কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি কথা

When Farmers are Partner : Experience of Kenya Exposure Visit

When the flight from Dhaka touched down at Kenya’s main airport in Nairobi on 10 April 2016, the excitement among 13 of its Bangladeshi passengers – including senior staff from the country’s ministries of agriculture, fisheries, livestock, planning and finance – was palpable. They had come to the East African country for a weeklong study tour to learn more about how farmers’ organizations (FOs) and the Kenyan Government act together to meet the Nation’s food security goals. 

Shared development goals

With the exception of a shared British colonial past, Bangladesh and Kenya are strikingly different in terms of landscape, culture, language and history. Yet, both countries have put agriculture, food security and better nutrition at the top of their development agendas.

And both have made great agricultural strides since gaining independence. Today, Kenya has a vibrant food and agriculture sector that contributes half of its economy thanks to tea, coffee, fruits, vegetables and flowers. Whereas Bangladesh has managed to triple rice production to feed its 160 million people–a population four times greater than Kenya’s, squeezed onto land one-fourth its size.

Strengthening investment capacities

The study tour was part of a capacity building component of the Integrated Agriculture Productivity Project (IAPP), financed by the Global Agriculture and Food Security Program (GAFSP) and implemented by the Government of Bangladesh and FAO. FAO’s technical assistance aims to strengthen capacities in Bangladesh for better investment – both public and private – in agriculture, food security and nutrition.

In low- and middle-income countries, the main private investors are farmers themselves. However, in Bangladesh, family farms are so small that without joining forces through various types of FOs, farmers have little chance to access markets, credit facilities or the knowledge required to move into more commercial production. Given that FOs in Bangladesh are still weak, the Bangladeshi colleagues were eager to learn more from their Kenyan peers.

FOs as agribusinesses

Kenya has a long and rich history with farmers’ cooperatives, dating back to the 1940s, before the country’s independence. Over the decades, Kenyan FOs have overcome challenges and difficulties to become well-organized and professional entities with a strong governance setup, providing their members with business advice, access to bulk marketing and the technical know-how to adapt to demand. They also defend members’ interests and rights with private value chain actors and the public administration.

During the study tour, the Bangladeshi colleagues visited active Kenyan cooperatives, dealing with coffee, tea, bananas and various value chains, to learn how they operate, bulk their products, find markets, fight for better prices, add value, provide good inputs, etc. The Kenyan FOs’ approach to business left a positive  impression on the Bangladeshi team.

“FOs should have an entrepreneurship mindset,” said one of the study tour participants, adding that for FO sustainability, there was “no alternative”.

Partnering with government

The Bangladeshi team also learned how Kenyan FOs and cooperatives were able to federate themselves at county and national level so that they are heard, respected and stronger,helping to improve the lives of millions of farmers –a goal shared by the Government and the FOs.

They were struck by the close interactions between FOs and various layers of the Government, as well as parliament.

During the study tour, members of parliament made it clear that FOs were constructive allies with shared interests, working hand in hand to help advance Kenya’s agriculture sector.

One Bangladeshi participant said that this relationship between the Kenyan Government and FOs enabled “good implementation of current policies, contrary to Bangladesh”, which was something they would “have to work on”.

And in the spirit of South-South cooperation, the learning was two-way, with the Kenyan colleagues keen to know more about production practices in Bangladesh.

Strengthening FOs back home

In addition to the Government ministers, the Bangladeshi study group featured two FAO colleagues from Dhaka who have worked tirelessly to develop FOs in Bangladesh, and two Bangladeshi FO leaders who formed a national alliance last year to support emerging FOs.

At the end of the week, the group came away with a better idea of how to improve the environment for FO development in Bangladesh.

That requires “capacity development in governance, accounting, human and institutional development, financial management and procurement,” said one participant.

Another added that the country “needs to strengthen its policy and regulatory framework to ensure transparent and accountable FOs” and that the extension approach “must target groups rather than individuals”.The Kenya National Farmers’ Federation (KENAFF) helped organize the study tour,doing a tremendous job inopening doors– from small groups and cooperatives to decision-makers at the highest levels. KENAFF has proven that connecting family farmers with the capital’s policy-makers is to the benefit of all.

Benoist Veillerette*

* Senior Economist and Task Leader, Investment Center (TCI) of FAO, Rome, Italy

যখন কৃষকরা অংশীদার : কেনিয়া সফরের অভিজ্ঞতা

যখন যাত্রীবাহী বিমানটি নাইরোবির কেনিয়ার প্রধান বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করলে তখন  ১৩ জন বাংলাদেশী যাত্রী যাদের মধ্যে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন বোধগম্য কারণেই তাদের মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়েছে। তারা পূর্ব আফ্রিকার এ দেশটিতে সপ্তাহব্যাপী অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে এসেছেন জানতে কিভাবে কৃষক সংগঠন ও কেনিয়ার সরকার জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যূথবদ্ধ হয়ে কাজ করছে।
যৌথভাবে নির্ণিত কাক্সিক্ষত উন্নয়ন
শুধু একই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অতীত অভিজ্ঞতা ছাড়া কেনিয়া ও বাংলাদেশ কি ভূমি গঠনে (ভূ-দৃশ্য), কি সংস্কৃতিতে, কি ভাষায় এবং ইতিহাস ঐতিহ্যে সুস্পষ্টভাবে আলাদা। তবুও দুই দেশই উন্নয়ন তালিকায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টিকে রেখেছে এবং উভয় দেশই স্বাধীনতার পর কৃষিতে বিরাট অগ্রগতি ঘটিয়েছে। কেনিয়ার খাদ্য ও কৃষি খাত এখন বিকাশমান, যা চা, কফি, ফল, সবজি ও ফুলের বদৌলতে অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ ভাগ অবদান রেখে চলেছে। পক্ষান্তরে কেনিয়ার আয়তনের এক-চতুর্থাংশের সমান ভূখণ্ডে ঘনবদ্ধ হয়ে থাকা চারগুণ বেশি জনসংখ্যা নিয়েও বাংলাদেশের ১৬০ মিলিয়ন মানুষের গ্রাসাচ্ছাদনে ধানের উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি করেছে।
বিনিয়োগ দক্ষতা শক্তিশালীকরণ
অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরটি ছিল গ্লোবাল এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি প্রোগ্রাম (জিএএফএসপি) বা বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়নে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক বাস্তবায়িত ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (আইএপিপি) কারিগরি সহায়তা অঙ্গের দক্ষতা উন্নয়নের অংশবিশেষ। এফএওর কারিগরি সহায়তা অঙ্গের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উভয়ের আরও ফলপ্রসূ বিনিয়োগ দক্ষতা বৃদ্ধি।
নিম্ন ও মধ্যআয়ের দেশগুলোতে কৃষকরা নিজেরাই হচ্ছেন প্রধান বেসরকারি বিনিয়োগকারী। অবশ্য বাংলাদেশে পারিবারিক খামার খুবই ছোট যে কোনোরূপ কৃষক সংগঠনে সংঘবদ্ধ হয়ে শক্তি সঞ্চয় ব্যতিরেকে তাদের পক্ষে বাজারে, ঋণ সুবিধায় বা অধিকতর বাণিজ্যিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে যে জ্ঞানের প্রয়োজন তাতে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত ক্ষীণ। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষক সংগঠন এখনও অনেক দুর্বল; বাংলাদেশী সহকর্মীরা তাদের কেনিয়ার সহকর্মীদের কাছ থেকে আরও জানতে আগ্রহী ছিল।
কৃষি ব্যবসায় কৃষক সংগঠন
কেনিয়ার কৃষক সমবায়ের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য/ইতিহাস আছে যার শুরু স্বাধীনতার পূর্বে সেই ১৯৪০ সালে। শক্তিশালী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা, সদস্যদের ব্যবসায়িক পরামর্শ, লটে বা একসঙ্গে কেনাবেচার সুযোগ সৃষ্টি এবং চাহিদার সঙ্গে খাপখাইয়ে চলার মতো প্রায়োগিক কৌশলসহ একটি সুসংগঠিত এবং পেশাদার স্বত্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে কেনিয়ার কৃষক সংগঠনকে কয়েক দশক জুড়ে অনেক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মূল্য সংযোজন ধারার কুশীলব (private value chain actor) কৃষকের স্বার্থ এবং অধিকারও সমবায় সমিতি সংরক্ষণ করে।
কেনিয়ায় সফরকালীন বাংলাদেশী সহকর্মীরা কফি, চা, কলা এবং বিভিন্ন মূল্য সংযোজন ধারায় কাজ করে এমন কতগুলো সক্রিয় সমবায় সমিতি পরিদর্শন করে- উদ্দেশ্য ছিল সমবায়গুলো কিভাবে কাজ করে, পণ্যগুলো একত্র করে,  বাজার খুঁজে নেয়, ভালো দামের জন্য লড়াই করে, মূল্য সংযোজন করে, মানসম্পন্ন উপকরণ সরবরাহ করে ইত্যাদি। এছাড়া কেনিয়ার কৃষকদের ব্যবসামুখী বাংলাদেশ দলের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
‘কৃষক সংগঠনের উদ্যোক্তাসুলভ মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে’- বললেন সফরে অংশগ্রহণকারী একজন। তিনি আরও বললেন, কৃষক সংগঠনের স্থায়িত্বের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
সরকারের সঙ্গে অংশীদারি
সফরকারী বাংলাদেশ দল জানতে পেরেছে কিভাবে কেনিয়ার কৃষকগণ কাউন্টি থেকে জাতীয় পর্যায়ে সংঘবদ্ধ হয়েছে ফলে এখন তাদের কথা সবাই শুনছে, সম্মান  করছে এবং তারা যথেষ্ট শক্তিশালী, তারা লাখ লাখ কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সহায়তা করছে যা ছিল সরকার ও কৃষক সংগঠনের যৌথ অংশগ্রহণে স্থিরকৃত লক্ষ্য। তারা কৃষক সংগঠনের সঙ্গে সংসদসহ সরকারের বিভিন্ন স্তরের নিবিড় মিথস্ক্রিয়ায় অভিভূত। অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরকালে কেনিয়ার সংসদ সদস্যরা এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কেনিয়ার কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে কেনিয়ার কৃষক সংগঠন হচ্ছে সরকারের প্রকৃত মিত্র যেখানে  সরকার ও কৃষক সংগঠন সমস্বার্থে হাত ধরাধরি করে কেনিয়ার কৃষি খাতের অগ্রগতিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের একজন অংশগ্রহণকারী বললেন, বাংলাদেশ থেকে কেনিয়ার তফাৎটা হলো কেনিয়ায় সরকার ও কৃষক সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্কের কারণে নীতির সঠিক বাস্তবায়নে সরকার সক্ষম হতে পেরেছে। তিনি বলেন, এ জায়গাটায় আমাদের কাজ করা উচিত এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার উজ্জীবিত মন্ত্রের আলোকে বলা যায় সফরের শিক্ষাটা ছিল দ্বিমুখী কারণ কেনিয়ার সহকর্মীরা বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে খুব আগ্রহী ছিল।
দেশে ফিরে কৃষক সংগঠন শক্তিশালীকরণ
বাংলাদেশ সফরকারী দলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুইজন এফএওর সহকর্মী ছিলেন যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার জন্য এবং ছিল দুইজন কৃষক সংগঠনের নেতা যারা উদীয়মান কৃষক সংগঠনগেুলোকে সহায়তা দিতে গত বছর একটি জাতীয় মঞ্চ গঠন করেছেন।
সপ্তাহ শেষে সফরকারী দল বাংলাদেশে কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে কিভাবে অনুকূল পরিবেশ  তৈরি করা যায় সে সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা করেছেন। একজন অংশগ্রহণকারী বললেন, এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, হিসাব-সংরক্ষণ, মানব ও সাংগঠনিক উন্নয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রয়ের ওপর দক্ষতার স্ফুরণ।
অন্য আরেকজন বললেন, ‘আমাদের দেশে প্রয়োজন নীতি ও বিধিবিধানের কাঠামো তৈরি করা। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংগঠন নিশ্চিত করতে সম্প্রসারণ পদ্ধতি অবশ্যই হতে হবে গ্রুপকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিকে নয়। কেনিয়ার জাতীয় কৃষক ফেডারেশন সংক্ষেপে KENAFF এ শিক্ষা সফরটি সংগঠিত করতে সহায়তা দিয়েছে। ক্ষুদ্র দল থেকে শুরু করে সমবায় এবং সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের সবার জন্য দরজা খুলে দিয়ে তারা অবিস্মরণীয় কাজ করে চলেছেন। কেনাফ (KENAFF) প্রমাণ করেছে পারিবারিক খামারিদের সঙ্গে রাজধানীর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সংযোগের মধ্যে আসলে নিহিত আছে সবার মঙ্গল।

বেনোয়া ভিলেরিত্তে (অনুবাদ : মাহমুদ হোসেন)*
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

কৃষক সংগঠন : সাফল্যের মূল বিষয়সমূহ

একটি কৃষক সংগঠনের সাফল্য এবং টিকে থাকা না থাকার পেছনে বহু বিষয়ের অবদান রয়েছে। একটি সংগঠন কোন পটভূমি ও প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে তা থেকে শুরু করে এর পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এবং কর্মকাণ্ডের ওপর তা নির্ভর করে। কৃষক সংগঠনের অবস্থা চিত্রায়ন ও দক্ষতা যাচাইয়ের একটি সমীক্ষায় এমন  কতগুলো বিষয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায় ক্ষেত্রেই অবহেলিত হয় আর তার ফলে, বিশেষ করে, সংগঠন সফল ও টেকসই হতে পারে না। নিচের পিরামিড চিত্রে একটি কৃষক সংগঠনের সাফল্যের মূল বিষয়গুলো দেখানো হলো-
কৃষক সংগঠনের সাফল্যের পিরামিড
স্বশাসন : যদিও কোনো কোনো কৃষক সংগঠন সম্প্রসারণ সংস্থার সহায়তায় গঠিত হচ্ছে কিন্তু এ ধরনের সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্য স্বশাসন বা তার অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনের ভেতর থেকেই আসতে হবে নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও উদ্যোগ। অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংগঠনের সদস্যদের নিজেদের। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্প্রসারণ সংস্থা বা প্রকল্পের সহায়কদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো রকম প্রভাব থাকলে চলবে না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় সহায়তাকারীদের (facilitators) কোনো ভূমিকাই থাকবে না। সরকারি-বেসরকারি সম্প্রসারণ সংস্থা যারা সহায়ক হিসেবে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করবে তাদের সবার অবশ্যকরণীয় হলো একটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগঠনের পরিপূর্ণ স্বশাসনের জন্য সত্যিকার অর্থে কাজ করা। যেমন প্রদর্শনী বা প্রকল্প সুবিধা কে পাবে সেটা নির্ধারণ করবে সংগঠন। সম্পদের ব্যবহার কিভাবে করা হবে তার সিদ্ধান্তও নেবে সংগঠন। তাই এটাকে সম্ভব করতে কৃষক সংগঠনের সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি বাইরে থেকে অতিরিক্ত চাপানো কিছু হলে চলবে না। বরং তার বদলে অবশ্যই সংগঠিত হওয়ার উপকারিতাগুলো কী কী তার ওপর জোর দিতে হবে। যেসব কৃষক সংগঠন ইতোমধ্যে সুগঠিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত তাদের কাছ থেকে এক বা আরেক সংগঠনকে শিখে নেয়ার সুবিধা করে দিতে হবে। আর সেই সঙ্গে স্থানীয় কৃষক সংগঠনগুলোর মাঝে নেটওয়ার্কের বা যোগসূত্রমূলক কাঠামো আরও উন্নত করে গড়ে তুলতে হবে। এ প্রক্রিয়া একটা সময় সাপেক্ষ  ব্যাপার। যারা কৃষক সংগঠন গড়ার কাজ করছেন তাদেরকে অবশ্যই এ সময়টা দিতে হবে।
সর্বসম্মত নেতৃত্ব (inclusive leadership) :  কৃষক সংগঠনগুলোর টেকসই হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দরকার। এ নেতা তার সংগঠনের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে ধারণ করবেন, সদস্যদের সক্রিয় করে তুলবেন ও সংগঠনের কাজে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন। নেতার প্রতি সংগঠনের সদস্যদের সত্যিকার সমর্থন থাকতে হবে। নেতা নিজেকে সংগঠনের কাজে সর্বদা নিয়োজিত রাখবেন; সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ঝুঁকি নিয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে দূরে ঠেলে সবাইকে লক্ষ্যের দিকে চালিত করবেন। বিনয়ের সঙ্গে অন্যের মতামতকে গ্রাহ্য করবেন। সঙ্গে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখেও চলবেন। বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি নেতা ভূমিকা রাখবেন। সুযোগ্য নয় এমন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কারণ থেকে থাকলে সেই সুপ্ত ক্ষোভের প্রতিকার ও জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা বিধানের ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।
নেতা তখনই হবেন যখন তিনি সংগঠনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন, গতিশীলতা আনবেন। সব সদস্য পরস্পরের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত মনে করবেন এবং একে অপরের সহায়তায় সদা সচেষ্ট থাকবেন এবং এভাবে তারা অগ্রসর হবেন।
মজবুত সদস্যভিত্তি : কৃষক সংগঠনের শক্তি নিহিত তাদের সদস্যদের সক্রিয়তার মাঝে।  সব কাজে সদস্যদের সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবে দলের নেতৃত্বকেও শক্তিশালী করে। তবে এর বিপরীতটা কোনোক্রমেই সত্য হতে পারে না, অর্থাৎ সংগঠন শুধু নেতাদের শক্তিতেই মজবুত হতে পারে না। সংগঠনের নেতৃত্বস্থানীয়রাই কেবল সংগঠনের সব সুবিধা গ্রহণ করবেন এমন প্রবণতা সংগঠনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তাদের এ প্রবণতার (অভিজাতরাই সুবিধার মালিক-এ মানসিকতা) দরুন নেতারা তাদের সদস্যদের সঙ্গে সুবিধাগুলো ভাগাভাগি করে নিতে চান না। এতে সদস্যরা সংগঠন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন অনুভব করতে পারেন। পরিণামে সংগঠন মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এ কারণে সংগঠনে বলিষ্ঠ ও সক্ষমতাসম্পন্ন সদস্যবর্গের একটা মজবুত ভিত্তি থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ভিত্তি মজবুত থাকলে সংগঠনের স্থায়িত্ব বাড়ে। সদস্যদের সংগঠনের বিষয়ে অবশ্যই যথেষ্ট আন্তরিক থাকতে হবে এবং পাশাপাশি নেতৃত্বকেও জবাবদিহি করতে সক্ষম হতে হবে।
সদস্যদের চাহিদামাফিক সেবা প্রদান : কৃষক সংগঠন তার সদস্যদের জন্য সে সেবা প্রদান করে থাকে তা অবশ্যই সদস্যদের সত্যিকারের প্রয়োজনের নিরিখে হতে হবে, বাইরের পেশাদার ব্যক্তিদের পূর্ব ধারণার ভিত্তিতে নয়। সেবা প্রদান ব্যবস্থায় সত্যিকারের প্রয়োজনের প্রতিফলন থাকলে সেটা সংগঠনকে আর্থিক দিক থেকে টেকসই করে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অনেকে মনে করেন অর্থই সব অনর্থের মূল কিন্তু খুব কম লোকই আছেন যারা ভেবে দেখেন যে অর্থের মূলে হলো সঠিক উদ্যোগ, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়। এ আর্থিক স্থিতিশীলতা বাস্তবে আকার নিতে পারে যদি সংগঠনের মালিকানায় কোনো একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যেমনÑ আমরা সংগঠনের বিনিয়োগে বীজ উৎপাদন বা নার্সারি বা কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া প্রদান ব্যবসার কথা বলতে পারি। ভালো উপকরণের চাহিদা সব সদস্যর নিকট সমান। এ রকম একটা উদ্যোগ হাতে নিলে তা থেকে সদস্যদের যেমন সেবা দেয়া যায় আবার কিছু আয়ও আসে। সংগঠন টেকসই করা যায়। আবার তথ্য ও পরামর্শ সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়। এটা কোনো আয় নিয়ে আসতে না  পারলেও সংগঠনের সদস্যদের জন্য সরকারি দপ্তর থেকে সেবা পাওয়াটা নিশ্চিত করতে পারে। এভাবে চাহিদা অনুযায়ী উন্নত সেবা দিতে পারলে সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে ক্রমাগত সদস্যভুক্তির একটা ধারা তৈরি করতে পারে। আর এভাবে যারা সদস্যভুক্ত হতে থাকবেন তাদের প্রদেয় চাঁদা তথা আয় পাবে সংগঠন। সদস্য বাড়তে থাকলে তারা সংগঠনের কাজে সক্রিয় হবে ও সংগঠনের আয়ও আসতে থাকবে। সংগঠন আর্থিক দিক থেকে টেকসই  হয়ে উঠবে।
স্পষ্ট স্বকীয় উদ্দেশ্য : কৃষক সংগঠন গড়ার প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক পদক্ষেপ হলো  কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার উদ্দেশ্যকে পরিষ্কার, স্পষ্ট ও স্বকীয় করে তোলা। শুধু সহায়তাকারী কর্মকর্তার কাছেই নয়, সব সদস্য  কৃষকের কাছে এ উদ্দেশ্য অবশ্যই স্পষ্ট করতে হবে। সহায়করা  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব ধ্যান ধারণা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এটি একটি বড় বিষয়  যা কৃষক সংগঠন গড়ার কাজকে যান্ত্রিক ও নিষ্প্রাণ করে তোলে।  আর সাধারণত সেই একই কারণে যেসব সংগঠন প্রকল্পের আওতায় গঠিত হয় সেসব প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর অল্পদিনের মধ্যেই ব্যর্থতার ঝুঁকিতে পড়ে।

