কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিবাসন সমস্যা নিরসন

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনসহ দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান, বেকারত্ব হ্রাস ও প্রতিটি নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়ন দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রণীত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়ন করতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিটি মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এরই মধ্যে যথেষ্ট উন্নতি করলেও  প্রায় ০৪ কোটি মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে। পাশাপাশি গরিব ও বিত্তবানদের মধ্যে পুষ্টি বৈষম্য বেড়েই চলেছে। দারিদ্র্য নিরসনে গত দুই দশকের বেশি সময়ে নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচির ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতিতে লক্ষণীয় অগ্রগতি আছে বাংলাদেশের। শিশু ও মাতৃপুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদ-ে বয়স অনুযায়ী শিশুর উচ্চতা ও ওজনে এখনও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আরও বড় একটি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে অপরিকল্পিত নগরায়ন। এর ফলে বেশ কিছু কৃষি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানোর পাশাপাশি দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকা ছেড়ে শহরমুখী হয়ে পড়ছে। অথচ গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন রোধ করাসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতাকেও রোধ করা সম্ভব। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন করছে।


গ্রামীণ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার অত্যন্ত সফল। দারিদ্র্য বিমোচন সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৫ সালেই Millennium Development Goals (MDG) এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে। যেখানে বিগত ১৯৯১ সালে দরিদ্রতার হার ছিল ৫৭ শতাংশ, সেখানে ২০১৬ সালে তা কমে ২৪.৮ শতাংশ। এ ছাড়া, মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০০৯ সালে জনপ্রতি খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২,৬৩৩ কিলোক্যালোরি এবং বিগত ২০১৬ সালে তা ২,৯২৫ কিলোক্যালোরিতে দাঁড়ায়। গ্রামীণ পর্যায়ে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের সঠিক বিক্রয়মূল্য নিশ্চিতকরণ ও কর্মসৃজনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাজার অবকাঠামো নির্মাণ করছে। উল্লেখ্য, অপ্রচলিত ফসলগুলো চাষাবাদ বৃদ্ধিকরণ এবং কৃষিভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ৭.৫ বিলিয়ন টাকা দেশব্যাপী বিতরণ করেছে, যা গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে এবং এসব উদ্যোগ আমাদের নবীন কৃষকদের কৃষির প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করতে নিয়মিত ভুর্তকি ও প্রণোদনা কর্মসূচি পরিচালনার পাশাপাশি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চাহিদা মোতাবেক পুনর্বাসন সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।


যেহেতু কৃষি প্রধান বংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৭ শতাংশ এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং এই শ্রমশক্তির সিংহভাগই প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে বিস্তৃত, দেশের অভিবাসন সমস্যা নিরসনে গ্রামীণ শ্রমশক্তির আর্থসামাজিক উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।  


উল্লেখ্য, বিগত ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে বাংলাদেশের   খাদ্যশস্যের (ধান, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন ছিল প্রায় ১১১ লাখ টন, আর বর্তমানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৩৯২ লাখ  টন। বিগত ১৯৭১-৭২ সালের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় তিন গুণেরও বেশি ও গম প্রায় ১৩ গুণ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে চতুর্থ, সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় তৃতীয় ও ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিবেচনায় সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। আগে যেখানে হেক্টর প্রতি ২ টন চাল উৎপাদিত হতো, বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে ৪ টনের কাছাকাছি। স্বাধীনতার পর দেশে মাত্র ৭ কোটি জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান ছিল না, আর বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ০.৭৩ শতাংশ হারে জমি কমে যাওয়া, গড়ে ১.৩৭ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ততা অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকা অগ্রগণ্য। কেননা সংস্থাটি তার প্রশিক্ষিত সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে ২০০টিরও বেশি ফসলের উৎপাদন, দলভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবা প্রদান, সেচ ব্যবস্থাপনা, বীজ ব্যবস্থাপনা, ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, ক্ষেত্র বিশেষে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনসহ সামগ্রিক প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ, সব দুর্যোগে কৃষকদের পাশে থেকে সহায়তা প্রদান, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ কৃষকের কাছে সহজলভ্যকরণ ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষক কর্তৃক গৃহীত প্রযুক্তিগুলো টেকসই করার মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ সরকার কৃষি উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উপকরণ ব্যবস্থাপনা ও সারের মূল্য নির্ধারণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার কৃষি বাজেট, কৃষিঋণ, ভর্তুকি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে দেশের বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ও গুদামজাতকরণের বিষয়ে আরও কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।


বাংলাদেশে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে পল্লী বসতিগুলো এখনকার মতো বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠলে মারাত্মক কৃষিজমির সংকট দেখা দেবে। কিন্তু Compact Township এর মতো করে যদি ঘনবসতিপূর্ণ বসতি সৃষ্টি করা যায়, তাহলে কৃষি জমির ওপর আগ্রাসন শুধু কমবেই না, বরং নতুন করে আরও কিছু কৃষি জমি মুক্ত হবে। ফলে পল্লী এলাকাতেই লোকজন নগর সুবিধা পেয়ে যাবে। সুতরাং পল্লী-নগর স্থানান্তর কমবে এবং এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্যও কমে যাবে। এছাড়া, সারা দেশের খাসজমির বণ্টনে আরও কার্যকরী নীতিমালা প্রয়োজন। নদীভাঙনের ফলে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিপরীতে যারা বাস্তুহারা হচ্ছে, তাদের চরের জমি বণ্টনের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ব্যক্তিমালিকানায় জমির ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে জমির সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া নবায়নের ক্ষেত্রে আইনি বিষয় ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।


সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে গ্রামের অধিবাসীদের আয় বাড়ানো যেতে পারে। গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক গ্রামে রূপান্তর করতে হলে প্রথমে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য ছোট ছোট ডেইরি ও পোলট্রি খামার এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতিসহ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া আমাদের সনাতন পদ্ধতিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ পালন ব্যবস্থাপনায় আনা হচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক পরিবর্তন। বাংলাদেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং তা দ্রুত কৃষকদের মাঝে সম্প্রসারণ করছে। গ্রামীণ পর্যায়ে মৎস্য ও প্রণিসম্পদের উন্নয়নের লক্ষ্যে এর দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো পুননির্মাণসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব  মোকাবিলায় খামার ও কৃষিভিত্তিক আয় বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাধাগুলো অপসারণে মাঠ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ করে যাচ্ছে। দরিদ্র কৃষকদের ভর্তুকি প্রদানসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মসংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তে মূলধন জোগান দেয়া হচ্ছে। দেশের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তাসহ দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়নে সরকারের এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং এলাকাভিত্তিক ফসল উৎপাদনের উপযোগিতাকে বিবেচনায় নিয়ে Cropping Zone সৃষ্টি করে এলাকাভিত্তিক উপযোগী ফসলগুলো নিবিড়ভাবে চাষাবাদ ও এর অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব। যার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উৎপাদিত ফসলের ওপর ভিত্তি করে বিশেষায়িত বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন গড়ে উঠবে, যা নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতা হ্রাস করবে। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন এবং এরই মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।


বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের যুগোপযোগী নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে গৃহীত ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিল্পনাগুলো সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অবৈধ অভিবাসন সমস্যা নিরসনসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।

 

কৃষিবিদ মো. গোলাম মারুফ*
*  মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫

 

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিএডিসির ভূমিকা

খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন কৃষি উপকরণ তথা মানসম্মত রাসায়নিক সার সংগ্রহ ও বিতরণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, উন্নত মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও বিপণন, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ইত্যাদি কৃষকের মাঝে অবাধ সরবরাহ থাকা বাঞ্ছনীয়। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে বিএডিসির বীজ ও  উদ্যান উইং এবং ক্ষুদ্রসেচ উইংয়ের পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা উইং বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের বহুমুখী নিরলস কার্যক্রম গ্রহণে জাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘ সময়ে বিএডিসি  উন্নত বীজ, পরিমিত সেচ ও গুণগতমান সম্পন্ন সার ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।


মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম  
ফসল উৎপাদনে বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। অন্যান্য কৃষি উপকরণের কার্যকারিতা গুণগত মানসম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া কোন ফসলের সম্ভাব্য ফলন বীজের মানের সাথে সরাসরি জড়িত। বীজ উৎপাদন ও মানসম্পন্ন বীজ কৃষকের হাতে তুলে দিতে বিএডিসি ৩৪টি ভিত্তিবীজ বর্ধন ও উৎপাদন খামারের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে দানাজাতীয় বীজ উৎপাদন খামার ২৪টি, পাটবীজ খামার দু’টি, ডাল ও তেলবীজ খামার চারটি ও আলুবীজ খামার দু’টি। ১ লাখ ৯ হাজার ৫৩১ একর কমান্ড এরিয়ায় ৭৫টি কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স জোন ও ৩৭ হাজার ৬১১ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষক যুক্ত আছেন। ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৫২টি আধুনিক বীজ প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র, তিনটি অটো সিড প্রসেসিং প্লান্ট ও ডিহিউমিডিফায়েড গুদাম এবং ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় বীজ পরীক্ষাগার রয়েছে। দেশব্যাপী ট্রানজিট বীজ গুদামসহ ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র, ৮ হাজার ৫৬ জন বীজ ডিলার নিয়ে একটি সুসংগঠিত মার্কেটিং চ্যানেল রয়েছে। বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৪টি এগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও নয়টি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। বীজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প, বীজ কার্যক্রম ও চুক্তিবদ্ধ চাষিদের মাধ্যমে বিগত ৯ বছরে বিভিন্ন ফসলের সর্বমোট ১২.৯০ লাখ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।


বোরো ধান বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জন্য দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে বোরো ধান বীজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ৬৬,৪৯৫ টন বোরো ধান বীজ কৃর্ষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


আমন ধান বীজ সরবরাহ
দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দানাজাতীয় ফসলের মধ্যে আমন ধান বীজ  অন্যতম। বিএডিসি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৭৭৯০ টন আমন ধানবীজ কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে
SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড ৬৫৪ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষকপর্যায়ে বিএডিসির SL-8H জাতের সুপার হাইব্রিড বোরো বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। SL-8H জাতের হাইব্রিড ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন ১০-১২ টন। এ জাতের ধান চাষে দেশে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 

