কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস সাড়ম্বরে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর দিনটিতে জাতিসংঘের অন্যতম একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান Food and Agriculture Organization (FAO) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মানুষের প্রধানতম মৌলিক চাহিদা হলো তার খাদ্য। মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে খাদ্যের অপরিহার্যতা, এর ব্যাপ্তি, সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ১৬ অক্টোবরকে প্রতি বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিভিন্ন বছরে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে এ দিবস পালিত হয়। এ বছর বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৯ এর প্রতিপাদ্য হলো  ‘Our Actions are our Future. Healthy diets for a # Zero Hunger world প্রতিপাদ্যের বাংলা ভাবার্থ নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ,  পুষ্টিকর খাদ্যেই হবে আকাক্সিক্ষত ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’ বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতায় এবারের প্রতিপাদ্য সময়োপযোগী ও যথার্থ বলেই বিবেচিত হয়। কারণ ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ এতো অমোঘবাণী। ব্যক্তি জীবনের কর্মফল যেমন তার জীবনের  ভবিষ্যৎকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে তেমনি মানবজাতির সামষ্টিক কর্মফলও তার ভবিষ্যৎ পথ নির্দেশ করে। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় জীবনটাকে আরও একটু উন্নততর বা আয়েশি করার জন্য বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি, জীব জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিভিন্ন অভিঘাত এখন সর্বত্র অনুভ‚ত হচ্ছে। যার পরিণতিতে এ গ্রহটির ভষ্যিৎ নিয়েই অনেক চিন্তাবিদ, গবেষক আতক্কিত বোধ করছেন। ভবিষ্যতের এই যে শঙ্কা বা আতঙ্ক মানবজাতির সামগ্রিক কর্মফলেরই পরিণতি বলে বিশ্বাসযোগ্য কারণ রয়েছে।


বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৯ এর প্রতিপাদ্যের অপর অংশ ‘পুষ্টিকর খাদ্যেই হবে আকাক্সিক্ষত ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’ বা Zero Hunger world। এটাও সময়ের বাস্তবতায় যথার্থ। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সাধন ও ক্ষয়পূরণের জন্য মানুষ যা খায় তাই তার খাদ্য। পুষ্টি উপাদান অনুযায়ী খাদ্যেরও শ্রেণী বিভাগ আছে। তবে  ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে হলে দু’টি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, পুষ্টিকর খাবারের পর্যাপ্ততা (availability) নিশ্চিতকরণ দ্বিতীয়ত সব জনগোষ্ঠীর জন্য খাবার প্রাপ্তির সামর্থ্য (affordable) নিশ্চিতকরণ। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর অমর্ত্য সেন বলেছেন শুধুমাত্র খাদ্যের পর্যাপ্ততা কোনো দেশ বা জাতিকে ক্ষুধামুক্ত করতে পারে না যতক্ষণ না সব জনগোষ্ঠীর জন্য ওই খাদ্য প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ‘ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’ শব্দ দু’টি বলতে ও শুনতে অন্তরে অনাবিল প্রশান্তি জাগায় বটে কিন্তু বাস্তবতা বহু দূর। এখনও এ পৃথিবীর অনেক দেশ অনেক জাতিগোষ্ঠী আছে যারা চরম দারিদ্র্য অথবা দারিদ্র্যসীমায় অবস্থান করছে, তাদের বেঁচে থাকার স্বাভাবিক খাবারই নিশ্চিত করা যায়নি সেখানে  পুষ্টিকর খাবার তো বিলাসী স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন- FAO, IFAD, WFP, IFPR  প্রভৃতি বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে । এসব সংস্থা তাদের নিজস্ব কর্ম পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার প্রণীত কৃষি ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট প্রকল্প অথবা কর্মসূচিতে সহায়তার মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনে ভূমিকা রাখছে ফলশ্রুতিতে বিশ্বের অনেক দেশে দারিদ্র্যের হার কমছে।


আমরা যদি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের চিত্র পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই এক অনন্য সাফল্যগাথা। মাত্র দেড় দশকেরও কম সময়ে আমাদের দারিদ্রতা যে হারে কমেছে তা অনেক দেশের জন্যই অনুকরণীয়। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দারিদ্রতার হার নেমে এসেছে ২১.৮% যা ২০০৫ সালে ছিল ৪০% এবং ২০১৬ সালে ছিল ২৪.৩%। অন্যদিকে ২০১৮ সালে চরমদারিদ্র্যের (extreme poverty) হার নেমে হয়েছে ১১.৩% যা ২০০৫ সালে ছিল ২৫.১% এবং ২০১৬ সালে ছিল ১২.৯%। কৃষির কথা যদি বলি সেখানে আরেক সাফল্যগাথা। বিগত এক দশকে কৃষির সবগুলো সেক্টর-ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। এফএও এর বাংলাদেশ কার্যালয় ২০১৮ সালের ১০ ডিসেম্বর পূর্বাভাস দিয়েছিল ২০১৮-’১৯ অর্থবছরে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। পূর্বাভাস যথার্থই ছিল, ডিএইর সূত্রে জানা যায় ফসল সেক্টরে শুধু দানাদার শস্যের উৎপাদনই এখন চার কোটি টনের উপরে, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন মিলিয়ে শাকসবজির উৎপাদন দেড় কোটি টন, দেশে প্রচলিত স্বল্প প্রচলিত এবং বিদেশী ফল যেগুলো এখানে অভিযোজিত হয়েছে সবমিলিয়ে ফলের উৎপাদন এখন কোটি টনের উপরে। ফল সবজির উৎপাদন শুধু বাড়েনি এর বহুমুখীকরণও হয়েছে। তাই তো দেশের বাজারে সব সময় বৈচিত্র্যময় শাকসবজি ও ফলের সমাহার দেখা যায়।


নিরাপদ পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য শস্য উৎপাদন ও খাদ্যের সহজলভ্যতা বজায় রাখতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য অধিদপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে তাল মিলিয়ে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য যেমনভাবে কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীদের কারিগরি প্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে ঠিক তেমনি রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষক পর্যায়ে কাজ করছে। ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম ফেজ ওও প্রজেক্টে কৃষি সম্প্রসারণ অদিপ্তর এর সাথে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবসথাপনা ও কৃষিপণ্যের বাজার উন্নয়নের উপর ৩০টি উপজেলায় কাজ করছে। প্রকল্প এলাকায় লাভজনকভাবে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের লক্ষ্যে কৃষিপণ্য সংগ্রহকরণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র  (সিসিএমসি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ঈড়সসড়হ ওহঃবৎংবঃ এৎড়ঁঢ় (ঈরএ)এর কৃষকদের সংগঠিত করে চৎড়ফঁপবৎ ড়ৎমধহরুধঃরড়হ গঠিত হয়েছে। এ সংগঠনের সদস্যগণের মধ্য হতে গঠিত বাজার পরিচালনা কমিটির দর কৃষকের মাধ্যমে   লাভজনকভাবে সিসিএমসিতে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা গড়ে উঠতেছে। নিরাপদ ফসল উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা যেমন ফসল সংগ্রহ সময়কাল (গধঃঁৎরঃু ওহফবী), সংগ্রহ কৌশল, সর্টিং, ধৌতকরণ (ওয়াশিং), গ্রেডিং, প্যাকিং ইত্যাদি প্রযুক্তি সমৃদ্ধ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষক ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে হর্টেক্স ফাউন্ডেশন দেশ ও বিদেশের বাজারে নিরাপদ ফসল বাজারজাত করণে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত পরামর্শমূলক সেবা দানের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে রপ্তানির জন্য উচ্চ মূল্যের কৃষিপণ্যসহ কৃষি ব্যবসা উন্নততর ও বহুমূখী করাই হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য।


দেশের মৎস্য সেক্টরের উন্নতিও ঈর্ষণীয়। বিবিএসের তথ্যে জানা যায়, দেশের সবগুলো উৎস থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে মাছ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৩২৮৫৪৫ মে.টন সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৪১৩৪৪৩৪ মে.টন। প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৬০%। বিগত দুই বছরে মাছের উৎপাদন আরও বেড়েছে। মৎস্য সেক্টরে বাংলাদেশ আরও একটা বিরল সম্মান অর্জন করেছে এফএও এর তথ্য মতে, ২০১৮ সনে অভ্যন্তরীণ জলজ উৎস (রহষধহফ ধিঃবৎ ংড়ঁৎপব ) থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। অথচ পূর্ববর্তী বছরের অবস্থান ছিল পঞ্চম। এক্ষেত্রে চীন প্রথম ভারত দ্বিতীয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক পুনর্নিরীক্ষণ তথ্য অনুযায়ী এখন দেশে মাথাপিছু প্রতিদিন মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬২.৫ গ্রাম যেখানে প্রয়োজন ৬০ গ্রাম। “ঞযব ঝঃধঃব ড়ভ ডড়ৎষফ ঋরংযবৎরবং ধহফ অয়ঁধপঁষঃঁৎব ২০১৮” রিপোর্ট   অনুযায়ী সামগ্রিক মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম।
কৃষির আর একটি সেক্টর হলো প্রাণিসম্পদ যেটি মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাবারের উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন হয় ৭১.৫০ লক্ষ মে.টন। দেশে মাংসের চাহিদা ৭১.৩৫ মে.টন। মাথাপিছু প্রতিদিন মাংসের চাহিদা ১২০ গ্রামের বিপরীতে উৎপাদন ১২১.৭৪ গ্রাম। উল্লিখিত তথ্যে দেখা যায় মাংসের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদন হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন হয়েছে ১৫.৫২ বিলিয়ন, এক দশক আগেও যার উৎপাদন ছিল ৫.৬৫ বিলিয়ন। ডিমের বার্ষিক চাহিদা ১৭.১৩ বিলিয়ন। চাহিদার বিপরীতে দেড় বিলিয়নের কিছু বেশি ঘাটতি আছে। নয়-দশ বছর আগে বার্ড ফ্লু দুর্যোগে দেশের উদীয়মান পোল্ট্রি শিল্প বিপর্যয়ের মধ্যে না পড়লে হয়তো ডিমের এ ঘাটতি থাকত না। তবে আশার কথা পোলট্রি শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর পথে আছে। দেশে বর্তমানে দুধের চাহিদা ১৫.০৪ মিলিয়ন টনের বিপরীতে ২০১৮ সনে উৎপাদন মাত্র ৯.৪ মিলিয়ন টন। অবশ্য “ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঋধৎস ঈড়সঢ়ধৎরংড়হ ঘবঃড়িৎশ (ওঋঈঘ )” এর ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সনে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ৮.০৮ মিলিয়ন টন। পরিসংখ্যানে দেখা যায় দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যে এখনও অনেক ঘাটতি আছে, তবে এ ঘাটতি পূরণে নানামুখী কর্ম পরিকল্পনা চলছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে দুধের ঘাটতি কমে যাবে।


দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তাসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনেকগুলো সূচকের অভাবনীয় সফলতা সম্ভব হয়েছে সরকারের সঠিক নীতি সহায়তা, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কারণে। বর্তমান দেশে খাদ্যের প্রাচুর্যতা এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটায় সব ধরনের জনগোষ্ঠীর ভোগ চাহিদা বেড়ে গেছে, বেড়েছে পূর্বাপেক্ষা পুষ্টিমান সম্মৃদ্ধ খাবার গ্রহণের পরিমাণ, তাই বেড়েছে জনগণের গড় আয়ু (বিবিএসের তথ্যানুযায়ী ৭২ বছর)। সামগ্রিক অর্থনীতির আশা জাগানিয়া প্রবৃদ্ধি হলেও এখনও আমরা চরমদারিদ্র্য বা দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হতে পারিনি। বিশ্ব খাদ্য দিবসের সেøাগান অনুযায়ী দেশের সব জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর অংশ হতে এখনও পারিনি বটে তবে সেøাগানের আর এক অংশ ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষৎ’ সামনের পথ নির্দেশনা দেয়। বিগত দশকের অভূতপূর্ব উন্নয়নের উদীপ্ত কর্মফলের ধারাবাহিকতা আগামীতে চলমান রাখতে পারলে আমরা আশান্বিত হতেই পারি ২০৩০ সালের এসডিজি গন্তব্যে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত দেশ এবং ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর গর্বিত অংশীদার।

 

কৃষিবিদ মোঃ মনজুরুল হান্নান১কৃষিবিদ মোঃ কুদরত-ই-গনী২
১ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২পরিচালক (অবঃ), ডিএই ও ট্রেনিং ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট এনএটিপি-২, হর্টেক্স ফাউন্ডেশন, সেচ ভবন, মানিক মিয়া, এভিনিউ, ঢাকা, মোবাইল নং ০১৭১১৮১৬৪৫২, Email: qghani57@gmail.com ,

