কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আম ধ্বংস, বাস্তবতা ও করণীয়

মধু মাসের সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ফল হচ্ছে আম। এ দেশে বর্তমানে যে ৭০টি ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে তার মধ্যে আম সবচেয়ে পছন্দনীয় ফল। সুমিষ্ট স্বাদ, মন মাতানো ঘ্রান ও পুষ্টিমান সব কিছু বিবেচনায় আম হচ্ছে সেরা। আবহাওয়াগত কারণে সারা বছর আম এ দেশের বাজারে পাওয়া যায় না। যদিও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্প্রতি বারি আম-১১ নামে আমের একটি বারোমাসী জাত উদ্ভাবন করেছে। এই উদ্ভাবিত জাতটি বছরে তিনবার ফলন দিচ্ছে। এই জাতটির চাষাবাদ যত দ্রুত মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে তত দ্রুত আম পছন্দকারী ভোক্তাগণ তাদের হাতের নাগালে আম পেতে পারেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা এই জাতের আম বাজারে ভালোভাবে আসতে আরও ৪-৫ বছর সময় লাগতে পারে। এ দেশে সাধারণত মে মাস হতে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত আম বাজারে সরবরাহ থাকে এবং ভোক্তাদের হাতের নাগালে থাকে। তবে বর্তমানের ব্যাগিং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে আম প্রাপ্তির সময়কাল দীর্ঘায়িত হয়েছে। এখন নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসেও আশ্বিনা আম বাজারে পাওয়া যায়। বেশ ভালো দামেই কেনাবেচা হচ্ছে। প্রতি কেজি আমের দাম ৪০০-৭০০ টাকা যা আমচাষিরা কখনও চিন্তা করেননি বা স্বপ্নেও ভেবে দেখেননি। নাবী এই আশ্বিনা জাতের আমের দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাগণ না কিনে শুধুমাত্র দেখেই তৃপ্ত হন। এই আমগুলো বেশি দামে বিক্রি হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে।


একজন ক্রেতার বা ভোক্তার আম যতই পছন্দের হোক না কেন মে মাসের আগে নামিদামি জাতের আমগুলো খাওয়ার তেমন সুযোগ নেই বা পেলেও খাওয়া ঠিক হবে না। তবে গুটি জাতের আম বাজারে আসতে পারে যেমন বৈশাখী, রাজবৈশাখী ইত্যাদি। এ সময়ে কিছু ভারতের অপরিপক্ব এবং কম স্বাদযুক্ত রঙিন আম বাজারে দেখা যায় এবং এক শ্রেণির ক্রেতাগণ আগ্রহভরে কিনতে থাকেন এই আমগুলো। এই আমগুলোর দামও বেশি ১২০-১৫০ টাকা প্রতি কেজি কেনাবেচা হতে দেখা যায়। এই আমগুলো না খাওয়ায় উত্তম। এদেশের অনেকগুটি জাত আছে যেগুলো এপ্রিল মাসের শেষের দিকে পুষ্ট হয় এবং রাইপেনিং হরমোনের ব্যবহার করে ভারতের আমের সময়েই পাকানো যায়। উন্নত দেশে ৮০ ভাগ পরিপক্বতায় আম সংগ্রহ করে ইথিলিন চেম্বারে আম পাকানো হয়। কিন্তু স্বাদের ও পুষ্টিমানের কথা বিবেচনায় এখনও বাণিজ্যিকভাবে জোর করে আম পাকানোর বৈধতা দেওয়া হয় নাই। তবে ভারতের অপরিপক্ব আম আমদানির চেয়ে আমাদের দেশে  স্বল্প পরিসরে ইথাইলিন চেম্বার করে আম পাকানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই ইথিলিন চেম্বারে আম পাকালে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি আমের প্রাপ্যতা আরও এক মাস বাড়তে পারে। এদেশের প্রথম বাজারে আসে সাতক্ষীরা জেলার আম। এই জেলার গোবিন্দভোগ আমটি মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিপক্বতা আসে। এরপর গোপালভোগ, খিরসাপাত/ হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি ও বারি আম-৩ (আ¤্রপালি) ও বারি আম-৪ জাতের আম বাজারে আসে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ আম সাতক্ষীরা হতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমের পরিমাণ কম হওয়ায় চাহিদা অনেক বেশি থাকে। এই সুযোগটা ভালোভাবেই কাজে লাগান এই অঞ্চলের আমচাষিরা ও আম ব্যবসায়ীরা। ভালোভাবে হিমসাগর আম পরিপক্ব না হলেও একটু বেশি দাম পাওয়ার আশায় আগাম বাজারজাত করে থাকেন। এই অপরিপক্ব আমগুলো এমনিই পাকতে চায় না। তারপর ইথোফন/কার্বাইড ব্যবহার করে জোর করে পাকানোর চেষ্টা করেন বা করে চলেছেন। আর সমস্যাটির শুরু এখানেই। সাতক্ষীরা জেলার ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত কারণে আম পাকবে তুলনামূলক আগে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, হিমসাগর আম পাকবে মে মাসের ১০ তারিখ হতে। গবেষণায় দেখা গেছে, মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত হিমসাগর আমের আটিই ভালোভাবে শক্ত হয় না। তবে বিগত কয়েক বছর পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার কারণে আম গবেষকরা এই বিষয়ে তেমন কোনো মতামত দেননি। তবে বর্তমানে গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহের সময়ে তারতম্য হচ্ছে। যেমন ২০১৭ সাল পর্যন্ত ধারণা করা হতো, সাতক্ষীরা জেলার হিমসাগর আম মে মাসের ১০-১৫ তারিখের মধ্যে পরিপক্বতা আসে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে, এর চেয়ে আরও ১০ দিন পরে পরিপক্বতা আসছে। ফলে এই সময়ের আগে যেন এই জাতটি সংগ্রহ করা না হয় সেইদিকে স্থানীয় প্রশাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই তথ্যটি বের করতে বিজ্ঞানীরা সময় নিয়েছেন তিনটি বছর। এখন বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, কোনো জাতের আম পরিপক্ব হতে কত দিন সময় লাগে, জেলার অক্ষাংশ বিবেচনায় কোন জেলার কোন জাত কখন পাকবে ইত্যাদি। সেই ফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিজ্ঞানীরা সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আম উৎপাদনকারী জেলার বিভিন্ন জাতের আম পরিপক্বতার সম্ভাব্য সময়কাল নির্ধারণ করেছেন যা অনুসরণ করলে আমচাষি, আম ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সবাই উপকৃত হবেন। মৌসুমের শুরুতে প্রতি বছর অনেক আম বিভিন্ন অজুহাতে নষ্ট বা ধ্বংস করা হয় যেটি কৃষি সংশ্লিষ্ট কারও কাম্য নয়। সুতরাং আগাম আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে আম সংগ্রহের সময় অনুসরণ করে নজরদারি বাড়ালে সুফল মিলবে এমনটিই মনে করেন আম বিজ্ঞানীরা।


ভোক্তাদের জন্য একটি সুখবর হলো ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত আমগুলো নিরাপদ, বিষমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও রপ্তানিযোগ্য। সুতরাং এই প্রযুক্তিটির ব্যবহার মাঠ পর্যায়ে যতবেশি বাড়বে ততই ভোক্তাদের ঝুঁকি কমবে। কারণ এই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে আম উৎপাদন করলে জাতভেদে বালাইনাশকের ব্যবহার কমে ৩০-৭০ ভাগ। ব্যাগিং প্রযুক্তির আম আমচাষিরা কখনও পরিপক্ব হওয়ার আগে সংগ্রহ করেন না এবং এখন পর্যন্ত এক কেজি ব্যাগিং আম বিভিন্ন কারণে নষ্টের কোনো নজির নেই।


এছাড়াও পরিপক্ব আম চেনার কয়েকটি সহজ উপায় আছে। যেমন- সকাল বেলায় ২/১টি পাকা আম গাছের নিচে পড়ে থাকবে এবং পরিপক্ব আম পানিতে সম্পূর্ণরূপে ডুবে যাবে, আধাপাকা আম পাখি ঠোকরাবে এবং গাছের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যাবে।


আমচাষিদের সময়মতো আম সংগ্রহ উৎসাহিত করতে দুইটি স্লেোগান খুবই কার্যকরী..
“পরিপক্ব ফল খাই
 পরিপূর্ণ পুষ্টি পাই”
‘গাছ থেকে যদি ভাই পুষ্ঠ আম পাড়
স্বাদ পাবে, পুষ্টি পাবে, ফলন বাড়বে আরো’
আমচাষিরা যেভাবে উপকৃত হবেন

 

আমগাছে আম থাকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। কোনোভাবেই বা কোনো কিছু প্রয়োগের মাধ্যমে আম দীর্ঘদিন গাছে রাখার কোনো সুযোগ নেই। আমের গুটি বাঁধার পর ধারাবাহিকভাবে আম বড় হতে থাকে এবং আমের ওজন বাড়তে থাকে এবং শেষের সময়ে এই ওজন বৃদ্ধির হার পূর্বের চেয়ে বেশি। গড়ে প্রতিদিন একটি আমের প্রায় ৩-৫ গ্রাম করে ওজন বাড়তে থাকে। এটি একটু বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোধগম্য হবে। হিমসাগর আম ৪০ কেজি হতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৭০টি আমের। প্রতিদিন যদি ৩ গ্রাম ওজন বাড়ে তাহলে মোট ওজন বাড়বে প্রায় ৫০০ গ্রাম। আর যদি ৫ গ্রাম ওজন বাড়ে তাহলে মোট ওজন বাড়বে ৮৫০ গ্রাম। তাহলে একজন চাষি যদি ৭ দিন পর আম সংগ্রহ করেন তাহলে প্রায় প্রতি ৪০ কেজির (এক মণ) জায়গায় ৪৬ কেজি আম সংগ্রহ করবেন। এভাবে একটি গাছে যদি ১০ মণ আম ধরে এবং সঠিক সময়ে সংগ্রহ করলে ১১.৫ মণ আম সংগ্রহ করতে পারবেন। অর্থাৎ একটি মাঝারি আম গাছ হতে ৩-৪ হাজার টাকা বেশি পেতে পারেন।
ব্যবসায়ীরা যেভাবে উপকৃত হবেন

অপরিপক্ব আম কেনার পর পাকানোর জন্য অস্থির হয়ে থাকেন আম ব্যবসায়ীরা। ব্যবহার করেন ইথোফোন/কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাইপেনিং হরমোন। এরপরও অনেক আম পচে নষ্ট হয়। ভোক্তারা আম খাওয়ার পর সন্তুষ্ট থাকেন না ফলে ব্যবসার সুনাম নষ্ট হয়। পরিপক্ব আম বাজারজাত করলে কোনো ঝুঁকি থাকে না। আমগুলো অনেক আস্তে পাকে এবং সংগ্রহোত্তর ক্ষতি অনেক কমে যায়। এই জাতীয় পরিপক্ব ও পুষ্ট আম কিনে ও খেয়ে ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকেন এবং ব্যবসার সুনাম বাড়তে থাকে। অর্থাৎ আমের ব্যবসা লাভজনক হয়।
ক্রেতা/ভোক্তারা যেভাবে উপকৃত হবেন

 

সময়মতো আম সংগ্রহ হলে ভোক্তাদের আম বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা থাকে না। প্রতিটি জাতের আম থেকে কাক্সিক্ষত স্বাদ পেয়ে থাকেন এবং আম খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। ক্রয়কৃত আম নষ্টের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
 

পরিশেষে, আমচাষিদের কষ্টের আম যেন অযথা নষ্ট না হয় সে দিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। অপরিপক্ব আমে অবৈধ কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার হলে ঢাকায় নয় উৎপাদনকারী এলাকাতেই নষ্টের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ইচ্ছে করলে খুব সহজেই এটি বন্ধ করতে পারেন। দেশের সব ক্রেতাদের জন্য সহজলভ্য ও সহজপ্রাপ্য হোক দেশীয় এই জনপ্রিয় মৌসুমি ফলটি এমনটিই প্রত্যাশা ফল বিজ্ঞানীদের।

 

ড. মো. শরফ উদ্দিন


ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, আকবরপুর, মৌলভীবাজার,  মোবা : ০১৭১২১৫৭৯৮৯, ই-মেইল :sorofu@yahoo.com

 

 


Share with :

Facebook Facebook