গম বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশে গমের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৮,১১১ টন গমবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।  

 
ভুট্টা বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি দেশে ভুট্টার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সর্বমোট ১৬ টন ভুট্টা বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করেছে।


ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশের জনগণের আমিষের চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ডালজাতীয় ৮৩৪ টন ও তেল জাতীয় ২,৩১৫ টন বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশে ডাল ও তেল ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলায় বিএডিসি কর্তৃক ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একটি ডাল ও তেলবীজ বর্ধন খামার স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। উক্ত খামারের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার চর এলাকায় একরপ্রতি ডাল ও তেল ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে।


আলু বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩২,৬২৭ টন আলুবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী আলু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

পাট বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭৫ টন পাটবীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে দেশব্যাপী পাটবীজের আমদানি নির্ভরতা কমেছে।

 

সবজি ও মসলা বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ
দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণকল্পে বিএডিসি কর্তৃক ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭৭ টন সবজি বীজ ও ১১০ টন মসলা বীজ উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।

 

উদ্যান সংক্রান্ত কার্যক্রম
বিএডিসি বিগত ২০১০-১১ হতে ২০১৬-১৭  সময়ে সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প, এগ্রো সার্ভিস সেন্টার কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৫.১৩৩ লাখ টন সবজি; ০.৩৭ লাখ টন মসলা; ৪.৪৮ লাখ টন ফল; ৩৯৮.৩২ লাখ সবজি চারা; ২০১৪.২৫৫ লাখ চারা/কলম ও ২৮.৬৮৫ লাখ নারিকেল চারা উৎপাদন ও বিতরণ করেছে। ফলে সময়ের সাথে সাথে সবজি, ফল, মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন উদ্যান ফসলের চারা বিতরণের ফলে দেশব্যাপী উদ্যান ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে দেশের জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।

 

সেচ কার্যক্রম
বিএডিসি সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ  অবদান রাখছে। খাদ্য উৎপাদনে দেশে দুই ধরনের সেচ কার্যক্রম প্রচলিত আছে। বৃহৎ সেচ ও ক্ষুদ্রসেচ। বোরো মৌসুমে ক্ষুদ্রসেচের মাধ্যমে দেশের সেচকৃত জমির ৯৫% ভাগ এবং বৃহৎ সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে মাত্র ৫%  জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে সেচযোগ্য জমির প্রায় ৭২% সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ফসলে সেচ প্রদানের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিএডিসি বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করেছে।

 

সেচকাজে ভূপরিস্থ পানিসম্পদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করা
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার ভূপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহারে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদী, খাল-বিল বা অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। তবে ব্যবহারযোগ্য পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে কম খরচে গুণগত মানসম্পন্ন পানি ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোই এর উদ্দেশ্য। বিগত ৬ বছরে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার ১৮% থেকে বৃদ্ধি করে ২২% এ উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারে নিম্নবর্ণিত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।


সেচের পানির উৎস বৃদ্ধিকল্পে ভূপরিস্থ পানি (বৃষ্টি ও বন্যার পানি) সংরক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য খাল-নালা, পাহাড়ি ছড়া ইত্যাদি পুনঃখনন/সংস্কার;
 

ছোট নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপনের মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান;
জলাবদ্ধ এলাকায় খাল-নালা পুনঃখনন ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে কৃষি জমি পুনরুদ্ধার করে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি এবং সেচের নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি করা;

বৃষ্টি বা বন্যার পানি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকার Water control structure (যেমন: ক্রস ড্যাম, সাবমারসিবল ওয়্যার, বক্স কালভার্ট, ক্যাটল ক্রসিং ইত্যাদি) নির্মাণ;

 

বিএডিসির প্রধান প্রধান সেচ কার্যক্রম
সঠিকভাবে সেচের পানির ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাসের পাশাপাশি ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণ ও ফলন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত বিএডিসির মাধ্যমে সেচকৃত এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কার্যক্রম  বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

 

কৃষক প্রশিক্ষণ
বিএডিসির সেচ উইং কর্তৃক বাস্তবায়িত প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সেচ দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে সর্বমোট ৯৮,০৫৮ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পানির অপচয় হ্রাস ও কৃষকপর্যায়ে সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে।

পানির স্তর পরিমাপ
বিএডিসি কর্তৃক বাস্তবায়িত ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নে জরিপ ও পরিবীক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বমোট ২০১টি অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার স্থাপন করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অটোওয়াটার টেবিল রেকর্ডারের মাধ্যমে টাইম সিরিজ ডাটা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং ডিজিটাল ডাটা ব্যাংক প্রস্তুত করার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির তথ্য/উপাত্ত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। এ তথ্য ব্যবহার করে ইতোমধ্যে
Groundwater Zoning Map তৈরি করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে তা আপডেট করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের কোথায় কোন ধরনের সেচযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে তা সহজেই নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে।  ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নের লক্ষ্যে সেচযন্ত্র, সেচ এলাকা, সেচের পানি ইত্যাদির নিয়মিত জরিপ, অনুসন্ধান অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার ও পর্যবেক্ষণ নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীল পানির স্তর পরিমাপ করা এবং Space Technology (ST), Remote Sensing (RS), Geophysical Survey এর মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ করে, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন: Geographic Information System (GIS) Modeling এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ, পরিবীক্ষণপূর্বক সুপারিশ প্রণয়ন, প্রচার এবং ডাটাবেজ উন্নয়ন ও সরকারকে তা অবহিত করা হচ্ছে।


সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম
ফসল উৎপাদনে সার তথা গাছে পুষ্টি সরবরাহ করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিএডিসি প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রাথমিকভাবে ১৯৬২-৬৩ অর্থবছরে প্রায় ৫০,০০০ টন সার সংগ্রহ ও ডিলারপর্যায়ে বিতরণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সফল কার্যক্রম শুরু করে এবং পর্যায়ক্রমে সার বিতরণ কার্যক্রম কৃষকপর্যায়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিএডিসি গত ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার টন সার আমদানি ও প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার টন সার বিতরণ করে থাকে। তথাপি তৎকালীন বিএনপি সরকার দেশের জনগণের কল্যাণ তথা কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা না করে সরকারি সিদ্ধান্তক্রমে ১৯৯২ সাল  থেকে বিএডিসির মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। অতঃপর বেসরকারিভাবে সার আমদানি কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা ও কৃষকপর্যায়ে বিতরণে বিশৃঙ্খলার কারণে সুদীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর ২০০৬-০৭ অর্থবছর সরকার পুনরায় বিএডিসিকে বেসরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি নন-নাইট্রোজেনাস সার আমদানি ও বিতরণের দায়িত্ব অর্পন করে।


বর্তমান সরকার কৃষকদের কাছে গুণগত মানসম্পন্ন টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিসিআইসির সার ডিলারদের পাশাপাশি বিএডিসির বীজ ডিলারগণকে বিএডিসির সার ডিলার হিসেবে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বিএডিসির নিজস্ব সার ডিলার নেটওয়ার্ক ব্যাপকতা লাভ করে। অর্থাৎ বিএডিসির মাধ্যমে নিবন্ধিত সব ডিলারকে সার উত্তোলনের সুযোগ প্রদান করায় বিএডিসির সার কৃষকদের কাছে আরও সহজপ্রাপ্য হয়। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে বিএডিসির আমদানিকৃত সারের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০০৯ সালে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার গঠনের পর সারের দাম দফায় দফায় হ্রাস করা হয়।


সারের মূল্য হ্রাস ও মানসম্মত সার নিশ্চিত হওয়ায় নন-নাইট্রোজেনাস সারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস পেয়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হারে দেশের জাতীয় উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএডিসি কর্তৃক টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের আমদানি ও বিতরণ হচ্ছে।


অর্থাৎ বর্তমান সরকারের উন্নয়নের অন্যতম নিদর্শন সুলভ মূল্যে কৃষক পর্যায়ে সার বিতরণ। যে কারণে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
পাশাপাশি সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রাথমিকপর্যায়ে ৪৬২টি গুদাম নির্মিত হয়। পূর্ববর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বন্ধ হয় এবং বিএডিসিতে জনবল হ্রাসকরণের ফলে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো ও গুদামগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনায় অনেকটা বিপর্যয় নেমে আসে। তখন গুদাম কিংবা স্থাপনা সংস্কার কিংবা মেরামত কাজ একদম বন্ধ ছিল। ফলে সময়ের পরিক্রমায় অনেক গুদাম ও স্থাপনা জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে জরাজীর্ণ/ব্যবহার অনুপযোগী গুদাম/স্থাপনা পুনরায় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকারের আধুনিক উন্নত চিন্তার কারণে অব্যাহতভাবে সার আমদানি বৃদ্ধি ও ডিলার নেটওয়ার্ক বাড়ানোর পদক্ষেপের পাশাপাশি বিএডিসি সার সংরক্ষণের জন্য গুদামের প্রয়োজনীয় ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছে। সরকারের খাদ্য বিভাগ, বিসিআইসি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিএডিসির যেসব গুদাম ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পুনরায় বিএডিসির অধীনে ফেরত নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে বিএডিসির গুদামের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৯৮,০০০ মে. টন সেখানে বর্তমানে বিএডিসির ১২০টি গুদামের মোট ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ১,৭৫,৯৬৬ মে. টনে উন্নীত হয়েছে।


জৈবসার
বিএডিসির বীজ উৎপাদন খামারগুলোতে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝিনাইদহের দত্তনগর, খুলনার বোয়ালিয়া, মেহেরপুরের চিৎলা পাটবীজ খামার, নীলফামারী জেলার ডোমার বীজ আলু উৎপাদন খামার, নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর ডাল ও তেলবীজ খামার, গাজীপুরের কাশিমপুর উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিএডিসির অন্যান্য খামারেও  জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) উৎপাদন করা হবে। বাণিজ্যিকভাবে বিএডিসি জৈবসার (ভার্মি কম্পোস্ট) বাজারজাত করবে।