বিস্তারিত
টেকসই নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটিই খাদ্য, আর বাংলদেশের ৯০ ভাগ লোকের প্রধান খাবার ভাত। কোনো দেশের শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় এই খাদ্য নিরাপত্তা দিয়ে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।  আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য বলতে আমরা ধানকেই বুঝে থাকি। ধানকে এ দেশের জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইরির মাসিক মুখপত্র রাইস টুডে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বলতে মূলত ধান বা চালের নিরাপত্তাকেই বোঝায়। অন্য   পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে না পারলেও দু বা তিন বেলা ভাতের সংস্থান প্রায় সবারই সামর্থ্যরে মধ্যে। এটি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন ভাতে কিভাবে শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করা যায়। বাংলাদেশে মাথাপিছু চালের গ্রহণ হার  দৈনিক যে পরিমাণের পুষ্টি আমরা চাল বা ভাত থেকে পাই, তা কোনোভাবেই আমাদের চাহিদার সমান নয়। এ কারণে খাদ্যের চাহিদা মিটলেও পুষ্টির চাহিদাই পূরণে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশে ৫ বছরের কমবয়সি শিশুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছে, এর মধ্যে শতকরা ১৪ ভাগ শিশু ভুগছে মারাত্মক অপুষ্টিতে। এর কারণ পুষ্টি সচেতনতার অভাব অথবা পুষ্টিকর খাবার ক্রয় করার অসামর্থ্যতা।
সরকারের জনবান্ধব কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- সার এবং তেলের দাম কমানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, উন্নত মানের ধানের বীজ সরবরাহ, বিভিন্ন ঘাত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বিগত দশ বছরে (২০০৯-১৮) চালের উৎপাদন ৬.০০ লক্ষ টন হারে বেড়েছে। বিপরীতে প্রতি বছর দেশের মোট জনসংখ্যার সাথে ২০-২২ লক্ষ জনসংখ্যা যোগ হচ্ছে। এই হিসাবে ২০৫০ সালে ২১ কোটি ৫৪ লাখ লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন। এটাই আপাতত টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য। সরকারের ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্রি ইতোমধ্যে জরপব ঠরংরড়হ ২০৫০ প্রণয়ন করেছে যা থেকে দেখা যায় বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা ২১৫ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। রাইস ভিশনে বলা হয়েছে উৎপাদনের বর্তমান গতিশীলতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে যথাক্রমে ৪০, ৪৪ এবং ৪৭ মিলিয়ন টন। বিপরীতে ২০৩০, ২০৪১ এবং ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৮৬, ২০৩ এবং ২১৫ মিলিয়ন লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে যথাক্রমে ৩৮.৫০, ৪২ এবং ৪৪.৬  মিলিয়ন টন। আপাতত সেদিকে লক্ষ্য রেখেই ব্রির গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ঐওঊঝ এর জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু চালের চাহিদা বছরে জনপ্রতি ১৩৪ কেজি যা খাদ্যের বহুমুখিতা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফল। চালকে প্রধান খাদ্যশস্য বিবেচনায় রাখতে হলে আমাদের কমপক্ষে ৬০-৬৫% ক্যালরি চাল থেকে নিতে হবে। তা না হলে ডায়াবেটিক, স্থ‚লতাসহ বিভিন্ন জীবনাচরিত (লাইফ স্টাইল) রোগ বেড়ে যাবে। সে হিসেবে মাথাপিছু চালের গ্রহণ (ঈড়হংঁসঢ়ঃরড়হ) জনপ্রতি ১৩৩ কেজি নিচে আসা উচিত হবে না। অথচ ইদানীং দেখা যাচ্ছে, অনেকে ওজন কমানোর জন্য খাদ্যতালিকা থেকে ভাত বাদ দিয়ে দিচ্ছেন; বিশেষ করে টিনএজ বা অল্প বয়সি ছেলেমেয়েরা। ভাতের পরিবর্তে তারা জাংক বা ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভাতের তুলনায় আরও বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার। ক্যালরির হিসাবে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখা যাবে, ১ কাপ ভাত থেকে ১৫০ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। অন্যদিকে ১ কাপ পোলাও থেকে ৩০০ এবং ১ কাপ বিরিয়ানি থেকে ৫০০ ক্যালরি পাওয়া যায়। একইভাবে রুটির পরিবর্তে পরোটা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, লুচি-পুরি, শর্মা ইত্যাদি বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ওজন বাড়ার পেছনে মূলত পরিমাণে বেশি খাবার খাওয়া, বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং ক্যালরি খরচ না করা অর্থাৎ শারীরিক পরিশ্রম না করা দায়ী। প্রতিদিন যদি কেউ ১০০ ক্যালরি বেশি খাবার খায়, তাহলে তাকে ২০ থেকে ২৫ মিনিট দ্রæত হাঁটতে হবে। এতে শরীরে ক্যালরি জমার ঝুঁকি কম থাকবে।
অনেকেই হালকা-পাতলা গড়নের শরীর গঠন ও বহুমূত্র রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আটার রুটি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আসল কথা হলো ভাত বা রুটি বলে কোনো সমস্যা নাই। মোটা বা চিকন হওয়ার প্রধান কারণ খাওয়ার পরিমাণ। বহুমূত্র রোগীর রক্তের গøুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভাত বা রুটি কোনোটাকেই ভালো বা খারাপ বলার সুযোগ নাই; তবে যেসব শস্যদানা জাতীয় খাদ্য ঝউঝ (ঝষড়ষিু উরমবংঃরনষফ ংঃধৎপয)  বেশি সেসব খাদ্যকে ভালো বলা যায়। যেসব গমের আটার জউঝ (জধঢ়রফষু উরমবংঃরনষব ঝঃধৎপয) বেশি সেসব খাদ্য বহুমূত্র রোগীর জন্য অবশ্যই অনুপযোগী। অন্য কথায় বলতেই হয় যেসব চালের ভাতে ঝউঝ-এর পরিমাণ বেশি সেগুলো বহুমূত্র রোগীদের রক্তের গøুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ উপযোগী। শস্যদানার (ঈবৎবধষ ঈৎড়ঢ়ং) মধ্যে পুষ্টিগুণের বিবেচনায় চালের চেয়ে ভালো গুণাগুণের কোনো খাদ্য আর নাই। ব্রি  এ পর্যন্ত বহুমূত্র রোগীদের উপযোগী তিনটি ধানের জাত অবমুক্ত করছে যেমন- বিআর১৬, ব্রি ধান৪৬ এবং ব্রি ধান৬৯।
অনেকের ধারণা নিয়মিত ভাত খেলে স্থ‚লতা বাড়ে। এটি আসলে সত্যি নয়। বরং আমরা প্রতিনিয়ত বাইরে যেসব স্ট্রিট ফুড বা মুখরোচক খাবার খাই, সেসব খাবারের সঙ্গে ট্রান্সফ্যাট খাচ্ছি এগুলোই ডায়াবেটিক, স্থ‚লতা বা বহুমূত্র এ জাতীয় লাইফস্টাইল রোগের জন্য অনেকখানি দায়ী। এখন আসি- এই ট্রান্স ফ্যাট আসলে কী? এটা এক ধরনের ক্ষতিকারক চর্বি, যা তেলে ভাজা খাবারের মচমচে ভাব বাড়ায় এবং খাদ্য বেশি সময় ধরে সংরক্ষণে ভ‚মিকা রাখে। এ ছাড়া এই চর্বি খাবারের স্বাদ বাড়ায় এবং টেক্সচার ধরে রাখে। এটি আমাদের দেশে ডালডা বা বনস্পতি হিসেবে অধিক পরিচিত; এর আসল নাম হাইড্রোজিনেটেড অয়েল। অতিরিক্ত ভাজা তেলে ট্রান্সফ্যাট পাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
জিংক শরীরের জন্য খুব প্রয়োজনীয় একটি খনিজ উপাদান। এটি মানবদেহে ২০০ এরও বেশি এনজাইমের নিঃসরণে অংশগ্রহণ করে যেগুলো দেহের অনেক বিপাকীয় কাজে এটি অংশ নেয়। এছাড়া দেহে এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শর্করার ভাঙনে, দেহ কোষের বৃদ্ধিতে এবং পলিপেটাইড, গ্যাসটিন নিঃসরণের মাধ্যমেই স্বাদের অনুভ‚তি বা রুচি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। জিংক ডিএনএ ও আরএনএ পলিমারেজ এনজাইমের একটি আবশ্যক উপাদান। কঙ্কালের বৃদ্ধির জন্য কেরোটিন তৈরি ও তার পরিপক্বতা, ক্ষত সারানো, আবরণী কোষের রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজের দ্বারা জিংক ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষা করে থাকে। উঠতি বয়সের   কিশোরকিশোরীদের বেড়ে উঠার ব্যাপারে জিংকের অভাব হলে শিশুকিশোররা বেটে হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এটি বিবেচনায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা জিংকসহ শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে কিভাবে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করা যায় সেটি নিয়ে গবেষণা করছেন। এই গবেষণায় প্রথম সাফল্য হলো ২০১৩ সালে ব্রির বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সর্বপ্রথম জিংক সমৃদ্ধ ধানের জাত ব্রি ধান৬২ উদ্ভাবন। মানুষের শরীরে জিঙ্কের যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তার পুরোটাই মিটাতে পারে এই ব্রি ধান৬২ জাতের চালের ভাতের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ব্রি জিংক সমৃদ্ধ আরো চারটি জাত যেমন- ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২,       ব্রি ধান৭৪ এবং ব্রি ধান৮৪ অবমুক্ত করে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের জিংকের দৈনিক চাহিদা ১৫ মিলিগ্রাম এবং প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর দৈনিক চাহিদা ১২ মিলিগ্রাম। ব্রি উদ্ভাবিত জিংকসমৃদ্ধ জাতে জিংকের পরিমাণ ১৯-২৪ মিলিগ্রাম। সাধারণত লাল মাংস, কাঠবাদাম, চীনাবাদাম, সয়া, দুগ্ধজাত খাবার, মাশরুম, যকৃত এবং সূর্যমুখীর বীজ জিংকের চমৎকার উৎস কিন্তু জিংকসমৃদ্ধ ভাতের ন্যায় এগুলো সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য নয়।
অনুরূপভাবে, প্রোটিন বা আমিষের অভাবে দেহে সুনির্দিষ্ট অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়। শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য পূর্ণ বয়স্কদের ক্ষেত্রে ১ গ্রাম, শিশুদের জন্য ২-৩ গ্রাম আমিষের প্রয়োজন। মাছ, মাংস ও ডাল প্রোটিনের অন্যতম উৎস হলেও এসব খাবার ততটা সহজলভ্য নয় যতটা সহজলভ্য ভাত। ব্রি উদ্ভাবিত প্রোটিনসমৃদ্ধ জাতগুলোতে যে পরিমাণ প্রোটিন রয়েছে তা আমাদের প্রোটিনের চাহিদার ৬০ ভাগ পূরণ করতে সক্ষম। এসডিজির ২নং অভীষ্টকে সামনে রেখে ব্রি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন- আয়রন,             এন্টি-অক্সিডেন্ট, গামা এমাইনো বিউটারিক এসিড (এঅইঅ) ও প্রো-ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ  এবং স্বল্প জিআই ধানসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করে উদ্ভাবনকৃত জাতগুলো অবমুক্তকরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবনে বিশে^র সর্বাধুনিক বায়োফর্টিফিকেশন ও জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
জনগণের ক্রয়ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষ এখন পয়সা খরচ করে ভালো (নিরাপদ) খাবার খেতে চায়। মানুষ স্বভাবত সরু ও চিকন চাল পছন্দ করে তাই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মোটা চালকে মেশিনে ছেঁটে সরু করে বাজারে বিক্রি করে যেটি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। চাল ছেঁটে যাতে চালকে অনিরাপদ করতে না হয় সেজন্য ব্রি ইতোমধ্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন জাত যেমন- ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪ এবং ব্রি ধান৮৬ উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় জাতসমূহ যেমন- বিরই, টেপি বোরো, রাতা বোরো, বালাম, কাটারি ভোগ, কৃষ্ণভোগ, রানীস্যালুট থেকে উফশী জাত উদ্ভাবনের কাজ ব্রিতে গুরুত্বের সাথে চলমান রয়েছে।
আমাদের মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক প্রায়ই বলে থাকেন, খাবার শুধু আধরষধনষব হলেই হবে না সাধারণের কাছে অপপবংংধনষব হতে হবে।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- দুধের উৎপাদন ১০ গুণ বাড়লেও দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কেননা তাদের পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি, প্রোটিন ও মিনারেল আসে ভাত থেকে। ভাত তাদের কাছে সহজলভ্য। সাধারণ মানুষ দুধ-ডিম ও মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারলেও ভাত নিয়মিত খেতে পারছে। তাই ভাতের মাধ্যমে কিভাবে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা।

ড. মো. শাহজাহান কবীর১ মো. আবদুল মোমিন২

১মহাপরিচালক ২ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর, মোবা : ০১৭১৬৫৪০৩৮০, ই-মেইল : Smmomin 80@gmail.com

 

বিস্তারিত
প্রতিদিনের সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পুষ্টি

বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু পুষ্টি নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। পুষ্টিকর খাবারের  মাধ্যমে আমরা এটি অর্জন করতে পারি। এজন্য খাদ্যশস্য আর প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে আমাদের আরো মনোযোগী হতে হবে। পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা স্বাস্থ্যবান জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব। এজন্য প্রথমেই আমরা কী খাচ্ছি এবং সেটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু দরকারি, সে খাবার থেকে কতটুকু পুষ্টি অথবা শক্তি পাব সেটি ভাবতে হবে। কারণ খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি-এই তিনটি শব্দ একটি আরেকটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। দেহের জন্য  প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হলে একজন ব্যক্তির জন্য সুষম খাদ্য নির্বাচন, খাদ্যের সহজলভ্যতা ও পুষ্টিমূল্য বজায় রেখে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির ওপরও পুষ্টি অনেকটাই নির্ভর করে।