মাহমুদ হোসেন* ড. ইমানুন নবী খান**
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা


কৃষক সংগঠন কি?

কৃষক সংগঠন কি? কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন?

সংগঠন হচ্ছে ‘কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কিছু সাধারণ উদ্দেশ্যে গড়া সঙ্কল্পবদ্ধ ব্যক্তিগোষ্ঠীর দল।’ সংগঠন তখনই হয় যখন সমশ্রেণীর ব্যক্তিগণ তাদের পছন্দসই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একসঙ্গে, একমতে, একই উদ্দেশ্যে ও ছন্দে কাজ করে।  প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম অবস্থা হতে শুরু করে সভ্যতার এ আধুনিক সময়ে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংগঠনের রূপ পাল্টেছে কিন্তু লক্ষ্য একই অর্থাৎ সমস্বার্থে যেসব কাজ একা করা যায় না, যা দুরূহ ও প্রতিকূল তা সম্পাদনের নিমিত্তেই সংগঠন। আদিম সমাজের কথাই ধরি- পাথর ছিল একমাত্র হাতিয়ার, যা দ্বারা পশুপাখি শিকার করা হতো। কিন্তু শিকার করতে হলে যেতে হবে জঙ্গলে; একা যাওয়ার উপায় নেই, দলবেঁধে, সবাই মিলে যেতে হয়। নচেৎ নিজেই শিকার হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকার প্রশ্নেই আদিম গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সংগঠনের উত্থান
আবার শিকার সহজলভ্য ছিল না, পাওয়া যেত কম। তাই দলের সবাই মিলে সমানভাবে শিকারের অংশ ভাগাভাগী করে নিত। আর তাছাড়া হিংস্র বন্যজন্তুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষার উদ্দেশ্যে আবাস বা ঘরবাড়িও ছিল একসঙ্গে গুহায় বা সুড়ঙ্গে বা উঁচু কোনো স্থানে। সভ্যতার শুরুতে আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সংগঠনের লক্ষ্য ছিল মূলত ‘খাবার’ ও ‘নিরাপদ আবাসন’; আর খাবার শিকারের জন্য বা হিংস্র বন্যজন্তুর আক্রমণ থেকে নিজেদের ও শিশুদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে একত্রে দলবেঁধে শিকার বা একত্রে বসবাস করা থেকেই মানুষের সংগঠিত হওয়ার প্রাথমিক ধারণার শুরু। ধীরে ধীরে আদিম মানুষ যখন কৃষিকাজ করতে আরম্ভ করল তখনও জমি তৈরি করতে জঙ্গল পরিষ্কার করা, কঠিন শিলা অপসারণ ইত্যাদি দলবেঁধে যেমন করত, ফসলও নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগী করে নিত। এভাবে আদিম সমাজের শুরুর দিকে কৃষির গোড়াপত্তনে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে কৃষি কাজ করা ও উৎপাদন ভাগাভাগী করার মধ্য দিয়েই সভ্যতার প্রথম সংগঠনের যাত্রা।
এ থেকে প্রতীয়মান হয় যূথবদ্ধতা বা সংগঠিত থাকা মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য
ক্রমে ক্রমে মানুষ আগুনের বহুবিধ ব্যবহার শিখল, সঙ্গে পাথর ও লৌহ দিয়ে হাতিয়ার তৈরি করে কৃষি জমি চাষাবাদে অভিজ্ঞ হওয়া শুরু করল। প্রয়োজনের থেকে একটু বেশি উৎপাদন করতে শিখল, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার প্রথা চালু হলো। সম্ভবত তখনই গোষ্ঠীকেন্দ্রিক কৃষি পারিবারিক কৃষির রূপ পরিগ্রহ করল। অর্থাৎ চাষাবাদটা যার যার মতো শুরু করল। বহুদিন এভাবেই চলছিল। মানুষ প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতি তাকে যা দিতো তা নিয়ে আর মানুষের কায়িক পরিশ্রম ও মেধার সমন্বয়ে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রতিযোগিতা চলছিল। দিন যায় মানুষ বাড়ে, উৎপাদন বাড়াতে উপকরণের চাহিদা বাড়ে, পাল্লা দিয়ে বাড়ে প্রাকৃতিক উপকরণের স্থলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তৈরির শিল্প স্থাপন, কৃষির অন্যতম উপকরণ বীজ উৎপাদনেও শিল্প খাতের বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। কৃষকরা পারিবারিক কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক কৃষির দিকে ধাবিত হয়। ধীরে ধীরে কৃষি তার প্রাকৃতিক উপকরণ নির্ভরতা হারাতে থাকে। বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন উপকরণ এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদ- জমি, জলা, বনও চলে যেতে থাকল বড় বড় পুঁজিপতি ও একশ্রেণীর সমাজপতিদের হাতে। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাজারে আসে হাইব্রিড জাতের বীজ, যা থেকে কৃষক পরবর্তী বছরের জন্য কোনো বীজ রাখতে পারে না। অন্যদিকে সঠিক ফসল বিন্যাস মেনে না চলায় এ বীজের জমিতে প্রয়োগ করতে হয় অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার। সঙ্গে আছে নতুন নতুন পোকামাকড়ের উপদ্রব, পাল্লা দিয়ে ব্যবহার করতে হয় বহুজাতিক কোম্পানির আবিষ্কার করা কীটনাশক। আর বহুজাতিক কোম্পানির বাজারকৃত এসব উপকরণ বড় ও মাঝারি কৃষকরা নাগালের মধ্যে পেলেও ছোট জোতের বর্গা, প্রান্তিক কৃষকরা এগুলোকে নাগালের মধ্যে পেতে একটি অসম-প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়। এ অসম প্রতিযোগিতা শুধু উপকরণ জোগানেই নয়, এমনকি উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতেও ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা কৃষকরা পদে পদে ঠকে। প্রাকৃতিক সম্পদেও ক্ষুদ কৃষকদের অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক কৃষির তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন, বর্গা ‘একক কৃষক’ বড় অসহায়। আর এ অসহায়ত্ব হতে পরিত্রাণের জন্যই আবারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার। এভাবে দেখা যায়, যখনই কোন প্রতিকূলতা সামনে আসে যা কৃষকদের একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তখনই সমশ্রেণীর কৃষকরা সংগঠিত হয়। সেসব সংগঠন নানা রকম হয়: কোনোটা হয়তো কোনো ইস্যুভিত্তিক, সাময়িকভাবে গড়ে উঠে, ইস্যু আদায়ের পর বা ইস্যু আদায়ে বিফল হবার পর সেটা বিলুপ্ত হয়; কোনো কোনোটি হয়তো উৎপাদন ও বিপণনকারী দল হিসেবে গড়ে উঠে, আবার কোনোটি হয়তোবা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত সংগঠন যেটি রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা হতে নিবন্ধন নিয়ে কৃষকদের স্বার্থে কাজ করে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্যও সরকারি সম্প্রসারণ সংস্থা কর্তৃক জনে জনে প্রশিক্ষিত করা দুরূহ বলে কৃষক দল গড়ে তোলা হয়। ধারণা আসে কৃষক সমবায়ের যেখানে যুথবদ্ধভাবে উৎপাদন ও বিপণনের ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়।     
বাংলাদেশের কৃষিতে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন কৃষকদের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বাংলাদেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ (০.২৮ হেক্টর)। ভূমিহীন কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ৪৯ শতাংশের নিচে তারাই এ দেশের কৃষিতে সংখ্যাধিক্য প্রায় ৫৩ ভাগ। তারপর শতকরা ২৪ ভাগ প্রান্তিক কৃষক- যাদের জমির পরিমাণ ৫০-১৪৯ শতাংশ। শতকরা ১১ ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ১৫০-২৪৯ শতাংশ এবং ১১ ভাগ মাঝারি কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ২৫০-৭৪৯ শতাংশ, আর মাত্র ১ ভাগ হলো বড় কৃষক কৃষক যাদের জমির পরিমাণ ৭৫০ শতাংশের ঊর্ধ্বে।  জমির মালিকানার ওপর ভিত্তি করে গ্রামের সব কৃষক পরিবারের শ্রেণীকরণ যার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান (শতকরা ৮৫ ভাগ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন কৃষক) অথচ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী সে কৃষকদের চিহ্নিত করা যায়। কৃষির সব সংকটে এরা সংবেদনশীল অর্থাৎ জলবায়ুগত প্রতিকূলতা, উপকরণ সংকট, উৎপাদিত পণ্যের অস্বাভাবিক দরপতন ইত্যাদি যে কোন সমস্যায় এরাই সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন। যেহেতু বড় ও মাঝারি কৃষকরা খুব সহজেই এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারে ফলে যে কোন সম্প্রসারণ সেবার প্রথমটা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের কেন্দ্র করেই হওয়া উচিত। তাদেরকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সমষ্টিগত উদ্যোগ হিসেবে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো সহজ হয়।
কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন?
মানুষ সভ্য হওয়ার শুরুর পদক্ষেপটা ছিল সংগঠন। সংগঠন ভয়কে জয় করার শক্তি দেয়। আবার জ্ঞানের সমাবেশ ঘটে বলে সৃষ্টিশীলতার সুযোগও সৃষ্টি হয়। সমাজের সব জ্ঞানের সমাবেশ ঘটে সংগঠনে। তাই এটি সামাজিক মূলধনও বটে। সংগঠিত হবার সুবিধা নানাবিধ। ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে আসছি ‘দশে মিলি করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’। অর্থাৎ কোনো কাজ সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে করলে কাজটা সহজ হয় এবং এতে হারলেও হতাশ হতে হয় না। কিন্তু তারপরও আমরা সংগঠিত হচ্ছি না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প আসলে কিছু পাওয়ার আশায় ২০-২৫ মিলে কাগজে পত্রে একটা দল করছি। এখন বিভাগীয় সব কাজই হয় প্রকল্পভিত্তিক। দেখা গেলো প্রকল্প থেকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার পছন্দমতো গ্রামের একজনকে দায়িত্ব দিলো ২০-২৫ জন কৃষককে নিয়ে একটা দল গড়তে। সেই কৃষক তার পছন্দমতো ভাই, স্ত্রী, বোন, আশপাশের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী নিয়ে বেশ ঘটা করে একটা দল গড়ল যেখানে ধনী, গরিব, প্রান্তিক, বর্গা সব কৃষকই থাকে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য কি, কৃষকের চাহিদাই বা কি- কোনো কিছু এতে বিবেচনা করা হয় না। আবার দেখা যায়, মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী সঠিকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হওয়ার কারণে তার মতো করে কিছু কৃষককে নিয়ে একটি দল করে বসে; যেখানে সমশ্রেণীর কৃষক থাকে না, বড় কৃষকরাই প্রকল্পের বেশি বেশি সুবিধা ভোগ করে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিগৃহীত হয়। ফলে এভাবে গড়া দল প্রকল্প সহায়তা বিদ্যমান থাকা পর্যন্ত টিকে থাকে, প্রকল্প শেষ হলে দলের প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়।
এজন্য সংগঠন গড়ে তুলতে হলে সমশ্রেণীর কৃষকদের (ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন) এক হতে হবে। ব্যক্তি কৃষকের নানাবিধ সমস্যা থাকতে পারে কিন্তু কতগুলো বিষয়ে তাদের সবার সমস্যা এক।  যেমন- বাজার, তথ্য, সম্পদে প্রবেশাধিকার, সহজশর্তে কৃষি ঋণ নাগালের মধ্যে পাওয়া, অত্যধিক উৎপাদন ব্যয় ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানে একক কৃষকের প্রচেষ্টা কোনো কাজেই আসবে না যদি না সংগঠিত হয়। কাজেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা/ভূমিহীন কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার সুবিধাগুলো  খুব ভালোভাবে  বুঝতে হলে বর্তমান বাজার ব্যবস্থাটি খুব সহজ করে বুঝতে হবে। পত্রপত্রিকায় আমরা নিয়মিত দেখতে পাই এ শ্রেণীর কৃষকরা উপকরণে ঠকে, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না, সরকারি ক্রয় অভিযানে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেন না, সরকারি ভর্তুকি সঠিকভাবে পান না, উৎপাদনের ও বাজারজাতকরণের তথ্য সঠিকভাবে পান না, ইত্যাদি বহুবিধ সমস্যা। এসব বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় হলো সংগঠন। নিচে সংগঠিত হওয়ার কিছু সুবিধা দেয়া হলো-
১. গুণগতমানের উপকরণ নিশ্চিতকরণে সংগঠন : ধরুন আপনার দলে ৫০ জন সদস্য আছে। তারা আলাদা আলাদাভাবেই কৃষিকাজ করছে। ধান হয়তো তাদের প্রধান ফসল। সঙ্গে সবজি, সরিষা, আলুও করে। সদস্যরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে ধান বা সবজির বীজ, যা তারা বাজার থেকে কিনেন তা প্রায়ই ভালোমানের হয় না। দেখা গেল ৫০ জনই টমেটো, বাঁধাকপি, মরিচ ও পেঁপে করেন। আমরা জানি এক বিঘা জমির জন্য টমেটো বীজ লাগে ৩০ গ্রাম, বাঁধাকপি বীজ লাগে ৬০ গ্রাম, মরিচ বীজ লাগে ৩০ গ্রাম আর পেপের জন্য লাগে মাত্র ১০ গ্রাম। একই সংগঠনের ৫০ জন কৃষক এ স্বল্প পরিমাণ বীজের জন্য পঞ্চাশবার পঞ্চাশভাবে বাজারে যান, আসা-যাওয়া বাবদ পরিবহন খরচ জনপ্রতি গড়ে ৫০ টাকা  হলে সকলে মিলে খরচ ২৫০০/- টাকা; জনপ্রতি ৩-৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করলে সকলে মিলে ব্যয় করছেন ১৫০-২০০ ঘণ্টা অর্থাৎ ১৮-২৫ শ্রমদিন; টাকায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০০০-১২৫০০ টাকা। আবার খুচরা বিক্রেতারা একক কৃষকের চাহিদা বিবেচনা করে কোম্পানির বড় প্যাকেট ভেঙে ছোট ছোট প্যাকেট করেন। এ ছোট প্যাকেট বা মিনিপ্যাক করার সময়ই ভেজালটা শুরু হয়। কৃষক জনপ্রতি অল্প পরিমাণ বীজ সংগ্রহ করতে গিয়ে মিনিপ্যাক কিনেন এবং দামে ও গুণগতমানে দুইভাবেই ঠকেন। এখন আপনারাই নির্ধারণ করুন এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায়গুলো কী কী হতে পারে। অর্থনীতির সহজ কড়চায় যদি বুঝেন যে ৫০ জন যেহেতু একই ফসল করেন। হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নিই এই ৫০ জনই এক বিঘা করে জমিতে টমেটো, বাঁধাকপি, মরিচ ও পেঁপে করেন। তাহলে সবার বীজের চাহিদাটি কি হতে পারে তা নিচের সারণিতে দেখানো হলো:
ওপরের হিসাব বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যাবে শুধু সবজি বীজের জন্যই একটি সংগঠনে বীজের চাহিদা আছে অর্থমূল্যে ৬৭৫০০০ টাকার। আর যে কোনো উপকরণের জন্য যখন এ পরিমাণ বাজার চাহিদা তৈরি হয় তা যে কোনো কোম্পানিকে আকৃষ্ট করে। বাজার সংযোগের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় বেসরকারি উপকরণ কোম্পানি এ ধরনের আদেশ পেলে তাদের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা থেকে প্যাকেট করে সরাসরি সরবরাহ করে থাকে যার গুণগতমান অনেক ভালো হয় আর দামেও হয় সাশ্রয়ী। অন্যান্য খরচ যেমনÑ যাতায়াত (৫০ টাকা) সময় (আধাবেলা-২৫০ টাকা) ব্যয় হচ্ছে না। বাড়ি বসেই আপনি বীজটা পাচ্ছেন। একা একা কিনলে ৩০ গ্রাম টমেটো বীজের খরচ হতো ২৪০০+৫০+২৫০=২৭০০ টাকা। সংগঠন থেকে আপনার খরচ পড়ছে ২৪০০ টাকা বা তারও কম  (যেহেতু বেশি পরিমাণে কিনলে কিছুটা কমিশন পাওয়া যায়) প্রায় ৩০০ টাকা সাশ্রয়। এতে উৎপাদন ব্যয়ও কমছে,  যা লাভ আপনার বাজারে টিকে থাকার জন্য জরুরি।
উপরের উদাহরণটি যে কোনো উপকরণের বেলায় প্রযোজ্য। হোক না সেটা সার, উন্নত চারা, কৃষি যন্ত্রপাতি, মাছের পোনা, খাবার, প্রাণী খাদ্য, ঔষধ, টিকা ইত্যাদিসহ এমনকি মাচার জন্য বাঁশ, জাল, পলিথিন। শুধু প্রয়োজন সংগঠনে নিজেদের মধ্যে সহমত। সহমতের পর একটি সহজ সদস্য জরিপ। সদস্যদের কী পরিমাণ জমিতে কোন মৌসুমে কী আবাদ করে, কতটুকু উপকরণের প্রয়োজন হয়, বর্তমানে কিভাবে ও কোথা হতে উপকরণ ক্রয় করে ইত্যাদি তথ্য। যখন সব সদস্যর তথ্য একটি সারণিতে বিশ্লেষণ করা হবে তখন মোট কি পরিমাণ উপকরণ লাগবে, অর্থ সংস্থান কিভাবে হবে এসব বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
তাই জনে জনে আলাদাভাবে উপকরণ না কিনে সদস্যদের সহমতে একসঙ্গে কেনার সুবিধাটির অনুধাবন করার মাঝেই সংগঠনের সার্থকতা নিহিত। এ ধরনের ক্রয়কে বলা হয় ‘বাল্ক বাইং (bulk buying)’। অর্থনীতির ভাষায় এ ধরনের সংগঠিত ক্রয়ের যে লাভ হয় তাকে বলে ‘ইকোনমি অব স্কেল (economy of scale)’ বা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন। কারণ এতে উৎপাদন ব্যয় কমে এবং লাভটা বেশি হয়।  
২. উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সংগঠন : এখানেও আমরা অর্থনীতির সহজ সূত্রের প্রয়োগ দেখি। বাংলাদেশে ফসলের ভরা মৌসুমে যখন বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেশি তখনই অস্বাভাবিক দরপতন ঘটে। এ ভরা মৌসুমে ছোট কৃষক ও প্রান্তিক কৃষককে ফসল বিক্রি করে দিতে হয়। কেউ কেউ আবার বেশি অভাবে ফসল তোলার আগেই জমিতেই বিক্রি করে দেয়। কারণ ফসল কাটার আগে বা তোলার পরপরই সময়টায় তার টাকার প্রয়োজন পড়ে; হয়তো সে উপকরণ বাকিতে কিনেছিল বা অন্য কোথাও লগ্নী করেছিল অথবা সামাজিক কোনো কারণে। তাই ফসল ধরে রাখতে পারে না বা চায় না।  বাংলাদেশের কৃষিতে ছোট কৃষকের আধিক্য বেশি হওয়ায় ভরা মৌসুমে সব পণ্য বাজারে একসঙ্গে চলে আসে। চাহিদার চেয়ে সরবরাহ তখন বেড়ে যায়। ফলে দাম কমে যায়। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার এটি হলো একটি বড় কারণ এবং এটি বেশির ভাগ বিচ্ছিন্ন কৃষকদের সমস্যা। এ সমস্যা হতে পরিত্রাণের জন্য সংগঠিত হলে কৃষকদের কী সুবিধা?
উপকরণ যেমন জনে জনে না কিনে সাংগঠনিকভাবে একত্রে কিনলে দামে ও গুণগতমানে লাভবান হওয়া যায় তেমনি  উৎপাদিত পণ্য জনে জনে আলাদাভাবে বিক্রি না করে একত্রে বিক্রি করলেও কিছুটা দাম বেশি পাওয়া যায়। আবার ভরা মৌসুমে বিক্রি না করে যদি কিছুটা সময় উৎপাদিত পণ্য ধরে রাখা যায় তাতে দাম আরও বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেখা গেছে ফসল তোলার ১ মাসের মধ্যে দরিদ্র খামার মোট ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ বাজারে ছাড়তে বাধ্য হয়। ছোট, মাঝারি ও বড় খামারের বেলায় এই অনুপাত ৫০, ৪০ এবং ২৭ শতাংশ। এটি করে জরুরি অভাব পূরণের জন্য। এর নাম ‘অসহায়ত্বের পানির দরে বিক্রি’। এ বিক্রিতে আবার তারা সারা বছরের গড় দামের চেয়ে ৬ শতাংশ কম পায়। নাজুক খামারের মধ্যে ৪৯ ভাগ এবং দরিদ্রদের বেলায় ৩৪ ভাগ অসহায়ত্বের বিক্রি করে যাচ্ছে।
কাজেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সংগঠন তিনটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেÑ ক. ঋণের ব্যবস্থা করে সদস্যদের সাময়িক অভাবপূরণে কাজ করে এবং ভরা মৌসুমে বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রোধে; খ. ভরা মৌসুমে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত ও গুদামজাতকরণের ব্যবস্থা করে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে সহায়তায়; গ. উচ্চমূল্যের পণ্যগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সহজলভ্য প্রযুক্তিতে (সর্টিং, গ্রেডিং, প্যাকিং, ইত্যাদি বা ডালের মিল, চালের মিল ইত্যাদি) বিনিয়োগ করে অধিকমূল্য নিশ্চিতে।
৩. সম্প্রসারণ সংস্থার সেবা প্রাপ্তিতে সংগঠন : দরিদ্র কৃষকদের যদি প্রযুক্তি বা সম্প্রসারণ সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায় তারা অধিকতর দক্ষ ও উৎপাদনশীল হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, প্রায় ১৩০০টি  কৃষক পরিবারকে সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক একজন করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন। আর প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য অধিদপ্তরের মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীর সংখ্যা প্রতি উপজেলায় ১ থেকে ৩ জন। এত স্বল্পসংখ্যক মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী দিয়ে বিশালসংখ্যক কৃষককে সার্থকভাবে সম্প্রসারণ সেবা (প্রযুক্তি, কৃষি খামার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক চাষাবাদসহ অতি দরকারী তথ্য ইত্যাদি) দান করা অসম্ভব।  জনে জনে এ ধরনের সেবা দান মানবিকভাবে সম্ভবও নয়। সেজন্যই সম্প্রসারণ সংস্থাগুলো সব সম্প্রসারণ সেবা প্রদানে কৃষকদের সংগঠিত হওয়ার প্রতি তাগাদা দিয়ে আসছে। যেমন ধরুন গবাদি প্রাণির টিকার ক্ষেত্রে। কোনো টিকার একটি অ্যাম্পুল ভেঙে একসঙ্গে অনেকগুলো গরুকে টিকা দেয়া যায়, সংগঠিত হলে এ ধরনের সেবা প্রাপ্তি সহজ হয়। তেমনি কৃষি সম্প্রসারণ অফিস হতে পরামর্শ সেবা সংগঠিত হলে সহজেই পাওয়া যায়।
৪. ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ে সংগঠন :  একা একা মানুষ শক্তিহীন ভাষাহীন। তেমনি একক কৃষক নিজের ন্যায্য অধিকারটুকুও বুঝেন না, বুঝলেও ভয়ে তা চাইতে জানেন না। সঠিক সদস্যভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি কৃষক সংগঠন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের জন্য বলিষ্ঠ সামাজিক মূলধন হিসেবে কাজ করে। যদিও বাংলাদেশের কৃষিবিষয়ক নীতিমালা ও সরকারি সম্প্রসারণ সেবা সংস্থাসমূহের নাগরিক সনদগুলো এ শ্রেণীর কৃষকদের জন্য অনেকাংশেই বান্ধব কিন্তু অধিকাংশ কৃষকদের এসব সরকারি নীতিমালা ও নাগরিক সনদ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই বা ওয়াকিবহাল নয়। কোনো পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য নেই আর এখানেই নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যত বিপত্তি। কৃষকরা হচ্ছেন এ দেশের উন্নয়নের প্রধান নায়ক। অথচ কৃষকরা জানেই না যে সরকারের উন্নয়ন কাজে তারা উপকারভোগী বা কাঙাল নয় বরঞ্চ অংশীদার। কৃষকরা যেমন এ ব্যাপারে অচেতন, তাদের টাকায় বেতনভোগীরাও  তাদের বেনিফিসিয়ারি হিসেবে দূরে রাখতেই অভ্যস্থ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। একদিকে যেমন কৃষকদের চেতনার জায়গাটা নাড়িয়ে দিয়ে সচেতন করা দরকার। অন্যদিকে সুবিধাভোগী বেতনভোগীদের ভাবনার জগৎটাও পাল্টানো প্রয়োজন।
এসব তখনই সম্ভব যখন কৃষকরা সংগঠিত হবে এবং তাদের অধিকার ও সম্মানবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে।  ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের সঠিকভাবে সংগঠিত করে এবং অধিকার বিষয়ে চেতনায়ন ঘটিয়ে মর্যাদাবোধ জাগ্রত করতে পারলে সবাই তাদের শক্তি হিসেবে মেনে নেবে। তখনই কেবল সরকারি উন্নয়নে সিদ্ধান্ত  গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সত্যিকারের অংশীদার হিসেবে কৃষক সংগঠগুলো কাজ করতে পারবেন। যেহেতু কৃষকের প্রতিনিধিত্ব মানে স্থানীয় কৃষির সংখ্যাধিক্যের মতামতের প্রতিফলন সেহেতু আশা করা যায় সরকারি প্রকল্প বা কর্মসূচি প্রণয়ন হবে সঠিক এর বাস্তবায়ন হবে সুচারু। এতে সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ হবে ও অধিকাংশ কৃষককে সেবার আওতায় আনা যাবে। একটি ছোট উদাহরণ দেয়া যায়Ñ বর্ষার সময় শ্রীমন্ত নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার পাদ্রী শিবপুর ইউনিয়নের মাদুরাখালি খালে সেচ ও নিষ্কাশনের একটি অবকাঠামো তৈরি করার সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা উপজেলার কয়েকজন প্রভাবশালীর পরামর্শক্রমে প্রথমে একটি কালভার্ট নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়, যা ওই প্রভাবশালীদের জমি ও মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কালভার্ট নির্মিত হলে অধিকাংশ কৃষকের প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে পলি পড়ে চাষাবাদের অনুপযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং এতে অধিকাংশ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরা একটি স্লুইস গেটের দাবি জানিয়েছিল যেটি তারা কপাট খুলে ও বন্ধ করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।  বিষয়টি নিয়ে যখন স্থানীয়ভাবে কাজ হচ্ছিল না তখন পাদ্রী শিবপুরের ছোট কৃষকদের গড়া ‘কৃষক বন্ধু সংগঠন’ সংশ্লিষ্ট সংস্থার জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার নিকট স্লুইস গেট নির্মাণের জন্য স্থানীয় কৃষকদের স্বাক্ষরে স্মারকলিপি পেশ করেন। কৃষক সংগঠনটি সরকারি সংস্থাটিকে স্লুইস নির্মাণ পরিকল্পনা, কোন পয়েন্টে এটা হলে সবচেয়ে ভালো হবে, কখন পানির প্রবাহ বেশি হয়, কপাট কত উঁচু হবে ইত্যাদি বিষয়ে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে। যদিও প্রভাবশালীরা হুমকিধামকি দিয়েছিল তথাপি সংগঠনে সদস্যদের অংশগ্রহণ সক্রিয় ছিল বলে কোনো বাধাই তাদের টলাতে পারেনি। যদি ওই এলাকায় ছোট কৃষকদের সংগঠন না থাকত তবে সরকার যেমন একটি ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করত তেমনি অধিকাংশ কৃষক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
আবার সরকারের তথ্যমালায় কৃষকদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারলে সংগঠিত কৃষকরা কিভাবে উপকৃত হয় তার একটি উদাহরণ দেয়া যাক: সরকার কৃষকদের জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার যে সুবিধা দিয়েছে তা ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে মানছে না। অধিকাংশ ব্যাংক কৃষকদের এ হিসাবটিকে শুধুমাত্র ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখেন। ম্যানেজারগণ কৃষকদের অন্যান্য প্রাত্যহিক লেনদেনে এ হিসাবটি ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক একটি আঞ্চলিক পাঠচক্রে কৃষক নেতার বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা থেকে জানতে পারল যে ১০ টাকার হিসাবটি সব স্বাভাবিক লেনদেনে ব্যবহার করা যাবে। তখন কৃষকরা স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে ওই নীতিমালার কপিটিসহ দেখা করল ও তাদের সংগঠনের সদস্যদের জন্য সরকার কর্তৃক প্রদেয় এ ন্যায্য অধিকার আদায় করল। সরকারের উচ্চমহলে বিষয়টি জানাজানি হলে সরকার এসংক্রান্ত একটি সাধারণ প্রজ্ঞাপনও জারি করে।  
৫. প্রাকৃতিক সম্পদ নাগালের মধ্যে পাওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠন : প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে জল, জমি, বন, বায়ু, সূর্যে আলো, খনিজ সম্পদকে বুঝায়। বাংলাদেশে অধিক জনসংখ্যার চাপে কৃষির প্রধান তিন প্রাকৃতিক সম্পদÑ জল, জমি ও বন দিন দিন কমে আসছে। সীমিত এ প্রাকৃতিক সম্পদ  নাগালের মধ্যে পেতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। জলাভূমি যেমন- হাওর, বাঁওড়, বিল, নদীনালার ওপর যেমন মৎস্যজীবীদের অধিকার নেই আবার কৃষি খাসজমিতেও নেই কৃষকের অধিকার। এ ক্ষেত্রে জোট বাঁধার কোনো বিকল্প নেই। সংগঠিত হলেই শুধু যেটুকু প্রাকৃতিক সম্পদ আছে তা সামাজিকভাবে ভাগাভাগী করে কৃষির চাহিদা মেটানো যাবে। যখন সংগঠিত কৃষকরা ভূমি ব্যবহার বিষয়ক সব সরকারি নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন, স্থানীয় কমিটি  ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ করে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে তখন প্রাকৃতিক সম্পদ নাগালের মধ্যে পেতে সুবিধা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের কিছু কিছু কৃষক সংগঠন তাদের বলিষ্ঠ সদস্যভিত্তি ও নেতৃত্বের গুণে সরকারি খাসজমি লিজ নিয়ে সদস্যদের জন্য ব্যবহার করছে। তদ্রুপ খাস জলাশয়, খাসজমিতে বাজার ইত্যাদি সংগঠন দ্বারা ব্যবস্থাপনার কথাও বলা যেতে পারে।
এভাবেই সদস্যভিত্তিতে গড়া কৃষক সংগঠন তার সদস্য ও আশপাশের কৃষকদের অধিকার আদায়ে একটি বলিষ্ঠ সামাজিক মূলধন হয়ে উঠে। উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় একটি বলিষ্ঠ কৃষক সংগঠন- ক্ষুদ্র কৃষকদের সব সমস্যার জবাব।

মাহমুদ হোসেন*  ড. ইমানুন নবী খান**
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। ** প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা


টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার মূল পরিচালিকা শক্তি

তিন ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক : টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার মূল পরিচালিকা শক্তি

একটি টেকসই কৃষক সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি তার মজবুত সদস্যভিত্তি। এটি গড়ে উঠে তখনই যখন সদস্যরা সংগঠনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কার্যাবলিতে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং নিজেকে সংগঠনের গর্বিত অংশীদার মনে করে। সংগঠনের সঙ্গে সদস্যদের এ অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক যখন দৃঢ় হয় তখন সংগঠনের বিভিন্ন সেবা প্রাপ্তি ও যোগাযোগ রক্ষার প্রয়োজনে অন্যান্য কৃষক সংগঠন, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। একটি টেকসই কৃষক সংগঠন তিন ধরনের পারস্পরিক সম্পর্কে বিজড়িত হয়ে টেকসই হতে পারে বন্ধন, সেতুবন্ধন ও সংযোগ। এ তিন ধরনের সম্পর্ক নিম্নোক্ত সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো-
বন্ধন : তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক সংগঠনে সদস্যদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক হলো বন্ধন। তবে এ বন্ধন কতটা দৃঢ় হবে তা নির্ভর করে সংগঠনটি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার ওপর। সংগঠনের সব সদস্যর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের মাঝে বন্ধন দৃঢ় করতে যে বিষয়গুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা নিম্নরূপ-
ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের সমবেতকরণ : বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক সংগঠন গড়ে ওঠে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কোনো না কোনো প্রকল্পের উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। যেভাবেই গড়ে উঠুক না কেন সমবেতকরণের এ ধাপে খেয়াল রাখতে হবে সংগঠনগুলো যেন শুধু প্রকল্পের সেবা প্রদানের হাতিয়ার হিসেবে গঠিত না হয়। এটাও খেয়াল রাখা প্রয়োজন সংগঠনগুলো যাতে একই শ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে গঠিত হয়। এখানে একটা কথা স্মরণ করা যেতে পারে যে, সচ্ছল পরিবারের ২৬ থেকে ৩০ শতাংশ বা আরও বেশি কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত (সূত্র : আব্দুল বায়েস ও মাহবুব হেসেন, ২০০৮)। ফলে তারা এমনিতেই প্রভূত প্রভাব রাখেন। যদি তাদের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা কৃষকদের সংগঠনে আনা হয় তবে তারা সংগঠনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেজন্য সমশ্রেণীর কৃষক নিয়ে দল গঠনই শ্রেয়। শুধু প্রকল্পের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা কৃষক সংগঠনগুলোর সদস্যদের মধ্যে বন্ধন শিথিল হয় নানা কারণে; তন্মধ্যে দলে নানা শ্রেণীর কৃষকদের মিশ্রণ, নানামুখী স্বার্থের টানাপড়েন, প্রকল্প সুবিধার অসম বণ্টন (বড় কৃষককে বেশি সুবিধা অথবা পক্ষপাত) ও সংগঠনের মাধ্যমে প্রকল্প চাহিদামাফিক সেবা বিতরণ ইত্যাদি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এ কারণে প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ও বিলুপ্ত হয়। আবার যখন সমশ্রেণীর কৃষকরা  তাদের জটিল সমস্যাগুলো অংশগ্রহণমূলকভাবে চিহ্নিত করে ও তা সমাধানে একই উদ্দেশ্যে একসঙ্গে সংগঠিত হয় তখন সেটিতে সদস্যরা আস্থা অর্জন করে এবং উদ্দেশ্য পূরণে একসঙ্গে কাজ করে।
উদাহরণ : একটি নির্দিষ্ট গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন-বর্গা কৃষকরা একজন মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীর সহায়তায় কৃষিতে তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলকভাবে চিহ্নিত করল। চিহ্নিত সমস্যার যেগুলো এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, সেগুলো কিভাবে সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে অংশগ্রহণকারী কৃষকরা একসঙ্গে আলোচনা করল এবং একটি নতুন কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার সম্ভাব্য এজেন্ডা হিসেবে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানে অংশগ্রহণকারী কৃষকদের মতামত গ্রহণ করল। একটি কার্যকর কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে এ অনুশীলনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ অনুশীলনের মাধ্যমেই প্রান্তিক-বর্গা-ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হবে কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন? ধরা যাক অংশগ্রহণমূলক অনুশীলনে এ ধরনের যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলোÑ উপকরণের সমস্যা (ভেজাল, উচ্চমূল্য), বাজারজাতকরণের সমস্যা (ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না), অবকাঠামো (সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, স্লুইস গেট, নিষ্কাশন নালা, গ্রামীণ রাস্তা ইত্যাদি) সমস্যা, ঋণের সমস্যা, উৎপাদনের সমস্যা (লাগসই প্রযুক্তি নেই)। আলোচনা করে তারা বুঝতে পারল এ সমস্যাগুলো একা একা সমাধান সম্ভব নয়, সম্মিলিত উদ্যোগে তখন তারা একটি সংগঠন গড়ে তুলতে সহমত পোষণ করল।
স্পষ্ট ও অংশীদারমূলক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পারস্পরিক সুবিধা : ওপরের উদাহরণের আলোকে দেখা যাচ্ছে, চাষাবাদে ব্যক্তি কৃষকদের একেকজনের একেক রকম সমস্যা থাকলেও সমশ্রেণীর কৃষকদের কিছু সমস্যা আছে, যা সবাইর জন্য সাধারণ, সে সমস্যা এককভাবে সমাধান করা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। এভাবে সমশ্রেণীর কৃষকদের সাধারণ সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সবার অংশীদারিত্বে একটি সাধারণ স্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এভাবে সব সদস্যের সাধারণ স্বার্থে গড়া সংগঠনে সবাইর মতামতের প্রতিফলন ঘটে, সবাই সংগঠনকে নিজের মনে করে এবং তাদের মধ্যে বন্ধন অটুট থাকে।
উদাহরণ : ধরা যাক পূর্বের সংগঠনটি অংশগ্রহণমূলকভাবে সমস্যা চিহ্নিত করার পর সংগঠিত হওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ হলো। এ সমস্যাগুলো থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যই হচ্ছে ‘ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের আর্থসামাজিক জীবনমান উন্নয়ন’। এ লক্ষ্য পূরণে সাংগঠনিকভাবে যেসব স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ করতে হবে তা নি¤œরূপÑ
সদস্যদের পূর্ণ আর্থসামাজিক বৃত্তান্ত প্রস্তুত করা এবং তদনুযায়ী তাদের চাহিদা নিরূপণ;
চিহ্নিত সমস্যাসমূহ সমাধানে একত্রে কাজ করা, সদস্যদের চাহিদামাফিক সেবা প্রদানে দলীয়ভাবে উপকরণ ও বাজারজাতকরণ সেবা (দলীয়ভাবে একসঙ্গে উপকরণ কেনা ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা) প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা যাতে করে সদস্যরা সংগঠনমুখী হতে পারে এবং তাদের মধ্যে সংগঠনের প্রতি দৃঢ়বন্ধন গড়ে উঠে;
সংগঠনে সুশাসন ও শক্ত দলীয়ভিত বজায় রাখতে সব কাজ কর্মে স্বচ্ছতা বজায় রাখা;
বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা;
কৃষিতে স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত সমস্যাসমূহের সমাধানে  স্থানীয় সরকার ও সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহের নাগরিক সনদে উল্লিখিত কৃষকদের প্রাপ্য সেবাসমূহ চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থাসমূহের সঙ্গে সংযোগে দেনদরবার করা;
সদস্যদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা যাতে সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচিতে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়।
স্বায়ত্তশাসন : সদস্যদের সবার অংশীদারিত্বে নির্ধারিত সাধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করা যে কোনো কৃষক সংগঠনের উন্নয়নের জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পভুক্ত বা প্রকল্প সাহায্যপুষ্ট সংগঠনগুলোতে সদস্যরা সম্প্রসারণ সংস্থার প্রতি অতিনির্ভরশীল, কি করতে হবে না হবে তা পূর্ব নির্ধারিত। কোনো পরিবর্তন করা না করা তাও বাইরের নির্দেশে করা হয়। ফলে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনে সদস্যদের খুব একটা সক্রিয় হতে দেখা যায় না। হতে পারে প্রকল্পের উদ্দেশ্য আদর্শের সঙ্গে তাদের আকাক্সক্ষার কোনো মিলই নেই। কারণ কৃষকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য আদর্শ নিয়ে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। যদি এমন হতো প্রকল্পটি শুরুই হয়েছে এলাকার কৃষকদের সঙ্গে অংশীদারিভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে। তবে কৃষকরা তাদের মতামত দিতে পারত, তাদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী প্রকল্পটি তৈরি হতো। অথবা সমস্যা চিহ্নিত করার ফলে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে তার সমাধান করতে পারত। সব ক্ষেত্রেই প্রকল্প বা সম্প্রসারণ সংস্থা শুধু সহায়কের ভূমিকা পালন করবে, কোনোক্রমেই প্রকল্পের কোনো মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করবে না, হয়তো কিছু তথ্য, প্রযুক্তি, জ্ঞান দিয়ে সহায়তা করবে। তাদের কাজ হলো কৃষকদের আত্মশক্তি জাগ্রত করা, নির্দেশ করা নয়। এতে কৃষকদের মাঝে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়বে। সংগঠন তার নিজস্ব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী চলবে। সব সিদ্ধান্ত সংগঠনের সদস্যরাই নেবেন ও বাস্তবায়ন করবেন। এভাবে সংগঠনগুলোতে স্বায়ত্তশাসনের চর্চা গড়ে ওঠে, সদস্যদের মাঝে বন্ধন গড়ে ওঠে, যা সংগঠনের সাধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক। স্বায়ত্তশাসন মানে নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। স্বায়ত্তশাসনের ফলে সদস্যরা নিম্নের কাজগুলো করতে অনুপ্রাণিত হয় এবং তাতে সংগঠনে তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়:
আমরাই আমাদের গঠনতন্ত্র তৈরি করব;
আমরা নিয়মিত সঞ্চয় করব, ভবিষ্যতে সঞ্চয় তহবিল থেকে আমরা সদস্যদের চাহিদামাফিক সেবা প্রদানে সামাজিক বিনিয়োগ করতে পারব;
সংগঠনের হিসাব নিয়মিত রাখব এবং সব সদস্যর মাঝে হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখব;
নিয়মিত সভা করব এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত সবাই মিলে গ্রহণ করব।

সাধারণ মূল্যবোধ : মূল্যবোধ দেখা যায় না ছোঁয়াও যায় না- অনুভব করতে হয়। কিন্তু এর প্রভাবেই আমাদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠিত হয়। মূল্যবোধ আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ ও অর্জনে প্রভাব ফেলে। আমরা যখন অন্যের কল্যাণ চাইব তখন নিজের স্বার্থের কথা কম চিন্তা করব বা করব না বিপরীতটাও অনুরূপভাবে সত্য। আমরা প্রথমটাই চাইব। আমাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মূল্যবোধ জড়িত। যদি দেখি কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন শেষে সবাই আনন্দিত অথবা ব্যর্থ বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সব স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে অথবা সীমিত সম্পদ যখন সবাইর মধ্যে সমভাবে বণ্টন করা যাচ্ছে না তখন যদি নিজের অংশটা অন্যকে দিতে সবাই মুখিয়ে থাকে কিংবা আর্থিক কোনো লাভ হবে না জেনেও সব সংগঠনের জন্য ব্যক্তিস্বার্থকে ত্যাগ করতে পারছেন তখন বুঝা যাবে সংগঠনে যৌথতার মূল্যবোধ জাগরূক আছে। আমরা জীবনে যেসব বিষয় নিয়ে প্রাণপণ লড়াই করি সে সব বিষয়ের পরিষ্কার ধারণা দেয় মূল্যবোধ। মূল্যবোধই বলে দেয় কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা চাই, কোনটা চাই না।
একজন মানুষের মধ্যে যেহেতু ভালো-মন্দ, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, সমাজকেন্দ্রিকতা একসঙ্গে বিরাজমান- তাই আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। সংগঠন যেহেতু সহযোগিতা ও যৌথতার ওপর গড়ে উঠে সেজন্য সংগঠনে কমিউনিটি সমাজ, ত্যাগ তিতিক্ষা এ ধরনের মূল্যবোধকে লালন করতে হয়। এজন্য উদ্দেশ্য, আদর্শ ঠিক করতে হয়, পরিকল্পনা করতে হয় সমাজকেন্দ্রিক মূল্যবোধের আলোকে। এটিই হলো মূল্যবোধের চর্চা। এছাড়াও কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। নিয়ম মূল্যবোধ আলাদা বিষয়। মূল্যবোধ বিমূর্ত ধারণা, নিয়ম হচ্ছে মূল্যবোধ প্রকাশের উপায়। যেমন- আমরা বিশেষ বিশেষ দিনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করিÑ এটি নিয়ম। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় আমাদের দেশপ্রেমের মূল্যবোধ। মৃত ব্যক্তির জন্য পালিত অনুষ্ঠানে আমরা সাদা-কালো পোশাক পরিÑ এটা নিয়ম কিন্তু এর মধ্য দিয়ে মৃতদের জন্য আমাদের শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়।  
সংগঠনের একটা সাধারণ মূল্যবোধ সদস্যদের মাঝে বন্ধন দৃঢ় করতে একটি শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সংগঠনে সদস্যদের বন্ধন দৃঢ় করতে একটি স্বকীয় দলীয় মূল্যবোধ সৃজনেও নেতাদের কাজ করতে হয়। একটি অতি সাধারণ মূল্যবোধ হতে পারে ‘সংগঠনের সব কাজে সদা সত্য কথা বলব- কোনো কিছু গোপন করব না’ অথবা এমন হতে পারে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। আবার সদস্যদের মাঝে মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শপথও নেয়া যেতে পারে ‘আমরা একতাবদ্ধ থাকবো, মিত্র সংগঠনগুলোর সাথে মিলেমিশে গড়ে তুলবো বৃহত্তর ঐক্য। আমার জন্য নয়, এখন থেকে আমাদের জন্য কাজ করব। সম্পদ সৃষ্টি করব মানুষের জন্য। সম্পদ সংরক্ষণ করব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।’ উদাহরণ হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একটি মহিলা গণ সংগঠন ‘সেবা’র (ঝঊডঅ) মূল্যবোধের কথা বলা যেতে পারে, যারা তাদের সব সভার আগে ও পরে শপথ নেয় এভাবে ‘আমরা সত্য, অহিংসা, সর্বধর্ম ও খাদি (স্থানীয় কর্মসংস্থান) প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবো’।


প্রতিশ্রুত সদস্য : সংগঠনের অংশগ্রহণমূলক উদ্দেশ্য ও সাধারণ মূল্যবোধ ছাড়াও সদস্যদের নিয়মিত আর্থিক অনুদান বা বিনিয়োগ ও বন্ধন দৃঢ় করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সদস্যরা যখন প্রতিশ্রুতিমতো সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে সঞ্চয় করে এবং সঞ্চিত অর্থ থেকে সামাজিক কোনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সব সমসুবিধা লাভ করে তখন তা সদস্যদের প্রতিশ্রুতবদ্ধ করে। প্রতিশ্রুত বা অঙ্গীকারাবদ্ধ সদস্যরা একদিকে যেমন সঞ্চয়ে আগ্রহ বোধ করে অন্যদিকে নিজেদের এ সম্পদ সৃজনের দেখভাল করতেও উদ্যমী হয়। তদুপরি সংগঠনে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আর্থিক সম্পদের ব্যবহারে নেতৃত্বকে দায়বদ্ধ করে তুলে।

সেতুবন্ধন : একটি কৃষক সংগঠনে সদস্যদের মধ্যকার দৃঢ় বন্ধন রচিত হওয়ার পরের কাজটি হলো অন্যান্য কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন বা সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। একজন কৃষক যেমন অপর একজন কৃষকের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে; পরস্পরের ভালো চাষাবাদ পদ্ধতি, কারিগরি জ্ঞান, ভালো বীজ, গুণগতমানের চারা, কলম, সার ইত্যাদি নিয়ে মতবিনিময় করে তেমনি একটি কৃষক সংগঠন অন্য আরেকটি কৃষক সংগঠনের সঙ্গে সেতুবন্ধন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এ সেতুবন্ধন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে দুটি সংগঠন বা সমশ্রেণীর অনেক কৃষক সংগঠন পরস্পরের সঙ্গে অনেক অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে পারে। তারা কিভাবে গড়ে উঠেছে, গড়ে ওঠার সময় কী কী প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিল, কিভাবে সেসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠেছে, সদস্যদের জন্য কী কী অভিনব সেবা দেয়া হয়, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সংগঠনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা কিভাবে করা হয়, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সংগঠনের সম্পর্ক কেমন, কৃষি পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সংগঠন সদস্যদের জন্য কি করে, সর্বোপরি সামাজিক মূলধন সৃজনে সংগঠন কিভাবে ভূমিকা রাখছে, কি কৌশল ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়ে ভাব-মতামত আদান-প্রদান হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক সংগঠনই ক্ষুদ্র, ২০-২৫ জনের ছোট ছোট দল; কাজেই পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা, ভূমিহীন কৃষকদের অধিকার আদায়েও কৃষক সংগঠনগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো না থেকে পরস্পরের সমন্বয়ে একটি অভিন্ন ও জোটভুক্ত মঞ্চ গড়ে তুলতে পারলে এ শ্রেণীর কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করতে পারে। এবং এ সেতুবন্ধনের সম্পর্ক গড়া বাংলাদেশের কৃষক সংগঠনের জন্য অতিশয় জরুরি।  
সেতুবন্ধনের সম্পর্ক রচনা করার কাজগুলো বিভিন্ন ধাপে হতে পারে। তবে পাশাপাশি সমশ্রেণীর কৃষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের কাজটিই আগে করা উচিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় একই ইউনিয়নে একই প্রকল্পের গড়া একটি গ্রামের কৃষক সংগঠন তার পাশের গ্রামগুলোর কৃষক সংগঠনগুলোকে চিনে না, জানে না বা জানার আগ্রহও বোধ করে না। এটা হয়, আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার ত্রুটির জন্য, মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীরা কখনো ছোট ছোট কৃষক দলগুলোকে জোটভুক্ত হওয়ার সুবিধাগুলো কী তা বুঝিয়ে উদ্দীপ্ত করে না বা সেটা করার দক্ষতাও নেই। সেতুবন্ধন পর্যায়ে জোটভুক্ত হওয়ার ধাপগুলো নিম্নরূপ হতে পারে:


গ্রাম থেকে : গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা, ভূমিহীন পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের ছোট ছোট দল করে একটা গ্রাম সমিতি গড়ে তোলা যায়। গ্রামের উন্নয়নে তারাই সিদ্ধান্ত দেবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির সঙ্গে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের জোটের সঙ্গে গ্রাম উন্নয়ন পরিকল্পনা দাখিল করবে।
উদাহরণ : বরগুনা সদর উপজেলার সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট ফউন্ডেশন (এসডিএফ) সহায়তায় গড়ে ওঠা পরীর খাল গ্রাম সমিতি।
ইউনিয়ন থেকে : ইউনিয়নের সব গ্রামে সমশ্রেণীর যেসব কৃষক সংগঠন আছে সেগুলো ইউনিয়ন পর্যায়ে জোটভুক্ত হতে পারে। তারা পরস্পরের সঙ্গে অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান যেমন করতে পারে, তেমনি সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জোরালো সংলাপ চালাতে পারে, ইউনিয়ন কৃষি কমিটিতে অংশগ্রহণ, গ্রাম সমিতিগুলোর মাধ্যমে ওয়ার্ড সভা করা, সব ওয়ার্ডের কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগ পরিকল্পনায় একত্র করে ইউনিয়ন কৃষি কমিটির মাধ্যমে উপজেলা পরিষদে প্রেরণ করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দিতে পারে।


উদাহরণ : কুড়িগ্রামে যাত্রাপুর ইউনিয়নে আরডিআরএসের যাত্রাপুর ইউনিয়ন ফেডারেশন।
উপজেলা পর্যায়ে : ইউনিয়নের জোটগুলো উপজেলা পর্যায়ে তাদের জোট গঠন করতে পারে। এ জোটটি ইউনিয়ন পর্যায়ের জোটগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধন, তাদের পরিকল্পনাগুলো উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) অবহিত করতে পারে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জোরালো দেন-দরবার চালাতে পারে। উপজেলা পর্যায়ের জোট- ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের জোটের চাহিদা সাপেক্ষে কৃষি উপকরণ কোম্পানি, উপজেলার পাইকারি উপকরণ বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে উপকরণ বেশি পরিমাণে ক্রয় করার মাধ্যমে গুণগত মান ও স্বল্পমূল্য নিশ্চিত করতে পারে।
জেলা পর্যায় : জেলা পর্যায়ে উপজেলা পর্যায়ের সেতুবন্ধনে আবদ্ধ কৃষক সংগঠনগুলো জোটভুক্ত হবে এবং জেলা পর্যায়ে এ জোটের ভূমিকা উপজেলা জোটের মতোই তবে আরো বড় পরিসরে।
বিভাগীয় বা আঞ্চলিক পর্যায় : গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা পর্যন্ত জোটগুলোর বৃহত্তর জোট বিভাগীয় পর্যায়েও হতে পারে আবার আঞ্চলিক পর্যায়েও করা যেতে পারে। কৃষকদের অধিকার রক্ষায় বিভাগীয় পর্যায়ে দেন-দরবারে এ ধরনের সেতুবন্ধন রচিত হতে পারে।
উদাহরণ : সারা বাংলা কৃষক জোট (উত্তর বঙ্গ), সারা বাংলা কৃষক জোট (দক্ষিণ বঙ্গ) ও কেন্দ্রীয় কৃষক মৈত্রী।
জাতীয় জোট : দেশের সর্ববৃহৎ পরিসরে সব পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বে কৃষকদের কেন্দ্রীয় জোট হতে পারে, যা কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত সব জাতীয় ইস্যু নিয়ে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের সাথে দেন-দরবার করতে পারে।


উদাহরণ : সারা বাংলা কৃষক জোটের আত্মপ্রকাশ, যদিও একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে তবুও বাংলাদেশের প্রায় ৫৪টি কৃষক সংগঠনের সেতুবন্ধনে এটি রচিত।
সংযোগ: সংগঠনে সদস্যদের মাঝে উত্তম সেবা নিশ্চিত করে বন্ধন দৃঢ় রাখতে নেতাগণকে বিভিন্ন সরকারি সেবা সংস্থা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, আবার সেতুবন্ধন সম্পর্কেও জোটভুক্ত সংগঠনগুলো কৃষকদের অধিকার রক্ষায় বা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়। এ যোগাযোগ স্থাপনের কাজটিই হলো সংযোগ। তবে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংযোগের ক্ষেত্রে কৃষক নেতাগণকে যথেষ্ট বিচক্ষণ হতে হবে। বিশেষ করে কৃষি, সম্পদ, সরকারি নীতিমালা, কোন দপ্তরের কী কাজ ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস  হচ্ছে চাষাবাদ। গ্রামীণ পটভূমিতে জীবন জীবিকায় পাঁচ ধরনের সম্পদকে চিহ্নিত করা যায়। যেমনÑ
প্রাকৃতিক সম্পদ : জল-জমি-জলা, বন, উদ্ভিদ জিন তথা ফসলের রকম।
ভৌত  সম্পদ : রাস্তাঘাট, আকাশ, পানি সরবরাহ সেচনালা, কৃষি যন্ত্রপাতি, ইত্যাদি।
মানবসম্পদ :    মানুষের  দক্ষতা, জ্ঞান, স্বাস্থ্য ইত্যাদি।
আর্থিক সম্পদ : সঞ্চয়, ঋণ, পণ্য ভা-ার, প্রেরিত অর্থ ইত্যাদি।
সামাজিক সম্পদ : গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান, কৃষক সংগঠন, নেটওয়ার্ক  বা বহুমুখী যোগাযোগ।
এসব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (এবং জীবন-জীবিকার গড়ন বা আদল বা ধরন ঠিক করে) তথা রাষ্ট্রের সার্বিক শাসন পদ্ধতি পরিচালন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা, আইন ইত্যাদি বর্তমান। এসব প্রতিষ্ঠান মৌজা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিদ্যমান। এমনকি  অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও এখানে জড়িত থাকে। এগুলো সরকারি হতে পারে আবার বেসরকারিও হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান এবং নীতিমালাই কার্যকরভাবে নির্ধারণ করে সম্পদে প্রবেশাধিকার, সম্পদের মধ্যকার বিনিময় এবং জীবন-জীবিকার কৌশল অবলম্বনে/ নির্বাচনে যেমনÑ জমিসংক্রান্ত  বিষয়ের জন্য  ভূমি  অফিস, ভূমি আইন।
কাজেই সরকারি-বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা না জানলে কৃষকদের অধিকার কী, কিভাবে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র কাজ করে তা জানা যাবে না। সেজন্য জানতে হবে কোন প্রতিষ্ঠান কি কাজ করে, কী তাদের ভূমিকা, কি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, কিভাবে তারা তাদের  দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে, কার্যকর করে। সেগুলো কী নীতিমালা বা আইনে বলা আছে? প্রতিষ্ঠানগুলো কী তাদের মানবিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে  সচেতন? বিভিন্ন দলের মধ্যে সম্পর্ক কী রকম? এসব কিছু জানতে হলে এদের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই বুঝা যাবে কোন প্রতিষ্ঠান কী সেবাটা দেয়, তার চালিকাশক্তি কী? এগুলো জেনে সেবা গ্রহণ করতে হবে সদস্যদের জন্য। তখনই কৃষক সংগঠনের সদস্যরা বলতে পারবেন নীতিমালার কোথায় কী সংযোজন করা দরকার কোনটা বাতিল করা দরকার।
এ সংযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে সহজলভ্য সেবাদানের উৎসগুলো সম্পর্কে জানা যাবে না, সেবাও গ্রহণ করা হবেনা। আবার নীতিমালা না জানলেও সেবা গ্রহণের সুযোগ আছে কিনা তা জানা যাবে না। উভয় ক্ষেত্রেই যদি নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনা দরকার তার জন্য অ্যাডভোকেসিও করা যাবে না।
প্রায়শই দেখা যায়, কৃষকরা জানে না যে, কোথায় গেলে কি সেবা পাওয়া যাবে! যদিও সরকারি সেবা বিষয়ক তথ্যগুলো প্রতিটি সেবাদানকারী সংস্থার যার যার নাগরিক সনদে বিবৃত আছে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক সংযোগ গড়ে না ওঠায় প্রান্তিক কৃষকরা এসব সেবা প্রাপ্তিতে বঞ্চিত হয়।
সরকারি সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে কৃষির উন্নয়নে বা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় কৃষক সংগঠনের অংশগ্রহণ। যেহেতু কৃষক সংগঠন স্থানীয় কৃষি, এর প্রতিকূলতা ও ঝুঁকিসমূহ এবং ঝুঁকি প্রশমনে করণীয় সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল, কাজেই কৃষি বিষয়ক যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংগঠিত কৃষকের প্রতিনিধিত্ব জরুরি।  এজন্য ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষি সম্পর্কিত যেসব কমিটি আছে (কৃষি কমিটি, জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত কমিটি, কৃষি পুনর্বাসন কমিটি, মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি) সেগুলোতে সংগঠিত কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে সব পর্যায়ে সংযোগ রক্ষা করা প্রয়োজন।  
সরকারি সংস্থাসমূহের মতো বেসরকারি খাতের সঙ্গেও একটা লাভ-লাভ (উইন-উইন) সম্পর্ক স্থাপনে কৃষক সংগঠনগুলোকে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। যখন একটি সংগঠনে সদস্যদের মাঝে দৃঢ় বন্ধন গড়ে ওঠে, তারা একত্রে সিদ্ধান্ত নেয় এখন থেকে আমরা আর ‘জনে জনে উপকরণ কিনব না, জনে জনে উৎপাদিত ফসল বেচবো না’ তখনই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে লাভজনক সংযোগের প্রয়োজন হয়। একসঙ্গে যখন বড় ধরনের চাহিদা তৈরি হয় অর্থাৎ একটি কৃষক সংগঠন যখন বেসরকারি উপকরণ কোম্পানির কাছে একেকটি বাজার হিসেবে গণ্য হয়, কোম্পানিগুলো তখন তার প্রয়োজনেই একটা আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। এতে উপকরণের গুণগতমান যেমন নিশ্চিত করা যায় তেমনি ন্যায্যমূল্যও পাওয়া যায়।

মাহমুদ হোসেন*  ড. ইমানুন নবী খান**
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা



কৃষক সংগঠন গড়তে প্রেরণা জোগানো : বহিঃপ্রেরণা বনাম অন্তঃপ্রেরণা

বাংলাদেশের কৃষিতে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গা-ভূমিহীন কৃষকদেরই জয়জয়কার। বাংলাদেশের মোট খাদ্যের ৪০ ভাগের জোগান দেয় শুধু বর্গাচাষিরা। কিন্তু কৃষির সব সংকটে এরা সংবেদনশীল অর্থাৎ জলবায়ুগত প্রতিকূলতা, উপকরণ সংকট, উৎপাদিত পণ্যের অস্বাভাবিক দরপতন, ইত্যাদি যে কোনো সমস্যায় এরাই সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন। যেহেতু বড় ও মাঝারি কৃষকরা খুব সহজেই সরকারি, বেসরকারি সেবা নাগালের মধ্যে পেতে পারে, তাই এসব প্রতিকূলতাও দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু  ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেবার নাগালের বাইরে থাকে। কাজেই যে কোনো সম্প্রসারণ সেবার প্রথমটা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের কেন্দ্র করেই হওয়া উচিত। এদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেলে এসব সমস্যা মোকাবিলায় সমষ্টিগত উদ্যোগ হিসেবে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো সহজ হয়।
একটি শক্তিশালী ও টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে উঠতে দুই ধরনের প্রেরণার প্রয়োজন হয়, বহিঃপ্রেরণা ও অন্তঃপ্রেরণা। বহিঃপ্রেরণা হলো কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা তাদের প্রকল্প কর্তৃক প্রেরণা। আর অন্তঃপ্রেরণা হলো সমশ্রেণীর কৃষকগণ একটি সাধারণ স্বার্থে (নিজেদের সমস্বার্থে) সদস্যদের নিজস্ব প্রেরণায় সংগঠিত হওয়া।
একটি টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে বহিঃ ও অন্তঃ দুই ধরনের প্রেরণারই প্রয়োজন আছে। তবে সংগঠন গড়তে অন্তঃপ্রেরণার স্ফুরণ ঘটাতে, কৃষকদের নিজেদের সমস্যা সমাধানে নিজেরাই সংগঠিত হওয়ার জন্য উদ্যোগী হতে, সদস্যদের জন্য সরকারি সেবা সুনিশ্চিত করতে, উপকরণ সেবাসহ উৎপাদিত পণ্যের মূল্যের দরপতনে একাট্রা হয়ে কাজ করতে সরকারি-বেসরকারি সম্প্রসারণ সংস্থাগুলোর বহিঃপ্রেরণাকারী হিসেবে সহায়কের ভূমিকা পালন করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ ছোট বড় কৃষক সংগঠন, উৎপাদনকারী দল বা তাদের সমবায় রয়েছে (এফএও ২০১৩)। এদের প্রায় সবাই সরকারি বা বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্প সহায়তায় অর্থাৎ বহিঃপ্রেরণায় গড়ে উঠেছে।  এসব সংগঠন সরকারের উন্নয়ন কাজের অংশীদার হিসেবে প্রকল্প চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে এর বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়নসহ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার পরিবর্তে প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, তথ্যবিস্তার, ঋণদান, ইত্যাদি কার্যাবলি সুসম্পন্ন করার জন্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রকল্পের কোনো কাজেই তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না তাই সংগঠনের সদস্যরা সংগঠনের প্রতি তাদের মালিকানা অনুভব করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রবণতাটা এমন যখন কোনো একটা প্রকল্পে কৃষক সংগঠন গড়ার প্রয়োজন হয়, মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীগণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে তার পরিচিত কৃষকদের ডেকে বলেন ২০-২৫ জনের একটা করে সমিতি তৈরি করে নাম-ঠিকানাসহ তার সঙ্গে অথবা প্রকল্প অফিসে যোগাযোগ করার জন্য। আর এতেই ঘটে বিপত্তি! এভাবে গড়া সংগঠনে সমশ্রেণীর কৃষক থাকে না ফলে বড় কৃষকরাই প্রকল্পের সুবিধা বেশি ভোগ করে। আবার কোনো কোনো প্রকল্প যদিও ভিত্তি জরিপ করে সমশ্রেণীর কৃষক চিহ্নিত করে থাকে তথাপিও কৃষকরা জানে যে তাদের সংগঠনে আসতে হবে প্রকল্প থেকে প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ, উপকরণ, ইত্যাদি সুবিধা পাওয়ার জন্য। আবার এসব প্রকল্পে যদি ব্যয়বহুল কোনো উপকরণ  (যেমন- কৃষি যন্ত্রপাতি বা থোক অনুদান) বিতরণের সুযোগ থাকে তাহলে আরেক বিপত্তি! সেটাও সংগঠনের সবার মালিকানায় বিতরণ না হয়ে নামে বেনামে বড় কৃষকদের কুক্ষিগত হয়। তাই বহিঃপ্রেরণায় কৃষক সংগঠন গড়তে এসব পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সংগঠনগুলো টেকসই হয় না এবং প্রকল্প শেষ হলেই এদের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে পড়ে।
বহিঃপ্রেরণায় গড়লেও সরকারি সংস্থার মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীগণ যদি প্রকল্পের শুরুতেই সমশ্রেণীর ক্ষুদ্র-প্রান্তিক-বর্গা কৃষকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে নিজেদের সাধারণ সমস্যাগুলোকে সমাধানের জন্য কেন সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন, সংগঠিত হওয়ার সুবিধা, সুশাসন ও স্বচ্ছতার চর্চা বজায় রেখে সংগঠনকে টেকসই করে তোলার ব্যাপারে কৃষকদের অনুপ্রাণিত করতেন তাহলে বাংলাদেশের কৃষক সংগঠনগুলোর চেহারাটা অন্যরকম হতো। একটি টেকসই সংগঠন গড়ে তোলার জন্য যেসব আদর্শ নিয়মনীতি রয়েছে সেগুলোর মাপকাঠিতে যদি কৃষক সংগঠনগুলোর মাঝে প্রকল্প সুবিধা বণ্টন করা যেত তবে সরকারি-প্রকল্প সেবা অনুকূলে পাওয়ার জন্য কৃষক সংগঠনগুলোর মাঝে একটা উদ্দীপনার সৃষ্টি হতো।
এভাবে কৃষক সংগঠন গড়তে বহিঃপ্রেরণাকারী হিসেবে সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহ নিমোক্ত কয়েকটি মৌলিক ধাপে কাজ করতে পারে-
ধাপ ১ : অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে সমশ্রেণীর কৃষক চিহ্নিত করা : বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র-প্রান্তিক-বর্গা কৃষক, এলাকার রাজনৈতিক নেতা, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষুদ্র-প্রান্তিক-ভূমিহীন কৃষকদের দুর্দশা লাঘবে এদের সংগঠিত করা। বিষয়টি সম্পর্কে বড় কৃষক বা রাজনৈতিক নেতাদের স্পষ্ট ধারণা দিলে তারা এতে নাক গলাবেন না বরঞ্চ সহায়ককে সহযোগিতা করার আশ্বাসও দিতে পারেন। যদি প্রকল্প কর্তৃক কোনো উপকরণ বিতরণের সুযোগ থাকে তবে বড় ও অভিজাতদের সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে যে এসব উপকরণ ব্যক্তি মালিকানায় দেয়া হবে না বরং যদি সংগঠন আদর্শ নিয়মনীতি মেনে চলে তবেই সামাজিক মালিকানায় দেয়া হবে অর্থাৎ সংগঠনের সদস্য ক্ষুদ্র-প্রান্তিক-ভূমিহীন কৃষকদের সবার মালিকানায় সেটা বিতরণ করা হবে।
ধাপ ২ : সংগঠনের মূলনীতি : প্রকল্প শুরুতেই সমশ্রেণীর কৃষকদের একটি আদর্শ সংগঠন গড়ে তোলার মূলনীতিগুলো যেমন- সর্বজনস্বীকৃত নেতৃত্ব,  সমশ্রেণীর কৃষকদের মজবুত সদস্য ভিত্তি, নতুন নেতৃত্ব সৃজনে ‘এক সদস্য এক ভোট’ নীতি, স্বচ্ছ হিসাব ব্যবস্থাপনা, দলীয় সদস্য সঞ্চয় ও চাহিদাভিত্তিক ব্যবসায়িক সেবা প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।
ধাপ ৩ : মানদ- নির্ধারণ : অতঃপর এসব নীতির ওপর ভিত্তি করে সংগঠনগুলোর একটা মানদ- নির্ণয় করে সর্বোচ্চ মান প্রাপ্ত সংগঠনগুলোকে সম্প্রসারণ সেবা প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ধাপ ৪ : প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের কৌশল : প্রকল্প বা সম্প্রসারণ সংস্থা কর্তৃক সর্বোচ্চ মানপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোকে সেবা হস্তান্তরের বেলায় অংশগ্রহণমূলকভাবে সব সদস্যের সম্মতিতে কৌশল নির্ধারণ উচিত। এতে সদস্যদের ভেতর ক্ষোভ-বিক্ষোভের লাঘব ঘটে এবং সদস্যরা একযোগে কাজ করতে পারে, সংগঠনের প্রতি বন্ধন দৃঢ় হয়। ধরুন কোনো প্রকল্প হতে একটি সংগঠনকে পাওয়ার টিলার দেয়া হবে; তখন অবশ্যই একটি অংশীদারমূলক চুক্তিনামা করে সংগঠনের সবার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করা যায়। আবার প্রদর্শনী স্থাপন বা প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের বেলায় সংগঠনের সব সদস্যর মতামতে উপযুক্ত কৃষক-কৃষাণী সদস্যকে নির্বাচন করা উচিত।
ধাপ ৫ : সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংগঠিত কৃষকদের অংশগ্রহণ : প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের  পাশাপাশি প্রকল্পের সব কাজে সর্বোচ্চ মানপ্রাপ্ত সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারলে সংগঠনের সদস্যরা সম্মানিত হয়, অভ্যন্তরীণভাবে অনুপ্রাণিত হয় এবং সংগঠনের প্রতি অনুগত হয়। সংগঠিত কৃষকদের স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন কমিটি যেমন- ইউনিয়ন ও উপজেলা কৃষি কমিটি, উপজেলা সেচ কমিটি, উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটি, ইত্যাদিতেও প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ রাখা উচিত।
সদস্যদের ভেতরের তাড়নায় সাধারণ স্বার্থে গড়ে উঠা কৃষক সংগঠন। ক্ষুদ্র-প্রান্তিক-ভূমিহীন-বর্গা কৃষকরা যখন একটি নির্দিষ্ট সমস্যা যেটি সবাইকে সমভাবে প্রভাবিত করে তা সমাধানে কোনো রকম বহিঃপ্রেরণা ছাড়াই সংগঠিত হয়। কৃষিতে বিদ্যমান কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য এসব ক্ষুদ্র কৃষকরা নিজেরা এক হয়ে অভ্যন্তরীণ অনুপ্রেরণায় সংগঠন গড়ে তোলেছে, বাংলাদেশে এমন দৃষ্টান্ত খুবই কম। তবে মজার বিষয় হচ্ছে নির্দিষ্ট কোনো একটি এলাকা যেটি একটি নির্দিষ্ট ফসল বা পণ্যের জন্য বিখ্যাত, সেখানেই নিজে নিজে গড়ে ওঠা কিছু সংগঠন পাওয়া গেছে যারা মূলত গড়ে উঠেছে ভরা মৌসুমে উৎপাদিত পণ্যের অস্বাভাবিক দরপতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে একযোগে কাজ করার প্রয়াসে। যেমন- মধুপুরে আনারস ক্লাস্টারে ইদিলপুর আনারস চাষি সমবায় সমিতি, চরফ্যাশনে শশা ক্লাস্টারে আদর্শ চাষি উন্নয়ন সংস্থা, যশোরে গদখালিতে ফুল ক্লাস্টারে গদখালি ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি, চুয়াডাঙ্গায় নবগঙ্গা পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি, কক্সবাজারে নাজিরেরটেক শুঁটকি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি, ইত্যাদি উৎপাদনকারী দলসমূহ। তবে অন্তঃপ্রেরণায় গড়ে উঠলেও এসব দলে সুশাসন, নেতৃত্বের মাঝে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।

মাহমুদ হোসেন* ড. ইমানুন নবী খান**
* ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করা : দূরদর্শিতার অনুশীলন

‘যে যা ভাবে সে রূপে সে হয়’ - লালন
কখন ব্যবহার করতে হয়?

কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নে কৃষক সংগঠনের সদস্যদের জন্য দূরদর্শিতার অনুশীলন একটি শক্তিশালী পদ্ধতি। একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলার সময় অথবা যখন একটি কৃষক সংগঠন বড় মাপের পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে তখন এ অনুশীলনটি খুবই উপযোগী। সংগঠনের সমৃদ্ধির জন্য যে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে নেতৃত্বকে দূরদর্শী হতে হয়। সে নেতাই দূরদর্শী যিনি ভবিষ্যৎকে দেখতে পান, বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং ফলাফল অর্জনে লক্ষ্য স্থির করতে পারেন।
এ অনুশীলনটি চর্চা করার পূর্বে সংগঠনের লক্ষ্য (ভিশন) এবং উদ্দেশ্য (মিশন) সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। লক্ষ্য বা ভিশন হচ্ছে একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বক্তব্য যা একটি সংগঠন মধ্যবর্তী বা দীর্ঘমেয়াদে অর্জন করতে চায়। আর উদ্দেশ্য বা মিশন হচ্ছে লক্ষ্য পূরণে সংগঠনটি মধ্যবর্তী মেয়াদে বা দীর্ঘমেয়াদে কী কী কাজ সম্পাদন করবে। সহজ কথায় ভিশন হচ্ছে স্বপ্ন দেখা আর মিশন হচ্ছে স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ়তার সঙ্গে কিছু কাজ সম্পাদন করা। এ স্বপ্নটা কিন্তু কোনো ব্যক্তির বা বহিঃপ্রেরণাকারীর স্বপ্ন নয়; এ স্বপ্ন দেখতে হবে সংগঠনের সব মিলে ফলে তার বাস্তবায়নও হবে সবার অংশীদারিত্বে।
কাজেই একটি সংগঠনের ভিশন ও মিশন ঠিক করতে সব সদস্যর অংশগ্রহণ জরুরি। বাংলাদেশের কৃষক সংগঠন বা যে কোনো গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্র বা উপধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সব ভিশন ও মিশন মোটামুটি একই। কেন এমন হলো? এটা বহিঃপ্রেরণাকারী হিসেবে যে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী কাজ করে প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় তিনিই অন্য কোনো সংগঠনের ভিশন ও মিশন দেখে হুবহু বসিয়ে দেন। ফলে সংগঠন কি লক্ষ্যে করব, লক্ষ্য পূরণে কী কী কাজ করব, কোন পদ্ধতিতে করব, কখন করব, কাকে কী কাজ দেব, ইত্যাদি প্রশ্ন কৃষকদের মনে জাগে না। প্রশ্ন জাগে না তো স্বপ্নও জাগে না, স্বপ্ন নাই তো আপনি একটি নাবিকহীন বা বৈঠাহীন নৌকা। আপনার লক্ষ্য নাই তো আপনার গন্তব্যও নাই। ফলে সংগঠন গড়ে তোলার মূলেই রয়েছে সবার অংশীদারিত্বে ভিশন ও মিশন স্থির করা। ভিশন ও মিশন ঠিক করতে গিয়েই একটি সংগঠন সর্বপ্রথম তার সদস্যদের মাঝে সংগঠনের প্রতি মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে। সবার অংশগ্রহণে যখন সংগঠনের ভিশন ও মিশন তৈরি করা হয় তখন সেটি পূরণে সব একযোগে কাজ করে যেহেতু সবাই স্বপ্নপূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।     
উদাহরণ : একটি কৃষক সংগঠনের সদস্যরা শুরুর দিকে সবাই মিলে সংগঠনের ভিশন স্থির করল যে ‘২০২০ সালের মধ্যে আমরা আমাদের সংগঠনকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও বিশ্বস্ত এবং সক্রিয় সংস্থা হিসেবে শক্তিশালী করে সদস্যদের জীবনমানের উন্নয়ন সাধন করব’।
উপরের উদাহরণে সংগঠনের সদস্যরা তাদের ভিশন হিসেবে তিনটি বিষয়ে প্রতিশ্রুতবদ্ধ হয়েছে-
১. সংগঠনের কার্যাবলিতে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা এনে শক্তিশালী করবে;
২. শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে সদস্যদের জীবনমানের উন্নতি ঘটাবে;
৩. মধ্যমেয়াদি সময়ে অর্থাৎ আগামী ৫ বছরে তারা এটা অর্জন করতে চায়;
আর এ লক্ষ্য পূরণে সংগঠনটির সব সদস্য মিলে উদ্দেশ্যসমূহ ঠিক করল নিম্নরূপ
১. গ্রামের সমশ্রেণীর (ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন, বর্গা) কৃষকদের অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে চিহ্নিত করা;
২. চিহ্নিত সমশ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে কৃষিতে বিদ্যমান প্রধান সমস্যাগুলো  চিহ্নিত করা যা সব কৃষককে সমভাবে প্রভাবিত করে;
৩. চিহ্নিত প্রধান সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করতে সবাইকে সংবেদনশীল ও সচেতন করা
৪. সচেতন, সংবেদনশীল ও সংগঠনমনা কৃষকদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলা;
৫. সবার অংশীদারিত্বে সংগঠনের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা;
৬. গঠনতন্ত্রের আলোকে সংগঠন পরিচালনার কৌশল নির্ধারণ করা;
৭. অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে সব সদস্যর কৃষিখামার বৃত্তান্ত ফরম পূরণ করে তাদের জমির শ্রেণিকরণ, পছন্দসই ফসল নির্বাচন, গবাদিপশু-হাঁস-মুরগি-পাখি শুমারি, মৌসুমভিত্তিক তাদের উপকরণের চাহিদা, মৌসুমভিত্তিক মোট উৎপাদন, ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা;
৮. সদস্য বৃত্তান্ত অনুসারে সংগঠনের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জনে জনে কেনা ও বেচা না করে সংগঠিতভাবে কেনা বেচার অভ্যাস করতে সদস্যদের অনুপ্রাণিত করা;
৯. সদস্যদের জন্য সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি সম্প্রসারণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ;
১০. সংগঠনের আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে নিয়মিত সদস্য চাঁদা আদায় এবং সামাজিক ব্যবসা শুরু করা।
উপরের উদাহরণটি থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই? সংগঠনের নেতাগণ কি দূরদর্শী? উপরের ১০টি উদ্দেশ্য কিভাবে ভিশনে উল্লিখিত তিনটি মূল প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?
দূরদর্শিতার অনুশীলন
‘স্বপ্ন তাই যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’

মাঠ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীগণ যারা কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে সহায়ক হিসেবে কাজ করেন তাদের জন্য এ অনুশীলনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি কৃষক সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করতে সব সদস্যর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। কৃষক সংগঠনে সদস্যদের অংশীদারিত্বে কিভাবে ভিশন ও মিশন ঠিক করা যায় তার একটি অনুশীলন নিচে দেয়া হলো। যে কোনো কৃষক দল গড়তে সংগঠনের সব সদস্যর অংশগ্রহণে একটি সাধারণ লক্ষ্য ও লক্ষ্য পূরণে উদ্দেশ্যগুলো স্থির করার জন্য দূরদর্শিতার অনুশীলনটি চারটি মূল ধাপে সম্পন্ন করা যায়-
ধাপ ১ : সংগঠনে সদস্যদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা (২০ মিনিট)
এ ধাপে সহায়ক সংগঠনের সব সদস্যদের বলবেন যে, ‘চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন আপনি এখন থেকে ৫ বছর পর দাঁড়িয়ে আছেন এবং আপনার সংগঠনটি সবার সেরা, কৃষক সংগঠনের সবচেয়ে সফল মডেল, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সব কৃষক সংগঠনের জন্য অনুসরণীয়। এ সংগঠনের একজন নেতা বা সদস্য হতে পেরে আপনি নিজেও গর্বিত যেহেতু এ পর্যায়ে আসতে আপনার শ্রম ঘামও এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ সংগঠনে আপনার একটা তীব্র অনুভূতি জড়িয়ে আছে। চলুন স্বপ্ন দেখি! চলুন স্বপ্নদ্রষ্টা হই!!’
চোখ খোলে প্রথমত : অংশগ্রহণকারীগণ একে একে সংগঠনের লক্ষ্য সম্পর্কে তাদের নিজেদের অভিব্যক্তি সবার সামনে উপস্থাপন করবেন। সংগঠনের লক্ষ্য সম্পর্কে সবার ধারণাগুলো ফ্লিপচার্টে লিখে রাখতে হবে। এ ধাপে অংশগ্রহণকারীগণ পরস্পরের সঙ্গে কোনো আলোচনা করতে পারবেন না, প্রয়োজনে কিছু না বুঝলে প্রশ্ন শুধু করতে পারবেন। সব ধারণাকেই স্বাগত জানাতে হবে, মনে রাখতে হবে সব ধারণাই ভালো ধারণা এবং ভবিষ্যতে সংগঠন গড়তে সম্ভাব্য আকর্ষণীয় হতেও পারে। দ্বিতীয়ত অংশগ্রহণকারীদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে অন্যদের ধারণাগুলোকে সমৃদ্ধ করার জন্য যাতে ভবিষ্যতের জন্য একটা সমৃদ্ধ আদর্শ চিত্র পাওয়া যায়।
ফলাফল : সদস্যদের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তির মাধ্যমে জানা যাবে ভবিষ্যতে তারা সংগঠনকে কোথায় নিয়ে যেতে চান।
ধাপ ২ : একটি সমষ্টিগত সৃজনশীল লক্ষ্য গড়া (৩০ মিনিট)
দ্বিতীয় ধাপে অংশগ্রহণকারীগণকে ছোট দলে ভাগ করে দিয়ে বলতে হবে ‘প্রথম ধাপের সবার ধারণার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আপনার সংগঠনের লক্ষ্য কি হতে পারে তার একটি উৎসাহব্যাঞ্জক মডেল তৈরি করুন। মডেলটি আর্থিক বা সামাজিক জগতের যে কোনো উপাদানকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে তৈরি করতে পারেন। হতে পারে একটি গাছ, প্রাণী বা যে কোনো নিরেট বস্তু।’
অংশগ্রহণকারীদের এ মডেলের মূল বৈশিষ্টগুলোর একটি তালিকা প্রণয়ন করতে বলুন যা দ্বারা তাদের সংগঠনের মডেলটিকে আগামী পাঁচ বছরে অন্যদের চেয়ে আলাদাভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা যায়। প্রতিটি দল তাদের ভিশন মডেলটি এমনভাবে আঁকবেন যাতে সবাই এটা দেখতে পায় এবং বুঝতে পারে।
ফলাফল : সদস্যরা ভবিষ্যতে সংগঠনকে কেমন দেখতে চায় তার লিখিত দলীয় অভিব্যক্তি।
ধাপ ৩ : সংগঠনের সম্মিলিত লক্ষ্যের মধ্যে সদস্যদের ব্যক্তিগত লক্ষ্যগুলোর ঐকতান (৩০ মিনিট)
এ ধাপে সব অংশগ্রহণকারী সম্মিলিতভাবে সংগঠনের জন্য একটি সাধারণ লক্ষ্য বা ভিশন স্থির করবেন। প্রতিটি দলকে তাদের গড়া ছবি বা মডেলটি সবার সামনে উপস্থাপন করতে অনুরোধ করতে হবে। তারপর প্রতিটি দলকে তাদের পৃথক পৃথক ভিশনগুলো একত্রিত করে সংগঠনের জন্য একটি সাধারণ ভিশন এ সংক্ষেপিত করতে অনুরোধ করতে হবে। ‘আগামী ৫ বছরে আমরা একটি টেকসই...’
ফলাফল: সংগঠনের জন্য একটি সর্বসম্মত সাধারণ ভিশন বা লক্ষ্য।
ধাপ ৪ : লক্ষ্য পূরণে উদ্দেশ্য নির্ধারণ (৩০ মিনিট)
শেষ ধাপে সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে স্থির করা সাধারণ লক্ষ্যটি পূরণে উদ্দেশ্যসমূহ স্থির করবেন। উদ্দেশ্য স্থির করতে লক্ষ্যে বর্ণিত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শব্দগুলোর দিকে জোড় দিতে হবে। ওপরের উদাহরণে ৩টি প্রতিশ্রুতির নিরিখে মোট ১০টি উদ্দেশ্য স্থির করা হয়েছিল।  
ফলাফল : সংগঠনের জন্য সর্বসম্মত সাধারণ মিশন বা উদ্দেশ্য।
সহায়কের জন্য নোট : দূরদর্শীতার অনুশীলনের সময় অংশগ্রহণকারীদের প্রাণবন্ত রাখতে সহায়ক যথেষ্ট উৎসাহ দেবেন যাতে তারা
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন;
মতামত যেন খুবই নির্দিষ্ট হয়;
ভবিষ্যতে নিজ নিজ সংগঠনে নাটকীয় পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা পোষণ করেন।

ড. ইমানুন নবী খান*  মাহমুদ হোসেন**

* প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

ভাদ্র মাসের কৃষি-১৪২৩

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, আপনাদের সবার জন্য শুভ কামনা। সারা দেশ বর্ষার পানিতে টইটম্বুর, সেসঙ্গে ঝরছে অঝোর বৃষ্টি। প্রকৃতির এ খেয়াল কৃষির জন্য যতটুকু না সুন্দর সফলতা বয়ে আনে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে। কৃষির এ ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থাপনা। কৃষির ক্ষতিটাকে পুষিয়ে নেয়া এবং প্রয়োজনীয় কাজগুলো যথাযথভাবে শেষ করার জন্য ভাদ্র মাসে কৃষিতে করণীয় বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেব-
আমন ধান

  • আমন ধান ক্ষেতের অন্তর্বর্তীকালীন যত্ন নিতে হবে;
  • ক্ষেতে আগাছা জন্মালে তা পরিষ্কার করতে হবে।
  • আগাছা পরিষ্কার করার পর ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। আমন ধানের জন্য প্রতি হেক্টর জমিতে ২০০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োজন হয়। এ সার তিন ভাগ করে প্রথম ভাগ চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর, দ্বিতীয় ভাগ ৩০-৪০ দিন পর এবং তৃতীয় ভাগ ৫০-৬০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।
  • নিচু জমি থেকে পানি নেমে গেলে এসব জমিতে এখনও আমন ধান রোপণ করা যাবে। দেরিতে রোপণের জন্য বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৪৬, বিনাশাইল, নাইজারশাইল বা স্থানীয় উন্নত ধান বেশ উপযোগী। দেরিতে চারা রোপণের ক্ষেত্রে প্রতি গুছিতে ৫-৭টি চারা দিয়ে ঘন করে রোপণ করতে হবে।
  • আমন মৌসুমে মাজরা, পামরি, চুঙ্গি, গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এছাড়া খোলপড়া, পাতায় দাগপড়া রোগ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে, জমিতে খুঁটি দিয়ে, আলোর ফাঁদ পেতে, হাতজাল দিয়ে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাছাড়া সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায়, সঠিক নিয়মে, সঠিক সময় শেষ কৌশল হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।


  • বন্যায় তোষা পাটের বেশ ক্ষতি হয়। এতে ফলনের সঙ্গে সঙ্গে বীজ উৎপাদনেও সমস্যা সৃষ্টি হয়। বীজ উৎপাদনের জন্য ভাদ্রের শেষ পর্যন্ত দেশি পাট এবং আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত তোষা পাটের বীজ বোনা যায়।
  • বন্যার পানি উঠে না এমন সুনিষ্কাশিত উঁচু জমিতে জো বুঝে প্রতি শতাংশে লাইনে বুনলে ১০ গ্রাম আর ছিটিয়ে বুনলে ১৬ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
  • জমি তৈরির সময় শেষ চাষে শতকপ্রতি ৩০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৬৫০ গ্রাম টিএসপি, ৮০ গ্রাম এমওপি সার দিতে হবে। পরবর্তীতে শতাংশপ্রতি ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম করে দুই কিস্তিতে বীজ গজানোর ১৫-২০ দিন পরপর জমিতে দিতে হবে।


  • এ সময় আখ ফসলে লালপচা রোগ দেখা দিতে পারে।
  • লালপচা রোগের আক্রমণ হলে আখের কাণ্ড পচে যায় এবং হলদে হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। এজন্য আক্রান্ত আখ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জমিতে যাতে পানি না জমে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • এছাড়া রোগমুক্ত বীজ বা শোধন করা বীজ ব্যবহার করলে অথবা রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করলে লালপচা রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
  • লালপচা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন কয়েকটি আখের জাত হচ্ছে ঈশ্বরদী ১৬, ২০, ২১।


  • ভাদ্র মাসের প্রথম দিকেই তুলার বীজ বপন কাজ শেষ করতে হবে।
  • বৃষ্টির ফাঁকে জমির জো অবস্থা বুঝে ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করে বিঘাপ্রতি প্রায় ২ কেজি তুলা বীজ বপন করতে হয়।
  • লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব ৩০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার বজায় রাখতে হয়।
  • তুলার বীজ বপনের সময় খুব সীমিত। তাই হাতে সময় না থাকলে জমি চাষ না দিয়ে নিড়ানি বা আগাছানাশক প্রয়োগ করে জমি আগাছামুক্ত করে ডিবলিং পদ্ধতিতে বীজ বপন করা যায়।
  • বীজ গজানোর পর কোদাল দিয়ে সারির মাঝখানের মাটি আলগা করে দিতে হবে।
  • সমতল এলাকার জন্য সিবি-৯, সিবি-১২, হীরা হাইব্রিড রূপালী-১, ডিএম-২, ডিএম-৩ অথবা শুভ্র জাতের চাষ করতে পারেন। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ি তুলা-১ এবং পাহাড়ি তুলা-২ নামে উচ্চফলনশীল জাতের তুলা চাষ করতে পারেন।


  • ভাদ্র মাসে লাউ ও শিমের বীজ বপন করা যায়। এজন্য ৪-৫ মিটার দূরে দূরে ৭৫ সেমি. চওড়া এবং ৬০ সেমি. গভীর করে মাদা বা গর্ত তৈরি করতে হবে।
  • এরপর প্রতি মাদায় ২০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। মাদা তৈরি হলে প্রতি মাদায় ৪-৫টি বীজ বুনে দিতে হবে এবং চারা গজানোর ২-৩ সপ্তাহ পর দুই-তিন কিস্তিতে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৭৫ গ্রাম এমওপি সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।
  • এ সময় আগাম শীতকালীন সবজি চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করা যেতে পারে।
  • সবজি চারা উৎপাদনের জন্য উঁচু এবং আলো বাতাস লাগে এমন জায়গা নির্বাচন করতে হবে।
  • এক মিটার চওড়া এবং জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা করে বীজতলা করে সেখানে উন্নত জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো এসবের বীজ বুনতে পারেন।


  • ভাদ্র মাসেও ফলদ বৃক্ষ এবং ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা যায়।
  • বন্যায় বা বৃষ্টিতে মৌসুমের রোপিত চারা নষ্ট হয়ে থাকলে সেখানে নতুন চারা লাগিয়ে শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে হবে।
  • এছাড়া এ বছর রোপণ করা চারার গোড়ায় মাটি দেয়া, চারার আতিরিক্ত এবং রোগাক্রান্ত ডাল ছেঁটে দেয়া, বেড়া ও খুঁটি দেয়া, মরা চারা তুলে নতুন চারা রোপণসহ অন্যান্য পরিচর্যা করতে হবে।
  • ভাদ্র মাসে আম, কাঁঠাল, লিচু গাছ ছেটে দিতে হয়। ফলের বোঁটা, গাছের ছোট ডালপালা, রোগাক্রান্ত অংশ ছেটে দিলে পরের বছর বেশি করে ফল ধরে এবং ফল গাছে রোগও কম হয়।


  • ভাদ্র মাসের তালপাকা গরমে পোলট্রি শেডে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • আর টিন শেডে চটের ছালা রেখে মাঝে মাঝে পানি দ্বারা ভিজিয়ে দিতে হবে। যাতে করে অধিক গরমে মুরগিগুলো মারা না যায় এবং নানা রোগের বিস্তার না ঘটে।
  • ভেজা আবহাওয়া ও মাঝে মাঝে গরম পোলট্রির ক্ষেত্রে গামবোরো রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি করে। এ রোগে  মুরগির পালক নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। গা গরম ও কাঁপুনি দেখা দেয়। সাদা পানির মতো পাতলা পায়খানা দেখা যায়। মুরগি সহজে নড়ে না। এমনিতে ভাইরাসজনিত এ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। তবে আছে সতর্কতা ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
  • বাংলাদেশে গোখাদ্যের সমস্যা এখনও বিরাজমান। সে কারণে পতিত জমিতে নেপিয়ার, বাজরা, খেসারি, মটর, ইপিল ইপিল, গিনি ঘাস লাগানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • যারা দুগ্ধবতী গাভী পালন এবং যারা গরু মোটাতাজাকরণ করবেন, তাদের অবশ্যই গবাদি পশুকে সুষম খাবার সরবরাহ করতে হবে।
  • কোনো জায়গায় যদি পানি জমে থাকে সে এলাকায় জন্মানো ঘাস গবাদিপশুকে খাওয়ানো যাবে না। কারণ এত গাভী বা গরুর রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।
  • গরু ও ছাগলকে নিয়মিত গোসল করার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে অসুখ-বিসুখ কম হয়।
  • গোয়াল ঘরের গোবর চনা নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার। আর গরুর গায়ের আঠালি, মাছি, জোঁক পোকামাকড় বেছে দিতে হবে।
  • তড়কা, বাদলা, গলাফুলা রোগ যাতে না হয় সেজন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারি সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।


  • পুকুরে সার ব্যবহারের মাত্রা আস্তে আস্তে কমিয়ে ফেলতে হবে। জৈব সার ব্যবহার না করাই ভালো। খাদ্য ঘাটতির জন্য পরিমাণ মতো অজৈব সার ব্যবহার করা দরকার।
  • পুকুরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
  • পুকুরে নতুন মাছ ছাড়ার সময় এখন। মাছ ছাড়ার আগে পুকুরের জলজ আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
  • পুকুর জীবাণুমুক্ত করে সঠিক সংখ্যক সুস্থ সবল পোনা মজুদ করতে হবে।  
  • যেসব পুকুরে মাছ আছে সেসব পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার।
  • রোগের আক্রমণ থেকে মাছ রক্ষা করতে স্থানীয় উপজেলা মৎস্য অফিসের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পুকুরে পাঙ্গাশ মাছের চাষ, ধান ক্ষেতে মাছ চাষ, প্লাবিত এলাকায় ঘেরের মাধ্যমে রাজপুটি ও চিংড়ির চাষ, পুকুরে রুই জাতীয় ও চিংড়ির মিশ্র চাষ এবং প্লাবিত এলাকায় খাঁচায় মাছ চাষ করা যেতে পারে।
  • বন্যার কারণে ভেসে যাওয়া পুকুরের মাছ পুকুরে রাখতে যা করা প্রয়োজন। সেটি হলো ভেসে যাওয়া পুকুরগুলোর ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরত্বে একটি চটের ব্যাগে ৫ থেকে ৭ কেজি ধানের কুড়া বা গমের ভুসি ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পানির নিচে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। তবে ব্যাগটিতে অবশ্যই ছোট ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে। খাবার পেয়ে মাছ পুকুরেই অবস্থান করবে।
  • কোনো কারণে পুকুরের পানি যদি দূষিত হয় তবে ভাইরাস, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে মাছের ক্ষত রোগ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেহের ভারসাম্যহীনতা, শরীরে লাল দাগ দেখা যায়। পরে মাছ ক্ষত রোগে মারা যায়। এ রোগ প্রতিকারে অধিক আক্রান্ত মাছ উঠিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। প্রতি শতক পুকরে ১ কেজি চুন ও ১ কেজি লবণ প্রয়োগ করতে হবে। ছোট ও ব্রুড মাছের জন্য প্রতি কেজি খাদ্যের সঙ্গে ৬০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম টেরামাইসিন মিশিয়ে মাছকে খাওয়ানো যেতে পারে।

সুপ্রিয় কৃষিজীবী ভাইবোন, বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি এখন সবুজ শ্যামলিমায় ভরপুর, কাশবনের আলোড়ন সবই প্রকৃতির দান। সেসঙ্গে বন্যা, প্লাবণ আমাদের নিত্য সহচর। সব কৃষক ভাইয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের কৃষিকে নিয়ে যাবে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। সবার জন্য নিশ্চিত সফল কৃষি উৎপাদন কামনা করে এ মাসের কৃষি এখানেই শেষ করলাম। সবাই খুব ভালো থাকবেন।


কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন*
*তথ্য অফিসার (কৃষি), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫


টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীদের ভূমিকা

বাংলাদেশের কৃষি এবং মাঠ ফসলের (ধান, মাছ, গবাদিপশু পাখি বা সবুজ বন) অতন্দ্র প্রহরী হচ্ছেন একজন আদর্শ মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী। মাঠ পর্যায়ের যে কোনো সমস্যায় যে কোনো শ্রেণীর কৃষকের সর্বপ্রথম যোগাযোগ বিন্দু হচ্ছেন তিনি কখনো উপদেষ্টা হয়ে, কখনো বা বন্ধু হয়ে। সম্প্রসারণ সংস্থাগুলো (কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ বা বন) ঐতিহাসিকভাবে এ মাঠকর্মীদের মাধ্যমে গবেষণালব্ধ বিভিন্ন প্রযুক্তি, ফলাফল বা জ্ঞান কৃষককূলে জনে জনে বা দলে হস্তান্তর ও বিস্তার করে আসছে। যদিও প্রথাগত এ একমুখী সম্প্রসারণ বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনা প্রণয়নে কৃষকদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। তবে সম্প্রতি সম্প্রসারণ সংস্থাসমূহের নীতিমালায় কৃষিতে বিদ্যমান স্থানীয় সমস্যার সমাধানে এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও জ্ঞানের বিস্তার তথা সার্বিক গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের বিভিন্ন স্তরে কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। অর্থবহ এসব নীতিমালায় কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষকদের অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে তাদের ছোট ছোট দলে সংগঠিত হতে এবং ছোট দল বড় দলে জোটভুক্ত হওয়ার প্রতি দিক নির্দেশনা আছে। অতি সম্প্রতি প্রণীত খসড়া জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি-২০১৫ এর উদ্দেশ্য (মিশন স্টেটমেন্ট) হিসেবে বলা আছে- ‘টেকসই কৃষি, কৃষি ব্যবসা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষক দল ও  ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে তাদের জোটের মাধ্যমে সব শ্রেণীর কৃষক, উৎপাদক, কৃষিতে নিয়োজিত ছোট ও মাঝারি উদ্যেক্তাগণকে দক্ষ এবং কার্যকর বিকেন্দ্রীভূত চাহিদামাফিক সমন্বিত সম্প্রসারণ সেবা প্রদান করা, যাতে তারা তাদের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে সক্ষম হতে পারে।’

যদিও অধিকাংশ সম্প্রসারণ সংস্থা বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে কৃষক দল গঠন করছে কিন্তু এদের বেশির ভাগই কৃষি প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ বা উপকরণ সরবরাহের নিমিত্তে গড়া। ফলে কৃষক দলগুলো একটি স্বাধীন ও টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে দক্ষ হওয়ার পরিবর্তে প্রকল্পের উপকারভোগী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ও সেবা হস্তান্তরের (প্রশিক্ষণ, উপকরণ ইত্যাদি) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করছে এ দৃষ্টিভঙ্গির (অথবা এ পদ্ধতির আমূল) পরিবর্তনের ওপর, অর্থাৎ কৃষক সংগঠনসমূহকে উপকারভোগী হিসেবে অবজ্ঞা না করে বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা। এক্ষেত্রে এসব সংগঠনের সক্রিয় সহায়ক হবে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীরা যাদের দক্ষতা বৃদ্ধিও আলোচ্য নীতিমালার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ (অনুচ্ছেদ ৬ : সম্প্রসারণ কর্মীদের সক্রিয় এবং পথনির্দেশক ভূমিকা, পৃষ্ঠা ১৩, খসড়া জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা-২০১২)। এ নীতিমালা অনুসারে সমশ্রেণীর কৃষকদের সংগঠিত করতে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীদের ভূমিকা হবে ‘একজন সহায়ক-পরিচালক বা নিয়ন্ত্রক নয়’। অর্থাৎ একটি শক্তিশালী কৃষক সংগঠনের মূলনীতিসমূহ দৃঢ়ভাবে প্রয়োগের জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে মাঠকর্মীর অন্যতম কাজ। এসব মূলনীতিসমূহ হচ্ছে- ১. কৃষক সংগঠনের স্বশাসন এবং সুশাসন; ২. সর্বজনস্বীকৃত কৃষক নেতৃত্ব; ৩. দৃঢ় সদস্যভিত্তি/সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ; ৪. সংগঠন কর্তৃক সদস্যদের চাহিদাভিত্তিক সেবাপ্রদান; এবং ৫. সংগঠনের জন্য একটি সুস্পষ্ট এবং স্বীকৃত উদ্দেশ্য।

সম্প্রতি (২০১৩) জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষক সংগঠন : বর্তমান অবস্থা চিত্রায়ন এবং দক্ষতা যাচাই’ শীর্ষক সমীক্ষায় বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নানামাত্রিক কৃষক দল চিহ্নিত করা হয়েছে। তন্মধ্যে শতকরা ৮১ ভাগ সংগঠন সরকারি সহায়তায়, শতকরা ১৪ ভাগ জাতীয় পর্যায়ের এনজিও সহায়তায়, শতকরা ৫ ভাগ আন্তর্জাতিক এনজিও সহায়তায় এবং স্বল্পসংখ্যক (০.০১%) মাত্র ১২টি সংগঠন পাওয়া গেছে যারা স্বাধীনভাবে গড়ে উঠেছে। শতকরা মাত্র ২ ভাগ সংগঠনকে কোনো না কোনো পর্যায়ে জোটভুক্ত হতে দেখা গেছে। সমীক্ষা মতে এসব কৃষক সংগঠন সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং বিনিয়োগ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত তিনটি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে-
কৃষক সংগঠনের একটা বৃহত্তর অংশ ক্ষুদ্র (গোষ্ঠী/সমাজভিত্তিক পর্যায়ে) এবং বিচ্ছিন্ন
বেশির ভাগ কৃষক সংগঠন সরকারি সংস্থা, এনজিও এবং প্রকল্প সহায়তাপুষ্ঠ
শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূলনীতিসমূহ দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করা হয় না
এ বাধাসমূহ অতিক্রম করার জন্য সমীক্ষাটি বিভিন্ন সুপারিশ পেশ করে, তন্মধ্যে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে, অর্থাৎ কৃষি সম্প্রসারণ মাঠকর্মীদের সহায়ক হিসেবে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়। ফলে একটি টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে সহায়ক হিসেবে সম্প্রসারণ কর্মীদের সক্ষমতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বিশেষ করে দল গঠনের পূর্ববর্তী কাজসমূহ যেমন- অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ, উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী চিহ্নিতকরণ, দরিদ্র-প্রান্তিক কৃষকদের শনাক্ত করা, কৃষক সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ অনুশীলন, সংগঠনের সদস্যদের ক্ষমতায়ন, সংগঠনের মূল্যবোধ বিকশিত করার মতো বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অত্যাবশ্যক।
একটি কার্যকর কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে বা কোনো দুর্বল সংগঠনকে গতিশীল করতে সহায়ক হিসেবে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীকে সর্বপ্রথম ওই সংগঠন যে এলাকায় কাজ করবে বা করে সেটির স্থানীয় প্রেক্ষাপট জেনে নিতে হবে। অর্থাৎ সংগঠন যে গ্রামে বা ইউনিয়নে কাজ করে তার আর্থসামাজিক অবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠানাদি, কৃষিতে বিদ্যমান সমস্যা ও জনগণের মতামতে সমস্যার সমাধান, ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হতে হবে। স্থানীয় এসব প্রেক্ষাপটের বিশদ তথ্য আহরণে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হয়, যেমন-ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার (individual interview), দলীয় আলোচনা (Focus Group Discussion), প্রাথমিক পরিদর্শন (Reconnaissance Visit) ইত্যাদি। তন্মধ্যে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা বা Participatory Rural Appraisal (PRA) এর বিভিন্ন টুল্স বা হাতিয়ার এর ব্যবহার সমাজ বিজ্ঞানীদের কাছে সর্বাধিক জনপ্রিয়।
বাংলাদেশের কৃষকগণ স্মরণাতীত কাল থেকে কৃষিতে তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে নিজেদের মেধা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে নানা প্রতিকূলতা নিরসনে সব মিলে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং তার সফল বাস্তবায়নও করতে পেরেছে। তাই যে কোনো স্থানীয় জ্ঞান আহরণে, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তার সমাধানে, কৃষি বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের সেই অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়ে কিভাবে তাদের জন্য পরিকল্পনা করি? আমাদের মনগড়া কৃষক দল অথবা চাপিয়ে দেয়া পরিকল্পনাও বা কিভাবে তাদের কাজে লাগবে? তাই কৃষক সংগঠন গড়তে সর্বপ্রথম প্রয়োজন একদল সমশ্রেণীর কৃষক যাদের সমস্যা একই ধরনের। আর এ সমশ্রেণীর কৃষক চিহ্নিতকরণ, তাদের সমস্যা নিরূপণ ও সম্ভাব্য সমাধানে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা বা PRA গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্থানীয় জনসাধারণের অংশগ্রহণে কোনো নির্দিষ্ট গ্রাম-এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ, কৃষির সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সমাধানের সম্ভাব্য উপায়, কৃষকের চাহিদা নিরূপণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করার সমন্বিত একটি পদ্ধতি হচ্ছে চজঅ। অর্থাৎ যাদের জন্য উন্নয়ন প্রয়োজন তাদের মাধ্যমেই সমস্যা চিহ্নিতকরণ, বিশ্লেষণ ও সমাধান নির্ণয় করাকেই চজঅ বলা হয়। এজন্য যারা মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী হিসেবে কাজ করছেন তাদের PRA এবং এর বিভিন্ন টুল্সের প্রয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষ হতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে PRA পদ্ধতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যেহেতু একটি টেকসই কৃষক সংগঠন গড়ে ওঠে নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা সমাধানের তাগিদে বিশেষ করে যেসব সমস্যা তাদের সবাইকেই প্রভাবিত করে, যা এককভাবে সমাধান করা যায় না। মাঠ সম্প্রসারণ কর্মীগণ স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে PRA এর বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষিতে তাদের সাধারণ সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে সমবেতভাবে সমশ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে একটি কৃষক দল গড়ে তুলতে পারেন।

যে কোনো সম্প্রসারণ কর্মী দল গঠনের জন্য কোনো গ্রামে প্রবেশ করেন তখন তার সর্বপ্রথম কাজ হবে জনগণের সঙ্গে আন্তরিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন (Rapport building)। এটি হতে পারে কোনো হাটে, বাজারে, চায়ের দোকানে বা লোকসমাগম হয় এমন স্থানে জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়া। মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী জনগণের সঙ্গে পরিচিত হবেন, নিজের পরিচয় দেবেন, আসার উদ্দেশ্য বলবেন, গ্রামটিকে ঘুরে ফিরে দেখতে গ্রামের জনগণের সহায়তা চাইবেন। একটি গ্রামে প্রবেশের পর জনগণকে বুঝাতে হবে যে বাংলাদেশের গ্রাম, কৃষি ও সমাজকে আপনাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করব, এ গ্রামে কয়টি পাড়া আছে, কৃষিতে কতভাগ পরিবার যুক্ত আছেন, কী কী কৃষি কাজ হয়, এ গ্রামে কৃষির মূল সমস্যা কী, এখানে কৃষকদের কোনো সংগঠন আছে কি না, না থাকলে কৃষক ও কৃষির সমস্যাকে মোকাবিলা করার জন্য কৃষকরা কিভাবে সংগঠিত হতে পারে, কেনই বা এখানে কৃষকরা অতীতে সংগঠিত  হননি, সংগঠিত হওয়ার সুফল ও প্রতিকূলতা/বাধাসমূহ ইত্যাদি বিষয়ে আমরা এ গ্রামের নানা শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে কথা বলব। যে কয়জনের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টি হবে তাদের বলতে হবে যে আপনাদের গ্রামকে, গ্রামের কৃষি ও সমাজকে বুঝতে আমরা আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কতগুলো পদ্ধতি অনুসরণ করে করব। এ পদ্ধতিকে অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা (PRA) বলে। আলাপের ফাঁকে নিম্নের উদাহরণে ব্যবহৃত সমাজমিতির (sociometry) অনুশীলনটি করা যেতে পারে:

সম্ভাবনাময় নেতা চিহ্নিতকরণ : সোসিওমেট্রি/সমাজমিতি পদ্ধতি
গ্রামের কোনো একটি চায়ের দোকানে বা বাজারে বা লোকসমাগম হয় এমন কোন স্থানে সাধারণ গল্প বা আলোচনার ফাঁকে কয়েকজনকে নিম্নের প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করুন:
ক. আমি এ গ্রামে নতুন এসেছি। অনুগ্রহ করে আপনি কি আমাকে এ গ্রামের তিনজন নেতার নাম বলবেন? (গ্রামের সাধারণ জনগণ একবাক্যে যাদের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেন তারা হচ্ছেন অবস্থানগত নেতা (opinion leader), যারা রাজনৈতিক কোনো মতাদর্শের হতে পারেন এবং বর্তমানে গ্রামে নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে আছেন)। প্রশিক্ষণার্থীরা তাদের নাম নোটে লিখে রাখবে।

খ. এবার আপনি আমাকে এমন কয়েকজন কৃষকের নাম বলুন কৃষি বিষয়ে যার মতামত বা ধারণা সাধারণ কৃষক এমনকি সমাজ নেতারাও  আমলে নেন, (তারা হচ্ছেন মতামত প্রদানকারী নেতা (opinion leader), তবে আর্থসামাজিক বিন্যাস অনুসারে এ ধরনের নেতৃত্ব বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কাজেই সেভাবে প্রশ্ন করে উত্তর নিতে হবে)। তবে কোনো কোনো গ্রামে কখনো কখনো এ ধরনের মতামত প্রদানকারী কৃষক ভিন্ন ভিন্ন না হয়ে একজনও হতে পারে যার  নিকট সব শ্রেণীর কৃষকরাই গিয়ে থাকেন।
১. প্রান্তিক, বর্গা ও ভূমিহীন কৃষকদের মতামত প্রদানকারী নেতা ----------------------------------------------------
২. ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের মতামত প্রদানকারী নেতা --------------------------------------------------------------
৩. বড়-ধনী কৃষকদের মতামত প্রদানকারী নেতা -------------------------------------------------------------------
ধারণা সূত্র : শংকরিয়া চামালা ও পিএম সিঙ্গি, ১৯৯৭, Improving agricultural extension: a reference manual, FAO and the International Program for Agricultural Knowledge System (INTERPAKS), College of Agricultural, Consumer, and Environmental Sciences, University of Illinois at Urbana-Champaign, United States.
ওপরের সমাজমিতি পদ্ধতি অনুসারে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী এ গ্রামে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন/বর্গা কৃষকরা কৃষির বিভিন্ন সমস্যায় যাকে সবচেয়ে আগে স্বার্থহীনভাবে কাছে পান সে ধরনের মতামত প্রদানকারী নেতা চিহ্নিত করতে পারবে। এভাবে জনগণের মতামতে চিহ্নিত মতামত প্রদানকারী নেতার কাছে থেকে স্থানীয় কৃষির সম্ভাবনা, সমস্যা, সমাধান ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে PRA  অনুশীলন শুরু করা যেতে পারে। এতে সহায়ক হিসেবে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মী স্থানীয় কৃষকদের অনেক বিষয় বুঝতে পারবেন।

কৃষক সংগঠন গড়ার আগে সচরাচর যেসব PRA টুল্স/কৌশল ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে পরিভ্রমণ, ভৌত মানচিত্র, সামাজিক মানচিত্র, চাপাতি চিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক বৃত্তান্ত, ঋতু চিত্র, শস্যবিন্যাস চিত্র, বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ, সময় চিত্র, উৎপাদন প্রবাহ চিত্র, সমস্যা অনুক্রম ছক, পছন্দ অনুক্রম ছক, স্থানীয় কারিগরি জ্ঞান ইত্যাদি। তন্মধ্যে সময়, উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখে অত্যাবশ্যকীয় ৫টি PRA কৌশলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্নে দেয়া হলো-


যেসব তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হয়

ব্যবহার পদ্ধতি

কখন করা হয়

পরিভ্রমণ/ Transect walk

ভূমির ধরন (উঁচু, মধ্যম, নিচু), মাটির ধরন, ভূমির ব্যবহার : ফসলি জমি ও শস্যবিন্যাস,  জলাভূমি (পুকুর, নদী, খাল, বিল ইত্যাদি) গাছপালা, গো-চারণভূমি, মানব বসতি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থান চিত্রায়ন

নির্বাচিত গ্রামটির একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত হাঁটতে হবে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদসমূহ চিহ্নিত করতে হবে। হাঁটার সময় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে রাখলে জানতে ও বুঝতে সুবিধা হয়।

গ্রামে কাজ করার শুরুতেই।

সামাজিক মানচিত্র/ Social Mapping

গ্রামের সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন- স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির-গির্জা, খানার বিস্তৃতি, হাটবাজার, দোকানপাট, উপকরণের দোকান, পুকুর বা জলাশয়, বাঁধ ইত্যাদির আপেক্ষিক অবস্থান প্রদর্শন

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে গ্রামটি ঘুরে দেখতে হবে এবং ভৌত সম্পদসমূহ চিহ্নিত করে ফিরে এসে একটি নির্দিস্ট ছায়াঘেরা স্থানে বসতে হবে এবং দলের সবার সহযোগিতায় মাটিতে বড় কাগজে মানচিত্রটি আঁকতে হবে।

পরিভ্রমণ এর পরপরই এ কাজটি করে নিতে হবে।

আর্থিক সচ্ছলতার স্তর বিন্যাস Wealth Ranking

সম্পদের ভিত্তিতে গ্রামের জনগণের স্তর বিন্যাস। এ অনুশীলনের মাধ্যমে গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, ভূমিহীন ও বর্গা কৃষকদের তালিকা তৈরি করা যায়, যা পরবর্তীতে এ শ্রেণীর কৃষকদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলতে সদস্য প্রোফাইল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রামের সব শ্রেণীর কৃষকদের (ধনী, মাঝারি, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক) খানা চিহ্নিত করা এবং বিশ্লেষণমূলক ছক তৈরি করা। এ অনুশীলনের মাধ্যমেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়। 

সামাজিক মানচিত্রের পরের ধাপে এ কাজটি করে নিতে হবে।

কৃষি বিষয়ক সমস্যা ও সমাধান  চিহ্নিতকরণ

স্থানীয় কৃষির সমস্যাসমূহ যেমন- উপকরণে, উৎপাদনে, ফলন পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণে, বাজারজাতকরণে এবং অর্থ, প্রযুক্তি ও তথ্য প্রাপ্তি, ইত্যাদি চিহ্নিতকরণ এবং সম্ভাব্য সমাধানসমূহ  গুরুত্ব অনুসারে নিরূপণ। এসব সমস্যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের  প্রভাবিত করে। এবং এসব সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবেই কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে গ্রামের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের  কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান চিহ্নিত করা এবং বিশ্লেষণমূলক ছক তৈরি করা। 

Wealth Ranking ধাপে এ কাজটি করে নিতে হবে।

চাপাতি চিত্র/ Venn Diagram

কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ঋণপ্রদানকারী সেবা প্রতিষ্ঠান ও  স্থানীয় দল  (যেমন কৃষক দল) চিহ্নিত করা, এসব প্রতিষ্ঠান হতে গ্রামের জনগণের সেবা গ্রহণের শতকরা হার নির্ণয়

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে ছোট বড় চাপাতির মাধ্যমে উল্লিখিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান হতে শতকরা সেবা গ্রহণের চিত্র আঁকতে হবে।

Wealth Ranking পরের ধাপে এ কাজটি করে নিতে হবে।

প্রতিষ্ঠান বৃত্তান্ত/  Institutional Profile

চাপাতি চিত্রে চিহ্নিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি বিশ্লেষণমূলক চিত্র প্রণয়ন যাতে এসব প্রতিষ্ঠানের সেবাসমূহ, সেবা প্রদানে সমস্যা, সমস্যা সমাধানের উপায়। এ সেশনে সহায়ক এ গ্রামে কোন কৃষক সংগঠন আছে কিনা তা ভালো করে যাচাই করে নেবেন এবং থাকলে কৃষক সংগঠনের জন্যও অনুরূপ বিশ্লেষণমূলক তথ্যাদি আহরণ করবেন।

১০-১২ জন নারী-পুরুষের  ছোট দলে সবার মতামতের ভিত্তিতে ছক আকারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নাম, মূল সেবা, সেবা প্রদান ও গ্রহণে সমস্যা, সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন। কৃষক সংগঠন থাকলে সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে আলাদাভাবে দলীয় আলোচনা নির্দিষ্ট চেকলিস্ট অনুযায়ী করতে হবে

চাপাতি চিত্রের পরের ধাপেই এ কাজটি করে নিতে হবে।

ড. ইমানুন নবী খান*  মাহমুদ হোসেন**

*প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ** ন্যাশনাল টিম লিডার, আইএপিপি-টিএ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা



Share with :

Facebook Facebook