কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কোভিড-১৯ : নগর কৃষির গুরুত্ব ও ফল চাষ

অধ্যাপক এ এইচ. এম. সোলায়মান, পিএইচডি

নগর কৃষিতে ছাদ বাগান নিয়ে বিভিন্ন রকম ফোন আসে। একজনের কথার কিছু অংশ আপনাদের সাথে শেয়ার করছি : আমি প্রায় ১০০০ ঘণ্টা ইউটিউব, গুগল সার্চ করে নগর কৃষি ও ছাদ বাগান সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেছি এবং আমি আমার বাসার ছাদে ও পুরান বাড়ির আশেপাশে ফল-সবজি লাগাতে চাই। আমার মা ও শিশুরা যাতে নিজেরা নিজেদের ফল নিজেরা পেড়ে খেতে পারে। একটু একটু আধুনিক বিষয় শিখে রপ্ত করে শুরু করতে চাই। তাই আপনার পরামর্শ নিতে আপনাকে কল করেছি। উনি আরো শিখতে চান, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চান আরো জেনে শিখে কাজ করতে চান, তার পরিকল্পনামাফিক সাফল্যজনক ভাবে বাগান করা হয়তো সহজ হবে। আর একটা বিষয় পরিষ্কার করি যে, সঠিকভাবে ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং শহুরে কৃষি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে ছাদ-বাগান করলে ছাদের ক্ষতিতো হয়ই না বরং টেকসই সবুজ আচ্ছাদন অক্সিজেন সরবরাহ করে আপনার বাসস্থান-অফিস ও প্রতিষ্ঠানকে আরো আরামদায়ক ও শান্তিময় রাখবে।
এখন ফল মৌসুম এবং যে কোন বৃক্ষ রোপণের উপযুক্ত সময়। করোনা পরিস্থিতিতে অবসর সময় কাটানোর খুবই আশাব্যঞ্জক বিষয় ছিল বাগান পরিকল্পনা ও সৃজন করা। গত প্রায় আড়াই মাসে এই করোনা বা কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে, তার মধ্যে শহর ও গ্রামের সকল মানুষ একটা বিষয় বুঝেছে যে, নিজের প্রয়োজনীয় খাবার, ফল-সবজি নিজে আবাদ করতে পারলে নিজের নিরাপদতা নিশ্চিত করে যতটুকু খালি জায়গা তাতে অল্প পরিমাণে হলেও ফল-ফসল উৎপাদন সবচেয়ে জরুরী।
 নগর কৃষি ও ছাদ বাগান নিয়ে কাজ করা সংগঠন গুলোর সাথে কথা বলে জানা যায়, এই করোনা পরিস্থিতিতে অন-লাইনে বাগান করার উপকরণ বিক্রি সন্তোষজনক ছিল যদিও অন্য সকল ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ছিল হতাশার। তাই আমরাও আশা করছি আগামী দশকে নগরকৃষি ও ছাদ বাগান তৈরী আরো বাড়বে।
 একটি কথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আগামী দশক হবে বাণিজ্যিক নগর কৃষি উৎপাদন ও নগর কৃষির আধুনিক কলাকৌশল রপ্ত করা। ঢাকা শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দশ লক্ষ ছাদ রয়েছে তার সাথে রয়েছে অব্যবহৃত পরিত্যক্ত খালি ও উন্মুক্ত বা আবদ্ধ জায়গা  যেখানে বাসস্থান, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ব্যাংক, শপিংমল, কনভেনশন সেন্টার ইত্যাদি বেশী। বিল্ডিং কোডে ২০% সবুজ থাকার কথা থাকলেও মানার ও দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।  করোনা পরিস্থিতিতে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এবং শহরবাসীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় নিলে ফল চাষ সবসময় অত্যাবশ্যকীয়।  
একটি গবেষণায় জানা যায়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে হার তাতে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন উন্নত দেশে ৭০% এবং বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে ১০০% ভাগ বাড়াতে হবে। যেহেতু জমির পরিমাণ কমছে এবং সকলের চাহিদা বাড়ছে তাতে উলম্ব বা ভার্টিক্যাল ফার্মিং ও বাণিজ্যিকভাবে শুরু করার পরিকল্পনা এখনই নিতে হবে। নগরে সবুজের পরিমাণ বাড়ছে, উপযুক্ততা অনুযায়ী পুষ্টি পাওয়ার বিষয়টি গুরুত¦ সহকারে ভাবতে হবে এবং তা করার সময় এখনই। তাই নগরে ফল ও সবজি চাষের জন্য ছাদ-বাগানসহ নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল নগরে টেকসইকরণের সাথে সাথে উপকরণ সহজলভ্য ও জনপ্রিয় করতে হবে।
বাণিজ্যিক উলম্ব চাষাবাদ
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, সুউচ্চ ৩০ তলা ভবনে ২৭,৮০০০,০০০ বর্গমিটার ভার্টিক্যাল ফার্ম স্থাপন করা যায় যা দিয়ে ৫০,০০০ মানুষকে খাওয়ানো যাবে যেখান থেকে প্রত্যেক জনকে ২০০০ ক্যালরি প্রতিদিন দেয়া সম্ভব। সুতরাং, বলাই যায়, ভবিষ্যৎ এর জন্য একমাত্র মাধ্যম হবে নগর ভার্টিক্যাল কৃষি ফার্ম।  আরো উল্লেখ্য যে, বর্তমান ভূমি কৃষির যে সকল সমস্যা যেমন- পরিবহন সমস্যা, সংরক্ষণ সমস্যার মতো কোন সমস্যাই নগর কৃষিতে থাকতো না। কারণ নগর কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের ফলে প্রত্যেক ফার্ম থেকে ফ্রেশ ফল বা সবজি সরাসরি বাজারজাত করা যাবে যেখানে ডিজাইনার, প্রকৌশলী, পুষ্টিবিদসহ অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং এতে একদল দক্ষ জনশক্তি তৈরী করা স¤ভব হবে।    
বাণিজ্যিক নগর কৃষি আরো টেকসই করা সম্ভব কারণ এত সেচের পানির অপচয় ৪০-৬০% কমিয়ে এনে ৩-৪ গুন ফলন বাড়ানো যায় যেখানে মাটি বিহীন হাইড্রোপনিক ছাড়াও অন্যান্য অনেক গ্রোয়িং মিডিয়া পাওয়া যায় শুধু জানার চেষ্টাটা বাড়াতে হবে। এখন  পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ পানিকে অটোমেটিক এবং জলবায়ূ-নিয়ন্ত্রিত বিল্ডিং এ সংরক্ষণ করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। যদিও আধুনিক এই প্রযুক্তির ইনডোর ভার্টিক্যাল ফার্মিং এ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের কারণে এককালীন খরচ বেশি হবে বিধায় স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে এর খরচ শুরুতে বেশি হলেও তা একবারই করতে হয়। তারপর নিজের অভিজ্ঞতা ও ব্যবহারের উপর তা কমপক্ষে ১০ বছর ব্যবহার করা যাবে ।  দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে কাজ করলে বাণিজ্যিক নগর ফার্মিং টেকসই ও লাভজনক করার সম্ভাবনা বর্তমান সরকারের একটি পরিকল্পনা।
আধুনিক চাষাবাদ : এলইডি  গ্রো-লাইট বানিজ্যিক ভার্টিক্যাল ডিভাইস, একুয়াপনিক্স ছাড়াও স্মার্ট ফার্মিং ডিভাইস, গ্রীন স্ক্রিন বা বায়োওয়াল, স্বয়ংক্রিয় সেচসমৃদ্ধ ভার্টিক্যাল ইনডোর ফার্ম, অব্যবহৃত বা আবদ্ধ ঘরে অপটিক্যাল-ফাইবার ব্যবহার করে আলো দিয়ে চাষাবাদ ইত্যাদি এখন আমাদের দেশেই সম্ভব এবং তা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে একদল উদ্যমী নন-কৃষিবিদ যাদের সাথে মিলে কৃষিবিদগণ কাজ করলে দেশে বাণিজ্যিক নগর চাষে বিপ্লব ঘটবেই।  এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রাইভেট কোম্পানি সাফল্যজনকভাবে কাজ করছে মাইশা গ্রæপ প্যারামাউন্ট গ্রæপ, পারটেক্স গ্রæপ, ডাইরেক্ট ফ্রেশ লিমিটেড, পাবনা, নারায়ণগঞ্জেও কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।  
গাছ নির্বাচন : এখনও অনেকে বলেন, নগরে বা ছাদে একটু ছোট জাতের ঝোপালো ফল-সবজি গাছ লাগানো ভালো, এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে ১৫-২০ বছর যাবত ছাদ-বাগান করে আশা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো। নগরে এবং ছাদে সব হয়। ছোট জাতের ভিয়েতনামিজ নারিকেল, সবজাতের আম, আমড়া, কামরাঙা, জাম, জামরুল, কদবেল, থাই ও মিসরীয় ডুমুর, আনার, ডালিম, লটকন, থাই লিচু, সিন্দুরী পেয়ারা আম, জাম, হলুদ এবং সাদা ড্রাগন ফল, বারোমাসি আম, বীজহীন লেবু, লাল স্ট্রবেরি পেয়ারা, লাল ইক্ষু, কমলা, বারি মাল্টা,  এভোকেডো, রাম্বুটান, পার্সিমন ছাড়াও গতানুগতিক সব দেশী ফলতো এখন সাধারণ বিষয়। বীজ থেকে যে সকল ফল নগরবাসী গতানুগতিক চাষ করে তার মধ্যে করমচা, শরিফা, বিলিম্বি ইত্যাদি কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবই কলমের ফল গাছ। আসলে এখন ছাদ-কৃষির কল্যাণে নগরবাসী সব ধরনের ও একটু ভিন্ন ফল গাছ চাষ করতে আগ্রহী হচ্ছে।
নিরাপদ চাষাবাদঃ ট্রাইকোডার্মা মিশ্রিত সার, বায়োচার, রেডিমিক্স, জীবাণুমুক্ত কোকোডাস্ট ইত্যাদি গ্রোয়িং মিডিয়া হিসেবে ছাদ বাগানে ব্যবহার করা যায়।  ভার্মি কম্পোস্ট, রান্নাঘর ও খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে বানানো সার, চা-কম্পোস্ট, ডিম খোসা ভাংগা মিশানো, নতুন মাশরুম কম্পোস্ট (পটাশ ও ফসফরাস আধিক্য), নিম খৈল, সরিষা খৈল, ইত্যাদি ছাড়াও যে কোন বায়োলজিক্যাল কম্পোস্ট ব্যবহার করা নিরাপদ চাষাবাদের অন্তর্ভূক্ত।
এছাড়াও নিয়ম মেনে রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহার করতে হবে; ফল ও ফল-জাতীয় সবজি চাষে ফল আহরণের কমপক্ষে ২০ দিন আগে থেকে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা ডাবে না।  পোকা দমনে ফ্লাইং ইনসেক্ট এর জন্য ফেরোমন ট্রাপ, সোলার লাইট ট্রাপ, হলুদ আঠালো ট্রাপ, পেঁয়াজ পাতার ও ছোলা পেস্ট বা নির্যাস, রসুনের, গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকার ফুলের নির্যাস ভালো কাজ করবে।
অন্য ফসল : একটি বেডে একই সাথে ফল গাছের ড্রামে বা প্লেন্টার বক্সে ফল গাছের সাথে সাথী ফসল হিসেবে সবজি, ওষুধি ও গাদা চাষ করুন। মনে রাখবেন আমাদের দেশে সকল মৌসুমে সকল স্থানে সকল ফল চাষ করা সম্ভব শুধু সঠিক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান থেকে পরামর্শ নিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্লাস্টিক বোতল না ফেলে যে কোন ফল-ফসলের বীজ চারা লাগালে, নিজের বাড়িতেই অক্সিজেন ফ্যাক্টরি স্থাপন হবে।
প্রশিক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা : প্রশিক্ষণ ও কারিগরী সহায়তার জন্য আপনার নিকটস্থ কৃষি অফিস হর্টিকালচার সেন্টার ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত¡ বিভাগসহ ফেসবুক গ্রæপগুলো পরামর্শ স্বতঃস্ফুর্তভাবে প্রদান করে অনলাইন পোর্টাল করে, ফেসবুকে গ্রæপ করে নিজেদের ফল-ফসল আদান-প্রদান করা যেতে পারে; ছাদ-কার্নিশ বা ব্যালকনিতে পটে বা টবে আবাদে সতর্কতা অবলম্বন করা যাতে বিল্ডিং বা এপার্টমেন্টের নিচ দিয়ে যাতায়া
তকারী পথচারী দুর্ঘটনার শিকার না হয়।
আমাদের এখনই সময় আধুনিক নগর কৃষি নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা, প্রকল্প নিয়ে কাজ করা। সরকার নতুন নতুন সৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষণার সাথে সাথে নতুন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করছে এবং অনলাইন শপ, ফেসবুক পেজ তৈরী করে সকলের কাছে উপাদান পৌঁছে দেয়ার এখনই সময়। য়

অধ্যাপক, উদ্যানতত্ত¡ বিভাগ ও প্রতিষ্ঠাতা, ফ্যাব ল্যাব, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-১২০৭। মোবাইল : ০১৭১১০৫৪২১৫। ই-মেইল :solaimansau@gmail.com>

 

 


Share with :

Facebook Facebook