কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ডেইরি খামারে ম্যাস্টাইটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে ১০টি কৌশল

যারা ডেইরি খামার করছেন কিন্তু গাভীর ম্যাস্টাইটিস রোগের ঝামেলায় পড়েননি এরকম খামারি খুব কমই আছে। খামারে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাতে পারে এই রোগটি। কিন্তু আপনি ১০টি সহজ উপায় অবলম্বন করলে সহজেই এই রোগকে প্রতিহত করতে পারেন। তবে প্রথমে জানতে হবে ম্যাস্টাইটিস রোগটি কি?                  
ম্যাস্টাইটিস : ম্যাস্টাইইটিস হল গাভীর ওলানে বা বাঁটে কোনো ধরনের সমস্যা দেখা যাবে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় প্রদাহ বলে। সাধারণ ওলানের দুধ নির্গত হবার জন্য ওলানের যে টিস্যুগুলো আছে সেগুলো যদি কোনো কারণে আক্রান্ত হয় তাহলে ওলান ফুলে গিয়ে দুধ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয় এমনকি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গাভীর শরীরে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। সাধারণত ওলান যদি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, ক্ষতিকর রাসায়নিক ওলেন প্রবেশ করে অথবা কোনো ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস দ্বারা ওলান আক্রান্ত হয় তাহলে এই রোগ হতে পারে।


এই রোগ প্রতিরোধের সহজ ১০টি উপায় নিচে জানিয়ে দিলাম। আশা করি নিজের খামারকে রক্ষা করতে পারবেন।
 

১. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খামার : গরুর খামার সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যাতে করে গাভী সব সময়ে স্বস্তিতে থাকতে পারে। গাভী যদি স্বস্তিতে থাকে তাহলে অক্সটসিন হরমোন ভালোভাবে নির্গত হতে পারে। গাভীর মাথা থেকে নিসৃত এই হরমোন অধিক বেশি দুধ উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পরিষ্কার খামারে ম্যাস্টাইটিস রোগ তৈরি করতে পারে এমন ক্ষতিকর জীবাণুর পরিমাণ একদম কমে যায়।


  খামারে ফ্লোরটি নিয়মিইত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। খুব গরম, খুব আর্দ্র আবহাওয়ায় গাভীটি যাতে স্বস্তিতে থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি গাভীর জন্য কোনো ধরনের বিছানা দেওয়া হয় তবে সেটা যেন অজৈব পদার্থ দিয়ে তৈরি হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণে অজৈব পদার্থে ক্ষতিকর জীবাণু কম জন্মায়।


২. পরিষ্কার ওলান : খামার ম্যাস্টাইটিস মুক্ত রাখতে হলে গাভীর ওলান অবশ্যই পরিষ্কার রাখতে হবে। দুধ দোহনের আগে অবশ্যই দুধের বাঁটগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এর ফলে দুধ দোহনের সময় ওলানে এবং বাঁটে লেগে থাকা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াগুলো বাঁটের ভেতর ঢুকতে পারে না।
অনেক রকমের ব্যাকটেরিয়া আছে যারা মাটিতে এবং গোবরে লেগে থাকে। এর মধ্যে স্ট্রপ্টো কক্কা, ই.কোলাই এবং এন্টারোব্যাকটার খুবই মারাত্মক। যারা সহজেই বাঁটের মধ্য দিয়ে ওলানে পৌঁছে যেতে পারে। ওলানে যখন মাটি, গোবর ইত্যাদি লেগে থাকে তখন তারা বাঁটের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। তাই দুধ দোহনের পূর্বে অবশ্যই ওলানে লেগে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। তা না হলে দুধ দোহনের জন্য যখনই বাঁটে চাপ পরে তখনি এ সব ব্যাকটেরিয়া বাঁটের ছিদ্র পথে ভেতরে প্রবেশ করে ওলনাকে অসুস্থ করে ফেলতে পারে।


 ওলানের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন জীবাণু পানির মাধ্যমেও পরবাহিত হতে পারে। তাই পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যেসব ওলানে বা বাঁটে অতিরিক্ত কাদা-গোবর লেগে থাকে, সেসব ক্ষেত্রে পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। পানি জোরে জোরে দেওয়া যাবে না। আর চেষ্টা করতে হবে পানি যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভালো।


 যে নল বা পাত্র দিয়ে পানি দেওয়া হয় সেটি বয়ে নিয়ে আসতে পারে হাজার হাজার জীবাণু, যা ওলান নষ্ট করার জন যথেষ্ঠ। তার মধ্যে সিউডোমোনাস জাতের ব্যাক্টেরিয়াগুলো খুবই মারাত্মক। তাই এসব নল প্রত্যেকবার ব্যবহারের পূর্বে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। তাছাড়া ব্যবহারের পর পানি জমিয়ে রাখা যাবে না।


৩. ওলান পরীক্ষা করা : প্রত্যেক বার দুধ দোহনের পূর্বে ওলান ভালো করে পরীক্ষা করে নিতে হবে। অনেক সময় দুধের বাঁটে ক্ষত ছিঁড়া, এমনি ঘা পর্যন্ত থাকতে পারে। এ রকম সমস্যা থাকলে ওই সব বাঁটে দুধ দোহনের মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। এ সব বাঁটে ম্যাসটাইটিস হবার ঝুঁকি থাকে বেশি। তাই বাঁটে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।


৪. দুধ দোহনের পূর্বে বাঁট পরিষ্কার করা : যেকোনো একটা ভালো জীবাণুনাশোক দিয়ে দুধ দোহনের পূর্বেই বাঁটগুলো ডুবিয়ে নিতে হবে। এর ফলে ওলানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষতিকর জীবাণুর পরিমাণ কমবে। যার ফলে বাটে ম্যাস্টাইটিস হবার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড জীবাণুনাশক এর মধ্যে দুধের বাঁট ডুবিয়ে রাখতে হবে। জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করার চেয়ে ডুবিয়ে রাখলে ফল বেশি পাওয়া যায়।


   যে পাত্রে জীবাণুনাশক নিয়ে বাঁট ধোয়া হবে সেটি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। একবার ডুবানোর পর অবশিষ্ট তরল ফেলে দিতে হবে। তা না  সে পাত্রই আবার ব্যাক্টেরিয়ার বাহক হতে পারে। যা নতুন গাভীকে আক্রান্ত করতে পারে।


৫. বাঁট পরিষ্কার করে মুছে ফেলা : জীবাণুনাশকে ডুবানোর পর সেই বাঁট পরিষ্কার তোয়ালে বা কাপড় দিয়ে মুছে শুষ্ক করে ফেলতে হবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিটি গরুর জন্য আলাদা আলাদা কাপড় বা তোয়ালে ব্যবহার করলে ভালো। খেয়াল করতে হবে যেন ওলান বা বাঁটের মুখে কোনো ধরনের মাটি, গোবর বা অন্য কোনো পদার্থ লেগে না থাকে।


    বাঁট শুকনো থাকলে মিল্কিং মেশিন ভালোভাবে কাজ করে। যদি বাঁট ঠিকমতো পরিষ্কার এবং শুষ্ক না হয় তাহলে দুধ দোহনের সময় বাঁটে ক্ষত হতে পারে, ছিঁড়ে যেতে পারে, ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। ফলে ম্যাস্টাইটিস তৈরি করে ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।


৬. ম্যাশিন স্থাপনের পূর্বে দুধ পরীক্ষা/দোহন : দুধ দোহনের ম্যাশিন স্থাপনের পূর্বে প্রতিটি বাঁট থেকে সামান্য দুধ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোনো ধরনের স্বাভাবিকতা আছে কি না? এর ফলে দুধ সংগ্রহের পূর্বে দুধের মান এবং ওলানের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক অবস্থা জানা যায়।


    এর আরও একটি সুবিধা হলো। এটি অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণে উদ্দীপ্ত করে। এ অক্সিটোসিন হরমোন দুধ উৎপাদন ও দুধ বের হওয়ার সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।


    জীবাণুনাশক দ্বারা ধৌত করার পূর্বে বা পরে এই কাজটি করা যায়। তবে প্রত্যেকটি পদ্ধতিই ডেইরি খামারের জন্য উপকারী।
 

৭. দুধ দোহনের যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার : যে সব লোকজন দুধ দোহনের মেশিন ব্যবহার করবে তাদের অবশ্যই এই বিষয়ে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ করতে হবে। এই যন্ত্রটি কিভাবে স্থাপন করতে হবে, কিভাবে আলাদা করতে হবে তা ভালোভাবে জানতে হবে।
    মিল্কিং মেশিন স্থাপনের সময় যে কোনো ধরনের বাতাস জমা না থাকে সেই দিকে খেয়ার রাখতে হবে।

 

৮. দুধ দোহনের সময় মনিটরিং : দুধ দহনের সময় সব কাজ ভালোভাবে তদারকি করতে হবে।
 

৯. খাদ্যাভ্যাস : দুধ দোহনের পর গাভীকে খাবার দিয়ে ব্যস্ত রাখতে হবে। যাতে গাভীটি দাঁড়িয়ে  থাকে। দুধ দোহনের সময় দুধের নালিগুলো বড় হয়ে যায়। যা স্বাভাবিক হতে অনেক সময় এক ঘণ্টাও লেগে যায়। তাই এই সময় গাভীকে ব্যস্ত রেখে দাঁড়িয়ে রাখতে পারলে ভালো।
 

১০. খাদ্যে ভিটামিন ই ও সেলেনিয়াম : গাভীর ওলানের সুরক্ষার জন্য ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়াম খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই গাভীর দৈনিক খাবারে ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়ামের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

 

ডা. সুচয়ন চৌধুরী

ভেটেরিনারি সার্জন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর রাঙ্গামটি সদর, রাঙ্গামাটি। মোবাইল নং : ০১৭১৮৬৩০২৬৮,


Share with :

Facebook Facebook