কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ফল চাষে নিরাপদ বালাই ব্যবস্থাপনা

ড. মোঃ জুলফিকার হায়দার প্রধান
ফল বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যানতাত্তি¡ক ফসল। এদেশে ৭০ প্রজাতির ফল উৎপাদিত হয় যা ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সর্বোত্তম উৎস এবং এতে ক্যানসার প্রতিরোধী এন্থোসায়ানিন ও লাইকোপেন রয়েছে।একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন কিন্তু বাংলাদেশে মাথাপিছু ফল গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ৭৮ গ্রাম। ক্ষতিকর পোকা মাকড়ের আক্রমণে মাঠে ফল ফসলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। দেশের অধিকাংশ কৃষক এসব ক্ষতিকর পোকা মাকড় দমনে দীর্ঘস্থায়ী বালাইনাশক প্রয়োগ করেন এবং বালাইনাশকের অপেক্ষমাণ সময় শেষ হওয়ারপূর্বেই ফলসংগ্রহ ও বাজার জাত করেন। যেহেতু ফল সরাসরি ভক্ষণ করা হয় এজন্য বালাইনাশক নির্বাচন ও প্রয়োগের সময় সঠিক না হলে এর অবশিষ্টাংশ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় ক্ষতি কর পোকামাকড় হতে ফল ফসল রক্ষার জন্য এদের আক্রমনের ধরন ও পরিবেশবান্ধব সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা অত্যন্ত জরুরি। নি¤েœ ফল ফসলের প্রধান প্রধান পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং এদের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো
আমের হপার পোকা : নিম্ফ ও পূর্ণবয়স্ক পোকা কচিপাতা, মুকুল এবং গাছের কচি অংশ থেকে রস চুষে খায়। কচি পাতায় দাগ পড়ে, মুকুল ঝরে পড়ে এবং কোন ফল হয় না। এরা আঠালো মধু রস নিঃসৃত করে, পরবর্তীতে এতে সুটি মোল্ড ছত্রাক জন্মে কালো বর্ণ ধারণ করে। আক্রান্ত গাছের নিচ দিয়ে হাটলে পোকা লাফিয়ে গায়ে পড়ে।
ব্যবস্থাপনা
বাগান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, গাছ ঘন ভাবে না রাখা। পোকা দমনে ইমিডাক্লোপ্রিড (কনফিডর@০.২ গ্রাম/লিটার) দুইবার স্প্রে করা। প্রথম স্প্রে গাছে মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে এবং দ্বিতীয় স্প্রে এক মাস পর ফলের আকার মার্বেলের মতো হলে।
কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা : সদ্যজাত লার্ভা মাটির ভেতরে ঢুকে গাছের শিকড় খায়। পরবর্তীতে এরা কচিপাতা চেঁছে খায়। আক্রান্ত পাতায় শুকনা কালো বা কালচে বাদামি দাগ দেখা যায়। মোচা বের হওয়ার পর এরা কচি কলা আক্রমণ করে।  আক্রান্ত কলার গায়ে দাগ দেখা যায়, বাজার মূল্য কমে যায়। মুড়ি ফসল এবং বর্ষা মৌসুমে আক্রমণ বেশি হয়।
ব্যবস্থাপনা
কলার মোচা পলিথিন ব্যাগ দ্বারা  ঢেকে দেয়া। কলার মোচা বের হওয়ার সাথে সাথে ও ছড়িতে কলা বের হওয়ার পূর্বেই ৪২ ইঞ্চি লম্বা ও ৩০ ইঞ্চি প্রস্থের দুমুখ খোলা একটি পলিথিন ব্যাগের এক মুখ মোচার ভেতর ঢুকিয়ে বেঁধে দেয়া ও অন্য মুখ খোলা রাখা। বাতাস চলাচলের জন্য পলিথিন ব্যাগে ২০-৩০টি ছোট ছোট ছিদ্র রাখা।
কুলের ফল ছিদ্রকারী উইভিল পোকাঃ সদ্যজাত লার্ভা কচি ফলের বর্ধনশীল বীজে আক্রমণ করে এবং সম্পূর্ণ বীজ খেয়ে ফেলে, ফলের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। বীজ খাওয়ার পর পূর্ণবয়স্ক পোকা ফলে গোলাকার ছিদ্র করে বের হয়ে আসে। এরা অমৌসুমের ফলেও আক্রমণ করে বংশবিস্তার করে থাকে। গাছে পরাগায়নের পর গাছে ফল ধারন শুরু হলেই এদের আক্রমণ চোখে পড়ে।
ব্যবস্থাপনা
আগাছা পরিষ্কার রাখা, গাছে অসময়ের ফুল ও কুঁড়ি নষ্ট করা, গাছে ও মাটিতে পড়া আক্রান্ত ফল পোকাসহ ধ্বংস করা, পরাগায়নের পর ফলধারণ শুরু হওয়ার সময় প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৪ মিলি ট্রেসার অথবা প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১২ মিলি হারে সাকসেস স্প্রে করা।
পেয়ারার মাছি পোকা : স্ত্রী মাছি পোকা ফলের খোসার উপর ডিম পাড়ে। সদ্যজাত লার্ভা ফল ছিদ্র করে ভিতরে প্রবেশ করে শাস খায়। আক্রান্ত পেয়ারা পঁেচ যায়, ঝড়ে পরে এবং ফলের ভেতর পোকার লার্ভা দেখা যায়।
ব্যবস্থাপনা
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, ফল মার্বেল আকৃতি হওয়ার পর ছিদ্রযুক্ত পলিথিন অথবা বাদামি কাগজের ব্যাগে আবৃতকরন ও ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার।
লিচুর ফল ছিদ্রকারী পোকা ঃ স্ত্রী পোকা বাড়ন্ত ফলের বোটার কাছে খোসার নিচে ডিম পাড়ে। সদ্যজাত লার্ভা বোটার নিকট দিয়ে ফলের ভেতরে ঢুকে কচি বীজ ছিদ্র করে খায়। ছিদ্রের মুখে করাতের গুঁড়ার মতো মিহি গুঁড়া দেখা যায়। ফল খাওয়ার অনুপযোগী ও ফেটে যায়।
ব্যবস্থাপনা
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ, আক্রান্ত ফল লার্ভাসহ নষ্ট করা, ফলের থোকা মশারীর নেট অথবা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া।
আমড়ার পাতার বিটল পোকা ঃ লার্ভা ও পূর্ণ বয়স্ক পোকা ব্যাপকভাবে গাছের পাতা ও কচি নরম ডগা খেয়ে ফেলে। অতিরিক্ত আক্রমণে গাছ পাতা শূন্য হয়ে পড়ে, গাছের বৃদ্ধি ও ফলধারন ব্যহত হয়।
ব্যবস্থাপনা
হাত দিয়ে পোকা ধরে মেরে ফেলা, গাছের নিচে পড়ে থাকা পাতা নষ্ঠ করা, প্রাথমিক অবস্থায় লার্ভা গুচ্ছাকারে পাতায় অবস্থান করে এ সময়ে লার্ভাসহ আক্রান্ত পাতা নষ্ট করা।
কাঁঠালের ফল ছিদ্রকারী পোকা ঃ পোকারলার্ভা ফলের ত্বক ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে ফলের শাষ খায়। আক্রান্ত ফল ফেটে বা বেঁকে যায়। আক্রান্ত অংশে বৃষ্টির পানি ঢুকে পচন সৃষ্টি করে।
ব্যবস্থাপনা
অপ্রয়োজনীয় ডাল পালা ছাটাই ,আক্রান্ত পুষ্পমঞ্জুরি ও ফল নষ্ট করা, কচি অবস্থায় কিছু ফল পাতলা করা ও বাড়ন্ত ফল পলিথিন অথবা পেপার ব্যাগ দ্বারা ঢেকে দেয়া।
লেবুর সাইলিড বাগ ঃ পূর্ণবয়স্ক পোকাও নিম্ফ পাতা, মুকুল ও কচিশাখা থেকে রস শোষণ করে। আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে যায় ও ঝরে পড়ে। এরা এক ধরনের সাদা মোমের মত পদার্থ নিঃসরন করে যাতে কালো মোল্ড জন্মে। এরাগাছে গ্রিনিং রোগছড়ায়। বর্ষায় এদের আক্রমণ বেশি হয়।
ব্যবস্থাপনা
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ , আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট করা ও বিভিন্ন উপকারী পোকা যেমন- লেডিবার্ড বিটল এর বংশ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা।
ডালিমের ফল ছিদ্রকারী পোকাঃ স্ত্রী পোকা ফলের গায়ে ডিম পাড়ে। সদ্যজাত লার্ভা ফলে প্রবেশ করে শাস খায়, পিউপায় পরিণত হওয়ার পূর্বে ফল ছিদ্র করে বের হয়ে আসে। আক্রান্ত ফল পচে যায় এবং ঝরে পড়ে। ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এবং ফলের আকার মার্বেলের মতো অবস্থায় পাতলা কাপড় বা কাগজ বা ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগে আবৃত করা।
পেঁপের ছাতরা পোকা : নিম্ফ এবং পূর্ণবয়স্ক পোকা গাছের বৃদ্ধি প্রাপ্ত অংশ পাতা, ডগা, ফুল এবং ফল থেকে রস চুষে খায়। পাতার আকার ছোট রং নষ্ট হয়। অত্যধিক আক্রমণে পাতা, ফুল কচিফল ঝরে যায়। গাছ দুর্বল ও খর্বাকৃতি হয়, ফল ধারণ ব্যাহত হয় এবং ফলন কমে যায়।
ব্যবস্থাপনা
পোকাসহ আক্রান্ত অংশ নষ্ট করা। আক্রান্ত পূর্ববর্তী ফসলেরঅবশিষ্টাংশ নষ্ট করা, জমি আগাছা মুক্ত রাখা,পিপড়ার আবাস স্থল নষ্ট করাও  লেডিবাড, সিরফিডফ্লাই, গ্রিনলেস উইং প্রভৃতি উপকারী পোকার বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।
নারিকেলের মাকড় : এরা কচি ফলের খোসার নিচে অবস্থান করে, কচি ডাব থেকে রস চুষে খায়, ফলের গায়ে বাদামি দাগ পড়ে ও ঝড়ে যায়। অতিরিক্ত আক্রমণে নারিকেল ফেটে পানি বের হয়ে যায়। নারিকেল বড় হওয়ার সাথে সাথে শুকনো অংশও বৃদ্ধি পেতে থাকে, ফলের বাজারমূল্য কমে যায়।
ব্যবস্থাপনা
শীতের আগে আক্রান্ত ফুলসহ ৬ মাস বয়স পর্যন্ত সকল ফল কেটে আগুনে ঝলসানো, গাছের মাথায় কাঁদি সংলগ্ন এলাকায় মাকড়নাশক ভার্টিমেক বা ওমাইট ১.৫ গ্রাম/লিটার হারে কঁচি পাতাসহ স্প্রে করা,  প্রথমবার স্প্রে করার পর গাছে ফল আসলে সেই ফলের বয়স ২ মাস হলে দ্বিতীয়বার স্প্রে করা এবং গাছে সংগ্রহের উপযোগী ডাব/নারিকেল থাকলে তা সংগ্রহ করে আগের নিয়মে আবার ¯েপ্র করা। য়
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কীটতত্ত¡)  বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সেউজগাড়ী, বগুড়া, মোবা: ০১৭১৬০৭১৭৬৪, ই-মেইল :zulfikarhaider@yahoo.com


Share with :

Facebook Facebook