কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিবাসন সমস্যা নিরসন

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনসহ দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান, বেকারত্ব হ্রাস ও প্রতিটি নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়ন দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রণীত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়ন করতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিটি মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে যথেষ্ট উন্নতি করলেও  প্রায় ০৪ কোটি মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে। পাশাপাশি গরিব ও বিত্তবানদের মধ্যে পুষ্টি বৈষম্য বেড়েই চলেছে। দারিদ্র্য নিরসনে গত দুই দশকের বেশি সময়ে নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচির ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতিতে লক্ষণীয় অগ্রগতি আছে বাংলাদেশের। শিশু ও মাতৃপুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদ-ে বয়স অনুযায়ী শিশুর উচ্চতা ও ওজনে এখনও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরও বড় একটি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে অপরিকল্পিত নগরায়ন। এর ফলে বেশ কিছু কৃষি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর পাশাপাশি দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হয়ে পড়ছে। অথচ গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন রোধ করাসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতাকেও রোধ করা সম্ভব। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছে।


গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার অত্যন্ত সফল। দারিদ্র্য বিমোচন সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৫ সালেই Millennium Development Goals (MDG) এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। যেখানে বিগত ১৯৯১ সালে দরিদ্রতার হার ছিল ৫৭ শতাংশ, সেখানে ২০১৬ সালে তা কমে ২৪.৮ শতাংশ। এ ছাড়া, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০০৯ সালে জনপ্রতি খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২,৬৩৩ কিলোক্যালোরি এবং বিগত ২০১৬ সালে তা ২,৯২৫ কিলোক্যালোরিতে দাঁড়ায়। গ্রামীণ পর্যায়ে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের সঠিক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিতকরণ ও কর্মসৃজনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজার অবকাঠামো নির্মাণ করছে। উল্লেখ্য, অপ্রচলিত ফসলগুলো চাষাবাদ বৃদ্ধিকরণ এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ৭.৫ বিলিয়ন টাকা দেশব্যাপী বিতরণ করেছে, যা গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে এবং এসব উদ্যোগ আমাদের নবীন কৃষকদের কৃষির প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করতে নিয়মিত ভুর্তকি ও প্রণোদনা কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চাহিদা মোতাবেক পুনর্বাসন সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।


যেহেতু কৃষি প্রধান বংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৭ শতাংশ এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং এই শ্রমশক্তির সিংহভাগই প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে বিস্তৃত, দেশের অভিবাসন সমস্যা নিরসনে গ্রামীণ শ্রমশক্তির আর্থসামাজিক উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।  


উল্লেখ্য, বিগত ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে বাংলাদেশের   খাদ্যশস্যের (ধান, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন ছিল প্রায় ১১১ লাখ টন, আর বর্তমানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৩৯২ লাখ  টন। বিগত ১৯৭১-৭২ সালের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন গুণেরও বেশি ও গম প্রায় ১৩ গুণ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে চতুর্থ, সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় তৃতীয় ও ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। আগে যেখানে হেক্টর প্রতি ২ টন চাল উৎপাদিত হতো, বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে ৪ টনের কাছাকাছি। স্বাধীনতার পর দেশে মাত্র ৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান ছিল না, আর বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ০.৭৩ শতাংশ হারে জমি কমে যাওয়া, গড়ে ১.৩৭ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ততা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কেননা সংস্থাটি তার প্রশিক্ষিত সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে ২০০টিরও বেশি ফসলের উৎপাদন, দলভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবা প্রদান, সেচ ব্যবস্থাপনা, বীজ ব্যবস্থাপনা, ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, ক্ষেত্র বিশেষে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনসহ সামগ্রিক প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ, সব দুর্যোগে কৃষকদের পাশে থেকে সহায়তা প্রদান, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ কৃষকের কাছে সহজলভ্যকরণ ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষক কর্তৃক গৃহীত প্রযুক্তিগুলো টেকসই করার মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ সরকার কৃষি উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উপকরণ ব্যবস্থাপনা ও সারের মূল্য নির্ধারণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার কৃষি বাজেট, কৃষিঋণ, ভর্তুকি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের বিষয়ে আরও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।


বাংলাদেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে পল্লী বসতিগুলো এখনকার মতো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠলে মারাত্মক কৃষিজমির সংকট দেখা দেবে। কিন্তু Compact Township এর মতো করে যদি ঘনবসতিপূর্ণ বসতি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কৃষি জমির ওপর আগ্রাসন শুধু কমবেই না, বরং নতুন করে আরও কিছু কৃষি জমি মুক্ত হবে। ফলে পল্লী এলাকাতেই লোকজন নগর সুবিধা পেয়ে যাবে। সুতরাং পল্লী-নগর স্থানান্তর কমবে এবং এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও কমে যাবে। এছাড়া, সারা দেশের খাসজমির বণ্টনে আরও কার্যকরী নীতিমালা প্রয়োজন। নদীভাঙনের ফলে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিপরীতে যারা বাস্তুহারা হচ্ছে, তাদের চরের জমি বণ্টনের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানায় জমির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে জমির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া নবায়নের ক্ষেত্রে আইনি বিষয় ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।


সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে গ্রামের অধিবাসীদের আয় বাড়ানো যেতে পারে। গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক গ্রামে রূপান্তর করতে হলে প্রথমে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য ছোট ছোট ডেইরি ও পোলট্রি খামার এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতিসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া আমাদের সনাতন পদ্ধতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ পালন ব্যবস্থাপনায় আনা হচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক পরিবর্তন। বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং তা দ্রুত কৃষকদের মাঝে সম্প্রসারণ করছে। গ্রামীণ পর্যায়ে মৎস্য ও প্রণিসম্পদের উন্নয়নের লক্ষ্যে এর দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো পুননির্মাণসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব  মোকাবিলায় খামার ও কৃষিভিত্তিক আয় বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো অপসারণে মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ করে যাচ্ছে। দরিদ্র কৃষকদের ভর্তুকি প্রদানসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মসংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। দেশের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তাসহ দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নে সরকারের এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং এলাকাভিত্তিক ফসল উৎপাদনের উপযোগিতাকে বিবেচনায় নিয়ে Cropping Zone সৃষ্টি করে এলাকাভিত্তিক উপযোগী ফসলগুলো নিবিড়ভাবে চাষাবাদ ও এর অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব। যার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উৎপাদিত ফসলের ওপর ভিত্তি করে বিশেষায়িত বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন গড়ে উঠবে, যা নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতা হ্রাস করবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন এবং এরই মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।


বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের যুগোপযোগী নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে গৃহীত ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিল্পনাগুলো সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অবৈধ অভিবাসন সমস্যা নিরসনসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।

 

কৃষিবিদ মো. গোলাম মারুফ*
*  মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিএডিসির ভূমিকা

খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তথা মানসম্মত রাসায়নিক সার সংগ্রহ ও বিতরণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, উন্নত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বিপণন, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ইত্যাদি কৃষকের মাঝে অবাধ সরবরাহ থাকা বাঞ্ছনীয়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে বিএডিসির বীজ ও  উদ্যান উইং এবং ক্ষুদ্রসেচ উইংয়ের পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা উইং বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের বহুমুখী নিরলস কার্যক্রম গ্রহণে জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘ সময়ে বিএডিসি  উন্নত বীজ, পরিমিত সেচ ও গুণগতমান সম্পন্ন সার ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।


মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম  
ফসল উৎপাদনে বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অন্যান্য কৃষি উপকরণের কার্যকারিতা গুণগত মানসম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া কোন ফসলের সম্ভাব্য ফলন বীজের মানের সাথে সরাসরি জড়িত। বীজ উৎপাদন ও মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে তুলে দিতে বিএডিসি ৩৪টি ভিত্তিবীজ বর্ধন ও উৎপাদন খামারের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে দানাজাতীয় বীজ উৎপাদন খামার ২৪টি, পাটবীজ খামার দু’টি, ডাল ও তেলবীজ খামার চারটি ও আলুবীজ খামার দু’টি। ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩১ একর কমান্ড এরিয়ায় ৭৫টি কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ও ৩৭ হাজার ৬১১ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষক যুক্ত আছেন। ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৫২টি আধুনিক বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, তিনটি অটো সিড প্রসেসিং প্লান্ট ও ডিহিউমিডিফায়েড গুদাম এবং ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার রয়েছে। দেশব্যাপী ট্রানজিট বীজ গুদামসহ ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, ৮ হাজার ৫৬ জন বীজ ডিলার নিয়ে একটি সুসংগঠিত মার্কেটিং চ্যানেল রয়েছে। বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪টি এগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও নয়টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। বীজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প, বীজ কার্যক্রম ও চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে বিগত ৯ বছরে বিভিন্ন ফসলের সর্বমোট ১২.৯০ লাখ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।


বোরো ধান বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে বোরো ধান বীজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ৬৬,৪৯৫ টন বোরো ধান বীজ কৃর্ষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


আমন ধান বীজ সরবরাহ
দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে আমন ধান বীজ  অন্যতম। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৭৭৯০ টন আমন ধানবীজ কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে
SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড ৬৫৪ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষকপর্যায়ে বিএডিসির SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। SL-8H জাতের হাইব্রিড ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন ১০-১২ টন। এ জাতের ধান চাষে দেশে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 

গম বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশে গমের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৮,১১১ টন গমবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।  

 
ভুট্টা বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি দেশে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৬ টন ভুট্টা বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশের জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডালজাতীয় ৮৩৪ টন ও তেল জাতীয় ২,৩১৫ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশে ডাল ও তেল ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলায় বিএডিসি কর্তৃক ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একটি ডাল ও তেলবীজ বর্ধন খামার স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। উক্ত খামারের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার চর এলাকায় একরপ্রতি ডাল ও তেল ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে।


আলু বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩২,৬২৭ টন আলুবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী আলু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

পাট বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭৫ টন পাটবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী পাটবীজের আমদানি নির্ভরতা কমেছে।

 

সবজি ও মসলা বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭ টন সবজি বীজ ও ১১০ টন মসলা বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।

 

উদ্যান সংক্রান্ত কার্যক্রম
বিএডিসি বিগত ২০১০-১১ হতে ২০১৬-১৭  সময়ে সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প, এগ্রো সার্ভিস সেন্টার কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৫.১৩৩ লাখ টন সবজি; ০.৩৭ লাখ টন মসলা; ৪.৪৮ লাখ টন ফল; ৩৯৮.৩২ লাখ সবজি চারা; ২০১৪.২৫৫ লাখ চারা/কলম ও ২৮.৬৮৫ লাখ নারিকেল চারা উৎপাদন ও বিতরণ করেছে। ফলে সময়ের সাথে সাথে সবজি, ফল, মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন উদ্যান ফসলের চারা বিতরণের ফলে দেশব্যাপী উদ্যান ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।

 

সেচ কার্যক্রম
বিএডিসি সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ  অবদান রাখছে। খাদ্য উৎপাদনে দেশে দুই ধরনের সেচ কার্যক্রম প্রচলিত আছে। বৃহৎ সেচ ও ক্ষুদ্রসেচ। বোরো মৌসুমে ক্ষুদ্রসেচের মাধ্যমে দেশের সেচকৃত জমির ৯৫% ভাগ এবং বৃহৎ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৫%  জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সেচযোগ্য জমির প্রায় ৭২% সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ফসলে সেচ প্রদানের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিএডিসি বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে।

 

সেচকাজে ভূপরিস্থ পানিসম্পদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করা
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার ভূপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহারে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদী, খাল-বিল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। তবে ব্যবহারযোগ্য পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে কম খরচে গুণগত মানসম্পন্ন পানি ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোই এর উদ্দেশ্য। বিগত ৬ বছরে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার ১৮% থেকে বৃদ্ধি করে ২২% এ উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারে নিম্নবর্ণিত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।


সেচের পানির উৎস বৃদ্ধিকল্পে ভূপরিস্থ পানি (বৃষ্টি ও বন্যার পানি) সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য খাল-নালা, পাহাড়ি ছড়া ইত্যাদি পুনঃখনন/সংস্কার;
 

ছোট নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপনের মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান;
জলাবদ্ধ এলাকায় খাল-নালা পুনঃখনন ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে কৃষি জমি পুনরুদ্ধার করে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং সেচের নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি করা;

বৃষ্টি বা বন্যার পানি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকার Water control structure (যেমন: ক্রস ড্যাম, সাবমারসিবল ওয়্যার, বক্স কালভার্ট, ক্যাটল ক্রসিং ইত্যাদি) নির্মাণ;

 

বিএডিসির প্রধান প্রধান সেচ কার্যক্রম
সঠিকভাবে সেচের পানির ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাসের পাশাপাশি ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণ ও ফলন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বিএডিসির মাধ্যমে সেচকৃত এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কার্যক্রম  বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

 

কৃষক প্রশিক্ষণ
বিএডিসির সেচ উইং কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সেচ দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে সর্বমোট ৯৮,০৫৮ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাস ও কৃষকপর্যায়ে সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে।

পানির স্তর পরিমাপ
বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নে জরিপ ও পরিবীক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বমোট ২০১টি অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার স্থাপন করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অটোওয়াটার টেবিল রেকর্ডারের মাধ্যমে টাইম সিরিজ ডাটা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং ডিজিটাল ডাটা ব্যাংক প্রস্তুত করার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির তথ্য/উপাত্ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এ তথ্য ব্যবহার করে ইতোমধ্যে
Groundwater Zoning Map তৈরি করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে তা আপডেট করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের কোথায় কোন ধরনের সেচযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে তা সহজেই নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে।  ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নের লক্ষ্যে সেচযন্ত্র, সেচ এলাকা, সেচের পানি ইত্যাদির নিয়মিত জরিপ, অনুসন্ধান অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার ও পর্যবেক্ষণ নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীল পানির স্তর পরিমাপ করা এবং Space Technology (ST), Remote Sensing (RS), Geophysical Survey এর মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ করে, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন: Geographic Information System (GIS) Modeling এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ, পরিবীক্ষণপূর্বক সুপারিশ প্রণয়ন, প্রচার এবং ডাটাবেজ উন্নয়ন ও সরকারকে তা অবহিত করা হচ্ছে।


সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম
ফসল উৎপাদনে সার তথা গাছে পুষ্টি সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিএডিসি প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রাথমিকভাবে ১৯৬২-৬৩ অর্থবছরে প্রায় ৫০,০০০ টন সার সংগ্রহ ও ডিলারপর্যায়ে বিতরণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সফল কার্যক্রম শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে সার বিতরণ কার্যক্রম কৃষকপর্যায়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিএডিসি গত ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার টন সার আমদানি ও প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার টন সার বিতরণ করে থাকে। তথাপি তৎকালীন বিএনপি সরকার দেশের জনগণের কল্যাণ তথা কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা না করে সরকারি সিদ্ধান্তক্রমে ১৯৯২ সাল  থেকে বিএডিসির মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। অতঃপর বেসরকারিভাবে সার আমদানি কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণে বিশৃঙ্খলার কারণে সুদীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর ২০০৬-০৭ অর্থবছর সরকার পুনরায় বিএডিসিকে বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি নন-নাইট্রোজেনাস সার আমদানি ও বিতরণের দায়িত্ব অর্পন করে।


বর্তমান সরকার কৃষকদের কাছে গুণগত মানসম্পন্ন টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিসিআইসির সার ডিলারদের পাশাপাশি বিএডিসির বীজ ডিলারগণকে বিএডিসির সার ডিলার হিসেবে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বিএডিসির নিজস্ব সার ডিলার নেটওয়ার্ক ব্যাপকতা লাভ করে। অর্থাৎ বিএডিসির মাধ্যমে নিবন্ধিত সব ডিলারকে সার উত্তোলনের সুযোগ প্রদান করায় বিএডিসির সার কৃষকদের কাছে আরও সহজপ্রাপ্য হয়। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে বিএডিসির আমদানিকৃত সারের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০০৯ সালে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার গঠনের পর সারের দাম দফায় দফায় হ্রাস করা হয়।


সারের মূল্য হ্রাস ও মানসম্মত সার নিশ্চিত হওয়ায় নন-নাইট্রোজেনাস সারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হারে দেশের জাতীয় উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএডিসি কর্তৃক টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের আমদানি ও বিতরণ হচ্ছে।


অর্থাৎ বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অন্যতম নিদর্শন সুলভ মূল্যে কৃষক পর্যায়ে সার বিতরণ। যে কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রাথমিকপর্যায়ে ৪৬২টি গুদাম নির্মিত হয়। পূর্ববর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ হয় এবং বিএডিসিতে জনবল হ্রাসকরণের ফলে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো ও গুদামগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনায় অনেকটা বিপর্যয় নেমে আসে। তখন গুদাম কিংবা স্থাপনা সংস্কার কিংবা মেরামত কাজ একদম বন্ধ ছিল। ফলে সময়ের পরিক্রমায় অনেক গুদাম ও স্থাপনা জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী গুদাম/স্থাপনা পুনরায় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকারের আধুনিক উন্নত চিন্তার কারণে অব্যাহতভাবে সার আমদানি বৃদ্ধি ও ডিলার নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পদক্ষেপের পাশাপাশি বিএডিসি সার সংরক্ষণের জন্য গুদামের প্রয়োজনীয় ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছে। সরকারের খাদ্য বিভাগ, বিসিআইসি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিএডিসির যেসব গুদাম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনরায় বিএডিসির অধীনে ফেরত নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে বিএডিসির গুদামের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৯৮,০০০ মে. টন সেখানে বর্তমানে বিএডিসির ১২০টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৫,৯৬৬ মে. টনে উন্নীত হয়েছে।


জৈবসার
বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামারগুলোতে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝিনাইদহের দত্তনগর, খুলনার বোয়ালিয়া, মেহেরপুরের চিৎলা পাটবীজ খামার, নীলফামারী জেলার ডোমার বীজ আলু উৎপাদন খামার, নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর ডাল ও তেলবীজ খামার, গাজীপুরের কাশিমপুর উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিএডিসির অন্যান্য খামারেও  জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন করা হবে। বাণিজ্যিকভাবে বিএডিসি জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) বাজারজাত করবে।


দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার টেকসই রূপ দিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য মানসম্পন্ন বীজ, সার এবং সেচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় তিউনিশিয়া, মরক্কো, বেলারুশ, রাশিয়া ও কানাডা হতে নন ইউরিয়া সার আমদানি এবং সেচ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে পতিত জমি আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মানসম্মত কৃষি উপকরণ তথা বীজ, সার ও সেচ সুলভ মূল্যে সহজলভ্য হওয়ায় ফসল উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কৃষি বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের মেরুদণ্ড। বর্তমানে কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ন হচ্ছে। গ্রামীণ জনগণের আয় বেড়েছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, তথ্য প্রযুক্তিতে গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

মো. নাসিরুজ্জামান*
*চেয়ারম্যান  (অতিরিক্ত সচিব), বিএডিসি, সেচ ভবন, মতিঝিল, ঢাকা

বিস্তারিত
অভিবাসন রোধ ও গ্রামীণ উন্নয়নে ধানভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনা (কার্তিক ১৪২৪)

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে। বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪ ভাগ এবং শহর এলাকায় ১০.৮১ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত (বিবিএস-২০১৬)। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৯.১% এবং কৃষি খাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এক সময়ের খোরপোষের কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত। এদেশের শিক্ষিত তরুণরা কৃষির চেয়ে অভিবাসনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু অভিবাসনের ঝুঁকির চেয়ে সমবিনিয়োগে ধানভিত্তিক কৃষিচর্চা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে পারে।


জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে শহরমুখী গ্রামীণ অভিবাসনের হার ক্রমেই বাড়ছে। গ্রাম এবং ছোট্ট মফস্বল শহরগুলো থেকে বড় শহরে লোকজনের অভিবাসনের কারণগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণটাই মুখ্য। অনেকের মতে, শহর এবং গ্রাম এলাকায় আয়ের বৈষম্যই শহরমুখী জনস্রোত বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। দারিদ্র্য, বছরজুড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নানা বিপর্যয়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন প্রভৃতির শিকার হয়ে গ্রামের অসহায় বিপর্যস্ত মানুষগুলো অনেকটা নিরুপায় হয়ে শহরমুখী হচ্ছে।


গ্রামে কাজ করার জন্য কৃষি শ্রমিক পাওয়াটা কঠিন ব্যাপার হয়ে গেছে। দুই চোখে নানা রঙিন স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে পা রাখা নারী-পুরুষগুলো যখন প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেকে দাঁড় করাতে পারেন না তখন শহরে কোনোভাবে মাথা গুঁজে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন। যেখানে অনেক সময় সুস্থভাবে বসবাসের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থাকে না। অথচ গ্রামে তাদের ছিল চমৎকার সুন্দর ছিমছাম বসতবাড়ি ও ভরণপোষণের উপযুক্ত কৃষি জমি, বাড়ির পাশের আঙিনায় সবজি, আনাজপাতির চাষ। তাই শহরমুখী গ্রামীণ জনস্রোতকে নিরুৎসাহিত করতে হলে গ্রামেই তাদের কর্মসংস্থানের নানা আকর্ষণীয় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বছরজুড়ে যেন কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।


অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধানভিত্তিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও ধান চাষে আধুনিক জাত এবং প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশেই বিদেশের তুলনায় বেশি আয় করা সম্ভব। বীজ সরবরাহ, সার-সেচে ভর্তুকিসহ বহুমুখী সরকারি প্রণোদনার কারণে এখন ধান চাষ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় লাভজনক। দেশের বাজারে এখন একমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। বর্তমানে এক কেজি মোটা চালের দাম ৪০-৫০ টাকা। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায়। ফলে ধান উৎপাদন এখন আর কোনোভাবেই অলাভজনক নয়। আগে যেখানে হেক্টরপ্রতি ধানের গড় উৎপাদন ছিল ২ থেকে ২.৫ টন এখন নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তির কারণে তা ৩.৫ থেকে ৭.০ টনে দাঁড়িয়েছে।


দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়েছে উচ্চফলনশীল ধানের একাধিক জাত ও লাভজনক শস্যক্রম। যেমন- স্বল্প জীবনকালের খরা সহনশীল ব্রি ধান৫৬/খরা পরিহারকারী ব্রি ধান৫৭ এবং জিংক সমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ চাষ করে বৃষ্টি নির্ভর বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিনা সেচে ছোলা এবং মশুর চাষ করা যায় এমন একটি অধিক লাভজনক শস্যবিন্যাস তৈরি করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। এ শস্য বিন্যাস অবলম্বন করে একটি জমির উৎপাদনশীলতা ১৮-৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব (আরএফএস বিভাগ, ব্রি)। ফলে রাজশাহী অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রবাসে অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে না দিয়ে তার অর্ধেক বা চার ভাগের একভাগ ব্যয়ে নিজের সামান্য জমিকে যথাযথ ব্যবহার করে ধানভিত্তিক কৃষি খামার ব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে।


উত্তরের জেলাগুলোতে যেখানে বৃষ্টিনির্ভর স্বর্ণা জাতের প্রচলন ছিল সেখানে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক আমন জাতগুলো যেমন- ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২ জাতগুলো প্রবর্তন করার মাধ্যমে ফলনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এ জাতগুলোর ফলন জাতভেদে ৪.৫ থেকে ৬.০ টন/ হেক্টর এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই পুরনো জাতের পরিবর্তে ব্রি উদ্ভাবিত এসব জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। এছাড়া অঞ্চলভেদে খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২, লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৪ এবং ব্রি ধান৭৩, বন্যাত্তোর বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪১ এবং জোয়ারের পানি যেখানে জমে যায় সেসব এলাকায় ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ চাষ করে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।


উত্তরাঞ্চলের বিশেষ সময়ের খাদ্যাভাব বা মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩/ব্রি ধান৬২-আগাম আলু-মুগ-ব্রি ধান৪৮ অধিক লাভজনক ধানভিত্তিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, যেটি অনুসরণ করে ওই এলাকার কৃষকরা মঙ্গা চিরতরে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের শহরমুখী বা দেশান্তরী হওয়ার যে প্রবণতা পূর্বে ছিল তা হ্রাসে দারুণ কাজে লেগেছে এ চার ফসলি শস্যক্রম। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ধান চাষের সুযোগ ও সম্ভাবনার বিষয়টি চোখে পড়ে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে। গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা  গেছে, ধানের ফলন ও উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে যা যথাক্রমে বার্ষিক ০.০৭ টন/হেক্টর ও ০.৯ মিলিয়ন টন/বছর।


আবার বোরো মৌসুমে মেগা জাত (সর্বাধিক জনপ্রিয়) হিসেবে খ্যাত ব্রির জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এর চেয়েও অনেক ভালো জাত বর্তমানে রয়েছে, যার মধ্যে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭৪ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ উল্লেখযোগ্য। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৪৭ এর আধুনিক সংস্করণ ব্রি ধান৬৭। আউশে পারিজা, জামাইবাবু ও বিআর২৬ এর পরিবর্তে যথাক্রমে ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৬৫ এবং নেরিকা মিউটেন্ট প্রবর্তন করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব।


অধিকন্তু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এমন কিছু ধান জাত উদ্ভাবন করেছে যেগুলো সুগন্ধি, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব ধান জাতের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ করেও লাভজনক খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। যেমন- ব্রি উদ্ভাবিত বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৩ ও ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি  ধান৮০ প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন জাত। বিআর১৬, ব্রি ধান৪৬ ও ব্রি ধান৬৯ লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (লো-জিআই) গুণসম্পন্ন জাত, এসব জাতের চালের ভাত ডায়াবেটিক রোগীরা নিরাপদে খেতে পারেন। ব্রি উদ্ভাবিত জিংক সমৃদ্ধ চারটি ধানের জাত ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২ এবং ব্রি ধান৭৪। এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জাতগুলোর ভোক্তা চাহিদা যেমন বেশি, বাজারমূল্যও অধিক। তাই ধানভিত্তিক খামার বিন্যাসে এ জাতগুলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অভিবাসনের অন্যতম বিকল্প হতে পারে। এ খাতে বর্ধিত হারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত পুঁজি লাভসহ তুলে আনা সম্ভব।


ব্রি বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত দেশের কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী ৩২টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করছে। চারা রোপণ, আগাছা নিধন থেকে ধান কাটা ও মাড়াই সব কিছুতেই লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। অভিবাসনের চিন্তা পরিহার করে সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কেনা একটি রাইস টান্সপ্লান্টার বা কম্বাইন হার্ভেস্টার স্ব-কর্মসংস্থানের অন্যতম উপায় হতে পারে। এছাড়া যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বর্তমানে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র বা ট্রান্সপ্লান্টার, রোটারি টিলার, ধান-গম কাটার যন্ত্র, ধান-গম মাড়াই যন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টার ও আগাছা দমন যন্ত্র বা উইডার ইত্যাদি। কৃষকরা এসব যন্ত্র নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও অন্যদের এসব সেবা প্রদান করে লাভবান হতে পারেন।


উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো ভালো বীজ। কথায় বলে ভালো বীজে, ভালো ফলন। ভালো বীজের অভাবে আমাদের কৃষকরা প্রায়শই প্রতারিত হন। এ পর্যন্ত মাত্র ৪৬ ভাগ চাষি মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারেন। বাকি ৫৪ ভাগ কৃষক নিজেদের অপেক্ষাকৃত কম মান সম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। মৌসুমভিত্তিক চিত্র হচ্ছে আমনে শতকরা ২০-২৩ ভাগ, আউশে শতকরা ১৬ ভাগ, এবং বোরোতে ৮০ শতাংশ কৃষক  মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করে থাকেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্রি প্রতি বছর ১৫০ টনের অধিক ব্রিডার (প্রজনন) বীজ উৎপাদন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রি থেকে ব্রিডার বীজ, ভিত্তি বীজ ও টিএলএস সংগ্রহপূর্বক সামান্য পুঁজি বীজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় যা অভিবাসনের একটি বিকল্প হতে পারে।


এছাড়াও ধানভিত্তিক বিভিন্ন খাবার প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (যেমন- চিড়া, মুড়ি, খই, রাইস কেক, চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি পিঠা-পুলি), কম ছাটা বা ঢেঁকি ছাঁটা চাল (অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন), বিভিন্ন মৎস্য ও পশু খাদ্য প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সামান্য পুঁজি বীজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। অভিবাসন ব্যয়ের সিকিভাগও যদি কৃষক পর্যায়ে উন্নত মান সম্পন্ন বীজ সরবরাহ, সার, সেচ সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন ধান উৎপাদন, ধানের চাল থেকে খাবার প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা যায় তাহলে কৃষকের যেমন ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমনি দেশের জাতীয় উন্নয়নেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর* ড. মো. আনছার আলী** মো. আবদুল মোমিন***
*মহাপরিচালক **পরিচালক (প্রশাসন)  *** ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর
E-mail-smmomin80@gmail.com

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল কৃষিনির্ভর এ দেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা। স্বাধীনতার অব্যহিত পরেই তিনি কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে Presidential Order No. ৩২ অর্ডিন্যান্স জারি করেন যার ফলে কৃষি গবেষণা এবং কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয় এবং কৃষি গবেষণার উন্নয়ন ও সমনি¦ত কার্যক্রমের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়। কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন এবং দেশ খাদ্যে স¦য়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নং-৬২ এর মাধ্যমে ‘ডাইরেক্টরেট অব এগ্রিকালচার (রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন)’ এর বিলুপ্তি ঘোষণা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিদ ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকার দানা জাতীয় ফসল, কন্দাল ফসল, ডাল, তেল, মসলা ফসল, সবজি, ফল, ফুল, সামুদ্রিক শৈবালসহ ২০৮টি ফসলের ওপর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠান এসব ফসলের খরা, লবণাক্ততা প্রতিরোধী, স্বল্প দৈর্ঘ্যরে বায়োফর্টিফাইড উচ্চফলনশীল উন্নত জাত এবং উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন, ফসল ব্যবস্থাপনা, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধী জাত ও ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, ফসলের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, এলাকাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, হাইড্রোপনিক পদ্ধতি, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, সমন্বিত খামার পদ্ধতি উন্নয়ন, পাহাড়ি অঞ্চলে ফসল উৎপাদন এবং আর্থসামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে তা সম্প্রসারণকর্মী, কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মী কৃষকের নিকট হস্তান্তরের জন্য নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৫০৯টি জাত ও ৪৮২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এসব জাত ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি তথা গ্রামীণ উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রেখে চলেছে।


যখন সব মানুষের সক্রিয় দৈনন্দিন সুস্বাস্থ্য জীবন যাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার থাকবে তখন তাকে খাদ্য নিরাপত্তা বলে। প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর জমির এ দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থসামাজিক এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সম্ভ^ব। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি সারে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের ফলে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।


দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর ফসলি জমি ০.৭৩% হারে কমে যাচ্ছে (এসআরডিআই ২০১৩)। ফলে চাষের জমি সম্প্রসারণের সুযোগ কম। তাই দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গ্রামীণ উন্নয়নের লাভজনক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার একান্ত প্রয়োজন।


বিভিন্ন ফসলের আধুনিক চাষাবাদের জন্য ফসল, মাটি এবং বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর ২১৩টি উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন। বায়োটেকনোলজির ওপর ১৮টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য ৩৫টি কৃষি যন্ত্র সংক্রান্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর ৩৬টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। চার ফসলভিত্তিক ১২টি লাভজনক শস্য বিন্যাসের উদ্ভাবন। শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তির ওপর ২৮টি প্রযুক্তির উদ্ভাবন। খামার পদ্ধতি গবেষণার আওতায় ১৩০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। প্রতি বছর  ১০ হাজারের অধিক বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান


নিয়মিত ত্রৈমাসিকভিত্তিক একটি আধুনিক জার্নাল, বারি সংবাদ, বারি প্রযুক্তি বইসহ অসংখ্যা বুকলেট, লিফলেট ও বই প্রকাশ। বিভিন্ন ফসলের ১০ হাজারের অধিক জার্মপ্লাজম বারি জার্মপ্লাজম কেন্দ্রে সংরক্ষণ।


প্রতি বছর ১০০০ টন বিভিন্ন ফসলের উন্নত বীজ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয় এবং পরে ঐসব প্রতিষ্ঠান বীজ বর্ধিত করে সারা দেশের কৃষকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।
বিশে^র মধ্যে বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে ৩য় স্থান এবং ফল উৎপাদনে ৮ম স্থান অর্জন করেছে।
সেক্স ফেরোমন এবং আইপিএম প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রবর্তনে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার প্রায় ৫০ হাজার টন থেকে ৩৫০০ টনে নেমে এসেছে।
কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়নে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, কেআইবি পুরস্কারসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। বিজ্ঞান ও কৃষি উন্নয়নে অবদানের জন্য এ প্রতিষ্ঠানের অনেক বিজ্ঞানী স্বাধীনতা পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারসহ বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সংস্থা কর্তৃক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত  প্রযুক্তিগুলো নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।
বিগত চার দশকে গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফলমূল, ফুল, মসলা ইত্যাদি ফসলের বারি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মাঝে প্রবর্তনের ফলে উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বেড়েছে। বারি উদ্ভাবিত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি হচ্ছে-

 

গম
বিএআরআই এ পর্যন্ত গমের ৩২টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির প্রয়োগ, লবণাক্ততা ও তাপ সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের ফলে বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। বারি গম-২৫ থেকে বারি গম-৩২ পর্যন্ত  দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশে এ জাতগুলোর আবাদ বৃদ্ধি করার ব্যাপক সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
 

ভুট্টা
একটি অতি উচ্চফলনশীল ফসল। দেশে পোলট্রি শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে ভুট্টার চাহিদা ক্রমান¦য়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩১ লাখ টন ভুট্টা উৎপন্ন হয়। বিএআরআই এ পর্যন্ত ১৫টি হাইব্রিড জাতসহ মোট ২৪টি ভুট্টা জাত উদ্ভাবন করেছে। খরা অঞ্চলের জন্য ভুট্টার ২টি হাইব্রিড জাত- বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩ ও বেবিকর্নের ১টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।

 

কন্দাল ফসল
কন্দাল ফসলের মধ্যে আলু, মিষ্টি আলু এবং কচু খাদ্য ও সবজির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫.৬৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে কন্দাল ফসলের চাষ করা হয় যার বার্ষিক উৎপাদন ৯৫ লাখ টন। বিএআরআই এ পর্যন্ত মোট ১০৮টি উচ্চফলনশীল কন্দাল ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে আলুর ৮৭টি জাত, মিষ্টিআলুর ১৩টি ও কচুর ৭টি উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি জাত (বারি আলু ৩৫, বারি আলু ৩৬, বারি আলু ৩৭, বারি আলু ৪০ ও বারি আলু ৪১) বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংকরায়নের মাধ্যমে ক্লোনাল হাইব্রিড জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩০-৩৫ টন, যা বর্তমানে প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে ২০-৩০% বেশি। এসব জাতের মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী।

 

ডাল জাতীয় ফসল
ডাল জাতীয় ফসল বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আমিষের প্রধান উৎস ডাল। জমির স¦ল্পতা, ডাল ফসলের কম উৎপাদনশীলতা, উন্নত জাতের অপ্রতুল ব্যবহার এবং উৎপাদন কলাকৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ না করাই ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়। বিএআরআই ৬টি ডাল ফসলের ৩৯টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করছে যার মধ্যে নতুন জাত (বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮,  বারি খেসারি-৩, বারি ছোলা-৯ ও বারি ফিল্ড পি-১) উদ্ভাবিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মসুর, মুগ ও ছোলার জাত চাষ করে ২৫-৩০% ডালের ফলন বাড়ানো সম্ভব।

 

তেল জাতীয় ফসল
তেল জাতীয় ফসল বাংলাদেশের কৃষি পণ্য উৎপাদনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যে পরিমাণ তেল বীজ উৎপাদিত হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বিএআরআই এ পর্যন্ত ৮টি তেলবীজ ফসলের ৪২টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি সরিষা-১৬, বারি তিল-৪ দুটি উচ্চফলনশীল জাত, দেশের লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকাতেও ভালো ফলন দিতে সক্ষম। উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা-১৫ এবং বারি সরিষা-১৭ রোপা আমন-বোরো ধান শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করে সরিষার উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। কৃষকের জমিতে জনপ্রিয় এ জাত তিনটির সন্তোষজনক ফলন লক্ষ করা যাচ্ছে ।

