কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

গোলমরিচ : বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

গোলমরিচ, (Piper nigrum Linn)| Piperaceae গোত্রের একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় (climbing/branching vine) উদ্ভিদ যার ফল berry হিসেবে পরিচিত। এটি  Monoecious জাতীয় উদ্ভিদ তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পুরুষ এবং স্ত্রী ফুল দেখা যায়। গোলমরিচ ফলটি গোলাকার, কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ এবং পাকা অবস্থায় হলুদ থেকে লাল বর্ণের হয়। এর মধ্যে একটি মাত্র বীজ থাকে। ভারতে গোলমরিচকে King of Spices হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভারত ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য Tropical দেশে গোলমরিচ চাষ হয়। গোলমরিচের গুঁড়া ইউরোপীয় দেশে খাদ্যে মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রাচীনকাল থেকে। এছাড়া ঔষধি গুণাগুণের জন্যও এটি সমাদৃত। গোলমরিচে পাইপারিন (piperine) নামের রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যা  থেকে এর ঝাঁঝালো স্বাদটি এসেছে। গোলমরিচের ইংরেজি নাম Black pepper এর Pepper শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষার পিপালি” শব্দ থেকে যার অর্থ দীর্ঘ মরিচ। এখান থেকে উদ্ভূত হয়েছে লাতিন ভাষার piper যা মরিচ ও গোলমরিচ দুটোকেই বোঝানোর জন্য রোমানরা ব্যবহার করত।
 

পর্তুগিজ, ফরাসি ও ইংরেজরা যে কয়টি কারণে অভিভক্ত ভারতবর্ষে আগমন করেছিল তার মধ্যে মসলা সংগ্রহ ছিল একটি। ওই সময়কাল ভারতবর্ষে  মসলার উৎপাদন হতো প্রচুর। ইউরোপীয় বণিকরা মসলা সংগ্রহে মূলত ভারতবর্ষ অভিমুখে জাহাজ প্রেরণ করত।


বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গোলমরিচ চাষ হয়। এখানকার নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীরা খাসিয়াপানের সঙ্গে অনেক দিন ধরেই চাষ করছেন গোলমরিচ। চা উৎপাদনে যে রকম অম্লীয় মাটি এবং উঁচু-নিচু টিলার প্রয়োজন গোলমরিচের জন্যও একই অবস্থা দরকার। অর্থাৎ যেখানে কোনো পানি আটকাবে না এমন উঁচু জায়গায় ভালো জন্মে। এছাড়াও ছায়াময় এলাকায় গাছগুলো ভালো জন্মে। গোলমরিচ যেহেতু বহুবর্ষজীবী লতা জাতীয় গাছ, তাই লতা রোপণের ৪/৫ বছর পর থেকে ফল ধরতে শুরু করে। গাছ বয়স ৮-৯ বছর হলে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় আসে এবং ২০-২৫ বছর পর্যন্ত ভালো ফলন দেয়। গোলমরিচ গাছ সাধারণত সহায়ক গাছকে আঁকড়িয়ে  বেড়ে ওঠে। এ গাছ সর্বোচ্চ ৩০-৩৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এ গাছের পাতা দেখতে অনেকটা পান পাতার মতো। একটি গাছ থেকে বছরে ৩-৫ কেজি পর্যন্ত  গোলমরিচ পাওয়া যায়।
 

গোলমরিচের গুণাগুণ
কফ, ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা নিরাময় করে; ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ব্যাহত করে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে; গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে; ওজন কমাতে সাহায্য করে; কোমর বা পাঁজরের ব্যথা সারাতে গোলমরিচ চূর্ণ গরম পানিসহ সকাল ও বিকালে একবার করে খেতে হবে; গোলমরিচ সামান্য পানিসহ বেটে দাঁত ও মাড়িতে প্রলেপ দিলে ব্যথা দূর হয়।

 

বারি গোলমরিচ-১                           
ষাটের দশকে বাংলাদেশে গোলমরিচের চাষাবাদ প্রবর্তিত হয়। তখন সিলেট অঞ্চলে বসতবাড়িতে কিছু গাছ ছিল বলে জানা যায়। নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক জৈন্তিয়া গোলমরিচ-১ জাতটি ১৯৮৭ সালে উদ্ভাবিত হয়। যা বারি গোলমরিচ নামে পরিচিত।

 

উৎপাদন প্রযুক্তি
পানি নিষ্কাশনযুক্ত উচ্চমাত্রায় হিউমাসযুক্ত উর্বর দো-আঁশ মাটি গোলমরিচ চাষের জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত। বেলে দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটিতেও গোলমরিচ চাষ করা যায়।
এটি ছায়া সহ্যকারী কিন্তু প্রখর সূর্য তেজ ও শুকনো হাওয়া সহ্য করতে পারে না। প্রখর সূর্যালোক বা দীর্য সময়কালীন  শুষ্ক আবহাওয়া বা দীর্ঘ খরায় গোলমরিচ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং Vine এর অঙ্গজ বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। জমি ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে কয়েকবার কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আগাছা বেছে তৈরি করে নিতে হবে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পিট তৈরি করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে হলে গাছ থেকে গাছের দূরত¦ হবে ৪ মিটার এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫ মিটার। এ দূরত্ব বজায় রেখে ৫০x৫০x৫০ সেন্টিমিটার আকারের গর্ত তৈরি করতে হবে। সহায়ক গাছ যেমন- মান্দার, ঝিগা, সুপারির ক্ষেত্রে গাছের গোড়ায় ৩০x৩০x৩০ সেন্টিমিটার আকারে গর্ত তৈরি করা দরকার। বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে  গর্তে ৫-১০ কেজি গোবর/কম্পোস্ট সার, ১২৫ গ্রাম খৈল, ১১৫ গ্রাম টিএসপি ও ১১৫ গ্রাম এমওপি দিয়ে ঝুরঝুরে মাটির সাথে গর্ত ভর্তি করতে হবে।  সহায়ক গাছ লাগাতে হলে গর্তে ৩-৪ কেজি গোবর/কম্পোস্ট সার দিয়ে গর্ত ভরাট করে কমপক্ষে ৭-১০ দিন রেখে দিতে হবে।       

 

বীজ কাটিং সংগ্রহ এবং রোপণ
উচ্চফলনশীল ও ফুলের ছড়া ১৫-২০ সেন্টিমিটার লম্বা এমন উন্নত মাতৃগাছ থেকে গোলমরিচের কাটিং সংগ্রহ করা হয়। বাণিজ্যিকভিত্তিতে কাটিং থেকে গোলমরিচের চারা তৈরি করা হয়। বয়স্ক উন্নত গাছের গোড়ায় দিক থেকে  বেরিয়ে আসা লতা থেকে কাটিং করা হয়। ভার্টিকেল কাটিং থেকে হরাইজনটাল ভাইন কাটিং গাছে উচ্চফলন পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ  মাসে এসব লতা ধারালো ছুরি দ্বারা কেটে মূল গাছ থেকে আলাদা করে পলিথিন ব্যাগের মাটিতে বসানো হয়।  প্রতিটি ভাইন কাটিংয়ে কমপক্ষে ২-৩টি চোখ থাকা আবশ্যক। ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে পরিমিতভাবে পানি দিলে এক মাসের মধ্যে কাটিংকৃত ভাইন থেকে মূল বা শিকড় বের হতে শুরু করবে এবং মে-জুন মাসে লাগানো উপযুক্ত হবে। এছাড়া বর্ষাকালে (মে-আগস্ট) গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করে সহায়ক গাছের গোড়ায় লাগালে শত ভাগ গাছ ভালোভাবে  বেঁচে থাকে। গোলমরিচ লতা জাতীয় গাছ। তাই এ জাতীয় গাছের জন্য আশ্রয়দাতা গাছ বা দীর্ঘস্থায়ী খুঁটি বাউনি হিসেবে দেয়া প্রয়োজন। অনেক সময় আম, কাঁঠাল, সুপারি, মান্দার, জিকা, সাজিনা, শিমুল, আমলকী আশ্রয়দাতা গাছ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

 

চারা নির্বাচন ও চারা তৈরি
অধিক ফলনশীল উন্নত জাতের মাতৃগাছ নির্বাচন করে ১-৩ বছর ফলন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে কাটিং করে চারা তৈরি করা উচিত। মাতৃগাছের বয়স ৫-১৫ বছর হলে কলম ভালো হয়। গাছের বয়স বেশি হলে সেখান থেকে উৎপন্ন  কলমের চারা গাছের বৃদ্ধি কম হয়।  গোলমরিচ গাছ তিন ধরনের বায়ুবীয় মুকুল দেয়,


ক. লম্বা  পর্ব মধ্য ও বায়বীয় মূলযুক্ত প্রাথমিক বা প্রধান মুকুল, অবলম্বন বেয়ে ওপরে উঠে; খ. ঝাড়ের গোড়া থেকে উৎপন্ন ধাবক মুকুল, এগুলোর পর্ব মধ্য লম্বা হয়;  গ. সীমিত বৃদ্ধিযুক্ত, ফল উৎপাদক পার্শ¦ীয় মুকুল। ধাবক মুকুল কাটিংয়ের জন্য  উত্তম। প্রাথমিক ও প্রধান মূল থেকেও কাটিং নেয়া যায়। পূর্ণবয়স্ক গাছের শীর্ষ অঞ্চল থেকে  কিছু শাখা-প্রশাখা নিচের দিকে ঝুলতে থাকে। এদের ঝুলন্ত মুকুল বলে। এ থেকে কাটিং সংগ্রহ করা যায়। উচ্চফলনশীল ও রোগমুক্ত গাছ থেকে ধাবক মুকুল নির্বাচন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে পাতা ছেটে দেয়ার পর ধাবক মুকুলগুলো গাছ থেকে কেটে নেয়া হয় এবং ৪-৫টি পর্বযুক্ত টুকরো করে নেয়া ভালো। কাটিংগুলো ছত্রাকনাশক মিশ্রিত পানিতে ১-২ মিনিট চুবিয়ে নিলে পরবর্তীতে রোগাক্রান্ত কম হয়। এ টুকুরোগুলো নার্সারিতে পলিথিন প্যাকেটে মাটির মিশ্রণে লাগানো হয়। নার্সারিতে প্যাকেটের ওপর যাতে রোদ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং নিয়মিত পানি দিতে হবে। কাটিং মে-জুন মাসে জমিতে লাগানোর উপযোগী হয়ে আসে। এগুলো সহায়ক গাছের গোড়ায় লাগানো হয়।
 

বাগান স্থাপন
গোলমরিচ ০১. একক ফসল ০২. মিশ্র ফসল ০৩. সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। মে-জুন মাসে মূল জমিতে অবলম্বনকারী গাছের সাথে কাটিং বসিয়ে দিতে হবে এবং প্রতি মাদাতে প্রতিটি অবলম্বন গাছের পাশে দুই তিনটি গোলমরিচের চারা বসানো যায়। চারার গোড়া থেকে অবলম্বনের গোড়ার দিকে ১৫ সেন্টিমিটার চওড়া ও গভীর নালা করতে হবে এবং সে  লতা নালার ভেতরে এমনভাবে বসিয়ে দিতে হবে যেন ডগাটিকে অবলম্বনের সাথে বেঁধে দেয়া যায়। এরপর নালার ভেতরে লতার উপর মাটি চাপা দিতে হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে রোপণের জন্য গর্ত প্রতি ২টি কাটিং হিসাবে ২২০০টি কাটিংয়ের প্রয়োজন হয়।

 

সার প্রয়োগ : প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে ও বর্ষার শেষে ফলন্ত গাছে সার দিতে হবে। গোলমরিচ গাছে প্রতি বছর ঝাড়প্রতি ১০০ গ্রাম নাইট্রোজেন, ৪০ গ্রাম ফসফেট ও ১৪০ গ্রাম পটাশ প্রয়োগ করা যেতে পারে। সার প্রয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন রাসায়নিক সার গাছের শেকড়ে সরাসরি না লাগে। প্রথম বছরে সারের তিন ভাগের একভাগ প্রয়োগ করতে হবে এবং দ্বিতীয় বছর প্রয়োগ করতে হবে তিন ভাগের দুইভাগ পরিমাণ। তৃতীয় বছরে  এবং তারপর থেকে পুরো মাত্রায় সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। ঝাড়ের গোড়া থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ও ১৫ সেন্টিমিটার গভীরতায় সার প্রয়োগ করতে হবে এবং ওই সার মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। মে-জুন মাসে প্রতি গাছে ১০ কেজি হারে গোবর সার বা খামারের সার  প্রয়োগ করা উচিত। প্রয়োজনে ১ বছর পর প্রতি গাছে ৫০০-৬০০ গ্রাম করে চুন মে-জুন মাসে প্রয়োগ করা যেতে পারে।


অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা : গাছ কিছুটা বড় হলে গাছের গোড়ার চারদিকে হালকাভাবে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। তাছাড়া গাছের চারদিকে মাটি দিয়ে ভেলি বেঁধে দিতে হবে। মূল লতায় বেশি শাখা-প্রশাখা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ৬-৭ মিটার ওপরে বেশ ঝাঁকড়া হয়। নিয়মিত পরিচর্যার অংশ হিসেবে আগাছা দমন ও গোড়ার মাটি আলগা রাখা প্রয়োজন। আবার অতিরিক্ত ছায়া গোলমরিচের Flowering এ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

কাটিং
ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সজীব ও হৃষ্টপুষ্ট সতেজ ভাইন কাটিংয়ের জন্য উপযুক্ত মাতৃগাছ থেকে পৃথক করা হয়। ৪-৫টি পর্ব বিশিষ্ট কাটিংয়ের কমপক্ষে ২টি পর্ব প্রস্তুতকৃত উঁচু বেডের পলিথিন ব্যাগে বা বাঁশের ছোট ঝুঁড়িতে রোপণ করে আংশিক ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিতে হবে। ভাইন থেকে শিকড় গজানো শুরু করলে ভারি বর্ষায় অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে চারা রোপণ করতে হয়। সরাসরি গাছের গোড়ায় তৈরি গর্তে কাটিংয়ের ২টি নোড মাটিতে প্রবেশ করে লাগালে ভালো হয়।

 

ফসল রক্ষা : গোলমরিচে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম তবে ফ্লি বিটল জাতীয় পোকা আক্রমণ করতে পারে। এ পোকার আক্রমণে গোলমরিচের দানা ফাঁপা হয়ে যায় ও ব্যাপক ক্ষতি করে। এ পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার কুইনালফস যেমন একালাকস ২৫ ইসি ভালোভাবে মিশিয়ে ৭-১৫ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে। এ রোগের প্রাথমিক অবস্থায় পাতা  হলদে হয়ে যায় ও পরে ঝরে যায় এবং গাছের মূল পচে যাওয়ায় গাছ মারা যায়। গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকলে এ রোগ হতে পারে। প্রতিকারের জন্য পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে ডাইথেন এম-৪৫ স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যায়।
 

ফসল তোলা ও ফলন : চারা রোপণের ৩-৪ বছর পর গাছ ফল দিতে শুরু করে। ৭-৮ বছর বয়সের গাছ পরিপূর্ণ ফলন দিয়ে থাকে। পৌষ-মাঘ মাস গোলমরিচ তোলার উপযুক্ত সময়। প্রতি ছড়ায় বা থোকাতে দু-একটি গোল মরিচের দানা কমলা বা লাল রঙের ধরলে ছড়াটিকে সাবধানে কেটে নিতে হবে। তারপর সাবধানে গোল মরিচের দানা আলাদা করে নিতে হবে। ৫-৭ দিন দানাগুলো রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। শুকানোর পর খোসার রঙ কালো হয়ে কুঁচকে আসে। প্রতি গাছে ৩-৫ কেজি টাটকা গোলমরিচ সংগ্রহ করা যায়। প্রক্রিয়াজাতকরণে পরে তা থেকে ১.৫-২.৫ কেজি কালো গোলমরিচ পাওয়া যায়।
 

প্রক্রিয়াকরণ : সংগ্রহের পর ফলগুলো ভালো ফল আলাদা করে একটি পাত্রে জমা করতে হয়। তারপর দানাগুলো ফুটন্ত পানিতে ১০ মিনিট সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে ফলগুলো রোদে শুকাতে হবে। যে পানিতে দানাগুলো সিদ্ধ করা হয়েছে সে পানি কিছুক্ষণ পর পর দানাগুলোর ওপর ছিটিয়ে দিতে হবে। এতে শুকনা গোলমরিচের রঙ সুন্দর হয়, সুগন্ধ অটুট থাকে এবং ঝাল নষ্ট হয় না। এভাবে ৬-৭ দিন ভালো রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা যায়।
 

বাংলাদেশে গোলমরিচ চাষের সম্ভাবনা ও করণীয়
২০১৫-১৬ বছরের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে মোট  ৫ হেক্টর জমিতে গোলমরিচের চাষ হয় সিলেট, হবিগঞ্জ ও বগুড়া জেলা যার মোট উৎপাদন ৬ মেট্রিক টন। বতর্মানে বারির  মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, জৈন্তাপুর, সিলেট ২৫০টি গাছ, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার ৫০টি গাছ, পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, খাগড়াছড়ি পাবর্ত্য জেলা, পাহাড়ি অঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, রামগড় ৪০টি গাছ এবং আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রামে ২৫০টি গাছ স¦ল্প পরিসরে গোলমরিচের চারা উৎপাদন এবং চাষাবাদ হচ্ছে। গোলমরিচ আংশিক ছায়া পছন্দকারী, লাল মাটি এবং বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২৫০০-৩০০০ মিলিমিটার সম্পন্ন এলাকায় ভালো হয়। মাটি ও জলবায়ু বিবেচনায় বাংলাদেশের সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, পাবর্ত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলাগুলো মাঝারি উঁচু জমি, চা বাগানের টিলা ও ঢালগুলো ছায়া প্রদানকারী গাছে

 

সাফল্যজনকভাবে গোলমরিচের চাষাবাদ সম্ভব।
০১. বর্তমানে বাংলাদেশে গোলমরিচের একমাত্র মুক্তায়িত জাত বারি গোলমরিচ-১। বারি গোলমরিচ-১ জাতটি ফলন ও গাছের বৃদ্ধির বিবেচনায় একটি ভালো জাত বলে সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
০২. নতুন জাত উন্নয়নের জন্য ভারত, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড  থেকে গোলমরিচের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
০৩. জাত উদ্ভাবনে বিজ্ঞানীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিজ্ঞানীদের বৈদেশিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
০৪. বিএআরআই সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ডিএই ও বিএডিসির ফার্মে চারা উৎপাদন করা যেতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে এরই মধ্যে মসলা গবেষণা উপকেন্দ্র, বিএআরআই, জৈন্তাপুর, সিলেট হতে গুণগত মানসম্পন্ন মাতৃ চারা (কাটিং) উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। যা ডিএইর মাধ্যমে চাষি পর্যায়ে বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।
০৫. উপরন্তু লাভজনক সম্ভাবনাময় এ ফসলটির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য অনতিবিলম্বে নতুন প্রকল্প/কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়।

 

*এসএসও, **পিএসও, ***সিএসও, ****ডিজি, বিএআরআই, গাজীপুর

 

বিস্তারিত
মাটি ও ফসলে বোরনের অভাব এবং প্রতিকার

গাছের জীবন ধারণের জন্য কমপক্ষে ২০টি পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন যার মধ্যে ১৭টি উপাদান গাছ মাটি থেকে গ্রহণ করে থাকে। পুষ্টি উপাদানগুলো সমপরিমাণে প্রয়োজন হয় না; কোনোটি বেশি আবার কোনোটির পরিমাণ কম প্রয়োজন হয়। তবে সবই জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক। গাছ যে ১১টি পুষ্টি উপাদান কম পরিমাণে গ্রহণ করে থাকে তাদের অনুপুষ্টি বলে। বোরন একটি মাইকোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টি। এটি  মাটি ও উদ্ভিদ দেহে তেমন সচল নয়। মাটিতে এটা বোরেট এবং বোরেট সিলিকেট মিনারেল হিসেবে থাকে। ওপরের স্তরের মাটিতে মোট বোরনের গড় পরিমাণ সাধারণত ১০ পিপিএম হয় তবে প্রাপ্যনীয় (Available) বোরনের পরিমাণ ১ পিপিএমের অনেক কম। মাটিতে প্রাপ্যনীয় বোরনের সংকট মাত্রা ০.২০ পিপিএম এবং কোনো মাটিতে বোরনের উত্তম মাত্রা হলো ০.৪৫-০.৬০ পিপিএম। গাছের কোষ-কলায় বোরনের পরিমাণ সাধারণত ২০-১০০ পিপিএম এ পরিমাণ ১৫ পিপিএমের কম হলে ঘাটতি হয় আবার ১০০ পিপিএম বেশি হলে বিষাক্ততা (Toxicity) দেখা দিতে পারে।
 

বাংলাদেশের মাটিতে বোরন ঘাটতি
আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন মাটি ও ফসলে বোরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। অতি নিবিড় কৃষির কারণে মাটিতে বোরন গাছ কর্তৃক আহরিত হওয়া, মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়া, অসুষম  মাত্রায় সার প্রয়োগ, এবং চুয়ানির ফলে মাটিস্থ বোরনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং ক্রমশ ঘাটতি লক্ষণ তীব্রতর হচ্ছে। মাটির বিক্রিয়া বেশি অম্লীয় হলে যেমন বোরন ঘাটতি হয় আবার বেশি ক্ষারীয় মৃত্তিকায়ও বোরনের ঘাটতি দেখা যায়। মাটির বিক্রিয়া বা পিএইচমান ৫.০-৭.০ এর মধ্যে থাকলে বোরনের প্রাপ্যনীয়তা উত্তম হয়।

