কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

রসে মধুর আনারস

আমকে যদি ফলের রাজা বলা হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে আনারস ফলের রানী। কেননা মাথায় মুকুট পরে কাঁটার আসনে বসে গাম্ভীর্যের সাথে আনারস গর্বিতভাবে জীবন যাপন করে। তাছাড়া ছানাবড়া চোখ শুধু আমাদেরকেই ধাঁধায় না, চোখ তুলে খেতেও বেশি কষ্ট করতে হয়। চেহারা, রূপ-লাবণ্য সব মিলিয়ে আনারসই ফলের রানী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। কাব্যরসিকরা অবশ্য আনারসকে স্বর্ণকুমারী বলেন। তাইতো ছন্দাকারে বলা যায়... আনারস মধুর ফল পুষ্টিগুণে ভরা, অর্থ দেয় লাভ দেয় দূর করে জরা। গবেষকদের ধারণা আনারসের উৎপত্তিস্থল ব্রাজিলে। আনারস উৎপাদনে লিডিং দেশগুলোর মধ্যে আছে কোস্টারিকা, ব্রাজিল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ইন্ডিয়া।
আনুমানিক ১৫৪৮ সালের দিকে আমাদের এ অঞ্চলে আনরস এসেছে। পাকা আনারসের অম্ল মধুর রসালো মিষ্টি গন্ধ হৃদয় ছুঁয়ে যায়, খাওয়ার প্রতি লোভ বাড়িয়ে দেয়। আনারস অবশ্যই দারুণ মনোহরি সুগন্ধি, উপাদেয় এবং সুস্বাদু ফল। আনারসের জুস, স্লাইস, এসিড, স্কোয়াশ, সিরাপ, জ্যাম, জেলি, আনারসসত্ত্ব, ভিনেগার, সাইট্রিক এসিড, ক্যালসিয়াম সাইট্রেট, অ্যালকোহল বিশ্বনন্দিত। কুশকুশে কাশি জ্বরে আনারস মহৌষধ। তাছাড়া আনারসের পাতা থেকে মোম ও সুতা তৈরি হয়। টিনে সংরক্ষণ করার পরও আনারসে কিছু পরিমাণ ভিটামিন থাকে। পাকা আনারসে গড়ে শতকরা ১০ ভাগ চিনি ১ ভাগ সাইট্রিক এসিড থাকে। টাটকা আনারসের মধ্যে প্রোটিন জাতীয় খাদ্যে পরিপাক ও হজমের সহায়ক ব্রোমিলিন নামক জারকরস থাকে। বাণিজ্যিক ফল হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে আনারস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের অধিকাংশ বাড়িতে ২-৪টি আনারস গাছ আছে। কিন্তু আবহাওয়া মাটি যতœ এসবের অভাবে সেসবে আনারস ফলে ঠিকই কিন্তু তেমন আশাবাদ ফলন দেয় না। আনারস বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং টাঙ্গাইল জেলায় ব্যাপকভাবে চাষ হয়। ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, দিনাজপুর জেলাতেও আনারসের চাষাবাদ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর এলাকার আনারস একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত। আমাদের দেশে আনারস সাধারণত তাজা পাকাফল হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পৃথিবীতে উৎপাদিত আনারসের বেশিরভাগই প্রক্রিয়াজাত করা হয়ে থাকে।
আনারসের বোটানি
আনারসের কা- বেশ ছোট, বহু সংখ্যক অতিঘন সন্নিবিষ্ট পুরু ও লম্বা পাতা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে। মূল ছোট। ১ ফুটের মতো মাটির গভীরে যায়। পাতা পুরু ও পিচ্ছিল বলে কিছু পরিমাণ অনাবৃষ্টি অতিবৃষ্টি সহ্য করতে পারে। এত গুণে গুণান্বিত এবং উপকারী ফল বছরের ৫-৬ মাস দেখাই যায় না। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুতে ওই সময় তারা মাতৃজঠরে আবদ্ধ থাকে। আবার যখন পাকা শুরু হয় তখন এক সাথে পাকে। আবার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর-মে মাসে ওষুধ সেবনের জন্যও পাওয়া যায় না। বর্তমানে দেশে ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আনারসের চাষ হচ্ছে। শুধু নানিয়াচর উপজেলায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর পাহাড়ি জমিতে আানরস হয়। উৎপাদনও পাঁচ লাখ মেট্রিক টনের ওপরে।  আমাদের দেশে সারা বছরই বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলের চাষ করা হয়। আনারস একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। আনারসের বৈজ্ঞানিক নাম
Anarus comosus| Bromeliaceae পরিবারভুক্ত। বাংলাদেশের অনেক স্থানেই আনারস চাষ করা হয়। ২০১৪ সালের হিসাব মতে, বিশ্বে সাড়ে ২৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে কোস্টারিকায় পৃথিবীর ১১% আনারস উৎপাদিত হয়।
পুষ্টি ও ভেষজ গুণ
পাকা ফল বলকারক, কফপিত্ত বর্ধক, পাচক ও ঘর্মকারক। কাঁচাফল গর্ভপাতকারী। পাকা ফলের সদ্য রসে ব্রোমিলিন নামক জারক রস থাকে যা পরিপাক ক্রিয়ার সহায়ক এবং রস পাণ্ডুরোগে হিতকর। কচি ফলের শাঁস ও পাতার রস মধুর সাথে মিশিয়ে সেবন করলে ক্রিমির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। পুষ্টিমানের বিচারে আনারসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ বি সি পাওয়া যায়। তাছাড়া ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। জ্বরে বিশেষ পথ্য ও ওষুধ হিসেবে কাজ করে।
আনারসের জাত
আনারসের বেশ কয়েকটি জাত আছে। এর মধ্যে হানিকুইন একটি। হানিকুইন ডলডুপি হিসেবেও পরিচিত। চোখ সূচালো ও উন্নত। গড় ওজন প্রায় ১ কেজি। পাতা কাঁটাযুক্ত ও পাটল বর্ণের। হানিকুইন বেশ মিষ্টি আনারস।  মধুর মতোই মিষ্টি। পাকা আনারসের শাঁস হলুদ রঙের। চোখ সূচালো ও উন্নত। সবচেয়ে বড় আকারের জাত হচ্ছে জায়ান্টকিউ। নামের সাথে মিল রেখেই এর আকারও বড় আকৃতির। পাকা অবস্থায়ও আনারস সবুজাভ শাঁস হালকা হলুদ। চোখ প্রশস্ত ও চেপ্টা। গাছের পাতা সবুজ ও প্রায় কাটাবিহীন। গড় ওজন ২ কেজি। ক্যালেন্ডুলা আরেকটি জাত। মাঝারি আকারের ভালোই মিষ্টি। ওজন ১ থেকে দেড় কেজি। আরও একটি উল্লেখযোগ্য জাত হচ্ছে ঘোড়াশাল। পাকা আনারস লালচে এবং ঘিয়ে সাদা হয়। চোখ প্রশস্ত। পাতা কাঁটা বিশিষ্ট, চওড়া ও ঢেউ খেলানো থাকে। গড় ওজন ১ থেকে ১.২৫ কেজি। বেশ মিষ্টি। এগুলো ছাড়া দেশীয় হয়তো আরও জাত থাকতে পারে যেগুলো বাড়ির আঙিনার আশপাশে জন্মে।
বংশবিস্তার
 স্বাভাবিক অবস্থায় আনারসের বীজ হয় না। তাই বিভিন্ন ধরনের চারার মাধ্যমে আনারসের বংশবিস্তার হয়। সাধারণত পার্শ্ব চারা, বোঁটার চারা, মুকুট চারা ও গুঁড়ি চারা দিয়ে আনারসের বংশবিস্তার হয়। এর মধ্যে পার্শ্ব চারা বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। আনারসের বিভিন্ন জায়গা থেকে চারা উৎপন্ন হয়। সব ধরনের চারাই ব্যবহার করা যায় চাষের জন্য। পাতার কক্ষ থেকে, মাটির কাছের পাতার কক্ষ থেকে, ফলে বোঁটার পাশ থেকে, মাথার মুকুট বা পুরনো গাছের গোড়া থেকে চারা পাওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা বলেন, পাতার কক্ষ থেকে পাওয়া চারা বেশি ভালো। আনারস গাছে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের চারা উৎপন্ন হয়। পার্শ্ব চারা, বোঁটার চারা, মুকুট চারা, গোড়ার চারা বা ট্যাম্প। সব ধরনের চারাই রোপণ করা যায়, তবে পার্শ্ব চারা ও গোড়ার চারাই উত্তম।
জমি ও মাটি
উঁচু জমি ও পানি দাঁড়ায় না দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি আনারস চাষের জন্য বেশ উপযোগী। মাটি ঝুরঝুরে করে মই দিয়ে জমি সমতল করতে হয় যাতে বৃষ্টির পানি কোনো স্থানে জমে না থাকতে পারে। জমি থেকে ১৫ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ১ মিটার প্রশস্ত বেড তৈরি করতে হবে। এক বেড থেকে অন্য বেডের মধ্যে ৫০-১০০ সেন্টিমিটার ফাঁক রাখতে হবে। পাহাড়ের ঢাল আনারস আবাদে  বেশ উপযোগী। পাহাড়ের ঢালে আনারসের চাষ করার জন্য কোনোক্রমেই জমি চাষ দিয়ে বা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে আলগা করা উচিত নয়। এতে ভূমিক্ষয়ের মাধ্যমে উর্বর মাটি ধুয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শুধু পাহাড়ের জঙ্গল বা আগাছা মাটির স্তরে কেটে পরিষ্কার করে জমি চারা রোপণের উপযোগী করে তুলতে হবে।
চারা রোপণ ও সার ব্যবস্থাপনা
গুণগত মানসম্পন্ন ভালো ফলন পেতে হলে আনারস চাষের জমিতে যতটুকু সম্ভব জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে মাটির ধরন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে জৈবসার ব্যবহার করলে মাটির গুণাগুণ ও পরিবেশ উভয়ই ভালো থাকবে। বাড়িতে গবাদি পশু থাকলে সেখান থেকে গোবর সংগ্রহ করা যাবে। নিজের গবাদি পশু না থাকলে পাড়া-প্রতিবেশী যারা গবাদি পশু পালন করে তাদের কাছ থেকে গোবর সংগ্রহ করা যায়। এছাড়া ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে আবর্জনা পচাসার ব্যবহার করা যায়। বাড়ির আশপাশে গর্ত করে সেখানে আবর্জনা, ঝরা পাতা স্তূপ করে রেখে আবর্জনা পচা সার তৈরি করা সম্ভব।
মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ অর্থাৎ অক্টোবর নভেম্বর মাস আনারসের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তাছাড়া সেচের সুবিধা থাকলে মধ্য মাঘ থেকে মধ্য ফাল্গুন অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসেও চারা লাগানো যায়। এক মিটার প্রশস্ত বেডে দুই সারিতে চারা রোপণ করতে হবে।  ৫০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে লাইনে ৩০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে চারা লাগাতে হবে। চারা বেশি লম্বা হলে ৩০ সেন্টিমিটার পরিমাণ রেখে আগার পাতা সমান করে কেটে দিতে হবে। পাহাড়ের ঢালে আনারস চাষের জন্য কন্টুর পদ্ধতি বা সমউচ্চতা বরাবর ঢালের বিপরীতে আড়াআড়িভাবে জোড়া সারি করে চারা রোপণ করা হয়। কখনও ঢাল বরাবর সারিতে চারা  রোপণ করা উচিত নয়। এতে ভূমিক্ষয় বাড়ে। পাহাড়ের ঢালে জোড়া সারিতে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৪০ সেন্টিমিটার ও চারা থেকে চারার দূরত্ব ২০-২৫ সেন্টিমিটার দেয়া উচিত। এতে হেক্টরপ্রতি ৫০ হাজার বা কানিপ্রতি (৪০ শতাংশ) ৮ হাজার চারা প্রয়োজন। নির্ধারিত স্থানে চারা রোপণের পর গোড়া ভালোভাবে চেপে দেয়া উচিত। যদিও পাহাড়ি এলাকাতে দূরত্ব সঠিকভাবে মানেন না।
সার ব্যবস্থাপনা
গাছপ্রতি পচা গোবর ৩০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৩৫ গ্রাম, টিএসপি ১৫ গ্রাম, এমওপি ৩৫ গ্রাম ও জিপসাম ১৫ গ্রাম প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে যত চারা আছে তা হিসাব করে সে মতো সার প্রয়োগ করতে হবে। গোবর, জিপসাম ও টিএসপি সার বেড তৈরির সময় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও এমওপি সার চারা রোপণের ৪-৫ দিন পর থেকে শুরু করে ৫-৬ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সার বেডে ছিটিয়ে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলে আনারস একটি উল্লেখযোগ্য ফসল। সেখানে পাহাড়ের ঢালে কন্টুর পদ্ধতিতে সুন্দর লাইন করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আনারস লাগানো হয়। সার ব্যবস্থাপনাও সমতল ভূমির আনারসে চেয়ে ভিন্নতর। চারা রোপণের দুই মাস পর গাছপ্রতি ইউরিয়া ও টিএসপি সার ১০ গ্রাম করে গাছের গোড়া থেকে ১৫ সেন্টিমিটার দূরে ডিবলিং পদ্ধতিতে/পেগিং পদ্ধতিতে প্রয়োগ করতে হবে। একইভাবে গাছের বয়স যখন ৭-৮ মাস হবে তখন আর একবার একই  মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হয়।
সেচ ও নিকাশ
শুকনো মৌসুমে আনারস ক্ষেতে সেচ দেয়া খুবই প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির সময় গাছের গোড়ায় যাতে পানি জমে না থাকে সেজন্য নালা কেটে পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। চারা বেশি লম্বা হলে ৩০ সেন্টিমিটার পরিমাণ রেখে আগার পাতা সমান করে কেটে দিতে হবে। আগাছা আনারসের খুবই ক্ষতি করে। তাই আনারসের জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখা প্রয়োজন। বছরে অন্তত দুইবার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে; একবার আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ফল সংগ্রহ করার পর ও দ্বিতীয় বার অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। গাছ বড় হওয়ার আগে এটি সম্ভব। কিন্তু গাছ ঝোপালো হয়ে গেলে আগাছা পরিষ্কার করা যায় না তেমনি পরিষ্কার করার তেমন প্রয়োজনও পড়ে না। জমিতে সেচ এবং সার প্রয়োগের পর মালচিং করে নিলে জমি আগাছামুক্ত থাকে। আগাছা দিয়ে মালচিং করার পর একসময় পচে জৈবসার হিসেবে মাটিতে যুক্ত হয় এবং এতে করে মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
বালাই ব্যবস্থাপনা
আনারসে সাধারণত বালাইয়ের আক্রমণ কম হয়। চাষের জমিতে পোকার আক্রমণ হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করলে বেশি ভালো হয়। তবে যে কোনো প্রয়োজনে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা অথবা উপজেলা কৃষি অফিসে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে।
আনারসে হরমোন ট্রিটমেন্ট
বাংলাদেশে যে পরিমাণ আনারস উৎপাদিত হয় তার অধিকাংশই আসে মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য ভাদ্র অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট মাসে। এ সময় আম, কলা, পেয়ারা, কাঁঠাল এসব ফলেরও মৌসুম। কাজেই এ সময় আনারসের দাম কমে যায়। এমনকি এক সাথে প্রচুর আনারস পাকার ফলে এবং বৃষ্টির দিনে পরিবহনের অভাবে আনারস পচে যায়, নষ্ট হয়। বছরের অন্যান্য সময়ে এর চাহিদা বেশি থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন না থাকায় তা খাওয়া যায় না। তাছাড়া আনারসভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হলেও সারা বছর এর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পিতভাবে হরমোন প্রয়োগ করে সারা বছর কাক্সিক্ষত সময়ে আনারস পাকানো যায়। আনারস উৎপাদনে প্রধান সমস্যার মধ্যে রয়েছে গাছে ফুল আসতে ১৫-১৬ মাস এবং আনারস পাকতে ২১-২২ মাস সময় লেগে যায়। এতে ফলের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা জমিতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বিশ্বে আনারস উৎপাদনকারী বিভিন্ন দেশে বহুকাল আগে থেকেই হরমোন প্রয়োগ করে আনারসের উৎপাদন করা হচ্ছে। হরমোন প্রয়োগে সুবিধা হলো- কম সময়ে আনারস পাওয়া; একসাথে বা কাক্সিক্ষত সময়ে আনারস পাওয়া; ইচ্ছে অনুযায়ী যে কোনো সময়ে আনারস পাকানো যায়; অমৌসুমে আনারস বিক্রি করে বেশি দাম পাওয়া যায়; কম খরচে বেশি লাভ করা যায়- হরমোন প্রয়োগে আনারসপ্রতি খরচ মাত্র ২০ পয়সা থেকে ২৫ পয়সা আর আনারস প্রতি বাড়তি লাভ ৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা; সারা বছর ফলানো যাবে বলে উৎপাদনের এবং সরবরাহের বছরব্যাপী নিশ্চয়তা পাওয়া যায়; বর্ষা মৌসুমে পরিবহন, স্তূপিকীকরণ সমস্যাজনিত অপচয় হবে না; বাগানে অতিরিক্ত উৎপাদন সম্ভব হবে কেননা, হরমোন প্রয়োগে ৮০-৯০% গাছে ফল ধারণ করে হরমোন ব্যতিরেকে গড়ে ৫০-৬০% গাছে ফল ধরে।
আনারসের ক্ষেত্রে ০১. ইথ্রেল ০২. ক্লোরোইথাইল ফসফোনিক এসিড ০৩. ন্যাপথলিন এসিটিক এসিড, ফুল আনতে সাহায্য করে। তবে বাংলাদেশে অমৌসুমে আনারসে ফুল আনার জন্য ০১ নং ও ০২ নং হরমোন বেশি কার্যকর। ক. ইথ্রেল ৫০০ পিপিএম দ্রবণ তৈরির জন্য প্রতি লিটার পরিষ্কার পানিতে ১.৩ মিলিলিটার তরল ইথ্রেল (৩৯% ইথাফন) মিশিয়ে নিতে হবে। খ. ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার পরিষ্কার পানিতে ১০ গ্রাম দানাদার ক্যালসিয়াম কার্বাইড প্রথমে অল্প পানিতে মিশিয়ে তৈরি দ্রবণ পরবর্তীতে পুরো পানির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। হরমোন দ্রবণ প্রতিদিন ভোরবেলায় সকাল ৬-৮টায় ৯ থেকে ১৩ মাস বয়সের ৩০-৪০ পাতাবিশিষ্ট প্রতি গাছে ৫০ মিলিলিটার হরমোন দ্রবণ গাছের ডগায় ঢেলে দিতে হবে। হিসাব করে দেখা গেছে, ১ লিটার হরমোন দ্রবণ দিয়ে ২০টি গাছে প্রয়োগ করা যায়। বৃষ্টি বাদলার দিনে হরমোন প্রয়োগ করলে কার্যকারিতা কম হয়। প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেন বৃষ্টি না হয় এ চিন্তা মাথায় রেখে দ্রবণ প্রয়োগ করতে হবে। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিডিউল করে হরমোন প্রয়োগ করলে কাক্সিক্ষত এবং অমৌসুমে আনারস পাওয়া যায়। এ হরমোন মানুষের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। প্রতি মাসেই ১ একটি ব্লকে আনারস চারা রোপণ করতে হয় বা একবার রোপণ করে ৩-৪টি ব্লকে ভাগ করে ক্রমান্বয়ে প্রতি মাসে হরমোন প্রয়োগ করলে কাক্সিক্ষত সময়ে আনারস পাকার ব্যবস্থা করা যায়। অমৌসুমে আনারস উৎপাদন করে চাষি যেমন লাভবান হতে পারেন তেমনি ক্রেতারাও বিশেষ স্বাদ নিতে পারেন। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে হরমোন প্রয়োগ করলে ১০ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ফুল আসে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হরমোন প্রয়োগ করলে মোটামুটি ৪০ দিনের মধ্যে ফুল আসে। আর অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হরমোন প্রয়োগ করলে ৪০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফুল আসে। এ পদ্ধতিতে মোটামুটিভাবে শতকরা ৮০ থেকে ১০০ ভাগ গাছে ফল আসে।
মুড়ি ও সাথী ফসল চাষ
আনারস চাষে অন্যান্য লাভের সাথে আরেকটি লাভ মুড়ি ফসল। মুড়িগাছ একাধিক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং ফল ধরে। সাধারণত মুড়ি ফসল থেকে ৫ থেকে ৬ বছর সফলভাবে ফল সংগ্রহ করা যায়। ঘোড়াশাল জাতের বেলায় কাপাসিয়া এলাকায় ৪০  থেকে ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুড়ি ফসল থেকে ফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে আগাছা পরিষ্কার, শূন্যস্থান পূরণ, সার প্রয়োগ, বালাই ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। আনারসের সাথে অনায়াসে আদা, সয়াবিন, সরিষা, কলাই, কচু সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন ফল গাছের বাগানের ভেতর আনারস আবাদ করে। পাহাড়ি এলাকায় সাধারণত ট্যারেসিং বা কন্টুর পদ্ধতিতে ৬০ সেন্টিমিটার গভীর ও ৩০ সেন্টিমিটার প্রস্থ চাষ করা ভালো। পাহাড়ি এলাকায় জমি তৈরিতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেন না বেশি নাড়াচাড়া করলে ভূমি ক্ষয় হয়ে যাবে।
ফল সংগ্রহ খরচ ফলন ও লাভ
সাধারণত চারা রোপণের ১৫-১৬ মাস পর মাঘ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে আনারস গাছে ফুল আসে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে আগস্ট মাসে আনারস পাকে। পাকা ফল সংগ্রহ করতে হবে। কিছু কিছু জাত আছে সারা বছর আনারস দেয়। প্রতি হেক্টরে ঘোড়াশাল ১৫ থেকে ২০ মেট্রিক টন, হানিকুইন আনারস ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন এবং জায়ান্টকিউ ৩০ থেকে ৪০ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়। এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে আনারস চাষের জন্য প্রায় ২০,০০০ টাকার প্রয়োজন হবে। সে মতে, হেক্টরপ্রতি দেড় থেকে ২ লাখ টাকা খরচ হয়। আর হেক্টরপ্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হয়। আনারস বহুগুণে গুণান্বিত ফল। আমাদের আছে অবারিত উপযোগী জমি ভূমি। একটু বেশি দরদ দিয়ে আবাদ আর প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে আনারস দিয়ে আমরা বিশ্ব মাতাতে পারব। শুধু প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা, কার্যক্রর ব্যবস্থাপনা আর বাস্তবায়ন কৌশল। শুধু পাহাড়ের আনারস দিয়েও আমরা নতুন সম্ভাবনাকে আরও বেগবান করতে পারব অনায়াসে।