 

সবজি, ফল ও ফুল
সবজি খাদ্যপ্রাণ ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানুষের স¦াস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক সবজির চাহিদা ২২০ গ্রাম অথচ সরবরাহ মাত্র ৬০ গ্রাম। সবজির ঘাটতি পূরণের জন্য বিএআরআই এ পর্যন্ত ২৯টি সবজি ফসলের মোট ১০৪টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে বেগুনের দুটি হাইব্রিড ও গ্রীষ্মকালীন টমেটোর দু’টি হাইব্রিড জাতও রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ করে সারা বছর টমেটোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অমৌসুমে টমেটোর আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে। বারি সরিষা ১৬, বারি হাইব্রিড টমেটো ৭, বারি হাইব্রিড টমেটো ৮ ফল সবজির মতো খাদ্য প্রাণ ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানুষের স¦াস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। মাথাপিছু দৈনিক ৮৫ গ্রাম ফলের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন থেকে আসে মাত্র ৩৫ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ যাবৎ ২৭টি ফল ফসলের ৭৯টি উন্নত জাতসহ ফল উৎপাদনের বেশ কিছু কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে।


আমাদের দেশে ফুলের গবেষণা একটি নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ক্ষেত্রটির সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিএআরআই বিভিন্ন ফুলের ১৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে গত সাড়ে ৪ বছরে ফুলের ১৩টি উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকার ২টি, অ্যালপেনিয়ার ১টি, গাঁদার ১টি, লিলির ১টি, ডালিয়া ও জারবেরার ২টি ও গ্লাডিওলাসের ৩টি জাত উল্লেখযোগ্য।


হাইড্রোপোনিক পদ্ধতি
বাংলাদেশে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ মোকাবিলার জন্য শুধু আবাদি জমির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এক্ষেত্রে চাষ অযোগ্য পতিত জমি, বিল্ডিংয়ের ছাদ বা ঘরের বারান্দায় হাইড্রোপোনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় স্টিলের বা প্লাস্টিকের ট্রেতে পানির মধ্যে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করা হয়। এরই মধ্যে টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস, ফুলকপি, শসা, করলা, শিম, খিরা, স্ট্রবেরি, গাঁদা এবং গোলাপ ইত্যাদি ফসল সাফল্যজনকভাবে এ পদ্ধতিতে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।


মসলা ফসল
মসলা জাতীয় ফসল বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। বিএআরআই তে মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পর পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ, আলুবোখারা ইত্যাদিসহ ১৭ ফসলের ৩৩টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে । যার মধ্যে বারি পেঁয়াজ-২, ৩, ৫  এবং বারি মরিচ-৩ সারা বছর চাষ উপযোগী জাত।

 

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সময় ও শ্রম সাশ্রয় কৃষি কাজ লাভজনক করার জন্য গবেষণার মাধ্যমে ৩৫টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর মধ্যে হাইস্পিড রোটারি টিলার, স্ট্রিú টিলেজ, পাওয়ার টিলার চালিত ইনক্লাইন্ড প্লেট সিডার, পিটিওএস, বেড প্লান্টার, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, শক্তি চালিত ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শক্তি চালিত শস্য মাড়াই যন্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা কৃষকপর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। কৃষিকাজে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সময়ের সাশ্রয় হবে অপরদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

 

ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তি বর্তমান সরকারের সময়ে বিএআরআই ফসল, পানি, সার ও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় দমন, জীব প্রযুক্তি, হাইড্রোপোনিক, আইপিএমসহ ফসল, মৃত্তিকা, পানি, রোগ ও পোকা মাকড় দমন ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ২১৩টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এসব প্রযুক্তি প্রতিকূল পরিবেশে বিশেষ করে, লবণাক্ত, খরা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকা ও চরাঞ্চলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।


রোগবালাই প্রতিরোধী জাত
বালাইনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে পরিবেশবান্ধব আইপিএম পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণার ওপর যথেষ্ঠ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এক্ষেত্রে সবজি ও ফলের বেশ কয়েকটি ফসলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা
(IPM) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে- যা মাঠপর্যায়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। জিএমও ফসলের ওপর গবেষণা, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনে Biotechnology গবেষণার প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেয়া হয়েছে। বিএআরআই কর্নেল ইউনির্ভাসিটির সহযোগিতায় এরই মধ্যে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী Bt Brinjal এর চারটি ট্রান্সজেনিক জাত (বারি বিটি বেগুন-১, ২, ৩ এবং ৪) উদ্ভাবন করেছে। বেগুনের এসব জাত কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাছাড়া Bt Brinjal এর আরও তিনটি জাতসহ আলুর নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধী ৎন মবহব সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক আলুর জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের ফলে আলু চাষে কৃষকদের মধ্যে আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন খরচ কমে গেছে। ফলে দেশে রেকর্ড পরিমাণ আলু প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশে আলু থেকে স্টার্চ ও জাংকফুড তৈরিসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠছে। এ জাতগুলো হচ্ছে- বারি আলু-৪৬, বারি আলু-৫৩ এবং বারি আলু-৬৮। রোগ ও পোকামাকড় সহনশীল জাতগুলো হচ্ছে-বারি মৌরি-১, বারি মৌরি-২, বারি শিম-৮, বারি কামরাঙা শিম-১, বারি ঝিঙা-২, বারি গম-৩০ (মরিচা, ছত্রাক), বারি গম-২৯ (ইউজি ৯৯ প্রতিরোধী), বারি মটর-১, বারি মরিচ-৩, বারি গম-২৭ (ইউজি-৯৯ প্রতিরোধী), বারি হাইব্রিড বেগুন-৪ (উইল্ট প্রতিরোধী), বারি বেগুন-১০ (উইল্ট, পড বোরার), বারি সয়াবিন-৬ (মোজাইক ভাইরাস প্রতিরোধী) বারি রসুন-৩, বারি রসুন-৪ ভাইরাস রোগ সহনশীল।


 জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফসল উৎপাদন সমস্যা যথা- লবণাক্ততা, উষ্ণতা, খরা, ভূ-গর্ভস্থ পানির সমস্যা ও বন্যা প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বিএআরআই ফসলের প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে তাপ সহিষ্ণুজাতগুলো হচ্ছেÑ বারি গম-২৬ বারি গম-২৮, বারি গম-২৯, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১, বারি গম-৩২, বারি বার্লি-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩, বারি চীনাবাদাম-৮, বারি চীনাবাদাম-১০, বারি আলু-৭৩, বারি হাইব্রিড টমেটো-৮, বারি বেগুন-১০। খরাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী এবং ভালো ফলন দিতে সক্ষম জাতও উদদ্ভাবন করা হয়েছে। লবণাক্ত এলাকার চাষের উপযোগী স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়েছে এবং দক্ষিণ অঞ্চলে লবণাক্ত এলাকায় কৃষক পর্যায়ে ভালো ফলন দিচ্ছে এবং জনপ্রিয়ও হচ্ছে। প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী এ জাতগুলো হলো- বারি গম-২৫, বারি বার্লি-৭, বারি সরিষা-১৬, বারি তিল-৪, বারি আলু-৭২, বারি মুগ-৬, বারি ছোলা-৯। এসব জাত জলবায়ুূ পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।


বায়োফর্টিফাইড জাত
পুষ্টিমান খাদ্য এককভাবে ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে পারে না। শক্তি, প্রোটিন এবং গৌণ পুষ্টি উপাদানগুলো খাদ্য-নিরাপত্তায় বিশেষভাবে প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বর্তমানে দৈনন্দিন খাদ্য অভ্যাসে বহুমুখীকরণের জন্য অপ্রচলিত ফসলের প্রচলন, ব্রিডিং প্রক্রিয়ায় বায়োফর্টিফাইড জাত (আয়রন, জিংক এবং ভিটামিন-এ) উদ্ভাবন এবং খাদ্য নিরাপদ রাখার জন্য উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের গরিব মানুষের পুষ্টিহীনতা অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব হবে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত ক্যারোটিন সমৃদ্ধ বারি মিষ্টিআলু-১০, বারি মিষ্টিআলু-১১, বারি মিষ্টিআলু-১২, জিংক, আয়রন ও সেলিনিয়াম সমৃদ্ধ বারি মসুর-৫, বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮, জিংক সমৃদ্ধ বারি গম-৩৩।


ফসল বিন্যাস এর ওপর গবেষণা কার্যক্রম চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন হওয়ায় এটা সম্ভব হচ্ছে।


সামুদ্রিক শৈবাল (Seaweed) গবেষণা  
সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণাও উন্নয়ন জোরদারকরণের মাধ্যমে দেশের ব্লু ইকোনমিতে অবদান রাখার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিএআরআই, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ এর মাধ্যমে সামুদ্রিক শৈবালের উপর গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ কক্সবাজারে শুরু করেছে। মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও ডেইরি, ঔষধ, টেক্সটাইল, জমিতে সার, প্রাণিখাদ্য, লবণ ও কাগজ শিল্পে সামুদ্রিক শৈবাল অ্যাগার কিংবা জেল জাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।


টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ চার দশক ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে ফসলের নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে চলেছে। শুধু প্রযুক্তির উদ্ভাবন হলেই হবে না এগুলো দ্রুত কৃষকদের কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কৃষি গবেষণার সহিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও অন্যান্য দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সম্পর্ক জোরদারকরণ করতে হবে। কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন, টেকসই উন্নয়ন  লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন কর্মসূচি ইত্যাদিতে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কৃষি গবেষণাকে আরও শক্তিশালী ও জোরদারকরণ এবং বিজ্ঞানীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি গবেষণা উদ্ভাবিত জাত ও লাগসই প্রযুক্তিগুলো সরকারি, বেসরকারি এনজিও ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে হস্তান্তর করা গেলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন করা সম্ভব।

 

ড. মো. আককাছ আলী*

* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে সুগারক্রপ (কার্তিক ১৪২৪)

কৃষি প্রধান দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এক কথায় আমরা বলি সোনার বাংলা। সত্য সত্যই এ বাংলা সোনা ফলানো বাংলা। ফসলের সমারোহে পীতে-হরিতে, সবুজে-শ্যামলে এ দেশ ভরপুর। অন্ন সমস্যা যে দেশে প্রকট, সে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে অচিরেই। আজকের দিনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের যা আশু এবং অবশ্যম্ভাবী করণীয় তা হলো কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত ফলনকে সুনিশ্চিত করা। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জিডিপির প্রায় ১৫.৩৩ শতাংশ (বিবিএস, ২০১৫)  অর্জিত হয় কৃষি খাত থেকে। কৃষি খাতে চলমান প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩৫ (বিবিএস ২০১৬)। দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান আসে কৃষি খাত থেকে। এ ছাড়াও প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন নতুন মুখের জন্য ৩ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্যের জোগান দিতে হয় এ খাতকে।


কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে জনগণ তাদের আয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে থাকে। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো সব সময়ে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয়হীনতার অভাবে ক্রমে প্রকট হয়ে উঠছে খাদ্য সংকট। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমি কমার কারণে গত ১০ বছরে জমির পরিমাণ ও উৎপাদন ২০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কৃষি খাতকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ১৫.১৮ মিলিয়ন (বিবিএস, কৃষি শুমারি ২০০৮) কৃষি পরিবারের (যাদের মধ্যে ৮৪.৩৮ শতাংশ পরিবারে জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ হেক্টর) জীবিকা অর্জনে কখনও কখনও অসম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য বিপুলসংখ্যক গরিব ও ভূমিহীন পরিবারের কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি কাজে জমির ওপর ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার চাপ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যাধিক্য, মাটির স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি, সেচ পানির অপ্রতুলতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, দানাদার ফসল উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব প্রদান, মানসম্মত বীজের অপ্রতুলতা, কৃষকের চলতি মূলধনের অভাব, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ধীরগতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং অন্যান্য সমস্যা কৃষি খাতে সাফল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়াও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন- কৃষি জমির শিল্প দূষণ, কৃষি জমি অকৃষিতে রূপান্তর, পাহাড়ধস ইত্যাদি কারণে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে এবং অভিবাসন হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ বলেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০০৭ সালে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের জনসাধারণ বিশেষ করে চরাঞ্চল, নদী, পাহাড়, বরেন্দ্র, হাওর ও সমুদ্র উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন-বন্যা, খরা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, পাহাড়ধস ইত্যাদি কারণে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়। বর্তমানে জনসংখ্যার ৪০% দরিদ্র। এর মধ্যে ২০% অতিদরিদ্র। চরাঞ্চলে ৮৮% দরিদ্র এবং ৪৪% অতিদরিদ্র এবং ৫% জনগোষ্ঠীর অরক্ষিত বসতি রয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার সাথে সাথে অভিবাসন হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।


সুগারক্রপ চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ
খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে সুগারক্রপের গুরুত্ব এদেশে অপরিসীম। ইক্ষুর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ দেশের চিনি ও গুড় শিল্প, যা উত্তরাঞ্চলের একমাত্র ভারী শিল্প। তাই উত্তরাঞ্চলের তথা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইক্ষুর অবদান সবচেয়ে বেশি। চিনিকল এলাকায় প্রায় ৬ লাখ চাষি পরিবার সরাসরি ইক্ষু চাষের ওপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া চিনিকল বহির্ভূত গুড় উৎপাদন এলাকায় এবং চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু উৎপাদনের জন্য সারা দেশে প্রায় ২০ লাখ চাষি পরিবার ইক্ষু ফসলের ওপর নির্ভরশীল। চিনিকলগুলো প্রতি বছর ইক্ষু চাষিদের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে, ২৫০-৩০০ কোটি টাকার ইক্ষু ক্রয় করে এবং নিজ নিজ এলাকার সড়ক, জনপথ, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুতায়ন, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি গড়ে ওঠায় চিনিকলগুলোই গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হচ্ছে চিনি শিল্পে। এ ছাড়া ৬০ মিলিয়ন কৃষি পরিবার, ব্যবসায়ী, শ্রমিক চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু এবং গুড় উৎপাদনের সাথে জড়িত। তা ছাড়া ইক্ষু রোপণ, আন্তঃপরিচর্যা, কর্তন, মাড়াই, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে কর্মসংস্থান হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের।


মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য মানবদেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান। বিশেষ করে মেধাশক্তি বিকাশে এর বিকল্প নেই। আমাদের দেশে সাধারণত  চিনি ও গুড় মিষ্টিজাতীয় খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী জনপ্রতি বার্ষিক ১৩ কেজি চিনি/গুড় খাওয়া প্রয়োজন। সেই হিসাবে দেশে ২০২১ সালে প্রাক্কলিত ১৭.২০ কোটি জনসংখ্যার জন্য দরকার হবে ২৩ লাখ  টন চিনি ও গুড়। বর্তমানে প্রতি বছর ১.৮০ লাখ হেক্টর জমিতে ইক্ষু আবাদের মাধ্যমে দেশে ১৫টি চিনিকলে ২.১০ লাখ টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে প্রায় ১.০০-১.৫০ লাখ  টন চিনি এবং ৬.০০ লাখ  টন গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। এতে করে চিনি/গুড়ের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭.৫০ লাখ টন। ফলে চিনি/গুড়ের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪.৮৬ লাখ টন। এ চাহিদা পূরণ করতে সরকারকে প্রতি বছর ১৪-১৬ লাখ টন চিনি বিদেশ থেকে  আমদানি করতে হয়। বর্তমানে ইক্ষু চাষাযোগ্য জমির পাশাপাশি পতিত জমির সদ্ব্যবহার, উপকূলীয় এলাকার ২০ লাখ হেক্টর জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, চরাঞ্চলের ২ লাখ হেক্টর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অব্যবহৃত জমির একটা অংশ গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যে চাষের আওতায় নিয়ে এসে ঘাটতি পূরণের এ কাজটি সফলভাবে করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইক্ষুর পাশাপাশি ট্রপিক্যাল সুগারবিট, খেজুর, তাল, গোলপাতা, স্টেভিয়া প্রভৃতি অপ্রচলিত মিষ্টি উৎপাদনকারী ফসল থেকেও চিনি, গুড়, সিরাপ, জুস উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।


এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে বছরে প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া কৃষককে আর্থসামাজিক অবস্থা ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে দেশে খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণের জন্য শুধু ইক্ষুর একক আবাদ যুক্তিযুক্ত নয়। আবাদযোগ্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত ফসল বিন্যাসের সাথে ইক্ষু ও সাথী ফসলের আবাদ সমন্বয় করা প্রয়োজন। চাষযোগ্য পতিত ৩.২৩ লাখ হেক্টর জমিসহ পাহাড়ি এলাকা, সমুদ্র উপকূলবর্তী ২০ লাখ হেক্টর, বরেন্দ্র এলাকার প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর এবং চর এলাকার প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুগারক্রপ চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে হাইওয়ে রয়েছে প্রায় ২.৫ হাজার মাইল, গ্রাম্য কাঁচারাস্তা রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মাইল, ইট বিছানো রাস্তা প্রায় ১.৫ হাজার মাইল, নিয়মিত বাঁধ ও বেড়িবাঁধ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাইল, মিটার গেজ রেলপথ আছে প্রায় ১.২ হাজার মাইল ও ব্রড গেজ রেলপথ রয়েছে ৬ শত মাইল। অর্থাৎ মোট রাস্তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার মাইল। দুই ধার হিসাবে ২ লাখ ১২ হাজার মাইল। ২০ ফুট পরপর একটি করে তাল বা খেজুর গাছ এসব পতিত জমির এক-চতুর্থাংশে লাগানো হলেও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ গাছ লাগানো সম্ভব। তাছাড়াও জমির আইল, পুকুর/খালের পাড়, দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় কয়েক কোটি খেজুর, তাল ও গোলপাতা গাছ লাগানো সম্ভব। প্রতি বছর যদি এক কোটি গাছ থেকে গুড় উৎপাদন করা হয় (গড়ে ১০ কেজি হিসাবে) তবে ১ লাখ টন গুড় উৎপাদন করা সম্ভব যার বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৮০ টাকা হিসাবে ৮ কোটি টাকা, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


