কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

জৈব পদ্ধতিতে নিরাপদ সবজি উৎপাদন

শাকসবজি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো কিন্তু সচরাচর আমরা যেসব শাকসবজি খাচ্ছি তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো, কতটা নিরাপদ? কি ধনী, কি গরিব দেশ-পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বর্তমানে বাণিজ্যিক শাকসবজি উৎপাদনে ক্ষতিকর রাসায়নিক বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার উচ্চ মাত্রায় যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সাথে বাড়ছে শাকসবজি সংগ্রহের পর তাতে বিভিন্ন জীবাণুর উপস্থিতি ও পচন, শাকসবজি পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত দূষিত পানি ইত্যাদি। বিভিন্ন পর্যায়ে শাকসবজি গ্রহণ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। উৎপাদন পর্যায়ে, সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে, বিপণন পর্যায়ে এমনকি শাকসবজি রান্না ও খাওয়ার সময়ও তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য নানা কারণে অনিরাপদ হয়ে উঠছে।


তাই শাকসবজি খাওয়া এখন স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো তা ভাবতে হচ্ছে। অনেকেই এসব ঝুঁকির কথা ভেবে শাকসবজি খাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আর যাদের টাকা আছে তাদের অনেকেই এখন খুঁজছেন বিষমুক্ত নিরাপদ শাকসবজি। এক কথায় অধিকাংশ স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ এখন দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা শাকসবজির দিকে। তবে মনে রাখা দরকার যে, নিরাপদ শাকসবজি মানে শুধু জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা শাকসবজিকে বুঝায় না। জৈব শাকসবজি ক্ষেত থেকে তোলার পর খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত নানাভাবে অনিরাপদ হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, কোথায় মিলবে নিরাপদ শাকসবজি, কে দেবে তার নিশ্চয়তা? আর কৃষকরা তা উৎপাদন করলেও কে দেবে তার উপযুক্ত মূল্য? এসব নানারকম চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এখন আমাদের দ্রুত এগিয়ে যেতে হচ্ছে জৈব পদ্ধতিতে নিরাপদ শাকসবজি উৎপাদনের দিকে। সরকারও নিরাপদ শাকসবজি উৎপাদনের ওপর জোর দিয়ে বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করেছে।


উন্নত বিশ্বের প্রায় সব মানুষ এখন নিরাপদ সবজি বা অর্গানিক ভেজিটেবলের সন্ধান করছেন। বাংলাদেশেও এখন বিভিন্ন সুপার শপে অর্গানিক ভেজিটেবলের বিপণন শুরু হয়েছে। অর্গানিক ভেজিটেবল বা জৈব সবজির দামও অপেক্ষাকৃত বেশি। তবে আমাদের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে আগে দরকার খাদ্য, বেশি পরিমাণে সবজি উৎপাদন। জৈব পদ্ধতিতে সবজি চাষে ফলন হয় কম। সেজন্য বাণিজ্যিকভাবে জৈব পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে তা আমাদের খাদ্য ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে না। সেক্ষেত্রে জৈব শাকসবজির দাম যদি কিছুটা বেশি পাওয়া যায় তাহলে অনেক কৃষক তা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে। স্বল্প পরিসরে বিশেষ করে বসতবাড়িতে আমরা প্রত্যেকে অন্তত জৈব পদ্ধতিতে শাকসবজি উৎপাদন করে নিজেরা সেসব সবজি খাওয়া অভ্যাস করতে পারি। রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করে বাণিজ্যিকভিত্তিতেও জৈব পদ্ধতিতে শাকসবজি উৎপাদন করা সম্ভব।


জৈব পদ্ধতিতে সবজি চাষের ধারণা : রাসায়নিক সার, বালাইনাশক, আগাছানাশক, হরমোন ইত্যাদি বাদ দিয়ে ফসলচক্র, সবুজ সার, কম্পোস্ট, জৈবিক বালাই দমন এবং যান্ত্রিক চাষাবাদ ব্যবহার করে শাকসবজি চাষই হলো জৈব সবজি উৎপাদন। অর্থাৎ এ পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং কোনো রাসায়নিক দ্রব্য চাষ কাজে ব্যবহার করা হয় না। এতে ফসল দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না ও নিরাপদ শাকসবজি উৎপাদন অনেকটা নিশ্চিত হয়।