 

বাংলাদেশের প্রায় ৪৭% জমিতে বোরনের ঘাটতি আছে। দেশের ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের মধ্যে ১৯টি অঞ্চলে কম-বেশি বোরনের ঘাটতি আছে। বিশেষত দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্ল­া ও সিলেট জেলায় বোরনের ঘাটতি প্রকট। তাছাড়া, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকার কিয়দংশ,  পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি এলাকা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলার কিয়দংশ এলাকায় বোরন ঘাটতি  দেখা যায়। রবি শস্যের মধ্যে গম, ভুট্টা, সরিষা, মুগডাল, ছোলা, সূর্যমুখী, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, আলু, বোরন সংবেদনশীল। তাছাড়া পেঁপে, কাঁঠাল, পেয়ারা লেবু প্রভৃতি ফলজ বৃক্ষে বোরন ঘাটতি দেখা গেছে। বোরন সংবেদনশীলতা সাধারণত ফসলের শ্রেণী ও জাতের ওপর নির্ভরশীল। রবিশস্যে বোরন প্রয়োগ করলে পরবর্তী ধান ফসলে প্রয়োগ না করলেও চলে তবে বেলে প্রধান মাটিতে প্রতি ফসলেই বোরন প্রয়োগ প্রয়োজন। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে বোরন সার প্রয়োগ বিধেয়।
 

বোরন উদ্ভিদের শর্করা বিপাকে সাহায্য করে ও আমিষ সংশ্লে­ষণে ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদের ভাজক কলা, বর্ধনশীল অংশ ও কোষ প্রাচীর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্যালসিয়াম ও নাইট্রোজেন পরিশোষণে সহায়তা করে। তাছাড়া ফুলের ডিম্বানু নিষিক্ত করা, ফল ও বীজ ধারণে বোরন একান্ত আবশ্যক।
 

বৃক্ষের নাম

বয়স

মাত্রা (গ্রাম/গাছ/বছর)

বোরন

বোরিক এসিড

আম, কাঁঠাল, নারিকেল,

লিচু, লেবু, পেঁপে, ইত্যাদি

১-৫ বছর

৩-৫ গ্রাম

১৮-৩০ গ্রাম

৫-১০ বছর

৫-৮ গ্রাম

৩০-৩৫ গ্রাম

>১০ বছর

৮-১০ গ্রাম

৫০-৬০ গ্রাম

 

বোরনের  ঘাটতি লক্ষণ
বোরন অচলমান (Immobile) হওয়ায় এর ঘাটতি লক্ষণ সাধারণত কচি পাতায় দেখা যায়। বিভিন্ন শস্য ও ফলে বোরনের ঘাটতি বিভিন্ন ধরনের হয়। তবে ঘাটতি লক্ষণগুলো হলো-
০১. গাছের কাণ্ডের শীর্ষ ভাগ শুকিয়ে যায় বা মরে যায়;
০২. পাতা ঈষৎ হলুদাভ হয় এবং কখনও কখনও পাতা মোড়ানো আকার ধারণ করে এবং ভঙ্গুরতা প্রদশর্ন করে;
০৩. গাছে পর্যাপ্ত পানি সেচ দেয়ার পরও কচিপাতা নেতিয়ে পড়া অবস্থায় থাকে;
০৪. বোরনের ঘাটতি  তীব্র হলে গমের শীষ, ভুট্টার মোচায় দানা তৈরি হয় না এবং ফুলে পরাগায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়  বন্ধাত্ব দেখা দেয়;
০৫. ডাল জাতীয় ফসলে দানা সংখ্যা কম হয় এবং দানা অপুষ্ট হয়। গাছ খর্বাকৃতি ও হলুদ হয়ে যেতে পারে; অভাব তীব্র হলে পচনজনিত ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে;
০৬. তৈল জাতীয় ফসলের পডে (শিম) বীজের সংখ্যা কমে যায়;
০৭. আখের পাতা শীর্ষ ভাগে ও কোনায় পুড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়।
০৮. পেঁপে, কাঁঠাল, পেয়ারা ফলের আকার বিকৃতি  হয়;
০৯. ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাতা সজীবতা হারায় এবং পাতায় হাত দিলে খসখসে অনুভূত হয়। ফুলকপির কাডবিবর্ণ হয়ে নষ্ট হয়;
১০. অভাব তীব্র হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি মন্থর হয়ে যায় এবং ফুল ধারণ কমে যায়।

 

সার সুপারিশ
রবিশস্য জাতীয় ফসলের জন্য বোরন হেক্টরপ্রতি ১-২ কেজি এবং বোরিক এসিড ৬-১২ কেজি।
ফলজ বৃক্ষের জন্য

 

প্রয়োগ বিধি
রবিশস্য জাতীয় ফসলের জন্য- জমি তৈরির শেষ চাষের সময় একটি পাত্রে পরিমাণমতো ঝুরঝুরে মাটির সাথে  বোরিক এসিড ভালোভাবে মিশিয়ে জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
ফলজ বৃক্ষের ক্ষেত্রে- বাড়ন্ত ফলজ বৃক্ষের জন্য বোরন সার বছরে দুইবার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় মাত্রার অর্ধেক বর্ষাকালের আগে এপ্রিল-মে মাসে এবং ২য় কিস্তি বৃষ্টির পরে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের গোড়া থেকে ০.৫ মিটার-১.৫ মিটার দূরে চার দিকে রিং পদ্ধতিতে প্রয়োগ করে হালকা সেচ দিতে হবে।

 

পাতায় সিঞ্চন পদ্ধতিতে প্রয়োগ
প্রতি লিটার পানিতে ২-৪ গ্রাম বোরন মিশিয়ে স্প্রে মেশিন দিয়ে সমভাবে পাতায় স্প্রে করতে হবে। ফসলভেদে হেক্টরপ্রতি ৬০-১২০ লিটার স্প্রে দ্রবণ প্রয়োজন হতে পারে। ফলজ গাছে বোরন ঘাটতি দেখা দিলে সঠিক মাত্রায় বোরন দ্রবণ স্প্রে করে গাছের পাতা ভিজিয়ে দিতে হবে।

 

সাবধানতা
০১. বোরন সার প্রয়োগ করার আগে মাটি পরীক্ষা করে মাটিতে বোরনের ঘাটতির পরিমাণ জেনে নেয়া উত্তম;
০২. পাতায় স্প্রে করার ক্ষেত্রে সূর্যাস্তের আগে দিনের যে কোনো উপযুক্ত সময়ে (মেঘলা দিন হলে ভালো হয়) স্প্রে মেশিন  দ্বারা স্প্রে করতে হবে;
০৩. সুপারিশকৃত মাত্রার অতিরিক্ত বোরন প্রয়োগ করা যাবে না। বেশি প্রয়োগ করলে বিষাক্ততা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের মাটি ও ফসলে বোরনের ঘাটতি ক্রমান্বয়ে ব্যাপক হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ফসলের ফলন ও গুণগতমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ও মৃত্তিকার স্বাস্থ্য বজায় রাখার স্বার্থে অন্যান্য সারের সাথে সমন্বিতভাবে বোরন সার প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সুপারিশকৃত মাত্রা ও বিধি মোতাবেক বোরন সার প্রয়োগ কৃষি উৎপাদন টেকসইকরণের জন্য তাই একান্ত জরুরি।

 

ড. নির্মল চন্দ্রশীল* ড. রওশন আরা বেগম**

*প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, **মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, বিএআরআই, জয়দেবপুর, গাজীপুর

বিস্তারিত
কোকোডাস্ট দিয়ে জৈব সার তৈরি

বাংলাদেশে নারিকেলকে বলা হয় গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকা শক্তি। ঐতিহ্যগতভাবে এদেশে নারিকেল চাষ হয় বাড়ির আঙিনায়। নারিকেল চাষে তাই বাড়তি কোনো জায়গা জমির দরকার হয় না। নারিকেল গাছের ছায়া বসতবাড়িতে সাথী ফসল হিসেবে অন্যান্য ফল ও শাকসবজি চাষ করতেও সহযোগিতা করে। রোপণ করার ৬-৭ বছর পর ফল আসে এবং বিরামহীনভাবে ৫০-৬০ বছর তা চলতে থাকে। বিস্ময়কর এ ফলদ বৃক্ষের ফুল, ফল, কাণ্ড পাতা বছরব্যাপী কোনো না কোনোভাবে আমাদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। কৃষকের কাছে তাই নারিকেল সবচেয়ে সমাদৃত গাছ। নারিকেল থেকে উত্তম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ডাবের পানি পাওয়া যায়। নারিকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ এবং আঁশজাত দ্রব্য তৈরি করা যায়। সবশেষে নারিকেলের তুষ (কোকোডাস্ট) থেকে ভালোমানের জৈব সার তৈরি হয়ে থাকে। বরিশাল অঞ্চলের স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর), খুলনার ফুলতলা, বাগেরহাট ও যশোর জেলার মনিরামপুর অঞ্চলে নারিকেলের ছোবড়া বা খোসা থেকে বংশানুক্রমে নারিকেলের খোসা, আঁশ ও আঁশজাত দ্রব্য করা হয়ে থাকে।
 

নারিকেলের খোসা
নারিকেলের খোসা থেকে আঁশ তৈরির সময় খোসার ৬৬% তুষ বা
Cocodust বের হয়। নারিকেলের তুষে ৩১% সেলুলোজ ও ২৭% লিগনিন জাতীয় জৈব পদার্থ আছে এবং এর কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত ১০৪:১ (Shekar, 1999)।  সেলুলোজ খুব শক্ত বা Stable পদার্থ এবং এ কারণে নারিকেলের তুষ ১০-১৫ বছর পরও মাটিতে অক্ষতাবস্থায় থাকে।  লিগনিন পচন-সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা অনুজীবের কার্যক্ষমতা কমায়। নারিকেলের তুষে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় সব রকম পুষ্টি থাকে বলে তুষ পচালে উৎকৃষ্ট জৈব সারে রূপান্তরিত হয়। ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে নারিকেলের তুষের সাথে চুন (প্রতি ১০০০ কেজি তুষে ৫ কেজি চুন) ও মাশরুম স্পন (Spawn) বা বীজ মিশিয়ে পচানো হয়। নারিকেলের তুষের মধ্যে মাশরুম চাষ করেও তা পচানো যায়। মাশরুমে ক্লোরোফিল না থাকায় সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন করতে পারে না। দৈহিক বাড়-বাড়তির জন্য মাশরুম  নারিকেলের তুষের সেলুলোজ হতে শর্করা জাতীয় খাদ্য সংগ্রহ করে, ফলে নারিকেলের তুষের সেলুলোজ কঠিন পদার্থ হতে সরলতম পদার্থে রূপান্তরিত হয় ও সহজে পচে যায়। তুষে মাশরুম spawn ও চুন প্রয়োগ করলে ১ মাসের মধ্যে হিউমাস জাতীয় কালো পদার্থে পরিণত হয়। হিউমাস রাসায়নিক সারের মতো পুষ্টি সমৃদ্ধ নয়, তবে মাটিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থেকে মাটির অনুজীবের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, মাটির ভৌত গুণাবলি ধরে রাখে এবং গাছের জন্য প্রয়োজনীয় মুখ্য ও গৌণ সব ধরনের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে। হিউমাস মাটির Ca++, Zn++, Cu++ Fe++ ধাতব আয়ন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এসব আয়নগুলো গাছের আয়ন বিনিময় ক্ষমতা বাড়ায়, মাটি থেকে খাদ্য সংগ্রহ করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিকেল অপসারণ করে গাছের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। ফ্রি-রেডিকেল এক ধরনের ক্রিয়াশীল যৌগমূলক যা গাছের ক্লোরোফিল নষ্ট করে দেয়। গাছের স্বাভাবিক রেচন প্রক্রিয়া (Metabolism) থেকেই ফ্রি-রেডিকেল তৈরি হয়। জমিতে বেশি বেশি রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে ফ্রি-রেডিকেলও বেশি তৈরি হয়। ফল জাতীয় সবজি যেমন টমেটো, করলার ক্ষেত্রে ফ্রি-রেডিকেলের কারণে একবার ফল আসলেই গাছের পাতা শুকিয়ে মারা যায়। এসব ধাতব আয়ন গুলো Super oxide dismutage (SOD) নামে এক ধরনের এনজাইম তৈরির মাধ্যমে ফ্রি-রেডিকেলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
 

নারিকেলের তুষের বিশেষ গুণ হচ্ছে ওজনের ৮-১০ গুণ পানি ধারণক্ষমতা। তাই সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি জানা থাকলে নারিকেলের অব্যবহৃত এ তুষ সরাসরি নার্সারি ব্যবসা ও ফুল চাষে ব্যবহার করে যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণ কেন্দ্র যশোরের কর্মরত বিজ্ঞানীরা ২০০৮ সালে যশোর শহরতলীর চাচড়া এলাকায় কোকো ফাইবার মিল নামক কোম্পানির সহায়তায় নারিকেলের আঁশ তৈরি ও তুষ পচানোর ওপর এক গবেষণা পরিচালনা করেন। ওই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মাশরুমের বীজ ও চুন প্রয়োগ করে দ্রুত নারিকেলের তুষ পচানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। হাইড্রোলিক মেশিনে নারিকেলে তুষের ব্লক তৈরি করে তাতে চারা লাগানোর ওপরও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেন।
 

নারিকেল থেকে জৈব সার তৈরি
নারিকেলের তুষ ফলের অংশ হওয়ায় গাছের বৃদ্ধির জন্য দরকারি সব পরিমাণ পুষ্টি বিশেষ করে পটাশিয়াম জাতীয় পদার্থ থাকে। পচানোর পর মাটিতে প্রয়োগ করলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা ও অন্যান্য ভৌতিক গুণাবলি বৃদ্ধিসহ অনুজীবের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে দীর্ঘমেয়াদে গাছের পুষ্টি সরবরাহ ও বৃদ্ধি-সহায়তা প্রদান করে।  তাছাড়া নারিকেল থেকে তৈরি জৈব সারে আছে অনেক রকমের এনজাইম (Enzyme) ও কোষীয় পদার্থ যা শিকড় দিয়ে গাছের মধ্যে প্রবেশ করে ও গাছের রোগ প্রতিরোধ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করার বাড়তি ক্ষমতা প্রদান করে। নারিকেল থেকে তৈরি জৈব সারে আছে ৬০৭৫% জৈব পদার্থ, ০.৭৬/ নাইট্রোজেন, ০.৪% হারে ফসফরাস ও পটাশ, ০.২% সালফার ও ০.০০৪ বোরন।   

 

কোকোপিটের ব্যবহার
০ ক্রমবর্ধমান হাইড্রোপোনিকউপায়ে সবজি চাষের জন্য কোকোপিট ব্যবহার করা হয় যেন কোনোভাবেই গাছ বা চারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়;
০ কোকোপিট উদ্ভিদের শিকড় উন্নয়নের জন্য একটি চমৎকার স্তর এবং গাছ বা চারা রোপণ করার সময় কোনো এজেন্ট প্রয়োজন হলে জৈব সারের সাথে কোকোপিটের সংমিশ্রণে একটি গ্রোয়ার মিডিয়া তৈরি করে সরাসরি চারা তৈরি করা যেতে পারে;
০ কোকোপিট মাটির তুলনায় অনেক হালকা এবং টবে ব্যবহারের সময় খুব সহজেই কোকোপিটের ভেতর বাতাস চলাচল করতে পারে যার ফলে গাছ বেশি বেশি অক্সিজেন নিতে পারে;
০ কোকোপিট শোষক সময়কাল অনেক : ফলে এটা গাছে ধীরে ধীরে শোষিত হয়;
০ কোকোপিট একটি উচ্চ বাফার ক্ষমতাসম্পন্ন জৈব পদার্থ যা মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। কাকোপিটের পিএইচ (
pH) সবসময় ৫.৫ থেকে ৭ থাকে যা সুস্থ উদ্ভিদ তৈরি করে এবং খুব সহজেই উন্নত মানের গাছপালা তৈরি করতে সাহায্য করে  এবং এর ফলে অনেক বেশি পরিমাণে ফসল সংগ্রহ করা যায়;
০ টবে মাটি ব্যবহার করলে ওজন বেশি হয়, কিন্তু  কোকোপিট ব্যবহার করলে কম হয়। ছাদের ওপর অনেক  টব ব্যবহার করলে লোড ক্যাপাসিটি কম হয়;
০ কোকোপিট দিয়ে যে কোনো প্রকার চারা তৈরি বা গাছ লাগানো যেতে পারে, নির্দিষ্ট কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। আধুনিক গ্রিন হাউসে কোকোপিটকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে

 

ফসল উৎপাদন করে থাকে;
০ কোকোপিট দিয়ে টবে গাছপালা লাগালে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পানি দিলে টবের ভেতর কখনও জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না, পানি সাথে সাথে দ্রুত সব জায়গাতে ছড়িয়ে দেয় এবং নির্দিষ্ট পরিমাণমতো পানি ধরে রেখে গাছকে সতেজ রাখে  এবং কখনও পানি আবদ্ধ হয়ে গাছ মারা যায় না ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় সব চাহিদার জোগান দিলেও আমাদের দেশে নারিকেল অনেকটা অবহেলিত রয়ে গেছে। নারিকেল গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে নারিকেলের ফলন ও উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। একই সাথে নার্সারির চারা তৈরি কলম লাগানোর ক্ষেত্রে কোকোডাস্ট নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। একে কাজে লাগিয়ে কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে।

 

ড. মো. নাজিরুল ইসলাম*

*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

বিস্তারিত
তাল চাষ সম্প্রসারণ

তাল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত ফল। একক লম্বা কাণ্ড ও তার আগায় সুন্দরভাবে এক গুচ্ছ পাতার সমারোহে সুশোভিত তাল গাছ দেখতে অপূর্ব লাগে। নারিকেল, খেজুর, সুপারির মতো তাল একই ‘পামী’ পরিবারভুক্ত। এ উদ্ভিদ এক দল বীজ পত্র দলীয় এবং এ গাছের শিকড় গুচ্ছ মূল বিশিষ্ট। তাল গাছের শিকড় মাটির বেশি গভীরে পৌঁছে না তবে শতাধিক গুচ্ছ মূল চারদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা (ঝড়, সাইক্লোন) থেকে গাছকে রক্ষা ও ভূমির ক্ষয় রোধ করে। বয়স্ক গাছ ৬০-৮০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছের আগায় ৩৫-৫০টা শক্ত পাতা থাকে। পাতার আগা সূচালো হওয়ায় বজ্রপাত রোধক গাছ হিসেবে এ ফলের আবাদ অতি জনপ্রিয়। একই কারণে বজ্রপাতের কবল থেকে প্রাণিকুলকে রক্ষা করার জন্য ও গাছের বহুবিধ ব্যবহার সুবিধাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে তাল ফল সম্প্রসারণে অনেক দেশেই প্রাধান্য দেয়া হয়। একই গুরুত্বে বাংলাদেশ সরকার চলতি বছরে (২০১৬-২০১৭) ১০ লাখ তাল চারা রোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। চলতি ২০১৭ সালে ডিএই ২ লাখ তাল বীজ/চারা সারা দেশে রোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
 

পুষ্টিগুণ : তাল অতি পুষ্টিকর ও ঔষধিগুণ সমৃদ্ধ। সব ধরনের ফলে দেহের জন্য উপযোগী বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ হলেও তালে এর বহির্ভূত কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদন রয়েছে। অন্য ফলের তুলনায় এ ফলে ক্যালসিয়াম, লৌহ, আঁশ ও  ক্যালোরির উপস্থিতি অনেক বেশি। বয়স্কদের জন্য এ ফলের উৎস থেকে সহজেই হজমযোগ্য পর্যাপ্ত আঁশ প্রাপ্তিতে অতি গুরুত্ব বহন করে। আখের গুড়ের চেয়ে তালের গুড়ে প্রোটিন, ফ্যাট ও মিনারেলসের উপস্থিতি বেশি।
 

ঔষধিগুণ :  তালের রস আমাশয় নিরাময়, মূত্রের প্রবাহ বৃদ্ধিকারক এবং পেটের পীড়া/প্রদাহ, কোষ্ঠকাঠিন্য নিরসনে সহায়ক। এ ফলের রস সেবনে শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে, ক্লান্তি দূর করে, দেহে শক্তি জোগায় এবং অনিদ্রা দূর করে। তালের রস থেকে তৈরি  মিসরি সর্দি-কাশি নিবারণে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া যকৃতের পীড়া ও পিত্তনাশক হিসেবে এ ফল অতি কার্যকর।  
 

উপকারিতা : কাঁচা-পাকা  তাল ও গাছের প্রতিটা অঙ্গ জনজীবনে অতি গুরুত্ব বহন করে। বয়স্ক গাছের (৫০ বছর ও তার ঊর্ধ্ব) কাণ্ডের টিম্বারভ্যালু খুব বেশি। গ্রাম-গঞ্জে টিনের বা সেমিপাকা বাড়ি তৈরিতে এ গাছের শক্ত দীর্ঘস্থায়ী কাঠের ব্যবহার জনপ্রিয়তা খুব বেশি। কাঁচাঘর তৈরিতে খড়ের বিকল্প হিসেবে দরিদ্র পরিবারবর্গ তালের পাতাকে অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।
 

