কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

গোলমরিচ : বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

গোলমরিচ, (Piper nigrum Linn)| Piperaceae গোত্রের একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় (climbing/branching vine) উদ্ভিদ যার ফল berry হিসেবে পরিচিত। এটি  Monoecious জাতীয় উদ্ভিদ তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পুরুষ এবং স্ত্রী ফুল দেখা যায়। গোলমরিচ ফলটি গোলাকার, কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ এবং পাকা অবস্থায় হলুদ থেকে লাল বর্ণের হয়। এর মধ্যে একটি মাত্র বীজ থাকে। ভারতে গোলমরিচকে King of Spices হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভারত ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য Tropical দেশে গোলমরিচ চাষ হয়। গোলমরিচের গুঁড়া ইউরোপীয় দেশে খাদ্যে মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রাচীনকাল থেকে। এছাড়া ঔষধি গুণাগুণের জন্যও এটি সমাদৃত। গোলমরিচে পাইপারিন (piperine) নামের রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যা  থেকে এর ঝাঁঝালো স্বাদটি এসেছে। গোলমরিচের ইংরেজি নাম Black pepper এর Pepper শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষার পিপালি” শব্দ থেকে যার অর্থ দীর্ঘ মরিচ। এখান থেকে উদ্ভূত হয়েছে লাতিন ভাষার piper যা মরিচ ও গোলমরিচ দুটোকেই বোঝানোর জন্য রোমানরা ব্যবহার করত।
 

পর্তুগিজ, ফরাসি ও ইংরেজরা যে কয়টি কারণে অভিভক্ত ভারতবর্ষে আগমন করেছিল তার মধ্যে মসলা সংগ্রহ ছিল একটি। ওই সময়কাল ভারতবর্ষে  মসলার উৎপাদন হতো প্রচুর। ইউরোপীয় বণিকরা মসলা সংগ্রহে মূলত ভারতবর্ষ অভিমুখে জাহাজ প্রেরণ করত।


বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গোলমরিচ চাষ হয়। এখানকার নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরা খাসিয়াপানের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই চাষ করছেন গোলমরিচ। চা উৎপাদনে যে রকম অম্লীয় মাটি এবং উঁচু-নিচু টিলার প্রয়োজন গোলমরিচের জন্যও একই অবস্থা দরকার। অর্থাৎ যেখানে কোনো পানি আটকাবে না এমন উঁচু জায়গায় ভালো জন্মে। এছাড়াও ছায়াময় এলাকায় গাছগুলো ভালো জন্মে। গোলমরিচ যেহেতু বহুবর্ষজীবী লতা জাতীয় গাছ, তাই লতা রোপণের ৪/৫ বছর পর থেকে ফল ধরতে শুরু করে। গাছ বয়স ৮-৯ বছর হলে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় আসে এবং ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়। গোলমরিচ গাছ সাধারণত সহায়ক গাছকে আঁকড়িয়ে  বেড়ে ওঠে। এ গাছ সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এ গাছের পাতা দেখতে অনেকটা পান পাতার মতো। একটি গাছ থেকে বছরে ৩-৫ কেজি পর্যন্ত  গোলমরিচ পাওয়া যায়।
 

গোলমরিচের গুণাগুণ
কফ, ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা নিরাময় করে; ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ব্যাহত করে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে; গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে; ওজন কমাতে সাহায্য করে; কোমর বা পাঁজরের ব্যথা সারাতে গোলমরিচ চূর্ণ গরম পানিসহ সকাল ও বিকালে একবার করে খেতে হবে; গোলমরিচ সামান্য পানিসহ বেটে দাঁত ও মাড়িতে প্রলেপ দিলে ব্যথা দূর হয়।

 

বারি গোলমরিচ-১                           
ষাটের দশকে বাংলাদেশে গোলমরিচের চাষাবাদ প্রবর্তিত হয়। তখন সিলেট অঞ্চলে বসতবাড়িতে কিছু গাছ ছিল বলে জানা যায়। নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক জৈন্তিয়া গোলমরিচ-১ জাতটি ১৯৮৭ সালে উদ্ভাবিত হয়। যা বারি গোলমরিচ নামে পরিচিত।

 

উৎপাদন প্রযুক্তি
পানি নিষ্কাশনযুক্ত উচ্চমাত্রায় হিউমাসযুক্ত উর্বর দো-আঁশ মাটি গোলমরিচ চাষের জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত। বেলে দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটিতেও গোলমরিচ চাষ করা যায়।
এটি ছায়া সহ্যকারী কিন্তু প্রখর সূর্য তেজ ও শুকনো হাওয়া সহ্য করতে পারে না। প্রখর সূর্যালোক বা দীর্য সময়কালীন  শুষ্ক আবহাওয়া বা দীর্ঘ খরায় গোলমরিচ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং Vine এর অঙ্গজ বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। জমি ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে কয়েকবার কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আগাছা বেছে তৈরি করে নিতে হবে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পিট তৈরি করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে হলে গাছ থেকে গাছের দূরত¦ হবে ৪ মিটার এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫ মিটার। এ দূরত্ব বজায় রেখে ৫০x৫০x৫০ সেন্টিমিটার আকারের গর্ত তৈরি করতে হবে। সহায়ক গাছ যেমন- মান্দার, ঝিগা, সুপারির ক্ষেত্রে গাছের গোড়ায় ৩০x৩০x৩০ সেন্টিমিটার আকারে গর্ত তৈরি করা দরকার। বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে  গর্তে ৫-১০ কেজি গোবর/কম্পোস্ট সার, ১২৫ গ্রাম খৈল, ১১৫ গ্রাম টিএসপি ও ১১৫ গ্রাম এমওপি দিয়ে ঝুরঝুরে মাটির সাথে গর্ত ভর্তি করতে হবে।  সহায়ক গাছ লাগাতে হলে গর্তে ৩-৪ কেজি গোবর/কম্পোস্ট সার দিয়ে গর্ত ভরাট করে কমপক্ষে ৭-১০ দিন রেখে দিতে হবে।       

 

বীজ কাটিং সংগ্রহ এবং রোপণ
উচ্চফলনশীল ও ফুলের ছড়া ১৫-২০ সেন্টিমিটার লম্বা এমন উন্নত মাতৃগাছ থেকে গোলমরিচের কাটিং সংগ্রহ করা হয়। বাণিজ্যিকভিত্তিতে কাটিং থেকে গোলমরিচের চারা তৈরি করা হয়। বয়স্ক উন্নত গাছের গোড়ায় দিক থেকে  বেরিয়ে আসা লতা থেকে কাটিং করা হয়। ভার্টিকেল কাটিং থেকে হরাইজনটাল ভাইন কাটিং গাছে উচ্চফলন পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ  মাসে এসব লতা ধারালো ছুরি দ্বারা কেটে মূল গাছ থেকে আলাদা করে পলিথিন ব্যাগের মাটিতে বসানো হয়।  প্রতিটি ভাইন কাটিংয়ে কমপক্ষে ২-৩টি চোখ থাকা আবশ্যক। ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে পরিমিতভাবে পানি দিলে এক মাসের মধ্যে কাটিংকৃত ভাইন থেকে মূল বা শিকড় বের হতে শুরু করবে এবং মে-জুন মাসে লাগানো উপযুক্ত হবে। এছাড়া বর্ষাকালে (মে-আগস্ট) গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করে সহায়ক গাছের গোড়ায় লাগালে শত ভাগ গাছ ভালোভাবে  বেঁচে থাকে। গোলমরিচ লতা জাতীয় গাছ। তাই এ জাতীয় গাছের জন্য আশ্রয়দাতা গাছ বা দীর্ঘস্থায়ী খুঁটি বাউনি হিসেবে দেয়া প্রয়োজন। অনেক সময় আম, কাঁঠাল, সুপারি, মান্দার, জিকা, সাজিনা, শিমুল, আমলকী আশ্রয়দাতা গাছ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