জৈব চাষাবাদের ইতিহাস : জৈব চাষাবাদের ধারণার উৎপত্তি আসলে আদিম। সুপ্রাচীন কাল থেকে এ পদ্ধতিতেই চাষাবাদ হয়ে আসছে। বিগত শতকে চাষাবাদে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়। রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে ফলন বাড়ানো হয়। ক্ষুধাময় বিশ্বে সে সময় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। সে প্রেক্ষিতে হয়ত সেটাই ঠিক ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের বোধোদয় হয় যে, রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে চাষের ফলে পেটের ক্ষুধা মিটছে ঠিকই কিন্তু পাশাপাশি এর ফলে মানুষের অসুস্থতা বাড়ছে। তাই ১৯৯০ সাল থেকে জৈব পদ্ধতিতে উৎপন্ন দ্রব্যের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। জৈব পদ্ধতিতে উৎপন্ন দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জৈব পদ্ধতিতে চাষকৃত এলাকাও বাড়তে থাকে। পৃথিবীর প্রায় ৩ কোটি ২২ লক্ষ হেক্টর জমিতে এখন জৈব পদ্ধতিতে ফসল চাষ হচ্ছে। এটা পৃথিবীর মোট আবাদি জমির ০.৮%। পাশাপাশি স্থানীয় জাতের জৈব পদ্ধতিতে আবাদ হয়েছে ৩ কোটি হেক্টরে।


১৯৩০ সালে জৈব কৃষির জন্য আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৩৯ সালে লর্ড নর্থবোর্ন তার লেখা খড়ড়শ ঃড় ঃযব খধহফ (১৯৪০) বইয়ে প্রথম ড়ৎমধহরপ ভধৎসরহম শব্দ ব্যবহার করেন। রাসায়নিক সারের উপর ক্রমেই কৃষকদের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসাবে এই আন্দোলন শুরু হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রথম সুপার ফসফেট সার তৈরি শুরু হয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যামোনিয়া থেকে উদ্ভূত সারসমূহ তৈরি শুরু হয়। কম পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়, তাড়াতাড়ি কাজ করে অর্থাৎ খুব শক্তিশালী, দামে সস্তা এবং পরিবহনে সুবিধা হওয়ায় রাসায়নিক সার দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। অনুরূপভাবে ১৯৪০ সালের প্রথম দিকে রাসায়নিক বালাইনাশকের এমন অগ্রগতি ঘটে যে  ওই দশকের শেষের দিকে রাসায়নিক বালাইনাশকের যুগ শুরু হয়। স্যার আলবার্ট হাওয়ার্ডকে জৈব কৃষির জনক বলে বিবেচনা করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে জে.আই.রডেল, যুক্তরাজ্যে লেডি ইভ বেলফোর এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আরও অনেকে জৈব কৃষির ওপর কাজ করেন।


শুরু থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীর মোট কৃষি উৎপাদনের শতকরা খুব নগন্য অংশই জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করে করা হয়েছে। পরিবেশ সচেতনতা এবং প্রয়োজন সাধারণ মানুষের কাছে জৈব কৃষির চাহিদা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। বাড়তি মূল্য এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি কৃষকদেরকে জৈব কৃষির প্রতি আকর্ষণ করছে। উন্নয়নশীল দেশে প্রথাগত চাষ পদ্ধতিকে জৈব পদ্ধতিতে চাষের সাথে তুলনা করা যেতে পারে কিন্তু তাদের প্রত্যয়নপত্র নেই। যাহোক ইউরোপে জৈব কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। আন্দোলন শুরুর মাধ্যমে জৈব কৃষি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই ভারতবর্ষে বেশ উন্নত জৈব পদ্ধতির চাষ হতো। ভারতীয় প্রাচীন গ্রন্থে জৈব কৃষির বিভিন্ন পদ্ধতির বর্ণনা আছে। ভারতে এখনও অনেক গ্রামে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ‘সঞ্জীবন’  পদ্ধতি এরূপ একটি জৈব কৃষি পদ্ধতির উদাহরণ।


জৈব পদ্ধতিতে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের প্রযুক্তি : কম খরচে কিভাবে জৈব পদ্ধতিতে নিরাপদ চাষ করা যায় সেটাই জৈব কৃষির প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কেননা, জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্যকেও বাজারে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। আবার স্বল্প উপকরণ ব্যবহারের ফলে তুলনামূলকভাবে উৎপাদনও কম হয়। তাই জৈব খামার ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার আগে খামারে আয়-ব্যয়ের একটা হিসেব কষে ও বাজারে বিক্রির সুযোগ কোথায় কোথায় আছে তা করতে হবে। পাশাপাশি জৈব সবজি বা অর্গানিক ভেজিটেবল কেন ক্রেতারা কিনবেন সে বিষয়েও প্রচারণা চালাতে হবে। মানুষ যত বেশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতন হবে, তত বেশি জৈব সবজি কেনার দিকে ঝুঁকবে। জৈব সবজি চাষে যেসব প্রযুক্তি অনুসরণ করা যেতে পারে তা হল-
 

সবজির এমন কিছু জাত আছে যেগুলো কম উপকরণ ব্যবহার করলেও ভালো ফল দেয় ও রোগ-পোকার আক্রমণ কম হয়। বিশেষ করে স্থানীয় বা দেশি জাতগুলোর এরূপ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরূপ জাত খুঁজে জৈব পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে।


নেট হাউস তৈরি করে তার ভেতরে শাকসবজি চাষ করে কীটনাশক ছাড়াই অনেক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার, সবুজ সার, খামারজাত সার ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।


বায়োফার্টিলাইজার (রাইজোবিয়াম, অ্যাজোটোব্যাকটার) ও বালাই দমনে বায়োএজেন্টসমূহকে (ট্রাইকোগ্রামা, ব্রাকন) ব্যবহার করতে হবে। বালাই দমনে বিভিন্ন গাছ-গাছড়া থেকে তৈরি করা বালাইনাশক ব্যবহারে উৎসাহিত হতে হবে। কিছু জৈব কীটনাশককে জৈব কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে যাদের নাম দেয়া হয়েছে ‘গ্রিন পেস্টিসাইড’। যেমন- নিমবিসিডিন, নিমিন এবং স্পিনোসাড। সাধারণভাবে জৈব কীটনাশকসমূহ অজৈব কীটনাশকের চেয়ে কম বিষাক্ত এবং পরিবেশ বান্ধব। যে তিনটি প্রধান জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করা হয় তারা হলো- বি টি (একটি ব্যাক্টেরিয়াল টক্সিন), পাইরিথ্রাম এবং রোটেনন।  অল্প বিষাক্ত জৈব বালাইনাশকসমূহের মধ্যে রয়েছে  নিম, সাবান, রসুন, সাইট্রাস ওয়েল, ক্যাপসেসিন (বিতারক), বেসিলাস পোপিলা, বিউভেরিয়া বেসিয়ানা ইত্যাদি। বালাইনাশকের প্রতি পোকার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকায় এসব জৈব বালাইনাশক পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করা উচিত। এগুলোর পাশাপাশি- আগাছা দমনে কোন আগাছানাশক ব্যবহার না করে নিড়ানি ও হাত দিয়ে আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আন্তঃফসল ও মিশ্র ফসলের চাষ করতে হবে। শস্য বহুমুখীকরণ করতে হবে। হিসাব করে সবজির বপন বা রোপণ সময় আগাম বা নাবি করতে হবে। যুক্তিসঙ্গতভাবে সেচ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্লাবন সেচ না দিয়ে ঝাঝরি দিয়ে বা কলসি ভরে পানি গাছের গোড়ায় ঢেলে সেচ দিতে হবে। প্রয়োজনে  খরার সময় মালচিং করতে হবে। পরিণত হওয়ার সূচক মেনে অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ে সবজি তুলতে হবে। শাকসবজি তোলার পর তা ধোয়া বা পরিষ্কার করার জন্য জীবাণুমুক্ত পানি ব্যবহার করতে হবে। বাছাই করে জীবাণুযুক্ত বা পচন ধরা শাকসবজি আলাদা করে বাদ দিয়ে প্যাকিং করতে হবে। প্যাকিং সামগ্রী জীবাণুমুক্ত হতে হবে। যতটা সম্ভব ক্ষেত থেকে শাকসবজি সংগ্রহের পর দ্রুত বাজারজাত করতে হবে। শাকসবজি খাওয়ার আগে জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে কাটতে হবে।

 

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকল্প পরিচালক, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা কম্পোনেন্ট, খামারবাড়ি, ঢাকা, মোবা : ০১৭১৮২০৯১০৭


Share with :

Facebook Facebook