কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে নেটেড মেলন চাষাবাদ প্রযুক্তি

ড. মো. আসাদুজ্জামান

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এরপরও প্রতি বছর যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। চাহিদা বাড়লেও প্রতি বছর কমছে চাষযোগ্য আবাদি জমি। একজন মানুষের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজন পরিমিত মাত্রার শাকসবজি ও ফলমূলের। কিন্তু এসব চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি অনেক কম। বিগত এক দশকে সংশ্লিষ্ট সবার চেষ্টা সত্তে¡ও এই ঘাটতি পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায়, গবেষকরা শাকসবজি উৎপাদনের নতুন একটি পদ্ধতি নিয়ে এ দেশে গবেষণা শুরু করেছেন, যা হাইড্রোপনিক্স নামে পরিচিতি।


এই পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য মাটির প্রয়োজন হয় না।  হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে মাটি ছাড়া পানি অথবা মাটিবিহীন সাবস্ট্রেটে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহের মাধমে জন্মানো হয়। এই পদ্ধতিতে গাছ শুধুমাত্র তার শিকড় দিয়ে পুষ্টি সমৃদ্ধ দ্রবণে অথবা বিভিন্ন জৈব, অজৈব পদার্থ যেমন: কোকো-ডাস্ট, কোকো-পিট, পিটমস, পারলাইট, রকউল, গøাসউল ইত্যাদিতে জন্মায়। পৃথিবীতে ফসল জন্মানোর সম্ভবত এটিই সবচেয়ে নিবিড় পদ্ধতি, যেখানে পানি, গাছের পুষ্টি উপাদান ও স্থানের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। দ্রুত বর্ধনশীল ও উচ্চমূল্যের উদ্যানতাত্তি¡ক ফসল যেমন- লেটুস, স্ট্রবেরি, টমেটো ক্যাপসিকাম, মেলন, শশা, বিভিন্ন ধরনের পাতা জাতীয় সবজি ও হার্ব এবং সৌন্দর্য বর্ধনকারী উদ্ভিদ সফলতার সহিত বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন শীত প্রধান দেশ যেমন ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, জাপান, চীন, রাশিয়া এবং কোরিয়াতে এই পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
নেটেড মেলনের ইংরেজী নাম- ঘবঃঃবফ সবষড়হ, বৈজ্ঞানিক নাম-ঈঁপঁসরং সবষড় ৎবঃরপঁষধঃঁং, ঈঁপঁৎনরঃধপবধব পরিবারের একটি মিষ্টি ভক্ষণীয় অংশযুক্ত ফল। এটি আফ্রিকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পাহাড়ের উষ্ণ পাদদেশ প্রধানত ইরান ও ভারত থেকে উৎপত্তি হয়েছে। নেটেড মেলন এক ধরনের ফল, ফলের বাইরের অংশ সবুজ বর্ণের এবং পরিপক্ব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে জালের মতো সরু শক্ত রিন্ট বা জাল থাকে এবং ফলের ভিতরের অংশ সবুজ, কমলা অথবা গাড় কমলা রঙের হয়। সুমিষ্ট এই ফলটি স¦াদ বর্ণ ও সুগন্ধ সমৃদ্ধ এবং প্রচুর পরিমাণে মিনারেল ও ভিটামিন থাকায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মাটিতে এবং হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে নেটেড মেলনের চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।


চাষাবাদ পদ্ধতি : বাংলাদেশে মেলনের বিভিন্ন ধরনের প্রজাতি যেমন মাস্কমেলন, নেটেড মেলন, চিনাল, ক্যান্টালোপ, লামিয়া ইত্যাদি নামে চাষাবাদ হয়ে আসছে। সম্প্রতি বিদেশ হতে নেটেড মেলনের বীজ সংগ্রহ করে সবজি বিভাগ, উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুরে নেটেড মেলন চাষাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বল্প পরিসরে হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে নেটেড মেলন চাষাবাদ হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ একটু বেশি হলেও নিরাপদ, তাজা ফলমূল ও শাকসবজি পাওয়ার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য উৎপাদন পদ্ধতি।


জাত : জাপানের দুইটি জাত চধহহধ, গরুধনর এবং আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা কয়েকটি জাত হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত জাত ও হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়।


সরবরাহকৃত পুষ্টি উপাদানের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য হাইড্রোপনিক্স দ্রবণের অ¤øমান (ঢ়ঐ) ৬.৫ এ রাখা হয়। মেলনের চারা রোপণ হতে ফলন সংগ্রহ পর্যন্ত প্রায় ৩ মাস সময় লাগে। এ ক্ষেত্রে হাইড্রোপনিক্স সলিউশন প্রতি মাসে এক বার নতুন সলিউশন দিয়ে পরিবর্তন অথবা প্রতি সপ্তাহে ইসি মাত্রা পরীক্ষা করে পুষ্টি উপাদান সঠিক মাত্রা ঠিক রাখা হয় হাইড্রোপনিক্স নিউট্রিয়েন্ট সলিউশন তৈরির উপাদানসমূহ সারণি-১ দ্রষ্টব্য।


বীজ বপন ও নার্সারি : হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে নেটেড মেলন উৎপাদানের জন্য প্রথমত বীজ কোকো-ডাস্টে সেলট্রেতে বপন করা হয়। চারা গজানোর পর একসপ্তাহের মধ্যে পানিতে অথবা সেলট্রেতে পারলাইট সার্বসট্রেটে স্থানান্তরিত করে নার্সারি করতে হয়। এতে গাছের দ্রæত বৃদ্ধি ও উন্নয়ন সাধন হয়। নার্সারি অবস্থায় প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে চারা উৎপাদনের জন্য। এতে প্রচুর পরিমাণে শিকড় তৈরি হয় যা হাইড্রোপনিক্স গ্রোবেড বা ট্রেতে লাগানোর উপযোগী হয় ।


হাইড্রোপনিক্স গ্রোবেডে/ট্রেতে গাছ রোপণ : নার্সারি থেকে সবল ও সুস্থ চারা হাইড্রোপনিক গ্রোবেডে অথবা কোকো-ডাস্ট সবস্ট্রেটে রোপণ করা হয়। গাছের গোড়ায় পাটের সুতলি দিয়ে বেধে পেঁচিয়ে উপরে টাঙ্গিয়ে চাষ করতে হয়। গ্রোবেডে ৩০ সেমি. দূরে দূরে একটি করে গাছ লাগানো হয় এবং দুই সারির মধ্যে ৫০ সেমি. দূরুত্ব বজায় রাখতে হয়। গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে সুতলির সাথে পেঁচিয়ে উপরের দিকে বেঁধে সোজা রাখতে হয়। গাছের পুষ্টি উপাদান প্রতি সপ্তাহে ইসি মিটার দিয়ে পরীক্ষা করে পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ ঠিক রাখা হয়। উচ্চ ফলনের জন্য প্রতি মাসে সম্পূর্ণ নিউট্রিয়েন্ট সলিউশন পরিবর্তন করতে হয়। গ্রোবেডে গাছ লাগানোর ৩০-৩৫ দিন পরে স্ত্রী ফুল আসা শুরু করে। উল্লেখ্য যে, স্ত্রী ফুল আসার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই পুরুষ ফুল আসে। গাছের ১০-১৫ নম্বর গিটের যে স্ত্রী ফুল আসে সেগুলেতে উচ্চমানের ফল পাওয়া যায়। একই গাছের বা অন্য গাছে পুরুষ ফুল নিয়ে পাপড়ি ফেলে দিয়ে স্ত্রী গাছের গর্ভদÐে পরাগরেণু ছিটিয়ে পরাগায়ন করা হয়। পরাগায়নের প্রায় একসপ্তাহ পর যখন ফল পিংপং বলের আকার হয় তখন প্রতি গাছে তিনটি ফল রেখে বাকি ফল কেটে ফেলা হয়। পরবর্তী এক সপ্তাহে নেটেড মেলন ফলের বৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়। তখন সর্বোত্তম ফলটি রেখে বাকি দুটি ফল কেটে ফেলা হয়। ফলের বোঁটায় অতিরিক্ত একটি পাটের সুতলি দিয়ে উপরের দিকে তারে বেঁধে দেওয়া হয়। যাতে বাড়ন্ত ফল ছিড়ে না পরে। ফুল ফোটার আট সপ্তাহ পর ফল সংগ্রহ উপযোগী হয়। মধ্যবর্তী পরিচর্যার মধ্যে গাছে সুতলিতে পেচানো ও টেপনার দিয়ে শক্ত ভাবে আটকানো, অপ্রয়োজনীয় শাখা কেটে ফেলা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ফল বৃদ্ধির সময় গাছের নিচের দিকের ৫ টি বয়স্ক পাতা কেটে ফেলা হয়। এতে গাছে উৎপাদিত খাবারের অপচয় কম হয়। এছাড়া  গাছের ২৫ নম্বর গিটের উপরে গাছের আগা কেটে অঙ্গজ বৃদ্ধি রহিত করা হয় এতে উৎপাদিত খাবার ফলে জমা হয় এবং ফলন বৃদ্ধি করে।


রোগ-পোকামাকড় দমন : হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করতে হবে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাইড্রোপনিক্স ফসল উৎপাদন করা হয় তাই রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ হয় না বললেই চলে। তবে কোনো কারণে নেটেড মেলন গাছ রোগ ও পোকামাকড় আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে  সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হয়। অতিরিক্ত আপেক্ষিক আর্দ্রতার কারণে পাউডারি মিলডিউ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ দেখা মাত্র উপযুক্ত বালাইনাশক নির্দেশিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। নেট হাউজ বা সেমি গ্রিন হাউজে নেটেড মেলন গাছের বৃদ্ধির শেষের দিকে যখন ফল বর্ধনশীল হয় তখন জাবপোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে কোনো সিস্টেমেটিক কীটনাশক প্রয়োগ করে আক্রমণ দমন করা যায়।


ফল সংগ্রহের সময় : সাধারণত ফুল ফোঁটার আট সপ্তাহ পরে ফল সংগ্রহ উপযোগী হয়। সময় পরিপক্ব ফলের বোঁটা শুকাতে শুরু করে এবং বোঁটায় চিকন ফাটল দেখা যায়। ফল সংগ্রহ করে পরে ঘরের তাপমাত্রায় ঠাÐা জায়গায় রাখতে হবে। নেটেড মেলন একটি ঈষরসধপঃবৎরপ ফল এজন্য পাকতে বা ভক্ষণ উপযোগী হওয়ার জন্য ৪-৭ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। এতে ফলের মধ্যে পাকার জন্য ইথিলিন হরমোন উৎপাদিত হয়ে শ্বসন বেড়ে যায় এবং ফল পাকে।
ফলন : উচ্চ গুণাগুণ সম্পন্ন নেটেড মেলন উৎপাদনের জন্য গাছ প্রতি একটি ফল রাখতে হয়। তবে অধিক মুনাফার জন্য একটি গাছে ২-৩ টি পর্যন্ত ফল রাখা যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, গাছপ্রতি ফলের সংখ্যা নেটেড মেলনের জাতের উপরও নির্ভর করে। এক একটি ফলের ওজন সাধারণত ১.৫-২.৫ কেজি পর্যন্ত হয়।


বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফলস উৎপাদনের প্রধান অন্তরায় হলো বাণিজ্যিক গ্রেডের রাসায়নিক সারের প্রাপ্যতা। অধিকিন্তু হাইড্রোপনিক্স পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্ট্রাকচার তৈরি করতে প্রাথমিক খরচ একটু বেশি হয় ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য নয়। তবে বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক্স  পদ্ধতিতে উচ্চ মূল্যের সবজি ফল অমৌসুমে উৎপাদনে করা সম্ভব। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় উৎপাদনের সহজলভ্যতা ও স্বল্প ব্যয়ের হাইড্রোপনিক্স  স্ট্রাকচার তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, দেশের তরুণ ও শিক্ষিত যুবকেরা এই পদ্ধতিতে ওঈঞ ও ওড়ঞ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক কৃষিতে অত্যন্ত আগ্রহী বিধায় নেটেড মেলনসহ অন্যান্য উদ্যানতাত্তি¡ক ফসল উৎপাদন লাভজনক হবে। অধিকিন্তু এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফল নিরাপদ ও ভেজাল না হওয়ায় ক্রেতারা অধিক মূল্য দিয়ে কিনতে আগ্রহী হবে। য়

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সবজি বিভাগ এবং ড. ফেরদৌসী ইসলাম, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সবজি বিভাগ উদ্যানতত্ত¡ গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, গাজীপুর, মোবাইল নম্বর: ০১৭১৮১৩১৫৪৫, ই-মেইল:  asadcbt@yahoo.com

 


Share with :

Facebook Facebook