কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে

ডঃ মনসুর আলম খান
কোভিড -১৯ এর সম্ভাব্য প্রথমরোগী
Patient Zero সনাক্তের পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে। ২০১৯ সালের ১লা ডিসেম্বর তারিখে চীনের উহান শহরে প্রথম রোগী শনাক্তের পর থেকে বিশ্বব্যাপী ১৯ মে ২০২০ আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ লাখের বেশি। মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের বেশি। আশঙ্কা করা হচ্ছে আরেকটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার। তাছাড়া, আশঙ্কার তালিকায় আছে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা জনিত মৃত্যু। WFPGi মতে ঈড়ারফ-১৯Covid-19  pandemic could now be fusing into a hunger pandemic.International Food Policy Research Institute (IFPRI) তাদের এক প্রতিবেদনে কোবিন-১৯ প্রাদুর্ভাবকে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝড় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, The COVID-19 pandemic has all the makings of a perfect storm for global malnutrition. নজিরবিহীন লকডাউনের প্রভাবে খাদ্য ও কৃষি পণ্য সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। তাছাড়া, আছে রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশংকা। Food and Agriculture Organization এর প্রধান অর্থনীতিবিদ Maximo Torero বলেছেন,The worst that can happen is that  governments restrict the flow of food”| এই প্রেক্ষাপটে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন উভয়েই দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহে বিঘœ ঘটাতে পারে এরকম রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে, ২৯ এপ্রিল ২০২০। বাস্তবতা হলো ২৯ এপ্রিল ২০২০ রাশিয়া গম, ভুট্টা, বার্লি ও আন্যান্য কৃষিজ পণ্য রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এখানে উল্লেখ্য করা যেতে পারে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাশিয়া ৩৫০ লাখ টনের বেশি গম রফতানি করেছে এবং বাংলাদেশ ৫২ লাখ টন গম আমদানি করেছে। বিশ্ব বাজারের এই চাহিদা-যোগান প্রক্রিয়া নিশ্চিত হুমকিতে আছে, করোনার প্রভাবে। এমন সময়ে আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, আগামী দিনগুলোতে আমরা কি খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারব, না করোনা আমাদের ভাতেও মারবে?


করোনা আমাদের আপাতত ভাতে মারতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশে চালের (ঈষবধহ জরপব) মজুদ সে কথাই বলে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আউশ এবং আমন উৎপাদিত হয়েছে যথাক্রমে ৩০ এবং ১৫৫ লাখ টন। চলতি বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ২০৪.৩ লাখ টন। সব মিলিয়ে ৩৮৯.৩ লাখ টন। আমাদের যে স্থায়ী অতিথি, সেই ১০-১১ লাখ রোহিঙ্গাসহ এই এক বছরে ভাতের জন্য বঙ্গদেশে (Human Consumption) দরকার প্রায় ২৫০ লাখ টন চালের। বাকি থাকে ১৩৯.৩ লাখ টন চাল। উৎপাদনের ২৬% হিসেবে গোখাদ্য, পোল্ট্রি, শিল্প কারখানা, অপচয় ইত্যাদি (Non- Human Consumption) খাতে ব্যবহৃত হবে আরও ১০১.২ লাখ টন। বাকি ৩৮.১ লাখ টন চাল থাকবে উদ্বৃত্ত। হিসাবটা কাটায় কাটায় না হলেও গত কয়েক বছর যাবতই গড়ে ৩৫ লাখ টন করে চাল উদ্বৃত্ত থাকছে। এই মুহূর্তে দেশে ৬০-৭০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত আছে। যার সাথে বোরো থেকে যোগ হতে যাচ্ছে আরও প্রায় ৩৮ লাখ টন। দেশের বর্তমান মজুতকৃত চাল দিয়ে আগামী ৭-৮ মাস নিশ্চিত থাকা যাবে। সামনে আসছে আউশ, তারপর আবার আমন। এসব কারণে করোনা আসার আগে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে কিছু চাল বিদেশে রফতানির পথ খোঁজা হচ্ছিল।


আর এখন করোনাকালে চাল রফতানির কথা মুখে নেয়া বাহুল্য। এখন দরকার বোরো ধান ঘরে তোলা। বিশেষ করে হাওরের বোরো ধান। এবছর, আমাদের বোরো আবাদ হয়েছে ৪৭.৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে। তার মাঝে হাওর এলাকায় (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়া এই সাত জেলার নিম্নাঞ্চল) ৪.৪৫ লাখ হেক্টর। ১৯৯৬-৯৭ সাল পর্যন্ত এসকল জমিতে ধানের আবাদ হতো কম। মূলত ১৯৯৮ সাল থেকে হাওরে ব্যাপকভিত্তিক বোরো আবাদ করা হয়। আর এখন দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন হাওরের উপযোগী উন্নত জাত। ১৪০-১৪৫ দিনে পরিপক্ব হয়। ফলনও আগের চেয়ে বেশি। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ ভাগ আসে এসকল হাওড় থেকে। হাওর অধিবাসিদের একমাত্র ফসল এটি। তাই হাওর থাকে আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে। হাওরের ধান ঠিক মত ঘরে উঠানো গেলো কি না এই নিয়ে থাকে সকলের উৎকণ্ঠা। কৃষক, কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, পাইকার, নীতিনির্ধারক সকলেই তাকিয়ে থাকেন হাওরের দিকে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কয়েকদিন এদিক সেদিক হলে তেমন ক্ষতি নেই। কিন্তু হাওরে ভিন্ন। এবারের উৎকণ্ঠা ছিল আরও বেশি। করোনার কারণে।


এবার হাওরে যখন ধান পাকে-পাকে তখনই করোনার আগমন। এমনিতেই ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। এবার লকডাউনের কারণে শ্রমিক পাওয়া নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয়। শেষে সকলের সহযোগিতায় সারা দেশ থেকে বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ থেকে শ্রমিক নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু মূল কাজটি সম্পন্ন করা হয় যন্ত্র দিয়ে। আশেপাশের জেলায় যত হারভেস্টার ছিল, ছিল যত রিপার সব পাঠিয়ে দেয়া হয় হাওরে। করোনাকে ফাঁকি দিয়ে সুনামগঞ্জের শনির হাওরে ব্যস্ত সময় পার করছে জাপানিজ ইয়ানমার কোম্পানির স্মার্ট কম্বাইন হার্ভেস্টার। কৃষক নূরুজ্জামানের ধান ক্ষেতে। আর এভাবে বাংলাদেশ আপাত শঙ্কামুক্ত হয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের হাত ধরে।


আর এজন্য আমাদেরকে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ তিনিই এ অঞ্চলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন কলের লাঙ্গল, মানে ট্রাক্টর। নিজ হাতে সেই ট্রাক্টর চালিয়েছিলেন তিনি। আমাদের পতিসরে। বাংলাদেশে এখন কলের লাঙলের সংখ্যা অগণিত। প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। সারা দেশে এতদিন ছোট বড় হার্ভেস্টার ছিল আনুমানিক ২৪৫০টি এবং রিপার ৫০০০টি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে ২০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছেন সেখান থেকে দেশে যোগ হতে যাচ্ছে আরও প্রায় ১০২৫টি হার্ভেস্টার এবং ৫৫০টি রিপার। এসব যন্ত্রপাতি কিনলেই কৃষক পাচ্ছেন বিরাট অংকের ভর্তুকি। হাওর অঞ্চলের জন্য শতকরা ৭০ ভাগ আর অন্য অঞ্চলের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ। এসবের সাথে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নেয়া হয়েছে মেগা পরিকল্পনা। আশা করা যাচ্ছে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি সজ্জিত হবে নতুন রূপে। আধুনিক সব যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজবে বাংলাদেশের কৃষি।


বর্তমানে করোনাভাইরাসজনিত বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে, কৃষি সংক্রান্ত প্রধান নির্দেশনাটি হচ্ছে “খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অধিক প্রকার ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার করতে হবে। কোন জমি যেন পতিত না থাকে”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সকল নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের জন্য এরই মাঝে মাননীয় কৃষি মন্ত্রী পরামর্শ করেছেন এখাতে অভিজ্ঞজনের সাথে। জুম মিটিং প্ল­াটফর্মে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে,আলোচনা করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, এমিরিটাস অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, একাধিক সাবেক সফলকৃষি সচিব, মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, কৃষি সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞ, বীজ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ বীজ এসোসিয়েশন, শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারক সমিতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ফার্মস, সুপারশপ মালিক সমিতিসহ কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গের সাথে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক এসব মতবিনিময় ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে আশা করা যায়। আগামী দিনগুলোতে বীজ, সার, সেচ ইত্যাদি কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের শর্তাবলি সহজীকরণ ইত্যাদি নানান বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সবাই গুরুত্বপূর্ণ মত দিয়েছেন। যেমনÑ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মতে     কৃষক পর্যায়ে ধানের মূল্য নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি সেচের খরচের প্রণোদনা প্রদান আবশ্যক। শুধু আলোচনা নয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রণয়ন করেছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন ‘করোনা ভাইরাস সারাবিশ্বকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে, এখানে কিন্তু খাদ্যাভাব মারাত্মকভাবে দেখা দিতে পারে। আমদের মাটি উর্বর, আমরা কিন্তু নিজেদের চাহিদা পূরণ করে অনেককে সাহায্য করতে পারব।’ বাংলাদেশের কৃষি এগোচ্ছে সে পথেই।


মুশকিল হলো বাংলাদেশ চাইলেই তার প্রয়োজনীয় সকল কৃষিজ পণ্য উৎপাদন করতে পারবে না। কিছু কৃষিপণ্য আমাদের আমদানিই করতে হবে। যেমন গম। এক-দেড় মাসের শীতকালীন আবহাওয়া গম চাষের উপযোগী নয়। তাই গম চাষ এদেশে লাভজনকও নয়। যদিনা জমি পতিত থাকে। শুধু গম নয়। আরও অনেক পণ্যই আমাদের আমদানি করতে হয়, ভবিষ্যতেও করতে হবে। দেশে উৎপাদিত এবং আমদানিকৃত প্রধান প্রধান কৃষিজ পণ্যের একটা নাতিদীর্ঘ তালিকা দেয়া যেতে পারে।


২০১৮-১৯ অর্থ বছরে দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি-রফতানিকৃত বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের তথ্যঃ
 (তথ্য সূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর)।
তাছাড়া, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ২৬.৫ লাখ টন ভোজ্যতেল। রফতানি হয়েছে কিছু চা, কাঁচা পাট এবং অল্প পরিমানের অন্যান্য কৃষিপণ্য। তথ্যচিত্র থেকে ধারণা করা যায় যে, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে খুব বেশি পরিবর্তন না এলে আগামী বছরেও আমদানির তালিকায় থাকবে গম, ভুট্টা, তেল ও ডাল জাতীয় দানাদার শস্য, পেঁয়াজ ও মসলা। বিগত বছরগুলোতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রণোদনামূলক কর্মসূচির কারণে ভূট্টা, তেল ও ডালজাতীয় দানাদার শস্যের উৎপাদন ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এবছর পেঁয়াজের সংকট মোকাবেলার অভিজ্ঞতা থেকে যোগ হয়েছে কিছু নতুন জাত। কৃষকও পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহিত হবে আশা করা যায়। উৎপাদনের গতিধারা পর্যালোচনা করলে বলা যেতে পারে আগামী বছর আমদানির তালিকার বড় অংশ জুড়ে থাকবে গম, ভোজ্যতেল এবং মসলা।


বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে পারস্পরিক সহযোগিতাই উন্নয়নের চালিকা শক্তি। তাছাড়া, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এত অল্প জমিতে সব ফসল করতে গেলে মূল খাদ্য চালই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। করোনা মোকাবেলার প্রধান হাতিয়ারও বৈশ্বিক সহযোগিতা। জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি Tijjani Muhammad-Bande যেমন বলেছেন,

Moving forward, I encourage all Member States to leverage South-South and Triangular Cooperation in order to strengthen agricultural systems. কৃষিতে করোনার প্রভাব মোকাবেলার জন্য সবাইকে সমভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। IFPRI তাদের এক প্রতিবেদনে কভিড -১৯ উদ্ভূত পুষ্টি সংকট মোকাবেলা করার জন্য কৃষি কেন্দ্রিক সাপ্লাই চেইন এবং ভ্যালু চেইনের সাথে সামাজিক দূরত্ব প্রয়োগ এবং স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাগুলি উন্নত করার উপর জোর দিয়েছেন। খামার থেকে শুরু করে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সকল প্রকার বাজার ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখার তাগাদা দিয়ে বলেছেন, Keep domestic and international food markets working

বাংলাদেশে কৃষির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই বাজার ব্যবস্থাপনা। দুর্বল ব্যবসায়িক নৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কৃষিজ বাজার। সকালের ৫০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ বিকালে হয়ে যায় ১৮০ টাকা। আবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সন্ধ্যায় নেমে আসে ১০০ টাকায়। ওয়াজ-নসিয়ত করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার নজির পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। যদিও কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ দেখাশোনা করার জন্য আছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এই সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবী। নচেৎ কৃষককে বারংবার হোঁচট খেয়েই যেতে হবে দোদুল্যমান বাজার ব্যবস্থার কাছে।


ডিজিটাল বাংলাদেশ আমাদের আশার আলো দেখায়। গত বছর থেকে অন-লাইন অ্যাপ্সের ব্যবহার করা হয়েছে প্রকৃত কৃষক নির্বাচনের জন্য। পরে সরাসরি তাঁদের নিকট থেকে ধান ক্রয় হয়েছে। চারদিকে প্রশংসিত হয়েছে সরকারের এই উদ্যোগ। করোনাকালেও যোগ হয়েছে চমৎকার কিছু আইডিয়া। যেমন ত্রাণের উপকরণে যোগ হয়েছে সবজি, দুধ, ডিম, আলু। কৃষক সবজি বিক্রি করেছেন অন-লাইনে, অ্যাপ্সের মাধ্যমে। কৃষি বাতায়ন পেয়েছে কৃষক প্রিয়তা। জনপ্রিয় এসব ‘Food System Innovations’এর পেছনে কাজ করেছে মাঠ প্রশাসনের তরুণ, মেধাবী, বিচক্ষণ সরকারি কর্মকর্তাগণ।


অবশ্য কৃষি মানেই এখন শিক্ষিত, প্রাণচঞ্চল, সাহসী, উদ্যমী টগবগে যুবক-যুবতীর কর্মস্থল। তাঁদের পদচারণায় মুখর বাংলাদেশের কৃষি। এই সব যুবার হাত ধরেই দেশ আজ ফুলে-ফসলে পূর্ণ। চারদিকে চাল, ডাল, সবজির, ফলের ছড়াছড়ি। বিস্তর মাঠে দোল খায় উচ্চফলনশীল নানান জাতের ফসল। তাঁদের হাত ধরেই বাংলাদেশের কৃষি জয়ী হবে করোনা যুদ্ধে।
করোনা মহামারী বিশ্ব সভ্যতাকে দাঁড় করিয়েছে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি। নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে কৃষি অর্থনীতিতে এর প্রভাব হতে পারে অনেক গভীর। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব আছড়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষিতে। আবার একমাত্র কৃষিই হতে পারে বাংলাদেশের সামষ্ঠিক অর্থনীতির চালিকা শক্তি। করোনা মোকাবেলার হাতিয়ার। তাই কৃষি খাতের যতœ নিতে হবে শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে। গৃহীত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে হবে নিখুঁত ভাবে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের জন্য এ দেশের কৃষক উৎপাদন করত ১০০ লাখ টন চাল। ছিল অভাব, হাহাকার। টাকা দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা যেত না চাল। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি এক সভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান আফসোস করে বলেছিলেন, ‘দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেই আমি চাল কিনতে পারছিনা। চাউল পাওয়াযায়না। যদি চাউল খেতে হয় আপনাদের পয়দা করেই খেতে হবে।’ সেই বাংলাদেশ এখন চালে উদ্বৃত্ত। দেশ থেকে নাই হয়ে গেছে মরা কার্তিক। পালিয়ে গেছে মঙ্গা, ক্ষুধা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ আজ দানাদার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের কৃষকেরা পয়দা করে চলেছেনধান, ভুট্টা, সবজি, ফল। লাখ লাখ টন।
আন্তর্জাতিক বাজার আবারও অস্থিতিশীল হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আসন্ন এই সংকট মোকাবেলায় মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে।‘ এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাকে শিরোধার্য করে। নিশ্চয় একদিন করোনার আধার দূর হয়ে বাংলাদশের আকাশে উঠবে নতুন সোনালী সূর্য। আর সেদিন আমরা গেয়ে উঠবঃ
আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার প্রাণ।।
উপসচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়, মোবাইল : ০১৮২০৮১০৫৭১, ই-মেইল : monsuralamkhan@gmail.com


Share with :

Facebook Facebook