কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনায় যান্ত্রিকীকরণ

কমর-উন-নাহার

কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মাছ। মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য আজ বিশ্ব পরিমÐলেও স্বীকৃত। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের তৃতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে পঞ্চম (ঋঅঙ-২০১৮)।
বর্তমান বাংলাদেশে মানুষের জনপ্রতি দৈনিক গড়ে ৬২.৫৮ গ্রাম (বিবিএস এর তথ্য মতে) মাছ খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করছে। দেশের মোট জিডিপির ৩.৫৭ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির এক চতুর্থাংশের বেশি (২৫.৩৫ শতাংশ) মৎস্য খাতের অবদান। (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮) দেশের রপ্তানির আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মৎস্য খাত থেকে । দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের অধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে এ সেক্টরের সাথে জড়িত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। মাছ চাষ একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় খাত হওয়ায় সাধারণ জনগণসহ দেশের বিভিন্ন বিনিয়োগকারীরা মৎস্যখাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়ে বিনিয়োগ করছে।
বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি খাত কৃষি খাত। কৃষি খাতে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার  আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার উপর জোড় দিয়েছে। দ্রæত সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের যান্ত্রিকীকরণ করা হয়েছে। কৃষিতে শ্রমিক সংকট লাঘবের জন্য সহজে ব্যবহার্য ও টেকসই কৃষি যন্ত্রপাতি সুলভে সহজ প্রাপ্য করার অঙ্গিকারের মাধ্যমে কৃষি খাতকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে। তাই মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একই পুকুরে  সর্বোচ্চ উৎপাদন পেতে মৎস্য খাতকে যান্ত্রিকীকরণে কোন বিকল্প নাই। মৎস্য খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে আমরা মাছের অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারি। বাংলাদেশের মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা এখনো অনেকাংশে সনাতন ও অদক্ষ শ্রমিকের উপর নির্ভরশীল। যার ফলে মাছের উৎপাদন কম হয়। চাষি আর্থিকভাবে লাভবান কম হয় ফলে মাছ চাষে চাষি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবারহের আওতায় এসেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে মৎস্য খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করে অধিক উৎপাদন করা সম্ভব। এতে চাষী তার উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অধিক লাভবান হবে, দেশও আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হবে এবং অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে। মৎস্য খামারে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় সেগুলোর একটি বর্ণনা নি¤েœ দেওয়া হলো  :  
পানির বিভিন্ন গুণাগুন পরীক্ষার যন্ত্রপাতি : মাছ চাষের পূর্বশর্ত পুকুরের পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা।  পানির বিভিন্ন প্যারামিটারগুলো যেমন : অক্সিজেন, চঐ, অ্যামানিয়া নাইট্রেট, তাপমাত্রা এসব উপাদান মাছ চাষে পুকুরে অনেক সময় বিভিন্ন কারণে কম বেশি হয় এবং পানির পরিবেশ বিপর্যয়ের মাধ্যমে মাছ মারা যায়। এতে খামারির বড় ধরণের ক্ষতি হয় কিন্তু ডিজিটাল মেশিনের মাধ্যমে এই সমস্যা শনাক্তকরণ ও এর পরিমাণ সর্ম্পকে জানা যায়। সেই অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে চাষি বড় ধরণের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। পানির গুনাগুন সঠিক মাত্রায় রাখার জন্য যে সমস্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় যেমন : অ্যারেটর ও বেøায়ার এ যন্ত্র ব্যবহার করে পানির গুণাগুণ স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা যায় এবং মৎস্য খামারের জৈবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
মাছের খাবার তৈরির (ডুবন্ত ও ভাসমান) পিলেট মেশিন : মাছ চাষ ব্যবস্থাপনায় যে খরচ হয় তার সিংহভাগই চলে যায় মাছের সম্পূরক খাদ্য ক্রয়ে। এই খরচের পরিমাণ প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ । অনেক সময় সঠিক গুণগত মানস¤পূন্ন খাদ্য না পাওয়ায় চাষির উৎপাদন হ্রাস পায় এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। চাষী যদি ছোট আকারের ডুবন্ত ও ভাসমান খাদ্য তৈরীতে পিলেট মেশিন ব্যবহার করে তবে সে সঠিক গুনগত মান সম্পন্ন পুষ্ঠিকর খাদ্য কম খরচে তৈরী করতে সক্ষম হবে। সেক্ষেত্রে সম্পূরক খাদ্য বাবদ খরচ অনেক কমে যাবে।
খামারে খাদ্য প্রয়োগ যান্ত্রিকীকারণ : পুকুরে মাছের খাদ্য প্রয়োগ ব্যবস্থা যদি যান্ত্রিকীকরণ করা যায় তবে খাদ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে নির্ধারিত পরিমাণ খাদ্য প্রয়োগের কথা থাকলেও অনেক সময় চাষিদের অদক্ষতা এবং অস্বচ্ছতার কারণে তারা পুকুরে খাদ্য প্রয়োগে সঠিক নিয়ম না মেনেই পুকুরে তাদের ইচ্ছামতো খাদ্য প্রয়োগ করে থাকে। কখনো খাবারের স্বল্পতা আবার কখনো অধিক খাবার প্রয়োগের কারণে তা নষ্ট হয়ে পুকুরের পানিতে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি করে মাছের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। পরবর্তীতে চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার পুকুরে সমানভাবে খাদ্য প্রয়োগ না করার ফলে সঠিকভাবে সব মাছ খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না যার কারণে মাছের আকারের তারতম্য দেখা যায় এবং মাছের উৎপাদন হ্রাস পায়। অটোমেটিক ফিশ ফিডার (অঁঃড়সধঃরপ ঋরংয ঋববফবৎ) ব্যবহারের মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করা যায়। এটি একটি প্রোগ্রামকৃত যন্ত্র। যার মাধ্যমে নিদিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পরিমাণ খাবার সুষম দূরত্বে সমহারে পুকুরে প্রয়োগ করা যায়। এতে সকল মাছের খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। উৎপাদন বৃদ্ধি পায় । বর্তমানে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ মৎস্য খামারে ফিশ ফিডার ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গসহ বেশ কিছু জেলায় যেমন : খুলনা , বাগেরহাট, ময়মনসিংহ , কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্চ, মৌলভী বাজার, যশোর , চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ চাষিরা এই মেশিন ব্যবহার করছে। অটোমেটিক ফিশ ফিডার স্থাপন করে মাছের খাদ্য প্রয়োগের হার কমাতে সক্ষম হয়েছেন অন্যদিকে খামারের পানি দূষণের পরিমাণও হ্রাস করতে পারছেন। এ যন্ত্রটি ২-১৮ মিটার দূরত্বে ১৩০ ডিগ্রি কোণ পর্যন্ত খাবার পৌছে দিতে সক্ষম। যার ফলে অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করা সম্ভব।
অ্যারেশন ব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ : মাছ চাষের পূর্বশর্ত পুকুরের পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা। পানির পরিবেশ অনুক‚লে থাকলে মাছ চাষের অধিকাংশ ঝুঁকি হ্রাস পায়। অ্যারেশনের মাধ্যমে আমরা এ কাজটি করতে পারি। পুকুরে মাছের অতিরিক্ত খাদ্য, মাছের মলমূত্র এবং বিভিন্ন  জৈব পদার্থ তলদেশে জমে পঁচে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকারক গ্যাসের সৃষ্টি করে। অ্যারেশনের ফলে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ফলে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে এবং ক্ষতিকারক জৈব পদার্থ ভেঙে পুষ্টি উপাদান পানিতে মুক্ত করে  যা মাছের জন্য খুবই উপকারী। অন্যদিকে অ্যারেশন ব্যবস্থা কম হলে পুকুরের তলদেশে জৈব পদার্থ পঁচে ক্ষতিকারক গ্যাস অ্যামনিয়া, হাইড্রোজেন      সালফাইড, কার্বন-ডাই-অক্সসাইড তৈরি করে। যার ফলে মাছ মারা যেতে পারে। অ্যারেশনের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো   সমাধান করা যায় । অনেক সময় মেঘলাদিনে, ভ্যাকসা     আবাহাওয়ায়. বৃষ্টির দিনে পুকুরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিলে পুকুরের সব মাছ মরে চাষির বিপুল ক্ষতি হয়ে যায়। পুকুরে অ্যারশন ব্যবস্থা থাকলে চাষিরা অতি সহজে এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। অ্যারশনের মাধ্যমে পানির পরিবেশ উন্নয়ন, ক্ষতিকারক এ্যালজি বøুম, মাছের রোগের প্রাদুর্ভাব হ্রাসসহ সর্বোপরি পুকুরের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে অধিক ঘনত্বে মাছ চাষ করা যায়। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের অ্যারেটার পাওয়া যায় এগুলো বিদ্যুৎচালিত এবং যেখানে বিদ্যুৎ নেই সেখানে ব্যবহারের জন্য সোলার এ্যারেটরের ব্যবস্থা আছে। যেসব এ্যারেটার ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্যাডেল হুইল এ্যারেটর, রুট বেøায়ার, সার্জ এ্যারেটর, সুপার এ্যারেটর, টারবাইন এ্যারেটর, ভেনচ্যুরি এ্যারেটর, জেট এ্যারেটর, সাবমারসিবল টারবাইন এ্যারেটর, তবে অধিক ঘনত্বে মাছ চাষের ক্ষেত্রে রুট বেøায়ার ও প্যাডেল হুইল সমন্বিত ব্যবহার করা হয়। প্যাডেল হুইল ও রুট বেøায়ার এ্যারেটর দুই ধরনের যেমন : ১ সিঙ্গেল ফেইজ (১৮০-২৪০ ভোল্ট ) ২ । থ্রি ফেইজ (৩৮০-৪৪০ ভোল্ট) সিঙ্গেল ফেইজ এ্যারেটরের ব্যবহার বেশি। কারণ বেশিরভাগ খামারে    ১৮০-২৪০ ভোল্ট বৈদ্যুতিক সংযোক দেওয়া থাকে। আমাদের দেশে উত্তর আঞ্চলসহ অনেক জেলাতেই চাষিরা খামারে এ্যারিটর ব্যবহার করছে।  
মাছ চাষ যান্ত্রিকীকরণের ফলে মাছের পুকুরে ক্ষতিকারক এ্যান্টিবায়োটিক, এ্যাকুয়া মেডিসিন, নানান ধরনের এ্যাকুয়া কেমিক্যাল ব্যবহার প্রয়োজন পরে না। এতে চাষির অর্থ খরচ কমে আসে এবং কেমিক্যাল মুক্ত নিরাপদ মাছ উৎপাদন করে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দিতে পারে। তাছাড়া অন্যান্য যন্ত্রপাতি যেমন জেনারেটর, পশু পাখির তাড়ানোর যন্ত্রপাতি, মোবাইল ইন্টারনেট, সিসি টিভি ইত্যাদি সংযোগের মাধ্যমে অটো মেশন করে খামার মালিক খামারটি নজরদারিতে রাখতে পারেন। য়
মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিস, সোনারগাঁ, নারায়াণগঞ্জ ।


Share with :

Facebook Facebook