দেশের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার টেকসই রূপ দিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খাদ্য উৎপাদনের জন্য মানসম্পন্ন বীজ, সার এবং সেচের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকপর্যায়ে মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় তিউনিশিয়া, মরক্কো, বেলারুশ, রাশিয়া ও কানাডা হতে নন ইউরিয়া সার আমদানি এবং সেচ এলাকা সম্প্রসারণের মাধ্যমে পতিত জমি আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। মানসম্মত কৃষি উপকরণ তথা বীজ, সার ও সেচ সুলভ মূল্যে সহজলভ্য হওয়ায় ফসল উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কৃষি বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের মেরুদণ্ড। বর্তমানে কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত হওয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ন হচ্ছে। গ্রামীণ জনগণের আয় বেড়েছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, শিশু মৃত্যুর হার কমেছে, তথ্য প্রযুক্তিতে গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

মো. নাসিরুজ্জামান*
*চেয়ারম্যান  (অতিরিক্ত সচিব), বিএডিসি, সেচ ভবন, মতিঝিল, ঢাকা

বিস্তারিত
অভিবাসন রোধ ও গ্রামীণ উন্নয়নে ধানভিত্তিক খামার ব্যবস্থাপনা (কার্তিক ১৪২৪)

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশে শতকরা ৭৫ ভাগ লোক গ্রামে বাস করে। বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় ৫৯.৮৪ ভাগ এবং শহর এলাকায় ১০.৮১ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত (বিবিএস-২০১৬)। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৯.১% এবং কৃষি খাতের মাধ্যমে ৪৮.১% মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এক সময়ের খোরপোষের কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত। এদেশের শিক্ষিত তরুণরা কৃষির চেয়ে অভিবাসনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু অভিবাসনের ঝুঁকির চেয়ে সমবিনিয়োগে ধানভিত্তিক কৃষিচর্চা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে পারে।


জরিপে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে শহরমুখী গ্রামীণ অভিবাসনের হার ক্রমেই বাড়ছে। গ্রাম এবং ছোট্ট মফস্বল শহরগুলো থেকে বড় শহরে লোকজনের অভিবাসনের কারণগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক কারণটাই মুখ্য। অনেকের মতে, শহর এবং গ্রাম এলাকায় আয়ের বৈষম্যই শহরমুখী জনস্রোত বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। দারিদ্র্য, বছরজুড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নানা বিপর্যয়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন প্রভৃতির শিকার হয়ে গ্রামের অসহায় বিপর্যস্ত মানুষগুলো অনেকটা নিরুপায় হয়ে শহরমুখী হচ্ছে।


গ্রামে কাজ করার জন্য কৃষি শ্রমিক পাওয়াটা কঠিন ব্যাপার হয়ে গেছে। দুই চোখে নানা রঙিন স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে পা রাখা নারী-পুরুষগুলো যখন প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেকে দাঁড় করাতে পারেন না তখন শহরে কোনোভাবে মাথা গুঁজে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেন। যেখানে অনেক সময় সুস্থভাবে বসবাসের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থাকে না। অথচ গ্রামে তাদের ছিল চমৎকার সুন্দর ছিমছাম বসতবাড়ি ও ভরণপোষণের উপযুক্ত কৃষি জমি, বাড়ির পাশের আঙিনায় সবজি, আনাজপাতির চাষ। তাই শহরমুখী গ্রামীণ জনস্রোতকে নিরুৎসাহিত করতে হলে গ্রামেই তাদের কর্মসংস্থানের নানা আকর্ষণীয় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। বছরজুড়ে যেন কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে।


অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধানভিত্তিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও ধান চাষে আধুনিক জাত এবং প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশেই বিদেশের তুলনায় বেশি আয় করা সম্ভব। বীজ সরবরাহ, সার-সেচে ভর্তুকিসহ বহুমুখী সরকারি প্রণোদনার কারণে এখন ধান চাষ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় লাভজনক। দেশের বাজারে এখন একমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। বর্তমানে এক কেজি মোটা চালের দাম ৪০-৫০ টাকা। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায়। ফলে ধান উৎপাদন এখন আর কোনোভাবেই অলাভজনক নয়। আগে যেখানে হেক্টরপ্রতি ধানের গড় উৎপাদন ছিল ২ থেকে ২.৫ টন এখন নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তির কারণে তা ৩.৫ থেকে ৭.০ টনে দাঁড়িয়েছে।


দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করা হয়েছে উচ্চফলনশীল ধানের একাধিক জাত ও লাভজনক শস্যক্রম। যেমন- স্বল্প জীবনকালের খরা সহনশীল ব্রি ধান৫৬/খরা পরিহারকারী ব্রি ধান৫৭ এবং জিংক সমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ চাষ করে বৃষ্টি নির্ভর বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে বিনা সেচে ছোলা এবং মশুর চাষ করা যায় এমন একটি অধিক লাভজনক শস্যবিন্যাস তৈরি করেছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা। এ শস্য বিন্যাস অবলম্বন করে একটি জমির উৎপাদনশীলতা ১৮-৩২ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব (আরএফএস বিভাগ, ব্রি)। ফলে রাজশাহী অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা তাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে প্রবাসে অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে না দিয়ে তার অর্ধেক বা চার ভাগের একভাগ ব্যয়ে নিজের সামান্য জমিকে যথাযথ ব্যবহার করে ধানভিত্তিক কৃষি খামার ব্যবস্থা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে।


উত্তরের জেলাগুলোতে যেখানে বৃষ্টিনির্ভর স্বর্ণা জাতের প্রচলন ছিল সেখানে ব্রি উদ্ভাবিত আধুনিক আমন জাতগুলো যেমন- ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭১, ব্রি ধান৭২ জাতগুলো প্রবর্তন করার মাধ্যমে ফলনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এ জাতগুলোর ফলন জাতভেদে ৪.৫ থেকে ৬.০ টন/ হেক্টর এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। তাই পুরনো জাতের পরিবর্তে ব্রি উদ্ভাবিত এসব জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার ওই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। এছাড়া অঞ্চলভেদে খরাসহনশীল ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, জলমগ্নতা সহনশীল ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২, লবণাক্ততা সহনশীল ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৫৪ এবং ব্রি ধান৭৩, বন্যাত্তোর বিআর২২, বিআর২৩, ব্রি ধান৪১ এবং জোয়ারের পানি যেখানে জমে যায় সেসব এলাকায় ব্রি ধান৪৪, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ চাষ করে কাক্সিক্ষত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।


উত্তরাঞ্চলের বিশেষ সময়ের খাদ্যাভাব বা মঙ্গা নিরসনে ব্রি ধান৩৩/ব্রি ধান৬২-আগাম আলু-মুগ-ব্রি ধান৪৮ অধিক লাভজনক ধানভিত্তিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, যেটি অনুসরণ করে ওই এলাকার কৃষকরা মঙ্গা চিরতরে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের শহরমুখী বা দেশান্তরী হওয়ার যে প্রবণতা পূর্বে ছিল তা হ্রাসে দারুণ কাজে লেগেছে এ চার ফসলি শস্যক্রম। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ধান চাষের সুযোগ ও সম্ভাবনার বিষয়টি চোখে পড়ে কিছু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দিলে। গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা  গেছে, ধানের ফলন ও উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে যা যথাক্রমে বার্ষিক ০.০৭ টন/হেক্টর ও ০.৯ মিলিয়ন টন/বছর।


আবার বোরো মৌসুমে মেগা জাত (সর্বাধিক জনপ্রিয়) হিসেবে খ্যাত ব্রির জনপ্রিয় জাত ব্রি ধান২৮ ও ব্রি ধান২৯ এর চেয়েও অনেক ভালো জাত বর্তমানে রয়েছে, যার মধ্যে ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ ব্রি ধান৬০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭৪ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩ ও ৫ উল্লেখযোগ্য। লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৪৭ এর আধুনিক সংস্করণ ব্রি ধান৬৭। আউশে পারিজা, জামাইবাবু ও বিআর২৬ এর পরিবর্তে যথাক্রমে ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৬৫ এবং নেরিকা মিউটেন্ট প্রবর্তন করে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব।


অধিকন্তু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এমন কিছু ধান জাত উদ্ভাবন করেছে যেগুলো সুগন্ধি, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন। এসব ধান জাতের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ করেও লাভজনক খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। যেমন- ব্রি উদ্ভাবিত বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৩ ও ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি  ধান৮০ প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন জাত। বিআর১৬, ব্রি ধান৪৬ ও ব্রি ধান৬৯ লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (লো-জিআই) গুণসম্পন্ন জাত, এসব জাতের চালের ভাত ডায়াবেটিক রোগীরা নিরাপদে খেতে পারেন। ব্রি উদ্ভাবিত জিংক সমৃদ্ধ চারটি ধানের জাত ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২ এবং ব্রি ধান৭৪। এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জাতগুলোর ভোক্তা চাহিদা যেমন বেশি, বাজারমূল্যও অধিক। তাই ধানভিত্তিক খামার বিন্যাসে এ জাতগুলো উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অভিবাসনের অন্যতম বিকল্প হতে পারে। এ খাতে বর্ধিত হারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকৃত পুঁজি লাভসহ তুলে আনা সম্ভব।


ব্রি বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত দেশের কৃষকদের ব্যবহার উপযোগী ৩২টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করছে। চারা রোপণ, আগাছা নিধন থেকে ধান কাটা ও মাড়াই সব কিছুতেই লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। অভিবাসনের চিন্তা পরিহার করে সরকার ঘোষিত ৬০ শতাংশ ভর্তুকিতে কেনা একটি রাইস টান্সপ্লান্টার বা কম্বাইন হার্ভেস্টার স্ব-কর্মসংস্থানের অন্যতম উপায় হতে পারে। এছাড়া যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বর্তমানে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র বা ট্রান্সপ্লান্টার, রোটারি টিলার, ধান-গম কাটার যন্ত্র, ধান-গম মাড়াই যন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টার ও আগাছা দমন যন্ত্র বা উইডার ইত্যাদি। কৃষকরা এসব যন্ত্র নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও অন্যদের এসব সেবা প্রদান করে লাভবান হতে পারেন।


উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো ভালো বীজ। কথায় বলে ভালো বীজে, ভালো ফলন। ভালো বীজের অভাবে আমাদের কৃষকরা প্রায়শই প্রতারিত হন। এ পর্যন্ত মাত্র ৪৬ ভাগ চাষি মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করতে পারেন। বাকি ৫৪ ভাগ কৃষক নিজেদের অপেক্ষাকৃত কম মান সম্পন্ন বীজের ওপর নির্ভরশীল। মৌসুমভিত্তিক চিত্র হচ্ছে আমনে শতকরা ২০-২৩ ভাগ, আউশে শতকরা ১৬ ভাগ, এবং বোরোতে ৮০ শতাংশ কৃষক  মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার করে থাকেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্রি প্রতি বছর ১৫০ টনের অধিক ব্রিডার (প্রজনন) বীজ উৎপাদন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ব্রি থেকে ব্রিডার বীজ, ভিত্তি বীজ ও টিএলএস সংগ্রহপূর্বক সামান্য পুঁজি বীজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায় যা অভিবাসনের একটি বিকল্প হতে পারে।


এছাড়াও ধানভিত্তিক বিভিন্ন খাবার প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (যেমন- চিড়া, মুড়ি, খই, রাইস কেক, চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি পিঠা-পুলি), কম ছাটা বা ঢেঁকি ছাঁটা চাল (অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন), বিভিন্ন মৎস্য ও পশু খাদ্য প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সামান্য পুঁজি বীজ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। অভিবাসন ব্যয়ের সিকিভাগও যদি কৃষক পর্যায়ে উন্নত মান সম্পন্ন বীজ সরবরাহ, সার, সেচ সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উন্নত পুষ্টি ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন ধান উৎপাদন, ধানের চাল থেকে খাবার প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা যায় তাহলে কৃষকের যেমন ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমনি দেশের জাতীয় উন্নয়নেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর* ড. মো. আনছার আলী** মো. আবদুল মোমিন***
*মহাপরিচালক **পরিচালক (প্রশাসন)  *** ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা, ব্রি, গাজীপুর
E-mail-smmomin80@gmail.com

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল কৃষিনির্ভর এ দেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা। স্বাধীনতার অব্যহিত পরেই তিনি কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে Presidential Order No. ৩২ অর্ডিন্যান্স জারি করেন যার ফলে কৃষি গবেষণা এবং কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয় এবং কৃষি গবেষণার উন্নয়ন ও সমনি¦ত কার্যক্রমের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়। কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন এবং দেশ খাদ্যে স¦য়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে তিনি সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নং-৬২ এর মাধ্যমে ‘ডাইরেক্টরেট অব এগ্রিকালচার (রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন)’ এর বিলুপ্তি ঘোষণা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের সর্ববৃহৎ বহুবিদ ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দেশের সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রকার দানা জাতীয় ফসল, কন্দাল ফসল, ডাল, তেল, মসলা ফসল, সবজি, ফল, ফুল, সামুদ্রিক শৈবালসহ ২০৮টি ফসলের ওপর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠান এসব ফসলের খরা, লবণাক্ততা প্রতিরোধী, স্বল্প দৈর্ঘ্যরে বায়োফর্টিফাইড উচ্চফলনশীল উন্নত জাত এবং উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন, ফসল ব্যবস্থাপনা, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই প্রতিরোধী জাত ও ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, ফসলের সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, এলাকাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, হাইড্রোপনিক পদ্ধতি, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, সমন্বিত খামার পদ্ধতি উন্নয়ন, পাহাড়ি অঞ্চলে ফসল উৎপাদন এবং আর্থসামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে তা সম্প্রসারণকর্মী, কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মী কৃষকের নিকট হস্তান্তরের জন্য নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করে থাকে।
প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৫০৯টি জাত ও ৪৮২টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এসব জাত ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি তথা গ্রামীণ উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রেখে চলেছে।


যখন সব মানুষের সক্রিয় দৈনন্দিন সুস্বাস্থ্য জীবন যাপনের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিসমৃদ্ধ সুষম নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার থাকবে তখন তাকে খাদ্য নিরাপত্তা বলে। প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর জমির এ দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থসামাজিক এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা সম্ভ^ব। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি সারে উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি, জ্বালানি তেলে ভর্তুকি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের ফলে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।


দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর ফসলি জমি ০.৭৩% হারে কমে যাচ্ছে (এসআরডিআই ২০১৩)। ফলে চাষের জমি সম্প্রসারণের সুযোগ কম। তাই দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গ্রামীণ উন্নয়নের লাভজনক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার একান্ত প্রয়োজন।


বিভিন্ন ফসলের আধুনিক চাষাবাদের জন্য ফসল, মাটি এবং বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর ২১৩টি উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন। বায়োটেকনোলজির ওপর ১৮টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য ৩৫টি কৃষি যন্ত্র সংক্রান্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর ৩৬টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। চার ফসলভিত্তিক ১২টি লাভজনক শস্য বিন্যাসের উদ্ভাবন। শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তির ওপর ২৮টি প্রযুক্তির উদ্ভাবন। খামার পদ্ধতি গবেষণার আওতায় ১৩০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন। প্রতি বছর  ১০ হাজারের অধিক বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান


নিয়মিত ত্রৈমাসিকভিত্তিক একটি আধুনিক জার্নাল, বারি সংবাদ, বারি প্রযুক্তি বইসহ অসংখ্যা বুকলেট, লিফলেট ও বই প্রকাশ। বিভিন্ন ফসলের ১০ হাজারের অধিক জার্মপ্লাজম বারি জার্মপ্লাজম কেন্দ্রে সংরক্ষণ।


প্রতি বছর ১০০০ টন বিভিন্ন ফসলের উন্নত বীজ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয় এবং পরে ঐসব প্রতিষ্ঠান বীজ বর্ধিত করে সারা দেশের কৃষকদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।
বিশে^র মধ্যে বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে ৩য় স্থান এবং ফল উৎপাদনে ৮ম স্থান অর্জন করেছে।
সেক্স ফেরোমন এবং আইপিএম প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রবর্তনে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার প্রায় ৫০ হাজার টন থেকে ৩৫০০ টনে নেমে এসেছে।
কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উন্নয়নে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার, কেআইবি পুরস্কারসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে। বিজ্ঞান ও কৃষি উন্নয়নে অবদানের জন্য এ প্রতিষ্ঠানের অনেক বিজ্ঞানী স্বাধীনতা পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারসহ বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সংস্থা কর্তৃক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত  প্রযুক্তিগুলো নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।
বিগত চার দশকে গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফলমূল, ফুল, মসলা ইত্যাদি ফসলের বারি উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মাঝে প্রবর্তনের ফলে উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বেড়েছে। বারি উদ্ভাবিত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি হচ্ছে-

 

গম
বিএআরআই এ পর্যন্ত গমের ৩২টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির প্রয়োগ, লবণাক্ততা ও তাপ সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের ফলে বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। বারি গম-২৫ থেকে বারি গম-৩২ পর্যন্ত  দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারা দেশে এ জাতগুলোর আবাদ বৃদ্ধি করার ব্যাপক সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
 

ভুট্টা
একটি অতি উচ্চফলনশীল ফসল। দেশে পোলট্রি শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে ভুট্টার চাহিদা ক্রমান¦য়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩১ লাখ টন ভুট্টা উৎপন্ন হয়। বিএআরআই এ পর্যন্ত ১৫টি হাইব্রিড জাতসহ মোট ২৪টি ভুট্টা জাত উদ্ভাবন করেছে। খরা অঞ্চলের জন্য ভুট্টার ২টি হাইব্রিড জাত- বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ ও বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩ ও বেবিকর্নের ১টি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।

 

কন্দাল ফসল
কন্দাল ফসলের মধ্যে আলু, মিষ্টি আলু এবং কচু খাদ্য ও সবজির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫.৬৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে কন্দাল ফসলের চাষ করা হয় যার বার্ষিক উৎপাদন ৯৫ লাখ টন। বিএআরআই এ পর্যন্ত মোট ১০৮টি উচ্চফলনশীল কন্দাল ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে আলুর ৮৭টি জাত, মিষ্টিআলুর ১৩টি ও কচুর ৭টি উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি জাত (বারি আলু ৩৫, বারি আলু ৩৬, বারি আলু ৩৭, বারি আলু ৪০ ও বারি আলু ৪১) বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সংকরায়নের মাধ্যমে ক্লোনাল হাইব্রিড জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩০-৩৫ টন, যা বর্তমানে প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে ২০-৩০% বেশি। এসব জাতের মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী।

 

ডাল জাতীয় ফসল
ডাল জাতীয় ফসল বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আমিষের প্রধান উৎস ডাল। জমির স¦ল্পতা, ডাল ফসলের কম উৎপাদনশীলতা, উন্নত জাতের অপ্রতুল ব্যবহার এবং উৎপাদন কলাকৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ না করাই ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়। বিএআরআই ৬টি ডাল ফসলের ৩৯টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করছে যার মধ্যে নতুন জাত (বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮,  বারি খেসারি-৩, বারি ছোলা-৯ ও বারি ফিল্ড পি-১) উদ্ভাবিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মসুর, মুগ ও ছোলার জাত চাষ করে ২৫-৩০% ডালের ফলন বাড়ানো সম্ভব।

 

তেল জাতীয় ফসল
তেল জাতীয় ফসল বাংলাদেশের কৃষি পণ্য উৎপাদনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যে পরিমাণ তেল বীজ উৎপাদিত হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বিএআরআই এ পর্যন্ত ৮টি তেলবীজ ফসলের ৪২টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি সরিষা-১৬, বারি তিল-৪ দুটি উচ্চফলনশীল জাত, দেশের লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকাতেও ভালো ফলন দিতে সক্ষম। উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত বারি সরিষা-১৪ ও বারি সরিষা-১৫ এবং বারি সরিষা-১৭ রোপা আমন-বোরো ধান শস্যবিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করে সরিষার উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব। কৃষকের জমিতে জনপ্রিয় এ জাত তিনটির সন্তোষজনক ফলন লক্ষ করা যাচ্ছে ।

 