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫; 
Subornoml @gmail.com

বিস্তারিত
সম্ভাবনাময় আগর-আতর শিল্প

পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। সুরভিত সুগন্ধির সুঘ্রাণ যে কোনো অনুষ্ঠানে আনে পবিত্রতার আমেজ।

আগর গাছের পরিচিতি
আগর মূলত একটি গাছের নাম। আগর শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো উৎকৃষ্ট বা সুগন্ধি বিশিষ্ট কাঠ। ইংরেজিতে এর নাম এলো ওড (
Aloe Wood বা Wagle Wood), আরবিতে বলে উদ, দক্ষিণ এশিয়ায় পরিচিত নাম গাডরউদ, মালয়েশিয়ান ভাষায় গাহারু, হারবাল ইউনানি চিকিৎসায় এর নাম উদহিন্দ এবং আয়ুর্বেদিক ভাষায় অগুরু বলে পরিচিত ও সমাদৃত। বাংলা, আরবি এবং ফারসিসহ বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে অপভ্রংশ হয়ে আগর নামটির উৎপত্তি হয়েছে। পৃথিবীতে কবে কোথায় আগর-আতরের চাষাবাদ শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস বের করা মুশকিল। তবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রেইন ফরেস্টই আগর গাছের আদিস্থান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। আগর গাছ থেকে বিশেষ কালো রঙের কাঠ পাওয়া যায়, যা আগর কাঠ নামে পরিচিত। স্থানীয় ভাষায় যা ‘মাল’ বলে অভিহিত করা হয়। স্থানীয়ভাবে যারা আগর কাঠ শনাক্ত করেন তাদের ‘দৌড়াল’ বলা হয়।
বাংলাদেশে মূলত
Aquilaria agallucha Ges Aquilaria malaccenesis এবং Aquilaria malaccenesis প্রজাতির আগর গাছ চাষ হয়। ট্যাক্সোনোমিকেলি আগর গাছ Thymelaeaceae  পরিবারের অন্তর্গত। আগর গাছ লম্বায় প্রায় ১৫ থেকে ৪০ মিটার এবং বেড় বা ব্যাস ০.৬-২.৫ মিটার হয়। শাখা-প্রশাখবিহীন সোজা লম্বা গাছটি দেখতে এবং আকার আকৃতিতে অনেকটা শাল বা গজারি গাছের মতো। এ গাছে সাদা রঙের ফুল এবং ফলগুলো ক্যাপসুল আকৃতির হয়। আগর গাছের পাতা দেখতে অনেকটা লিচু গাছের পাতার মতো, অনেকে বকুল গাছের পাতার সাথেও মিলাতে পারেন। সাদা রঙের আগর কাঠ খুব নরম হয়। ফলে আতর উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহ ও জ্বালানি কাঠ ছাড়া অন্য কোনো কাজে এ গাছ ব্যবহার হয় না।  
আগর-আতরের ব্যবহার
আগর কাঠকে ঈশ্বরের কাঠ বলা হয়। পূর্ব এশিয়া ও জাপানে আগর কাঠ পূজার অর্ঘ্য উপকরণ। মধ্যপ্রাচ্যে আগর কাঠের ব্যবসা ও সমাদর হাজার বছরের পুরনো। আগরের সুগন্ধ প্রশান্তিদায়ক, অনেকেই শরীরের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজে লাগে। নানাবিধ ওষুধ, পারফিউম, পারফিউম জাতীয় দ্রব্যাদি-সাবান, শ্যাম্পু এসব প্রস্তুতে আগর তেল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত গৃহে, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সুগন্ধি ছড়ানোর জন্য আগর-আতর ব্যবহার করা হয়। আগর আতরের পাশাপাশি আগর কাঠের গুঁড়া বা পাউডার ধূপের মতো প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জাতি বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং মুসলিম ধর্মালম্বী সবাই আগর আতর ও আগর কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করে। আতর বাংলাদেশে তরল সোনা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
আগর গাছের উৎপাদন কৌশল
বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার পাশে, পতিত জমি, টিলার ঢালে, টিলা বা পাহাড়ে এমনকি পরিত্যক্ত জায়গায় আগর গাছ লাগানো যায়। পাহাড় বা টিলা জমিতে আগর গাছ ভালো জন্মে। তবে সব জমিতেই কমবেশি জন্মে।
চারা তৈরি : গাঢ় বাদামি বর্ণের ৩.৮১ সে.মি.-৫.০০ সে.মি (১.৫ থেকে ২ ইঞ্চি) লম্বা ক্যাপসুল জাতীয় ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। প্রতি ফলে দুটো বীজ হয়। বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে। সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা স্থায়ী থাকে। বীজ থেকে চারা তৈরি করা হয়। বীজ বপনের উৎকৃষ্ট সময় মার্চ-এপ্রিল। চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়। প্রথমে বালুর বেডে বীজগুলো বিছিয়ে দিয়ে ওপরে আবারও বালু দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এখানে বীজগুলো অঙ্কুরিত হয়। প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পরে পলিব্যাগে চারা স্থানান্তরিত হয়। চারা গজানোর জন্য অস্থায়ী শেডের ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। চারায় নিয়মিত পানি সেচের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
চারা রোপণ : বর্ষা মৌসুম আগর গাছের চারা রোপণের উৎকৃষ্ট সময়। বাংলাদেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে আগরের চারা রোপণ করলে গাছ টিকে বেশি। স্কুল, কলেজ, রাস্তা দুই পাশেও আগরের চারা রোপণ করা যায়। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতেও আগর গাছ লাগানো যেতে পারে। রোপণের সময় প্রতিটি গর্তে জৈব সার-কম্পোস্ট সার, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম সার গাছের বয়স অনুযায়ী প্রয়োগ করা যেতে পারে। রোপণের সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব ১.৫২ মি.-১.৮২ মি. (৫-৬ ফুট) এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৯১.৪৪ সে.মি.-১.২২ মি. (৩-৪ ফুট) বজায় রাখা উত্তম। সাধারণত ১-২ বছর বয়সী আগরের চারা লাগানো হয়। একক বাগানের ক্ষেত্রে কম দূরত্ব এবং মিশ্র বাগানের ক্ষেত্রে একটু বেশি দূরত্ব রাখা উচিত। অন্যান্য গাছের মতো চারা রোপণের পূর্বে দৈর্ঘ্যে ৫০ সেন্টিমিটার প্রস্থে ৫০ সেন্টিমিটার এবং গভীরতায় ৫০ সেন্টিমিটার আকারের গর্ত তৈরি করে পচা গোবর ও সার প্রয়োগ করা ভালো।
আন্তঃফসল : সাধারণত প্রথম ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত মিশ্র ফসল যেমন শাকসবজি ও ডাল জাতীয় ফসল চাষ করা যায়। পরবর্তীতে কয়েক বছর ছায়া পছন্দকারী সর্পগন্ধা ঔষধি গাছের আবাদ করা যায়। আদা এবং হলুদও চাষ করা হয়। তাছাড়া সুপারি, কফি, রাবার, পামগাছসহ অধিকাংশ বনজ গাছ আগর গাছের সাথে মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। বিভিন্ন দেশে এলাচও চাষ করে।
আন্তঃপরিচর্যা
খরা মৌসুমে পানি সেচ দিতে হয়। প্রয়োজনমতো আগাছা দমন করতে হবে। তাছাড়া নিয়ম করে কিছু রাসায়নিক সার দিলে গাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। এক্ষেত্রে নতুন আগর গাছের বাগানে কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। আগর গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সার ব্যবহার করা যায়। একবার বর্ষার আগে এবং একবার বর্ষার পরে অর্থাৎ বছরে দুইবার সার প্রয়োগ করা উত্তম।
আগরের বালাই
আগরের তেমন কোনো রোগ হয় না তবে মাঝে মাঝে গোড়া পচা রোগ এবং ডাইব্যাক রোগে গাছের ডালপালা শুকিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে ভালো ফল পাওয়া যায়। আগর চাষের ক্ষেত্রে বিছা পোকা পাতা ঝাঁঝরা করে ফেলে। সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করে বিছা পোকার আক্রমণ দমানো যায়।    
আগর সংগ্রহের সময় : প্রাকৃতিকভাবে আগর গাছে আগর তৈরি হতে ২৫-৩০ বছর সময় লেগে যায়। তবে কৃত্রিমভাবে ৫-৬ বছর বয়সী আগর গাছে পেরেক মেরে এসব গাছ ১৫-১৬ বছর হলেই আগর কাঠ সংগ্রহ করা যায়। আগর কাঠ সংগ্রহের জন্য গাছ কর্তনের উপযোগী হয়েছে কিনা তা বিবেচনা করা হয় মূলত গাছ কতটুকু রুগ্ন হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। গাছের বয়স, গাছের বৃদ্ধি ও শারীরতাত্ত্বীয় পরিপক্বতা বিবেচনা করে আগর গাছ কর্তন করা হয় না বরং গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাওয়া, দৃশ্যমান ক্ষতযুক্ত কা-, কাঠের বিকৃতি, ক্ষুদ্র পাতা, মূল কা- ও শাখার ওপর মরা লক্ষণ এসব দেখে আগর কাঠ কর্তন করা ও সংগ্রহ করা হয়। সারা বছরই আগর কাঠ সংগ্রহ করা গেলেও জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসই আগর কাঠ সংগ্রহের উৎকৃষ্ট সময়। এ সময় গাছ সুপ্ত অবস্থায় থাকে বলে আগর কাঠে আতর বা তেলের পরিমাণ বেশি ও গুণগত মানের পাওয়া যায়। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক গাছ থেকে ২.০ থেকে ২.৫ কেজি পরিমাণ আগর কাঠ পাওয়া যায়।
আগর গাছে দুইভাবে আগর তৈরি হয়।
প্রাকৃতিক পদ্ধতি : প্রাকৃতিক উপায়ে আগর গাছ হতে আগর উৎপন্ন হতে প্রায় ২৫-৩০ এমনকি ৫০ বছর সময়ের  প্রয়োজন হয়। তবে আগর গাছের বয়স ৫-১০ বছর থেকেই গাছে আগর জমা হতে থাকে। এক্ষেত্রে গাছের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কালো বর্ণ ধারণ করে। দেখতে ছোপ ছোপ আকারে অনেকটা সারি কাঠের মতো। তবে সারি কাঠ যেমন অনেকটা বা পুরোটা অংশজুড়ে কালো হয় এক্ষেত্রে ঠিক তেমনটি হয় না। আগর গাছে নির্দিষ্ট স্থানে কালো হওয়া শুরু হলে তা পূর্ণ হতে প্রায় ৪ থেকে ৬ বছর লেগে যায়। এটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। গাছের এ কালো অংশকেই বলা হয় আগর বা আগর কাঠ।
কৃত্রিম পদ্ধতি : এক ধরনের কা-ছেদক পোকা আগর গাছে ছিদ্র তৈরি করে পরে সেখানে ছত্রাকের আক্রমণে গাছ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে জৈবনিক প্রক্রিয়ায় আগর গাছের ওই ক্ষত স্থানের চারপাশে বাদামি-কালো রঙের আস্তরন তৈরি হয় যা আগর উৎপাদনের মূল উপকরণ। এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ কৃত্রিমভাবে পেরেক মেরে ক্ষত সৃষ্টি করে, ফলে সেখানে আগর সঞ্চিত হয়। এ পদ্ধতিতে খুব কম সময়ে আগর গাছ থেকে আতর তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে ১০-১২ বছরের ১০-১২ ইঞ্চি পরিধির আগর গাছের গায়ে ৪-৫ ইঞ্চি পরপর সারিবদ্ধভাবে গাছের নিচ থেকে শুরু করে ওপর পর্যন্ত প্যারেক (তারকাটা) গেঁথে দেয়া হয়। সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ২.৫৪ সে.মি.-৫.০০ সে.মি. (১-২ ইঞ্চি) পরপর সারিবদ্ধভাবে ৩.৮১ সে.মি.-৫.০০ সে.মি. ১.৫ থেকে ২.০ ইঞ্চি সাইজের তারকাটা ৪ থেকে ৫ বছর বয়সী গাছে লাগানো হয়েছে। তারকাটা লাগানোর সময় একটা কৌশল হিসেবে অর্ধেক অংশ পরিমাণ তারকাটা গাছের কা-ে ডুকানো হয়, একটু আড়াআড়িভাবে লাগানো পেরেকের বাহিরের অংশটুকু গাছের বৃদ্ধির সাথে সাথে কা-ের ভেতর ডুকে যায় গাছের তারকাঁটা গাঁথা অংশে কৃত্রিমভাবে আঘাতের ফলে ছত্রাকের আক্রমণ সহজেই ঘটে ফলে তারকাঁটার চারপাশের কাঠে ৫-৬ বছরের মধ্যেই বাদামি-কালো রঙের আস্তরণ তৈরি হয়। পরে সে গাছগুলো কেটে আগর-আতর উৎপাদনের কাঁচামাল বের করা হয়। সাধারণত গাছের পুরুত্ব ও আকারের ওপর তারকাঁটা পোতা নির্ভর করে। এক্ষেত্রে গাছের বয়সটা মুখ্য নয়।
আতর প্রস্তুত করার কলাকৌশল
আগর বাগান থেকে পূর্ণ বয়স্ক আগর গাছ কেটে এনে প্রথমে তা টুকরো টুকরো (স্থানীয় ভাষায় লগ) করে কেটে আলাদা করা হয়। এ টুকরোগুলোকে দুইভাগে আলাদা করা হয়। এক ভাগে ঘন কালো, হালকা কালো, তামাটে, অল্প তামাটে বর্ণের কাঠের টুকরা এবং অন্য ভাগে ধূসর, প্রায় সাদা বর্ণের কাঠের টুকরা থাকে। হালকা কালো, তামাটে ও অল্প তামাটে রঙের আগর কাঠের লগগুলোকে লম্বালম্বিভাবে চেরা হয়। লম্বালম্বি চেরাগুলোকে ফালি বলা হয়। ফালিগুলো থেকে সাবধানতার সাথে তারকাটাগুলোকে সরানো হয়। ফালিগুলো অত্যন্ত যতœ ও সুনিপুণভাবে করা হয় যেন কালো অংশ বা আগরগুলো আস্ত থাকে। চেরা ফালিগুলো স্থানীয় ভাষায় ধুম বলে। কারখানাগুলোতে ধুম তৈরির কাজগুলো মূলত মহিলারা করেন। ধুম করার পর কাঠের ফালিগুলোকে কুচি কুচি করে কাটা হয়। চেরা ফালিগুলো (ধুম) কুচি কুচি করতে দা ব্যবহারের পাশাপাশি অনেক কারখানায় মেশিন ব্যবহার করা হয়। এরপর কুচি কুচি করে কাটা টুকরোগুলো একটি পাত্রে বা পানির ট্যাঙ্ক, ড্রাম, বড় হাঁড়িতে (স্থানীয় ভাষায় ডেগ বলে) ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা হয়। ভিজিয়ে রাখা কাটা কাঠগুলো তুলে চালনির সাহায্য পানি ঝড়িয়ে ঢেকি দিয়ে গুঁড়া করা হয়। স্থানীয় ভাষায় কাঠের গুঁড়া অংশগুলোকে ছুরন বলা হয়। ছুরনগুলোকে আবারও কমপক্ষে আট থেকে দশ দিন ভিজিয়ে রাখতে হয়। উল্লেখ্য যে, ডেগে ভিজিয়ে রাখার ব্যাপারে অনেকে দুইবার আবার অনেকে একবারও করে থাকে। ছুরনগুলো খুব ভালোভাবে পচে গেলে ডেগ থেকে তুলে নিয়ে একটি পানি ভর্তি স্টিলের তৈরি বিশেষ পাত্রের মধ্যে রেখে পরবর্তীতে নিচ থেকে আগুনে তাপ দিতে হয়। পাত্রের চারিদিক খুব ভালোভাবে বন্ধ করা থাকে, অনেকটা এয়ার টাইটের মতো। এভাবে অনবরত ১০ থেকে ১২ দিন তাপ প্রয়োগ করতে হয়। পাত্রের ওপরের দিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় একটা নল সংযুক্ত করা হয় এবং নলটির অপরপ্রান্ত আরেকটি পাত্রের সাথে সংযুক্ত করা থাকে। নলটি অন্য একটি ঠা-া পানি ভর্তি স্টিলের তৈরি দিয়ে পরিচালিত করে অন্য পাত্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এখানে স্টিলের তৈরি পাত্রটিতে ঠা-া পানি ভর্তি থাকে, ফলে নলের মধ্য দিয়ে ভেসে আসা বাষ্পগুলো ঠা-া পানির সংস্পর্শে এসে সহজেই ফোটায় ফোটায় পানিতে পরিণত হয়, ফোটায় ফোটায় পানিগুলো নলের অপর প্রান্তে রাখা পাত্রে জমা হয়। আগুনের তাপে ছুরন কাঠ সিদ্ধ হয়ে বাষ্পাকারে ওপরের নলে প্রবেশ করে এবং বাষ্পগুলো ঘনীভূত হয়ে অপর প্রান্তের পাত্রের মধ্যে ফোটায় ফোটায় পড়তে থাকে। ঘনীভূত বাষ্প পানি হয়ে নির্দিষ্ট পাত্রে জমতে থাকে এবং তার ওপর তেলের আস্তরণ পড়ে। তেলের এ আস্তরণই আগর আতর তেল। পরবর্তীতে পানির ওপর থেকে তেলের অংশটিকে সংগ্রহ করা হয়। এটি মূলত বাষ্পীভবন-শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় বিশেষ পাতন প্রক্রিয়া। এক সঙ্গে একটি ডেগে ৭৪.৬৫ কেজি-১১২.০০ কেজি (২ থেকে ৩ মণ) পরিমাণ ছুরন (আগর চিপস/আগর কাঠের টুকরো) ভর্তি করা যায়। এক ডেগ ছুরন জ্বাল দিয়ে ৮-৯ তোলা আতর পাওয়া যায়। একতোলা আতর প্রায় ১২ গ্রাম পরিমাণ। প্রাপ্ত তথ্য মতে, আতর বের করার পর উচ্ছিষ্টগুলো আগর বাতির ফ্যাক্টরিতে বিক্রি করা হয়। তাছাড়া উচ্ছিষ্ট অংশগুলোও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হয়।
আগরের বাজার ব্যবস্থাপনা
বিশ্বে আগর আতর পণ্যের প্রায় ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি বাজার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আগর উড চিপস ও আতরের খুব চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে আগর কাঠের বিভিন্ন প্রকার মান রয়েছে যথা- ডবল সুপার, আগর প্রপার, কলাগাছি আগর, ডোম আগর। আগর আতর শিল্প থেকে দেশি ও বিদেশি অনেক আতর তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জান্নাতুল নাঈম, জান্নাতুল ফেরদাউস, শাইখা, হাজরে আসওয়াদ, সুলতান, উদ, কিং হোয়াইট, আল ফারেজ, কুল ওয়াটার এসব নামের আতর বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আগর কাঠের বাজারদর প্রতি কেজি পাঁচ ডলার থেকে দশ হাজার ডলার। গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে এক তোলা আতর ৫-১৫ হাজার পর্যন্ত বিক্রি হয়। তাছাড়া আগর গাছের ডাস্ট বা উচ্ছিষ্টগুলোও রপ্তানিযোগ্য। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশে এসব ডাস্ট প্রক্রিয়াজাত করে ২০-২২টি পণ্য উৎপাদন করে। আগর তেলের মান বহুবিদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মান অনুযায়ী আগর কাঠের দামও কম-বেশি হতে পারে। প্রাথমিক বিবেচনায় দাম নির্ধারণে কাঠের মান ও উৎপাদনকারী দেশের ওপর নির্ভর করে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের গ্রাহক বা ব্যবসায়ীরা ভিন্ন ভিন্ন গুণাবলি বিবেচনায় রেখে আগর কাঠের মান-দাম নির্ধারণ করে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে আগর কাঠের তেল থেকে প্রাপ্ত গন্ধ বা সুরভী মুখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সিঙ্গাপুর আগর ব্যবসার মূলকেন্দ্র। প্রধান প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া অন্যতম।
লাভজনক ব্যবসা আগর শিল্প
আগর-আতর উৎপাদন অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। এ ব্যবসায় অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা আয় করা সম্ভব। এক কেজি কালো কাঠের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা। একটি আগর কাঠসমৃদ্ধ প্রাপ্ত বয়স্ক গাছের মূল্য ৫-১০ লাখ এমনকি ২০-২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, আগর প্লান্টেশনে বিনিয়োগ করে উচ্চ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। অন্য জরিপে জানা যায়, সঞ্চয়পত্রে ১ ডলার বিনিয়োগ করলে ১২ বছর পর ৪.২১ ডলার পাওয়া যায়, অপরদিকে আগর গাছে ১ ডলার বিনিয়োগ করলে ১১৭ থেকে ৭৩৬ ডলার আশা করা যায়। তাছাড়া আগর শিল্প একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প।  
আগর শিল্প বিকাশে সুপারিশমালা
আগর আতর শিল্পের বিকাশে এ শিল্পকে ঢেলে সাজাতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, পলিসি, উদ্যোগ ও উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন। আগর শিল্পের মানোন্নয়নে সুপারিশ হলো  সরকারি উদ্যোগে আগর নিয়ে আধুনিক মানসম্মত গবেষণা করা; ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, উদ্যোক্তা, আগর শ্রমিক, কারিগরদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আগর থেকে বিশ্বমানের প্রসাধনী পণ্য সামগ্রী তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা; সরকারি উদ্যোগে ঋণ সুবিধা প্রদান করা; সরকারি খাস জমি বিশেষ করে টিলাগুলো লিজ প্রদান করা; আগর শিল্পের জন্য পৃথক অবকাঠামো ও বিসিক শিল্প নগরী স্থাপন করা; গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল খাতে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা; রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজতর করতে ফরওয়ার্ড লিংকেজের ব্যবস্থা করা; প্রাকৃতিক আগর দিয়ে উৎপাদিত প্রসাধনীর আনুষাঙ্গিক রাসায়নিক দ্রব্যাদি আমদানি সুবিধা বৃদ্ধি করা (শুল্কমুক্ত করা) যাতে দেশীয় পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি করে অধিক মূল্যে রপ্তানি করা সহজতর হয় ট্যাক্স হলিডে (শুল্ক রেয়াত) সুবিধা দেয়া।  সমন্বিত গবেষণার জন্য আগর উন্নয়ন বোর্ড-সেল গঠন করা। সরকারি উদ্যোগে গবেষণা এবং প্যাটেন্টরাইট প্রদানের ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ, কাস্টমস বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, বিজিবি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা।
আগর শিল্পের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে বর্তমানে সিলেট তথা মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আগর চাষ করার উপযোগী জায়গা রয়েছে। গতানুগতিক বা সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে কৃত্রিম পদ্ধতির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বেশি পরিমাণ আগর ও আগরজাত দ্রব্যাদি উৎপাদন করা সম্ভব। বড়লেখা উপজেলায় ছোট বড় প্রায় ৩০০টি আগর আতর ফ্যাক্টরি রয়েছে। এ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আরও আগর কারখানা তৈরি সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশী অনেক ব্যক্তি দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আগর শিল্প গড়ে তুলেছেন। এসব শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকই বাংলাদেশী। কাঁচামাল আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা দূরীভূত হলে আমাদের দেশে এ শিল্পগুলো স্থাপন করা সম্ভব হবে এবং দেশীয় শ্রমের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে ফলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে।
আগর-আতর শিল্পে সরকারি উদ্যোগ
আগর গাছ ও আতর একটি অতি মূল্যবান সম্ভাবনাময় সুগন্ধি। আভিজাত্যের প্রতীক হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে এখনও এ আগর শিল্পটি অবিকশিত। অত্যন্ত শক্তিমান এ সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া জাপান, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশেও প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চাহিদা বৃদ্ধির সাথে রপ্তানিমুখী এ শিল্পের বিকাশে জরুরি ভিত্তিতে আগর গাছের ওপর গবেষণা জোরদার, চাষ সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনাসহ প্রক্রিয়াজাতকরণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে আধুনিকায়ন করার উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা উচিত। ব্যক্তি কর্তৃক উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে এসে সরকারি মাধ্যমে রপ্তানি নিশ্চিত করা দরকার। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং গ্রামীণ জনপদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাছাড়া পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখা সম্ভব। এ শিল্পের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, ফলে দেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হবে।

