কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

চুইঝাল কৃষির নতুন সেনসেশন

চুইঝাল বা চইঝাল লতাজাতীয় এক অমূল্য সম্পদ। প্রাকৃতিকভাবে এটি ভেষজগুণ সম্পন্ন গাছ। অনেকেই বিভিন্নভাবে কাজে লাগাচ্ছেন কৌশলের মাধ্যমে। চুইঝাল গ্রীষ্ম অঞ্চলের লতাজাতীয় বনজ ফসল হলেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে খুব ভালোভাবে জন্মে। বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান, বার্মা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড চুইচাষের জন্য উপযোগী। ইতিহাস বলে প্রাচীনকাল থেকে চুইঝালের আবাদ হয়ে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আমাদের দেশের কিছু আগ্রহী চাষি নিজ উদ্যোগে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অনেক দিন আগ থেকেই চুইঝাল চাষ করে আসছেন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় চুইঝাল বেশ জনপ্রিয় এবং দেশের সিংহভাগ চুইঝাল সেখানেই আবাদ হয়। এসব এলাকাতে চুইঝালের কা-, শিকড় পাতার বোঁটা রান্নার সাথে ব্যঞ্জন হিসেবে এবং ঔষধি পথ্য হিসেবে কাজে লাগায়। বিশেষ করে মাংস তাও আবার খাসির মাংসে বেশি আয়েশ করে রান্না হয়, মাছের সাথে, ডালের সাথে মিশিয়েও রান্না করে। আমাদের দেশে ফল খাওয়া হয় না। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো দেশে চুইঝালের ফল যা শুকালে লংয়ের মতো সেগুলোও মসলা হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। নিজেদের কারিশমা দিয়ে এটিকে এখন প্রাত্যহিকতার আবশ্যকীয় উপকরণের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। অন্য গাছের সাথে আশ্রয় নিয়ে এরা বেড়ে উঠে। তাছাড়া মাটিতে লতানো ফসল হিসেবেও বেড়ে তাদের বৃদ্ধি ঘটায়। মোটামুটি সব গাছের সাথেই বাড়ে। এর মধ্যে আম, কাঁঠাল, মেহগনি, সুপারি, শিমুল, নারিকেল, মেহগনি, কাফলা (জিয়ল) গাছে ভালো হয়। আবার আম, কাফলা ও কাঁঠাল গাছে বেড়ে ওঠা চুই সবচেয়ে বেশি ভালোমানের বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
আরোহী গাছের গোড়ায় সামান্য গোবর মাটি মিশিয়ে লতার ১টি গিট মাটির নিচে রোপণ করলে ক’দিন পরেই বাড়তে শুরু করে। ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যেই লতা কাটা যায়। সাধারণ যত্নেই চুই বেড়ে ওঠে। খুব বেশি ব্যবস্থাপনা, যত্নআত্তির প্রয়োজন হয় না। সঠিক সুষ্ঠু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রযুক্তি অবলম্বন করে আবাদ করলে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও বেগবান করা যাবে। লতার পর্বমধ্য ছোটোছোটো করে কেটে টুকরো করে তরকারি, ডালসহ অন্যান্য ঝালযুক্ত উপকরণ হিসেবে রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। চুইঝাল ব্যবহার করলে তরকারিতে মরিচ ব্যবহার করতে হয় না। মরিচের বিকল্প হিসেবে চুইকে ব্যবহার করা যায় অনায়াসে। ব্যবহারকারীরা বলেন, এটি তরকারিতে ব্যবহার করলে তরকারির স্বাদ বেড়ে যায়। কাঁচা অবস্থায় চিবিয়েও চুই খাওয়া যায়। চুইয়ের লতাকে শুকিয়ে গুঁড়া করেও দীর্ঘদিন রাখা যায় এবং প্রয়োজনীয় বা সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহার করা যায়। চুইলতার শিকড়, কাণ্ড, পাতা, ফুল ফল সব অংশই ভেষজগুণ সম্পন্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পুরো গাছ উপকারী। অতি সাধারণভাবে বলতে গেলে খরচবিহীন এদের চাষ করা যায় এবং আশাতীত লাভ পাওয়া যায়।
চুইঝালের বোটানি
চুইঝাল গাছ হয়তো অনেকে চিনেন না তাদের জানার জন্য বলা যায় চুইয়ের বোটানিক্যাল নাম পেপার চাবা (Piper Chaba), পরিবার পিপারেসি (Piperaceae), জেনাস পিপার (Piper) এবং স্পেসিস হলো পিপার চাবা (Piper chaba)। লতা সুযোগ পেলে ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। পাতা ২ থেকে ৩ ইঞ্চি লম্বা হয়। হার্টের মতো আকার। আর পিপুলের পাতার লতার সাথেও বেশ সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। নতুন অনেকেই চুইপাতা গোলমরিচ পাতার সাথে বা পানপাতার সাথে মিলিয়ে ফেলেন। কেননা দেখতে তাদেরই মতো। পুরুষ স্ত্রী ফুল আলাদা লতায় জন্মে। পরাগায়ন প্রাকৃতিকভাবেই সম্পন্ন হয়। ফুল লাল লম্বাটে দূর থেকে দেখতে অনেকটা মরিচের মতো। কাছে গেলে ফলের প্রাকৃতিক নান্দনিক কারুকার্য ধরা পড়ে। ফলের ব্যাস ১ ইঞ্চির মতো। ফল সাধারণত লাল রঙের হয়। তবে পরিপক্ব হলে বাদামি বা কলো রঙের হয়ে যায়। বর্ষায় ফুল আসে, শীতের শুরুতে ফল আসে।
চুই লতা জাতীয় অর্থকরী ফসল। এর কাণ্ড ধূসর এবং পাতা পান পাতার মতো সবুজ রঙের। এর কাণ্ড, শিকড়, শাখা, প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চুই সাধারণত দুই প্রকার। একটির কাণ্ড আকারে বেশ মোটা ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার, অন্যটির কা- চিকন, আকারে ২.৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার। চুই গাছ ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
রাসায়নিক উপাদান
চুইঝালে দশমিক ৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল রয়েছে। অ্যালকালয়েড ও পিপালারটিন আছে ৫ শতাংশ। তাছাড়া ৪ থেকে ৫ শতাংশ পোপিরন থাকে। এছাড়া পোলার্টিন, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সিজামিন, পিপলাসটেরল এসব থাকে পরিমাণ মতো। এর কাণ্ড, শিকড়, পাতা, ফুল, ফল, সব ভেষজগুণ সম্পন্ন। শিকড়ে থাকে দশমিক ১৩ থেকে দশমিক ১৫ শতাংশ পিপারিন। এসব উপাদান মানব দেহের জন্য খুব উপকারী।
ঔষধি গুণ
চুইঝালে আছে অসাধারণ ঔষধিগুণ। চুইঝাল-
১.     গ্যাস্ট্রিক সমস্যার সমাধান করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে;
২.     খাবারের রুচি বাড়াতে এবং ক্ষুধামন্দা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে;
৩.     পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহ সারাতে চুইঝাল অনেক উপকারী;
৪.     স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও মানসিক অস্থিরতা প্রশমন করে;
৫.     ঘুমের ওষুধ হিসেবে কাজ করে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে এবং শরীরের ব্যথা সারায়;
৬.     সদ্য প্রসূতি মায়েদের শরীরের ব্যথা দ্রুত কমাতে ম্যাজিকের মতো সাহায্য করে;
৭.     কাশি, কফ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও রক্তস্বল্পতা দূর করে;
৮.     মাত্র এক ইঞ্চি পরিমাণ চুই লতার সাথে আদা পিষে খেলে সর্দি সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়;
৯.     আরও বহুবিদ ভেষজগুণ সম্পন্ন ফসল চুইঝাল।
বংশবিস্তার
বীজ ও লতার কাটিং দিয়ে বংশবিস্তার করা যায়। তবে লতার কাটিংয়ে বাড়বাড়তি তাড়াতাড়ি হয় এবং ফলন দ্রুত পাওয়া যায়। বীজ থেকে বংশবিস্তার জটিল, সময়সাপেক্ষ বলে আমাদের দেশে শুধু লতা থেকে বংশবিস্তার করা হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় সবক‘টি নার্সারিতে চুইঝালের চারা পাওয়া যায়।
জমি ও মাটি
দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও ছায়াময় উঁচু জমিতে সাধারণত চুই চাষ করা হয়। চুইঝালের জন্য আলাদা কোনো মাটি জমির প্রয়োজন নেই সাধারণ ফলবাগান বা বৃক্ষ বাগানের মাটি জমির উপযুক্ততাই চুয়ের জন্য উপযুক্ত। শুধু খেয়াল রাখতে হবে বর্ষায় বা বন্যায় যেন চুইঝাল গাছে গোড়ায় পানি না জমে।
রোপণের সময়
বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) এবং আশ্বিন-কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর) মাস এ দুইবার হলো চুইঝালের লতা রোপণের উপযুক্ত সময়।
অঙ্গজ প্রজনন বা লতা কাটিং পদ্ধতিতে এর কাণ্ড বা শাখা ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা করে কেটে সরাসরি মাটিতে রোপণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে কাটিং বা শাখাকে পোড় বলা হয়। একটি পোড়ে কমপক্ষে ৪-৫টি পর্বসন্ধি থাকে। বাণ্যিজিকভাবে পলিব্যাগে চারা তৈরি করা হয়। তারপর পলিব্যাগ থেকে চারা নিয়ে মূল জমিতে রোপণ করা হয়।
কাটিং শোধন
ভালো বালাইমুক্ত আবাদের জন্য চুইঝালের কাটিং তৈরি চারা রোপণের আগে অবশ্যই শোধন করে নিতে হবে। ১ লিটার পানিতে ২-৩ গ্রাম প্রোভ্যাক্স/নোইন/ব্যাভিস্টিন বা অন্যকোনো উপযুক্ত রাসায়নিকে মিশিয়ে কাটিং ৩০ মিনিট চুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলে কাটিং রোপণ করতে হবে। এতে পরে রোগ পোকার আক্রমণ হয় না বা অনেক কম হয়। লতা ভালোভাবে বেড়ে উঠে।
সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা
চুই চাষে চাষিরা সাধারণত কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। পোড় বা শাখা রোপণের আগে গর্তে পচা আবর্জনা বা ছাই বা গোবর ব্যবহার করেন। তবে কেউ কেউ কোথায়ও কোথায়ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ হারে ইউরিযা, টিএসপি, এমওপি বর্ষার আগে ও পরে গাছের গোড়া থেকে ১ হাত দূরে প্রয়োগ করেন। শুকনো মৌসুমে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। অন্তত সপ্তাহে ১ বার গাছের গোড়ায় সেচ দিলে গাছের বাড়বাড়তি স্বাভাবিক থাকে। আর বর্ষাকালে চুইঝালের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সে দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হয়।
বাউনি দেয়া
চুইঝাল যেহেতু লতা জাতীয় তাই এর জন্য আরোহণের সাপোর্ট লাগে। সেক্ষেত্রে আম, কাঁঠাল, জাম, সুপারি, নারিকেল, মেহগনি ও কাফলা (জিয়ল) গাছ বাউনি হিসেবে চুই চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাউনি না দিলেও মাটিতে বাড়তে পারে। বিশেষ করে অন্যান্য দেশ মাটিতে কোনো বাউনি ছাড়া চুইঝালের চাষ হয়। তবে এক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুমে গাছের লতার বেশ ক্ষতি হয়। কৃষকের মতো আম, কাঁঠাল ও কাফলা গাছে চাষকৃত চুই খুব সুস্বাদু হয়। তবে অন্যান্য গাছের  চুইঝাল গুণে মানে কম না কিন্তু।
ফসল সংগ্রহ ও ফলন
চুই লাগানোর বা রোপণের ১ বছরের মাথায় খাওয়ার উপযোগী হয়। তবে ভালো ফলনের জন্য ৫-৬ বছর বয়সের গাছই উত্তম। সে মতে ৪-৫ বছর অপেক্ষা করা ভালো। চুইঝালের জন্য আলাদা জমির প্রয়োজন হয় না। বিভিন্ন আরোহী গাছের সাথে আরোহণের ব্যবস্থা করে দিলেই হয়। এতে মূল গাছের বাড়বাড়তিতে বা ফলনে কোনো সমস্যা হয় না। হেক্টরপ্রতি ২.০ থেকে ২.৫ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়। ৫-৬ বছরের একটি গাছ থেকে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত চুইঝাল লতার ফলন পাওয়া যায়।
চুইয়ের ব্যবহার
কাণ্ড খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। বড় বড় মাছ বা যে কোনো মাংসের সাথে খাওয়া যায়। আঁশযুক্ত নরম কাণ্ডের স্বাদ ঝালযুক্ত। কাঁচা কাণ্ডও অনেকে লবণ দিয়ে খান। ছোলা, ভাজি, আচার, হালিম, চটপটি, ঝালমুড়ি, চপ ও ভর্তা তৈরিতে চুইঝাল ব্যবহৃত হয়। মোট কথা মরিচ, গোলমরিচ ঝালের বিকল্প হিসেবে যে কোনো কাজে চুইঝাল ব্যবহার করা যায়।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব
নার্সারি শিল্পে চুইঝাল একটি মূল্যবান উপকরণ উপাদান হিসেবে বিশেষ বিবেচনা করা যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এরই মধ্যে চুই লতার চারা উৎপাদন বাণিজ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় চুই প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। বর্তমানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে বৃহত্তর খুলনা বরিশাল ফরিদপুর অঞ্চলে চুইয়ের আবাদ এবং বাজার রমরমা ত্যাজি। শুকনো এবং কাঁচা উভয় অবস্থায় চুই বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা চুইঝাল লতা অঞ্চল ভেদে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে শাখা ডাল থেকে শিকড়ে ডালে ঝাল বেশি হয় বলে এর দামও একটু বেশি। শুকনো চুইয়ের দাম কাঁচার চেয়ে আরও ২-৩ গুণ বেশি। ১৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। একজন সাধারণ কৃষক মাত্র ২-৪টি চুই গাছের চাষ করে নিজের পরিবারের চাহিদা মিটাতে পারেন।  বেশি ফলনের মাধ্যমে নিজের চাহিদাও মিটিয়ে বাড়তি আয় করতে পারেন। বাংলাদেশে মরিচের বদলে চুইঝালের চাষের বিস্তার ঘটিয়ে হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। অবাক করা বিষয় হলো এই যে খুলনার চুই দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে ও রফতানি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাই যদি এর দিকে পরিকল্পিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেন এবং সুনজর দেন তবে আমাদের দেশ চুইঝাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। চুইয়ের জনপ্রিয়তা আর গ্রহণ যোগ্যতার কারণে দেশ-বিদেশে চুইঝাল বা চুই হোটেল নামে অগণিত হোটেল রেস্তোরাঁর নামকরণ করা হয়েছে। এসব হোটেলে চুইসমৃদ্ধ খাবার পরিবেশন করা হয়। সবাই খেয়ে রসনা তৃপ্তি মেটান। আমাদের দেশেও বেশক‘টি চুইঝাল হোটেল এর মধ্যে চুই নামের কারণে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে এবং দারুণ ব্যবসা করে যাচ্ছে।


চুই গাছের ভেষজগুণ অসামান্য এবং বিস্তৃত। পেটেরপীড়া সারানো, ক্ষুদামন্দা, রুচি বাড়ানো, পেটের গ্যাস নিবারণ, শ্বাসকষ্ট, কফ, কাশি, ডায়রিয়া কমানো, ঘুমবাড়ানো, শারীরিক দুর্বলতা কমাতে, গায়ের ব্যথা, ম্যাজম্যাজ ভাব কমাতে, বাচ্চাপ্রসবের পর শরীরের ব্যথা কমানোর জন্য অব্যার্থ মহৌষধ হিসেবে চুইঝাল কাজ করে। একটি পরিবারের বছরের চুইয়ের চাহিদা মেটাতে বড় একটি আরোহী আমগাছের ফলনই যথেষ্ট। প্রতিদিনই চুইঝাল লতা কাটা যায়।


নার্সারি শিল্পে চুইঝাল একটি মূল্যবান লাভজনক উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। একজন সাধারণ কৃষক নিজের ২-৪টি গাছে চইয়ের চাষ করে নিজের পারিবারিক চাহিদা মেটাতে পারেন অধিকন্তু অতিরিক্ত ফলন বিক্রি করে পারিবারিক অন্যান্য আবশ্যকীয় চাহিদা মিটাতে পারেন অনায়াসে। মরিচের বিকল্প হিসেবে চুইকে যুক্ত করতে পারলে দেশের হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সাথে ভেষজগুণ থাকার কারণে অনেক রোগব্যাধির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।


এজন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, গবেষণা, মাঠ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বহুমুখী ব্যবহারে প্রচার প্রচারণা। তবেই চুই নিয়ে আমরাও অল্প সময়ে অনেক দূর পথ পেরিয়ে যেতে পারব। (কৃতজ্ঞতা- আবদুর রহমান, এআইসিও এবং কৃতসা, খুলনা)।