সবজি, ফল ও ফুল
সবজি খাদ্যপ্রাণ ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানুষের স¦াস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক সবজির চাহিদা ২২০ গ্রাম অথচ সরবরাহ মাত্র ৬০ গ্রাম। সবজির ঘাটতি পূরণের জন্য বিএআরআই এ পর্যন্ত ২৯টি সবজি ফসলের মোট ১০৪টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে বেগুনের দুটি হাইব্রিড ও গ্রীষ্মকালীন টমেটোর দু’টি হাইব্রিড জাতও রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ করে সারা বছর টমেটোর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং অমৌসুমে টমেটোর আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়েছে। বারি সরিষা ১৬, বারি হাইব্রিড টমেটো ৭, বারি হাইব্রিড টমেটো ৮ ফল সবজির মতো খাদ্য প্রাণ ও খনিজ সমৃদ্ধ খাদ্য, যা মানুষের স¦াস্থ্য রক্ষায় অপরিহার্য। মাথাপিছু দৈনিক ৮৫ গ্রাম ফলের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন থেকে আসে মাত্র ৩৫ গ্রাম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ যাবৎ ২৭টি ফল ফসলের ৭৯টি উন্নত জাতসহ ফল উৎপাদনের বেশ কিছু কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছে।


আমাদের দেশে ফুলের গবেষণা একটি নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ ক্ষেত্রটির সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিএআরআই বিভিন্ন ফুলের ১৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে গত সাড়ে ৪ বছরে ফুলের ১৩টি উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকার ২টি, অ্যালপেনিয়ার ১টি, গাঁদার ১টি, লিলির ১টি, ডালিয়া ও জারবেরার ২টি ও গ্লাডিওলাসের ৩টি জাত উল্লেখযোগ্য।


হাইড্রোপোনিক পদ্ধতি
বাংলাদেশে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ মোকাবিলার জন্য শুধু আবাদি জমির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এক্ষেত্রে চাষ অযোগ্য পতিত জমি, বিল্ডিংয়ের ছাদ বা ঘরের বারান্দায় হাইড্রোপোনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বড় স্টিলের বা প্লাস্টিকের ট্রেতে পানির মধ্যে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করা হয়। এরই মধ্যে টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস, ফুলকপি, শসা, করলা, শিম, খিরা, স্ট্রবেরি, গাঁদা এবং গোলাপ ইত্যাদি ফসল সাফল্যজনকভাবে এ পদ্ধতিতে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে।


মসলা ফসল
মসলা জাতীয় ফসল বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়। বিএআরআই তে মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পর পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ, আলুবোখারা ইত্যাদিসহ ১৭ ফসলের ৩৩টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে । যার মধ্যে বারি পেঁয়াজ-২, ৩, ৫  এবং বারি মরিচ-৩ সারা বছর চাষ উপযোগী জাত।

 

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ
বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সময় ও শ্রম সাশ্রয় কৃষি কাজ লাভজনক করার জন্য গবেষণার মাধ্যমে ৩৫টি কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এর মধ্যে হাইস্পিড রোটারি টিলার, স্ট্রিú টিলেজ, পাওয়ার টিলার চালিত ইনক্লাইন্ড প্লেট সিডার, পিটিওএস, বেড প্লান্টার, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, শক্তি চালিত ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শক্তি চালিত শস্য মাড়াই যন্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা কৃষকপর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। কৃষিকাজে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সময়ের সাশ্রয় হবে অপরদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে এবং ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

 

ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তি বর্তমান সরকারের সময়ে বিএআরআই ফসল, পানি, সার ও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় দমন, জীব প্রযুক্তি, হাইড্রোপোনিক, আইপিএমসহ ফসল, মৃত্তিকা, পানি, রোগ ও পোকা মাকড় দমন ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ২১৩টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এসব প্রযুক্তি প্রতিকূল পরিবেশে বিশেষ করে, লবণাক্ত, খরা, জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি এলাকা ও চরাঞ্চলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।


রোগবালাই প্রতিরোধী জাত
বালাইনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে পরিবেশবান্ধব আইপিএম পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণার ওপর যথেষ্ঠ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এক্ষেত্রে সবজি ও ফলের বেশ কয়েকটি ফসলের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা
(IPM) প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে- যা মাঠপর্যায়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। জিএমও ফসলের ওপর গবেষণা, রোগবালাই প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনে Biotechnology গবেষণার প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেয়া হয়েছে। বিএআরআই কর্নেল ইউনির্ভাসিটির সহযোগিতায় এরই মধ্যে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী Bt Brinjal এর চারটি ট্রান্সজেনিক জাত (বারি বিটি বেগুন-১, ২, ৩ এবং ৪) উদ্ভাবন করেছে। বেগুনের এসব জাত কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তাছাড়া Bt Brinjal এর আরও তিনটি জাতসহ আলুর নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধী ৎন মবহব সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক আলুর জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত নাবি ধসা রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের ফলে আলু চাষে কৃষকদের মধ্যে আরও উৎসাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উৎপাদন খরচ কমে গেছে। ফলে দেশে রেকর্ড পরিমাণ আলু প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশে আলু থেকে স্টার্চ ও জাংকফুড তৈরিসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠছে। এ জাতগুলো হচ্ছে- বারি আলু-৪৬, বারি আলু-৫৩ এবং বারি আলু-৬৮। রোগ ও পোকামাকড় সহনশীল জাতগুলো হচ্ছে-বারি মৌরি-১, বারি মৌরি-২, বারি শিম-৮, বারি কামরাঙা শিম-১, বারি ঝিঙা-২, বারি গম-৩০ (মরিচা, ছত্রাক), বারি গম-২৯ (ইউজি ৯৯ প্রতিরোধী), বারি মটর-১, বারি মরিচ-৩, বারি গম-২৭ (ইউজি-৯৯ প্রতিরোধী), বারি হাইব্রিড বেগুন-৪ (উইল্ট প্রতিরোধী), বারি বেগুন-১০ (উইল্ট, পড বোরার), বারি সয়াবিন-৬ (মোজাইক ভাইরাস প্রতিরোধী) বারি রসুন-৩, বারি রসুন-৪ ভাইরাস রোগ সহনশীল।


 জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফসল উৎপাদন সমস্যা যথা- লবণাক্ততা, উষ্ণতা, খরা, ভূ-গর্ভস্থ পানির সমস্যা ও বন্যা প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বিএআরআই ফসলের প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে যার মধ্যে তাপ সহিষ্ণুজাতগুলো হচ্ছেÑ বারি গম-২৬ বারি গম-২৮, বারি গম-২৯, বারি গম-৩০, বারি গম-৩১, বারি গম-৩২, বারি বার্লি-১, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২, বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৩, বারি চীনাবাদাম-৮, বারি চীনাবাদাম-১০, বারি আলু-৭৩, বারি হাইব্রিড টমেটো-৮, বারি বেগুন-১০। খরাপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী এবং ভালো ফলন দিতে সক্ষম জাতও উদদ্ভাবন করা হয়েছে। লবণাক্ত এলাকার চাষের উপযোগী স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়েছে এবং দক্ষিণ অঞ্চলে লবণাক্ত এলাকায় কৃষক পর্যায়ে ভালো ফলন দিচ্ছে এবং জনপ্রিয়ও হচ্ছে। প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী এ জাতগুলো হলো- বারি গম-২৫, বারি বার্লি-৭, বারি সরিষা-১৬, বারি তিল-৪, বারি আলু-৭২, বারি মুগ-৬, বারি ছোলা-৯। এসব জাত জলবায়ুূ পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।


বায়োফর্টিফাইড জাত
পুষ্টিমান খাদ্য এককভাবে ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে পারে না। শক্তি, প্রোটিন এবং গৌণ পুষ্টি উপাদানগুলো খাদ্য-নিরাপত্তায় বিশেষভাবে প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বর্তমানে দৈনন্দিন খাদ্য অভ্যাসে বহুমুখীকরণের জন্য অপ্রচলিত ফসলের প্রচলন, ব্রিডিং প্রক্রিয়ায় বায়োফর্টিফাইড জাত (আয়রন, জিংক এবং ভিটামিন-এ) উদ্ভাবন এবং খাদ্য নিরাপদ রাখার জন্য উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের গরিব মানুষের পুষ্টিহীনতা অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব হবে। বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত ক্যারোটিন সমৃদ্ধ বারি মিষ্টিআলু-১০, বারি মিষ্টিআলু-১১, বারি মিষ্টিআলু-১২, জিংক, আয়রন ও সেলিনিয়াম সমৃদ্ধ বারি মসুর-৫, বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৭, বারি মসুর-৮, জিংক সমৃদ্ধ বারি গম-৩৩।


ফসল বিন্যাস এর ওপর গবেষণা কার্যক্রম চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন হওয়ায় এটা সম্ভব হচ্ছে।


সামুদ্রিক শৈবাল (Seaweed) গবেষণা  
সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণাও উন্নয়ন জোরদারকরণের মাধ্যমে দেশের ব্লু ইকোনমিতে অবদান রাখার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিএআরআই, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ এর মাধ্যমে সামুদ্রিক শৈবালের উপর গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ কক্সবাজারে শুরু করেছে। মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও ডেইরি, ঔষধ, টেক্সটাইল, জমিতে সার, প্রাণিখাদ্য, লবণ ও কাগজ শিল্পে সামুদ্রিক শৈবাল অ্যাগার কিংবা জেল জাতীয় দ্রব্য ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।


টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীগণ চার দশক ধরে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে ফসলের নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে চলেছে। শুধু প্রযুক্তির উদ্ভাবন হলেই হবে না এগুলো দ্রুত কৃষকদের কাছে হস্তান্তর করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কৃষি গবেষণার সহিত সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও অন্যান্য দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে সম্পর্ক জোরদারকরণ করতে হবে। কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণ, রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন, টেকসই উন্নয়ন  লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়ন কর্মসূচি ইত্যাদিতে সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কৃষি গবেষণাকে আরও শক্তিশালী ও জোরদারকরণ এবং বিজ্ঞানীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি গবেষণা উদ্ভাবিত জাত ও লাগসই প্রযুক্তিগুলো সরকারি, বেসরকারি এনজিও ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে হস্তান্তর করা গেলে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন করা সম্ভব।

 

ড. মো. আককাছ আলী*

* প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বিস্তারিত
খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে সুগারক্রপ (কার্তিক ১৪২৪)

কৃষি প্রধান দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এক কথায় আমরা বলি সোনার বাংলা। সত্য সত্যই এ বাংলা সোনা ফলানো বাংলা। ফসলের সমারোহে পীতে-হরিতে, সবুজে-শ্যামলে এ দেশ ভরপুর। অন্ন সমস্যা যে দেশে প্রকট, সে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে অচিরেই। আজকের দিনে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের যা আশু এবং অবশ্যম্ভাবী করণীয় তা হলো কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত ফলনকে সুনিশ্চিত করা। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জিডিপির প্রায় ১৫.৩৩ শতাংশ (বিবিএস, ২০১৫)  অর্জিত হয় কৃষি খাত থেকে। কৃষি খাতে চলমান প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩৫ (বিবিএস ২০১৬)। দেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান আসে কৃষি খাত থেকে। এ ছাড়াও প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন নতুন মুখের জন্য ৩ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্যের জোগান দিতে হয় এ খাতকে।


কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে জনগণ তাদের আয়ের বেশির ভাগ খাদ্যের জন্য ব্যয় করে থাকে। রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো সব সময়ে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয়হীনতার অভাবে ক্রমে প্রকট হয়ে উঠছে খাদ্য সংকট। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমি কমার কারণে গত ১০ বছরে জমির পরিমাণ ও উৎপাদন ২০ থেকে ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কৃষি খাতকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ১৫.১৮ মিলিয়ন (বিবিএস, কৃষি শুমারি ২০০৮) কৃষি পরিবারের (যাদের মধ্যে ৮৪.৩৮ শতাংশ পরিবারে জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ হেক্টর) জীবিকা অর্জনে কখনও কখনও অসম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য বিপুলসংখ্যক গরিব ও ভূমিহীন পরিবারের কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পরিস্থিতির জটিলতা আরও বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার মানোন্নয়নে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি কাজে জমির ওপর ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার চাপ, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যাধিক্য, মাটির স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি, সেচ পানির অপ্রতুলতা ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, দানাদার ফসল উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব প্রদান, মানসম্মত বীজের অপ্রতুলতা, কৃষকের চলতি মূলধনের অভাব, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ধীরগতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং অন্যান্য সমস্যা কৃষি খাতে সাফল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়াও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ যেমন- কৃষি জমির শিল্প দূষণ, কৃষি জমি অকৃষিতে রূপান্তর, পাহাড়ধস ইত্যাদি কারণে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে এবং অভিবাসন হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ বলেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০০৭ সালে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের জনসাধারণ বিশেষ করে চরাঞ্চল, নদী, পাহাড়, বরেন্দ্র, হাওর ও সমুদ্র উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন-বন্যা, খরা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, পাহাড়ধস ইত্যাদি কারণে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়। বর্তমানে জনসংখ্যার ৪০% দরিদ্র। এর মধ্যে ২০% অতিদরিদ্র। চরাঞ্চলে ৮৮% দরিদ্র এবং ৪৪% অতিদরিদ্র এবং ৫% জনগোষ্ঠীর অরক্ষিত বসতি রয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার সাথে সাথে অভিবাসন হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।


সুগারক্রপ চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ
খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে সুগারক্রপের গুরুত্ব এদেশে অপরিসীম। ইক্ষুর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ দেশের চিনি ও গুড় শিল্প, যা উত্তরাঞ্চলের একমাত্র ভারী শিল্প। তাই উত্তরাঞ্চলের তথা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইক্ষুর অবদান সবচেয়ে বেশি। চিনিকল এলাকায় প্রায় ৬ লাখ চাষি পরিবার সরাসরি ইক্ষু চাষের ওপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া চিনিকল বহির্ভূত গুড় উৎপাদন এলাকায় এবং চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু উৎপাদনের জন্য সারা দেশে প্রায় ২০ লাখ চাষি পরিবার ইক্ষু ফসলের ওপর নির্ভরশীল। চিনিকলগুলো প্রতি বছর ইক্ষু চাষিদের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে, ২৫০-৩০০ কোটি টাকার ইক্ষু ক্রয় করে এবং নিজ নিজ এলাকার সড়ক, জনপথ, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুতায়ন, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি গড়ে ওঠায় চিনিকলগুলোই গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হচ্ছে চিনি শিল্পে। এ ছাড়া ৬০ মিলিয়ন কৃষি পরিবার, ব্যবসায়ী, শ্রমিক চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু এবং গুড় উৎপাদনের সাথে জড়িত। তা ছাড়া ইক্ষু রোপণ, আন্তঃপরিচর্যা, কর্তন, মাড়াই, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে কর্মসংস্থান হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের।


মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য মানবদেহের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান। বিশেষ করে মেধাশক্তি বিকাশে এর বিকল্প নেই। আমাদের দেশে সাধারণত  চিনি ও গুড় মিষ্টিজাতীয় খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী জনপ্রতি বার্ষিক ১৩ কেজি চিনি/গুড় খাওয়া প্রয়োজন। সেই হিসাবে দেশে ২০২১ সালে প্রাক্কলিত ১৭.২০ কোটি জনসংখ্যার জন্য দরকার হবে ২৩ লাখ  টন চিনি ও গুড়। বর্তমানে প্রতি বছর ১.৮০ লাখ হেক্টর জমিতে ইক্ষু আবাদের মাধ্যমে দেশে ১৫টি চিনিকলে ২.১০ লাখ টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে প্রায় ১.০০-১.৫০ লাখ  টন চিনি এবং ৬.০০ লাখ  টন গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। এতে করে চিনি/গুড়ের মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭.৫০ লাখ টন। ফলে চিনি/গুড়ের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪.৮৬ লাখ টন। এ চাহিদা পূরণ করতে সরকারকে প্রতি বছর ১৪-১৬ লাখ টন চিনি বিদেশ থেকে  আমদানি করতে হয়। বর্তমানে ইক্ষু চাষাযোগ্য জমির পাশাপাশি পতিত জমির সদ্ব্যবহার, উপকূলীয় এলাকার ২০ লাখ হেক্টর জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, চরাঞ্চলের ২ লাখ হেক্টর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অব্যবহৃত জমির একটা অংশ গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যে চাষের আওতায় নিয়ে এসে ঘাটতি পূরণের এ কাজটি সফলভাবে করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইক্ষুর পাশাপাশি ট্রপিক্যাল সুগারবিট, খেজুর, তাল, গোলপাতা, স্টেভিয়া প্রভৃতি অপ্রচলিত মিষ্টি উৎপাদনকারী ফসল থেকেও চিনি, গুড়, সিরাপ, জুস উৎপাদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।


এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে বছরে প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া কৃষককে আর্থসামাজিক অবস্থা ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে দেশে খাদ্যশস্যের চাহিদা পূরণের জন্য শুধু ইক্ষুর একক আবাদ যুক্তিযুক্ত নয়। আবাদযোগ্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত ফসল বিন্যাসের সাথে ইক্ষু ও সাথী ফসলের আবাদ সমন্বয় করা প্রয়োজন। চাষযোগ্য পতিত ৩.২৩ লাখ হেক্টর জমিসহ পাহাড়ি এলাকা, সমুদ্র উপকূলবর্তী ২০ লাখ হেক্টর, বরেন্দ্র এলাকার প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর এবং চর এলাকার প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুগারক্রপ চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে হাইওয়ে রয়েছে প্রায় ২.৫ হাজার মাইল, গ্রাম্য কাঁচারাস্তা রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মাইল, ইট বিছানো রাস্তা প্রায় ১.৫ হাজার মাইল, নিয়মিত বাঁধ ও বেড়িবাঁধ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাইল, মিটার গেজ রেলপথ আছে প্রায় ১.২ হাজার মাইল ও ব্রড গেজ রেলপথ রয়েছে ৬ শত মাইল। অর্থাৎ মোট রাস্তার পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার মাইল। দুই ধার হিসাবে ২ লাখ ১২ হাজার মাইল। ২০ ফুট পরপর একটি করে তাল বা খেজুর গাছ এসব পতিত জমির এক-চতুর্থাংশে লাগানো হলেও প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ গাছ লাগানো সম্ভব। তাছাড়াও জমির আইল, পুকুর/খালের পাড়, দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় কয়েক কোটি খেজুর, তাল ও গোলপাতা গাছ লাগানো সম্ভব। প্রতি বছর যদি এক কোটি গাছ থেকে গুড় উৎপাদন করা হয় (গড়ে ১০ কেজি হিসাবে) তবে ১ লাখ টন গুড় উৎপাদন করা সম্ভব যার বাজার মূল্য প্রতি কেজি ৮০ টাকা হিসাবে ৮ কোটি টাকা, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


বসতবাড়ির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রত্যেক বাড়ির আনাচে-কানাচে চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষু ও স্টেভিয়া চাষ, পরিবারপ্রতি একটি করে তাল ও একটি করে খেজুর গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রায় কয়েক কোটি গাছ লাগানো সম্ভব, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কৃষকদের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা পূরণ করবে এবং অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ১৮,৪৯,০০০ একর বসতবাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ১,৭৮,০০০ একর শহর এলাকায় এবং ১৬,৭১,০০০ একর গ্রাম এলাকায় (Statistical Pocket Book, Bangladesh, 2006) । বন্যা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিকভাবে পানি ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে ইক্ষুর রস ব্যবহার করার লক্ষ্যে বাড়ির আঙিনায় চিবিয়ে খাওয়া আখের কয়েকটি ঝাড় লাগিয়ে উৎপাদিত আখ বছরব্যাপী ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।


গ্রামীণ উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার উপযোগী আখ, তাল, খেজুর ও গোলপাতার স্বাস্থ্যসম্মত দানাদার/পাটালি গুড়, সিরাপ, জুস, তালমিশ্রি ইত্যাদি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে সমবায় সমিতি প্রবর্তনের মাধ্যমে চাষিদের অবস্থার উন্নতি সাধন করে আমরা সুফল পেতে পারি। বাংলাদেশে বহু পতিত জমি, খাল-বিল, ডোবা, পাহাড়, চরাঞ্চল, বরেন্দ্র, সমুদ্র উপকূলীয় অধিকাংশ এলাকা এখনো অনাবাদি। এগুলো চাষোপযোগী করলে আমরা অধিক পরিমাণে খাদ্য ফলাতে পারি। তাছাড়া বন্যাক্রান্ত অধিকাংশ এলাকার ফসল বিনষ্ট হওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ইক্ষু একমাত্র ফসল, যা বন্যাকালীনও জমিতে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নষ্ট হয় না। বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুষ্টি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তাল ও খেজুর গাছ রোপণ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আমন ধান রোপণের পর আশ্বিন-কার্তিক মাসে মানুষের হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকায় অলস বসে থাকে এবং অভিবাসনের হার বৃদ্ধি পায়। ওই সময় হচ্ছে ইক্ষুর রোপণ ও কাটার সময়। ইক্ষু রোপণের জন্য বীজ খ- তৈরি, শোধন, নালা তৈরি, জমি তৈরি, রোপণ, আন্তঃপরিচর্যা এবং কর্তনকৃত আখ থেকে গুড় মাড়াই, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর  আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি অভিবাসন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-


খাল কেটে পানি সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন, পোকামাকড় ধ্বংস, প্লাবন ও লোনাপানির হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে পারলে খাদ্য ঘাটতি বহুল পরিমাণে হ্রাস করা সম্ভব।
কৃষক সংগঠন/উৎপাদক দল গড়ে তোলা এবং তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য যথাযথ সহায়তা প্রদান।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ।
কৃষিঋণ কার্যক্রম সহজীকরণ এবং প্রকৃত কৃষক যেন ঋণ পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করা।
উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
কৃষকগণ যেন ফসল  উৎপাদন লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা।
সময়মতো কমমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
গবেষণা-সম্প্রসারণ-কৃষক-বাজার সংযোগ শক্তিশালী করা।
গুদামজাতকরণ সুবিধা বৃদ্ধি করা।
কৃষি পণ্যের বাণিজ্যিক চাষাবাদে উৎসাহ প্রদান।
শস্য বীমা চালুকরণ।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা।
উৎপাদনমুখী বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পরীক্ষণ, প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ইত্যাদি।

 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অতীতের উন্নত জাতিগুলো কৃষি কার্যেও উন্নত ছিল। প্রাচীন মিসরবাসী পালাক্রমে ভিন্ন ভিন্ন শস্যের চাষ জানত। উষ্ণ মরুভূমি, হাজার বছরের পতিত জমি যেসব জায়গায় ফসল ফলানোর কথা কল্পনাও করা যেত না এক সময়, সেখানে আজ অতি প্রয়োজনীয় সব ফসল ফলছে। পরিবার পরিকল্পনা, অধিক খাদ্য ফলাও, একটি বাড়ি একটি খামার ইত্যাদি অভিযান সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে পারলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়ন এবং অভিবাসন রোধ সম্ভব। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে আবাদযোগ্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ও সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত ফসল বিন্যাসের সাথে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল ফসলের আবাদ সমন্বয় করা তাই সময়ের দাবি।

 

কৃষিবিদ ড. মো. আমজাদ হোসেন* কৃষিবিদ ড. মো. নূর আলম মিয়া**
*মহাপরিচালক **বিভাগীয় প্রধান, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা

 

বিস্তারিত
অভিবাসন ব্যবস্থাপনা : গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

বছর ঘুরে আবারও এলো ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস প্রতি বছরের মতো নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে হাজির। এবারের প্রতিপাদ্য ‘অভিবাসনের ভবিষ্যৎ বদলে দাও, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াও’। Change the Future Migration Invest in Food Security and Rural Development| এবারের প্রতিপাদ্যে তিনটি অংশ স্পষ্ট। অভিবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা আর গ্রামীণ উন্নয়ন। এ তিন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হবে এবারের প্রতিপাদ্যের মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে আমরা সুনির্ধারণ করতে পারব আমাদের করণীয়।


মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে অভিবাসনের যাত্রা। অভিবাসন কোনো সুনির্দিষ্ট একক কারণে নয় বহুবিদ কারণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, সুখ, শান্তি, দুর্ভিক্ষ, পরিবর্তিত জলবায়ু এসব মূলত দায়ী। সে কারণেই অভিবাসন রোধ ও ব্যবস্থাপনা বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, গবেষকরা বের করেছেন অভিবাসন শুধু দেশে থেকে দেশান্তরই নয় বরং দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসন হার অনেক বেশি। পৃথিবীটাই একটা বিরাট গ্রাম। গ্রামীণ উন্নয়ন সুনিশ্চিত হলে গ্রামের শত কোটি মানুষ যেমন সুখে থাকবে তেমনি পরিকল্পিতভাবে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। তবেই আমরা আয়েশি জীবন যাপনে অনেকটুকু এগিয়ে যেতে পারব। পারব শুভ সুন্দর আগামীর পথে পথ চলতে। তখন অনাকাক্সিক্ষত অভিবাসন রোধ হবে।
 

বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ গ্রামীণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত এবং তারা তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ তিতীক্ষা দিয়েও নিজ বাসভূমি আঁকড়িয়ে থাকতে চান অনাদিকালের চেনা পথ ধরে। ছোটখাটো দুর্যোগ দুর্বিপাকে তারা নিজেরা নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে নিজেদের খাপ-খাওয়ানোর কৌশল অর্জন করে স্থিত থেকে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে অহর্নিশ। কিন্তু কখনও কখনও এ চিরায়ত অবস্থান অসহনীয় হয়ে যায়। তখনই তারা দেশান্তরিত হয়, কিংবা স্থানান্তরিত হয়, রূপান্তরিত হয়। ২০১৫ সালে ২৪৪ মিলিয়ন মানুষ আন্তর্জাতিক অভিবাসী হয়েছে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী শুধু দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসনের সংখ্যা ৭৬৩ মিলিয়ন যা আন্তর্জাতিক অভিবাসনের চেয়ে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের গড় বয়স ১৫ থেকে ৩৪ এর মধ্যে। তার ভেতরেও আবার প্রায় অর্ধেক নারী। অভিবাসন চিত্রে গ্রাম থেকে শহরে আসার সংখ্যাই বেশি এবং তাহলো ৭৫ শতাংশ। দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব, অভাব, অনটন, সম্পদের অভাব, জীবন যাত্রার মান কাক্সিক্ষত না হওয়ার কারণেই অভিবাসন বেশি ঘটে। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবর্তিত জলবায়ু এবং আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট দুর্যোগই প্রধান। পরিসংখ্যান বলে আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তুর মধ্যে অন্তত ৪ ভাগের ১ ভাগ তিনটি দেশে সীমাবদ্ধ। আর এ তিনটি দেশ হলো তুরস্ক, পাকিস্তান এবং লেবানন।


অভিবাসন শুধু দেশ থেকে দেশ নয়। দেশের ভেতরেও হতে পারে। ১৯৭৪ সালের পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশের কোনো শহরের জনসংখ্যা ১ মিলিয়ন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে রাজধানী ঢাকা ১০ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি মহানগরীতে পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের নগর জনসংখ্যার অবস্থান পর্যালোচনা করলে  দেখা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার আয়তন বহুলাংশে বেড়েছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে এ নগরগুলো দেশের মোট শহরবাসীর এক-তৃতীয়াংশ ধারণ করত। ১৯৯১ সালে এ হার দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মাত্র ৭.৬ শতাংশ লোক শহরে বাস করত, ১৯৯০-এর দশকে এ হার ২০ শতাংশে উন্নীত হয়। ১৯৭৫-১৯৯০ সালে বাংলাদেশে শহরের জনসংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪ শতাংশ যা প্রতিবেশী অনেক রাষ্ট্র এবং এশিয়ার জনবহুল রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।


গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন প্রায়শ দ্বিমুখী পরিণতির জন্ম দেয়। একটি সুবিধাজনক এবং অন্যটি ক্ষতিকর। এছাড়া মিশ্র ফলও লক্ষ্য করা যায়। তবে কর্মসংস্থান এবং অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে অভিবাসনের ইতিবাচক প্রভাবই বেশি। সাময়িক অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ তাদের গ্রামের স্বজনদের কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ঢাকা শহরের বস্তি এলাকায় বসবাসরত অভিবাসীরা তাদের উপার্জনের বেশির ভাগই ব্যয় করে পরিবারের খাবার এবং সন্তানের শিক্ষার জন্য। অভিবাসনের মাধ্যমে মানুষ ভাগ্যান্বেষণে স্বল্প সম্ভাবনাময় স্থান থেকে বেশি সম্ভাবনাময় স্থানে যেতে চায়। বিদেশে বাংলাদেশের অস্থায়ী অভিবাসীদের উপার্জিত অর্থ দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ায় এবং বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পূরণ করে। বাংলাদেশ বিশ্বের সে স্বল্পসংখ্যক দেশের একটি যেখানে অস্থায়ী অভিবাসীদের পাঠানো অর্থ জিডিপির একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। প্রবাসীদের পাঠানো এ অর্থ দেশে তাদের পরিবারের সদস্যদের আয়ের একটি উৎস, যা শুধু মধ্যবিত্ত বা বিত্তবান পরিবারেরই অর্থনৈতিক ভিত্তি দৃঢ় করে তা নয়, অনেক দরিদ্র পরিবারকেও তাদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা  মোকাবিলায় সাহায্য করে  দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।


অভিবাসনের ক্ষতিকর দিকের মধ্যে বড় বড় শহরে গ্রাম থেকে ক্রমাগত অভিবাসনের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার পরিবর্তে তা বিঘিœত হয় এবং সামগ্রিকভাবে শহরের অবকাঠামোগত অবস্থা ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নগরের জনসংখ্যার দ্রুত ও ব্যাপক বৃদ্ধি উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করে। নগরে জনসংখ্যা বাড়ার ৬০ শতাংশ ঘটে পুনঃবিভাজন সহকারে গ্রাম  থেকে শহরে স্থানান্তরের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রধান শহরগুলোর সীমিত শিল্পায়ন অথচ বাণিজ্যের দ্রুত প্রসারভিত্তিক একটি বিশেষ ধরনের বিন্যাস কাঠামোয় জনসংখ্যার গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর ঘটে। সড়ক অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং উৎপাদন, ব্যবসা,  হোটেল,  রেস্তোরাঁ, গৃহায়নসহ বিভিন্ন ধরনের নির্মাণের বিকাশ শহরগুলোতে অদক্ষ ও অর্ধদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তাই জীবিকার প্রয়োজনে এবং সম্ভাবনাময় চাকরির জন্য গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অসম ভূমি ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভূমিহীন জনসংখ্যার এ স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। এ ছাড়া গ্রামের অনেক ভূমি মালিকও বিভিন্ন উৎস থেকে উপার্জন বাড়ানোর প্রত্যাশায় গ্রাম থেকে শহরে যায়।