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ*
*আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, সিলেট

 

বিস্তারিত
মাটির প্রাণ কেঁচোসার বা ভার্মিকম্পোস্ট

উদ্ভিদ ও প্রাণিজ বিভিন্ন প্রকার জৈববস্তুকে কিছু বিশেষ প্রজাতির কেঁচোর সাহায্যে কম সময়ে জমিতে প্রয়োগের উপযোগী উন্নত মানের জৈবসারে রূপান্তর করাকে ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচোসার বলে। ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচোসার নিয়ে কাজ করেছে বহু দিন থেকেই বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা।
আমাদের দেশের বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্মিকম্পোস্ট সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা চলছে এবং উন্নত মানের ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করতে ইউড্রিলাস ইউজেনি এবং আইসেনিয়া ফিটিডা-কে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে আবার ইউড্রিলাস ফিটিডার ব্যবহার বেশি। ইউড্রিলাস ইউজেনি কেঁচোর সহনশীলতা বেশি। বিভিন্ন জৈব কীটনাশক যেমন- নিম খোল, মহুয়া খোল, গ্লাইরিসিডিয়া, ইউপাটোরিয়ামের প্রতি অনেক বেশি সহনশীলতা দেখায়। বিভিন্ন ধরনের মাটির সাথেই কেঁচোর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয় তাই স্থানীয় মাটিতে সে স্থানের কেঁচোর সাহায্যেই জৈবসার তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাইরে থেকে কেঁচো নিয়ে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। বড় গর্ত, ট্যাংক বা কংক্রিটের বৃত্তাকার পাত্র-রিং অথবা যে কোনো বড় পাত্রে কেঁচোর প্রজনন ঘটিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন করা যায়।
পুষ্টিমান
ভার্মিকম্পোস্ট সারে গাছের অত্যাবশ্যকীয় ১৬টি খাদ্য উপাদানের ১০টিই বিদ্যমান। গবেষণায় দেখা গেছে, আদর্শ ভার্মিকম্পোস্টে জৈব পদার্থ ২৮.৩২ ভাগ, নাইট্রোজেন ১.৫৭ ভাগ, ফসফরাস ১.২৬ ভাগ, পটাসিয়াম ২.৬০ ভাগ, ক্যালসিয়াম ২ ভাগ, ম্যাগনেসিয়াম ০.৬৬ ভাগ, সালফার ০.৭৪ ভাগ, বোরন ০.০৬ ভাগ, আয়রন ৯৭৫ পিপিএম, ম্যাঙ্গানিজ ৭১২ পিপিএম, জিঙ্ক ৪০০ পিপিএম এবং কপার ২০ পিপিএম রয়েছে।
কেঁচোসার বা ভার্মিকম্পোস্টের গুরুত্ব
বিজ্ঞানী চালর্স ডারউইন সর্বপ্রথম কেঁচোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সবাইকে অবগত করান। তিনি বলেন কেঁচো ভূমির অন্ত্র এবং পৃথিবীর বুকে উর্বর মাটি তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে, যার ওপর ফসল উৎপাদন করি। এ অতি সাধারণ, ক্ষুদ্র প্রাণীটি পচনশীল জৈবপদার্থ থেকে সোনা ফলাতে পারে, কেঁচোসার বা ভার্মিকম্পোস্টে রূপান্তরিত করে। আহার পর্বের পর যে পাচ্য পদার্থ মলরূপে নির্গমন হয় তাকে কাস্ট বলে। এ কাস্টের ভেতর জীবাণু সংখ্যা এবং তার কার্যকলাপ বাড়ার কারণে মাটির উর্বরতা বাড়ে। দেখা গেছে, পারিপার্শ্বিক মাটির তুলনায় কাস্টের মধ্যে জীবাণু সংখ্যা প্রায় হাজার গুণ বেশি। এ কাস্টের ওপরে বিভিন্ন প্রকার উৎসেচক উৎপাদনকারী ব্যাক্টেরিয়া জীবাণু বেশি থাকায় মাটির উর্বরতাও বাড়ে। কাস্টের কারণে মাটি থেকে গাছে ৬ শতাংশ নাইট্রোজেন এবং ১৫-৩০ শতাংশ ফসফরাস যোগ হতে দেখা গেছে। এছাড়াও অন্যান্য উদ্ভিদ খাদ্য উপাদান ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম গাছ বেশি পরিমাণে গ্রহণ করতে পারে। কেঁচোর উপস্থিতিতে জৈবপদার্থের কার্বন ও নাইট্রোজেন অনুপাত প্রায় ২০:১ এর কাছাকাছি হয়। এ অনুপাতে গাছ সহজেই কম্পোস্ট থেকে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে।
কেঁচোর বৈশিষ্ট্য
কেঁচোর সার তৈরি করতে নির্দিষ্ট প্রজাতির কেঁচো বেছে নেয়ার জন্য তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেয়া আবশ্যক। শীত ও গ্রীষ্ম উভয় আবহাওয়াতে বেঁচে থাকার ক্ষমতা; সব রকম জৈববস্তু থেকে খাবার গ্রহণ করার সামর্থ্য; কেঁচো যেন রাক্ষুসে প্রকৃতির হয়, অর্থাৎ প্রচুর আহার করার ক্ষমতা থাকতে হবে; অন্যান্য প্রজাতির কেঁচোর সাথে মিলেমিশে বাস করা; জৈব দ্রব্য পাওয়ার সাথে সাথে বা অল্প সময়ের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং সেখান থেকে খাবার সংগ্রহ করা; রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এবং প্রতিকূল অবস্থানে নিজেদেরকে মানিয়ে নেয়া; দ্রুততার সাথে বংশবিস্তার করা এবং শারীরিক বৃদ্ধি ঘটানো।
স্থানীয় কেঁচো সংগ্রহের উপায়
এমন মাটি শনাক্ত করতে হবে যেখানে কেঁচো দৃশ্যমান। ৫০০ গ্রাম গুড় এবং ৫০০ গ্রাম তাজা গোবর ২ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে ১ মিটার দ্ধ ১ মিটার এলাকায় মাটির উপরিতলে ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। খড়ের ডেলা এবং পুরনো চটের থলি দিয়ে জায়গাটা ঢেকে দিতে হবে। ২০ থেকে ৩০ দিন ক্রমাগত পানি ছিটিয়ে যেতে হবে। এ জায়গাতেই একসাথে বহু কেঁচোর বাচ্চা জন্ম হবে যাদের সহজেই সংগ্রহ এবং ব্যবহার করা যাবে। এমনকি পচা কলার গাছের খোল থেকেও স্থানীয় লাল কেঁচো সংগ্রহ করা যায়।
গর্ত বানানো ও সার তৈরি করা
প্রয়োজনানুযায়ী গর্ত তৈরি করে নেয়া যেতে পারে বাড়ির উঠোনে অথবা বাগানে বা মাঠে। একটি অথবা দুটি গর্ত করা যেতে পারে বা ইঁট ও চুন-সুরকি দিয়ে যে কোনো মাপের ট্যাংক, পানি যাওয়ার জায়গাসহ তৈরি করে নেয়া যেতে পারে। ২ মিটার দ্ধ ১ মিটার দ্ধ ০.৭৫ মিটার হচ্ছে এ কাজের জন্য আদর্শ। জৈব ও কৃষির র্জ্যরে ওপর নির্ভর করবে গর্তের মাপ। কেঁচোগুলো পিঁপড়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য গর্তের মাঝ-বরাবর অস্থায়ী প্রাচীরে পানি জমিয়ে রাখা যায়। চারটি প্রকোষ্ঠযুক্ত গর্ত-ট্যাংক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ জৈবসারের প্রকোষ্ঠ থেকে প্রক্রিয়াকরণের আগের বর্জ্য প্রকোষ্ঠে কেঁচোদের যাতায়াতের সুবিধা করার জন্যই চারটি প্রকোষ্ঠযুক্ত গর্ত বা ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়।
উপকরণ
প্রাণীর মল-গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ছাগল-ভেড়ার মল। এগুলোর মধ্যে গোবর উৎকৃষ্ট; মুরগির বিষ্ঠায় প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ফসফেট থাকে যা পরিমাণে বেশি হলে কেঁচোর ক্ষতি হতে পারে। তাই খড়, মাটি বা গোবরের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা ভালো। কৃষি বর্জ্য-ফসল কাটার পর পড়ে থাকা ফসলের দেহাংশ যেমন- ধান ও গমের খড়, মুগ, কলাই, সরিষার গমের খোসা, তুষ, কা-, ভুসি, সবজির খোসা, লতাপাতা, আখের ছোবড়া; গোবর গ্যাসের পড় থাকা তলানি বা স্লারি; শহরের আবর্জনা এবং শিল্পজাত বর্জ্য যেমন- খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা বর্জ্য। যেসব বস্তু ব্যবহার করা উচিত নয়, তাহলো-পেঁয়াজের খোসা, শুকনোপাতা, মরিচ, মসলা এবং অম্ল বা এসিড সৃষ্টিকারী বর্জ্য টমেটো, তেঁতুল, লেবু, কাঁচা বা রান্না করা মাছ মাংসের অবশিষ্টাংশ। এছাড়া অজৈব পদার্থ পাথর, ইটের টুকরা, বালি, পলিথিন।
স্থান নির্বাচন ও প্রস্তুত প্রণালি
সার তৈরি করতে প্রথমে ছায়াযুক্ত উঁচু জায়গা বাছতে হবে, যেখানে সরাসরি সূর্যালোক পড়বে না এবং বাতাস চলাচল করে। ওপরে একটি ছাউনি দিতে হবে। মাটিরপাত্র, কাঠেরবাক্স, সিমেন্টের রিং বা পাত্র, পাকা চৌবাচ্চা বা মাটির ওপরের কেঁচোসার প্রস্তুত করা যায়। লম্বা ও চওড়া যাই হোক না কেন উচ্চতা ৩০.৪৮ সে.মি.-৩.৮১ সে.মি. (১-১.৫ ফুট) হতে হবে। পাত্রের তলদেশে ছিদ্র থাকতে হবে যাতে কোনোভাবেই পাত্রের মধ্যে পানি না জমে। প্রথমে চৌবাচ্চা বা পাত্রের তলদেশে ৩ ইঞ্চি বা ৭.৫ সেন্টিমিটার ইঁটের টুকরা, পাথরের কুচি দিতে হবে। তার ওপরে ২.৫৪ সে.মি. (১ ইঞ্চি) বালির আস্তরন দেয়া হয় যাতে পানি জমতে না পারে। বালির ওপর গোটা খড় বা সহজে পচবে এরকম জৈব বস্তু বিছিয়ে বিছানার মতো তৈরি করতে হয়। এরপর আংশিক পচা জৈবদ্রব্য (খাবার) ছায়াতে ছড়িয়ে ঠা-া করে বিছানার ওপর বিছিয়ে দিতে হবে। খাবারে পানির পরিমাণ কম থাকলে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে যেন ৫০-৬০ শতাংশ পানি থাকে। খাবারের ওপরে প্রাপ্ত বয়স্ক কেঁচো গড়ে কেজি প্রতি ১০টি করে ছেড়ে দিতে হবে। কেঁচোগুলো অল্প কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর এক মিনিটের মধ্যেই খাবারের ভেতরে চলে যাবে। এরপর ভেজা চটের বস্তা দিয়ে জৈব দ্রব্য পুরোপুরি ঢেকে দেয়া উচিত। বস্তার পরিবর্তে নারিকেল পাতা দিয়েও ঢাকা যেতে পারে। মাঝে মাঝে হালকা পানির ছিটা দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে অতিরিক্ত পানি যেন না দেয়া হয়। এভাবে ২ মাস রেখে দেয়ার পর কম্পোস্ট সার তৈরি হয়ে যাবে। জৈববস্তুর ওপরের স্তরে কালচে বাদামি রঙের, চায়ের মতো দানা ছড়িয়ে থাকতে দেখলে ধরে নেয়া হয় সার তৈরি হয়ে গেছে। এ সময়ে কোনো রকম দুর্গন্ধ থাকে না। কম্পোস্ট তৈরি করার পাত্রে খাবার দেয়ার আগে জৈববস্তু, গোবর, মাটি ও খামারজাত সার নির্দিষ্ট অনুপাত (৬:৩:০.৫:০.৫) অর্থাৎ জৈব আবর্জনা ৬ ভাগ, কাঁচা গোবর ৩ ভাগ, মাটি ১/২ ভাগ এবং খামার জাত সার ১/২ ভাগ, মিশিয়ে আংশিক পচনের জন্য স্তূপাকারে ১৫-২০ দিন রেখে দিতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পর ওই মিশ্রিত পদার্থকে কেঁচোর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে একটি ১ মিটার লম্বা, ১ মিটার চওড়া ও ৩ সেন্টিমিটার গভীর আয়তনের গর্তের জন্য ৪০ কিলোগ্রাম খাবারের প্রয়োজন হয়। এ রকম একটি গর্তে এক হাজার কেঁচো প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রথম দিকে কম্পোস্ট হতে সময় বেশি লাগে (৬০-৭০ দিন)। পরে মাত্র ৪০ দিনেই সম্পন্ন হয়। কারণ ব্যাক্টেরিয়া ও কেঁচো উভয়েরই সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে। তথ্য অনুসারে ১ কেজি বা ১০০০টি কেঁচো, ৬০-৭০ দিনে ১০ কেজি কাস্ট বা কম্পোস্ট তৈরি করতে পারে। এক কেজি কেঁচো দিনে খাবার হিসেবে ৫ কেজি সবুজসার খেতে পারে। তার জন্য ৪০-৫০ শতাংশ আর্দ্রতা বজায় রাখা আবশ্যক। প্রায় ৮০০-১০০০ কেঁচোর ওজন হয় ১ কেজি। এই পরিমাণ কেঁচো সপ্তাহে ২০০০-৫০০০টি ডিম বা গুটি দেয়। পূর্ণাঙ্গ কেঁচোর জন্ম হয় ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় ১ কেজি কাঁচা গোবর থেকে প্রায় ৫০০ গ্রাম কম্পোস্ট পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য কৃষিজ বর্জ্যে ক্ষেত্রে কেজি কাঁচামাল হতে ২৫০ গ্রাম কেঁচো সার পাওয়া যায়।
সার প্রস্তুতকরণ
যখন পদার্থগুলো সামান্য ঝুরঝুরে হয়ে যাবে এবং সারের রঙ গাঢ় বাদামি হয়ে যাবে তখনই সার প্রস্তুত সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। দানাদার, কালো, হালকা এবং বোদযুক্ত হবে;
৬০-৯০ দিনের মধ্যেই সার প্রস্তুত সম্পন্ন হবে। ওপরের বেডে কেঁচোর উপস্থিতিতেই তা বোঝা যাবে;
সার থেকে কেঁচোগুলোকে আলাদা করার জন্য বেড খালি করার ২-৩ দিন আগে পানি দেয়া বন্ধ করতে হবে। এর ফলে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ কেঁচো নিচে চলে যাবে;
ঝাঁঝরি বা চালুনি দিয়েও কেঁচোদের আলাদা করা যায়। কেঁচো এবং সামান্য পুরু পদার্থ যা ঝাঁঝরির ওপরে থেকে যাবে তাকে আবার গর্তে ফেলে দিতে হবে যেখানে পুনরায় পদ্ধতিটি শুরু হবে। সারের গন্ধ মাটির মতো। যে কোনো খারাপ গন্ধ এটাই প্রমাণ করে পচন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি এবং ব্যাক্টিরিয়ার কার্য-ক্রিয়া চালু আছে। ছাতা ধরা বা বাসিগন্ধের মানে নাইট্রোজেন বেরিয়ে যাচ্ছে। যদি এমন ঘটে তাহলে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং আরও বেশি করে তন্তু জাতীয় পদার্থ যোগ করতে হবে এবং শুকনা রাখতে হবে। এরপরে ব্যবহারের উপযোগী সারকে ছেঁকে নিয়ে প্যাকেট করতে হবে;
দুই বা চার প্রকোষ্ঠযুক্ত ব্যবস্থায় প্রথম প্রকোষ্ঠে পানি দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে যাতে কেঁচোগুলো নিজে থেকেই এক প্রকোষ্ঠ থেকে অন্য প্রকোষ্ঠে চলে যায় যেখানে উপযুক্ত পরিবেশ নিয়মিতভাবে রক্ষা করা হয় এবং ফসল উৎপাদনও নিয়মিত হতে থাকে।
সতর্কতা
পিঁপড়া, উঁইপোকা, তেলাপোকা, গোবরাপোকা, চিকা, মুরগি ও বিভিন্ন পাখি কেঁচোর শত্রু। এগুলো কোনো কীটনাশক দিয়ে মারা যাবে না। তবে হাউসের চারদিকে কীটনাশক দেয়া যাবে। ব্যবহৃত গোবরের সঙ্গে ছাই, বালু, ভাঙা কাঁচ এসব রাখা যাবে না। মুরগি ও পাখির আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য হাউসের ওপর ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে। কেঁচোকে জীবিত ও সক্রিয় রাখতে হাউসে বেশি পানি দেয়া যাবে না। চালনি দিয়ে চালার সময় হাউসে নির্দিষ্ট জাত ছাড়া অন্য জাতের কেঁচো থাকলে সরিয়ে ফেলতে হবে। ট্যাংক-প্রকোষ্ঠ-রিংয়ের উচ্চতা কোনোক্রমেই আড়াই ফিটের অধিক করা যাবে না। উচ্চতা বেশি হলে অক্সিজেনের অভাবে কেঁচো নিচে যেতে চাবে না এবং খাদ্য গ্রহণে অনীহা দেখা দিবে।
আয়-ব্যয় হিসাব
মূলত রিং পদ্ধতিতে কেঁচোকম্পোস্ট সার উৎপাদন করে থাকেন। প্রতিটি রিংয়ের উচ্চতা ৩০.৪৮ সে.মি. (১২ ইঞ্চি) এবং ব্যাস ৭৬.২ সে.মি. (৩০ ইঞ্চি)। প্রতিটি রিংয়ে ৬০-৭০ কেজি গোবরে আধা কেজি কেঁচো দেয়া হয়। আবার অনেক সময় একটি রিংয়ের ওপর আরেকটি রিং বসিয়ে দেয়া হয়। এতে গোবর ও কেঁচো দ্বিগুণ হারে লাগে। প্রতি রিংয়ে রিং বাবদ ২০০ টাকা, গোবর বাবদ ১২০ টাকা এবং কেঁচো বাবদ ২৫০ টাকা খরচ হয়। স্থাপনের ২৫-৩০ দিনের মাথায় বিক্রয়ের উপযোগী কেঁচো সার তৈরি হয়। প্রতিটি রিং হতে ৩০-৩৫ কোজি সার পাওয়া যায়। প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়। ফলে এক মাসে একটি রিং হতে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং প্রায় আধা কেজি কেঁচো ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এভাবে ১৭টি রিং থেকে মাসে সাড়ে ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা এবং বছর ঘুরে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। ২৫ শতক আলুর জমিতে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি প্রতি শতকে ৩ কেজি হারে কেঁচো সার ব্যবহার করতে হয়। এক শতক জমিতে তিনি ১২০ কেজি ফলন হয়। প্রতিবেশী কৃষকেরা ফলন পায় ১০০ কেজির কাছাকাছি। শুধু তাই নয় তার জমিতে রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব কম হয়। কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বিভিন্ন স্থানে কৃষি তথ্য সার্ভিস নির্মিত ভার্মিকস্পোস্টের ওপর সিনেমা শো আয়োজন করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পশ্চিম ধনতলা কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রের অনেক মহিলা সদস্যসহ গ্রামের অনেকেই এখন কেঁচোকম্পোস্ট সার উৎপাদন করছে। কেঁচোসার উৎপাদন-বিক্রয় করে গ্রামের বেকার যুবক-যুবতিদের সহজেই স্বনির্ভর আয়ের সংস্থান করতে পারেন।
কেঁচোসার বা ভার্মিকম্পোস্টের ব্যবহারের মাত্রা ও ফলনে প্রভাব
ভার্মিকম্পোস্ট সব প্রকার ফসলে যে কোনো সময়ে ব্যবহার করা যায়। সবজি এবং কৃষি জমিতে ৩-৪ মেট্রিক টন প্রতি হেক্টরে ও ফল গাছে গাছ প্রতি ৫-১০ কেজি হারে ব্যবহার করা হয়। ফুল বাগানের ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিমাণ ৫০০ থেকে সাড়ে ৭০০ কেজি এক হেক্টর জমিতে। মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কেঁচো সার ব্যবহারে মাঠ ফসলে ফলন শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবজিতে ফলন বৃদ্ধিসহ গুণগতমান ও স্বাদ বাড়ে। এমনকি ফল না ধরা অনেক পুরনো ফল গাছে নতুন করে ফল ধরাসহ ফলদ বৃক্ষে দুইগুণ অবধি ফলন বেড়েছে। জমির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা বজায় রাখার জন্য জৈব সার ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন এ ব্যাপারে। তাই ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন ও তার ব্যবহার এক মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে চলেছে আগামী দিনগুলোতে।

কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম*

*আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, আঞ্চলিক অফিস, রংপুর; মোবাইল-০১৭১৯৫৪৭১৭৯ sayemdae@yahoo.com

বিস্তারিত
দরকার কৃষকবান্ধব ব্যবসা

কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেসব পণ্য উৎপাদন করেন কৃষকরা তার ভালো দাম কখনই পান না। এর ওপর আছে বাজারদরের ব্যাপক ওঠানামা, পরিবহন জটিলতাসহ পণ্য স্থানান্তরে কালক্ষেপণের দীর্ঘসূত্রিতা, আছে উৎপাদন পর্যায়ে নানা রকমের ঝুঁকি। এবার ফাল্গুনের শেষে যে বৃষ্টি হলো তাতে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক তরমুজ ও আলু চাষি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। কৃষকরা পণ্য উৎপাদন করে তাই তেমন লাভবান হতে পারছেন না। তারা যে লাভ না পাচ্ছেন তার চেয়ে বেশি লাভ চলে যাচ্ছে খামার থেকে বাজারের মধ্যে থাকা এক শ্রেণীর লোকের কাছে। তাই আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যতই উৎপাদন বাড়ানো হোক না কেন, কখনও কখনও সেই বাড়তি উৎপাদন কৃষকদের বাড়তি কোনো লাভ নিশ্চিত করতে পারছে না। এতে অনেক কৃষক কৃষি উৎপাদনে আগ্রহ ও পুঁজি হারিয়ে ফেলছেন।
কৃষকদের জন্য সুসংগঠিত কোনো বাজার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে না ওঠার কারণে প্রত্যেকেই স্বতন্ত্রভাবে তাদের পণ্য বিপণন করছেন। এতে প্রত্যেককেই আলাদাভাবে বাজার খুঁজতে হচ্ছে, বাজারে সেসব পণ্য নিজেদেরই পরিবহন করে নিয়ে যেতে হচ্ছে, নিজেদেরই বিক্রির জন্য চেষ্টা করতে হচ্ছে ও বিক্রির পর টাকা পাওয়ার জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে। এতে প্রত্যেকেরই সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ বেশি লাগছে। উৎপাদন পর্যায়ে স্বতন্ত্র কৃষকের উৎপাদনকে উৎসাহিত না করে দলগতভাবে কৃষি পণ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে পারলে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়বে, মান বাড়বে, খামারে যান্ত্রিকীকরণের ফলে শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য খরচসহ উৎপাদন ব্যয় কমবে ও নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের মাধ্যমে বাজার সংযোগ সহজ হবে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সব কর্মকা- পরিকল্পনামাফিক করা সম্ভব হবে। কৃষকরাও কৃষি পণ্য উৎপাদনে লাভ-ক্ষতির বিষয় হিসাব করতে পারবেন ও বুঝতে পারবেন যে কোনো পণ্য উৎপাদন করে কত বেশি মুনাফা হচ্ছে।
সচরাচর কৃষকরা উৎপাদনের বিষয়ে তাদের নিজস্ব ভাবনা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করেন, কখনও কখনও কিছু পরামর্শ নেন। কিন্তু উৎপাদনের আয়-ব্যয়ের কোনো সঠিক হিসাব রাখেন না, বিক্রির ব্যাপারেও সঠিক কোনো পরিকল্পনা করেন না। এখন সময় এসেছে এসব নিয়ে ভাবার। সঠিক উৎপাদন পরিকল্পনা ও ব্যবসায় পরিকল্পনা করে চাষাবাদ করতে পারলে প্রচলিত লাভের চেয়ে বেশি লাভ করা অবশ্যই সম্ভব। এখন সময় এসেছে কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের। এসবই বাণিজ্যিক কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধাপে ধাপে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করে এগোতে পারলে কৃষকদের সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করে কৃষকবান্ধব ব্যবসায় অনুপ্রাণিত করা সম্ভব। এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য দেশের কৃষকদের ভ্যালু চেইন ও বাজার সংযোগের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়া যায়।
এ দেশে কৃষকদের সম্পৃক্ত ও দক্ষ করে গড়ে তুলে কৃষকদের দিয়ে কৃষকবান্ধব ব্যবসা করানো যেতে পারে। এরই মধ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা অঙ্গ (আইএফএমসি) প্রকল্প কৃষকদের সংগঠিত করে গ্রুপভিত্তিক বাজার সংযোগ তৈরির মাধ্যমে কৃষকদের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের ৬১টি জেলার ৩৭৩টি উপজেলায় মোট ৮৫৪টি এ ধরনের কৃষক গ্রুপ বা কৃষক সংগঠন তৈরির মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মানসম্মত কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বাজার সংযোগ সৃষ্টি করে কৃষকবান্ধব ব্যবসার মাধ্যমে তা বিপণনের জন্য ধারাবাহিকভাবে কিছু কাজ করা হচ্ছে।
প্রথমত, এ প্রকল্পে থেকে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রকল্পের কর্মকর্তারা উপযুক্ত কৃষক সংগঠন ও কৃষক গ্রুপ নির্বাচন করছেন। ভালো সংগঠন তৈরিতেও তারা সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। গড়ে প্রতি উপজেলায় ১ থেকে ৩টি কৃষক সংগঠন নির্বাচন করা হচ্ছে। প্রতিটি কৃষক সংগঠন বা কৃষক গ্রুপে থাকেন ৩৫ জন সদস্য। কৃষক সংগঠনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। এজন্য প্রতিটি কৃষক সংগঠনের নির্বাহী কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি সংগঠন থেকে ৪ জন সদস্যকে নির্বাচন করা হয় যাদের বলা হয় বিজনেস ফোকাল পারসন (বিএফপি)। এ দলের ২ জন থাকেন নারী ও ২ জন পুরুষ সদস্য। কৃষক সংগঠনের সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই তারা নির্বাচিত হন। এসব সদস্যদের নিবিড়ভাবে ১০ দিনব্যাপী কৃষক সংগঠন ও বাজার সংযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা সাংগঠনিক ও ব্যবসায়িক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পান।
প্রশিক্ষণ শেষে উপজেলা কৃষি অফিসে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষক সংগঠন ও বাজার সংযোগ বিষয়ক একদিনের একটি কর্মশালা আয়োজন করেন যেখানে সংগঠন ও ব্যবসা সংশ্লিষ্ট উপজেলার অন্যান্য বিভাগীয় কর্মকর্তা, উপকরণ ব্যবসায়ী, আড়ৎদার প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় কৃষক সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বিএফপিবৃন্দ তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা সবার সামনে উপস্থাপন ও আলোচনা করেন। তাদের ব্যবসা কার্যক্রমে উপস্থিত অন্যান্য সবাইকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে এবং কোন বিভাগ থেকে তারা কী কী সেবা ও সুযোগ পেতে পারে সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার পর কৃষক সংগঠনের সাথে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসারের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বিএফপিবৃন্দ স্ব স্ব এলাকায় ফিরে গিয়ে কৃষক সংগঠনের অবশিষ্ট সদস্যদের ৮ দিনে কৃষক সংগঠন ও বাজার সংযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন। উদ্দেশ্য যে, সংগঠনের সব সদস্য যাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে দক্ষতার সাথে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করতে পারেন। নারী সদস্যরা যাথে নারীবান্ধব কৃষি ব্যবসা নিয়ে ভাবতে ও করতে পারেন সেজন্য তাদের বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে তারা ব্যবসা পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার প্রাথমিক মূলধন হিসেবে কৃষক সংগঠনকে আইএফএমসি প্রকল্প থেকে প্রত্যেক সংগঠনকে ৩৫০০০ টাকা দেয়া হয় যদি তারা নিজেরা ব্যবসার জন্য সমপরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে রাজি হয়। ব্যবসার জন্য এলাকায় পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনা করে পণ্য নির্বাচন ও তার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সংগঠনের একটি কালেকশন পয়েন্ট বা পণ্য একত্রীকরণ স্থান থাকে। সাধারণত সংগঠনের ঘর বা কোনো বাড়ির উঠোনকে কালেকশন পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কৃষক গ্রুপের সদস্যরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সে স্থানে নিয়ে আসেন। কে কতটুকু সেদিন বিক্রির জন্য নিয়ে এলেন তার তথ্য লিখে রাখা হয়। বিএফপিবৃন্দ এ কাজে সাহায্য করেন। এরই মধ্যে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিএফপিবৃন্দ বিভিন্ন বাজারে বা আড়তে সেদিনের ওই পণ্যের বাজারদর যাচাই করেন। যে বাজারে পণ্যের চাহিদা ও দাম ভালো থাকে পরিবহন খরচ বিবেচনা করে অধিক দামে যেখানে বিক্রি করা যাবে তা ঠিক করে রাখেন। এজন্য তারা একাধিক বাজারে সংযোগ স্থাপন করেন। চলতি বাজারদর অনুযায়ী উৎপাদকদের দাম সংগঠনের তহবিল থেকে সাথে সাথে পরিশোধ করে দেন। আবার বাকি রেখে বাজারে বিক্রির পরও কেউ কেউ উৎপাদকদের দাম পরিশোধ করেন। পণ্য একত্রিত হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা পণ্য পরিচ্ছন্ন, বাছাই বা গ্রেডিং, প্যাকিং এসব কাজ করেন।
এরপর বিএফপি বা ব্যবসার জন্য সংগঠন থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সেসব পণ্য বাজারে নিয়ে যান। বিক্রির পর ফিরে এসে লাভ-লোকসান হিসাব করে খাতায় লিখে রাখেন। সপ্তাহ বা মাস শেষে মোট লাভ-লোকসান হিসাব করেন ও লভ্যাংশ বণ্টন করেন। সাধারণত ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করার জন্য কৃষক সংগঠনের লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হয় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ ও বিএফপিদের লভ্যাংশ ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ। এর ফলে নিয়মিত কিছু না কিছু লাভ সংগঠনের তহবিলে যোগ হতে থাকে। এতে কৃষক সংগঠনের আর্থিক সক্ষমতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কিছু সদস্যের স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দেখা গেছে, ভালো কর্মতৎপর একজন বিএফপি মাসে এভাবে বাড়িতে থেকে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। পণ্যের পরিমাণ বেশি হলে আয়ও বাড়ে। সংগঠন মজবুত থাকলে, সংগঠনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে, সঠিক নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা থাকলে এবং মান সম্মত পণ্য উৎপাদন ও জোগান অব্যাহত রাখতে পারলে এটি একটি স্থায়ী ব্যবসায়িক ও আয়বর্ধক কর্মকা-ে পরিণত হতে পারে। সারা বছর যাতে ব্যবসা ও আয়সৃজন কর্মকা- চলতে পারে সেজন্য তারা প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় শুরুতেই বছরব্যাপী একটি ব্যবসার পরিকল্পনা করে ফেলেন। এজন্য সারা বছর প্রতি মৌসুমেই তাদের কিছু না কিছু আয়ের পথ খোলা থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যাতে কৃষক গ্রুপের বা সংগঠনের মাধ্যমে যাতে বিপণন বা রপ্তানি করা যায় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, আম, সবজি এসব রপ্তানিতে সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের মান এবং সুনাম ধরে রাখতে পারে বাংলাদেশেরই বিশ্বস্ত কৃষক ও কৃষক সংগঠন। সময় এসেছে কৃষকবান্ধব ব্যবসা চালু করার।

কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়*
*উপপ্রকল্প পরিচালক, আইএফএমসি প্রকল্প, খামারবাড়ি ঢাকা ও পাহাড়ি ফসল, উপকূলীয় কৃষি, শাকসবজির রোগ, মশলার চাষ, শাকসবজি চাষ ইত্যাদি গ্রন্থের রচয়িতা।

বিস্তারিত
ছাদ বাগান : এক টুকরো নির্মল উদ্যান

ইট কাঠের নাগরিক সভ্যতার শহরগুলো থেকে দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ। কিন্তু মানুষ তার শিকড়কে সহজে ভুলতে পারে না। সবুজে ভরা গ্রাম বাংলায় বেড়ে উঠা নাগরিক সমাজের একটা অংশ সবুজকে ধরে রাখতে চায় আবাসস্থলে। শৌখিন মানুষরা তাদের ঘরবাড়িতে সবুজকে ধরে রাখার জন্য একান্ত নিজস্ব ভাবনা আর প্রচেষ্টায় আপন আপন বাড়ির ছাদে তৈরি করছে ছাদ বাগান। সময়ের সাথে এ বাগান এখন আর শৌখিনতায় আটকে নেই। নিরাপদ সবজি দিয়ে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদাপূরণ, পারিবারিক বিনোদন এবং অবসর কাটানোর এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এ ছাদ বাগানগুলো। বাংলাদেশের শহুরে কৃষি ব্যবস্থার শৌখিন পদযাত্রা সময়ের বিবর্তনে এক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে যাচ্ছে।
ছাদে বাগান কোনো নতুন ধারণা নয়। অতি প্রাচীন সভ্যতায়ও ছাদে বাগানের ইতিহাস চোখে পড়ে। খ্রিস্টের জন্মেরও পূর্বে মেসোপটিয়াম ও পারস্যের জুকুরাক নামীয় পিরামিড আকৃতির উঁচু পাথরের স্থাপনায় বাগান ও ছোট গাছ লাগানোর জন্য স্থান নির্ধারণ করার নিদর্শন পাওয়া যায়। পম্পেই নগরীর কাছেই প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রোমান ভিলায় কেবল একটি নির্দিষ্ট ছাদ তৈরিই করা হয়েছিল বাগান করার জন্য। এগারো শতকের পুরনো কায়রো শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ হয় যার কোনোটি কোনোটি ছিল চৌদ্দতলা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ভবনগুলোর সবগুলোর ছাদেই বাগান স্থাপন করা হয়েছিল সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে যাতে সেচ দেয়ার জন্য প্রাণী শক্তির সাহায্যে চাকা ঘুরিয়ে পুলি দিয়ে নিচ থেকে ওপরে পানি তোলা হতো। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানও ধারণা করা হয় বিভিন্ন ছাদ ও বারান্দার সমন্বয়ে তৈরি তবে ঐতিহাসিকভাবে এ উদ্যানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও তৎকালে বর্তমানে ইরাকের মসুল শহরের কাছেই আরেক ঝুলন্ত উদ্যানের নিদর্শন পাওয়া যায়।   
বিশ্বব্যাপী নগরায়ন বাড়ছে। ফলে শহুরে কৃষি নামক এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দ ভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছে। এ কৃষির শুরুটা শৌখিন। ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়। বিশ্বের দেশে দেশে এর গুরুত্ব দিন  দিন বাড়ছে। শহরাঞ্চলে ফুল, ফল ও সবজির পারিবারিক বাগান এখন আর কেবলই শৌখিনতা বা পারিবারিক প্রয়োজন নয়। পরিবেশ রক্ষা আর নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে অনেক দেশেই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গাড়ি বারান্দা, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাস ভূমি, বজ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উৎপাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুলের গাছের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে সবুজ নগরায়ন। আমাদের দেশেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছাদ বাগানের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এদেশে ছাদ বাগানের সূচনা ।
শহরে ছাদ বাগান স্থাপন করা হলে শহরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমে আসে। আমাদের শহরগুলোতে মাটির অস্তিত্ব দিন দিন কমে আসছে। ইট-কাঠের ভবনের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাঁচে মোড়ানো বহুতল ভবন। বিশেষ করে জানালায় কাঁচ ও বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হালকা কিন্তু শক্তিশালী ধাতব পাত, ফাইবার ও গ্লাস। সূর্য থেকে তাপ ও আলো এ ধাতব ও কাঁচের কাঠামোর একটিতে পড়ে অপরটিতে প্রতিফলিত হয়। বারংবার প্রতিফলনের দরুন সে নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় সামান্য বেড়ে যায় এবং শহরজুড়ে তৈরি হয় অসংখ্য হিট আইল্যান্ড বা তাপ দ্বীপ। ভবনে বা এর কাঠামোতে বাগান স্থাপন করা হলে বাগানের গাছের পৃষ্ঠদেশ এ তাপ শুষে নেয়  এবং গাছের গাছের দেহ থেকে যে পানি জলীয় বাষ্প আকারে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায় তা সে নির্দিষ্ট স্থানের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনে। অসংখ্য ছাদ বাগান বা শহুরের গাছপালা এ প্রক্রিয়ায় শহরের উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনে।
ছাদ বাগানকে কেতাবি ভাষায় যেমন কোনো সংজ্ঞায় নির্ধারিত করা যায়নি তেমনি এর কোনো সুনির্দিষ্ট মডেল এদেশে এখন পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। পাকা বাড়ির খালি ছাদে অথবা বেলকনিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ফুল, ফল, শাকসবজির বাগান গড়ে তোলাকে ছাদে বাগান বলা হয়। বাড়ির মালিক তাদের আপন আপন উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে আপন ভাবনায় ভঙ্গিমায় সাজিয়ে তুলেন তাদের ছাদকে। এখানে টবে, বড় বড় ড্রাম কিংবা ট্রেতে রোপণ করা হয় নানা ফুল, ফল ও সবজি। কেউ কেউ আবার ছাদে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করে তাতে গাছ রোপণ করেন। ছাদের আকার ও সহনশীলতার দিকে লক্ষ্য রেখে নানা কাঠামোর ওপর স্থাপন করেন টব, মাচা। তবে এলোমেলো ও অপরিকল্পিত ছাদ বাগান কেবল সময়, অর্থ অপচয় করায় না। সেই সাথে ভবনেরও নানা ক্ষতি করে। তাই কিছু মৌলিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে ছাদ বাগান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ছাদে বাগান করার সময় প্রথমেই ছাদের আয়তন অনুসারে কাগজে কলমে খসড়া ম্যাপ করে বিভিন্ন স্থাপনা ও ভবনের কলামগুলো চিহ্নিত করে নিতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ চাহিদা ও রুচি অনুসারে সাজানো না হলে এর পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত শ্রম সাধ্য একটি কাজ। বড় বা ভারি গাছ গুলো ছাদের বিম বা কলামের নিকটবর্তী স্থান বরাবর স্থাপন করতে হবে। ছাদ যেন ড্যাম্প বা স্যাঁতসেঁতে হতে না পারে সে জন্য রিং বা ইটের ওপর ড্রাম অথবা টবগুলো স্থাপন করলে নিচ দিয়ে আলো বাতাস চলাচল করবে এবং ছাদও ড্যাম্প হতে রক্ষা পাবে। নেট ফিনিশিংয়ের মাধ্যমেও ছাদকে ড্যাম্প প্রতিরোধ করা যায়।
চাহিদা অনুসারে  হাফ ড্রাম, সিমেন্ট বা মাটির টব, স্টিল বা প্লাস্টিক ট্রে সংগ্রহ করতে হবে। অনেক সময় বসতবাড়ির ভাঙা চোরা বালতি, অব্যবহৃত তেলের বোতলও ছোটখাটো গাছ রোপণের জন্য ব্যবহার করা হয়। ঠিকমতো উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে এসব অব্যবহৃত জিনিস বাগানে ব্যবহার করা গেলে এও হতে পারে এক নতুন নান্দনিকতা। ছাদের সুবিধা মতো স্থানে স্থায়ী বেড (ছাদ ও বেডে মাঝে ফাঁকা রাখতে হবে) স্থাপন করা যেতে পারে। এসব বেডে মূলত সবজি, শাক চাষ করা যায়। চাইলে লাগানো যায় ফুলগাছ। স্থায়ী বেড বানাতে না চাইলে পুরনো চৌবাচ্চা বা জাহাজের লাইফ বোট রাখার বয়ার খোলও অনেক জায়গায় বেড হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
যেহেতু ছাদ বাগান স্বল্প পরিসরে গড়ে তোলা হয় কাজেই এর যতœ আত্তির দিকে সব সময় নজর রাখা আবশ্যক। সে জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রথমেই সংগ্রহ করে নিতে হবে। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে আছেন সিকেচার, কোদাল, কাচি, ঝরনা, বালতি, করাত, খুরপি, স্প্রে মেশিন এসব। চারা রোপণের আগে চারার উচ্চতা, শিকড়ের প্রকৃতি, সহিষ্ণুতা এসব জিনিসের প্রতি নজর রাখতে হবে। সব চারা ও গাছ ছাদ বাগানের জন্য উপযুক্ত না। যেমন
*  আম-বারিআম-৩ (আম্রপালি), বাউআম-২ (সিন্দুরী);
* পেয়ারা-বারি পেয়ারা-২, ইপসা পেয়ারা-১;
* কুল-বাউকুল-১, ইপসা কুল-১ (আপেল কুল), থাই কুল-২ ;
* লেবু-বারি লেবু -২ ও ৩, বাউ কাগজি লেবু-১;
* আমড়া-বারি আমড়া-১, বাউ আমড়া-১;
* করমচা-থাই করমচা;
* ডালিম (দেশী উন্নত);
* কমলা ও মাল্টা-বারি কমলা-১, বারি মাল্টা ১;
* জামরুল-বাউ জামরুল-১ (নাশপাতি জামরুল), বাউ জামরুল-২ (আপেল জামরুল) এসব।
* সবজি-লালশাক, পালংশাক, মূলাশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, লেটুস, বেগুন, টমেটো, মরিচ, লাউ, শিম এসব।
সাধারণত ফল গাছের জন্য হাফ ড্রাম ব্যবহার করা উচিত। এর তলদেশে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ১ ইঞ্চি ব্যাসের ৫-৬টি ছিদ্র রাখতে হবে। ছিদ্রগুলোর ওপর মাটির টবের ভাঙা টুকরো বসিয়ে দিতে হবে। ড্রামের তলদেশে ১ ইঞ্চি পরিমাণ ইটের খোয়া বিছিয়ে তার ওপর বালি  দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।  সমপরিমাণ দো-আঁশ মাটি ও পচা গোবরের মিশ্রণ দিয়ে ড্রামটির দুই তৃতীয়াংশ ভরার পর হাফ ড্রাম অনুযায়ী ড্রাম প্রতি মিশ্র সার আনুমানিক ৫০-১০০ গ্রাম প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে এবং সম্পূর্ণ ড্রামটি মাটি দিযে ভর্তি করে নিতে হবে। ১৫ দিন পর ড্রামের ঠিক মাঝে মাটির বল পরিমাণ গর্ত করে কাক্সিক্ষত গাছটি রোপণ করতে হবে। এ সময় চারা গাছটির অতিরিক্ত শিকড়-মরা শিকড়গুলো কেটে ফেলতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে মাটির বলটি যেন ভেঙে না যায়। রোপিত গাছটিতে খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। রোপণের পর গাছের গোড়া ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। সময়ে সময়ে প্রয়োজনমতো গাছে পানি সেচ ও উপরি সার প্রয়োগ বালাই দমন ব্যবস্থা নিতে হবে। চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের সহায়তায় টব বা ড্রাম এ মাটি দেয়ার আগেই মাটি শোধন করে নেয়া যেতে পারে। গাছের বাড়-বাড়তি অনুযায়ী ২ বারে টব প্রতি ৫০-১০০ গ্রাম মিশ্র সার প্রয়োগ করে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।     
রোগ বালাই দমনে যথাসম্ভব রাসায়নিক কীটনাশক পরিহার করা উত্তম। স্বল্প পরিসরের বাগান বিধায় জৈবিক পদ্ধতিতেই শতভাগ রোগ বালাই দমন করা যেতে পারে। একান্তই সম্ভব না হলে পরামর্শ মোতাবেক অনুমোদিত মাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু দিন পরপরই গাছের রোগাক্রান্ত ও মরা ডালগুলো ছাঁটাই করতে হবে এবং কর্তিত স্থানে বোর্দপেস্ট লাগাতে হবে। গাছের ধরন অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ পরিচর্যা করতে হবে যেমন কুল খাওয়ার পর ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি গাছের সব ডাল কেঁটে দিতে হবে।
কিছু কিছু জায়গায় ছাদে বাগানের বড় সমস্যা হলো পাখির উপদ্রব বিশেষ করে ফল গাছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য উঁচু করে তারের জালি কিংবা জাল দিয়ে পুরো ছাদের ওপর ও পাশটা ঢেকে দেয়া যেতে পারে। প্রতি বছর না হলেও ১ বছর পরপর টবের পুরনো মাটি পরিবর্তন করে নতুন গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে পুনরায় টবটি-ড্রামটি ভরে দিতে হবে। এ সময় খেয়াল বাখতে হবে গাছ যেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অপটু হাতে মাটি পরিবর্তন না করিয়ে এ ব্যাপারে দক্ষ মালি বা নার্সারির সহায়তা গ্রহণ করতে হবে।
ছাদে বাগানে নানা উপকরণ সহায়তা করার জন্য বিশেষায়িত নার্সারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে পুরো বাগানটাই যেন নার্সারি কৃর্তক স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ছেড়ে দেয়া না হয়। কারণ ছাদ বাগান পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন হালকা কায়িক শ্রম ও বিনোদনের উৎস হিসেবেই গড়ে তোলা উত্তম। এতে পরিবারের নতুন সদস্যরা প্রবীণদের কাছ থেকে যেমন ফুল, ফল ও গাছপালা সম্পর্কে জানবে তেমনি নিজের হাতে যতœ নেয়ায় পরিবেশের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসারও জন্ম নেবে। ইট কাঠের শহরে বাস করা প্রজন্মের জন্য এটি অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন টেলিভিশন মিডিয়ায় প্রচারিত ছাদ বাগান বা অন্যের বাগান স্বচক্ষে দেখার পর অনেকেই ছাদ বাগানে উদ্বুদ্ধ হন। কিন্তু মেলা থেকে আর্কষণীয় ফলন্ত গাছ কিনে এনে করা বাগান বা চুক্তিভিত্তিক নার্সারি দিয়ে স্থাপন করা অনেক বাগানই টেকসই হয় না কেবল বাগানের প্রতি ব্যক্তিগত দরদ তৈরি না হওয়ার দরুন। আর ইউটিউব দেখে বা হঠাৎ টিভি বা বই পুস্তক পড়ে কোন আকর্ষণীয় জিনিস দেখে বাগান করাও যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ ব্যতিক্রমী জিনিস উদাহরণ হতে পারে না। যারা ছাদে বাগান করতে চান তারা শুরুটা সব প্রাথমিক নিয়ম মেনে করাই উত্তম। এতে বাগান টেকসই হয়। সময়ের সাথে বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বাগানকে নিজের মতো করে গুছিয়ে তোলা যেতেই পারে।
ছাদে বাগান করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায় থেকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শহরে বেশ কিছু বাগান স্থাপন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তেমন কোনো নথিপত্র সংরক্ষণ করা যেমন হয়নি তেমনিভাবে করা হয়নি কোনো গবেষণাও।  জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উদ্যোগে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এ বিষয়ে একটি কার্যক্রম বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে চলমান যা বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এতে নির্দিষ্ট বাড়ির ছাদে নানা উপকরণ সরবরাহ করছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া এ কার্যক্রমে শিশু-কিশোরদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য একই কর্মসূচির আওতার কয়েকটি স্কুলে সবজি ও ফল বাগান গড়ে তোলা হচ্ছে।
ছাদ বাগান আমাদের প্রকৃতির সাথে সংযোগ হবার একটি সুযোগ করে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো মানুষের সভ্যতায় থিতু হওয়ার সময় মহাকালের হিসেবে অতি নগন্য। পরিবেশের সাথে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা মানুষের কিছু অভিযোজিত ক্ষমতা এখনও আমাদের মাঝে বিরাজমান। যে কোনো রঙের তুলনায় আমাদের চোখে সবুজ রঙের পার্থক্যটা বেশি ধরার কারণও এই অভিযোজনের ফলাফল বলে অনেকেই ধারণা করেন। তাই নানা প্রকার সবুজের সমারোহ দেখে আমরা প্রফুল্ল হয়ে উঠি। অসংখ্য শেডের সবুজ রঙ আমাদের একঘেয়েমিতে আক্রান্ত করে না। করে উৎফুল্ল। যান্ত্রিক জীবনে ছাদ বাগানের ছোট সবুজ উদ্যান আমাদের সতেজ রাখতে সহায়তা করে। গড়ে তোলে নির্মল পরিবেশ। ছাদ না পেলে বেলকনিতেই গড়ে তুলুন আপন উদ্যান। কৃষি মন্ত্রণালয়ধীন সব সংস্থার সব পর্যায়ে চাকরিজীবীরা আপনাদের সহায়তা করার জন্য হাসিমুখে অপেক্ষা করছে।

কৃষিবিদ আবু কাউসার মো. সারোয়ার*

*আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, চট্টগ্রাম

 

বিস্তারিত
কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণন সংক্রান্ত প্রক্ষেপণ প্রতিবেদন

দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য  যথেষ্ট পরিমাণে নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য  প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় মানুষের খাদ্য তালিকায় আদিকাল থেকেই সবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে  আছে। বিবিএস ২০১৫ অনুযায়ী মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৭.৯৩ মিলিয়ন হেক্টর যার মধ্যে সবজি ফসলের দখলে মাত্র ২.৬৩%  এর কিছু ওপরে। এ থেকেই অনুমান করা যায় কত অল্প পরিমাণ জমি থেকে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সবজির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এ অবস্থার অবসানকল্পে আমাদের খাদ্য তালিকায় মানবদেহের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় দুটি খাদ্য উপাদান, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিনের পর্যাপ্ত  প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য এগুলোর সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস বিভিন্ন প্রকারের সবজির অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
তাছাড়া উন্নত দেশে মাথাপিছু সবজির প্রাপ্যতা আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তাই আমাদের দেশে সবজির উৎপাদন বাড়াতে হবে সেটি নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সবজির উৎপাদন বাড়াতে হলে সবজির উৎপাদন খরচের দিকে নজর দিতে হবে। কৃষকগণ যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্য যৌক্তিক মূল্যে বিক্রি করে লাভবান হতে পারে সে সাথে পাইকারি ব্যবসায়ী, ফড়িয়া ও খুচরা ব্যবসায়ীও যেন অধিক মুনাফার আশা না করে  যৌক্তিক মূল্যে পণ্য বিপণন করতে পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ কৃষকরা তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদিত পণ্য যথাযথ মূল্যে বিক্রি করতে না পারলে উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বে। তাই উৎপাদিত সবজির ন্যূনতম বাজার মূল্য নির্ধারণ করে কৃষক পর্যায়ে তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেই দৃষ্টিকোন থেকে টমেটো, কাঁচামরিচ, বেগুন, শিম, আলু, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ফসলের ওপর উৎপাদন খরচ বিশ্লেষণপূর্বক প্রতি কেজির গড় উৎপাদন খরচ নির্ণয় করা হয়েছে। বিপণন ব্যয় বিশ্লেষণপূর্বক উৎপাদন ব্যয়ের সাথে বিপণন ব্যয় ও মুনাফা যোগ করে কৃষক পর্যায়ে যৌক্তিক মূল্য কেজিপ্রতি (১৫-২০% লভ্যাংশসহ) পাইকারি পর্যায়ে যৌক্তিক মূল্য কেজি প্রতি  (১৩-২০% লভ্যাংশসহ) ও খুচরা পর্যায়ে যৌক্তিক মূল্য কেজিপ্রতি (২০-২৫% লভ্যাংশসহ) ধরে প্রতি কেজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। যা ছকে উল্লেখ করা হলো-
সবজি উৎপাদন অনেকটা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবজি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলে। এছাড়া বার্ষিক পরিক্রমায় দেখা যায়, এক বছর কোনো একটি সবজির ভালো দাম পেলে পরবর্তী বছর ভালো দামের আশায় অধিকাংশ কৃষক এ সবজি উৎপাদনে আগ্রহী হয় ফলে বাজারে ওই সবজি সরবরাহের আধিক্যে স্বভাবতই কৃষক কম দাম পায়। এদেশে প্রচুর পরিমাণ সবজি উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের অভাবে প্রচুর  পরিমাণ সবজি পচে নষ্ট হয়ে যায় এবং সংরক্ষণজনিত সমস্যার কারণে  উত্তোলন মৌসুমে কৃষক কম মূল্যে বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। ফলে কৃষক তথা দেশের কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ কৃষকেরই পণ্য উত্তোলন মৌসুমে পণ্য গুদামজাতকরণ বা সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তাই কৃষক পর্যায়ে সবজির সংগ্রহ ও স্বল্পকালীন সংরক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া কৃষকদের সংগঠিত করে সবজি চাষিদের সমবায় সমিতি গঠন করা যাতে করে তারা পণ্যের ন্যায্য বিক্রয় মূল্য পেতে দরকষাকষির অবস্থানে যেতে পারে। সংগঠিত সবজি বাজারেরঅভাবে অনেক সময় সঠিক মূল্য নির্ধারণ সম্ভব হয় না। এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান মজবুত করতে স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে  পারেন।

নাসরিন সুলতানা*

*সহকারী পরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা; NASRIN SULTANA.448@gmail.com

বিস্তারিত
কলা একটি উৎকৃষ্ট ফল

কলা অতি জনপ্রিয় একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। এ ফলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, ভিটামিন এ বি সি এবং ক্যালসিয়াম,  লৌহ ও পর্যাপ্ত খাদ্যশক্তি রয়েছে। অন্যান্য ফলের তুলনায় কলা দামে সস্তা এবং প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়। তাই ধনী গরিব নির্বিশেষে সব মানুষ সহজেই কলা খেতে পারে। উৎপাদন, স্বাদ ও সুগন্ধের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ হওয়ায় কলাকে ফলের রানী বলা হয়।
দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ, আসাম ও ইন্দো চীন কলার উৎপত্তি স্থান। কলা মিউজেসি (
Musaceae) পরিবারের একটি একবীজপত্রী উদ্ভিদ। কলার বৈজ্ঞানিক নাম Musa Spp দেশের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে কমবেশি কলা গাছ দেখা যায়। তবে নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, যশোর, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, জেলায় সবচেয়ে বেশি কলা উৎপন্ন হয়।
কলা গাছ বেরি (
Berry) জাতীয় ফল উৎপাদন করে। এর প্রতিটি পুষ্পমঞ্জুরিতে উৎপাদিত ফল সমষ্টিকে ছড়া বা কাঁদি (bunch) বলা হয়। প্রতিটি ছড়া আবার ৫-১৫টি ফানায় (hand) বিভক্ত। কোথাও কোথাও ফানাকে কাঁদি বলে। প্রতিটি ফানায় সাধারণত ১২-১৬টি কলা (finger) থাকে। কলায় দুটি অংশ আছে। ফলের ওপরের সবুজ আবরণকে কলার খোসা বলা হয় এবং ভেতরের নরম সাদা অংশকে পাল্প বলে, যা পরবর্তীতে পাকার পর ভোজ্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একবার ফল দিয়ে কলা গাছ মারা যায়। কলা গাছের গোড়া থেকে একাধিক গুঁড়ি-চারা বের হয়, এগুলো দিয়ে কলার বংশবিস্তার করতে হয়। প্রতিটি দেশের কলার নিজস্ব জাত রয়েছে। পৃথিবীতে যে জাতটি সর্বাধিক পরিমাণে জন্মানো হয় তার নাম  গ্রোস মিচেল (gros michel)। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪০-৫০টি জাতের কলার চাষ হয়। এগুলোর মধ্যে অমৃতসাগর, সবরি, কবরি, চাঁপা, সিঙ্গাপুরী বা কাবুলী, মেহেরসাগর, এঁটে বা বিচিকলা, কাঁচকলা বা আনাজি কলা, জয়েন্ট গভর্নর এসব উল্লেখযোগ্য।
কলা পুষ্টিগুণেসমৃদ্ধ ও সহজপাচ্য একটি উৎকৃষ্ট ফল। মানব দেহের ক্ষয়পূরণ, পুষ্টিসাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য যেসব পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন তার প্রায় সবগুলোই কলায় রয়েছে। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, আহার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কলায় ৭.০ গ্রাম প্রোটিন, ২৫ গ্রাম শর্করা, ০.৮ গ্রাম চর্বি এবং ০.১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-১ (থায়ামিন), ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-২ (রাইবোফ্লেভিন) ও ২৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ থাকে। তাছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কলা  থেকে ১৩ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৯০ মিলিগ্রাম লৌহ, ৮০ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন (ভিটামিন ‘এ’) এবং ১০৯ কিলোক্যালোরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। পাকাকলা টাটকা ফল হিসেবে সরাসরি খাওয়া যায় বলে এর পুষ্টি উপাদান অবিকৃত অবস্থায় আমাদের শরীর গ্রহণ করে। তাই নিয়মিত পাকা কলা ও অন্যান্য ফল খেলে পুষ্টি সমস্যা দেখা দেয় না। কলায় যে লৌহ জাতীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে, তা রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে। লৌহের ঘাটতি পূরণে কলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই লৌহের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত মহিলাদের জন্য কলা হতে পারে দুঃসময়ের বন্ধু। ভিটামিন এ এবং বি এর উৎকৃষ্ট উৎস কলা। এজন্য কলাকে বলা হয় মস্তিষ্কের খাবার। কলাতে কোনো ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল নেই। তাছাড়া এতে কোনো দ্রবণীয় চর্বি (Saturated Fat) নেই। বরং কলায় রয়েছে হৃদযন্ত্রের পেশির নিয়মিত স্পন্দন সৃষ্টিকারী পদার্থ পটাশিয়াম। এছাড়াও গবেষকদের মতে, পাকস্থলীর দেয়ালকে এসিডের হাত থেকে রক্ষা করতে কলার অনেক ভূমিকা রয়েছে।
সাম্প্রতিককালের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কলা উচ্চরক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। তাদের মতে, কলায় প্রচুর উচ্চ পটাশিয়াম আছে এবং চর্বির পরিমাণ কম থাকে। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা উচ্চরক্তচাপ কমানোর জন্য শুধু ওষুধের পরিবর্তে কলা জাতীয় ফল, কম চর্বিযুক্ত খাবার খেতে এবং কাঁচা লবণ কম খেতে উপদেশ দেন। এছাড়াও কলা মানসিক চাপ কমায় এবং একই সাথে মানসিক কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি করে। কলায় সোডিয়ামের পরিমাণ কম এবং পটাশিয়ামের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এটি স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমায়। জানা যায়, প্রতিদিনকার খাদ্যাভ্যাসে কলা রাখলে ৪০% স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যায়। কলায় প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম থাকায় এটি মাথাব্যথার প্রাকৃতিক নিরাময় হিসেবে কাজ করে। তাই এখন থেকে যে কোনো সময় মাথাব্যথা শুরু হতে চাইলেই চট করে এটি কলা খেয়ে ফেলুন।
সম্প্রতি আর এক তথ্যে জানা যায়, কলা অন্ত্রের, মুখের ও ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে দেহকে রক্ষা করে। কলায় প্রচুর আঁশ রয়েছে। তাই পাকা কলা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং সহজে হজম হয় বলে রোগীর পথ্য হিসেবে কলা অতুলনীয়। নরম ও মিহি হওয়ার জন্য পেটের সমস্যায় খুবই উপকারী খাবার কলা। খুব বেশি পেট খারাপ রোগেও কলাই একমাত্র ফল যা নির্বিঘেœ খাওয়া যায়। কলা অস্বস্তি কমিয়ে আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। অনেক দেশে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে কলা ব্যবহার করা হয়। গর্ভবতী মহিলাদের জ্বর হলে ওষুধের বদলে খাওয়ানো হয় কলা। থাইল্যান্ডে গর্ভস্থ সন্তানের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে কলা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। পেশি গঠনেও কলার কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্নভাবে কলা আমাদের রসনার স্বাদ মেটায়। দুধভাতে পাকা কলার জুড়ি মেলা ভার। সাধারণত বেশির ভাগ মানুষ সদ্য পাকা কলা খেতে পছন্দ করেন। কলা অতিরিক্ত পেকে গেলে এর চামড়ায় কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়ে। আর এ দাগের কারণে বেশির ভাগ সময় অতিরিক্ত পাকা কলা কেউ খেতে চান না। কিন্তু কলা যখন অতিরিক্ত পেকে যায় এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নিয়মিত পাকা কলা খান, আর সুস্থ ও সুন্দর থাকুন।
কলা একদিকে পুষ্টিগুণে ভরপুর, অপরদিকে এর প্রচুর ঔষধি গুণও রয়েছে। গলার ঘায়ে, শুল্ক কাশিতে ও কিডনি রোগের ক্ষেত্রে পাকা কলা উপকারী। কলা থোড়ের রস কলেরা রোগীয় তৃষ্ণা নিবারণে ও রক্ত বমি রোধের জন্য উপকারী। কলার কন্দমূল ও কা- দূষিত রক্ত বিশুদ্ধকরণে সাহায্য করে। কাঁচা কলা (সিদ্ধ) সিফিলিসের চুলকানি ও পোড়া ঘায়ে প্রলেপের জন্য উপকারী।
কলার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। সাধারণত বিশ্বে উৎপাদিত কলার অর্ধেক পরিমাণ পাকা অবস্থায় ফল হিসেবে খাওয়া হয় এবং বাকি অর্ধেক সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। তবে বাংলাদেশে কেবলমাত্র সবজি হিসেবে কাঁচা কলার ব্যবহার প্রচলিত আছে। এদেশে কলা ছাড়াও কলার থোড় এবং মোচা সবজি হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কাঁচা কলা ও কলার মোচা ভর্তা ও ভাজি এবং সবজি হিসেবে খাওয়া হয়ে থাকে। এটি বেশ সুস্বাদু ও উপাদেয়। তাছাড়া কলার ভুয়া কা-, থোড় ও পাতা গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
টাটকা ফল হিসেবে খাওয়া ছাড়াও পাকা কলা ময়দা বা চালের গুঁড়ার সাথে পিষে সুস্বাদু ও মুখরোচক কলার পিঠা  তৈরি হয়। কলা থেকে আবার কেক এবং বড়াও তেরি করা যায়। ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এরকম কয়েকটি দেশে কলা পাতলা করে কেটে রোদে শুকিয়ে চিপস তৈরি করা হয়। আজকাল কলা আর দুধ মিশিয়ে মজাদার আইসক্রিম তৈরি করে খাওয়ার রীতি সব দেশেই প্রচলিত।
কলা একদিকে যেমন, বহু গুণে গুণান্বিত একটি আদর্শ ফল; অপরদিকে এটি একটি লাভজনক ও অর্থকরী ফসল। স্বল্প পরিশ্রমে ও কম খরচে কলা চাষ করা যায়। খনা বলেন, রুয়ে কলা না কেটো পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত। খানার বিখ্যাত এ বচনটি নির্দেশ করে কলার অর্থকরী দিকের কথা। এর ফলনও অন্যান্য ফল ও ফসল অপেক্ষা অনেক বেশি। তাই কলার চাষ করে সহজেই আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়া যায়। সুতরাং, খাদ্য ও পুষ্টি, ফলের চাহিদা পূরণ, দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে বেশি করে কলার চাষ করা একান্ত প্রয়োজন।

 মো. আবদুর রহমান*
*উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপজেলা কৃষি অফিস, কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা

বিস্তারিত
গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ

এ দেশে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কারণ আমাদের মাংসের চাহিদা প্রচুর, উৎপাদন কম। এছাড়া গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের সাথে কর্মসংস্থান, গোবর উৎপাদন, চামড়া উৎপাদন, পরিবেশ উন্নয়ন এসব নানা কিছু জড়িত। একটি কথা তো সর্বজন স্বীকৃত যে প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় এদেশে প্রায় ৪০-৫০ লাখ গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া কোরবানি করতে হয়। এ সংখ্যার ৭০% গরু। সুতরাং কোরবানি উপলক্ষে গরিষ্টসংখ্যক গবাদিপশু মোটাতাজা করতে হয়। কাজটি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ এ দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষের নিয়মিত কর্মসংস্থান। এরা বছরব্যাপী আমাদের মাংস সরবরাহে সহায়তা করে। এছাড়া বিগত কয়েক বছর ধরে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে গরু আমদানি নিষিদ্ধ অথবা নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং দেশে গো মাংসের চাহিদা পূরণে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের কোনো বিকল্প আর নেই।
গবাদিপশু মোটাতাজা করার পদ্ধতিগুলো হচ্ছে ১. গরু নির্বাচন ২. বাসস্থান ৩. প্রতিষেধক টিকা ৪. কৃমিনাশক ৫. পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ। মোটামুটি এ পাঁচটি কাজ সুষ্ঠুভাবে করা গেলে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদনে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রসংশনীয় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়।  গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের ধাপগুলো হলো -
পশু ক্রয় এবং নির্বাচন : পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে পশুর বয়স ২-৩ বছরের মধ্যে হলে সহজে মোটাতাজা করা যায়। বয়স্ক গরু মোটাতাজাকরণের জন্য খুব বেশি উপযোগী নয়। গরু সাধারণত ষাড় হওয়া ভালো। ষাড় গরুর মাংসের মূল্য এবং চাহিদা বেশি। গরু নির্বাচনের সময় খেয়াল রাখবেন প্রাণীটির দেহের কাঠামো যেন একটু বড় হয়। যেমন লম্বা এবং উচ্চতা এ দুটো বিষয়ই খেয়াল রাখতে হয়। বড় আকারের একটি কংকালসার গরুর গায়ে বেশ মাংস উৎপন্ন করা যায়। প্রাণী ক্রয়ের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন প্রাণীটির বাহ্যত কোনো সংক্রামক রোগ আছে কি নেই। এ ক্ষেত্রে আমরা মূলত লক্ষ করতে বলি ‘ক্ষুরারোগ’ আছে কি নেই। কারণ ক্ষুরারোগ প্রাণীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ এ কারণে যে অল্প বয়স্ক রুগ্ন পশুতে ক্ষুরারোগ থাকলে তা পশুর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। সুতরাং তাপ দেখবেন, ক্ষুরার ক্ষত দেখবেন, প্রাণীটি অস্থির কিনা তা দেখবেন, চোখ লাল এবং ছলছল করছে কিনা সেটাও দেখবেন। যদি এসব লক্ষণ দেখেন তবে বুঝবেন প্রাণীটির ক্ষুরারোগ থাকতে পারে। এরপর পশু পাতলা পায়খানা করছে, রক্ত আমাশয় আছে, পশু হাড্ডি কংকালসার এসব যতো সমস্যাই থাক এগুলো সবকিছু নিরাময় করে মোটাতাজাকরণকে লাভজনক করা যায়। মোটাতাজাকরণ কার্যক্রমটি একজন ভেটেরিনারি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে করবেন। তিনি এসব সামান্য রোগব্যাধি নিরাময়ের ব্যবস্থা নেবেন।  পশু ক্রয় করার পর তার গোবর পরীক্ষা করান। দেখা যাবে সেখানে প্রচুর কৃমির ডিম পাওয়া যাবে, এছাড়া পশুটি  লম্বা সময় পুষ্টিহীনতার কারণে তার পরিপাকতন্ত্রের কার্যক্রম দুর্বল থাকতে পারে। দীর্ঘদিন পশু অপুষ্টিতে ভুগলে তার ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। কৃষক ভাইদের প্রাথমিক  ধারণা থাকার জন্য বলছি ভেটেরিনারি ডাক্তার সাধারণত কী কী করেন।
১. তিনি মল পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কৃমির ওষুধ দেন;
২. পেটে কোনো জীবাণু সংক্রামণ থাকলে সেখানে শুধু পেটে অথবা পরিপাকতন্ত্রে কাজ করে এমন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করেন। এতে পাতলা পায়খানা চলে যায়;
৩. যদি আমাশয় থাকে, সেক্ষেত্রে মেট্রোনিডাজল গ্রুপের যে কোনো ভালো ওষুধ দিয়ে তা দূর করেন।  খাদ্য হজমটি ভালোভাবে হলে প্রাণীর স্বাস্থ্য ভালো হতে বাধ্য।
সবাইকে মনে রাখতে হবে গবাদিপশু মোটাতাজা করতে ৪-৫ মাস সময় লাগে। হঠাৎ করে স্টেরয়েড খাইয়ে গরু মোটাতাজা করা যায়। তবে কাজটি অনৈতিক, নিষিদ্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। স্টেরয়েডের ব্যবহারের কারণে খামারেই গরুর মৃত্যু ঘটে এমন নজির প্রচুর আছে। কারণ স্টেরয়েড প্রাণীর স্বাভাবিক মেটাবলিজমকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংগ যেমন লিভার, লাং, হৃদপি- এসব স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্টেরয়েড খাওয়ানো গরু হাইপারটেনশনে বেশি মারা যায়। এ ছাড়া স্টেরয়েড মানব দেহের জন্যও যথেষ্ট ক্ষতিকর। সুতরাং মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ার কোথাও স্টেরয়েডের প্রয়োজন হয় না। যদি তা স্বাভাবিক সময় এবং নিয়ম জেনে করা হয়। তবে মোটাতাজাকরণের সময় চিকিৎসকরা সহনীয় মাত্রায় ভিটামিন, মিনারেল ব্যবহার করেন। যা প্রাণীর জন্যও ক্ষতিকর নয়, মানুষের জন্যও ক্ষতিকর নয়। এ হচ্ছে সাধারণ রোগব্যাধির প্রতিকার। সংক্রামক রোগ আছে এমন প্রাণী ক্রয় করা যাবে না। দ্বিতীয়ত প্রাণী ক্রয়ের পর পর ক্ষুরা, তড়কা এবং গলাফুলা রোগের টিকা দেয়া বাঞ্ছনীয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে বাসস্থান কেমন হবে। বাসস্থান নির্ভর করে আপনি কতটি গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহার করবেন। যদি সংখ্যা ১০-১৫টির মধ্যে থাকে, তবে স্ট্রাকচারড শেড বানানোর দরকার নেই। সাধারণত আমরা গোয়ালঘরে যেভাবে গরু পালন করি সেই রকম একটা গোয়ালঘরের মতো ঘর বানাতে পারলেই মোটাতাজাকরণ শুরু করা যায়। তবে এখানে বিচার্য বিষয় হচ্ছে যে প্রতিটি গরুর জন্য ৩ ফিট প্রস্থ এবং ৭ ফিট দৈর্ঘ্যরে জায়গা দরকার হয়। এর সাথে যা দরকার হয় তা হচ্ছে খাবারের চারি। প্রতিটি গরুর জন্য একটি চারি গোয়ালঘরে রাখতে হবে। খর, টিন, ছন অথবা হোগলাপাতা দিয়ে তৈরি করা যায়। যেখানে যা সহজলভ্য এবং যা সাধ্যের মধ্যে কুলায় এমন উপকরণ দিয়ে মোটাতাজাকরণ শুরু করতে হবে। কারণ গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ একটি লাভজনক ব্যবসা। বাসস্থানের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার। যেমন গোয়ালঘর খোলামেলা হওয়া ভালো। এতে গবাদিপশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। গোয়ালঘরের কাছে একটি স্যালো টিউবওয়েল অথবা ডিপটিউবওয়েল স্থাপন করা দরকার। কারণ মোটাতাজাকরণে গবাদিপশুকে পরিমিত পানি, দানাদার খাবার মিশ্রণ, ইউরিয়া মিশ্রিত স্ট্র এসব প্রস্তুত করতে পর্যাপ্ত পানির সংস্থান থাকতে হয়। তাছাড়া মোটাতাজাকরণের পশুকে দু-তিন দিন পরপর পানির স্প্রে করে শরীর ধুইয়ে দিলে ত্বক মসৃণ হয়। বাসস্থানে গোবর এবং মূত্র নিষ্কাশিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের পরিবেশগত একটি গুরুত্ব সর্বদাই থাকে। তা হচ্ছে গোবরের ব্যবহার। আজকাল জমিতে অর্গানিক সার ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য গোবর থেকে কম্পোজিটর সার, গোবরে কেঁচো চাষ করে সেখান থেকে জৈবসার প্রস্তুত এসব নয়া কৃষিতে ভীষণভাবে মূল্যবান। সুতরাং গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের সাথে মাটির উর্বরতা এবং সবুজ বিপ্লবের একটি নিবিড় সম্পর্ক আছে। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি সবুজ বিপ্লবকে নিবিড়ভাবে সহায়তা করে।
গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ এবং উৎপাদন দুই ক্ষেত্রেই কাঁচা ঘাসের সংকট আছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমরা ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র কে ঘাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করত পারি। তবে এর পরিমাণ দিনে ৩-৪ কেজির ঊর্ধ্বে হওয়া যাবে না। ৩-৪ কেজির বেশি ইউরিয়া মিশ্রিত খর খাওয়ালে গরুতে ইউরিয়া বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। কারণ একটি গরু মিশ্রিত উপকরণের সাথে দৈনিক গড়ে ৫০-৬০ গ্রাম ইউরিয়া শরীরবৃত্তির কাজে ব্যবহার করতে পারে। এর বেশি ইউরিয়া খাওয়ালে পশুতে বিষক্রিয়া হয়।  ১০ কেজি শুকনো খড় টুকরো টুকরো কাটুন। ৫ লিটার পানি একটি বালতিতে রাখুন; এ ৫ লিটার পানির মধ্যে ২.৫ কেজি (আড়াই কেজি) চিটাগুড় মিশান, চিটাগুড় মিশ্রিত হলে এর সাথে ২৫০ গ্রাম (এক পোয়া) ইউরিয়া মেশান। এখন ইউরিয়া এবং চিটাগুড় মিশ্রিত পানির দ্রবণটি ১০ কেজি খড়ের সাথে ভালোভাবে মেশান। ব্যাস, ইউরিয়া মোলাসেস তৈরি হয়ে গেলো। এখন এ খড় প্রতিদিন প্রতিটি গরুকে ৩ থেকে ৪ কেজি পরিমাণ খাওয়াবেন। ৩ থেকে ৪ কেজির বেশি ইউএমএস এক দিনে একটি গরুকে খাওয়ানো যাবে না। এখন খাদ্য তালিকায় আরও যা রাখবেন তা হচ্ছে গরু প্রতি প্রতিদিন ৫-৬ কেজি কাঁচাঘাস ঘাস খাওয়াতে হবে। দানাদার খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন প্রকার ডালের ভুসি ২-৩ কেজি মিশ্রণ করবেন এর সাথে ২-৩ কেজি চালের কুঁড় এবং গমের ভুসির মিশ্রণ করবেন। এ হারে মিশ্রিত দানাদার খাদ্য প্রতিদিন প্রতিটি গরুকে খাওয়াতে হবে। গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে প্রতিটি গরুকে খাওয়াতে হবে। গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে প্রতিটি গরুকে দিনে ২৫০ গ্রাম সরিষার খৈল খাওয়ালে গরুর ত্বক মসৃণ হয় এবং স্বাভাবিকভাবে চর্বির বৃদ্ধি ঘটে। এ ছাড়া ভাতের মাড়, চাল ধোয়া পানি, সবজির অবশিষ্ট অংশ, ফলমূলের ছোবড়া গবাদিপশুকে খাওয়ান, পশুর বৃদ্ধি খুব দ্রুত হবে।
মোটামুটি এসব নিয়মকানুন মেনে চললে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের মাধ্যমে ভালো আয় করা যায় এবং দেশে মাংস, গোবর এবং চামড়ার সরবরাহের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়।

ডা. এম এ সবুর*

* ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, এফ.ডি.আই.এল. মানিকগঞ্জ

বিস্তারিত
মাছের রোগ ব্যবস্থাপনা

পানির পরিবেশ খারাপ হলে ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী দ্বারা রোগ হতে পারে। এগুলো হলো-
রক্ত জমাট বাঁধা রোগ
রোগের কারণ ও লক্ষণ : স্টেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে হয়। এ ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে আক্রমণ করে দেহের রক্ত জমাট বাঁধায়। হৃদপি-, কিডনি ও পাকস্থলী আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। মাছের ক্ষুধা মন্দ হয়। মাছ ভারসাম্যহীনভাবে চলাফেরা করে। মাছ মারা যায়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : পুকুরে জৈব পদার্থ ব্যবহার কমাতে হয়। জাল রোদে শুকিয়ে জাল টানতে হয়। নিয়মিত চুন প্রয়োগ করা। খাদ্যের সাথে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ মিশিয়ে দিতে হয়।
ট্রাইকোডাইনিয়াসিস
রোগের কারণ ও লক্ষণ : ট্রাইকোডিনা নামক এককোষী পরজীবী দ্বারা এ রোগ হয়। বড় মাছের চেয়ে পোনা মাছের ক্ষেত্রে এ রোগ বেশি হয়। মাছের শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বাড়ে। ফুলকায় গোলাকার হলদে সিস্ট বা ফুটকি দেখা যায়। চামড়ায় বালু কণার মতো ফুটকি দেখা যায়। মাছ শক্ত জিনিসে ঘা ঘষে। ফুলকার রক্তক্ষরণ স্থান ফুলে যায়। খাদ্য গ্রহণে অনীহা হয়। আক্রান্ত মাছ দ্রুত মারা যায়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : পুকুরে প্রতি শতাংশে ২ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা। মাছের ঘনত্ব কমাতে হবে। জৈবসার প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। আক্রান্ত মাছ ৫০ পিপিএম ফরমালিনে ২৪ ঘণ্টা বা ২৫০ পিপিএম ফরমালিনে ৩-৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে পরিষ্কার পানিতে ছেড়ে দিতে হবে অথবা আক্রান্ত মাছকে ২০০ পিপিএম সাধারণ লবণ দ্রবণে সপ্তাহে ১ বার ২৪ ঘণ্টা গোসল করাতে হবে।
ড্যাকটাইলোগাইরোসিস রোগ-ফুলকা কৃমি রোগ
এ রোগ সাধারণত ফুলকা কৃমি নামে পরিচিত। এটি শুধু মাছের ফুলকা আক্রমণ করে।
রোগের কারণ ও লক্ষণ : ড্যাকটাইলোগাইরোসিস পরজীবী সংক্রমণে এ রোগ হয়। আক্রান্ত মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়। দেহের বর্ণ ফ্যাকাশে হয়। ফুলকায় রক্তক্ষরণ হয়। ফুলকা পচে ও ফুলে যায়। মাছ দ্রুত মারা যায়। মাছ লাফালাফি করে।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : মাছের ঘনত্ব কমাতে হবে। পুকুরে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে পাথর চুন ৩ মাস পর পর দিতে হবে। জৈবসার ও সম্পূরক খাদ্য কম দিতে হয়। আক্রান্ত মাছ ২০০ পিপিএম লবণ দ্রবণে সপ্তাহে একবার হিসাবে মোট দুইবার গোসল করাতে হবে। অথবা ৫০ পিপিএম ফরমালিনে আক্রান্ত মাছকে ১ ঘণ্টা ডুবিয়ে ছেড়ে দিতে হয়।
কাইলোডোনেলিয়াসিস রোগ
রোগের কারণ ও লক্ষণ : কাইলোডোনেলা নামক পরজীবী সংক্রমণে এ রোগ হয়। আক্রান্ত মাছ প্রাথমিক পর্যায়ে পানির উপরিভাগে লাফালাফি করে। শ্বাস কার্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। মাছের দেহের বর্ণ নীলাভ বা ধূসর হয়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : পুকুরে জৈবসার প্রয়োগ স্থগিত রাখা। পুকুরে মাছের ঘনত্ব কমিয়ে দেয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য প্রয়োগ করা। পুকুরের পানি দ্রুত পরিবর্তন করা। পুকুরে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে দুইবার চুন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। ২০০ পিপিএম লবণ জলে ২৫ মিনিট অথবা ৫০ পিপিএম ফরমালিনে (৩৭%) ২৪ ঘণ্টা ডুবিয়ে রাখতে হবে অথবা ০.১% পিপিএম তুঁত দ্রবণে ৩০-৬০ মিনিট মাছকে ডুবিয়ে রাখতে হবে।
মাছের উকুন (Argulosis)
কারণ ও লক্ষণ : আরগুলাস নামক বহিঃপরজীবী দ্বারা মাছ আক্রান্ত হয়। মাছের দেহের রক্ত চুষে ক্ষত সৃষ্টি করে। দেহ পৃষ্ঠ ও পাখনায় উকুন লেগে থাকে। শক্ত কিছু পেলে মাছ দেহ ঘষে। মাছ লাফালাফি করে। দেহ থেকে রক্তক্ষরণ হয়। পরজীবী খালি চোখে দেখা যায়। মাছ ক্লান্তহীনভাবে সাঁতার কাটে। আক্রান্ত স্থানের চারপাশ লালচে বর্ণ হয়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : পুকুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন দেয়া। জৈবসার প্রয়োগ কমিয়ে দেয়া। আক্রান্ত মাছ পুকুর থেকে সরানো। ডিপটারেক্স (ডাইলকস, নেগুভন, টেগুভন) ০.৫ পিপিএম হারে পুকুরে প্রয়োগ করা। সপ্তাহে একবার ও পরপর ৫ বার অথবা ০.৮ পিপিএম হারে সুমিথিয়ন প্রয়োগ করা। প্রতি সপ্তাহে একবার ও পরপর ৫ বার অথবা ০.২৫ পিপিএম পটাশ দ্রবণে   ৫-৬ মিনিট গোসল করাতে হবে।
কৃমি রোগ
বর্ষা ও শীতকালে নার্সারি ও লালন পুকুরে এ কৃমি বেশি দেখা যায়। এ জাতীয় কৃমি নাইলোটিকা মাছের ফুলকায় আক্রমণ করে এবং শিরা উপশিরা থেকে রক্ত চুষে নেয়।
লক্ষণ হলো :    রোগাক্রান্ত মাছ খুব অস্থিরভাবে চলাফেরা করে। মাছের দেহে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। মাছের শ্বাসকষ্ট হয় ও পুকুর পাড়ে ভাসতে থাকে। পুকুরের পাড়ে কোনো কিছুতে গা ঘষতে থাকে। মাছ দুর্বল হয়। মাছের শ্বাসকষ্ট হয় ও মারা যেতে পারে।
প্রতিরোধ-প্রতিকার : জলাশয়ের শামুক পরিষ্কার করা। প্রতি শতাংশে পুকুরে ১ মিটার গভীরতার জন্য ৪০ গ্রাম ডিপ্টারেক্স ৭ দিন পরপর মোট ২ বার প্রয়োগ করতে হয়। ৩.৫ লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার ফরমালিন মিশিয়ে সেই দ্রবণে মাছ ৫ থেকে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে।
ক্ষতরোগ
বাংলাদেশে প্রায় ৩২ প্রজাতির মাছ এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এ রোগে আক্রান্ত মাছের গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অঢ়যধহড়সুপবং নামক ছত্রাক সংক্রমণে এ রোগ হয়। পরে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এরোগ সৃষ্টি হয়। এ রোগে মাছের গায়ে ছোট ছোট লাল দাগ দেখা যায়। লাল দাগের স্থানে গভীর ক্ষত হয়। মাছ দ্রুত মারা যায়। চোখ নষ্ট হতে পারে। ক্ষত স্থান থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। মাছ খাদ্য গ্রহণ করে না। ক্ষতে চাপ দিলে দুর্গন্ধ ও পুঁজ বের হয়। মাছ দুর্বল হয় এবং ভারসাম্যহীনভাবে চলাফেরা করে। আক্রান্ত বেশি হলে লেজ ও পাখনা পচে খসে পড়ে।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : শুকনো মৌসুমে পুকুরের তলা শুকাতে হবে। শীতের শুরুতে প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন ও ১ কেজি লবণ একত্রে প্রয়োগ করতে হবে। পোনা মজুদের আগে ২-৩% লবণ পানিতে পোনা গোসল করানো। জৈবসার প্রয়োগ সীমিত করা। জাল রোদে শুকিয়ে পুকুরে ব্যবহার করা। প্রতি কেজি খাবারের সাথে ৬০-১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন বা ১ গ্রাম ক্লোরোমাইসিটিন ওষুধ মিশিয়ে পরপর ৭-১০ দিন প্রয়োগ করতে হবে। আক্রান্ত মাছকে ৫ পিপিএম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে ১ ঘণ্টা অথবা ১ পিপিএম তুঁতের দ্রবণে ১০-১৫ মিনিট গোসল করাতে হয়।
ড্রপসি-উদরফোলা-শোঁথরোগ
রোগের কারণ : ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এ রোগ হয়। আর লক্ষণ হলো : মাছের পেটে তরল পদার্থ জমে পেট ফুলে যায়। মাছ চিৎ হয়ে ভেসে উঠে। ভারসাম্যহীন চলাফেরা করে। হলুদ বা সবুজ রঙের পিচ্ছিল তরল পদার্থ বের হয়। দেহের পিচ্ছিল পদার্থ থাকে না।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : হাত দিয়ে পেট চেপে তরল পদার্থ বের করা। জৈব সার প্রয়োগ করা। চুন প্রয়োগ করা। টেরামাইসিন গ্রুপের ওষুধ খাদ্যের সাথে খাওয়াতে হবে অথবা ইনজেকশন দিতে হবে।
লেজ ও পাখনা পচা রোগ
রোগের কারণ ও লক্ষণ : অ্যারোমোনাস ও মিক্সো ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এ রোগ হয়। দেহের পিচ্ছিল পদার্থ কমে যায়। লেজ ও পাখনায় সাদাটে দাগ দেখা যায়। লেজ ও পাখনায় পচন ধরে। লেজ ও পাখনার পর্দা ছিড়ে যায়। লেজ ও পাখনা খসে পড়ে। রক্তশূন্যতা দেখা দেয় ও রঙ ফ্যাকাশে হয়। মাছ দেহের ভারসাম্য হারায়। মাছ ঝাঁকুনি দিয়ে চলাফেরা করে। আক্রান্ত স্থানে তুলার মতো ছত্রাক জন্মায়।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার : পুকুরে জৈবসার প্রয়োগ কমাতে হবে। নিয়মিত হররা বা জাল টেনে পুকুরের তলার বিষাক্ত গ্যাস কমাতে হবে। মজুদকৃত মাছের ঘনত্ব কমাতে হবে। পুকুরে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা। প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে ২৫ মিলিগ্রাম টেট্রাসাইক্লিন মিশিয়ে পর পর ৭ দিন দিতে হবে। পোনা মাছে ১ পিপিএম তুঁত দ্রবণে সপ্তাহে ২ দিন চুবিয়ে জীবাণুমুক্ত করে পরিষ্কার পানিতে ছেড়ে দিতে হবে।
আঁইশ উঠা রোগ
রোগের কারণ ও লক্ষণ : অ্যারোমোনাস ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে হয়। মাছের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়। আঁইশ বাঁকা হয়। সামান্য ঘষা বা আঘাতেই আঁইশ উঠে যায়। লেজ অবশ হয়। মাছ ভারসাম্যহীনভাবে চলাফেরা করে। মাছ খাদ্য গ্রহণ করে না।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ : পুকুরে জৈবসার প্রয়োগ কমাতে হবে। প্রতি শতাংশে ১ কেজি চুন নিয়মিত প্রয়োগ করা। জাল রোদে শুকিয়ে পুকুরে ব্যবহার করা। এক লিটার পানিতে ২-৩ মিলি গ্রাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট অথবা ১ লিটার পানিতে ১ মিলিগ্রাম তুঁত মিশিয়ে মাছকে গোসল করালে এ রোগ ভালো হয়। প্রতি কেজি খাদ্যে ১ গ্রাম ক্লোরোমাইসিটিন মিশিয়ে মাছকে কমপক্ষে ৭ দিন খাওয়াতে হবে।

কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ*
*কৃষি প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক, কৃষিশিক্ষা, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল; বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত লেখক; ০১৭১১-৯৫৪১৪৩

বিস্তারিত
রোগ প্রতিরোধে খাদ্য ও পুষ্টি

রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করা ভালো। রোগ হলে রোগীর কষ্ট হয়। চিকিৎসা করাতে হয়, ওষুধ খাওয়াতে হয়, অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আমাদের দেশে আ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি, হেকিমিসহ যত ওষুধ তৈরি হয় এর অধিকাংশ ওষুধ শাকসবজি ফলমূল ভেষজ উদ্ভিদ, খাদ্য দ্রব্যসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি হয়। রাসায়নিক প্রায় সব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু ফুলফল, শাকসবজি, ভেষজ উদ্ভিদের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ক্ষতিকর প্রভাব নেই। ওষুধ না খেয়ে সুনিদিষ্ট পরিমাণ ফল, শাকসবজি, খাদ্যদ্রব্য খেয়ে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করা যায় ও রোগ সারানো যায়। এজন্য কোনো খাদ্য খেলে কোন রোগ প্রতিরোধ হয় ও সারায় এবং পুষ্টি পাওয়া যায় তা আমাদের সবার জানা একান্ত প্রয়োজন। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মদ রোগ প্রতিরোধে খাদ্য ও পুষ্টি বইতে বিশ্লেষণ করেছেন সহজ সরল ভাষায়।
বইতে ৫৪টি শাকসবজির পুষ্টিমাণ ও রোগ প্রতিরোধ গুণ, ৩৫টি ফলের পুষ্টিমাণ ও রোগপ্রতিরোধ গুণ, ১০টি মশলার পুষ্টিমাণ ও রোগপ্রতিরোধ গুণ, ৩৫টি ভেষজ উদ্ভিদের রোগ সারানোর গুণ, ৩৩টি বিভিন্ন খাদ্যের পুষ্টিগুণসহ খাদ্য পুষ্টি বিষয়ক বিশ্লেষণ আছে। বইটিতে রোগ প্রতিরোধে শাকসবজি, রোগ প্রতিরোধে ফল, রোগ প্রতিরোধে মশলা, রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন খাদ্য এবং পুষ্টি তথ্য সংবলিত মোট ৫টি ভিন্ন অধ্যায় আছে। বিভিন্ন তথ্য, গবেষণা ফলাফল, বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে লেখক সুন্দরভাবে পুষ্টিতথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। কোন ফসলে কী কী পুষ্টিগুণ, কী পরিমাণ আছে এবং তা কী কাজে লাগে তা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া বন্যার্তদের জন্য পুষ্টি বার্তা, অসুস্থদের জন্য পুষ্টিবার্তা, রোগীদের জন্য পুষ্টিবার্তা, আমাদের চলমান অভ্যাসগত খাদ্যোপাদানের মধ্যে কী খেলে কী লাভ হয়, কী ক্ষতি হয় সেগুলোও বিশ্লেষণ করেছেন। বিষমুক্ত উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনেও জোর দিয়েছেন। শেষ অধ্যায়ে পুষ্টি বার্তায় রোগীদের খাদ্য তালিকা, দামি ও সস্তা খাবার, দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা, বিভিন্ন খাদ্যে পুষ্টি উপাদান, রোগ নিরাময়ে ভেষজ গাছ, কোন কাজে কত ক্যালরি দরকার, পুষ্টি উপাদানের ওপর রান্নার প্রভাব, পুষ্টি বজায় রেখে রান্নার কৌশল বর্ণনা করেছেন। আশা করি বইটি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সচেতন মানুষ, পুষ্টিবিদ, পুষ্টি গবেষক, পুষ্টি শিক্ষার্থী, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের বিশেষ উপকারে আসবে। বইটিতে মোট পৃষ্ঠা ২০০। দাম ৩০০ টাকা। ঝকঝকে ছাপা, বাইন্ডিংসহ বইটি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রকাশক দি রয়েল পাবলিশার্স, ৩৬ বাংলাবাজার, দোতলা, ঢাকা-১১০০। লেখকের কাছ থেকেও সুলভ মূল্যে পাওয়া যাবে। কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মদের সেল নাম্বার ০১৭১১৯৫৪১৪৩। তাছাড়া খামারবাড়ির কৃষি তথ্য সার্ভিসের বিক্রয় কেন্দ্রেও বইটি পাওয়া যাবে।

(কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মদের আরেকটি বই)
মো. আমিনুল ইসলাম*

*স্ক্রিপ্ট রাইটার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
বালাইনাশকের ঝুঁকি (নাটিকা)

সখিনা : (স্বামীর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়া জিনিস পত্র আলাদাভাবে রাখছে, তেলও বিষের বোতল একত্রে তাকের ওপর রেখেছে আর বলছে), ছেলে স্কুলে গেছে, ভাত রান্না তো হলো না, কখন ফিরবে কি খাবে?
রব্বিল : (বই হাতে বন্ধুর সাথে প্রবেশ) মা ... মা ...ওমা, মাগো  ক্ষিধা  লাগিছে, ভাত দাও, ভাত খাব। সেই সকালে ভাত খাইছি,
সখিনা : ভাত রান্না তো হয়নি বাবা, টিনের কৌটায় মুড়ি আছে, মুড়ি নিয়া খা ।
রব্বিল : (ছেলে প্লেটে মুড়ি নিয়া খাচ্ছে) মা মুড়ি খেতে ভালো লাগছে না, গলায় আটকে যাচ্ছে ,খালি মুড়ি কি খাওয়া যায়?
সখিনা : বাবা রব্বিল দেখতো তাকের ওপর সরিষার তেল আছে, তেল নিয়া মুড়ি মাইখ্যা খা, আমি গোসল করে আসি।
রব্বিল : (বিষের বোতল নিয়া মুড়ির সাথে বিষ মিশাইয়া খাওয়া শুরু করতেই) মা .. ও মা, গলা জ্বলছে বুক জ্বলছে, পেট জ্বলছে, বমি হচ্ছে, মা গো মরে গেলাম বাঁচাও..বাঁচাও ...বাঁচাও (মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল)।
হাশেম : রব্বিল কে নিয়ে হুলস্থূল, পানি নিয়ে আয়, তেল নিয়ে আয়, কে কোথায়  আছ তাড়াতাড়ি  আস।
কাশেম : রব্বিল কে দেখে দ্রুত ডাক্তার ডাকতে গেল।
শরিফ : হাত ধরে দেখল, চোখ দেখল, টেলিস্কোপ ধরল। রব্বিল আর নাই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। (কান্নার রোল পড়ে গেল)।                                                              
২য় দৃশ্য
ল্যাকট : (স্প্রে মেশিন ও বিষের বোতল নিয়ে বিষণœ মনে ভাবছে) ছেলেটা মরে গেল আমি আর কি নিয়া বাঁচব? আমার সাথে কত কথা বলত, স্কুলে যেত, খেলা করত, তার কত বন্ধু ছিল,..আবার ওই দিকে ক্ষেতের ফসলে পোকা লেগে সব ফসল খেয়ে গেল কি যে, করি আমার তো পা উঠছে না।
মাখন মিয়া : চাচা আর দুঃখ কইরো না, সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছা, বাঁচা  মরার মালিক সেই। চিন্তা কইর না  চাচা  তোমার ক্ষেতে আমি বিষ দিয়া দেবোনে ।
ল্যাকট : মাখন! আমার জমিতে বিষ দিয়া দিবি! তাহলে আমি রক্ষা পাই। তোকে ২০০ টাকা দেবোনে আর বিড়ি দেবনে বিড়ি ,....বিড়ি।
মাখন মিয়া : তাহলে চল চল আমাকে বিষ মিশিয়ে মেশিন কাঁধে তুলে দাও।
ল্যাকট : শোন বউ আমারে দুজনের জন্যে মাঠে ভাত নিয়া আইস।
মাখন মিয়া : (মুখ দিয়া বিষের বোতল খুলবে, হাত দিয়া মিশাবে, পান খাবে, খালি গায়ে, খালি পায়ে, খালি পেটে, বাতাসের বিপরীতে বিষ স্প্রে করবে) আজ পোকার একদিন কি আমার একদিন, পোকার চৌদ্দগোষ্ঠী মাইরা ফেলাব  পোকার জ্বালায় জানডা ভাজা ভাজা হয়ে গেল (ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাড়ির দিকে উঁকি ঝুঁকি করছে)।
সখিনা : (ভাতের গামলা, জগ, গ্লাস নিয়ে স্ত্রীর প্রবেশ) ভাত লইয়া আইছি, খাইয়া নাও, ও রব্বিলের বাপ, বেলা তো কম হয়নি ।
মাখন মিয়া : (হাত পা না ধুয়ে তড়ি ঘড়ি করে মাখনও ল্যাকট খেতে শুরু করল, কয়েক বার মুখে দিয়েই) মুখ আটকে আসছে, গলা জ্বলছে, বুক জ্বলছে, পেট জ্বলছে,মাথা ঘুরছে, কিছু দেখতে পাচ্ছি না, কি খাওয়ালে চাচি (বমি বমি ভাব) জ্বলে গেল, পুড়ে গেল মরে গেলাম, বাঁচাও, বাঁচাও (অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে)।
ছাকেন : দূরের মাঠে কাজ করছিল, ছুটে এলো। (ছাকেন ও সখিনা, মাখনকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল)  তুই পরের ছেলেটা বিষ দিতে নিয়া মারে ফেলতে লাগিছ্।
শরিফ : (হাত ধরে দেখবে, চোখ দেখবে, হার্টবিট দেখবে, মুখ হা করাবে, পাইপ লাগাবে, বিষ বাহির করবে, ইনজেকশন দিবে) বলবে... এবারের মতো বেঁচে  গেলেন। (হাতে ডাইরি, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে এসএএও সাহেবের প্রবেশ)
ফয়েজ : কি হয়েছে ল্যাকট ভাই? এত শোরগোল কিসের?
ল্যাকট : আস্সালামু আলাইকুম, এসএএও সাব, আপনার কথা না শুনে বিষ দিতে গেছিলাম, যাইয়া আমার ভাইস্তা মাখন মিয়া প্রায় যায় যায়, আমার ছেলে রব্বিল আর নাই। (ক্রন্দন)
ফয়েজ : কাঁদে না ভাই, কাঁদেন না (চোখ মুছে দিবেন) ধৈর্য ধরুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার ভুলের জন্য বিপদে পড়েছেন, আমার ও খুব খারাপ লাগছে। তবে সতর্কতার সাথে বিষ ব্যবহার করলে নিজেদের কোনো ক্ষতি হতো না, পোকা ঠিকই দমন হতো।
ল্যাকট : সতর্কতা আবার কি? বাজার থেকে বিষ কিনে নিয়ে  আসি পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করেছি ।

(এসএএও কথা বলার সময় সব কৃষক মনোযোগ সহকারে শুনতে হবে)                                                                                                                                    
ফয়েজ : না ভাই না না, সতর্কতা হলো, বিষ ব্যবহারের আগে-পরে ও বিষ ব্যবহারের সময় সাবধান থাকা।
আপনারা সবাই শুনেন বিষ দেয়া জমিতে লাল কাপড়ের  নিশান টাঙাতে হবে।
ল্যাকট ও মাখন : (কান ধরে বলবে) আর কোনো দিন এলোপাতাড়ি বিষ ব্যবহার করব না। কৃষি বিভাগের পরামর্শ না নিয়া বিষ ব্যবহার করব না। (ল্যাকট, মাখন ও ফয়েজ একত্রে মাথা ঝুকিয়ে সমাপ্ত করবে )।

মো. মাজেদুল ইসলাম মিন্টু*
*এসএএও, পাবনা সদর, পাবনা; ০১৭১৭-৪৬৬৯৯৮

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর কৃষিকথা ১৪২৪ (নিয়মিত বিভাগ)

মো. নাজমুল হাসান,  গ্রাম : দহশৈলা, উপজেলা : লালপুর, জেলা : নাটোর
প্রশ্ন : আমের গুটির গায়ে এবং বোঁটায় কালো ফোসকা দেখা যায় এবং গুটিগুলো ঝরে যাচ্ছে। এর প্রতিকার কি?

উত্তর : এ রোগের নাম অ্যানথ্রাকনোজ। এতে পাতা, কাণ্ড, মুকুল ও ফলে ধূসর বদামি রঙের দাগ পড়ে। কচি পাতায় অনিয়মিত দাগ দেখা যায়। মুকুল কালো হয়ে যায়, আমের গুটি ঝরে যায়। আমের গায়ে কালচে দাগ হয় এবং আম পচে যায়। কুয়াশা, মেঘাচ্ছন্ন ও ভেজা আবহাওয়ায় এ রোগ বেশি হয়ে থাকে, গাছের সব মুকুল ঝরে যায়। এ রোগ থেকে বাঁচার জন্য আমের মৌসুম শেষে গাছের মরা ডালপালা কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে বর্দোপেস্ট (প্রতি লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম তুঁতে ও ১০০ গ্রাম চুন) লাগাতে হবে। বাগান সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ডাইথেন এম ৪৫, ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আমের আকার মটর দানার মতো হলে ২য় বার স্প্রে করতে হবে। ফল সংগ্রহ শেষ হলে গাছ পরিষ্কার করে একটি ছত্রাকনাশক ও একটি কীটনাশক দিয়ে পুরো গাছ ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।  
মো. আল আমিন, গ্রাম : কান্দিকাবিলাপাড়া, উপজেলা : পীরগাছা, জেলা : রংপুর
প্রশ্ন : ভুট্টার ভালো ফলন পাওয়ার জন্য ভুট্টার ক্ষেতে কোন সময় পানি সেচ দিতে হবে?

উত্তর : ভুট্টার ভালো ফলন পাওয়ার জন্য উচ্চফলনশীল জাতের ক্ষেত্রে রবি মৌসুমে সেচ প্রয়োগ করা জরুরি। ৩-৪টি সেচ নির্দিষ্ট সময়ে দিতে হবে।  প্রথম সেচ বীজ বপনের ১৫-২০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ  ৪-৬ পাতা পর্যায়ে দিতে হবে। দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে বীজ বপনের ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে অর্থাৎ  ৮-১২ পাতা পর্যায়ে। মোচা বের হওয়া পর্যায় অর্থাৎ বীজ বপনের ৬০-৭০ দিনের মধ্যে তৃতীয় সেচটি দিতে হবে। আর চতুর্থ সেচ  বীজ বপনের ৮৫-৯৫ দিনের মধ্যে অর্থাৎ  দানা বাঁধার পূর্ব পর্যায়ে দিতে হবে। ফুল ফোটা ও দানা বাঁধার সময় জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে দেয়া যাবে না।
অনুপ মণ্ডল, গ্রাম বিষখালী, উপজেলা : মোরেলগঞ্জ, জেলা : বাগেরহাট
প্রশ্ন : ধানের পাতা হলুদ হয়ে যাচ্ছে, পাতার মধ্যে চোখের আকৃতির বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়। কিভাবে এর প্রতিকার করা যাবে?

উত্তর : ধানে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ চারা অবস্থা থেকে ধান পাকার আগ পর্যন্ত যে কোনো সময় দেখা দিতে পারে। ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় পাতায় শিশির জমে থাকলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পানি ধারণক্ষমতা কম এমন হালকা মাটিতে ধান চাষ করলে রোগটি বেশি হতে পারে। অনুকূল পরিবেশে রোগ দ্রুত ছড়ায় এবং ধানের প্রচুর ক্ষতি করে থাকে। রোগপ্রবণ জাতে যদি রোগটি হয় তাহলে শতকরা ৮০ ভাগ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। রোগ দেখা দিলে রোগের প্রাথমিক অবস্থায় বিঘাপ্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। আবহাওয়া অনুকূল হলে রোগের প্রাথমিক অবস্থায় ট্রুপার/নেটিভো/জিল নামক ছত্রাকনাশক বিঘাপ্রতি ১০৭ মিলিলিটার ১০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ব্লাস্ট রোগের ক্ষতি থেকে বাঁচতে মাটিতে জৈব সার ব্যবহার করতে  হবে। রাসায়নিক সার সুষম মাত্রায়  ব্যবহার করতে  হবে। রোগাক্রান্ত বীজ ব্যবহার না করে সুস্থ বীজ ব্যবহার করতে হবে। রোগপ্রবণ ধানের চাষ থেকে বিরত থাকতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স¤পন্ন জাত যেমন বোরো মৌসুমে বিআর ৩, ৬, ৭, ১২, ১৪, ১৬, ১৭, ব্রিধান২৮ ও ৪৫; আউশ মৌসুমে বিআর ৩, ৬, ৭, ১২, ১৪, ১৬, ২০, ২১, ২৪; আমন মৌসুমে বিআর ৪, ৫, ১০, ব্রিধান ৩২, ব্রিধান ৩৩ ও ব্রিধান ৪৪ চাষ করতে হবে। ইউরিয়া সার যেন পরিমিতভাবে ব্যবহার করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ইউরিয়া সারের চাহিদা নির্ধারণের জন্য এলসিসি দিয়ে ধানের পাতার রঙ মিলিয়ে নেয়া ভালো।  জমিতে বা জমির আশপাশে অন্যান্য পোষক গাছ বা আগাছা যেন না থাকে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে।
আবদুস সাত্তার, গ্রাম : সালিহর, উপজেলা : গৌরীপুর, জেলা : ময়মনসিংহ
প্রশ্ন : পুকুরে হঠাৎ করে মাছ মরে যাচ্ছে, কী করব?

উত্তর : পুকুরে হঠাৎ করে মাছ মরে যেতে থাকলে পুকুরে মাছের ঘনত্ব কমিয়ে দিতে হবে। মাছের জন্য  নিয়মিত পরিমাণমতো সুষম খাদ্য (রেডি ফিড বা পিলেট ফিড) দিতে হবে। পুকুরে ৫০০ গ্রাম প্রতি শতকে চুন প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও নতুন পানি সংযোগ করতে হবে। বড় মাছ তুলে নিয়ে  বাজারজাতকরণ করতে হবে। হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা মাছকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে এবং পুকুর বা ঘের শুকানোর ব্যবস্থা না থাকার কারণে এ সমস্যা হতে পারে।
নিপেন চন্দ্র, গ্রাম : দুর্গাপুর, উপজেলা : পিরোজপুর, জেলা : পিরোজপুর
প্রশ্ন : পুকুরে কার্প মাছের মিশ্র চাষ করতে চাই, এক্ষেত্রে কতগুলো মাছ ছাড়তে পারব?

উত্তর : চাষ পদ্ধতির  ওপর কার্প জাতীয় মাছের মজুত অনেকাংশে নির্ভর করে। সাধারণত মিশ্র চাষে ৪০টি (৩/৪ ইঞ্চি ৭.৬২ সে.মি-১০.১৬ সে.মি. সাইজের পোনা) : কাতলা ও সিলভার কার্প ২০টি, রুই ১০টি, মৃগেল ১০টি থাকতে পারে। আর আধা নিবিড় পদ্ধতিতে কার্প মিশ্র চাষে কাতলা ১০টি, সিলভার কার্প ১৫টি, রুই ১০টি, মৃগেল ৫টি, কমন কার্প ৫টি, সরপুটি ২০টি ও গ্রাস কার্প ২টি থাকতে পারে।
জাফর আলী, গ্রাম : বনগ্রাম, ইউনিয়ন : রাজাপুর, থানা : মোহাম্মদপুর, জেলা : মাগুরা
প্রশ্ন : আমার ১০টি মুরগি আছে, এগুলো শুধু ঝিমায়, কিছু খায় না, চুনের মতো পায়খানা করে। মুরগিগুলো শুধু পানি খেতে চায়। আমি কি চিকিৎসা করাব?
উত্তর:  মুরগির রানীক্ষেত রোগ হয়েছে। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই রোগ হওয়ার আগেই টিকা দিতে হয়। আক্রান্ত মুরগিকে টাইলোভেট বা মক্সিলিন ভেট বা এজিন ভেট পাউডার প্রতি ২.৫ গ্রাম এর সাথে ১ লিটার পানি মিশিয়ে দিনে একবার করে খাওয়াতে হবে, সাথে এনফ্লক্স ভেট পাউডার ১ গ্রাম এর সাথে ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে অথবা সিপ্রো এ ভেট সিরাপ ১ মিলি পরিমাণ ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে  দিনে ২ বার খাওয়াতে হবে। ১টা এইচ ভেট বা ফাস্ট ভেট ট্যাবলেট ৮ ভাগ করে প্রতি একভাগ ট্যাবলেট পানি অথবা খাদ্যের সাথে মিশিয়ে দিনে তিন বার খাওয়াতে হবে।
আবদুস সালাম, গ্রাম : মনিগঞ্জ, উপজেলা : তেঁতুলিয়া, জেলা : পঞ্চগড়
প্রশ্ন : আমার চার জোড়া কবুতর আছে। কবুতরগুলোর চোখ ও মুখের চারদিকে গুটি দেখা দিয়েছে। চোখগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি এর জন্য পরামর্শ চাই।

উত্তর : এ রোগটির নাম বসন্ত রোগ। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগের জন্য প্রতিষেধক খুব জরুরি। কবুতরগুলোকে এখন থেকে বসন্তের টিকা দিতে হবে। কবুতরের বাচ্চার বয়স ৩-৭ দিন হলেই বসন্তের টিকা দিয়ে দিতে হবে। অসুস্থ কবুতরগুলো আলাদা ঘরে রাখতে হবে। এক গ্লাস পানিতে অল্প পরিমাণ পটাশ মিশিয়ে আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার করে নিয়মিত নেবানল ক্রিম বা নিউবেক্রিন ক্রিম লাগিয়ে দিতে হবে। প্রতি এক লিটার পানিতে এক গ্রাম রেনামক্স বা মক্সিলিন ভেট পাউডার মিশিয়ে দিনে একবার করে খাওয়াতে হবে।  এভাবে রোগ ভালো না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা  করতে হবে।  

সুপ্রিয় পাঠক বৃহত্তর কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কল সেন্টারের ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটি ব্যতিত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৬ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

কৃষিবিদ ঊর্মি আহসান*

*উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (এলআর), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
আষাঢ় মাসের কৃষি (কৃষিকথা জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪)

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, গ্রীষ্মের তাপদাহে মানুষ, প্রকৃতি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ঠিক সে সময় নববর্ষার শীতল স্পর্শে ধরণীকে শান্ত, শীতল ও শুদ্ধ করতে বর্ষা ঋতু আসে আমাদের মাঝে। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ভরে ওঠে নতুন পানির জোয়ারে। গাছপালা ধুয়ে মুছে সবুজ হয়, কদমফুলের মনোহরি সুঘ্রাণ শোভা মাতিয়ে মন ভালো করে দেয় প্রতিটি বাঙালির। সাথে আমাদের কৃষি কাজে নিয়ে আসে ব্যাপক ব্যস্ততা। প্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন আসুন আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই এ বর্ষায় কৃষির করণীয় আবশ্যকীয় কাজগুলো।
আউশ ধান
আউশ ধানের ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য যতœ নিতে হবে; আইপিএমের  মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে হবে; বন্যার আশঙ্কা হলে আগাম রোপণ করা আউশ ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
আমন ধান
পানিতে ডুবে না এমন উঁচু খোলা জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার কারণে রোপা আমনের বীজতলা করার মতো জায়গা না থাকলে ভাসমান বীজতলা বা দাপগ পদ্ধতিতে বীজতলা করে চারা উৎপাদন করতে হবে;
বীজতলায় বীজ বপন করার আগে ভালো জাতের সুস্থ সবল বীজ নির্বাচন করতে হবে। রোপা আমনের উন্নত জাত যেমন বিআর১০, বিআর২৫, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩১, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১। এছাড়া লবণাক্ত জমিতে ব্রি ধান৪৪ চাষ করতে পারেন;
খরাপ্রবণ এলাকাতে নাবি রোপার পরিবর্তে যথাসম্ভব আগাম রোপা আমনের (ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান ৩৯ এসব) চাষ করতে হবে;
ভালো চারা পেতে প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ২ কেজি গোবর, ১০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১০ গ্রাম জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে; আষাঢ় মাসে রোপা আমন ধানের চারা রোপণ শুরু করা যায়;
মূল জমিতে শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৯০ কেজি টিএসপি, ৭০ কেজি এমওপি, ১১ কেজি দস্তা এবং ৬০ কেজি জিপসাম দিতে হবে; জমিতে চারা সারি করে রোপণ করতে হবে। এতে পরবর্তী পরিচর্যা বিশেষ করে আগাছা দমন সহজ হবে;
জমির এক কোণে মিনি পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন, যেন পরবর্তীতে সম্পূরক সেচ নিশ্চিত করা যায়।
পাট
পাট গাছের বয়স চার মাস হলে ক্ষেতের পাট গাছ কেটে নিতে হবে; পাট কাটার পর চিকন ও মোটা পাট গাছ আলাদা করে আঁটি বেঁধে দুই-তিন দিন দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে; পাতা ঝরে গেলে ৩-৪ দিন পাট গাছগুলোর গোড়া একফুট পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার পানিতে জাগ দেিত হবে।
পাট পচে গেলে পানিতে আঁটি ভাসিয়ে আঁশ ছাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে পাটের আঁশের গুণাগুণ ভালো থাকবে। ছাড়ানো আঁশ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ে শুকাতে হবে।
যেসব জায়গায় জাগ দেয়ার পানির অভাব সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচাতে পারেন। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচন সময় কমে যায়।    
পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য ১০০ দিন বয়সের পাট গাছের এক থেকে দেড় ফুট ডগা কেটে নিয়ে দুটি গিটসহ ৩-৪ টুকরা করে ভেজা জমিতে দক্ষিণমুখী কাত করে রোপণ করতে হবে। রোপণ করা টুকরোগুলো থেকে ডালপালা বের হয়ে নতুন চারা হবে। পরবর্তীতে এসব চারায় প্রচুর ফল ধরবে এবং তা থেকে বীজ পাওয়া যাবে।
ভুট্টা
পরিপক্ব হওয়ার পর বৃষ্টিতে নষ্ট হবার আগে মোচা সংগ্রহ করে ঘরের বারান্দায় সংগ্রহ করতে পারেন। রোদ হলে শুকিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; মোচা পাকতে দেরি হলে মোচার আগা চাপ দিয়ে নি¤œমুখী করে দিতে হবে, এতে বৃষ্টিতে মোচা নষ্ট হবে না।
শাকসবজি
ডাঁটা, গিমাকলমি, পুঁইশাক, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, ঝিঙা, শসা, ঢেঁড়স, বেগুনের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনে মাটি তুলে দিতে হবে। এছাড়া বন্যার পানি সহনশীল লতিরাজ কচুর আবাদ করতে পারেন;
উপকূলীয় অঞ্চলে ঘেরের পাড়ে গিমাকলমি ও অন্যান্য ফসল আবাদ করতে পারেন;
সবজি ক্ষেতে পানি জমতে দেয়া যাবে না। পানি জমে গেলে সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে;
তাড়াতাড়ি ফুল ও ফল ধরার জন্য বেশি বৃদ্ধি সমৃদ্ধ লতা জাতীয় গাছের ১৫-২০ শতাংশের লতা পাতা কেটে দিতে হবে;
কুমড়া জাতীয় সব সবজিতে হাত পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। গাছে ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন ভোরবেলা হাতপরাগায়ন নিশ্চিত করলে ফলন অনেক বেড়ে যাবে;
আগাম জাতের শিম এবং লাউয়ের জন্য প্রায় ৩ ফুট দূরে দূরে ৩০.৪৮ সে.মি. (১ ফুট) চওড়া ও ৩০.৪৮ সে.মি. (১ ফুট) গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা তৈরির সময় গর্তপ্রতি ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম সরিষার খৈল, ২ কেজি ছাই, ১০০ গ্রাম টিএসপি ভালভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর প্রতি গাদায় ৩-৪টি ভালো সবল বীজ রোপণ করতে হবে।
গাছপালা
এ সময়টা গাছের চারা রোপণের জন্য খুবই উপযুক্ত। বসতবাড়ির আশপাশে, খোলা জায়গায়, চাষাবাদের অনুপযোগী পতিত জমিতে, রাস্তাঘাটের পাশে, পুকুর পাড়ে, নদীর তীরে গাছের চারা বা কলম রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে; চারা রোপণের আগে গর্ত তৈরি করতে হবে;
সাধারণ হিসাব অনুযায়ী এক ফুট চওড়া ও এক ফুট গভীর গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার মিশিয়ে, দিন দশের পরে চারা বা কলম লাগাতে হবে;
বৃক্ষ রোপণের ক্ষেত্রে উন্নত জাতের রোগমুক্ত সুস্থ সবল চারা বা কলম রোপন করতে হবে;  
চারা রোপণের পর শক্ত খুঁটির দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। এরপর বেড়া বা খাঁচা দিয়ে চারা রক্ষা করা, গোড়ায় মাটি দেয়া, আগাছা পরিষ্কার, সেচনিকাশ নিশ্চিত করতে হবে; মাতৃগাছ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুব জরুরি। সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, দুর্বল রোগাক্রান্ত ডালপালা কাটা বা ছেটে দেয়ার কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে হবে।
প্রাণিসম্পদ
বর্ষাকালে হাঁসমুরগির ঘর যাতে জীবাণুমুক্ত ও আলো-বাতাসপূর্ণ থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে;
হাঁস-মুরগির কৃমি, কলেরা, রক্ত আমাশা, পুলরাম রোগ, সংক্রমণ সর্দি দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে; হাঁস-মুরগিকে ভেজা স্যাঁতসেঁতে জয়গায় না রেখে শুকনো ঘরে রাখতে হবে এবং মাঝে মধ্যে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে;
বর্ষাকালে গবাদিপশুকে সংরক্ষণ করা খড়, শুকনো ঘাস, ভুসি, কুঁড়া খেতে দিতে হবে। সে সাথে কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হবে; মাঠ থেকে সংগৃহীত সবুজ ঘাস ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাওয়ানো যাবে না;
বর্ষাকালে গবাদিপশুর গলাফোল, তড়কা, বাদলা, ক্ষুরা রোগ মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। এ জন্য প্রতিষেধক টিকা দিতে হবে; কৃমির আক্রমণ রোধ করার জন্য কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে;
হাল চাষের পর গরুকে ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে; এছাড়া যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।
মৎস্য সম্পদ
বর্ষা মৌসুমে পুকুরের পাড় উঁচু করে দিতে হবে; বন্যার সময় পুকুরে মাছ আটকানোর জন্য জাল, বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে; আষাঢ় মাস মাছের পোনা ছাড়ার উপযুক্ত সময়। মাছ চাষের জন্য মিশ্র পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন; পুকুরে নিয়মিত খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে; বড় পুকুরে, হাওরে, বিলে, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করতে পারেন।
সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের আগাম নিশ্চিত প্রস্তুতির জন্য আগামী মাসে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়ে দেয়া হয়। এরপরও যদি আরও নতুন কোনো তথ্য প্রযুক্তি বা কৌশল জানার থাকে অথবা কোনো বিষয়ে বিস্তারিত জনতে চান তাহলে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি-মৎস্য-প্রাণী বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিলে আরও বেশি লাভবান হবেন। আর একটি কথা এ সময় বীজ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় কৃষি উপকরণগুলো বন্যামুক্ত উঁচু বা নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*

*তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫।

বিস্তারিত

Share with :
Facebook Facebook