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫;  Subornomal@gmail.com

বিস্তারিত
পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচনে সবজি চাষ

আমরা খাদ্য গ্রহণ করি দেহের পুষ্টির জন্য এবং যার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সবল রেখে কর্মক্ষম জীবন যাপন করা যায়। তাই  এ ব্যাপারে মানুষের খাদ্য তালিকায় আদিকাল থেকেই সবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আমাদের উপমহাদেশেই সবজি নির্ভর খাদ্য ব্যবস্থার আদি নিবাস এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য  সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।  আর এ প্রবণতা উন্নত বিশ্বে স্বল্পোন্নত বিশ্বের তুলনায় অধিকতর লক্ষণীয়। তাইতো এসব দেশে মাথাপিছু প্রতিদিন সবজি গ্রহণের পরিমাণ দেশভেদে আমাদের মতো দেশের তুলনায় ৪ থেকে ৫ গুণ বা তারও বেশি। মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশসহ শারীরিক সক্ষমতার বিচারে তাইতো ওইসব দেশের নাগরিকরা আমাদের থেকে অনেক অগ্রগামী। এ অবস্থার অবসানকল্পে আমাদের খাদ্য তালিকায় মানবদেহের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় দুটি খাদ্য উপাদান, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিন এর পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য এগুলোর সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস বিভিন্ন প্রকারের সবজির অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শর্করা নির্ভর খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্যময় (বিভিন্ন রঙের) পাতাজাতীয় ও ফল মূলজাতীয় সবজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের খাদ্য জগতে বিভিন্ন প্রকারের সবজিই সম্ভবত একমাত্র খাদ্য, শরীর গঠনে যার ইতিবাচক ছাড়া কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই। বর্তমানে আমরা দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেলেও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার সাথে পুষ্টি নিরাপত্তার কার্যকরভাবে সংযোগ ঘটাতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্থহীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশে বর্তমানে অপুষ্টি একটি অন্যতম  প্রধান সমস্যা। আর এ সমস্যা দূরীকরণে পুষ্টি সমৃদ্ধ সুষম খাবারের নিশ্চয়তা দিতে সবজি গোত্রীয় ফসল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে  যেহেতু সবজি ফসল বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। তাই সবজি ফসলের অধিক উৎপাদন ও গ্রহণ দানাজাতীয় ফসলের ওপর চাপ কমিয়ে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষক ভাইদের জন্য অধিক মুনাফার সংস্থান করে দেশের অর্থনীতিতেও বিরাট অবদান রাখতে পারে।
মাথাপিছু প্রাপ্যতায় সবজির অবস্থান  
বিবিএস ২০১৫ অনুযায়ী মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৭.৯৩ মিলিয়ন হেক্টর যার মধ্যে সবজি ফসলের দখলে মাত্র ২.৬৩% এর কিছু ওপরে। এ থেকেই অনুমান করা যায় কত অল্প পরিমাণ জমি থেকে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণুু বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সবজির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। আর তাই মাথাপিছু প্রয়োজনের নিরিখে উৎপাদন যথেষ্ট নয়। তারপরও প্রতি একক জমিতে উচ্চফলনশীল উন্নত জাত আবাদের মাধ্যমে সবজি ফসলে তুলনামূলক অধিক ফলন পাওয়া যায় বলে প্রয়োজনীয় প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা না গেলেও উৎপাদনের অগ্রযাত্রা যথেষ্ট আশানুরূপ আবাদি জমি বৃদ্ধির বিচারে পৃথিবীতে প্রথম এবং উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয় স্থান। সর্বশেষ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মাত্র ০.৪০ মিলিয়ন হেক্টর জমি থেকে ৩.৭৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন (আলু বাদে) সবজি উৎপাদিত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রতিজনের জন্য প্রায় ৬২ গ্রাম সবজি উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু এ পরিমাণ কখনোই মাথাপিছু পাপ্যতা হিসাবে ধরা যাবে না কারণ বিভিন্ন মাধ্যমের হিসাব মতে গড়ে যদি চার ভাগের এক ভাগও সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায় তাহলেও তা ৫০ গ্রামে নেমে আসে। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু সেটা যে FAO কর্তক অনুমোদিত মাথাপিছু প্রতিদিন ২২০ গ্রাম এর তিন ভাগের এক ভাগের বেশি নয় তা মনে হয়। সেক্ষেত্রে উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় তিন গুণ বা তারও বেশি বৃদ্ধি করতে হবে।    
পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা
পুষ্টি নিরাপত্তা বিষয়টি খাদ্য নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক সময় খাদ্য নিরাপত্তা মানে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাবারের প্রাপ্যতাকেই বুঝানো হতো, পুষ্টির কথাটি তেমন গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় অত্যাবশ্যক খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যের লভ্যতা এবং খাদ্যের পুষ্টিমান। আর আবশ্যকীয় তিনটি বিষয়ের মধ্যে শেষোক্তিটির কারণে সুষম খাবারের কার্যকর সরবরাহ চাহিদা মোতাবেক পেতে হলে খাদ্য তালিকায় সবজির অন্তর্ভুক্তি অতি আবশ্যকীয়ভাবেই থাকতে হবে।
সবজির পুষ্টিমান
সবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য এবং সবজিভেদে কাঁচা বা রান্না অবস্থায় সুস্বাদু খাবারের ভা-ার। আমাদের দৈনন্দিন খাবারে বিভিন্ন প্রকারের সবজির সমারোহ যেমন স্বাদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা আনয়ন করে তেমনি বৈচিত্র্যময় সবজির উপস্থিতি নানারকম পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে থাকে। মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সব পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ সবজি তাই সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও বুদ্ধিদীপ্ত জাতি খাদ্য তালিকার অপরিহার্য অংশ। বছরব্যাপী হরেক রকমের নিরাপদ সবজির চাষ সম্প্রসারণ  ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে পুষ্টিহীনতা বা পুষ্টিস্বল্পতা দূরীকরণে যেমন অবদান রাখা যাবে  সে সাথে উৎপাদনের সাথে জড়িত কৃষককুল ও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। আর তা করা গেলে সবজির মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা থাকবে যা পুষ্টির নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়ক হবে।
পুষ্টি চাহিদা পূরণে ও রোগ প্রতিরোধে শাকসবজির ভূমিকা
মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে শাকসবজির ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রকারের ভিটামিন ও খনিজ লবণের উৎস হিসেবে স্বল্প খরচে বছরব্যাপী এর জোগান দিতে সবজি ফসলের কোনো বিকল্প নেই।  আর এসব খাদ্য উপাদান অল্প প্রয়োজন হলেও তা শরীর গঠনে ও বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশে অত্যাবশ্যকীয়। সবজির জগতে বৈচিত্র্যময় বহু ফসলের সমাহার এবং বছরব্যাপী এর চাষাবাদ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে শুধু পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান করা যাবে তাই নয়, এসব পুষ্টির অভাবজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকেও জাতিকে মুক্ত রাখা যাবে।
নিরাপদ সবজি উৎপাদান
নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়টি অন্যান্য কৃষি উৎপাদনের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কারণ সবজি ফসল বিভিন্ন রোগ ও পোকায় সহজেই আক্রান্ত হয় বলে উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক অতিমাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার করে এবং নিরাপদ সময়ের আগেই তা বাজারজাত করে। অনেক সবজিই কাঁচা খাওয়া হয় বা অল্প রান্নায় খাওয়া হয় বলে মানবদেহে বিষাক্ত খাবারের প্রভাব পড়ে এবং নানা রকম রোগশোক ও অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে ফসল উত্তোলন করে বাজারজাত করা পর্যন্ত এমনকি ভোক্তার হাতে যাওয়ার পরও তা বিভিন্নভাবে অনিরাপদ হতে পারে। এ সম্পর্কিত সম্যক জ্ঞানের অভাবে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতা সবজি ফসলকে অনিরাপদ করে খাবারের অনুপযুক্ত অথবা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।  
দারিদ্র্যবিমোচন
কৃষকের অধিক মুনাফা নিশ্চিতকরণ সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যে সমন্বিত ও উন্নত কৃষি বিপণন ব্যবস্থার ওপরে নির্ভরশীল যা আমাদের দেশে একেবারেই অনুপস্থিত বিধায় সবজি চাষিরা বছরের বিভিন্ন সময়ে তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম মূল্যও পায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তা চাষিদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং পরে অনুৎসাহিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থা সবজির মতো একটি অতীব প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উৎপাদনশীলতা ব্যাহত করবে যা সামগ্রিকভাবে সরকার ঘোষিত সবার জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ও কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনের পথে বিরাট অন্তরায়। তাই সবজির মতো দ্রুত পচনশীল অথচ অতীব প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় পার্যায়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের আশু দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে কৃষকের যথাযথ মূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানে সবজি ফসলের রপ্তানিবাজার স¤প্রসারণের লক্ষ্যেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম, এসব পণ্যের রপ্তানিকারকদের সাথে কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত করে সম্ভাব্য কিছু কিছু চিহ্নিত এলাকা সু-কৃষিচর্চা ও জৈব কৃষির মাধ্যমে রপ্তানিমুখী সবজি চাষ সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভরা মৌসুমে যথাযথ মূল্য প্রাপ্তির সমস্যা হলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে তা সংরক্ষণে উৎসাহিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে অল্প জমি থেকে অধিক মুনাফা চাষিরা সবজি ফসল থেকে সহজেই পেতে পারে যা তাদের দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
 বছরব্যাপী সবজি চাষ
আমাদের দেশে চাষকৃত সবজির সংখ্যা প্রায় ৯০টির মতো। এর মধ্যে ৩০-৩৫টিতে প্রধান সবজি বলে ধরা যায়। প্রকারভেদে কিছু সবজি মৌসুমভিত্তিক এবং কিছু সারা বছরই চাষ করা যায়।  মৌসুমের নয় এমন সময়ে চাষ করাতে ফলন কম হয় এবং রোগশোক, পোকামাকড় বা বৈরী আবহাওয়ারও সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু অমৌসুমি হওয়ার কারণে অধিক মূল্য পাওয়া যায় বলে কৃষক ভাইরা অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলিয়েও এসব সবজির চাষ অব্যাহত রাখেন। ফলে যেগুলো আগে মৌসুমি সবজি ছিল এখন তা সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে। সে অর্থে মৌসুমের দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় প্রতিটি মৌসুমেই অমৌসুমি সবজির প্রাপ্যতা বাড়ছে। আর এতে করে সারা বছরই বা বছরের অধিকাংশ সময় কমবেশি সব সবজি উৎপাদিত হচ্ছে এবং তা বাজারে পাওয়াও যাচ্ছে। তাই বছরব্যাপী হরেক রকমের সবজির প্রাপ্যতা এখন আর কোনো সমস্য নয়। জাত ও প্রযুক্তি কৃষকের হাতের মুঠোয়। শুধু জাতীয় পর্যায় থেকে নীতিমালার মাধ্যমে সব কিছু সমম্বয় করে কার্যকর বাজার ব্যবস্থা চালু করে কৃষককে তার ন্যায্যমূল্য পেতে সহায়তার মাধ্যমে বছরব্যাপী নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা রকম সবজির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।
সবজি চাষের সম্ভাব্য পরিবেশ ও পদ্ধতি
সবজিভেদে বাণিজ্যিক কৃষি বা পারিবারিক বাগানে; ঘরের ছাদে বা চালে; খোলা মাঠে; পাহাড়ের ঢালে; বাড়ির আঙিনায় বড় গাছে; পানিতে; পানির ওপরে মাচায়; সমতল ভূমিতেও মাচায়; সমতল ভূমিতে বহুতল মাচায়; জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান পদ্ধতিতে; চর অঞ্চলে বালুময় জমিতে ঋবৎঃরমধঃরড়হ পদ্ধতিতে; লবণাক্ত ভূমিতে ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; হাইড্রোপনিত পদ্ধতিতে মাটিবিহীন বহুস্তর বিশিষ্ট স্থাপনা করে অতি অল্প জায়গায় অনেক প্রকার সবজি ফলানো যায়; লবণাক্ত বা বালির চর এলাকায় খাঁড়া পদ্ধতিতে বস্তা বা সস্তা কাঠ ও বাঁশের স্ট্রাকচার তৈরি করে মাটি ভর্তি করে সেখানেও চাষ করা যায়;  সেঁতসেঁতে ছায়াযুক্ত এলকায় যেখানে অন্য ফসল ফলানো যায় না সেখানেও বিশেষ বিশেষ কিছু সবজি চাষ করা যায়।
বাড়ির ছাদে ও বসতবাড়িতে সবজি চাষ
পারিবারিক খাদ্য তালিকায় দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে একটি অত্যন্ত সুন্দর ও কার্যকর ব্যবস্থা। অনেকেই এভাবে ইদানিং সবজি বাগান করেন এবং নিজ হাতে উৎপাদিত বিষমুক্ত তরজাতা নিরাপদ সবজি দিয়ে নির্ভেজাল পুষ্টির জোগান দিচ্ছেন স্ব স্ব পরিবারের খাদ্য তালিকায়। বসতবাড়িতে সবজি চাষ করার সময় এমন সবজি নির্বাচন করতে হবে যা প্রয়োজনীয় পুষ্টির দিক থেকে উচ্চমানের, খেতেও সুস্বাদু এবং যেগুলোর বাড়তি সবজি বিক্রি করতেও অসুবিধা নেই। তাছাড়া সেগুলো যেন স্থানীয় জলবায়ুতে জন্মানোর উপযোগী হয়।
পুষ্টি ঘাটতিজনিত সমস্যাবলি
বিভিন্ন প্রকার খাদ্যোপাদান যেমন- শর্করা, আমিষ, তেল, খাদ্যপ্রাণ এবং খনিজ পদার্থেও অভাবে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকমের অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা যায়। অপুষ্টিজনিত সমস্যাগুলো হলো- শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়; বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে; মহিলা এবং শিশু রক্তশূন্যতায় ভোগে; প্রয়োজনীয় ক্যালারির অভাবে ভুগছে; ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত রোগে ভুগছে; রাইবোক্লেভিনের অভাবে ভুগছে; গলা ফোলা রোদে আক্তান্ত হচ্ছে; শিশুরা অন্ধত্ব বরণ করছে। সে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং কম ব্যয়বহুল উপায় খাদ্য তালিকায় রকমারি সবজির ব্যবহার। সামগ্রিকভাবে বছরব্যাপী খাবার হিসেবে অন্যান্য খাবারের সাথে হরেকরকম সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করে অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
সবজি ফসলের প্রযুক্তিগত অবস্থা
উদ্ভাবিত ৩২-৩৩টি প্রধান সবজির প্রায় ১০০টিরও অধিক ওপি ও শংকর জাতের মধ্যে বেশ কয়েকটি জাত ও কিছু উৎপাদন প্রযুক্তি জাতীয় পর্যায়ে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। এর মধ্যে টমেটো, বেগুন, লাউ, ঢেঁড়শ, মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙা, লালশাক,  কলমিশাক, চিনাশাক, বাটিশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক শিম ও বরবটিসহ আরও কিছু সবজি জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে যেমন- পলি ছাউনিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।
বীজকথন
উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি প্রয়াস খুবই ভালো। কিন্তু সে সব জাতের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বর্তমানে সবজি বীজের জাতীয় মোট চাহিদা বলা হয় ৪৫০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি ব্যবস্থাপনার দ্বারা উৎপাদিত বীজের পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ এবং আমাদানি করা হয় তাও প্রায় ১৫ শতাংশ। এর বাইরে ৫৫ শতাংশ বা তারও কিছু বেশি বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে এর সবই কৃষকের নিজস্ব রাখা বীজ যা মানের বিচারে নিম্নমানের। আমদানি করা বীজের একটা অংশ দ্বারা চাষি প্রায়শই প্রতারিত হয়। তাই সবজি উৎপাদনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনের প্রধানতম উপাদান মানসম্পন্ন বীজের নিশ্বয়তা বিধানকল্পে সরকার ও নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ থাকতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কর্মপন্থার কিছু সুপারিশ
বাংলাদেশের খাদ্য শস্যে উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও তার কার্যকর সম্প্রসারণে জাতীয় উদ্যোগ দানাদার শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। তবে পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও যথেষ্ট অবহেলিত। যার ফলে বিভিন্ন প্রকারের অপুষ্টিজনিত রোগ-শোকের আক্রান্তের হার এখনও যথেষ্ট উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে এবং শিশু ও মহিলারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার হচ্ছে। এ অবস্থার অবসানকল্পে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল যেমন- সবজির উৎপাদন বাড়িয়ে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আপামর জনগণের পুষ্টির নিরাপত্তা বিধানে আরও বেশি সচেষ্ট হওয়ার এখনই সময়। সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলে লক্ষ্যে পৌঁছানে যাবে দ্রুতই।
১.     উৎপাদিত সবজির ন্যূনতম বাজার মূল্য নির্ধারণ করে কৃষক পর্যায়ে তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ;
২.     কৃষক পর্যায়ে সময়মতো সঠিক মূল্যে উন্নতমানের সবজি বীজের সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করা;
৩.     কৃষক পর্যায়ে সবজির সংগ্রহ ও স্বল্পকালীন সংরক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থা করা;
৪.     সবজি চাষিদের সমবায় সমিতি গঠন করা যাতে করে তারা পণ্যের ন্যায্য বিক্রয় মূল্য পেতে দর কষাকষির অবস্থানে যেতে পারে। এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান শক্ত করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের সাহায্য করতে পারেন;
৫.     সবজির রপ্তানিমুখী উৎপাদন এলাকায় প্রশিক্ষিত চাষি তৈরি করা এবং রপ্তানিকারকদের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করা;
৬.     সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যে পরিবহনে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা;
৭.     ফসল উত্তোলন পরবর্তী নষ্ট হয়ে যাওয়া কমাতে চাষের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উত্তোলন এবং পরবর্তীতে কিভাবে সবজির যতœ নিতে হয় এ ব্যাপারে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা গড়ে তোলার পদক্ষের নিতে হবে;
৮.     চলমান গবেষণা কার্যক্রমে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার পদক্ষের নিতে হবে;
৯.     সবজি ফসলের ক্ষেত্রে ধীরগতি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হবে গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের মাঝে সমম্বয় সাধন করে।
রোগমুক্ত, সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন রঙের রকমারি সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে সবাইকে। এ ব্যাপারে জাতীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যকর ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং বেশি করে সবজি অথবা সবজি জাত খাবার খেতে হবে। আর তা করতে পারলে যেমন অপুষ্টির হাত থেকে জাতি রক্ষা পাবে তেমনি ব্যয়বহুল দানা শস্যের ওপরে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারলে অন্যান্য ফসলসহ সবজি চাষের জন্য অধিক জমি পাওয়া যাবে। তখন বছরব্যাপী আবাদ বৃদ্ধি করে পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান সহ বিরাট সংখ্যক কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হবে।

ড. শাহাবুদ্দীন আহমদ*
*সাবেক পরিচালক, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, জয়দেবপুর, গাজীপুর

