কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

উন্নতজাতের ফলের চারা তৈরি ও ফল গ্রহণ

কৃষিবিদ মো. কবির হোসেন১ কৃষিবিদ সাবিনা ইয়াসমিন২
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফলের গুরুত্ব ও অবদান অপরিসীম। বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা পূরণ, শারীরিক বৃদ্ধি ও দেহের ক্ষয় রোধ, মেধার বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, সর্বোপরি দেশের জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সুবিধা আমরা ফল থেকে পাই। এছাড়া জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ, পরিবেশ দূষণ কমানো, প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে ফলদ বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফল চাষের বিকল্প নেই। তাই যদি ভাল থাকতে চান তাহলে প্রতিদিন অন্তত একটি বা দুইটি ফল খান। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ফল খাওয়া প্রয়োজন প্রায় ২২০ গ্রাম  তার মধ্যে আমরা পাই ৭৮ গ্রাম /প্রতিদিন/প্রতিজন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৬ কোটির ও বেশি লোক বাস করে এবং তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে  প্রতিবছর ১২১.৫২ লক্ষ মেট্রিকটন ফল উৎপাদন হচ্ছে। যদিও চাহিদার তুলনায় এই ফলন পযাপ্ত নয়। তাই আমাদেরকে পরিকল্পনামাফিক বসতবাড়িতে ও বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষ করতে হবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের ফল বিভিন্ন সময়ে পাওয়া যায়।  যেমন বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে অধিক পরিমাণে ফল পাওয়া যায়। সেজন্য ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ফল সংরক্ষণ করতে পারলে  এবং বিভিন্ন মৌসুমী ফল রোপণ করলে সারা বছরই  ফলের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে পুষ্টি চাহিদা মেটানো সম্ভব।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও বাস্তবমুখী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বর্তমানে দেশ ইতোমধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন আমাদেরকে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে এবং  করোনার প্রভাব মোকাবেলার জন্য প্রতি ইঞ্চি জমিকে চাষাবাদের মাধমে কাজে লাগানোর জন্য নির্দেশনা দেন। আমাদের দেশীয় ফল বিশেষ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় দেশীয় ফলমূলের যোগান নিশ্চিত করতে ফলদ বৃক্ষ রোপণের বিকল্প নেই । তাই পরিকল্পিতভাবে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বছরব্যাপী দেশীয় ফলের চাষ বৃদ্ধি করতে হবে।
ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা
ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোর উৎপাদন মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু উৎপাদনই নয়, ফল রপ্তানীতে ও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।  বিগত পাঁচ বছরের ফল উৎপাদনের তথ্য সারণি-১ দ্রষ্টব্য।
ফল উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুণগতমানসম্পন্ন উন্নত জাতের চারা/কলম তৈরি নিশ্চিতকরণ ও পরিচর্যা: ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো পর্যন্ত কোভিড ১৯ নামক ভাইরাস সমস্ত পৃথিবীর প্রায় সব কটা দেশের মানুষকে আক্রমণ করে  চলেছে । এই আক্রমণে দেশের জনগণ যেমন মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে তেমনি সেই সাথে দেশে  নানা রকম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। পরিমানমতো ও পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন ও গ্রহণ এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই আমাদের সকলকে বেশি বেশি করে সকল ধরণের ফসল চাষ করা সহ ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা অতীব জরুরী। এক্ষেত্রে     মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশকে মূলমন্ত্র ধরে কাজ করে যাচ্ছে করোনাকালীন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং এর বিভিন্ন ক্যাটাগরীর মোট ৭৬টি হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। তারা  নিয়মিত চারা/কলম উৎপাদন ও গ্রাহকদের সেবা প্রদান করছেন করোনা যোদ্ধা হিসেবে। বিভিন্ন সবজি ও ফুলের চারা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যেই সেন্টার গুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেন্টার গুলোতে প্রতিদিন সামজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত উৎপাদিত চারা-কলম বিক্রয় ও ফল উৎপাদনে চাষীদের বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। চলতি বছর (২০১৯-২০) বাংলাদেশে বিভিন্ন ফলের উৎপাদন এলাকা বৃদ্ধিসহ উৎপাদন লক্ষমাত্রা অর্জনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট হর্টিকালচার উইং বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই গ্রহণ করেছেন ।  
গুণগতমানসম্পন্ন উন্নত জাতের চারা/কলম রোপণের জন্য নিকটস্থ সরকারি হটিকালচার সেন্টার থেকে চারা/কলম ক্রয় করা যেতে পারে কারণ এখানে স্বল্পমূল্যে ভালো মানের চারা/কলম পাওয়া যাবে।
সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন, হর্টিকালচার উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
পুরানো ফলন্ত গাছগুলোর সঠিক পরিচর্যা গ্রহণের মাধ্যমে বেশি ফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করণের মাধ্যমে এলাকাবাসীর আর্থিক উন্নয়ন ও ফল চাষকে লাভজনক স্তরে নেয়া যেতে পারে। গাছগুলোকে ট্রেনিং-প্রæনিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অফলন্ত ডাল অপসারণ করে আলো-বাতাস চলাচল সুবিধা করা, বাগানে গাছের অপ্রয়োজনীয়  ডালপালা ছাঁটাই/অপসারণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও বাগানকে আগাছা, লতা-পাতা মুক্ত করা, সার প্রয়োগ, রোগ-পোকা দমন, মালচিং দেয়া, সুবিধা থাকলে সেচ দেয়া ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফল গ্রহণের নিয়মাবলী : করোনা নামক ভাইরাস এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেকে বাঁচাতে সবচেয়ে  সহজ উপায় হলো দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। আর এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হলে অবশ্যই প্রতিদিন নিয়মিত ফল-মূল ও শাক-সবজি  গ্রহণ করতে হবে।ফল পুষ্টি উপাদানের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার এবং আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, আঁশ এবং প্রচুর  উপকারী হরমোন ও ফাইটোকেমিক্যালস প্রদান করে শরীরকে বিভিন্ন রোগবালাই থেকে সুরক্ষা প্রদান করে, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ফল ঔষধি গুণাগুণে সমৃদ্ধ বিধায় একে ‘রোগ প্রতিরোধী খাদ্য ও’ বলা হয়। বিভিন্ন ফলে ক্যান্সার প্রতিরোধকারী উপাদান অ্যান্থোসায়ানিন, লাইকোপেন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপস্থিত থাকায় মরণনাশক রোগব্যাধি থেকে রক্ষা।
ফল আমরা কাঁচা বা পাকা অবস্থায় সরাসরি খেয়ে থাকি। ফল রান্না ব্যতীত সরাসরি খাওয়া সম্ভব বিধায় এতে বিদ্যমান সবটুকু পুষ্টি পাওয়া যায়। কিন্তু করোণাকালীন সময়ে কাঁচা খাওয়া যায় এমন খাদ্যদ্রব্য সরাসরি খাওয়ার সময় অবশ্যই সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। রান্না খাবারের মাধ্যমে কোভিড-১৯ সংক্রিমত হবার কোন তথ্য প্রমাণ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন খাবার রান্না হলে এই ভাইরাস মরে যায়। কিন্তু ঝুঁকি আছে কাঁচা শাকসব্জি, ফলমূল নিয়ে। যেহেতু অন্য ক্রেতারা বাজারে যে কোন জিনিস হাত দিয়ে ধরে থাকতে পারে, এমনকী              বিক্রেতারাও সেগুলো ধরছে, তাই এমন কোন নিশ্চয়তা নেই যে সেগুলো পুরো জীবাণুমুক্ত। কাঁচা বাজারের ক্ষেত্রে অধ্যাপক            ব্লমফিল্ডের পরামর্শ হল সবকিছু ভাল করে কলের ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে তারপর সেগুলো তুলে রাখা বা ব্যবহার করা (বিবিসি বাংলা নিউজ)। কাঁচা এবং রান্না করা খাবার সম্পূর্ণ আলাদা রাখার পরামর্শ দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
করোনা ভাইরাস যদিও এখন পর্যন্ত খাবারে থাবা বসায়নি। তবু কিছু সতর্কতা পালন করা জরুরি। তারই টিপস রইল এখানে পাঁচ ধাপে পরিষ্কার করতে হবে: (সূত্র: এনডিটিবি ফুড বাংলা, ভারত)
১. আগে নিজের হাত ধুয়ে নিন
শাকসবজি ধোয়ার আগে অবশ্যই আপনার হাত পরিষ্কার আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। ফল এবং সবজি পরিষ্কারের আগে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ডের জন্য নিজের হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এরপর ফল, সবজি ধুতে থাকুন।
২. পানির নীচে রেখে ধুতে হবে
বাজার থেকে কেনা সমস্ত ফল এবং শাকসবজি খোলা কলের নীচে ফেলে ধুয়ে হাত দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করুন ।  এতে কোনও জীবাণু সংক্রমণের ভয় থাকে না।
৩. সাবান একেবারেই নয়
সাবান বা ডিটারজেন্ট নয়, শুধু পানি দিয়ে বাজার থেকে আনা জিনিসগুলো ধুয়ে নিন। কোথাও, কোনও পচা বা দাগ  ধরা অংশ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি কেটে বাদ দিয়ে দিন।
৪. ব্রাশ বা স্পঞ্জ ব্যবহার চলবে
আলু বা গাজরের মতো সবজি পরিষ্কারের সময় ময়লা পরিষ্কার করতে ব্রাশ বা স্পঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন।
৫. বাড়তি যতœ নিয়ে ধোবেন কোনগুলো
আঙুর জাতীয় ফল বা সবজি পরিষ্কারের সময় বাড়তি যতœ নেওয়া জরুরি। তাই এগুলিকে একটি বাস্কেটে রেখে কলের নীচে রাখুন। আবার লেটুস এবং পাতাযুক্ত শাকগুলি এক বাটি ঠান্ডা পানিতে রাখতে হবে।
এভাবে সকলে এগিয়ে আসলেই তবে এই দেশ ফল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ন হবে। আর আমাদের জনগণ পাবে পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং দেশ পাবে সুস্থ্য ও মেধাসম্পন্ন নাগরিক । ফল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থাপনা। এতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে উঠবে আরো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হবে আরো মজবুত ও গতিশীল, দেশবাসী পাবে খাদ্যে পুষ্টিমানসম্পন্ন একটি ভবিষ্যৎ। তাই আসুন বেশি করে ফলদ বৃক্ষ রোপণ করি ও রোগ প্রতিরোধ গড়ে তুলি। য়
১পরিচালক, হর্টিকালচার উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল: ০১৭১৬৩৮৪৫৩৮, ২উপজেলা কৃষি অফিসার, সংযুক্ত: হর্টিকালচার উইং, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবাইল: ০১৬৮৮০৫৪৭৮৬

 


Share with :

Facebook Facebook