গ্রাম থেকে শহরে আসা পুরুষ অভিবাসীদের বেশির ভাগই কৃষিশ্রমিক। এছাড়া কৃষিপ্রধান এলাকা থেকেই মূলত স্থানান্তর ঘটে। পরিবারের অস্তিত্ব¡ রক্ষার্থে এবং অনেক ক্ষেত্রে নতুন উপায়ে উপার্জনের মাধ্যমে পারিবারিক আয় বাড়ানোর জন্য এ অভিবাসন ঘটে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পোশাক শিল্প কারখানা বিকাশের সাথে সাথে মেয়েদের শহরে অভিবাসন বেড়ে যায়। সত্তরের দশকে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব মানুষের গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার পাশাপাশি অভিবাসীদের বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, পরিবারে তার দায়িত্ব¡ ও ভূমিকা এবং পারিবারিক সম্পদের উৎস বিশেষত জমিজমা থেকে আয় এসব অভিবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। সামাজিক সংযোগ এবং গন্তব্যস্থলের সুবিধা ও সেখানে সম্ভাব্য সহায়তা অভিবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচ্য। একইভাবে গ্রামীণ খামার কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং শহরাঞ্চলের ওপর বেশি গুরুত্ব¡ারোপই প্রমাণ করে জনসংখ্যার ঘনত্বই বাংলাদেশের অভিবাসনের ধারা নির্ধারণ করে না, বরং অভিবাসীর কাজ ও কাজের বৈচিত্র্যের সুযোগ, মাথাপিছু আয়, ক্ষয়িষ্ণু উপার্জন ব্যবস্থার ঝুঁকি, প্রাকৃতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্তর এবং কৃষিক্ষেত্রে আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ নিয়ামকের দ্বারাও অভিবাসন প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়। শহরাঞ্চলে মৌলিক সামাজিক সুবিধা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দরিদ্র শহরবাসী, মহিলারা স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকির দিক থেকে বিত্তবানদের তুলনায় বেশি ভুক্তভোগী। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনকারী দরিদ্র গৃহস্থরাও উচ্ছেদ, অত্যাচার, ক্রমাগত অসুস্থতা, যৌন হয়রানি এসব কঠিন হুমকির সম্মুখীন হয়। যদিও শহরের দরিদ্র ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাসরত অভিবাসীরা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো নাগরিক সুবিধাগুলো বিধিবহির্ভূত উপায়ে ভোগের ব্যবস্থা করে।


খাদ্য নিরাপত্তা মানে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ এবং বছরব্যাপী খাদ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা। খাদ্য নিরাপত্তা দুই রকমেরÑপারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি পরিবারের পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল, যাতে পরিবারের প্রতিটি লোক স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিসম্মত খাদ্য খেতে পারে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা দেশের জনগণের জন্য যথেষ্ট খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্যরে ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রথমত, পরিবার ও গোটা জাতির প্রয়োজনীয় মোট খাদ্যের প্রাপ্যতা। দ্বিতীয়ত, স্থান কালভেদে খাদ্য সরবরাহের যুক্তিসঙ্গত স্থায়িত্ব। তৃতীয় নির্বিঘœ ও মানসম্মত পরিমাণ খাদ্যে প্রত্যেক পরিবারের ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবাধ অধিকারের নিশ্চয়তা।


নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকে অবশ্যই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা বিষাক্ত, অপুষ্টিকর খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও কোনো কাজে আসবে না, স্বাস্থ্য শরীর মন ঠিক থাকবে না। সুতরাং নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা বলয় সুনিশ্চিত করতে হবে। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে জীবন-জীবিকার মান উন্নত হবে, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, পরিবেশের অবক্ষয় কমবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রহণের ওপর সংঘাত কমবে। গ্রামীণ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, কাক্সিক্ষত স্থায়িত্বশীলতা পাবে। বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ছাড়াই বাস করছেন (এফএও ২০০৩)। মানুষের জীবনের চলার অনুষঙ্গ মানুষের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, ওষুধ ও সেবা। মানুষ যখন মোটামুটি পরিসরে এগুলো নিশ্চিত পায় তখন সে নিজেকে স্বর্গসুখী মনে করেন। ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে মানুষ (বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অভিবাসনের দিকে এগোচ্ছে)। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিবাসনকে রোধ করা সম্ভম্ভব। প্রাকৃতিক, মানবসৃষ্ট, পারিপার্শ্বিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক এসবের সাথে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে বিবেচ্য অভিবাসন বিশ্বের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ যাদের নিজের সম্পদ সীমিত তাদের ওপর এ চাপ ভয়াবহ। আমাদের দেশও এর বাইরে নয়। এ দেশে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪ ভাগের ৩ ভাগই গ্রামে বাস করেন এবং কৃষি তাদের জীবিকার প্রথম ও প্রধান অবলম্বন। সুতরাং গ্রামের কর্মক্ষম জনগণকে বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক যুবকদের এমন একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে তারা তাদের নিজ এলাকায় থাকতে নিরাপদ/স্বস্তি বোধ করে ও পরিবেশবান্ধব জীবন-জীবিকা উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করতে পারে।


গ্রামীণ উন্নয়ন মানে এমন একটা অবস্থা যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে আয়েশে জীবন ধারণ করতে পারেন। প্রাপ্তির ষোলোকলা পূর্ণ না-ই বা হলো কিন্তু নিজ অতিচেনা পরিসরে জীবন-ধারণ করতে পারে স্বস্তির সাথে। তবে গ্রামীণ উন্নয়নে খাদ্য, পরিবেশ, বস্ত্র, চিকিৎসা, পুষ্টি, যোগাযোগ এগুলোতে যে মাত্রাই হোক না কেন তা আবশ্যকীয়ভাবে জায়গা করে নেবেই। গ্রামীণ উন্নয়নে ছোটখাটো ব্যবসা, শিল্প, ব্যঞ্জরিত কাজের সুযোগ, কর্মসংস্থান এগুলো উল্লেখযোগ্য। আবার মাছ চাষ, গবাদি খামার, পোলট্রি খামার, আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রম, নার্সারি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বসতবাড়িতে চাষবাস, সমন্বিত খামার, মাশরুম চাষ, কুটির শিল্প, ভাসমান কৃষি কার্যক্রম, সর্জান পদ্ধতি, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসা আরও ছোটখাটো স্বল্পপুঁজির ব্যঞ্জরিত কার্যক্রম যা সংশ্লিষ্ট করে ও চাকরির সুযোগ তৈরি করবে। এতে করে অনাকাক্সিক্ষত অভিবাসন প্রবণতা অনেকখানি কমবে। গ্রামের আসল উন্নয়নের জন্য কাক্সিক্ষত মাত্রায় পরিকল্পিত বিনিয়োগ খুব ভালো ফল দেয়। সে পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাবো আমাদের কাক্সিক্ষত আলোকিত বিজয়ী মঞ্চে। তবেই গ্রামের ঋণাত্মক অভিবাসন চ্যালেঞ্জকে রুখে দেয়া যাবে। সুখের বিষয় যে বর্তমান সরকার এ বিষয়ে সচেষ্ট থেকে নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। কৃষি উন্নয়নে বাংলাদেশ রোলমডেল হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইতোমধ্যে। এ কথা তো ঠিক আমাদের গ্রামগুলো যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশলের মাধ্যমে বসবাসবান্ধব করা যায় তাহলে এ অভিবাসন অনেক কমে যাবে কিংবা বন্ধ হবে। অভিবাসন প্রক্রিয়া ঠেকানো যেমন সহজ না, আবার বন্ধ করা অসাধ্যও না। এজন্য জরুরি দরকার বাস্তবতার নিরিখে গ্রামভিত্তিক সুষ্ঠু যৌক্তিক পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। তবেই আমাদের কাক্সিক্ষত গ্রামীণ উন্নয়ন বাস্তবায়ন হবে এবং তখন অভিবাসন এমনিতেই কমে যাবে, থেমে যাবে মানুষের আগমন বহির্গমনের অযৌক্তিক প্রবাহ। গ্রাম হবে উন্নয়নের রোলমডেল।


গ্রামীণ কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে আরও সুদৃঢ়করণের মাধ্যমে অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে পরিবর্তিত জলবায়ু সহনশীল পরিবেশবান্ধব লাগসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসলের নিত্যনতুন জাত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিস্তৃতকরণ, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশসম্মত চাষাবাদ এসবের পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন, প্রাণিজ আমিষ পূরণের লক্ষ্যে মাছ ও গবাদিপ্রাণী পালন বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। সে লক্ষ্যে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক, সম্প্রসারণবিদসহ সংশ্লিষ্টরা মনোনিবেশ করবেন। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে আমাদের অনেক উন্নয়ন ও উন্নতি হয়েছে। দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি আমরা বিদেশে খাদ্য রপ্তানিও করছি। উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতাকে টেকসই রূপ দিয়ে সুখী, সমৃদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিপুল জনগোষ্ঠীর অভিবাসন যখন পৃথিবীর জন্য একটি বড় চ্যলেঞ্জ তখন তা মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে এ প্রতিপাদ্য যথাযথ ও সময়োপযোগী।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব প্রকটভাবে লক্ষণীয়। বিভিন্ন কারণেই অগণিত মানুষ তাদের চির পরিচিত বাপদাদার বাস্তুভিটা ত্যাগ করে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লাখ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছেন। এটি সরাসরি সামাজিকভাবে সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় দারিদ্র্য ও সুবিধাবঞ্চিত জনসাধারণের জন্য আর্থি