 

চারা নির্বাচন ও চারা তৈরি
অধিক ফলনশীল উন্নত জাতের মাতৃগাছ নির্বাচন করে ১-৩ বছর ফলন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে কাটিং করে চারা তৈরি করা উচিত। মাতৃগাছের বয়স ৫-১৫ বছর হলে কলম ভালো হয়। গাছের বয়স বেশি হলে সেখান থেকে উৎপন্ন  কলমের চারা গাছের বৃদ্ধি কম হয়।  গোলমরিচ গাছ তিন ধরনের বায়ুবীয় মুকুল দেয়,


ক. লম্বা  পর্ব মধ্য ও বায়বীয় মূলযুক্ত প্রাথমিক বা প্রধান মুকুল, অবলম্বন বেয়ে ওপরে উঠে; খ. ঝাড়ের গোড়া থেকে উৎপন্ন ধাবক মুকুল, এগুলোর পর্ব মধ্য লম্বা হয়;  গ. সীমিত বৃদ্ধিযুক্ত, ফল উৎপাদক পার্শ¦ীয় মুকুল। ধাবক মুকুল কাটিংয়ের জন্য  উত্তম। প্রাথমিক ও প্রধান মূল থেকেও কাটিং নেয়া যায়। পূর্ণবয়স্ক গাছের শীর্ষ অঞ্চল থেকে  কিছু শাখা-প্রশাখা নিচের দিকে ঝুলতে থাকে। এদের ঝুলন্ত মুকুল বলে। এ থেকে কাটিং সংগ্রহ করা যায়। উচ্চফলনশীল ও রোগমুক্ত গাছ থেকে ধাবক মুকুল নির্বাচন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে পাতা ছেটে দেয়ার পর ধাবক মুকুলগুলো গাছ থেকে কেটে নেয়া হয় এবং ৪-৫টি পর্বযুক্ত টুকরো করে নেয়া ভালো। কাটিংগুলো ছত্রাকনাশক মিশ্রিত পানিতে ১-২ মিনিট চুবিয়ে নিলে পরবর্তীতে রোগাক্রান্ত কম হয়। এ টুকুরোগুলো নার্সারিতে পলিথিন প্যাকেটে মাটির মিশ্রণে লাগানো হয়। নার্সারিতে প্যাকেটের ওপর যাতে রোদ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং নিয়মিত পানি দিতে হবে। কাটিং মে-জুন মাসে জমিতে লাগানোর উপযোগী হয়ে আসে। এগুলো সহায়ক গাছের গোড়ায় লাগানো হয়।
 

বাগান স্থাপন
গোলমরিচ ০১. একক ফসল ০২. মিশ্র ফসল ০৩. সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। মে-জুন মাসে মূল জমিতে অবলম্বনকারী গাছের সাথে কাটিং বসিয়ে দিতে হবে এবং প্রতি মাদাতে প্রতিটি অবলম্বন গাছের পাশে দুই তিনটি গোলমরিচের চারা বসানো যায়। চারার গোড়া থেকে অবলম্বনের গোড়ার দিকে ১৫ সেন্টিমিটার চওড়া ও গভীর নালা করতে হবে এবং সে  লতা নালার ভেতরে এমনভাবে বসিয়ে দিতে হবে যেন ডগাটিকে অবলম্বনের সাথে বেঁধে দেয়া যায়। এরপর নালার ভেতরে লতার উপর মাটি চাপা দিতে হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে রোপণের জন্য গর্ত প্রতি ২টি কাটিং হিসাবে ২২০০টি কাটিংয়ের প্রয়োজন হয়।

 

সার প্রয়োগ : প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে ও বর্ষার শেষে ফলন্ত গাছে সার দিতে হবে। গোলমরিচ গাছে প্রতি বছর ঝাড়প্রতি ১০০ গ্রাম নাইট্রোজেন, ৪০ গ্রাম ফসফেট ও ১৪০ গ্রাম পটাশ প্রয়োগ করা যেতে পারে। সার প্রয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন রাসায়নিক সার গাছের শেকড়ে সরাসরি না লাগে। প্রথম বছরে সারের তিন ভাগের একভাগ প্রয়োগ করতে হবে এবং দ্বিতীয় বছর প্রয়োগ করতে হবে তিন ভাগের দুইভাগ পরিমাণ। তৃতীয় বছরে  এবং তারপর থেকে পুরো মাত্রায় সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। ঝাড়ের গোড়া থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ও ১৫ সেন্টিমিটার গভীরতায় সার প্রয়োগ করতে হবে এবং ওই সার মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। মে-জুন মাসে প্রতি গাছে ১০ কেজি হারে গোবর সার বা খামারের সার  প্রয়োগ করা উচিত। প্রয়োজনে ১ বছর পর প্রতি গাছে ৫০০-৬০০ গ্রাম করে চুন মে-জুন মাসে প্রয়োগ করা যেতে পারে।


অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা : গাছ কিছুটা বড় হলে গাছের গোড়ার চারদিকে হালকাভাবে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। তাছাড়া গাছের চারদিকে মাটি দিয়ে ভেলি বেঁধে দিতে হবে। মূল লতায় বেশি শাখা-প্রশাখা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ৬-৭ মিটার ওপরে বেশ ঝাঁকড়া হয়। নিয়মিত পরিচর্যার অংশ হিসেবে আগাছা দমন ও গোড়ার মাটি আলগা রাখা প্রয়োজন। আবার অতিরিক্ত ছায়া গোলমরিচের Flowering এ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

কাটিং
ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সজীব ও হৃষ্টপুষ্ট সতেজ ভাইন কাটিংয়ের জন্য উপযুক্ত মাতৃগাছ থেকে পৃথক করা হয়। ৪-৫টি পর্ব বিশিষ্ট কাটিংয়ের কমপক্ষে ২টি পর্ব প্রস্তুতকৃত উঁচু বেডের পলিথিন ব্যাগে বা বাঁশের ছোট ঝুঁড়িতে রোপণ করে আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। ভাইন থেকে শিকড় গজানো শুরু করলে ভারি বর্ষায় অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে চারা রোপণ করতে হয়। সরাসরি গাছের গোড়ায় তৈরি গর্তে কাটিংয়ের ২টি নোড মাটিতে প্রবেশ করে লাগালে ভালো হয়।