বসতবাড়ির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রত্যেক বাড়ির আনাচে-কানাচে চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু ও স্টেভিয়া চাষ, পরিবারপ্রতি একটি করে তাল ও একটি করে খেজুর গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রায় কয়েক কোটি গাছ লাগানো সম্ভব, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষকদের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা পূরণ করবে এবং অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ১৮,৪৯,০০০ একর বসতবাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ১,৭৮,০০০ একর শহর এলাকায় এবং ১৬,৭১,০০০ একর গ্রাম এলাকায় (Statistical Pocket Book, Bangladesh, 2006) । বন্যা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিকভাবে পানি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে ইক্ষুর রস ব্যবহার করার লক্ষ্যে বাড়ির আঙিনায় চিবিয়ে খাওয়া আখের কয়েকটি ঝাড় লাগিয়ে উৎপাদিত আখ বছরব্যাপী ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।


গ্রামীণ উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উপযোগী আখ, তাল, খেজুর ও গোলপাতার স্বাস্থ্যসম্মত দানাদার/পাটালি গুড়, সিরাপ, জুস, তালমিশ্রি ইত্যাদি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে সমবায় সমিতি প্রবর্তনের মাধ্যমে চাষিদের অবস্থার উন্নতি সাধন করে আমরা সুফল পেতে পারি। বাংলাদেশে বহু পতিত জমি, খাল-বিল, ডোবা, পাহাড়, চরাঞ্চল, বরেন্দ্র, সমুদ্র উপকূলীয় অধিকাংশ এলাকা এখনো অনাবাদি। এগুলো চাষোপযোগী করলে আমরা অধিক পরিমাণে খাদ্য ফলাতে পারি। তাছাড়া বন্যাক্রান্ত অধিকাংশ এলাকার ফসল বিনষ্ট হওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ইক্ষু একমাত্র ফসল, যা বন্যাকালীনও জমিতে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নষ্ট হয় না। বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তাল ও খেজুর গাছ রোপণ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমন ধান রোপণের পর আশ্বিন-কার্তিক মাসে মানুষের হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকায় অলস বসে থাকে এবং অভিবাসনের হার বৃদ্ধি পায়। ওই সময় হচ্ছে ইক্ষুর রোপণ ও কাটার সময়। ইক্ষু রোপণের জন্য বীজ খ- তৈরি, শোধন, নালা তৈরি, জমি তৈরি, রোপণ, আন্তঃপরিচর্যা এবং কর্তনকৃত আখ থেকে গুড় মাড়াই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর  আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-


খাল কেটে পানি সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন, পোকামাকড় ধ্বংস, প্লাবন ও লোনাপানির হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে পারলে খাদ্য ঘাটতি বহুল পরিমাণে হ্রাস করা সম্ভব।
কৃষক সংগঠন/উৎপাদক দল গড়ে তোলা এবং তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য যথাযথ সহায়তা প্রদান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ।
কৃষিঋণ কার্যক্রম সহজীকরণ এবং প্রকৃত কৃষক যেন ঋণ পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করা।
উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
কৃষকগণ যেন ফসল  উৎপাদন লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা।
সময়মতো কমমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
গবেষণা-সম্প্রসারণ-কৃষক-বাজার সংযোগ শক্তিশালী করা।
গুদামজাতকরণ সুবিধা বৃদ্ধি করা।
কৃষি পণ্যের বাণিজ্যিক চাষাবাদে উৎসাহ প্রদান।
শস্য বীমা চালুকরণ।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা।
উৎপাদনমুখী বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষণ, প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ইত্যাদি।

 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতের উন্নত জাতিগুলো কৃষি কার্যেও উন্নত ছিল। প্রাচীন মিসরবাসী পালাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন শস্যের চাষ জানত। উষ্ণ মরুভূমি, হাজার বছরের পতিত জমি যেসব জায়গায় ফসল ফলানোর কথা কল্পনাও করা যেত না এক সময়, সেখানে আজ অতি প্রয়োজনীয় সব ফসল ফলছে। পরিবার পরিকল্পনা, অধিক খাদ্য ফলাও, একটি বাড়ি একটি খামার ইত্যাদি অভিযান সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে পারলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ সম্ভব। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে আবাদযোগ্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত ফসল বিন্যাসের সাথে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল ফসলের আবাদ সমন্বয় করা তাই সময়ের দাবি।

 

কৃষিবিদ ড. মো. আমজাদ হোসেন* কৃষিবিদ ড. মো. নূর আলম মিয়া**
*মহাপরিচালক **বিভাগীয় প্রধান, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা

 

বিস্তারিত
অভিবাসন ব্যবস্থাপনা : গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

বছর ঘুরে আবারও এলো ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস প্রতি বছরের মতো নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে হাজির। এবারের প্রতিপাদ্য ‘অভিবাসনের ভবিষ্যৎ বদলে দাও, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াও’। Change the Future Migration Invest in Food Security and Rural Development| এবারের প্রতিপাদ্যে তিনটি অংশ স্পষ্ট। অভিবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা আর গ্রামীণ উন্নয়ন। এ তিন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হবে এবারের প্রতিপাদ্যের মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে আমরা সুনির্ধারণ করতে পারব আমাদের করণীয়।


মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে অভিবাসনের যাত্রা। অভিবাসন কোনো সুনির্দিষ্ট একক কারণে নয় বহুবিদ কারণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, সুখ, শান্তি, দুর্ভিক্ষ, পরিবর্তিত জলবায়ু এসব মূলত দায়ী। সে কারণেই অভিবাসন রোধ ও ব্যবস্থাপনা বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, গবেষকরা বের করেছেন অভিবাসন শুধু দেশে থেকে দেশান্তরই নয় বরং দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসন হার অনেক বেশি। পৃথিবীটাই একটা বিরাট গ্রাম। গ্রামীণ উন্নয়ন সুনিশ্চিত হলে গ্রামের শত কোটি মানুষ যেমন সুখে থাকবে তেমনি পরিকল্পিতভাবে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। তবেই আমরা আয়েশি জীবন যাপনে অনেকটুকু এগিয়ে যেতে পারব। পারব শুভ সুন্দর আগামীর পথে পথ চলতে। তখন অনাকাক্সিক্ষত অভিবাসন রোধ হবে।
 

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ গ্রামীণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত এবং তারা তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ তিতীক্ষা দিয়েও নিজ বাসভূমি আঁকড়িয়ে থাকতে চান অনাদিকালের চেনা পথ ধরে। ছোটখাটো দুর্যোগ দুর্বিপাকে তারা নিজেরা নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে নিজেদের খাপ-খাওয়ানোর কৌশল অর্জন করে স্থিত থেকে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে অহর্নিশ। কিন্তু কখনও কখনও এ চিরায়ত অবস্থান অসহনীয় হয়ে যায়। তখনই তারা দেশান্তরিত হয়, কিংবা স্থানান্তরিত হয়, রূপান্তরিত হয়। ২০১৫ সালে ২৪৪ মিলিয়ন মানুষ আন্তর্জাতিক অভিবাসী হয়েছে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী শুধু দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসনের সংখ্যা ৭৬৩ মিলিয়ন যা আন্তর্জাতিক অভিবাসনের চেয়ে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের গড় বয়স ১৫ থেকে ৩৪ এর মধ্যে। তার ভেতরেও আবার প্রায় অর্ধেক নারী। অভিবাসন চিত্রে গ্রাম থেকে শহরে আসার সংখ্যাই বেশি এবং তাহলো ৭৫ শতাংশ। দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব, অভাব, অনটন, সম্পদের অভাব, জীবন যাত্রার মান কাক্সিক্ষত না হওয়ার কারণেই অভিবাসন বেশি ঘটে। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবর্তিত জলবায়ু এবং আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট দুর্যোগই প্রধান। পরিসংখ্যান বলে আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তুর মধ্যে অন্তত ৪ ভাগের ১ ভাগ তিনটি দেশে সীমাবদ্ধ। আর এ তিনটি দেশ হলো তুরস্ক, পাকিস্তান এবং লেবানন।


অভিবাসন শুধু দেশ থেকে দেশ নয়। দেশের ভেতরেও হতে পারে। ১৯৭৪ সালের পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের কোনো শহরের জনসংখ্যা ১ মিলিয়ন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে রাজধানী ঢাকা ১০ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি মহানগরীতে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের নগর জনসংখ্যার অবস্থান পর্যালোচনা করলে  দেখা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার আয়তন বহুলাংশে বেড়েছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে এ নগরগুলো দেশের মোট শহরবাসীর এক-তৃতীয়াংশ ধারণ করত। ১৯৯১ সালে এ হার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মাত্র ৭.৬ শতাংশ লোক শহরে বাস করত, ১৯৯০-এর দশকে এ হার ২০ শতাংশে উন্নীত হয়। ১৯৭৫-১৯৯০ সালে বাংলাদেশে শহরের জনসংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪ শতাংশ যা প্রতিবেশী অনেক রাষ্ট্র এবং এশিয়ার জনবহুল রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।


গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন প্রায়শ দ্বিমুখী পরিণতির জন্ম দেয়। একটি সুবিধাজনক এবং অন্যটি ক্ষতিকর। এছাড়া মিশ্র ফলও লক্ষ্য করা যায়। তবে কর্মসংস্থান এবং অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে অভিবাসনের ইতিবাচক প্রভাবই বেশি। সাময়িক অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ তাদের গ্রামের স্বজনদের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ঢাকা শহরের বস্তি এলাকায় বসবাসরত অভিবাসীরা তাদের উপার্জনের বেশির ভাগই ব্যয় করে পরিবারের খাবার এবং সন্তানের শিক্ষার জন্য। অভিবাসনের মাধ্যমে মানুষ ভাগ্যান্বেষণে স্বল্প সম্ভাবনাময় স্থান থেকে বেশি সম্ভাবনাময় স্থানে যেতে চায়। বিদেশে বাংলাদেশের অস্থায়ী অভিবাসীদের উপার্জিত অর্থ দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ায় এবং বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পূরণ করে। বাংলাদেশ বিশ্বের সে স্বল্পসংখ্যক দেশের একটি যেখানে অস্থায়ী অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ জিডিপির একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। প্রবাসীদের পাঠানো এ অর্থ দেশে তাদের পরিবারের সদস্যদের আয়ের একটি উৎস, যা শুধু মধ্যবিত্ত বা বিত্তবান পরিবারেরই অর্থনৈতিক ভিত্তি দৃঢ় করে তা নয়, অনেক দরিদ্র পরিবারকেও তাদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা  মোকাবিলায় সাহায্য করে  দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।


অভিবাসনের ক্ষতিকর দিকের মধ্যে বড় বড় শহরে গ্রাম থেকে ক্রমাগত অভিবাসনের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার পরিবর্তে তা বিঘিœত হয় এবং সামগ্রিকভাবে শহরের অবকাঠামোগত অবস্থা ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নগরের জনসংখ্যার দ্রুত ও ব্যাপক বৃদ্ধি উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করে। নগরে জনসংখ্যা বাড়ার ৬০ শতাংশ ঘটে পুনঃবিভাজন সহকারে গ্রাম  থেকে শহরে স্থানান্তরের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রধান শহরগুলোর সীমিত শিল্পায়ন অথচ বাণিজ্যের দ্রুত প্রসারভিত্তিক একটি বিশেষ ধরনের বিন্যাস কাঠামোয় জনসংখ্যার গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর ঘটে। সড়ক অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং উৎপাদন, ব্যবসা,  হোটেল,  রেস্তোরাঁ, গৃহায়নসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণের বিকাশ শহরগুলোতে অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তাই জীবিকার প্রয়োজনে এবং সম্ভাবনাময় চাকরির জন্য গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অসম ভূমি ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভূমিহীন জনসংখ্যার এ স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। এ ছাড়া গ্রামের অনেক ভূমি মালিকও বিভিন্ন উৎস থেকে উপার্জন বাড়ানোর প্রত্যাশায় গ্রাম থেকে শহরে যায়।


গ্রাম থেকে শহরে আসা পুরুষ অভিবাসীদের বেশির ভাগই কৃষিশ্রমিক। এছাড়া কৃষিপ্রধান এলাকা থেকেই মূলত স্থানান্তর ঘটে। পরিবারের অস্তিত্ব¡ রক্ষার্থে এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন উপায়ে উপার্জনের মাধ্যমে পারিবারিক আয় বাড়ানোর জন্য এ অভিবাসন ঘটে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পোশাক শিল্প কারখানা বিকাশের সাথে সাথে মেয়েদের শহরে অভিবাসন বেড়ে যায়। সত্তরের দশকে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব মানুষের গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার পাশাপাশি অভিবাসীদের বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, পরিবারে তার দায়িত্ব¡ ও ভূমিকা এবং পারিবারিক সম্পদের উৎস বিশেষত জমিজমা থেকে আয় এসব অভিবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। সামাজিক সংযোগ এবং গন্তব্যস্থলের সুবিধা ও সেখানে সম্ভাব্য সহায়তা অভিবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচ্য। একইভাবে গ্রামীণ খামার কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং শহরাঞ্চলের ওপর বেশি গুরুত্ব¡ারোপই প্রমাণ করে জনসংখ্যার ঘনত্বই বাংলাদেশের অভিবাসনের ধারা নির্ধারণ করে না, বরং অভিবাসীর কাজ ও কাজের বৈচিত্র্যের সুযোগ, মাথাপিছু আয়, ক্ষয়িষ্ণু উপার্জন ব্যবস্থার ঝুঁকি, প্রাকৃতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্তর এবং কৃষিক্ষেত্রে আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ নিয়ামকের দ্বারাও অভিবাসন প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়। শহরাঞ্চলে মৌলিক সামাজিক সুবিধা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দরিদ্র শহরবাসী, মহিলারা স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকির দিক থেকে বিত্তবানদের তুলনায় বেশি ভুক্তভোগী। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনকারী দরিদ্র গৃহস্থরাও উচ্ছেদ, অত্যাচার, ক্রমাগত অসুস্থতা, যৌন হয়রানি এসব কঠিন হুমকির সম্মুখীন হয়। যদিও শহরের দরিদ্র ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাসরত অভিবাসীরা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো নাগরিক সুবিধাগুলো বিধিবহির্ভূত উপায়ে ভোগের ব্যবস্থা করে।


খাদ্য নিরাপত্তা মানে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ এবং বছরব্যাপী খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা। খাদ্য নিরাপত্তা দুই রকমেরÑপারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি পরিবারের পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, যাতে পরিবারের প্রতিটি লোক স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিসম্মত খাদ্য খেতে পারে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা দেশের জনগণের জন্য যথেষ্ট খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্যরে ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রথমত, পরিবার ও গোটা জাতির প্রয়োজনীয় মোট খাদ্যের প্রাপ্যতা। দ্বিতীয়ত, স্থান কালভেদে খাদ্য সরবরাহের যুক্তিসঙ্গত স্থায়িত্ব। তৃতীয় নির্বিঘœ ও মানসম্মত পরিমাণ খাদ্যে প্রত্যেক পরিবারের ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবাধ অধিকারের নিশ্চয়তা।


নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকে অবশ্যই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা বিষাক্ত, অপুষ্টিকর খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও কোনো কাজে আসবে না, স্বাস্থ্য শরীর মন ঠিক থাকবে না। সুতরাং নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা বলয় সুনিশ্চিত করতে হবে। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে জীবন-জীবিকার মান উন্নত হবে, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, পরিবেশের অবক্ষয় কমবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রহণের ওপর সংঘাত কমবে। গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, কাক্সিক্ষত স্থায়িত্বশীলতা পাবে। বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়াই বাস করছেন (এফএও ২০০৩)। মানুষের জীবনের চলার অনুষঙ্গ মানুষের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, ওষুধ ও সেবা। মানুষ যখন মোটামুটি পরিসরে এগুলো নিশ্চিত পায় তখন সে নিজেকে স্বর্গসুখী মনে করেন। ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে মানুষ (বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অভিবাসনের দিকে এগোচ্ছে)। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিবাসনকে রোধ করা সম্ভম্ভব। প্রাকৃতিক, মানবসৃষ্ট, পারিপার্শ্বিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক এসবের সাথে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচ্য অভিবাসন বিশ্বের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ যাদের নিজের সম্পদ সীমিত তাদের ওপর এ চাপ ভয়াবহ। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়। এ দেশে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪ ভাগের ৩ ভাগই গ্রামে বাস করেন এবং কৃষি তাদের জীবিকার প্রথম ও প্রধান অবলম্বন। সুতরাং গ্রামের কর্মক্ষম জনগণকে বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক যুবকদের এমন একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে তারা তাদের নিজ এলাকায় থাকতে নিরাপদ/স্বস্তি বোধ করে ও পরিবেশবান্ধব জীবন-জীবিকা উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে পারে।


গ্রামীণ উন্নয়ন মানে এমন একটা অবস্থা যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে আয়েশে জীবন ধারণ করতে পারেন। প্রাপ্তির ষোলোকলা পূর্ণ না-ই বা হলো কিন্তু নিজ অতিচেনা পরিসরে জীবন-ধারণ করতে পারে স্বস্তির সাথে। তবে গ্রামীণ উন্নয়নে খাদ্য, পরিবেশ, বস্ত্র, চিকিৎসা, পুষ্টি, যোগাযোগ এগুলোতে যে মাত্রাই হোক না কেন তা আবশ্যকীয়ভাবে জায়গা করে নেবেই। গ্রামীণ উন্নয়নে ছোটখাটো ব্যবসা, শিল্প, ব্যঞ্জরিত কাজের সুযোগ, কর্মসংস্থান এগুলো উল্লেখযোগ্য। আবার মাছ চাষ, গবাদি খামার, পোলট্রি খামার, আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রম, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বসতবাড়িতে চাষবাস, সমন্বিত খামার, মাশরুম চাষ, কুটির শিল্প, ভাসমান কৃষি কার্যক্রম, সর্জান পদ্ধতি, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসা আরও ছোটখাটো স্বল্পপুঁজির ব্যঞ্জরিত কার্যক্রম যা সংশ্লিষ্ট করে ও চাকরির সুযোগ তৈরি করবে। এতে করে অনাকাক্সিক্ষত অভিবাসন প্রবণতা অনেকখানি কমবে। গ্রামের আসল উন্নয়নের জন্য কাক্সিক্ষত মাত্রায় পরিকল্পিত বিনিয়োগ খুব ভালো ফল দেয়। সে পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাবো আমাদের কাক্সিক্ষত আলোকিত বিজয়ী মঞ্চে। তবেই গ্রামের ঋণাত্মক অভিবাসন চ্যালেঞ্জকে রুখে দেয়া যাবে। সুখের বিষয় যে বর্তমান সরকার এ বিষয়ে সচেষ্ট থেকে নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশ রোলমডেল হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইতোমধ্যে। এ কথা তো ঠিক আমাদের গ্রামগুলো যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশলের মাধ্যমে বসবাসবান্ধব করা যায় তাহলে এ অভিবাসন অনেক কমে যাবে কিংবা বন্ধ হবে। অভিবাসন প্রক্রিয়া ঠেকানো যেমন সহজ না, আবার বন্ধ করা অসাধ্যও না। এজন্য জরুরি দরকার বাস্তবতার নিরিখে গ্রামভিত্তিক সুষ্ঠু যৌক্তিক পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। তবেই আমাদের কাক্সিক্ষত গ্রামীণ উন্নয়ন বাস্তবায়ন হবে এবং তখন অভিবাসন এমনিতেই কমে যাবে, থেমে যাবে মানুষের আগমন বহির্গমনের অযৌক্তিক প্রবাহ। গ্রাম হবে উন্নয়নের রোলমডেল।


গ্রামীণ কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে আরও সুদৃঢ়করণের মাধ্যমে অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে পরিবর্তিত জলবায়ু সহনশীল পরিবেশবান্ধব লাগসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসলের নিত্যনতুন জাত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিস্তৃতকরণ, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশসম্মত চাষাবাদ এসবের পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন, প্রাণিজ আমিষ পূরণের লক্ষ্যে মাছ ও গবাদিপ্রাণী পালন বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। সে লক্ষ্যে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক, সম্প্রসারণবিদসহ সংশ্লিষ্টরা মনোনিবেশ করবেন। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে আমাদের অনেক উন্নয়ন ও উন্নতি হয়েছে। দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আমরা বিদেশে খাদ্য রপ্তানিও করছি। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতাকে টেকসই রূপ দিয়ে সুখী, সমৃদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিপুল জনগোষ্ঠীর অভিবাসন যখন পৃথিবীর জন্য একটি বড় চ্যলেঞ্জ তখন তা মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে এ প্রতিপাদ্য যথাযথ ও সময়োপযোগী।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব প্রকটভাবে লক্ষণীয়। বিভিন্ন কারণেই অগণিত মানুষ তাদের চির পরিচিত বাপদাদার বাস্তুভিটা ত্যাগ করে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লাখ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছেন। এটি সরাসরি সামাজিকভাবে সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় দারিদ্র্য ও সুবিধাবঞ্চিত জনসাধারণের জন্য আর্থিক ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য এ পরিকল্পনায় ক্রম উৎপাদনশীলতা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা বিস্তৃত করার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং নদীভাঙা পরিবারকে সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় খামার এবং কৃষিভিত্তিক আয় বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো অপসারণে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র কৃষকের কৃষি ভর্তুকি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কৃষি উপকরণ কার্ড, কৃষি যান্ত্রিকীরণ ভতুর্কি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মসংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। পুষ্টি, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তাসহ দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নে এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


সবার জন্য নিরাপদ খাদ্যের টেকসই জোগান নিশ্চিত করতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন, সম্প্রসারণ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, উদ্ভিজ ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিজ্ঞানী, গবেষক, সম্প্রসারণবিদ, উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উন্নয়নের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ আর ঝুঁকির মুখে থাকা গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন আর খাদ্য নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা কমানোর প্রয়োজনীয়তায় শহরমুখী হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশের সার্বিক উন্নয়নে অভিবাসনের এ ঢেউ প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো সে সাথে টেকসই পরিকল্পনা। বর্তমান সরকার গ্রামীণ উন্নয়নের বহুমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এছাড়া কৃষি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির তথ্য কৌশল আর প্রযুক্তিতে আনা হচ্ছে আধুনিক ও লাগসই ব্যবস্থাপনা এবং কাক্সিক্ষত নানা ধরনের পরিবর্তন। দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় খামার ও কৃষিভিত্তিক আয় বাড়াতে সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো অপসারণে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। ভর্তুকি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মসংস্থান, সরকারের এসব উদ্যোগ সঠিক বাস্তবায়ন হলে আমাদের সার্বিক সক্ষমতা বাড়বে জ্যামিতিক হারে, গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে রোধ হবে অভিবাসন সমস্যা। সাথে গ্রামীণ উন্নয়ন নিশ্চিত করে সুনিশ্চিত হবে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা। আমাদের বিশ্বাস বিশ্ব খাদ্য দিবসকে সফল করতে প্রতিপাদ্যভিত্তিক আমাদের ব্যঞ্জরিত প্রয়াস খাদ্য দিবসের তাৎপর্যকে অনুধাবন করে দেশীয় আদলে যথাযথ যৌক্তিক বাস্তবায়ন কৌশল গ্রহণ করে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারব এবং পৌঁছতে পারব আমাদের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সমৃদ্ধির আলোকিত সীমানায়। তখনই বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্যভিত্তিক কার্যক্রম সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে, আয়েশে আমরাও হবো সমৃদ্ধ। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অভিবাসনের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়ে কাক্সিক্ষত আবাহনকে আহ্বান জানাব। আর গ্রামীণ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে গ্রামের উন্নয়ন নিশ্চিত করব তার প্রেক্ষিতে খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে আমরা সুখে থাকব, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশে।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
*পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

বিস্তারিত
পাট উৎপাদনে অভিবাসন রোধ ও গ্রামীণ উন্নয়ন

পাট এক ধরনের দ্বিবীজপত্রী আঁশযুক্ত গাছ। এর ছাল থেকে হয় আঁশ আর ভেতরে থাকে কাঠি। প্রাচীনকালে একে বল হতো নালিতা। কেউ কেউ মনে করেন পাটের আদি নিবাস দক্ষিণ চীন ও আফ্রিকায়। ভারতে এর চাষ শুরু হয় বাগানের উদ্ভিদ হিসেবে। প্রথমে এর ব্যবহার হতো সবজি ও ঔষধিগাছ হিসেবে। তবে বস্ত্র হিসেবেও পাটের ব্যবহার অনেক পুরনো। বাংলাদেশের গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে পাট উৎপন্ন হতো প্রায় তিন হাজার বছর আগে। ক্রমে এর উৎপাদন ও ব্যবহার বেড়েছে পাট পরিণত হয়েছে এ দেশের কৃষকের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে। বাঙালির ঐতিহ্যে ও অস্তিত্বে একাকার হয়ে মিশে গেছে সোনালি আঁশ পাট। বাংলাদেশে ৯০ দশকে পাট হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। মাঝে প্রায় ৩০-৪০ বছর পাটের এলাকা কমতে কমতে ৪.০-৪.৫ লাখ হেক্টরে নেমে যায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির সাথে সাথে গত ২০১০-১৫ সাল পর্যন্ত পাট চাষের এলাকা বৃদ্ধি প্রায় ৭-৮ লাখ হেক্টরে পৌঁছে গেছে। শুধু তাই নয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আগের ১২ লাখ হেক্টর এলাকা থেকে যে পরিমাণ পাট পাওয়া যেত এখন ৭.০-৮.০ লাখ হেক্টর জমি থেকেই বা তার চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, তখন ১২ লাখ হেক্টর থেকে প্রায় ৬০-৬৫ লাখ বেল পাট পাওয়া যেত আর সম্প্রতি মাত্র ৭.০-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতেই প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র অধিক পরিমাণে কাঁচা পাট আঁশ রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কমবেশি পাট উৎপাদিত হয়ে থাকে। তবে বেশি পরিমাণে পাট উৎপাদন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, জামালপুর এবং ঢাকা জেলায়। আগে পাটের  একক জমিতে উৎপাদন কম হলেও বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির বিকাশের ফলে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ১৯৬৯-৭০ সালে এ দেশে পাটের গড় ফলন ছিল ১.২৮ টন/হেক্টর, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৬-০৭ সালে  দাঁড়ায় ১.৯৮ টন/হেক্টর, যা বর্তমানে ২.০১ টন/হেক্টর হয়েছে। এ দেশের মাটি ও আবহাওয়া পাট উৎপাদনের জন্য দারুণ উপযুক্ত, কৃষকগণ ও পাট চাষে খুবই অভ্যস্ত এবং বেশি আগ্রহী।


তুলনামূলক বিচারে পাট থেকে বৈদেশিক মুদ্রার আয়  হ্রাস পেলেও বিশ্ববাজারে এখনও বাংলাদেশী পাটের আধিপত্য বিরাজমান। বাংলাদেশী কাঁচাপাট প্রধানত রফতানি করা হয়, ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইউরোপ, আইভরিকোষ্ট, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে। অপরদিকে পাটজাত পণ্য রফতানি হয় ইউরোপ, তুরস্ক, ইরান, আমেরিকা, সিরিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, জাপান, সুদান, ঘানা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রে। আমাদের কাঁচাপাট আমদানির বেলায় পাকিস্তান, চীন ও ভারত এবং পাটজাত দ্রব্য আমদানির বেলায় ইউরোপ ও তুরস্কের স্থান সবার শীর্ষে। তার কারণ পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী এখন নিরুৎসাহিত করছে পরিবেশবাদীরা, পলিথিন ও সিনথেটিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপরদিকে পাট পরিবেশবান্ধব। তাই এর চাহিদা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। এক সময় সিনথেটিকের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে গিয়েছিল পাট। এখন পরিস্থিতি পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। তাই পাটের ক্রমবিকাশমান আন্তর্জাতিক বাজার ধরার জন্য আমাদের খুবই তৎপর হওয়া প্রয়োজন।


দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিভাগের পাট চাষিরা বর্তমানে পাটের উৎপাদন এবং বাজারমূল্যে সন্তুষ্ট। ২০১৬ এর মাঝামাঝি জুন জুলাই মাসের দিকে বিশেষত, রাজশাহীর স্থানীয় হাটবাজারে প্রতি মণ পাট ১৭০০ টাকা থেকে ১৯০০ টাকা বিক্রি হয়েছে, যেখানে গত ২০১৫ সালে পাটের মূল্য ছিল মণপ্রতি ১৪০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা। বর্তমানে পরিবেশ সচেতনতার ফলে বিশ্বব্যাপী আবার পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাটের ব্যবসা সব সময়ই বেশ রমরমা থাকে। বিভিন্ন ধাপে কাঁচাপাট ক্রয় করা হয় ভোক্তার হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রাথমিক ধাপ কৃষকের ঘর বা গ্রাম্য হাট থেকে পাট আঁশ ক্রয় করে নেয় বেপারিরা। এদের থেকে দ্বিতীয় ধাপ ক্রয় করে গুদামের মালিক ও পাট ব্যবসায়ীরা। তৃতীয় ধাপে পাট ক্রয় করা হয় নারায়ণগঞ্জ/খুলনার পাট কলগুলোতে। চতুর্থ ধাপে বা শেষ পর্যায় পাট বা আঁশজাত পণ্যের চালান হয় বিদেশে রফতানি বাজারে। এসব ধাপ অতিক্রমে কিছু বিপণন ও প্রক্রিয়াকরণ খরচ গুণতে হয়। মুনাফারও অংশ দিতে হয় প্রতিটি ধাপে তাতে ভোক্তাপ্রদত্ত দামের একটি বড় অংশের ভাগিদার কৃষক হতে পারে না বলেই পাটের কৃষক মুনাফার খুব কম অংশ পেয়ে থাকেন।


কৃষকপর্যায়ে আভিবাসন রোধ
বর্তমানে পরিবেশ গত কারণে পাটের চাহিদার বৃদ্ধি ও সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। যদিও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক গুরুত্বের বিবেচনায় পাট অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফসল তবুও বিভিন্ন সমস্যা ও বাধা যেমন কৃষি জমির অভাব, মূল্যের জন্য কৃষকের অনীহা, আঁশের বাজারজাতকরণ ও পাট কলগুলো  দৈন্যদশা ইত্যাদি কারণে এ দেশের পাট ফসল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৩% পাট থেকে আসে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান প্রায় শতকরা ৩ ভাগ। প্রতি বছর প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা কৃষক পেয়ে থাকে পাট আঁশ ও পাটখড়ি বিক্রি করে। এ দেশের প্রায় ৪০ লাখ কৃষক পাটের ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকে। এ ছাড়াও কাঁচাপাট ও পাটজাত দ্রব্য বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। পাট ফসল দেশের কর্মসংস্থানে বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করছে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃতভাবে। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০% ভাগ পাট চাষ এবং চাষ পরবর্তী বিভিন্ন প্রক্রিয়া যেমন- প্রক্রিয়াজাতকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, পরিবহন/স্থানান্তর ও বিপণন ইত্যাদির সাথে জড়িত। বিশেষ করে পাটের আঁশ পঁচার পর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানো ইত্যাদি কাজে কৃষক পরিবারের মহিলা সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি দেশের মহিলা কর্মসংস্থানের এক বিরল উদাহরণ। পাটের আঁশ বিক্রির টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে, গ্রামীণ জনপদে সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও পরবর্তী রবিশস্য চাষের আর্থিক সহায়তা  করে থাকে। তাই পাট চাষের সাথে জড়িত কৃষকদের অন্য পেশায় বা অন্য স্থানে পেশার তাগিদে উপার্জনের জন্য স্থানান্তর হতে হয় না। পাট গোলায় থাকলে নগদ টাকা হাতে আছে বলেই তারা মনে করেন। যে কোনো প্রয়োজনে যে কোনো ভাবেই যখন তখন গোলার পাট বিক্রি করে কৃষক তার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারে। তাই কৃষকপর্যায়ে অভিবাসন রোধে পাট ফসল উৎপাদনের কোনো জুড়ি নেই।


পাট উৎপাদনে গ্রামীণ উন্নয়ন
বর্তমানে বাংলাদেশে পাটচাষির সংখ্যা ৪০ লাখ। জিডিপিতে পাট খাতের অবদান ০.২৬ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১.৪ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির ১২.৫ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে পাট উৎপাদনের কাজে। পাট শিল্পে জড়িত আছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ শ্রমিক। এর মধ্যে সরকারি সংস্থা বিজেএমসি শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ এবং বেসরকারি সংস্থা বিজেএসএ ও বিজেএমএ সংস্থা মিলে শতকরা ৬০ ভাগ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করছে। মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ উপার্জন করা হয় পাট রপ্তানি থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর, পাট দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক চতুর্থাংশ আসে কাঁচাপাট রপ্তানি থেকে। দেশের কৃষকদের জন্য নগদ অর্থের সংস্থান করে যাচ্ছে পাট। মহাজনদের বা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ, সন্তানের বিয়ে, বউয়ের শাড়ি, গয়না, শহরে জমি কেনা সবই হয় চাষিদের পাট বিক্রির অর্থ দিয়ে।অসহায় পাটচাষিরা তাদের সংগঠন থেকে স্বল্প সুদে অর্থ নিয়ে সংকট সময় পার করতে পারছে। ফলে তাদের আর মৌসুমের শুরুতে কম দামে পাট বিক্রয় করতে হচ্ছে না। সেই পাট মজুদ করে রেখে পরে বেশি দামে বিক্রি করেতে পারছেন চাষিরা, এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। এভাবে সারা দেশে চাষিদের সংগঠন গড়ে উঠলে ফড়িয়াদের চক্র ভেঙে যাবে। তখন চাষিদের আর পানির দরে পাট বিক্রি করতে হবে না। ফলে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে পাট উৎপাদনে কৃষকের সামর্থ্যরে উন্নয়ন তথা গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে থাকে।


পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য। একটি বাঙালি সংস্কৃতিরই একটি অপরিহার্য অংশ। এ দেশের কৃষকদের নগদ অর্থ উপার্জনে, কর্মসংস্থানে, দারিদ্র্য বিমোচনে, বৈদেশিক অর্থ আহরণে ও সর্বোপরি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তভাবে বিনির্মাণে পাটের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির যে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে তাকে কাজে লাগাতে হবে পুরোপুরি। বিকাশ ঘটাতে হবে পাটভিত্তিক কল-কারখানার। সেজন্য চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী পাটের ক্ষেত্রে সে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে বর্তমান সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত বলেই আমদের ধারণা। বাংলার সোনালি আঁশ অদূর অভিষ্যতে তার হারানো গৌরব ফিরে পাক এ প্রত্যাশা সবার।

 

কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
*সিএসও এবং প্রধান কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বিজেআরআই, ঢাকা। মোবাইল : ০১৫৫২-৪১৬৫৩৭,
mahbub_agronomy@yahoo.com

বিস্তারিত
অভিবাসন রোধে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়ার কার্যকর উদ্যোগ ও অঙ্গীকার প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসের কার্যক্রমগুলো বিশ্বময় ক্ষুধার্থ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও তাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গত বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্যতার মুখে কৃষি এবং খাদ্যকেও পরিবর্তিত হতে হবে’। খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে অভিবাসনের ধারণা বদলে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে এবার (২০১৭) পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগের ধারণা পুরোপুরি বদলে দিতে পারে, বদলে দিতে পারে অভিবাসনের প্রচলিত ধারা। সরকারের সদিচ্ছার সাথে উপযুক্ত বাজেট বরাদ্দ ও জনবলের সংস্থান হলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এখনই বাংলাদেশের জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতেও সক্ষম।

 


 

খাদ্য মানুষের প্রাথমিক এবং মৌলিক মানবাধিকারের উপাদান সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী ৮০৫ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষুধার্থ জীবনযাপন করে; প্রতিদিন ৬০% নারী এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী কমপক্ষে ৫ মিলিয়ন শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে (ইউ/এফএও, বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৬)।


খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ যদিও অনেক দূর এগিয়েছে কিন্তু ক্ষুধাশূন্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিদ্যমান কিছু প্রতিবন্ধকতা আমাদের এখনও অতিক্রম করতে হবে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনও খাদ্য অনিশ্চয়তা এবং ক্ষুধার্থ জীবনযাপন করে যাদের যথাযথ পুষ্টিকর খাদ্য ও বহুমাত্রিক খাদ্য তালিকায় প্রবেশের সুযোগ নেই।  খাদ্য উৎপাদনে বহুদূর এগোনোর পরেও অতি তীব্র অপুষ্টির মাত্রা এখনও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়নি, এখনও প্রতি তিনজনে একজন শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত অপুষ্টিজনিত কারণে (ইউ/এফএও, বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৬)। সর্বোপরি, জলবায়ু এবং আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সর্বাপেক্ষা বড় প্রশ্নটি এখন খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে সামনে অগ্রসর করা এবং সামগ্রিক কৃষি ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক (যেমন-শস্য বহুমুখীকরণ, মূল্য সংযোজিত প্রাণিজাত খাদ্য উৎপাদন ইত্যাদি) উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। ক্ষুধা দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির যোগান নিশ্চিত করা এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন তথা ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি ২ বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের কৃষি খাতের সব থেকে বড় দায়িত্ব। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে কাক্সিক্ষত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রাণিজ আমিষের অগ্রসরমান উপযুক্ত জোগান আমাদের আশাবাদী করছে। এ ক্ষেত্রে পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নির্ভরযোগ্য ভূমিকা ও অবদান রাখতে সক্ষম।


প্রাণিজাত আমিষের দুইটি প্রধান উৎস প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্যসম্পদ খাত। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০১৫-১৬ এর তথ্য ভিত্তিতে নেট প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন (ফ্রেশ ভিত্তিক) প্রাণিসম্পদ খাত (২০১৫-১৬) হতে ৪৬.৫৭ লাখ টন (১ এমএল দুধে এ ০.০৩৩ গ্রাম আমিষ, ১ গ্রাম মাংসে ০.২১১৬ গ্রাম আমিষ এবং ১ গ্রাম ডিমে ০.১২৫ গ্রাম আমিষ অথবা ১টি ডিম ৬০ গ্রাম যাতে ৭.৫ গ্রাম আমিষ হিসেবে) এবং মৎস্য সম্পদ খাত (২০১৫-১৬) হতে ৬.৩৯ লাখ টন (১০০ গ্রাম মাছে এ ১৭ বা ১ গ্রাম মাছে এ ০.১৭ গ্রাম আমিষ)। সুতরাং, বাংলাদেশে বার্ষিক সর্বমোট নেট প্রাণিজ আমিষ সরবরাহের পরিমাণ = ৫২.৯৬ লাখ টন (২০১৫-১৬)।


 

প্রাণিসম্পদ মানব জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মানব সভ্যতা বিকাশের প্রতিটি স্তরে প্রাণিসম্পদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কৃষি কাজ শুরুর পূর্বে পশু শিকারই মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন হলেও সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে পশুকে কর্ষণ, পরিবহন ও খাদ্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে লাগানো হয়েছে। গৃহপালিত পশুপাখি এখন মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণের অবিচ্ছেদ্য খাত। ৭০ এর দশকে পারিবারিক আমিষের চাহিদা পূরণ এবং জমি কর্ষণ ও পরিবহন শক্তিই ছিল পশুপাখি পালনের প্রধান উদ্দেশ্য। ৮০ এর দশক থেকে এ খাতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানুষের দৃশ্যমান আয় বৃদ্ধির ফলে দুধ-ডিম-মাংসের চাহিদা বেড়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে সূচিত হয়েছে উৎপাদনশীল পশুপাখির বাণিজ্যিক পালন পদ্ধতি। ফলে সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাত শিল্প খাতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জের সর্ব ক্ষেত্রে গবাদিপ্রাণীর খামার গড়ে তুলে যুবসমাজ এরই মধ্যে চাকরির বিকল্প কর্মসংস্থান এবং অভিবাসনের বিকল্প খুঁজে পেয়েছে। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ খাতে আমিষ উৎপাদনের ও প্রবৃদ্ধির ধারা পরিচ্ছন্নভাবে ঊর্ধ্বমুখী। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ধারণা, কাক্সিক্ষত প্রকৃত ডাটাবেজ তৈরি সম্পন্ন হলে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এবং জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান যে আরও বহুমাত্রিক, তা পরিষ্কার করা যাবে।


মাংস উৎপাদনে আমরা এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি, ডিম উৎপাদনে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের খুবই কাছাকাছি আর দুধ উৎপাদনেও আমরা অচীরেই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করতে পারব এমনভাবেই সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে।


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক জনগণের প্রয়োজন ও চাহিদা মাফিক কর্মসূচির প্রেক্ষিতে ২০১১-১২ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মধ্যে ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত পাঁচ/ছয় বছরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদন এর প্রতিটি ক্ষেত্র শ্রমঘন শিল্প খাতে রূপান্তর করা ছাড়াও শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের অভিবাসন বিমুখ করেছে বহুলাংশে।


জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অধিক উৎপাদনশীল প্রাণীর শিল্পমুখী ও নিবিড় পালন স্বাভাবিকভাবেই নতুন রোগব্যাধি আবির্ভাবে সহায়ক হয়েছে, ফলে প্রাণিস্বাস্থ্যসহ মানবস্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত তিন দশক থেকেই সার্বিক প্রাণিজাত পণ্য উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান হারে উন্নত হচ্ছে। এতে উৎপাদনের গতিশীলতাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধির নানা ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এর কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। বিদ্যমান ক্রমবর্ধমান উৎপাদনমুখিতা এবং প্রবৃদ্ধির ধারা টেকসই করতে নেতিবাচক দিকগুলোও বিবেচনা করা একান্ত আবশ্যক। জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টিও অপরিহার্যভাবে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত যেসব বিষয়ে আশু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মনে করে তা হলো- ১. প্রাণিবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ২. জবাই উপজাত ব্যবস্থাপনা, ৩. ওষুধের উৎপাদন ও ব্যবহার ব্যবস্থাপনা, ৪. পরস্পর সংক্রমণযোগ্য (জুনেটিক) রোগের দমন ও ব্যবস্থাপনা, ৫. আবির্ভূত ও পুনঃআবির্ভূত রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, ৬. পুষ্টি নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন-ব্যবস্থাপনা এবং ৭. প্রাণিকল্যাণ নৈতিকতা ব্যবস্থাপনা।


প্রাণিসম্পদ সেবার মান উচ্চতর মাত্রা এবং যুগোপযোগী করার অঙ্গীকার, সেবা গ্রহীতাগণের সাথে আরও নিবিড় সমন্বয় সাধন, প্রাণিসম্পদ খাতের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখা, পুষ্টি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য অর্জনে এ খাত প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নিরাপদ প্রাণী ও প্রাণিজাত খাদ্য উৎপাদনের অঙ্গীকার এবং রেগুলেটরি সার্ভিসে রূপান্তরের প্রত্যয় এ খাতের রয়েছে। ক্রমবর্ধমান ডিম, দুধ ও মাংস উৎপাদন বাজার চাহিদার সাথে বহুলাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে এখন কোরবানির পশুর শতভাগ চাহিদা দেশীয় উৎপাদন হতেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগ নিয়ন্ত্রণের ফলে পোলট্রি শিল্প এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থান খাত, যেখানে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ সরাসরি কর্মরত। কৃত্রিম প্রজননের সফলতায় প্রাণিসম্পদ খাত মাইলফলক ছোঁয়ার দ্বারপ্রান্তে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা, ডিজিজ সার্ভিল্যান্স, ট্রান্সবাউন্ডারি প্রাণিরোগ দমন কার্যক্রম জোরদার করার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। ই-প্রাণিসম্পদ সেবা, আইসিটি উন্নয়ন, উদ্ভাবনী কার্যক্রম, প্রাণিসম্পদ সহায়ক মোবাইল অ্যাপ, ২৪ ঘণ্টা সেবা সংক্রান্ত এসএমএস সার্ভিস এবং সফটওয়্যারভিত্তিক রিপোর্টিং চালুর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় অগ্রসরমান। এখন আমরা প্রস্তুত ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ, এপিডেমিওলজি, পোলট্রি ভেলু চেইনে ফুড সেফটি কার্যক্রম এবং প্রডাক্ট ডাইভারসিফিকেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য। প্রাণিবর্জ্য, জবাই উপজাত, ওষুধ উৎপাদন ও ব্যবহার, পরস্পর সংক্রমণযোগ্য (জুনেটিক) রোগ দমন, আবির্ভূত ও পুনরাবির্ভূত রোগ নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে প্রাণিসম্পদ খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা এবং নিরাপদ প্রাণী ও প্রাণিজাত খাদ্য উৎপাদন জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। তার জন্য সার্ভিস রেগুলেশন জোরদারকরণ এবং প্রাণিকল্যাণ নীতিমালা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তঃবিভাগ সমন্বিত কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলেও আমরা মনে করছি। কৃষি ও কৃষকের সেবার মান বৃদ্ধি, স্বল্পতম সময়ে ও স্বল্প খরচে সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অচীরেই আমরা ইলেক্ট্রনিক ভেটেরিনারি সার্ভিস চালু করতে যাচ্ছি। আশা করছি, সরকারের অন্যান্য সংস্থা গ্রামীণ বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তাদের সেবা-খাত সম্প্রসারণ করবে এবং প্রাণিসম্পদ শিল্প গ্রাম পর্যায়ে আরও জনপ্রিয় হবে।


এরই মধ্যে সৃষ্ট খাদ্য পুষ্টি নিরাপত্তা বলয় টেকসই করাসহ প্রবৃদ্ধির চলমান ধারাকে আমরা আরও গতিশীল করতে পারব বলে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস। ফলশ্রুতিতে ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা অগ্রণী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হব। অভিবাসনের ধারণা উল্টোরথে যাত্রা করবে আমরা সে বাস্তবতার অপেক্ষায়।

 

ড. মো. আইনুল হক*  ড. সৈয়দ আলী আহসান**

 *মহাপরিচালক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঢাকা ; **উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, এলআর সংযুক্ত: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঢাকা

 

বিস্তারিত
মাছ চাষে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন

মাছ আমাদের নিত্য আবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইতিহাস সাক্ষী দেয় আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। সময়ের পরিক্রমায় মাছ নিয়ে আমরা মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলাম। সরকারের সুষ্ঠু ও বাস্তবভিত্তিক যৌক্তিক নীতি এবং কর্মসূচির কারণে মাছ উৎপাদনে এখন আমরা গর্বিত পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা আরও এগিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারব। ব্যক্তি পর্যায়ে সামগ্রিক কাজের গুরুত্ব এসে নির্ভর করে খাদ্য চাহিদা গ্রহণের ওপর। আবার রাষ্ট্রীয় পার্যায়েও একইভাবে দেশের জনসমষ্টির খাদ্য জোগান মুখ্য বিষয় হয়ে দেখা দেয়। আর প্রতিটি উন্নয়ন খাতের ওপর যখন খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি মুখ্য হয় তখন আর স্পষ্ট করে বলার অপেক্ষা রাখে না যে সবার আগে আমাদের খাদ্য চাহিদা পূরণই হচ্ছে সব কর্মকাণ্ডের মূলমন্ত্র। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা যখন শঙ্কায় থাকে তখন দেশের আর্থসামাজিক বা অবকাঠামোগত সব উন্নয়নই গৌণ বিষয় হয়ে দেখা দেয়। সুতরাং সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। খাদ্য নিরাপত্তার কথা আসলেই নির্ভরতা বাড়ে কৃষির ওপর। চাহিদানুযায়ী খাদ্যশস্য যেমন খাদ্য নিরাপত্তার পথকে সুগম করে তেমনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মৎস্য খাত কৃষিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। কেননা দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী যেমন এ খাতের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে তেমনি খাদ্যের তালিকায় প্রোটিনের জোগানের বিষয়টিও নিশ্চিত করছে প্রতিনিয়ত। আবার মাছ খাদ্য চাহিদাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে খাদ্যের পরিপূরক সম্পূরক খাবার হিসেবে।


আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ বাস করে কৃষি উৎপাদন নির্ভর গ্রামীণ জনপদে। ব্যবসা বাণিজ্যের মূল উৎস বিবেচনা করা হয় কৃষিকেই। আবার ছোট্ট পরিসরের এ দেশের ১৬ কোটির ওপরে বিশাল জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার পরিকল্পনাও আসে কৃষি থেকে। ২০২১ সাল আমাদের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হবে। গৌরবময় এ অধ্যায়কে সামনে রেখে আমাদের দেশকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য মুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ আত্মনির্ভরশীল দেশ গঠনের প্রত্যয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বর্তমান সরকার। সরকার দেশকে খাদ্যে আত্মনির্ভর, ২.৮ কোটি বেকারের সংখ্যা ২০২১ সালের মধ্যে ১.৫ কোটিতে নামিয়ে আনা, দারিদ্র্যসীমা এবং অতি দরিদ্রতাকে ২৫ ও ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কাজে সহায়তা করতে খাদ্য নিরাপত্তায় মৎস্য সেক্টরের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের ভাবতে হবে আধুনিক পদ্ধতি প্রযুক্তি অনুসরণ করে কম থেকে বেশি উৎপাদনের কথা। মৎস্য খাত মানুষের পুষ্টি চাহিদার ৬৩ শতাংশ পূরণ করছে। আবার মোট রপ্তানি আয়ের ৬ শতাংশ আসছে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে। এসবের পরও আমাদের এ খাতে অবদান তুলনামূলকভাবে কম। মৎস্য খাতের উৎসগুলো  হলো- স্থায়ী ও মৌসুমি পুকুর ২৪১৫ হেক্টর, হাওর ৫৪৮৮  হেক্টর, সড়ক ও রেলপথ পার্শ্ববর্তী বরোপিট ১৪ হাজার হেক্টর, চা বাগানের বরোপিট ১১ হাজার হেক্টর, মাছ চাষযোগ্য ধানি জমি ৬ লাখ হেক্টর, চিংড়ি খামার (উপকূলীয়) ১৪১৩৫৩ হেক্টর, মাছ চাষযোগ্য প্লাবন ভূমি ৭ লাখ হেক্টর এবং সেচ এলাকার জলাভূমি ৭ লাখ হেক্টর। তবে এ উৎসের মধ্যেও অনেক জলাভূমি পরিকল্পনাহীনভাবে ব্যবহার হচ্ছে। দেশের উন্নয়নে জলাভূমির পুরোটাই আনতে হবে পরিকল্পিত আধুনিকতার মধ্যে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০১৫ সালে আমাদের দেশে মোট মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫.৪০ লাখ টন। সেখানে  বর্তমান উৎপাদন মাত্র ২৫ লাখ টনের কাছাকাছি। প্রতি বছর লোক বাড়ছে প্রায় ২৫ লাখ। মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে বিভিন্ন কারণে। দেশের মৎস্য উৎপাদনের সিংহভাগ অবদানই বেসরকারি বা ব্যক্তি পর্যায়ের। দেশের জনসংখ্যার মধ্যে ১.২৫ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মৎস্য খাতের সাথে জড়িত। এর মধ্যে প্রায় ১২.৫ লাখ লোক সার্বক্ষণিক এ খাতে নিয়োজিত থাকেন।


বিশেষজ্ঞরা বলেন, মৎস্য খাত উন্নয়নে যেসব ভাবা দরকার তা হলো ০১. উৎস ও বাস্তবভিত্তিক প্রাকৃতিক কৌশলে বিভিন্ন কার্যক্রম খুঁজে বাস্তবায়ন করা; ০২. সময়ভিত্তিক প্রাকৃতিক উৎসের জন্য চাষ কৌশল উপায় খোঁজা এবং তার যথার্থ ব্যবহার; ০৩. সম্পদ সম্প্রসারণ ও সংরক্ষণের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা; যাতে আইনের বেড়াজালে না আটকিয়ে, প্রয়োজনের উপলব্ধি সৃষ্টি করে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা; ০৪. এলাকাভিত্তিক কিছু পুকুর বা জলাশয়কে একত্র করে খামারভিত্তিক মাছচাষ কার্যক্রম পরিচালনা করা। এতে আন্তঃপ্রজননের বিষয়টিকে মাথায় রেখে পোনা উৎপাদন ও মাছ চাষ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। ০৫. স্কুল, মন্দির, মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয় থেকে মাছ চাষের সামাজিক প্রয়োজন ও চাষ কৌশল অবহিত করা। ০৬. মিষ্টি ও লোনা পানির মাছ এবং  ছোট ইলিশকে (জাটকা) বিশেষত প্রাকৃতিক উপায়ে সংরক্ষণের মাধ্যমে তা উৎপাদনে আনা প্রয়োজন। যেখানে প্রায় ৪৬৫ মিলিয়ন জাটকা ইলিশ ধরা পড়ে। এদের বড় হতে সুযোগ দিলে, দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের যে ১২ শতাংশ অবদান, তাকে আরও বাড়ানো খুবই সহজ হবে; ০৭. মাছ চাষিদের জন্য দরকার তথ্য আদান প্রদানের জন্য সমৃদ্ধ রিসোর্স সেন্টার; ০৮. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও ঝুঁকি প্রতিরোধে সক্ষমতা উপযোগী হিসেবে চাষিদের গড়ে তোলা উচিত। ০৯. মাছ চাষের উপযোগী হিসেবে অর্থের জোগানে ঋণ প্রাপ্তিতে সহজ প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থা করা; ১০. জেলেদের কথা বিবেচনা করে জলমহাল নীতিমালা প্রণয়ন করা। মৎস্য নীতিমালা-২০০৯ কে আরও যুগোপযোগী মাছচাষিবান্ধব করা; ১১. দরিদ্রতা নিরসনে প্রকৃতিক সম্পদ, ভৌত অবকাঠামোগত সম্পদ, অর্থনৈতিক সম্পদ ও মানবসম্পদকে সমন্বয়ক বিবেচনা করে নীতিমালা তৈরি ও যথাযথ প্রয়োগ করা; ১২. মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে ডিজিটাল বাংলায় পুকুরের পাড় হতে সমুদ্রের গহিন জলরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার সাথে আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা। যাতে মাছ চাষের সব কৌশল এবং পদ্ধতিগত তথ্যসহ ঝুঁকি কমানোর কারণ সম্পর্কে জেলে/চাষি সম্যক ধারণা পায়। এতে কর্মসংস্থান, আয় এবং আমিষের জোগান বাড়বে দেশ হবে স্বনির্ভর। আর সার্থক হবে ভিশন-২০২১ অভিযাত্রা।


অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষত আমিষের চাহিদা মেটাতে মৎস্য সম্পদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক কৃষিজীবী এবং গ্রামে বাস করে। মৎস্য চাষ এসব গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক আয় রোজগারের একটি অংশ। প্রতি বাড়ির আনাচে-কানাচে পতিত পুকুরে মাছ চাষ করা যায়। মাছ চাষে যে মনমানসিকতা, সক্ষমতা প্রয়োজন এ দেশের মানুষের তা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এদের পরিকল্পিত উপায়ে মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করা। বর্তমানে সরকার এবং ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগে আমাদের দেশেও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত জাতের মৎস্য চাষ শুরু হয়েছে। ফলে দেশে প্রতিনিয়তই মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে। স্বনির্ভর হচ্ছে দরিদ্র পরিবার এবং বেকার যুবকরাও।
বর্তমানে সারা দেশে প্রজননের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি মাছের পোনা/বীজ উৎপাদন খামার রয়েছে। পুষ্টিহীনতা দূর করতে সারা দেশে যে পরিমাণ মাছ, মাংস, দুধ, ডিম উৎপাদিত হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি বাকিদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগী হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে আরও বেশি করে মৎস্য খামার, যা পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে। পতিত পুকুরে আধুনিক উপায়ে মাছ চাষ, যা আমাদের দারিদ্র্যমোচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রযুক্তি যেমন সহজ ও কম খরচি তেমনি দরিদ্র জনগণের জন্য উপযোগী। সুতরাং দেশের পুরো জলসীমা যথাযথ সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে।


সমকালীন বিশ্ব প্রায় সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ও চাহিদার কারণে সবক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ অনেক এগিয়ে গেছে। নতুন প্রযুক্তির বিকাশ অনেক প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি দিয়েছে কিন্তু এসব প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের অভাবে বিকাশমান দেশগুলোর মধ্যে আমরা তুলনামূলক এখনও অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। এ দেশে আগের তুলনায় মাছ চাষ বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। দেশের সব জলাভূমিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা গেলে মাছের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। বিশ্বের উৎপাদন কৌশল এখন বাণিজ্যভিত্তিক। কম শ্রম ও পুঁজি বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা অর্জন এর মূল লক্ষ্য। মৎস্য সম্পদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নেই। বিশ্বের সব দেশে এখন আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের মাছ চাষ হচ্ছে। গড়ে উঠেছে উন্নত মৎস্য খামার। কৃত্রিম প্রজনন মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ব্যাপক স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। আমরাও সে পথে এগোব সাহসে প্রযুক্তিতে শক্তিতে।


মাছ চাষ প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজ। এর সাহায্যে আমাদের দেশের শিক্ষিত ও নিরক্ষর লোকজন স্বাবলম্বী হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় মাছ চাষের যৌক্তিক মনমানসিকতা প্রয়োজন এ দেশের মানুষের তা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এদের পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করা। মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন উন্নত জাতের বা রোগমুক্ত পোনা, যা দ্রুত বাড়তে পারে। সাথে প্রয়োজনীয় সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। ইউরোপ ও রাশিয়া বাংলাদেশের চিংড়ির বড় বাজার। ডলারের বিপরীতে ইউরো ও রুবেলের দরপতনে সেখানে চাহিদা কমে গেছে। তাদের রিপেমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানি সহায়ক নির্দেশনা দিতে পারে। সরকার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা দিতে পারে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রতিও নজর দিতে হবে কিভাবে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায় সে চিন্তাও করতে হবে। সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতিতে মাছ চাষ করলে পাল্টে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। এ দেশের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ কর্মসংস্থানের আশায় নিরন্তর চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন জীবনের পথচলায়। জীবনের বেকারত্বের গ্লানি ঘোঁচাতে এখন অনেকেই মাছ চাষের প্রতি ঝুঁকছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে হারে দেশে মাছ চাষ বাড়ছে এবং এ ধারা যদি অব্যাহত রাখা যায় তবে অতি অল্প সময়ে মাছ জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে সক্ষম হবে। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন দেশের লক্ষাধিক মানুষ। আর মাছ চাষের সফলতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। বর্তমানে স্থানীয় বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান গর্বিত অবস্থানে। ক্রমাগত ফিশারিজের সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়াও স্বাধীনতা-পরবর্তী ফিশারিজ থেকে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১.৬ গুণ।


দেশে ক্রমান্বয়ে মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকোয়াকালচার-২০১৬’ প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ফিশারিজ পদ্ধতিতে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। মৎস্য অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মৎস্য চাষ ও মৎস্য সংরক্ষণের সাথে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ নারীও মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত। গত সাত বছরে মৎস্য খাতের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত প্রায় ০৬ লক্ষাধিক গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দেশে বদ্ধ জলাশয়ের পরিমাণ ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬১ হেক্টর। উন্মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৬ হাজার ৪৩৪  হেক্টর। দেশে মোট হ্যাচারির সংখ্যা ৯৪৬। এর মধ্যে সরকারি মৎস্যবীজ উৎপাদন খামারের সংখ্যা ১৩৬টি। আর বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারির সংখ্যা ৮৬৮টি। দেশে দিন দিন বাড়ছে মৎস্য খামারের সংখ্যা। মৎস্য অধিদফতরের ২০১৪-১৫ সালের তথ্য মতে, দেশে মৎস্য চাষির সংখ্যা ১ কোটি ৪৬ লাখ ৯৭ হাজার। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকেও অনেকেই এগিয়ে এসেছেন মাছ চাষে। চাষির সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। ২০০৮-০৯ সালে ২৭ দশমিক শূন্য ১ লাখ টন মাছের উৎপাদন হলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ দশমিক ৮৪ লাখ টনে। আর সরকারের টার্গেট ২০২১ সালের মধ্যে তা ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ টনে উন্নীতকরণ। বর্তমানে বাজারে যেসব মাছ পাওয়া যায় তার অধিকাংশই চাষের মাছ। নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশে মাছ চাষের সম্প্রসারণ ঘটেছে। মাছ চাষের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনেকটা সম্প্রসারিত হলেও সব সময় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না বিভিন্ন কারণে।

 
হাওর ও পাহাড়ির জেলায়ও মাছ চাষের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। অবৈধ শিকারিদের হাত থেকে প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ রক্ষার্থে মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে কাজ করছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। জনসাধারণকে দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ। মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে দেশের অসংখ্য পরিবার। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন গ্রামীণ মানুষ। এতে আগের তুলনায় যেমন তাদের উৎপাদন বেড়েছে তেমনি বেড়েছে মাছভিত্তিক মুনাফাও। সাধারণ জনগণও আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ মাছ গ্রহণ করতে পারছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পন্ন এলাকায় মাছ চাষের সম্প্রসারণ তেমন আশানুরূপ ঘটে না। এছাড়া গুণগত মানের হ্যাচারির অভাব, মাছের খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণেই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। এ ছাড়া মাছ বিক্রিতে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। মাছচাষিদের সরকারের কাছে দাবি, মাছ চাষকে জনপ্রিয় করে তুলতে বিদ্যুতের প্রাপ্তি যেন সহজলভ্য করে দেয়া হয়।


নদীমাতৃক দেশে পানির সোনা মাছ উৎপাদনের রয়েছে আমাদের অপার সম্ভাবনা। মিঠাপানির মাছ চাষে পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত জলাশয় আর লাখ লাখ পুকুর। পরিশ্রমী মাছচাষিদের সাথে রয়েছে অবারিত জায়গা আর মাছ চাষের রয়েছে বিশাল সুযোগ। এসব সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ। আর বছরে আয় হতে পারে কয়েক বিলিয়ন ডলার। মিঠা পানির মাছ ও মাছজাতীয় পণ্য ছিল এর মাত্র ৮ শতাংশ। চিংড়ি রফতানি থেকেই এসেছে এর প্রায় ৯২ শতাংশ। মাছ রফতানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সরকারের নীতি সহায়তা। তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে শুধু চিংড়ি রফতানি খাত থেকেই কয়েক শত কোটি মার্কিন ডলার আয় সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথমস্থানে রয়েছে চীন। এর পরই রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। আশা করা হচ্ছে কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হবে। যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে পুকুর নির্বাচন, তৈরি, মাছের পোনা ছাড়া, মাছের খাদ্য-স্বাস্থ্য-বালাইব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রযুক্তি অনুসরণ করে নিশ্চিত করতে পারি তাহলে মাছ চাষে আমরা অনেকটুকু এগিয়ে যেতে পারব। তখন মাছভিত্তিক খাদ্য নিরাপত্তা আরো সুদৃঢ় হবে। আমাদের গ্রামীণ উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে। আমরা আমাদের দেশীয় অভিবাসনকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারব।

 

রফিকুল আলম কবীর*
*সুবর্ণ ভিলা, রায়পুর, নোয়াখালী

বিস্তারিত
কবিতা (কার্তিক ১৪২৪)

বিশ্ব খাদ্য দিবসে যুগল চতুর্দশপদী
কৃষিবিদ এ এইচ ইকবাল আহমেদ*

 

ক. কৃষির সুতিকাগার
বদলে দাও আগামী অভিবাসন।
অতীতের ওই যাযাবর দিনগুলো
মনে করে দেখ, দিয়েছি যা নির্বাসন।
সজ্ঞানে হয়ো না পশুতুল্য মনভুলো।

প্রপিতামহেরা তামাম প্রান্তর ঘুরে
ফলমূল আর প্রাণিখাদ্য খুঁজে খুঁজে
সারাদিনমান ছুটেছেন কত দূরে
প্রকৃতির সাথে অক্লান্ত প্রাণান্ত যুজে।

এখন ভাঁড়ারে প্রাচুর্য্যরে সমারহ
অন্য কাজে হচ্ছে উদ্বৃত্ত কাল বিলীন
কেটেছে ক্ষুধার যন্ত্রণাময় দুর্দিন
তার জন্য চাই পুঁজির সরবরাহ।

হোক সব গ্রাম কৃষির সুতিকাগার
জনতার পাতে জুটুক পূর্ণআহার।।

খ. বীজ-মৃত্তিকা উর্বর
পর্বত অরণ্য ঘুরে খুঁজেছি খাবার
তুখোড় বন্যের সাথে করেছি সমর
অতঃপর পেয়ে  বীজ মৃত্তিকা উর্বর
সোনালি শস্যের গড়ি বিশাল ভাগাড়।

স্বর্গচ্যূত হয়ে মর্তে স্বহস্তে আবার
গড়ে তুলি ভূয়ে  রম্য বন্দর নগর
খাদ্য ও শক্তিতে হয়ে ওঠি স্বর্নিভর
স্থিতু হই ঘরে, নই যাযাবর আর।

যুদ্ধ হোক শেষ; মানুষ ও  প্রকৃতিরে
সাথে নিয়ে গড়ি পৃথিবীতে স্বর্গোদ্যান।
জলকবুতর ওড়ে সাগর গভীরে
নিশ্চিন্তে যেমন, কণ্ঠে  জীবনের গান।  

এখানে রয়েছে  ছড়ানো খাদ্য সবার
প্রয়োজন শুধু সঠিক বাঁটোয়ারার।

 

এসেছে বিশ্ব খাদ্য দিবস প্রতিপাদ্য নিয়ে
ইফতি ইশতি ইমতি**


প্রতি বছর খাদ্য দিবসে হয়  প্রতিপাদ্য নির্ধারণ
অনাহার দারিদ্র্য দূর করে আগামীর পথে হতে আগুয়ান...
১৯৮১/৮২ সবার আগে খাদ্য,
১৯৮৩ খাদ্য নিরাপত্তার,
১৯৮৪ কৃষিতে নারী;
১৯৮৫ গ্রামীণ দরিদ্রতা;
১৯৮৬ জেলে ও জেলে সম্প্রদায়;
১৯৮৭ ক্ষুদ্র কৃষক, ১৯৮৮ গ্রামীণ যুবক;
১৯৮৯ খাদ্য ও পরিবেশ;,
১৯৯০ সালে ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য;
১৯৯১ জীবনের জন্য গাছ; ১৯৯২ খাদ্য ও পুষ্টি;
১৯৯৩ মানব কল্যাণে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সমাহার;
১৯৯৪ জীবনের জন্য পানি;
১৯৯৫ সবার জন্য খাদ্য;
১৯৯৬ ক্ষুধা ও পুষ্টির বিরুদ্ধে সংগ্রাম;
১৯৯৭ খাদ্য নিরাপত্তায় বিনিয়োগ;
১৯৯৮ অন্ন যোগায় নারী;
১৯৯৯ ক্ষুধা জয়ে তারুণ্য;
২০০০ ক্ষুধামুক্ত সহস্রাব্দ;
২০০১ দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুধামুক্তির সংগ্রাম;
২০০২ পানি খাদ্য নিরাপত্তার উৎস;
২০০৩ ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি;
২০০৪ খাদ্য নিরাপত্তায় জীব বৈচিত্র্য;
২০০৫ কৃষি ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ;
২০০৬ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ;
২০০৭ খাদ্যের অধিকার;
২০০৮ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জলবায়ুর পরিবর্তন ও জৈবশক্তি;
২০০৯ সংকটকালীন খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন;
২০১০ ক্ষুধার বিরুদ্ধে ঐক্য;
২০১১ সংকট নিরসনে সহনশীল খাদ্যমূল্য নির্ধারণ;
২০১২ কৃষি সমবায় : ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার উপায়;
২০১৩ খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য টেকসই খাদ্য কৌশল;
২০১৪ পারিবারিক খামার : পরিবেশসম্মত প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগান ও সমৃদ্ধির মূল উৎস;
২০১৫ গ্রামীণ দারিদ্র্য চক্রের অবসানে সামাজিক সুরক্ষা এবং কৃষি;
২০১৬ জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাদ্য এবং কৃষিও বদলাবে;
২০১৭ অভিবাসনের ভবিষ্যৎ দাও বদলে, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে করো বিনিয়োগ
এ হলো বিগত বছরের খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য শিরোনাম
সবাই মিলে করলে বাস্তবায়ন দেশ হবে বলিয়ান।


*পরিচালক (অব.), বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কৃষি মন্ত্রণালয়, ০১৫৫৮ ৩০১ ৯০৮, ahiqbal.ahmed@yahoo.com;
** প্রযত্নে-জেড এ ভুইয়া, জবেদ ফয়জুন মঞ্জিল, পীরেরবাগ, ঢাকা

 

বিস্তারিত
প্রশ্নোত্তর (কৃষিকথা কার্তিক ১৪২৪)

 

রবিউল ইসলাম, গ্রাম : হেউরনগর, উপজেলা : ধুনট, জেলা : বগুড়া
প্রশ্ন : বেগুন গাছের পাতায় পোড়া পোড়া দাগ হচ্ছে, ধীরে ধীরে পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। কী করব?

উত্তর : এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত হলে পাতায় বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়। এ দাগ পরবর্তীতে সব পাতায় ছড়িয়ে পড়ে। আক্রমণ বেশি হলে পাতা ঝরে যায়। এ রোগে ফলও আক্রান্ত হয় এবং ফল ঝরে পড়ে। এ রোগ যাতে না হয় সেজন্য ক্ষেত সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। লাগানোর আগে অবশ্যই বীজ শোধন করে নিতে হবে। আক্রমণ দেখা দিলে আক্রান্ত অংশ নষ্ট করে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম  রোভরাল বা ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


নাসরিন নাহার, গ্রাম : বাঁকা, উপজেলা : পাইকগাছা, জেলা : খুলনা
প্রশ্ন : জালি লাউগুলো পোকায় নষ্ট করে ফেলছে, কী করব?
উত্তর : লাউ গাছে মাছি পোকার আক্রমণ হলে এ পোকা কচি ফলের নিচের দিকে অভিপজিটর ঢুকিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে লাউয়ের শাঁস খেয়ে নষ্ট করে। আক্রমণ দেখা দেয়া মাত্র আক্রান্ত ফল বা ফুল সংগ্রহ করে কমপক্ষে ৩০ সেন্টিমিটার পরিমাণ গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা হাত বা পা দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদের মাধ্যমে পুরুষ মাছি পোকা আকৃষ্ট করে মাছি পোকা মেরে ফেলা যায়। প্রতি ফাঁদে এক মিলি পরিমাণ ফেরোমন একখ- তুলায় ভিজিয়ে ফাঁদের প্লাস্টিক পাত্রের মুখ হতে ৩-৪ সেন্টিমিটার নিচে একটি সরু তার দিয়ে স্থাপন করতে হবে। ফেরোমনের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে মাছি পোকা পাত্রের ভেতরে প্রবেশ করবে ও সাবান পানিতে পড়ে মারা যাবে। বিষটোপ ফাঁদ ব্যবহার করে মাছি পোকার আক্রমণ কমানো সম্ভব। এজন্য ১০০ গ্রাম পাকা মিষ্টিকুমড়া কুচি কুচি করে কেটে থেঁতলে নিয়ে তাতে ০.২৫ গ্রাম মিপসিন ৭৫ পাউডার বা সেভিন ৮৫ পাউডার এবং ১০০ মিলি পানি মিশিয়ে ছোট একটি মাটির পাত্রে নিয়ে পাত্রটি তিনটি খুঁটির সাহায্যে মাটি থেকে ০.৫ মিটার উঁচুতে স্থাপন করতে হবে। বিষটোপ তৈরির পর ৪-৫ দিন পর্যন্ত ব্যবহার করার পর তা ফেলে দিয়ে নতুন করে আবার তৈরি করতে হবে। ফেরোমন ও বিষটোপ ফাঁদ জমিতে ১২ মিটার দূরে দূরে স্থাপন করতে হবে। ক্ষেত সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।


নাজমা বেগম, গ্রাম : তাম্বুলখানা, উপজেলা : ফরিদপুর সদর, জেলা : ফরিদপুর
প্রশ্ন : আমার মরিচের ক্ষেতে কিছু কিছু মরিচ গাছ নেতিয়ে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। এর প্রতিকার কী?
উত্তর : এটি মরিচের ঢলে পড়া রোগ। রোগটি ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে হতে পারে। এ রোগ প্রতিহত করার জন্য সুনিষ্কাশিত অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হবে। সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। বপনের আগে বীজ শোধন করে নিতে হবে। প্রতি কেজি বীজের জন্য প্রোভেক্স-২০০ অথবা ব্যাভিস্টিন ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। পিএইচের মাত্রা কম হলে জমিতে চুন প্রয়োগ করতে হবে। রোগের আক্রমণ দেখা দিলে ক্ষেত থেকে রোগাক্রান্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে ক্যাপটান অথবা ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে আক্রান্ত গাছের গোড়ার মাটিতে স্প্রে করা যেতে পারে। ফসল সংগ্রহের পর ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। একই জমিতে ক্রমাগত মরিচ চাষ করতে থাকলে ঢলে পড়া রোগের আক্রমণ বেশি হয়, কাজেই এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।  


মো : সোলায়মান, গ্রাম : জলসা, উপজেলা : ধামরাই, জেলা : ঢাকা
প্রশ্ন : মুলার ভালো ফলন পেতে কী কী সার ব্যবহার করব?
উত্তর : মুলা রবি মৌসুমের একটি প্রধান সবজি। প্রচুর ভিটামিন এ সমৃদ্ধ এ সবজির ভালো ফলন পেতে সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। মুলার জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম এবং বোরাক্স দিতে হয়। প্রতি হেক্টর জমির জন্য ইউরিয়া প্রয়োজন হবে ৩৭৫ কেজি, টিএসপি ২২৫ কেজি, এমওপি ২২৫ কেজি, জিপসাম ১০০ কেজি এবং বোরাক্স ১০-১৫ কেজি। শেষ চাষের সময় টিএসপি, জিপসাম, বোরাক্স সবটুকু  এবং ইউরিয়া ও এমওপি সারের অর্ধেক জমিতে দিতে হবে। সারগুলো জমিতে সমানভাবে ছিটিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি ইউরিয়া ও এমওপি সার সমান দুই ভাগে ভাগ করে দুই কিস্তিতে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম কিস্তি বীজ বপনের তিন সপ্তাহ পর এবং দ্বিতীয় কিস্তি বীজ বপনের পাঁচ সপ্তাহ পর প্রয়োগ করতে হবে।  


বিকাশ চন্দ্র সাহা, গ্রাম : গজকান্দা, উপজেলা : দেওয়ানগঞ্জ, জেলা : জামালপুর
প্রশ্ন : পাটের কাণ্ডের বাদামি রঙের দাগ পড়ে এবং কাণ্ড পচে যাচ্ছে, কী করব?
উত্তর : পাটের কাণ্ড পচা রোগ ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে চারা অবস্থায় কাণ্ডের ওপর গাঢ় বাদামি রঙের দাগ পড়ে, যা ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং কাণ্ড দুর্বল হয়ে গাছ ভেঙে পড়ে। কাণ্ড পচে গাছ মারাও যেতে পারে। যদি বীজ গজানোর সময় ছত্রাকের আক্রমণ হয় তাহলে বীজ পচে যায়, সেক্ষেত্রে গাছ মাটির ওপরে আসার আগেই মারা যায়। এ রোগ যাতে না হয় সেজন্য সুস্থ ও রোগমুক্ত গাছের বীজ ব্যবহার করতে হবে। জমিতে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। বীজ শোধন করে নিয়ে তারপর বপন করতে হবে। জমিতে রোগাক্রান্ত গাছ দেখলেই তা তুলে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রমণের পরিমাণ বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম  মেনকোজেব গ্রুপের বালাইনাশক মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।


মো. তিতাস শেখ, গ্রাম : পিঠাভোগ মধ্যপাড়া, উপজেলা : রূপসা, জেলা : খুলনা
প্রশ্ন : করলা গাছের পাতা ও গাছের গায়ে সাদা পাউডারের আবরণ দেখা যায়, গাছে ফুল ফল কম ধরে, প্রতিকারের উপায় কী?
উত্তর : করলা গাছে পাউডারি মিলডিউ রোগ দেখা দিয়েছে। এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এ রোগ হলে গাছের পাতা ও গাছের গায়ে সাদা পাউডারের আবরণ দেখা যায়। ক্রমে পাতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে গাছ দুর্বল হয়ে যায় এবং ফুল ফল কম হয়। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম থিয়োভিট ৮০ ডব্লিউপি অথবা ০.৫ মিলি টিল্ট ২৫০ ইসি মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।


মো. কামরুল হোসেন, গ্রাম : মৌগাছি, উপজেলা : মোহনপুর, জেলা : রাজশাহী
প্রশ্ন : বেগুন গাছ ঝিমিয়ে যাচ্ছে, পাতা ও কাণ্ড শুকিয়ে গাছ মরে যাচ্ছে, গাছের গোড়া কালো হয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিকার কী?
উত্তর : বেগুনের গোড়া পচা রোগ হয়েছে। গাছের যে কোনো বয়সে এ রোগ দেখা দিতে পারে। এ রোগে গাছ ঝিমিয়ে পড়া, পাতা কাণ্ড শাখা প্রভৃতি শুকিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গাছের গোড়া পচে যায় এবং শিকড়েও পচন ধরে। গাছ শুকিয়ে যায় ও মারা যায়। এ রোগ হলে গাছের শুকিয়ে যাওয়া মরা পাতা, ডাল সব সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। বেগুন গাছের গোড়ায় শুকনো ছাই ছিটিয়ে দিলে আক্রমণ কমানো যায়। এছাড়া গোড়ার মাটির সাথে শুকনো ছাই মিশ্রিত পটাশ সার মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে। এতে করে নতুন শিকড় জন্মাবে এবং গাছ সতেজ হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মেনকোজেব গ্রুপের বালাইনাশক মিশিয়ে স্প্রে করলে আক্রমণ কম হবে।


মামুন সরকার, গ্রাম : চরবহর, থানা : শ্রীপুর, জেলা : গাজীপুর
প্রশ্ন : আমার ছাগলের ডায়রিয়া হয়েছে। নাক দিয়ে সর্দি পড়ছে, শ্বাস-প্রশ্বাসেও কষ্ট হচ্ছে। এর প্রতিকার কী?
উত্তর : ছাগলের পিপিআর হয়েছে। এর প্রতিকার হিসেবে প্রতি ২০ কেজি ওজনের ছাগলের জন্য ১ মিলি করে এসপিভেট ০.৫ গ্রাম ইনজেকশন মাংসে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও প্রতি ২৫ কেজি ওজনের ছাগলের জন্য ১ মিলি করে অ্যান্টিহিস্টাভেট ইনজেকশন মাংসে প্রয়োগ করতে হবে ৩-৫ দিন পর্যন্ত। আর তিন দিন পর্যন্ত কপ ভেট ইনজেকশন প্রতি ৩৩ কেজি ওজনের জন্য ১ মিলি করে ২৪ ঘণ্টা পরপর মাংসে প্রয়োগ করতে হবে।

 

মো. কামাল হোসেন, গ্রাম : নকিপুর, উপজেলা : শ্যামনগর, জেলা : সাতক্ষীরা
প্রশ্ন : আমার বাছুরের বয়স ২ মাস। সে মাটি খাচ্ছে। কী করব পরামর্শ চাই।
উত্তর : বাছুরের মিনারেল ঘাটতিজনিত রোগ পাইকা হয়েছে। বাছুরকে ক্যালপ্লেক্স লিকুইড ২০-২৫ মিলি করে ৫-৭ দিন পর্যন্ত খাওয়াতে হবে।
সুপ্রিয় পাঠক বৃহত্তর কৃষির যে কোনো প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান পেতে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো মোবাইল থেকে কল করতে পারেন আমাদের কল সেন্টার এর ১৬১২৩ এ নাম্বারে। শুক্রবার ও সরকারি ছুটি ব্যতীত যে কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে। তাছাড়া কৃষিকথার গ্রাহক হতে বার্ষিক ডাক মাশুলসহ ৫০ টাকা মানি অর্ডারের মাধ্যমে পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ এ ঠিকানায় পাঠিয়ে ১ বছরের জন্য গ্রাহক হতে পারেন। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিকে কৃষিকথা পৌঁছে যাবে আপনার ঠিকানায়।

 

কৃষিবিদ ঊর্মি আহসান*

*উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (এলআর) সংযুক্ত, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত
অগ্রহায়ণ মাসের কৃষি (কার্তিক ১৪২৪)

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, সবাইকে নবান্নের শুভেচ্ছা। নবান্নের উৎসবের সাথে সমান্তরালে উৎসবমুখর থাকে বৃহত্তর কৃষি ভুবন। কেননা এ মৌসুমটাই কৃষির জন্য তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত একটি মৌসুম। তাহলে আসুন আমরা জেনে নেই অগ্রহায়ণ মাসের কৃষিতে আমাদের করণীয় কাজগুলো।
 

আমন ধান
এ মাসে অনেকের আমন ধান পেকে যাবে তাই রোদেলা দিন দেখে ধান কাটতে হবে;
ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় আমন ধান শতকরা ৮০ ভাগ পাকলে কেটে ফেলতে হবে;
আমন ধান কাটার পরপরই জমি চাষ দিয়ে রাখতে হবে, এতে মাটির রস কম শুকাবে;
উপকূলীয় এলাকায় রোপা আমন কাটার আগে রিলে ফসল হিসেবে খেসারি আবাদ করা যায়;

 

বোরো ধান
আগ্রহায়ণ মাস বোরো ধানের বীজতলা তৈরির উপযুক্ত সময়। রোদ পড়ে এমন উর্বর ও সেচ সুবিধাযুক্ত জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করতে হবে;
চাষের আগে প্রতি বর্গমিটার জায়গার জন্য ২-৩ কেজি জৈবসার দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে;
যেসব এলাকায় ঠাণ্ডার প্রকোপ বেশি সেখানে শুকনো বীজতলা তৈরি করতে পারেন। প্রতি দুই প্লটের মাঝে ২৫-৩০ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হবে;
যেসব এলাকায় সেচের পানির ঘাটতি থাকে সেখানে আগাম জাত হিসেবে ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫ এবং ব্রি ধান৫৫, উর্বর জমি ও পানি ঘাটতি নেই এমন এলাকায় ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান৫৯, ব্রি ধান৬০, ব্রি হাইব্রিড ধান১, ব্রি হাইব্রিড ধান২ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ঠাণ্ডা প্রকোপ এলাকায় ব্রি ধান৩৬, হাওর এলাকায় বিআর১৭, বিআর১৮, বিআর১৯, লবণাক্ত এলাকায় ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬১ চাষ করতে পারেন;
বীজ বপন করার আগে ৬০-৭০ ঘণ্টা জাগ দিয়ে রাখতে হবে। অঙ্কুরিত বীজ বীজতলায় ছিটিয়ে বপন করতে হবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ৮০-১০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
গম
অগ্রহায়ণের শুরু থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ পর্যন্ত গম বোনার উপযুক্ত সময়। এরপর গম যত দেরিতে বপন করা হবে ফলনও সে হারে কমে যাবে; দো-আঁশ মাটিতে গম ভালো হয়;
অধিক ফলনের জন্য গমের আধুনিত জাত যেমন- শতাব্দী, সুফী, বিজয়, প্রদীপ, আনন্দ, বরকত, কাঞ্চন, সৌরভ, গৌরব, বারি গম-২৫, বারি গম-২৬ এসব বপন করতে হবে;
বীজ বপনের আগে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধন করে নিতে হবে;
বিঘাপ্রতি সেচযুক্ত চাষের জন্য ১৬ কেজি, সেচবিহীন চাষের জন্য ১৩ কেজি বীজ বপন করতে হবে;
গমের ভালো ফলন পেতে হলে প্রতি শতক জমিতে ৩০-৪০ কেজি জৈবসার, ৬০০-৭০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৬০০-৭০০ গ্রাম টিএসপি, ৩০০-৪০০ গ্রাম এমওপি, ৪০০-৫০০ গ্রাম জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে;

 

ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার শেষ চাষের সময় এবং ইউরিয়া তিন কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে;
গমে তিনবার সেচ দিলে ফলন বেশি পাওয়া যায়। বীজ বপনের ১৭-২১ দিনের মধ্যে প্রথম সেচ , ৪৫-৬০ দিনে দ্বিতীয় সেচ এবং ৭৫-৮০ দিনে ৩য় সেচ দিতে হবে।

 

ভুট্টা
ভুট্টা আবাদ না করে থাকলে এ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে;
ভুট্টার উন্নত জাতগুলো হলো বারি ভুট্টা-৬, বারি ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৬, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৮, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১ এসব;

 

এক হেক্টর জমিতে বীজ বপনের জন্য ২৫-৩০ কেজি ভুট্টা বীজের প্রয়োজন হয়। তবে খই ভুট্টা বা হাইব্রিডের ক্ষেত্রে বীজের মাত্রা এর অর্ধেক হবে;
ভালো ফলনের জন্য সারিতে বীজ বপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৭৫ সেন্টিমিটার এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ২৫ সেন্টিমিটার রাখতে হবে;
সাধারণভাবে প্রতি শতাংশ জমিতে ইউরিয়া ১-১.৫ কেজি, টিএসপি ৭০০-৯০০ গ্রাম, এমওপি ৪০০-৬০০ গ্রাম, জিপসাম ৬০০-৭০০ গ্রাম, দস্তা ৪০-৬০ গ্রাম, বরিক এসিড ২০-৩০ গ্রাম এবং ১৬-২০ কেজি জৈব সারপ্রয়োগ করতে হবে।

 

সরিষা ও অন্যান্য তেল ফসল
তেল ফসলের মধ্যে সরিষা অন্যতম। তাছাড়া তিল, তিসি, সূর্যমুখী এসব আবাদ করতে পারেন;
সরিষা গাছের বয়স ২০-২৫ দিন হলে শতাংশপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে;
উপরি সার প্রয়োগের পর হালকা একটি সেচ দিতে হবে;
মাটিতে রস কমে গেলে ২০-২৫ দিন পর আবারো একটি সেচ দিতে হবে।

 

আলু
উপকূলীয় অঞ্চলে এ মাসেও আলু আবাদ শুরু করা যায়; অন্যান্য স্থানে রোপণকৃত আলু ফসলের যতœ নিতে হবে; মাটির কেইল বেঁধে দিতে হবে এবং কেইলে মাটি তুলে দিতে হবে; সারের উপরিপ্রয়োগসহ প্রয়োজনীয় সেচ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।

 

ডাল ফসল
ডাল আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। মাঠে এখন মসুর, মুগ, মাষ, মটর, খেসারি, ছোলা, ফেলন, সয়াবিন প্রভৃতি ডাল ফসল আছে। সারের উপরিপ্রয়োগ, প্রয়োজনে সেচ, আগাছা পরিষ্কার, বালাই ব্যবস্থাপনাসহ সব ক’টি পরিচর্যা সময়মতো যথাযথভাবে করতে পারলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যাবে।

 

শাকসবজি
ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, মুলা এসব বড় হওয়ার সাথে সাথে চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে;
চারার বয়স ২-৩ সপ্তাহ হলে সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে;
সবজি ক্ষেতের আগাছা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করতে পারেন।
জমিতে প্রয়োজনে সেচ প্রদান করতে হবে; টমেটো গাছের অতিরিক্ত ডাল ভেঙে দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে; ঘেরের বেড়িবাঁধে টমেটো, মিষ্টিকুমড়া চাষ করতে পারেন।
অন্যান্য রবি ফসল
মাঠে এখন মিষ্টিআলু, চীনা, কাউন, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ অনেক অত্যাবশ্যকীয় ফসলের ভালোভাবে যতœ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে আশাতীত ফল বয়ে আনবে;
এসব ফসলের কোনোটি এখনও না লাগিয়ে থাকলে দেরি না করে চারা লাগাতে হবে।
এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত খরা সহনশীল ছোলা, মুগ, তিল, তিসি, যব এসব বপন করা যায়।

 

গাছপালা
বর্ষায় রোপণ করা ফল, ঔষধি বা বনজ গাছের যতœ নিতে হবে। গাছের গোড়ায় মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছকে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে।
গাছের গোড়ায় জাবরা প্রয়োগ করলে তা পানি ধরে রাখবে। মাটিতে রসের পরিমাণ কমে গেলে গাছের গোড়ায় সেচ প্রদান করতে হবে।

 

প্রাণিসম্পদ
হাঁস-মুরগির ডিম থেকে বাচ্চা ফুটানোর ভালো সময় এখন।
তাছাড়া সামনে শীতকাল আসছে। শীতকালে পোলট্রিতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ বেড়ে যায় এবং রানীক্ষেত, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড,  বসন্ত রোগ, কলেরা এসব রোগ মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে। এসব রোগ থেকে হাঁস-মুরগিকে বাঁচাতে হলে এ মাসেই টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
এ মাসে পশুখাদ্যের কোনো অভাব থাকে না। বিশেষ করে কাঁচা ঘাসের। তাই আমন ধানের খরসহ অন্যান্য খাদ্য যেমন- ভুট্টা, ডাল, ঘাস দিয়ে সাইলেজ তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে পারেন।
এ সময় গবাদি পশুর ক্ষুরা রোগ, তড়কা, গলাফুলা দেখা দিতে পারে। গবাদিপশুতে রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে প্রাণিচিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

মৎস্যসম্পদ
মাছের খাবার হিসেবে উদ্ভিজ খাদ্য এবং প্রাণিজ খাদ্য তৈরিতে গোবর/আবর্জনা পচা সার, রাসায়নিক সার বেশি উপযোগী। এসব পরিমাণমতো প্রয়োগ করতে হবে;
জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে;
প্রয়োজনে মৎস্যবিদদের সাথে পরামর্শ করে চুন বা তুঁতে প্রয়োগ করতে পারেন;
পুকুরে রোদ পড়া নিশ্চিত করতে পুকুর পাড়ের গাছের ডালপালা কেটে পরিষ্কার করতে হবে;
পুকুরের ঢালে প্যারা, নেপিয়ার বা অন্যান্য ঘাসের চাষ করলে অতিরিক্ত ফসল পাওয়া যায় এবং কার্পজাতীয় মাছের খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়;
এছাড়া মাছ সংক্রান্ত যে কোনো পরামর্শের জন্য উপজেলা মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*

*তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

বিস্তারিত

Share with :

Facebook Facebook