কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বেল চাষাবাদের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা (শ্রাবণ ১৪২৫)

বেল (Aegle marmelos) ফলটি Rutaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বেলের আদি নিবাস হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশকে ধরা হয়। তবে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে বেল জন্মায় ও ভালো ফলন দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। পছন্দের এই ফলটি ভারত ও বাংলাদেশে বেল নামে পরিচিত হলেও ইন্দোনেশিয়ায় মাঝা ও থাইল্যান্ডে মাতুন নামে পরিচিত। এই বেলকে আরবিতে সাফারজাল এবং হিন্দি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় বেল নামেই ডাকা হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ফলটির চাষাবাদ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত।


বেল বাংলাদেশে চাষযোগ্য একটি অপ্রধান দীর্ঘমেয়াদি ফল। তবে অপ্রধান ফল বলে বিবেচিত হলেও এর বহুবিধ ব্যবহার, পুষ্টিগুণ কোনো অংশে কম নয়। ছোট বড় সবাই এই ফলটি পছন্দ করে থাকেন। এদেশের প্রায় সব জেলাতেই বেলের গাছ জন্মাতে ও ফলন দিতে দেখা যায়। বেলের গাছ মূলত বাড়ির আশপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার পার্শ্বে অযত্ন অবহেলায় জন্মে থাকে এবং বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে কোনো বাণিজ্যিকভাবে বেলের বাগান করতে দেখা যায়নি। কারণ হিসেবে দেখা যায়, বীজের গাছ থেকে বেল পেতে সময় লাগে ৮-১২ বছর। আসলে এত দীর্ঘ সময় কেউ ফলের জন্য অপেক্ষা করতে চায় না। যে জেলাগুলোতে বেল উৎপাদিত হয় তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অন্যতম। ফল বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্ঠা সারা বছর দেশীয় ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে ২০০৬ সালে কয়েকটি অপ্রধান ফল বাছাই করে এই ফলগুলোর ওপর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অত্র কেন্দ্রে বেল ও ডালিমের ওপর বেশ গুরুত্ব দিয়ে ২০০৭ সালে জার্মপ্ল­াজম শনাক্তকরণ ও সংগ্রহ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বেলের ২২টি ভালোমানের জার্মপ্ল­াজম সংগ্রহ ও কলম করা হয়। সংগ্রহকৃত জার্মপ্ল­াজম হতে দীর্ঘ ৯ বছর গবেষণা করার পর বারি বেল-১ নামের একটি জাত মুক্তায়ন করা হয়েছে। এই জাতটি বাংলাদেশের সব জেলাতেই জন্মাতে ও ফলন দিতে সক্ষম। আশা করা যায় বেলের এই জাতটি চাষাবাদ করে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন এবং অসময়ে দেশীয় ফলের চাহিদা মেটাতে অনেকটাই সক্ষম হবে। এছাড়াও আরো কয়েকটি জার্মপ্লাজম সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা দিয়েছে। আরও কয়েকটি জার্মপ্ল­াজমকে সম্ভাবনাময় হিসেবে পাওয়া গেছে। চলতি মৌসুমে আরো একটি জার্মপ্ল­াজম মূল্যায়নের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই বেলটি ৩-৪ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। সুতরাং নতুন নতুন বেলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত আছে।


গত বছর থেকে বারি বেল-১ এর কলম চাষিদের মাঝে বিতরণ শুরু হয়েছে। এই জাতটি কলমের মাধ্যমে জন্মানো যাবে, যার ফলে মাতৃগাছের গুণাগুণ হুবহু অক্ষুণœ থাকবে এবং ফল আসতে সময় লাগবে মাত্র ৪-৫ বছর। ফলে অন্যান্য ফলের মতো বেলও চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে পারবে। বেলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রথম শুরু করছেন পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার চাষি আলহাজ মো. শাহজাহান আলী যিনি পেঁপে বাদশা নামেও পরিচিত। তিনি এই কেন্দ্র হতে কয়েকটি জার্মপ্ল­াজম সংগ্রহ করেছেন এবং তার জমিতে রোপণ করেছেন। তার বর্তমানে বেল গাছের সংখ্যা ৩৫০টি।


বারি বেল-১ জাতটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য : ফল মাঝারি আকারের, নিয়মিত ফলদানকারী; প্রতিটি ফলের গড় ওজন ৯০০ গ্রাম, কাঁচা বেলের রঙ সবুজ। তবে পাকা ফল দেখতে হালকা সবুজ হতে হালকা হলুদ বর্ণের এবং টিএসএস ৩৫%। ফলের খাদ্যোপযোগী অংশ ৭৮ ভাগ। সাত বছর বয়সী গাছপ্রতি গড় ফলের সংখ্যা ৩৮টি এবং গড় ফলন ৩৪ কেজি/গাছ/বছর। অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় ১৪ টনের মতো। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলনও বাড়বে। এটি বেলের মধ্যম সময়ের জাত। এই জাতটির সংগ্রহের সময় মার্চ মাসের শেষ হতে এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত। বাংলাদেশের সব জেলাতেই এই জাতটি চাষাবাদ করা যাবে।


বেলের ব্যবহার ও পুষ্টিগুণ : কাঁচা ও পাকা বেলের রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। পাকা বেলের শাঁস গাছ থেকে পেড়ে সরাসরি খাওয়া যায়। এছাড়াও পাকা বেলের শাঁস সরবত, জ্যাম, জেলি, চাটনি, স্কোয়াস, বেভারেজ ও বিভিন্ন ধরনের আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বেলের পাতা ও ডগা সালাদ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বেল পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা বেলের শাঁসে থাকে আর্দ্রতা ৬৬.৮৯ ভাগ, কার্বোহাইড্রেট ৩০.৮৬ ভাগ, প্রোটিন ১.৭৬ ভাগ, ভিটামিন সি ৮.৬৪ মিলিগ্রাম, ভিটমিন এ (বেটাকেরোটিন) ৫২৮৭ মাইক্রোগ্রাম, শর্করা ৩০.৮৬ ভাগ, ফসফরাস ২০.৯৮ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১২.৪৩ মিলিগ্রাম এবং লৌহ ০.৩২ মিলিগ্রাম। এমনকি বেল গাছের কা- হতে যে আঠা পাওয়া যায় তা গাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বেলের রয়েছে বহুবিধ ঔষধি গুণাগুণ। পাকা বেলের  সরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে থাকে। অন্য একটি গবেষণার ফল হতে দেখা গেছে, বেল হতে প্রাপ্ত তেল ২১ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে।


যেভাবে পাওয়া যাবে বেলের কাক্সিক্ষত কলম : প্রথম কাজটি হবে ভালো গুণগতমানসম্পন্ন মাতৃগাছ নির্বাচন করা অর্থাৎ যে গাছ হতে পরবর্তীতে সায়ন সংগ্রহ করা হবে। দ্বিতীয় কাজটি হলো যে কোনো বেলের বীজ হতে পলিব্যাগে চারা উৎপন্ন করা যা পরে রুটস্টক হিসেবে ব্যবহার করা হবে অথবা নিকটস্থ নার্সারি হতে বেলের চারা সংগ্রহ করা যায় এবং শেষ কাজটি হলো উপযুক্ত সময়ে (এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি) কাক্সিক্ষত বয়সের (৩-৬ মাস) রুটস্টকে কাক্সিক্ষত সায়নটি ক্লেফট গ্রাফটিং বা ফাটল কলমের মাধ্যমে জোড়া লাগানো। আসলে অন্যান্য ফলের বেলায় যেভাবে ক্লেফট গ্রাফটিং বা ফাটল কলম করা হয়, বেলের ক্ষেত্রে একইভাবে করা হয় তবে এক্ষেত্রে সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্থানভেদে সময় ৭ দিন কম-বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলো মাতৃগাছের নতুন কচিপাতা বের হওয়ার আগেই ডগা সংগ্রহ করে কলম বাধার কাজটি সম্পন্ন করতে হবে। আরেকটি মজার বিষয় হলো অন্যান্য ফলের বেলায় শুধু ডগাটি সায়ন হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিন্তু বেলের বেলায় একটি ডগা হতে ২-৪টি পর্যন্ত সায়ন পাওয়া যায়। একটি সায়নে ২-৩টি কুড়িই যথেষ্ঠ। তবে ডগার শীর্ষ হতে একটু কেঁটে ফেলা উত্তম। মাতৃগাছে কচিপাতা বের হওয়ার পর কলম করলে কলমের সফলতা অনেক কমে যাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ ভাগে নেমে আসতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে কলম করা হলে সফলতা প্রায় ৯০-৯৫ ভাগ। গ্রাফটিং করার দুই সপ্তাহের মধ্যেই নতুন কুশি বের হবে। তবে কলম করার সপ্তাহখানেক পর হতে দিনে কমপক্ষে একবার পরিদর্শন করা ভালো। সায়ন হতে নতুন কুশি বের হলে ওপরের পলিথিন কভারটি সরিয়ে ফেলতে হবে এবং রুটস্টক হতে কোন কুশি বের হলে তা ভেঙে ফেলতে হবে। এইভাবেই পাওয়া যাবে কাক্সিক্ষত বেলের কলম।


চাষাবাদ পদ্ধতি : জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দ্বারা তৈরি করে নিতে হবে। লাইন থেকে লাইন এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৫ মিটার। কলমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। নির্ধারিত গর্তে গোবর সার বা জৈব সার প্রয়োগ করা ভালো। জুন-জুলাই মাসে নির্ধারিত গর্তে কলমের চারাটি রোপণ করতে হবে। লাগানোর পর অন্যান্য পরিচর্যা সমূহ করতে হবে। রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ তেমন লক্ষ্য করা যায় না। তবে একটি লেপিডোপটেরান পোকার লার্ভা বেলের কপি পাতা খায়। নতুন পাতাবের হলে সাইপারমেথ্রিন, কার্বারিল অথবা ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের যে কোনো একটি কীটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় মাত্র একবার ব্যবহার করলে পোকাটির আক্রমণ থেকে বেলের পাতাকে রক্ষা করা যাবে। এদেশে বর্তমানে যতগুলো ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় তার মধ্যে বেলে সবচেয়ে কম বালাইনাশকের ব্যবহার হয় এবং সবচেয়ে বেশি সময় গাছে থাকে। বেলের ফুল আসা থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ১১ মাস। ফলে এই দেশীয় ফলটি সবচেয়ে নিরাপদও বটে।


পরিশেষে, ফলটির গুরুত্ব বিবেচনায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে উৎসাহিত করতে হবে ফল চাষিদের। অসময়ে দেশীয় ফলের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে আমদানি নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে এমনটিই প্রত্যাশা ফল গবেষকদের।

 

কৃষিবিদ ড. মো. শরফ উদ্দিন
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ


Share with :

Facebook Facebook