 

ফসল রক্ষা : গোলমরিচে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম তবে ফ্লি বিটল জাতীয় পোকা আক্রমণ করতে পারে। এ পোকার আক্রমণে গোলমরিচের দানা ফাঁপা হয়ে যায় ও ব্যাপক ক্ষতি করে। এ পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার কুইনালফস যেমন একালাকস ২৫ ইসি ভালোভাবে মিশিয়ে ৭-১৫ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ রোগের প্রাথমিক অবস্থায় পাতা  হলদে হয়ে যায় ও পরে ঝরে যায় এবং গাছের মূল পচে যাওয়ায় গাছ মারা যায়। গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে এ রোগ হতে পারে। প্রতিকারের জন্য পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে ডাইথেন এম-৪৫ স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যায়।
 

ফসল তোলা ও ফলন : চারা রোপণের ৩-৪ বছর পর গাছ ফল দিতে শুরু করে। ৭-৮ বছর বয়সের গাছ পরিপূর্ণ ফলন দিয়ে থাকে। পৌষ-মাঘ মাস গোলমরিচ তোলার উপযুক্ত সময়। প্রতি ছড়ায় বা থোকাতে দু-একটি গোল মরিচের দানা কমলা বা লাল রঙের ধরলে ছড়াটিকে সাবধানে কেটে নিতে হবে। তারপর সাবধানে গোল মরিচের দানা আলাদা করে নিতে হবে। ৫-৭ দিন দানাগুলো রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। শুকানোর পর খোসার রঙ কালো হয়ে কুঁচকে আসে। প্রতি গাছে ৩-৫ কেজি টাটকা গোলমরিচ সংগ্রহ করা যায়। প্রক্রিয়াজাতকরণে পরে তা থেকে ১.৫-২.৫ কেজি কালো গোলমরিচ পাওয়া যায়।
 

প্রক্রিয়াকরণ : সংগ্রহের পর ফলগুলো ভালো ফল আলাদা করে একটি পাত্রে জমা করতে হয়। তারপর দানাগুলো ফুটন্ত পানিতে ১০ মিনিট সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে ফলগুলো রোদে শুকাতে হবে। যে পানিতে দানাগুলো সিদ্ধ করা হয়েছে সে পানি কিছুক্ষণ পর পর দানাগুলোর ওপর ছিটিয়ে দিতে হবে। এতে শুকনা গোলমরিচের রঙ সুন্দর হয়, সুগন্ধ অটুট থাকে এবং ঝাল নষ্ট হয় না। এভাবে ৬-৭ দিন ভালো রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা যায়।
 

বাংলাদেশে গোলমরিচ চাষের সম্ভাবনা ও করণীয়
২০১৫-১৬ বছরের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে মোট  ৫ হেক্টর জমিতে গোলমরিচের চাষ হয় সিলেট, হবিগঞ্জ ও বগুড়া জেলা যার মোট উৎপাদন ৬ মেট্রিক টন। বতর্মানে বারির  মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, জৈন্তাপুর, সিলেট ২৫০টি গাছ, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার ৫০টি গাছ, পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি পাবর্ত্য জেলা, পাহাড়ি অঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, রামগড় ৪০টি গাছ এবং আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রামে ২৫০টি গাছ স¦ল্প পরিসরে গোলমরিচের চারা উৎপাদন এবং চাষাবাদ হচ্ছে। গোলমরিচ আংশিক ছায়া পছন্দকারী, লাল মাটি এবং বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫০০-৩০০০ মিলিমিটার সম্পন্ন এলাকায় ভালো হয়। মাটি ও জলবায়ু বিবেচনায় বাংলাদেশের সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, পাবর্ত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলাগুলো মাঝারি উঁচু জমি, চা বাগানের টিলা ও ঢালগুলো ছায়া প্রদানকারী গাছে

 

সাফল্যজনকভাবে গোলমরিচের চাষাবাদ সম্ভব।
০১. বর্তমানে বাংলাদেশে গোলমরিচের একমাত্র মুক্তায়িত জাত বারি গোলমরিচ-১। বারি গোলমরিচ-১ জাতটি ফলন ও গাছের বৃদ্ধির বিবেচনায় একটি ভালো জাত বলে সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
০২. নতুন জাত উন্নয়নের জন্য ভারত, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড  থেকে গোলমরিচের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
০৩. জাত উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিজ্ঞানীদের বৈদেশিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
০৪. বিএআরআই সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডিএই ও বিএডিসির ফার্মে চারা উৎপাদন করা যেতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে এরই মধ্যে মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, জৈন্তাপুর, সিলেট হতে গুণগত মানসম্পন্ন মাতৃ চারা (কাটিং) উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। যা ডিএইর মাধ্যমে চাষি পর্যায়ে বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।
০৫. উপরন্তু লাভজনক সম্ভাবনাময় এ ফসলটির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য অনতিবিলম্বে নতুন প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়।

 

*এসএসও, **পিএসও, ***সিএসও, ****ডিজি, বিএআরআই, গাজীপুর

 

বিস্তারিত
মাটি ও ফসলে বোরনের অভাব এবং প্রতিকার

গাছের জীবন ধারণের জন্য কমপক্ষে ২০টি পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন যার মধ্যে ১৭টি উপাদান গাছ মাটি থেকে গ্রহণ করে থাকে। পুষ্টি উপাদানগুলো সমপরিমাণে প্রয়োজন হয় না; কোনোটি বেশি আবার কোনোটির পরিমাণ কম প্রয়োজন হয়। তবে সবই জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক। গাছ যে ১১টি পুষ্টি উপাদান কম পরিমাণে গ্রহণ করে থাকে তাদের অনুপুষ্টি বলে। বোরন একটি মাইকোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টি। এটি  মাটি ও উদ্ভিদ দেহে তেমন সচল নয়। মাটিতে এটা বোরেট এবং বোরেট সিলিকেট মিনারেল হিসেবে থাকে। ওপরের স্তরের মাটিতে মোট বোরনের গড় পরিমাণ সাধারণত ১০ পিপিএম হয় তবে প্রাপ্যনীয় (Available) বোরনের পরিমাণ ১ পিপিএমের অনেক কম। মাটিতে প্রাপ্যনীয় বোরনের সংকট মাত্রা ০.২০ পিপিএম এবং কোনো মাটিতে বোরনের উত্তম মাত্রা হলো ০.৪৫-০.৬০ পিপিএম। গাছের কোষ-কলায় বোরনের পরিমাণ সাধারণত ২০-১০০ পিপিএম এ পরিমাণ ১৫ পিপিএমের কম হলে ঘাটতি হয় আবার ১০০ পিপিএম বেশি হলে বিষাক্ততা (Toxicity) দেখা দিতে পারে।
 

বাংলাদেশের মাটিতে বোরন ঘাটতি
আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন মাটি ও ফসলে বোরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অতি নিবিড় কৃষির কারণে মাটিতে বোরন গাছ কর্তৃক আহরিত হওয়া, মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়া, অসুষম  মাত্রায় সার প্রয়োগ, এবং চুয়ানির ফলে মাটিস্থ বোরনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং ক্রমশ ঘাটতি লক্ষণ তীব্রতর হচ্ছে। মাটির বিক্রিয়া বেশি অম্লীয় হলে যেমন বোরন ঘাটতি হয় আবার বেশি ক্ষারীয় মৃত্তিকায়ও বোরনের ঘাটতি দেখা যায়। মাটির বিক্রিয়া বা পিএইচমান ৫.০-৭.০ এর মধ্যে থাকলে বোরনের প্রাপ্যনীয়তা উত্তম হয়।

 

বাংলাদেশের প্রায় ৪৭% জমিতে বোরনের ঘাটতি আছে। দেশের ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের মধ্যে ১৯টি অঞ্চলে কম-বেশি বোরনের ঘাটতি আছে। বিশেষত দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্ল­া ও সিলেট জেলায় বোরনের ঘাটতি প্রকট। তাছাড়া, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকার কিয়দংশ,  পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি এলাকা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ এলাকায় বোরন ঘাটতি  দেখা যায়। রবি শস্যের মধ্যে গম, ভুট্টা, সরিষা, মুগডাল, ছোলা, সূর্যমুখী, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, আলু, বোরন সংবেদনশীল। তাছাড়া পেঁপে, কাঁঠাল, পেয়ারা লেবু প্রভৃতি ফলজ বৃক্ষে বোরন ঘাটতি দেখা গেছে। বোরন সংবেদনশীলতা সাধারণত ফসলের শ্রেণী ও জাতের ওপর নির্ভরশীল। রবিশস্যে বোরন প্রয়োগ করলে পরবর্তী ধান ফসলে প্রয়োগ না করলেও চলে তবে বেলে প্রধান মাটিতে প্রতি ফসলেই বোরন প্রয়োগ প্রয়োজন। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে বোরন সার প্রয়োগ বিধেয়।
 

বোরন উদ্ভিদের শর্করা বিপাকে সাহায্য করে ও আমিষ সংশ্লে­ষণে ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদের ভাজক কলা, বর্ধনশীল অংশ ও কোষ প্রাচীর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্যালসিয়াম ও নাইট্রোজেন পরিশোষণে সহায়তা করে। তাছাড়া ফুলের ডিম্বানু নিষিক্ত করা, ফল ও বীজ ধারণে বোরন একান্ত আবশ্যক।
 

বৃক্ষের নাম

বয়স

মাত্রা (গ্রাম/গাছ/বছর)

বোরন

বোরিক এসিড

আম, কাঁঠাল, নারিকেল,

লিচু, লেবু, পেঁপে, ইত্যাদি

১-৫ বছর

৩-৫ গ্রাম

১৮-৩০ গ্রাম

৫-১০ বছর

৫-৮ গ্রাম

৩০-৩৫ গ্রাম

>১০ বছর

৮-১০ গ্রাম

৫০-৬০ গ্রাম

 

বোরনের  ঘাটতি লক্ষণ
বোরন অচলমান (Immobile) হওয়ায় এর ঘাটতি লক্ষণ সাধারণত কচি পাতায় দেখা যায়। বিভিন্ন শস্য ও ফলে বোরনের ঘাটতি বিভিন্ন ধরনের হয়। তবে ঘাটতি লক্ষণগুলো হলো-
০১. গাছের কাণ্ডের শীর্ষ ভাগ শুকিয়ে যায় বা মরে যায়;
০২. পাতা ঈষৎ হলুদাভ হয় এবং কখনও কখনও পাতা মোড়ানো আকার ধারণ করে এবং ভঙ্গুরতা প্রদশর্ন করে;
০৩. গাছে পর্যাপ্ত পানি সেচ দেয়ার পরও কচিপাতা নেতিয়ে পড়া অবস্থায় থাকে;
০৪. বোরনের ঘাটতি  তীব্র হলে গমের শীষ, ভুট্টার মোচায় দানা তৈরি হয় না এবং ফুলে পরাগায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়  বন্ধাত্ব দেখা দেয়;
০৫. ডাল জাতীয় ফসলে দানা সংখ্যা কম হয় এবং দানা অপুষ্ট হয়। গাছ খর্বাকৃতি ও হলুদ হয়ে যেতে পারে; অভাব তীব্র হলে পচনজনিত ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে;
০৬. তৈল জাতীয় ফসলের পডে (শিম) বীজের সংখ্যা কমে যায়;
০৭. আখের পাতা শীর্ষ ভাগে ও কোনায় পুড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।
০৮. পেঁপে, কাঁঠাল, পেয়ারা ফলের আকার বিকৃতি  হয়;
০৯. ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাতা সজীবতা হারায় এবং পাতায় হাত দিলে খসখসে অনুভূত হয়। ফুলকপির কাডবিবর্ণ হয়ে নষ্ট হয়;
১০. অভাব তীব্র হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি মন্থর হয়ে যায় এবং ফুল ধারণ কমে যায়।

 

সার সুপারিশ
রবিশস্য জাতীয় ফসলের জন্য বোরন হেক্টরপ্রতি ১-২ কেজি এবং বোরিক এসিড ৬-১২ কেজি।
ফলজ বৃক্ষের জন্য

 

প্রয়োগ বিধি
রবিশস্য জাতীয় ফসলের জন্য- জমি তৈরির শেষ চাষের সময় একটি পাত্রে পরিমাণমতো ঝুরঝুরে মাটির সাথে  বোরিক এসিড ভালোভাবে মিশিয়ে জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
ফলজ বৃক্ষের ক্ষেত্রে- বাড়ন্ত ফলজ বৃক্ষের জন্য বোরন সার বছরে দুইবার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় মাত্রার অর্ধেক বর্ষাকালের আগে এপ্রিল-মে মাসে এবং ২য় কিস্তি বৃষ্টির পরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের গোড়া থেকে ০.৫ মিটার-১.৫ মিটার দূরে চার দিকে রিং পদ্ধতিতে প্রয়োগ করে হালকা সেচ দিতে হবে।

 

পাতায় সিঞ্চন পদ্ধতিতে প্রয়োগ
প্রতি লিটার পানিতে ২-৪ গ্রাম বোরন মিশিয়ে স্প্রে মেশিন দিয়ে সমভাবে পাতায় স্প্রে করতে হবে। ফসলভেদে হেক্টরপ্রতি ৬০-১২০ লিটার স্প্রে দ্রবণ প্রয়োজন হতে পারে। ফলজ গাছে বোরন ঘাটতি দেখা দিলে সঠিক মাত্রায় বোরন দ্রবণ স্প্রে করে গাছের পাতা ভিজিয়ে দিতে হবে।

 

সাবধানতা
০১. বোরন সার প্রয়োগ করার আগে মাটি পরীক্ষা করে মাটিতে বোরনের ঘাটতির পরিমাণ জেনে নেয়া উত্তম;
০২. পাতায় স্প্রে করার ক্ষেত্রে সূর্যাস্তের আগে দিনের যে কোনো উপযুক্ত সময়ে (মেঘলা দিন হলে ভালো হয়) স্প্রে মেশিন  দ্বারা স্প্রে করতে হবে;
০৩. সুপারিশকৃত মাত্রার অতিরিক্ত বোরন প্রয়োগ করা যাবে না। বেশি প্রয়োগ করলে বিষাক্ততা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের মাটি ও ফসলে বোরনের ঘাটতি ক্রমান্বয়ে ব্যাপক হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ফসলের ফলন ও গুণগতমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ও মৃত্তিকার স্বাস্থ্য বজায় রাখার স্বার্থে অন্যান্য সারের সাথে সমন্বিতভাবে বোরন সার প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সুপারিশকৃত মাত্রা ও বিধি মোতাবেক বোরন সার প্রয়োগ কৃষি উৎপাদন টেকসইকরণের জন্য তাই একান্ত জরুরি।

 

ড. নির্মল চন্দ্রশীল* ড. রওশন আরা বেগম**

*প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, **মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, বিএআরআই, জয়দেবপুর, গাজীপুর

বিস্তারিত
কোকোডাস্ট দিয়ে জৈব সার তৈরি

বাংলাদেশে নারিকেলকে বলা হয় গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকা শক্তি। ঐতিহ্যগতভাবে এদেশে নারিকেল চাষ হয় বাড়ির আঙিনায়। নারিকেল চাষে তাই বাড়তি কোনো জায়গা জমির দরকার হয় না। নারিকেল গাছের ছায়া বসতবাড়িতে সাথী ফসল হিসেবে অন্যান্য ফল ও শাকসবজি চাষ করতেও সহযোগিতা করে। রোপণ করার ৬-৭ বছর পর ফল আসে এবং বিরামহীনভাবে ৫০-৬০ বছর তা চলতে থাকে। বিস্ময়কর এ ফলদ বৃক্ষের ফুল, ফল, কাণ্ড পাতা বছরব্যাপী কোনো না কোনোভাবে আমাদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। কৃষকের কাছে তাই নারিকেল সবচেয়ে সমাদৃত গাছ। নারিকেল থেকে উত্তম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ডাবের পানি পাওয়া যায়। নারিকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ এবং আঁশজাত দ্রব্য তৈরি করা যায়। সবশেষে নারিকেলের তুষ (কোকোডাস্ট) থেকে ভালোমানের জৈব সার তৈরি হয়ে থাকে। বরিশাল অঞ্চলের স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর), খুলনার ফুলতলা, বাগেরহাট ও যশোর জেলার মনিরামপুর অঞ্চলে নারিকেলের ছোবড়া বা খোসা থেকে বংশানুক্রমে নারিকেলের খোসা, আঁশ ও আঁশজাত দ্রব্য করা হয়ে থাকে।
 

নারিকেলের খোসা
নারিকেলের খোসা থেকে আঁশ তৈরির সময় খোসার ৬৬% তুষ বা
Cocodust বের হয়। নারিকেলের তুষে ৩১% সেলুলোজ ও ২৭% লিগনিন জাতীয় জৈব পদার্থ আছে এবং এর কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত ১০৪:১ (Shekar, 1999)।  সেলুলোজ খুব শক্ত বা Stable পদার্থ এবং এ কারণে নারিকেলের তুষ ১০-১৫ বছর পরও মাটিতে অক্ষতাবস্থায় থাকে।  লিগনিন পচন-সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা অনুজীবের কার্যক্ষমতা কমায়। নারিকেলের তুষে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় সব রকম পুষ্টি থাকে বলে তুষ পচালে উৎকৃষ্ট জৈব সারে রূপান্তরিত হয়। ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে নারিকেলের তুষের সাথে চুন (প্রতি ১০০০ কেজি তুষে ৫ কেজি চুন) ও মাশরুম স্পন (Spawn) বা বীজ মিশিয়ে পচানো হয়। নারিকেলের তুষের মধ্যে মাশরুম চাষ করেও তা পচানো যায়। মাশরুমে ক্লোরোফিল না থাকায় সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন করতে পারে না। দৈহিক বাড়-বাড়তির জন্য মাশরুম  নারিকেলের তুষের সেলুলোজ হতে শর্করা জাতীয় খাদ্য সংগ্রহ করে, ফলে নারিকেলের তুষের সেলুলোজ কঠিন পদার্থ হতে সরলতম পদার্থে রূপান্তরিত হয় ও সহজে পচে যায়। তুষে মাশরুম spawn ও চুন প্রয়োগ করলে ১ মাসের মধ্যে হিউমাস জাতীয় কালো পদার্থে পরিণত হয়। হিউমাস রাসায়নিক সারের মতো পুষ্টি সমৃদ্ধ নয়, তবে মাটিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থেকে মাটির অনুজীবের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, মাটির ভৌত গুণাবলি ধরে রাখে এবং গাছের জন্য প্রয়োজনীয় মুখ্য ও গৌণ সব ধরনের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে। হিউমাস মাটির Ca++, Zn++, Cu++ Fe++ ধাতব আয়ন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এসব আয়নগুলো গাছের আয়ন বিনিময় ক্ষমতা বাড়ায়, মাটি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিকেল অপসারণ করে গাছের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। ফ্রি-রেডিকেল এক ধরনের ক্রিয়াশীল যৌগমূলক যা গাছের ক্লোরোফিল নষ্ট করে দেয়। গাছের স্বাভাবিক রেচন প্রক্রিয়া (Metabolism) থেকেই ফ্রি-রেডিকেল তৈরি হয়। জমিতে বেশি বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে ফ্রি-রেডিকেলও বেশি তৈরি হয়। ফল জাতীয় সবজি যেমন টমেটো, করলার ক্ষেত্রে ফ্রি-রেডিকেলের কারণে একবার ফল আসলেই গাছের পাতা শুকিয়ে মারা যায়। এসব ধাতব আয়ন গুলো Super oxide dismutage (SOD) নামে এক ধরনের এনজাইম তৈরির মাধ্যমে ফ্রি-রেডিকেলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
 

নারিকেলের তুষের বিশেষ গুণ হচ্ছে ওজনের ৮-১০ গুণ পানি ধারণক্ষমতা। তাই সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি জানা থাকলে নারিকেলের অব্যবহৃত এ তুষ সরাসরি নার্সারি ব্যবসা ও ফুল চাষে ব্যবহার করে যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণ কেন্দ্র যশোরের কর্মরত বিজ্ঞানীরা ২০০৮ সালে যশোর শহরতলীর চাচড়া এলাকায় কোকো ফাইবার মিল নামক কোম্পানির সহায়তায় নারিকেলের আঁশ তৈরি ও তুষ পচানোর ওপর এক গবেষণা পরিচালনা করেন। ওই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মাশরুমের বীজ ও চুন প্রয়োগ করে দ্রুত নারিকেলের তুষ পচানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। হাইড্রোলিক মেশিনে নারিকেলে তুষের ব্লক তৈরি করে তাতে চারা লাগানোর ওপরও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন।
 

নারিকেল থেকে জৈব সার তৈরি
নারিকেলের তুষ ফলের অংশ হওয়ায় গাছের বৃদ্ধির জন্য দরকারি সব পরিমাণ পুষ্টি বিশেষ করে পটাশিয়াম জাতীয় পদার্থ থাকে। পচানোর পর মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও অন্যান্য ভৌতিক গুণাবলি বৃদ্ধিসহ অনুজীবের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদে গাছের পুষ্টি সরবরাহ ও বৃদ্ধি-সহায়তা প্রদান করে।  তাছাড়া নারিকেল থেকে তৈরি জৈব সারে আছে অনেক রকমের এনজাইম (Enzyme) ও কোষীয় পদার্থ যা শিকড় দিয়ে গাছের মধ্যে প্রবেশ করে ও গাছের রোগ প্রতিরোধ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করার বাড়তি ক্ষমতা প্রদান করে। নারিকেল থেকে তৈরি জৈব সারে আছে ৬০৭৫% জৈব পদার্থ, ০.৭৬/ নাইট্রোজেন, ০.৪% হারে ফসফরাস ও পটাশ, ০.২% সালফার ও ০.০০৪ বোরন।   

 

কোকোপিটের ব্যবহার
০ ক্রমবর্ধমান হাইড্রোপোনিকউপায়ে সবজি চাষের জন্য কোকোপিট ব্যবহার করা হয় যেন কোনোভাবেই গাছ বা চারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়;
০ কোকোপিট উদ্ভিদের শিকড় উন্নয়নের জন্য একটি চমৎকার স্তর এবং গাছ বা চারা রোপণ করার সময় কোনো এজেন্ট প্রয়োজন হলে জৈব সারের সাথে কোকোপিটের সংমিশ্রণে একটি গ্রোয়ার মিডিয়া তৈরি করে সরাসরি চারা তৈরি করা যেতে পারে;
০ কোকোপিট মাটির তুলনায় অনেক হালকা এবং টবে ব্যবহারের সময় খুব সহজেই কোকোপিটের ভেতর বাতাস চলাচল করতে পারে যার ফলে গাছ বেশি বেশি অক্সিজেন নিতে পারে;
০ কোকোপিট শোষক সময়কাল অনেক : ফলে এটা গাছে ধীরে ধীরে শোষিত হয়;
০ কোকোপিট একটি উচ্চ বাফার ক্ষমতাসম্পন্ন জৈব পদার্থ যা মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। কাকোপিটের পিএইচ (
pH) সবসময় ৫.৫ থেকে ৭ থাকে যা সুস্থ উদ্ভিদ তৈরি করে এবং খুব সহজেই উন্নত মানের গাছপালা তৈরি করতে সাহায্য করে  এবং এর ফলে অনেক বেশি পরিমাণে ফসল সংগ্রহ করা যায়;
০ টবে মাটি ব্যবহার করলে ওজন বেশি হয়, কিন্তু  কোকোপিট ব্যবহার করলে কম হয়। ছাদের ওপর অনেক  টব ব্যবহার করলে লোড ক্যাপাসিটি কম হয়;
০ কোকোপিট দিয়ে যে কোনো প্রকার চারা তৈরি বা গাছ লাগানো যেতে পারে, নির্দিষ্ট কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। আধুনিক গ্রিন হাউসে কোকোপিটকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে

 

ফসল উৎপাদন করে থাকে;
০ কোকোপিট দিয়ে টবে গাছপালা লাগালে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পানি দিলে টবের ভেতর কখনও জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না, পানি সাথে সাথে দ্রুত সব জায়গাতে ছড়িয়ে দেয় এবং নির্দিষ্ট পরিমাণমতো পানি ধরে রেখে গাছকে সতেজ রাখে  এবং কখনও পানি আবদ্ধ হয়ে গাছ মারা যায় না ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় সব চাহিদার জোগান দিলেও আমাদের দেশে নারিকেল অনেকটা অবহেলিত রয়ে গেছে। নারিকেল গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে নারিকেলের ফলন ও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। একই সাথে নার্সারির চারা তৈরি কলম লাগানোর ক্ষেত্রে কোকোডাস্ট নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। একে কাজে লাগিয়ে কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।

 

ড. মো. নাজিরুল ইসলাম*

*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

বিস্তারিত
তাল চাষ সম্প্রসারণ

তাল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত ফল। একক লম্বা কাণ্ড ও তার আগায় সুন্দরভাবে এক গুচ্ছ পাতার সমারোহে সুশোভিত তাল গাছ দেখতে অপূর্ব লাগে। নারিকেল, খেজুর, সুপারির মতো তাল একই ‘পামী’ পরিবারভুক্ত। এ উদ্ভিদ এক দল বীজ পত্র দলীয় এবং এ গাছের শিকড় গুচ্ছ মূল বিশিষ্ট। তাল গাছের শিকড় মাটির বেশি গভীরে পৌঁছে না তবে শতাধিক গুচ্ছ মূল চারদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা (ঝড়, সাইক্লোন) থেকে গাছকে রক্ষা ও ভূমির ক্ষয় রোধ করে। বয়স্ক গাছ ৬০-৮০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছের আগায় ৩৫-৫০টা শক্ত পাতা থাকে। পাতার আগা সূচালো হওয়ায় বজ্রপাত রোধক গাছ হিসেবে এ ফলের আবাদ অতি জনপ্রিয়। একই কারণে বজ্রপাতের কবল থেকে প্রাণিকুলকে রক্ষা করার জন্য ও গাছের বহুবিধ ব্যবহার সুবিধাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে তাল ফল সম্প্রসারণে অনেক দেশেই প্রাধান্য দেয়া হয়। একই গুরুত্বে বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরে (২০১৬-২০১৭) ১০ লাখ তাল চারা রোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। চলতি ২০১৭ সালে ডিএই ২ লাখ তাল বীজ/চারা সারা দেশে রোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
 

পুষ্টিগুণ : তাল অতি পুষ্টিকর ও ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ। সব ধরনের ফলে দেহের জন্য উপযোগী বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ হলেও তালে এর বহির্ভূত কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদন রয়েছে। অন্য ফলের তুলনায় এ ফলে ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও  ক্যালোরির উপস্থিতি অনেক বেশি। বয়স্কদের জন্য এ ফলের উৎস থেকে সহজেই হজমযোগ্য পর্যাপ্ত আঁশ প্রাপ্তিতে অতি গুরুত্ব বহন করে। আখের গুড়ের চেয়ে তালের গুড়ে প্রোটিন, ফ্যাট ও মিনারেলসের উপস্থিতি বেশি।
 

ঔষধিগুণ :  তালের রস আমাশয় নিরাময়, মূত্রের প্রবাহ বৃদ্ধিকারক এবং পেটের পীড়া/প্রদাহ, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরসনে সহায়ক। এ ফলের রস সেবনে শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে, ক্লান্তি দূর করে, দেহে শক্তি জোগায় এবং অনিদ্রা দূর করে। তালের রস থেকে তৈরি  মিসরি সর্দি-কাশি নিবারণে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া যকৃতের পীড়া ও পিত্তনাশক হিসেবে এ ফল অতি কার্যকর।  
 

উপকারিতা : কাঁচা-পাকা  তাল ও গাছের প্রতিটা অঙ্গ জনজীবনে অতি গুরুত্ব বহন করে। বয়স্ক গাছের (৫০ বছর ও তার ঊর্ধ্ব) কাণ্ডের টিম্বারভ্যালু খুব বেশি। গ্রাম-গঞ্জে টিনের বা সেমিপাকা বাড়ি তৈরিতে এ গাছের শক্ত দীর্ঘস্থায়ী কাঠের ব্যবহার জনপ্রিয়তা খুব বেশি। কাঁচাঘর তৈরিতে খড়ের বিকল্প হিসেবে দরিদ্র পরিবারবর্গ তালের পাতাকে অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
 

বর্ষায় প্লাবণে তালের কাণ্ড দিয়ে ডিঙি বানিয়ে অনেকে পানি পথ পারাপার হয়। জ্বালানি হিসেবেও তালের পাতা ও ডগা ব্যবহার করার প্রচলন গ্রামগঞ্জে বেশি। প্রাচীন কালে যখন কাগজের ব্যবহার প্রচলন ছিল না তখন লেখাপড়ার কাজে কাগজের বিকল্প হিসেবে তাল পাতা ব্যবহার করা হত। তাল পাতা দিয়ে নানা প্রকার হাত পাখা তৈরি করা হয়। গরমকালে এ পাখার ব্যবহার খুব বেশি। তাল পাতা দিয়ে রঙবেরঙের পাখা তৈরি ও বিপণনের মাধ্যমে বাড়তি উপার্জনের কাজে মূলত মহিলারা নিয়োজিত থাকে।   
তালের ফুল ও কচি ফল থেকে সংগৃহীত রস অন্যতম সুস্বাদু মূল্যবান পানীয় হিসেবে ব্যবহার অতি জনপ্রিয়। তালের রস থেকে গুড় তৈরি করা হয়। এ গুড়ের বাজার মূল্য অনেক বেশি। পুরুষ-স্ত্রী উভয় প্রকার গাছ থেকেই তালের রস পাওয়া যায়। মৌসুমে একটা তাল গাছ থেকে দৈনিক ১০-১৫ লিটার রস পাওয়া যায়।

 

কচি তালের ভেতরের আহার্য্য অংশ অতি সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। কচি ফলের বাজার মূল্যও অনেক বেশি। এপ্রিল-মে মাসের গরমে তৃষ্ণা নিবারণে ও বিচিত্র স্বাদ আহরণে কচি তালের কদর বেশি। কচি তাল সংগ্রহ ও তা বিপণন কাজে হাজার হাজার মানুষ মৌসুমে নিয়োজিত হয়ে থাকে। পাকা তালের ঘন রস বিভিন্ন উপাদেয় সুস্বাদু খাবার তৈরির কাজে ব্যবহার হয়। তালের রস দিয়ে তৈরি হরেক রকমের পিঠা, পায়েশ, হালুয়ার স্বাদই আলাদা। তালের আঁটিকে ছাই মিশ্রিত মাটির নিচে ৫-৭ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা হলে তা থেকে লম্বা মোটা শিকড় গজায়। এ অবস্থায় আঁটির ভেতরে নরম শাঁস তৈরি হয়। শিশু, কিশোর ও বয়স্ক সবার কাছে এ সুস্বাদু আঁশ অতি জনপ্রিয়।
 

বৃহত্তর ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও রাজশাহী জেলায় এ ফলের চাষ তুলনায় অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে অসময়ে প্রচুর বৃষ্টি ও বজ্রপাতের প্রতিকূল প্রভাব অহরহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বজ্রপাতের আধিক্য অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে হাওর এলাকায় তালসহ অন্য বয়স্ক বড় গাছের (বট, পেকুড়, তেঁতুল) অনুপস্থিতির কারণে তদাঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার তুলনায় অনেক বেশি। এ অবস্থার উন্নয়নে সারা দেশে তাল গাছ সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সবার কর্তব্য।
 

মাটি :  তাল সব ধরনের মাটিতে চাষ সুবিধা আছে। প্রতিকূল পরিবেশে কিছুটা অনুর্বর মাটিতেও তাল চাষ করা যায়। অন্যগাছের তুলনায় জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ত সহিষ্ণুগুণ ফলের বেশি।
জাত : দেশ-বিদেশে তালের কোনো সুনির্দিষ্ট জাত কম দেখা যায়। তাল ফলের আকার, রঙ ও ফল ধরার অবস্থা বিবেচনায় স্থানীয়ভাবে জাতের বিভিন্ন নামকরণ হয়। পাকা তালের রঙ হালকা বাদামি, গাঢ় হলুদ এবং কালো হতে পারে। এছাড়া কিছু বারোমাসি জাতের তাল গাছ দেখা যায়। যেহেতু খেজুর, লটকনের মতো তাল গাছের পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদাভাবে জন্মে। এজন্য টিস্যু কালচার বা অনুরূপ ব্যবস্থায় বংশবিস্তার ব্যবস্থা ছাড়া বীজ থেকে প্রাপ্ত চারায়  জাতের বৈশিষ্ট্যতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

 

বংশবিস্তার :  তালের বীজ থেকে চারা তৈরি করে অথবা সরাসরি বীজ মাটিতে বপন করে তালের বংশবিস্তার করা হয়। অন্য ফলের মতো বাগান আকারে তালের চাষ প্রচলন এদেশে নেই। আগস্ট-অক্টোবর মাসে পাকা তাল প্রাপ্তির ভরা মৌসুম। পাকা তাল বা বীজ কোনোভাবে জমিতে, রাস্তা, পুকুর বা দিঘির পাড়ে পড়ে থাকলে তা থেকেই নতুন গাছের সৃষ্টি হয়। যেহেতু বীজ গজিয়ে চারা  তৈরি করে তা থেকে ফল পেতে ১০-১২ বছর সময় লেগে যায়, এজন্য অন্য ফলের মতো বসতবাড়িতে বা বাগান আকারে তাল গাছ রোপণে কারো আগ্রহ দেখা যায় না। তবে রাস্তা, বাঁধের ধার, চিংড়ির ঘের, রেললাইনের পাশে ও অন্য কমিউনিটি স্থানে বৃক্ষ রোপণে বিশেষ লাভবান হওয়া যায়।
 

চারা তৈরি :  চারা তৈরির জন্য প্রথমে ভালো উন্নত মানের বেশি ফলদানে সক্ষম এমন মাতৃগাছ নির্বাচন করে তা থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত। পাকা ফল সংগ্রহের দুই সপ্তাহের মধ্যে রোপণ করা উচিত। অন্যথায় বীজ শুকিয়ে গেলে তা থেকে চারা গজায় না।  অসময়ে তাল প্রাপ্তির প্রয়োজনে বারোমাসি জাতের গাছ থেকে তাল বীজ সংগ্রহ করা উত্তম। আগস্ট মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তাল পাকে। এ সময় তাল বীজ বেশি সংগ্রহ সুবিধা রয়েছে। তবে বারোমাসি জাতের তালের বীজ এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে সংগ্রহ করে সরাসরি বীজ রোপণ অথবা জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যে তৈরি চারা রোপণ করা বেশি উপযোগী। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে চারা রোপণের ক্ষেত্রে আগাম চারা তৈরি করে নিয়ে হাওরের কিনারের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি  থেকে পানি নেমে গেলে সেসব স্থানে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে চারা রোপণ কাজ শেষ করা উত্তম ।
 

প্রায় ১০ ফুট লম্বা এবং ৩ ফুট চওড়া বীজতলায় এক হাজার তালের আঁটি বা বীজ বসানো যায়। বীজ থেকে চারা গজানোর সময় শিকড় দ্রুত মাটির নিচে প্রবেশ করে এবং তা উঠিয়ে পলিব্যাগে সংরক্ষণ করা কষ্টকর হয়। এ অবস্থায় মাটি থেকে চারা উঠালে অধিকাংশ চারা মারা যেতে পারে। এজন্য বীজ তলার নিচের অংশে পাতলা টিনের শিট বা পুরু পলিথিন বিছিয়ে অথবা তলার এ অংশ ২-৩ ইঞ্চি পুরু করে সিমেন্ট বালি খোয়া দিয়ে ঢালাই করে নিয়ে তা তালের চারা তৈরির কাজে ব্যবহার করলে সুবিধা হয়, তাতে শিকড় মাটির ভেতরে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে গজানো আঁটি সহজেই উঠিয়ে পলিব্যাগে সংরক্ষণ উপযোগী হয়। বীজতলা তৈরিকালে নিচের অংশ কম্পোস্ট/পচা গোবর ও ছাই মিশ্রিত বেলে-দো-আঁশ মাটি দিয়ে  ৩ ইঞ্চি পরিমাণ ভরাট করে তাতে সারি করে বীজ বসাতে হয়। বীজগুলো বসানো হলে মোটা বালু  ও মাটির মিশ্রণ দিয়ে প্রায় ১ ইঞ্চি (২-৩ সেমি) পুরু করে বসানো বীজের উপরিভাগ ঢেকে দিতে হয়। বীজতলার মাটিতে নিয়মিত হালকা পানি সেচ দিয়ে ভেজাতে হয়। বীজ বপনের ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হওয়া শুরু হবে। গজানো বীজ থেকে মোটা শিকড়ের মতো নরম, আগা কিছুটা সূচালো এক প্রকার টিউব তৈরি হয়। এ টিউবের মধ্যে শিকড় ও সুপ্ত পাতা একই সঙ্গে বড় হয়ে ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে গজানো পাতা প্রায় ৭-১৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। পাতা বের হওয়া শুরু হলে টিউবের আবরণ শুকিয়ে বা পচে ভেতরের পাতা ও শিকড় আলাদাভাবে বড় হওয়া শুরু করে। এ সময় চারাগুলো আঁটিসহ উঠিয়ে পুরু শক্ত ১০দ্ধ১০ ইঞ্চি মাপের পলিব্যাগে অথবা পরিত্যক্ত সিমেন্টের বস্তা দিয়ে তৈরি ব্যাগে ভালো মানের পটিং মিডিয়া (বেলে দো-আঁশ মাটি ৫০%, জৈব পদার্থ ৪০% এবং ১০% কেকোডাস্ট/করাত কলের গুঁড়া) ব্যবহার করে তা সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেয়া হয়। অনেক সময় তৈরি নতুন চারার শিকড় বেশি বড় হয়, এ ক্ষেত্রে ব্যাগিং করার সময় কাজের সুবিধার্থে গাজানো শিকড় ৪-৬ ইঞ্চি রেখে অবশিষ্ট অংশ সিকেচার বা ধারালো চাকু দিয়ে কেটে ফেলা উত্তম হবে। চারা ব্যাগিং করার প্রথম ২-৩ সপ্তাহ হালকা ছায়া দেয়ার ব্যবস্থা করা ভালো।  
 

বীজ/চারা রোপণ :  রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইনের ধারে, চিংড়ির ঘেরে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, গোরস্থান, শ্মশান, ঈদগাহ বিভিন্ন ধরনের ‘কমিউনিটি’ প্লেসে তাল ফল সম্প্রসারণ সুবিধা এ দেশে বেশি। চারা তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও তা রোপণ কাজ অনেক ঝামেলা/ কষ্টকর ও ব্যয় বহুল। এজন্য বেশি পরিমাণে তাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সরাসরি জমিতে বীজ রোপণ করা  সহজতর। বিদ্যুৎ লাইনের অবস্থান বিবেচনায় এনে তাল বীজ/চারা রোপণ ব্যবস্থা নিতে হয়।  
 

দু’এক সারি তাল বীজ/চারা রোপণের জন্য ১০-১২ ফুট দূরত্ব দিলেই চলে। প্রতিটা গাছের দূরত্ব নির্ধারণ করে নিয়ে ২ী২ী২ ফুট মাপের গর্ত তৈরি করে সার মাটি দিয়ে পুনরায় তা ভরাট করে বীজ/চারা রোপণ করা উচিত হবে।  রোপণের আগে প্রতিটা গর্তে ১০-১৫ কেজি গোবর এবং ২৫০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি  সার মিলে মোট ৫০০ গ্রাম গর্তের মাটির সাথে ভালোভাবে মেশানো প্রয়োজন। গোবর সার প্রাপ্তি সুবিধা না থাকলে নিকটস্থ জমির উপরিভাগের (ঞড়ঢ় ংড়রষ) উর্বর মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করলেও রোপিত বীজ/চারা বাড়তে সহায়ক হবে।  
 

সার প্রয়োগ :  তাল গাছে সার প্রয়োগ করার প্রচলন এদেশে নেই। তবে রোপিত গাছে প্রথম বছর পচা গোবর-১০ কেজি, ইউরিয়া-৩০০ গ্রাম, টিএসপি-২৫০ গ্রাম এবং এমওপি-২০০ গ্রাম হারে সার প্রয়োগ করা হলে গাছ ভালোভাবে বাড়বে, ফলন বেশি দিবে। এ সারের অর্ধেক পরিমাণ বর্ষার আগে এবং বাকি অর্ধেক সার বর্ষা শেষে বছরে দুইবার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তাল গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতি বছর ১০% হারে সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং  এ প্রবৃদ্ধি ৭-৮ বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। এরপর প্রতিটা বয়স্ক গাছের জন্য পচা গোবর-২০ কেজি, ইউরিয়া-১ কেজি, টিএসপি-৯০০ গ্রাম এবং এমওপি-৮০০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করার প্রয়োজন হবে।
 

পরিচর্যা :  তাল বীজ/চারা রোপণের পর খুব একটা যত্ন নেয়া হয় না। তবে দু’এক মাসের ব্যবধানে গাছের গোড়া আগাছামুক্ত রাখার প্রয়োজন হয়। খরা মৌসুমে গাছের