কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

আউশ ধানের আধুনিক জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি

ড. এম. মনজুরুল আলম মন্ডল
বাংলাদেশে তিন মৌসুমে ধানের চাষ করা হয়- আউশ, আমন ও বোরো মৌসুম। বোরো ধান চাষে প্রচুর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহত হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর দিনে দিনে নিচে নামছে যা কাক্সিক্ষত নয়। যেহেতু আউশ ধানের আবাদ বৃষ্টি নির্ভর, সেহেতু এ ধান উৎপাদনে সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। ফলে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রচলিত শস্য পর্যায় পরিবর্তন করে বোরো ধানের চাষ বাদ দিয়ে শস্য পর্যায়ে আউশ ধান অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। তাছাড়া
বর্তমানে অবমুক্তকৃত উচ্চফলনশীল জাতের চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়।  
আউশ ধান দুইভাবে চাষ করা হয়। বোনা আউশ এবং রোপা আউশ। বোনা আউশের জনপ্রিয় আধুনিক জাতসমূহঃ ব্রিধান৪৩, ব্রিধান৬৫, ব্রিধান৮৩ এবং বিনাধান-১৯। রোপা আউশ ধানের আধুনিক জাতসমূহঃ ব্রিধান৪৮, ব্রিধান৮২, ব্রিধান৮৫,  বিনাধান-১৯ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৭।
আউশ ধানের জাতগুলোর বৈশিষ্ট্যসমূহঃ
বিনাধান-১৯ : প্রচÐ খরা সহিষ্ণু হওয়ায় খরা মাটি পছন্দ করে। বোনা ও রোপা উভয় পদ্ধতিতে চাষ উপযোগী। গাছ হেলে পড়ে না। জীবনকাল ৯৫-১০০ দিন। চাল সরু ও লম্বা। ফলন ৪-৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৪৩ : জাতটি বৃষ্টি প্রবন এবং খরা প্রবন উভয অঞ্চরের জন্য উপযোগী। আগাম জাত, জীবন কাল ১০০ দিন। খরা সহিষ্ণু। কাÐ বেশ শক্ত বলে সহজে হেলে পড়ে না। ফলন ৩.৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৪৮ : অধিক ফলনশীল এ জাতটি রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। জীবনকাল ১১০ দিন। কাÐ শক্ত। চাল মাঝারী মোটা ও সাদা। ফলন ৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৬৫ : বোনা আউশ মৌসুমের খরা সহনশীল জাত। গাছ খাটো ও কাÐ শক্ত হওয়ায় হেওে পড়ে না। শীষ থেকে ধান সহজে ঝড়ে পড়ে না। চাল মাঝারী চিকন ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। জীবনকাল ১০০ দিন। ফলন ৩.৫-৪ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৮২ : অধিক ফলনশীল এ জাতটি রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। গাছের উচ্চতা ১১০  সেমি.।  জীবনকাল ১০০-১০৫ দিন। কাÐ শক্ত। চাল মাঝারী মোটা ও ভাত ঝরঝরে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৮৮৩ : বোনা আউশ মৌসুমের খরা সহনশীল জাত। গাছের উচ্চতা ১০০-১০৫ সেমি। কাÐ শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না এমনকি ধান পাকার পরও গাছ হেলে পড়ে না। দানার রং লালচে যা স্থানীয় কটকতারা জাতের অনুরুপ। চাল মাঝারী মোটা ও সাদা এবং ভাত ঝরঝরে। জীবনকাল ১০৫ দিন। ফলন ৪-৫ টন/হেক্টর।
ব্রি ধান৮৫ : অধিক ফলনশীল এ জাতটি কুমিল্লা অঞ্চলসহ দেশের পূর্বাঞ্চলৈ রোপা আউশ মৌসুমের জন্য উপযোগী। জলাবদ্ধতা সহনশীর হওয়ায় আউশ মৌসুমে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকাতেও চাষ করা সম্ভব। গাছের উচ্চতা ১১০  সেমি.। জীবনকাল ১০৮-১১০ দিন। কাÐ শক্ত। চাল মাঝারী লম্বা ও চিকন এবং ভাত ঝরঝরে। ফলন ৪.৫-৫.০ টন/হেক্টর।
ব্রি হাইব্রিড ধান৭ : আউশ মৌসুমে চাষযোগ্য একমাত্র হাইব্রিড ধানের জাত। রোপা আউশ মৌসুমে প্রচলিত অন্যান্য জাতের চেয়ে অধিক ফলনশীন, ফলন ৬.৫-৭০ টন/হেক্টর। গাছের উচ্চতা   ১০০-১০৫ সেমি। কাÐ শক্ত হওয়ায় হেলে পড়ে না। জীবনকাল ১০৫-১১০ দিন। ধানের আকৃতি সরু, লম্বা ও ভাত ঝরঝরে।
বীজ বপন : বোনা আউশের মূল জমিতে বীজ বপন ২৫ মার্চ হতে ২০ এপ্রিল, রোপা আউশের বীজতলায় বীজ বপন ৩০ মার্চ হতে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত উপযুক্ত সময়।
বীজ হার : ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে ১০ কেজি/বিঘা এবং সারিতে রোপনের ক্ষেত্রে ৬ কেজি/বিঘা।
চারার বয়স রোপণ : ১৫-২০ দিন। চারা রোপণ করতে হবে ১৫ এপ্রিল হতে ১০ মে পর্যন্ত।  প্রতি গোছায় ২টি করে ৮ ইঞ্চিদ্ধ৬ ইঞ্চি দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে।
সার ব্যবস্থাপনা  (প্রতি বিঘায়) : ইউরিয়া-১৫ কেজি, ডিএপি-৭ কেজি, এমপি-১০ কেজি, জিপসাম-৫ কেজি এবং দস্তা ০.৭ কেজি। শেষ চাষের সময় ১/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং অন্যান্য সকল সার প্রয়োগ করতে হবে। ২য় কিস্তি ইউরিয়া ৪-৫ টি কুশি দেখা দিলে (সাধারণত রোপনের ১৫-১৮ দিন পর) এবং ৩য় কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৬ দিন পূর্বে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে গন্ধক এবং দস্তার অভাব থাকলে শুধুমাত্র             জিপসাম এবং দস্তা প্রয়োগ করতে হবে। অন্য দিকে, বোনা আউশের ক্ষেত্রে ইউরিয়া সমান দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। ১ম কিস্তি শেষ চাষের সময় এবং ২য় কিস্তি ধান বপনের ৩০-৩৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
আগাছা দমন : সাধারণত হাত দিয়ে, নিড়ানী যন্ত্রের সাহায্যে অথবা আগাছানাশক ব্যবহারের মাধ্যমে ৩০-৩৫ দিন পর্যন্ত আগাছামুক্ত রাখতে হবে। রোপা আইশ ধানের ক্ষেত্রে             প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসাবে বেনসালফিউরান মিথাইল+এসিটাক্লোর, মেফেনেসেট+বেনসালফিউরান মিথাইল ইত্যাদি গ্রæপের আগাছানাশক রোপনের ৩ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। বোনা আউশের জন্য                    প্রি-ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসাবে পেনডামিথাইলিন, অক্সাডায়ারজিল এবং অক্সাডায়াজন গ্রæপের যে কোন আগাছানাশক বপনের ২/৩ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। রোপা/বোনা আউশ ধানের ক্ষেত্রে পোস্ট ইমারজেন্স আগাছানাশক হিসাবে বিসপাইরিবেক সোডিয়াম, বেনসালফিউরান মিথাইল, ডায়াফিমনি, ইথক্সিসালফিউরান এবং ফেনক্সলাম গ্রæপের আগাছানাশক জমিতে আগাছা দেখা যাওয়ার পর প্রয়োগ করতে হবে। পরবর্তীতে  আগাছার অবস্থা বুঝে ৩৫-৪০ দিন পর একবার হাতে নিড়ানী দিতে হবে।
সেচ ব্যবস্থাপনা : চারা লাগানোর সময় বা বীজ বপনের সময় বৃষ্টিপাত না হলে সময়মত চারা রোপণ/বপনের জন্য সম্পূরক সেচ দিতে হবে। সরাসরি বীজ বপনের ক্ষেত্রে জমিতে জো অবস্থা বিরাজমান না থাকলে অংরিত বীজ জমিতে কাদা করে লাইনে/ছিটিয়ে বীজ বপন করতে হবে।
রোগ বালাই ব্যবস্থাপনা : আউশ মৌসুমে সাধারণত খোলপোড়া রোগ, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ, টুংরো এবং বাকানি রোগের প্রকোপ দেখা যায়। খোলপোড়া রোগ দমনের জন্য জমির পানি বের করে দিয়ে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে এমিস্টার টপ/টেবুকোনাজল/ফলিকুর ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। ব্যাকটেরিয়া জনিত পাতা পোড়া রোগের জন্য ৬০ গ্রাম
এমপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট এবং ২০ গ্রাম জিঙ্ক ১০ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করলে ভার ফল পাওয়া যাবে। টুংরো রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেরতে হবে। প্রয়োজনে টুংরোর বাহক সবুজ পাতা ফড়িং দমনে মিপসিন ব্যবহার করা যেতে পারে। বাকানি প্রবন এলাকায় বাকানি রোগ প্রতিরোধে অটিস্টিন নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটারে ২-৩ গ্রাম ১ কেজি বীজে মিশ্রিত কওে শোধন করা যেতে পারে।
পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা : আউশের মুখ্য পোকাগুলো- মাজরা পোকা, পামরি পোকা, থ্রিপস, গান্ধি পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং এবং বাদামি গাছ ফড়িং। পোকা দমনে আলোর ফাঁদ এবং পার্চিং ব্যবহার করতে হবে। মাজরা এবং বাদামি ঘাসফড়িং পোকা দমনের জন্য প্রয়োজনে কার্টাপ গ্রæপের        কীটনাশক সানটাপ ৫০ পাউডার এবং থ্রিপস, সবুজ পাতা ফড়িং ও গান্ধি পোকা দমনের জন্য কার্বোসালফান গ্রæপের কীটনাশক মারশাল ২০ ইসি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ধান কাটা ও মাড়াই : ৮০ ভাগ ধান পাকলে ধান কাটতে হবে। তাড়াতাড়ি মাড়াইয়ের জন্য ধান মাড়াই যন্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। বাদলা দিনে ধান মাড়াই করে সাধ্যমত ঝেরে বৃষ্টিমুক্ত (চালার নীচে) স্থানে ছড়িয়ে দিয়ে শুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে। য়

চীপ সায়েন্টিফিক অফিসার, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ। মোবাইল : ০১৭১৬৭৪৯২৯, ই-মেইল : mmamondal@gmail.com

 


Share with :

Facebook Facebook