কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পুষ্টি সমস্যা দূরীকরণে শাকসবজির ভূমিকা (কৃষিকথা ১৪২৫)

বাংলাদেশ জনসংখ্যার অনুপাতে ক্ষুদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন  করেছে। আজ সারা বিশ্বের ‘খাদ্য নিরাপত্তা’ অর্জনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর পুষ্টি অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এখনও পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতি তিনজন শিশুর খর্বাকৃতি অথবা বয়সের অনুপাতে কম ওজন। এদিকে ১৫-৪৯ বছরের নারীদের ক্ষেত্রে ক্রনিক এনার্জির অভাবজনিত সমস্যায় আক্রান্ত নারীর সংখ্যা (১৭ শতাংশ) কমে আসলেও অন্যদিকে ২৪ শতাংশ নারী অধিক ওজন সম্পন্ন (Over weight/obesity)। যার ফলে অসংক্রামক ব্যাধিতে (Noncommunicable Disease) আক্রান্ত ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে এবং ফলশ্রুতিতে অসংক্রামক  ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও (৬৮ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য অপুষ্টি একটি মারাত্মক জাতীয় সমস্যা। এ দেশের নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরী অধিকাংশ মানুষই ওপরে বর্ণিত অপুষ্টির/অতিপুষ্টি/অনুপুষ্টির অভাবজনিত অপুষ্টির শিকার। তবে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মহিলারাই বেশি অপুষ্টিতে ভুগছে।


বাংলাদেশ পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দারিদ্র্র্য বিমোচন ও স্বাস্থ্য সেবা উন্নয়নের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর মাঝে বিরাজমান পুষ্টি অবস্থা উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে চলেছে। তারপরও অপুষ্টি সমস্যা, অতি পুষ্টি ও  অনুপুষ্টির অভাবজনিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা বিরাজমান এবং এর ফলশ্রুতিতে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ঝুঁকি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। এসব পুষ্টি সমস্যা নিরসনে বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন অর্জনের জন্য ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার ৮টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পূর্বশর্ত হচ্ছে পুষ্টি অবস্থার উন্নতি। জনগোষ্ঠীর সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যগ্রহণ অত্যাবশ্যক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সংজ্ঞানুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য (Healthy Diet) গ্রহণই প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার মাধ্যমে শরীরের সঠিক গঠন, বৃদ্ধি ও ক্ষয় পূরণ করার মধ্য দিয়ে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মাধ্যমে পুষ্টি অবস্থার টেকসই উন্নয়ন অর্জন নিশ্চিত করা সম্ভব।


Healthy Diet এর সংজ্ঞানুযায়ী প্রতিদিনের খাবারে যেমন ৫৫-৬৫ শতাংশ এনার্জি শস্যজাতীয় খাবার থেকে গ্রহণ করতে হবে তেমনি চর্বি জাতীয় খাবার থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি একজন প্রাপ্ত বয়স্কের প্রতিদিনের খাবারে ৪০০ গ্রাম শাকসবজি/ফলমূল খেতে হবে কিন্তু আমাদের জনপ্রতি খাদ্য গ্রহণের তথ্যানুযায়ী (HIES 2016) ২০১৬) এখনও ২০০ গ্রাম সবজি ও ফলমূল গ্রহণ করে থাকে, যা পর্যাপ্ত নয়। একজন পূর্ণবয়স্ক লোক গড়ে ১৬৭ গ্রাম সবজি খায়। এর সাথে আলু ও মিষ্টি আলু যোগ করলেও প্রতিদিন গড় পরিমাণ ৬৫ গ্রামের বেশি হয় না আর ৩৬ গ্রাম ফল অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় আমরা খুব অল্প পরিমাণ শাকসবজি আর ফলমূল খাই।


বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় স্থানে তবু বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি ফলমূল খায় না। আমাদের দেশে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন রকমের শাকসবজি পাওয়া যায়। তাই প্রতিদিনের খাবারে সবজির বিভিন্ন রকম আইটেম রাখা খুব কঠিন ব্যাপার না। তবে বেশির ভাগ লোকই প্রতিদিন শাক বা সবজির যে কোনো ১টি আইটেম খেয়ে থাকেন, যা আমাদের সব ধরনের পুষ্টি সরবরাহ করে না। বাংলাদেশের শাকসবজির পুষ্টিমাণের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে একেক ধরনের শাকসবজি একেক ধরনের পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে থাকে, তাই বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির সংমিশ্রণ খাদ্যে বিভিন্ন পুষ্টি নিশ্চিত করে।


আমাদের দেশে শীতকালে নানা প্রকার শাকসবজি উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, শালগম, টমেটো, আলু, গাজর, বেগুন, মুলা, লাউ, শিম, ধনেশাক, লালশাক প্রভৃতি অন্যতম। শীতকালীন শাকসবজি অতি প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাদ্য। এতে মানব দেহের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এ এর উৎস, ভিটামিন বি সমূহ, সি এবং ক্যালসিয়াম, লৌহ, জিঙ্ক প্রভৃতি অতি প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন শিমজাতীয় সবজিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে উদ্ভিজ প্রোটিন আছে। তাছাড়া গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শীতকালীন শাকসবজি বিশেষ করে গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, মুলাশাক, লালশাক ও পালংশাকে প্রচুর পরিমাণে সে সব ক্যারোটিন থাকে, যা ভিটামিন এ এর উৎস। ফলে এসব ক্যারোটিন হতে আমাদের দেহে ভিটামিন ‘এ’ তে রূপান্তর করতে পারে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকে শীতকালীন শাকসবজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার পাশাপাশি শাকসবজি দেহের রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শরীরের চাহিদা মতো শাকসবজি খেলে নানা রকম রোগব্যাধি যেমন প্রতিরোধ করা সম্ভব তেমনি শরীরকে রোগ থেকে রক্ষা করে শরীর সুস্থ রাখে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শাকসবজি খাওয়ার ফলে ক্যান্সার, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম।


গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, যারা পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজি খেয়ে থাকে তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কাও কমে যায়। শীতকালীন শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে। এই আঁশ গ্রহণকৃত খাদ্য দ্রব্যের মধ্যস্থিত কোলস্টেরল/চর্বিসহ অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিকের সাথে যৌগ তৈরি করে শরীর থেকে নিষ্কাশন করার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। শাকসবজিতে বিদ্যমান আঁশ মলাশয়ের ক্যান্সার, বহুমূত্র, স্থুলকায়ত্ব, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালীর পাথর ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে দেহকে সুস্থ ও সতেজ রাখে।


তাছাড়া শীতকালীন শাকসবজি শিশুদের অপুষ্টিজনিত রাতকানা, অন্ধত্ব, রিকেট, বিভিন্ন প্রকার চর্মরোগ, স্কার্ভি, মুখ ও ঠোঁটের কোণে ঘা, রক্তশূন্যতা দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, অপুষ্টি ও দেহের রোগ প্রতিরোধে শাকসবজির ভূমিকা অপরিসীম। শিশুদের সম্পূরক খাদ্য তৈরির ক্ষেত্রে উল্লেখিত ভিটামিন আর মিনারেলস শরীরের চাহিদানুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য শাকসবজিও পরিমাণমতো ব্যবহার করা যেতে পারে।


শীতে হরেক রকম সবজির প্রাচুর্য দেখা যায়, সারা বছর তার কিয়দাংশ পাওয়া যায় না। শুধু সহজলভ্যতায় নয় এসব সবজির পুষ্টিগুণও অধিক। শীতের প্রতিটি সবজিতেই প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা থাকে। তাই সুস্থ ও সুন্দর থাকার জন্য এসব শাকসবজি প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত।


Healthy Diet এর সংজ্ঞা অনুযায়ী একজন শিশুর প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ গ্রাম শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ উৎপাদনের সাথে সাথে বাড়ছে কিন্তু এখনও WHO সুপারিশ অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষ সম্ভবত এত কম পরিমাণ শাকসবজি খায় না। বস্তুত আমাদের খাদ্য তালিকায় ভাত জনপ্রিয়তার শীর্ষে। সে তুলনায় শাকসবজির কদর একেবারেই কম। ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ লালশাক, পালংশাক, মুলাশাক কিংবা দেশীয় যে কোনো শাকের মাত্র ৫০ গ্রাম আমাদের দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু শাকসবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। শাকসবজি আবাদের সুবিধা হলো ফসলি মাঠে যেমন শাকসবিজ চাষ করা যায়, তেমনি জমির আইল বা রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে এক টুকরো জায়গায়, বসতবাড়ির আঙিনায়, ঘরের চালে, দালানের ছাদে, টবে বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদন সম্ভব। কাজেই অধিক পরিমাণে পুষ্টিসমৃদ্ধ শাকসবজির চাষ করে তা পরিমাণমতো খাওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক তথা জাতীয় সমস্যা দূরীকরণে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন এবং আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ-সবল ও অপুষ্টিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

অধ্যাপক নাজমা শাহীন

পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৪৭৭৯৯৫৬২


Share with :

Facebook Facebook