খাদ্যের কয়েকটি উপাদান যেমন- শকর্রা, আমিষ, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করাই হলো সুষম খাবার। শর্করা শরীরে শক্তি ও কার্যক্ষমতা জোগায়। চাল, গম, যব, আলু,   মিষ্টিআলু, কচু, চিনি, মধু, গুড় ইত্যাদিতে প্রচুর শর্করা পাওয়া যায়। প্রতি গ্রাম শর্করা থেকে ৪ কিলোক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। প্রোটিন হলো দেহ গঠন ও ক্ষয়পূরণকারী খাদ্য। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন ডাল, বরবটি, শিম, মটরশুঁটি ইত্যাদি দেহ গঠনে সহায়তা করে। প্রতি গ্রাম প্রোটিন থেকে ৪          কিলোক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। চর্বি বা ফ্যাট দেহের কর্মদক্ষতা বজায় রাখে এবং ত্বক সুন্দর ও মসৃণ রাখে। সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, তিলের তেল, ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাছ, মাংস, ডিম ও কলিজা ইত্যাদি চর্বিযুক্ত খাদ্য। প্রতি গ্রাম চর্বি থেকে ৯ কিলোক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। পানি শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গøাস পানি পান করা দরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন ফলের রস, পানিজাতীয় খাবার গ্রহণ করা দরকার। আঁশ দেহের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, অন্ত্রনালির সুস্থতা বজায় রাখে। খাদ্যের আঁশ উদ্ভিজ খাদ্য থেকে পাওয়া যায়। যেমন-লাল আটা, যব, ভুট্টা, যবের ছাতু, শিম, শিমের বিচি, ডাল ও ডালজাত খাদ্য, খোসাসহ ফল যেমন-কালোজাম, আঙুর, পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি ও সব ধরনের    শাকসবজি। খনিজ লবণ যেমন-ফসফরাস, লৌহ, আয়োডিন, জিংক যা দেহ গঠন, ক্ষয়পূরণ, পরিপোষণ, দেহের শরীরবৃত্তীয় কাজ করে। আয়োডিন গলগÐ রোগ প্রতিরোধ করে। লৌহ রক্তস্বল্পতা দূর করে; হাত ও দাঁতের গঠন মজবুত করে। জিংক মানসিক বৃদ্ধি ও হাড়ের  বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
ভিটামিন এ, ডি, ই, কে,    ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন সি সব রকমের সবুজ ও রঙিন শাকসবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, ডিম, দুধ, কলিজা, ছোট মাছ, লেবু চা ইত্যাদি খাদ্যে ভরপুর এবং রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য। ভিটামিন ‘এ’ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘ডি’ রিকেট রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স ত্বকের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘সি’ স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে।
আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে খাদ্য বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দেয়া দরকার। মৌলিক খাদ্যগুলো অর্থাৎ ভাত, রুটি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়ায় খাদ্য বিনিময় ও পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রত্যেক খাদ্য বিভাগ থেকে পরিমিত পরিমাণে খাদ্য গ্রহণকেই প্রাধান্য দেয়া উচিত। পুষ্টিসম্মত খাদ্য গ্রহণের লক্ষ্যগুলো হলো- বাংলাদেশের জনগণের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়ন এবং পুষ্টি উপাদনের অভাবজনিত রোগগুলো প্রতিরোধ করা; গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের যথাযথ পুষ্টিগত অবস্থা বজায় রাখা; শিশুদের সঠিকভাবে মায়ের দুধ ও পরিপূরক খাবার  খাওয়ানো  নিশ্চিত করা; খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ করা; বয়স্কদের সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে আয়ুষ্কাল বাড়ানো। বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশের বেশি শিশু প্রোটিন ও ক্যালরিজনিত পুষ্টিহীনতায় ভোগে, যার মধ্যে খর্বাকৃতি ৩৬ শতাংশ, কৃষকায় ১৪ শতাংশ এবং নিম্ন ওজনে রয়েছে ৩৩ শতাংশ। গড়ে এক চতুর্থাংশ মহিলা দীর্ঘস্থায়ী ক্যালরিজনিত অপুষ্টিতে ভোগে, যাদের অধিকাংশেরই দেহে একই  সঙ্গে জিংক, আয়রন ও আয়োডিনের স্বল্পতা রয়েছে। এসব আমাদের সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে।
আদর্শ খাদ্য গ্রহণের জন্য...
জনগণের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য খাদ্য গ্রহণের ১০টি নির্দেশাবলি এবং পুষ্টিবার্তা আছে। যা সাধারণ জনগণের জন্য সহজবোধ্য। এটি পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে  সময়োপযোগী ধারণার প্রেরণা জোগাবে। এর মাধ্যমে জনগণ কোন খাদ্য কী পরিমাণ গ্রহণ করবে, প্রতিদিন কী পরিমাণ তেল, লবণ, চিনি ও পানি গ্রহণ করবে সেই সম্পর্কে     বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা পাওয়া যাবে। এতে বিভিন্ন খাদ্যের সুফল ও কুফল সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়া  হয়েছে। নির্দেশাবলিতে নিরাপদ খাদ্য ও রান্না সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা  দেয়া হয়েছে, যা প্রয়োগ করলে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের অপচয় রোধ হবে এবং  সুস্বাস্থ্য বজায় থাকবে। প্রতিদিন সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ; পরিমিত পরিমাণে তেল ও চর্বিজাতীয় খাদ্য গ্রহণ; প্রতিদিন সীমিত পরিমাণে আয়োডিনযুক্ত লবণ গ্রহণ; মিষ্টিজাতীয় খাদ্য সীমিত পরিমাণ গ্রহণ; প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে  নিরাপদ পানি ও পানীয় পান; নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ; সুষম খাদ্য গ্রহণের  পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে আদর্শ ওজন বজায় রাখা; সঠিক পদ্ধতিতে রান্না, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সুস্থ জীবনযাপনে নিজেকে অভ্যস্তকরণ; গর্ভাবস্থায় এবং স্তন্যদানকালে চাহিদা অনুযায়ী বাড়তি খাদ্য গ্রহণ; শিশুকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ দেয়া এবং ৬ মাস পর বাড়তি খাদ্য প্রদান।
প্রতিদিনের সুষম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পুষ্টি...
প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী ভাত, রুটি বা অন্যান্য শস্যজাতীয় খাদ্য গ্রহণ; ভাত ও রুটির সঙ্গে ডাল-মাছ-মাংস-ডিমজাতীয় খাবারের সমন্বয়ে তৈরি খাদ্য গ্রহণ; চাল অতিমাত্রায় না ধুয়ে বসাভাত রান্না ও গ্রহণ; লাল চাল ও লাল আটা হলো প্রোটিন, আঁশ, তেল, খনিজ লবণ ও ভিটামিনের উৎস সেজন্য পারত পক্ষে এগুলো বেশি করে গ্রহণ। প্রতিদিন মাঝারি আকারের ১-৪ টুকরা মাছ-মাংস এবং ১ থেকে ১/২ কাপ ডাল (৩০-৬০ গ্রাম) গ্রহণ; প্রাণিজ প্রোটিনের অনুপস্থিতিতে ভাত ও ডাল অথবা মুড়ি ও ছোলার ওজনের আদর্শ অনুপাত ৩:১ বজায় রাখা; প্রতিদিন কমপক্ষে ২টি মৌসুমি ফল (১০০ গ্রাম) গ্রহণ করা। ১টি চাপা কলা, ১টি আমড়া এসব খাওয়া; খাদ্য গ্রহণের পর আয়রনের পরিশোষণ বাড়ানোর জন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল যেমন- আমলকী, পেয়ারা, জাম্বুরা, পাকা আম খাওয়া; প্রতিদিন অন্তত ১০০ গ্রাম বা  ১ আঁটি শাক এবং ২০০ গ্রাম বা ২ কাপ সবজি গ্রহণ; সুস্থতার জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ১ কাপ (১৫০ মিলিলিটার) দুধ বা আধা কাপ দই গ্রহণ; বৃদ্ধকালে ননিতোলা দুধ এবং সয়াদুধ গ্রহণ করুন।
তেল ও চর্বিজাতীয় পুষ্টিবার্তা : প্রতিদিন প্রাপ্ত বয়স্ক জনপ্রতি গড়ে ৩০-৪৫ মিলিলিটার বা ২-৩ টেবিল চামচ তেল গ্রহণ; রান্নায় প্রধানত উদ্ভিজ তেল  যেমন- সরিষা, সয়াবিন, রাইসব্রান তেল ব্যবহার; ঘি, ডালডা ও মাখন যথাসম্ভব কম ব্যবহার; অতিরিক্ত ভাজা এবং তৈলাক্ত খাবার বর্জন; নিয়মিত উচ্চ চর্বিযুক্ত বেকারির খাদ্য কেক, পেস্ট্রি, ফাস্টফুড, হটডগ, বার্গার, উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাদ্য পরোটা, কাচ্চি, বিরিয়ানি, পোলাও, কোরমা, রেজালা, প্রক্রিয়াজাত মাংস, গ্রিল চিকেন এসব পরিহার করা। এ খাবারগুলোতে ট্রান্সফ্যাট থাকে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; বাজারের সনদবিহীন খোলা তেল গ্রহণ থেকে বিরত থাকা আবশ্যকীয়।
আয়োডিন ও মিষ্টিজাতীয় খাদ্যের পুষ্টিবার্তা : প্রতিদিন ১ চা চামচের কম পরিমাণ আয়োডিনযুক্ত লবণ গ্রহণ; খাবারের সময় বাড়তি লবণ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা; উচ্চমাত্রার লবণাক্ত খাদ্য বাদ দেয়া বা সীমিত পরিমাণে গ্রহণ; টেস্টিং সল্ট গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। দৈনিক ২৫ গ্রাম বা ৫ চা চামচ এর কম পরিমাণে চিনি গ্রহণ করা; মিষ্টি কোমল পানীয় বর্জন করা;  বেকারির তৈরি খাবার বিস্কুট, কেক, জ্যাম জেলি, চকলেট, ক্যান্ডি, মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাদ্য সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা; বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল খেয়ে প্রাকৃতিক চিনি গ্রহণকে     উৎসাহিত করা। আর পানি গ্রহণ সংক্রান্ত পুষ্টিবার্তা হলো- প্রতিদিন ১.৫-৩.৫ লিটার অর্থাৎ ৬-১৪ গøাস বিশুদ্ধ পানি পান করা; কোমল পানীয় এবং কৃত্রিম জুসের পরিবর্তে ডাবের পানি অথবা টাটকা ফলের রস পান করা বেশি পুষ্টিসম্মত।
আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর জন্য জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই যথেষ্ট এবং ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিতে হবে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। শিশু মৃত্যুর কারণ হিসেবে পেটের অসুখ, হাম, নিউমোনিয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি না ঘটার কারণে আত্মকেন্দ্রিকতা, অবসাদ, ব্যক্তিত্বহীনতা দেখা যায় এবং মেধাশক্তি বিকশিত হতে পারে না। ফলে এসব ছেলেমেয়ে অলস ও উদাসীন, পরনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে।

জি এম আবদুর রউফ
উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ঝিনাইদহ, ফোন : ০৪৫১৬২৪৯৮ ddaejhenidah@gmail.com

 

বিস্তারিত
পাটজাত ফসল ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শক্তি

বাংলাদেশে উৎপাদিত অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাটের স্থান শীর্ষে। পাটের ব্যবহারিক উপযোগিতা, অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিবেচনা করে পাটকে ‘সোনালী আঁশ’ বলে অভিহিত করা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয় এবং প্রায় ১৬ লক্ষ টন (৬৫-৭০ লক্ষ বেল) পাট আঁশ উৎপন্ন হয়। পাট মৌসুমে বাংলাদেশে দেশি ও তোষা উভয় জাতের পাটের পাতাই সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পাট ফসলের  বীজ বপনের পর ২০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ২ অথবা ৩ বার গাছ পাতলাকরণের মাধ্যমে সাধারণত এই কচি পাটপাতা সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন  প্রয়োজনীয় কারণেই পাটের গাছের সংখ্যার চেয়ে জমিতে অতিরিক্ত বীজ বপন করা হয়। প্রায় ৫ থেকে ১০ লক্ষ কচি পাট গাছ এইভাবে পাট ফসলের জমি থেকে পাতলাকরণের মধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়। এইভাবে ১ হাজার থেকে ২ হাজার কেজি সবুজ পাতা যাহা ২০০ থেকে ৪০০ কেজি শুকনা পাতার সমপরিমাণ হয়। হেক্টরপ্রতি পাটশাকের ফলন প্রায় ৩.০-৩.৫ টন হয়ে থাকে। এই ভাবে সংগ্রহীত পাটপাতা সারা দেশে সবজি হিসেবে এবং কোন কোন স্থানে অতিরিক্ত হলে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ হিসেবে পাটপাতার ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে। পাটের পাতার রস রক্তপিত্তনাশক, বাতনিরোধক, ক্ষুধাবৃদ্ধিকারক, আমাশয়, উদরাময় ও অম্লরোগের মহৌষধ। শুকনা পাতা ভেজে সবজি হিসেবে ভাতের সাথে খেলে অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কাঁচা পাতা শাক হিসেবে বহুল ব্যবহৃত একটি ভেষজ। আজও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেটের  পাহাড়ি অঞ্চলে এবং মিসর, আরব, প্যালেস্টাইনে পাটপাতাকে বাগান সবজি হিসেবেই চাষ করা হয়। গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে পাটপাতার ব্যবহার এত হরেক রকম যে, তা বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু এ কথা স্পষ্টই প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রাচীনকালে সবজি ও ওষুধ হিসেবেই প্রথম পাটের ব্যবহার শুরু হয়েছিল।   