বর্ষায় প্লাবণে তালের কাণ্ড দিয়ে ডিঙি বানিয়ে অনেকে পানি পথ পারাপার হয়। জ্বালানি হিসেবেও তালের পাতা ও ডগা ব্যবহার করার প্রচলন গ্রামগঞ্জে বেশি। প্রাচীন কালে যখন কাগজের ব্যবহার প্রচলন ছিল না তখন লেখাপড়ার কাজে কাগজের বিকল্প হিসেবে তাল পাতা ব্যবহার করা হত। তাল পাতা দিয়ে নানা প্রকার হাত পাখা তৈরি করা হয়। গরমকালে এ পাখার ব্যবহার খুব বেশি। তাল পাতা দিয়ে রঙবেরঙের পাখা তৈরি ও বিপণনের মাধ্যমে বাড়তি উপার্জনের কাজে মূলত মহিলারা নিয়োজিত থাকে।   
তালের ফুল ও কচি ফল থেকে সংগৃহীত রস অন্যতম সুস্বাদু মূল্যবান পানীয় হিসেবে ব্যবহার অতি জনপ্রিয়। তালের রস থেকে গুড় তৈরি করা হয়। এ গুড়ের বাজার মূল্য অনেক বেশি। পুরুষ-স্ত্রী উভয় প্রকার গাছ থেকেই তালের রস পাওয়া যায়। মৌসুমে একটা তাল গাছ থেকে দৈনিক ১০-১৫ লিটার রস পাওয়া যায়।

 

কচি তালের ভেতরের আহার্য্য অংশ অতি সুস্বাদু ও জনপ্রিয়। কচি ফলের বাজার মূল্যও অনেক বেশি। এপ্রিল-মে মাসের গরমে তৃষ্ণা নিবারণে ও বিচিত্র স্বাদ আহরণে কচি তালের কদর বেশি। কচি তাল সংগ্রহ ও তা বিপণন কাজে হাজার হাজার মানুষ মৌসুমে নিয়োজিত হয়ে থাকে। পাকা তালের ঘন রস বিভিন্ন উপাদেয় সুস্বাদু খাবার তৈরির কাজে ব্যবহার হয়। তালের রস দিয়ে তৈরি হরেক রকমের পিঠা, পায়েশ, হালুয়ার স্বাদই আলাদা। তালের আঁটিকে ছাই মিশ্রিত মাটির নিচে ৫-৭ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা হলে তা থেকে লম্বা মোটা শিকড় গজায়। এ অবস্থায় আঁটির ভেতরে নরম শাঁস তৈরি হয়। শিশু, কিশোর ও বয়স্ক সবার কাছে এ সুস্বাদু আঁশ অতি জনপ্রিয়।
 

বৃহত্তর ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও রাজশাহী জেলায় এ ফলের চাষ তুলনায় অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশে অসময়ে প্রচুর বৃষ্টি ও বজ্রপাতের প্রতিকূল প্রভাব অহরহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বজ্রপাতের আধিক্য অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে হাওর এলাকায় তালসহ অন্য বয়স্ক বড় গাছের (বট, পেকুড়, তেঁতুল) অনুপস্থিতির কারণে তদাঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার তুলনায় অনেক বেশি। এ অবস্থার উন্নয়নে সারা দেশে তাল গাছ সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সবার কর্তব্য।
 

মাটি :  তাল সব ধরনের মাটিতে চাষ সুবিধা আছে। প্রতিকূল পরিবেশে কিছুটা অনুর্বর মাটিতেও তাল চাষ করা যায়। অন্যগাছের তুলনায় জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ত সহিষ্ণুগুণ ফলের বেশি।
জাত : দেশ-বিদেশে তালের কোনো সুনির্দিষ্ট জাত কম দেখা যায়। তাল ফলের আকার, রঙ ও ফল ধরার অবস্থা বিবেচনায় স্থানীয়ভাবে জাতের বিভিন্ন নামকরণ হয়। পাকা তালের রঙ হালকা বাদামি, গাঢ় হলুদ এবং কালো হতে পারে। এছাড়া কিছু বারোমাসি জাতের তাল গাছ দেখা যায়। যেহেতু খেজুর, লটকনের মতো তাল গাছের পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদাভাবে জন্মে। এজন্য টিস্যু কালচার বা অনুরূপ ব্যবস্থায় বংশবিস্তার ব্যবস্থা ছাড়া বীজ থেকে প্রাপ্ত চারায়  জাতের বৈশিষ্ট্যতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

 

বংশবিস্তার :  তালের বীজ থেকে চারা তৈরি করে অথবা সরাসরি বীজ মাটিতে বপন করে তালের বংশবিস্তার করা হয়। অন্য ফলের মতো বাগান আকারে তালের চাষ প্রচলন এদেশে নেই। আগস্ট-অক্টোবর মাসে পাকা তাল প্রাপ্তির ভরা মৌসুম। পাকা তাল বা বীজ কোনোভাবে জমিতে, রাস্তা, পুকুর বা দিঘির পাড়ে পড়ে থাকলে তা থেকেই নতুন গাছের সৃষ্টি হয়। যেহেতু বীজ গজিয়ে চারা  তৈরি করে তা থেকে ফল পেতে ১০-১২ বছর সময় লেগে যায়, এজন্য অন্য ফলের মতো বসতবাড়িতে বা বাগান আকারে তাল গাছ রোপণে কারো আগ্রহ দেখা যায় না। তবে রাস্তা, বাঁধের ধার, চিংড়ির ঘের, রেললাইনের পাশে ও অন্য কমিউনিটি স্থানে বৃক্ষ রোপণে বিশেষ লাভবান হওয়া যায়।
 

চারা তৈরি :  চারা তৈরির জন্য প্রথমে ভালো উন্নত মানের বেশি ফলদানে সক্ষম এমন মাতৃগাছ নির্বাচন করে তা থেকে বীজ সংগ্রহ করা উচিত। পাকা ফল সংগ্রহের দুই সপ্তাহের মধ্যে রোপণ করা উচিত। অন্যথায় বীজ শুকিয়ে গেলে তা থেকে চারা গজায় না।  অসময়ে তাল প্রাপ্তির প্রয়োজনে বারোমাসি জাতের গাছ থেকে তাল বীজ সংগ্রহ করা উত্তম। আগস্ট মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তাল পাকে। এ সময় তাল বীজ বেশি সংগ্রহ সুবিধা রয়েছে। তবে বারোমাসি জাতের তালের বীজ এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে সংগ্রহ করে সরাসরি বীজ রোপণ অথবা জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যে তৈরি চারা রোপণ করা বেশি উপযোগী। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে চারা রোপণের ক্ষেত্রে আগাম চারা তৈরি করে নিয়ে হাওরের কিনারের অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি  থেকে পানি নেমে গেলে সেসব স্থানে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে চারা রোপণ কাজ শেষ করা উত্তম ।
 

প্রায় ১০ ফুট লম্বা এবং ৩ ফুট চওড়া বীজতলায় এক হাজার তালের আঁটি বা বীজ বসানো যায়। বীজ থেকে চারা গজানোর সময় শিকড় দ্রুত মাটির নিচে প্রবেশ করে এবং তা উঠিয়ে পলিব্যাগে সংরক্ষণ করা কষ্টকর হয়। এ অবস্থায় মাটি থেকে চারা উঠালে অধিকাংশ চারা মারা যেতে পারে। এজন্য বীজ তলার নিচের অংশে পাতলা টিনের শিট বা পুরু পলিথিন বিছিয়ে অথবা তলার এ অংশ ২-৩ ইঞ্চি পুরু করে সিমেন্ট বালি খোয়া দিয়ে ঢালাই করে নিয়ে তা তালের চারা তৈরির কাজে ব্যবহার করলে সুবিধা হয়, তাতে শিকড় মাটির ভেতরে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে গজানো আঁটি সহজেই উঠিয়ে পলিব্যাগে সংরক্ষণ উপযোগী হয়। বীজতলা তৈরিকালে নিচের অংশ কম্পোস্ট/পচা গোবর ও ছাই মিশ্রিত বেলে-দো-আঁশ মাটি দিয়ে  ৩ ইঞ্চি পরিমাণ ভরাট করে তাতে সারি করে বীজ বসাতে হয়। বীজগুলো বসানো হলে মোটা বালু  ও মাটির মিশ্রণ দিয়ে প্রায় ১ ইঞ্চি (২-৩ সেমি) পুরু করে বসানো বীজের উপরিভাগ ঢেকে দিতে হয়। বীজতলার মাটিতে নিয়মিত হালকা পানি সেচ দিয়ে ভেজাতে হয়। বীজ বপনের ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হওয়া শুরু হবে। গজানো বীজ থেকে মোটা শিকড়ের মতো নরম, আগা কিছুটা সূচালো এক প্রকার টিউব তৈরি হয়। এ টিউবের মধ্যে শিকড় ও সুপ্ত পাতা একই সঙ্গে বড় হয়ে ৮-১০ সপ্তাহের মধ্যে গজানো পাতা প্রায় ৭-১৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। পাতা বের হওয়া শুরু হলে টিউবের আবরণ শুকিয়ে বা পচে ভেতরের পাতা ও শিকড় আলাদাভাবে বড় হওয়া শুরু করে। এ সময় চারাগুলো আঁটিসহ উঠিয়ে পুরু শক্ত ১০দ্ধ১০ ইঞ্চি মাপের পলিব্যাগে অথবা পরিত্যক্ত সিমেন্টের বস্তা দিয়ে তৈরি ব্যাগে ভালো মানের পটিং মিডিয়া (বেলে দো-আঁশ মাটি ৫০%, জৈব পদার্থ ৪০% এবং ১০% কেকোডাস্ট/করাত কলের গুঁড়া) ব্যবহার করে তা সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেয়া হয়। অনেক সময় তৈরি নতুন চারার শিকড় বেশি বড় হয়, এ ক্ষেত্রে ব্যাগিং করার সময় কাজের সুবিধার্থে গাজানো শিকড় ৪-৬ ইঞ্চি রেখে অবশিষ্ট অংশ সিকেচার বা ধারালো চাকু দিয়ে কেটে ফেলা উত্তম হবে। চারা ব্যাগিং করার প্রথম ২-৩ সপ্তাহ হালকা ছায়া দেয়ার ব্যবস্থা করা ভালো।  
 

বীজ/চারা রোপণ :  রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইনের ধারে, চিংড়ির ঘেরে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, গোরস্থান, শ্মশান, ঈদগাহ বিভিন্ন ধরনের ‘কমিউনিটি’ প্লেসে তাল ফল সম্প্রসারণ সুবিধা এ দেশে বেশি। চারা তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও তা রোপণ কাজ অনেক ঝামেলা/ কষ্টকর ও ব্যয় বহুল। এজন্য বেশি পরিমাণে তাল সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সরাসরি জমিতে বীজ রোপণ করা  সহজতর। বিদ্যুৎ লাইনের অবস্থান বিবেচনায় এনে তাল বীজ/চারা রোপণ ব্যবস্থা নিতে হয়।  
 

দু’এক সারি তাল বীজ/চারা রোপণের জন্য ১০-১২ ফুট দূরত্ব দিলেই চলে। প্রতিটা গাছের দূরত্ব নির্ধারণ করে নিয়ে ২ী২ী২ ফুট মাপের গর্ত তৈরি করে সার মাটি দিয়ে পুনরায় তা ভরাট করে বীজ/চারা রোপণ করা উচিত হবে।  রোপণের আগে প্রতিটা গর্তে ১০-১৫ কেজি গোবর এবং ২৫০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি  সার মিলে মোট ৫০০ গ্রাম গর্তের মাটির সাথে ভালোভাবে মেশানো প্রয়োজন। গোবর সার প্রাপ্তি সুবিধা না থাকলে নিকটস্থ জমির উপরিভাগের (ঞড়ঢ় ংড়রষ) উর্বর মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করলেও রোপিত বীজ/চারা বাড়তে সহায়ক হবে।  
 

সার প্রয়োগ :  তাল গাছে সার প্রয়োগ করার প্রচলন এদেশে নেই। তবে রোপিত গাছে প্রথম বছর পচা গোবর-১০ কেজি, ইউরিয়া-৩০০ গ্রাম, টিএসপি-২৫০ গ্রাম এবং এমওপি-২০০ গ্রাম হারে সার প্রয়োগ করা হলে গাছ ভালোভাবে বাড়বে, ফলন বেশি দিবে। এ সারের অর্ধেক পরিমাণ বর্ষার আগে এবং বাকি অর্ধেক সার বর্ষা শেষে বছরে দুইবার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তাল গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতি বছর ১০% হারে সারের পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং  এ প্রবৃদ্ধি ৭-৮ বছর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে। এরপর প্রতিটা বয়স্ক গাছের জন্য পচা গোবর-২০ কেজি, ইউরিয়া-১ কেজি, টিএসপি-৯০০ গ্রাম এবং এমওপি-৮০০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করার প্রয়োজন হবে।
 

পরিচর্যা :  তাল বীজ/চারা রোপণের পর খুব একটা যত্ন নেয়া হয় না। তবে দু’এক মাসের ব্যবধানে গাছের গোড়া আগাছামুক্ত রাখার প্রয়োজন হয়। খরা মৌসুমে গাছের গোড়ায় ১.৫-২ ইঞ্চি দূর পর্যন্ত স্থানের মাটি আগলা করে দিয়ে কচুরি পানা/খড়কুটা অথবা স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য অনুরূপ দ্রবাদি দিয়ে ঢেকে মালচিং ব্যবস্থা নেয়া ভালো। পরবর্তীতে এ মালচিং দ্রবাদি পচে জৈব সার হিসেবে গাছের  উপকারে আসবে। তাতে  মাটিতে রস সংরক্ষিত থাকবে, আগাছা সহজেই দমন হবে। খরা মৌসুমে পানি সেচ এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা করতে হবে।
 

পোকামাকড়  ও রোগবালাই :  অন্য ফল গাছের তুলনায় তাল গাছে পোকামাকড়ের উপদ্রব কম। এছাড়া অতি লম্বা গাছের আগায় পাতা, ফুল ও ফলে ছত্রাক/কীটনাশক ব্যবহার করা ততটা সহজ নয়। তথাপি রোগবালাই  ও পোকামাকড়ের উপদ্রব দেখা দিলে তা সময়মতো দমন করা উচিত।
 

ফল সংগ্রহ : বীজ-চারা রোপণের ১০-১২ বছর পর থেকে গাছে ফুল ফল ধরা আরম্ভ করে। জানুয়ারি মাস হতে শুরু করে মার্চ মাস পর্যন্ত তাল গাছে ফুল ফুটে। তবে বারোমাসি জাতের তাল গাছে সারা বছরই কম-বেশি ফুল ফল ধরে। আগস্ট মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত  পাকা তালের ভরা মৌসুম। মে-জুন মাস কচি তাল পাওয়ার উপযোগী সময়। প্রতিটা গাছে ২০০-৩০০টা কাঁচা পাকা তাল ধরে। সুস্থ সবল গাছে ১০-১৫টা তালের কাঁদি/ছড়া থাকে। তাল পাকা শুরু হলে ৩-৫ সপ্তাহ পর্যন্ত ক্রমন্বয়ে  পাকা ফল পাওয়া যায়। ফল পাকলে মাটিতে ঝরে পড়ে। অনেকে পুষ্ট ফল পেড়ে ২-৫ দিন ঘরে রেখে পাকিয়ে নিয়ে বাজারজাত করে। কিছু চাষি  দড়ি বা লাইলনের  দড়ি দিয়ে জাল  তৈরি করে তা গাছের নিচের কা- ও পাতার ডগায় বেঁধে রাখে। পাকা ফল ঝরে এ জালে জমা হয়। তাতে পরে গাছে উঠে জমায়িত ফল সংগ্রহ করা হয়। এ ব্যবস্থায় তাল ফল পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত বা গলে যাওয়া রোধ হয়। এ ব্যবস্থায় ফল সংগ্রহ করা হলে  বাজার মূল্য বেশি পাওয়া যায়। একেকটা কচি তালের মূল্য প্রায় ২০ টাকা। তবে পাকা তাল ফলের আকার অনুযায়ী ৬০-১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সে হিসাবে একটা গাছ থেকে ৫-৭ হাজার টাকার কচি তাল অথবা ৮-১০ হাজার টাকার পাকা তাল থেকে আয় হয়। একেকটা পুরুষ/স্ত্রী তাল গাছ থেকে প্রতিদিন ১০-১৫ লিটার রস পাওয়া যায়। মার্চ মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত তালের রস সংগ্রহ করা যায়। মৌসুমে একেকটা তাল গাছ থেকে প্রায় ৭০০-১৫০০ লিটার রস সংগ্রহ করা যায়। প্রতি লিটার রসের বাজার মূল্য প্রায় ২০-৩০ টাকা। সে অনুযায়ী একটা পুরুষ গাছ থেকে ১০-১২ হাজার টাকার রস বিক্রি করা যায়। একটা তাল গাছের রস থেকে প্রায় ৫০-৭০ কেজি  গুড় পাওয়া যায়। সব দিক বিবেচনায় তাল গাছ মানব জীবনে অতি উপকারী বৃক্ষ। এ গাছের বহুল সম্প্রসারণ ও নিধন বন্ধ করে একে রক্ষা করা আমাদের সবারই একান্ত কর্তব্য।

 

এম এনামুল হক*

*মহাপরিচালক (অব.) এবং সদস্য, বিশেষজ্ঞ পুল (APA), কৃষি মন্ত্রণালয়, Email-enamul 1944@gmail.com, মোবাইল : ০১৯১৭০৫৫২০৫

বিস্তারিত
পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচনে সবজি

আমরা খাদ্য খাই মনের সাধ মেটানোর জন্য, দেহের পুষ্টির জন্য, যার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সবল রেখে কর্মক্ষম জীবন যাপন করা যায়। আমাদের খাদ্য তালিকায় সবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এ প্রবণতা উন্নত বিশ্বে স্বপোন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি। তাইতো সেসব দেশে মাথাপিছু প্রতিদিন সবজি গ্রহণের পরিমাণ দেশভেদে আমাদের মতো দেশের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেশি। মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশসহ শারীরিক সক্ষমতার বিচারে সেসব দেশের নাগরিকরা তাই আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। এ অবস্থার অবসানে আমাদের খাদ্য তালিকায় মানবদেহের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় দুটি খাদ্য উপাদান, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিনের পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য এগুলোর সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস বিভিন্ন প্রকারের সবজির অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প আমাদের নেই। আমাদের শর্করা নির্ভর খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন রঙের পাতা ও ফল মূল জাতীয় সবজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের খাদ্য জগতে বিভিন্ন প্রকারের সবজিই একমাত্র খাদ্য, শরীর গঠনে যার ইতিবাচক ছাড়া কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই। সেজন্যই তো সুস্থ সবল স্বাস্থ্য চান বেশি করে সবজি খান এ স্লোগান আমাদের খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব অনুধাবনে আমাদের অনুপ্রাণিত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
 

খাদ্য নিরাপত্তা
খাদ্য নিরাপত্তা হলো খাদ্যের কার্যকর চাহিদা মোতাবেক সুষম খাদ্য সরবরাহ; যখন জনসাধারণ সব সময় সুস্থ ও কর্মঠ জীবন যাপনের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা ও পছন্দসই খাদ্য সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে, সে অবস্থাকেই খাদ্য নিরাপত্তা বলা হবে। বর্তমানে আমরা দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেলেও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার সাথে পুষ্টি নিরাপত্তার কার্যকরভাবে সংযোগ ঘটাতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই সবজি ফসলের অধিক উৎপাদন ও গ্রহণ দানাজাতীয় ফসলের ওপর চাপ কমিয়ে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি কৃষকের জন্য মুনাফার সংস্থান করে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে সব ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

মাথাপিছু সবজির প্রাপ্যতা
বিবিএস ২০১৫ তথ্য অনুযায়ী, মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৭.৯৩ মিলিয়ন হেক্টর যার মধ্যে সবজি ফসলের দখলে মাত্র ২.৬৩% এর কিছু ওপরে। এ থেকেই অনুমান করা যায় কত অল্প পরিমাণ জমি থেকে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণুু বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সবজির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তবে উৎপাদনের অগ্রযাত্রা যথেষ্ট আশানুরূপ। আবাদি জমি বৃদ্ধির বিচারে পৃথিবীতে প্রথম এবং উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয় স্থান। সর্বশেষ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ০.৪০ মিলিয়ন হেক্টর জমি থেকে ১৫২.৬৪ লাখ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। যদিও সবজিভিত্তিক পুষ্টি গ্রহণের উপাত্ত ও পরিমাণে ভিন্নতা আছে বিভিন্ন রেফারেন্সে। যেমন- গড়ে দৈনিক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের গ্রহণ করা দরকার ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। আর আমরা গ্রহণ করছি ১০০ থেকে ১৬৬ গ্রাম। অনেকে আবার বলেন প্রতিদিন প্রতি জনের জন্য প্রায় ৬২ গ্রাম সবজি উৎপাদিত হয়েছে কিন্তু এ পরিমাণ কখনোই মাথাপিছু প্রাপ্যতা হিসাবে ধরা যাবে না কারণ বিভিন্ন মাধ্যমের মতে গড়ে যদি ০৪ ভাগের ০১ ভাগও সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায় তাহলেও তা ৫০ গ্রামে নেমে আসে। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু সেটা যে ঋঅঙ কর্তক অনুমোদিত মাথাপিছু প্রতিদিন ২২০ গ্রাম এর ০৩ ভাগের ০১ ভাগের বেশি না। সেক্ষেত্রে উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় তিন বা চার গুণ বেশি বাড়াতে হবে।

 

দেহের পুষ্টিতে সবজি
সবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য এবং সবজিভেদে কাঁচা বা রান্না অবস্থায় সুস্বাদু খাবারের ভা-ার।  আমাদের দৈনন্দিন খাবারে বিভিন্ন প্রকারের সবজির সমারোহ যেমন স্বাদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা আনে তেমনি বৈচিত্র্যময় সবজির উপস্থিতি নানারকম পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সব পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ বিভিন্ন রকমের সবজি তাই সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তালিকার অপরিহার্য অংশ। বেশ কিছু সবজি আছে যেগুলো খেলে আমাদের দেহের পুষ্টি বিশেষ করে ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা মেটায়। এর মধ্যে আছে- পালংশাক, কচুশাক, লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটা, বরবটি, শসা, কাঁচামরিচ, মুলাশাক, ঢেঁড়শ, লেটুস, মটরশুটি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, শিম, লাউশাক, গাজর, মিষ্টিকুমড়া ও কুমড়াশাক, কচু ও কচুশাক, বরবটি, কলমিশাক..। পরিকল্পিতভাবে আবাদ শিডিউল করলে সারা বছরই এসব শাকসবজি নিয়মিত ও পরিমিত খাওয়া যায়।

 

নিরাপদে সবজি উৎপাদান
বিগত বছরগুলোতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বিষয়ক আলোচনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে যা স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়াও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়টি অন্যান্য কৃষি উৎপাদনের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কেননা সবজি ফসল বিভিন্ন রোগ ও পোকায় সহজেই আক্রান্ত হয়। তাই উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক অতিমাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার করে এবং নিরাপদ সময়ের আগেই তা বাজারজাত করে। অনেক সবজিই কাঁচা খাওয়া হয় বা অল্প রান্নায় খাওয়া হয় বলে মানবদেহে বিষাক্ত খাবারের প্রভাব পড়ে এবং নানারকম রোগশোক ও অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে ফসল কাটা বা উত্তোলন করে বাজারজাত করা পর্যন্ত এমনকি ভোক্তার হাতে যাওয়ার পরও তা বিভিন্নভাবে অনিরাপদ হতে পারে। এ সম্পর্কিত সম্যক জ্ঞানের অভাবে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতা সবজি ফসলকে অনিরাপদ করে খাবারের অনুপযুক্ত অথবা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

 

দারিদ্র্যবিমোচনে সবজি
কৃষকদের অধিক মুনাফা নিশ্চিতকরণ সবজির মতো দ্রুতপচনশীল পণ্যে সমন্বিত ও উন্নত কৃষি বিপণন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যা আমাদের দেশে একেবারেই অনুপস্থিত বলে সবজি চাষিরা বছরের বিভিন্ন সময়ে তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম মূল্যও পায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তা চাষিদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং পরবর্তীতে অনুৎসাহিত হয়ে পড়ে। তাই সবজির মতো দ্রুতপচনশীল অথচ অতীব প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে ও কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনে উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় পার্যায়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। তা না হলে সবজির মতো সংবেদনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বিপণনের চরম অব্যবস্থা কৃষকের জন্য কি রকম বিপর্যয়কর হতে পারে।

 

বছরব্যাপী সবজি চাষ
আমাদের দেশে বিভিন্ন সূত্র মতে, প্রচলিত ও অপ্রচলিত চাষকৃত সবজির সংখ্যা প্রায় শতাধিক। এর মধ্যে ৩০-৩৫টিকে  প্রধান সবজি বলে ধরা যায়। প্রকারভেদে কিছু সবজি মৌসুমভিত্তিক এবং কিছু সারা বছরই চাষ করা যায়। মানুষের চাহিদার ব্যাপ্তিকে মৌসুমের বাইরে নিয়ে যেতে যে সবজি যে মৌসুমের নয় কিন্তু চাহিদা আছে সে ধরনের জাত ও চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। কৃষক তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অধিক মূল্য পেতে স্বাভাবিক মৌসুমের আগে বা পরে অনেক সবজিই চাষ করতে শুরু করেছে। কিন্তু অমৌসুমি হওয়ার কারণে অধিক মূল্য পাওয়া যায় বলে কৃষক অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলিয়েও এসব সবজির চাষ অব্যাহত রাখছে। ফলে বহু সবজি যেগুলো আগে মৌসুমি সবজি ছিল এখন তা সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে। সে অর্থে মৌসুমের দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় প্রতিটি মৌসুমেই অমৌসুমি সবজির প্রাপ্যতা বাড়ছে। আর এতে করে সারা বছরই বা বছরের অধিকাংশ সময় কম বেশি সব সবজি উৎপাদিত হচ্ছে এবং তা বাজারে পাওয়াও যাচ্ছে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। জাত ও প্রযুক্তি কৃষকের হাতের মুঠোয়। শুধু জাতীয় পর্যায় থেকে নীতিমালার মাধ্যমে সব কিছু সমম্বয় করে কার্যকর বাজার ব্যবস্থা চালু করে কৃষককে তার ন্যায্যমূল্য পেতে সহায়তার মাধ্যমে সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা রকম সবজির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। সবজিভেদে বাণিজ্যিক কৃষি বা পারিবারিক বাগানে ব্যবহার্য এমনই কিছু পদ্ধতি হলো- বাগানে চাষ করা যায়; ঘরের ছাদে বা চালে পতিত জায়গায় চাষ করা যায়; খোলা মাঠে চাষ করা যায়; পাহাড়ের ঢালে চাষ করা যায়।

 

সবজি চাষে বহুমুখিতা
পানিতে চাষ করা যায়; পানির ওপরে মাচায় চাষ করা যায়; সমতল ভূমিতেও মাচায় চাষ করা যায়; সমতল ভূমিতে বহুতল মাচায় চাষ করা যায়; জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; চর অঞ্চলে বালুময় জমিতে ঋবৎঃরমধঃরড়হ পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; লবণাক্ত ভূমিতে ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মাটিবিহীন বহুস্তর বিশিষ্ট স্থাপনা করে অতি অল্প জায়গায় অনেক প্রকার সবজি ফলানো যায়; লবণাক্ত বা বালির চর এলাকায় খাঁড়া পদ্ধতিতে বস্তা বা সস্তা কাঠ ও বাঁশের স্ট্র্রাকচার তৈরি করে মাটি ভর্তি করে সেখানেও চাষ করা যায়; সেঁতসেঁতে ছায়াযুক্ত এলাকায় যেখানে অন্য ফসল ফলানো যায় না সেখানেও বিশেষ বিশেষ কিছু সবজি চাষ করা যায়; এমনই আরও অনেক বৈচিত্র্যময় পরিবেশে বা অবস্থায় বিভিন্ন সবজির চাষ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ এবং তা গবেষণা করে প্রযুক্তি আকারে সারা দেশে কৃষক এমনকি ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যার জন্য যেখানে যে পদ্ধতি প্রযোজ্য তার প্রচার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা যায়। অনেকেই ইদানীং সবজি বাগান করেন এবং নিজ হাতে উৎপাদিত বিষমুক্ত তরজাতা নিরাপদ সবজি দিয়ে নির্ভেজাল পুষ্টির জোগান দিচ্ছেন স্ব স্ব পরিবারের খাদ্য তালিকায়। বাংলাদেশে শতাধিক রকমের সবজি শীতকাল, গ্রীষ্মকাল আবার কোনো কোনোটি সারা বছর চাষ করা হয়। বসতবাড়িতে সবজি চাষ করার সময় এমন সবজি নির্বাচন করতে হবে যা প্রয়োজনীয় পুষ্টির দিক থেকে উচ্চমানের, খেতেও সুস্বাদু এবং যেগুলোর বাড়তি সবজি বিক্রিও করা যায় বাজার চাহিদার সাথে মিল রেখে।

 

পুষ্টিজনিত সমস্যাবলি
বিভিন্ন প্রকার খাদ্যোপাদান শর্করা, আমিষ, তেল, খাদ্যপ্রাণ এবং খনিজ পদার্থের অভাবে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকমের অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা যায়। শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়; বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে; মহিলা এবং শিশু রক্তশূন্যতায় ভোগে; প্রয়োজনীয় ক্যালারির অভাবে ভুগছে; ভিটামিন এ’র অভাবজনিত রোগে ভুগছে; রাইবোক্লেভিনের অভাবে ভুগছে; গলা ফোলা রোদে আক্তান্ত হচ্ছে; শিশুরা অন্ধত্ব বরণ করছে। পুষ্টি ঘাটতিজনিত সমস্যাগুলোর শতকরা হার বা সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তা যে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনপদে এক বিরাট সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই বলেই মনে হয়।  আর সে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং কম ব্যয়বহুল উপায় খাদ্য তালিকায় নিয়মিত ও পরিমিত রকমারি সবজির ব্যবহার। সামগ্রিকভাবে বছরব্যাপী খাবার হিসেবে অন্যান্য খাবারের সাথে হরেক রকম সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করে অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 

সবজির প্রযুক্তি ও বীজ
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সবজি গবেষণার সূত্রপাত আশির দশকের শুরুতে। এরপর এর ক্রমবিকাশের ধারা অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলেছে। কৃষি গবেষণা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এ গোত্রের ফসলের জাত উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত। এক্ষেত্রে এ উদ্ভাবিত ৩০-৩৫টি প্রধান সবজির প্রায় ১০০টিরও বেশি  জাত ও কিছু উৎপাদন প্রযুক্তি জাতীয় পর্যায়ে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০টির মতো বিভিন্ন সবজির জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর বাইরে বীজ কোম্পানিগুলো অনেক সবজির ওপি এবং শংকর জাত আমদানি করে বাজারজাত করে আসছে বহু আগ থেকেই এখনও যা অব্যাহত আছে। সবজি গবেষণার জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ বছর আগে প্রথমবারের  মতো বেসরকারি খাতে বীজ কোম্পানি নিজস্ব গবেষণা (আরএন্ডডি) কার্যক্রম শুরু করে দেশের মাটিতে। সে থেকে এ পর্যন্ত আরও ৮-১০টি বেসরকারি কোম্পানি নিজস্ব গবেষণা পর্যায়ক্রমে শুরু করে। বর্তমানে তাদের উদ্ভাবিত অনেক সবজির জাত কৃষক পর্যায়ে সমাদৃত হয়েছে এবং সবজির ফলন বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক। উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি প্রয়াস খুবই ভালো। কিন্তু সেসব জাতের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বর্তমানে সবজি বীজের জাতীয় মোট চাহিদা বলা হয় ৪৫০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত বীজের পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ এবং আমাদানি করা হয় তাও প্রায় ১৫ শতাংশ। আমদানি করা বীজের একটা অংশ দ্বারা চাষি প্রায়শই প্রতারিত হয় এমন অভিযোগও শোনা যায়। এর বাইরে যে ৫৫ শতাংশ বা তারও কিছু বেশি বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে এর সবই কৃষকের নিজস্ব রাখা বীজ যা মানের বিচারে নি¤œমানের। তাই সবজি উৎপাদনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনের প্রধানতম উপাদান মানসম্পন্ন বীজের নিশ্চয়তায় সরকার ও নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ থাকতে হবে।

 

সবজি উৎপাদন ও ব্যবহার
বাংলাদেশের খাদ্য শস্যে উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও তার কার্যকর সম্প্রসারণে জাতীয় উদ্যোগ দানাদার শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। তবে পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও অবহেলিত। যার ফলে বিভিন্ন প্রকারের অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্তের হার এখনও যথেষ্ট উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে এবং শিশু ও মহিলারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার হচ্ছে। এ অবস্থার অবসানে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল সবজির উৎপাদন বাড়িয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আপামর জনগণের পুষ্টির নিরাপত্তা বিধানে আরও বেশি সচেষ্ট হওয়ার এখনই সময়। সরকারিভাবে জাতীয় সবজি মেলার প্রচলন এ সম্পর্কে সরকারের সদিচ্ছারই প্রতিফলন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এরপরও যেতে হবে আমাদের বহুদূর কাক্সিক্ষত পুষ্টি নিরাপত্তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে। সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলে লক্ষ্যে পৌঁছানে যাবে দ্রুতই। এ পরিপ্রেক্ষিতে সুপারিশমালা হলো-
উৎপাদিত সবজির ন্যূনতম বাজার মূল্য নির্ধারণ করে কৃষক পর্যায়ে তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; কৃষক পর্যায়ে সময়মতো সঠিক মূল্যে উন্নতমানের সবজি বীজের সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করা; কৃষক পর্যায়ে সবজির সংগ্রহ ও স্বল্পকালীন সংরক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থা করা; কৃষককে সংগঠিত করে সবজি চাষিদের সমবায় সমিতি গঠন করা যাতে করে তারা পণ্যের ন্যায্য বিক্রয় মূল্য পেতে দরকষাকষির অবস্থানে যেতে পারে; এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান শক্ত করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের সাহায্য করতে পারেন; সবজির রফতানিমুখী উৎপাদন এলাকা নির্বাচন করে প্রশিক্ষিত চাষি তৈরি করা এবং রফতানিকারকদের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করা; সবজির মতো দ্রুতপচনশীল পণ্যের পরিবহনে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা; ফসল তোলার পর নষ্ট হওয়া কমাতে চাষের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উত্তোলন এবং পরবর্তীতে কিভাবে সবজির যত্ন নিতে হয় এ ব্যাপারে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে; সর্বোপরি চলমান গবেষণা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার পদক্ষেপ নিতে হবে; সবজি ফসলের ক্ষেত্রে ধীরগতি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হবে গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের মাঝে অধিকতর সমম্বয় সাধন করে। রোগমুক্ত, সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন রঙের সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে সবাইকে। এ ব্যাপারে জাতীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যকর ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আমাদের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং বেশি করে সবজি অথবা সবজি জাত খাবার খেতে হবে। আর তা করতে পারলে যেমন অপুষ্টির হাত থেকে জাতি রক্ষা পাবে তেমনি ব্যয়বহুল দানা শস্যের ওপরে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারলে অন্যান্য ফসলসহ সবজি চাষের জন্য বেশি জমি পাওয়া যাবে। তখন বছরব্যাপী আবাদ বাড়িয়ে পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানসহ বিরাট সংখ্যক কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হবে।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

*পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

 

বিস্তারিত
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য শস্যবীমা

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ যার সার্বিক উন্নয়ন কৃষির ওপরই নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের দেশের আবহাওয়া অনবরত বদলে যাচ্ছে ফলে কৃষিক্ষেত্রে নানা রকম ফসলের সময়মতো উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের কৃষির গতি ও প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের কৃষি প্রতিনিয়ত প্রকৃতির বৈরী পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে এগিয়ে চলছে। অসময়ে খরা, বন্যার কারণে একদিকে কৃষক হারিয়ে ফেলছে অতি মূল্যবান ফসলসহ নানা জাতের বীজ অন্যদিকে মাটি হারাচ্ছে ফসল উৎপাদনশীলতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের কৃষি নির্ভরশীল ক্ষুদ্র খামারভিত্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলদেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন করতে হলে কৃষির এসব সমস্যা নিরূপণ করে, খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা আমাদের জন্য খুব জরুরি। এছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বৈরী আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন প্রয়োজন। কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে আমরা কিছুটা সফল হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার আধুনিক প্রযুক্তির মারাত্মক অভাব এখনও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যেমন- লবণাক্ততা, উচ্চ তাপমাত্রা, খরা কিংবা বন্যাসহিষ্ণু প্রযুক্তির অভাব লক্ষণীয় যা টেকসই কৃষি উৎপাদনের পূর্বশর্ত।
 

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা ও চলমান অগ্রগতিতে কৃষি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষি ব্যবস্থার ওপর নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি প্রতি বছরই খরায় আক্রান্ত হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দেয়ার ফলে নদীর কাছাকাছি এলাকায় জমিতে পলি পড়ে উঁচু হয়েছে কিন্তু বাঁধের ভেতরে বেসিনের মতো নিচু হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। এরকম জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিগত ৪০ বছরে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৭% বেড়েছে। নদীর নাব্য কমে গিয়ে লবণাক্ত পানি সমুদ্র থেকে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পরছে। ফলে দেশের স্বাভাবিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ এক মিলিয়ন হেক্টরেরও বেশি। বাংলাদেশে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ৮,৩০,০০০ হেক্টর আবাদি জমির ক্ষতি করেছে। প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি হাওর কিংবা বিল এলাকায় অবস্থিত এবং হাওরাঞ্চলের পানি সময়মতো বের করে চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। বিগত ৩৫ বছরের মধ্যে এবছরের এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হওয়ার ফলে অকাল বন্যায় কৃষকের শত শত কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে। অসময়ে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক বেঁচে থাকার অবলম্বন বোরো ধান ও সবজি তলিয়ে যাওয়ায় এখন তারা নিঃস্ব।   
 

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়াও কৃষকের ফসলের মাঠে নতুন নতুন রোগবালাইয়ের সংক্রমণে প্রতি বছর সহস্র কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীতে ফসলের ভয়াবহ রোগগুলোর মধ্যে গমের ব্লাস্ট রোগ অন্যতম, অনুকূল আবহাওয়ায় যা মহামারি আকারে দেখা দেয়। ১৯৮৫ সালে সর্বপ্রথম এ রোগটি ব্রাজিলে দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গত বছর অনাকাক্সিক্ষতভাবে এ রোগটি বাংলাদেশে প্রথম দেখা দেয় এবং দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের আটটি জেলার প্রায় ১৫,০০০ হেক্টর জমির গম নষ্ট করে। আক্রান্ত জমিতে ৪০-৫০ ভাগ, ক্ষেত্রবিশেষে শত ভাগ ফসল নষ্ট হয়। রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য গত বছর আক্রান্ত গমক্ষেতগুলো সরকারি নির্দেশনায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, এ বছর উল্লেখযোগ্য হারে গম উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে এবং বিগত বছরের তুলনায় ওই এলাকাগুলো গম চাষ প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। এ বছর যারা গম চাষ করেছেন তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থোড় আসার আগেই গমের গাছ কেটে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গত বছরের গমের চাষকৃত জমিগুলো এ বছর কৃষক তামাক, মসুর ও ভুট্টা চাষ করেছেন। অতি সম্প্রতি দেশের প্রায় সব অঞ্চলে ধানের জমিগুলোতে নেক ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাব কৃষিজীবী, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষি নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। নেক ব্লাস্টের ভয়ঙ্কর আক্রমণে ধানের দানা পুষ্ঠ হতে না পারায় শীষ সাদা ও চিটা হয়ে যাচ্ছে। তদুপরি, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসলের বাম্পার ফলনের আশায় প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থায়, কৃষক যদি কৃষি কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ফসল হারিয়ে লোকশান গুনে এবং রাষ্ট্র থেকে কাক্সিক্ষত সহযোগিতা না পায় তাহলে কৃষি কাজে একসময় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এরূপভাবে কৃষকের কৃষি কাজের প্রতি অনাগ্রহ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে যা আমাদের দেশর বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনপদের জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। তাই আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও কৃষককে সুরক্ষা প্রদানে শস্যবীমা প্রচলন এখন সময়ের দাবি।   
 

কৃষি ও শস্যবীমা হচ্ছে কৃষি পণ্য উৎপাদনকারী ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কৃষি বীমা সুরক্ষার আওতায় থাকে কৃষক, মৎস্য চাষি, গবাদি পশুপাখি পালনকারী ও কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ঠ অন্যান্য চাষি। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশে অনেক প্রকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগ খরা, বন্যা, শিলাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় ঘটে থাকে যা কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের মারাত্মক ক্ষতি করে। ফলে গোটা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। কৃষি ও শস্যবীমার মাধ্যমে কৃষি আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা এবং সব প্রকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে কৃষি ও কৃষককে নিরাপত্তা বা সুরক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে। কৃষি ও শস্যবীমা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিকে পুষিয়ে দিয়ে কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে অপরদিকে কৃষি পণ্যের দামের পতনশীলতা থেকেও কৃষককে রক্ষা করে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শস্যবীমা পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে যা কৃষি ও কৃষককে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
 

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা বিধানে দৃষ্টান্তস্বরূপ  সফলতা লাভ করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ সফলতার মূল ভিত্তি রচনা করেছেন এদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। তাই কৃষিবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট সবিনয় প্রস্তাব করছি আমাদের গ্রামীণ কৃষক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে কৃষি ও শস্যবীমা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ঠ বাজেটসহ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের  দিনবদলের অংশীদার হবেন। নতুবা  ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশাহারা কৃষক পরিবার কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি স্বনামধন্য বীমা কোম্পানি ও এনজিওগুলো কৃষক সুরক্ষায় শস্যবীমা কার্যক্রম চালুর মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। কেননা কৃষি ও শস্যবীমা কৃষিতে বিদ্যমান প্রাকৃতিক বৈরী প্রভাবের নির্ভশীলতার বেড়াজালে আটকে পড়া কৃষককে শুধু রক্ষাই করবে না বরং তার কৃষিকে লাভজনক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে, যা দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও বেশি মজবুত করবে বলেই আমার বিশ্বাস। 

 

মো. নূর-ই-আলম সিদ্দিকী* 
*সহকারী অধ্যাপক, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ, কৃষি অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৬; ০১৭২৩১২৯২২৪

 

বিস্তারিত
পেঁপে গাছের গুটি কলম

পেঁপে (Papaya) বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফল। সবজি হিসেবেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। সাধারণত পেঁপের বংশবিস্তার বীজের মাধ্যমে করা হয় কিন্তু বীজের মাধ্যমে মাতৃগাছের গুণাগুণ সমৃদ্ধ চারা পাওয়া যায় না। আবার হাইব্রিড চারা গাছের বীজ থেকেও গাছ করা যায় না। সম্পূর্ণ মাতৃগাছের গুণাগুণ সমৃদ্ধ চারা করার লক্ষ্যে পেঁপেতে গুটি কলম তৈরির জন্য চেষ্টা করে সফলতা অর্জন করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের হর্টিকালচার সেন্টার, হাটহাটজারীর উদ্যানতত্ত্ববিদ কৃষিবিদ  মো. আল মামুন শিকদার। সম্প্রতি এ বিষয়ে তাঁর কার্যালয়ে বিস্তারিত আলাপকালে তিনি জানান এরই মধ্যে মাতৃগাছ থেকে ২য় কলম সফলভাবে আলাদা করা হয়েছে। প্রচলিত গুটি কলমের মতো না করে একটু ভিন্নভাবে পেঁপেতে গুটি কলম করতে হয়। জনাব আল মামুন শিকদার পেঁপেতে গুটি কলম তৈরির যে ধাপগুলো অনুসরণ করেছেন তা হলো-


উপকরণ- ১. নারিকেলের ছোবড়া (রুটিং মিডিয়া); ২. প্লাস্টিক প্যাকেট; ৩. প্লাস্টিক সুতা; ৪. কাঠি/বাঁশের অংশ; ৫. পেঁপে গাছের শাখা।
 

গুটি কলম করার ধাপ
প্রথমে মাতৃগাছ নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগমুক্ত, সুমিষ্ট এবং উচ্চফলনশীল জাতের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

নির্বাচিত মাতৃগাছে অবশ্যই প্বার্শশাখা তৈরি করে নিতে হবে। গাছটির প্রধান শাখাকে কেটে দিলে অনেক পার্শ্বশাখা উৎপন্ন হবে।
 

নির্বাচিত পার্শ্বশাখার ঠিক মাঝামাঝি স্থান নির্ধারণ করা এবং নিচ থেকে ওপরের দিক বরাবর ৪৫ ডিগ্রি বাঁকা করে প্বার্শশাখার ১/৩ অংশ ধারালো চাকু দিয়ে কাটতে হবে। বাকি অংশ গাছের সাথে সংযুক্ত থাকবে।
 

চাকু দিয়ে কেটে ফেলা ১/৩ অংশকে কাঠি/বাঁশের টুকরো দিয়ে ফাঁকা করে রাখতে হবে যেন কাঁটা অংশ পুনরায় একসাথে লেগে না যায়।  
 

কাঁটা অংশটির চারদিকে খুব সাবধানে রুটিং মিডিয়াকে স্থাপন করতে হবে। রুটিং মিডিয়া হিসেবে নারিকেলের ছোবড়া ব্যবহার করতে হবে। রুটিং মিডিয়াটি ভালোভাবে বেঁধে

পলিথিনে মুড়িয়ে বেঁধে দিতে হবে।
 

রুটিং মিডিয়াটি যেন শুকিয়ে না যায় এজন্য মাঝে মাঝে পরিমাণমতো ছত্রাকনাশক মিশ্রিত পানি প্রয়োগ করতে হবে।
 

নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হলে ৩০ দিনের মধ্যে মিডিয়াতে শিকড়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে।
 

শিকড়ের রঙ গাঢ় খয়েরি হলে ধারালো ছুরি দিয়ে কাক্সিক্ষত প্বার্শশাখাটিকে শিকড়সহ কেটে ফেলতে হবে। নির্ধারিত (উঁচু ও রৌদ্রময়) জায়গায় গর্ত করে মাটি শোধনপূর্বক কলমটিকে রোপণ করতে হবে।
 

রোপণের সময় মনে রাখতে হবে যেন শাখাটিতে বেশি পাতা, ফুল বা ফল না থাকে। থাকলে সেগুলো সাবধানে কেটে ফেলতে হবে।
 

সদ্য রোপণকৃত গাছটিতে খুঁটি দেয়াসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে যাতে অতিরিক্ত বাতাস, ঝড় এবং বৃষ্টির পানি জমে চারার কোনো ক্ষতি না করতে পারে।
 

সময়মতো আগাছা পরিষ্কার, মালচিং, সার প্রদান ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
 

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পরবর্তীতে মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে ফুল আসা শুরু করে এবং কাঙ্খিত ফল সংগ্রহ করা যায়। গাছের আকারও বেশ খাটো হয়।  
 

কৃষিবিদ আবু কাউসার মো. সারোয়ার*

* আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার,  কৃষি তথ্য সার্ভিস, চট্টগ্রাম

 

বিস্তারিত
ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ একটি বিশ্লেষণ

বাংলায় মেলা সদা শতত পরিবর্তনশীল। মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনা নানা পার্বণকে ঘিরে প্রবর্তিত। কিন্তু ফল মেলা শহর গ্রামান্তরের কৃষিতে নতুন সংযোজন। কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় এটি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কৌশল সংযোজন। ফল মেলা একটি সম্প্রসারণ পদ্ধতি ও প্রযুক্তি। বিশেষ ধরনের স্বরূপ, থিম ও দ্রুত বহনযোগ্য বিশেষ বার্তা। ফল চাষের কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও খাদ্য অভ্যাসে ফল আহারের অনুপ্রেরণা তাগিদ। বিশেষ করে সব পেশার মানুষের অংশগ্রহণ এবং কৃষি নির্ভর মানুষের জৈব প্রযুক্তি সংযোগ তথা দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের বিশেষ আবহ তৈরি করে। মেলা বনে যায় চলমান কৃষি ব্যবসার প্রসার ও আয় তৈরির সোপান। বার্ষিক ফল মেলা ও ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ সফল। ফুরফুরে মেজাজে এ মেলা বার বার ফিরে আসুক কৃষকের শুভ বারতা নিয়ে।


জাতীয় ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ
গত কয়েক বছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সম্ভাবনায় কৃষি মেলা প্রবর্তন করা হয়।  এ সত্ত্বেও ফল বৃক্ষ রোপণের বাস্তবতা অনুধাবনে ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ পালন ও জাতীয় ফল মেলা সম্প্রসারণ পদ্ধতিকে আরও অধিকতর কার্যকর করে তুলছে। এ পক্ষ শুরু থেকেই একটি মূল সুর নিয়ে আত্ম প্রকাশ করে। ১৬-১৮ জুন ২০১৬ এর বৃক্ষ রোপণ পক্ষের প্রতিপাদ্য অর্থপুষ্টি-স্বাস্থ্য চান, ফলদ ফল বেশি খান। ২০১৫ ছিল দিন বদলের বাংলাদেশ, ফল বৃক্ষে ভরবো দেশ। এ মূল থিমগুলো বিশেষ বার্তা নিয়ে আসে যা অন্তত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। উপজেলা ইউনিয়ন গ্রাম হাটে তথা দেশ জুড়ে রঙিন পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট কলাকৌশল বিস্তারে ফল চাষিদের আনন্দে বিমোহীত করছে নতুন ফলচাষির সংখ্যা বৃদ্ধিতে দেখা দেয় নতুন অনুরণ।


পুষ্টি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় দেশজ ফলের অবদান সঠিক এ উপস্থাপনায় বলা হয় দেশে-৭০ প্রজাতির দেশীয় ফল বিদ্যামান। সৌভাগ্যে হলো দেশব্যাপী সবমিলিয়ে ১৩০টি ফলের চাষের তালিকা তৈরি করা হয়। দেশের চাষযোগ্য জমির ১-২% জমি ফল চাষের আওতায় রয়েছে। কিন্তু ফসলভিত্তিক মোট আয়ের শতকরা ১০% জোগায় দিয়ে থাকে ফল। ২০১০ সালে এফএওর এক তথ্য মতে, বাংলাদেশ ফল উৎপাদান সৌভাগ্যময় দেশের তালিকায় অধিভুক্ত। তথ্য মতে, দেশের ফলের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি ও হেক্টরপ্রতি উৎপাদনের নিরিখে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে যা ভারত এবং চীনের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে ১.৩৮ লাখ হেক্টের জমিতে মোট ৪৫.৮১ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়। ফলের মোট বার্ষিক চাহিদা ৭.১ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ মোট চাহিদার ৬৪% উৎপাদিত হচ্ছে বাকি ৩৬% আমদানি করতে হয়। আমদানিকৃত ফল সহজেই চোখে পড়ে আপেল, আঙুর, আনাড়, কমলা, মাল্টা এসব। পুষ্টি প্রাপ্যতায় হিসেব মতো দৈনিক চাহিদা রয়েছে ৫৬ গ্রাম। দৈনিক মাথাপিচু ৩০-৩৫ গ্রাম ফলের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। তাই বলা যায়, বাংলাদেশে পুষ্টির প্রাপ্যতার সূচক সঠিক পথে এগোতে পারছে না। ইফপ্রির বৈশ্বিক পুষ্টি প্রতিবেদন ২০১৪ এ শিশুদের খর্বতা, কৃশতা, অতি ওজন এবং নারীদের রক্ত স্বল্পতা হ্রাসের সূচকে  সাফল্য অর্জনে বিছিয়ে আছে। যদিও ২.৭ হারে খর্বতা কমেছে তবে ৩.৩% হারে খর্বতা হ্রাসের মাত্রা কমাতে হবে। সুতরাং পুষ্টির চাহিদা পূরণ একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন বাংলাদেশে মোট ফল উৎপাদনের ৫৪ ভাগ সরবরাহ হয় মধুমাস বলে খ্যাতি মে-আগস্ট এ চার মাসে। বাকি ২৪ ভাগ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এবং ২২ ভাগ সেপ্টেম্বের থেকে ডিসেম্বর মাসে। অর্থাৎ শীত ঋতুতে ফল কম উৎপন্ন হয়। তাই এ লিন পিরিয়ডে ফল উৎপাদনের অধিকতর সম্ভবনা সারা বছর ধরে ফল উৎপাদনের কৌশল রপ্ত করাসহ ফলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ করা দরকার।


পুষ্টির চাহিদা পূরণে দেশীয় ফল : বলা হয় ফলই বল। দেশীয় ফলের গুরুত্ব দেশে উৎপাদান সহয়ক শক্তি। শহরের ৭৩ লাখ বসতবাড়ির ছাদে ফল চাষসহ নগরীতে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান তথা ফল উৎপাদান মৌসুমে কৃষকের আর্থিক লাভও দারিদ্র্যবিমোচনের কথা বলেন। ফল উৎপাদনের ভরা মৌসুমে ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজকরণের প্রসার তথা ফল রপ্তানি প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা যায়। প্রবন্ধকার ড. রহমান ফলকে অনুপুষ্টির একমাত্র আধার বলে ব্যাখ্যা করেন। ফলের সামাজিক ও আর্থিক উপযোগিতার কথা বলেন। নার্সারিগুলোতে উন্নত মানের চারা উৎপাদন। কৃষি ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনের আহ্বান জানান।


জাতীয় ফল প্রদর্শনী : ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষর বিশেষ আকর্ষণ জাতীয় ফল প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনী ১৬-১৮ জুন পার্থক্য দেশীয় ফলের পরিচয়, শনাক্তকরণ এবং এর পুষ্টিমান সম্পর্কে সব বয়সের নর-নারীসহ শিশু কিশোরের ফলের জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করছে। বিশেষ করে ঢাকাবাসী প্রকৃতির খরতাপে তিক্ত সময়ে এ মেলা বেশ পরিদর্শনে আগ্রহ লক্ষ করা যায়। এ মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টল ফলসহ গবেষণালব্ধ প্রকাশ তথ্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে ফল বাজার সম্পসারণ করছে।


সম্ভাবনাময় বসতবাড়ি : বাংলাদেশের ১ কোটি ৫৫ লাখ বসতবাড়িতে প্রচলিত ও অপ্রচালিত ফল একযোগে ৫৩% ভাগ ফল জোগান দেয়। তবে বসতবাড়িতে ফল উৎপাদন এখনও পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না বসতবাড়ির স্থান স্বল্পতা দিকবিবেচনা করে একই মাসে বেল উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যে সঠিক তথ্য সম্পর্কিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পূর্বে গ্রামে ও শহরের বসতবাড়িতে দেশীয় ফলের গাছের সমাহার দেখা যেত। আজকাল তা আর দেখা যায় না। বসতবাড়িতে দেশীয় প্রজাতির ফল ক্রমান্বয়য়ে বিস্তার হতে যাচ্ছে। তাই বসতবাড়ির আঙিনায় ফল সবজি চাষে পুষ্টি জোগানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা যায়।
এ প্রসঙ্গে দেশীয় ফলের জিনপুল সংরক্ষেণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। অনেক উন্নত জাত বাজারে আসলেও দেশীয় ফলের জাতসহ স্থানীয় অনেক ফলের জাত বিলুপ্তি হচ্ছে। জাতগুলো সংরক্ষণ এবং এর উন্নয়নে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় মনোনিবেশ করে তাদের সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রাখা দরকার।


দারিদ্র্যবিমোচনে কৃষি বিজ্ঞানী : বিজ্ঞানীদের যাচাই বাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্নত জাতের ফল ও চারা বাজারজাতকরণে উৎফুল্ল হচ্ছে। অপরিচিত ফলের পরিচিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৮টি বিভিন্ন ফলের জাত অবমুক্ত করেছে। ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জার্মপ্লাজম সেন্টার বিজ্ঞানীদের গবেষণার সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট ৬৬টি জাত অবমুক্ত করেছে। বাজারে ফলের রঙের নানা বৈচিত্র্যতা লক্ষ করা যায়। শহর থেকে গ্রামের হাটে ক্ষুদ্র ফল ব্যবসায়ীরা স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিজ্ঞনীদের অবমুক্তকৃত ফল জাতীয় ঐক্য ও সাম্যতার বার্তা নিয়ে আসছে।


খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ন্যায় ফল উৎপাদনের দিকে লক্ষ্য সম্প্রসারিত করার দিকনির্দেশনা দেন। প্রান্তিক পতিত জমি পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিজ্ঞানীরা দেশ বিদেশের সাফল্য দেখে শিখে অনুপ্রাণিত হয়ে সব উদ্যোগে দীক্ষিত হয়ে করার অনুপ্রেরণায় কথা বলেন। যেমন- বীজবিহীন লটকন, ছোট বীজের আমড়া, খরাকৃতির নারিকেল জাত উৎপাদনের কথা বলেন। পাশাপাশি ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কৌশল বিস্তারের মাধ্যমে ফলের নানা সামগ্রী তৈরির প্রতি জোর দেয়। যেমন চিপস, জাম, জেলি, জুস তৈরির কথা বলেন। আগের তুলনা নতুন নতুন উদ্যোক্তারা ফল প্রক্রিয়াকরণের ব্যবসায় এগিয়ে আসছেন। কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুতসই যোগাযোগের মাধ্যমে ফল উৎপাদান ও বিপণনে যুগান্তকারী সুযোগ ও অগ্রগতি লাভ করবে।


কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নেক্সাস : এবারের ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষের একটি বিশেষ যোগসাজশ কৃষি ব্যবসার সংযোগ, সমন্বয় ও সম্প্রসারণের সমাহার। বলা হয়, বাণিজ্যের সোনা ক্ষেতের কোণা। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮২৫ টন আম রপ্তানি করা হয়েছে। এ বছর আম রপ্তানি লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার টন। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চাল আমদানিতে ট্যারিফ বসিয়ে চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করছেন। অন্যদিকে চাল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করছেন। অনুরূপ বাংলাদেশ থেকে ফল রপ্তানিতে সরকারের সুযোগ-সুবিধা অধিকতর সুযোগ প্রদানের উৎসাহ ব্যক্ত করেছেন। সম্ভাবনাময় ফল কলা আর কাঁঠালের চিপস, নানা ফলের প্যাকেটজাত জুস তৈরির সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সেতুবন্ধন তৈরির সুযোগ ও সহযোগিতা প্রদানের আশ^াস প্রদান করেন। মনিষিরা বলেন, জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি হলো গাছের মতো। কৃষি তার মূল, শিল্প তার শাখা এবং বাণিজ্য তার পাতা। আজকের এ আয়োজনে অতি উচ্চমাত্রার এ প্রবাদটি ফল ও কৃষি বাণিজ্যের শাসকের কথা বলে দেয়।


ফল উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নতুন আধুনিক জাত অবমুক্ত করা। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল তৈরি করে সে অনুযায়ী নিবিড় গবেষণা হলো ফল বিস্তার করা। উন্নত কৌলিতাত্ত্বিক সমৃদ্ধ ও মান সম্মত চারা কলম উৎপাদনের মাধ্যমে ফলজ বৃক্ষের চারা সহজলভ্য করে পতিত পাহাড়ি ও বসতবাড়ির জমিতে পরিকল্পিত চারা রোপণ করা। ফল উৎপাদনের বিশেষ জোন তৈরি করা। ফলের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া বিকাশের মাধ্যমে পোস্ট হারভেস্ট লস কমিয়ে আনা। ফল চাষে মাঝারি কৃষকের ক্ষুদ্রঋণ, মাঝারি কৃষকের মধ্যে উন্নত মানের চারা বিতরণ ও প্রণোদনা দেয়।


খাদ্য থালায় শুধু ভাত নয় এর সাথে থাকবে টাটকা দেশী ফল। বছরব্যাপী বারোমাসি ফল। ক্রমবর্ধমান মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দেশি ফলই আশার আলো। দেশ সবজি উৎপাদন পাঁচত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বাড়তি চাল, আলু রপ্তানি হচ্ছে। ফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের চেয়ে প্রাগসর। মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনেও সাফল্যের গাঁথা বিদ্যমান যা সামগ্রিক কৃষির উন্নতি সাধনের শুভসূচক। তাই বলা যায় ফল সংবেদনশীল মনে রসনা জোগায়। জাতীয় ঐক্য ও সম্যতার প্রতীক নানা জাতের ফল। তাই প্রকৃতি ও ফলের ভালোবাসায় খুঁজে ফিরুক অবহমান বাংলার ফল ধরা প্রকৃতি। জাতীয় ফলদ পণ্য ও ফল মেলা সার্থক বার বার ফিরে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধির বারতা নিয়ে।


ড. এস এম আতিকুল্লাহ*
*এগ্রিকালচার স্পেশালিস্ট, জাতীয় ভূমি জোনিং প্রকল্প, ০১৭১২৮৮৯৯২৭; mdatikullah@yahoo.com

বিস্তারিত
ভাসমান কৃষি : ঐতিহ্য আর বহুমুখী সম্ভাবনার হাতছানি

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। আমাদের রয়েছে ৪৫ লাখ হেক্টরের বেশি জলসীমা। গোপালগঞ্জ, বরিশাল, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ জেলাসহ আরও অনেক জেলা বর্ষা মৌসুমে বিরাট অংশ জলাবদ্ধ থাকে। সেখানে বছরে প্রায় ৬ মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এ সময়ে সেখানে কোনো কৃষি কাজ থাকে না, ফসল হয় না, মানুষ বেকার জীবন-যাপন করেন। ওই সব এলাকায় ওই সময়ে কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ আগাছায় ঢাকা থাকে। দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক নিজেদের প্রয়োজনে নিজেরাই উদ্ভাবন করলেন ভাসমান কৃষি কার্যক্রম। এসব জেলার জলমগ্ন এলাকাগুলো কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ আগাছায় আচ্ছন্ন রয়েছে বিশেষ করে বিভিন্ন বিল, হাওর, নালা, খাল ও মজা পুকুর। সেখানে এখন বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে স্তূপ করে প্রয়োজনীয় মাপের ভেলার মতো বেড তৈরি করে ভাসমান পদ্ধতিতে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মসলা উৎপাদন করছেন অনায়াসে। বন্যা ও জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন কৌশল হিসেবে ভাসমান সবজি ও মসলা উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ক্ষেত্র বিশেষে আপদকালীন আমন ধানের চারা উৎপাদন সম্প্রসারণে নতুন যুগের সূচনা করেছে এবং কৃষি সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। আস্তে আস্তে জলাবদ্ধ এলাকায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।
 

এ বছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এসব বন্যাকবলিত এলাকায় ভাসমান বেডে আমন ধানের বীজতলা করা হয়। এ যাবত অন্তত ৮০০টির বেশি ভাসমান বেডে আমন বীজতলা করা হয়েছে। ভাসমান বেডে ধানের বীজতলা করলে পানিতে ডুবে থাকা জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার পরপর কিংবা ডুবো জমি জেগে উঠার পর দেরি না করে ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সী আমনের চারা মূল জমিতে লাগানো যায়। এতে সময় নষ্ট হয় না, সময়ের সাথে সমন্বয় করে আমন আবাদ করা যায়। আমন ফলনেও তেমন ব্যাঘাত ঘটে না। বৃষ্টি আর বন্যার কারণে যেখানে আমনের বীজতলা করা যায় না সেখানেও বর্ষা বা বন্যার পানি টান দিলে সময় নষ্ট না করে ভাসমান বেডে উৎপাদিত আমন ধানের চারা দিয়ে যথাসময়ে এসব জমিতে আমন আবাদ করা যায়। এতে সময় সাশ্রয় হয়, বহুমুখী লাভ হয়। এ প্রযুক্তিটি এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে কৃষি আর কৃষকের বহুমুখী লাভ হচ্ছে।
 

ভাসমান বেড তৈরির প্রধান উপকরণ কচুরিপানা। এ ছাড়া টোপাপানা, শেওলা, বিভিন্ন ধরনের জলজ আগাছা, দুলালিলতা, ধানের খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ, আখের ছোবড়া, সডাস্ট ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করা যায়। পরিপক্ব গাঢ় সবুজ রঙের বড় ও লম্বা কচুরিপানা দিয়ে বেড তৈরি করলে বেডের স্থায়িত্ব বেশি হয়। যেখানে দুলালিলতা পাওয়া যায় না সেখানে দুলালিলতার পরিবর্তে পাটের তৈরি দড়ি দিয়ে বল মেডা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া চারা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। ভাসমান বীজতলার ক্ষেত্রে অন্য স্বাভাবিক বীজতলার মতোই বীজের হার প্রতি বর্গমিটারে ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম হবে। এ ক্ষেত্রে এক বিঘা জমি রোপণের জন্য ৩৫ বর্গমিটার বা প্রায় ১ শতক ভাসমান বীজতলার চারা ব্যবহার করা যায়। চারার বয়স ২০ থেকে ২৫ দিনের হলে চারা উঠিয়ে মাঠে রোপণ করা যেতে পারে। এতে ধানের চারা উৎপাদনের জন্য আর মূল জমি ব্যবহার করতে হয় না। জমি ব্যবহার সাশ্রয়ী হয়। জেগে ওঠা খালি জমিতে তাড়াতাড়ি কাক্সিক্ষত ফসল উৎপাদন করে বেশি লাভবান হওয়া যায়। এভাবে তৈরি চারা অন্যসব স্বাভাবিক চারার মতোই রোপণ করতে হবে এবং পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা অন্য স্বাভাবিক বীজতলার চারার মতোই হবে। উৎপাদিত চারা অন্য সব স্বাভাবিক চারার  মতোই ফলন দেয়। পানিতে ভাসমান থাকার জন্য এ বীজতলায় সাধারণত সেচের দরকার হয় না, তবে মাঝে মধ্যে প্রয়োজনে ছিটিয়ে পানি দেয়া যেতে পারে।


সাধারণত বর্ষায় বন্যাকবলিত এলাকায় বীজতলা করার মতো জায়গা থাকে না। তাছাড়া বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চারা তৈরির প্রয়োজনীয় সময় থাকে না। কচুরিপানা ও জলজ আগাছা দিয়ে তৈরিকৃত বেডে অনায়াসে আপদকালীন সময়ে আমনের অংকুরিত বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা যায়। তবে বীজ ছিটানোর আগে বেডের ওপর ২-৩ সেন্টিমিটার পরিমাণ পুকুরের তলার কিংবা মাটির পাতলা কাদার প্রলেপ দিয়ে ভেজা বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার পানিতে যেন ভাসমান বেড যেন ভেসে না যায় সেজন্য ভাসমান বীজতলার বেডকে দড়ির সাহায্যে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতে হবে। ছিটানোর পর সতর্ক থাকতে হবে যেন পাখি বা অন্য কিছু  বীজগুলো নষ্ট করতে না পারে।


ভাসমান বেডে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকে বলে সমতল ভূমির তুলনায় ঘন করে বীজ বপন বা চারা রোপণ করা যায়। আবার ভাসমান বেডে বেশি জৈব সারের কারণে জমিতে প্রচলিত চাষের তুলনায় ফসল দ্রুত বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৩-৫ গুণ বেশি ফলন পাওয়া যায়। বন্যার শেষে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এসব ভাসমান বেড যখন মাটির ওপর বসে যায় তখন তা ভেঙে জমিতে বিছিয়ে বা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সফলভাবে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা যায়। এছাড়া, মৌসুম শেষে পচা কচুরিপানা ফল গাছের গোড়ায় সার হিসেবে ব্যবহার করে ফলের উৎপাদন বাড়ানো যায়। ফল গাছের গোড়ায় পচা কচুরিপানা ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো যায়। আমাদের দেশে চাষযোগ্য জমিতে যে পরিমাণে জৈবসার ব্যবহার করা দরকার সেভাবে দেয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশের নিম্নাঞ্চলের জলাবদ্ধ এলাকার কচুরিপানা ব্যবহার করে সবজি ও মসলা উৎপাদন করলে নিরাপদ সবজি ও মসলা উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি জোগানের পাশাপাশি বর্ষাকালীন আমন ধানের চারা উৎপাদনসহ পচা কচুরিপানা জমিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করলে জমির উর্বরতা ও উৎপাদিকা শক্তি বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং জৈবকৃষি বা পরিবেশবান্ধব কৃষি বাস্তবায়নে মাত্রিক অবদান রাখবে। জমি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া যায়। পতিত জমি ব্যবহারে সুযোগ থাকে। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে কৃষক ভাইরা ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে বহুমাত্রিক কাজ করে কাক্সিক্ষত ফলন পেয়ে অধিকতর লাভবান হতে পারবেন। ভাসমান বেডে এ কার্যক্রমে সময় সাশ্রয় হবে, ফসলি জমি আগাম কাজে লাগানো যাবে, খরচও বাঁচবে, লাভ বেশি হবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদনে আরও বেশি সম্প্রসারিত হবে।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
* পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত
গবাদিপশুর সুষম খামার

যে খাবার ছয় প্রকার খাদ্য উপাদান পরিমিত পরিমাণে সরবরাহ করে তাকে সুষম খাবার বলা হয়। শ্বেতসার বা শর্করা, আমিষ বা  প্রোটিন, চর্বি বা তেল, খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি হলো আবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান।
 

সুষম খাদ্য-
০ শরীরে শক্তি ও কাজ করার ক্ষমতা দেয়;
০ শরীরের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে;
০ শরীরকে রোগমুক্ত রাখাতে সাহায্য করে।
গবাদিপশুর খাদ্য প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ১. ছোবড়া বা আঁশজাতীয় খাদ্য। ২. দানাদার খাদ্য।

 

ছোবড়া বা আঁশওয়ালা খাদ্য
এ প্রকার গোখাদ্যে আয়তনের তুলনায় পুষ্টি উপাদন তুলনামূলক কম থাকে। এটি প্রধানত শ্বেতসার বা শর্করা জাতীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে। এর পাচ্যতা কম তবে জাবর কাটা প্রাণীদের জীবনধারণ, বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য এ খাদ্যর পরিমিত সরবরাহ প্রয়োজন। ছোবড়াজাতীয় গোখাদ্যগুলো হলো লিগুম বা শিমজাতীয় কচি ঘাসের খড়, নাড়া, খড় বা বিচালি, গোচারণ ঘাস এবং রক্ষত ঘাস।

 

দানাদার খাদ্য
যেসব খাদ্যে আয়তনের তুলনায় খাদ্যমান অপেক্ষাকৃত বেশি এবং সহজপাচ্য তাকে দানাদার খাদ্য বলা হয়। দানাদার গোখাদ্যগুলো হলো চালের কুঁড়া গমের ভুসি, ভুট্টা, বিভিন্ন প্রকার খৈল, কলাই, ছোলা, খেসারি, সয়াবিন ও শুকনো মাছের গুঁড়া এসব। আমিষের পরিমাণ ভিত্তিতে দানাদার খাদ্যগুলো তিন ভাগে করা যায়। ক. কম আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- কুঁড়া, ভুসি (৫-১৫% আমিষ)। খ. মধ্যম আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- খৈল, কলাই, ছোলা ২০-২৫% আমিষ। গ. উচ্চ আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য শুকনো মাছের গুঁড়া, কসাই খানার মাংসের কণা, রক্তের গুঁড়া ৩৫-৪৫% আমিষ।

 

বাছুরের খাদ্য
বাছুর প্রসবের পরেই বাছুরকে তার মায়ের প্রথম দুধ অর্থাৎ কাচলা দুধ খাওয়াতে হবে। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণ রোগ প্রতিরোধক উপাদান রয়েছে। বাছুরের প্রধান খাদ্য দুধ কারণ জন্মের পর পর প্রথম সপ্তাহে বাছুর দুধ ছাড়া কিছুই খেতে পারে না। বাছুরের ওজনের প্রতি ১০ কেজির জন্য ১ কেজি দুধ প্রতিদিন খেতে দিতে হবে। গরুর বাচ্চা ৩০ কেজির ওপর ওজন হলেও ৩ কেজি দুধ সরবরাহ করতে হবে। দুই সপ্তাহ থেকে বাছুরকে সামান্য কিছু ঘাস ও দানাদার খাবার দেয়া যেতে পারে। বাছুরের বয়স ৭-৮ মাস হওয়ার পরে যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ জাতীয় দানাদার খাদ্য দিতে হবে। প্রথমত, ছোবড়াজাতীয় খাদ্য না দিয়ে সহজপাচ্য সবুজ ঘাস দিতে হবে। বাছুরের শারীরিক বৃদ্ধি প্রধানত পরিপাকযোগ্য আমিষ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বয়স বাড়ার সাথে খাদ্যের পরিমাণও বাড়বে।

 

দুধালো গাভীর খাদ্য
সাধারণত দুধালো গাভীর প্রতি ১০০ কেজির জন্য ২ কেজি খড় সরবরাহ করতে হয়। ১ কেজি খড় ৩ কেজি তাজা সবুজ ঘাসের সমতুল্য। গাভীকে প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১ কেজি শুকনো আঁশযুক্ত খাদ্য (খড়) এবং ৩ কেজি তাজা সবুজ আঁশযুক্ত খাদ্য ঘাস দেয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ৫০০ কেজি ওজনের একটি দুগ্ধবতী গাভীকে ৫ কেজি শুকনো খড় এবং ১৫ কেজি সবুজ ঘাস সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা দুধ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। দুধ উৎপাদনের প্রথম ৩ কেজির জন্য প্রয়োজন ৩  কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য এবং পরবর্তী প্রতি ৩ কেজির জন্য প্রয়োজন ১ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য। অবশ্য যদি দুধে স্নেহ পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৪ ভাগ বা তার নিচে থাকে। দুধে স্নেহ পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৪ ভাগের বেশি হলে প্রতি ৩ কেজি দুধের পরিবর্তে প্রতি আড়াই কেজি দুধের জন্য ১ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্যের প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে দেশি ও সংকর জাতের গাভীকে সর্বোচ্চ ৬ কেজি এবং বিশুদ্ধ বিদেশি গাভীকে সর্বোচ্চ ৮ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হয়।


লবণের চাহিদা পূরণের জন্য গাভীকে মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০ গ্রাম খাওয়ার লবণ এবং ৬০ গ্রাম জীবাণুমুক্ত হাড়ের গুঁড়া খাওয়াতে হবে। খাবারে সরবরাহকৃত সবুজ ঘাস গাভীর ‘এ’ ভিটামিনের চাহিদা মেটাতে পারে। ‘বি’ ভিটামিন গবাদিপশু স্বয়ং প্রক্রিয়ার প্রস্তুত করতে পারে। গাভীকে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। গবাদিপশুকে যেসব কাঁচা ঘাস খাওয়ানো হয় তার মধ্যে  নেপিয়ার ও পারা ঘাস অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও উপকারী ঘাসের উৎপাদন পদ্ধতি।


নেপিয়ার ঘাস
গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য ঘাস। পুষ্টিকর ঘাসে দেহ গঠনকারী আমিষ উপাদানসহ প্রায় সর্বপ্রকার উপাদন মজুদ থাকে। উন্নতজাতের অধিক ফলনশীল ঘাসের মধ্যে নেপিয়ার উল্লেখযোগ্য। খাদ্যমান বেশি থাকায় গবাদিপশুর জন্য এ ঘাস বেশ উপাদেয় ও পুষ্টিকর।


আমাদের দেশে বর্তমানে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য পতিত জমিও ক্রমে খাদ্যশস্য চাষের আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে গবাদিপশু আজ চরম খাদ্য সংকটের সম্মুখীন। এ সংকট সমাধানের জন্য সীমিত জমিতে অধিক গোখাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নতজাতের ঘাস চাষ করা আবশ্যক। উন্নতমানের ঘাস চাষ করা হলে গবাদিপশুর খাদ্য সমস্যা অনেক কমে যাবে। ফলে মানুষের খাদ্য উৎপাদনের লক্ষও বাধাগ্রস্ত হবে না। নেপিয়ার উন্নতজাতের ঘাস। এ ঘাসের চাষ পদ্ধতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে কৃষক অবগত হলে এ ঘাসের চাষে তারা উৎসাহিত হবেন।

 

নেপিয়ার ঘাস বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এটি গ্রামিণি পরিবারের অন্তর্গত। এ ঘাস একবার চাষ করার পর কয়েক বছর ধরে পাওয়া যায়। এর পাতা ও কাণ্ড দেখতে কিছুটা আখ গাছের মতো। কা- গোলাকৃতি ও সবুজ বর্ণের। এ ঘাস সব ধরনের মাটিতেই জন্মে। তবে বেলে দোআঁশ মাটিতে এর ফলন সবচেয়ে বেশি। এ ঘাসের জন্য উঁচু জমি ভালো। বন্যাকবলিত জমি এ ঘাস চাষের জন্য অনুপযুক্ত। বাংলাদেশের আবহাওয়া নেপিয়ার ঘাস চাষের জন্য খুবই উপযুক্ত।


চাষ পদ্ধতি : এ ঘাস চাষের জন্য জমিতে ৪-৫টি চাষ দিতে হয় এবং মই দিয়ে আগাছামুক্ত করার পর রোপণ করতে হয়। দুই চোখ বিশিষ্ট কাণ্ডাংশ অথবা মূলসহ কাণ্ড চারার জন্য ব্যবহৃত হয়। সারা বর্ষা মৌসুমেই এ ঘাস লাগানো যায়। তবে বর্ষার শুরুতেই রোপণের উৎকৃষ্ট সময়। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে রোপণ করা হলে প্রথম বছরেই ৩-৪ বার ঘাস কাটা যেতে পারে। ২ চোখসহ কাণ্ডাংশ অথবা মূলসহ কাণ্ড সারিবদ্ধভাবে লাগাতে হয়। এক লাইন থেকে অন্য লাইনের দূরত্ব ২-৩ ফুট হবে এবং এক চারা থেকে অন্য চারার দূরত্ব দেড় ফুট হবে। মাটিতে রস না থাকলে চারা লাগানোর পর পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত প্রতি একর জমি রোপণের জন্য ৭-৮ হাজার চারা বা কাটিংয়ের প্রয়োজন হয়।
 

সার প্রয়োগ ও পানি সেচ : ভালো ফলন ও গাছের বৃদ্ধির জন্য সার ও পানির প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমে পানি সেচের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু অন্য সময়ে সাধারণত পানির সেচের প্রয়োজন হয়।
 

জমি প্রস্তুতের সময় : ১.৫০-২.০০ টন গোবর প্রতি একরে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া রাসায়নিক সারের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার ব্যবহার করা হয়।
সাভার ডেইরি ফার্মের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, বছরে যথাক্রমে ১১২, ৮৯ ও ৪০ কেজি নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ প্রতি একরে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ঘাস দুইবার কাটার পর একরপ্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে দিলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। সার ছিটানোর আগে দুই সারির মাঝের জায়গায় লাঙল অথবা কোদাল দিয়ে আলগা করে দিতে হবে।

 

ঘাসের ব্যবহার ও ফলন : নেপিয়ার ঘাস কেটে খাওয়ানো সবচেয়ে ভালো। এতে অপচয় কম হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে ফলন বেড়ে যায়। ঘাস লাগানোর ৩ মাস পরে কাটার উপযোগী হয়। ৩ সপ্তাহ পর পর ঘাস কাটা যায়। প্রথম বছর ফলন কিছুটা কম হয় কিন্তু পরবর্তী ২-৩ বছর পর্যন্ত ফলন বেড়ে যায়। বছরে সাধারণত ৮-১০ বার ঘাস কাটা যায় এবং গড়ে প্রতি একরে বছরে ৩০-৪০  মেট্রিক টন কাঁচার ঘাস পাওয়া সম্ভব। কাণ্ড ঘাসের গোড়ার সাথে রেখে কাটা পরবর্তী ফলনের জন্য ভালো।


জমি থেকে কেটে এ ঘাস সরাসরি গবাদিপশুকে খাওয়ানো যায়। এ ছাড়া ২-৩ ইঞ্চি করে কেটে খড়ের সাথে মিশিয়েও খাওয়ানো যায়। নেপিয়ার ঘাসে শতকরা ৭ ভাগ প্রোটিন আছে। নেপিয়ার ঘাস শুকিয়ে সংরক্ষণ করা সুবিধাজনক নয়। তবে কাঁচা ঘাস সাইলেজ করে শুকনো মৌসুমে সংরক্ষণ করা যায়।
 

চারাপ্রাপ্তির স্থান
০ বাংলাদেশ সরকারের গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধখামারগুলো- গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধখামার, সাভার, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া;
০ সব জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র;
০ সব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
নেপিয়ার ঘাস চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রামের চাষিদের ভালোভাবে জানার সুযোগ দিতে হবে। এজন্য শুধু প্রচারণাই যথেষ্ট নয়। চাষিরা যাতে ঘাসের কাটিং বা চারা সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য প্রতিটি উপজেলাতে ঘাসের চারা বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে উৎসাহিত করা এবং নেপিয়ার ঘাস চাষের প্রচলন করা নিঃসন্দেহে লাভজনক হবে।

 

পারা ঘাস
পারা উন্নতমানের ঘাস এবং এর চাষ করাও সহজ। দেশের অধিকাংশ কৃষক উন্নত জাতের ঘাস সম্পর্কে অবগত নন। এ ঘাসের চাষ পদ্ধতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে তারা অবগত হলে আরও উৎসাহিত হবেন। পারা ঘাস দক্ষিণ আমেরিকার ঘাস কিন্তু বর্তমানে দেশের সর্বত্রই এর চাষ হয়ে থাকে। পারা একটি স্থায়ী জাতের অর্থাৎ একবার চাষ করলে কয়েক বছর ধরে ফসল পাওয়া যায়। জলীয় ও আর্দ্র অঞ্চলে এ ঘাস ভালো হয় তাই আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এটি খুবই উপযোগী। এ ঘাস দেখতে লতার মতো, কাণ্ড গোলাকৃতি ও সবুজ বর্ণের। সারা গায়ে প্রচুর সূক্ষ্ম লোম আছে।


উঁচু নিচু সব মাটি-জমিতেই জন্মে। এমনকি আবদ্ধ পানি ও লোনা মাটিতেও এ ঘাস জন্মানো সম্ভব। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের জন্য এ ঘাস চাষ খুবই সম্ভাবনাপূর্ণ। আম কাঁঠালের বাগানের ফাঁকে ফাঁকে, রাস্তার দুই পাশে সেঁতসেঁত জায়গায়, জলাবদ্ধ স্থানে, এমনকি সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লবণাক্ত জমিতে যেখানে সাধারণত অন্য ফসলের চাষ হয় না, সেসব জমিতেও পারা ঘাস স্বার্থকভাবে চাষ করা যায। অবশ্য শীতকালে অধিক ঠাণ্ডায় এ ঘাসের উৎপাদন কমে যায়।


ঘাস লাগানো : বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এ ঘাস লাগানো যায়। তবে গ্রীষ্মের আগে জমি চাষ দিয়ে প্রস্তুত করে রাখতে হবে। গ্রীষ্মে এক পশলা বৃষ্টি হলেই এ ঘাস লাগানো যায়। এ ঘাস লাইন করে ১.৫x১.৫ ফুট ব্যবধানে রোপণ করতে হয়। তবে এক লাইন হতে অন্য লাইনের দূরত্ব তেমন ধরা বাধা নিয়ম নেই। কারণ এ ঘাস অল্প সময়ে সব জমিতে বিস্তার লাভ করে। কাণ্ডাংশগুলো মাটির সাথে ৬০ ডিগ্রি কোণ করে লাগালে ভালো ফল পাওয়া যায়। ঘাসের কাণ্ড অথবা শিকড়যুক্ত ঘাসের গোড়া চারার জন্য ব্যবহৃত হয়। কাণ্ড ছেদনের সময় লক্ষ রাখতে হবে প্রতি খণ্ডে যেন ২-৩টি গিঁট থাকে।


পারা ঘাসের চাষের জন্য বিশেষ কোনো যত্ন নিলেও চলে। তবে ভালো ফসলের জন্য জমি প্রস্তুতের সময় প্রতি একরে ৪ টন গোবর অথবা কম্পোস্ট সার এবং ৩৫ কেজি টিএসপি প্রয়োগ করতে হবে। ঘাস লাগানোর ২-৩ সপ্তাহ পর একরপ্রতি ৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হয়। প্রতিবার ঘাস কাটার পর একরপ্রতি ৩৫ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভালো ফলন আসে।
 

সাভার ডেইরি ফার্মের রিপোর্ট অনুসারে একরপ্রতি বছরে ১১২ কেজি নাইট্রোজেন, ৮০ কেজি ফসফরাস এবং ৪০ কেজি পটাশ প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। ময়লাযুক্ত পানি এবং গোয়াল ঘর ধোয়া পানি ও আবর্জনা এ ঘাসের জমিতে প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের চাষিদের কাছে এ ঘাস চাষ নতুন বিষয়। তাই ঘাসের চাষ পদ্ধতি এবং গুণাগুণ সম্পর্কে চাষিদের ভালোভাবে জানার সুযোগ দিতে হবে। এজন্য ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন।

 

 যেসব স্থানে চারা বা কাটিং ও চাষ পদ্ধতির তথ্য পাওয়া যায়-
০ বাংলাদেশ সরকারের সব গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধখামারগুলো। গো-উন্নয়ন ও দুগ্ধখামার, সাভার ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও বগুড়া;
০ সব জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র; সব জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়; সব জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়; বন বিভাগ ও নার্সারিগুলো;
চারা কাটিংস পাওয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আগেই  যোগাযোগ করে নেয়া ভালো। আজকাল এ ঘাস বিক্রয় করেও লাভবান হওয়া যায়।


ঘাসের ব্যবহার ও ফলন : পারা ঘাস দ্রুতবর্ধনশীল ঘাস। যখন ২৪-৩২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয় তখনই এ ঘাস কাটার উপযুক্ত সময়। ঘাস লাগানোর ৩ মাস পরই কাটার উপযুক্ত হয় এবং এরপর প্রায় প্রতি মাসেই ঘাস কাটা যায়। বছরের প্রায় ৮-১০ বার ঘাস কাটা যায় এবং প্রতি একরে বছরে ২০-২৫ টন কাঁচার ঘাস পাওয়া সম্ভব। এ ঘাস কেটে খাওয়ানো যায়। এ ঘাসে শতকরা ১২ ভাগ আমিষ রয়েছে। এটি একটি সুস্বাদু ঘাস। গবাদিপশুর কাছে এ ঘাস খুবই পছন্দনীয়। সর্বশেষে বলা যায়, সংশ্লিষ্ট সবাইকে উৎসাহিত করা এবং এসব উন্নতমানের চাষের প্রচলন করা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে লাভজনক হবে।

 

রাকিবুল আলম মিরাজ*
*স্বপ্ননীড়, লন্ডনঘাট, চাঁদপুর

বিস্তারিত
ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ

ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ লাভজনক। একই জমি থেকে একই সাথে ধান, মাছ ও চিংড়ি পাওয়া যায়। জমির উর্বরতা বাড়ে। বাংলাদেশে ধানক্ষেতে চিংড়ি চাষের যথেষ্ট সুযোগ সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে চার থেকে ছয় মাস পানি থাকে ৫০-৬০ লাখ হেক্টর জমিতে। ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ করে উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। দুই পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ করা যায়।
 

ক. ধানের ক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ (যুগপৎ পদ্ধতি)
খ. ধানের পর মাছ ও চিংড়ি চাষ (পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি)

 

ক. ধানের ক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ
আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষ করা যায়। তবে গলদা চিংড়ির সাথে অন্যান্য মাছও চাষ করা যায়। বছরে এ চাষ দুইবার করা যায়। হাওড় অথবা নিচু জমিতে বোরো মৌসুমে ধানের সাথে গলদা চিংড়ি চাষের যথেষ্ট সুযোগ আছে। সেচ ব্যবস্থা থাকলে উঁচু জমিতেও ধানের সাথে চাষ করা যায়।

 

১. জমি নির্বাচন : যেসব জমিতে সারা বছর কিংবা কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ মাস পানি থাকে বা ধরে রাখা যায় সেসব জমিতে ধানের সাথে অথবা ধানের পরে গলদা চিংড়ি চাষের উপযোগী। যেসব জমির অংশ বিশেষ একটু বেশি নিচু অথবা জমির ভেতরে নালা কিংবা গর্ত আছে সেসব জমি গলদা চাষের জন্য বেশি উপযোগী। এঁটেল বা দো-আঁশ মাটির ধানক্ষেত সবচেয়ে ভালো। জমি বন্যামুক্ত হতে হবে। ধানক্ষেতের কাছাকাছি পানি সরবরাহ ও নির্গমন ব্যবস্থা থাকতে হবে।


২. জমির আইল তৈরি বা মেরামত : জমির আইল শক্ত, মজবুত ও উঁচু করতে হবে। আগে থেকে আইল বাঁধা থাকলে তা মেরামত করে নিতে হবে। জমিরতলা সমতল করতে হবে। সাধারণ বন্যায় যে পরিমাণ পানি হয় তার চেয়ে ৫০-৬০ সেন্টিমিটার উঁচু করে আইল তৈরি করা উচিত। মাছ ও গলদা চাষের জন্য পানির গভীরতা চাষ এলাকায় কমপক্ষে ১ মিটার হলে ভালো হয়। আইলের পাশে গোড়ার দিকে ৫০ সেন্টিমিটার এবং ওপরের দিকে ৩০ সেন্টিমিটার।


৩. গর্ত বা নালা বা খাল খনন : ধানক্ষেতে মাছ ও গলদা চাষের জন্য আইল বা বাঁধের চারপাশে ভেতরের দিকে খাল অথবা সুবিধাজনক স্থানে এক বা একাধিক ডোবা বা গর্ত নির্মাণ করতে হবে।
 

জমির ঢালুর দিকে গর্ত বা ডোবা খনন করা উত্তম। মোট জমির শতকরা ১৫ ভাগ এলাকায় ডোবা ও নালা করতে হয়। ডোবা বা নালার গভীরতা ৫০-৬০ সেন্টিমিটার হলে ভালো হয়। ডোবার সাথে নালার সংযোগ থাকতে হবে। আইল থেকে নালা ১২০ সেন্টিমিটার দূরে থাকবে। নালা প্রশস্থ এবং হেলানোভাবে/ঢালু করে কাটতে হবে। মাছ বেশিরভাগ সময় এসব নিচু এলাকায় থাকবে এবং রাতে খাদ্য গ্রহণকালে কম পানি এলাকায় চলে আসবে। এ সব নিচু এলাকায় বা খালে পর্যাপ্ত পরিমাণে আশ্রয় স্থান তৈরি করে দিতে হবে। বর্ষার সময় ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত পানি বের করার জন্য আইলের এক বা একাধিক স্থানে নির্গমন নালা রাখতে হবে। তলা থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার উঁচুতে এ নালা করলে ক্ষেতে প্রয়োজন পরিমাণ পানি থাকবে। নির্গমন নালায় ৫ ইঞ্চি প্লাস্টিকের পাইপ বসিয়ে পাইপের মুখে তারের জাল দিতে হবে যাতে মাছ ও চিংড়ি বের না হতে পারে।


৪. জমি তৈরি গলদার জন্য : ধানক্ষেতের উঁচু এলাকা ধানের জন্য এবং নিচু এলাকা গলদার জন্য উপযুক্তভাবে তৈরি করতে হবে। ধানের পরে গলদা চাষ করলে একইভাবে জমি তৈরি করতে হয়। প্রথমে জমির পানি নিকাশ করে শুকাতে হয়। প্রতি শতকে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে হালকা সেচ দেয়া যেতে পারে। প্রতি শতকে ৫ কেজি হারে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। ধাপে ধাপে পানি সরবরাহ করা। প্লাঙ্কটন উৎপাদনের জন্য নিয়মিত সার প্রয়োগ করতে হবে।


৫. জমি তৈরি ধানের জন্য : জমিতে প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি থকথকে কাদাময় করতে হবে। জমি মই দিয়ে সমতল করতে হবে। ময়লা আবর্জনা আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।


৬. সার প্রয়োগ : সারের পরিমাণ ধানের জাতের ওপর নির্ভরশীল। উফশী জাতে যে পরিমাণ সার দিতে হয় গলদা চাষের জন্য এর চেয়ে ১৫% বেশি সার দিলে ভালো হয়।
 

সারণি : প্রতি হেক্টরে সারের পরিমাণ (কেজি)

সারের নাম

অনুমোদিত মাত্রা

১৫% বাড়তি

মোট পরিমাণ

প্রয়োগ সময়

ইউরিয়া

২০০

৩০

২৩০

তিন কিস্তিতে

টিএসপি

১২০

১৮

১৩৮

শেষ চাষ

এমওপি

৮০

১২

৯২

শেষ চাষ

জিপসাম

৬০

৬৯

শেষ চাষ


 ইউরিয়া ছাড়া অন্য সব সার সম্পূর্ণ জমি তৈরির শেষ চাষের সময় মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয়। ইউরিয়া সমান তিনভাগ করে ধান রোপণের ১৫, ৩০ ও ৫৫ দিন পর ছিটিয়ে দিতে হবে। উপরিপ্রয়োগের সময় চিংড়িগুলো গর্ত ও নালায় নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।


৭. ধানের জাত নির্বাচন : বোরো মৌসুমের জন্যÑ বিআর-১, বিআর-২, বিআর-৩, বিআর-৭, বিআর-৮, বিআর-৯, বিআর-১২, বিআর-১৪, বিআর-১৮, ব্রিধান-৩৫, ব্রিধান-৪৭ ও ব্রিধান-৫৫। আমন মৌসুমের জন্যÑ বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-১০, বিআর-১১, বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রিধান৪০, ব্রিধান৪১, ব্রিধান৪৪ ও ব্রিধান৫৬।
 

৮. চারা রোপণ : কমপক্ষে এক মাস বয়সের চারা লাগানো দরকার। ধানের লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার এবং লাইনে গোছার দূরত্ব প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। এরূপ ২/৩টি করে চারামুক্ত গোছাগুলো রোপণ করা যেতে পারে; তবে আরও ভালো হয় জোড়ায় জোড়ায় সারিগুলো স্থাপন করলে। জোড়ার ভেতরে সারি দুটির দূরত্ব কমিয়ে বা ১৫ সেন্টিমিটার করে, এক জোড়া থেকে অপর জোড়ার দূরত্ব বাড়িয়ে ৩৫ সেন্টিমিটার করা যায়। এতে মাছ ও চিংড়ির চলাফেরা সুবিধা হবে এবং পানিতে প্রচুর সূর্যালোক পড়বে। এভাবে মাছ ও চিংড়ির খাদ্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে তার দৈহিক বৃদ্ধি দ্রুততর হবে।


৯. পানি সরবরাহ : নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় থেকে ছেঁকে পানি সরবরাহ করলে ভালো হয়। প্রথম অবস্থায় ৫-৬ সেন্টিমিটার পানি সরবরাহ করতে হয়। পরে ধান বৃদ্ধির অবস্থা অনুসারে পানি সরবরাহ করতে হয়। চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর ১০-১৫ সেন্টিমিটার পানি সরবরাহ করে মাছ ও চিংড়ির পোনা ছাড়তে হবে।


১০. পোনা মজুদ : মাছ ও চিংড়ির পোনা ধানক্ষেতে ছাড়ার জন্য যেসব বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে-
পোনা ছাড়া ও মজুদের হার : ধানক্ষেতে শুধু চিংড়ির চাষ করতে হেক্টরপ্রতি ১০-১৫ হাজার পোনা ছাড়া যেতে পারে। প্রতি শতকে ৫০-৬০টি পোনা ছাড়তে হয়। পোনা কমপক্ষে ৫ সেন্টিমিটার লম্বা হওয়া উচিত। মাছ চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতকে রাজপুটি, নাইলোটিকা ও মিররকাপ ১০-১৫টি পোনা ছাড়তে হয়।


পোনা ছাড়ার নিয়ম : ক্ষেতে ধান রোপণের ২০-২৫ দিন পর চিংড়ির পোনা ছাড়া হয়। জমিতে ধানের চারা লেগে গিয়ে বেশ কিছুটা বেড়েছে এমন পর্যায়ই পোনা ছাড়া উপযুক্ত। কারণ খালি বা খোলা জমিতে পোনা না ছাড়াই ভালো। জমিতে পোনা ছাড়ার সবচেয়ে ভালো সময় সকাল ও বিকাল বেলা। যে পাত্রে পোনা আনা হয় তা ক্ষেতের পানিতে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখার পর যখন ক্ষেতের ও পাত্রের পানির তাপমাত্রা সমান হয় তখন পাত্রটি কাত করে আস্তে আস্তে পোনা ছাড়তে হবে। তাহলে পোনাগুলো তাপে কোনো আকস্মিক পরিবর্তনের শিকার হবে না।


১১. পরিচর্যা : ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষে কোনো বাড়তি খাবার না দিয়েও মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন হতে পারে। মাছ ও চিংড়ি ধানক্ষেতের শ্যাওলা, পোকামাকড়, কীড়া ও পচনশীল দ্রব্যাদি খেয়ে থাকে। তবে কিছু খাবার প্রয়োগ করলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এর জন্য শুরুতে চালের কুঁড়া ও গোবর ১ঃ৩ অনুপাত মিশিয়ে বল আকারে হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি পরিমাণে প্রতি ৭ দিন পরপর গর্তে দিতে হবে। মাছ ও চিংড়ি ছাড়ার মাস খানেক পর থেকে, মোট মাছ ও চিংড়ির ওজন অনুমান করে ওজনের ৩-৫% হারে খৈল ও ভুসি বা কুঁড়া ১ঃ১ অনুপাতে মিশিয়ে একদিন পরপর গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে খৈল একরাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে গমের ভুসি বা চালের কুঁড়ার সাথে মিশিয়ে বল আকারে বিকালে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হবে।


১২. ধানের পরিচর্যা : ধানক্ষেতের বিভিন্ন পরিচর্যা, যেমন- আগাছা দমন, ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগ, পর্যায়ক্রমে জমি শুকানো ও ভিজানো কাজগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে করা যায়। সারের উপরিপ্রয়োগের সময় যেন পরিখা বা গর্তে পানি থাকে, কিন্তু জমিতে বেশি পানি না থাকে এটা খেয়াল রাখতে হবে।


ধানের পোকা ও রোগ দমনের জন্যে কীটনাশক প্রয়োগ না করে জৈবিক দমন, বালাইসহনশীল জাতের চাষ, আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও যান্ত্রিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। পোকা দ্বারা আক্রান্ত হলে হাতজাল, আলোর ফাঁদ, সেক্স ফেরোমেন ফাঁদ, কঞ্চি পুঁতে পাখি বসতে দেয়া, ডিমের গাদা নষ্ট করা যান্ত্রিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে যায়।


১৩. মাছ ও চিংড়ি ধরা : ধান পাকা শুরু হলে ক্ষেতের পানি ধীরে ধীরে কমাতে হবে। এতে মাছ ও চিংড়িগুলো পরিখা বা গর্তে গিয়ে আশ্রয় নেবে। তখন প্রথমে ধান কেটে পরে চিংড়ি ধরতে হবে। কোনো কারণে ধান পাকার আগেই পানি শুকাতে শুরু করলে, ধান কাটার আগেও মাছ ও চিংড়ি ধরা যায়। আবার সুযোগ থাকলে এবং মাছ ও চিংড়ি বিক্রির আকারে না পৌঁছলে অর্থাৎ প্রতিটি যথাক্রমে ১০০ ও ৩৫ গ্রাম ওজনের না হলে ধান কাটার পরও মাছ ও চিংড়ি ক্ষেতে রেখে বড় করে নেয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আবার পানি দিতে হবে।


১৪. মাছ ও চিংড়ির ফলন : বোরো ধান ক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ করলে, বাড়তি খাবার ছাড়াই এর উৎপাদন হেক্টরপ্রতি প্রায় ২৮০ কেজি চিংড়ি হয়। খাবার দিলে উৎপাদন প্রায় ৪০০ কেজি পর্যন্ত হয়। আমন ধান ক্ষেতে বাড়তি খাবার ছাড়া চিংড়ি হেক্টরপ্রতি ১০০-১৫০ কেজি হয়। খাবার দিলে উৎপাদন ২০০-৩০০ কেজি হতে পারে। মাছ হেক্টরপ্রতি ২৫০-৩০০ কেজি হয়।
 

খ. ধানের পর মাছ ও গলদা চিংড়ি চাষ : জমি থেকে বোরো  আমন ধান কাটার পর জমিতে পানি থাকলে অথবা পানি সরবরাহ করে মাছ ও চিংড়ি চাষ করা যায়। যেসব জমি ধান কাটার পর ১-২ মাস পতিত থাকার সম্ভাবনা থাকে সেসব জমিতে মাছ ও চিংড়ি চাষ করা যায়। ধানের পর মাছ ও চিংড়ি চাষের পদ্ধতি কিছু কিছু অংশ ধানের সাথে মাছ ও চিংড়ি চাষের মতো। সম্পূর্ণ কাজ কর্মগুলোকে তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত করা যায়। এগুলো হচ্ছে-
 

* গর্ত ও নালা তৈরি : মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনকালে এসব জমিতে প্রচুর পানি থাকে, আবার মাছ ও চিংড়ির সাথে ধান থাকে না সেজন্য এ জমিতে পরিখা বা গর্ত খননের প্রয়োজন নেই তবে মাছ ও চিংড়ি ধরার সুবিধার জন্য জমির নিচু স্থানে গর্ত খুঁড়ে রাখলে ভালো হয়।
 

০ সার প্রয়োগ : ধানের জন্য অনুমোদিত সার ধান চাষেই ব্যবহার করতে হবে। মাছ ও চিংড়ি চাষের জন্য অতিরিক্ত ১৫% হারে সার চিংড়ি চাষে প্রয়োগ করতে হবে।
সাবধানতা

 

১. ধানক্ষেতের পানি যেন শুকিয়ে না যায়, কিংবা এত কমে না যায় যে পানি বেশ গরম হয়ে উঠে। উভয় অবস্থায়ই চিংড়ি মারা যেতে পারে। ২. অতি বৃষ্টি অথবা অন্য কোনো কারণে যেন পানি জমে আইল উপচে না যায়। পানি উপচে পড়লে পানির সাথে চিংড়ি বের হয়ে যাবে। ৩. পানি নির্গমন পথে যেন তারের জাল বা বাঁশের বানা দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে। অন্যথায় মাছ ও চিংড়ি পানির সাথে চলে যেতে পারে। ৪. ক্ষেতের পানি কমে গেলে সাপ, বড় ব্যাঙ, ইঁদুর ও শিয়াল ইত্যাদি প্রাণী মাছ ও চিংড়ি খেয়ে ফেলার আশংকা থাকে।

 

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ*

*কৃষি প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল; ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

বিস্তারিত
কবিতা (ভাদ্র ১৪২৪)

খামারবাড়ি
কৃষিবিদ ড. সৈয়দ মো. জয়নুল আবেদীন*

জেগেছে খামারবাড়ি সুস্নিগ্ধ অঘ্রাণে,
চারিদিকে কলরব বিজয়-বিজয়।
গিরস্থের ক্লান্তি নেই মস্ত আয়োজনে,
কেটে গেছে সব বাধা রক্ত-হিম ভয়।
কঠিন সময় ছিল এইতো সেদিন,
দানবেরা কেড়ে নিত খামারের ধান।
চাষিদের শত ছেলে হয়েছে বিলীন,
শত বধূ প্রাণ দিয়ে রেখে গেছে  মান।
আজিকে খামারবাড়ি মুখর আবার,
লক্ষ নাম, রক্ত-ঘাম আজ ইতিহাস।
উঠানে উছলে উঠে ধানের পাহাড়,
দূর হতে ভেসে আসে প্রজাপতি হাঁস।
চাষির মাসুম ছেলে মায়ের কবরে,
পুষ্প হাতে নির্ভয়ে কাঁদে প্রাণ ভরে।

 

গাছ লাগান
অ্যাডভোকেট আলেয়া রাহাত**

উপায় নাই, উপায় নাই, উপায় নাইরে,
বনায়ন ছাড়া বাঁচার কোন উপায় নাইরে।
ফল হোক, ফুল হোক, কাঠ হোক, হোকরে ঔষধি
কার্বন-ডাই-অক্সাইড করবে শোষণ, অক্সিজেন দিবে নিরবধি।
ছায়া দিবে বাতাস দিবে আরও দিবে অর্থ,
গাছ লাগালে জীবন কারও হবে না তো ব্যর্থ।
গাছ বিনা জীব জগৎ ঠিকবে না একদিন,
অতীত সভ্যতা থেকে এ কথাটি এবার জেনে নিন।
সিন্ধু সভ্যতা, অক্কাদ সভ্যতা, তিয়ানচু সভ্যতা,
আর মায়া সভ্যতা ধ্বংসের কারণ এ মূর্খতা।
গাছ যে পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার শ্রেষ্ঠ উপাদান,
এ কথাটি জানত না সেসব সভ্যতার জনগণ।
সভ্যতা বিকাশের প্রয়োজনে ধ্বংস করত বনাঞ্চল,
প্রকৃতিও প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে ধ্বংস করেছে সভ্যতা সকল।
গাছ আল্লাহ পাকের জিকির করে সদা সর্বদা,
মোদের নবী প্রেমের ছবি তিনিও বলতেন গাছ লাগানোর কথা।
এ সকল কথা জানার পরে হতে হবে সচেতন,
সপরিবারে বৃক্ষ রোপণে করুন অংশগ্রহণ।
যেথা যায় না লাঙলের ফলা সেথা হোক গাছের তলা,
প্রকৃতি কখন রুষ্ট হবে যায় না তো কিছু বলা।
বাঁচাতে হবে পরিবেশ, তাহলে বাঁচবে দেশ।
সকল দেশের সেরা হবে আমার বাংলাদেশ।

 

আমরা চাষি
আবদুল হালীম খাঁ***

আমরা চাষি বারো মাসই মাঠে করি কাজ,
কাজের মাঝে আনন্দ পাই পাই না কভু লাজ।
কঠিন মাটি চাষ করি চাষ মোদের খেলা,
সকাল দুপুর সন্ধ্যা সাঁঝ মাঠেই কাটে বেলা।
দেশকে আমরা ভালোবাসি দেশকে ভালোবাসি,
ধুলো কাদায় ফলাই আমরা সোনা রাশি রাশি।
মাঠে মাঠে ফলাই ধান আরও ফলাই পাট,
সরিষা কলাই তিসি তিলে ভরি দেশের হাট।
মোদের কাজের ফলে দেশ সচল হয়ে আছে,
গাছগাছালি ফুল ও ফল পুকুর ভরা মাছে।
আমরা চাষি আছি বলেই ঘুরছে গাড়ির চাকা,
চলছে অফিস উড়ছে জাহাজ হচ্ছে ছবি আঁকা।
শীত কুয়াশা বৃষ্টি বান করি না কভু ভয়,
কাজের মাঝে জীবন কাটে জীবন কর্মময়।
দূর আকাশে উড়ছে কেউ গ্রহের কাছাকাছি,
আমরা চাষি বারো মাসই মাটি ধরেই আছি।
মুক্ত মাঠের মিষ্টি হাওয়ায় সুখ যে পাই কী যে,
তাই তো আমরা গান গাই বৃষ্টি জলে ভিজে।
আমরা চাষি বিশ্ববাসীর ক্ষুধা করি দূর,
সবার মুখে হাসি ফোটাই দিই যে গানে সুর।

 

 *৪৭৩/ই পশ্চিম শেওড়াপাড়া, ঢাকা, ০১৭৯৬৫৪৪০৬৫; **অ্যাডভোকেট জজকোর্ট, খুলনা, মোবাইল : ০১৭১৬১৬৪৭১৮;
*** গ্রাম+পো :+উপজেলা : ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল-১৯৬০, মোবাইল : ০১৯৩৩৬৮৫৯।

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (ভাদ্র ১৪২৪)

 

মনোরঞ্জন শীল, গ্রাম : লেহেম্বা, উপজেলা : রানীশংকৈল, জেলা : ঠাকুরগাঁও
প্রশ্ন : ধানের পাতার সবুজ অংশ পোকা খেয়ে ফেলছে এবং পাতা সাদা হয়ে খড়ের রঙ ধারণ করছে। এর প্রতিকারের উপায় কি?

উত্তর : ধান ক্ষেতে পামরি পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এ পোকার কীড়া এবং পূর্ণবয়স্ক পোকা দুটোই ধান গাছে আক্রমণ করতে পারে। পূর্ণবয়স্ক পোকা  পাতার ওপর সমান্তরাল দাগ করে সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে আর কীড়া পাতার দুটো স্তরের ভেতরে সুড়ঙ্গ করে খায়। এ পোকা এক এলাকা থেকে উড়ে গিয়ে অন্য এলাকার ধানে ক্ষতি করতে পারে। এর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য প্রতিরোধী জাত যেমন- বিআর১৪ (বোরো), বিআর২৫, ব্রিধান২৭ (আমন) এর চাষ করতে হবে। জমির আইল বা পার্শ্ববর্তী  জায়গা আগাছামুক্ত রাখতে হবে। পোকার আক্রমণ হলে হাত জালের সাহায্যে পূর্ণবয়স্ক পোকা  ধরে মেরে ফেলতে হবে। আক্রান্ত পাতার গোড়া থেকে তিন সেন্টিমিটার ওপরে পাতা কেটে নষ্ট করে ফেলতে হবে। তবে কাইচ থোড় আসার পর পাতা কাটলে ফলন কম হয়। আক্রমণ বেশি হলে যদি শতকরা ৩৫ ভাগ পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা প্রতি গোছা ধান গাছে ৪টি পূর্ণবয়স্ক পোকা থাকে তাহলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্লাসিক/পাইরিফস/লিথাল ২ মিলি প্রতিলিটার হারে বা কারটাপ/ফরওয়াটাপ ১.৬ গ্রাম প্রতিলিটার হারে পানিতে মিশিয়ে বিকালে স্প্রে করতে হবে।

 

মো. রনি, গ্রাম বেলেডাঙ্গী, উপজেলা : ফরিদপুর সদর, জেলা : ফরিদপুর
প্রশ্ন : পটোলের ফলগুলো হলুদ হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলের ভেতরে পোকা দেখা যায়। প্রতিকারের উপায় কি?

উত্তর : পটোল গাছে ফলের মাছি পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। নানা রকমের পোকা পটোলের গাছ ও ফলে আক্রমণ করতে পারে। এর মধ্যে ফলের মাছি পোকা অন্যতম। এ পোকা কচি ফলের ভেতর ছিদ্র করে এবং সেখানে  ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়া বের হয়। এ কীড়া ফলের নরম অংশ খেতে থাকে। পরবর্তীতে পূর্ণবয়স্ক পোকা বের হয়ে আসে।  ফলের নরম অংশ খেয়ে ফেলার কারণে ফলের আকার আকৃতি নষ্ট হয়ে যায়, ফল হলুদ হয়ে যায়, পচে গিয়ে ঝরে পড়ে।  এ পোকার আক্রমণ যাতে না হয় সেজন্য ক্ষেত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জমিতে খুব ভালোভাবে চাষ দিয়ে  পোকার পুত্তলি পাখিদের খাবার সুযোগ করে দিতে হবে। আক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে। প্রতি ১০ শতাংশের জন্য ৩টি হারে ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করে ভালো ফল পাওয়া যায়।  কুমড়া জাতীয় ফল ১০০ গ্রাম কুচি কুচি করে কেটে তাতে সামান্য বিষ    (যেমন- সপসিন ০.২৫ গ্রাম) মিশিয়ে তা দিয়ে বিষটোপ তৈরি করে মাটির পাত্রে করে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করা যেতে পারে।  আক্রমণের পরিমাণ খুব বেশি হলে সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক ১ মিলি প্রতি লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


মো. নূর-এ-আলম, গ্রাম : গোবিন্দপুর, উপজেলা : সাতক্ষীরা সদর, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : পুঁইশাকের পাতায় লালচে রঙের ছোট ছোট দাগ দেখা যায় এবং পাতা ছিদ্র হয়ে যায়। কি করব?

উত্তর : পুঁইশাকের পাতায় দাগ রোগ একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ হলে আক্রান্ত পাতায় হলদে থেকে বাদামি রঙের ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। ক্রমে একাধিক দাগ একত্রিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি হয় এবং ছড়িয়ে যায়। এ রোগ যাতে না হয় সেজন্য আগে থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে এবং বপনের আগে বীজ শোধন করে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতি কেজি বীজের জন্য ২.৫ গ্রাম ভিটাভেক্স বা ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন বা ৩-৪ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা ভিরিডি ব্যবহার করা যায়। রোগের আক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত পাতা ও ডগা সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ছত্রাক নাশক যেমন- ব্যাভিস্টিন/নোইন ১ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে শেষ বিকালে স্প্রে করা যেতে পারে। ১০-১২ দিন পরপর ২ বার স্প্রে করতে হবে। ফসল সংগ্রহ করার পর পরিত্যক্ত অংশ ধ্বংস করে ফেলতে হবে।


সাদেকুল ইসলাম, গ্রাম : খাজুরা, উপজেলা : নলডাঙ্গা, জেলা : নাটোর
প্রশ্ন : রেণু পোনার পুকুরে হাঁসপোকা হয়েছে। কিভাবে সমাধান করা যায়?

উত্তর : রেনু পোনার পুকুরে হাঁসপোকা অনেক বড় সমস্যা সৃষ্টি করে তাই পোনা ছাড়ার আগেই ১ বিঘা জমির পুকুরের জন্য ৫০ মিলি সুমিথিয়ন বা ডিপটারেক্স ১ কেজি পানিতে মিশ্রিত করে সব পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। সুমিথিয়ন বা ডিপটারেক্স এভাবে দেয়ার ৭২ ঘণ্টা পর রেনু ছাড়তে হবে অথবা পরিমাণমতো ডিজেল রেণু ছাড়ার আগে পুকুরে প্রয়োগ করলে হাঁসপোকা দমন করা যায়। রেণু পোনা থাকা অবস্থায় অনেক সময় হাঁসপোকা দেখা যায়। এক্ষেত্রে শতক প্রতি ২ মিলি হারে সুমিথিয়ন ১০ দিন পর পর মোট ৩ বার ব্যবহার করতে হবে।

 

মো. মাসুম বিল্লাহ, গ্রাম : কনেশপুর, উপজেলা : যশোর সদর, জেলা : যশোর
প্রশ্ন : মাছের সুষম খাবার তৈরি ও প্রয়োগের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই।

উত্তর : পুকুরের মাছের ওজনের ৩%-৫% হারে ভালো কোম্পানির ফিড (মেগা, কোয়ালিটি, সৌদি, আফতাব ইত্যাদি ফিড) অথবা খৈল, চালের কুঁড়া, গমের ভুসি মিশিয়ে ছোট ছোট মণ্ড তৈরি করে প্রতিদিন পুকুরে প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে ১০০ কেজি মাছের জন্য ৩ কেজি খাবার (১.৫ কেজি একদিন আগে ভিজিয়ে রাখা খৈল ও ১.৫ কেজি গমের ভুসি বা চালের কুঁড়া) প্রয়োজন হবে। খাবারগুলো মাটির পাত্রে অথবা প্লাস্টিকের চটের ওপর রাখলে ভালো হয় কারণ মাছ খাবার খেল কিনা তা সঠিকভাবে জানতে পারা যাবে। যদি ২ দিন পরও খাবার দেখা যায় তাহলে মাছের খাবার কমিয়ে দিতে হবে।  এক কেজি আদর্শ মাছের খাবার তৈরিতে গমের ভুসি ৩০০ গ্রাম, চালের কুড়া ২০০ গ্রাম, ফিশমিল ২০০ গ্রাম, আটা ১০০ গ্রাম, আগে ভিজানো খৈল ২০০ গ্রাম সাথে ভিটামিন প্রিমিক্স ১ চা চামচ, লবণ ১ চা চামচ, ও চিটাগুড় প্রয়োজনমতো (মণ্ড প্রস্তুত করতে যতটুকু প্রয়োজন ১০০-২০০ গ্রাম) মেশাতে হবে।


আবুল কালাম, গ্রাম : রাঙ্গামাটি, থানা : পীরগঞ্জ,   জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : আমার গরুর পেটফাঁপা রোগ হয়েছে। আমি জাইমোভেট পাউডার ১ প্যাকেট ও এনোরা ট্যাবলেট ২টি করে খাইয়েছি কিন্তু ভালো হচ্ছে না। আমি এ ব্যাপারে পরামর্শ চাই।

উত্তর : গরুর এ রোগের জন্য ১ প্যাকেট জাইমোভেট অথবা ডিজিটপ পাউডারের সাথে ২ লিটার পানি মিশিয়ে ২ দিন খাওয়াতে হবে, সাথে ১০০ মিলি করে ব্লট স্টপ অথবা নো ব্লট সিরাপ ১ দিন খাওয়াতে হবে।  


রেজাউল করিম, গ্রাম : ডাকাহার, থানা : দুপচাঁচিয়া,  জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : আমার একটি এক মাসের বাছুর আছে। বাছুরের নাভিতে পোকা হয়েছিল। পোকা বের করেছি কিন্তু নাভি শুকাচ্ছে না। এখন আমি কি করব?

উত্তর : টারপিন তেল অথবা ন্যাপথলিন দিয়ে পরপর তিন দিন নাভি পরিষ্কার করে নেবানল পাউডার অথবা সুমিত ভেট পাউডার দিতে হবে। স্টেপট্রোপেন অথবা এস পি ভেট ইনজেকশন ২ মিলি করে পরপর ৫ দিন মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে। এর সাথে এসটা ভেট অথবা হিস্টা ভেট ইনজেকশন ১ মিলি করে পরপর ৫ দিন মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে।


মো. আবদুর রহমান, গ্রাম : পাঁজিয়া, উপজেলা : কেশবপুর, জেলা : যশোর
প্রশ্ন : পান গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে। কি করব?

উত্তর : এটি পান গাছের একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ যাতে না হয় সেজন্য লাগানোর সময় রোগমুক্ত লতা ব্যবহার করতে হবে। এ রোগ হলে আক্রান্ত লতা বা কা- তুলে নষ্ট করে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ডায়থেন এম ৪৫ বা ৪ গ্রাম কুপ্রাভিট মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


মো. জহুরুল ইসলাম, গ্রাম : পায়রাবন্দ, উপজেলা : মিঠাপুকুর, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : কলা গাছের কচি পাতায় এবং কলার গায়ে সাদা সাদা দাগ দেখা যায়। সকালের দিকে পাতায় ছোট ছোট পোকা দেখা যায়। এর প্রতিকার কি?

উত্তর : কলা গাছে বিটল পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা কচি পাতার সবুজ অংশ নষ্ট করে দেয়। আক্রান্ত স্থানে অনেক দাগ দেখা যায়। আক্রমণ খুব বেশি হলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। কলা যখন বের হওয়ার সময় হয় তখন বিটল পোকা মোচার মধ্যে ঢুকে কচি কলার রস চুষে খায়। এর ফলে কলার গায়ে বসন্ত রোগের মতো দাগ হয়ে যায়। এ পোকায় আক্রান্ত  মাঠে বার বার কলা চাষ করা যাবে না। আক্রমণ প্রতিহত করতে কলার মোচা বের হওয়ার সময় ছিদ্রবিশিষ্ট পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউপি মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২ বার গাছের পাতার ওপরে ছিটাতে হবে। ম্যালাথিয়ন বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি  লিবাসিড ৫০ ইসি ২ মিলি হারে ব্যবহার করতে হবে।

 

কৃষিবিদ ঊর্মি আহসান*
*উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (এলআর), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
আশ্বিন মাসের কৃষি (ভাদ্র ১৪২৪)

শুভ্র কাশফুল, দিগন্ত জোড়া সবুজ আর সুনীল আকাশে ভেসে বেড়ানো চিলতে সাদা মেঘ নিয়ে শরৎ আসে আমাদের মাঝে। সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা। বর্ষা মৌসুমের সবটুকু ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া আর চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে কার্যকরী প্রস্তুতি নেয়ার সময় এখন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আসুন সংক্ষেপে জেনে নেই আশ্বিন মাসের বৃহত্তর কৃষি ভুবনের  করণীয় বিষয়গুলো।
 

আমন ধান
আমন ধানের বয়স ৪০-৫০ দিন হলে ইউরিয়ার শেষ কিস্তি প্রয়োগ করতে হবে।
সার প্রয়োগের আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে।
এ সময় বৃষ্টির অভাবে খরা দেখা দিতে পারে। সেজন্য সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। ফিতা পাইপের মাধ্যমে সম্পূরক সেচ দিলে পানির অপচয় অনেক কম হয়।
শীষ কাটা লেদা পোকা ধানের জমি আক্রমণ করতে পারে। প্রতি বর্গমিটার আমন জমিতে ২-৫টি লেদা পোকার উপস্থিতি মারাত্মক ক্ষতির পূর্বাভাস। তাই সতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ সময় মাজরা, পামরি, চুঙ্গী, গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে, জমিতে খুঁটি দিয়ে, আলোর ফাঁদ পেতে, হাতজাল দিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
খোলপড়া, পাতায় দাগ পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। তাছাড়া সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে, সঠিক সময় শেষ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

 

নাবি আমন রোপণ
কোনো কারণে আমন সময় মতো চাষ করতে না পারলে অথবা নিচু এলাকায় আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিআর-২২, বিআর-২৩, বিনাশাইল বা স্থানীয় জাতের চারা রোপণ করা যায়। গুছিতে ৫-৭টি চারা রোপণ করতে হবে।
অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি ইউরিয়া প্রয়োগ ও অতিরিক্ত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায় এবং দেরির ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়।

 

আখ
আখের চারা উৎপাদন করার উপযুক্ত সময় এখন। সাধারণত বীজতলা পদ্ধতি এবং পলিব্যাগ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা যায়। পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করা হলে বীজ আখ কম লাগে এবং চারার মৃত্যুহার কম হয়। চারা তৈরি করে বাড়ির আঙিনায় সুবিধাজনক স্থানে সারি করে রেখে খড় বা শুকনো আখের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। চারার বয়স ১-২ মাস হলে মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। কাটুই বা অন্য পোকা যেন চারার ক্ষতি করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

 

বিনা চাষে ফসল আবাদ
মাঠ থেকে বন্যার পানি নেমে গেলে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় বিনা চাষে অনেক ফসল আবাদ করা যায়। ভুট্টা, গম, আলু, সরিষা, মাসকালাই বা অন্যান্য ডাল ফসল, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক বিনা চাষে লাভজনকভাবে অনায়াসে আবাদ করা যায়। সঠিক পরিমাণ বীজ, সামান্য পরিমাণ সার এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে লাভ হবে অনেক। যেসব জমিতে উফশী বোরো ধানের চাষ করা হয় সেসব জমিতে স্বল্পমেয়াদি টরি-৭ ও কল্যাণী জাতের সরিষা চাষ করতে পারেন।

 

শাকসবজি
আগাম শীতের সবজি উৎপাদনের জন্য উঁচু জায়গা কুপিয়ে পরিমাণমতো জৈব ও রাসায়নিক সার বিশেষ করে ইউরিয়া প্রয়োগ করে শাক উৎপাদন করা যায়।
শাকের মধ্যে মুলা, লালশাক, পালংশাক, চিনাশাক,    সরিষাশাক অনায়াসে করা যায়।
সবজির মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো, বেগুন, ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপিসহ অন্যান্য শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করে মূল জমিতে বিশেষ যতেœ আবাদ করা যায়।

 

কলা
অন্যান্য সময়ের থেকে আশ্বিন মাসে কলার চারা রোপণ করা সবচেয়ে বেশি লাভজনক। এতে ১০-১১ মাসে কলার ছড়া কাটা যায়।
ভালো উৎস বা বিশ্বস্ত চাষি ভাইয়ের কাছ থেকে কলার অসি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে।
কলার চারা রোপণের জন্য ২-২.৫ মিটার দূরত্বে ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ৬০ সেন্টিমিটার গভীর গর্ত করে রোপণ করতে হবে।
গর্তপ্রতি ৫-৭ কেজি গোবর, ১২৫ গ্রাম করে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার এবং ৫ গ্রাম বরিক এসিড ভালোভাবে মিশিয়ে ৫-৭ দিন পর অসি চারা রোপণ করতে হবে।
কলা বাগানে সাথি ফসল হিসেবে ধান, গম, ভুট্টা ছাড়া যে কোনো রবি ফসল চাষ করা যায়।

 

গাছপালা
বর্ষায় রোপণ করা চারা কোনো কারণে নষ্ট সেখানে নতুন চারা রোপণ করতে হবে।
বড় হয়ে যাওয়া চারার সাথে বাঁধা খুঁটি সরিয়ে দিতে হবে এবং চারার চারদিকের বেড়া প্রয়োজনে সরিয়ে বড় করে দিতে হবে। মরা বা রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে।
চারা গাছসহ অন্যান্য গাছে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় এখন।
গাছের গোড়ার মাটি ভালো করে কুপিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে। দুপুর বেলা গাছের ছায়া যতটুকু স্থানে পড়ে ঠিক ততটুকু স্থান কোপাতে হবে। পরে কোপানো স্থানে জৈব ও রাসায়নিক সার ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ
হাঁস-মুরগির কলেরা, ককসিডিয়া, রানীক্ষেত রোগের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রাথমিকভাবে টিকা প্রদান, প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক।
এ মাসে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফুটানোর ব্যবস্থা নিতে পারেন। বাচ্চা ফুটানোর জন্য অতিরিক্ত ডিম দেয়া যাবে না। তাছাড়া ডিম ফুটানো মুরগির জন্য অতিরিক্ত বিশেষ খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
আশ্বিন মাসে গবাদিপশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো দরকার।
গবাদিপশুকে খোলা জায়গায় না রেখে রাতে ঘরের ভেতরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
পানিতে জন্মানো গোখাদ্য এককভাবে না খাইয়ে শুকিয়ে খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে।
এ সময় ভুট্টা, মাসকলাই, খেসারি বুনো ঘাস উৎপাদন করে গবাদিপশুকে খাওয়াতে পারেন।
গর্ভবতী গাভী, সদ্য ভূমিষ্ঠ বাছুর ও দুধালো গাভীর বিশেষ যতœ নিতে হবে।
এ সময় গবাদিপ্রাণীর মড়ক দেখা দিকে পারে। তাই গবাদিপশুকে তড়কা, গলাফুলা, ওলান ফুলা রোগের জন্য প্রতিষেধক, প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চত করতে হবে।

 

মৎস্যসম্পদ
বর্ষায় পুকুরে জন্মানো আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং পুকুরের পাড় ভালো করে বেঁধে দিতে হবে।
পুকুরের মাছকে নিয়মিত পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার সরবরাহ করতে হবে।
এ সময় পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।
তাছাড়া পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রোগ সারাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে ।
এ সময় সরকারি ও বেসরকারি মাছের খামার থেকে জিওল মাছের পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আশ্বিন মাসে নিয়মিত কৃষি কাজের পাশাপাশি সারা দেশজুড়ে ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়। ইঁদুরের হাত থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য এ অভিযান চলে। এককভাবে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুর দমন করলে কোনো লাভ হবে না। ইঁদুর দমন কাজটি করতে হবে দেশের মানুষকে একসাথে সম্মিলিতভাবে  এবং ইঁদুর দমনের সব পদ্ধতি ব্যবহার করে। ইঁদুর নিধনের ক্ষেত্রে যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় সেগুলো হলো- পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক চাষাবাদ, গর্তে ধোঁয়া দেয়া, ফাঁদ পাতা, উপকারী প্রাণী যেমন- পেঁচা, গুঁইসাপ, বিড়াল দ্বারা ইঁদুর দমন, বিষটোপ এবং গ্যাস বড়ি ব্যবহার  করা। আসুন সবাই একসাথে ইঁদুর দমন করি। সবাই ভালো থাকবেন।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*

*তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook