন বছরের শুভেচ্ছা সবাইকে। এ মাসে চলতে থাকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী মেলা, পার্বণ, উৎসব, আদর, আপ্যায়ন। পুরনো বছরের ব্যর্থতাগুলো ঝেড়ে ফেলে নতুন দিনের প্রত্যাশায় কৃষক ফিরে তাকায় দিগন্তের মাঠে। প্রিয় পাঠক আসুন এক পলকে জেনে নেই বৈশাখে কৃষির করণীয় দিকগুলো।
বোরো ধান
ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরি প্রয়োগ করতে হবে। নাবি বোরো ধানের থোড় আসার সময় পানির অভাব না হয় তাই আগে থেকেই সম্পূরক সেচের জন্য মাঠের এক কোণে মিনি পুকুর তৈরি করতে হবে। ধানের দানা শক্ত হলে জমি থেকে পানি বের করে দিতে হবে। এ মাসে বোরো ধানে মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, সবুজ পাতাফড়িং, গান্ধিপোকা, লেদাপোকা, ছাতরাপোকা, পাতা মোড়ানো পোকার এবং এ সময় ধানক্ষেতে উফরা, বাদামি দাগ রোগ, বøাস্ট, পাতাপোড়া ও টুংরো রোগের আক্রমণ হতে পারে। বালাই দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শণ করতে হবে এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। বালাই আক্রমণ প্রতিহত করা না গেলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক বালাইনাশক, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে প্রয়োগ করতে হবে। এ মাসে শিলাবৃষ্টি হতে পারে, বোরো ধানের ৮০% পাকলে তাড়াতাড়ি কেটে ফেলতে হবে।
আউশ ধান
আউশ ধানের জমি তৈরি ও বীজ বপনের সময় এখন। বোনা আউশ উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি এবং রোপা আউশ বন্যামুক্ত আংশিক সেচনির্ভর মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নি¤œ জমি আবাদের জন্য নির্বাচন করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষের সময় শতাংশপ্রতি ৬০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি ও ৩০০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করতে হবে। বৃষ্টিনির্ভর বোনা আউশ এলাকায় ইউরিয়া দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করত হবে। প্রথম কিস্তি শেষ চাষের সময় এবং দ্বিতীয় কিস্তি ধান বপনের ৩০-৪০ দিন পর। জমিতে গন্ধক এবং দস্তার অভাব থাকলে শতাংশ প্রতি ১৩৫ গ্রাম জিপসাম ও ২০ গ্রাম জিঙ্ক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। বোনা আউশের উন্নত জাত হিসাবে বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩ ও ব্রি ধান৮৩ এবং রোপা হিসেবে বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৮২ ও ব্রি ধান৮৫। এ ছাড়াও খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকাসহ পাহাড়ি এলাকার জমিতে বিনা ধান-১৯ চাষ করতে পারেন তবে বীজ প্রাপ্তির জন্য উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
ভুট্টা (খরিফ)
খরিফ ভুট্টার বয়স ২০-২৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে রসের ঘাটতি থাকলে হালকা সেচ দিতে হবে। জমিতে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং একই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে।
পাট
বৈশাখ মাস তোষা পাটের বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। বিজেআরআই তোষা-৭, ও-৩৮২০, ও-৭৯৫ ভালো জাত।
দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে তোষা পাট ভালো হয়।
বীজ বপনের আগে প্রতি কেজি বীজ ৪ গ্রাম ভিটাভেক্স বা ১৫০ গ্রাম রসুন পিষে বীজের সাথে মিশিয়ে শুকিয়ে নিয়ে জমিতে সারিতে বা ছিটিয়ে বুনতে হবে। সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশে ২৫-৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। তবে ছিটিয়ে বুনলে ৩৫-৪০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। ভালো ফলনের জন্য  শতাংশপ্রতি ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি সার শেষ চাষের সময় মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমিতে সালফার ও জিংকের অভাব থাকলে জমিতে সার দেয়ার সময়  শতাংশপ্রতি ৪০০ গ্রাম জিপসাম ও ৫০  কেজি দস্তাসার দিতে হবে। শতাংশপ্রতি ২০ কেজি গোবর সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের পরিমাণ অনেক কম লাগে।  
শাকসবজি
বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে ডাঁটা,      কলমিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। মাদা তৈরি করে চিচিঙ্গা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টিকুমড়া, চাল কুমড়ার বীজ বুনে দিতে পারেন। আগের তৈরি করা চারা থাকলে ৩০/৩৫ দিনের সুস্থ সবল চারাও রোপণ করতে পারেন। লতানো সবজির জন্য  মাচা তৈরি করে নিতে হবে। দৈহিক বৃদ্ধি যত বেশি হবে তার ফুল ও ফল ধারণক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য গাছের বাড়বাড়তি বেশি হলে ১৫-২০ শতাংশ পাতা লতা কেটে দিতে হবে।
কুমড়াজাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করে পাপড়িগুলো ফেলে দিয়ে পরাগমুÐটি স্ত্রী ফুলের গর্ভমুÐে ঘষে হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে।      কুমড়াজাতীয় ফসলে মাছি পোকা দমনে জমিতে খুঁটি বসিয়ে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। এছাড়া সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করেও এ পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়।
গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে চাইলে বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫, বারি টমেটো ৬, বারি টমেটো ১০, বারি হাইব্রিড টমেটো ৪, বারি হাইব্রিড টমেটো ৮ বা বিনা টমেটো ৩, বিনা টমেটো ৪-এর চাষ করতে পারেন। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে হলে পলিথিনের ছাওনির ব্যবস্থা করতে হবে সে সাথে এ ফসলটি সফলভাবে চাষের জন্য টমেটোটোন নামক হরমোন প্রয়োগ করতে হবে। স্প্রেয়ারের সাহায্যে প্রতি লিটার পানিতে ২০ মিলি টমেটোটোন মিশিয়ে ফুল আসার পর ফুলের গায়ে ৫-৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
গাছপালা
এ মাসে আমের মাছি পোকাসহ অন্যান্য পোকার জন্য সতর্ক থাকতে হবে। মাছি পোকা দমনের জন্য সবজি খেতে যে রকম বিষটোপ ব্যবহার করা হয় সে ধরনের বিষটোপ বেশ কার্যকর। ডিপটরেক্স, ডারসবান, ডেনকাভেপন সামান্য পরিমাণ দিলে উপকার পাওয়া যায়। এ সময় কাঁঠালের নরম পচা রোগ দেখা দেয়। এলাকায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলে ফলে রোগ দেখা দেয়ার আগেই ফলিকুর ০.০৫% হারে বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ বা রিডোমিল এম জেড-৭৫ প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। বাড়ির আঙিনায় সুস্থ সবল, নারিকেল চারা উন্নত ও খাটো জাতের নারিকেল চারা এবং গ্রামের রাস্তার পাশে পরিকল্পিতভাবে খেজুর ও তালের চারা এখন লাগাতে পারেন। যতœ, পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে ৩-৪ বছরেই গাছগুলো অনেক বড় হয়ে যাবে। বৃষ্টি হয়ে গেলে পুরানো বাঁশ ঝাড় পরিষ্কার করে মাটি ও কম্পোস্ট সার দিতে হবে এবং এখনই নতুন বাঁশ ঝাড় তৈরি করার কাজ হাতে নিতে হবে। যারা সামনের মৌসুমে গাছ লাগাতে চান তাদের এখনই জমি নির্বাচন, বাগানের নকশা প্রস্তুত এবং অন্যান্য প্রাথমিক কাজগুলো সেরে রাখতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
ব্রæডার হাউজের শেডে মুরগির বাচ্চা তোলার সাথে সাথে পরিমাণ মতো ভিটামিন সি ও গøুকোজ খাওয়াতে হবে। অতিরিক্ত গরমে লেয়ার হাউসে শেডের চাল বা ছাদে তাপ বিকিরণ করতে পারে এমন সাদা, অ্যালুমিনিয়িাম রঙ এবং প্রয়োজনে পাইপ বা ঝর্ণার মাধ্যমে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। হাঁস-মুরগির রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া জরুরি। সেজন্য পোলট্রি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে উপযুক্ত টিকা প্রদানের পাশাপাশি পুষ্টি ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার দিকে অধিকতর নজর দিতে হবে।
গোখাদ্যের জন্য নেপিয়ার, বাজরা, প্যারা, ভুট্টা, ইপিল ইপিলের চাষ করার ভালো সময় এখন। বাড়ির আশপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে, পতিত জায়গায় গোখাদ্যের চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। গাভীকে ক্রিমির ওষুধ খাওয়ানো না হয়ে থাকলে প্রতি দুই মাস অন্তর পানি বা খাদ্যের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। এ সময়ে গবাদি পশুর ক্ষুরারোগ ও ভাইরাস রোগ দমনে ভেটেরনারি চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত টিকা প্রদান করতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
বৈশাখ মাস পুকুরে মাছ ছাড়ার উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে পুকুর তৈরি অর্থাৎ কাদা সরিয়ে, চুন প্রয়োগ করে, আগাছা পরিষ্কার, পানি দেয়া, পানি পরীক্ষা, পরিমাণ মতো সার দেয়া, পুকুর পাড়ে নিত্য পাতা ঝরা গাছ ছাঁটাই বা কেটে ফেলাসহ অন্যান্য কাজগুলো করতে হবে। এরপর প্রতি শতকে মিশ্রচাষের জন্য ৩০-৪০টি ৪-৫ ইঞ্চি বড় সুস্থ সবল পোনা ছাড়তে হবে। পানির ৩ স্তরের কথা বিবেচনা করে তেলাপিয়া, সরপুঁটি, নাইলোটিকা, কার্পজাতীয় মাছ, রুই, কাতল, মৃগেল, কালো বাউস এবং সম্ভব হলে চিংড়ি পোনাও ছাড়া যাবে। পোনা সংগ্রহের সময় বিশ্বস্ত উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করতে হবে।
প্রিয় পাঠক, বৈশাখ আসে আমাদের জন্য নতুন আবাহনের সৌরভ নিয়ে। সাথে আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসে কালবৈশাখীকে। কালবৈশাখীর থাবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কৃষিতে আগাম বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সুবিবেচিত লাগসই কৌশল আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সব বাধা ডিঙিয়ে আমরা       কৃষিকে নিয়ে যেতে পারব সমৃদ্ধির ভুবনে। আবারও কথা হবে আগামী মাসের কৃষিকথায়। আপনাদের সবার জন্য নতুন বছরের শুভ কামনা। য়
সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, ই-মেইল : বফরঃড়ৎ@ধরং.মড়া.নফ

বিস্তারিত
কবিতা (চৈত্র ১৪২৬)

বিস্মৃতির আঁধার চিরে মানুষের মণিকোঠায়
(কৃষি ও কৃষকের বঙ্গবন্ধু)

 মোছলেহ উদ্দিন সিদ্দিকী

এখনো কান পেতে শুনি
বাংলার পথে প্রান্তরে, দিগন্ত থেকে দিগন্তের ওপারে
নিষ্পেষিত নিগৃহীত নিপীড়িত মানুষের তরে
তাঁর বর্জ্রকণ্ঠে উচ্চারিত সেই পঙতিমালা
 (বঙ্গবন্ধু : “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকের উপর হত্যা করা হয়
তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইলো... প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল,
তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।
মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা ”)
জয় বাংলা....
জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা,
সদ্য স্বাধীন আমাদের এই বাংলা;
তখনো চারিদিকে বারুদের গন্ধ, খাদ্য ঘাটতি প্রায় ৩০ লক্ষ টন।
বুভুক্ষু সন্তানের মুখ তারে কাঁদায়, কষ্টের বিষণœতায়।
ছুটে যান ভিনদেশে, দুয়ারে দুয়ারে
কেউবা দেয় কিছু, কেউবা মুখ ফিরায়
জনকের যাতনা কেবলি বুঝেন জনক
শাবকেরে করে হুঁশিয়ার
কষ্ট লুকিয়ে বুকে আদেশের সুর মেখে সন্তানেরে বুঝায়
“ভাত খেতে হলে পয়দা করতে হবেরে তোর
 যেতে হবে আরো দূর, কৃষি বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়।   

মুক্তি নাই মুক্তি নাই
কৃষি ও কৃষকের উন্নতি ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই।
মওকুফ হয় ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা,
তুড়িতে উড়িয়ে দেন তিনি বাংলার কৃষকের বিরুদ্ধে করা
কৃষি ঋণের সার্টিফিকেট মামলার হুলিয়া।
খাসজমি বিতরণ হয় ভূমিহীন কৃষকের মাঝে
ভুমি ব্যবস্থাপনার সুষমবিন্যাসে ভেঙে যায়
পাকিস্তানী শাসক-শোষকের সেই জমিদারি- জায়গিরদারী- সরদারি প্রথার শৃঙ্খল।
কী মায়ার বাঁধনে বাঁধলেন তিনি বাংলার জনতারে...
আশার আলো ছড়ালেন ঘোর অমানিশার অন্ধকারে।
বঙ্গবন্ধু...
এতো শুধু সামান্য শব্দ চয়নের অভিঘাতে নয় !
৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দে ১০১ কোটি টাকা কৃষির জন্য হয়
বঙ্গবন্ধু! সামান্য তো নয়!
যুদ্ধবিধ্বস্ত কৃষি অবকাঠামো বিনির্মাণ তাঁর হাত দিয়েই হয়।
বঙ্গবন্ধু! সামান্যতো নয়!

সবুজ বিপ্লবের ডাক দিলেন তিনি
বীজ, সার, সেচ, কৃষি উপকরণ উন্নত চাষ ব্যবস্থাপনা
যুদ্ধের পর-পর কৃষক সবি পায়, তার ইশারায়।
কহিলেন তিনি, সভাসদ যতো আছো গুণধর
বাংলার মাটি উর্বর থেকে উর্বরতর
বীজ গুঁজে দিলে ফসল ফলে যায়- নির্দ্বিধায়
এখন থেকে বিলাও নিজেকে উন্নয়ন চিন্তায়।
তাঁরই আহŸানে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞান আজো প্রাণপায়।
যার ভাবনায় কল্পনায় তারুণ্যের উদ্দিপনা
তারি তর্জনির নির্দেশে গবেষণায় মেতে উঠে মেধাবী চোখ
প্রতিষ্ঠা হয় এদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো।
যুদ্ধের পর আরো একটি যুদ্ধে নিজেকে বিলিয়ে দেয় গবেষক, কৃষি কর্মী আর সম্প্রসারণবিদ।  
জনক শিখালেন যবে, সবকিছু ঠিক রবে
কৃষক বাঁচাতে হবে এই বাংলায়।
আমার কৃষক যে বড় আসহায়, বড় অসহায়।
(বঙ্গবন্ধু : “আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখি মানুষ ও নির্যাতিত শ্রেণী, তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে।”)

যেদিকে চোখ যায়, ফসলের মাঠে কিংবা আঙিনায়, ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়
বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর গর্জন যেনো আজো শোনা যায়,
তারই তর্জনির ইশারায়।

একদিন যার নির্দেশ শুনে বিমুগ্ধ কৃষক
 লাঙ্গলের হাল ছেড়ে বারুদের গন্ধ মেখেছিল গায়।
 সম্মুখ সমরে জীবনের মায়া ছেড়ে পেশী টানটান হয়েছিল তার
এখনো সে স্বপ্ন দেখে, কল্পনায় ছবি আঁকে
জাতির পিতা ঐ দেখা যায়, যুগ যুগান্তরে কৃষকের আঙিনায়।
আজো তাঁর বজ্রকণ্ঠ ধ্বনি প্রতিধ্বনির আঘাতে বিচুর্ণ করে ঘুমন্ত মানবেরে।
তাঁরই গ্রথিত মহাকাব্যের মহা উল্লাস
বাংলার আকাশে বাতাসে আজো ছেয়ে যায়
আমাদের মহানায়ক, জাতির জনক বাংলায় ফিরে আসে বারবার
বিস্মৃতির আধাঁর চিরে মানুষের মনিকোঠায়।  

১৪৪ সবুজ বাগ লেন, মিস্ত্ররী পাড়া, খুলনা, মোবাইল : ০১৭৩১৩৬৬২৫;  ২গ্রাম : বিদ্যাবাগীশ, ডাকঘর ও উপজেলা : ফুলবাড়ী, জেলা : কুড়িগ্রাম; মোবাইল : ০১৭৩৫২০২৭৯৮

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ফসল বৈচিত্র্যায়নে মাটির ডাক্তার

কৃষিবিদ শাহ্ মো. গোলাম মওলা

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু তনয়া     মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছেন। খোরপোষের কৃষি থেকে বর্তমানে আমরা বাণিজ্যিক কৃষির দিকে যাত্রা শুরু করেছি। কৃষির এ নবযাত্রায় ফসল বৈচিত্র্যায়নে সুফলা মাটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মাটি আমাদের মায়ের মত। মায়ের স্বাস্থ্য আমাদের নিকট যেমন গুরুত্ববহ, ঠিক তেমনি মাটির স্বাস্থ্য। টেকসই কৃষি উন্নয়নে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
মাটির বুকেই মানুষের জন্ম। মাটির উপরই মানুষের যাপিত জীবন। কবির ভাষায়-‘যার বুকে তুই জন্ম নিলি তারে চিনলি না। মাটির মঙ্গল করো রে ভাই, মাটি যে তোর মা।’ অথচ মাতৃসম মাটির সাথে মানুষের অসমীচীন ব্যবহারের ফলে মাটি স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ছে-যা বর্তমানে দুঃশ্চিন্তার কারণ।
বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ উর্বর মাটি নানাভাবে দূষণের শিকার। মৃত্তিকা দূষণের কারণে মাটির উৎপাদিকা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ফসলের ফলন আশাতীত হচ্ছে না। মাটি দূষিত বা বিষাক্ত হয়ে গেলে জীব বৈচিত্র্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। মাটিতে বসবাসকারী উপকারী অনুজীব মারা যাবে-এতে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিভিন্ন কারণে আজ প্রতিক‚লতার মুখে এই বৃহৎ প্রাকৃতিক সম্পদ। মৃত্তিকা দূষণ এখন একটি নীরব ঘাতক। দূষণের উৎস হিসেবে দেশের      গৃহস্থালি বর্জ্য, কল কারখানার কঠিন ও তরল বর্জ্য, ল্যান্ডফিলগুলো (ময়লার ভাগাড়) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অপরিকল্পিত ও যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সার এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারের কারণে মৃত্তিকা দূষণ হচ্ছে।
মাটির স্বাস্থ্য বলতে ফসল উৎপাদনের জন্য মাটি কতটুকু উপযোগী তা বোঝানো হয়ে থাকে। মাটির উর্বরতা মাটির স্বাস্থ্য পরিমাপের মাপকাঠি। যে মাটিতে অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকে না এবং যা ফসল উৎপাদনের উপযুক্ত তাকে স্বাস্থ্যবান মাটি বলে।
টেকসই উন্নয়ন অভিলক্ষ্য ২০৩০ [ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষং-২০৩০] স্বপ্ন পূরণের অভিযাত্রায় মৃত্তিকা সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। টেকসই কৃষি উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ সুফলা মাটি। কেননা           কৃষকের স্বপ্ন বুননের আধার মাটি। সেই স্বপ্ন ফিকে হয়Ñযদি না থাকে স্বাস্থ্যকর মাটি। সবুজ বিপ্লবের হাওয়ায় বেড়েছে কৃষি উৎপাদন, অন্যদিকে কমেছে মাটির উর্বরতা। অথচ এই মাটি থেকেই আমরা জীবন ধারণের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সব কিছুই পেয়ে থাকি। খাদ্যের জন্য আমরা মাটিতে অনবরত ফসল ফলাই। কিন্তু মাটির সঠিক যতেœর অভাবে সুফলা মাটি তার ভারসাম্যতা হারাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। নানা কারণে মাটির এ অবস্থা হয়ে থাকে।
া    মাটির অ¤øত্ব বৃদ্ধি অ¤øধর্মী ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া সালফেট প্রভৃতি নাইট্রোজেন সার প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির অ¤øত্ব বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের প্রায় ৪.৬ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমি বিভিন্ন মাত্রায় অ¤øত্বের শিকার।
া    মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি উজানে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বিভিন্ন নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে আসা, ঘন ঘন সামুদ্রিক ঝড়, জলোচ্ছ¡াস-সিডর, আইলার আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানির অনুপ্রবেশ, চিংড়ি ঘেরে লোনা পানিতে চিংড়ি চাষ, সুষ্ঠু সেচ ও নিকাশ ব্যবস্থার কারণে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৮টি জেলার ৯৬টি উপজেলা বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততায় আক্রান্ত। বিগত চার দশকে লবণাক্ত আক্রান্ত জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমানে উপক‚লবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে এই লবণাক্ততা ক্রমে বেড়েই চলছে। লবণাক্ততার কারণে এ এলাকায় শস্য নিবিড়তা মাত্র ১৩৩ শতাংশ।
া    আমাদের অধিকাংশ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ২ বা ২-এর কম। জৈব পদার্থের ঘাটতিজনিত কারণে মাটির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে থাকে।
া    গাছের/ফসলের প্রয়োজনীয় ১৬টি উপাদানের যে কোনো একটি যদি মাটিতে সঠিক মাত্রায় ও সহজলভ্য আকারে না থাকে; তবে মাটির স্বাস্থ্যের ব্যত্যয় ঘটে।
া    অপরিকল্পিত ও যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সার ব্যবহারে মৃত্তিকা স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। মাটিতে পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততা দেখা দিচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ সেচের পানি ব্যবহার, রাসায়নিক সার, কীটনাশকে মাত্রাতিরিক্ত দূষক পদার্থের উপস্থিতি (লেড, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, মার্কারি, ক্রোমিয়াম নিকেল) মাটির দূষণ ঘটাচ্ছে।
া    সারা বছর জমিতে পানি পছন্দকারী ফসল চাষাবাদ করার কারণে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাবলি পরিবর্তন হচ্ছে। এতে করে মাটিতে দস্তা ও সালফারের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৩.৮ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে দস্তা এবং ৪.৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সালফারের অভাব দেখা দিয়েছে।
া    তামাক চাষে মাটির বুনট, গঠন বিন্যাস, পিএইচ লেভেল ও অনুজৈবিক কার্যাবলিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কেননা তামাক অত্যধিক রাসায়নিক সার,         কীটনাশক এবং শ্রমঘন ফসল। তামাক অন্যান্য ফসলের তুলনায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ বেশি গ্রহণ করে (জুয়েল এবং ফাল্গুনী-২০১৫)। এ জন্য দেখা যায়, উন্নত দেশ অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে তামাক চাষ স্থানান্তর করছে।   
া    অপ্রয়োজনে বেশি সংখ্যক চাষের মাধ্যমে ও বেশি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির সংযুক্তি নষ্ট হচ্ছে।
া    পাহাড়ি এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে জুম চাষের কারণে ভূমিক্ষয়ের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ভূমি অবক্ষয় পরিবীক্ষণ টাস্কফোর্সের পরিচালিত ১৯৮৮ সালের এক জরিপ থেকে জানা যায়, পাহাড়ি জমির প্রায় ১৭ হাজার               বর্গকিলোমিটার এলাকা ভূমি ক্ষয়ের ঝুঁকির আশঙ্কায় রয়েছে।
া    সর্বোপরি অনেক কৃষক জেনে বা না জেনেই নগদ লাভের আশায় ফসলি জমির টপ সয়েল (১-১.৫ ফুট) ইট ভাটায় বিক্রি করে থাকে। এটি আমাদের কৃষির জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) মৃত্তিকার তথ্য ভাÐার সৃজন, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি অনন্য সংস্থা। এসআরডিআই-প্রকাশিত ‘উপজেলা নির্দেশিকা’একটি তথ্যবহুল প্রকাশনা। উপজেলা নির্দেশিকার তথ্যকে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ‘মাটির ডাক্তার’ শিরোনাম স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদের স্থানভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করা, পাশাপাশি স্থানভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর ও টেকসই কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সীমিত ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদকে ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য সংরক্ষণ করা।
আমাদের শরীরের মতো মাটিরও রয়েছে শারীরিক কাঠামো। শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হই, ঠিক তেমনি মাটির বোবাকান্না নিরসনে তথা মাটির সুস্থতায় ‘মাটির ডাক্তার’।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই), বগুড়া জেলা কার্যালয়ের একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ ‘মাটির ডাক্তার’।  কৃষকের দোরগোড়ায় মাটির স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই পাইলটিং আকারে বগুড়া সদর উপজেলায় এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এটি একটি প্রত্যয়দীপ্ত ক্ষুদ্র প্রয়াস। এ কার্যক্রমের আওতায় এলাকার কৃষক/কৃষাণীর চাহিদামাফিক বিনামূল্যে মাটির স্বাস্থ্য সেবা তথা মাটির গুণাগুণ অনুসারে ফসল/ফসলবিন্যাসভিত্তিক সার সুপারিশ প্রদান, মাটির নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি ও মাটি পরীক্ষাকরণে সহায়তা, জমির ধরন বুঝে উপযোগী ফসলের জাত নির্বাচন ও ভেজাল সার শনাক্তকরণে সহযোগিতা,            ভার্মি কম্পোস্টসহ অন্যান্য জৈবসার ব্যবহারে কৃষক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সেবা গ্রহীতা কৃষক ভাইদের সারের খরচে সাশ্রয় হচ্ছে গড়ে প্রায় ১০ ভাগ, পাশাপাশি ফসলের গড় ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় ২০-২৫ ভাগ।
কৃষক-কৃষাণীর মূল পুঁজি হচ্ছে কৃষি জমি। কৃষি জমির স্বাস্থ্য সুরক্ষা করেই আমাদের ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।  দানাশস্যে আমরা স্বয়ম্ভর হয়েছি বটে, তবে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনে নয়। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনে সুস্থ মাটির গুরুত্ব অপরিসীম। য়

উদ্ভাবক ‘মাটির ডাক্তার’ কার্যক্রম, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, এসআরডিআই, জেলা কার্যালয়, বগুড়া; মোবা: ০১৭১৭-৭১৫৬৫২,      ই-মেইল: moulasrdi@yahoo.com

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধু : কৃষির প্রবাদ পুরুষ

বাংলাদেশ নামের দেশটি দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের ফসল। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল যে মুক্তিযুদ্ধের, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। বাঙালি পেয়েছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশ সত্য, কিন্তু দীর্ঘ দিনের যুদ্ধ সংগ্রামে তখন বিপর্যস্ত ছিল দেশের কৃষি ও অর্থনীতি, জীবন ও জনপদ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন ও ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাজ। খুব সহজ ছিল না সে কাজ। পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর পোড়ামাটির বাংলাদেশকে তিনি সবুজে শ্যামলে ভরে দিয়ে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলেন সে যাত্রা। সে যাত্রাপথে ছেদ পড়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। কিন্তু তাঁর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সে স্বপ্নকে নিয়ে বাস্তবে রূপদান করে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন সোনার বাংলা, কৃষিতে সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। এগিয়ে চলেছে কৃষি উন্নয়নের ধারা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কৃষি ও বঙ্গবন্ধুর কৃষি বিপ্লবের ডাক
বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৭২ সালে ছিল সাড়ে সাত কোটি। সে মানুষের সারা বছর খাওয়ানোর মতো কোনো খাদ্য ছিল না দেশে। তাঁর দেয়া বিভিন্ন বক্তৃতার মধ্যে সে দুরবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘গত ২৫ বছর থেকে বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি ২৫ লক্ষ টন। কিন্তু এ খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য অতীতে কোনো বন্দোবস্ত করা হয়নি। অনেকে এসেছেন, নতুন কথা বলেছেন- শুধু আমাদের সম্পদকে লুট করা নয়, আমাদের কাঁচামাল বিক্রি করে পশ্চিম পাকিস্তানকে উন্নত করা হলো। বাংলাকে মর্টগেজ রেখে পশ্চিম পাকিস্তানে আমার অর্থে গড়ে উঠল করাচি, আমার অর্থে গড়ে উঠল লাহোর, হায়দারাবাদ, ইসলামাবাদ। অর্থ কোথা থেকে এলো, কিভাবে এলো আপনারা জানেন এ ইতিহাস। আজ বাংলাদেশের অবস্থা বড় শোচনীয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ১৫০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। এর পেছনে বিরাট ষড়যন্ত্র ছিল, যাতে এ দেশ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।’ এই চরম সত্যকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন, ‘খাবার অভাব হলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। সে জন্য খাওয়ার দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে অন্নহীন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে।’
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘ঞযব ঝঃধঃব ড়ভ ঋড়ড়ফ ্ অমৎরপঁষঃঁৎব ১৯৭২’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ‘বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাবস্থার কারণে কেবলমাত্র আখ ছাড়া অন্য সব কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এজন্য বাংলাদেশে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য চাষের জমি বাড়িয়ে ও উচ্চফলনশীল জাত, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো প্রত্যাশিত।’ বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাই তিনি স্বাধীনতার পরপরই প্রথম গুরুত্ব দিয়েছিলেন কৃষির ওপর। কেননা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য ঘাটতিতে থাকা একটা দেশের মানুষ সব সময়ই খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকে। খাদ্যের অভাবে কিছু মানুষকে অনাহারে থাকতে হয়, এমনকি অনাহারে মৃত্যু বা দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে যে দেশের এত মানুষ মরেছে, সেখানে খাদ্যের অভাবে কোন মানুষের মৃত্যুকে তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে চাননি।
শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, সত্তরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়, বাহাত্তরের দীর্ঘ অনাবৃষ্টি- খাদ্য উৎপাদন ক্ষেত্রকে করেছিল বিপর্যস্ত। মানুষের মুখে রোজ দুবেলা আহার জোগানো ছিল সে সময়ের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু সে সময় এ কঠিন চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলার জন্য ১৯৭২-৭৩ সালে বাজেটে ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিলেন শুধু বিদেশ থেকে খাদ্য কেনার জন্য। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘গত বছর ২৭ লক্ষ টন খাদ্য আনতে হয়েছে বিদেশ থেকে কিনে, ভিক্ষা করে। এই বছর ১২৫ কোটি টাকার খাবার কেনার ব্যবস্থা করেছি বাংলাদেশের সম্পদ থেকে। জানিনা কেউ দেবে কি দেবে না? মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারি না; তাই ১২৫ কোটি টাকার খাবার কিনতে বাধ্য হয়েছি। দেশের মানুষের অবস্থা খারাপ। সাত মাস বৃষ্টি হয় নাই। বাংলাদেশে যেমন এখন পানি নাই, আবার যখন বন্যা আসে তখন সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’ এই বাস্তবতার নিরীখে তিনি তখন বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, এ দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে অন্য দেশ থেকে চাল কিনে বা খাদ্য এনে বাঁচানো যাবে না। কে কখন কতটুকু খাদ্য দেবে তা  অনিশ্চিত। তাই তিনি দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই রাগ করবেন না, দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেও আমি চাউল কিনতে পারছি না। চাউল পাওয়া যায় না। যদি চাউল খেতে হয় আপনাদের চাউল পয়দা করে খেতে হবে, না হলে মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়ালেও হবে না।’ কৃষি বিপ্লবের কথা বলে বঙ্গবন্ধু প্রকৃতই কৃষি উন্নয়নের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সে সময় ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১০১ কোটি টাকাই তিনি রেখেছিলেন কৃষি উন্নয়নের জন্য যা ছিল তখনকার সময়ে এক দুঃসাহসী উদ্যোগ।
প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও কৃষি উন্নয়ন
বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তার পেছনে ছিল এক জটিল ও দুঃসহ প্রেক্ষাপট- সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জের এক অষ্পষ্ট ভবিষ্যৎ। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তাঁকে ভাবতে হয়েছিল ভারত থেকে ফিরে আসা প্রায় ১ কোটি বাঙালির পুনর্বাসন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার, মুক্তিযুদ্ধের দালালদের বিচার করা ইত্যাদি। কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই তিনি প্রণয়ন করলেন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। কৃষকদের ও কৃষি উন্নয়নের কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। দেশকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য বঙ্গবন্ধু সেই পরিকল্পনা গ্রহণের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। দেশের এক ইঞ্চি জমিও যাতে পড়ে না থাকে এবং জমির ফলন যাতে বৃদ্ধি পায় তার জন্য দেশের কৃষক সমাজকেই সচেষ্ট হতে হবে।’
কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব প্রদান
বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে তখন গুরুত্ব দেন কৃষি গবেষণা ও কৃষি শিক্ষার। তিনি ১৯৭৩ সালে কৃষি শিক্ষায় মেধাবীদের           আকৃষ্ট করার জন্য চাকরি ক্ষেত্রে কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেন। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। পুনর্গঠন করা হয় তুলা উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে কৃষি খাতে প্রায় ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, বাড়ে খাদ্য শস্যের উৎপাদন।
কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে  ১৯৭৩ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট। এসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে দেশে ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে উচ্চফলনশীল জাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের নানামুখী গবেষণার ফলে দেশ আজ মাংস, ডিম ও স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে সেচপাম্প, সার ও উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়। এর ফলে স্বাধীনতার পর রাসায়নিক সারের ব্যবহার, সেচকৃত জমি ও উন্নত জাতের ধানের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এ সময় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) কর্তৃক প্রদত্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক  ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তিনি কয়েক লক্ষ কৃষি  ঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থাও করেন। এ ছাড়া ভূমিহীন কৃষকদের নামে বন্দোবস্ত দেয়া হয় খাস কৃষিজমি। কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দানের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় জাতীয় কৃষি পুরস্কার তহবিল।
কৃষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা
বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে এ দেশের কৃষক শ্রমিকদের সম্বোধন করে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেছিলেন, কৃষকদের সাথে থাকার ও কৃষকদেরও তাঁর সাথে থাকার উদাত্ত আহŸান জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন এ দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ লোক ছিল কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের কৃষক-শ্রমিকদের তিনি খুব ভালোবাসতেন ও সবসময় তাঁদের উন্নতির চিন্তা করতেন।  কৃষকদের তাচ্ছিল্য বা অসম্মান করার কথা তিনি কখনো কল্পনাও করতেন না। এ কথার প্রমাণ মেলে সে সময় জাতিসংঘে দেয়া তাঁর এক ভাষণে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজুররা করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ।’ কৃষকদের দিয়েছিলেন তিনি সোনার বাংলা গড়ার মূল কারিগরের মর্যাদা। এই যে উদারতা, বুক আগলে কৃষকদের সম্মান রক্ষা করা- এ কেবল বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব।
কৃষকদের জন্য শুধু মুখের কথা, আবেগ প্রকাশ বা হৃদয়ের উদারতা প্রকাশই নয়, বাস্তবে তাঁদের জন্য বঙ্গবন্ধু বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে বেতার-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দেন, সেখানেও তিনি কৃষকদের কথাই বলেন এভাবে, ‘আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে। সম্পদের স্বল্পতা থাকা সত্তে¡ও আমরা চাষিদের স্বল্পমেয়াদি সাহায্য দানের জন্য ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। ২৫ বিঘার কম জমি যাদের আছে তাদের খাজনা চিরদিনের জন্য মওকুফ করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে সমস্ত বকেয়া খাজনা মওকুফ করা হয়েছে। তাকাবি ঋণ বাবদ ১০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে এবং ১৬ কোটি টাকা টেস্ট রিলিফ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।’
সমন্বিত ভাবনা
বঙ্গবন্ধু সব সময়ই বলতেন, ‘ আমাদের দেশের জমি এত উর্বর যে বীজ ফেললেই গাছ হয়, গাছ হলে ফল হয়। সে দেশের মানুষ কেন ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পাবে।’ তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে, এ দেশে যেমন সোনার মাটি ও মানুষ আছে, তেমনি আছে কৃষির অপার সম্ভাবনা। এমন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে মজবুত করতে হবে। তাঁর এক ভাষণে তিনি এ কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন ‘কৃষি ও কৃষক বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।’ তিনি এটাও বুঝতেন, কৃষির উন্নতি মানে শুধু ধান-গম বা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। ভাত-রুটি খেয়ে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু মেধাবী জাতি গঠনে দরকার সুষম খাদ্য ও পুষ্টি। এ ছাড়া  মেধাবী জাতি ছাড়া কোনো দেশের উন্নতি হয় না। সেজন্য তিনি প্রধান খাদ্যের পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদির উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেন। তিনি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার ওপর জোর দেন। যৌথ খামার গড়ে তোলার আহŸান জানান। তিনি বলেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বুঝায় না বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি এসবকে বুঝায়। সুতরাং কৃষির উন্নতি করতে হলে এসব খাদ্যশস্যের সমন্বিত উৎপাদনের উন্নতি করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা
বঙ্গবন্ধুর প্রথম স্বপ্ন ছিল এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও সাধারণ মানুষের মুক্তি। স্বাধীনতা অর্জনের পর তাঁর দ্বিতীয় স্বপ্ন ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। বাংলাদেশকে তিনি সোনালি ফসলের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, প্রতি ইঞ্চি জমিকে তিনি চাষের আওতায় এনে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে চেয়েছিলেন, প্রতিটি মানুষের জন্য নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন উন্নত খাদ্য, আশ্রয় ও জীবন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দেশের প্রতি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে উন্নত জীবনের অধিকারী হবে- এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন।’ তিনি ৩ জুন ১৯৭২ সালে সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে তার স্বপ্নের কথা বলেন, ‘বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন, ধ্যান, ধারণা ও আরাধনার ধন। আর সে সোনার বাংলা ঘুমিয়ে আছে চির অবহেলিত গ্রামের আনাচে-কানাচে, চির উপেক্ষিত পল্লীর কন্দরে কন্দরে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির আশেপাশে আর সুবিশাল অরণ্যের গভীরে। ভাইয়েরা আমার- আসুন সমবায়ের জাদুস্পর্শে সুপ্ত গ্রাম বাংলাকে জাগিয়ে তুলি। নব-সৃষ্টির উন্মাদনায় আর জীবনের জয়গানে তাকে মুখরিত করি।’ দূরদর্শী এ ভাষণে তিনি সমবায়ের কথা বললেও তা মান্ধাতার আমলের পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে  আধুনিক জোটবদ্ধ যৌথ খামারের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন। তিনি সে সময়েই বুঝেছিলেন, মানুষকে শিক্ষিত করে তুললে তারা অন্য চাকরি করবে, ভিন্ন পেশায় চলে যাবে। কৃষির ওপর নির্ভর করবে না। দিন দিন কৃষি শ্রমিকের প্রাপ্যতা কমবে। তাই কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রম নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। যেভাবে পরিবার ও জমি ভাঙ্গছে, চাষের জমিগুলো দিন দিন আয়তনে ছোট হচ্ছে- তাতে যন্ত্রের মাধ্যমে চাষ করা কঠিন। তাই ভবিষ্যতে কৃষির উৎপাদন খরচ ও শ্রমিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হলে যৌথ বা বিশেষ সমবায় পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। তাঁর এক বক্তব্যে এই বিশেষ পদ্ধতিতে চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার কি আশ্চর্য এক সূত্র তিনি দিয়েছিলেন যার ভেতরে শুধু কৃষি উন্নয়নই নয়, স্থানীয় রাজস্বে পল্লী উন্নয়নেরও রূপরেখা নিহিত ছিল। তিনি চেয়েছিলেন ‘প্রতি গ্রামে যৌথ চাষ হবে এবং ফসলের ভাগ যাবে মালিক, শ্রমিক, গ্রাম তহবিল- এ তিন জায়গায়’। এসব স্বপ্নের মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ। তিনি বলেছিলেন, ‘এই স্বাধীনতা তখনি আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলার কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।’
সপরিবারে তাঁকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট  নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের এক জঘন্যতম কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় সেখান থেকে। যে শেখ মুজিবুর রহমান জেল, জুলুম, হুলিয়া, নির্যাতন সহ্য করেছেন তাঁর প্রিয় বাঙালিদের জন্য, তাদেরই কয়েকজন তাঁকে হত্যা করে এ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা জানতো না যে, বঙ্গবন্ধুকে কখনো মেরে ফেলা যায় না, মুছে ফেলা যায় না তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শকে, থামানো যায় না বাংলাদেশের উন্নয়নকে। তাঁর স্বপ্ন ও ভাবনাকে ভিত্তি করে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আরও বলিষ্ঠ নীতি নিয়ে এ দেশের কৃষি উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য তাঁর সরকার পরিচিতি পেয়েছে কৃষিবান্ধব সরকার হিসেবে। তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় দেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ যা বঙ্গবন্ধুরই চাওয়া ছিল। এখন আমরা মাংস উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষির নানা ক্ষেত্রে এখন অর্জিত হয়েছে অনেক সাফল্য। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে কৃষি উন্নয়নের রোল মডেল। কৃষি উৎপাদনের নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন মর্যাদার আসন লাভ করেছে। বাংলাদেশ এখন পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম ও পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়, ধান উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম, আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, আলু উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, মৌসুমী ফলের উৎপাদনে বিশ্বে দশম। ইতোমধ্যে আমরা পাট, ধৈঞ্চা ও ইলিশের জন্মরহস্য আবিষ্কার করেছি, পেয়েছি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ইলিশ ও খিরসাপাত আমের স্বীকৃতি। এটাই তো স্বাধীনতার সার্থকতা। কৃষি উৎপাদনে এরূপ অনেক সাফল্য অর্জিত হওয়ার পর বর্তমান সরকার এখন নজর দিয়েছে পুষ্টি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপর যাতে দেশের মানুষ খাদ্য গ্রহণ করে সুস্থ থাকতে পারে, গড়ে উঠতে পারে একটি মেধাবী জাতি।

 

মৃত্যুঞ্জয় রায়

উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা: ০১৭১৮২০৯১০৭, ই- মেইল :  kbdmrityun@yahoo.com

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জাতীয় অর্থনীতি ও প্রাণিজ পুষ্টি উন্নয়ন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন লালিত সোনার বাংলা তথা বিশ^ দরবারে উন্নত বাংলাদেশের আবির্ভাবের পর্যায়ে আমরা বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশ। আগামী ২০৪১ সালে বিশে^ উন্নত দেশে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়াও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ অর্জনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসডিজি এর উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়া এবং প্রতিটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের গৃহীত নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ দুধ ও ডিম উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গবাদিপ্রাণি ও পোল্ট্রি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। মোট দেশজ উৎপাদনে প্রানীসম্পদ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছাড়াও, দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি এবং প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। চামড়াসহ বিভিন্ন উপজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
গবাদি প্রাণী ও পোলট্রি প্রজাতি
বাংলাদেশে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য গবাদি প্রাণি ও পোলট্রি প্রজাতিগুলো হচ্ছে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মুরগি ও হাঁস। দেশে প্রতি বছর গবাদি প্রাণী ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা বেড়েই চলছে অর্থাৎ দেশে শিল্পায়ন, নগরায়ন ইত্যাদি হলেও জনগণ গবাদি প্রাণী পালন থেকে বিচ্যুত হয়নি।
জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান
স্থির মূল্যের ভিত্তিতে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৪৭%, যা টাকার অংকে প্রায় ৪৩২১২ কোটি টাকা। প্রাণিসম্পদ খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হার ছিল ৩.৪৭%। জাতীয় জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে কমলেও কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মূল্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১৩.৪৬%।
প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সুপারিশ অনুযায়ী একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের প্রতিদিন ন্যূনতম ২৫০ মিলি দুধ ও ১২০ গ্রাম মাংস এবং বছরে ১০৪টি করে ডিম খাওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশগুলোতে দুধ, ডিম ও মাংস গ্রহণের পরিমাণ এফএও এর সুপারিশের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমান দেশজ উৎপাদন দুধ, মাংস ও ডিমের ন্যূনতম জাতীয় চাহিদার ৬৬.০৩, ১০৪.১৫ এবং ৯৯.৮৯% জোগান দিয়ে থাকে। বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ৩২২.৯১, ৪৯৬.৩৫ এবং ১৯৭.৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের চাহিদা উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি
দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০% সরাসরি এবং ৫০% আংশিকভাবে জীবিকার জন্য প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এক টন দুধ উৎপাদন এবং ইহার প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতের সাথে সম্পৃক্ত ৩৭টি শ্রমজীবী পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।    উল্লেখ্য যে, প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত মহিলাসহ বিপুলসংখ্যক বেকার যুবক-যুবতির কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
প্রাণিসম্পদ পণ্য ও উপজাত রপ্তানি
জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় শতকরা ২.৪৯ ভাগ অর্থাৎ ১.০১ বিলিয়ন আমেরিকান ডলার সমপরিমাণ টাকা আসে বিদেশে চামড়া ও চামড়া জাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। সরকার দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে বিদেশে দুধ, মাংস ও ডিম রপ্তানি করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও প্রাণিজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের লক্ষ্যে মাননিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার স্থাপনসহ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
টেকসই নিরাপদ দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ নি¤œরূপ :
কৃষি জমির স্বল্পতা: দ্রæত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য দেশে শিল্প বিকাশের বিকল্প নাই। শিল্প বিকাশের জন্য স্থাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চাষাবাদযোগ্য জমি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে দেশে প্রতি বছর ১% হারে কৃষি জমি অন্যান্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এমতাবস্থায়, প্রাণিসম্পদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেশে দুধ, ডিম ও মাংসের জোগান নিশ্চিত করা দূরুহ হবে। কারণ প্রাণীর সংখ্যা বাড়ালে তাদের পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পাওয়া সহজ হবে না। সে ক্ষেত্রে দেশের চরাঞ্চলগুলোকে মিল্কভিটার আদলে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।
দেশীয় প্রাণী ও পোলট্রি প্রজাতিসমূহের কম উৎপাদনশীলতা :  দেশে বিদ্যমান গরুর প্রায় ৫০%, মহিষের ৯০%, ছাগলের ৬০% ও ভেড়ার ৮০% দেশী জাতের। দেশী জাতের এসব গবাদি প্রাণী ও পোলট্রি প্রজাতির উৎপাদনশীলতা অনেক কম। যা লাভজনক বাণিজ্যিক খামার ব্যবস্থাপনায় পালন উপযোগী নয়। দেশে বিদ্যমান সংকর জাতের গবাদি প্রাণীগুলোর উৎপাদন তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এদের রোগবালাই বেশি, বাচ্চা প্রদানের হার কম, পালন ব্যবস্থাপনা ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ খামারিদের জন্য সহজসাধ্য নয়।
প্রাণী ও পোলট্রি খাদ্যের ঘাটতি : আমাদের দেশে উৎপাদিত ধানের খড় গবাদি প্রাণীর আঁশ জাতীয় খাদ্যের জোগান দিয়ে থাকে। দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ খড় উৎপাদিত হয় তা দিয়ে আঁশ জাতীয় খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু অধিকাংশ খড় বর্ষা মৌসুমে উৎপাদিত হওয়ায় প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় চাহিদার প্রায় ৫৬% ঘাটতি থাকে। সা¤প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএলআরআই উদ্ভাবিত নেপিয়ার ফডার চাষ স¤প্রসারিত হচ্ছে। অন্যদিকে দানাদার খাদ্য হিসেবে মূলত বিভিন্ন শস্য উপজাত, শস্যদানা এবং খৈল ব্যবহার হয়ে থাকে। দেশে উৎপাদিত এসব খাদ্য উপাদান জাতীয় চাহিদার মাত্র ২০.৪০% জোগান দিয়ে থাকে।
রোগনির্ণয়, চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ : দেশীয় গবাদিপশু ও পোলট্রি প্রজাতিসমূহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং চিকিৎসা ব্যয় অনেক কম। অন্যদিকে সংকর এবং বিশুদ্ধ বিদেশী জাতের গবাদিপ্রাণি ও পোলট্রির বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পালন ব্যবস্থাপনায় রোগব্যাধি বেশি হয়,  মৃত্যুহার বেশি এবং জীবদ্ধশায় বাচ্চা উৎপাদনের সংখ্যা অনেক কম। এ ছাড়াও, দেশে প্রযুক্তি নির্ভর কার্যকর রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার ব্যবহার খুবই সীমিত পর্যায়ে।
প্রাণিসম্পদ পণ্যের বহুমুখী বিপণন ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশে গবাদি প্রাণী ও পোলট্রি খামার ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যালু-এডেড পণ্য উৎপাদন এবং খামার উপজাতসমূহের     রি-সাইকেলিং বা এ থেকে ভ্যালু এডেড পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি উপেক্ষিত। এমতাবস্থায় শুধু দুধ, মাংস ও ডিম বিপণনের মাধ্যমে লাভজনক খামার পরিচালনা করা দুরুহ। এর পেছনে রয়েছে খামারিদের অসচেতনতা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তির সহজ প্রাপ্যতা অন্যতম।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশ বিশে^ সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ুর প্রভাব প্রাণিসম্পদ পালন এবং উৎপাদনে যথেষ্ট প্রভাব রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গাভীর দুধ উৎপাদন ১৪ থেকে ৩৫% কমে যায়। এমতাবস্থায়, পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে সহনশীল প্রাণী ও পোলট্রি পালন প্রযুক্তি উন্নয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।
শ্রমিকের প্রাপ্যতা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। দেশে শিল্পায়নের সম্প্রসারণের ফলে জনবলের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় কৃষি কাজে শ্রমিকের স্বল্পতা দেখা যাচ্ছে। ফলশ্রæতি ভবিষ্যৎ প্রাণিসম্পদ খামার ব্যবস্থাপনায় যান্ত্রিকীকরণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচ্য হবে।
আগামী ৫০ বছরে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে সম্ভাব্য গবেষণা ক্ষেত্রসমূহ
জলবায়ু ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য গবেষণা; প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জীবপ্রযুক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত গবেষণা; প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থায় ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ বিষয়ক গবেষণার সূচনা; প্রাণিসম্পদ গবেষণা ও উন্নয়নে আইসিটি প্রয়োগ; প্রাণিসম্পদজাত খাদ্যপণ্য এবং উপজাত প্রক্রিয়াকরণ সংক্রান্ত গবেষণা জোরদারকরণ; ভ্যাকসিন ও বায়োলজিক্স সংক্রান্ত গবেষণা আধুনিকায়ন ও জোরদারকরণ; নুতন খাদ্য উদ্ভাবন ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ বিষয়ক গবেষণা জোরদারকরণ; জলবায়ু পীড়ন সহনশীল প্রাণী ও পোল্ট্রির জাত উন্নয়ন।
মানসম্পন্ন ও নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণে আঞ্চলিক কৃষি, কৃষক ও আবহাওয়াকে সম্পৃক্ত করে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পরিবর্তনশীল প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন সমস্যাবলীর কার্যকর সমাধানের জন্য অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর জন্য দেশের গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

ড. গৌতম কুমার দেব১ ড. নাথুরাম সরকার২

১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বায়োটেকনোলজি বিভাগ, মোবা : ০১৭১৫২৩৪২৩, ই-মেইল : debgk2003@yahoo.com,   ২মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট,

বিস্তারিত
বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষে দৈহিক মানসিক স্বাস্থ্য ভাবনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন যেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তেমনি রাজনৈতিক মুক্তি সহ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম আশা-আকাক্সক্ষা। তাঁর এই   আশা-আক্সক্ষার প্রতিফলন দেখা যায় স্বাধীনতাত্তোর সাড়ে তিন বছরের কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে তাঁর সূদুরপ্রসারি পরিকল্পনা ও কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে। তাঁর কর্ম-পরিকল্পনার মধ্যে ছিল (১) কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করা (২) ভ‚মি রাজস্বের চাপে নিষ্পিষ্ট কৃষকদের ২৫ বিঘা জমি পর্যন্ত খাজনা মাফ করা এবং বকেয়া খাজনা মওকুব করা (৩) প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার তৎপরতা চালানো (৪) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের বনজ-সম্পদ, গো-সম্পদ, হাঁস-মুরগি চাষ, দুগ্ধ ও মৎস্য খামার তৈরি ইত্যাদি। অর্থাৎ উৎপাদন ও উন্নয়নের মাধ্যমে দৈহিক ও মানসিকভাবে উন্নত জাতি গঠন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।


ঐতিহাসিকভাবে, মানুষ আদিম যুগ থেকে দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে খাদ্যের জোগাড় করে আসছে, শিকার বা সংগ্রহ এবং কৃষি। বর্তমানে, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের সিংহভাগই খাদ্য কৃষি বা  কৃষিভিত্তিক শিল্প  হতে সরবরাহ হয়ে থাকে। আমাদের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কৃষি জীববৈচিত্র্য। হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের কৃষকগণ এই জীববৈচিত্র্য ধরে রেখেছেন। মানুষের প্রয়োজনেই তারা বাছাই  করে নিয়েছেন ফসল, ফসলের জাত, গৃহপালিত প্রাণী ও প্রাণীর বিভিন্ন জাত। মাছ চাষের জন্য  প্রাকৃতিক মৎস্য ভাÐার থেকে বেছে নিয়েছেন হরেক রকম মাছ। কৃষি জীববৈচিত্র্যের আরেক অংশ হলো আমাদের কৃষি বনায়ন বা সামাজিক বনায়নের জন্য বাছাই করে নেওয়া উদ্ভিদ প্রজাতি। আমাদের আবাদি জমিতে চলছে বিভিন্ন মিশ্র ফসলের চাষ, আর এই আবাদি-অনাবাদি জমিতে অবস্থানরত জীব-অনুজীবও আমাদের কৃষি জীববৈচিত্র্যের অংশ। এছাড়া আমাদের ফসলের পরাগায়নে সহায়তাকারী কীটপতঙ্গ, এমনকি ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গও এই জীববৈচিত্র্যের সদস্য।


আধুনিক কৃষিতে জীববৈচিত্র্যে আজ হুমকির মুখে, জীব বৈচিত্র্যে  ধরে রাখা অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ আধুনিক কৃষির প্রভাব আজ পড়ছে কৃষির সকল পর্যায়ে। অল্প জায়গা থেকে অধিক উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার মুখে খাদ্য তুলে দেওয়ার পাশাপাশি রয়েছে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চাপ। ফলে আমাদের আবাদ করতে হচ্ছে উচ্চফলনশীল ফসল, মাছ ও ডিমের প্রয়োজনে গড়ে তুলতে হচ্ছে নতুন নতুন বিদেশি বা দেশি-বিদেশি সঙ্কর জাতের মুরগি খামার। একইভাবে অধিক দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনের আশায় লালন-পালন করতে হচ্ছে বিদেশি বা সঙ্কর জাতের গরু।  প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে আরও গড়ে তুলতে হচ্ছে ছোট বড় মৎস্য খামার, যেখানে বিভিন্ন মাছের বাচ্চা উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারের চাহিদা মোতাবেক বড় বড় মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। এই সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়েছে বা হচ্ছে আমাদের জনগণের খাদ্যাভাস এর কথা মাথায় রেখে। দেশের জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিধান করার লক্ষ্যে। তবে এসব করতে গিয়ে আমাদের সর্বদাই মাথায় রাখতে হবে যেন আমরা আমাদের স্থানীয় ফসলের জাত, গৃহপালিত পশুর স্থানীয় জাত, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন আবাসস্থল ইত্যাদি যেন হারিয়ে না ফেলি। এগুলো হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে কৃষি জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে টেকসই উন্নয়ন।
এবার ফেরা যাক স¦াস্থ্যের কথায়, জীবনের কথায়। দীর্ঘজীবী হতে কে না চায়? তাহলে বেশি কিছু নয় কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলেন তাহলে আপনি হবেন স¦াস্থ্যবান ও দীর্ঘজীবী, দৈনিক-
*প্রচুর পরিমাণে ফলমূল খেতে হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক পরিশ্রমী ব্যক্তির  ফল- ১৫০ গ্রাম ও শাকসবজি ২৫০ গ্রাম খেতে হবে।
*পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।
* সিগারেট ও অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।
*পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে (৭-৮ ঘণ্টা)।
স¦াস্থ্য ভালো রাখতে লাল মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য কম পরিমাণে এবং শাকসবজি, ফল, মাছ এবং শস্যদানা বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস শুধু ওজনই নিয়ন্ত্রণে রাখবে না পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
ফলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শারীরিক স¦াস্থ্যের সাথে মানসিক স¦াস্থ্যের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবার স¦াস্থ্যের সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তির একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য অনেকেরই অল্প বয়সেই স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। এক্ষেত্রে সচেতনতা জরুরি। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সঞ্চালন বাড়ে ফলে স¥ৃতিশক্তি দৃঢ় হয়। অন্যদিকে রাতে টানা ৬-৮ ঘণ্টা ভালো ঘুম না হলে মস্তিষ্ক জটিল সমস্যার সমাধান বা চিন্তা করতে পারে না। মস্তিষ্ক সজাগ রাখতে সুযোগমতো বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটান, সামাজিক কর্মকাÐ বা মানবসেবায় যোগ দিন এবং প্রাণখুলে হাসুন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি সামাজিক, পরোপকারী সদা হাস্যোজ্জ¦ল তাদের মনে রাখার ক্ষমতাও প্রবল। কারণ     স্নেহ-মমতা, বন্ধুত্ব-ভালোবাসা এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম যা মানুষের মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। শারীরিক ও মানসিক চাপ স্মৃতিশক্তি হ্রাসের জন্য দায়ী। এজন্য মেডিটেশনের কোন বিকল্প নেই।
স¥ৃতিশক্তি বাড়াতে খাদ্য তালিকায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন- শিম, কুমড়ার বীজ, সয়াবিন, ব্রোকলি, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদিতে রয়েছে স্যাচুরেটেন্ড ফ্যাট। রঙিন তাজা শাকসবজি ফলমূল ও সবুজ চায়ে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব পুষ্টি উপাদান মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে স্মৃতিশক্তি তীক্ষè করে। শিশুদের ভিডিও গেম বা সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলা করতে না দিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক খেলনা দিন এবং অনুষ্ঠান দেখান। তাদের নতুন নতুন গল্পের বা উপন্যাসের বই পড়তে দিতে পারেন এবং আপনি নিজেও শিশুদের সামনে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্রাউজিং থেকে বিরত থাকুন এবং নিজে বই পড়ুন (হার্ডকপি) তাহলে শিশুও বই পড়ায় আগ্রহ পাবে। কারণ শিশুরা সবসময় অনুকরণ প্রিয়। এছাড়া নিজে নতুন নতুন কাজের ঝুঁকি নিন কারণ নতুনত্ব একঘেয়েমিতা দূর করে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ায় ও মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
মানসিক অস্থিরতা কিংবা বিষণœতা দূর করতে আমরা মেডিটেশনের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা এক মাস মেডিটেশন অব্যাহত রাখলে মস্তিকে গঠনগত যে পরিবর্তন আসে তা মানসিক ব্যাধি প্রতিকারে কার্যকরী ভ‚মিকা রাখতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে। ব্রিটিশ একদল গবেষক বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই গ্রæপ ছাত্রছাত্রীদের উপর গবেষণা চালান। এক গ্রæপ এক মাসব্যাপী মেডিটেশনের অভ্যাস করে অন্য গ্রæপ করে না। গবেষকগণ লক্ষ্য করেন যে, মেডিটেশন করা গ্রæপের ছাত্রছাত্রীদের মস্তিষ্কের ¯œায়ুতন্ত্র (হোয়াট মেটার) বেশি উদ্দীপ্ত হয় এবং বেশি সঙ্কেত গ্রহণে সক্ষম হয় ফলে মস্তিষ্কের যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং তাদের আচার-আচারণের অনেক গুণগত পরিবর্তন হয়। (সূত্র : ডেইলি মেইল; ড. মজুমদার ২০১৮)।  মানসিক স¦াস্থ্য ভালো রাখার অন্য আরও একটি কথা বলা যাক,  মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা করে রাখার অভ্যাস ভালো নয়, যা হৃদযন্ত্রের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। গবেষণায় দেখা গেছে ক্ষমা করার পরিবর্তে ক্ষোভ জমা করে রাখলে মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ে। ডক্টর সিমন্স বলেন ‘আপনি ভাবতেই পারবেন না মনের মধ্যে ক্ষোভ জমা থাকলে তা কত দ্রæত এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের ক্ষতি সাধন করে। তাই নিজের ঘাড় থেকে এই আপদ নামিয়ে মানসিকভাবে সুস্থ থাকুন সবসময়। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ক্যথি হেফনার ক্ষমাশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর ফলে সামাজিকবন্ধন আরও দৃঢ় হবে যা সুরক্ষিত রাখবে হৃদযন্ত্র এবং ভালো থাকবে     মানসিক স¦াস্থ্য। পরিশেষে হেমন্তের মৃদু-মন্দ বাতাসে শীতের আগমনী বার্তায় সকলের শারীরিক ও মানসিক সুস¦াস্থ্য কামনায় ছন্দে ছন্দে বলি-
ফুলকপি ওলকপি ও আমলকী জলপাই ফল,
এসব খেলে দেহেতে বাড়ে শক্তি সাহস আর বল।
মা-শীতের দিনে নতুন ধানে পায়েস-মিঠাই করবে,
সেসব খেয়ে পেটের সাথে মনটাও তাই ভরবে।
রোগমুক্ত দেহ ও মন পেতে  নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, হাঁটা, দৌঁড়ানো, সাঁতার কাটা বা কায়িক পরিশ্রম কিংবা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন। এসব কর্মকাÐ শারীরিক এবং    মানসিকভাবে সুস্থ রাখবে এবং ডায়াবেটিস কিংবা হৃদরোগ থেকে দূরে রাখবে।

 

ড. সত্যেন মণ্ডল১ বীথিকা রায়২

১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ব্রি গাজীপুর,মোবাঃ-০১৭১২৪০৫১৪৯, ইমেইল-satyen1981@gmail.com 2সহকারী শিক্ষক, কালীগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, কালীগঞ্জ, গাজীপুর

বিস্তারিত
উপকূলীয় কৃষকের মুখে হাসি : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি অন্যতম চালিকাশক্তি। জীবন-জীবিকার পাশাপাশি আমাদের সার্বিক উন্নয়নে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই কৃষির উন্নয়ন মানে দেশের সার্বিক উন্নয়ন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই স্বাধীনতার পরপরই কৃষিকে উন্নয়ন করতে নিয়েছিলেন নানামুখী পদক্ষেপ। তারই ধারাবাহিকতায় টেকসই কৃষি উন্নয়নে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষি ক্ষেত্রে সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং দিকনির্দেশনায় খোরপোষের কৃষি আজ বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দশম।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন চলছে সারাদেশে। মুজিববর্ষে কৃষিতে বদলাবে বাংলাদেশ, কৃষিতে বদলে যাবে উপকূল।
কপিজাতীয় ফসলের চাষে সফলতার মুখ দেখেছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপক‚লীয় এলাকার কৃষকেরা, যাদের বেশ কিছু জমি লবণাক্ততায় আক্রান্ত । শুকনো মৌসুমে এই বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকে লবণাক্ততার কারণে, যা এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বড় হতাশা আর দুর্ভোগ। বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চলের এই সমস্যা সমাধান করে কৃষকের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইকো কোঅপারেশন দি সল্ট সলিউশন নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলের ৪টি জেলার (পটুয়াখালী, বরগুনা, বাগেরহাট ও খুলনা) এবং ৮টি উপজেলার (কলাপাড়া, গলাচিপা,বরগুনা সদর,তালতলী, বাগেরহাট সদর, রামপাল, দাকোপ ও কয়রা)  ৫০০০ চাষিপরিবার নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্পটি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোডেক এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে  নেদারল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সল্ট ফার্ম টেক্সেল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের কৃষকরা লবনাক্ততায় আক্রান্ত জমিতে শীতকালীন কপি জাতীয় ফসলের লবণ সহনশীল জাতের উন্নত চাষাবাদের জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছে । কৃষকগণ প্রকল্পের থেকে প্রাপ্ত বীজ ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করে কপিজাতীয় ফসল চাষে পাচ্ছেন সফলতা যা এই অঞ্চলের কৃষকদের পারিবারিক আয় এবং পুষ্টি নিশ্চয়তার এক অনন্য সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।


কপিজাতীয় ফসলের গুরুত্ব
বাঁধাকপি : বাঁধাকপির মূলত বাংলাদেশের একটি শীতকালীন সবজি, যা পাতাকপি নামে বেশি প্রচলিত।  বাঁধাকপি কাঁচা কিংবা রান্না করে খাওয়া যায়। ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটকেমিক্যালসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদানে ভরপুর এই সবজি। এতে রয়েছে রিবোফ্লোভিন, প্যান্টোথেনিক  অ্যাসিড, থায়ামিন, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি ও কে। এছাড়াও বাঁধাকপি আয়রনের ভাল উৎস। বাঁধাকপি ওজন কমাতে সাহায্য করে, হাড় ভালো রাখতে সহায়তা করে, আলসার নিরাময়ে উপকারী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, কিডনি সমস্যা প্রতিরোধ করে, ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
ফুলকপি : ফুলকপি রান্না বা কাঁচা যে কোন প্রকারে খাওয়া যায়, আবার এটি দিয়ে আচারও তৈরি করা যায়। সাধারণত    ফুলকপির ফুল অর্থাৎ সাদা অংশটুকুই খাওয়া হয় আর সাদা অংশের চারপাশে ঘিরে থাকা ডাঁট এবং সবুজ পাতা দিয়ে স্যুপ রান্না করা যায়,যা আমাদের দেশে ফেলে দেওয়া হয়। এতে রয়েছে ভিটামিন বি,সি,কে, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও জিংক। একটি মাঝারি আকারের ফুলকপিতে রয়েছে শক্তি-২৫ কিলোক্যালরি । এছাড়াও ফুলকপিতে রয়েছে  কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, আঁশ, ফোলেট, নিয়াসিন, থায়ামিন, প্যানথানিক এসিড। বাঁধাকপি এবং ফুলকপি উভয়ই  রক্তে প্রোথম্বিন তৈরি হতে সাহায্য করে।
ওলকপি : ওলকপিতে রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, লৌহ ভিটামিন বি, সি, কে এবং ভিটামিন এ। এছাড়াও রয়েছে ডায়েটারি ফাইবার এবং ফাইটোকেমিকেলস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সহ বিভিন্ন ক্যারোটিন। গøুকোসিনোলেটস ও অ্যান্টি অক্সিডেন্টগুলো স্তন ও প্রোস্টেটসহ সব রকম  ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।  
বিটকপি/রেডবিট : তবে লবণাক্ত এলাকার জন্য এটি হতে পারে এক আশীর্বাদ, কারন এটি  প্রাকৃতিকভাবেই লবণ সহিষ্ণু। দি সল্ট সল্যুশন প্রকল্পের মাধ্যমে রেডবিটের বোরো নামক জাতটি খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে চাষাবাদ করা হয়। এতে দেখা যায় সমুদ্রের পানি দিয়ে সেচ দিলেও গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয় না। তাই দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় শুকনো মৌসুমে যখন মিষ্টি পানি থাকে না তখন সহজপ্রাপ্য লবণাক্ত পানি ব্যবহার করেই রেডবিট ফলানো সম্ভব। রেডবিট বা বিটকপির কোনো অংশই ফেলার নয় এর পাতা এবং মূল দুটোই খাওয়া যায়। শহর এলাকায় কিংবা বিভিন্ন সুপারশপে রেডবিট কেজি প্রতি ২০০-৬০০ টাকা মূল্যেও বিক্রি হয়। অতএব কৃষকের আয় বৃদ্ধিতেও রেডবিট এর সম্ভাবনা অনেক এবং এটি পুষ্টি গুণেও অনন্য। এতে রয়েছে প্রচুর আয়রন। এছাড়াও এতে রয়েছে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৬ ইত্যাদি। রক্ত পরিষ্কার করতে, যকৃতের অসুস্থতায়, কোষ্ঠকাঠিন্যে, স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় রেডবিট উপকারী।      
লবণাক্ত জমিতে কপিজাতীয় ফসলের উৎপাদন প্রযুক্তি
জাত পরিচিতি: আমাদের দেশে বাঁধাকপি, ওলকপি এবং ফুলকপির কোনো লবণ সহিষ্ণু জাত নেই। দি সল্ট সল্যুশন প্রকল্পের মাধ্যমে নেদাল্যান্ডস থেকে এই সকল সবজির বিভিন্ন লবন সহিষ্ণু জাত এনে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত কৃষকদের দেয়া হয় এবং লিড ফার্মারের মাধ্যমে প্রদর্শনী প্লট বাস্তবায়ন করা  হয়।
চারা উৎপাদন পদ্ধতি :  বাঁধাকপি, ওলকপি এবং ফুলকপির  চারা বীজতলায় উৎপাদন করে জমিতে লাগানো হয়। সীড ট্রে তে করে চারা উৎপাদন করাই সবচেয়ে উত্তম। অধিক পরিমাণে জৈব উপাদান সমৃদ্ধ মাটিতে ০.৫-১.৫ সেমি গভীরে বীজ বপন করতে হবে। প্রতিটি গর্তে বা বক্সে ১-২টি বীজ রোপণ করতে হবে। বীজতলায় বীজ অবশ্যই লাইন করে রোপণ করতে হবে। অনেকেই এলমেলোভাবে বীজ বপন করে এতে চারা খুব ঘন হয় এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় সহজেই।
বীজতলার আকার ১ মিটার পাশে ও লম্বায় ৩ মিটার হওয়া উচিত। সমপরিমাণ বালি, মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে ঝুরাঝুরা করে বীজতলা  তৈরি করতে হয়। বীজতলায় চারা রোপণের আগে ৭/৮ দিন পূর্বে প্রতি বীজতলায় ১০০ গ্রাম  ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। পরে চারা ঠিকমত না বাড়লে প্রতি বীজতলায় প্রায় ১০০ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দেয়া ভাল। রেড বিটের বীজ সাধারনত সরাসরি বুনতে হয় তবে চারা উৎপাদন করেও রেডবিট আবাদ করা যায়।  
জমি তৈরি ও চারা রোপণ : গভীর ভাবে ৪-৫টি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে তৈরি করতে হবে। বীজ বপনের ৩০-৩৫  দিন পর বা দুই থেকে তিনটি পাতা সমৃদ্ধ প্রায় ১০ সেমি লম্বা সুস্থ সবল চারা রোপন করতে হবে। লবনাক্ততা মোকাবেলায়  রিজ-ফারো পদ্ধতিতে জমি তৈরি করতে হবে। এ পদ্ধতিতে বাঁধাকপি ও ফুলকপির জন্য বেডের সাইজ একই এবং রেডবিট, ওলকপির জন্য আলাদা। চারা আঁকাবাঁকা বা জিগজ্যাগ পদ্ধতিতে রোপণ করতে হবে  চারা থেকে চারার দূরত্ব হলো- বাঁধাকপি: ১৮-২০ ইঞ্চি, ফুলকপি:  ২০-২২ ইঞ্চি, ওলকপি:  ৯-১২ ইঞ্চি, রেডবিট:  ৩-৪ ইঞ্চি।
সার প্রয়োগ ও সেচ দেয়া : মাটি পরীক্ষা করে অথবা এস আর ডি আই কর্তৃক নির্দেশকৃত সার ব্যবহার করতে হবে । তবে লবণাক্ত মাটিতে শতাংশ প্রতি ২৫-৩০ কেজি জৈবসার এবং ৪-৬ কেজি জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া  সার ২ কিস্তিতে চারা রোপণের ২০-২৫ দিন পর একবার এবং  ৩০-৪০ দিন পর আর  একবার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া বাদে বাকি সার জমি প্রস্তুতির সময় প্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার পরপরই সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া ২-৩ দিন পর পরই সেচ দিতে হবে।
কৃষিতাত্তি¡ক পরিচর্যা : সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা : সার দেয়ার পরপরই সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। জমিতে পানি বেশি সময় ধরে যেন জমে না থাকে সেটাও খেয়াল করতে হবে। সার দেয়ার আগে মাটির আস্তর ভেঙে দিয়ে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
বিশেষ পরিচর্যা : গাছের সারির মাঝে সার দেয়ার পর সারির মাঝখানের মাটি তুলে দুইপাশ থেকে গাছের গোড়ায় টেনে দেয়া যায়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়।
রোগ ও পোকা দমন : ফসলের রোগ ও পোকা দমন করতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যেমন (১) আগাম বীজ বপন করা  (২) বীজ শোধন করে রোপণ করা (৩) সুষম সার ব্যবহার করা  (৪) সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ করা  (৫) চারা লাগানোর এক সপ্তাহের মধ্যেই জমিতে ফেরোমন ফাঁদ পাততে হবে । (৬) ফসলের ক্ষেত সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে (৭) পানি নিষ্কাশনের সুব্যাবস্থা থাকতে হবে (৮) শস্যপর্যায় অবলম্বন করতে হবে (৯) হাত দ্বারা পোকার  কীড়া ও ডিম সংগ্রহ করে ধ্বংস  করা (১০) আক্রমণের তীব্রতা খুব বেশি হলে নির্দিষ্ট মাত্রায় অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।

কৃষিবিদ মোঃ মাসুদ রানা

সিনিয়র এগ্রিকালচার অফিসার, ইকো কোঅপারেশন, বাংলাদেশ, মোবাইলঃ ০১৭১৬৩৩০৭৭৫, m.rana@icco.nl

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook