কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যবহার উপযোগী চারা উৎপাদনের কলাকৌশল

শারমিন ইসলাম১, ড. মো: দুররুল হুদা২,

ড. মো: আনোয়ার হোসেন৩, ড. মো: গোলাম কিবরিয়া ভূঞা৩, ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান৪

জনসংখ্যার দ্রæত বৃদ্ধি, ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি কৃষির অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রকৃতি নির্ভর কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থাৎ যান্ত্রিকায়নের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। সময়মতো কৃষি কাজ সম্পাদন, পণ্যের উৎপাদন খরচ কমানো ও কর্তনোত্তর অপচয় রোধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণ, শ্রমিকের কায়িক শ্রম লাঘব ও ঘাটতি পূরণ সর্বোপরি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্য এর যান্ত্রিকীকায়ন অপরিহার্য। উন্নত বিশ্বে যান্ত্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমেই  কৃষিতে বিপ্লব সাধিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায় যে, দেরিতে ধান রোপণের ফলে বোরো, আমন ও আউশ মওসুমে প্রতিদিনে হেক্টরপ্রতি যথাক্রমে ৬০, ৫৫ ও ৯ কেজি ফলন কমে যায়।
দেশের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ ধানী জমি হাতে চারার রোপণের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়ে থাকে এবং বীজ তলা থেকে চারা উঠানো ও জমিতে রোপণের জন্য ধান চাষে মোট খরচের প্রায় ৩০% ব্যয় হয়ে থাকে। দেশে ধানের চারা রোপণের ভরা মওসুমে ব্যাপকভাবে শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। শ্রমিক স্বল্পতার কারণে কৃষক বিলম্বে চারা রোপণ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলশ্রæতিতে আশানুরূপ ফলন না হওয়ায় শস্য উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণ। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের জন্য এক ধরনের প্লাস্টিক ট্রে অথবা পলিথিন সিটের ওপর বিশেষ ব্যবস্থায় চারা উৎপাদন করতে হয়, যা দেশের কৃষকের কাছে একেবারে নতুন প্রযুক্তি।
চারা উৎপাদনের কলাকৌশল
সাম্প্রতিক কালে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি উন্নত দেশে কাদা জমিতে যন্ত্রের সাহায্যে ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে, যা আমাদের দেশের প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উৎপাদন খরচ কমায়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ পদ্ধতি হলো যান্ত্রিক এবং কৃষিতত্তে¡র সমন্বিত প্রায়োগিক প্রযুক্তি। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের মূল বিষয় হলো ২.০ - ২.৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে সীমিত শিকড় দ্বারা আবদ্ধ মাটিযুক্ত বিশেষ ধরনের চারা উৎপাদন। এ বিশেষ ধরনের চারা এক ধরনের প্লাস্টিক ট্রে অথবা পলিথিন সিটের ওপর বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি করতে হয়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চারা রোপণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা যায়। তার মধ্যে প্লাস্টিক ট্রে ও পলিথিন ম্যাট পদ্ধতি বহুল        প্রচলিত।
প্লাস্টিক ট্রে পদ্ধতি
এ পদ্ধতিতে ৫৮ দ্ধ ২৮ দ্ধ ২.৫ সেন্টিমিটার আকারের প্লাস্টিক ট্রে ব্যবহার করা হয়। যার তলদেশে ২-৩ মিলিমিটার ব্যাসের ছিদ্র রয়েছে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা রাখার জন্য যে নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে তার আকার এবং প্লাস্টিক ট্রের আকার একই। এ পদ্ধতিতে দুই ধরনের প্লাস্টিক ট্রে ব্যবহার করা হয়- ১) শক্ত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি রিজিড ট্রে এবং ২) নরম প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ফ্লেক্সিবল ট্রে। রিজিড ট্রের দাম ও স্থায়িত্ব ফ্লেক্সিবল ট্রের দাম ও স্থায়িত্বের তুলনায় বেশি  ।
পলিথিন ম্যাট পদ্ধতি
প্রথমে সনাতন পদ্ধতিতে বীজতলার জন্য যেভাবে চাষ দিয়ে জমি তৈরি করা হয় সেভাবে জমি তৈরি করতে হবে। আধুনিক বীজতলার ন্যায় এমনভাবে বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে যাতে দুটি ট্রে পাশাপাশি স্থাপন করা যায় অর্থাৎ ১.৪-১.৫ মিটার চওড়া লম্বা বরাবর রেইজ বেড করতে হবে। তারপর শুকনো/ভেজা নরম জমিকে রেইজ বেডের উভয় পাশে নালা তৈরির জন্য জায়গা রেখে নালার মাটি বীজতলায় উঠিয়ে এমনভাবে সমতল করতে হবে যেন বেডের উভয় পার্শ্ব একটু ঢালু থাকে। এতে করে অতিরিক্ত পানি গড়িয়ে নালায় যেতে পারে।  তারপর রেইজ বেডের ওপর পলিথিন সিট বিছিয়ে নিতে হবে। পলিথিন সিটের কারণে চারার শিকড় ইচ্ছামতো বড় হতে পারবে না এবং ট্রে পদ্ধতির ন্যায় চারার শিকড় ২.০-২.৫ সেন্টিমিটার জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা স্থাপনের জায়গার মাপ অনুযায়ী অর্থাৎ ২.৫ - ৩.০ সেন্টিমিটার উচ্চতা, ২৮ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৫৮ সেন্টিমিটার লম্বা কাঠ/বাঁশের ফালি দিয়ে ট্রের ন্যায় পলিথিন সিটের ওপর স্থাপন করতে হবে যাতে সহজে ট্রের ন্যায় চারার বøক পাওয়া যায়। তারপর প্লাস্টিক ট্রের মতোই প্রথমে ২.০ সেন্টিমিটার আগাছা মুক্ত ঝুরঝুরা নরম মাটি পলিথিনের ওপর স্থাপনকৃত কাঠ/বাঁশের ফালির মধ্যে ভরাট করতে হবে। মাটি ভরাটের পর পরিমাণ মতো বীজ বপন করতে হবে। অতপর বপনকৃত বীজের ওপর ০.৫ সেন্টিমিটার ঝুরঝুরে মাটি দিয়ে বীজ ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে। যান্ত্রিকপদ্ধতিতে রোপণ উপযুক্ত চারার বৈশিষ্ট্য
সফলভাবে চারা রোপণের প্রধান বিষয় হচ্ছে মানসম্পন্ন চারা।  এ ক্ষেত্রে চারার উচ্চতা, ঘনত্ব এবং মাটির পুরুত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগবালাই মুক্ত সম-ঘনত্বের সবল-সতেজ চারা হতে হবে। চারার ঘনত্ব প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে নূন্যতম ২-৩টি হতে হবে। ২.০-২.৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে সীমিত শিকড় দ্বারা আবদ্ধ মাটিযুক্ত চারা    । চারার পাতার সংখ্যা ৩-৪ টি। চারার উচ্চতা ১০-১২ সেন্টিমিটার। চারার বয়স আউশ-আমন মওসুমে ১২-১৫ দিন  এবং বোরো মওসুমে ২৫-৩০ দিন।    
চারার বøকের এমন মাত্রার ভর বহনক্ষমতা থাকতে হবে যাতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারে চারা স্থাপনের পর বøকের আকৃতির পরিবর্তন না ঘটে।    
মাটি নির্বাচন ও বীজতলা তৈরি
আগাছা, ফসলের নাড়া (ঈৎড়ঢ় ৎবংরফঁব), কাঁকর, কলকারখানার বর্জ্য মুক্ত উর্বর বেলে-দোআঁশ মাটি ট্রে’তে চারা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ করে ঢিলা ভেঙে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। ঢিলার পরিমাণ বেশি ও বড় হলে প্রয়োজনে ঢিলা ভেঙে চালনি (ঝরবাব) দিয়ে চেলে নিতে হবে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনে জৈবসার  (গোবর/কম্পোস্ট) ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। জমিতে চারা রোপণের ১০-১২ দিন আগে চারা তৈরি করতে হবে। এমনভাবে বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে যাতে দু’টি ট্রে পাশাপাশি স্থাপন করা যায় এবং বীজতলার উভয় পাশে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরির ব্যবস্থা থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ কারণে বীজতলা ১.৪-১.৫ মিটার চওড়া হওয়া বাঞ্ছনীয়।
বীজ নির্বাচন
বীজ ধানের আকার অনুযায়ী ৫৮ দ্ধ ২৮ দ্ধ ২.৫ সেন্টিমিটার সাইজের প্রতি ট্রের জন্য ইনব্রিড জাত হলে ১২০-১৫০ গ্রাম এবং হাইব্রিড জাত হলে ৮০-১০০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। নির্বাচিত জাতের ধান বীজ প্রথমে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। পানি দিয়ে ভিজানোর সময় পানির ওপর ভাসমান চিটা ধান আলাদা করে নিতে হবে। কারণ চিটা ধান থেকে        সবল-সতেজ চারা উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। রোগমুক্ত        সবল-সতেজ চারা পাওয়ার জন্য বীজ ধান জাগ দেওয়ার পূর্বেই রোগমুক্ত করে নেয়া ভালো। বাঁকানি, ফলস স্মার্ট, গ্রেইন স্পট ইত্যাদি রোগবালাই থেকে চারাকে রক্ষার জন্য প্রতি কেজি বীজের জন্য ৩ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ধান বীজ ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখার পর বীজ ধান পানি থেকে আলাদা করে নিয়ে চটের বস্তায়/অন্য কোন পাত্রে অঙ্কুরোদগমের জন্য জাগ দিতে হবে। উল্লেখ্য, বীজ শোধন করা না হলে সাধারণত ভালো অঙ্কুরোদগমের জন্য জাগ দেয়ার পূর্বে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নিতে হবে। ভ্রƒণমূলের (রেডিক্যাল) দৈর্ঘ্য বীজ ধানের ১/৩ অংশ হলে চটের বস্তা থেকে অঙ্কুরোদগমকৃত বীজ ঢেলে নিয়ে দলা ছুটিয়ে আলাদা করে নিতে হবে।
বীজ বপন প্রক্রিয়া
প্রথমে ট্রেতে ২.০ সেন্টিমিটার করে মাটি ভর্তি করার পর কাঠ বা বাঁশের কাঠি দিয়ে ভালোভাবে সমতল করে নিতে হবে। এরপর প্রতিটি ট্রের জন্য নির্ধারিত বীজকে তিন ভাগে বিভক্ত করে নিয়ে ট্রের ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ট্রেতে সমভাবে বীজ পড়ে। অতপর ০.৫ সেন্টিমিটার করে শুকনো মাটি এমনভাবে বীজের ওপর ছিটিয়ে দিতে হবে যাতে করে সব বীজ মাটি দ্বারা ঢেকে যায়। এরপর সতর্কতার সঙ্গে এমনভাবে ট্রেতে পানি দিতে হবে যাতে পানি কেবলমাত্র ট্রের নিচ পর্যন্ত পৌঁছে। ট্রের নিচে যাতে অতিরিক্ত পানি না জমে থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করে দিতে হবে।
বীজতলায় চারার পরিচর্যা
অঙ্কুরোদগকৃত বীজের ভ্রƒণ ও ভ্রƒণমূল দ্রæত বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত  অধিক আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এ কারণে শীতকালে ট্রেতে বীজ বপনের পর রাত্রে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। চারার দৈর্ঘ্য ২.০-২.৫ সেন্টিমিটার হলে বীজতলায় ছিপছিপে করে পানি রাখতে হবে। শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে রাত্রিবেলায় বীজতলায় দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, আউশ ও আমন মৌসুমে রাত্রিবেলায় পলিথিন দিয়ে ট্রে ঢাকার প্রয়োজন নেই। আমরা জানি চারা গাছে নাইট্রোজেনের অধিক উপস্থিতি দ্রæত শিকড় বৃদ্ধিতে এবং অধিক পরিমাণ কার্বন চারা গাছকে রোপণের সময় ইনজুরির হাত থেকে রক্ষা করে। এ কারণে রোপণের আগে চারার পাতার রং ঘন-সবুজ আছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। পাতার রং ঘন সবুজ না থাকলে রোপণের ৪-৫ দিন পূর্বে প্রতি হেক্টর বীজতলার জন্য ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া পানিতে মিশিয়ে ফলিয়ার স্প্রে করা যেতে পারে অথবা ১% ইউরিয়া ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ফলিয়ার স্প্রে করা যেতে পারে। প্লাস্টিক ট্রে কিংবা পলিথিন ম্যাটে উৎপন্ন চারা মাদুরের ন্যায় রোল করে এবং একটির উপর আরেকটি এভাবে ৩-৪টি রোল স্থাপন করে গাড়িতে করে মাঠে নিয়ে যাওয়া যায়। য়

১ কৃষি প্রকৌশলী, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, , (Sharminshikha85@gmail.com, ২প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৩ ঊধ্বর্তন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ৪মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বিআরআরআই, গাজীপুর।

 


Share with :

Facebook Facebook