কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ধান উৎপাদনে সার সাশ্রয়ী প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া প্রযুক্তি

নূর উদ্দীন মাহমুদ১ দিপালী রানী গুপ্তা২ মোঃ তোফাজ্জল ইসলাম৩
ব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সকল পরিবেশে বিরাজমান এবং বৈচিত্র্যময় এককোষী জীব। সকল বহুকোষী জীবের সংস্পর্শে এমনকি অন্তঃকোষীয় অঞ্চলেও ব্যাকটেরিয়া বসবাস করতে পারে। এদের অধিকাংশই জীব ও পরিবেশের জন্য উপকারী এবং অপরিহার্য। উদ্ভিদের দেহের বহিঃত্বক ও অন্তঃকোষীয় অঞ্চলে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে  উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া বলা হয়।
এসব ব্যাকটেরিয়া নানাভাবে  উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে। এদের ব্যবহারে  শস্যের ফলন বৃদ্ধি পায় এবং উৎপাদের গুণগতমানের উন্নয়ন ঘটে। স্থানীয় পরিবেশ থেকে আহরিত এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়া দামি রাসায়নিক সারের বিকল্প অণুজীব সার বা উদ্ভিদ বৃদ্ধিকারক হিসাবে ব্যবহার করলে ফসল উৎপাদন খরচ বহুলাংশে কমানো যায়। এদের ব্যবহারে উদ্ভিদে রোগবালাইর আক্রমণ হ্রাস পায়।   প্রকৃতি থেকে আহরিত এসব মূল্যবান ‘জৈব সোনার’ ব্যবহার টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনে সহায়ক।
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বাণিজ্যিক ব্যবহারের  প্রয়োজনীয়তা
আগামী ২০৫০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৭০ কোটিতে উন্নীত হবে। এ বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য খাদ্যোৎপাদন শতকরা ৭০-১০০ ভাগ বৃদ্ধি আবশ্যক। শস্য উৎপাদনে অধিক পরিমাণ কৃত্রিম রাসায়নিক সারও বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। তবে কৃষিতে রাসায়নিক পদার্থের অধিকতর ব্যবহার  পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলছে, যা টেকসই কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তার অন্তরায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর ধান ও অন্যান্য ফসলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ৫০ লক্ষ মেট্রিক টন। তন্মোধ্যে, ৫০ ভাগের বেশি ইউরিয়া এবং প্রায় সম্পূর্ণ ফসফেট ও পটাশ সার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ফলশ্রæতিতে, একদিকে ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অপরদিকে সার আমদানিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। এক্ষেত্রে, প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া একটি সম্ভাব্য বিকল্প টেকসই প্রযুক্তি হতে পারে, যা রাসায়নিক সারের ব্যবহার বহুলাংশে কমাবে।
বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার ফসল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বে কৃষিতে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াজাত সার ও বালাইনাশকের বর্তমান বাজারমূল্য ২০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। সুতরাং, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নিজস্ব পরিবেশ থেকে       আহরিত ‘জৈব সোনা’ খ্যাত উপকারী প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াকে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে ফসল উৎপাদনে ব্যবহার খুবই প্রয়োজন।
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার উৎস
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া সাধারণত দু’ধরনের হয়ে থাকে। এক. উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গের বহিঃত্বকে, এবং ২. উদ্ভিদের কোষকলার অভ্যন্তরে বিদ্যমান প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া।উদ্ভিদের বহিঃত্বকে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া সাধারণত মূল, কাÐ, পাতা, ফুল ও ফলের বহিঃত্বক হতে সংগ্রহ করা হয়। উদ্ভিদের কোষকলায় বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গের অন্তস্থ কোষকলা থেকে আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়।
প্রকৃতি থেকে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া আহরণ কৌশল
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া আলাদাকরণ ও বাছাইকরণ : সাধারণত গবেষণাগারে উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গ হতে অণুজীবীয় পদ্ধতিতে  এদেরকে আলাদা করা হয়। ব্যাকটেরিয়াকে আলাদা করে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট আবাদ মাধ্যমে এদের বিভিন্ন কার্যকারিতা যেমন: বায়ুমÐলীয় নাইট্রোজেন সংযোজন, পটাশিয়াম ও ফসফেট দ্রবীভূতকরণ, উদ্ভিদ হরমোন উৎপাদন ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে বাছাই করা হয়। সুনির্দিষ্ট আবাদ মাধ্যমে রঙের নির্দেশক এবং অদ্রবণীয় পুষ্টি উপাদান সম্বলিত যৌগ দ্রবীভ‚ত করে স্বচ্ছ অঞ্চল সৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে ব্যাকটেরিয়াগুলোর উপকারী কার্যকারিতা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণ : ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণ সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়মমাফিক পরীক্ষা যেমন- দৈহিক, শারীরবৃত্তীয় এবং জৈব রাসায়নিক পরীক্ষা এবং জিন সিকোয়েন্সিং ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করে কোন প্রজাতির তা শনাক্ত করা হয় । নিয়মমাফিক পরীক্ষার মধ্যে এদের রং,            আকৃতি, মার্জিন, উচ্চতা, দ্রবণীকরণ এলাকা, অপটিক্যাল ঘনত্ব, বায়োফিল্ম তৈরি, গ্রাম স্টেইনিং, বিভিন্ন এনজাইম ও স্টার্চ উৎপাদন, জৈব এসিডের ব্যবহার এবং এন্টিবায়োটিক উৎপাদন ক্ষমতা নির্ণয়ের মাধ্যমে এদের বাণিজ্যিক ব্যবহারে সম্ভাব্যতা নিশ্চিত করা হয়। পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য বিশ্লেষণ করেও এদের প্রজাতি শনাক্ত করা হয়।
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া উপকারিতা
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া নানাভাবে উদ্ভিদের উপকার করে থাকে (১) বাতাস হতে নাইট্রোজেন সংযোজন করে উদ্ভিদ পুষ্টিতে সহায়তা; (২) মৃত্তিকায় বিদ্যমান জৈব ও অজৈব অদ্রবণীয় আবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানকে দ্রবীভ‚ত করে উদ্ভিদের পরিশোষণে সহায়তা; (৩) নানারকম রাসায়নিক পদার্থ যেমন উদ্ভিদ হরমোন (অক্সিন, জিবেরেলিন ইত্যাদি) এবং অন্যান্য বৃদ্ধিকারক নিঃসরণ করে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে।
এছাড়াও এরা নানারকম এনজাইম ও গৌণ রাসায়নিক বিপাকীয় উৎপাদ (যেমন- এন্টিবায়োটিক) নিঃসরণ করে উদ্ভিদকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করে। উল্লেখ্য যে, উদ্ভিদের জিনসমূহের প্রকাশেও এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে উদ্ভিদকে জৈবিক ও অজৈবিক ঘাতসমূহ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
উদ্ভিদ বৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব
বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক এবং জিন সিকোয়েন্সিং দ্বারা শনাক্তকৃত উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে গবেষণাগারে ধানের বীজের অঙ্কুুরোদগম এবং চারার বৃদ্ধিতে পরীক্ষা করা হয়। এ পদ্ধতিতে ধানের বীজ ব্যাকটেরিয়া দ্রবণে একরাত্র ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে  জীবাণুমুক্ত পানি দিয়ে টিস্যু পেপার বা ফিল্টার পেপার ভিজিয়ে পেট্রিডিশে বীজগুলোকে রাখা হয় । এক সপ্তাহ পর ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার ব্যতীত অঙ্কুরিত চারার সাথে ব্যাকটেরিয়া সংযোজিত চারা গাছের তুলনা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায় যে, ব্যাকটেরিয়া সংযোজিত বীজের অঙ্কুুরোদগম হার এবং অঙ্কুরিত চারার মূল ও কাÐের দৈর্ঘ্য এবং ওজন ব্যাকটেরিয়া ছাড়া চারার তুলনায় অনেক বেশি হয়। এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে সর্বোত্তমগুলোকে পরবর্তী গ্রীনহাউজ পরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়।
গ্রীনহাউজ ও মাঠে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার  কার্যকারিতা যাচাইকরণ
গবেষণাগারে পেট্রিডিশে যেসব ব্যাকটেরিয়া সর্বোচ্চ কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে, তাদেরকে প্রথমে গ্রীনহাউজে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ধান গাছের দৈহিক ও ফলন বৃদ্ধিতে কতটুকু প্রভাব আছে, তা পরীক্ষা করা হয়। যেসব ব্যাকটেরিয়া ভালো ফলাফল প্রদর্শন করে, সেগুলোকে বাছাই করে গবেষণা মাঠের উন্মুক্ত পরিবেশে ধান ফসলের দৈহিক বৃদ্ধি, উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদান গ্রহণ এবং ফলন বৃদ্ধিতে এদের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। পরিশেষে, গ্রীনহাউজ এবং মাঠের উভয় পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচিত ব্যাকটেরিয়া কৃষকের মাঠে ধান উৎপাদনে ব্যবহার করে চ‚ড়ান্ত মূল্যায়ন করা হয়। মাঠ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে রাসায়নিক সারের বিকল্প প্রোবায়োটিক সার উৎপাদনের জন্য উচ্চ কার্যকারিতা সম্পন্ন ব্যাকটেরিয়া নির্বাচন করা হয়।
উদ্ভিদ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া থেকে জৈব সোনা সার তৈরিকরণ
বর্তমানে বায়োফার্টিলাইজার বা অণুজীব সার পাউডার অথবা তরল আকারে বাজারজাত করা হয়। অণুজীব সার তৈরির ক্ষেত্রে একক কার্যকারিতা সম্পন্ন ব্যাকটেরিয়া অথবা ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতার একাধিক ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সেক্ষেত্রে, মিশ্রণে ব্যবহৃত ব্যাকটেরিয়ার সহাবস্থান গবেষণাগারে পরীক্ষা করে নিতে হয়। সাধারণত মিশ্র অণুজীব সার অধিক কার্যক্ষম হয়, কারণ অনেকগুলো ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের শিকড়ে বসতি স্থাপন করে একাধিক কার্যকারিতা প্রদর্শন করে। তাছাড়া মাটিতে অবস্থানকারী অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সাথে খাদ্য ও অবস্থানগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। এভাবে স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ (যা কখনো নিঃশেষ হবার নয়) থেকে জৈব সোনা প্রোবায়োটিক সার তৈরি করা হয়। আমাদের গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, এসব সার ব্যবহারে ধান ও অন্যান্য ফসলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ কমানো সম্ভব।
প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াসার ফসলে প্রয়োগ কৌশল
উদ্ভিদের প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগের বিভিন্ন কৌশলের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে এর কার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং মাটিতে গাছের শিকড়াঞ্চলে এর উপস্থিতি টেকসই করা যায়। এদের ব্যবহারের সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বীজ বপনের পূর্বে ব্যাকটেরিয়া দিয়ে বীজের উপর আবরণ (বায়োফিল্ম) তৈরি করা। এজন্য পানিতে ব্যাকটেরিয়া দ্রবণ তৈরি করা হয়। বীজকে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টাকাল ব্যাকটেরিয়া দ্রবণে ভিজিয়ে বায়োফিল্ম তৈরিতে সহায়তা করা হয়। ব্যাকটেরিয়া সংযোজিত বীজ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বপন করা হয়। প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া চারা গাছেও ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে, বীজতলা হতে চারাগাছ শিকড়সহ উত্তোলনের পরে ভালোভাবে শিকড়ের মাটি পরিষ্কার করে ব্যাকটেরিয়ার দ্রবণে সারারাত ভিজিয়ে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। আইবিজিই উদ্ভাবিত জৈব সোনা প্রোবায়োটিক সার ব্যবহারে শতকরা ৫০ ভাগ রাসায়নিক সারের ব্যবহার হ্রাস পায়, ফলে ফসল উৎপাদনে খরচ কমে এবং মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয়। সুতরাং, বাণিজ্যিকভাবে প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন এবং কৃষক পর্যায়ে এদের ব্যবহারে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। য়

১গবেষণা সহযোগী, ইমেইল tofazzalislam@yahoo.com  ; মোবাইল ঃ ০১৭১৪০০১৪১৪, ২সহযোগী অধ্যাপক, ৩পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৬

 


Share with :

Facebook Facebook