মেস্তা মূলত উষ্ণম-লীয় দেশে চাষ হয়। পাটের তুলনায় অনুর্বর মাটিতেও মেস্তা বেশ ভালোভাবেই জন্মানো যায়। অন্যান্য মৃত্তিকা  এবং জলবায়ুগত চাহিদা মোটামুটি পাটের অনুরূপ। প্রায় তিন শতাব্দী পূর্ব থেকেই মেস্তা এশিয়াতে চাষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই মেস্তার চাষ হয়ে আসছে। ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও যশোহর জেলার উঁচু জমিতে বেশ সফলতার সাথে আবাদ করা যায়। অন্যান্য জেলার উঁচু জমিতেও মেস্তা আবাদ করা সম্ভব। মেস্তার পাতা আঙুলাকৃতি (খ-িত), গাঢ় সবুজ। পাতা মসৃণ এবং স¦াদ টক ও সুস¦াদু। পাতার কিনারা ঢেউ খেলানো এবং পরিণত বয়সে তামাটে লাল হয়ে থাকে। ফুলের রঙ হলুদ, তবে ভেতরের মাঝখানে গাঢ় খয়েরি। ফুল আসতে ১৩০ থেকে ১৪০ দিন সময় লাগে, পাতা ও বৃতি সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। ফল ক্যাপসুল আকৃতির উপরের দিকে চোখা এবং  রোমযুক্ত। একটি গাছে ৪০-৬০টি ফল হয়। বৃতির ফলন ২.০০-২.৫ টন/হেক্টর। বীজ ধূসর রঙের কিডনি আকারের। মাঠে  ফসল হিসেবে চাষের পরিমাণ অনেক কম তবে বাড়ির আঙিনায় সবজি হিসেবে চাষ করা হয়ে থাকে।    
পাটশাকের পুষ্টিগুণ   
পাটের পাতার পুষ্টিগুণ খুবই অবাক হওয়ার মতো। তবে সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ার ফলে এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। বাজারে বহু শাক পাওয়া যায়। যেমন- পুঁইশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক, কচুশাক, মুলাশাক ইত্যাদি। এসব শাকের মধ্যে পালংশাক আমাদের কাছে বহুল পরিচিত,  পুষ্টিকর, মূল্যবান ও প্রিয় শাক। এই পালং শাকের সাথে পাট শাকের পুষ্টিমানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে পাটশাকে  পুষ্টিমানের গুরুত্বের বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সারণি-১ এর মাধ্যমে তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে এটা খুবই স্পষ্ট যে পাটশাকের পুষ্টিমান খুবই উন্নত। অন্যান্য শাকের তুলনায় পাটপাতায় প্রচুর পরিমাণে শক্তি, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ক্যারোটিন ও ভিটামিন-সি বিদ্যমান। অতএব ওষুধ হিসেবে দাঁত ও পেটের নানাবিধ সমস্যায় বা সবজি হিসেবে পুষ্টিহীনতায় এবং রক্ত পরিষ্কারক হিসেবে পাটপাতার ব্যবহারের গুরুত্ব অপরিসীম।
পাটশাকের ঔষধি গুণ
চিকিৎসা শাস্ত্র গ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’ এ পাটের ঔষধি গুণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, পাটশাক রক্তপিত্ত বিনাশকারী, প্রস্রাবের কষ্টজনিত রোগ উপশমকারী এবং বাতের প্রকোপ হ্রাসকারী। কবিরাজি চিকিৎসা শাস্ত্র মতে, তিতা পাট অর্থাৎ দেশী পাটের পাতার রস আমাশয়, জ্বর ও অম্লবিনাশে অমোঘ ওষুধ। ইহা ক্ষুধা ও হজম বৃদ্ধি করে এবং কোষ্ট পরিষ্কারক হিসেবে খুবই উপযোগী। আবার মিঠা বা তোষা পাটের পাতার রস ও হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে খেলে জটিল রক্ত আমাশয় নিরাময় হয়। মিঠা পাটের পাতা ভিজিয়ে পানি খেলে প্রস্রাব বৃদ্ধি, মূত্রাশয়ের জ্বালাপোড়া দূর হয় এবং শরীরের বল বা শক্তি বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পাটের পাতার বহুল ব্যবহার প্রচলিত আছে। পাট সাধারণত বর্ষা মৌসুমের ফসল, তখন বেশির ভাগ এলাকায় পাটশাক সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যদি অন্য মৌসুমে পাতার প্রয়োজন হয়, তবে পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে সযতেœ সংরক্ষণ করা যেতে পারে।       
মেস্তাশাক ও চুকুরের পুষ্টিগুণ   
মেস্তার পাতা ও ফলের মাংসল বৃতি (শাঁস) টক ও সুস¦াদু। রান্না করে খাওয়া যায়। এর মাংসল বৃত্তি থেকে জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চা জাতীয় পানীয় ইত্যাদি তৈরি করা হয়ে থাকে। এর ফলকে জনপ্রিয় নাম হিসেবে চুকুর বলা হয়। এই চুকুরের পাতা ও  ফলে প্রচুর পরিমাণ প্রেটিন, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি ও  অন্যান্য খাদ্য উপাদান পাওয়া যায়। এক হেক্টর জমি থেকে ৭৭৮৯ কেজি সবুজ পাতা এবং  ২০০০-২০৫৫ কেজি প্রায় বৃতি উৎপন্ন হয়। মেস্তার খৈল গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বীজ থেকে প্রায় ২০% খাদ্য উপযোগী তেল পাওয়া যায়। এই তেলে ১৫.৮% পালমিটিক এসিড, ৬.৮% স্টিয়ারিক এসিড, ৫১% অলিক  এসিড ও ২৬.৮%  সিনোলিক এসিড থাকে। ফলে পৃথিবীর বহু দেশে সাবান তৈরিতে এবং পরিশোধিত তেল খাবার তেলে মিশাতে  ব্যবহৃত হয়।            
পাটশাক, মেস্তাশাক ও মেস্তাফলের (চুকুর) ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের বড় চাষিরা পাটের মৌসুমে জামিতে আন্তঃপরিচর্যার জন্য শত শত শ্রমিক নিয়োগ করে। এই বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের সকাল বা দুপুরের খাবার দেয়া হয় ভাতের সাথে পাট বা মেস্তাশাক, ডাল, মরিচ এবং কখনো কখনো অন্য কোন একটি তরকারি। এ ক্ষেত্রেও প্রচুর পরিমাণে পাটশাক সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শহর অঞ্চলের বড় বড় কাঁচাবাজারগুলোতে পাটের শাক প্রায় বছরের সব সময়ই পাওয়া যায় এবং বহুলভাবে কেনাবেচা হয়। একটি প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে ৩২০ সেঃ তাপমাত্রায় ৮ ঘণ্টা ইলেকট্রিক্যাল ওভেনে পাটের পাতা শুকানোর ব্যবস্থা  করলে পাতার রঙ নষ্ট না হয়ে সবুজ থাকে। এই অবস্থায় পাতায় পানির পরিমাণ থাকে প্রায় শতকরা ৮ ভাগ। এই ধরনের শুকনা পাতা ১৬ ম্যাস ছাঁকনির পরিমাপে পাউডার করা সম্ভব। তবে সাধারণভাবে পাটপাতা ঘরের তাপমাত্রায় ছায়ার মধ্যে শুকানোর ব্যবস্থা করলেও এর সবুজ রঙ অটুট থাকে। বাংলাদেশে ভাত হলো আমাদের প্রধান খাদ্য, সেখানে পাট পাতা শাক হিসেবে, সুপ হিসেবে, ভেজিটেবল চপ এবং ভাজা পাতা হিসেবে খাওয়ার প্রচলন তৈরি করা খুবই সহজ এবং গুরুত্বপূর্ণ। পাট ও মেস্তা গ্রীষ্মের ফসল, তবে বছরের যে কোনো সময় সবজি হিসেবে পাট ও মেস্তা পাতার উৎপাদন করা সম্ভব। তা ছাড়া যে কোনো সময়ে উৎপাদিত পাতা শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে বছরের যে কোনো সময় চাহিদা মতো ব্যবহার করা চলে।  
উপরোক্ত বিষয়গুলো অনুধাবন করে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে জাপান, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকায় পাটশাক ও মেস্তার ফল চুকুরকে সহজেই অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তা ছাড়া বাংলাদেশে পুষ্টিহীনতার সমস্যা ব্যাপক। এ ক্ষেত্রে পাটশাক, মেস্তাশাক ও মেস্তাফলের ব্যবহার আরো  জনপ্রিয় করে তোলা গেলে সমস্যার কিছুটা হলেও সহজেই সমাধান করা সম্ভব। একটি প্রবন্ধে উল্লেখ পাওয়া যায় ‘সেই রমনী ভাগ্যবতী, যিনি প্রত্যহ স্বামীকে গরম ভাতের সাথে ঘি, মাছের ঝোল ও পাটশাক সহযোগে আহার্য পরিবেশন করেন। এ যুগের রমনীদের বেলায় এ কথা কতটুকু পালনীয় সেদিকে দৃষ্টি না দিলেও, এ কথা বিশ্বাস অবশ্যই করতে হবে যে, প্রাচীন বাংলায় পাটশাকের জনপ্রিয়তা ও আভিজাত্যের উপস্থিতি ছিল। পাটশাক, মেস্তাশাক ও চুকুরফল ব্যাপক পুষ্টিগুণ ও বিভিন্ন ঔষধিগুণে গুণান্বিত। এসবের পুষ্টিগুণ, সুস্বাদুতা ও ঔষধিগুণের বিষয়াদি নিয়ে যথাযথ বিচার বিশ্লেষণ ও ব্যাপক প্রচারণা করা গেলে, পাটশাক, মেস্তাশাক ও চুকুর ফল পুনরায় তার প্রাচীন গৌরবে অভিজাত খাদ্য তালিকায় ফিরে আসতে পারবে এবং ভবিষ্যৎ পুষ্টি ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

 

কৃষিবিদ ড. মো: মাহবুবুল ইসলাম

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ঢাকা-১২০৭,  মোবা : ০১৫৫২৪১৬৫৩৭, ই- মেইল : mabbub_agronomy@yahoo.com

 

 

বিস্তারিত
কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তায় তুলা চাষের ভূমিকা

পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার টেকসই উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোপান ‘খাদ্য নিরাপত্তা’। ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিশে^ আজ আলোচনার বিষয়। খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে ফুটে উঠে দুইটি মূল ধারণা, যার একটি ‘খাদ্যের সহজলভ্যতা’ ও অপরটি হলো ‘খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা’। একটি দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা তখনই শতভাগ নিশ্চিত হবে যখন দেশটিতে তার জনগণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য বিদ্যমান থাকবে এবং জনগণের খাদ্য ক্রয় করার সামর্থ্য থাকবে। ‘পুষ্টিসম্মত  নিরাপদ খাদ্যের সহজলভ্যতা ও এর ক্রয়ক্ষমতা’ অংশটুকু ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা শীর্ষক ধারণাটিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তা শত ভাগ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কৃষি ব্যবস্থা উন্নয়নের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। দেশের অধিকাংশ জনগণ গ্রামে বসবাস করে যার অধিকাংশ প্রত্যক্ষভাবে কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবদি কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশে^র কাছে আদর্শস্বরূপ। সাম্প্রতিক সময়ে দানাদার শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনও বেড়েছে লক্ষণীয় হারে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কৃষকের আয়। কিন্তু কৃষকের এই বর্ধিত আয় বাজারে খাদ্যের মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। চাহিদার অতিরিক্ত পরিমাণ খাদ্য শস্য উৎপাদনের কারণে প্রতি বছর কৃষকরা এ সমস্যায় পড়ছে। তাই খাদ্য শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থকরী ফসল (তুলা, চা, পাট ইত্যাদি) উৎপাদন কৃষকদের এই ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে লাভের মুখ দেখাতে পারে।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল তুলা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প স¤পূর্ণভাবে এই তুলার ওপর নির্ভরশীল যার বেশির ভাগ অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা আমদানিকারক দেশ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের দেশে প্রায় ৮১ লাখ বেলতুলা আমদানি করা হয়েছে যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪০,০০০ কোটি টাকা। তুলা একটি আঁশজাতীয় ফসল এবং এর বীজ থেকে উপজাত হিসেবে ভোজ্যতেল ও খৈল পাওয়া যায়। তুলা বীজ থেকে ১৫-১৭% ভোজ্যতেল ও ৮০% উন্নতমানের খৈল পাওয়া যায়। দেশে বেসরকারি উদ্যোগে ১৮টি জিনিং শিল্পে প্রায় ১০০টি জিনিং মেশিন ও তুলার বীজ থেকে তেল আহরণের জন্য ১৫-২০টি    ঊীঢ়বষষবৎ মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। অপরিশোধিত তেলকে পরিশোধনের মাধ্যমে ভোজ্যতেলে পরিণত করার জন্য কুষ্টিয়ায় বেসরকারি উদ্যোগে একটি রিফাইনারি স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মে.টন ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। তুলার খৈল মাছ ও গবাদি পশুর উৎকৃষ্ট মানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তুলা ফসল উৎপাদনের পর তুলা গাছ জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কৃষক শুকনা তুলা গাছ জ¦ালানি হিসেবে ব্যবহার করে অর্থের সাশ্রয় করে অথবা তুলা গাছ জ¦ালানি হিসেবে বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। তুলার বীজ বপন থেকে শুরু করে বীজ তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জিনিং পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া যে জমিতে তুলা চাষ করা হয় সে জমিতে তুলার পাতা পড়ে জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায় ফলে তুলা পরবর্তী ফসলের উৎপাদন খরচ কম হয় এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়। কৃষক ১ হেক্টর তুলা চাষে ৭৫-৯০ হাজার টাকা খরচ করে ৩.৫-৪.৫ টন বীজ তুলা পায় যার বাজার মূল্য       ২.২৫-২.৬২ লক্ষ টাকা। ফলে কৃষক ১ হেক্টর তুলা চাষ করে ১.৫-১.৯ লক্ষ টাকা (বিঘাপ্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা) লাভ পায়। কৃষক ওই টাকা দিয়ে খুব সহজে খাদ্য ক্রয় করে পরিবারের সুষম খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। অন্যান্য ফসলের তুলনায় তুলা ফসলে ঝুঁকি কম। তুলা মধ্যম মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল ফসল। তুলা হালকা কাষ্ঠল (ঝযৎঁন) জাতীয় উদ্ভিদ বিধায় সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে তুলা ফসল তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না যেখানে অন্যান্য ফসল বিশেষ করে সবজি জাতীয় ফসল নষ্ট হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে তুলা ফসলের টিকে থাকার নিশ্চয়তা বেশি। তুলা মধ্যম মাত্রার খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসল। প্রতিকূল পরিবেশে তুলা চাষ বেশ লাভজনক, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নি¤েœ তুলে ধরা হলোÑ
(ক) খরাপ্রবণ অঞ্চলে তুলা চাষ
বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলটি খরাপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। এই উঁচু বরেন্দ্র ভূমি রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত যা তুলা চাষের জন্য উপযুক্ত। বরেন্দ্র ভূমিতে মোট ৫.৮২ লাখ হে. আবাদ যোগ্য জমির ৮৪% এক ফসলি, ওই অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা মাত্র ১১৭%। অতিরিক্ত খরার জন্য খাদ্য শস্য উৎপাদন তেমন একটা লাভজনক হয় না। কিন্তু তুলা খরাসহিষ্ণু হওয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাতও সম্পূরক সেচে ওই অঞ্চলে তুলা চাষ করার মাধ্যমে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
(খ) পাহাড়ি অঞ্চলে তুলা চাষ
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় জুম পদ্ধতিতে তুলা চাষ হয়ে থাকে। জুম পদ্ধতিতে তুলার ফলন কম হয় ফলে কৃষকদের লাভের পরিমাণ কম হয়। বর্তমানে তুলা উন্নয়ন বোর্ড বিগত কয়েক বছর গবেষণার মাধ্যমে পাহাড়ের ঢালে আন্তঃফসল পদ্ধতিতে দুই সারি ধান ও এক সারি আপল্যান্ডজাতের তুলা চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে যার মাধ্যমে ওই এলাকার চাষিরা ধান ও তুলা উভয়ের অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হচ্ছে।
(গ) লবণাক্ত এলাকায় তুলা চাষ
বাংলাদেশের আবাদি জমির একটি বিরাট অংশ দখল করে আছে উপকূলীয় এলাকা (২৮.৫ লক্ষ হে.)  যা দেশের সমগ্র আয়তনের ২০%। উপকূলীয় এলাকার মাটি লবণাক্ত হওয়ার কারণে সব ধরনের খাদ্য শস্য খুব একটা ভালো হয় না। তুলা মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসল হওয়ায় আমন ধান কাটার পর পতিত জসিতে রবি মৌসুমে তুলা চাষের গবেষণাও  সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে।
(ঘ) চরাঞ্চলে তুলা চাষ
বাংলাদেশের নদ-নদীর অববাহিকায় জেগে ওঠা চরাঞ্চলের মাটি বেলে প্রকৃতির হওয়ায় এর উর্বরতা ও পানি ধারণক্ষমতা কম। এই কারণে চরাঞ্চলগুলোতে কৃষকরা খাদ্য শস্য চাষাবাদ করে তেমন লাভবান হয় না। তুলা গভীর মূলী ফসল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে তুলা চাষ করা হচ্ছে। তাছাড়া চরাঞ্চলে তুলা চাষের ফলে জমিতে তুলার পাতা যোগ হয়ে মাটিতে জৈব পর্দাথের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চরাঞ্চলে তুলা চাষ হতে পারে কৃষকদের অধিক আয়ের একটি সম্ভাবনাময় ফসল।
(ঙ) কৃষি বনায়ন জমিতে তুলা চাষ
বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় আম, পেঁপে এবং লিচু বাগানের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে (বর্তমানে প্রায় ৭০০০০ হে. জমি ফলজ ও বনজ বাগানের আওতাভুক্ত)। এসব ফলজ বা বনজ জমিতে গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে ২-৩ বছর সফলভাবে তুলা চাষ করার লক্ষ্যে তুলা উন্নয়ন বোর্ড বিগত কয়েক বছর ধরে নব্য সৃজনকৃত বাগানে তুলা চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে কৃষকরা তাদের ফলজ ও বনজ বাগানে তুলা চাষ করে অধিক লাভবান হতে পারবে।
তাই যেসব প্রতিকূলতার কারণে অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয় সেখানে খুব সহজে তুলা চাষ করে কৃষক লাভবান হয় এবং খাদ্য ক্রয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকের অধিক আয় নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা   নিশ্চিতকরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে তুলা একটি সম্ভাবনাময় ফসল।

 

ড. মোঃ ফরিদ উদ্দিন

নির্বাহী পরিচালক, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবা : ৫৫০২৮৩৫৫, ই-মেইল : mfaridcdb@gmil.com

 

 

বিস্তারিত
ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রাণিসম্পদ বিভাগ

বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০১৯ এর প্রতিপাদ্য ‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ, পুষ্টিকর খাদ্যেই হবে আকাক্সিক্ষত ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’। খাদ্য নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত পুষ্টি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের রূপকল্প হচ্ছে প্রাণিসম্পদের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মূল্যসংযোজনের মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত  ও মানসম্মত প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করা। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে ঘোষিত ‘ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার’ অর্জনে টেকসই প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। ডড়ৎষফ ঋড়ড়ফ চৎড়মৎধস (ডঋচ) এর প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এরই মধ্যে যথেষ্ট উন্নতি করলেও, অনিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এখনও অধিক সংখ্যক মানুষ, যাতে নারী ও শিশুর সংখ্যা অত্যাধিক। শিশুদের এক- তৃতীয়াংশ ক্ষীণস্বাস্থ্য ও    পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। তাছাড়া, আর্থসামাজিক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রণীত রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়ন করতে সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। উল্লেখ্য যে, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য নিরসনে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার প্রায় ২০% প্রত্যক্ষ  এবং ৪৫% পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধিসহ সংরক্ষণ, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জাত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ গবাদিপশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা বিগত কয়েক বছর ধরে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত গবাদিপশু দ্বারা কোরবানির চাহিদা পূরণ হয়েছে। তা ছাড়া, বিগত এক দশকে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ৩.১৯ গুণ, ৫.০ গুণ এবং ২.০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশব্যাপী  বিভিন্ন  কর্মপরিকল্পনার  বাস্তবায়ন  করে  যাচ্ছে।
খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ যদিও অনেক দূর এগিয়েছে কিন্তু নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিনির্মাণে কিছু প্রতিবন্ধকতা আমাদের এখনও অতিক্রম করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা  এবং সবার জন্য কর্ম নিশ্চিত করতে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে সামনে অগ্রসর করা এবং সামগ্রিক     কৃষি ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক (যেমনÑ শস্য বহুমুখীকরণ, মূল্য সংযোজিত প্রাণিজাত খাদ্য উৎপাদন ইত্যাদি) উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। ক্ষুধা দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তাসহ উন্নত সহজলভ্য পুষ্টির জোগান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্য-২ বাস্তবায়ন    কৃষিখাতের ওপর অর্পিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকিঁতে কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রাণিজ আমিষের পর্যাপ্ত জোগান আমাদের আশাবাদী করছে। আগামীতে মানুষের কর্মস্পৃহা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের উন্নয়ন তথা নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে প্রাণিসম্পদ খাত নির্ভরযোগ্য ভূমিকা ও অবদান রাখতে সক্ষম।
মানবসভ্যতা বিকাশের প্রতিটি স্তরে প্রাণিসম্পদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কৃষি কাজ শুরুর পূর্বে পশু শিকারই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন হলেও, সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে পশুকে কর্ষণ, পরিবহন ও খাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে লাগানো হয়েছে। ৭০ এর দশকে পারিবারিক আমিষের চাহিদা পূরণ, জমি কর্ষণ ও পরিবহন শক্তিই ছিল পশু-পাখির পালনের প্রধান উদ্দেশ্য। ৮০ এর দশক থেকে এই খাতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে সূচিত হয়েছে উৎপাদনশীল পশু-পাখির বাণিজ্যিক পালন পদ্ধতি। ফলে, সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাত শিল্পখাতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গার্মেন্টের পর পোলট্রি শিল্প এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান খাত, যেখানে প্রায় ৭০ লক্ষের অধিক মানুষ সরাসরি কর্মরত।
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ একটি     সম্ভাবনাময় ও লাভজনক শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিবছর গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিজাত উৎপাদন বেড়ে চলছে। স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১০ লক্ষ মেট্রিক টন, ৫ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ১৫০ কোটি, যা বর্তমানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৯৯.২৩ লক্ষ মেট্রিক টন, ৭৫.১৪ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ১৭১১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। উক্ত পরিসংখ্যানই বলে দেয়, পুষ্টিসমৃদ্ধ এসব খাদ্য উপাদানসমূহ অর্থাৎ দুধ, মাংস ও ডিমের প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে দুধ, মাংস ও ডিমের প্রাপ্যতা যথাক্রমে ১৬৫.০৭ মিলি/জন/দিন, ১২৪.৯৯ গ্রাম/জন/ দিন এবং ১০৩.৮টি/জন/বছর ।
সম্প্রীতি বিশ^ ব্যাংকের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে বাংলাদেশ নি¤œ আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। তাই পর্যায়ক্রমে উন্নত দেশের তালিকায় উন্নীত হতে গেলে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় প্রাণিজ আমিষের আধিক্য বাড়াতে হবে। কারণ উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সবার আগে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ।
দুধ, মাংস ও ডিমের প্রাপ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। দুগ্ধজাতীয় পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্কুল ফিডিংয়ের মাধ্যমে দুধ পানের অভ্যাস জনপ্রিয়তা লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রতি বছর প্রাণিসম্পদ সেবা সপ্তাহ পালন করে থাকে। প্রতি বছর ০১ জুন ‘দুধ পানের অভ্যাস গড়ি, পুষ্টি চাহিদা পূরণ করি’ প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে বিশ^ দুগ্ধ দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশকে দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে গাভী ক্রয় করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ডিমকে বিশে^ একটি উন্নতমানের ও সহজলভ্য আমিষ জাতীয় খাদ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ইন্টারন্যাশনাল ঊমম ঈড়সসরংংরড়হ প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ^ ডিম দিবস পালন করে আসছে। ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশেও দিনটি পালন করা হয়ে থাকে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক, যুব মহিলা, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষককে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে সম্পৃক্ত করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণে ও ভাগ্য পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিগত দশকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রায় ৯১ লক্ষ বেকার যুবক, যুব-মহিলা, দুস্থ মহিলা, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষককে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মাঠ পর্যায়ে ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষকদেরকে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি লালন-পালনের ওপর প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে প্রাণী চিকিৎসক কর্তৃক সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। দারিদ্র্যবিমোচন ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক নি¤œবর্ণিত প্রযুক্তির সম্প্রসারণ হয়েছেঃ
ি স্বাস্থ্যসম্মত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ;
ি ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য বাণিজ্যিক লেয়ার ও বয়লার পালন মডেল;
ি স্ল্যাট/স্লট পদ্ধতিতে ছাগল পালন বাংলাদেশের সাধারণত উন্মুক্ত অবস্থায় ছাগল পালন করা;
ি গ্রামীণ পরিবেশে হাঁস পালন পদ্ধতি;
ি পারিবারিক পর্যায়ে কোয়েল/টার্কি/খরগোশ পালন প্রযুক্তি;
ি বায়োগ্যাস প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিরাপদ জ¦ালানি এবং জৈবসার উৎপাদন;
ি কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে প্রাণিসম্পদ হতে উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে;
ি প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে দেশের আবহাওয়া উপযোগী সংকর জাতের বীফ ব্রিড উন্নয়নের লক্ষ্যে আমেরিকা থেকে ১০০% ব্রাহমা জাতের সিমেন আমদানি করে দেশি জাতের গাভীর সাথে প্রজনন করে মাংসল জাতের গরুর উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে;
ি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য মোট ১৭ প্রকারের টিকা উৎপাদন, বিতরণ ও প্রয়োগ।        ই-প্রাণিসম্পদ সেবা, প্রাণিসম্পদ সহায়ক মোবাইল তা ইত্যাদি ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় সেবা প্রদান;
প্রাণিবর্জ্য, পশু জবাইজাত উপকরণ, ওষুধ উৎপাদন ও ব্যবহার, পরস্পর সংক্রমণযোগ্য (জুনোটিক) রোগ দমন, আবির্ভূত ও পুনঃরাবির্ভূত রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রাণিসম্পদ খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। ফলশ্রুতিতে সরকারের রূপকল্প অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্যে নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা  বিনির্মাণে প্রাণিসম্পদ সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

ডাঃ হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক ১ ফয়সাল মেহেদী হাসান ২

১মহাপরিচালক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা, ২উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ অর্থনীতি শাখা, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঢাকা, মোবা : ০১৭১৩৪০৩২১৩, ই-মেইল: hfaysal-1971@yahoo.com

 

বিস্তারিত
পুষ্টির উন্নতিতে বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করলেও বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের খর্বতা, কৃশতা, অতি ওজন এবং নারীদের রক্তস্বল্পতা কমানোর ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের উন্নতি সন্তোষজনক নয়। কৃষি গবেষণায় আন্তর্জাতিক সংস্থা    ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ওঋচজও) তাদের ওয়েবসাইটে বৈশ্বিক পুষ্টি প্রতিবেদন ২০১৪ প্রকাশ করেছে। ১৯ থেকে ২১ নভেম্বরে ইতালির রোমে অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পুষ্টি সম্মেলন উপলক্ষ্যে বৈশ্বিক পুষ্টি পরিস্থিতির এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশের পক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই সম্মেলনে যোগদান করেন।
পুষ্টি নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন এটাই প্রথম। এতে বলা হয়েছে ২০২৫ সালের মধ্যে খর্বকায় (ঝঃঁহঃরহম), কৃশকায় (ডধংঃরহম), স্থূল (ঙনবংরঃু), কম ওজনের নবজাতক ও শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশু এবং রক্তস্বল্পতার শিকার নারী বিষয়ে ছয়টি সূচকে অগ্রগতির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইটি সূচকে অগ্রগতি হলেও চারটি সূচকে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত অর্জন করতে হবে।
বিশ্বের প্রতিটি দেশেই অপুষ্টির সমস্যা আছে। পৃথিবীর ২০০ থেকে  ৩০০ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের অপুষ্টির শিকার। কেউ বয়সের তুলনায় খর্ব, কৃশ বা কম ওজনের, কেউ স্থূল, আবার কেউ অপুষ্টি উপাদানের ঘাটতিতে ভুগছে। হাড্ডিসার শিশু, শ্বাসকষ্টে ভোগা স্থূলকায় মানুষ, প্রথম জন্মদিনের আগেই মারা যাওয়া শিশু এসবই অপুষ্টির নানা চেহারা। প্রতিবেদনে পুষ্টির চ্যালেঞ্জকে একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে থাকবে পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নতির বিষয়টি। পুষ্টির উন্নতি জীবনব্যাপী এবং আন্তঃপ্রজন্ম স্থায়ী হয়।
২০১২ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের পুষ্টিবিষয়ক অধিবেশনে পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নতির জন্য ছয়টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।  বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে খর্বকায় শিশু ৪০ শতাংশ, রক্তস্বল্পতার শিকার নারী ৫০ শতাংশ, কম জন্ম ওজনের শিশু ৩০ শতাংশ এবং কৃশকায় শিশুর সংখ্যা ৫ শতাংশ কমাতে হবে। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশু ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। আর স্থূল বা বয়সের তুলনায় অতি ওজনের শিশু হার কমাতে হবে। এই প্রতিবেদনে খর্বতা, রক্তস্বল্পতা, কৃশতা ও অতি ওজন এই চারটি সূচক ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মানুষের খর্বতা ২ দশমিক ৭ শতাংশ হারে কমছে। অথচ ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে খর্বতা কমাতে হবে।  অবশ্য কাক্সিক্ষত পর্যায়ে অর্জন না হলেও বাংলাদেশ খর্বতা কমানোর ক্ষেত্রে অনেক ভালো করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এখানে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের খর্বতা কমানোর হার ভারতের চেয়েও দ্বিগুণের বেশি। এটা কেমন করে সম্ভব হলো, তারও একটি ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সম্পদ বৃদ্ধি, বাবা মায়ের শিক্ষার উন্নতি, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের আওতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ প্রজননক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ রক্তস্বল্পতায় ভোগে।  প্রতিবেদন বলেছে, রক্তস্বল্পতা বছরে শূন্য দশমিক  ৬ শতাংশ হারে কমছে। অন্যদিকে পাঁচ বছরে কম বয়সি ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু কৃশকায়। কৃশকায় শিশু কত হারে কমছে, তার উল্লেখ না থাকলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রেও লক্ষ্য অর্জনের পথে নেই বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে অনুযায়ী,  বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি অধিক ওজনের শিশুর সংখ্যাও বাড়ছে।
১১৮ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে শুধু নিম্ন আয়ের দেশের জন্যই নয়, অপুষ্টি সব দেশেরই উদ্বেগের বিষয়, অনেক উচ্চআয়ের দেশেও এই সমস্যা আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০ সালের তুলনায় স্থূল মানুষ দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। দেশটি বয়স্কদের ৬৯ শতাংশ এবং শিশুদের ৩২ শতাংশ স্থূল। একই সমস্যা যুক্তরাজ্যেও। দেশটির ৬৭ শতাংশ পুরুষ ও ৫৭ শতাংশ নারী স্থূল। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, অপুষ্টি দূর করার ক্ষেত্রে উন্নত দেশ ও দাতাগোষ্ঠী তহবিল সরবরাহের যেসব প্রতিশ্রুতি বিভিন্ন সময় দিয়েছিল তাও অনেক ক্ষেত্রে পূরণ হয়নি। অপুষ্টি দূর করার জন্য দাতা, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি যারা পুষ্টি নিয়ে ভালো কাজ করছেন, তাদের সংগঠিত করতে হবে,   সহায়তা দিতে হবে, স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাদের ভালো কাজের বিস্তার ঘটাতে হবে।
গত ১৩ আগস্ট ২০১৭ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পুষ্টি পরিষদের (এনএনসি) সভায় বলেন, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি জনগণের পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তাঁর সরকার দেশের জনগণের খাদ্যনিরাত্তা নিশ্চিত করেছে। এখন পুষ্টি নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। পুষ্টির সঙ্গে অনেক কিছু সম্পৃক্ত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টির বিষয়ে শহরাঞ্চলে সচেতনতা সৃষ্টি হলেও গ্রামাঞ্চলে জনগণের মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে (প্রথম আলো ১৩ আগস্ট,২০১৭)। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও কৃষি তথ্য সার্ভিস তাদের দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পুষ্টি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ ও তথ্য প্রচার পরিচালনা করছে। তবে আমি মনে করি গ্রামের গরিব ও অসচেতন জনগোষ্ঠীর কাছে আরো বেশি করে পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে বহুল প্রচার করা উচিত। গণমাধ্যমও এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য করণীয়
বাংলাদেশের জন্য করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান তাহমিদ আহমেদ বলেন, মানুষের জীবিকা বা ভালো উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে, শিশু খাদ্যের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং বিশুদ্ধ পানি ও  পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব মার্গারেট চ্যান বলেছেন পৃথিবীর সব প্রান্তে থাকা অপুষ্টি দূর করতে হলে অনেক ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের একার পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাড়ছে। স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য করণীয় সম্পর্কে অনেক দেশ এখন অনেক সজাগ। এই প্রতিবেদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্পর্কে এবং কোথায় বিনিয়োগ দরকার তা জানতে সহায়তা করবে। (সূত্র- প্রথমআলো, নভেম্বর ২০১৪)।
খাদ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ওঋচজও) মহাপরিচালক শেনগেন ফান গত ২০ আগস্ট ২০১৫ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন, জাতীয় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তাহা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তিনি কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করার পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের তাগিদ দিয়েছেন। এতে তিনি মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।    ইফপ্রির মহাপরিচালক বলেছেন এদেশের মানুষের ৭৭ শতাংশ ক্যালরি ও ৫০ শতাংশ প্রোটিন আসে ভাত থেকে। অপুষ্টি দূর করতে ও গড় উচ্চতা বাড়াতে হলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে চাল ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ ভাগ লোক গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত, ২০-২২% লোক হৃদরোগে আক্রান্ত, ৮০-৯০ লাখ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, প্রায় ১০-১২ লক্ষ লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং ১৫ লক্ষ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত (বাংলাদেশ প্রতিদিন এপ্রিল ২০১৫ ও মার্চ ২০১৬)। আর বিশ্বে প্রতি ১১ জনে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত (সময় টিভি-৬ এপ্রিল ২০১৬)। আর এসব রোগের মূল কারণ ভেজাল খাদ্য গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করা, সুষম খাদ্য গ্রহণে অসচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পয়ঃনিষ্কাশন ও সুপেয় পানির অভাব এবং পুষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতা।
বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট সীমিত আকারে জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। শহরের বস্তিবাসী, গ্রামের গরিব ও অসচেতন জনগোষ্ঠীর কাছ আরো বেশি করে পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য  সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের গণমাধ্যমে বহুল প্রচার করা উচিত। প্রতিদিন অন্তত ফল এবং সবজি পরিমাণ মতো (৪০০ গ্রাম) খাওয়া প্রতিটি মানুষের একান্ত কর্তব্য। এতে     কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের সম্প্রসারণ কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর সাথে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ও যুক্ত থাকতে পারে। জনগণের মধ্যে পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য   কৃষি মন্ত্রণালয় খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পুষ্টি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা ও গণমাধ্যমে প্রচার জোরদার করা উচিত। এতে মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যও সুরক্ষা হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষ) বিশেষ করে ঝউএ-১ ্ ঝউএ-২ অর্জন সহজ হবে।

 

ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার

উপপরিচালক (এলআর-পিআরএল), খামারবাড়ি, ঢাকা, বাড়ি নং ৩৮, রোড নং-১, সেক্টর-৬, উত্তরা, ঢাকা  ফোন : ০১৮১৫৫৯৭৩০৪, ই-মেইল : dhossain1960@yahoo.com 

বিস্তারিত
খাদ্য ও রোগের সম্পর্ক

অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই যে আপনি যা খাচ্ছেন তা আপনার অনুভূতিকে অনেকটাই নির্ধারণ করছে। একবার ভাবুন তো, বান্ধবীকে নিয়ে সিনেপ্লেক্সে বসে মুভি দেখছেন, সে সময় যদি একটা ঠোঙায় থাকে মাখনমাখা পপকর্ণ আর এক ক্যান কোকÑতাহলে মুভি দেখার অনুভূতিটা কেমন বদলে যাবে তাই না? তার মানে খাদ্যের সাথে অনুভূতির একটা সম্বন্ধ আছে। অনুভূতিটা তো আসে স্বাস্থ্য থেকে। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মনে সুখ ও আনন্দ লাগে, স্বাস্থ্য মন্দ থাকলে কষ্ট লাগে। এখনো সময় আছে, এবিসিডি- এই চারটা রোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার।
‘এ’ মানে অ্যাজমা, ‘বি’ মানে ব্লাড প্রেসার, ‘সি’ মানে ক্যানসার এবং ‘ডি’ মানে ডায়াবেটিস। এই চার সমস্যা এখন অধিকাংশ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছে। খাদ্য ও রোগ নিয়ে নানারকম উপদেশ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। কোনটা মানবো, কোনটা শুনবো, কোনটা করবো না- ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। অনেকেই যখন বলছে, ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার সাহেব যখন এটা ওটা খেতে নিষেধ করছেন, তখন মনে হচ্ছে স্বাস্থ্যের ওপর খাদ্যের নিশ্চয়ই কোনো ক্রিয়া বা প্রভাব আছে- অনেক খাদ্য রোগ ডেকে আনে, আবার অনেক খাদ্য রোগকে ঠেকিয়ে দেয়। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে? রোগ ও খাদ্যের মধ্যে সম্পর্কটাকে ভালো করে চিনে জানা দরকার- বিশেষ করে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের চোখে। অবশ্য এটা নিশ্চিত হওয়া মুশকিল যে, রোজ এক প্যাকেট চিপস বা চায়ে এক চামচ চিনি আমাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আসলে কতটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিংবা তিন বেলা বেশি করে ভাত খাওয়া- সেটাও কতটা স্বাস্থ্যসম্মত? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর এ অধ্যায়ে আমি সেসব আলোচনা করার চেষ্টা করছি। নিশ্চয়ই ওজন কমানোর জন্য দামি ওষুধ খাওয়া ও ডাক্তারের বিল পরিশোধ করার চেয়ে কিছু খাদ্য-খাবার বেছে সেগুলো খাওয়া দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
অ্যাজমা রোগ ও খাদ্য
সন্দেহ নেই যে সুষম খাবার আমাদের দেহ-মনকে সুস্থ-সবল রাখতে পারে। কিন্তু এমন কিছু খাদ্য আছে যেগুলো খেলে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, কিছু খাদ্য আছে যেগুলো খেলে শ্বাসকষ্ট কমে। অ্যাজমা বা হাঁপানি আমাদের মতো ধূলি-আবর্জনার শহরে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সেই সাথে যদি খাদ্যের কারণে এ রোগ বাড়ে তাহলে তা দুশ্চিন্তার বিষয়। ভিটামিন ডি সরাসরি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। দেহে    ভিটামিন-ডি কমে গেলে অ্যাজমা রোগের প্রবণতা বেড়ে যায়। ফর্টিফাইড দুধ, সামুদ্রিক মাছ (স্যালমন ফিশ), কমলার রস, ডিম ইত্যাদি ভিটামিন ডি-এর অন্যতম উৎস। ভিটামিন ই টোকোফেরল নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ ধারণ করে। টোকোফেরল অ্যাজমার লক্ষণ বিশেষ করে কাশিকে প্রশমিত করে। ভিটামিন ই-এর অন্যতম উৎস হলো আখরোট, কুমড়ার বিচি, সরিষা শাক, ব্রোকলি, বাটিশাক ইত্যাদি। বিটা ক্যারেটিনসমৃদ্ধ সবজি যেমন গাজর ও সবুজ শাক, ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন পালংশাক ও কুমড়ার বিচি ইত্যাদি অ্যাজমা রোগের জন্য খাওয়া যেতে পারে। এসব খাবার খেলে অ্যাজমা রোগ প্রশমনে তা সাহায্য করে।
অন্যদিকে, সালফাইট উৎপন্নকারী বিভিন্ন খাবার যেমন চিংড়ি, কাঁকড়া, পুঁইশাক, আচার, বোতলজাত লেমন জুস, মদ ইত্যাদি খেলে অ্যাজমা রোগ বাড়ে। গ্যাস উৎপন্নকারী কিছু খাবার আছে যেমন কার্বোনেটেড সোডা ওয়াটার ও কোমল পানীয় বা কোল্ড ড্রিংকস, পিয়াজ, রসুন, তেলেভাজা খাবার (পুরি, পিয়াজী, বড়া, ফ্রেঞ্চফ্রাই, নাগেট, রোল) ইত্যাদি খেলেও অ্যাজমা বাড়তে পারে। ঠা-া পানীয় বা আইসক্রিম তো বাড়াবেই। অ্যাজমা হলে বিভিন্ন প্রকার শিম খাওয়াও ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত চা, কফি বা মসলা খেলেও এ সমস্যা হতে পারে।
যত দোষ নন্দ ঘোষ
সারা বিশ্বের বাজারে কত খাবার যে আছে! এসব খাবারের কোনটা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলছে তা জানা কঠিন। তবে এ কথা সত্য যে নির্দিষ্ট কোন খাদ্যের প্রতি আমাদের আসক্তি ও সেসব খাবার তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণ আমাদের মৃত্যুকে এগিয়ে আনে।
স্বাস্থ্য নষ্টের এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে তেল। আমাদের দেহের জন্য চর্বি বা ফ্যাটজাতীয় উপাদানের দরকার আছে সত্য, কিন্তু ওটা প্রকৃতিতে জন্মানো ও উৎপাদিত প্রতিটি খাবারের মধ্যেই কম-বেশি আছে। দেহের জন্য যতটুকু দরকার তা নিয়মমতো খাবার খেলে মানে তেলছাড়া রান্না করে খেলেও তা যথেষ্ট। অথচ প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন খাবার তৈরিতে প্রচুর পরিমাণে তেল ব্যবহার করছি ও খাচ্ছি। এটাই বাড়তি হয়ে দেহে মেদের আকারে জমছে ও উচ্চ রক্তচাপসহ হৃদরোগ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাপী এখন স্থূলতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এসবের জন্য দায়ী আসলে অতিরিক্ত তেল বা চর্বিজাতীয় খাবার খাওয়া। অথচ যে খাবার আমাদের রোজ খাওয়া দরকার তা খাচ্ছি না। খাদ্য তালিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে সেগুলো। এর মধ্যে অন্যতম প্রয়োজনীয় একটি আদর্শ খাদ্য হলো দুধ। নারীদের হাড় মজবুত রাখতে বিশেষভাবে দুধ খাওয়া দরকার। হাড় মজবুত হলে নারীদের আথ্রাইটিস ও অস্টিওপোরেসিস প্রতিরোধ হয়। নিয়মিত টাটকা ফল ও শাকসবজি খেলে কোলস্টেরলের মাত্রা কমে, এতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমে।
লাল মাংস খাওয়ার ঝুঁকি
রোজ লাল মাংস খেলে অবশ্যই আয়ু কমবে, বাঁচবো কম দিন। লাল মাংস হলো গরু-মোষ, খাসি-ভেড়ার মাংস। মাংস খেলে তা থেকে দেহ প্রোটিন বা আমিষ পায়। দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিসাধনের জন্য প্রোটিনের দরকার আছে সত্য। তবে সেই প্রোটিন চাহিদা বিকল্প উৎস থেকেও মিটানো যায়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, লাল মাংস অধিক গ্রহণের ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসার রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের একদল গবেষক ড. ফ্রাংক হুর নেতৃত্বে এক গবেষণা কর্ম সম্পাদন করেন। তারা ১৯৮০ সালে ৮৩০০০ জন নারী ও ১৯৮৬ সালে ৩৭,০০০ জন পুরুষের ওপর এক জরিপ চালান। গবেষণা শুরুর সময়ে তাদের কারোরই কোনো হৃদরোগ ও ক্যানসার ছিল না। তারা প্রতি ৪ বছর অন্তর তাদের খাদ্য গ্রহণ ও চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যাদি একটি জরিপ ফরমে পূরণ করে দিতেন। গবেষক দলের একটি গবেষণা পত্র ২০১২ সালের ১২ মার্চ আর্কাইভ অব ইন্টারনাল মেডিসিনে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। গবেষণা চলাকালীন সময়ের মধ্যে ২৪০০০ জন মারা যায়। তাদের মধ্যে ৫৯০০ জন মারা যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ও ৯৫০০ জন ক্যানসারে ভুগে, যারা অধিক পরিমাণে লাল মাংস খেয়েছিলেন। খাদ্য তালিকায় এরা দিনে অন্তত একবার লাল মাংস গ্রহণ করেছিলেন। গবেষকরা গবেষণা শেষে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, যারা দিনে একবার লাল মাংস খায় তাদের মৃত্যুঝুঁকি ১৩% ও যারা দুবার লাল মাংস খায় তাদের মৃত্যুঝুঁকি ২০% বেশি। গবেষকরা এটাও দেখেছেন যে, যদি তারা প্রোটিনের জন্য বিকল্প উৎস থেকে খাদ্য গ্রহণ করে তাহলে পুরুষের ক্ষেত্রে ৯.৩% ও নারীদের বেলায় ৭.৬% মৃত্যুঝুঁকি কমানো যায়।
তবে এই গবেষণা থেকে এটা নিশ্চিত যে, লাল মাংস খাওয়ার ফলে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের হৃদরোগ বেড়ে গেছে, কিছু ক্যানসারও। কাজেই এ নিয়ে সাবধান হওয়া ভালো।
বেশি খাবারে বেশি ওজন
কথায় বলে ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’। তাঁতির কি হলো তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও এখন নিজের ওজন, মুটিয়ে যাওয়া, ভুড়ি- এসব নিয়ে এখন ভাবতে হচ্ছে। কেননা, বিশ্বব্যাপী দেহের ওজন বেড়ে যাওয়া ও মোটা হওয়া এখন বেড়ে চলেছে। ওজন বাড়া আর স্থ’ূলতা বা মোটা হওয়ার কারণে অনেক রোগ বিশেষ করে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এখন আমাদের টাকা-পয়সা হচ্ছে আর আমরা বেশি বেশি খাবার খাচ্ছি, অখাদ্য-কুখাদ্যও খাচ্ছি, যা আমাদের এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব পরিস্থিতিও আশংকাজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, বিশ্বে ২০১৬ সালে প্রায় ১.৯ বিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ওজন বেশি ছিল যাদের মধ্যে প্রায় ৬৫ কোটি লোক ছিল মোটা। যাদের ওজন বেশি তাদের মৃত্যু হার ওজন কমওয়ালাদের তুলনায় বেশি। শুধু যে প্রাপ্ত বয়স্ক বা বয়স্ক মানুষরা মুটিয়ে যাচ্ছে তাই নয়- বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ১০ লক্ষ শিশু ¯ূ’’লতা নিয়ে বড় হচ্ছে। উন্নত ও ধনী দেশসমূহে এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি লোক প্রয়োজনীয় খাবার পায় না অথচ ২০০ কোটি লোক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খায়।
কানাডিয়ান কমিউনিটি হেলথ সার্ভের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা রোজ সবজি ও ফল খায় তাদের ওজন কম, পক্ষান্তরে যারা বেশি মাংস খায় তাদের ওজন বেশি। কিন্তু এই সরল হিসাবের বাইরেও আছে আরও অনেক কারণ- অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে যে ক্যালরি নিচ্ছি তা ঠিকমতো পোড়াতে পারছি না। শারীরিক কাজ, খেলাধুলা ও ব্যায়ামের প্রবণতা অনেক কমে গেছে। এটাও ওজন বাড়ার কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে সারা বিশ্বে ক্যানসার রোগীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ রোগীর ওজন বেশি ও মোটা। মোটা লোকেরা সাধারণত স্তন, জরায়ু, আন্ত্রিক, কিডনি, পিত্তথলি, গলা ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে বেশি ভোগে। এদের দেহে কোলস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণা করে উপর্যুপরি বেড়ে যাওয়া ক্যানসার রোগের কারণ খুঁজতে গিয়ে তারা অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যগ্রহণকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। তাই কি খাবো, কতটুকু খাবো, দেহের ওজন তথা বিএমআই ঠিক বা কম রাখতে কি করতে হবে সেসব নিয়ে এখন চিন্তা করার সময় এসে গেছে।
অতি ভাতে রসাতল
প্রাচীনকালের লোকেরা আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন, ‘ঊন ভাতে দুনো বল, অতি ভাতে রসাতল।’ ঊন মানে কম ভাত খেলে সুস্থ থাকা যায়, কিন্তু বেশি ভাত খেলে তা আমাদের সর্বনাশ ডেকে আনে। ভাত তথা কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের পরিমাণ অতিরিক্তি হয়ে গেলে দেহের ভেতরে তৈরি হওয়া   ইনসুলিন তা পুরোপুরি রূপান্তর করতে পারে না। ফলে রক্তে চিনির পরিমাণ বা ব্লাড সুগার বেড়ে যায়, যা ডায়াবেটিস রোগ ডেকে আনে। অতিরিক্ত ভাত খাওয়ার ফলে দেহে কোলস্টেরল বেড়ে যায়। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ২৩২ গ্রাম চালের ভাতই যথেষ্ট, সেখানে আমাদের চালের দৈনিক চাহিদা গড়ে জনপ্রতি ৪৪৩ গ্রাম। আশার কথা, ধীরে ধীরে এ অভ্যাসে পরিবর্তন আসছে, কমছে ভাত খাওয়ার পরিমাণ। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের দ্বারা এ অবস্থা বদলানো যায়। ভাতের বিকল্প রুটি খেলেও উপকার হয়। সুস্থ থাকার জন্য সেটা এখন অনিবার্য। বিশেষ করে কোলস্টেরল ও রক্তের চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিমাণ মতো ভাত খাওয়া দরকার। এতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক কমে।
নিজের হৃৎপি-কে ভালোবাসুন
ভালোবাসার চেয়ে বড় শক্তি পৃথিবীতে আর নেই- সেই ভালোবাসা দিয়ে আপনি আপনার হৃৎপি-কে রক্ষা করুন, হৃদস্বাস্থ্যকে ভালো রাখুন। দিন দিন বিশ্বব্যাপী বেড়ে চলেছে হৃদরোগের ঝুঁকি ও হৃদরোগে মৃত্যু। আপনার পরিবারে যদি হৃদরোগের ইতিহাস থাকে তবে সে বংশধারার ঝুঁকি এড়ানো কঠিন। কিন্তু স্বাস্থ্যসম্মত কিছু সহজ উপায় মেনে তা অভ্যাস করলে হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। যেসব বিশেষ কারণে হৃদরোগ হয় যেমন উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চমাত্রার কোলস্টেরল, ধূমপান, দেহের অতিরিক্ত ওজন, দৈহিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করা ইত্যাদি। এর মধ্যে কোলস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক। কোলস্টেরলের মাত্রা যত বাড়বে, হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও তত বাড়বে। এটা বাড়ল কি-না তা পরীক্ষা ছাড়া জানা সম্ভব নয়। নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে হবে খউখ (খারাপ কোলস্টেরল), ঐউখ (ভালো কোলস্টেরল) ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হার্ট অ্যাটাকের আর এক নীরব ঘাতক। এসব দস্যু ও ঘাতক থেকে নিজের হৃৎপি-কে রক্ষা করতে হৃৎপি-ের জন্য যেসব খাদ্য ভালো সেগুলো খেতে হবে।   
সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট খুবই খারাপ, কেননা তা খারাপ কোলস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এই চর্বি থাকে মাংস, দুধজাতীয় খাবার, চকোলেট, বেকারি সামগ্রী (কেক, বিস্কুট, ডানোট, প্যাস্ট্রি), ভাজা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ইত্যাদিতে। ট্রান্স ফ্যাট আর একটি খারাপ ফ্যাট। এটা খারাপ কোলস্টেরলকে বাড়িয়ে ও ভালো কোলস্টেরলকে কমিয়ে দিতে পারে। ট্রান্স ফ্যাট রয়েছে অধিকাংশ হাইড্রোজেনেটেড তেল ও চর্বি যেমন মার্জারিন, ক্র্যাকার্স, ফ্রেঞ্চফ্রাই ইত্যাদিতে।
এগুলোর বদলে ভালো ফ্যাট আছে যেমন-পাখি বা মুরগির মাংস, বাদাম, অসম্পৃক্ত তেল যেমন ক্যানোলা, অলিভ ও কুসুম তেল ইত্যাদি গ্রহণ করতে পারেন। যেসব খাবারে বেশি দ্রবণীয় আঁশ বা ফাইবার আছে সেসব খাবার খেতে পারেন নিশ্চিন্তে, যেমন-কলা, কমলা, জাম্বুরা, পেয়ারা, আনারস, নাশপাতি, আপেল ইত্যাদি ফল, ওটমিল বা যবের ভুসি, মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ঝাড়শিম, বরবটি ইত্যাদি। মাছ ভালো, তবে যেসব মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড অধিক পরিমাণে আছে সেসব মাছ (স্যালমন, টুনা মাছ) খাওয়া ভালো। সব খাবারেই লবণের পরিমাণকে যথাসম্ভব কমাতে হবে। কাঁচা লবণ খাওয়া যাবে না। সারা দিনে বড়জোর একচা-চামচ লবণ খেতে হবে- এর বেশি নয়। মদ বা অ্যালকোহল পান হৃৎপি-ের জন্য ক্ষতিকর। কি খাবো তা ভাবা দরকার
সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে ১ হাজার কোটি মানুষের টেকসই জীবনধারণ নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে বছরে ২৩.৬ শতাংশ বা ১ কোটি ১৬ লাখ লোকের অকাল মৃত্যু ঠেকানো যাবে। এজন্য তারা সুপারিশ করেছেন লাল মাংস খাওয়া অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি বাদাম, ফল, শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির গড়ে রোজ ২৫০০ কিলোক্যালরি শক্তির দরকার হয়। এ শক্তি আসে খাদ্য থেকে। সেটা শুধু ভাত খেলেও আসে, অন্যান্য খাবার খেলেও আসে। কিন্তু শুধু শক্তিদায়ক খাবার যেমন-চাল, আটা, রুটি, চিনি, মিষ্টি এসব না খেয়ে অন্যান্য খাদ্যের সমন্বয়ে একটি সুষম পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের পরিকল্পনা করে তা খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট রোজ কোন খাবার কতটুকু খেলে তা স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে ও রোগাক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে সে বিষয়ে একটি তালিকা দিয়েছেন। সে অনুসারে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকে রোজ ৩০০ গ্রাম শাকসবজি, ২০০ গ্রাম ফল, ৫০ গ্রাম শ্বেতসারযুক্ত সবজি (যেমন আলু), ৪০ গ্রাম অসম্পৃক্ত তেল (সয়াবিন, রাই সরিষা, সূর্যমুখী, বাদাম তেল), ৩১ গ্রাম চিনি, ২৫ গ্রাম চীনাবাদাম, ১৪ গ্রাম গরু বা খাসির মাংস, ২৫ গ্রাম সয়াজাত খাদ্য, ২৫ গ্রাম আখরোট, ২৯ গ্রাম মুরগি বা হাঁসের মাংস, ৫ গ্রাম চর্বিজাতীয় খাবার, ৬.৮ গ্রাম পামতেল, ২৫০ গ্রাম দুধ বা দুধজাতীয় খাদ্য, ২৩২ গ্রাম খাদ্যশস্য (চাল বা আটা), ৫০ গ্রাম ডাল, ২৮ গ্রাম মাছ ও সপ্তাহে দেড়টা ডিম (দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯) খাওয়া উচিত।
তবু রোগ থেকে সাবধান থাকতে চাইলে সাধারণ পাঁচটা নিয়ম তো পালন করতে পারি, যেমন:
ি টাটকা শাকসবজি, ফল, দানাশস্য ও কম-ফ্যাটযুক্ত দুধ বা দুধজাতীয় খাবার খেতে হবে।
ি প্রোটিন বা আমিষ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মাছ, মাংস, ডিম, শিমের বিচি, বাদাম- এসব যতটা কম খাওয়া যায় তত ভালো।
ি তেল, ঘি, মাখন, লবণ ও চিনি না খাওয়া উত্তম, খেলেও তা ন্যূনতম পরিমাণে খেতে হবে।
ি প্রক্রিয়াজাত ও টিনজাত খাবার পারতপক্ষে পরিহার করতে হবে। এসব খাবারের মধ্যে অনেক খাবারে বিভিন্ন রঙ ও প্রিজারভেটিভ কেমিক্যাল থাকে, যা ক্যানসারের কারণ হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, যদি আমরা সুস্থ থাকতে চাই তাহলে প্রত্যেকেরই দিনে অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা দৈহিক পরিশ্রম বা কাজ করা উচিত। নিদান পক্ষে ৪৫ মিনিট হাঁটা।

 

মৃত্যুঞ্জয় রায়

উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবা : ০১৭১৮২০৯১০৭, ই-মেইল : kbdmrityun@yahoo.com

 

বিস্তারিত
অগ্রহায়ণ মাসের কৃষি

কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তকাল।  হেমন্ত বাংলার বিখ্যাত নবান্ন উৎসবের সময়। নবান্ন উৎসবের সমান্তরালে উৎসবমুখর থাকে বৃহত্তর কৃষি ভুবন। সুখ্যাত আমন ও আউশসহ নানা নতুন ধান কেটে এই সময়ে ঘরে তোলা হয়। কেননা এ মৌসুমই কৃষির জন্য তুলনামূলক নিশ্চিত একটি মৌসুম। তাহলে আসুন আমরা জেনে নেই অগ্রহায়ণ মাসের কৃষিতে আমাদের করণীয় কাজগুলো।

আমন ধান
এ মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় আমন ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলে কেটে ফেলতে হবে। আমন ধান কাটার পরপরই জমি চাষ দিয়ে রাখতে হবে, এতে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মাটির রস কম শুকাবে। উপকূলীয় এলাকায় রোপা আমন কাটার আগে রিলে ফসল হিসেবে খেসারি আবাদ করতে পারেন। আগামী মৌসুমের জন্য বীজ রাখতে চাইলে প্রথমেই সুস্থ সবল ভালো ফলন দেখে ফসল নির্বাচন করতে হবে। এরপর কেটে, মাড়াই-ঝাড়াই করার পর রোদে ভালোমতো শুকাতে হবে। শুকানো গরম ধান আবার ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হবে এবং ছায়ায় রেখে ঠা-া করতে হবে। পরিষ্কার ঠা-া ধান বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। বীজ রাখার পাত্রটিকে মাটি বা মেঝের ওপর না রেখে পাটাতনের ওপর রাখতে হবে। পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই পেতে হলে ধানের সাথে নিম, নিসিন্দা, ল্যান্টানার পাতা শুকিয়ে গুঁড় করে মিশিয়ে দিতে হবে।
বোরো ধান
আগ্রহায়ণ মাস বোরো ধানের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময়। রোদ পড়ে এমন উর্বর ও সেচ সুবিধাযুক্ত জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করতে হবে। চাষের আগে প্রতি বর্গমিটার জায়গার জন্য ২-৩ কেজি জৈব সার দিয়ে ভালোভাবে জমি তৈরি করতে হবে। পানি দিয়ে জমি থকথকে কাদা করে এক মিটার চওড়া এবং জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা করে ভেজা বীজতলা তৈরি করতে হবে। যেসব এলাকায় ঠা-ার প্রকোপ বেশি সেখানে শুকনো বীজতলা তৈরি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রতি দুই প্লটের মাঝে ২৫-৩০ সেমি. নালা রাখতে হবে। বোরো মৌসুমের পানি সাশ্রয়ী ব্রি ধান৯২ এ ছাড়া যেসব এলাকায় সেচের পানির ঘাটতি থাকে সেখানে আগাম জাত হিসেবে ব্রি ধান৪৫ এবং ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান ৮৪ ও ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮, উর্বর জমি ও পানি ঘাটতি নেই এমন এলাকায় ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৫৯, ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান ৬৪, ব্রি ধান৬৮, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৯, ব্রি ধান৯২ ব্রি হাইব্রিড ধান১, ব্রি হাইব্রিড ধান২ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ঠা-া প্রকোপ এলাকায় ব্রি ধান৩৬, হাওর এলাকায় বিআর১৭, বিআর১৮, বিআর১৯, লবণাক্ত এলাকায় ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬১ চাষ করতে পারেন। বীজ বপন করার আগে ৬০-৭০ ঘণ্টা জাগ দিয়ে রাখতে হবে। এ সময় ধানের অঙ্কুর গজাবে। অঙ্কুরিত বীজ বীজতলায় ছিটিয়ে বপন করতে হবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ৮০-১০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
গম
অগ্রহায়ণের শুরু থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ পর্যন্ত গম বোনার উপযুক্ত সময়। এরপর গম যত দেরিতে বপন করা হবে ফলনও সে হারে কমে যাবে। দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়। অধিক ফলনের জন্য গমের আধুনিক জাত যেমন- বারি গম-২৫, বারি গম-২৮, বারি গম-২৯, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১, বারি গম-৩২, বারি গম-৩৩ এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু বিনা গম-১ এসব বপন করতে হবে। বীজ বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করে নিতে হবে। গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৮০ ভাগ বা তার বেশি হলে বিঘাপ্রতি ১৬ কেজি বীজ বপন করতে হবে। সেচসহ চাষের ক্ষেত্রে শেষ চাষের সময় প্রতি শতক জমিতে ৩০-৪০ কেজি জৈবসার,  ৬০০-৭০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫৫০-৬০০ গ্রাম টিএসপি,        ৪০০-৪৫০ গ্রাম এমওপি, ৪৫০-৫০০ গ্রাম জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। তিন পাতা বয়সে প্রথম সেচের পর দুপুর বেলা মাটি ভেজা থাকা অবস্থায় প্রতি শতাংশে ৩০০-৪০০ গ্রাম ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখ্য, সেচ ছাড়া চাষের ক্ষেত্রে সমস্ত ইউরিয়া শেষ চাষের সময় অন্যান্য সারের সাথে প্রয়োগ করতে হবে। গমে তিনবার সেচ দিলে ফলন বেশি পাওয়া যায়। বীজ বপনের ১৭-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ, ৫০-৫৫ দিনে দ্বিতীয় সেচ এবং ৭৫-৮০ দিনে ৩য় সেচ দিতে হবে।
ভুট্টা
ভুট্টা গত মাসে আবাদ না করে থাকলে এ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো খই ভুট্টা, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৫, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৬, বারি মিষ্টি ভুট্টা-১, বারি বেবি কর্ন-১ এসব। খরা প্রধান এলাকা ও সাদা দানার ক্ষেত্রে বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩ এসব। এক শতাংশ জমিতে হাইব্রিড বীজ বপনের জন্য ৮০-৯০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। ভালো ফলনের জন্য সারিতে বীজ বপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেমি. এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ২৫ সেমি. রাখতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে জমিতে সার প্রয়োগ করলে কম খরচে ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে সাধারণভাবে হাইব্রিড ভুট্টা চাষের জন্য প্রতি শতাংশ জমিতে ইউরিয়া       ২-২.২৫ কেজি, টিএসপি ৯৫০-১০০০ গ্রাম, এমওপি    ৭০০-৯০০ গ্রাম, জিপসাম ৯৫০-১০০০ গ্রাম, দস্তা ৪০-৬০ গ্রাম, বরিক এসিড ২০-৩০ গ্রাম এবং ১৬-২০ কেজি জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে।
সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল
তেল ফসলের মধ্যে সরিষা অন্যতম। তাছাড়া বাদাম, সূর্যমুখী এসব আবাদ করতে পারেন। সরিষা গাছে ফুল আসার সময় শতাংশপ্রতি ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। উপরি সার প্রয়োগের পর হালকা একটি সেচ দিতে হবে। মাটিতে রস কমে গেলে ২০-২৫ দিন পর আবারো একটি সেচ দিতে হবে।
আলু
উপকূলীয় অঞ্চলে এ মাসেও আলু আবাদ শুরু করা যায়। অন্যান্য স্থানে রোপণকৃত আলু ফসলের যতœ নিতে হবে। মাটির কেইল বেঁধে দিতে হবে এবং কেইলে মাটি তুলে দিতে হবে। সারের উপরিপ্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সেচ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
শাকসবজি
মাঠে এখন অনেক সবজি বাড়ন্ত পর্যায়ে আছে। ফুলকপি,             বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, মুলা এসব বড় হওয়ার সাথে সাথে চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে। চারার বয়স ২-৩ সপ্তাহ হলে সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। সবজি ক্ষেতের আগাছা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ ব্যবহার করতে পারেন। এতে পোকা দমনের সাথে সাথে পরিবেশও ভালো থাকবে। জমিতে প্রয়োজনে সেচ প্রদান করতে হবে। টমেটো গাছের অতিরিক্ত ডাল ভেঙে দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। ঘেরের বেড়িবাঁধে টমেটো, মিষ্টিকুমড়া চাষ করতে পারেন। মিষ্টিআলু, চীনা, কাউন, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ অনেক অত্যাবশ্যকীয় ফসলের প্রাথমিক বৃদ্ধি পর্যায়। এসব ফসলের কোনটি এখনো না লাগিয়ে থাকলে দেরি না করে চারা লাগাতে হবে। এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত খরা সহনশীল ছোলা, মুগ, তিসি, যব এসব বপন করা যায়।
গাছপালা
এবারের বর্ষায় রোপণ করা ফল, ঔষধি বা বনজ গাছের যতœ নিতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছকে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। গাছের গোড়ায় জাবরা প্রয়োগ করলে তা পানি ধরে রাখবে। মাটিতে রসের পরিমাণ কমে গেলে গাছের গোড়ায় সেচ প্রদান করতে হবে। এ সময় গাছের   বাড়বাড়তি কম হয় তাই পারতপক্ষে এখন গাছের ডালপালা কাটা ঠিক হবে না।
প্রাণিসম্পদ
হাঁস-মুরগির ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর ভালো সময় এখন। তাছাড়া সামনে শীতকাল আসছে। শীতকালে পোলট্রিতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়ে যায় এবং রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড,  বসন্ত রোগ, কলেরা এসব রোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। এসব রোগ থেকে হাঁস-মুরগিকে বাঁচাতে হলে এ মাসেই টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ মাসে পশুখাদ্যের কোনো অভাব থাকে না। বিশেষ করে কাঁচা ঘাসের। তাই আমন ধানের খরসহ অন্যান্য খাদ্য যেমন ভুট্টা, ডাল, ঘাস দিয়ে সাইলেজ তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে পারেন। এ সময় গবাদিপশুর খুরা রোগ, তড়কা, গলাফুলা দেখা দিতে পারে। গবাদিপশুতে রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রাণী চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
মাছের খাবার হিসেবে রাসায়নিক সার এ সময় বেশি উপযোগী। জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে মৎস্যবিদদের সাথে পরামর্শ করে চুন বা তুঁতে প্রয়োগ করতে পারেন। পুকুরে রোদ পড়া নিশ্চিত করতে পুকুর পাড়ের গাছের ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। পুকুরের ঢালে প্যারা, নেপিয়ার বা অন্যান্য ঘাসের চাষ করলে অতিরিক্ত ফসল পাওয়া যায় এবং কার্পজাতীয় মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, সংক্ষেপে আগামী তথা অগ্রহায়ণ মাসের কৃষিকথা উপস্থাপন করা হলো। বিস্তারিত কৌশল জানার জন্য স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা   কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করতে হবে। এ ছাড়া কৃষি সম্পর্কিত যে কেনো সমস্যার সমাধানের জন্য যে কোনো মোবাইল থেকে ১৬১২৩ নম্বরে কল করতে পারেন। মনে রাখবেন আমাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণই নিয়ে আসবে কৃষির কাক্সিক্ষত সাফল্য।

 

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম

সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা, টেলিফোন:০২৫৫০২৮৪০৪, মেইল: fardousi30@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে মিষ্টি ফসলের গুরুত্ব

পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রথম এবং প্রধান উপজীব্য। যা প্রথম শুরু করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই ফলশ্রুতিতে তিনি কৃষিকে ঢেলে সাজানোর প্রয়াস নিয়েছিলেন। কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গড়ে তুলেছিলেন এদেশের মিষ্টি ফসলের ভিত্তি। কারণ  মিষ্টি ফসলের সব উদ্ভিদ উৎসই পুষ্টিক এবং এগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অল্প জমিতে অধিক পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন করতে মিষ্টি ফসলই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি ফসল আখ। আখ থেকে হয় রস, গুড়, চিনি। আখের পাশাপাশি রয়েছে তাল, খেজুর, গোলপাতা, স্টেভিয়া, সুগারবিট, মধু, যষ্টিমধু প্রভৃতি। তাল থেকে হয় রস, গুড়, তালমিছরি প্রভৃতি। খেজুর ও গোলপাতা থেকেও হয় রস, গুড়। সুগারবিট থেকে হয় গুড়, চিনি, মাছের খাবার, গবাদি পশুর খাবার প্রভৃতি। স্টেভিয়া, যষ্টিমধু এবং মধুর পুষ্টিগুণ ও ঔষধিগুণ সর্বজনবিদিত। আর বড় কথা হলো এসব খাবারের পাশাপাশি ওইসব ফসলভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের খাদ্য শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। তাতে রয়েছে দারিদ্র্য মোচনেরও অপার সম্ভাবনা। এসব ছাড়াও তাল থেকে তৈরি বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাল গাছ বজ্রপাতের বিপদ থেকে রক্ষা করে। এখানে আলোচিত ফসলগুলোর মধ্যে আখ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু। তবে তাল ও খেজুর গাছও প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে। বিশেষ করে বজ্রপাত নিরোধে তালগাছের ভূমিকা অপরিসীম।
পরিবারের আয় এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে আখ চাষ
আখ মিষ্টি ফসল এবং পুষ্টিকর ফসল। আজকাল সারা দেশে সারা বছর উপজেলা শহর থেকে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত প্রতিটি বাজারের কোণায় কোণায় চিবিয়ে খাওয়া আখ ব্যাপক হারে বিক্রি হয়। যার বাজারদর এলাকা ভেদে ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রতিটি আখের দাম অপেক্ষাকৃত কম হলেও মধ্য, দক্ষিণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে দাম ও চাহিদা খুবই বেশি। এক বিঘা জমিতে ৩০০০টি চিবিয়ে খাওয়া আখের চারা রোপণ করা যায়। এক্ষেত্রে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১ মিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৪৫ সেমি.। এক বিঘা অর্থাৎ ১৩৪৯ বর্গমিটার জমিতে ওই মাপে লাগানো হলে ২৯৯৮ বা ৩০০০টি চারা লাগানো যাবে। সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে এটা রোপণ করে, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গাছ প্রতি কমপক্ষে ৫টি কুশি পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে ঝাড় প্রতি ১টি মাতৃগাছ এবং ৫টি কুশি অর্থাৎ ৬টি আখ পাওয়া যাবে। সুতরাং ৩০০০টি ঝাড়ে ৩০০০ী ৬=১৮০০০টি আখ পাওয়া যাবে) তা থেকে ১৮০০০টি সুস্থ ও সবল আখ উৎপাদন করা সম্ভব। সর্বনিম্ন বাজারদরে (১০টাকা) তা বিক্রি করেও এ থেকে ১,৮০,০০০/-টাকা আসবে যার চাষাবাদ থেকে বিক্রি পর্যন্ত মোট খরচ হয় প্রায় ২৫০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা। অর্থাৎ নিট লাভ হয় ১,৫০,০০০ টাকা। এটা গেল আখের হিসাব। আখ ছাড়াও ওই জমিতে সাথী ফসল চাষ করে প্রায় ১০,০০০-১৫০০০ টাকা নিট লাভ হবে। এ টাকা দিয়ে চাষি তার আখ চাষের ওই খরচ মিটাতে পারবে। যদিও বলা হয় আখ ১২-১৪ মাস মাঠে থাকে কিন্তু এর পরিপক্বতার জন্য  ১০-১২ মাসই যথেষ্ট। তদুপরি যদি চিবিয়ে খাওয়ার আখ হয় তাহলে তা ৭-৮ মাসেই বিক্রির উপযোগী হয়। সে কারণেই সঠিক জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আখ চাষ করে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করা যেমন সম্ভব তেমনি সম্ভব অধিক উপার্জন এর মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করা এবং এভাবেই সম্ভব দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকার পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে দারিদ্র্যবিমোচনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা।
বিভিন্ন মিষ্টি ফসলের পুষ্টিমান
আমেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের (অর্গানিক লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন) মতে আখের রসের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৪৩। অর্থাৎ এটি নি¤œমাত্রার গ্লাইসেমিক খাবার। তাই ডায়াবেটিক রোগীরাও আখের রস নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নির্ভয়ে খেতে পারেন। বিভিন্ন ফসলের গুড় ও চিনির পুষ্টিমান    সারণি-১ দেয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রতিকূল এলাকায় যেখানে অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যায় না কিংবা করেও তা লাভজনকভাবে ধরে রাখা যায় না সেখানেও পুষ্টিকর এসব   মিষ্টি ফসল আবাদের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে।
ক) খরাপীড়িত এলাকা
উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকায় আখ ফসল সবচেয়ে বেশি টিকে থাকতে পারে। শুধু তাই নয় যেখানে অন্য সব  ফসল পানির অভাবে মারা যায় সেখানেও আখ ফসল বেঁচে থাকতে পারে এবং পানি পেলে তা আবার পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠে। সেজন্যই উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকায় আখ চাষের ব্যাপকতা বেশি। শুধু আখই নয়, খরাপীড়িত এলাকার জন্যও আখের সঙ্গে সাথী ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। আখের পাশাপাশি তাল, খেজুরেরও রয়েছে এই খরাসহিষ্ণু ক্ষমতা।
খ) চরাঞ্চলের বালুময় পতিত জমি
চরের বালিময় পতিত জমিতে আখ চাষ করে, আখের সাথে সাথী ফসল করে এবং গুড় তৈরি করে যথেষ্ট লাভ করার সুযোগ রয়েছে। এর কারণ আখের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত গভীরে চলে যেতে পারে। তাছাড়া চরে অন্যান্য ফসল চাষ করে চাষিরা ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ বন্যায় তা ডুবিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অথচ আখ এমন একটি ফসল যা ১২ -১৫ ফুট লম্বা হয় এবং বন্যায় এর নিম্নাংশ ডুবে থাকলেও কোনো ক্ষতি হয় না। আবার চরে যেসব স্বল্পমেয়াদি ফসল হয় সেগুলো সাথী ফসল হিসেবে আখের সাথে চাষ করা যায়।
গ) দক্ষিণাঞ্চলের  লবণাক্ত এলাকা
লবণাক্ততার কারণে যেখানে অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যায় না সেখানেও আখ ফসল বেড়ে উঠতে পারে। একমাত্র আখ ফসল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই প্রতি মিটারে ১৫ ডিএস মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই লবণাক্ত এলাকারও লাভজনক ফসল আখ। আখ ছাড়া সুগারবিটও লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে।
ঘ) পাহাড়ি এলাকা
পাহাড়ি এলাকায় আখের বাজার দর অপেক্ষাকৃত বেশি। অল্প জমি ব্যবহার করে সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে এত বেশি আয় করা শুধু আখ চাষের মাধ্যমেই সম্ভব। একইভাবে পাহাড়ি এলাকায় গুড়ের দামও বেশি। তাই ওখানকার মানুষ গুড় করেও বেশি লাভ করতে পারেন। পাহাড়ি এলাকায় তাল ও খেজুর ফসল চাষের সম্ভাবনাও যথেষ্ট।
ঙ) পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা
হাওর এলাকার অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে অল্প কিছুদিন পরেই পানি নেমে যায়। এসব জায়গাগুলো নির্বাচন করে সেখানে জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু আখের জাত রোপণ করা যেতে পারে। যেমন ঈশ্বরদী ৩৭, ঈশ্বরদী ৩৪, ঈশ্বরদী ২০, ঈশ্বরদী ২১ প্রভৃতি। তাছাড়া হাওরে প্রতি বছর বজ্রপাতের কারণে অনেক সংখ্যক মানুষ মারা যায়। তাই এই এলাকায় অধিক তালগাছ রোপণের মাধ্যমে একদিকে যেমন তালের রস, গুড়, তালমিছরি প্রভৃতি বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যায় তেমনি এরই পাশাপাশি বজ্রপাত প্রতিরোধেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
চ) দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা
সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা যেখানে প্রায় প্রতি বছরই মারাত্মক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হানা দিয়ে ক্ষেতের সব ফসল ল-ভ- করে দেয়, সেখানে আখ ফসল থাকলে তা ওই এলাকার জীবন রক্ষাকারী ফসলে পরিণত হয়। কারণ ঘূর্ণিঝড়ে ল-ভ- সবকিছুতে রান্না করার উপকরণও চলে যায়, ঘরের শুকনা  খাবারও (যদি থাকে) শেষ হয়ে যায়, আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় পানীয় জলের। ওই এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে চিবিয়ে খাওয়া আখ থাকলে ঝড়ে তা যত ক্ষতিগ্রস্তই হোক না কেন তা থেকে পানি ও পুষ্টি উভয়ই পাওয়া যেতে পারে। সংকটকালীন ওই সময়ে বাড়ির শিশুদের জন্য তা হয় জীবন রক্ষাকারী খাদ্য। সেকারণেই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকার প্রতিটি বাড়িতেই চিবিয়ে খাওয়া আখের আবাদ করতে হবে। এছাড়া সেখানে তাল গাছের প্রতিরক্ষা বেষ্টনীও গড়ে তোলা যেতে পারে।
অর্থাৎ সারা দেশেই পুষ্টিকর খাদ্যের জন্য মিষ্টি ফসল চাষ করা প্রয়োজন। বরং উল্টা করে বলা যায় আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যখন বিজ্ঞানীরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন পরিবর্তনসহিষ্ণু ফসল, সেখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনসহিষ্ণু ফসল হচ্ছে আখ এবং অন্যান্য মিষ্টি ফসল। আখের রস যেমন  পুষ্টিকর, আখের চাষও তেমনি লাভজনক। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হচ্ছে এলাকাভিত্তিক আখের জাত নির্বাচন করে তার ভালো বীজের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। মনে রাখতে হবে যে আখ চাষের উপকরণ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি-জ্ঞান এবং উৎপাদিত কাঁচামালের বাজার সবই আমাদের দেশেই যথেষ্ট ভালো রয়েছে। তাই দেশের যেকোনো এলাকায় আখচাষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। আর এটা করতে পারলেই দেশের চিনি ও গুড় এর জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং দারিদ্র্যবিমোচনেও যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

 

ড. মো. আমজাদ হোসেন১  ড. সমজিৎ কুমার পাল২
১মহাপরিচালক, ২পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা, ফোন : ০৭৩২৬৬৬৬২৮, ই-মেইল : bsridg123 @gmail.com

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook