কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

ভোজ্যতেল আমদানি কমাতে ধানের সাথে সরিষা চাষ

আবহমান কাল থেকে গ্রাম বাংলার মাঠে ঘাটে শীতকালে অসময় যত্রতত্র বুনে দেওয়া হতো সরিষার বীজ। কিন্তু পেট ভর্তি করে খাবার জন্য দানাশস্য বিশেষ করে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আমাদের জোর দিতে হয়েছিল। ফলে অনুর্বর প্রান্তিক জমিতে তেল ফসলকে চলে যেতে হয়। সরিষা এমন একটি ফসল যা কিনা শুধু ধানের জমিতে নয়, ধান ব্যতীত অন্যান্য ফসলের জমিতেও  ভালোভাবে যে ফলানো যায় তা খনার বচনে প্রমাণ পাওয়া যায়।
সরিষা বুনে কলাই মুগ
বুনে বেড়াও চাপড়ে বুক
যদি একই ক্ষেতে সরিষা ও কলাই মুগ বোনা যায় তাহলে এক সাথে দুটি ফসল পাওয়া যায় তখন চাষি আনন্দে বুক বাজায়।
খনা বলে চাষার পো
শরতের শেষে সরিষা রো।
শরৎকালের শেষে অর্থাৎ আশ্বিন মাসের শেষে সরিষা রোপণের বিশিষ্ট সময়। তবে জাত ও শস্যবিন্যাস ভেদে সরিষা  আগ-পিছ করে লাগানো যেতে পারে। সরিষার বপন সর্ম্পকেও  খনার বচনে সম্যক ধারণা দেওয়া হয়েছে।                                 
সরষে ঘন পাতলা নাই।
নেঙে নেঙে কার্পাস পাই।
কার্পাস বলে কোষ্টা ভাই।
জ্ঞাতি পানি না যেন পাই।
সরিষা বুন ঘন করে এবং রাই কিছু ফাঁক ফাঁক করে বপন করতে হয়। এমনভাবে কার্পাস লাগাতে হবে যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোলা যায়; কার্পাস ও পাট একই ক্ষেতে বোনা উচিত নয়। পাটের জলে কার্পাসের চাষ ক্ষতি করে।
ভোজ্যতেলের জন্য আমরা মারাত্মকভাবে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয় আমাদের। প্রতি বছর প্রায় ২.৩ থেকে ২.৪ মিলিয়ন টন ভোজ্যতেল আমাদের আমদানি করতে হয়, যার মধ্যে ৫৫-৫৮ ভাগ হলো ঢ়ধষস ড়রষ। আমাদের দেশের উৎপাদিত তেলের সিংহ ভাগ আসে সরিষার আবাদের মধ্য দিয়ে। ধানের জমির সাথে পাল­া দিতে গিয়ে সরিষার আবাদ যে বন্ধ হয়ে গেছে তা নয় বরং শস্য বিন্যাস বিশেষজ্ঞ (Croping System Specialist), কৃষি সম্প্রসারণবিদ ও বাংলার কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সরিষা চাষ এখনো ভালোভাবে চলছে। তবে সমস্যা হলো সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে সরিষার জন্য জমি বের করা। সরিষাভিত্তিক শস্য বিন্যাসে ২৪ ধরনের শস্য বিন্যাস রয়েছে যার মোট  জমির পরিমাণ ৫২০৪৭০ হেক্টর (সারণি-১)। যার মধ্যে সরিষা-বোরো-রোপা আমন শস্য বিন্যাস এর জমি ১৮৪৬২ হেঃ এবং সরিষা-বোরো-পতিত শস্য বিন্যাস এর জমি ১৪৩১৩০ হেঃ। আবার বোরো- পতিতরোপা আমন এর আওতায়  সারাদেশে রয়েছে মোট ২৩০৬০০৫ হেঃ জমি, যা প্রকৃত ফসলি জমির  ২৭ ভাগ।  এই শস্য বিন্যাসে   বোরোর পূর্বে সরিষা ফলাতে পারলে  মোট সরিষা উৎপাদন করা যায় প্রায় ২.৬০ মিলিয়ন টন যা থেকে বছরে প্রায় ১.০৪ . মিলিয়ন টন সরিষার তেল পাওয়া সম্ভব।
আমাদের দেশে রয়েছে তিন রকমের সরিষার প্রজাতি, কম বেশি তিনটি প্রজাতিই আবাদ করা হচ্ছে আমাদের দেশে। অনাদিকাল ধরে এদেশের কৃষকভাইরা যে সরিষা আবাদ করে থাকে তা হলো Brassica campestri/rapa প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। কৃষকদের বাছাই করে নেওয়া জাতগুলোর মধ্যে অন্যতম  দুটি জাত হলো টরি ৭ এবং রাই ৫ সরিষা।  রাই ৫ হলো Brassica juncia প্রজাতির স্থানীয় জাত। টরি সরিষাকে স্থানভেদে মাঘী সরিষাও  বলা হয়। এদের ফলন কম বটে তবে ভালো বৈশিষ্ট্য এই যে, ৭০-৮০ দিনের মধ্যে এদের ফসল সংগ্রহ করা যায়। ফলন হেক্টরে ১ টনের কম হলে কৃষক এদের আবাদ করে কারণ শীতকালে মূল ফসল করার ফাঁকে একটি ফসল পাওয়া যায়। সেচ, সার, আগাছা নিড়ানি তেমন লাগেনা বলে এসব জাতের প্রতি কৃষকের এতো আকর্ষণ। সরিষার তৃতীয় প্রজাতিটি  হলো Brassica napus । এটি ইউরোপের একটি উচ্চফলনশীল প্রজাতি। আমাদের স্বল্প মেয়াদি Brassica napus জাতের সাথে ইউরোপের জাতের সংকরায়ন ও ক্রোমোজমের দ্বিগুণিতক করে এবং তা থেকে  বাছাই করে আমাদের দেশের জন্য উপযোগী করে  Brassica napus সরিষা উদ্ভাবন করা হয়েছে।
মানুষ বাড়ছে জমি কমছে সেজন্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ আমাদের রয়েছে, ফলে অল্প জমিতে অধিক ফসল ফলানোর তাগিদও বাড়ছে। সে কারণে সনাতন কম ফলনশীল জাতের চাষ আমাদের কমাতে হচ্ছে। লক্ষ্য হচ্ছে এক জমি থেকে  বছরে তিন ফসল ফলানো। আর এজন্য এমন সব ফসলের জাত প্রয়োজন যেন জমি প্রস্তুতের সময় ব্যতীত বাকি সময়ে তিনটি ফসল কেটে নিয়ে আসা যায়। অনেক শস্য বিন্যাসে, যেমন  সরিষা-বোরো-রোপা আমন-এ তিনটি  ফসলের জাত এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন ৩২০-৩৪৫ দিনের মধ্যে তিনটি  ফসলই সংগ্রহ করা যায়। আর এভাবে সফলভাবে তিনটি ফসল ফলাতে পারলে  আমাদের  উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি -এর কৃষি সংক্রান্ত যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তা পূরণে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
ধান যেহেতু কৃষকদের প্রধান ফসল, তাই ধানের ফলন কমে যাক কৃষক সাধারণত তা চায় না। বরং মাঝখানে একটি বাড়তি ফসল পেতে চান কৃষক। ফলে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি কিন্তু অধিক ফলনশীল জাত পছন্দ করেন। ধানের স্বল্পমেয়াদি আমন ও বোরো ধানের জাত যথাযথ ভাবে  চাষাবাদ করতে পারলে ফলন খুব একটা না কমিয়ে ২৩০-২৫০ দিনের মধ্যে দুটি ধান ফসল সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব। কৃষকের কাছে সে রকম জাতের তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং শস্যবিন্যাসে এদের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা বড় প্রয়োজন। আর সেটা পারলে দুই ধানের মাঝখানে  ৮০-৯০ দিনের উচ্চফলনশীল সরিষার জাত আবাদ করা সম্ভব। আর এজন্য কৃষিতত্ত¡বিদদের এবং সম্প্রসারণবিদদের বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন  করতে হবে। জাত সম্পর্কিত তথ্যাদি ও জাতের বীজ যথাসময়ে কৃষকগনের মাঝে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। যাই হোক স্বল্পমেয়াদি অথচ অধিক ফলনশীল জাত কৃষকগণের হাতে পৌঁছে দেওয়া এবং সেগুলো যথাযথভাবে শস্যবিন্যাসে ব্যবহার করার পূর্বশর্ত হলো এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা পরিচালনা করা এবং তা চলমান রাখা।
আমাদের মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, বিভিন্ন সভা, সেমিনারে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছেন আমাদের ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং তা সম্ভব তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।  ভোজ্যতেলের জন্য বছরে আমাদের প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় এর সিংহভাগ খরচ হয় পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানি করতে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়  হলো আমদের দেশের কৃষি-পরিবেশ উপযোগী তেল উৎপাদনকারি  তেলবীজ ফসল যেমন-সরিষা, তিল, তিসি, সূর্যমুখী ইত্যাদি এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

ড. সত্যেন মণ্ডল১ ড. আমিনা খাতুন২ ড. মুহম্মদ নাসিম৩ ড. অভিজিৎ সাহা৪ ড. মোঃ শাহজাহান কবীর৫


১ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২,৩প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৪মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৫মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, মোবাঃ-০১৭১২৪০৫১৪৯, ইমেইল atyen1981@gmail.com

 

 

বিস্তারিত
পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ কলাকৌশল

পেঁয়াজ বাংলাদেশের একটি অর্থকরী মসলা ফসল। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই পেঁয়াজের চাষ হয়। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৈরী আবহাওয়া এবং বিভিন্ন রোগ ও পোকার আক্রমণ ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশে পেঁয়াজের জাতীয় গড় ফলন (৯.৭৩ টন/হেক্টর) বিশ্বব্যাপী গড় ফলন (১৭.২৭ টন/হেক্টর) অপেক্ষা কম। বর্তমানে দেশে ১.৭৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১৭.৩৮ লক্ষ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে (বিবিএস,২০১৮)। আমাদের দেশে যে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় তা দিয়ে দেশের মোট চাহিদার মাত্রা ৫৭.১৪% মিটানো সম্ভব। এ থেকে বোঝা যায় যে, দেশে পেঁয়াজের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। প্রতি বছর চাহিদা পূরণের জন্য বিপুল পরিমাণ কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা (৫০০-৬০০ কোটি টাকা) ব্যয় করে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজের বাল্বের ফলন বৃদ্ধির জন্য মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে আমাদের দেশে পেঁয়াজের বীজের ফলন হেক্টরপ্রতি গড়ে ২৫০-৩৭০ কেজি যা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম (ইৎধংিঃবৎ, ১৯৯৪)। বর্তমানে আমাদের দেশে উন্নত জাত, সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় সার, সেচ ও বালাই দমন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পেঁয়াজের বীজের ফলন বৃদ্ধিসহ মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন করা সম্ভব।
জাত ও বৈশিষ্ট্য : এ দেশে এখনও দেশী জাতের পেঁয়াজের চাষাবাদ হয়ে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র হতে বারি পেঁয়াজ-১ (শীতকালীন), বারি পেঁয়াজ-২, (গ্রীষ্মকালীন), বারি     পেঁয়াজ-৩ (গ্রীষ্মকালীন), বারি পেঁয়াজ-৪ (শীতকালীন), বারি পেঁয়াজ-৫(গ্রীষ্মকালীন) ও বারি পেঁয়াজ-৬ (শীতকালীন)  নামে  ৬টি জাত মুক্তায়িত হয়েছে।
আবহাওয়া : যে সমস্ত স্থানে খুব বেশি ঠাণ্ডা বা গরম পড়ে না এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয় না সে সব স্থানে পেঁয়াজ এবং বীজ খুব ভালো হয়। যেখানে বছরে ৭৫ থেকে ১০০ সেমি বৃষ্টিপাত হয় সে সব স্থানে পেঁয়াজ ভালো হয়।  বীজ উৎপাদনের  জন্য পুষ্পায়নের সময় মোটামুটি ঠাÐা তাপমাএা প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় ৪.৫ ডিগ্রি থেকে ১৪ ডিগ্রি সে তাপমাত্রায় প্রতিটি কন্দে অধিক সংখ্যক ফুল ও পুষ্ট বীজ গঠিত হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। এই ঠাÐা তাপমাত্রা উৎপাদন মৌসুমে বিশেষ করে জানুয়ারী - ডিসেম্বর  মাসে বিদ্যমান থাকে।
মাটি : পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাযুক্ত গভীর, ঝুরঝুরে হালকা দো-আঁশ বা পলিযুক্ত  মাটি পেঁয়াজ বীজ  চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। মাটির  পি এইচ ৫.৮-৬.৮ থাকলে পেঁয়াজের কন্দ ও বীজের ফলন ভালো হয়। যেসব জমিতে পানি জমে সে সব জমিতে পেঁয়াজ বীজ মোটেও ভালো হয় না।
বীজ উৎপাদন পদ্ধতি : বীজের ফলন যতগুলো  বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল তার মধ্যে বীজ উৎপাদন  পদ্ধতি অন্যতম । দুটি মৌলিক পদ্ধতির মাধ্যমে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন করা যায়:
১.বীজ থেকে বীজ এবং
২.কন্দ থেকে বীজ : উন্নত ও অধিক ফলনের জন্য কন্দ থেকে বীজ উৎপাদন পদ্ধতি সবচেয়ে উপযোগী হওয়ায় আমাদের দেশে  সাধারণত কন্দ থেকে বীজ উৎপাদন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
কন্দ থেকে বীজ উৎপাদন
মাতৃকন্দ সংগ্রহ : সাধারণত উৎপাদিত পেঁয়াজ ফসল থেকে মাতৃকন্দ সংগ্রহ  করা হয়। বীজ উৎপাদনের জন্য ৪-৬ সেমি. ব্যাসের কন্দ উপযুক্ত । বীজের বিশুদ্ধতার জন্য কন্দ উৎপাদন মৌসুমে সতর্কতার  সাথে অস্বাভাবিক পত্রগুচ্ছ, রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ গাছ ক্ষেত থেকে তুলে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। পরিপক্ব পেয়াজ কন্দ, চিকন গলা এবং রোগ মুক্ত পেঁয়াজের মাতৃকন্দ সংগ্রহ করতে হবে ।
মাতৃকন্দ সংরক্ষণ : পেঁয়াজ কন্দ উত্তোলনের পর এর পাতা ও শিকড় কেটে ৭-১০ দিন বায়ু চলাচল সুবিধা যুক্ত শীতল ও ছায়াময় স্থানে শুকিয়ে নিতে হবে । এরপর যথারীতি         মাতৃকন্দের জন্য বাছাই ও শ্রেণীবিন্যাস করে ঠাÐা ও বায়ুময় গুদামে সংরক্ষণ করতে হবে। মাঝে মাঝে পচা বা শুকনা পেঁয়াজ বেছে সরিয়ে ফেলতে হবে।
রোপণ মৌসুম : পেঁয়াজের রোপণ সময়ের ওপর বীজ উৎপাদনের অনেক প্রভাব রয়েছে। বেশি আগাম অর্থাৎ অক্টোবরের মাঝামাঝি পেঁয়াজ রোপণ করলে পুষ্পদÐে প্রতি কদমে ফুলের সংখ্যা অনেক কম হয় । আবার ডিসেম্বর মাসে রোপণ করলে গাছের বৃদ্ধি কম হয়। কদমে কম সংখ্যক ফুল আসে এবং পার্পল বø­চ রোগ ও থ্রিপস পোকার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া বিলম্বে রোপণ করলে বীজ ফসল কালবৈশাখী ঝড় ও শীলা বৃষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে । তাই অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বর মাসের  প্রথম হতে মাঝামাঝি পেঁয়াজের মাতৃকন্দ রোপণের উপযুক্ত সময়। এ সময়ে পেঁয়াজ কন্দ রোপণ করলে উক্ত বীজ ফসল খুব ভালো ফলন দেয়।
মাতৃকন্দ নির্বচান : পেঁয়াজের আকার ছোট হলে গাছ দুর্বল হয়। ফুলদÐ চিকন ও হালকা হয় এবং সহজেই বাতাসে ভেঙে পড়ে। তাছাড়া উক্ত ফুলদÐের কদমে ফুল কম ধরে ও ছোট হয় এবং বীজের ফলনও খুব কম হয়। বারি পেঁয়াজ-১ ও বারি পেঁয়াজ-৬ জাতের ৩০-৩৫ গ্রাম ওজনের কন্দ এবং তার ব্যাস যদি ৪.০ সেমি হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি বীজ উৎপন্ন হয়। বারি পেঁয়াজ- ২, বারি পেঁয়াজ-৩, বারি পেঁয়াজ-৪ ও বারি পেঁয়াজ-৫ জাতের ক্ষেত্রে ৪০-৪৫ গ্রাম ওজনের কন্দ থেকে সর্বাধিক পরিমাণ বীজ উৎপাদন হয়।
জমি তৈরি : বীজ উৎপাদনের জন্য জমি ভালোভাবে প্রস্তুত  করা দরকার যাতে মাটি নরম ও ঝুরঝুরে হয়।  সাধারণত    ৪-৫টি চাষ ও মই দিয়ে আগাছা বেছে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জমিতে ১০ মি. ী  ১.৫ মি. আকারের বেড করা প্রয়োজন। তিন বেড পরপর গভীর পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা রাখতে হবে । ভিজা মাটিতে পেঁয়াজ রোপণ করলে পচন রোগ হওয়ায় আশঙ্কা থাকে আবার জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রস না থাকলে গাছ সন্তোষজনকভাবে বাড়তে পারে না।
মাতৃকন্দ শোধন : প্রভেক্স-২০০ /আটোস্টিন/রোভরাল জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে মাতৃকন্দ শোধন করতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম প্রভেক্স-২০০ দ্বারা কন্দ ৫-১০ মিনিট চুবিয়ে রেখে শোধন করতে হবে।
মাতৃকন্দ রোপণ : সারি করে মাতৃকন্দ রোপণ করা উত্তম। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেমি. এবং কন্দ থেকে কন্দের দূরত্ব ২০ সেমি. হওয়া প্রয়োজন। অল্প গভীরে রোপণ করা কন্দ থেকে পেঁয়াজের ফুলদÐ বড় হলে বৃষ্টি বা সেচের পানিতে মাটি সরে গিয়ে গাছ পড়ে যায়।
মাতৃকন্দ বীজের পরিমাণ : বীজ উৎপাদনের জন্য আমাদের দেশে স্পেসিং ও মাতৃকন্দের আকারের ওপর ভিত্তি করে এক হেক্টর জমিতে ২৫০০-৩৫০০ কেজি মাতৃকন্দের প্রয়োজন হয়।
সেচ প্রয়োগ : পেঁয়াজ বীজের ফলন বৃদ্ধির জন্য সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় সেচ প্রদান করা প্রয়োজন। অনেক সময় কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি সেচ প্রদান করা হয়। যার ফলে ফলন কম হয় ও বীজের গুণগত মান হ্রাস পায়। পেঁয়াজের বৃদ্ধির চারটি পর্যায়ে সেচ প্রদান করা জরুরি। যথা (১) দৈহিক বৃদ্ধি পর্যায়, (২) পুষ্প দÐ বের হওয়ার সময় (৩) ফুল ফোটার সময় ও (৪) বীজের দানা গঠনের সময় প্রত্যেক ধাপে একটি করে মোট চারটি সেচ প্রদান করতে হবে। উক্ত চারটি ধাপে সেচ প্রদান করলে হেক্টর প্রতি পেঁয়াজের ফলন ৯০০-১০০০ কেজি পাওয়া সম্ভব, যা স্বাভাবিক ফলনের প্রায় ৩-৪ গুণ। একটি সেচের ক্ষেত্রে অবশ্যই পেঁয়াজের ফুল ফোটার সময় সেচ প্রদান কতে হবে।  কারণ পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের জন্য সেচ প্রদানে ক্ষেত্রে কিটিকাল প্রিয়ড হলো পেঁয়াজের ফুল ফোটার সময় (ঋষড়রিহম ঃরসব)। এ সময় ফসল সেচবিহীন রাখা যাবে না।
সার প্রয়োগ : পেঁয়াজের বীজ ফসলের সময়কাল দীর্ঘ, ১৫০-১৬৫ দিন। সে জন্য বীজ উৎপাদনে সারের প্রয়োজন অনেক বেশি। নি¤েœ হেক্টরপ্রতি সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি উল্লেখ করা হলোঃ
বীজ উৎপাদন মাঠের স্বতন্ত্রীকরণ : পেঁয়াজ সাধারণত পর পরাগায়িত উদ্ভিদ, সেজন্য প্রতিবেশী পেঁয়াজ ক্ষেত থেকে পরাগায়িত পোকা ও বাতাসের মাধ্যমে পরাগায়িত হয়ে এর স্বতন্ত বৈশিষ্ট্য লোপ পেতে পারে । দুটি ভিন্ন জাতের পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের জন্য স্বাতন্ত্রীকরণ দূরত্ব ১০০০ মি. হওয়া বাঞ্ছনীয়। বীজের বিশুদ্ধতার জন্য এটি অপরিহার্য।
অনাকাক্সিক্ষত পেঁয়াজ গাছ উত্তোলন : পেঁয়াজের ফুল ফোটার পূর্বেই রোগাক্রান্ত চিকন বা সরু পুষ্পদÐসহ অপুষ্ট পেঁয়াজ গাছ ক্ষেত থেকে তুলে তা ধ্বংস করতে হবে। উন্নতমানের বীজ উৎপাদনের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । গাছের দৈহিক বৃদ্ধির পর্যায়ে ও ফুল ফোটার সময় এই কাজটি করতে হবে।
মাধ্যমিক পরিচর্যা : সেচের পর মাটির জো দেখে নিড়ানি দিয়ে মাটি আলগা করে দিতে হবে। পেঁয়াজের বীজ ফসল আগাছামুক্ত রাখা এবং পেঁয়াজের পুষ্পদণ্ড যাতে বাতাসে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য ঠেকনার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে।
পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের বর্ডার ফসলের প্রভাব : পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে পলিনেটরদের মোভমেন্ট/ভিজিট এর ওপর নির্ভর করে। কারণ পেঁয়াজ পরপরাগায়িত ফসল। পেঁয়াজের পলিনেশন প্রটেনড্রাই প্রকৃতির, তাই পেঁয়াজে পরপরাগায়ন হয়। এই পরপরাগায়ন ১০০ ভাগ বিভিন্ন পোকা যেমন- মাছি, হাউজফ্লাই, ব্লোফ্লাই, সিরফিড ফ্লাই ইত্যাদি দ্বারা হয়ে থাকে। পেঁয়াজের ফুল সাদা হওয়ায় ফুল ফোটার সময় অনেক ক্ষেত্রে পলিনেটিং পোকার ভিজিট কম হয়। সে ক্ষেত্রে পেঁয়াজের সাথে মৌরী, ধনিয়া, শলুক ইত্যাদি চাষ করে পলিনেটিং পোকাকে পেঁয়াজের পরাগায়নে আকৃষ্ট করা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১০ সারি পেঁয়াজের পর ২ সারি মৌরী, শলুক, ধনিয়া চাষ করলে পেঁয়াজের পলিনেশনকারী পোকার ভিজিট বৃদ্ধির কারণে পেঁয়াজের সীড সেট ভালো হয় এবং বীজের ফলন বৃদ্ধি পায়। শলুক ও মৌরী পেঁয়াজ রোপণের দিনেই বপন করতে হবে। ধনিয়া, পেঁয়াজ রোপণের ২০-২২ দিন পর বপন করতে হবে।
বীজ সংগ্রহ, শুকানো ও সংরক্ষণ : বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে বীজ সংগ্রহ করলে বীজের গুণগত মান ভালো হয়। পেঁয়াজের বীজ পরিণত হলে ফুলের মুখ ফেটে যায় এবং কালো বীজ দেখা যায়। শতকরা ২০-২৫ ভাগ কদমের মুখ ফেটে কালো বীজ দেখা গেলে তা সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একই সময়ে পেঁয়াজের সব পুষ্পদÐের বীজ পরিপক্ব হয় না বিধায় ২-৩ বার বীজ তোলা হয়। পুষ্পদÐের নিচ থেকে কদমের ৫-৭ সেন্টিমিটার অংশসহ পরিপক্ব কদমগুলো তুলে নিতে হয়। এগুলো কয়েক দিন রোদে ভালোভাবে শুকানোর পর ঘষে খোসা থেকে বীজ আলাদা করে পরিষ্কার করা হয়। জাতভেদে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৬০০-১২০০ কেজি পর্যন্ত বীজ উৎপাদন সম্ভব হয়। সংগৃহীত বীজ আরো ২-৩ দিন রোদে শুকিয়ে বীজের আর্দ্রতা ৬-৭% এ কমিয়ে ও ঠাÐা করে বায়ুনিরোধক পলিথিন ব্যাগে ভরে সিল করে টিন অথবা প্লাস্টিকের পাত্রে ভরে শুকনো জায়গায় সংরক্ষণ করতে হবে।
রোগবালাই
পার্পল বøচ (চঁৎঢ়ষব ইষড়ঃপয): অলটারনারিয়া পোরি (অষঃবৎহধৎরধ ঢ়ড়ৎৎর) নামক ছত্রাক দ্বারা এই রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত বীজ, বায়ু ও গাছের পরিত্যক্ত অংশের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। এই রোগের আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে গাছের পাতা বা পুষ্পদÐে ছোট ছোট পানি ভেজা দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে দাগগুলো ধীরে ধীরে বড় হয়। অনুক‚লে আবহাওয়ায় পাতা বা পুষ্পদÐে এক বা একাধিক দাগ পড়ে এবং তা দ্রæত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত আক্রান্ত পাতা ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে হলুদ হয়ে মরে যায়। পুষ্পদР ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হলে তা ভেঙে পড়ে, বীজ পেঁয়াজ পূর্ণতা প্রাপ্ত হতে পারে না এবং এতে বীজ উৎপাদন মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়।
দমন : সুস্থ, নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। রোভরাল নামক ছত্রাকনাশক কেজিপ্রতি ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম রোভরাল এবং ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর ৫-৬ বার গাছে স্প্রে করতে হবে।  
পোকমাকড়
থ্রিপস পোকা : আক্রান্ত পাত রূপালী রঙের অথবা পাতায় ক্ষুদ্রাকৃতির বাদামি দাগ বা ফোঁটা দেখা যাবে। পাতা শুকিয়ে বিকৃত হতে পারে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হলে কন্দের আকার ছোট ও বিকৃত হয়।
দমন : সাবান মিশ্রিত পানি ৪ গ্রাম/লিটার হারে প্রয়োগ করা যেতে পারে। নীল অথবা সাদা আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করে এই পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এক কেজি আধা ভাঙা নিমবীজ ২০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি (ছেঁকে নেয়ার পর) পাতার নিচের দিকে স্প্রে করা। আক্রমণ বেশি হলে জৈব বালাইনাশক স্পিনোসেড (সাকসেস) ১ লিটার পানিতে ১.২ মিলি হারে ৭-১০ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে উপরে উল্লিখিত কীটনাশক বর্ণিত হারে ফুল ফোটার আগে স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ কমানো যায়। কিন্তু ফুল ফোঁটার পর পোকার আক্রমণ দেখা গেলে বিকেল ৫টার দিকে স্প্রে করা যেতে পারে।

ড. মোঃ নুর আলম চৌধুরী

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মসলা গবেষণা কেন্দ্র, শিবগঞ্জ, বগুড়া, মোবা: ০১৭১১২৪৬৩৫২, মেইল:  dmnalam@yahoo.com

 

বিস্তারিত
পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্যের উন্নয়ন

পরিবেশ ও ঋতু বৈচিত্র্যের ধরনের আমূল পরিবর্তন আজ সহজে অনুমেয়। কখনো কখনো গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সে.। সকালে আকাশে সামান্য মেঘের ঘনঘটা থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন বা জলবায়ুর পরিবর্তন আজ বিশ্বে এক বহুল আলোচিত ও ভাবনার বিষয়। জলবায়ুর পরিবর্তন তথা উষ্ণায়ন পৃথিবীব্যাপী আতঙ্কের বিষয়ও বটে।
বিগত সত্তর দশকে আমরা আমাদের ছেলেবেলায় তাপমাত্রার এত পরিবর্তন কখনও দেখেনি। ঋতু বৈচিত্র্যের এমন খামখেয়ালিপনাও লক্ষ করা যায়নি। তবে আমার যতদূর মনে পড়ে ৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে গ্রীষ্মকালে কখনও এখনকার মতো এত গরম অনুভব করিনি। তখন চৈত্র-বৈশাখ মাসে বিলে, খালে, পুকুর এবং নদীতে প্রচুর পানি থাকতো। ওই সময় বিলে বাঁওড়ে মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। স্বাভাবিক নিয়মে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচুর বৃষ্টি হতো। আর জ্যৈষ্ঠ মাসের বৃষ্টি তো রীতিমতো জ্যৈষ্ঠ ঢল নামে পরিচিত ছিল। এ সময় জ্যৈষ্ঠ ঢলে বিল-পুকুর অনেক সময়  এক দিনেই ভরে যেত। বৃষ্টির ঢলে শুকনো মাঠের ও বিলের কিনারে বৃষ্টির সাথে কই, শিং, বাইন ও টাকি মাছের দেখা মিলতো। এসব মাছ ফাল্গুন-চৈত্রে মাটির নিচে গর্তে থাকত। তখন মাটির নিচে পানির স্তর বা ধিঃবৎ ঃধনষব বড় জোর ১ থেকে ১.৫ মিটার নিচে থাকত। কিন্তু বর্তমানে মাত্র চার দশক পার হতে না হতেই মাটির নিচে বর্তমানে মাটির নিচে অনেক স্থানে গভীর নলক‚পেও খরা মৌসুমে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে গভীর নলক‚পেও সেচের পানির মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় মাটির নিচে বর্তমানে গর্তে জীবিত কোনো মাছ বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে এখন যদিও বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠে মুষল ধারায় বৃষ্টি হয় তবুও আগের মতো গর্ত হতে মাছ বের হয়ে পানির সাথে সাথে মাছের দেখা মেলে না; জলাশয় বা পুকুর মাছে ভর্তি হয়ে যায় না। ঋতু পরিবর্তনের কথা এবং পরিবেশ বিপর্যয়, বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ বর্তমানে বহুল আলোচিত বিষয়। মনুষ্য সৃষ্ট কারণ ও  বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর প্রত্যক্ষও পরোক্ষ প্রভাবের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে।
স্বাধীনতা উত্তরকালে আমাদের দেশে অনেক রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভাট, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাত কোটি লোক যেখানে দুইবেলা পেট ভরে খাবার পেত না; আজ সেখানে আনুমানিক ১৬ কোটি লোক তিন বেলা পেট ভরে ভাত ও পছন্দ  মতো খাবার খেতে পারছে। বর্তমানে মাথাপিছু জাতীয় আয় ১৯০৯ মার্কিন ডলার, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩২.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নতি হয়েছে (সূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯)। এখন বিভিন্ন শহরে গগনচুম্বী অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। গ্রামের মানুষও এখন আর কয়লা বা ছাই দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করে না। কুলি-মজুর থেকে শুরু করে সবাই সাবান, শ্যাম্পু, পেস্ট, ব্রাস ব্যবহার করে। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। গাড়ি চড়ে একদিনে ৩টি বিভাগীয় শহরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। বিমান, প্রাইভেট হেলিকপ্টার ইত্যাদি ব্যবস্থা হয়েছে। রাস্তায় যাতায়াতের জন্য এসি বাস, ডেমো ট্রেন, মাইক্রোবাস ও নদী পথে স্পিডবোট ও এসি লঞ্চে ভ্রমণ করা সম্ভব হচ্ছে। ১৯৮০ সালে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় গ্যাসসংযোগ হয়নি। অনেক বাসায় যেমন আগারগাঁও-শেওড়াপাড়ার মতো এলাকায়ও বিদ্যুৎসংযোগ ও তেমন বসতি ছিল না। উঁচু ভবন ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। তাও আবার   ৪-৫ তলার ঊর্ধ্বে নয়। তখন ঢাকায় অনেক অভিজাত এলাকাতেও কাঠের চুলায় রান্না হতো। কিন্তু এখন? ঢাকার অবস্থার কী অভাবনীয় পরিবর্তন! যানজট নিরসনে বিদেশি আদলে দীর্ঘ উড়াল সেতু, ঊষবাধঃবফ  বীঢ়ৎবংং ধিু, দুর্ঘটনা এড়াতে দৃষ্টি নন্দন ফুট ওভার ব্রিজ, বহু উঁচু ভবন, বিনোদন পার্ক, ইকোপার্ক নির্মাণ হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হচ্ছে তা বোধ করি স্বয়ং রাজউক বা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনও এ টঢ়ফধঃব তথ্য দিতে হিমসিম খাবে। আর গাড়ির সংখ্যা তো বলে শেষ করার নয়।
আজ আমাদের দেশে ধানের ফলন ও উৎপাদন অনেক গুণ বেড়েছে, যা প্রায় ৪১৩.২৫। আলু উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ টনের বেশি পরিমাণ, যা আমাদের সরকার, কৃষি বিভাগ এবং আমাদের সচেতন কৃষকদের ঐকান্তিক চেষ্টা, শ্রম, সাফল্যের ফসল ও কৃতিত্ব। সুতরাং এখানে কয়েকটি ভধপঃড়ৎ বেশি কাজ করে। তা হলো মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাটি ক্ষয়রোধ, সেচ ও নিকাশ সঠিক ভাবে করা। এ জন্য দরকার উপযুক্ত জাতের উন্নত বীজ, বীজ বপন, চারা রোপণ, কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার ও সঠিক পরিচর্যা। এখানে একটি বিষয় হলো কীটনাশক ব্যবহার না করলে ফসল ভালো হয় না । এমনকি কীটপ্রতঙ্গ ও ছত্রাকে সারা ক্ষেত বিনাশ করে দিতে পারে। এখন এগুলো দমন করতে গেলে মাটিতে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাখ লাখ ইরড়সং বা গরপৎড়নবং  আছে তার মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সেদিকে লক্ষ্য রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা বাঞ্চনীয়। এখানে উৎপাদন বাড়াতে গেলে  মাটির জীবাণু ও কীট-পতঙ্গের  কিছু ক্ষতি হতে পারে যা পরিবেশের বিরূপ প্রভাব পড়ে কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে, বাঁচার প্রয়োজনে পরিবেশ সুরক্ষায় সহনীয় পর্যায়ে সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে মাটিতে সার ও কীটনাশক যেমন ব্যবহার করা উচিত তেমনি শিল্প ও   কলকারখানা স্থাপন, ভবন নির্মাণ, বিপণি বিতান প্রতিষ্ঠা সুষ্ঠু ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থাপন করা বাঞ্ছনীয়।
আমরা জানি সব উন্নয়নের মূলে কিছু ক্ষতিকর প্রভাব থাকে এবং এ ক্ষতি কিছুটা হলেও আমাদের সহ্য করতে হবে। কারণ শিল্পায়ন ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত অন্যায়। সে কারণে ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ প্রয়োজন। কারণ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ংযড়ঁষফ হড়ঃ নব ংঃড়ঢ়বফ. সব কিছু করার আগে আমাদের নৈতিকতা বা গড়ৎধষরঃু এর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সবার আগে দেশকে ভালোবাসতে হবে ও পরিবেশ সুরক্ষায় সবাইকে নজর দিতে হবে। পরনির্ভরশীলতা কমাতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ শিশু হাঁটা শিখে চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকে না। আপন মনে চলতে চায় নিজ পরিমÐলে। এখানে শুধু সরকার বা শিল্প উদ্যোক্তাকে দোষারোপ করলে চলবে না। এমনকি, রাস্তায় থুথু ফেলা থেকে শুরু করে চকোলেটের খোসা ফেলা বন্ধ করা এবং যত্রতত্র আবর্জনা ও মলমূত্র ত্যাগ করা, কলার খোসা ফেলা, বোতল নিক্ষেপ করা এসব ধরনের কাজও পরিত্যাগ করতে হবে। বর্তমানে আমাদের প্রায় ১ কোটি লোক বিদেশে অবস্থান করে। তারা যথেষ্ট সচেতন। ঘধঃঁৎব বদলের সাথে সাথে তাদের মতো আমজনতার চরিত্রও বদল করতে হবে। সবাইকে পচ্ছিন্ন পরিবেশ সুরক্ষায় মনোযোগী হতে হবে। মানবকে প্রকৃতি প্রেমিক হতে হবে; পরিবেশবান্ধব হতে হবে এবং প্রকৃতির সাথে সংযোগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। এখানে ধনী-গরিব বলে কথা নয়। পরিবেশ উন্নয়ন ও সুস্থ পরিবেশ সুরক্ষায় সবার একান্ত চেষ্টা, শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তবেই পরিবেশ উন্নয়ন সম্ভব। শুধু আইন প্রণয়ন করে শতভাগ পরিবেশ উন্নয়ন ও সুরক্ষা করা যাবে না। ধূমপান নিষিদ্ধের আইন করেও ধূমপান করা থেকে বিরত রাখা যায়নি। প্রায় অধিকাংশ ধূমপায়ী জনসম্মুক্ষে ধূমপান করে থাকে। এক্ষেত্রে জনগণের স্বাস্থ্য, পরিবেশ সচেতনতা ও আইনের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
আমরা জানি গাছ আমাদের পরিবেশ উন্নয়নের অনন্য বন্ধু। তপ্তদুপুরে ক্লান্ত পথিকই কেবল বোঝেন বট-বৃক্ষের নিচে কত আরাম ও শ্রান্তি। গাছ বায়ুমÐল শীতল রাখে। গাছ পশুপাখির আশ্রয় ও খাদ্য এবং অক্সিজেন যোগান দেয়। গাছ সূর্যালোকের সাহায্যে বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে সালোক সংশ্লেষণ এর মাধ্যমে শর্করা জাতীয় খাদ্য প্রস্তুত করে এবং শ্বসন প্রক্রিয়ায় পরিবেশে ও অক্সিজেন এর ভারসাম্য রক্ষা হয়। কিন্তু আমরা অপরিকল্পিতভাবে নির্বিচারে গাছ কেটে বৃক্ষ নিধন করছি। ফলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলছি এবং এৎববহ যড়ঁংব বভভবপঃ -এর ফলে ওজন স্তরে ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে এবং পৃথিবীর পরিবেশ বাসযোগ্যহীন হয়ে উঠছে। মাটিতে ডধঃবৎ ঃধনষব বা পানির স্তর উন্নয়নে গাছ ভ‚মিকা পালন করে। মৃত্তিকার বীর সন্তান গাছ; আসলে গাছ আমাদের নিত্যদিনের বন্ধু। গাছ আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসা, শিক্ষা উপকরণ, আসবাবপত্র সর্বোপরি জীবন রক্ষা করে। অর্থাৎ জন্মের পর দোলনা হতে মৃত্যুর পর খাটিয়া, কবর ও হিন্দুদের সৎকার পর্যন্ত গাছের প্রয়োজন। যত্রতত্র গাছ থাকলে আশপাশের ময়লা আবর্জনা খেয়ে কাক-পক্ষি, পশু-পাখি ও ক্ষুদ্র্র গরপৎড়ড়ৎমধহরংস অতি দ্রæত আবর্জনা উবপড়সঢ়ড়ংব করে ওহড়ৎমধহরপ বস্তুকে অতিদ্রæত ঙৎমধহরপ ঈড়সঢ়ড়ঁহফ এ পরিণত করতে পারে। এর ফলে বায়োগ্যাস প্রস্তুত করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। অবশিষ্ট অংশ মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার সঠিক বাস্তবায়নের জন্য ঠবৎসর পড়সঢ়ড়ংঃ সবঃযড়ফ প্রয়োগ করে জৈবসার উৎপাদন এবং সাথে সাথে পরিবেশ উন্নয়ন করা সম্ভব। যাহোক গাছ যে পরিবেশ সুরক্ষা, শীতল বায়ু সৃজন, বৃষ্টিপাতের নিয়ামক ও ঝড়ঝঞ্চা প্রতিরোধে একক রক্ষা বুহ্য তা আর আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে সুন্দরবন ও উপক‚লীয় সৃজিত ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের বিশাল রক্ষা বুহ্য বা ঝযবষঃবৎ নবষঃ । যে কারণে সিডর, সাইক্লোনসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে বাংলাদেশ রক্ষা পাচ্ছে।
পরিবেশ উন্নয়ন ভাবনা এবং জনসংখ্যার চাপ এ দু’টি বিষয় আজ সচেতন সব মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। দ্রæত নগরায়ন ও সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সবার কাম্য। কিন্তু আমরা সারা দেশের জেলা ও উপজেলা শহরে দেখতে পাই, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় সীমিত পরিসরে গণসৌচাগার এর ব্যবস্থা করে থাকে। অনেক স্থানে তাও নেই। আর থাকলেও
ব্যবহার অনুপযোগী। অনেকটা পুরনো দিনের রেলস্টেশনের টয়লেটের মতো। তবে উন্নত পরিবেশ ও পরিচ্ছন্ন নগরী সৃষ্টির জন্য সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব বেতনধারী ংঃধভভ ওহফরমবহঁং ভৎঁরঃং দিয়ে মার্কেট বিপণি বিতানসহ যেখানে লোক সমাগম আছে সেখানে উন্মুক্ত পরিচ্ছন্ন টয়লেট স্থাপন ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার জন্য স্থায়ী লোক নিয়োগ করে পরিচ্ছন্ন নগরী ও পরিবেশ উপহার দেয়া সম্ভব। কারণ আমরা জানি পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কেউ থুথু ও পানের পিক ফেলে না। ময়লা আর্বজনা ফেলতেও ভয় সংকোচ করে। আশার কথা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় ও মাননীয় যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরর বিশেষ চেষ্টায় ঢাকা গাবতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও প্রায় সব রেলস্টেশনের টয়লেট ব্যবহার উপযোগী হয়েছে এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে।
পরিবেশ ক্রমান্বয়ে বৈরী হয়ে উঠছে। উষ্ণ হচ্ছে সারা দেশের পরিবেশ। মরে যাচ্ছে খাল-নদীসহ বড় বড় গাছপালা, মাটির ক্ষুদ্র জীবাণু ও বন্য জীব জন্তু। কাজেই দ্রæত উত্তোরণের জন্য নদী, খাল, বায়ু তথা পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। ময়লা, আবর্জনা, বর্জ্য, মলমূত্র, চিকিৎসা বর্জ নদী, খাল-বিল ও যত্রতত্র ফেলা যাবেনা। আবর্জনা ও বর্জ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রিসাইক্লিং ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে।  খাল ও নদী পুনঃখনন করে নাব্যতা বাড়াতে হবে ও বৃষ্টির পানি দ্রæত নিঃষ্কাশন করতে হবে। ফাঁকা জায়গায় দ্রæত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ রোপণ করতে হবে। নদী ও খাল পাড়ে দ্রæত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ রোপণ ও সেচ নিকাশের ব্যবস্থা ও যতœ-পরিচর্যার মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করে সবুজ নগরায়ন গড়ে তুলতে হবে।
উন্নত বিশ্বের জলবহুল শহর যেমন- সাংহাই, টোকিও প্রভৃতি শহরে যেভাবে মলমূত্র ও আবর্জনা ব্যবস্থাপনা করা হয় সেভাবে করতে হবে। আমরা জানি জমিতে অধিক পরিমাণ ফসল ফলাতে হলে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অধিক সার ও পুষ্টি সরবরাহ, সেচ ও পরিচর্যা করা পরীক্ষিত সত্য। আবার যে গাভী অধিক দুধ দেয় তার জন্য প্রচুর খাবার জোগান দিতে হয়। যত সমস্যাই থাকুকনা কেন আমাদের সবার সচেতনতা, দায়িত্ব-কর্তব্য, শিষ্ঠাচার, শৃঙ্খলা,বিবেক-বুদ্ধি, নৈতিকতা, সততা সবকিছুর সমন্বয়ে বনায়ন, বন সংরক্ষণ, পরিবেশ উন্নয়নও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা অতি জরুরি। সে জন্য সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মুক্ত মৃদুমন্দ বাতাস, বনজ, দৃষ্টিনন্দন ও ফুলেল পরিবেশ কাম্য। সবার একান্ত আগ্রহ, প্রচেষ্টা, উদ্যোগ, অনুসরণ, অনুকরণ, দৃষ্টান্ত ও অনুরণন আবশ্যক।
দ্রæত বর্ধনশীল ও অধিক মূল্যবান  প্রজাতির গাছের চারা দ্বারা ফাঁকা জায়গা ও চর বনায়ন করে এবং জেগে ওঠা নদী ও চরে উপযুক্ত প্রজাতির দ্বারা সবুজের সমারোহ গড়ে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির দ্বারা উপক‚লীয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বনায়ন করলে গাছের শ্বাসমূল (চহবঁসধঃড়ঢ়যড়ৎব) বাইরে থাকার ফলে ভ‚মিক্ষয় ও নদী ভাঙন রোধ হয়। এ প্রক্রিয়ায় বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠা চরে ও উপক‚লীয় এলাকায় বনায়ন করে সবুজায়ন ও ঝযবষঃবৎনবষঃ গড়ে তোলা সম্ভব। রাস্তা, রেললাইন, বাঁধ, স্কুলসহ  সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফাঁকা জায়গা ফলদ ও বনজ প্রজাতির দ্বারা বনায়ন করে বনভূমির আয়তন শতকরা ১৭ ভাগ হতে ৩০ ভাগের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া এবং প্রাণ বৈচিত্র্যের উন্নয়ন ঘটানো দরকার। আমাদের  দেশি আদি ফল (ওহফরমবহড়ঁং ভৎঁরঃং) ও ফসল যেমন- শরিফা, আতা, ডেউয়া, জাম, গাব, কাউ, আশঁফল, জামরুল, জাম্বুরা, চালতা, কামরাঙা, সফেদা, আমড়া, কুল, টক বরই, বেল প্রভৃতির সংরক্ষণের জন্য বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে আবাদ করে ভিটামিন, পুষ্টি  ও ওষুধি গুণাগুণ বৃদ্ধিকরণের মাধ্যমে পাখপাখালির প্রাচুর্যতা তথা জীববৈচিত্র্যের উন্নয়ন ঘটানো আবশ্যক।
সবার একান্ত চেষ্টা, শ্রম, মেধা ও উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রযুক্তিসমূহের সফল বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে  বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্য  ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। কাজেই বলতে হয়-
সুস্থ দেহ, উন্নত মন,
গড়ে তুলব বাসযোগ্য ভুবন।

  ড. আ স ম হেলাল সিদ্দীকি

সিনিয়র রিসার্চ অফিসার, ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, মুজগুন্নী, খুলনা-৯০০০,  মোবা : ০১৭১৮৫০৩৪৪৯, ই-মেইল : helalrobfri@yahoo.com

বিস্তারিত
নিরাপদ দেশি ফলের চাষ দেবে পুষ্টি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি

(ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ-২০১৯ উপলক্ষ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ‘খ’গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকারী)

ভ‚মিকা : বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু ফল আবাদের জন্য উপযোগী। বর্তমানে সারাদেশে ১৩০ প্রজাতির ফলের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রতি বছর ৭০ প্রজাতির প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফলের আবাদ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হচ্ছে। ফল একটি অর্থকরী ফসল। ফলগাছ অন্যান্য গাছের ন্যায় কাঠ দেয়, ছায়া দেয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। নিয়মিত ফল খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ সবল জীবন লাভ করা যায়। বাংলাদেশে প্রায় ৮৮ ভাগ মানুষ ভিটামিন এ, ৯০ ভাগ মানুষ ভিটামিন সি, ৯৩ ভাগ মানুষ ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগে। আমাদের দেশে এ পুষ্টি ঘাটতি পূরণে ফল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে। তাই অতীতে বলা হতো-
‘যদি বাঁচতে চাও,
যত পার সবজি আর ফল খাও।’
শরীরের চাহিদামতো প্রতিদিন নিয়মিত ফল গ্রহণ করলে সুস্থ ও সবল দেহ নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। সারাদেশে প্রত্যেক বছর উৎপাদিত ফলসমূহ বর্তমানে দেশের মানুষদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণের সাথে সাথে দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করছে। প্রতি বছর বিদেশি ফল আমদানিতে প্রচুর অর্থের ব্যয় হয়। তাই বর্তমানে নিরাপদ দেশি ফলমূল দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রেখেছে।
ফল একটি রোগ প্রতিরোধক খাদ্য : ফলকে রোগ প্রতিরোধক খাদ্য বলা হয়। ফল আমাদের শরীরে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে। অথচ আমরা ফলকে গুরুত্ব দেই না।       পুষ্টিবিদরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের দৈনিক প্রায় ২০০ গ্রাম ফল গ্রহণ করার সুপারিশ করেছেন। ফলে দেহের জন্য অপরিহার্য প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খলিজ লবণ ও আঁশ থাকে। এসব পুষ্টি উপাদান রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও খাদ্যদ্রব্য হজম, পরিপাক, বিপাক, খাবারে রুচি বৃদ্ধি বদ হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করে। ফলের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করার কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো-
আমাদের মোট খাদ্যের শতকরা ১ ভাগ আঁশ থাকা উচিত। আঁশ হজম, পরিপাক ও বিপাক প্রক্রিয়ায় সাহায্য এবং শর্করা, চর্বি ও আমিষ দহনে সহায়তা করে। এছাড়াও খাদ্যের আঁশ মলাশয়ের ক্যান্সার, বহুমূত্র, এপেন্ডিসাইটিস, মূত্রনালিতে পাহারসহ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে শরীরকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সাবলীল করে রাখে।  দেশীয় হলুদ রঙের ফলে প্রচুর পরিমাণ ক্যারোটিন (প্রাক  ভিটামিন এ) থাকে। ভিটামিন এ রাতকানা রোগ ও অন্ধত্ব হতে প্রতিরোধ
করে। এছাড়াও ফলের ভিটামিন বি-১ খাদ্যদ্রব্যকে রূপান্তর, হজম ও মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে।   

দেশে নিরাপদ ফল চাষ : বাংলাদেশ আর্দ্র ও উষ্ণ মÐলীয় দেশ। এদেশের উর্বর মাটি প্রায় সব ধরনের গ্রীষ্ম ও অগ্রীষ্ম মÐলীয় ফল চাষের অনুক‚লে। বর্তমানে এদেশের যে পরিমাণ ফল উৎপাদিত হয় তা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত মাত্রার মাত্র ৩৫% পূরণ করতে পারে। অবশিষ্ট ৬৫% ঘাটতি বিধায় দেশি ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রসারণ কাজের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চল, পতিত জমি, বসতবাড়ি প্রভৃতিসহ বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এদেশে দেশি ফলের গড় ফলন অত্যন্ত কম। উন্নতজাতের চাষ, কলমের চাষ, উন্নত চাষাবাদ ও নিবিড় পরিচর্যা, সঠিক রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
মাঠ ফসলের তুলনায় ফলের চাষ অধিক লাভজনক। তাই সম্প্রতিকালে বিভিন্ন ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা ও কুলের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোথাও অপ্রচলিত বাগান হচ্ছে না। ফলশ্রæতিতে বাণিজ্যিক চাষাবাদের কারণে অপ্রচলিত অনেক ফল ভবিষ্যতে দেশ থেকে বিলীন হওয়ার এক অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে আপেলকুল, বোম্বে লিচু, থাই পেয়ারা ইত্যাদি ফল উৎপাদন এক বিরাট সারা জাগিয়েছে দেশে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০২০ সালে ১৭ কোটি ছাড়িয়ে যাবে এবং জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম হিসেবে ফলের চাহিদা বাড়বে ৭৫ লাখ টন।
১২ মাসের নানান ফল : ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। প্রায় ১৩০ প্রজাতির ফল জন্মে এ দেশে এর মধ্যে ৬০টি হলো বুনো ফল বনে জন্মে। প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ ফল উৎপাদিত হয় গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতুতে। ফল উৎপাদনের প্রধান মাস হলো জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস। বেশি উৎপাদনের কারণে একদিকে ফলের প্রাপ্যতা বেড়ে যায়। এ দুই মাসে বেশি ফল খেতে পারলেও বাকি দশ মাসে সন্ধান মেলে অল্প কিছু সংখ্যক ফলের। শীতকালে কমলা আর কুল ছাড়া অন্য কোনো ফল পাওয়া মুশকিল হয়ে পরে। অবশ্য কলা ও পেঁপে বারো মাসই উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি গবেষণার সুবাদে এখন বছরে ৭ মাসে আম পাওয়া যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি তথা হরমোন ব্যবস্থা ব্যবহার করে বছরে বারো মাসই আনারস উৎপাদিত হচ্ছে। প্রধান উৎপাদন মৌসুম ছাড়াও অন্যান্য মৌসুমে ফল উৎপাদন করতে পারলে তা ফলের বাড়তি উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকদের অধিক লাভবান করতে পারে। বারো মাসে থাই পেয়ারা উৎপাদনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এজন্য ফল চাষি ও বাড়ির গৃহস্থদের একটু পরিকল্পনা করে ফল চাষ করতে হবে। একই ফলের বিভিন্ন জাত লাগিয়েও কয়েক মাস ধরে ফল পাওয়া যায়।
ফল চাষের বর্তমান অবস্থা : দেশি ও বিদেশি ফলসহ বাংলাদেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল জন্মে থাকে। প্রচলিত ফলের মধ্যে কলা, আম, আনারস, পেয়ারা, পেঁপে, লেবু, বাতাবি লেবু, লিচু, কুল, নারকেল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে বহু রকমের ফল উৎপাদনের সত্তে¡ও মাথাপিছু দৈনিক ফলের প্রাপ্যতা মাত্র ৩৫-৪০ গ্রাম যা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত ন্যূনতম চাহিদা মাত্রার অনেক কম (১১৫-১২০ গ্রাম) বর্তমানে বাংলাদেশে ১.৪৪ লাখ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ২২ লাখ টন ফল উৎপাদন হয়। অথচ দরকার প্রায় ৬৭.০ লাখ মেট্রিক টন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ফলের প্রাপ্তির পরিমাণ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে যে সব ফল উৎপাদন হয় তার মধ্যে তরমুজ, আম, জাম, কলা, কাঁঠাল, নারকেল, পেয়ারা ও আনারস এই সাতটি ফলের উৎপাদন ১৭.৫ লাখ মেট্রিক টন, যা মোট উৎপাদনের ৮০ ভাগ।
বর্তমানে নার্সারির আধুনিক উন্নত জাত ও কলমের চারা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে ফল চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে ফলের গড় ফলন ও বৈদেশিক বাজারমূল্য বিবেচনায় ব্যাপক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ফল ও ফলজাত দ্রব্যাদি রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। বর্তমানে রপ্তানির পরিমাণ ২৫-৩০%।
ফল চাষে বিভিন্ন সংস্থার ভ‚মিকা : বাংলাদেশে ফলগাছ লাগানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা প্রথম থেকেই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে কাজ করে যাচ্ছে। নি¤েœ দেয়া হলো-
ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র : উষ্ণ ও অবউষ্ণ মÐলীয় ফলের ওপর নিবিড় গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে অদ্যবধি ৩২টি বিভিন্ন ফলের ৭৬টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে এবং ৭১টি টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার আম, পেয়ারা ও কুলের বেশ কয়েকটি নতুন জাতও উদ্ভাবন করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) : প্রতি বছর প্রায় এক কোটিরও বেশি ফলদ বৃক্ষ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। শুধু গাছ লাগানোই নয় গাছ লাগানোর পর তার পরিচর্যার মাধ্যমে মানসম্পন্ন ফল উৎপাদন, আহরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ করা যায় তার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে ডিএই-এর আওতায় সারাদেশে ৭৩টি হর্টিকালচার সেন্টার থেকে প্রতি বছর মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। এসব সেন্টার থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৭.৫২ লাখ চারা ও ৬.৬৩ লাখ কলম উৎপাদন হয়।
বিএডিসি : ফল উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিএডিসিও কাজ করে যাচ্ছে। বিএডিসিও উদ্যান উন্নয়ন বিভাগ ও এগ্রো সার্ভিস সেন্টার-এর মাধ্যমে সারাদেশে ২৩ প্রদর্শনী খামার এবং প্রদর্শনী খামার প্রকল্প এলাকার মাধ্যমে ফল উৎপাদন করছে। এছাড়াও বরেন্দ্র (বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ), রাজশাহী ও বন বিভাগও উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করছে।
সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ এবং কৃষি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণবিদ ও ফল চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশে^ সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে বিশে^ অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে আর মোট ফল উৎপাদনে বিশে^র ২৮তম স্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান) : বাংলাদেশ সরকার ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও পুষ্টি সম্পর্কৃত গবেষণার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এই বারটান প্রতিষ্ঠা করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনসচেতনতা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে সুষম ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ‘নার্সারি গাইড লাইন্স ২০০৮’ প্রণয়ন করে নার্সারি শিল্পের মনোন্নয়ন করা হয়েছে এবং নিয়মিত ফল মেলার আয়োজন করা হচ্ছে এবং বাজার সংযোগ স্থাপনের সহায়তায় কাজ করছে।
মানুষের পুষ্টি সরবরাহে ফল : শরীরের চাহিদামতো পুষ্টি সরবরাহ করতে হলে ফল উৎপাদন, আহরণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদিত ফলের এক বিরাট অংশ সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির ২৫ থেকে ৪০ ভাগই সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়। তাই মানুষের যথাযথ পুষ্টি যোগানে বাংলাদেশে নিরাপদ ফল চাষের গুরুত্ব যেমন অপরদিকে বিশাল পরিমাণের এই ফলমূল পচনের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদেরকে এর প্রক্রিয়াজাত সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।
বর্তমানে ভরা মৌসুমে ফলের অধিক সরবরাহের ফলে দাম অনেক কমে যায়, ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে সংগ্রহের পর যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করা হলে একদিকে অপচয় কমবে, অপরদিকে উৎপাদনকারীর ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হয়ে বছরব্যাপী সারাদেশের মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করা যাবে। তাই বলা হতো-
‘ফল খাই পুষ্টি পাই
আসুন ফলের গাছ লাগাই।’
উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বেশি দিন ফল সংরক্ষণ, আকর্ষণীয় বাজারে মূল্য প্রাপ্তি এবং বিদেশে রপ্তানিসহ সর্বোপরি সকলের পুষ্টি নিশ্চিত।
মানুষের পুষ্টি যোগানে নিরাপদ দেশি ফলের অবদান : বাংলাদেশ উষ্ণ-অবউষ্ণ জলবায়ুর দেশ। এ দেশে প্রায় ৭০ রকমের ফল জন্মে। ফল অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু খাবার। ফল ভিটামিন ও খনিজ লবণের অন্যতম উৎস। ফলের নানান উপাদান মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধিসহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের মাথাপিছু দৈনিক ফলের প্রাপ্যতা মাত্র ৩৫ গ্রাম যা পুষ্টি বিজ্ঞানীদের সুপারিশকৃত চাহিদার এক                 তৃতীয়াংশেরও কম। একদিকে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বসতবাড়ির জন্য প্রতিদিন ২২ হেক্টর হিসেবে বছরে প্রায়ই ৮৩,০০ হেক্টর আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মেটানো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ি তবে প্রতি ১০০ গ্রাম দেশীয়  নিরাপদ ফলের মধ্যে আম, লিচু, পেয়ারা, পাকা, তাল, কামরাঙা, বেল ও আতাফলে ৫০ থেকে ১০০ ক্যালরি থাকে। এই ক্যালরি মানুষদেরকে          নানানভাবে দেহ গঠনে সহায়তা করে।
ি ভিটামিন এ শরীরের চাহিদামতো গ্রহণ করলে রাতকানা রোগ ও অন্ধত্ব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কাজেই অল্প পরিমাণ আম, কাঁঠাল ও পেঁপে খেলেই আমাদের ভিটামিন এ এর চাহিদা পূরণ হয়।
এভাবেই দেশীয় ফল আমাদের পুষ্টি দানে সর্বোত্তম ভ‚মিকা পালন করে।
দেশি থাই পেয়ারা : ফলের বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিদেশি আপেলের। প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছিল বিদেশি এই ফলের আমদানি। গত অর্থছরেও প্রতিদিন গড়ে ৭ কেজি আপেল বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে। তবে এই অর্থবছরে আপেল আমদানি কমে নেমেছে দিনে ৫ লাখ কেজিতে। গতবছরে ২ লাখ ৫৭ হাজার টন আপেল আমদানি হয়। প্রতি টন ১ হাজার কেজি হিসেবে তা দাঁড়ায় ২৫ কোটি ৭০ লাখ কেজি। তাতে ১ হাজার ৮০ কোটি টাকার সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। শুল্ককর পরিশোধ করে এই আপেল খুচরা ক্রেতাদের হাতে পৌঁছায়। খুচরা বাজারজাত হিসেব করে দেখা যায় শুধু আপেলের বাজারই ৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকার। তাই বর্তমানের বাজার প্রেক্ষিতে -
‘বিদেশি আপেলের বাজারে ভাগ
বসিয়েছে দেশে উৎপন্ন থাই পেয়ারা।’
বিদেশি আপেলের এই বড় বাজারে ভাগ বসিয়েছে দেশে উৎপাদিত থাই জাতের পেয়ারা। আপেলের চেয়ে দাম কম এবং নিরাপদ রাসায়নিক হওয়ায় আপেলের বদলে মানুষ এখন এই পেয়ারা বেছে নিচ্ছেন। আর তাতেই আপেল আমদানি কমে যাচ্ছে। আপেলের মতো নাশপাতিও বিভিন্ন ধরনের সাইট্রাস বা লেবু জাতীয় ফলের আমদানিও কমেছে। সুতরাং নিরাপদ দেশি ফল এখন অর্থনীতিতে ভ‚মিকা রাখছে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে দেশি ফলের অবদান : ফল চাষকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে নার্সারি যার সংখ্যা কয়েক সহ¯্র অধিক। এসব নার্সারি থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চারা ও কলম বিক্রি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করছে।
বর্তমান সরকারের আমলে দেশে ফল চাষসহ কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে এবং এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে যে বিপ্লব সাধিত হয়েছে তা যাতে অব্যাহত থাকে এর জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির নিমিত্ত প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণকে কৃষি মন্ত্রণালয় এখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের     মাননীয় মন্ত্রীর প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অন্যদিকে যে কৃষক তার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোদ বৃষ্টির ধকল কাটিয়ে ফল উৎপাদনে ব্যস্ত থাকে সে যেন প্রয়োজন মতো সব কৃষি বসতবাড়ি ছাড়াও তার এলাকার বিভিন্ন স্থানে আরও ফলগাছ রোপণ করে তবে তা অত্যন্ত লাভজনক  অপরদিকে দেশের ওইসব নিরাপদ ফলসমূহ মানুষের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে সাহায্য করবে। দেশে উৎপাদিত ফলের উপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেছে। এছাড়া উন্নত পদ্ধতিতে ফল চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ চাষের আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্যমোচন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে দিনে দিনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হিসেবে গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ২১ লাখ কেজি।  সুতরাং দেশি ফলের গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রয়েছে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে।
নিরাপদ ফল চাষের প্রয়োজনীয়তা ও মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি :  দেশে নিরাপদ ফল চাষে সচেতন হতে হবে আমাদের ফল চাষি সমাজকে। একমাত্র এই নিরাপদ ফলই আমাদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে পারবে এবং যা বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে।
বিটিসি নিউজ ডেস্ক : বিটিসি নিউজে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ পরিবেশসম্মত নিরাপদ ফল উৎপাদনে সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন,‘পরিবেশসম্মত নিরাপদ ফল উৎপাদনেও সচেতন হওয়া আবশ্যক। এতে দেশের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া যাবে।’
প্রতিবছরের ন্যায় এবারেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় বৃক্ষ রোপণপক্ষ ও জাতীয় ফল প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জলবায়ু ফল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। প্রকৃতির এই অপার সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে এর জন্য সচেষ্ট হতে হবে। দেশীয় ফলের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করতে হবে।
তাই সর্বোপরি ফলচাষে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
উপসংহার : প্রযুক্তিগত কার্যক্রম প্রয়োগের মাধ্যমে দেশি ফলের ফলন বৃদ্ধি ও মান সম্পন্ন ফল উৎপাদনে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে কারন বাংলাদেশের এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া নিরাপদ ফল চাষের জন্য উপযোগী এবং এক কথায় সর্বোত্তম। অধিক উৎপাদিত দেশি ফল পুষ্টিহীনতা দূরীকরণের পাশাপাশি দানাদার খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস সংকোচিত করে খাদ্যাভাস পরিবর্তনের মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ভ‚মিকা রাখবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ দানাদার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শাকসবজি, ফলমূল উৎপাদনও বেড়েছে দ্বিগুণ। দেশীয় ফলমূলের ব্যাপক উৎপাদন জাতীয় পর্যায়ে দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে।
‘অপ্রতিরোধ্য দেশের অগ্রযাত্রা,
ফলের পুষ্টি যোগাবে নতুন মাত্রা।’
বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলমূলের নিরাপদ নিশ্চিতকরণে ফল চাষিদের সর্বোত্তম চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ একমাত্র এই নিরাপদ ফলমূলই মানুষের পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে এবং আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে যাচ্ছে এবং আমাদের অর্থনীতিকে বিকশিত করছে দিন দিন।

মনোরঞ্জন রাজবংশী

একাদশ শ্রেণী পাবনা ক্যাডেট কলেজ, পাবনা, মোবাইল : ০১৩০৬৬৯৩৪১১

বিস্তারিত
‘বাংলা ল্যাম্ব’ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ

সুস্থ সবল ও মেধাবী জাতি গঠনে প্রাণিজ আমিষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস মাংস। বাংলাদেশ এখন চাহিদাভিত্তিক মাংস উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের গড় মাংস গ্রহণের তুলনায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। বর্তমানে দেশে ৩৪.৬৮ লক্ষ ভেড়া রয়েছে, যা গবাদিপশুর সংখ্যানুপাতে তৃতীয়। আমাদের দেশে গরু ও ছাগলের মাংস খুবই জনপ্রিয়। মাংসের গুণগতমান যাচাইয়ে ভেড়ার মাংসও (বিশেষ করে ল্যাম্ব মিট) সমান বা অধিক গুরুত্বের দাবিদার। গুণগত মান ও স্বাদের ভিত্তিতে সারা বিশ্বে ল্যাম্বের মাংস খুবই জনপ্রিয়। ল্যাম্ব বলতে সাধারণত এক বছরের কম বয়সী হৃষ্টপুষ্ট বাড়ন্ত ভেড়াকে বুঝায় এবং এই ভেড়ার মাংসকেও ল্যাম্ব বলে, যা খুবই সুস্বাদু। গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে যেসব ভেড়া মাংসের জন্য জবাই হয় তাদের গড় বয়স ১৬ মাস। যাদের বেশির ভাগই বয়স্ক এবং পাল থেকে বাদ দেয়া ভেড়া। ফলে এদের মাংসের গুণাগুণ এবং স্বাদ আশানুরূপ নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই মাংস ছাগলের মাংসের সাথে মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। তাই উন্নত গুণাগুণ সম্পন্ন ভেড়ার মাংস উৎপাদন ও এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকল্পে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ল্যাম্ব উৎপাদন ও বিপণন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে বর্তমানে দেশি ভেড়ার যে কারকাস বিক্রি হয় তার গড় ওজন প্রায় ৮ কেজি। এই ৮ কেজি কারকাস উৎপাদনে ভেড়া গড়ে ১ বছর ৬ মাস সময় নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে পরিমিত খাদ্য, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে ৬-৭ মাসেই ৮ কেজি কারকাস উৎপাদন সম্ভব। যার মাধ্যমে ভেড়া হতে উৎপাদিত মোট মাংসের পরিমাণ দ্বিগুণ করা সম্ভব। সেদিক দিয়ে আমাদের দেশীয় ভেড়া খুবই সম্ভাবনাময় সম্পদ।
ল্যাম্ব (ভেড়ার মাংস) কেন খাবো?
আমিষের একটি সুস্থ ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ল্যাম্ব বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ল্যাম্বের গুণাগুণ নিম্নে তুলে ধরা হলো-
১. ল্যাম্ব নরম, রসালো, সুস্বাদু ও সহজে হজমযোগ্য।
২. ল্যাম্বে আমিষ ও শক্তি বেশি এবং ক্ষতিকারক চর্বি ও কোলস্টেরলের পরিমাণ কম।
৩. ল্যাম্বেসোডিয়াম, পটাশিয়াম, কপার ও ফসফরাসের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, যা বাচ্চাদের শারীরিক ও    মানসিক বৃদ্ধি, টিস্যু পুনর্গঠন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
৪. ল্যাম্বে উপস্থিত ভিটামিন-এ, ই এবং সি এন্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে শিরা ও ধমনীতে কোলস্টেরল জমাট হতে বাধা প্রদান করে।
৫. ল্যাম্বে কনজুগেটেড লিনোলিক এসিড থাকে, যা স্তন ক্যান্সারের প্রতিরোধে লড়াই করে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে।
৬. মাংসে একটি এসিডের ফোলিক উৎস, যা নবজাত শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয়।
৭. অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে ল্যাম্ব বেশ উপকারী।
ল্যাম্ব উৎপাদনে বিবেচ্য বিষয়সমূহ
আমাদের দেশে সাধারণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরাই ভেড়া পালন করে থাকে। বর্তমানে ভেড়ার বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশি ভেড়ার খামারের প্রধান উৎপাদন হলো বাচ্চা বা ল্যাম্ব। ল্যাম্ব উৎপাদনের জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো- বাচ্চার জন্ম ওজন, ভেড়ীর দুধ উৎপাদন, বাচ্চার ওজন বৃদ্ধির হার অর্থাৎ সঠিক সময়ে সঠিক ওজন অর্জন। এ জন্য ভেড়ীর গর্ভকালীন খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ দুই মাসের পুষ্টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ে গর্ভস্থ বাচ্চার ওজন বৃদ্ধি ৮০% ঘটে। এই সময়ে অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে বাচ্চার জন্ম ওজন, পরবর্তী ওজন বৃদ্ধির হার এবং ভেড়ীর দুধ উৎপাদন কমে যায়, যা বাচ্চা মৃত্যুর অন্যতম কারণ। আবার বাচ্চা জন্মের পর মায়ের সুষম খাদ্যের ঘাটতি হলে বাচ্চার পরবর্তী ওজন বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, মায়ের দুধ উৎপাদন, সময়মতো গরম হওয়া ও গর্ভধারণ ব্যাহত হয়। ফলে খামার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মানসম্মত ল্যাম্ব উৎপাদনে (মাংস) ভেড়ীর গর্ভাবস্থা হতে শুরু করে বাচ্চা জন্মের পর ও বাচ্চা জবাই উপযোগী হওয়া পর্যন্ত খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে উপযুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গুণগতমান সম্পন্ন ও নিরাপদ ল্যাম্ব (মাংস) উৎপাদন এখন সময়ের দাবি।
ল্যাম্ব উৎপাদনে স্থানীয় জাতের ভেড়া
আমাদের দেশে সাধারণত তিন ধরনের স্থানীয় জাতের ভেড়া পাওয়া যায়। তবে কিছু সংকর জাতের ভেড়াও রয়েছে। দেশে তিন ধরনের স্থানীয় জাতের ভেড়া রয়েছে। এগুলো হলো- বরেন্দ্র এলাকার ভেড়া, যমুনা নদী অববাহিকার ভেড়া, উপক‚লীয় অঞ্চলের ভেড়া। বিএলআরআই পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে এই তিন ধরনের ভেড়াই বাণিজ্যিক ল্যাম্ব উৎপাদনে উপযোগী। তবে উপক‚লীয় অঞ্চলের ভেড়া তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক।          
বরেন্দ্র এলাকার ভেড়া, যমুনা অববাহিকা এলাকার ভেড়া ও উপক‚লীয় অঞ্চলের ভেড়া। ল্যাম্ব উৎপাদনে বিএলআরআই দেশের প্রাণিসম্পদ বিষয়ক উচ্চতর গবেষণার একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)’ সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই প্রান্তিক পর্যায়ের প্রাণিসম্পদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মাঠ পর্যায়ের খামারিদের সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয়তার আলোকে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বিএলআরআই-এর নিজস্ব বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীবৃন্দের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও সংশ্লিষ্ট সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিএলআরআই আমাদের দেশি ভেড়া হতে লাভজনকভাবে ‘বাংলা ল্যাম্ব’ উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্বারা খামারিপর্যায়ে ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে ভেড়ার মাংসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিকল্পে ইতোমধ্যে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে ‘ঠধষরফধঃরড়হ মড়ড়ফ ঢ়ৎধপঃরপবং ড়ভ ড়হ ভধৎস ষধসন ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ ংুংঃবস’ শীর্ষক একটি যৌথ প্রকল্প কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের অ্যানিমল সাইন্স বিভাগ, সোসাল প্রগ্রেস সার্ভিস (এসপিএস, এনজিও) এবং ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমল সাইন্স বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে উপক‚লীয় অঞ্চল, যমুনা অববাহিকা অঞ্চল ও বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলমান এই প্রকল্পের মাধ্যমে টেকসই ল্যাম্ব উৎপাদন প্রযুক্তি খামারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যা নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
বিএলআরআই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে লালন-পালন করলে একটি ল্যাম্ব ৬ মাস বয়সে প্রায় ১৫ কেজি, ৯ মাসে ২০ কেজি ও ১২ মাসে ২৪ কেজি ওজন হয়। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে দেশি ল্যাম্বের ওজন ৬ মাস পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ে এর পর ওজন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও তা ক্রমহ্রাসমান হারে বাড়ে। তবে ৬-৯ মাস যে কোনো বয়সেই জবাই করলে ল্যাম্ব উৎপাদন লাভজনক হয়।
বিভিন্ন বয়সে দেশি ভেড়া হতে উৎপাদিত বাংলা ল্যাম্বের পুষ্টিমান
উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি কেজি বাংলা ল্যাম্ব (মাংস) উৎপাদনের জন্য বয়স বেঁধে (৬ হতে ৯ মাস বয়সী ল্যাম্ব) ২৮০ এবং ৪১০ টাকা খরচ হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি ল্যাম্ব মাংসের বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে একজন খামারি ১৯০-৩২০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করতে পারে। অতএব, উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ল্যাম্ব উৎপাদনের মাধ্যমে লাভজনক ভেড়ার খামার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করবে এবং গুণগত মানসম্পন্ন ও নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহে ভমিকা রাখবে।

 ড. ছাদেক আহমেদ
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকা, মোবা :০১৭১২১৮৯২১২, ই-মেইল : Sadek_11@yahoo.com

বিস্তারিত
স্বাস্থ্যসম্মত চিংড়ি মাছ উৎপাদন ও রপ্তানিতে আধুনিক প্রযুক্তি

আমাদের দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পুষ্টি পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মাছ ও চিংড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। নানা কারণে আমাদের প্রাকৃতিক উৎসের মাছ ও চিংড়ি দিন দিন কমে আসছে। এ প্রেক্ষাপটে চাষের মাধ্যমে মাছ ও চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদিত মাছ যেন জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হয় সে বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা নিরাপদ খাদ্য মানুষের জন্ম জন্মান্তরের অধিকার। উৎপাদিত মাছ ও চিংড়ি খেয়ে কেউ অসুস্থ হবে না- এ প্রত্যাশা সবার। তাছাড়া আমরা সকলেই জানি বিশেষ করে চিংড়ি হলো আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্য। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানসম্পন্ন ও নিরাপদ মৎস্য ও মৎস্য পণ্য উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু চাষ পর্যায়ে আমরা এমন কিছু কাজ বা প্র্যাকটিস অনুসরণ করে থাকি যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎপাদিত মাছ ও চিংড়ির গুণগত মান বিনষ্ট ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়ে। তাই মাছ অথবা চিংড়ি চাষে খারাপ প্র্যাকটিসগুলো বর্জন করে ভালো বা উত্তম প্র্যাকটিসগুলো  অনুসরণ করা খুবই জরুরি। যথাযথ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে পুকুরে চাষের উত্তম পরিবেশ রক্ষা করতে পারলে যেমন রোগবালাই এর ঝুঁকি কমে, তেমন উৎপাদনও বাড়ে। সেই সাথে উৎপাদিত চিংড়ির গুণগতমান রক্ষা পায় এবং বিশ্ববাজারে সুনামের সাথে টিকে থাকা যায়। আমাদের দেশ থেকে পণ্য ক্রয়ে ক্রেতা দেশের নানা বিধিনিষেধ, শর্ত ও আইনি বাধা সম্পর্কে আমরা অনেকটাই জানি। ইইউ এর আইন অনুযায়ী ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকসহ প্রায় সকল প্রকার রাসায়নিক দ্রব্যাদি চিংড়ি চাষে ব্যবহার নিষিদ্ধ। অতএব, চাষকৃত মাছ ও চিংড়ির গুণগতমানের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যাদির ব্যবহার পরিহার করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘গুড অ্যাকোয়াকালচার প্র্যাকটিস’ বাস্তবায়ন ও অনুসরণ করা। ‘গুড অ্যাকোয়াকালচার প্র্যাকটিস’ এর অংশ হিসেবে পুকুরের ডিজাইন, পানির গুণাগুণ এবং চিংড়ির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা প্র্যাকটিসসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে গুড প্র্যাকটিস অনুসরণ করলে উৎপাদিত মাছ ও চিংড়ির গুণগতমান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিঃসন্দেহে বজায় থাকবে। গুণগতমানসম্পন্ন চিংড়ি উৎপাদনে অনুসরণযোগ্য ভালো বা উত্তম প্র্যাকটিসসমূহ নি¤েœ আলোচনা করা হলো-
* খামারের অবস্থান সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস
* চিংড়ি চাষে ব্যবহ্নত পানি সম্পর্কিত গুড প্রাকটিস
* খামারের আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস
* খামারের অনুসরণীয় স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থাপনা/হাইজনিক প্র্যাকটিস
* চিংড়ির খাদ্য সম্পর্কিত গুড প্র্যাকটিস
* চিংড়ির খামারের ঔষধ ব্যবহারের গুড প্র্যাকটিস
মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যসমূহের মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় রপ্তানি হয়। এ সকল দেশ তাদের জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে বিশেষ করে রাসায়নিক দ্রব্যের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। উৎপাদন পর্যায়ে ব্যবহার বা প্রাকৃতিকভাবে সংশ্লেষিত হওয়ার কারণে অথবা আহরণ পরবর্তী ব্যবস্থাপনার ত্রæটি বা প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়ে ব্যবহার বা সংক্রমণ ইত্যাাদি কারণে মৎস্য ও মৎস্য পণ্যে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতি ঘটে থাকে, তা প্রতিরোধের জন্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাহিদার কারণেই ও পরামর্শ মতে বাংলাদেশে জাতীয় রেসিডিউ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। আমদানিকারক দেশসমূহের নিয়মনীতি অনুসরণ করে আমাদের রাসায়নিক দূষণ দ্রব্যগুলোর রেসিডিউ পরীক্ষা, দূষণের উৎস শনাক্ত করা ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি কাজ করা হয়ে থাকে। এর আওতায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘের/পুকুর হতে মাছ/চিংড়ি ও পানি সংগ্রহ করে কেমিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো পরিবীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মাছ ও চিংড়িতে ক্ষতিকর কেমিক্যালের উপস্থিতি শূন্যমাত্রায় বা অনুমোদিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা। যদি  এনআরসিপি হতে ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর প্রমাণ করা যায় যে, দেশে উৎপাদিত মৎস্য ও মৎস্য পণ্যে নিষিদ্ধ/ক্ষতিকর দ্রব্য নেই অথবা অনুমোদিত মাত্রার মধ্যে রয়েছে, তাহলে রপ্তানিপূর্ব পরীক্ষার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
রাখা এবং সেগুলো বিক্রয় বন্ধে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার
করা।
- ওষুধসমূহের মোড়কে উৎপাদন তারিখ, ব্যবহারের শেষ তারিখ এবং ব্যবহারের কত দিন পরে মাছ বা চিংড়ি ধরা নিরাপদ তা যথাযথভাবে প্রদর্শন করা।
- মৎস্য খাদ্য উৎপাদন পর্যায়ে যাতে কোনরূপ নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর দ্রব্য না মেশানো হয় তা নিশ্চিত করার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারকরণ।
- মৎস্য খাদ্য বা খাদ্য উপাদানে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানি প্রচলিত আইন অনুয়ায়ী কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ি ও মাছের চাহিদা প্রতিদ্ব›দ্বী দেশসমূহ- যেমন- ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতির তুলনায় কম নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
দেশের রপ্তানিতব্য মৎস্য পণ্যের গুণগতমানের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে রেসিডিউ নিয়ন্ত্রণ ও রেসিডিউ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্রেতাদের বিশ্বস্ততা অর্জন করে আরও অনেক বেশি পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব।

 

কৃষিবিদ রিপন কান্তি ঘোষ

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা, মাদারীপুর। মোবাইল : ০১৭১৭-৪৮৮৩৭৮ ই-মেইল : ghoshripon4@gmail.com

বিস্তারিত
কবিতা (অগ্রহায়ণ ১৪২৬)

নবান্ন

আবু হেনা ইকবাল আহমেদ১  

ক.
বলদের মতো খেটে   সারা দিনমান
এশা পড়ে ঘুম দেই   গা তুলি ফজরে
ভোমরায় ফসলের     কানে গায় গান
শুনে ওরা বেড়ে ওঠে  তর তর করে।
বাড়ন্ত ফসল দেখে    জুড়ে যায় প্রাণ
তবু ভয়ে কাঁপে বুক   অকালের ঝড়ে
কখন না একেবারে    নাশে পাকাধান
আশার কপালে ছাই    যেন তা না পড়ে!
অঘ্রাণের নবান্নের      ঘ্রাণ পাই নাকে
গিন্নির সময় যায়       গোলা মেরামতে
কল্পনারা ডানা মেলে   কতো ছবি আঁকে
প্রবাসী সজন ছোটে    ঘরমুখী পথে।
চারিদিকে ধুম পড়ে    নবান্ন বরণে
কেউ কেউ স্মৃতি ঘাঁটে অতীত স্মরণে \
খ.
চারপাশে হইচই      অঘ্রাণের ভোরে
নবান্নের উৎসবে       চঞ্চলা শৈশব
বড়রাও মেতে আছে  অঘ্রাণের ঘোরে
মিষ্টান্নের গন্ধ শুঁকে    মৌতাত যে সব।
নতুন ধানের পাঁজা    দেবার উৎসব
যার জমি নাই সেও   নেই বসে ঘরে
মাঠে ছুটে ধানকেটে  করে অনুভব
ঘরে ঘরে পিঠা শিন্নি আদিকাল ধরে।
গরু নাই বটে তবে   মাড়াই ঝাড়াই
ছাঁটাই কলে হয়      ঢেঁকি গেছে ওঠে
আতপ চালের গুঁড়ি   কলেই বানাই।
শিশুরা হল্লায় মাতে   কিশোরেরা ছোটে।
মেয়েরা সবাই ব্যস্ত   পিঠাপুলি বেলে
অঘ্রাণ জোয়ার আনে  স্বপ্ন ডানা মেলে \

 

নবান্নের ঘ্রাণে
অনুকুল বিশ্বাস

সোনা রঙে সোনালী ধানে
ভরে গেছে মাঠ,
খুশির জোয়ার ঘরে ঘরে
বসেছে চাঁদের হাট।

শীষে শীষে জড়াজড়ি
বাতাসে দুলে দুলে,
শত কষ্টের শস্য সম্ভার
দেখি নয়ন খুলে।

মাঠ মেতেছে মন মেতেছে
ধান কাটার মেলা,
নাওয়া খাওয়ার নেই সময়
শেষ হয়েছে বেলা।

কৃষক বধূ উঠান ছাঁটাই
পথের পানে চেয়ে,
ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে
ফিরবে পরান প্রিয়ে।

ছাড়াই মাড়াই শেষ করে
ভরবে ধানের গোলা,
মনের মতো কেনা-কিনি
শুরু সুখের পালা।

নুতন ধানের পিঠা পুলি
নবান্নের ঘ্রাণে ঘ্রাণে,
সুখ শান্তি ভরে থাকুক
সবার প্রাণে প্রাণে।
 

 

কৃষিবিদ পরিচালক (অব.), বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সী, কৃষি মন্ত্রণালয়,  সেল : ০১৬১৪৪৪৬১১১ ahiqbal.ahmed@yahoo.com ‘কলমিলতা # ৪, এলেনবাড়ি গভ. অফিসার্স কোয়াটার্স, তেজগাঁ, ঢাকা-১২১৫, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ, মোবা : ০১৭১৭৮১২০৫৪

 

বিস্তারিত
চরাঞ্চলে নিরাপদ স্কোয়াশ উৎপাদন

স্কোয়াশ একটি সুস্বাদু ও জনপ্রিয় সবজি হিসেবে বিদেশিদের কাছে অনেক আগে থেকেই পরিচিত। এ দেশে স্কোয়াশ একটি উচ্চমূল্যের সবজি ফসল। কয়েক বছর ধরে এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষাবাদের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে কম উর্বর জমিতে এবং চরাঞ্চলে স্কোয়াশের চাষাবাদ সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় স্কোয়াশের চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন     লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও মাদারীপুর জেলার চাষিরা। দেশের অন্য অঞ্চলে রয়েছে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের সম্ভাবনা। গবেষকরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে বারি স্কোয়াশ-১ নামে একটি জাত রবি মৌসুমে চাষাবাদের জন্য মুক্তায়ন করা হয়েছে। বারি স্কোয়াশ-১ একটি উচ্চফলনশীল জাত। পরাগায়নের পর থেকে মাত্র ১৫-১৬ দিনেই ফল সংগ্রহ করা যায়। নলাকার গাঢ় সবুজ বর্ণের ফল। গড় ফলের ওজন ১.০৫ কেজি। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ৪৫ টন।
উৎপাদন প্রযুক্তি
মাটি ও আবহাওয়া
স্কোয়াশের জন্য উষ্ণ, প্রচুর সূর্যালোক এবং নি¤œ আর্দ্রতা উত্তম। চাষকালীন অনুক‚ল তাপমাত্রা হলো ২০-২৫ ডিগ্রি  সেলসিয়াস। চাষকালীন উচ্চতাপমাত্রা ও লম্বা দিন হলে পুরুষ ফুলের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্ত্রী ফুলের সংখ্যা কমে যায়। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দো-আঁশ বা এঁটেল দো-আঁশ মাটি এর চাষাবাদের জন্য উত্তম তবে চরাঞ্চলে পলিমাটিতে স্কোয়াশের ভালো ফলন হয়।  
বীজের হার
প্রতি হেক্টরে ২-৪ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
বীজ বপন ও চারা উৎপাদন
শীতকালে চাষের জন্য অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে বীজ বপন করা যায়। চারা নার্সারিতে পলিব্যাগে উৎপাদন করে নিলে ভালো হয়। বীজ বপনের জন্য ৮ ী ১০ সেমি. বা তার থেকে কিছুটা বড় আকারের পলিব্যাগ ব্যবহার করা যায়। প্রথমে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করে পলিব্যাগে ভরতে হবে। সহজ অঙ্কুরোদগমের জন্য পরিষ্কার পানিতে ১৫-২০ ঘণ্টা অথবা শতকরা এক ভাগ পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবণে বীজ এক রাত ভিজিয়ে অতঃপর পলিব্যাগে বপন করতে হবে। প্রতি ব্যাগে দুটি করে বীজ বপন করতে হবে। বীজের আকারের দ্বিগুণ  মাটির গভীরে বীজ পুঁতে দিতে হবে। বীজ সরাসরি মাদায়ও বপন করা হয়। সেক্ষেত্রে সার প্রয়োগ ও মাদা তৈরির ৪-৫ দিন পর প্রতি মাদায় ২-৩টি করে বীজ বপন করা যেতে পারে। চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর ১টি সুস্থ ও সবল চার রেখে  বাকিগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে। চারার বয়স ১৬-১৭ দিন হলে তা মাঠে প্রস্তুত মাদায় লাগাতে হবে।
বেড তৈরি
বেডের উচচতা ১৫-২০ সেমি. ও প্রস্থ ১-১.২৫ মি. এবং লম্বা জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে সুবিধামতো নিতে হবে। এভাবে পরপর বেড তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দুইটি বেডের মাঝখানে ৭০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা থাকবে।
মাদা তৈরি
মাদার ব্যাস ৫০-৫৫ সেমি. গভীরতা ৫০-৫৫ সেমি. এবং তলদেশ ৪৫-৫০ সেমি. প্রশস্ত হবে। ৬০ সেমি. প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা সংলগ্ন বেডের কিনারা থেকে ৫০ সেমি. বাদ দিয়ে মাদার কেন্দ্র ধরে ২ মিটার অন্তর অন্তর এক সারিতে মাদা  তৈরি করতে হবে। প্রতি বেডে এক সারিতে চারা লাগাতে হবে।
সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
ভালো ফলন পেতে মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের সরবরাহ করতে হবে। তবে মাটির অবস্থা বুঝে সারের পরিমাণ কম/বেশিও  হতে পারে।
সমস্ত গোবর সার, ফসফরাস সার ও পটাশ সারের ৩ ভাগের  দুইভাগ শেষ জমি প্রস্তুতের সময় জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে। অবশিষ্ট এক ভাগ পটাশ সার বীজ বপনের ৩০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। তবে নাইট্রোজেন সার তিনটি সমান ভাগে বীজ বপনের ২৫, ৪০ ও ৬০ দিন পর উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
চারার বয়স ও চারা রোপণ
বীজ গজানোর পর ১৬-১৭ দিন বয়সের চারা মাঠে লাগানোর জন্য উত্তম। মাঠে প্রস্তুত মাদাগুলোর মাটি ভালোভাবে ওলটপালট করে এক কোপ দিয়ে চারা লাগানোর জন্য জায়গা করে নিতে হবে। অতঃপর পলিব্যাগের ভাঁজ বরাবর বেøড দিয়ে কোটি পলিব্যাগ সরিয়ে মাটির দলাসহ চারাটি ওই জায়গায় লাগিয়ে চারপাশে মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর গর্তে পানি দিতে হবে।
পরবর্তী পরিচর্যা
সেচ দেওয়া : স্কোয়াস ফসল পানির প্রতি খুবই সংবেদনশীল। সেচ নালা দিয়ে প্রয়োজন অনুসারে নিয়মিত সেচ দিতে হবে। জমিতে কখনও সব জমি ভেজানো বা প্লাবন সেচ দেয়া যাবে না। শুধু সেচ নালায় পানি দিয়ে আটকে রাখলে গাছ পানি টেনে নেবে। প্রয়োজনে সেচনালা হতে ছোট কোনো পাত্র দিয়ে কিছু পানি গাছের গোড়ায় দেয়া যাবো। শুষ্ক মৌসুমে ৫-৭ দিন অন্তর সেচ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে।
মালচিং : প্রত্যেক সেচের পর হালকা খড়ের মালচ করে গাছের গোড়ার মাটির চটা ভেঙে দিতে হবে। আগাছা অনেক রোগের আবাসস্থল। এ ছাড়াও আগাছা খাদ্যোপাদান ও রস শোষণ করে নেয়। কাজেই চারা লাগানো থেকে শুরু করে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ : ফলে মাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এটি থেকে ফসলকে রক্ষা করার জন্য সেক্স ফেরোমন ফাঁদ এবং পরাগায়নের পর ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করে মাছি পোকা দমন করা যায়। এ ছাড়াও ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রæপের কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় ১০-১২ দিন পরপর ব্যবহার করে এই পোকার আক্রমণ কমানো যায়। রোগবালাইয়ের আক্রমণ তেমনটি চোখে পড়ে না।
বিশেষ পরিচর্যা : সাধারণত স্কোয়াশ উৎপাদনের জন্য ১৬-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। রাতের তাপমাত্রা ১৭-২১ ডিগ্রি সে. এর কম বা বেশি হলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফুল ঝরে পড়ে ও ফলন কমে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একবারেই ফলন হয় না। অক্টোবর মাসে বীজ  বপন করে নভেম্বরে লাগালে দেখা যায় যে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ হতে জানুয়ারি পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায়, ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এজন্য গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পলিথিন ছাউনি বা গøাস হাউসে গাছ লাগালে রাতে ভেতরের তাপমাত্রা বাইরে অপেক্ষা বেশি থাকে।
ফসল সংগ্রহ : ফল পরাগায়নের ১০-১৫ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করতে হবে। তখনও ফলে সবুজ রঙ থাকবে এবং ফল মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাবে। নখ দিয়ে ফলের গায়ে চাপ দিলে নখ সহজেই ভেতরে ঢুকে যাবে।
এ দেশে সবজির উৎপাদন বাড়াতে নতুন এই সুস্বাদু সবজি ফসলটি গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারে এমনটিই প্রত্যাশা সবার।

 

কৃষিবিদ ড. মো. শরফ উদ্দিন

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার, মোবা : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল : Sorofu@yahoo.com

বিস্তারিত
কৃষক পর্যায়ে গমবীজ উৎপাদন প্রযুক্তি

গম বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ দানাজাতীয় খাদ্যশস্য। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে ২০১৮-১৯ সালে ৩.২৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১১.৫০ লক্ষ টন গম উৎপাদিত হয়।  জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে গমের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ৬০ লক্ষ টন গম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গমের নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে ২০১৮-১৯ সালে দেশে গমের হেক্টরপ্রতি গড় ফলন বেড়ে ৩.৪৯ টনে উন্নীত হয়েছে। গমের আধুনিক জাত, উন্নতমানের বীজ, সময়মতো বপন, সুষম সার,  পরিমিত সেচ, ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে গমের জাতীয় গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.০ টনে উন্নীত করা সম্ভব। বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়াও শুধু উন্নতমানের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রায় ২০% ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। চাষের বিভিন্ন পর্যায়ে যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করলে গমের মান সম্পন্ন বীজ উৎপাদন সহজতর হবে এবং গম চাষ আরো লাভজনক হবে। বর্তমানে বীজের চাহিদা প্রায় ৫০,০০০ টন। এর মধ্যে বিএডিসি ৪০% সরবরাহ করে এবং অবশিষ্ট ৬০% চাষি পর্যায়ে সংরক্ষিত বীজ থেকে জোগান দেয়া হয়। এঅবস্থায় মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বীজ উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল
জাত নির্বাচন : এ পর্যন্তÍ উদ্ভাবিত ৩৩টি উচ্চফলনশীল গম জাতের মধ্যে বারি গম- ২৫, বারি গম- ২৭, বারি গম- ২৮, বারি গম- ২৯, বারি গম- ৩০, বারি গম- ৩১, বারি গম- ৩২ ও বারি গম- ৩৩ কৃষক পর্যায়ে চাষের আওতায় রয়েছে। নতুন জাতগুলি উচ্চফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এর মধ্যে বারি গম- ২৫ লবণাক্ততাসহিষ্ণু এবং বারি গম- ৩৩ জাতটি বøাস্ট রোগ প্রতিরোধী ও জিংক সমৃদ্ধ। বারি গম- ৩০ ও বারি গম- ৩২ জাত দুটি গমের বøাস্ট রোগে সহনশীল।
বপন সময় :
বীজের সঠিক আকার, আকৃতি, পুষ্টতা ও অন্যান্য গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য উপযুক্ত সময়ে গম বপন করতে হবে। ভাল বীজের জন্য গম বপনের উপযুক্ত সময় নভেম্বর মাসের ১৫ থেকে ৩০ (অগ্রহায়ণ মাসের ১ম থেকে ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত) পর্যন্ত।
বীজের হার ও বীজ শোধন : বীজ গজানোর ক্ষমতা শতকরা ৮০ ভাগ বা তার বেশি হলে হেক্টরপ্রতি ১২০ কেজি বীজ ব্যবহার করতে হবে।  তবে বারি গম ৩৩ জাতের দানা বড় হওয়ায় কাক্সিক্ষত সংখ্যক গাছ পেতে হেক্টরপ্রতি ১৪০ কেজি বীজ বপন করতে হবে। বপনের পূর্বে বীজের অংকুরোদগম ক্ষমতা পরীক্ষা করে নিতে হবে এবং কার্যকর ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। এর ফলে বীজবাহিত রোগ দমন হয়, চারার সংখ্যা ২০-২৫% বৃদ্ধি পায় এবং ফলন শতকরা ১০-১২ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
বপন পদ্ধতি : সারিতে অথবা ছিটিয়ে গম বীজ বপন করা যায়। সারিতে বপনের ক্ষেত্রে ২০ সেমি. দূরে দূরে সারি করে ৪-৫ সেমি. গভীরে বীজ বুনতে হবে। ধান কাটার পরপরই পাওয়ার টিলার চালিত বীজ বপন যন্ত্রের সাহায্যে স্বল্পতম সময়ে গম বোনা যায়। এ যন্ত্রের সাহায্যে একসঙ্গে জমি চাষ, সারিতে বীজ বপন ও মইয়ের কাজ হয়। সারিতে বপন করলে বিভিন্ন আন্তঃপরিচর্যা ও ভিন্ন জাতের গাছ বাছাই করা সহজ হয়।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ :  গম চাষে সুষম সার ব্যবহার প্রয়োগে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়। জৈব সার প্রয়োগ করার পর দুই-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া এবং সম্পূর্ণ টিএসপি (ফসফেট), পটাশ, জিপসাম এবং বোরন সার শেষ চাষের পূর্বে জমিতে সমানভাবে ছিটিয়ে চাষ-মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
বপনের ১৭-২১ দিনের মধ্যে বা চারার তিন পাতা অবস্থায় প্রথম সেচের পর দুপুর বেলা মাটি ভেজা থাকা অবস্থায় হেক্টরপ্রতি ৭৫-৮৫ কেজি ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। জমিতে অ¤øীয় মাত্রা ৫.৫ এর কম হলে হেক্টরপ্রতি ১০০০ কেজি হারে ডলোচুন গম বপনের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে মাটিতে ‘জো’ থাকা অবস্থায় প্রয়োগ করতে হবে। ডলোচুন প্রয়োগে গমের ফলন ২০-২৫% বৃদ্ধি পায়। মাটিতে একবার ডলোচুন প্রয়োগ করলে তিন বছরে আর প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।
সেচ প্রয়োগ : ভালো বীজ উৎপাদনের জন্য পরিমিত সেচ দেওয়া প্রয়োজন। মাটির প্রকার ভেদে গম আবাদে ২-৩টি সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথম সেচ চারার তিন পাতার সময় (বপনের ১৭-২১ দিন পর), দ্বিতীয় সেচ শীষ বের হওয়ার আগে (বপনের ৫০-৫৫ দিন পর) এবং তৃতীয় সেচ দানা গঠনের সময় (বপনের ৭৫-৮০ দিন পর) দিতে হবে। তবে শুষ্ক আবহাওয়ায় ভালো ফলনের জন্য অতিরিক্ত এক বা দুটি সেচ প্রয়োজন হতে পারে। প্রথম সেচটি খুবই হালকাভাবে দিতে হবে। তা না হলে অতিরিক্ত পানিতে চারার পাতা হলুদ হতে পারে বা চারা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেজন্য সেচের পরপরই জমি থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে হবে। তাই বপনের পর জমির ঢাল বুঝে ২০-২৫ ফুট অন্তর অন্তর নালা কেটে রাখতে হবে।
অন্যান্য পরিচর্যা : বীজ বপনের পর ১০-১২ দিন পর্যন্ত পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। জমিতে ‘জো’ অবস্থায় আগাছা দমনের জন্য নিড়ানী দিতে হবে। চওড়া পাতা বিশিষ্ট আগাছা (বথুয়া ও কাকরি) দমনের জন্য বপনের ২৫-৩০ দিনের মধ্যে এফিনিটি নামক আগাছানাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ গ্রাম  হারে মিশিয়ে একবার স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। সময়মতো আগাছা দমন করলে ফলন শতকরা ১৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়।
রোগ-বালাই দমন : গমে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ নেই বললেই চলে। তবে মান সম্পন্ন বীজ উৎপাদনের জন্য কয়েকটি রোগ যেমন- বীজের কালো দাগ রোগ, পাতা ঝলসানো রোগ, মরিচা রোগ, বøাস্ট রোগ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
গম ক্ষেতে রোগ নিয়ন্ত্রণে করণীয় : রোগমুক্ত বীজ বপন; উপযুক্ত সময়ে (১ অগ্রহায়ণ - ১৫ অগ্রহায়ন) বীজ বপন; বপনের পূর্বে প্রতি কেজি বীজের সাথে ৩ গ্রাম হারে পাউডার ছত্রাকনাশক (কার্বক্সিন ৩৭.৫% + থিরাম ৩৭.৫%) অথবা ৩ মিলি হারে তরল ছত্রাকনাশক (কার্বক্সিন ১৭.৫% + থিরাম ১৭.৫%) মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। বীজ শোধন করলে গমের বীজবাহিত রোগ দমন হবে; গমের প্রধান প্রধান ছত্রাকজনিত রোগ দমনের জন্য প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে ৬ গ্রাম হারে দানাদার ছত্রাকনাশক (টেবুকোনাজল ৫০% + ট্রাইফ্লক্সিস্ট্রোবিন ২৫%) অথবা ১০ মিলি হারে তরল ছত্রাকনাশক (এজক্সিস্ট্রোবিন ২০% + ডাইফেনোকোনাজল ১২.৫%) ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে শীষ বের হওয়ার সময় একবার এবং ১২-১৫ দিন পর আরেকবার ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করলে গমের বøাস্ট রোগসহ পাতা ঝলসানো রোগ, বীজের কালো দাগ রোগ, মরিচা রোগ ইত্যাদি দমন হবে এবং বীজের মান ভাল হবে।
ভিন্ন জাত বাছাইকরণ বা রোগিং : বীজের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য শীষ বের হওয়ার পর থেকে শুরু করে গাছ পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত বীজ ক্ষেতে ২-৩ বার ভিন্ন জাতের মিশ্রণ ও আগাছা গোড়াসহ উপড়ে ফেলতে হবে। বীজ উৎপাদনের জন্য এ কাজগুলো সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে করলে বীজের মান নিশ্চিত হবে।
ফসল কর্তন ও বীজ সংগ্রহ : গম গাছ সম্পূর্ণরূপে পেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করলে কাটার উপযুক্ত হয়েছে বলে গণ্য হবে। তাছাড়া গম পাকার পর বেশি দিন ক্ষেতে থাকলে ঝড়/শিলা বৃষ্টিতে ফসল ও বীজ উভয়েরই যথেষ্ট ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেরি না করে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সকালের দিকে গম কেটে দূপুরে মাড়াই করা উত্তম। মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে গম মাড়াই করলে বীজের মান ভালো থাকে।  
বীজ সংরক্ষণ : কৃষক পর্যায়ে উন্নত পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ করা গম চাষের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংরক্ষণের পূর্বে মাড়াইকৃত বীজ পরপর ২-৩ দিন রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে বীজের আর্দ্রতা শতকরা ১২ ভাগ বা তার নিচে নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে। শুকনা গম দাঁতে চিবানোর সময় ‘কট’ করে শব্দ করে ভেঙে গেলে বুঝতে হবে ওই বীজ সংরক্ষণের উপযুক্ত হয়েছে। সংরক্ষণের পূর্বে ঝেড়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করার পর ১.৭৫-২.৫০ মিমি ছিদ্র বিশিষ্ট চালনি দিয়ে চেলে পুষ্ট বীজ বাছাই করে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে পুষ্ট বীজ থেকেই কেবলমাত্র সুস্থ ও সবল চারা উৎপাদন সম্ভব। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে বীজের সুস্থতা ও অংকুরোদগম ক্ষমতা বজায় থাকবে। ফলশ্রæতিতে মাঠে চারার সংখ্যা ও ফলন বেশি হবে।
বীজ সংরক্ষণ পাত্র : ধাতব পাত্র (তেলের ড্রাম, কেরোসিন টিন, বিস্কুটের টিন), প্লাস্টিক ড্রাম বা পলিথিন ব্যাগে বীজ সংরক্ষণ করা উত্তম। পাত্র অবশ্যই ছিদ্রমুক্ত হতে হবে। ভালোভাবে শুকানো পুষ্ট বীজ দ্বারা পাত্র পরিপূর্ণভাবে ভরে ঢাকনাটি শক্তভাবে আটকাতে হবে যাতে বাইরের বাতাস পাত্রের ভেতরে না ঢুকতে পারে। এতে বীজের আর্দ্রতা ঠিক থাকবে এবং রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হবে না। প্লাস্টিক ড্রামে বা পলিথিন ব্যাগে বীজ রাখার ক্ষেত্রে রোদে শুকানো গরম বীজ সংরক্ষণের পূর্বে ছায়ায় ঠাÐা করে নিতে হবে।
বীজ সংরক্ষণে সাবধানতা অবলম্বন : যে পাত্রেই বীজ সংরক্ষণ করা হোক না কেন তা অবশ্যই বীজ দ্বারা পরিপূর্ণ করে রাখতে হবে। সংরক্ষিত বীজভর্তি পাত্র মেঝেতে না রেখে মাচার ওপরে এবং ঘরের দেয়াল/বেড়া থেকে একটু দূরে রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন বীজসহ পাত্রগুলো মাটির সংস্পর্শে না আসে।  মাটির সংস্পর্শে এলে বীজের আর্দ্রতা বেড়ে বীজ নষ্ট হয়ে যাবে।
সংরক্ষণের সময়ে পোকার আক্রমণ রোধ করার জন্য ফসটক্সিন ট্যাবলেট বা ন্যাপথালিন বল ব্যবহার করলে ওই বীজ আর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।য়

১বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ২ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৩সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নশিপুর, দিনাজপুর-৫২০০
মোবাইল : ০১৭৯৬৫৮৬০৩৯, ই-মেইল : rezaulw@yahoo.com

মোহাম্মদ রেজাউল কবীর১  মো. আব্দুল হাকিম২ নরেশ চন্দ্র দেব বর্মা৩

বিস্তারিত
কৃষিতে নবান্ন

কৃষিকে ঘিরেই মানব সভ্যতার জাগরণ শুরু। বলা হয়ে থাকে কৃষিই কৃষ্টির মূল। কেননা কৃষি বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। বাংলাদেশ ধানের দেশ-গানের দেশ-পাখির দেশ। তাই অগ্রহায়ণে ধান কাটার উৎসব গ্রামবাংলা তথা বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য। পহেলা  অগ্রহায়ণ মানেই ছিল বাঙালি গেরস্থ বাড়িতে উৎসবের আমেজ। নতুন ধানের গন্ধে ম ম উঠান বাড়ি। আবহমান এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পহেলা অগ্রহায়ণ দিনটি নবান্ন উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে এদেশের কৃষিতান্ত্রিক পরিবারগুলো। নবান্ন উৎসব এমন একটি আয়োজন যাতে দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে।


নবান্ন ঋতুকেন্দ্রিক একটি উৎসব। শাব্দিক অর্থের দিকে বলতে পারি, ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’। হেমন্তে নতুন ফসল ঘরে তোলার সময় এই উৎসব পালন করা হয়। এই উৎসব পালিত হয় অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিন। অগ্র অর্থ ‘প্রথম’। আর ‘হায়ণ’ অর্থ ‘মাস’। এ থেকে সহজেই ধারণা করা হয়, একসময় অগ্রহায়ণ মাসই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস। হাজার বছরের পুরোনো এই উৎসব সবচেয়ে অসা¤প্রদায়িক, সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং সবচেয়ে প্রাচীনতম মাটির সঙ্গে চিরবন্ধনযুক্ত।


বাংলাদেশে নবান্ন উৎসব পালিত হয় আমন ধানের ফলন ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে। আমন শব্দটির উৎপত্তি আরবি শব্দ ‘আমান’ থেকে যার অর্থ আমানত। অর্থাৎ আমন কৃষকের কাছে একটি নিশ্চিত ফসল (ঝঁৎব ঈৎড়ঢ়) বা আমানত হিসেবে    পরিচিত ছিল। আবহমান কাল থেকে এ ধানেই কৃষকের গোলা ভরে যা দিয়ে কৃষক তার পরিবারের ভরণ-পোষণ, পিঠাপুলি, আতিথেয়তাসহ সংসারের অন্যান্য খরচ মিটাতো। এজন্যই হয়তো এই মৌসুমকে কেন্দ্র করে পালিত হয় নবান্ন উৎসব। ফলন ও উৎপাদনে বোরোর চেয়ে আমনের অবস্থান অনেক পেছনে হওয়া সত্তে¡ও প্রতি বছর দেশে আমনের উৎপাদন বাড়ছে। গত বছর আমনের উৎপাদন ১ কোটি ৪০ লক্ষ টনে পৌঁছায় যা মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছে ব্রি উদ্ভাবিত নতুন নতুন জাত-প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও সঠিক নীতি প্রয়োগ।


বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমন মৌসুম ও এর পরিবেশ উপযোগী ৪১টি (৩৯টি ইনব্রিড ও ২টি হাইব্রিড) উফশী ধানের জাত ও ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানা রকম কৃষিতাত্তি¡ক ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে। অনুক‚ল পরিবেশ উপযোগী জাতসমূহ হচ্ছে- বিআর৪, বিআর৫, বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৭৯,   ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮৭।
প্রতিক‚ল পরিবেশে চাষযোগ্য জাতগুলো হলো-
খরাপ্রবণ এলাকায় ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭ ও ব্রি ধান৬৬,  ব্রি ধান৭১ বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী জাতগুলো হলো- ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২,  ব্রি ধান৭৯। এছাড়া বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪৬ জাতগুলোর নাবি গুণ থাকার জন্য এদের বীজ  ২০-৩০ শ্রাবণে বপন করে  ৩০-৪০ দিনের চারা সর্বশেষ ৩১ ভাদ্র পর্যন্ত বন্যাপ্রবণ এলাকায় রোপণ করা যায়।
লবণাক্ত এলাকায় বিআর২৩, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, ব্রি ধান৭৩, ব্রি ধান৭৮ জোয়ার-    ভাটাপ্রবণ অলবণাক্ত এলাকার উপযোগী জাতগুলো হলো-    ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৬,ব্রি ধান৭৭ জলাবদ্ধ এলাকায় হয় এমন এলাকার জন্য উপযোগী জাত- বিআর১০, বিআর২৩, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৮ বরেন্দ্র এলাকার জন্য জাতগুলো হলো- ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫, ও ব্রি ধান৮০। এছাড়া সুগন্ধি ব্রি ধান৩৪সহ সমতল বরেন্দ্র অঞ্চলে অনুক‚ল পরিবেশের  জন্য সুপারিশকৃত সব জাতই চাষ করা সম্ভব।
পাহাড়ি এলাকার জন্য উপযোগী জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে-  ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭৫, এবং            ব্রি ধান৮০।
প্রিমিয়াম কোয়ালিটি আমনের জাত : দিনাজপুর, নওগাঁসহ যেসব এলাকায় সরু বা সুগন্ধি ধানের চাষ হয় সেখানে বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৭০,      ব্রি ধান৭৫ ও ব্রি ধান৮০ চাষ করা যায়।
ব্রি উদ্ভাবিত হাইব্রিড জাত : আমন মৌসুমের জন্য ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো ব্রি হাইব্রিড ধান৪ ও ৬। এ জাতগুলো বন্যামুক্ত এলাকায় রোপা আমনে অনুক‚ল পরিবেশে চাষযোগ্য। এ জাতগুলোর চাল মাঝারি চিকন, স্বচ্ছ ও সাদা এবং লম্বা, ভাত ঝরঝরে হওয়ায় কৃষকের কাছে পছন্দনীয়।
নতুন উদ্ভাবিত আমনের জাত ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৮০ এবং ব্রি ধান৮৭ জাতগুলো চাষ করে প্রতিনিয়ত উৎপাদন বৃদ্ধি মাধ্যমে কৃষকের নবান্ন উৎসবে বাড়তি আনন্দ যোগ করা সম্ভব।

গল্প কবিতায় নবান্ন এসেছে অন্যভাবে। কবি জীবনান্দ তার কবিতায় লিখেছেন- ‘অশ্বত্থ পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে/ শুকনো মিয়ানো ছেঁড়া, অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে/ সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে/ হেমন্ত এসেছে তবু;’ (অঘ্রাণ প্রান্তর, বনলতা সেন)। অগ্রহায়ণ মানেই ‘আমন’ ধান কাটার মাস। ‘ বাংলার শস্যহীন প্রান্তরে’ যখন ‘গভীর অঘ্রান’ এসে দাঁড়ায়, তখন উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়ে বাংলার  আকাশ-অন্তরীক্ষে। ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলো বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। কিষান-কিষানির প্রাণমন ভরে ওঠে এক অলৌকিক আনন্দে। সোনালি ধানের প্রাচুর্য আর বাঙালি সংস্কৃতির বিশেষ অংশ প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বারবার ধরা পড়েছে দারুণভাবে। তিনি লিখেছেন, ‘চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল/ তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল/ প্রচুর শস্যের গন্ধ থেকে-থেকে আসিতেছে ভেসে/ পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাড়ারের দেশে।’ পুনর্বার ফিরে আসার আকুতি ধ্বনিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের আরেকটি কবিতায়, ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয় হয়তো শঙ্খচিল শালিখের বেশে;/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে’। নবান্নে প্রকৃতির বিচিত্র রূপের বর্ণনা দিয়েছেন এ দেশের কবি-সাহিত্যিকরা।


কিষান-কিষানিরা নবান্নের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে নবান্নে বাড়ির জামাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়। মেয়েকেও বাপের বাড়িতে ‘নাইয়র’ আনা হয়। নবান্ন আর পিঠেপুলির উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই। তাই অগ্রহায়ণ এলেই সর্বত্র ধ্বনিত হয়, ‘আজ নতুন ধানে হবে রে নবান্ন সবার ঘরে ঘরে।’ কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারদিক আর কৃষকের গোলায় উঠছে পাকা ধান। চিরায়ত বাংলার চিরচেনা রূপ এটি। কৃষকের মাঠে তখন সোনারঙা ধানের ছড়াছড়ি। কৃষক রাশি রাশি সোনার ধান কেটে নিয়ে আসে ঘরে। ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখর হয় বাড়ির আঙিনা। নতুন চালের ভাত আর নানা ব্যঞ্জনে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশে। তৈরি হয় নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর-পায়েস। মুসলিম সমাজে মসজিদে শিন্নি দেওয়ার রেওয়াজও আছে, সনাতন সমাজের কৃষকের ঘরে ঘরে চলে পূজার আয়োজন।


নগরও নবান্ন উৎসব উদযাপনে পিছিয়ে নেই আর। ‘এসো মিলি সবে নবান্নের উৎসবে’ এই সেøাগান সামনে রেখে প্রতিবছর নগরে নবান্ন উৎসব পালিত হয়েছে। এই সময়ে      কৃষকের ঘরে নতুন ফসল আসে, সোনালি ফসলে ভরে ওঠে কৃষকের গোলা। ঘরে থাকে খুশির আমেজ, আর সেই খুশির বহিঃপ্রকাশ ঘটে নবান্ন উৎসবের মাধ্যমে। রাজধানীর শাহবাগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ও বকুলতলায় প্রতি বছর নবান্ন উৎসব উদ্যাপিত হয়। উৎসবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, বাউলগান, আদিবাসীদের পরিবেশনা ও নবান্ন কথনসহ ঐতিহ্যবাহী নানা রকম পিঠা প্রদর্শনী করা হয়ে থাকে। বলতে গেলে অগ্রহায়ণের প্রথম সকালে নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে রাজধানীবাসী। নানা শিল্পীদের কণ্ঠে আনন্দে মাতিয়ে তুলে রমনা বটমূল কিংবা চারুকলা প্রাঙ্গণ।


নবান্ন উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন হলো নবান্নের প্রাণ গ্রামীণ মেলা। হরেক রকমের দোকান নিয়ে বসে গ্রামীণ মেলায়। এই মেলায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের পিঠা-ফুলি, মিষ্টি-সন্দেশ, মন্ডা-মিঠাই, খেলনা-পুতুল, মাটির তৈজষপত্র। আর বাড়তি আনন্দ দিতে বসে বাউল গানের আসর। নবান্ন উৎসবকে ঘিরে নাচে-গানে মুখরিত থাকে মেলাপ্রাঙ্গণ। প্রকৃতি আর পরিবেশের মধ্যে আত্মহারা হয়ে ওঠে বাঙালি মানুষ।


নবান্নের ফসল আমন কাটা ও ঘরে তোলার আনন্দের পাশাপাশি ধান সংরক্ষণের বিষয়টি উঠে আসে। ঠিকমতো আমন সংরক্ষণ করা না গেলে কৃষক পরিবারের নবান্নের আনন্দ ফিকে হয়ে যেতে পারে। আমনের মাঠে শতকরা ৮০ ভাগ পেকে গেলে ফসল কেটে মাঠে বা উঠানে এনে মাড়াই করতে হবে। দ্রæত ও লাভজনক মাড়াইয়ের কৌশল হিসেবে ব্রি উদ্ভাবিত মাড়াই যন্ত্র যেমন- রিপার, হেড ফিড কম্ভাইন হার্ভেস্টার ও মিনি  কম্বাইন হার্ভেস্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। ধান মাড়াই করার জন্য অবশ্যই পরিচ্ছন্ন জায়গা বেছে নিতে হবে। কাঁচা খলায় সরাসরি ধান মাড়াই করার সময় চাটাই, চট বা পলিথিন বিছিয়ে নেয়া উচিত। এভাবে ধান মাড়াই করলে ধানের রঙ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার থাকে। মাড়াই করার পর অন্তত ৪-৫ বার রোদে ভালোভাবে শুকানোর পর ঝেড়ে নিয়ে গোলাজাত বা সংরক্ষণ করতে হবে।


শেষ করছি আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের কৃষকের স্বার্থরক্ষার একটি আকুতির কথা উল্লেখ করে। তিনি মেহনতি মানুষের স্বার্থরক্ষায় সমস্যা জর্জরিত কৃষকের পক্ষে যে দাবিগুলো পেশ করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কৃষক যাতে তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য ও উপযুক্ত মুনাফা পায়, নিজের জমিতে যেন তার কায়েমি স্বত্ব বজায় থাকে এবং কৃষি-জমি থেকে তাকে যেন উচ্ছেদ করা না হয়  এ দাবিগুলো জাতীয় কবি নজরুলের। আজকের দিনেও শুধু কৃষক নয়, গোটা জাতির কাছে দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবান্ন উৎসবে বাঙালি জনজীবনে অনাবিল আনন্দ, সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। সব ক্ষেত্রে এদেশের খেটে খাওয়া কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক এই কামনায় শেষ করছি।

 

কৃষিবিদ এম. আব্দুল মোমিন

ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর-১৭০১, মোবা : ০১৭১৬৫৪০৩৮০, ই-মেইল : Smmomir80@gmail.com

 

বিস্তারিত
কৃষকের ব্যয় সাশ্রয় বারি আলু যন্ত্র

আলু বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিকাশে বিশেষ ভ‚মিকা রাখছে। বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু আলু উৎপাদনের উপযোগী। বাংলাদেশে জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, আর কমছে কৃষি জমি। অল্প জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজন অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন। এর জন্য ভালো বীজ, সার, সেচ ও বালাই ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি। ইদানীং কৃষিতে নানা কারণে প্রয়োজনীয় সংখক শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে । সেজন্য     কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।


আলু শীতকালীন ও স্বল্পমেয়াদি ফসল। অল্প সময়ের মধ্যে আলু রোপণ করতে হয়। প্রচলিত পদ্ধতি ধিরগতি সম্পন্ন, ব্যয় বহুল ও অনেক শ্রমিক প্রয়োজন হয়। গবেষণা করে দেখা গেছে যে, জমিতে শক্তির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন বাড়ে। তাই জমিতে শক্তির ব্যবহার বাড়ানো দরকার। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে এবং বাংলাদেশের কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে এফএমপিই (ফার্মমেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভস্টে প্রসসে ইঞ্জনিয়িারং) বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে আলুসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে কয়েকটি লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। যেহেতু দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও ডিজেল ইঞ্জিন এবং পাওয়ার টিলার (১২-১৬ অশ্বশক্তি) পাওয়া যায়, সেহেতু আলু চাষের  যন্ত্রপাতিগুলো  পাওয়ার টিলারের ইঞ্জিনকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে একদিকে পাওয়ার টিলারের বহুমুখী ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে কৃষকগণ অল্প খরচে শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারবেন। কৃষিতে নিয়জিত শ্রমিক সংখ্যা দিন দিন কমছে। সমীক্ষায় দেখা যায় ২০০২ সালে কৃষিতে ৫১.৭% শ্রমিক নিয়োজিত ছিল তা কমে ২০১৭ সালে ৪০.২% নেমে এসেছে (বিবিএস, ২০১৭)।


আলু বাংলাদেশের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য শস্য। বিগত বছরগুলোতে আলুর ব্যাপক ফলন হয়েছে যা দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। বর্তমানে আলুর উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর প্রায় এক কোটি তিন লক্ষ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে যা দেশের চাহিদার তুলনায় ৩৩ লক্ষ টন উদ্বৃত্ত। কিন্তু মৌসুমে দাম কম থাকায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখেতে পারেনি। এর অন্য আরেকটি কারণ হলো যে, আলু চাষে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। আমাদের দেশে আলু চাষের জন্য জমি তৈরির কাজটি পাওয়ার টিলার দিয়ে দিলেও অন্যান্য কাজ যেমন: লাইন করা, একটি একটি করে বীজ নির্দিষ্ট দূরত্বে ফেলা, আলুকে ঢেকে দেয়া, বেড তৈরি করার কাজগুলো হাতের সাহায্যেই করা হয়ে থাকে। শ্রমিকের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ও শহরমুখী নানাবিধ পেশার দিকে ঝুকে পড়ায় মৌসুমের সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা  যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে তেমনি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আলু চাষে কৃষকের কষ্ট কমাতে শ্রমিক সাশ্রয় করতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ হতে পাওয়ার টিলার চালিত আলু রোপণ যন্ত্র উদ্ভাবন করা হয়েছে।


পাওয়ার টিলার চালিত এ যন্ত্র একবারেই লাইন তৈরি করে, নির্দিষ্ট দূরত্বে বীজ দেয়, আলু ঢেকে দেয় ও বেড তৈরি করে। এ যন্ত্রটি ৬০ সে.মি. চওড়া বেড তৈরি করে যার উচ্চতা হয় ১২-১৪ সে.মি.। যন্ত্রটিতে ২০টি ব্লেড বা ফাল থাকে যা একবিশেষ পদ্ধতিতে সাজানো হয় ফলে মাটি দুই পাশ থেকে মাঝের দিকে যায়। দুইটি ডিস্ক দুই পাশ থেকে মাটিকে আরো গুছিয়ে আনে ও পেছনের বেড শেপার মাটিকে চাপ দিয়ে সুন্দর বেড তৈরি করে দেয়। যন্ত্রের মাঝ বরাবর একটি ফারো ওপেনার আছে যা উঁচুনিচু করে বীজ গভীরতা কম বেশি করা যায়। বীজ হপারে ২৮-৪০ মিমি সাইজের আলু বীজ বা বড়বীজ কে কেটে কাক্সিক্ষত আকার করে ঢেলে দেয়া হয়। কাপ পদ্ধতির মিটারিং ডিভাইস দ্বারা একটি একটি বীজ ২৩-২৫ সেমি দূরত্বে পড়তে থাকে। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি বীজ কাপগুলো প্রয়োজনের বীজের আকারের ভিন্নতার অনুসারে পরিবর্তন করে নেয়া যায়। এক হেক্টর জমির আলু যেখানে হাতে লাগাতে ৬৭ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় সেখানে যন্ত্রদ্বারা আলু লাগতে মাত্র ৪ জন শ্রমিক লাগে। হাতে আলু লাগালে হেক্টরে খরচ হয় ১৬৯০০ টাকা কিন্তু বারি আলু রোপণ যন্ত্র দিয়ে আলু লাগাতে খরচ হয় হেক্টরে মাত্র ৪৮০০ টাকা। বারি আলু রোপণ যন্ত্র ব্যবহারে ৯৭% শ্রমিক ও ৬৭% আলু রোপণ খরচ কমানো যায়। যে কৃষকের পাওয়ার টিলার রয়েছে তিনি আর মাত্র ৫৫০০০ টাকা দিয়ে যন্ত্রটি কিনে ব্যবহার করতে পারবে। যন্ত্র চালাতে ঘণ্টায় মাত্র ১.৫ থেকে ২ লিটার ডিজেল লাগে। যন্ত্রটির দ্বারা এক বিঘা জমিতে আলু  রোপণ করতে ১-১.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। একজন চালক ও বীজ সরবরাহের জন্য একজন সহকারী দ্বারা যন্ত্রটি দিনে ৬-৮ বিঘা জমিতে আলু বীজ রোপণ করতে পারে।


এছাড়া বারি উদ্ভাবিত আলু উত্তোলন যন্ত্রও রয়েছে যা অত্যন্ত শ্রমিক সাশ্রয়ী। পাওয়ার টিলার চালিত আলু উত্তোলন যন্ত্র মাটির নিচে থাকা সব আলুকে মাটির ওপরে এনে গুছিয়ে রাখে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে কোদাল দিয়ে আলুর বেড খুঁড়ে ও হাত দিয়ে আলুকে খুঁজে নিতে হয় না। প্রচলিত পদ্ধতিতে মাটির নিচে প্রায় ১০% আলু থেকে যায় কিন্তু যন্ত্র ব্যবহারে একবারেই ছোট-বড় সব আলু উঠে আসে। এক হেক্টর জমির আলু উঠাতে মাত্র ২১ জন শ্রমিক লাগে যেখানে হাতে উঠাতে ৫০জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। হাতে আলু উঠাতে হেক্টরে খরচ হয় ২২০০০ টাকা কিন্তু বারি আলু উত্তোলন যন্ত্র দিয়ে আলু উঠাতে খরচ হয় হেক্টরে মাত্র ১৩৫০০ টাকা। বারি আলু উত্তোলন যন্ত্র ব্যবহারে ৫৮% শ্রমিক ও ৩৯% আলু উত্তোলন খরচ কমানো যায়। যে কৃষকের পাওয়ার টিলার রয়েছে তিনি আর মাত্র ৪৫০০০ টাকা দিয়ে যন্ত্রটি কিনে ব্যবহার করতে পারবে। যন্ত্র চালাতে ঘণ্টায় মাত্র ১.০ থেকে ১.৫ লিটার ডিজেল লাগে। যন্ত্রটির দ্বারা এক বিঘা জমিতে   ১-১.৫ ঘণ্টা সময় লাগে।


বারি আলু রোপণ ও আলু উত্তোলন যন্ত্র রাজশাহী, পঞ্চগড়, গাজীপুর, বগুড়া, যশোর ও দেশের অন্যান্য এলাকার গবেষণা মাঠে ও কৃষক মাঠে ব্যবহার শুরু হয়েছে। কৃষি কাজে শ্রমিক ঘাটতি ও শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কৃষকগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কম খরচে তাদের আলু চাষসহ অন্যান্য কৃষি কাজ সম্পন্ন করতে পারছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাথে চুক্তিভুক্ত যন্ত্র প্রস্তুতকারীরা ইতিমধ্যে এ যন্ত্রগুলো তৈরি ও বাজারজাতকরণ শুরু করেছে। ফলে এসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে তা আরো বাড়বে। যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতাও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আলু উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে, তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া, দিনাজপুরে অবস্থিত প্রস্তুতকারকগণ উৎপাদন ও বিপণন করছেন। নতুন উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির মান যাতে ঠিক থাকে, সেজন্য নমুনা দেয়ার সময় তাদের যন্ত্রপাতি প্রস্তুত সম্বন্ধে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং প্রস্তুতকালীন সময়ে বিজ্ঞানীগণ কারখানা পরিদর্শন করে যথাযথ নির্দেশ প্রদান করেন। এর ফলে এসব কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য  হয়ে উঠেছে এবং এগুলোর চাহিদাও দিন দিন বেড়ে চলছে।

 

ড. মোহাম্মদ এরশাদুল হক
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফার্মমেশিনারি এন্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট,
গাজীপুর-১৭০১, মোবা : ০১৭১২৬৩৫৫০৫, ই-মেইল : arshadulfmpe@gmail.com

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (অগ্রহায়ণ-১৪২৬)

কৃষিবিষয়ক
নিরাপদ ফসল উৎপাদনের জন্য আপনার ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগ দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করুন।
মো : আজগর আলী, গ্রাম: হরকাডাঙ্গা, উপজেলা: গোমস্তাপুর, জেলা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রশ্ন: পেঁপে গাছের পাতায় এক ধরনের পোকার আক্রমণের ফলে পাতা ও ফলে সাদা পাউডারের মতো আবরণ পড়ে এবং অবশেষে গাছ মারা যাচ্ছে। কী করব?
উত্তর :  এ ধরনের পোকার নাম মিলিবাগ। বর্তমানে পেঁপে গাছের একটি মারাত্মক পোকা। আক্রমণের শুরুর দিকে পোকাসহ আক্রান্ত পাতা বা কাÐ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। কিন্তু পোকার আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম সাবান গুঁড়া অথবা এডমায়ার ২০০ এমএল ০.২৫ মিলি হারে মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। তবেই আপনি উপকার পাবেন।
মো: আবরার হোসেন, গ্রাম: লখাইডাঙ্গা, উপজেলা :  মণিরামপুর, জেলা: যশোর
প্রশ্ন: আমার মাল্টা বাগানে মাল্টা গাছের পাতায় হলদে ভাব, পাতার শিরা দুর্বল, পাতা কিছুটা কোঁকড়ানো ও পাতার সংখ্যা কমে আসছে। এমনকি গাছ ওপর থেকে নিচের দিকে মরে আসছে।  কী করণীয় ? জানাবেন।
উত্তর :  আপনার মাল্টা গাছের এ সমস্যাকে গ্রিনিং বলে। এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। আর এ রোগটি সাইলিডবাগ নামক এক ধরনের পোকা দ্বারা সংক্রমিত হয়। এজন্য রোগাক্রান্ত গাছ থেকে ডাল নিয়ে জোড় কলম, শাখা কলম বা গুটি কলম করলেও এ রোগ দেখা যায়। এ কারণে রোগাক্রান্ত গাছ থেকে কোনো ধরনের কলমের চারা তৈরি করা ঠিক না। এ রোগ প্রতিকারে মে থেকে অক্টোবর মাসে একবার সুমিথিয়ন ৫০ ইসি প্রয়োগ করে রোগ বিস্তারের বাহক পোকা সাইলিডবাগ দমন করতে হবে। আর আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে ফেলতে হবে। বাগানের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গাছকে সবল ও রোগমুক্ত রাখতে হবে।   
মো. ময়েজ উদ্দীন, গ্রাম: ল²ীরপাড়, উপজেলা:  বিশ্বম্বরপুর, জেলা: সুনামগঞ্জ
প্রশ্ন: পেঁয়াজের পাতা উপরের দিক থেকে আস্তে আস্তে মরে যেতে থাকে এবং পাতা ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে হলদে হয়ে মরে যায়। এ সমস্যার সমাধান জানাবেন।  
উত্তর : এ ধরনের রোগকে পেঁয়াজের বøাইট রোগ বলে। এ রোগ প্রতিকারে সুস্থ নীরোগ বীজ ও চারা ব্যবহার করা দরকার। আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া রোভরাল বা প্রোভেক্স-২০০ নামক ছত্রাকনাশক প্রতি কেজি পেঁয়াজ বীজের সাথে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে। আর রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম রোভরাল বা ২ গ্রাম রিডোমিল গোল্ড মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পর পর ৩ থেকে ৪ বার পেঁয়াজ গাছে স্প্রে করতে হবে। তবেই আপনি উপকৃত হবেন।    
মুক্তা আকতার, গ্রাম: দক্ষিণ ভাদারতিল, উপজেলা: কালীগঞ্জ, জেলা: গাজীপুর
প্রশ্ন: মরিচ গাছে এক ধরনের পোকার আক্রমণে পাতা উপরের দিকে কুঁকড়ে যায়। পাতা বিকৃত ও বেঢপ দেখায়। কী করণীয়।
উত্তর :  মরিচ গাছে এ সমস্যাটি থ্রিপস পোকার আক্রমণ হলে এ রকমের সমস্যা দেখা যায়। এ পোকা দমনে আঠালো সাদা ফাঁদ প্রতি হেক্টরে ৪০টি ব্যবহার করে পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জৈব বালাইনাশক হিসেবে এক কেজি আধা ভাঙ্গা নিম বীজ ২০ লিটার পানিতে ২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি ছেঁকে নেয়ার পর পাতার উপরের দিকে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া পোকার আক্রমণ বেশি হলে ফিপ্রোনিল গ্রæপের যে কোনো কীটনাশক ১০ মিলি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে সঠিক নিয়মে স্প্রে করতে হবে।
মো. আজমল ইসলাম, গ্রাম: ফলিয়ামারি, উপজেলা :    ময়মনসিংহ সদর, জেলা: ময়মনসিংহ
প্রশ্ন:  লাউ গাছের পাতায় কেমন জানি ভেজা ভেজা দাগ দেখা যায়। পাতাও পচে যায়। এ ছাড়া লাউ গাছের কাÐ ফেটে লালচে আঠা বের হচ্ছে। এ অবস্থায় কী করণীয়?
উত্তর : বড় আকারের লাউ ক্ষেতে দু-একটা লাউ গাছে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে লাউ গাছ উঠিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু যদি রোগের প্রকোপ বেশি হয় তবে আক্রান্ত  কাÐে বর্দোপেস্ট লাগানো এবং ১% বর্দোমিকচার বা বিøটক্স বা সানভিট ৪ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে সঠিকভাবে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর স্প্রে করলে উপকৃত হবেন।  
নাজমুল করিম, গ্রাম: বালাগ্রাম  উপজেলা: জলঢাকা, জেলা: নীলফামারী
প্রশ্ন: ধনিয়া পাতার দাগ রোগ দমন করব কিভাবে জানাবেন।  
উত্তর :  এ রোগ হলে পাতায় হলুদ রঙের দাগ পড়ে। পরে সাদা হয়ে যায়। এমনকি অবশেষে পুরো পাতাটাই নষ্ট হয়ে যায়। এ রোগ দমনের জন্য ক্ষেত পরিষ্কার রাখা জরুরি। আক্রমণ বেশি দেখা দিলে রোভরাল ২ গ্রাম বা ডায়থেন এম ৪৫  ছত্রাকনাশক ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে আশা করি উপকার পাবেন।    
মৎস্য বিষয়ক
মো: হাবিবুর রহমান, গ্রাম: গাজীরকান্দি, উপজেলা: নবীনগর, জেলা: ব্রাহ্মণবাড়ীয়া
প্রশ্ন: মাছের লেজ ও পাখনা পচে যাচ্ছে কী করব?
উত্তর :  এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। প্রথমে পাখনা ও লেজের প্রান্তে সাদা দাগ পড়ে। ক্রমে পাখনা ও লেজ সম্পূর্ণ ক্ষয় হয়ে যায়। মাছের রঙ ফ্যাকাশে হয়। মাছ ভারসাম্য হারায় ও মাছ মারা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে মাছের আক্রান্ত পাখনা কেটে ফেলে দেয়ার পর শতকরা দুইভাগ সিলভার নাইট্রেট দ্রবণে অথবা শতকরা ২.৫ ভাগ লবণ পানিতে ধুয়ে ফেলতে হবে। অথবা ১ লিটার পানিতে ০.৫ গ্রাম কপার সালফেট বা তুঁত মিশিয়ে তার মধ্যে আক্রান্ত মাছকে গোসল করালে এ রোগ ভালো হয়। বড় মাছের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি দেহ ওজনের জন্য ১০ মিলিগ্রাম টেট্রাসাইক্লিন ইনজেকশন সপ্তাহে ২ বার দেয়া যেতে পারে। অথবা ১০ কেজি খাবারের সাথে ১০ গ্রাম অ্যাকুয়ামাইসিন বা রেনামাইসিন বা অক্সিসেন্ট্রিন/টেট্রাভেট ২০০ ডবিøউএসপি মিশিয়ে সাত দিন মাছকে খাওয়াতে হবে।  
মো: আক্কাস আলী, গ্রাম: রামচÐিপুর উপজেলা: কাউনিয়া, জেলা: রংপুর
প্রশ্ন: ডিম স্ট্রিপিং পদ্ধতি স¤পর্কে জানতে চাই।   
উত্তর : হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার পর স্ত্রী মাছকে ব্রিডিং পুলে স্রোত ও ফোয়ারা সহকারে স্ত্রী মাছ হতে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। ডিম পাড়ার সঠিক সময়ে স্ত্রী মাছ ধরে শুকনো কাপড় দ্বারা মুছে পেটে সামান্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি পাত্রে ডিম সংগ্রহ করতে হবে। এরপর পুরুষ মাছের পেটে চাপ দিয়ে বীর্য পূর্বে সংগ্রহীত ডিমের ওপর ফেলতে হবে এবং মুরগির নরম পালক দিয়ে বীর্যকে ডিমের সাথে মিশিয়ে ডিমকে নিষিক্ত করতে হবে। নিষিক্ত ডিমে ক্রমান্বয়ে পানি দিয়ে ডিমের পানির শোষণ সম্পূর্ণভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পানি শোষিত নিষিক্ত ডিমকে পরিমাপ সহকারে হ্যাচিং জার অথবা হ্যাচিং পুলে পানির স্রোত ও ফোয়ারার মধ্যে স্ফুটনের জন্য রাখতে হবে।
প্রাণিসম্পদ বিষয়ক
মো: সোরাব হোসেন, গ্রাম: ভানুর দীঘিপাড়া, উপজেলা : বালিয়াডাঙ্গি, জেলা: ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন: আমার ভেড়ার বয়স ২ বছর।  ভেড়ার মুখে, পা এবং ওলানে ঘা দেখা যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণায় ঘা দেখা যাচ্ছে। কী করব?
উত্তর : ঘায়ে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করার জন্য ফিটকিরি দিয়ে ধুয়ে চিকিৎসা করতে হবে। মিথাইলিন বøু বা ক্রিস্টাল ভায়োলেট শতকরা ২ ভাগ মুখে বা আক্রান্ত জায়গায় প্রতিদিন একবার ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
মো: নাজমুল সরকার, গ্রাম: মাধবপাশা, উপজেলা: বাবুগঞ্জ, জেলা: বরিশাল
প্রশ্ন: আমার মুরগিগুলো দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। মাথার ঝুঁটি শুকিয়ে ছোট হয়ে যায় ও ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় কী করণীয়?
উত্তর : প্রথমত ভাইরাসজাতীয় রোগ হওয়ায় এর কোনো চিকিৎসা নাই। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের আক্রমণ হতে রক্ষা পেতে এনফ্লক্সভেট সলিউশন খাওয়াতে হবে।য়   
(মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক প্রশ্ন কৃষি কল সেন্টার হতে প্রাপ্ত)

 

কৃষিবিদ মো. তৌফিক আরেফীন

উপপ্রধান তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল নং ০১৭১১১১৬০৩২, iquedae25@gmail.com

 

বিস্তারিত
পৌষ মাসের কৃষি (অগ্রহায়ণ ১৪২৬)

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের সবার জন্য রইল শীতের শুভেচ্ছা। হেমন্ত শেষে ঘন কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে শীত এসে উপস্থিত হয়েছে আমাদের মাঝে। বাংলার মানুষের মুখে অন্ন জোগাতে শীতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় লেপের উষ্ণতাকে ছুড়ে ফেলে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মাঠের কাজে। মাঠের কাজে সহায়তার জন্য আসুন সংক্ষেপে আমরা জেনে নেই পৌষ মাসে সমন্বিত কৃষির সীমানায় কোন কাজগুলো আমাদের করতে হবে।
বোরো ধান
অতিরিক্ত ঠাণ্ডার সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে এবং বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিতে হবে। সে সাথে প্রতিদিন সকালে চারার ওপর জমাকৃত শিশির ঝরিয়ে দিতে হবে। এতে চারা ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। বীজতলায় সব সময় নালা ভর্তি পানি রাখতে হবে। চারাগাছ হলদে হয়ে গেলে প্রতি বর্গমিটারে ৭ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। এরপরও যদি চারা সবুজ না হয় তবে প্রতি বর্গমিটারে ১০ গ্রাম করে জিপসাম দিতে হবে। চারা রোপণের জন্য মূল জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে পানিসহ কাদা করতে হবে। জমিতে জৈবসার দিতে হবে এবং শেষ চাষের আগে দিতে হবে ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার। চারার বয়স ৩৫-৪৫ দিন হলে মূল জমিতে চারা রোপণ করতে হবে। ধানের চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর প্রথম কিস্তি, সাধারণত গুছিতে কুশি দেখা দিলে দ্বিতীয় কিস্তি এবং কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন আগে শেষ কিস্তি হিসেবে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
গম
গমের জমিতে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সেচ দিতে হবে। চারার বয়স ১৭-২১ দিন হলে গমক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করে একরপ্রতি ১২-১৪ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে এবং সেচ দিতে হবে। সেচ দেয়ার পর জমিতে জো এলে মাটির ওপর চটা ভেঙে দিতে হবে। গমের জমিতে যেখানে ঘনচারা রয়েছে সেখানে কিছু চারা তুলে পাতলা করে দিতে হবে।
ভুট্টা
ভুট্টাক্ষেতের গাছের গোড়ার মাটি তুলে দিতে হবে। গোড়ার মাটির সাথে ইউরিয়া সার ভালো করে মিশিয়ে দিয়ে সেচ দিতে হবে। গাছের নিচের দিকের মরা পাতা ভেঙে দিতে হবে। ভুট্টার সাথে সাথী বা মিশ্র ফসলের চাষ করে থাকলে সেগুলোর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে।
আলু
চারা রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর অর্থাৎ দ্বিতীয়বার মাটি তোলার সময় ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। দুই সারির মাঝে সার দিয়ে কোদালের সাহায্যে মাটি কুপিয়ে সারির মাঝের মাটি গাছের গোড়ায় তুলে দিতে হবে।  ১০-১২ দিন পরপর এভাবে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে না দিলে গাছ হেলে পড়বে এবং ফলন কমে যাবে। আলু ফসলে নাবি ধসা রোগ দেখা দিতে পারে। নি¤œ তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া ও বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে ডায়থেন এম-৪৫ অথবা ম্যানকোজেব অথবা ইন্ডোফিল প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। গাছে রোগ দেখা দেয়া মাত্রই ৭ দিন পর পর সিকিউর অথবা অ্যাক্রোভেট এম জেড ২ গ্রাম/লিটার হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। মড়ক লাগা জমিতে সেচ দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। তাছাড়া আলু ফসলে মালচিং, সেচ প্রয়োগ, আগাছা দমনের কাজগুলোও করতে হবে। আলু  গাছের বয়স ৯০ দিন হলে মাটিরসমান করে গাছ কেটে দিতে হবে এবং ১০ দিন পর আলু তুলে ফেলতে হবে। আলু তোলার পর  ভালো করে শুকিয়ে বাছাই করতে হবে এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তুলা
তুলা সংগ্রহের কাজ শুরু করতে হবে। তুলা সাধারণত ৩ পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। শুরুতে ৫০% বোল ফাটলে প্রথম বার, বাকি ফলের ৩০% পরিপক্ব হলে দ্বিতীয় বার এবং অবশিষ্ট ফসল পরিপক্ব হলে শেষ অংশের তুলা সংগ্রহ করতে হবে। রৌদ্রময় শুকনা দিনে বীজ তুলা সংগ্রহ করতে হবে। ভালো তুলা আলাদাভাবে তুলে ৩-৪ বার রোদে শুকিয়ে চট অথবা ব্যাগে সংরক্ষণ করতে হবে।
ডাল ও তেল ফসল
মসুর, ছোলা, মটর, মাষকলাই, মুগ, তিসি পাকার সময় এখন। সরিষা, তিসি বেশি পাকলে রোদের তাপে ফেটে গিয়ে বীজ পড়ে যেতে পারে, তাই এগুলো ৮০ ভাগ পাকলেই সংগ্রহের ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ডাল ফসলের ক্ষেত্রে গাছ গোড়াসহ না উঠিয়ে মাটি থেকে কয়েক ইঞ্চি রেখে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। এতে জমিতে উর্বরতা এবং নাইট্রোজেন সরবরাহ বাড়বে।
শাকসবজি
ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, ওলকপি, শালগম, গাজর, শিম, লাউ, কুমড়া, মটরশুঁটি এসবের নিয়মিত যতœ নিতে হবে। বিভিন্ন শাক যেমন- লালশাক, মুলাশাক, পালংশাক একবার শেষ হয়ে গেলে আবার বীজ বুনে দিতে পারেন। টমেটো ফসলের মারাত্মক পোকা হলো ফলছিদ্রকারী পোকা। ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রতি বিঘা জমির জন্য ১৫টি ফাঁদ স্থাপন করতে হবে। আক্রমণ তীব্র হলে কুইনালফস গ্রæপের কীটনাশক (দেবীকুইন ২৫ ইসি/   কিনালাক্স ২৫ ইসি/করোলাক্স ২৫ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার পরিমাণ মিশিয়ে স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়। টমেটো সংগ্রহ করে বাসায় ৪-৫ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করার জন্য আধা পাকা টমেটোসহ টমেটো গাছ তুলে ঘরের ঠাÐা জায়গায় উপুর করে ঝুলিয়ে টমেটোগুলোকে পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। শীতকালে মাটিতে রস কমে যায় বলে সবজি ক্ষেতে চাহিদামাফিক নিয়মিত সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া আগাছা পরিষ্কার, গোড়ায় মাটি তুলে দেয়া, সারের উপরিপ্রয়োগ ও রোগবালাই প্রতিরোধ করা জরুরি।
গাছপালা
বর্ষায় রোপণ করা ফল, ঔষধি বা কাঠ গাছের যতœ নিতে হবে। গাছের গোড়ার মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে গাছকে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে। রোগাক্রান্ত গাছের আক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করে দিতে হবে। গাছের গোড়ায় নিয়মিত সেচ দিতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
শীতকালে পোলট্রিতে অপুষ্টি, রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব সমস্যা দেখা যায়। তাই প্রয়োজনীয় যতœ নিতে হবে। মোরগ-মুরগীর অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে ও ফলিক এসিড খাওয়াতে হবে। শীতের তীব্রতা বেশি হলে পোলট্রি শেডে অবশ্যই মোটা চটের পর্দা লাগাতে হবে এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ সময় হাঁসের যেসব রোগ হয় সেগুলো হলো- হাঁসের প্লেগ রোগ, কলেরা রোগ এবং বটুলিজম। প্লেগ  রোগ প্রতিরোধে ১৮-২১ দিন বয়সে প্রথম মাত্রা এবং প্রথম টিকা দেয়ার পর ৩৬-৪৩ দিন বয়সে দ্বিতীয় মাত্রা পরবর্তী ৪-৫ মাস পরপর একবার ডাক প্লেগ টিকা দিতে হবে। গাভীর জন্য শীতকালে মোটা চটের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি। শীতকালে ছাগলের নিউমোনিয়া রোগটি খুব বেশি হয়। যদি ৫ দিনের বেশি কাশি ও দুর্গন্ধযুক্ত পায়খানা হয় তবে বুঝতে হবে প্যারাসাইটের জন্য নিউমোনিয়া হয়েছে। নিউমোনিয়াতে সেফটিয়াক্সোন ও টাইলোসিন ব্যবহারে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
মৎস্যসম্পদ
শীতকালে মাছের বিশেষ যত্ন নেয়া দরকার। কারণ এ সময়ে পুকুরে পানি কমে যায়। পানি দূষিত হয়। মাছের রোগবালাইও বেড়ে যায়। শীতের সময় কার্প ও শিং জাতীয় মাছে ড্রপসি বা উদর ফোলা রোগ বেশি হয়। এ রোগ প্রতিরোধে মাছের ক্ষত রোগ যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। আর এ রোগের প্রতিকারে প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন বা স্ট্রেপটোমাইসিন পর পর ৭ দিন খাওয়াতে হবে। এ সময় আগামী বর্ষায় রুইজাতীয় মাছকে কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফুটাতে ইচ্ছুক চাষিগণ প্রজননক্ষম বয়ঃপ্রাপ্ত মাছ সংগ্রহ করে মজুদ পুকুরে রেখে দিন।  
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, শীতকাল আমাদের কৃষির জন্য একটি নিশ্চিত মৌসুম। শুকনো মৌসুম বলে মাটিতে রস কম থাকে। তাই প্রতি ফসলে চাহিদামাফিক সেচ প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে। কৃষির মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারি। কৃষির যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য আপনার নিকটস্থ উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা ১৬১২৩ এ নম্বরে যে কোনো মোবাইল অপারেটর থেকে কল করে নিতে পারেন বিশেষজ্ঞে পরামর্শ। আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা।

কৃষিবিদ ফেরদৌসী বেগম
সম্পাদক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা।  টেলিফোন : ০২৫৫০২৮৪০৪, মেইল : editor@ais.gov.bd

 

 

বিস্তারিত
পানিকচু বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রযুক্তি

সবজি হিসেবে বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কচুর ব্যবহার বেশ পুরনো। ধারণা করা হয় প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল, শ্রীলংকা, সুমাত্রা ও মালয় অঞ্চল কচুর উৎপত্তিস্থল। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে কচুর ব্যবহার অতি প্রাচীন। সুদীর্ঘকাল ধরে সবজি ও ভেষজ হিসেবে কচু ব্যবহৃত হচ্ছে। কচুতে প্রচুর পরিমাণ শ্বেতসার, লৌহ, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন এ ও সি রয়েছে।


সাধারণত যে কচু স্বল্প পানিতে চাষ করা যায় তাকে পানিকচু বলা হয়। আমাদের দেশে স্থান ভেদে পানিকচুর নাম ভিন্ন যেমন নারকেলি কচু, শোলা কচু, জাত কচু, বাঁশকচু, কাঠকচু ইত্যাদি। তবে পানি কচু নামেই সর্বাধিক পরিচিত। পানিকচুর লতি ও কাণ্ড সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্ষার শেষে যখন বাজারে সবজির ঘাটতি দেখা দেয় তখন জুন-সেপ্টেম্বর মাসের বাজারে পানি কচুর লতি ও কাÐ বেশ জনপ্রিয়।

 
পানিকচুর জাত
বারি পানিকচু -১ (লতিরাজ)
এ জাতে কাণ্ড অপেক্ষা লতির প্রাধান্য বেশি। জীবনকাল  ১৮০-২৭০ দিন। রোপণের ২ মাস পর থেকে ৭ মাস পর্যন্ত লতি হয়ে থাকে। হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ টন লতি এবং ১৫-২০ টন কাণ্ড উৎপন্ন হয়। লতি সমানভাবে সিদ্ধ হয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট কম থাকায় গলা চুলকায় না।
বারি পানিকচু -২
লতি প্রধান ভক্ষণযোগ্য অংশ। উৎপাদিত লতির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ মিটার। লতি গোলাকার, অপেক্ষাকৃত মোটা ও গাঢ় সবুজ বর্ণের হয়। হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ টন লতি এবং ১৮-২২ টন কাণ্ড উৎপন্ন হয়। লতি সমানভাবে সিদ্ধ হয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট কম থাকায় গলা চুলকায় না।
বারি পানিকচু -৩
কাণ্ড প্রধান ভক্ষণযোগ্য অংশ। হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ টন কাণ্ড এবং ১০-১২ টন লতি উৎপন্ন হয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট কম থাকায় গলা চুলকায় না।
বারি পানিকচু -৪
অবমুক্তের বছর ২০১৩। মূলত রাইজোম প্রধান ভক্ষণযোগ্য অংশ তবে স্বল্প পরিসরে লতিও হয়। কাÐ মোটা ও গোলাপি বর্ণের। রাইজোম গোলাপি বর্ণের ও ফ্লেস হালকা গোলাপি যা এ জাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।  হেক্টর প্রতি ৩৫-৪৫ টন কাণ্ড এবং ৫-৮ টন লতি উৎপন্ন হয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট কম থাকায় গলা চুলকায় না।
বারি পানিকচু -৫
রাইজোম প্রধান ভক্ষণযোগ্য অংশ। কাণ্ড মোটা ও সবুজ বর্ণের। রাইজোম হালকা সবুজ বর্ণের ও ফ্লেস হালকা সাদাটে। হেক্টর প্রতি ৩৫-৪০ টন কাণ্ড এবং ৫-৮ টন লতি উৎপন্ন হয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট কম থাকায় গলা চুলকায় না।
বারি পানিকচু -৬
এর রাইজোম লম্বায় প্রায় ১ মিটার ও বেড়ে ৩০-৩৫ সেমি যার বর্ণ হালকা সবুজ। শাঁস আকর্ষণীয় সাদা। রাইজোমই প্রধান ফসল। হেক্টর প্রতি ৮০-৯০ টন কাণ্ড এবং ৬-৭ টন লতি উৎপন্ন হয়।
বপন ও রোপণের সময়
আগাম ফসলের জন্য কার্তিক ও নাবী ফসলের জন্য মধ্য ফাল্গুন থেকে মধ্য বৈশাখ মাসে লাগানো যায়। তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য অগ্রহায়ণ-পৌষ মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। হেক্টর প্রতি সাধারণত ৩৭-৩৮ হাজার চারার প্রয়োজন হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৪৫ সে.মি.।
পানি কচুর চারা রোপণের আগে এর সমস্ত পাতা, শিকড় ও কাণ্ডে তলার কিছু অংশ কেটে ফেলতে হবে। এতে করে চারা দ্রুত মাটিতে লেগে যায়। জমি কাদাময় না হলে রোপণের পর পরই জল সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। যে সব জায়গা বন্যার পানিতে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে সেখানে কার্তিক মাসেই চারা লাগানো ভালো  এতে বর্ষার পানিতে তলিয়ে যাবার আগেই ফসল তোলা যায়।
মাটি
পলি দোঁআশ ও এঁটেল মাটি পানিকচু চাষের উপযোগী। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে পানি কচু লাগালে বন্যার ভয় থাকে না। তবে জমিতে যাতে সব সময়ই কিছু পানি থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পানি কচুর গোড়ায় দাঁড়ানো পানির গভীরতা ৮-১০ সে.মি. এর বেশি হলে ফলন কমে যায় এবং দাঁড়ানো পানি মাঝে মাঝে নাড়িয়ে দিতে হয়। বর্ষাকালে পানির পরিমাণ ৮-১০ সে.মি. এর বেশি হলে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে ফেলতে হয়।
সার ব্যবস্থাপনা
পানি কচু চাষে সার প্রয়োগ অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত হয়েছে । বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট অনুমোদিত
সারের মাত্রা হলো -
*এলাকা ভেদে প্রয়োজনানুসারে।
গোবর, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট, বরিক এসিড ও অর্ধেক এমওপি সার জমি তৈরির সময় শেষ চাষের আগে প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে অর্ধেক এমওপি ও এক ষষ্টাংশ ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিতে হবে। বাকি পাঁচ ভাগ ইউরিয়া সমান কিস্তিতে ১৫ দিন পর পর জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
আগাছা দমন ব্যবস্থাপনা
পোকামাকড় : পোকামাকড়ের মধ্যে লেদা পোকা, লাল মাকড় ও জাব পোকা প্রধান।
লেদা পোকা : পূর্ণ বয়স্ক মথ পাতার নিচে গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে। কীড়া প্রাথমিক পর্যায়ে সবুজ বর্ণের ও মাথা কালো। এ পোকা প্রতিকারের জন্য হাত দিয়ে ডিম ও কীড়া সংগ্রহ করে নষ্ট করা যেতে পারে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত   বালাইনাশক যেমন ট্রেসার ৪৫ এসসি প্রতি লিটার পানিতে  মিশিয়ে ০.৪ মিলি. প্রয়োগ করা যেতে পারে।
কচুর লাল মাকড় :  পাতার নিচে লাল রংয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। এদেরকে খালি চোখে দেখা যায় না। পূর্ণ বয়স্ক ও নিম্ফ উভয়েই গাছের ক্ষতি করে। অনুমোদিত বালাইনাশক যেমন ভার্টিমেক ১.৮ ইসি ১.৮ মিলি/লি: মাত্রায় প্রয়োগ করে এটি দমন করা যায়।
জাবপোকা : জাবপোকা কচু থেকে রস শোষণ করে এবং ভাইরাস রোগ ছড়িয়ে ফসলের ক্ষতি করে। এই পোকা পাতার রস শোষণ করে ও ক্লোরফিলের পরিমাণ হ্রাস করে। পোকা দমনের জন্য এডমায়ার ১০০ এসপি ০.৫ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে  প্রয়োগ করতে হবে।
রোগ :
পাতা ঝলসানো রোগ : এর আক্রমণে পাতা ও করম পচে যায়। জুলাই-সেপ্টেম্বরে এ রোগ বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত পাতায় প্রথমে ছোট কালো দাগ দেখা যায় যা পরবর্তীতে হলুদ প্রান্তযুক্ত বাদামি বর্ণে পরিণত হয়। দাগগুলো একত্রিত হয়ে পুরো পাতায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ গাছ ও পাতা পুড়ে যায়। কাÐ পচে যায়। রোগের অন্যতম উৎস বীজ হওয়ায় রোগ দমনের জন্য রোগমুক্ত এলাকা থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। রোগ দেখা মাত্রই অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন সিকিউর বা রিডোমিল্ড গোল্ড ২০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
পাতায় দাগ পড়া বা লিফ স্পট : ছত্রাক জনিত রোগ। কচু পাতায় শুকনো ও মাঝারি আকারের দাগ পড়ে। আক্রমণ বেশি হলে সম্পূর্ণ গাছই পুড়ে যেতে পারে। ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। সুস্থ, সবল রোগমুক্ত চারা রোপণ ও শস্য পর্যায় অনুসরন এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।  আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত বালাইনাশক যেমন টিল্ট ০.৫ মিলি/লিটার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
গোড়া পচা রোগ : ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগের আক্রমণে গাছের গোড়ায় ছত্রাকের সাদা মাইসেলিয়াম দেখা যায়। পরবর্তীতে আক্রান্ত গাছটি সম্পূর্ণ রূপে হলুদ হয়ে ঢলে পড়ে যায়।  রোগ প্রতিরোধের জন্য রোগ মুক্ত এলাকা হতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। জমির পানি সরিয়ে অনুমোদিত বালাইনাশক যেমন বেভিস্টিন ১ গ্রাম/ লিটার মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। বালাইনাশক প্রয়োগের এক দিন পর জমিতে আবার পানি দেওয়া যাবে।

রাইজম পচা রোগ : ছত্রাক জনিত এ রোগের আক্রমণে অল্প বয়স্ক গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গাছ মারাও যেতে পারে। অধিক আক্রমণে গাছের কাÐ পচে যায়। রোগ প্রতিরোধের জন্য রোগমুক্ত এলাকা হতে বীজ সংগ্রহ, শস্য আর্বতন, পরিষ্কার চাষাবাদ ইত্যাদি অনুসরণ করতে হবে। বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে জমির পানি সরিয়ে অনুমোদিত বালাইনাশক যেমন রিডোমিল্ড গোল্ড ২ গ্রাম/লিটার মাত্রা দিয়ে ফসলের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে।

কচুপাতায় ছত্রাক বা কীটনাশক প্রয়োগের সময় ডিটারজেন্ট বা সাবান গুড়ো ২০ গ্রাম/১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। নতুবা বালাইনাশক গড়িয়ে পড়ে যাবে।
পানিকচু দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এখনও এটি অবহেলিত সবজি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর বাণিজ্যিক চাষাবাদের প্রতি দেশের সব অঞ্চলে সমান আগ্রহ তৈরি হয়নি। অথচ ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত কচুর লতি স্বল্প পরিমানে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে তা পুষ্টি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

আবু কাউসার মোঃ সারোয়ার
আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, চট্টগ্রাম, ফোন : ০৩১৭২১১৭৪, ই-মেইল : Chittagong@ais.gov.bd

 

 

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook