কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

শাকসবজি সংগ্রহোত্তর পরিবহন ও বাজারজাতকরণ

করার পূর্ব পর্যন্ত শাকসবজি নাড়াচাড়াসহ কিছু ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলাদি যার মাধ্যমে শাকসবজির গুণগতমান রক্ষা করা সম্ভব হয়। তাজা পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখা, তাদের সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানো এবং তুলনামূলক অপচয় কমানোর জন্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তিসমূহ ব্যবহৃত হয়। ভোক্তার নিকট আকর্ষণীয়ভাবে পণ্য উপস্থাপনের জন্য সংগ্রহোত্তর কলাকৌশল প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তমভাবে সংগ্রহোত্তর কার্যাদি সম্পাদনে অনেক ধাপ রয়েছে যা সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
 

প্যাকহাউস স্থাপন
বাণিজ্যিকভাবে উত্তম কৃষি পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হলে মাঠের পাশে একটি প্যাকহাউস স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। সবজির সব ধরনের সংগ্রহোত্তর কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একটি প্যাকহাউস এর গুরুত্ব অপিরিসীম।


একটি প্যাকহাউসের অবস্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে-
যতদূর সম্ভব এটি যাতে কৃষি খামারের কাছাকাছি হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
পণ্য এবং পণ্যের প্যাকেটগুলো পরিবহনে উঠানো ও নামানোর সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে।
বাজার এবং পরিবহন টার্মিনালে যাতে সহজেই প্রবেশ করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

 

নিকটস্থ বাজারে সরবরাহের জন্য কেবলমাত্র বাছাইকরণ ও প্যাকেজিং এর প্রয়োজন হয় কিন্তু দূরবর্তী বাজারের জন্য আরো অতিরিক্ত কিছু সংগ্রহোত্তর কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। এছাড়া যে সকল সবজি পণ্য তাৎক্ষণিকভাবে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্য পরিবহন করা হবে সেগুলো সংরক্ষণাগারে রাখার প্রয়োজন হয় না।
মূলত একটি সাধারণ প্যাকহাউসে শাকসবজি সংগ্রহোত্তর যে সকল ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় তা হলো-


১. ফল ও সবজি/পণ্য গ্রহণ।
২. সটিং  অথবা বাছাইকরণ
৩. পণ্য ঠাণ্ডাকরণ
৪. গ্রেডিং অথবা শ্রেণিকরণ
৫. পরিষ্কারকরণ
৬. প্যাকেজিং
৭. পরিবহন ও বাজারজাতকরণ
৮. সংরক্ষণ

 

সবজি বা পণ্য গ্রহণ
প্যাকহাউসে সবজি আসার পর জাত এবং উৎপাদনের স্থানসহ ওজন নথিবদ্ধ করা।
সবজি বাজারজাতকরণের জন্য বিশেষ করে উন্নত বাজারে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে নথি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে উপযুক্ত মেশিনের সাহায্যে বালাইনাশকের উপস্থিতির মাত্রা পরীক্ষা করে জানা প্রয়োজন।
বাজারজাতকরণের সময় পণ্যেও লেভেলিং এ নমুনা পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখ করলে উন্নত মার্কেটে পণ্য সরবরাহ করার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হবে।
বিভিন্ন সংগ্রহোত্তর কার্যক্রম শুরু করার পূর্বে পণ্যকে সূর্যের আলো ও তাপ থেকে দূরে রাখতে হবে, বড় প্যাকেজিং এর কারণে শারীরিক ক্ষত এবং মাটি ও আবর্জনা ইত্যাদির সংস্পর্শ হতে রক্ষা করতে হবে যাতে জীবাণুদ্বারা সংক্রামিত হতে না পারে।

 

সর্টিং অথবা বাছাইকরণ
সর্টিং কার্যক্রমের মাধ্যমে পণ্যে ৪০-৬০% মূল্য সংযোজন করা সম্ভব।
সর্টিং এর মাধ্যমে নিম্নলিখিতভাবে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো যায়-
ক) রোগের সংক্রমণ হতে সুস্থ পণ্যকে পৃথক রাখা সম্ভব।
খ) ক্ষতযুক্ত ও পাকা ফলের সহিত ভালো ফল/সবিজ রাখতে উৎপাদিত ইথিলিনের দ্বারা ভালো সবজিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে সর্টিং ও গ্রেডিং এর মাধ্যমে পণ্যেও শারীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন ও শারীরিক ক্ষতের পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়।
সংগ্রহের পর অতিরিক্ত পাকা, কাটা ও ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ বা অন্যভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, পরিপক্ব ও অপরিপক্ব ফসল বাছাই করে নিতে হয়। নতুবা সঠিক বাজার মূল্য পাওয়া যায় না।

 

পণ্য ঠাণ্ডাকরণ
প্যাকহাউসে সবজি সর্টিং করার পরের কাজ হচ্ছে সবজি ঠাণ্ডাকরণ। স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে বরফ কুচি মিশিয়ে তারপর এতে সবজি রাখলে সবজি আন্তঃতাপমাত্রা লক্ষণীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেলে, এভাবে ঠাণ্ডা করলে সবজির আন্তঃতাপমাত্রা প্রায় ১৩-১৭ ডিগ্রি পর্যন্ত নামিয়ে আনা যায়।
ঠাণ্ডাকরণের মাধ্যমে শ্বসনের হার কমিয়ে আনা যায় এবং ফল ও সবজির জীবনকাল বেড়ে যায়।


গ্রেডিং অথবা শ্রেণিকরণ
গ্রেডিং স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে পণ্য বাণিজ্যের বিশ্বজনীন প্রতীক। গ্রেডের মান অনুযায়ী বাজারে পণ্যেও চাহিদা নির্ধারিত হয় এবং সেই অনুযায়ী প্যাকহাউসের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সর্টিংকৃত পণ্যসমূহ নির্দিষ্ট আকার, ওজন ও পরিপক্বতার ওপর ভিত্তি করে গ্রেডিং বা শ্রেণিকরণ করা হয়। সর্টিং এর পরে  বা প্যাকেজিং এর ঠিক পূর্বে গ্রেডিং করা প্রয়োজন।


পরিষ্কারকরণ
বাজারে উচ্চ মূল্য পাওয়ার জন্য সবজি বা পণ্য পরিষ্কার করতে হবে।
পরিষ্কার করার মাধ্যমে সবজিতে জীবাণুর সংক্রমণ, শারীরিক ক্ষত এবং পরিবহন খরচ হ্রাস করা যায়।
নিম্নলিখিতভাবে সবজি বা পণ্য পরিষ্কার করতে হবে
বেগুন ও টমেটোর বোঁটা, সরিষা পাতার মূল, ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাতা ও বাড়তি শিকড় ছাঁটাই করতে হবে।  বাঁধাকপির ক্ষেত্রে ৩-৪টি মোড়ানো পাতা রাখতে হবে।
পরিষ্কার নরম কাপড় দিয়ে টমেটো, বেগুন বা শসা মুছে নিতে হবে।
পরিষ্কার পানি দিয়ে সবজির সাথে লেগে থাকা মাটি ও অন্যান্য আবর্জনা ধৌত করতে হবে।
পরিষ্কারকরণের সময় সর্টিং এর কাজও করা যায়।
পণ্য যেন কোনোভাবেই সরাসরি মাটির সংস্পর্শে না আসে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ মাটি হলো বিভিন্ন  জীবাণুর অন্যতম উৎস, যার সংস্পর্শে রোগের সৃষ্টি হয়।

 

প্যাকেজিং অথবা পণ্যের মোড়কীকরণ
প্যাকহাউসের প্রধান কাজ হলো পণ্যকে প্যাকেজিং করা। যা সতেজ পণ্যকে ক্ষত হওয়া ও বাহিরের আঘাত থেকে রক্ষা করে। দুর্বল ও অনুপোযুক্ত প্যাকেজিং ব্যবস্থার কারণে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পরিবহন ও হ্যান্ডলিং এর সময় সবচেয়ে বেশি সংগ্রহোত্তর ক্ষতি হয়।
বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং দ্রব্য বা কন্টেইনার পাওয়া যায়। সবজির প্রকৃতি, বাজারে দূরত্ব, যানবাহনের ধরন এবং রাস্তার অবস্থার উপর নির্ভর করে প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।
সতেজ সবিজ বা ফল পরিবহনের ক্ষেত্রে প্যাকেজিং এর জন্য কাঠের বাক্স বা প্লাস্টিক ক্রেটস-ই অধিকতর উপযোগী। তবে এই পাত্রসমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে লাইনার হিসেবে মুদ্রণবিহীন নিউস পেপার, পরিষ্কার কলার পাতা ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।
সবজির উত্তম প্যাকেজিং-এর জন্য আবশ্যিক কার্যক্রম
সবজি প্যাকেজিং এর জন্য পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করতে হবে।
যদি যান্ত্রিকভাবে সবজির প্যাকেট হ্যান্ডলিং এর ব্যবস্থা না থাকে, তবে সেক্ষেত্রে একক প্যাকেটের ওজন ৪০ কেজির নিচে হতে হবে, যাতে করে একজন শ্রমিক একাই একটি প্যাকেট সহজে তুলতে বা নামাতে পারে।
পাত্রের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী সবজি ভরতে হবে। কারণ ধারণক্ষমতার বেশি হলে সবজিতে চাপজনিত ক্ষত সৃষ্টি হবে। আবার পরিমাণ কম হলে কম্পনজনিত (ভাইব্রেশন) ক্ষত সৃষ্টি হবে।
একটি পাত্রে কেবলমাত্র একই ধরনের পরিপক্বতা বিশিষ্ট সবজি বা পণ্য রাখতে হবে।
প্যাকেজিং পাত্রে সবজিকে এমনভাবে রাখতে হবে যাতে নড়াচড়া করতে না পারে।
সবজিকে ভরার সময় পাত্রকে মৃদুভাবে নড়াচড়া করতে হবে যাতে করে পাত্রের ভেতরের ফাঁকা স্থান সবজি দ্বারা পূর্ণ হয়।
প্যাকেজিং এর পর পাত্রকে সঠিকভাবে বেঁধে দিতে হবে।
অতঃপর প্যাকেটকৃত সব্জি বাজারজাতকরণের পূর্বে শীতল স্থানে রাখতে হবে।

 

পরিবহন
পরিবহন বাজারজাতকরণের অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ কাজের মাধ্যমে পণ্যের স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি হয়। যে কাজের মাধ্যমে উৎপাদকের নিকট হতে ক্রেতার নিকট পণ্য পৌঁছে দিয়ে স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি করা হয় তাকে পরিবহন বলে। অর্থাৎ পরিবহন হলো পণ্য উৎপাদনের স্থান হতে ক্রয়ের বা ব্যবহারের স্থানে স্থানান্তর করা এবং এভাবে পণ্যের সময়মতো ও স্থানগত উপযোগ সৃষ্টি হয়।
পরিবহন দুভাবে পণ্য বণ্টন প্রণালিতে সাহায্য করে। যাদের একটি হলো উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামাল শিল্পে পৌঁছে দিয়ে এবং অন্যটি হলো শিল্প উৎপাদিত পণ্য ক্রেতা বা ভোক্তার নিকট পৌঁছে দিয়ে। পরিবহন ব্যবস্থা পণ্য মূল্যের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পণ্য পরিবহন যত সহজ, দ্রুত ও সহজ হবে, পণ্যের মূল্যও তত হ্রাস পাবে। ফলে ক্রেতারা স্বল্প মূল্যে তাদের কাক্সিক্ষত পণ্যটি ক্রয় করতে পারবে। পণ্যসামগ্রী যে স্থানে উৎপাদিত হয়, সে স্থানে ভোগ হবে এমন নয়। উৎপাদনের স্থান হতে ভোগ স্থানের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এখানে পরিবহন উৎপাদক এবং ভোক্তার নিকট পৌঁছিয়ে দেয় ফলে তাদের মধ্যে যে স্থানগত বাধা থাকে, তা দূর হয়। ক্রেতাদের মাঝে যথোপোযুক্ত সময়ে সরবরাহ করার জন্য পণ্য উৎপাদন করা হয়। বিপণনকারীর মূল লক্ষ্য থাকে ক্রেতাদের হাতের নাগালে পণ্য নিরাপদে সরবরাহ করা। পরিবহনের মাধ্যমে উৎপাদকের নিকট হতে বিভিন্ন হাত ঘুরে পণ্যটি চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট সরবরাহ করা হয়। ফলে বিপণনের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়।


ভোক্তার সন্তুষ্টি বিপণনকারীর মূল উদ্দেশ্য। পণ্য হতে ক্রেতাদের প্রত্যাশা পূরণ হলে ভোক্তারা সন্তুষ্ট হয়। তবে ক্রেতারা শুধুমাত্র পণ্যের গুণগত মান, আকার, পরিমাণ ইত্যাদির দ্বারা সন্তুষ্ট হয় না। তারা পণ্যটি হাতের নাগালে পাওয়ারও প্রত্যাশা করে। ক্রেতাদের এরূপ প্রত্যাশা পূরণ কেবলমাত্র পরিবহনের দ্বারাই সম্ভব।


পণ্য বিভিন্ন পথে পরিবাহিত হয়। এগুলো হলো স্থলপথ (সড়ক ও রেল পরিবহন), আকাশ পথ (বিমান পরিবহন) এবং জল পথ  (নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক পরিবহন)।


পণ্য পরিবহনে অনুসরণীয়
পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত গাড়ির অবশ্যই লাইসেন্স থাকতে হবে এবং চালকেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে।
যে সকল কর্মীরা মালামাল গাড়িতে উঠানো নামানোর কাজে অংশগ্রহণ করবে তাদের অবশ্যই জীবাণুমুক্ত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
পরিবহনের সময় অবশ্যই সবজির ধরন, পরিমাণ, তারিখ, সবজি উৎপাদনকারীর নাম ও ঠিকানা এবং পরিবহন চালকের নাম লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত এর রেকর্ড রাখতে হবে।
সবজি পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবহনকারী যান পরিবহনের পূর্বে এবং পরে নিয়মিত পাম্প এর পানির মাধ্যমে ভালোভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
খেয়াল রাখতে হবে যানবাহন এর ভেতরে যেন ইঁদুর, তেলাপোকা, পিঁপড়া ইত্যাদি না থাকে এবং কোনো প্রকার মলমূত্র বা অন্য কিছুর খারাপ গন্ধ না থাকে।
খোলা ভ্যানে পরিবহন করলে উপরে অবশ্যই ছাউনি থাকেত হবে। তা না হলে বৃষ্টির পানি, রোগ বালাই ও ধুলাবালি দ্বারা সবজির গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে।
একই পরিবহনে সবজির সাথে অন্য কোনো দ্রবাদি যেমন- রাসায়নিক সার, কীটনাশক/বালাইনাশকের প্যাকেট ইত্যাদি যেন পরিবহন না করা হয় সে দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
গাড়ি অতিরিক্ত বোঝাই দেওয়া যাবে না।
কন্টেইন বা প্যাকেজ সঠিকভাবে সারিবদ্ধভাবে করতে হবে।
পুরো প্যাকেজ লোড সম্পূর্ণ হালকা রঙিন ত্রিপল দিয়ে ঢাকতে হবে।
বাংলাদেশে প্যাকেজিং সন্তোষজনক নয় যদিও এই প্যাকেজিং পদ্ধতির যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটানো সুযোগ আছে তাতে পণ্যের গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ ও সংগ্রহোত্তর ক্ষতি অনেক কমানো যায়।  এজন্য নি¤œলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে।
প্রচলিত বাঁশের তৈরি প্যাকেজ এর পরিবর্তে প্ল­াস্টিক ক্রেট, ওভেন প্ল­াস্টিকের বস্তা, প্লাস্টিকের নেট ব্যাগ এবং ঢেউখেলানো ফায়ার বোর্ডের কার্টুন ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্যাকেজটি শক্ত হওয়া দরকার
প্যাকেজ অধিক বড় হওয়া উচিত নয় বাংলাদেশে ব্যাপারিরা সাধারণত বড় প্যাকেজ ব্যবহার করে। যাতে করে ৩০০-৬০০ কেজি ধরে এতে পণ্যের ক্ষতি হওয়ায় সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে।
পরিবহনের সময় বিভিন্ন রকমের প্যাকেজিং একসেসরিজ যেমন বাটিং, মোড়া, ফোমনেট, পেপার, পাতা, লতা, ইত্যাদি ব্যবস্থা করতে হবে।
বাজারজাতকরণে উৎসাহিত করার জন্য প্যাকেজে লগেট বা অন্যান্য তথ্য সংরক্ষিত ট্যাগ লেভেল থাকতে হবে।
পরিবহনের সময় সবজি বস্তা বা ক্রেট এর ওপর বসে অথবা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করা যাবে না। পরিবহন যানে পণ্যদি উঠনো নামানোর সময় যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করা এবং সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা।
পণ্যসামগ্রী খুব শক্ত করে বাঁধা যাতে তা নড়াচড়া করতে না পারে এবং পরিবহন যানের জায়গা সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চত করা;
পণ্যের প্যাকেটগুলো এমনভাবে সাজানো যাতে নিচের পণ্য সামগ্রীর কোনো ক্ষতি না হয়;
গাড়ি চালককের যতেœর সাথে গাড়ি চালাতে হবে যাতে পণ্যে তেমন ঝাঁকুনি না লাগে;
পরিবহনকালে অবাধ বাতাস চলাচলের সুবিধা থাকতে হবে যাতে বাইরের আলো-বাতাস পণ্যের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং পণ্যের শ্বসনজনিত গ্যাস ইথাইলিন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি সহজেই বের হয়ে যেতে পারে।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কাভার্ডভ্যানে সবজি পরিবহনের সর্বোত্তম পন্থা।
নির্বাচিত সবজির সংরক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য
ফল ও সবজির গুণগত মান রক্ষা ও সংগ্রহোত্তর অপচয় রোধে সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফল ও সবজি যেসব কারণে সংরক্ষণ করা হয় বা সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়, তা সাধারণত নি¤œরূপ
মাঠ থেকে সংগ্রহের পর বাজারজাতকরণের পূর্বে ও বাজারজাতকরণের সুবিধার্থে;
খুচরা বাজারেও সরবরাহের আগে সাময়িক সংরক্ষণের জন্য;
বৈদেশিক বাজারে রপ্তানির পূর্বে গুণগতমান অক্ষুন্ন রাখার উদ্দেশ্যে;
পচন থেকে রক্ষা করে প্রয়োজনমতো ভবিষ্যতে বা অমৌসুমে বিক্রি বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে।
সংরক্ষণাগার এর পরিচর্যা
সংরক্ষণাগার অবশ্যই ময়লা ও রোগ জীবাণুমুক্ত, শুষ্ক এবং বাতাস চলাচলের সুবিধাযুক্ত ঠা-া জায়গা হতে হবে।
মেঝের ওপর ফসল রাখা যাবে না। ফল ও শাকসবিজ ক্রেটের মাধ্যমে মেঝে থেকে ১ ফুট উপরে তাকের মধ্যে সাজিয়ে স্টোর করতে হবে। এতে করে সংগ্রহোত্তর রোগ বালাই বা কীটপতঙ্গ থেকে ফসলকে অনেকাংশে রক্ষা করা যাবে।
উত্তম গুণাগুণ সম্পন্ন পণ্য সংরক্ষণ করা;
ক্ষতযুক্ত বা রোগজীবাণুযুক্ত পণ্যকে সংরক্ষণ না করা;
সংরক্ষণের আগে পণ্যকে অবশ্যই প্রাক শীতলীকরণ করা;
যে পাত্রে পণ্য সংরক্ষণ করা হবে সেই পাত্রটির মধ্য দিয়ে যাতে সহজে বায়ু চলাচল করতে পারে সে ব্যবস্থা রাখা;
দুইটি সংরক্ষণ পাত্রের মধ্যে অবশ্যই কিছু ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে;
যখন বিভিন্ন ধরনের পণ্য একসঙ্গে সংরক্ষণ করা হবে তখন লক্ষ্য রাখতে হবে যে পণ্যগুলো যেন একই ধরনের তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন হয়;
নির্বাচিত ফল ও সবজি সংরক্ষণের উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা
বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ একটি প্রধান সমস্যা। অনুন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগী সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে কৃষি পণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ সম্ভব হয় না। ফলে কৃষকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কৃষিতে পণ্য অধিক উৎপাদিত হলে উৎপাদিত দ্রব্য স্থানান্তরের জন্য পরিবহন তথা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়। কৃষির উন্নতি অবনতির সাথে পরিবহন তথা যোগাযোগ ব্যবস্থা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের সাথে শহরের বা হাটবাজারের কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে উপযুক্ত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা নাই। যার ফলে পচনশীল পণ্য সহজেই নষ্ট হয় এবং কৃষকরা অনেক কৃষিপণ্যের উপযুক্ত দাম থেকেও বঞ্চিত হয়। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় সেজন্য বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব থেকে কৃষকদের মুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের এক অঞ্চলের ভোক্তারা অন্য অঞ্চলের পণ্য  বা সেবা ভোগের অধিকার লাভ করেছে। এতে একদিকে ক্রেতারা যেমন তাদের পণ্য ভোগের সুবিধা পাচ্ছে, তেমনি উৎপাদকের উৎপাদিত  পণ্যেও বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।

 

প্রফেসর ড. এম. এ. রহিম১ ড. মো. শামছুল আলম২

১পরিচালক, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বা.কৃ.বি., ময়মনসিংহ, মোবাইল : ০১৭১১৮৫৪৪৭১ ২এস. এস. ও., উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ, বিনা

 


Share with :

Facebook Facebook