বিস্তারিত
কামরাঙা শিম

কামরাঙা শিম বরবটি ও দেশি শিমের মতো লতা জাতীয় উদ্ভিদ। এ শিম গাছের ফুল, ফল, লতা, পাতা, শিকড় সব অংশই খাওয়া যায়। এ শিমের আদি স্থান পশ্চিম আফ্রিকা। কারও মতে এ সবজি ভারতে প্রথমে চাষ শুরু হয়। দক্ষিণ ও পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় কামরাঙা শিম আবাদ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এছাড়া মিয়ানমার, মাদাগাসকার, পাপুয়া নিউগিনি, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বহু আগে থেকেই এ শিমের অস্তিত্ব দেখা গেছে।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশি উচ্চতা (১৫০০-২৫০০ ফুট) বিশিষ্ট স্থানে এ সবজি আবাদের জন্য বেশি উপযোগী। এ সুবিধার কারণে দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে কামরাঙা শিমের আবাদ প্রচলন বেশি। দেশের উত্তরাঞ্চলেও কোনো কোনো পরিবার সীমিত আকারে এ শিম আবাদ করে। বেশি আর্দ্রতা বিশিষ্ট উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এ শিম চাষের জন্য বেশি ভালো।
এ সবজি আবাদে পানির প্রয়োজনীয়তা কম হওয়ায় অপেক্ষাকৃত শুকনা এলাকায় কামরাঙা শিম চাষের প্রচলন বেশি। এ ফসল মূলত বসতবাড়ি ও তদসংলগ্ন এলাকায় পরিবারের চাহিদা মেটাতে সীমিত আকারে আবাদ করা হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অন্যান্য সবজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিসমৃদ্ধ এ কামরাঙা শিম আবাদ প্রবণতা বেশি দেখা যায় না। ডাল জাতীয় ফসলের মতো জমিতে নাইট্রোজেন যোগ করার ক্ষমতা এ সবজির আছে।  


পুষ্টিমান  ও খাবার উপযোগী অংশ :  কামরাঙা শিম অতি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ সবজি। মানুষসহ সব প্রাণিকুলের জন্য এ শিম অতি উপাদেয় ও পুষ্টিকর। কচি পাতা সুস্বাদু, পুষ্টিকর শাক হিসেবে খাওয়া যায়। এ শিমের হালকা নীল ফুল সালাদ ও সবজি হিসেবে খেতে অতি চমৎকার। কচি পাতা শুকিয়ে পাউডার করে চায়ের বিকল্প পানীয় হিসেবে ব্যবহার প্রচলন অনেক দেশেই আছে। চার কোণা বিশিষ্ট কচি শিম লম্বায় ১.র্৫র্ -র্২র্  (৪-৫ সেন্টিমিটার) হলে তা সংগ্রহ করে সবজি হিসেবে অতি  সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। সবজি হিসেবে ব্যবহার উপযোগী একেকটা শিমের ওজন প্রায় ৫০-৬০ গ্রাম।  পরিপক্ব শিম লম্বায় র্৫র্ -র্৬র্  ইঞ্চি (১৫-২০ সেন্টিমিটার) হতে পারে। প্রতিটা শিমে ৫-৭টা বীজ থাকে। পুষ্ট বীজ সংগ্রহ করে তা মটরশুঁটি বা শিম বীজের মতো সবজি হিসেবে মুখরোচক ও  উপাদেয়। পুষ্ট কামরাঙা শিমের বীজ শুকিয়ে পাউডার করে কফির বিকল্প পানীয় হিসেবে পান করার প্রচলন অনেক দেশেই আছে। এ গাছের শিকড় মিষ্টি আলুর মতো টিউবার বা মূল গঠন করে। এ আলু বা মূল বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সবজি হিসেবে ও চিপস তৈরি করে আহার করার সুবিধা আছে। গাছের ফুল ও কচি ফল সবজি হিসেবে নিয়মিত সংগ্রহ করা হলে শিকড়ের আকার বেশি বড় হয়। তাতে মূল বা আলুর ফলন বেশি হয়। শাকসবজিতে সাধারণত প্রোটিনের পরিমাণ কম। তবে কামরাঙা শিম গাছের সব অংশই প্রোটিনের উপস্থিতি তুলনায় অনেক বেশি। বীজে প্রোটিনের পরিমাণ সয়াবিনের মতো অত্যাধিক (৩০-৩৯%)। এতে আরও রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিনস ও মিনারেলস। সোডিয়াম ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি থাকে এবং এ সবজি কোলেস্টেরলমুক্ত। অন্যান্য প্রজাতির শিমের চেয়ে ক্যালসিয়ামের উপস্থিতি এতে খুব বেশি, যা হাড় ও দাঁতের সুস্বাস্থ্যের জন্য অতি উপকারী। এ শিমের শিকড়েও প্রচুর প্রোটিন থাকে যা অন্য কোনো প্রকার আলু বা টিউবার জাতীয় ফসলে দেখা যায় না। টিউবার বা শিকড়ে প্রোটিনের উপস্থিতি প্রায় ২০%।  নানা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে এ সবজি বিভিন্ন হারবাল মেডিসিন তৈরির কাজে ব্যবহার প্রচলন বেশি। এ ফসল পুষ্টিকর ‘ফডার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি লিগুমিনাস দলীয় ফসল হওয়ার কারণে জমির স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনে ফসল চক্রে এ শিম আবাদে প্রাধান্য  অন্যান্য দেশে বেশি দেয়া হয়।


বৈশিষ্ট্য : এটা বরবটি বা দেশি শিমের মতো লতানো গাছ। ফলের আকৃতি চার পাখা বা শিরা বিশিষ্ট যা দেখতে অনেকটা কামরাঙা ফলের মতো। সম্ভবত এজন্যই কামরাঙা শিম নামে পরিচিত। এ শিম চওড়ায় কম (২-৩ সেন্টিমিটার) এবং লম্বায় বেশি প্রায় ৮ ইঞ্চি (২০ সেন্টিমিটার)। একটা পূর্ণাঙ্গ শিম গাছ প্রায় ১০-১৫ ফুট লম্বা হয়। প্রতি গাছে মৌসুমে ৪০-৫০টা ফল ধরে। দিনের পরিধি অপেক্ষাকৃত ছোট হলে (১০-১১ ঘণ্টা) গাছে ফুল-ফল ধরা আরম্ভ করে। অনুকূল মৌসুমে বীজ রোপণের ৬-৭ সপ্তাহ পর থেকেই গাছে ফুল ধরা আরম্ভ করে। ফুল ও গাছের আকৃতি দেখতে সুন্দর হওয়ার কারণে সৌন্দর্য আহরণেও অনেকেই বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশে চাষ করে থাকে। ফুল ফোটার ১০-১২ দিন পর কচি শিম আহার উপযোগী হয়। বয়স্ক শিম শক্ত হলে সবজি হিসেবে খাওয়া যায় না। তবে পুষ্ট শিম থেকে বীজ বের করে মটরশুঁটির মতো বিভিন্নভাবে খাওয়া করা যায়। লতানো গাছে ফুল-ফল ধরা আরম্ভ করলে তা থেকে এক টানা পর্যায়ক্রমে প্রায় ৩ মাস পর্যন্ত সবজি সংগ্রহ করা যায়। আফ্রিকাতে বিভিন্ন বাগানে অয়েল পাম, পিচ ফল, কোকো, কাজুবাদাম, রাবার আচ্ছাদন ফসল (ঈড়াবৎ পৎড়ঢ়) হিসেবে এ সবজির আবাদ জনপ্রিয়তা বেশি। তাতে আগাছা দমনসহ, লতা-পাতা ও শিকড় পচে বাগানে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ে। এছাড়া এ শিম জমিতে রাইজোবিয়াম (নাইট্রোজেন) সার যোগ করতে সামর্থ্য হয়। এ ব্যবস্থায় জমিতে রস সংরক্ষিত থাকে, পানি সেচ কম লাগে, সর্বোপরি বাগানে গাছের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। আমাদের দেশেও ফল বাগানে এ ফসল অনুরূপভাবে আবাদ করে একই সুফল আহরণ করা দরকার।   


জাত :  এ দেশে কামরাঙা শিমের জাত উদ্ভাবনের উদ্যোগ তেমন নেই। তবে বারি কামরাঙা শিম -১ নামে একটা জাত অবমুক্ত করেছে। দেশি জাতগুলো মূলত আলোকসংবেদনশীল। তাই এ সবজি হেমন্ত, শীত ও বসন্তকালে দিনের আকার ছোট থাকা অবস্থায় চাষ করা হয়। বিদেশে নানা প্রজাতির এ শিম দেখা যায়। কোনো কোনো বিদেশি জাত বড় দিনেও অর্থাৎ গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল-ফল ধরে যা এদেশে আবাদ প্রচলন ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তাতে বছর ধরে এ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর সবজি অসময়ে প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।


চাষ পদ্ধতি :  বরবটির বা দেশি শিমের মতো সারি করে বীজ বপন করে আবাদ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতি সারির মাটি ২০-২৫ সেন্টিমিটার গভীর করে কুপিয়ে মাদা তৈরি করে নেয়া প্রয়োজন। বেশি ফলন পেতে তৈরি মাদায় যথেষ্ট পরিমাণ জৈব সার মিশিয়ে নেয়া ভালো। অন্য ফসলের মতো কামরাঙা শিম চাষের জন্য খুব বেশি উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না। অনুর্বর বেলে বা এঁটেল মাটিতেও এ ফসল ভালো ফলে। আবাদে খুব একটা বেশি সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। তবে পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু জমি এ সবজি আবাদের জন্য বেশি ভালো। ৩০-৪৫ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ২.৫৪ সেন্টিমিটার লম্বা মাদায় ৫০০ গ্রাম করে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি মিলে প্রায় ১৫০০ গ্রাম সার জমি তৈরি কালে প্রয়োগ করা হলে ফলন ভালো হয়। চারা গাজানোর প্রায় ৩ সপ্তাহ পর ২০ দিনের ব্যবধানে এতে  আরও ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার ২-৩ কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করা ভালো। ঠিকমতো আলো-বাতাস পায় এমন স্থানে এ সবজির ফলন ভালো হয়। উন্মুক্ত আধা ছায়াতেও এ সবজি ফলানো যায়। তবে বেশি ছায়ায় ফসল ভালো হয় না। সাধারণত পরিবারের চাহিদা মেটাতে এ সবজির আবাদ করার প্রচলন বেশি। পার্বত্য জেলার অধিকাংশ পরিবার এ ধরনের শিম চাষে বেশি আগ্রহী। তারা নিজের চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত শিম বিক্রি করে বাড়তি আয় করে থাকে।


বীজ বপন : বীজের আবরণ খুব শক্ত হওয়ায় অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কম (৪০-৫০%)। এজন্য বীজ বপনের আগে তা ২০-৩০ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নেয়া উত্তম। সাধারণত ৮-১০  ইঞ্চি (২০-৩৫ সেন্টিমিটার) দূরত্বে র্১র্  ইঞ্চি (২-৩ সেন্টিমিটার) গভীরতায় বীজ বপন করা হয়। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব হবে ৩-৪ ফুট (প্রায় এক মিটার)। বীজ বপনের ৫-৭ দিনের মধ্যে তা গজিয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে। এ ভাবে ৪-৫ সপ্তাহ বৃদ্ধির পর অনুকূল আবহাওয়ায় দিনের পরিধি কমে (১০-১১ ঘণ্টা) গেলে গাছে ফুল ফোটা আরম্ভ করে। কাঁকরোলের মতো কামরাঙা শিমের শিকড় থেকেও চারা তৈরি করা হয়। মৌসুম শেষে অনেকে বয়স্ক গাছের শিকড় সংগ্রহ করে রেখে দেয় পরে শরৎ-হেমন্ত কালে তা পুনরায় বীজের বিকল্প হিসেবে রোপণ করে থাকে।  


অন্য ফসলের মতো এ সবজি মাঠ ফসল হিসেবে আবাদ প্রচলন নেই। বাড়ির আঙিনায় শিম, বরবটি, শশা, করলার মতো ১.৫-২.০ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠির বাউনি বা ছোট আকারের মাচা তৈরি করে তাতে উঠিয়ে আবাদ ব্যবস্থা নেয়া হয়। সীতাকু- মডেলে কাঠি বা কঞ্চি খাঁড়া করে দিয়ে বাউনির ব্যবস্থা করে খুব সহজেই এ সবজি চাষ করা যায়। এ সবজির লতা, ফুল, ফল সবই দেখতে সুন্দর হওয়ায় এবং সৌন্দর্য ও ফলন উভয় প্রাপ্তির লক্ষ্যে বাগানোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে অনেকে এ সবজি আবাদ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।


পরিচর্যা : বীজ বপনের পর মাটি বেশি শুকনা হলে তা গজাতে বিলম্বিত হতে পারে। তাই মাটিতে রসের অভাব হলে ২-৩ দিনের ব্যবধানে হালকাভাবে সেচ দেয়া ভালো। চারা গজিয়ে এক ফুট লম্বা হলে আগা ভেঙে দেয়া প্রয়োজন। তাতে শাখা-প্রশাখার সংখ্যা বাড়বে, ফুল-ফল বেশি দিবে। লতানো গাছে বাউনি হিসেবে ২.৪-৩.০ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠি দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দুইসারির কাঠির আগা বেঁধে দিলে উভয় দিক থেকে বাড়ন্ত লতা সুন্দরভাবে বাড়তে সহায়ক হয়। বিকল্প ব্যবস্থায় করলা, বরবটি, শশার মতো কম চওড়া বিশিষ্ট মাচা দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। শিম গাছের গোড়ার মাটিতে রসের অভাব হলে মাঝে মাঝে হালকা সেচ দেয়া প্রয়োজন। তবে খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় কোনো ক্রমেই যেন পানি  না জমে। এজন্য জমিতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা জরুরি। জমি সব সময় নিড়ানি দিয়ে আগাছামুক্ত ও মাটিতে চট ধরলে মাটি আগলা করে দেয়া দরকার। এ শিমে পোকা ও রোগের উপদ্রব খুবই কম।


ফলন : প্রতি গাছ থেকে প্রায় ৪০-৬০টা কচি সবজি আহরণ করা যায় এবং সংগৃহীত এ গাছের সবজির পরিমাণ প্রায় ৪-৫ কেজি হয়। এ ব্যবস্থায় প্রতি পরিবারে সীতাকু- মডেলে স্বল্প পরিসরে ২০-৩০টা  এ শিম গাছ রোপণ করা হলে তাতে একেক পরিবারের জন্য প্রায় ১০০-১২৫ কেজি মৌসুমে সবজির প্রয়োজনীয়তা মেটানো যায়।
এ সবজির পাতা, ফুল, ফল, বীজ, শিকড়, সবই অতি পুষ্টিকর ও আহার উপযোগী এবং ভেষজ ঔষধিগুণসমৃদ্ধ  হওয়ার কারণে এ ফসলের সুফল আহরণ করা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।  পুষ্টিসমৃদ্ধ এ শিম প্রতিটা বসতবাড়িতে এবং বাড়ির ছাদে আবাদের জন্য অতি উপযোগী। বহুবিদ ব্যবহার উপযোগী মানুষ ও পশুপাখির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ এ গুরুত্বপূর্ণ সবজি সম্প্রসারণ করার দ্রুত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

এম এনামুল হক*
*মহাপরিচালক (অব.), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং সদস্য বিশেষজ্ঞ টিম (অচঅ), কৃষি মন্ত্রণালয়

বিস্তারিত
বোরো ধানে চিটা হওয়ার কারণ ও প্রতিকার ১৪২৪

প্রকৃতির সাথে কৃষির রয়েছে সুনিবিড় সম্পর্ক। ফসল উৎপাদনে আবহাওয়ার প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন প্রকৃতির কাছে এখনও আমরা নিদারুণ অসহায়। অবশ্য প্রকৃতির সাথে সেতুবন্ধনেই আমাদের কৃষক এগিয়ে যাচ্ছে। ধান ফসলও আবহাওয়ার প্রভাবে দারুণ প্রভাবিত। বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো এ হলো ধান আবাদের বিন্যাস। শুধু আবহাওয়াজনিত কারণে এ বিন্যাসগুলোর রয়েছে স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। বোরো মৌসুম ঠাণ্ডা হিম শীতলের সমন্বয়ে নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ) মাসে শুরু হয়। আর শেষটা হয় চরম গরমের এপ্রিল-মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) মাসে। বোরো মৌসুমের প্রতিটা দিনেই রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্যতা। গবেষণায় দেখা গেছে, ধান গাছ তার জীবনচক্রের মধ্যে কাইচ থোড় থেকে ফুল ফোটা  পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা ও গরম সহ্য করতে পারে না। ওই সময় বাতাসের তাপমাত্রা যদি ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অথবা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যায়, তাহলে ধানে ব্যাপকভাবে চিটা দেখা দেয়। তাছাড়া এ সময়ে খরা, ঝড়, পোকামাকড় বা রোগবালায়ের আক্রমণ হলেও চিটা হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে ধানের জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তরে ক্রিটিক্যাল (নিম্ন) তাপমাত্রা
গবেষণা মোতাবেক ধান গাছের জীবন চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রিটিক্যাল (নিম্ন) তাপমাত্রার একটি স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। ধানের জীবন চক্রের অঙ্কুরোদগম অবস্থায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চারা অবস্থায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কুশি অবস্থায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, থোড় অবস্থায় ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ফুল ফোটা অবস্থায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা চলে গেলে ফলনে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এতে ফলন অনেক কমে যায়।

ধানে চিটা হওয়ার মূল কারণ
স্বাভাবিকভাবে ধানে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ চিটা হয়। চিটার পরিমাণ এর চেয়ে বেশি হলে ধরে নিতে হবে থোড় থেকে ফুল ফোটা এবং ধান পাকার আগ পর্যন্ত ফসল কোনো না কোনো প্রতিকূলতার শিকার হয়েছে, যেমন অসহনীয় ঠাণ্ডা বা গরম, খরা বা অতিবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, পোকা ও রোগবালাই। একটু বিস্তারিত বলতে গেলে
ঠাণ্ডা :  রাতের তাপমাত্রা ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দিনের তাপমাত্রা ২৮-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (কাইচ থোড় থেকে থোড় অবস্থা অবধি) ধান চিটা হওয়ার জন্য মোটামুটি সংকট তাপমাত্রা। তবে এ অবস্থা পাঁচ/ছয় দিন শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকলেই কেবল অতিরিক্ত চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাতের তাপমাত্রা সংকট মাত্রায় নেমে এলেও যদি দিনের তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে তবে চিটা হওয়ার আশংকা কমে যায়।
গরম : ধানের জন্য অসহনীয় তাপমাত্রা হলো ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি। ফুল ফোটার সময় ১-২ ঘণ্টা ওই তাপমাত্রা বিরাজ করলে মাত্রাতিরিক্ত চিটা হয়ে যায়।
ঝড়ো বাতাস : প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসের কারণে গাছ থেকে পানি প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায়। এতে ফুলের অঙ্গগুলো গঠন বাধাগ্রস্ত হয়। আবার ঝড়ো বাতাস পরাগায়ন, গর্ভধারণ ও ধানের মধ্যে চালের বৃদ্ধি ব্যাহত করে। এতে ধানের সবুজ খোসা  খয়েরি বা কালো রঙ ধারণ করে। ফলে ধান চিটা হয়ে যেতে পারে।
খরা : খরার কারণে শিষের শাখা বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং বিকৃত ও বন্ধ্যা ধানের জন্ম দেয়ায় চিটা হয়ে যায়।
শৈত্যপ্রবাহ বা ঠাণ্ডা জনিত কারণের লক্ষণ
চারা অবস্থায় শৈত্যপ্রবাহ থাকলে চারা মারা যায়। কুশি অবস্থায় বাড় বাড়তি কমে যায়, গাছ হলুদ হয়ে যায়, থোড় অবস্থায় শিষ পুরোপুরি বের হতে পারে না, শিষের অগ্রভাগের ধান মরে যায় বা সম্পূর্ণ চিটা হয়ে যায়।
প্রতিরোধের উপায়
ফসল চক্রে নেমে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করা কঠিন। কিন্তু বোরো ধান অগ্রহায়ণের শুরুতে বীজ বপন করলে ধানের থোড় এবং ফুল ফোটা অসহনীয় নিম্ন বা উচ্চ তাপমাত্রায় পড়ে না, ফলে ঠাণ্ডা ও গরম এমনকি ঝড়ো বাতাসজনিত ক্ষতি থেকেও রেহাই পাওয়া সম্ভব। চিটা ব্যবস্থাপনা করার প্রয়োজনীয় পরামর্শ হলো-


ব্রি ধান২৮ এর ক্ষেত্রে ১৫-৩০ নভেম্বরের মধ্যে এবং ব্রিধান ২৯ এর ক্ষেত্রে ৫-২৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন সম্পন্ন করতে হবে।  অর্থাৎ দীর্ঘ জীবনকাল সম্পন্ন (১৫০ দিনের ওপর) ধানের জাতগুলো নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এবং স্বল্প জীবনকালের (১৫০ দিনের নিচে) জাতগুলো ১৫ নভেম্বর থেকে বীজতলায় বপন করতে হবে।
বোরো মৌসুমে কেবল ব্রি ধান২৮ চাষ না করে বিআর ১, ব্রি ধান৩৫ ও ব্রি ধান৩৬ এর আবাদ করতে হবে।


বীজতলায় চারা থাকা অবস্থায় শৈত্যপ্রবাহ চললে চারার উচ্চতা ভেদে ৫-১০ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে। তাছাড়া স্বচ্ছ এবং পাতলা পলিথিনের ছাউনি দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ কালে দিনে ও রাতে আচ্ছাদিত রাখতে হবে।


চারা রোপণের জন্য ৩৫ থেকে ৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করতে হবে। কুশি অবস্থায় শৈত্যপ্রবাহ চললে জমিতে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে। তাছাড়া থোড় ও ফুল ফোটা স্তরে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা থাকলেও ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পানি রাখলে চিটার পরিমাণ হ্রাস করা যায়।
অতি আক্রমণকাতর জাতের আবাদ পরিহার করা বা অবস্থার প্রেক্ষাপটে কৃষক আবাদ অব্যাহত রাখলে ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পাশাপাশি পরিমিত ইউরিয়া ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ব্রি ধান২৮ এর গড় জীবনকাল ১৪০ দিন। মনে করি, একজন কৃষক ২৫ নভেম্বর বীজতলায় বীজ বপন করল। ৪০ দিন বয়সের চারা মাঠে রোপণ করেন (০৪ জানুয়ারি)। মূল জমিতে চারা লাগানোর পর থেকে সর্বোচ্চ কুশি স্তর পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৪০ দিন (১৫ ফেব্রুয়ারি)। অতঃপর ধান গাছের প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তর শুরু হয়। ধান গাছে কাইচ থোড় থেকে ফুল ফোটা স্তর পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ৩০ দিন (১৫ মার্চ)। পরবর্তীতে ধান পাকা পর্যায়ের দুধ স্তর শুরু হয়ে পরিপক্বতায় পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে (১৫ এপ্রিল)। এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় জানুয়ারি মাস সবচেষে শীতল মাস। তাছাড়া এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে। হাওর অঞ্চলে আগাম বোরো ধান আবাদ করলে অর্থাৎ অক্টোবর মাসের শেষ দিকে বীজতলা এবং ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে মূল জমিতে রোপণ করলে নিশ্চিত অতিরিক্ত ঠাণ্ডাকালীন (১৫ জানুয়ারি) প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তর আক্রান্ত হয় ফলে চিটা হয়। ঠাণ্ডাজনিত কারণে চিটা হলে আমরা এটাকে কোল্ড ইনজুরি বলে থাকি। আবার অনেক কৃষক ভাইরা যদি একটু দেরিতে বোরো আবাদ করেন অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে বা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে তাহলে প্রজনন পর্যায়ের কাইচ থোড় স্তরটি অতি গরমকালীন (১৫ মার্চ) গরমে আক্রান্ত হতে পারে। ফলে ধানে চিটা হতে পারে।
এক কথায় বলতে গেলে, ব্রি ধান২৮, ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে সবচেয়ে বেশি ফলন পাওয়া যায়। ব্রি ধান২৯, ২০ ডিসেম্বর হতে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করলে চিটার পরিমাণ কম হয় এবং ফলন বেশি হয়। তাই ব্রি ধান২৯ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ০৫ থেকে ২৫ নভেম্বর এবং ব্রি ধান২৮ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলো ১৫ থেকে ২৫ নভেম্বর। তাই উফশী নাবি জাতগুলো ৫ নভেম্বর এবং আগাম জাতগুলো ১৫ নভেম্বর থেকে বীজ বপন শুরু করলে ফসলের থোড়/গর্ভাবস্থা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করতে পারে, ফলে ঠাণ্ডা বা গরমের কারণে ধান চিটা মুক্ত হবে এবং ফলন বেশি হবে।
মোদ্দাকথা হলো ধানের কাইচ থোড় থেকে ফুল স্তর পর্যন্ত সময়টুকু অতিরিক্ত ঠাণ্ডা (জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রয়ারি) এবং অসহনীয় গরম (মার্চ থেকে মধ্য এপ্রিল) এ সময়ে ফ্রেমে যেন না পড়ে সেদিকে একটু বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের স্বাভাবিক কৃষি কাজ ও অগ্রগতিকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। শৈত্যপ্রবাহ, অসহনীয় উত্তাপ, ঝড়, বন্যা, পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের প্রাদুভাব সমূলে নির্মুল করা সম্ভব নয় তবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। তাই কৃষকদেরই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। জয় হোক কৃষকের।

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ*

*আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট

 

বিস্তারিত
গ্রীষ্মকালীন মুগডালের চাষ

ডাল বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় উদ্ভিদ উৎস থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান। এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ছাড়াও শর্করা, চর্বি ও খনিজ রয়েছে। মুগ, মসুর, মাষকলাই, ছোলা, মটর যে কোনো ডালই হোক না কেন তা শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং উপকারী। তবে নিরামিষভোজীদের জন্য মুগডাল জনপ্রিয় একটি খাবার। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যামাইনো এসিড ও উচ্চমাত্রার প্রোটিন রয়েছে যা শরীরে আমিষের ঘাটতি পূরণ করে। কাজেই প্রতিদিনের তালিকায় এ খাবারটি রাখা ভালো। মুগডালের প্রধান কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো- হজমে সহায়তা করে শরীরের পরিপাক নালির মধ্যে যে বিষাক্ত পদার্থ আছে তা বের করে দেয়, ফলে হজম শক্তি বাড়ে। এ ছাড়া এতে লেসিথিন নামে এমন এক ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে যা যকৃতে চর্বি জমাতে বাধা দেয়। অপর দিকে, মুগ ডালে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকায় ক্ষুধা কম লাগে। এতে ভিটামিন বি২ নামে এমন একটি উপাদান রয়েছে যা ক্যান্সারের কোষগুলো ধ্বংস করতে সহায়তা করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি চমৎকার খাবার হলো মুগ ডাল। এটি রক্তে শর্করার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং বিভিন্ন রোগের হাত থেকে বাঁচায়।  মুগের এত গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বাংলাদেশে ৬ লাখ হেক্টর জমিতে ৫ লাখ টন ডাল উৎপাদিত হয় যা চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ। উপরন্তু প্রতি বছর দেশে ডাল উৎপাদন কমছে কিন্তু বাড়ছে ডালের চাহিদা। তবে আশায় কথা হচ্ছে বিগত কয়েক বছরে অন্যান্য ডালের আবাদ কমলেও কিন্তু মুগের আবাদ বাড়ছে। এর কারণ হলো মুগই একমাত্র ফসল যা শীতকালীন ফসল কাটার পর চাষ করা যায়। কিন্তু মুগ চাষের প্রধান অসুবধাগুলোর মধ্যে একটি হলো মুগের ফল একই সাথে পাকে না ফলে একাধিকবার ফল সংগ্রহ করাত হয় যা শ্রমঘন কাজ। বর্তমানে প্রচলিত জাতগুলোর ফল একই সাথে পাকে না। মুগের ফলগুলো যেন একই সাথে  পাকে  সে  উদ্দেশ্যকে  সামনে রেখে  বাংলাদেশ কৃষি  গবেষণা  ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীগণ গবেষণার মাধ্যমে কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন যা ফলগুলো প্রায় একইসাথে পাকে এবং ফলনও ভালো। নতুন জাতজাতগুলো হলো বারিমুগ-৫, বারিমুগ-৬, বিনামুগ-৫, বিনামুগ-৭, বিনামুগ-৮ এবং বিইউ মুগ-৪। জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো গাছের উচ্চতা খাটো থেকে মাঝারি (৩৫-৪০ সেন্টিমিটার), জীবনকাল কম (বীজ বপন থেকে পরিপক্ব পর্যন্ত সময় লাগে ৬৫-৭০ দিন), বীজের আকার মাঝারি ও উজ্জ্বল সবুজ, গ্রীষ্মকালে চাষের উপযোগী। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১.৮ টন এবং পাতা হলুদ মোজাইক ভাইরাস সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন।


চাষ উপযোগী জমি : বৃষ্টির পানি জমে থাকে না এরূপ যে কোনো জমিতেই মুগের চাষ করা যায়। তবে বেলে দো-আঁশ জমিতে চাষ করলে ফলন ভালো হয়। বৃষ্টি বা অন্য কারণে ক্ষেত্রে পানি জমে গেলে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
 

বপনের সময় : গ্রীষ্মকালীন মুগ বপনের সময় অঞ্চলভেদে কিছুটা তারতম্য হয়। দক্ষিণাঞ্চলের (বরিশাল বিভাগ) জেলাগুলো মাঘ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফাল্গুন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত (জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারি মসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত) সময়ের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ফাল্গুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চৈত্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত (ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে মার্চেও শেষ পর্যন্ত) সময়ের মধ্যে বীঝ বপন সম্পন্ন করতে হবে। মার্চের ১৫ তারিখের পর (ফাল্গুন মাসের পর) বপন করলে ফলন কমে যায়।
সতর্কতা : আষাঢ় মাসের (মধ্য জুন থেকে জুলাই) অবিরাম বৃষ্টিতে মুগের ফল পচে যায়। চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহ মধ্যে (মধ্য মার্চ) বীজ বপন সম্পন্ন করতে পারলে আষাঢ় মাসের আগে ফসল সংগ্রহ করা যায় এবং ফল পচনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়। এ ছাড়াও অনুমোদিত সময়ের আগে বীজ বপন করলে শীতের কারণে চারা মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

জমি তৈরি : জমির অবস্থাভেদে ২-৪ টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। শীতকালীন ফসল তোলার পর মুগ চাষের জন্য ১-২টি চাষই যথেষ্ট তবে পতিত জমির জন্য ৩-৪টি চাষ লাগে। জমিতে পানির অভাব হলে হলে বীজের অংকোরোদগমের সুবধার জন্য একটি হালকা সেচ দেয়া প্রয়োজন।
সার প্রয়োগ : জমির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে সারের তাপতম্য করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সার সুপারিশমালা অনুসরণ করতে হবে। তবে সাধারণভাবে একরে ১২-১৫ কেজি ইউরিয়া, ২৮-৩০ কেজি টিএসপি, ১৫-২০ কেজি এমওপি ও ৫ কেজি জিপসাম সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বপন পদ্ধতি ও বীজের পরিমাণ : মুগকালাই সাধারণ ছিটিয়ে বপন করা হয়। বপনের পর ভালোভাবে মই দিয়ে বীজগুলো ঢেকে দিতে হবে। তবে সারিতে বপন করলে ব্যবস্থাপনায় সুবধিা হয় ও ফলন বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি হতে হবে। একরে ১০-১২ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।


আগাছা দমন : চারা গজানোর পরে জমিতে আগাছা আগাছা দেখা দিলে ১৫-২০ দিন পর নিড়ানি দিয়ে হালকাভাবে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে  ফেলতে হবে। এতে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
পানি সেচ : মুগকালাই চাষাবাদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় পানি সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে জমিতে অত্যধিক পানির প্রয়োজন হলে একবার সেচ দেয়া বাঞ্ছনীয়। এতে ভালো ফলন পাওয়া যায়।  
রোগ ও পোকামাকড় দমন : নতুন উন্নত মুগ ডালের জাতগুলো পাতার সার্কোস্পোরা দাগ রোগ প্রতিরোধ  ক্ষমতাসম্পন্ন এবং হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগ সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন। তাছাড়া পোকার আক্রমন ও তুলনামুুলক কম। মোজাইক ভাইরাস রোগ দেখা দেয়া মাত্র গাছ উপড়ে ফেলতে হবে। সাধারণত কোন ছত্রাকনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না তবে ছত্রাকের মারাত্মক আক্রমণ হলে যে কোনো ছত্রাকনাশক (ডাইথেন এম ৪৫, বেভিস্টন ৫০, রিডোমিল গোন্ড) ৭-১০ দিন পর পর দুইবার প্রয়োগ করা যেতে পারে। পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে ডায়াজিনন ৬০ইসি, নুভাক্রন ৮০ wsc, রিপকর্ড ব্যবহার করা যায়।

 

ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ : মুগকালাই ক্ষেত  থেকে সংগ্রহ করা খুবই অসুবিধাজনক। কারণ দেশে যেসব প্রচলিত জাত আছে সেগুলোর ফল একসাথে পাকে না বিধায় কয়েকবার সংগ্রহ করতে হয়। এক্ষেত্রে নতুন উন্নত মুগ ডালের জাতগুলোর ফল প্রায় একই সাথে পাকে ফলে সংগ্রহ করা সহজ। ফসল কাটা হলে গাছগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা গরু দিয়ে মাড়াই করে বীজ সংগ্রহ করতে হয়।
এ পর বীজগুলো পরিষ্কার করে এবং ভালোভাবে  রোদে শুকিয়ে মাটি বা টিনের পাত্রে মুখ বন্ধ করে সংরক্ষণ করা হলে অনেক দিন পর্যন্ত বীজ ভালো থাকে।

ড. এম. মনজুরুল আলম মণ্ডল*
*পিএসও, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ, # ০১৭১৬৭৪৯৪২৯

বিস্তারিত
পেয়ারা চাষ

বাংলাদেশে পেয়ারা চাষ বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছে। পেয়ারার উচ্চফলন পেতে হলে কতগুলো আধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণ করতে হবে যা এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো। হালকা বেলে মাটি ও  দো-আঁশ মাটিতে পেয়ারা ভালো হয়।
পেয়ারার জাত
বীজ দ্বারা বংশবিস্তার করা সবচেয়ে সহজ। কিন্তু বীজের গাছে মাতৃগাছের গুণাগুণ থাকে না এবং ফল অনেক সময় নিকৃষ্ট হয়। তাই বীজ দিয়ে বংশবিস্তার না করে কলমের দ্বারা বংশবিস্তার করাই উত্তম। গুটি কলম দ্বারা বংশবিস্তার খুব সহজ। বর্ষাকাল আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথেই গুটি কলম করতে হয়। গুটি বাঁধার জন্য পেন্সিলের মতো মোটা একটি ডাল বেছে নিয়ে ডালটির আগা হতে নিচের দিকে ৩০-৩৮ সেন্টিমিটার জায়গা ছেড়ে দিয়ে ৩.৮ হতে ৫ সেন্টিমিটার পরিমাণ স্থানের বাকল গোল করে কেটে খুব ভালো করে পরিষ্কার করে তুলে ফেলতে হবে।
এরপর ওই স্থানে পচা গোবর মিশ্রিত কাদামাটি চারদিকে ১.৩-২.৫ সেন্টিমিটার পুরু করে লাগিয়ে খড়, ছালার টুকরো অথবা প্লাস্টিক দিয়ে ভালো করে বেঁধে দিতে হবে যাতে সময়মতো গুটি বের হয়।     
পেয়ারা থেকে উচ্চফলন অব্যাহত রাখতে হলে গাছ প্রতি নি¤œরূপ হারে নিয়মিত সার প্রয়োগ করতে হবেÑ
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা : গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।  রোপণের পর প্রথম দিকে মাটি ঝুরঝুরে রাখতে হবে নতুবা চারা দ্রুত বাড়বে না। এজন্য মাঝে মাঝে বিশেষ করে সেচ দেয়ার পর জমিতে জো আসলে কোদাল দিয়ে জমির চটা ভেঙে দিতে হবে।  
অ্যানথ্রাকনোজ রোগ লক্ষণ
ফল ও পাতায় দাগ পড়ে। তারপর কালো হয়ে শুকিয়ে যায়।
রোগ দমন : এ রোগ দমনের জন্য সপ্তাহ পরপর কম্পেনিয়ন ২ গ্রাম/লিটার পানি স্প্রে করতে হবে। এছাড়া বাগান পরিষ্কার রাখতে হবে।
সুটি মোল্ড রোগ লক্ষণ : পাতায় কালো ময়লা পড়ে।
রোগ দমন : এ রোগ দমনের জন্য ব্লিটক্স ২ গ্রাম/লিটার সাথে অটোমিডা ১ গ্রা/লি. পানি স্প্রে করতে হবে।
স্কাব রোগ লক্ষণ : ফল দাগযুক্ত ও কুঁচকানো হয়।
রোগ দমন : এজন্য গাছ সাকসেস ১.৫ গ্রা/লি. + কুমুলাস ২ গ্রা/লি ১.৫ মি.লি/লিটার পানি স্প্রে করতে হবে।
ডাই ব্যাক রোগ লক্ষণ
গাছের কচি ডাল আগা থেকে শুকিয়ে মারা যায়।
রোগ দমন : আক্রান্ত গাছে ডাইথেন এম ৪৫ (ব্লেটক্স) অথবা বোর্দো মিশ্রণ (১%) স্প্রে করতে হবে।
ফল মাছি : মাটির মেগট ফলের ভেতরে খেয়ে নষ্ট করে।
ফল মাছি দমনের জন্য এমিটাফ ১.৫ গ্রাম বা রিভা ০.৫ মিলি/লি স্প্রে করতে হবে। সপ্তাহান্তর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
পেয়ারা গাছের পাতা হতে রস চুষে খায়। ফলে পাতা কুঁকড়ে যায় এবং রঙ পরিবর্তিত হয়ে সাদা হয়।
দমন ব্যবস্থাপনা :  এসাটাফ ১.৫ গ্রাম/লিটার পানি আক্রমণের আগে স্প্রে করতে হবে।
ফল আহরণ : ফল আহরণের উপযুক্ত হলে সবুজ রঙ পরিবর্তিত হয়ে হলুদাভ সবুজ বা হলুদ হয়।
 প্রতিটি ফল এক এক করে সম্ভব হলে  সিকেচার দিয়ে কেটে আহরণ করতে হয়। বছরে ২ বার ফল আহরণ করা হয়।
ফলন : ৩-৩ বছর বয়সের কাজী পেয়ারা ও বারি পেয়ারা-২ গড়ে ১২৫ কেজি এবং ১০২ কেজি ফলন দিয়ে থাকে।
বীজের গাছের তুলনায় কলমের গাছ বেশি ফলন দেয়।

 

প্রফেসর ড. মো. সদরুল আমিন*
*সাবেক ডিন হাজী দানেশ বিপ্র বিশ্বদ্যিালয় দিনাজপুর; ০১৯৮৮৮০২২৫৩, ০১৭৩১৫৭৫২২৬.  # sadrulamin47@gmail.com

বিস্তারিত
যেভাবে পাবনা ক্যাটল

বাংলাদেশে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন শুরু হয়েছিল আঠারো শতকের শেষভাগে। কাজটি শুরু করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার যৌবনের ঊষালগ্নে যখন পূর্ববঙ্গে পদার্পণ করেছিলেন তিনটি অঞ্চলের জমিদারি দেখভাল করার জন্য, কাজটি তিনি তখনই শুরু করেন। বাস্তবিক অর্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার ছিলেন না; বরং তিনি জমিদারি প্রথার বিরোধী একজন বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর ছিলেন। আমরা তার পরিচয় পাই অচলায়তন অথবা রক্ত করবী নাটকে অথবা রথের রাশি কাব্যে। সাঁওতাল, ডোম, সুইপার, মুচি কম উঠে আসেনি তার সাহিত্যে। বলা যেতে পারে তিনি সমাজে বঞ্চিত-লঞ্ছিত মানুষের সেবা করার জন্য জমিদারির ধন অকাতরে বিলিয়েছেন। এ মানুষটি এসবের স্বাক্ষর রেখেছেন তার লেখায় এবং কাজে। নোবেল বিজয়ে প্রাপ্ত পুরো অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন খরাপ্রবণ পূর্ববঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল নওগাঁ জেলার বা পতিসরের কৃষকের জন্য। নোবেলের অর্থ দিয়ে তিনি বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রথম চালু করেছিলেন কৃষকের সমবায় ব্যাংক। এ ব্যাংকের পুরো লগ্নি ছিল রবী ঠাকুরের নোবেলের অর্থ। কৃষি কাজকে তিনি এমনভাবেই উৎসাহিত করেছেন, পৃষ্টপোষকতা করেছেন।
পূর্ববঙ্গে যখন শাহজাদপুর অঞ্চলে তার পরগনা দেখতে আসতেন; তিনি আসতেন নৌপথে। নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গ তার সৃজনশীল মন খুলে দিয়েছিল অন্যভাবে। বর্ষার যত গান, যত কাব্য সব তো তিনি লিখেছিলেন পদ্মা, মেঘনা, যমুনার উত্তাল ঢেউয়ে উদ্বেলিত হয়ে। উম্মত্ত পদ্মা আর ষড়ঋতুর বিচিত্র আকাশ রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে যে কত রূপ দিয়েছিল তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু তিনি ভাবেননি অথবা লেখেননি। নদীর সাথে বসবাস যেসব মানুষের, তাদের ভাঙা গড়ার অনিশ্চিত জীবনকে কীভাবে কল্যাণকর জীবনে রূপান্তর করা যায়, রবীন্দ্রনাথ তা ভেবেছেন অত্যন্ত গভীরভাবে। সে ভাবনা থেকেই এদেশে চলনবিল এবং গোয়ালা নদীর তীরের জলমগ্ন মানুষদের জন্য তিনি হাতে নিয়েছিলেন গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন কার্যক্রম। যমুনা থেকে বড়াল, বড়াল থেকে গোয়ালা এবং এর চারপাশ দিয়ে চলনবিল; এলাকাটি শাহজাদপুর। তদানীন্তন পাবনা  জেলার একটি থানা। বড় বিচিত্র এখনাকার ভূ-প্রাকৃতিক রূপ। শুকনো মৌসুমে এখানে জমিনগুলো জেগে থাকে ৬ থেকে ৯ মাস। আর বর্ষার পানির নিচে, বর্ষায় এ অঞ্চলের মানুষের আশ্রয় কেবল পাহাড়ের মতো মাটির ঢিবির ওপরের ঘরবাড়ি। এখানকার মানুষ সরল কিন্তু অলসও বটে। দারিদ্র্য এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। রবীন্দ্রনাথ এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের কাজে হাত দিলেন। ব্যবহার করলেন গোয়ালা নদী। একটি নদীকে সম্পদ ভাবলেন রবী ঠাকুর এবং এ সম্পদ ব্যবহারের চিন্তায় মগ্ন হলেন কবি। এখানকার অলস মানুষ বিস্তীর্ণ জমিতে গতর খাটায়, মাঠে বেশ গরু বাছুর দেখা যায়।
রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কাজ। এজন্য ভারত থেকে নিজ অর্থে নিয়ে এলেন শাহীওয়াল ও সিন্ধি জাতের কিছু ষাড়। ষাড়গুলো রবীন্দ্রনাথ শাহজাদপুর অঞ্চলের কৃষকের মাঝে বিতরণ করলেন। যাদের ষাড় প্রদান করা হলো তাদের জন্য শর্ত একটাই, সেটা হলো তাদের খর্বাকৃতির গাভীগুলো যখন প্রজননে আসবে, তখন এ উন্নত জাতের ষাড় দিয়ে শংকরায়ন করাতে হবে এবং তা বিনামূল্যে। শুরু হলো বঙ্গদেশে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন কার্যক্রম। শ্রী ঠাকুর ষাড়ের মালিকদের প্রতি মাসে ৩০ টাকা করে বরাদ্দ করলেন সেসব ষাড়ের খাদ্য, যতœ এবং ওষুধপত্রের জন্য। ৩০ টাকা তখনকার সময় একজন উচ্চ মানের সরকারি কর্মকর্তার বেতনের চেয়ে বেশি ছিল। শাহজাদপুরের প্রজারা ভালো একটি কাজ পেয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন শাহজাদপুরে গরুর জাত উন্নয়ন হবে। সুতরাং উন্নত জাতের গবাদিপশুর জন্য চারণভূমি প্রয়োজন। শ্রী ঠাকুর নিজের জমিদারি থেকে ৬০৭ হেক্টর জমি গরুর বাথানের জন্য দান করলেন। বিস্তীর্ণ এ জমিতে শাহজাদপুরের গরু নাক ডুবিয়ে সবুজ ঘাস খায়, এদের স্বাস্থ্য অত্যন্ত সুঠাম, রোগব্যাধী নেই, দিনভর ঘাস খায় আর সময়মতো গোয়ালা নদীতে গোসল করে, সাঁতার কাটে শাহজাদপুরের গরু। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। দেখতে দেখতে অতি অল্প সময়ে কয়েক হাজার সংকর জাতের গাভী সৃষ্টি হলো শাহাজাদপুরে। এরা স্বাভাবিক নিয়মে দিনে ১০-১৫ লিটার দুধ দিতে শুরু করল, এ গাভীগুলো শাহাজাদপুর তথা পূর্ববঙ্গের আবহাওয়ার সাথে বেশ খাপ খাইয়েছিল। এরা রোদ, বৃষ্টি, শীতে ভীষণ রকম সহনশীল একটি ভিন্ন ধারার গরুর জাত। এ জাতের তখন নাম হলো পাবনা ক্যাটল এবং এর জনক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বর্তমানে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের দিগ¦দিক গতিধারায় পাবনা ক্যাটল আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। সত্যি কথা বলতেই হয়, পাবনা ক্যাটল কিছু নিজস্ব সকীয়তা নিয়ে এদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের দেশে ফ্রিসিয়ান, শাহীওয়াল দিয়ে জাত উন্নয়ন শুরু হয়েছে ১৯৭৫ সাল থেকে। কিন্তু বড় সত্যি কথা হচ্ছে প্রায় ৫০-৫৫ বছর সময়ের মধ্যে শাহজাদপুর অঞ্চলে একটি অধিক দুগ্ধ উৎপাদনশীল গরুর জাত সৃষ্টি হয়েছিল বলেই ১৯৪৭ সালে সেখানে দুধ পাউডার করার শিল্প স্থাপিত হয়েছিল। সে এক বিস্ময়কর অধ্যায়, ১৯৪৭ সালে সম্ভবত এ দেশে কৃষিভিত্তিক অন্য কোনো শিল্প এত সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। অথচ পেয়েছিল দুধ পাউডার করার একটি আধুনিক শিল্প; শাহজাদপুরের কোল ঘেসে, লাহিরী মোহনপুর রেলস্টেশনের পূর্বপাশে। শুধু দুধ পাউডারকরণ কেন? দগ্ধ উৎপাদনকারীদের নিয়ে একটি সমবায়ও গড়ে উঠেছিল পাবনার শাহজাদপুরে। কালের প্রবাহে আজ সব কেমন বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এ বঙ্গের গর্ব করার মতো গরুর দুটি জাত আজ বিলিন হতে চললো, কেউ এর খোঁজ রাখে না; কেউ এসব নিয়ে ভাবেন না। বিলিনের পথে দুটি জাতের মধ্যে একটি পাবনা ক্যাটল অন্যটি রেড চিটাগাং ক্যাটল। যারা গবাদিপশুর উন্নয়ন নিয়ে বাস্তবমুখী চিন্তা করেন, তাদের যতœকরে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হয়। আজ বিশৃঙ্খল জাত উন্নয়নের ধারায় আমরা আমাদের নিজস্ব জাতের গরু ধরে রাখতে পারছি না। খুব সত্যি কথা হচ্ছে, যদি খুব নির্বাচিতভাবে আমরা পাবনা ব্রিড এবং চিটাগাং ব্রিড দুটি টিকিয়ে রাখতে পারতাম তবে কত উপকার আমাদের হত তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কারণ দুটি জাতের গরুই কম খায়, এদের রোগব্যাধী কম হয় এবং এরা বেশি দুধ দেয়। দুটি জাতই বিরূপ আবহাওয়ায় বেশি সহনশীল।
একটি অপ্রিয় সত্যি না বললেই নয়; সেটি হচ্ছে যত্রতত্র কৃত্রিম প্রজনন। এসব করে আজ দুধের উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে বটে। কিন্তু কৃত্রিম প্রজননের জন্য যে শত শত কোটি টাকা ব্যয়  করা হচ্ছে এর ফল আমরা কি পাচ্ছি? দেশে ৭০ লাখ সংকর জাতের গরু আছে। কিন্তু সংকর জাতের গাভীগুলোর প্রজনন স্বাস্থ্যের হাজারো সমস্যা, অধিকাংশ গাভী একবার বাচ্চা দেয়ার পর আর গর্ভধারণে সক্ষম হচ্ছে না। আমাদের ধারণা কেবল কৃত্রিম প্রজনন করিয়ে দিলেই হয়ে গেল, এখন দুধের নহর বইবে। আসলে কী তাই? এখানে কৃত্রিম প্রজনেনর ফলে গাভীর মৃত্যু, বাছুরের মৃত্যু, ওলানফোলা রোগ, রিপিট ব্রিডিং, প্রজনন ক্ষমতা চিরতরে নষ্ট হওয়া, মিল্কফিভার এসব ঘটনা মাঠ পর্যায়ে হাজারে হাজারে ঘটছে। কিন্তু মূল্যবান এ গোসম্পদের সঠিক উন্নয়নের জন্য এ বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই, নেই কোনো সঠিক তথ্য, নেই কোনো প্রতিকারের বিধান। ফলে ফ্রিসিয়ান এবং শাহীওয়াল জাতের বীজ দিয়ে সংকরায়নের কারণে দেশে প্রাথমিক পর্যায় ১৯৮০-১৯৯০ সাল পর্যন্ত গাভীপ্রতি দুধের উৎপাদন ২০-৩০ লিটারের বেশি ছিল। কিন্তু এ দুধের উৎপাদন কমে বর্তমানে ৮ লিটারে নেমেছে। তা হলে কী বলা যাবে না শুধু কৃত্রিম প্রজনন করালেই গাভীর দুধ বাড়ে না। বরং দুধ কমে এবং জাতটি ঝুঁকিপূর্ণ একটি জাতে রূপান্তরিত হয়। এক্ষেত্রে জাত টিকাবার জন্য অনেক ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়, গবেষণা করতে হয়; যা বাংলাদেশে করা হয় না।
কৃষকের বন্ধু রবীন্দ্রনাথ যে পাবনা ব্রিডের সৃষ্টি করেছিলেন। সে জাতের গাভী প্রায় ৭০-৮০ বছর পর্যন্ত ১২-১৫ লিটার দুধ দিত বিনা যতেœ। আমরা হুজুগে সব নষ্ট করি, তারই ধারাবাহিকতায় নষ্ট করেছি পাবনা ব্রিড এবং চিটাগাং ব্রিড। একজন পেশাজীবী হিসেবে বলতেই হয়, জাত উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে যদি সংকরায়ন করানো যায়, যদি গো খাদ্যের জন্য চারণভূমি তৈরি করা যায়, যদি গোয়ালা নদীর মতো রক্ষা করা যায় পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ দেশের সব শাখা নদী। যদি রক্ষা করা যায় চলনাবিল, জবাইবিল, টাংগুয়ার হাওর, হাকলুকি হাওর, বাইক্কাবিল তবেই হয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশে এদেশে সৃষ্টি হতে পারে অধিক উৎপাদনশীল গবাদিপশু, যার মাধ্যমে দেশ দুধে স্বংয়সম্পূর্ণ হবে এবং এদেশের দুধ রফতানি করা যাবে বিদেশে। এর জন্য বছরের পর বছর শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন নেই প্রয়োজন আছে কেবল রবীন্দ্রনাথের পাঠশালা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

কৃষিবিদ ডা. এম এ সবুর*
*সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার, এফডিআইএল, মানিকগঞ্জ

বিস্তারিত
লাভজনক পদ্ধতিতে মাছ চাষ

মাছ আমাদের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন এবং পুষ্টি সরবরাহে মাছের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। একই পুকুরে নানা জাতের মাছ চাষ করা যায়, খাল ও ডোবায় মাছ চাষ করা যায়, আবার চৌবাচ্চায়, খাঁচায় মাছের চাষ করা যায়। কোনো নির্দিষ্ট জলাশয়ে পরিকল্পিত উপায়ে স্বল্পপুঁজি, অল্পসময় ও লাগসই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছের বিভিন্ন নিয়ম মেনে প্রাকৃতিক উৎপাদনের চেয়ে অধিক মাছ উৎপাদনই মাছ চাষ। মাছ চাষে লাভবান হতে হলে মাছ চাষ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি পর্বে মাছ চাষিকে বিশেষ কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। মাছ চাষির অজ্ঞতা বা অবহেলা বা ভুল লাভজনক মাছ চাষের ক্ষেত্রে অন্তরায়। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় মাছ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছের অনেক চাহিদা থাকার কারণে মাছ চাষ করে ভালো আয় করা সম্ভব। স্থানীয় হাট, বাজার ছাড়াও দূরবর্তী বাজারে মাছ বিক্রি করে লাভ করা সম্ভব। তাছাড়া বিদেশে মাছ রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। মাছ চাষে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ। এটা আমাদের গর্বের বিষয়।
মাছের গুণাগুণ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা
আমাদের দেশের স্বাদু পানিতে ২৬০টিরও বেশি প্রজাতির মাছ আছে। এছাড়া খাঁড়ি অঞ্চলে ও লোনা পানিতে কয়েকশ‘ প্রজাতির মাছ আছে। তবে চাষযোগ্য মাছগুলো হলো রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, সিলভারকার্প, মিররকার্প, গ্রাসকার্প, কমনকার্প, বিগহেড, রাজপুঁটি, নাইলোটিকা, তেলাপিয়া, বিদেশি মাগুর, থাই পাঙ্গাশ এসব। এসব মাছের কিছু বিশেষ গুণাগুণ আছে। এসব মাছ খুব দ্রুত বাড়ে; খাদ্য ও জায়গার জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না; পুকুরে  বেশি সংখ্যায় চাষ করা যায়; পানির সব স্তর থেকে খাবার গ্রহণ করে, পুকুরের পরিবেশ ভালো থাকে; খেতে খুব সুস্বাদু; বাজারে এসব মাছের প্রচুর চাহিদা আছে; সহজে রোগাক্রান্ত হয় না, চাষে লাভ বেশি হয়। এজন্য লাভজনকভাবে এসব মাছে চাষ করা যায় আনয়াসে। মাছ চাষ শুরু করার আগে প্রয়োজন হচ্ছে সঠিক সুষ্ঠু এবং বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা।
মাছ উৎপাদন কৌশল
১. সনাতন পদ্ধতির মাছ চাষ : এ পদ্ধতিতে পুকুরের কোনো ব্যবস্থাপনা ছাড়াই মাটি ও পানির উর্বরতায় পানিতে যে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি হয় মাছ তাই খেয়ে জীবন ধারণ করে। এক্ষেত্রে আলাদা কোনো পরিচর্যা নিতে হয় না;
 ২. আধানিবিড় পদ্ধতির মাছ চাষ : এ পদ্ধতিতে নিয়মমতো পুকুর প্রস্তুত করে আংশিক সার ও খাদ্য সরবরাহ করে মাছের খাদ্য উৎপন্ন করতে হয়। পুকুরের বিভিন্ন স্তরে উৎপাদিত খাদ্যের সঠিক ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য রেখে মাছের পোনা ছাড়তে হয়;
 ৩. নিবিড় পদ্ধতির মাছ চাষ : অল্প জায়গায়, অল্প সময়ে বেশি উৎপাদনের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হয়;
 ৪. কার্প জাতীয় মাছের মিশ্রচাষ : পুকুরের বিভিন্ন স্তরে উৎপন্ন খাবার সম্পূর্ণ ব্যবহার করার জন্য রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস, বিগহেড, সিলভারকার্প, মিররকার্প, কমনকার্প, কারপিউ এসব নানা প্রজাতির মাছ একসাথে চাষ করা যায়।
পুকুর নির্বাচন
১. পুকুরটি খোলামেলা  রোদ্রউজ্জ্বল জায়গায় এবং বাড়ির আশপাশে হতে হবে যেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়;
২. মাটির গুণাগুণ পুকুরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত দো-আঁশ, এঁটেল দো-আঁশ ও এঁটেল মাটি পুকুরের জন্য ভালো;
৩. পুকুরের আয়তন কমপক্ষে ১০ শতাংশ হতে হবে। ৩০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ আকারের পুকুর মাছ চাষের জন্য বেশি উপযোগী;
৪. পুকুরের গভীরতা ২-৩ মিটার রাখতে হবে এবং বছরের পুরো সময় পানি থাকতে হবে;
৫. পুকুর পাড়ে বড় গাছ বা ঝোপঝাড় থাকা যাবে না। বিশেষ করে পাতাঝরা গাছ রাখা যাবে না।
পুকুর খনন তৈরি ও প্রাথমিক কাজ
যেখানে পুকুর খনন করা হবে সেখানকার অবকাঠামো, পরিবেশ, পানির গভীরতা, বর্ষায় বন্যার হুমকি, পুকুর পাড়ের ঢাল, বকচর, শুষ্ক মৌসুমে পানি কতটা থাকে, পানি কমে গেলে বাইরে থেকে পানি দেয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা এসব বিষয়ে সঠিক ধারণা নিয়ে শুরু করতে হবে। এজন্য প্রথমেই অভিজ্ঞ মৎস্য চাষি বা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নেয়া  প্রয়োজন। মাছ চাষ শুরু করার আগে বা মাছের পোনা ছাড়ার আগে সঠিক নিয়মে পুকুর তৈরি করা অত্যাবশ্যক। পানিতে প্রাকৃতিক খাবার জন্মানো এবং পুকুরে পানি প্রবেশ এবং নিষ্কাশনের রাস্তা সঠিকভাবে রক্ষা করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে অবহেলা করা হলে পরবর্তীতে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। পোনা মাছ ছাড়ার আগে পুকুর তৈরি করে নিতে হবে। নতুন পুকুর কাটা কিংবা পুরনো পুকুরই তৈরি করে নেয়া আবশ্যকীয় প্রাথমিক কাজ। পুকুর প্রস্তুতির কাজটি হবে ধাপে ধাপে-
 ১ম ধাপ : জলজ আগাছা কচুরিপানা, কলমিলতা হেলেঞ্চা, অন্যান্য গাছ শেকড়সহ তুলে ফেলতে হবে;
 ২য় ধাপ :  শোল, গজার, বোয়াল, টাকি রাক্ষুসে মাছ এবং অবাঞ্ছিত মাছ মলা, ঢেলা, চান্দা, পুঁটি সরিয়ে ফেলতে হবে;
৩য় ধাপ : প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন পুকুরে পানি থাকলে ড্রামে বা বালতিতে গুলে ঠা-া করে পুরো পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে;
৪র্থ ধাপ : মাটি ও পানির গুণাগুণ বিবেচনায় রেখে চুন দেয়ার এক সপ্তাহ পর জৈবসার বিশেষ করে পচা গোবর দিতে হবে;
৫ম ধাপ : পুকুর শুকনা হলে পুকুরে সার, চুন/জিওলাইট, গোবর ছিটিয়ে দিয়ে লাঙল দিয়ে চাষ করে দুষণমুক্ত পানি ঢুকাতে হবে;
৬ষ্ঠ ধাপ : পোনা মজুদের আগে পুকুরে ক্ষতিকর পোকামাকড় থাকলে তা মেরে ফেলতে হবে;
৭ম ধাপ : পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্য জন্মালে পোনা মজুদ করতে হবে। মৃত্যুর হার যেন কম থাকে সেজন্য পোনার আকার ৮-১২ সেন্টিমিটার হতে হবে;
৮ম ধাপ : নিয়মমতো পুকুরে পোনা ছাড়তে হবে। এক্ষেত্রে যেসব বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে তা হলো- পোনা হাঁড়িতে বা পলিথিন ব্যাগে আনা হলে, পলিথিন ব্যাগটির মুখ খোলার আগে পুকুরের পানিতে ২০-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখা; তারপর ব্যাগের মুখ খুলে অল্প করে ব্যাগের পানি পুকুরে এবং পুকুরের পানি ব্যাগে ভরতে হবে। ব্যাগের পানি ও পুকুরের পানির তাপমাত্রা যখন সমান হবে তখন পাত্র বা ব্যাগের মুখ আধা পানিতে ডুবিয়ে কাত করে সব পোনা পুকুরে ছাড়া; সকাল ও বিকাল পোনা ছাড়ার ভালো সময়;
 ৯ম ধাপ : দিনে দুইবার সকাল ১০টায় এবং বিকাল ৩টায় খৈল, কুঁড়া, ভুসিসহ সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
 সতর্কতা ও পরিচর্যা
 রোগ প্রতিরোধী মাছের চাষ করতে হবে; সঠিক সংখ্যায় পোনা মজুদ করতে হবে; পোনা ছাড়ার আগে পোনা রোগে আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে;  পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং পুকুরে যাতে আগাছা না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে; প্রতি ৩-৪ বছর পরপর পুকুর শুকিয়ে ফেলে নতুন করে পুকুর প্রস্তুত করে নিতে হবে; বর্ষার শেষে পুকুরের পানিতে লাল বা সবুজভাব কমে গেলে অবশ্যই পরিমাণমতো সার দিতে হবে; মাঝে মাঝে জাল টেনে মাছের অবস্থা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখতে হবে; পুকুরে জাল টেনে দড়ি টেনে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ানো এবং মাছের ব্যায়াম করাতে হবে।
পোনা যত্নও মজুদ
মাছ চাষি হ্যাচারি থেকে যেসব পোনা সংগ্রহ করেন তার অধিকাংশই সরাসরি চাষ পুকুরে ছাড়ার উপযোগী নয়। চাষ পুকুরে ছোট পোনা সরাসরি ছেড়ে অনেক সময় চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এতে ব্যাপক হারে পোনা মারা যায়। এ কারণে পোনা ভালোভাবে নার্সিং করতে হবে। নার্সিং করার পর পোনা বড় ও টেকসই হলে গণনার মাধ্যমে পোনা মজুদ পুকুরে দেয়া যায় এবং পরবর্তীতে খাবার ব্যবস্থাপনার সাথে অন্যান্য ব্যবস্থাপনাও যথার্থ হতে হবে। একক চাষের ক্ষেত্রে বিশেষত শিং, মাগুর, কৈ, তেলাপিয়া প্রভৃতি মাছের পোনা হ্যাচারি থেকে সরাসরি চাষ পুকুরে দিয়ে অনেক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ইচ্ছেমতো বা পুকুরের জায়গার তুলনায় অধিক পরিমাণে পোনা ছাড়া আমাদের মৎস্য চাষিদের একটি প্রচলিত ত্রুটি। তাদের ধারণা বেশি পোনা ছাড়া হলেই বেশি উৎপাদন হবে। চাষের ধরন, অবকাঠামো, পানি বদলানোর সুবিধা, খাবারের ধরন, মাছ চাষের মেয়াদ, মাছের প্রজাতি এসব বিবেচনা করে পোনা মজুতের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ চাষি বা অভিজ্ঞ মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। বেশি পোনা নয় বরং পরিমিত পরিমাণে পোনা ছেড়ে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।
পোনা নির্বাচন পরিবহন ও অবমুক্তকরণ
চাষিকে মানসম্মত ব্রুড থেকে উৎপাদিত এবং অন্তঃপ্রজনন মুক্ত  পোনা, একই আকারের ও বয়সের রোগমুক্ত পোনা সংগ্রহ করতে হবে। মানসম্পন্ন পোনা সংগ্রহ করার পর তা সঠিক নিয়মে পরিবহন এবং পরিবহনের পর যথার্থভাবে পুকুরে অবমুক্ত করতে হবে। পরিবহনজনিত ক্রটি থাকায় এবং পরিবহনের আগে পোনা সঠিক নিয়মে টেকসই করা হয় না বলে পোনা ব্যাপক হারে মারা যায়। অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে মারা না গেলেও পোনা এতই দুর্বল থাকে যে দুই একদিনের মধ্যে অনেক পোনাই মারা যায়। এ কারণে পোনা পরিবহন ও পোনা ছাড়ার ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।
মিশ্রচাষে জাত নির্বাচন
পুকুরে পানির তিনটি স্তরে একই রকমের মাছ থাকে না। এ কারণে মিশ্রচাষে প্রজাতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ওপরের স্তর, মধ্য স্তর এবং নিচের স্তরের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রতিটি স্তর সঠিক ব্যবহারের জন্য সঠিক সংখ্যা সঠিক প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। অনেক সময় মাছ চাষিরা কোনো একটি স্তরে বেশি মাছ ছেড়ে দেন অথচ অন্য একটি স্তরের উপযোগী মাছ ছাড়েন না। এতে কখনও ভালো ফল আসে না। তাছাড়া একই স্তরে বসবাসকারী বেশি মাছের জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে প্রতিযোগিতা করতে হয়। তাই প্রতিটি স্তরের সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য আনুপাতিক হারে মাছ ছাড়তে হবে। পরস্পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় এমন প্রজাতি এড়িয়ে যাওয়া ভালো। ওপরের স্তরের জন্য কাতলা, সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, সরপুঁটি, মধ্য স্তরের জন্য রুই, তেলাপিয়া, সরপুঁটি, নিচের স্তরে মৃগেল, মিররকার্প, কার্পিও, কালো বাউশ এ ধরনের মাছ আবাদ করতে হয়। পোনা ছাড়ার সময় আনুপাতিক হার ঠিক রেখেই পোনা ছাড়তে হবে। একই সাথে মৃগেল এবং গলদা চিংড়ি ছাড়া হলে গলদা চিংড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার মাংসভোজী অর্থাৎ একে অপরকে খেয়ে ফেলে এ ধরনের প্রজাতি মিশ্রচাষে দেয়া যাবে না। মিশ্রচাষে রাক্ষুসে প্রজাতিকে এড়িয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক।
পানির গুণাগুণ রক্ষা
মাছ পানিতে থাকে বলেই পানির গুণাগুণ ও পরিবেশ রক্ষা করাটা জরুরি। অথচ অনেক মাছ চাষি পানির গুণাগুণ রক্ষায় সচেষ্ট নন। মাছ চাষের জন্য পানির নির্ধারিত স্থিতিমাপ রয়েছে। এগুলো দক্ষতার সাথে রক্ষা করতে পারলে চাষকালীন নানা সমস্যা এড়ানো সম্ভব। পানির পিএইচ, অ্যামোনিয়া, ক্ষারত্ব, দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রভৃতির আদর্শ মাত্রা রয়েছে। এ মাত্রা অতিক্রম করলে বা অস্বাভাবিক কমবেশি হলেই বিপত্তি ঘটে। চাষিরা টেস্ট কিটের মাধ্যমে মাত্রা  মেপে পানির গুণাগুণ জানতে এবং করণীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এ কারণে সব মাছ চাষিদের জন্য একটি টেস্ট কিট রাখা অতি জরুরি।
মাছের খাবার ব্যবস্থাপনা
লাভজনক মাছ চাষের জন্য মানসম্মত খাবার অন্যতম প্রধান শর্ত। কেননা মাছ চাষে ৭০% এর বেশি খরচ হয় খাদ্য সরবরাহে। বাজারের খাদ্য এবং নিজে খাদ্য তৈরি করে সরবরাহ করেন। সঠিক পুষ্টিমান সম্পন্ন এবং মাছের আকার ও বয়স উপযোগী খাবার সরবরাহ না করলে লাভ হবে না। অনেক চাষি নিম্নমানের খাবার কিনে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাছাড়া পরীক্ষাগারে খাদ্য পরীক্ষা করালে খাদ্যের পুষ্টিমান সম্পর্কে জানা যায়। কম খাবার সরবরাহ করলে যেমন মাছের প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া যায় না তেমনি বেশি পরিমাণে খাবার সরবরাহে লোকশান হয়। এতে খাবার ও অর্থ দুই-ই অপচয় হয় এবং পানি দূষণের জন্য মাছ মারা যায়। সাধারণত মাছের পোনার সংখ্যা অজানা থাকায় খাদ্য প্রয়োাগের হিসাবে গড়মিল থাকায় সঠিকমাত্রায় খাবার সরবরাহ করতে পারেন না। এজন্য মাছের সংখ্যা এবং গড় ওজন জেনে পানির গুণাগুণের দিক বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাবার সরবরাহ করা দরকার। অনেকে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করার পরিবর্তে মাঝে মাঝে ও অনিয়মিতভাবে খাবার সরবরাহ করেন। এভাবে খাবার সরবরাহ করলে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা সম্ভব নয়। অর্থাভাবে চাষের মাঝামাঝি সময়ে খাবার সরবরাহে ব্যর্থ হলে চাষি লাভবান হতে পারে না। মাছ চাষে পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনে জৈব ও অজৈব সারের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। অনেক চাষি কেবল সার প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ চাষ করতে চান। এ ধারণা থেকে অতিরিক্ত সার প্রয়োগে বিপদ ডেকে আনেন। পানিতে প্লাংক্টন বুম বেশি হয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে এক পর্যায়ে পানি নষ্ট হয়ে যায় এবং পুকুরে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে মাছ মারা যায়। সুতরাং প্রয়োজন হলেই সার দেয়া উচিত না হলে দরকার নেই।  মাছের সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা একান্ত জরুরি।
পোলট্রি লিটার ব্যবহার
পোলট্রি লিটারে খাদ্যমান রয়েছে এ চিন্তা থেকে অনেক মাছ চাষি পোলট্রি লিটারকেই কেবল মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু লিটার ব্যবহারের কারণে মাছ চাষিরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। পোলট্রি লিটারে কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করা হয় যা মাছ খেয়ে পরিপাক হয় না এবং তা থেকে বদহজম হয়  পেট ফুলে মাছ মারা যায়। আবার লিটারে কেবল তুষ থাকার কারণে একই সমস্যা হয়। বেশি পরিমাণে লিটার পানির গুণাগুণ নষ্ট করে। পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে ব্যাপকহারে মাছ মারা যায় এবং পানির গুণাগুণ রক্ষা করতে গিয়ে ওষুধপত্র কিনতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। তাছাড়া এ লিটারের মাধ্যমে মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া যায় যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
 নিয়মিত ওজন নেয়া ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা
প্রতি ১০-১৫ দিন পর পর মাছের গড় ওজন নেয়া আবশ্যক। তা না হলে খাবারের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না। মাছের ওজন না নিলে চাষিও বুঝতে পারেন না যে মাছের বাড়বাড়তি সন্তোষজনক নাকি হতাশাব্যঞ্জক। পোনা ছেড়ে এবং খাবার সরবরাহ করেই চাষির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মাছের স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণ একটি বড় কাজ। মাছের অস্বাভাবিক আচরণ বা দেহে অস্বাভাবিক কোনো কিছু দেখা গেলে বা ক্ষত হলে মৎস্য বিশেষজ্ঞ বা মৎস্য কর্মকর্তার শরণাপন্ন হতে হবে। তবে মাছের রোগ হলে চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে অধিক মনোযোগী হলে মাছচাষি ক্ষতি এড়াতে পারেন। স্বাস্থ্যসম্মত চাষ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে মাছ চাষে চিকিৎসা, নানা ওষুধপত্র এবং পুষ্টিপণ্য পাওয়া যাচ্ছে যা চাষি ব্যবহার করে সুবিধা পেতে পারেন। আমাদের দেশেও নানা  কোম্পানি নানা পণ্য বাজারজাত করছে। অনেক সময় তারা সস্তায় এসব কিনে প্রতারিত হন। আবার সঠিক ব্যবহার বিধি না জানা বা সঠিক মাত্রায় ব্যবহার না করায় সুফল পাচ্ছে না। এ কারণে মৎস্যবিদ বা অভিজ্ঞ চাষির পরামর্শে সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে এবং প্রয়োগ বিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
একই পুকুর থেকে একাধারে কয়েক দিন মাছ ধরলে চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কেননা পরপর কয়েক দিন জাল টানলে অন্য মাছ খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দেয় বলে মাছের ওজন কমে যায় এবং আঘাতজনিত কারণেও কিছু মাছ মারা যেতে পারে। এ কারণে একটানা কয়েক দিন মাছ না ধরে মাঝে বিরতি দেয়া উচিত।
মাছ পরিবহন
মাছ ধরে সঠিকভাবে বাজারজাত করতে না পারলে মাছ চাষি চাষের শেষ দিকে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। যেসব মাছ জীবিত পরিবহন করা হয় সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে অধিক সময় পরিবহন বা অন্য কোনো ক্রটির কারণে মারা যায়। এ ক্ষেত্রে প্লাস্টিক ড্রামে পরিষ্কার পানিসহ পরিমিত মাছ পরিবহন করা উচিত। আজকাল ড্রামসহ গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। শিং, মাগুর, কৈ মাছ এভাবে পরিবহন করা হয়। ড্রামে নেয়ার আগে কিছু সময় হাপায় রাখা আবশ্যক। মাছ ধরার ৮-১০ ঘণ্টা আগে খাবার দেয়া বন্ধ রাখলে মাছ অধিক সময় জীবিত থাকে। অন্যান্য মাছ দূরত্ব ভেদে বরফজাত করা উচিত। মাছ চাষিরা একটু সতর্ক হলে এবং চাষকালে প্রতিটি ধাপে দক্ষতার পরিচয় দিলে ক্ষতি বা লোকসান থেকে রক্ষা পেয়ে নিশ্চিত লাভবান হতে পারবেন।
মাছের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ
মাছ প্রক্রিয়াজাতের সময় হাত দিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি করা যাবে না; মাছ ধরার পর মাছের আকৃতি অনুযায়ী আলাদা করে ফেলতে হবে; বাক্সে বা পাত্রে বরফ দিয়ে স্তরে স্তরে মাছ সাজাতে হবে; শুকনোভাবে অথবা ভেজা অবস্থায় লবণ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করা যায়; মাছ কেটে নাড়িভুঁড়ি ও মাথা ফেলে দিয়ে চাক করে সেগুলো সিদ্ধ করতে হবে। এরপর লবণ, তেল, মসলা চাকের সাথে মেখে টিনের পাত্রে সুন্দর করে স্তরে স্তরে সাজিয়ে পাত্রটি বায়ুশূন্য করে মুখবন্ধ করতে হবে। একে ফিশকেনিং পদ্ধতি বলে। বরফ ছোট ছোট টুকরা করে ঝুড়ি বা প্যাকিং বাক্সের তলায় ঘন করে স্তরে স্তরে বরফ দিয়ে মাছ প্যাকিং করে দিতে হবে; ব্যবসাভিত্তিক মাছ কোল্ড স্টোরেজে কমদামে একসাথে অনেক সংরক্ষণ করা যায়; বালির ওপর মাছ ছাড়িয়ে দিয়ে অথবা দড়ি টানিয়ে রোদের তাপে ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। তবে তাজা মাছ খাওয়া বেশি সুস্বাদু এবং লাভজনক।
মাছ আমাদের অমূল্য প্রাণিজ জাতীয় সম্পদ। নিজেদের একান্ত প্রয়োজনে পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি পদ্ধতি অনুসরণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করলে মাছ চাষে কম খরচে বেশি লাভবান হওয়া যায়। মাছ দিয়ে আমরা আমাদের দেশকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারব। রূপালি সম্পদে দেশকে টইটম্বুর করতে পারব। পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে কৃষি নিয়ে দাঁড়াতে পারব। আমাদের পারিবারিক সামান্য জলসীমা যেন আমরা খালি না রেখে পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষ করি।

কবির বিন জবেদ*
*জবেদ ফয়জুন মঞ্জিল, রামপুর বাজার, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর

বিস্তারিত
কবিতা ১৪২৪

দুর্যোগে আমরা নিঃস্বার্থ অন্তহীন
মো. বাবর আলী সরদার*

আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে
কারও যেন হয় না ক্ষতি জলবায়ুর দূষণে
বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
যেমন বন্যা আরও ঝড় ভাঙে সুখের বসতঘর
কারও আবার নেয় ভাসিয়ে সোনার সংসার
কারও আবার অঙ্গহানি বাঁচেনা কেউ পরাণে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
যেমন বানের পানি আমরা সকলে জানি
হঠাৎ এসে মরণ পথে দেয়া হাতছানি
তাদের করতে উদ্ধার ভয় করি না মরণে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
পেলে আবার হাওয়ার খবর তা হয় যদি জবর
পৌঁছিয়ে দেই তাড়াতাড়ি সবার ওপর
নিরাপদে থাকে যেন এলাকার জনগণ
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
থাকলে সাইক্লোন সেন্টার সেখানে যেতে হবে সত্তর
সহযোগিতা আমরা করি বেঁচে থাকবার
ভেসে যাওয়া কত মানুষ ডুবলেও কেহ গহিনে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
যত ছাগল গরুর দল সকল হাঁস মুরগির পাল
আরও কত পশুপাখি মার যাওয়ার কল
উঁচু যায়গায় রাখি তাদের  বাঁচে যেন পরাণে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
বিপদ যখন এসে যায় আমরা এমন সময়
উপকারে এগিয়ে আসি যারা অসহায়
ভয় করি না বিপদ বাধা তাদের জীবন বাঁচনে
যেমন সুপেয় পানি আমরা দূর থেকে আনি
খাওয়াই তাদের হয় না যেন কারও  প্রাণহানি
তারই সাথে শুকনা  খাবার পৌঁছিয়ে দেই সেখানে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
সাথে ওষুধ ও পথ্য দিতে থাকি যে ব্যস্ত
আমাদের কাজ অসুস্থদের করতে সুস্থ্য
যার যেখানে অসুবিধা পৌঁছে যাই সেখানে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
আমরা এমন বাধাহীন দুর্যোগ চলে যে কয়দিন
যতই কষ্ট হোক না মোদের হয়ে উদাসীন
সব সময় ব্যস্ত থাকি বিপদ রক্ষার কারণে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
মোদের চাওয়ার কিছুই নাই শুধু খেদমত করতে চাই
সবার কাছে এগিয়ে যাবার দোয়া যেন পাই
ইচ্ছা থাকলে সাথে আসতে পারেন সৎমনে
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥
কারও যেন হয় না ক্ষতি  জল বায়ুর দূষণে...॥
আমরা বিনা স্বার্থে কাজ করে যাই জনকল্যাণে॥

আধুনিক কৃষির সার কথা
ইফতি মোহাম্মদ হিসাম**

আমরা নবীন আমরা প্রবীণ কৃষি কাজের মূল
ফসল ফলিয়ে গোলা ভরে বাড়াবো সমৃদ্ধির কুল
কৃষি কাজে হিম্মত লাগে আরও লাগে বল
বীজ সার সেচ যতœ ব্যবহারে আধুনিক কল
সময় মতো সব কাজ কৃষির আসল কাজ
বেশি ফলন বেশি লাভ সাজবে নতুন সাজ
ভৌগলিক কারণে বালাই আক্রমণ হয় কৃষিতে বেশি
শীত গ্রীষ্ম সারা বছর আইপিএম বিষমুক্ত দেশি
ভালো মানের বীজ দিও সুষম মাত্রায় সার
নিশ্চিত ফলন আসবে ঘরে লাভজনক কারবার
এদেশেতে কৃষি ছাড়া অন্য কাজে গতি নাইরে আর
কৃষি কাজে সুফল আসে অন্য খাতে হবে ছারখার
সময় মতো রোপণ করো সময়মতো কাটো
যতœ আত্তি সেবা করতে আধুনিক কৃষির পথে হাটো
উন্নয়ন কর্মী বিশেষজ্ঞ আছেন সবার পাশে
সময়মতো চাহিদামাফিক পরামর্শ পাবেন তাদের কাছে
বেশি করে শাকসবজি চাষ করতে হবে
পরিকল্পিত চাষাবাদ গ্রহণ পুষ্টি সমৃদ্ধ তবে
রোদের দিনে কেটে কুটে শুকিয়ে ঝাড়ার পর
ঠা-া করে বীজপাত্রে রাখবে গোলাঘর
কৃষি হলো উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি
বাংলার কৃষক বাংলার মাটি সোনার চেয়েও খাঁটি
সবাই মিলে নিবেদিত কাজের নেইকো শেষ
কৃষি দিয়ে গড়বো মোরা সোনার বাংলার দেশ...।

*গ্রাম+ডাক-তারালী, উপজেলা-কালীগঞ্জ, জিলা-সাতক্ষীরা; ** হাউজিং সোসাইটি, মোহাম্মদপুর, ঢাকা

বিস্তারিত
সাফল্য গাঁথা

স্বপ্ন হলো সত্যি
গ্রামের নাম খঞ্জনমারা। এ গ্রামেরই কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম। কৃষক বললে ভুল হবে। কেননা, ২০ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে  ঢাকা শহরে গিয়েছিলেন রিকশা চালাতে। রিকশা চালিয়েছেন ঢাকা, গাজীপুর, আবদুল্লাপুর, মাওয়া, সিরাজদিখান এমনকি খাগড়াছড়ি জেলাতেও।  প্রথমে দিনে গড়ে ৩০০ টাকা আয় হলেই খুশি হতেন। পরে সংসার, বাচ্চা-কাচ্চা এসব নিয়ে হিমশিম খেতেন। ১৫ দিন পর যা আয় হতো- তা নিয়ে বাড়ি আসতেন। মাসখানেক থাকার পর ৫০০/১০০০ টাকা যখন ঋণ হয়ে যেত- তখন আবার বেড়িয়ে পড়তেন পেটের তাগিদে। এভাবেই  কেটে গেছে আরও ২০ টি বছর। এখন বয়স প্রায় ৪০ বছর। পা আর চলে না। তাই রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের খঞ্জনমারা গ্রামে ২০১৩ সালে গ্রামে ফিরে আসেন।
গ্রামে ফিরেই সে বছর চেষ্টা করেন পরিত্যক্ত ৩০ শতকের একটি জলাশয়ে মাছ চাষের। কিন্তু এ বিষয়ে জ্ঞান না থাকায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নাই। পরবর্তী বছর ২০১৪ সালটি তার জন্য স্মরণীয়। কেননা, এ বছরটি তার জীবনের সব হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়। সেপ্টেম্বর মাসে আইএপিপি প্রকল্পের আওতায় যে মৎস্য দল গঠিত হয় সে দলের একজন সদস্য হয়ে যান রফিকুল ইসলাম। ১০টি  সেশনে অংশ নেন। দীক্ষা নেন তেলাপিয়া, কৈ আর কার্প জাতীয় মাছ চাষের। একইসাথে স্বল্প সময়ে অধিক লাভের জন্য  নার্সারির বিষয়টিও তার পছন্দ হয়। তার গভীর মনোযোগ আর আগ্রহের প্রতি লক্ষ্য রেখে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ তার পুকুরে স্থাপন করেন একটি থাই কৈ প্রদর্শনী।  খরচ বাদে লাভ হয় প্রায় ৬৩০০০ টাকা। এজন্য মাঠ দিবস অনুষ্ঠানে তাকে শ্রেষ্ঠ কৃষক হিসেবে পুরস্কৃতও করা হয়। এটিই ছিল মূলত টার্নিং পয়েন্ট।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে তার আগ্রহের প্রতি লক্ষ্য রেখে আইএপিপি প্রকল্প তাকে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ মৎস্য  গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিএফআরআই) আইএপিপির অর্থায়নে ৩ দিনের প্রশিক্ষণ কোর্সে প্রেরণ করেন। রফিকুল ইসলাম সেখানে গিয়ে গুণগত মানের পোনা উৎপাদন কৌশল ও পোনার উৎস্য খুঁজে পান। একইসাথে সুলভে খাদ্য তৈরির বিষয়টি ভাবতে ভাবতে খাদ্য তৈরির মেশিন  কেনা যায় কিভাবে সে বিষয়টি তাকে আলোড়িত করে। জীবনের ফিকে স্বপ্নগুলো রঙিন হতে শুরু করে। পৈতৃক জমি সম্বল ছিল ২ শতক। বিক্রি করেন  ৫০,০০০ টাকা। মহাজনের কাছ থেকে মাসিক ১০,০০০ টাকা সুদে ঋণ নেন ১,০০,০০০ টাকা। আর নিজের কাছে যৎসামান্য সঞ্চয়  এ হলো তহবিল। প্রায় ১,৬,০০০০ টাকা খরচ করে কিনে ফেলেন খাদ্য তৈরির মেশিন। মিক্চার মেশিন, শ্যালো মেশিন, পাউডার তৈরি মেশিন, বস্তা  শেলাই মেশিন, বেল্ট, চেচিস, মেঝে পাকাকরণ- এ যেন স্বপ্নকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নতুনরূপে রূপদানের এক মহাযজ্ঞ।
জুন ২০১৬। শুরু করেন দানা জাতীয় ও পাউডার জাতীয় খাদ্য উৎপাদন। প্রতি কেজি দানাদার খাদ্য তৈরি করতে তার খরচ প্রায় ২৫  টাকা, বিক্রি করেন ৩০ টাকা। অন্যদিকে পাউডার জাতীয় খাদ্য তৈরিতে খরচ প্রায় ৩০ টাকা- যা বিক্রি করেন ৪২ টাকা। বাজারের তুলনায় মূল্য কেজিতে প্রায় ১০-১৫ টাকা কম হওয়ায় স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের মৎস্য  চাষিরা ধীরে ধীরে তার নিকট ভিড় জমাতে শুরু করেন। অল্প ক’দিনেই পরিচিতি বাড়ে। তাই ব্যবসায়ীরাও তার খাদ্য নেয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু লাইসেন্স না থাকায় তিনি  দিতে পারছেন না। এ যাবৎ অক্টোবর ২০১৬ পর্যন্ত প্রতি মাসে প্রায় ২-৩ মেট্রিক টন খাদ্য বিক্রি করেছেন- যা দিয়ে মহাজনের ধার শোধ করেছেন প্রায় ৭০,০০০  টাকা। পাশাপাশি মৎস্য চাষ, নার্সারি কার্যক্রমসমূহও চালু রেখেছেন। সেপ্টেম্বর/১৬ মাসের শেষে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রায়  ২০,০০০ গিফট্ জাতের তেলাপিয়ার ছোট পোনা নিয়ে এসেছেন। তার আশা, ডিসেম্বরে কেজিতে ৫-৬টি আসা মাত্রই তিনি তা বাজারে বিক্রি করবেন। এখান থেকে ১,৩০,০০০ টাকা খরচ করে প্রায় ৩,০০,০০০ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন রফিকুল ইসলাম।
শুরু হলো দিন বদলের পালা। এরই মধ্যে বাড়ির চারপাশে পাট খড়ির বেড়া পাল্টিয়ে টিনের বেড়া দিয়েছেন। একটি গেট নির্মাণ করেছেন।  পুষ্টি তালিকায় যোগ হয়েছে মাছ-মাংস। পোশাক-পরিচ্ছদ আগের চেয়ে উন্নত। তার ভাষায় ‘আগের কথা মনে হইলে-চোহে পানি চইলা আসে। বড় মাইয়াটা ভালা ছাত্রী ছিল। ফাইভে-এইটে বৃত্তি পাইছিল। অথচ টাকার জন্যি ভালো মাস্টার দিবার পারি নাই। মাইয়াডা কষ্ট নিয়া  রৌমারী কলেজে ডিগ্রি পড়তাছে। ‘তার ছোট মেয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়েন। তাকে নিয়েও তার স্বপ্ন অনেক। তিনি বলেন ‘আর মাত্র ৩ কিস্তি,  মহাজনের টাকা শোধ হইয়া গেলে দায়মুক্ত। তহন মাইয়া দুইটার যত সাধ সব পূরণ করুম। ‘ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টিভিটি প্রজেক্ট  এবং মৎস্য অধিদপ্তরের নিকট কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই রফিকুল ইসলামের। তিনি বলেন ‘বাড়ি ফিরা আমি যহন নিঃস্ব, হতাশ তহন আইএপিপি আমার পাশে আইসা দাঁড়াইছে এবং বদলাইয়া দিছে আমার জীবন।’
রফিকুল ইসলাম ভবিষ্যতে বড় একটি খাদ্য তৈরির কারখানা দিতে চান। কারণ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টরে এ খাদ্যের চাহিদা বিপুল। আর  রৌমারীর মতো জায়গায় বড় কারখানা মানে অনেক বেকার লোকের কর্মসংস্থান। তার মতো আর কোনো রফিকুল বাহিরে গিয়ে রিকশা চালাক-  সেটি তার কাম্য নয়।
তাই তিনি চান আর দশটি কোম্পানির মত তার পণ্যও বাজারে বিক্রি হবে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডে। এজন্য তিনি লাইসেন্সের আবেদন করেছেন মৎস্য অধিদপ্তরের নিকট। আর প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন আদরের দুই মেয়ে রুজিনা-রিনার নামে।

মো. সিরাজুল ইসলাম*
*সাবেক জেলা সমন্বয়কারী, আইএপিপি, কুড়িগ্রাম

 

বিস্তারিত
নিয়মিত বিভাগ-১৪২৪ (প্রশ্নোত্তর )

ইসহাক মোল্লা, গ্রাম : আন্ধার কোটা, উপজেলা : চৌগাছা, জেলা : যশোর
প্রশ্ন : আমগাছের মুকুল আসার সময় হপার পোকার আক্রমণ হলে কিভাবে পরিচর্যা করব?

উত্তর : হপার বা শোষক পোকা আমের একটি বড় শত্রু। এ পোকা কচি পাতা ও মুকুল থেকে রস চুষে খায়। পূর্ণবয়স্ক ও নিম্ফ (বাচ্চা) দুই অবস্থাতেই এটি আক্রমণ করে থাকে। আক্রান্ত  মুকুল  শুকিয়ে বাদামি হয়ে যায় এবং ঝরে পড়ে। এ পোকা এক ধরনের আঠালো  মধুরস নির্গত করে। এর ফলে পাতায় শুটি মোল্ড ছত্রাক আক্রমণ করে এবং পাতা কালো হয়ে যায়। পোকার আক্রমণ হলে ফল ধরে না বা ধরলেও গুটি থেকে রস শুষে নেয়ায় তা ঝরে পড়ে। এ রোগ প্রতিরোধের জন্য আম বাগান সবসময় পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত গাছ খুব ঘন হলে কিছু ডালপালা ছেটে দিতে হবে। পরিষ্কার পানি স্প্রে করে দিলে আক্রমণ কিছুটা কমানো যায়। আক্রান্ত গাছে নিম্বিসিডিন ০.৫ মিলি/লিটার হারে  স্প্রে করতে হবে বা মুকুল আসার  আগে আগে একবার, মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে ২য় বার এবং ফল গুটি হলে সাইপারমেথ্রিন (রিপকর্ড/সিমবুশ) ১ মিলি/লিটার হারে স্প্রে করতে হবে। ফল সংগ্রহের পরে মরা ডালপালা ছেটে দিতে হবে।
হাসান আলী, গ্রাম : ঝান্জিরা, উপজেলা : দিনাজপুর সদর, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : আলুর পাতায় পানি ভেজা দাগ দেখা দেয়ার ২-৩ দিনের মধ্যে জমির প্রায় সব গাছ আক্রান্ত হয়ে মরে গিয়েছে। এ রোগ থেকে বাঁচার উপায় কি?

উত্তর : জমিতে আলুর মড়ক বা নাবি ধসা (লেট ব্লাইট) রোগ দেখা দিয়েছে। এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে। এ রোগ হলে প্রথমে পাতা, ডগা ও কাণ্ডের ছোট ভেজা দাগ পড়ে। পরবর্তীতে দাগ বড় হয়ে সব পাতা ডগা ও কাণ্ডের কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আবহাওয়ায় রোগ দ্রুত ছড়ায়। ২-৩ দিনের মধ্যে জমির সব ফসল আক্রান্ত হয়ে গাছ ঝলসে যায়। আক্রান্ত ক্ষেতে পোড়া পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়। ভোরের দিকে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক চোখে পড়ে। এ রোগ থেকে বাঁচার জন্য রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত জমিতে সেচ যথাসম্ভব বন্ধ করে দিতে হবে। আক্রান্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ করা বা একই জমিতে বারবার আলু চাষ করা যাবে না। জমিতে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ প্রতিরোধক হিসেবে ডাইথেন এম-৪৫/মেলোডি ডুও/হেম্যানকোজেব ০.২% হারে ৭-১০ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে। রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে সিকিউর (২ গ্রাম/লিটার)/মেলোডি ডুও ২ গ্রাম+সিকিউর ১ গ্রাম (প্রতি লিটার পানিতে)/মেলোডি ডুও ২ গ্রাম+ডাইথেন এম-৪৫ ২ গ্রাম (প্রতি লিটার পানিতে) ছত্রাকনাশক ৭ দিন পর পর পাতার ওপরে ও নিচে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।
আনিসুল হক, গ্রাম : গোঠাইল, উপাজেলা : ইসলামপুর, জেলা : জামালপুর
প্রশ্ন : আমার গাভীর ওলান শক্ত হয়ে গিয়েছে, গাভীটির কয়েক দিন আগে বাচ্চা হয়েছে। এখন দুধ হয় না। আমি কী করতে পারি?

উত্তর : আপনার গাভীর ওলানে আলাদা নেকড়া দিয়ে প্রথমে পরিষ্কার করে অন্য নেকড়া দিয়ে সকাল বিকাল তাপ দেবেন। প্রতিদিন একটি করে এমকক্স ভেট (২.৫ গ্রাম) ভায়াল মাংসে ইনজেকশন দেবেন। এভাবে ৫ দিনে ৫টি ভায়াল ইনজেকশন দেবেন। এর সাথে রানের মাংসে প্রতিদিন ১০ মিলি কিরে ডেলারজেন ইনজেকশন তিন দিন দেবেন।
মানিরুল ইসলাম, গ্রাম : বনগাঁও, উপজেলা : বিরল, জেলা : দিনাজপুর
প্রশ্ন : আমার গরুর একটি বাছুর হয়েছে। এটা শুধু মাটি খায়। পায়খানা মাটির মতো হয়ে গিয়েছে। আমি এখন কী করতে পারি?

উত্তর : বাছুরের ফসফরাসের অভাব হয়েছে তাই মাটি খাচ্ছে। বাছুরকে প্রতিদিন দিনে দুইবার করে ২০ মিলিলিটার সিপি ভেট সিরাপ খাওয়াবেন। তাছাড়া প্রতি ১০০ কেজি খাদ্যের সাথে ২.৫ গ্রাম ডিসিপি প্লাস পাউডার মিশিয়ে খাওয়াবেন। বাছুরের আবাসন, সুষম খাদ্য এসবের ওপর নিয়মিত ও পরিমিত নজর দিতে হবে।  
মো. ইয়াজুল ইসলাম, গ্রাম : বাগজান, উপজেলা : পাঁচবিবি, জেলা : জয়পুরহাট
প্রশ্ন : মাছের মাথা মোটা ও লেজ চিকন হয়ে যাচ্ছে, কি করব?

উত্তর : হ্যাচারি বা যে কোনো উৎস থেকে অপরিপক্ব বা পুষ্টিহীন বা খারাপ মানের পোনা আনলে এ সমস্যা হতে পারে। তাই পোনা সংগ্রহের আগে পোনার গুণগত মান সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বিশ্বস্ত কোনো হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করতে হয়। নিয়মিতভাবে পুষ্টিকর খাবার যেমন সরিষার খৈল, গমের ভুসি, শুঁটকির গুঁড়া, ভিটামিন মিশ্রিত করে অথবা পিলেট বা রেডি ফিড মাছের খাদ্য হিসেবে দিতে হবে। মাছের দেহের ওজনের ৩-৫% হারে খাদ্য দিতে হবে।
শিউলি বেগম, গ্রাম : আগমাড়াই, উপজেলা : রাজবাড়ী, জেলা : রাজবাড়ী
প্রশ্ন : মাছ চাষের জন্য কীভাবে পুকুর প্রস্তুত করব?

উত্তর : পুকুর শুকিয়ে তলদেশের পচা কাদা অপসারণ এবং তলদেশ সমান করতে হবে। পাড় উঁচু করে বাঁধতে হবে। পুকুরের পাড়সহ তলায় চুন ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। পুকুরের তলদেশ চাষ দিয়ে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। পানি প্রবেশপথ ও জরুরি পানি নির্গমন পথ করতে হবে এবং তাতে স্ক্রিন বা বানা (বাঁশের পাটা ও নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি) দিতে হবে। চুন প্রয়োগের ৫-৭ দিন পরে প্রয়োজনমতো পানি প্রবেশ করিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে গোবর ৫ কেজি, ইউরিয়া ১০০-১৫০ টিএসপি ৫০-৭৫ গ্রাম এবং এমওপি ২০ গ্রাম দিতে হবে।
মো. খাইরুল ইসলাম, গ্রাম : মুষ্টিগড়, উপজেলা : সিংড়া, জেলা : নাটোর
প্রশ্ন : শিম ফসলের সার ব্যবস্থাপনা স¤পর্কে জানতে চাই।

উত্তর : শিম ডাল জাতীয় শস্য বলে এতে সারের পরিমাণ বিশেষ করে নাইট্রোজেন সারের পরিমাণ কম লাগে। শিম চাষে হেক্টর প্রতি ১০ টন গোবর, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ৯০ কেজি টিএসপি, ৬০ কেজি এমওপি, ৫ কেজি জিপসাম ও ৫ কেজি বোরিক এসিড প্রয়োজন হয়। শেষ চাষের সময় গোবর সার, জিপসাম ও বোরিক এসিড সবটুকু ছিটিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। এ সার গুলো চাষ দিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও এমওপি সারের অর্ধেক এবং টিএসপি সারের সবটুকু বীজ বপন বা চারা রোপণের ৪-৫ দিন আগে একত্রে ছিটিয়ে প্রয়োগ করে মাদার মাটির সাথে (১০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত) কোদাল দিয়ে হালকাভাবে কুপিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি সার বপন/রোপণের ৩০ দিন পর মাদায় উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
মো. হাসান, গ্রাম : কালাইয়া, উপজেলা : বাউফল, জেলা : পটুয়াখালী
প্রশ্ন : কাঁঠালের মুচির গায়ে দাগ হয়ে তা ঝরে পড়ে। এর প্রতিকার কি?

উত্তর : এটি কাঁঠালের মুচি পচা রোগ। এক রকম ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। প্রথমে কচি ফলের গায়ে বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়। পরবর্তীতে আক্রান্ত ফল গাছ থেকে ঝরে পড়ে।  এ রোগের প্রতিকারে মুচি ধরার আগে ও পরে ১০ দিন পর পর ২/৩ বার ব্যাভিস্টিন/ইন্ডোফিল এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে অথবা ইন্ডোফিল এম-৪৫/রিডোমিল এম জেড-৭৫ প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছে ফুল আসার পর থেকে ১৫ দিন অন্তর অন্তর ৩ বার স্প্রে করতে হবে। গাছের পরিত্যক্ত অংশে এ রোগের জীবাণু বেঁচে খাকে বলে গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা, পুষ্প মঞ্জুরি, আক্রান্ত  মুচি ও ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ফল বেশি ঘন থাকলে পাতলা করে দিতে হবে এবং গাছ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
সুপ্রিয় পাঠক বৃহত্তর কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে  কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কল সেন্টার এর ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির ব্যতিত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৬ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

কৃষিবিদ ঊর্মি আহসান*
*উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (এলআর) সংযুক্ত কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
নিয়মিত বিভাগ (জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষি)

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, জ্যৈষ্ঠ মাস ফলের মাস। পাকা ও মিষ্টি ফলের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা বাংলার দিক প্রান্তর। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, বাঙ্গিসহ মৌসুমি ফলের সৌরভ আমাদের রসনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। মৌসুমি ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি আচার, চাটনি, জ্যাম, জেলি জ্যৈষ্ঠের গরমে ভিন্ন স্বাদের ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। আর এ মধুমাসে প্রিয় পাঠক, চলুন একপলকে জেনে নেই জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষিকথা।
বোরো ধান
*জমির ধান শতকরা ৮০ ভাগ পেকে গেলে জমির ধান সংগ্রহ করে কেটে মাড়াই, ঝাড়াই করে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে;  শুকনো বীজ ছায়ায় ঠাণ্ডা করে প্লাস্টিকের ড্রাম, বিস্কুটের টিন, মাটির কলসি এসবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
আউশ ধান
*এখনও আউশের বীজ বোনা না হয়ে থাকলে এখনই বীজ বপন করতে হবে; চারার বয়স ১২ থেকে ১৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের প্রথম কিস্তি হিসেবে একরপ্রতি ১৮ কেজি ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এর ১৫ দিন পর একই মাত্রায় দ্বিতীয় কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে; ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা বাড়াতে জমিতে সার প্রয়োগের সময় ছিপছিপে পানি রাখাসহ জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
আমন ধান
*নিচু এলাকায় বোরো ধান কাটার ৭-১০ দিন আগে বোনা আমনের বীজ ছিটিয়ে দিলে বা বোরো ধান কাটার সাথে সাথে আমন ধানের চারা রোপণ করলে বন্যা বা বর্ষার পানি আসার আগেই চারা সতেজ হয়ে ওঠে এবং পানি বাড়ার সাথে সাথে সমান তালে বাড়ে;
*চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া ছিটিয়ে দিলে চারা তাড়াতাড়ি বাড়ে, ফলন ভালো হয়;
*এ মাসের মধ্যেই রোপা আমনের জন্য বীজতলা তৈরি করতে হবে। বীজতলা তৈরির জন্য রোদ্রোজ্জ্বল উঁচু জমিতে চাষ, মই, পানি দিয়ে ভালোভাবে থকথকে কাদাময় করে নিতে হবে। জমি উর্বর হলে সাধারণত কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না, তবে অনুর্বর হলে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি জৈবসার মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়;
*প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ৮০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বোনার আগে অংকুরিত করে নিলে তাড়াতাড়ি চারা গজায়, এতে পাখি বা অন্য কারণে ক্ষতি কম হয়। বীজ বোনার আগে বীজতলায় এক স্তর ছাই ছিটিয়ে দিলে চারা তোলার সময় উপকার পাওয়া যায়;
*ভালো চারা পাওয়ার জন্য বীজতলায় নিয়মিত সেচ দেয়া, অতিরিক্ত পানি নিকাশের ব্যবস্থা করা, আগাছা দমন, সবুজ পাতা ফড়িং ও থ্রিপসের  আক্রমণ প্রতিহত করাসহ অন্যান্য কাজগুলো সতর্কতার সাথে করতে হবে;
*চারা হলুদ হলে প্রতি বর্গমিটারে ৭ গ্রাম করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এরপরও যদি চারা হলুদ থাকে তবে প্রতি বর্গমিটারে ১০ গ্রাম করে জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে;
*জ্যৈষ্ঠ মাসে আউশ ও বোনা আমনের জমিতে পামরি পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। পামরি পোকা ও এর কীড়া পাতার সবুজ অংশ খেয়ে গাছের অনেক ক্ষতি করে। আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে হাতজাল দিয়ে পামরি পোকা ধরে মেরে ফেলে আক্রমণ কমানো যায়। তাছাড়া আক্রান্ত গাছের গোড়া থেকে ৫ সেন্টিমিটার (২ ইঞ্চি) রেখে বাকি অংশ কেটে কীড়া ও পোকা ধ্বংস করা যায়। আক্রমণ যদি বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
পাট
*আগাছা পরিষ্কার, ঘন ও দুর্বল চারা তুলে পাতলা করা, সেচ এসব কাজগুলো যথাযথভাবে করতে হবে;
*ফাল্গুনি তোষা জাতের জন্য একরপ্রতি ৪০ কেজি ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে;
*মাটিতে রস না থাকলে বা দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে হালকা সেচ দিতে হবে এবং বৃষ্টির কারণে পানি জমে থাকলে তা নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে;
*পাটশাক যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিকর। তাই নিড়ানির সময় তোলা অতিরিক্ত পাটের চারা ফেলে না দিয়ে শাক হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
*পাটের বিছা পোকা এবং ঘোড়া পোকা জমিতে আক্রমণ করতে পারে। বিছা পোকা দলবদ্ধভাবে পাতা ও ডগা খায়, ঘোড়া পোকা গাছের কচিপাতা ও ডগা খেয়ে পাটের অনেক ক্ষতি করে। পোকার আক্রমণ রোধ করতে পোকার ডিমের গাদা, পাতার নিচ থেকে পোকা সংগ্রহ করে মেরে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। জমিতে ডালপালা পুঁতে দিলে পোকা খাদক পাখি যেমন শালিক, ফিঙ্গে এসব পোকা খেয়ে উপকার করে। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিকভাবে, সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।
শাকসবজি
*মাঠে বা বসতবাড়ির আঙিনায় গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির পরিচর্যা সতর্কতার সাথে করতে হবে। সারের উপরিপ্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, গোড়ায় বা কেলিতে মাটি তুলে দেয়া, লতাজাতীয় সবজির জন্য বাউনি বা মাচার ব্যবস্থা করা খুব জরুরি;
*লতানো সবজির বাড়বাড়তি যত বেশি হবে তার ফুল ফল ধারণক্ষমতা তত কমে যায়। সেজন্য লতার/গাছের ১৫-২০ শতাংশের পাতা লতা কেটে দিলে তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরবে;
*কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন অধিক ফলনে দারুণভাবে সহায়তা করবে; গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন সকালে হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে;
*কুমড়া জাতীয় ফসলে মাছি পোকা দারুণভাবে ক্ষতি করে থাকে। জমিতে খুঁটি বসিয়ে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। এছাড়া সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করেও এ পোকার আক্রমণ রোধ করা যায়;
*সবজিতে ফল ছিদ্রকারী পোকা, জাব পোকা, বিভিন্ন বিটল পোকা সবুজ পাতা খেয়ে ফেলে। হাত বাছাই, পোকা ধরার ফাঁদ, ছাই ব্যবহার করে এসব পোকা দমন করা যায়। তাছাড়া আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলে এবং সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে;
*মাটির জো অবস্থা বুঝে সেচ এবং পানি নিকাশের ব্যবস্থা সতর্কতার সাথে অনুসরণ করতে হবে।
বিবিধ
*বাড়ির কাছাকাছি উঁচু এমনকি আধা ছায়াযুক্ত জায়গায় আদা হলুদের চাষ করতে পারেন;
*মাঠের মিষ্টিআলু, চিনাবাদাম বৃষ্টি শুরুর আগেই তুলে ফেলতে হবে। গ্রীষ্মকালীন মুগডালের চাষও করা যায়;
*পতিত বা আধা ছায়াযুক্ত স্থানে অনায়াসে লতিরাজ বা পানিকচু বা অন্যান্য উপযোগী কচুর চাষ করতে পারেন;
*যারা সবুজ সার করার জন্য ধইঞ্চা বা অন্য গাছ লাগিয়ে ছিলেন, চারার বয়স ৩৫-৪৫ দিন হলে চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। সবুজ সার মাটিতে মেশানোর ৭-১০ দিন পরই ধান বা অন্যান্য চারা রোপণ করতে পারবেন।
গাছপালা
*আগামী মাসে চারা লাগানোর জন্য জায়গা নির্বাচন, গর্ত তৈরি ও গর্ত প্রস্তুতি, সারের প্রাথমিক প্রয়োগ, চারা নির্বাচন এ কাজগুলো এমাসেই শেষ করে ফেলতে হবে;
*উপযুক্ত মাতৃগাছ থেকে ভালো বীজ সংগ্রহ করে নারকেল, সুপারির বীজ বীজতলায় এখন লাগাতে পারেন।
প্রাণিসম্পদ
*এ সময়ে প্রাণী চিকৎসকের সাথে পরামর্শ করে হাঁস মুরগির ভ্যাকসিন দিতে হবে;
*এছাড়া হাঁস মুরগির কৃমির জন্য ওষুধ খাওয়ানো, ককসিডিয়া রোগ হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জরুরিভাবে অন্যান্য প্রতিষেধক টিকা দিয়ে দিতে হবে;
*মুরগি ও হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর কাজটি ভরা বর্ষার আগেই সেরে ফেলতে হবে;
*বর্ষার নিয়মিত এবং পরিমিত গো-খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হবে;
*গবাদি পশুর গলাফোলা, ডায়রিয়া, ক্ষুরারোগ, নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য রোগের টিকা দেয়াসহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মৎস্যসম্পদ
*মাছ প্রজননে আগ্রহী চাষিভাইদের স্ত্রী-পুরুষ মাছ (ব্রুড ফিশ), পিটুইটারি গ্রন্থি, হাপা এবং ইনজেকশনের সরঞ্জামাদি প্রস্তুত রাখতে হবে;
*আঁতুড় পুকুর বন্যায় ডুবে যাবার আশঙ্কা থাকলে পাড় উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে। আঁতুড় পুকুরে পোনার আকার ১ ইঞ্চি হলে সাবধানে ধরে চারা পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে;
*নিয়মিত তদারকি, রাক্ষুসে মাছ তোলা, আগাছা বা জংলা পরিষ্কার, খাবার দেয়া, সার দেয়া, সম্পূরক খাবার দেয়া, জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এসব প্রাসঙ্গিক কাজগুলো নিয়মিত করতে হবে;
*এছাড়া যে কোনো সমস্যায় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের কল্যাণে ও সফলতার জন্য আমরা এক মাস আগেই আগামী মাসের কৃষির করণীয় দিকগুলো স্মরণ করিয়ে দেই। সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম বাস্তবায়নে আপনাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিতে এগুলো বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। এরপরও যদি আরও নতুন কোনো তথ্য প্রযুক্তি বা কৌশল জানার থাকে তাহলে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণীবিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিলে আরও বেশি লাভবান হবেন।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*
*তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫।

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook