কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফল চাষ (শ্রাবণ)

ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ-২০১৮ উপলক্ষ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্তৃক
আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় ‘খ’ গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকারী

ভূমিকা :
    ‘ফল দেহ সুস্থ রাখে
        তাই তা দরকার আছে
    সব ঋতুর সব ফলই
        প্রিয় হোক সবার কাছে।’
                    -কবি রফিকুল আলম
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফলের গুরুত্ব ও অবদান অপরিসীম। খাদ্য, পুষ্টি, বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা পূরণ, শারীরিক বৃদ্ধি ও দেহের ক্ষয় রোধ, মেধার বিকাশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, সর্বোপরি দেশের জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও আয়বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সুবিধা আমরা ফল থেকে পাই। এছাড়া জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ, পরিবেশ দূষণ কমানো, প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে ফলদ বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফল চাষের বিকল্প নেই।


বাংলাদেশে ফল চাষের পরিস্থিতি : ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ টন,১ যা বিগত বছরগুলোর উৎপাদন মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে।
শুধু উৎপাদনই নয়, ফল রফতানিতেও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব মতে, গত ৫ বছরে ফল রফতানিতে আয় বেড়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৮৮ কোটি টাকার ফল রফতানি করেছে। ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ এই দুই অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮০ কোটি টাকা।২


আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশ ইতোমধ্যে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তাই আমাদেরকে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে’।৩


খাদ্য পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষ : খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় ফল চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফল খাদ্য চাহিদা পূরণ করে, পুষ্টির উন্নয়ন ঘটায়, মেধার বিকাশ ঘটায় এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। শুধু তাই  নয়, ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবেও ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।

ক. খাদ্য চাহিদা পূরণ : বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় দেশে আবাদী জমির পরিমাণ অনেক কম। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফল চাষের বিকল্প নেই। কারণ দানাদার শস্যের চেয়ে ফল চাষ অনেক বেশি লাভজনক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর জমিতে ধানের ফলন যেখানে তিন থেকে চার টন, সেখানে একই পরিমাণ জমিতে আমের উৎপাদন হয় ২০ থেকে ২৫ টন।৪


অধিকন্তু আমাদের দেশে মাথাপিছু ফলের উৎপাদন প্রায় ৭০-৭৫ গ্রাম,৫ যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। আর এ চাহিদা পূরণ করার জন্য প্রয়োজন-আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশি বেশি ফল উৎপাদন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ফল চাষ করতে পারলে দেশের মানুষের প্রতিদিনের ফলের চাহিদা মেটানো সম্ভব’।৬


খ. পুষ্টি নিরাপত্তা : পুষ্টি নিরাপত্তা বলতে সুষম খাদ্য হিসেবে পর্যাপ্ত আমিষ, ভিটামিন, খনিজ উপাদান এবং নিরাপদ পানীয় এর সরবরাহকে বোঝায়।৭ পুষ্টিবিদদের মতে, একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক ১৫৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন, কিন্তু আমরা খাই মাত্র ৩৪ গ্রাম।৮ ফলে আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।


বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্য ঘাটতির চেয়ে পুষ্টি ঘাটতি সমস্যা অনেক বড় আকারে দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন এখন একটা চ্যালেঞ্জ। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত ফলমূলের যোগান পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে’।৯


ইংরেজিতে একটি কথা আছে, Fruits are food cooked by the sun.’১০ অর্থাৎ ফল হলো এমন একটি খাদ্য যা রান্না করা হয়েছে সূর্যের আলোয়। কৃত্রিম পদ্ধতিতে রান্না করা হয়নি বলে এর মধ্যে সব ধরনের খাদ্যগুণ বজায় আছে। তাছাড়া আমাদের দেশে ফলের সংখ্যা ৭০ এর অধিক এবং এ সমস্ত ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ।১১ তাই এই পুষ্টি সমস্যা সমাধানে ফলই হতে পারে একমাত্র হাতিয়ার।


গ. মেধা বিকাশ : ফলকে বলা হয় পুষ্টির আঁধার। আর পুষ্টি ও মেধা বিকাশের মধ্যে রয়েছে দারুণ সম্পর্ক। গবেষাণায় দেখা গেছে, মাতৃগর্ভেই মানুষের মেধা বিকাশ হয় শতকরা ৪০ ভাগ এবং অবশিষ্ট ৬০ ভাগ মেধা বিকাশ হয় জন্মের ৫ বছরের মধ্যে।১২ এই সময়ে যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে ফলমূল-শাকসবজিসহ বিভিন্ন সুষম খাবার না খাওয়ানো হয় তাহলে তাদের পুষ্টি ঘাটতির ফলে কম মেধা নিয়ে বেড়ে ওঠে। ফলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এদের অবদান রাখার ক্ষমতা কমে যায়। মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয় দেশ ও জাতি। এমতাবস্থায় দেশকে এই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে এবং উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে ফল চাষ ও গ্রহণের বিকল্প নেই।


ঘ. রোগ প্রতিরোধ : শর্করা, আমিষ, তেল, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের অভাবে মানুষ্যের মধ্যে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮৮ ভাগ মানুষ ভিটামিন-এ, ৯০ ভাগ মানুষ ভিটামিন-সি এবং ৯৩ ভাগ মানুষ ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগে।১৩ শুধু তাই নয়, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ লোক রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে এবং অপুষ্টি সমস্যার প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা।১৪ আর এসব সমস্যার উৎকৃষ্ট সমাধান দিতে পারে ফল। কারণ ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ইত্যাদি রয়েছে যা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।


ফলকে আহার ও ওষুধ দুই বলা যেতে পারে। কারণ ফল হলো রোগ প্রতিরোধক খাদ্য এবং এতে রয়েছে নানারকম রোগ সারাবার গুণ। তাই ফল খেয়ে শরীর নীরোগ রাখলে আর ওষুধ খেয়ে  রোগ সারাবার দরকার হবে না।

ঙ. বিকল্প খাদ্য হিসেবে : ভাত আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য। অন্য যেকোন দেশের তুলনায় আমরা বাংলাদেশের অধিবাসিরা ভাত বেশি খাই।১৫ ভাত একটি চমৎকার শক্তিপ্রদানকারী খাদ্য, কিন্তু এতে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় সবগুলো উপাদান নেই। বর্তমানে দানাদার শস্যের ওপর চাপ কমানোর জন্য খাদ্যাভাস পরিবর্তন একান্ত জরুরি। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি বছরে গড়ে ১৮৩ কেজি চাল খায় যেখানে শ্রীলঙ্কায় খায় মাত্র ৮৩ কেজি এবং চীনে খায় মাত্র ৪৫-৫০ কেজি।১৬ এমতাবস্তায়, যদি দানাদার খাদ্য কমানো যায় এবং ফলমূল দিয়ে তা পূরণ করা হয় তাহলে একদিকে যেমন পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ টন উদ্বৃত্ত খাদ্য বিদেশে রফতানি করা যাবে।


এজন্য থালায় শুধু ভাত নয়, এর সাথে রাখতে হবে টাটকা ফলমূল। শিশুদের টিফিনে ফাস্ট ফুড দেওয়ার পরিবর্তে ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমরা দেশকে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও মেধাবী জাতি উপহার দিতে পারব।
দেশের উন্নয়নে ফল চাষ : ফল চাষের মাধ্যমে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব। দেশে পরিকল্পিতভাবে ফলের শিল্পায়ন করতে পারলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, যা দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করবে। এছাড়া ফলদ বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সহজতর হবে।


ক. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফল উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। দেশের মোট চাষভুক্ত জমির মধ্যে ফলের আওতায় রয়েছে মাত্র ২% জমি অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের ১০% আসে ফল থেকেই।১৭ তাই বাংলাদেশের জনগণের খাদ্য পুষ্টির চাহিদা পূরণসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম।

ফল ও ফলজাত দ্রব্যাদি রফতানি করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। ডিএই এর তথ্য মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে  বিদেশে ৫,৭৯৭ মে. টন ফল রফতানি করা হয়েছে,১৮ যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। ফলে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

ফল চাষকে কেন্দ্র করে দেশে হাজার হাজার নার্সারি গড়ে উঠছে। বর্তমানে এসব নার্সারি থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার চারা ও কলম বিক্রি হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফল চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘ফলের চাষ বাড়িয়ে পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিশ্ব বাজারে সুস্বাদু বৈচিত্র্যময় ফল রফতানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব’।১৯

খ. ফলের শিল্পায়ন : দেশে শত শত শিল্পকারখানা গড়ে উঠলেও ফলের ওপর তেমন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। তাই ফলভিত্তিক অর্থনীতিতে অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশি ফল বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কুল ইত্যাদি ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করলে ফল ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদিত ফলের মাত্র ৫% দেশের শিল্পকারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়।২০


এমতাবস্থায়, আমরা ফলকে উৎপাদন, সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জ্যাম, জেলি, আচার, চাটনি, মোরব্বা ইত্যাদি সুস্বাদু আইটেম তৈরি করতে পারি। তাহলে একদিকে যেমন দেশে ফলের বাজার তৈরি করা সম্ভব হবে তেমনি বিশ্ব ফল বাজারেও আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারব।


তাছাড়া আমাদের দেশের শিল্প উপকরণ ও শ্রমিকের মূল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। তাই ফল শিল্পে সর্বনিম্ন বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য ফলের উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং রফতানিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

গ. কর্মসংস্থানের সুযোগ : বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সত্ত্বেও মানুষ খাদ্য ও পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। এর কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অভাব। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২৪.৪৭ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে,২১ যাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় পুষ্টিবিদ Sachin e‡jb, Producing enough food is not itself enough, but that food must be harvested, Processed and distributed and the poor must be in a position to have Purchasing in order to access that food resource. ২২ বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ।২৩ এই বেকার যুবকদের ফলের প্রক্রিয়াজাতিরণের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে ফলদ শিল্পকারখানায় চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ফলে তাদের অয়ের সুযোগ বাড়বে এবং তারা তাদের পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে পারবে। এছাড়া তরুণ যুবকদের সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা করলে তাদের মধ্যে নতুন নতুন ফল চাষি উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে তারা স্বনির্ভর হয়ে উপার্জন করতে পারবে।

ঘ. দারিদ্র্য বিমোচন : ফল চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয় বৃদ্ধি করা যায়। পরিবারে খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ফল বাজারে বিক্রি করে পারিবারিক চাহিদা মেটানো যায়। পারিবারিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পর্যায়ে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ জনপ্রিয় করা গেলে পারিবারিক উপার্জন বৃদ্ধি পাবে।


বাংলাদেশের নারীরা সমাজে অবহেলিত এবং অর্থনৈতিক সূচকে অনেকটাই পিছিয়ে। নারীদের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তারা  সহজেই ফল থেকে আচার, জ্যাম, জেলি, জুস ইত্যাদি তৈরি করতে পারবে। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে পরিবারের দরিদ্রতা দূর করতে পারবে। এভাবে নারীদের স্বাবলম্বী করার মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ সমাজের দারিদ্র্য বিমোচন করা সম্ভব।


দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতা বিমোচন করে পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটের ১০-১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়।২৪ বর্তমানে এই বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ফল উৎপাদনে দারিদ্র্য কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে দেশ থেকে দারিদ্র্যের হার কমে যাবে এবং মানুষ স্বাবলম্বী হবে।


ঙ. পরিবেশের ভারসাম্যতা রক্ষা : পরিবেশের ভারসাম্যতা রক্ষায় ফলদ উদ্ভিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি ফলদ উদ্ভিদ থেকে আমরা একাধারে পাই খাদ্য, পুষ্টি, অর্থ ও সুন্দর পরিবেশ। Indian Forest Research Institute এর গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি ফলদ বৃক্ষ বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা করে ১০ লাখ টাকা, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় ৫ লাখ টাকার, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরা শক্তি বাড়িয়ে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, গাছে বসবাসকারী প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় ৫ লাখ টাকা, আসবাবপত্র ও জ্বালানি কাঠসহ ফল সরবরাহ করে ৫ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য জোগান দিয়ে বাঁচায় ৪০ হাজার টাকা।২৫
ফলদ গাছপালা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা করে। তাল, নারিকেলের মতো ফলদ বৃক্ষ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমিয়ে জীবন ও সমপদ রক্ষা করে। ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ বসতবাড়ি রয়েছে। এসব বসতবাড়িতে আছে ৫ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর ফল চাষ উপযোগী জমি।২৬ তাই এসব বসতবাড়িতে যদি ফলের চাষ করা যায়, তবে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্যতা রক্ষা হবে, অন্যদিকে দরিদ্রতা দূরীকরণসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।


উপসংহার : ফল একটি আদর্শ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। তাই অধিক ফল চাষের মাধ্যমে দেশের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবেই আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারব।

তথ্যসূত্র :
১. দৈনিক যুগান্তর, ২৯ এপ্রিল, ২০১৮
২. দৈনিক সংগ্রাম, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৭
৩. দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ জুন, ২০১৭
৪. দৈনিক বণিকবার্তা, ৩০ জুন, ২০১৪
৫. ড. মো: দেলোয়ার হোসেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তায়              
   ফল’, কৃষিবার্তা।
৬. সময় টিভি, ১৭ জুন,২০১৭
৭. সৈয়দা শারমিন আক্তার, ‘পুষ্টিনামা’, অন্যপ্রকাশ,
   ২০১৩, পৃষ্ঠা-১১।
৮. মু. ফজলুল হক রিকাবদার, ‘বাংলাদেশের ফল,’  
   সূচিপত্র প্রকাশনি, ২০১২, পৃষ্ঠা ৫-৬।
৯. দৈনিক অমৃতবাজার, ১৫ জুন, ২০১৭
১০.‘শিশুর বিকাশে ফল তবে পুষ্টিগুণ জানা
    প্রয়োজন’, বিজ্ঞান একাডেমি, ২০০৫, পৃষ্ঠা ১২।
১১. মো: জামিউল ইসলাম, ‘বাণিজ্যিক ফল বাগান’,
     ফজিলাতুন নেছা প্রকাশনি, ২০০৭, পৃষ্ঠা ১-৩।
১২. কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ,‘ফল বৃক্ষের সামর্থ্য :
     খাদ্য, পুষ্টি ও অর্থ’, হালচাষ।
১৩. ঐ (রনরফ)
১৪. দৈনিক বণিক বার্তা, ৩০ জুন, ২০১৪
১৫. জাহিরুল ইসলাম, ‘দেশি ফলে বেশি মজা’, দি
     ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০৫, পৃষ্ঠা. ৩-৪।
১৬. ড. মো: দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, ‘খাদ্য ও
   পুষ্টি নিরাপত্তায় দেশি ফলের অবদান’, কৃষি সংবাদ।
১৭. মো: আলী আশরাফ খান, ‘ফল পরিচিতি ও
    পুষ্টিগুণ’, গতিধারা প্রকাশনি, ২০১৩, পৃষ্ঠা.১।
১৮. ‘বাংলাদেশের ফল ও এর উন্নয়ন’, কৃষিকথা, শ্রাবণ সংখ্যা, ১৪২৪।
১৯. দৈনিক কালেরকণ্ঠ, ২২ এপ্রিল, ২০১৭
২০. ‘ফলের গুরুত্ব’, কৃষিকথা, ভাদ্র সংখ্যা, ১৪২৩।
২১. দৈনিক ভোরের কাগজ, ১৪ অক্টোবর, ২০১৬।
২২. Sachin Tyagi, ‘Fruits for Health and
      Nutritional Security’, 2017, PP.88 2017, PP.88

২৩. দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ মে,২০১৭
২৪. কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ, ‘রোগ প্রতিরোধে
     খাদ্য ও পুষ্টি দি রয়েল পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা.১১।
২৫. দৈনিক যুগান্তর, ২৪ জুন, ২০১৫
২৬. দৈনিক বণিক বার্তা, ৩০ জুন, ২০১৪

 

 মো: তৌফিক আহমেদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ডিপার্টমেন্ট : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বর্ষ : ৩য়, মোবা: ০১৭৬১১০৬৯২১, ইমেইল :toufikahmed56@gmail.com

 

 


Share with :

Facebook Facebook