কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

উফশী পাট রবি-১ এর উৎপাদন প্রযুক্তি

মু. দেলোয়ার হোসেন সরকার

নতুন, জনপ্রিয় এবং উচ্চ ফলনশীল (উফশী) পাটের জাত রবি-১ বা বিজেআরআই তোষা পাট-৮ । নতুন উদ্ভাবিত এই জাত সাধারণ তোষা পাটের জাতের চেয়ে কমপক্ষে ২০ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। এর উচ্চতা সাধারণ পাটের চেয়ে ২০ সেন্টিমিটার বেশি। আঁশের পরিমাণও ২০ শতাংশ বেশি। সাধারণ তোষা পাট ১২০ দিন পর কাটতে হয়, নতুন এই জাত কাটা যায় ১১০ দিন বয়সে। সাধারণ তোষা পাটের আগা চিকন গোড়া মোটা হয়, পক্ষান্তরে নতুন এই জাতের পাটের আগা গোড়া সমান। এর আঁশের উজ্জ্বলতাও বেশি।
আসুন জেনে নেওয়া যাক,   রবি-১ বা বিজেআরআই তোষা পাট-৮ এর উৎপাদন প্রযুক্তি।
সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য
রবি-১ জাতের পাটের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য হলো এর কাÐ মসৃণ, লালচে এবং দ্রæত বর্ধনশীল। আলোক প্রাপ্তি সাপেক্ষে কাÐের বর্ণ তামাটে থেকে গাঢ় লাল বর্ণের হয়। তবে যেখানে সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে না সেখানে কাÐের বর্ণ সবুজ হয়।  এতে স্থায়ী লাল বর্ণের উপপত্র বিদ্যমান। পাতা উজ্জ্বল ও চকচকে।
বপন সময় ও জমির বৈশিষ্ট্য
ক) মধ্য ফাল্গুন (মার্চ) হতে মধ্য বৈশাখ (এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ) পর্যন্ত বপনযোগ্য তবে মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ বীজ বপনের সর্বাধিক উপযোগী সময়।
খ) অপেক্ষাকৃত উঁচু, জলাবদ্ধতাহীন দোঁ-আশ এবং
বেলে দো-আঁশ মাটি ‘রবি-১’ চাষের জন্য উপযোগী।
গ) এ জাতটি বোরো ধান কাটার পর বপন করে জমিকে সহজেই ৩ ফসলী শস্যক্রমের আওতায় আনা যায়।
বীজ বপন হার  
সারিতে বপন করার জন্য হেক্টর প্রতি ৫-৬ কেজি এবং ছিটিয়ে বপন করার জন্য হেক্টর প্রতি ৬-৭ কেজি বীজ প্রয়োজন।
সার প্রয়োগ মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি
সুনিষ্কাশিত উঁচু, দোঁ-আশ এবং বেলে-দোঁ-আশ মাটিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগের মাত্রা সারণি-১ প্রদর্শন করা হয়েছে। তবে গোবর বা অন্যান্য জৈবসার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার আনুপাতিক হারে কমিয়ে আনতে হবে।
জমি তৈরির শেষ চাষের সময় সারণি-১ তে নির্দেশিত মাত্রার অর্ধেক ইউরিয়া এবং সম্পূর্ণ মাত্রার টিএসপি, এমওপি ও     জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে। চারার বয়স ৪০-৪৫ দিন হলে জমিতে নিড়ানী দিয়ে, চারা পাতলা করে নির্দেশিত মাত্রার অবশিষ্ট অর্ধেক ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। সার দেওয়ার সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা জরুরি। খরা দীর্ঘায়িত হলে কাক্সিক্ষত ফলন প্রাপ্তির জন্য সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে গাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং ফলন বৃদ্ধি পাবে।
রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন রবি-১ জাতের পাটে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ
তেমন পরিলক্ষিত হয় না। তা স্বত্তে¡ও পাটের সাধারণ রোগ হিসাবে আগামরা বা কাÐপচা রোগ দেখা দিলে প্রাথমিকভাবে রোগাক্রান্ত গাছসমূহ উপড়ে ফেলে দ্বিতীয় পর্যায়ের আক্রমণ রোধ করার জন্য ডায়থেন এম-৪৫ বা ইন্ডোফিল এম-৪৫ নামক ছত্রাকনাশক ০৩ দিন পর পর ০৩ বার স্প্রে করা যেতে পারে। এছাড়া রবি-১ পাটের জমিতে ৫% এর উপর মাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে সানমেকটিন ১.৮ ইসি বা অ্যামবুশ ১.৮ ইসি গাছের উপরের দিকে কচি পাতার নীচের পৃষ্ঠে ০৭ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করা যেতে পারে।
গুণগত মানসম্পন্ন আঁশ উৎপাদন
