কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশের কৃষির উপর করোনা পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ করণীয়সমূহ

কৃষিবিদ মো. হামিদুর রহমান

সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব করোনা পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সংঘটিত সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ও মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে করোনা সংক্রমণ ও কারোনা সংক্রমণজনিত মৃত্যু পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। কেননা বিশ্বযুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত দেশের সংখ্যা ছিল সীমিত কিন্তু করোনায় ইতোমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছে ২১২ এর বেশি দেশ। চলতি মে মাসের ০২ তারিখ পর্যন্ত দুই লাখের উপরে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে ৩৪ লক্ষাধিক মানুষ। আমেরিকা-ইউরোপের  মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানে অতি উন্নত দেশগুলো পরিস্থিতি   মোকাবিলায় হিমসিম খাচ্ছে, অসহায় বোধ করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এতটাই তীব্র যে, গোটা মানব সভ্যতা হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সাতশো কোটি মানুষ করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচার আশায় স্বপ্রণোদিত গৃহবন্দীত্বের জীবন বেছে নিয়েছে। এমন বিপর্যয় উত্তোরাধুনিক সভ্যতার প্রতিটি মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়।
বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য জয়ের লড়াইয়ে নিয়োজিত দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের একটি তীব্র ঘনবসতিপূর্ণ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১১৪৬ জন মানুষ বসবাস করে। এ দেশের অর্থনীতির বুনিয়াদ কৃষি এবং শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ মানুষ কৃষি খাতে নিয়োজিত। মাত্র ৮৬ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য জমি থেকে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের অন্নসংস্থান হচ্ছে। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকা ৪টি খুঁটির উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, এগুলো হলো :
১. কৃষি
২. রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প
৩. বিদেশে কর্মরত শ্রমশক্তি এবং
৪. দেশের অভ্যন্তরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ

জিডিপি নিয়ন্ত্রণের এসব ক্ষেত্রসমূহের মধ্যে খাদ্যের যোগানদার খাত হিসেবে কৃষি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশের কৃষি ব্যবস্থার এক ধরনের চিরাচরিত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এ ব্যবস্থা এখন এক আশাজাগানিয়া সমৃদ্ধির স্তরে উঠে এসেছে।  দেশ আজ প্রধান দানাজাতীয় খাদ্যপণ্য চালে উদ্বৃত্ত, ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ, গম, ভুট্টা ও আলুর মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে সাফল্যের পাশাপাশি সবজি, ফলমূল ও মসলা জাতীয় ফসল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে। সেইসাথে ডাল ও তেলবীজ উৎপাদনে উল্লেখ্যযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে। পাশাপাশি-মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ উৎপাদনে অভ‚তপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
করোনা পরিস্থিতির দ্বারা খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা আক্রান্ত হওয়া মানে বাঁচা-মরার আর এক সংকটের মুখোমুখি হওয়া। এ কারণে কৃষির উপর করোনা পরিস্থিতির প্রভাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ বা উত্তরণের জন্য করণীয় নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে এখনই। কেননা, বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ইতোমধ্যেই করোনা পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতির হালহাকিকত সম্পর্কে  সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। গত ২৭ এপ্রিল ২০২০ এক প্রেস ব্রিফিং এ   মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে করোনা পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ব মন্দায় দুর্ভিক্ষ হতে পারে। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষি আমাদের প্রধান ভরসা।
করোনা পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের কৃষি
চলতি বছরের শুরুতেই কোভিড-১৯ পরিচয়ে করোনা ভাইরাস চীন দেশে মানুষের জন্য মহামারী আকারে দেখা দেয়। তার প্রকোপ বাংলাদেশে এসে পৌঁছায় মার্চ মাসের সূচনায়। এক মাস যেতে না যেতে অর্থাৎ মার্চ মাসের মধ্যেই করোনা বিশ্ব জুড়ে ভয়াবহ মহামারী আকার ধারণ করে। ২ মে পর্যন্ত আমাদের দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৭৯০ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৭৫ জন এবং এ ক্রমবৃদ্ধি সূচকীয় হারে বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।  বিগত ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস থেকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সকল নাগরিককে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করাসহ কিছু বিশেষ স্বাস্থ্য সুরক্ষা আচরণ রপ্ত করার জন্য রাষ্ট্রীয় নিদের্শনা দেয়া হয়; বন্ধ করে দেয়া হয় ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকান, স্কুল-কলেজ ও             গণপরিবহন। শহর থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষ গ্রামে চলে যায়। মানুষের মধ্যে কাজ করতে থাকে ভয় ও অসহায়ত্ব। সংগতকারণেই এর প্রভাব কৃষি ব্যবস্থার উপর পড়ছে। কেননা কৃষক সমাজই কৃষির চালিকা শক্তি। বাংলাদেশের ফসল উৎপাদন ব্যবস্থায় অক্টোবর মাস থেকে পরের বছর মার্চ মাস পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় রবি মৌসুম। এ মৌসুম মাঠ ফসল উৎপাদনের জন্য প্রধান মৌসুম। এ মৌসুমে প্রাকৃতিক বৈরিতা তেমন থাকে না সে কারণে ফসল উৎপাদন নিরাপদ ও নির্বিঘœ হয়। এ মৌসুমে প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের পাশাপাশি গম, ভুট্টা, আলু, ডাল ও তেলবীজ, পিয়াঁজ, রসুন, মরিচের মতো প্রধান প্রধান মশলা উৎপান ও সংগ্রহের কাজ চলে; প্রতিটি কৃষক পরিবার কাটায় ব্যস্ত সময়। এমন একটি সময়ে যদি       কৃষকদের ঘরে থাকতে হয়, উৎপাদিত পণ্য  সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিক্রয় না করতে পারে, মাঠের ফসলের যদি প্রয়োজনীয় পরিচর্যা না হয় এর প্রভাব কৃষির উপর পড়বে বইকি। এ ছাড়া সমাগত খরিফ-১ মৌসুমে আউশ ধান, পাট, মুগডাল ইত্যাদি ফসল চাষের প্রস্তুতি ও পরিচর্যা, মধ্য এপ্রিল থেকে মে মাস জুড়ে বোরো ধান কর্তন ও সংগ্রহের কাজে প্রতিনিয়ত কৃষকদেরকে মাঠে যেতে হবে। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশব্যাপী চলবে বোরো ধান কর্তন। এ সময় উত্তরবঙ্গের পাবনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম,      নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং জামালপুর, টাঙগাইল ও ময়মনসিংহ থেকে কৃষি শ্রমিক হাওর অঞ্চলে যাতায়াত করবে। প্রয়োজন হবে ভর্তুকির মাধ্যমে সরকার প্রদত্ত কর্তন যন্ত্র ব্যবহারের। করোনা পরিস্থিতির কারণে এ কার্যক্রম বিঘিœত হলেও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে হাওরে কৃষি শ্রমিক প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সেইসাথে ৪০০ এর অধিক কর্তন যন্ত্র ৭০% ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কৃষিতে যে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহৃত হয়। এ সব রাসায়নিক দ্রব্যের কোন কোনটি কাঁচামাল হিসেবে আবার কোনটি তৈরি পণ্য  হিসেবে বিদেশ থেকে আসে। আমরা যে সবজি, ভুট্টা এবং পাট উৎপাদন করি এসব ফসলের বীজের প্রধান উৎস বিদেশ। শীতকালীন সবজি বীজ, আলু এবং কিছু কিছু হাইব্রিড ধানের বীজও বিদেশ থেকে আসে। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রপাতির বেশিরভাগ আসে বিদেশ থেকে। করোনা জনিত কারণে এসব পণ্য বিদেশ থেকে সময়মতো আসা বিঘিœত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব কৃষির উপর পড়তে বাধ্য।
উৎপাদিত কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ কৃষি ক্ষেত্রে আরেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। দেশের ভেতরে এবং বাইরের পচনশীল কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ বিঘিœত হলে তার প্রভাবও কৃষির উপর পড়বে নানাভাবে নানামাত্রায়।
এই বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই আমাদের কৃষি উৎপাদনের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। বিষয়টি কত বড় চ্যালেঞ্জ তা আমরা অনুমান করতে পারি। এমনিতেই কৃষি জলবায়ুর প্রভাব নির্ভর একটি অনিশ্চয়তার পেশা, তার উপর যদি এই প্রাণঘাতী মহামারীর মুখোমুখি হয়ে কৃষি উৎপাদন  বেগবান করতে হয় সে তো হবে এক অন্য রকম মহাযুদ্ধ। এই মহামারী থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে কৃষির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার মহাযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে এবং জয়ী হতেই হবে।
আর জয়ী হতে হলে এই যুদ্ধের প্রধান সৈনিক কৃষক ভাইদের পাশে সর্বোচ্চ এবং সর্ব প্রকার সহায়তা নিয়ে রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে সবার আগে। করোনা থেকে তাদের রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে কৃষক ভাইয়েরা করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থায় যেন শামিল থাকে সেজন্য সরকার স্বাস্থ্য বিভাগ ও তথ্য বিভাগের পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষক      নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। সম্প্রসারণ কর্মীগণ স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে দ্বিগুণ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা ও অঙ্গীকারের সাথে যাতে মাঠ পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তি ও পরামর্শ সেবা অব্যাহত রাখেন সেজন্য সংস্থা পর্যায়ে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে এবং সম্প্রসারণ কর্মীদের জন্য মোবাইল ভাতা বাড়িয়ে এবং করোনাকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করে এই সেবার পরিধি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নিতে হবে। প্রধান কাজ হবে উৎপাদনে কৃষকের মনোবল সুদৃঢ় করে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এই কাজগুলো করার জন্য ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহীত উদ্যোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
১. বিদ্যমান মাঠ ফসলের (ঝঃধহফরহম ঈৎড়ঢ়ং) প্রয়োজনীয় পরিচর্যা অব্যাহত রাখা; কৃষক ভাইয়েরা       স্ব-উদ্যোগেই এ কাজটি করে থাকেন। আমাদের সম্প্রসারণ কর্মীরা এ কাজে পরামর্শ সেবা দেয়ার কাজে নিয়োজিত আছেন।
২. প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ, বীজ, সার, বালাইনাশক, সেচ ব্যবস্থাপনাসহ কৃষি যন্ত্রপাতির সঠিক সময়ে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
৩. রাজস্ব খাতের প্রণোদনা এবং বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পসমূহের কার্যক্রম যাতে মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় সেদিকে নজরদারি জোরদার করা।
৪. স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় কৃষি পণ্যের পরিবহন, গুদামজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কাজসমূহ নির্বিঘœ হয় সে ব্যবস্থা করা।
৫. মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বশীল ও সময়োচিত দিক নির্দেশনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের শ্রমিক জোগানের সাথে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর এবং হাওর অঞ্চলের জেলাগুলোর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি, সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে      কৃষি শ্রমিকদের হাওরে ধান কাটার অংশগ্রহণে সুব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সেইসাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০০ কোটি টাকা প্রণোদনার অর্থদিয়ে ভর্তুকি মূল্যে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার হাওরে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী, মাননীয় সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক         নেতৃবৃন্দ, কৃষি সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের          মহাপরিচালক নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়ন এবং খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়ন হাওরের বোরো ধান কাটা পরিদর্শনে উপস্থিত হয়ে         কৃষকদের অনুপ্রাণিত করেন।
৬. খরিপ-১ মৌসুমের প্রধান প্রধান ফসল যেমন আউশ ধান, পাট, মুগডাল ইত্যাদি চাষের লক্ষ্যমাত্রা যাতে অর্জিত হয় সে বিষয়ে কৃষি গবেষণা, বিএডিসি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ কর্মধারা জোরদার করা। এ ক্ষেত্রে বীজ ব্যবসায়ী বিশেষ করে যারা হাইব্রিড ধান বীজ এবং পাট বীজ বিপণন করে থাকেন তাদের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
৭. আমন তথা খরিফ-২ মৌসুমে ইতোমধ্যে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
৮. খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমে ফসল চাষ নির্বিঘœ করার জন্য প্রয়োজনীয় আমদানীযোগ্য উপকরণের যোগান নিশ্চিত করার জন্য উৎস দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ এবং এসব পণ্যের আগমন, পরিবহন ও ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আমদানিকারক ও বিপণনকারী কোম্পানিসমূহের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
৯. করোনা দুর্যোগকালে উদ্ভাবনমূলক সম্প্রসারণ সেবা প্রদানের জন্য উদ্ভাবনী কর্মকর্তাদের প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করা। এসব উদ্ভাবনী সম্প্রসারণ সেবা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা। উদ্ভ‚ত করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিগত ২৬ মার্চ প্রদত্ত ভাষণে চাষযোগ্য প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল উৎপাদন এর যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়কালে অধিক দুর্দশাগ্রস্তদের খাদ্যশস্য প্রেরণের যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তা সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়নে কৃষক সমাজের সার্বিক সহায়তা প্রদানের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় সর্বশক্তি নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পরিস্থিতির অনাকাক্সিক্ষত অবনতি ও কৃষি ক্ষেত্রে করণীয়
এতসব প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা অতি অবশ্যই ভ‚লণ্ঠিত হবে যদি পরিস্থিতির অনাকাক্সিক্ষত অবনতি ঘটতে থাকে। করোনা সংক্রমণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করে বাংলাদেশের জনঘনত্ব এবং চিকিৎসা সুবিধার তুলনামূলক অপ্রতুলতা আমদের জন্য অধিকতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে। পরিস্থিতি আরো ঝুঁকিপূর্ণ হলে অন্য সব ব্যবস্থার মত কৃষি খাতের উপরেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়াও কৃষি উপকরণের উপর আমাদের বিদেশ নির্ভরতা আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিঘিœত করতে পারে। অধিকন্তু তৈরি পোশাক রপ্তানি ও জনশক্তি থেকে আয় কমে গেলে তা আমাদের সার্বিক অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে উপর প্রভাব ফেলবে। এমন চরম খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আমরা কোন পর্যায়ে কৃষি উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখবো তথা খাদ্যোৎপাদন চাহিদার সমানুপাতে রাখব সে বিষয়টি এখন থেকেই ভাবতে হবে। এই প্রস্তুতির ক্ষেত্রে করণীয় হলোÑ
১. করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলে সম্ভাব্য নিরাপদ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে কৃষি উৎপাদন চালু রাখতে হবে সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া।
২. এ বিষয়ে বিশ্ব পরিসরের কোন কার্যকর কৌশল বা  অনুসরণযোগ্য অভিজ্ঞতা থাকলে তা গ্রহণ ও প্রয়োগের চর্চা করা। সেই সাথে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের উপযোগী উদ্ভাবনমূলক কার্যকর কর্মকৌশল গ্রহণ  করা।
৩. দেশজুড়ে মাঠে থাকা বোরো ধান যাতে সম্পূর্ণরূপে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় তার সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, এক্ষেত্রে হাওর অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মধ্যে যে সমন্বয়মূলক কর্মধারা সূচিত হয়েছে তা হাওর অঞ্চলের বাহিরে অন্য জেলাগুলোতেও অনুসরণ করা।
৪. ভুট্টা, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের সহযোগিতা করতে হবে।
৫. গ্রামাঞ্চলে কৃষকের বসতবাড়িতে এবং শহরাঞ্চলের বাড়িতে পুষ্টি বাগান রচনার কাজ দ্রæততার সাথে করতে হবে। হোম কোয়ারিন্টাইনে থাকা অবস্থায় এ কাজে সকলকে উৎসাহিত করতে হবে। নার্সারি থেকে যাতে বীজ বা চারা সংগ্রহ করে এ কাজ করা যায় তার সুব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজে নারী এবং যুবশক্তি ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬. দরকারি কৃষি যন্ত্রপাতির প্রয়োজনীয় মজুদ গড়ে তুলতে হবে এবং ভর্তুকি মূল্যে অধিক সংখ্যক কৃষক যাতে কৃষি যন্ত্রপাতি পায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।
৭. কৃষি উপকরণ দেশের বাইরে থেকে আনা, খাদ্যপণ্য আমদানি রপ্তানি এবং কৃষি পণ্যের ও উপকরণের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা সুচারুরূপে চালু রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি, বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আন্তঃসমন্বয় জোরদার করতে হবে।
৮. চলতি বোরো মৌসুম থেকে সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায্যমূল্যে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান চাল সংগ্রহের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি গোডাউন এবং সরকারি শস্যগুদামগুলো ব্যবহার করতে হবে। করোনা মোকাবেলায় এটা হবে অতি গুরুত্বপর্ণ কার্যক্রম।
৯. কৃষক, কৃষি উদ্যেক্তা এবং ক্ষুদ্র মাঝারি ও বড় কৃষি ব্যবসায়ীদের কম সূদে (৪% হারে) ঋণ প্রদান করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৫০০০ কোটি টাকার যে প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন তা নিষ্ঠার সাথে বাস্তবায়ন করতে হবে।
১০. প্রকৃত কৃষকদের কাজ থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে অধিক পরিমাণ ধান ক্রয় করে ধানের বাজারমূল্য যাতে কৃষকের জন্য অলাভজনকভাবে কমে না যায় সে বিষয়ে তীব্র দৃষ্টি রেখে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল ক্রয়ের কার্যব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে।
১১. হাওরে ও অন্যান্য জেলায় বোরো ধান সংগ্রহের সময় বজ্রপাতে যেসব কৃষি শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে তাদের পরিবারের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে বজ্রপাতের ভয়াবহতা থেকে কৃষি শ্রমিকদের রক্ষা করতে হবে।
১২. ক্ষতিগ্রস্ত ফুল, ফল ও সবজি চাষিদের তালিকা তৈরি করে তাদের প্রণোদনার সহায়তার আওতায় আনতে হবে।
১৩. কৃষি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অন্তরায়সমূহ চিহ্নিত করে তা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যমান জনবলের দক্ষতা, মনোবল ও আগ্রহীর সাথে কাজ করার ইচ্ছা বাড়ানোর কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।
১৪. কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন পতিত জমিতে ফসল উৎপাদনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
১৫. গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সৃষ্ট কৃষক সংগঠন/সংঘসমূহকে মাঠ পর্যায়ে ও বসতবাড়িতে ফসল উৎপাদন এবং যৌথভাবে তা বাজারজাতকরণে কাজে লাগাতে হবে। য়

এপিএ এক্সপার্ট পুল সদস্য, কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাক্তন মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল-০১৭১১৮০৩৬৯৫, ই-মেইল : hamidur2152@gmail.com

 


Share with :

Facebook Facebook