ক) অধিক ফলন ও গুণগত মানসম্পন্ন আঁশ পাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ে বপনকৃত পাট গাছ ১১০ দিনে কাটা উত্তম। তবে প্রয়োজনে এ জাত ১০০ দিনেও কর্তন করা যাবে। সে ক্ষেত্রে ফলন সামান্য কম হলেও এতে আঁশ সোনালী রঙ ধারণ করে এবং নরম থাকে যা বিভিন্ন রকমের উন্নত মানের পাটপণ্য তৈরিতে অধিক উপযোগী বলে বিবেচিত হয়েছে।
সারণি-১ সার প্রয়োগের মাত্রা
খ) পাট গাছ কাটার পর ১০-১২টি গাছ একত্রে আঁটি বেঁধে জমিতে ৩-৪ দিন খাড়া রাখার পর, পাতা ঝরিয়ে পানিতে জাগ দেয়া শ্রেয়। জাগ খুব পুরু না করে খড় বা কচুরীপানা দিয়ে ঢেকে দেয়া ভাল। জাঁক সম্পন্ন হওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে ভালোভাবে ধুয়ে রৌদ্রে শুকাতে হবে। ধোয়া আঁশ আড়ে শুকানো উচিত। মাটিতে শুকালে আঁশের মান খারাপ হয়ে যায়।
গ) এ ছাড়া পানি স্বল্প এলাকায় আঁশ ছাড়ানোর জন্য রিবন রেটিং পদ্ধতিও অবলম্বন করা যেতে পারে।
ফলন
উপযুক্ত আবহাওয়া এবং সঠিক পরিচর্যায় কৃষকের মাঠে   ‘রবি-১’ জাতের শুকনো আঁশের ফলন নিম্নরূপঃ
তবে কাক্সিক্ষত এ ফলন পেতে হলে হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা ৩.৫ থেকে ৪.০ লক্ষ থাকা উচিত।
বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ
আঁশের জন্য চাষকৃত মাতৃ গাছ থেকে গুণগত মানে ও পরিমাণে ভালো বীজ পাওয়া সম্ভব নয়। তাই কাক্সিক্ষত গুণে, মানে ও পরিমাণে বীজ উৎপাদনের জন্য ৩টি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
ক) কাটিং বা ডগা রোপণ পদ্ধতি
আঁশ ফসলের জন্য বপনকৃত গাছের বয়স ১০০-১১০ দিন হলে সুস্থ ও সতেজ গাছের উপরের অংশ  থকে প্রায় ৩০-৪৫ সেন্টিমিটার বা এক থেকে দেড় ফুট পরিমাণ কেটে নিয়ে প্রতিটিকে ২-৩ টুকরা করতে হবে যেন প্রতি টুকরায় ২ টি পর্ব বা গিট থাকে। কাটিংগুলোকে পর্যাপ্ত রস সমৃদ্ধ মাটিতে ৪৫ ডিগ্রি কাত করে পুঁতে দিতে হবে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এসকল কাটিংস থেকে প্রচুর ডালপালা বের হয়, যা থেকে ভালো মানের বীজ উৎপাদিত হয়। এ পদ্ধতিতে প্রতি শতক জমিতে ২-৩ কেজি বীজ সহজেই উৎপাদন করা যায়।
খ) নাবী বীজউৎপাদন পদ্ধতি
জুলাই মাসের মাঝামাঝি (শ্রাবণ মাস) হতে আগস্ট মাসের শেষ বা প্রয়োজনে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি (ভাদ্র মাস) পর্যন্ত জলাবদ্ধতাহীন উঁচু জমিতে প্রতি হেক্টরে ৫ কেজি বীজ বপন করে ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ) মাসে বীজ সংগ্রহ করা যায়। এ পদ্ধতিতে গাছের উচ্চতা সাধারণত ৩-৫ ফুট হয়ে থাকে এবং প্রচুর শাখা প্রশাখা বিস্তার করে পরিপুষ্ট ফুল ও ফল ধারণ করে। প্রতিটি ফল সর্বাধিক পরিমাণ বীজ ধারণ করে। এ পদ্ধতিতে সবচেয়ে মানসম্পন্ন প্রতি শতকে অনায়াসে ৩-৪ কেজি বীজ পাওয়া যায়। সাধারণভাবে একজন কৃষকের ৩-৫ কেজি বীজ হলেই চলে। সেক্ষেত্রে কোন কৃষক তার রবি ফসলের বর্ডার ফসল হিসাবে ২-৩ সারি বীজ বপন করেই নিজের বীজে সহজেই প্রয়োজন মেটাতে পারে।
গ) চারা রোপণ পদ্ধতি
উঁচু জমিতে চারা তৈরি করে ৩০-৪০ দিন বয়সের চারা ভেজা মাটিতে রোপণ করে সন্তোষজনক পরিমাণ বীজ উৎপাদন যায়। এ পদ্ধতিতে প্রতি শতক জমিতে ২-৩ কেজি বীজ উৎপন্ন হয়।
বীজ উৎপাদনে সারের মাত্রা
বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য সারের মাত্রা সারণি-২ তে প্রদর্শিত হয়েছে। তবে গোবর বা অন্যান্য জৈবসার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার আনুপাতিক হারে কমিয়ে আনতে হবে।
বীজ ফসল কর্তন ও সংরক্ষণ
ফল ৭০-৮০ শতাংশ বাদামি বর্ণ ধারণ করলে গাছের গোড়া সমেত কেটে মেঝেতে ত্রিপল/ পাটের বস্তা বিছিয়ে ফল শুকাতে হবে। উৎপাদিত বীজ ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে ২ বছর পর্যন্ত বপনযোগ্য থাকে। য়

বিজ্ঞানী ও পাট গবেষক, পাটের কৃষি পরীক্ষা কেন্দ্র, জাগীর, মানিকগঞ্জ, মোবাইল-০১৬৭০৯২৫৯৮৭, ই-মেইলঃ delwarbarj@gmail.com


Share with :

Facebook Facebook