কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

নরম খোলসের কাঁকড়ার উন্নত চাষ কৌশল

ভূমিকা : মৎস্য সেক্টরের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থান দখল করেছে। কিন্তু অবহেলিত রয়ে গিয়েছে সামুদ্রিক বিশাল জলরাশি। মৎস্য  সেক্টরের উন্নয়নে সময় এসেছে সামুদ্রিক নীল-অর্থনীতির (Blue-Economy) দিকে গুরত্ব দেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা সম্পন্ন মৎস্য এবং মাৎস্যজাত পণ্য যেমন- সামুদ্রিক আগাছা, কাঁকড়া, সবুজ ঝিনুক, স্কুইড ইত্যাদি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সক্ষম হবে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় বিশাল অঞ্চলে কৃষি পণ্যের উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এবং গলদা ও বাগদা চিংড়ির ঘেরে পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদার প্রেক্ষিতে বর্তমানে কাঁকড়া চাষিদের আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলছে। এ প্রেক্ষিতে নরম খোলসের কাঁকড়ার উন্নত চাষ প্রযুক্তি সুদীর্ঘ ৭১১ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যবহার করে বদলে দিতে পারে লাখো মানুষের ভাগ্য।


চার প্রজাতির শিলা কাঁকড়ার মধ্যে (Scylla serrata, Scylla tranquebarica, Scylla paramamosain IScyllaolivacea) বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৯০% ভাগই Scylla olivacea এবং ১০% Scylla tranquebarica. কাঁকড়া আর্থ্রােপোডা পর্বের ক্রাস্টাসিয়া প্রাণি। খোলস শক্ত থাকা অবস্থায় খাবার গ্রহণের প্রকৃতি ও পরিমাণের উপর কাঁকড়ার শারীরিক বৃদ্ধি অনেকাংশ নির্ভর করে। চলাফেরা ও খাবার গ্রহণের সুবিধার্থে কাঁকড়ার ১০টি পা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সাঁড়াশির মতো পা গুলোকে চিলেপেড/চেলাযুক্ত পাবলা হয়। চিলেপেডের সাহায্যে কাঁকড়া আত্মরক্ষা করে এবং শিকার ধরে। এছাড়া মাটিতে চলাফেরার জন্য তিন জোড়াহাঁটার পা দিয়ে কাঁকড়া যে কোন কিছু আঁকড়ে ধরতে পারে এবং পিছনের সাঁতার পায়ের সাহায্যে কাঁকড়া সাঁতার কাটতে পারে।        


উন্নত চাষ পদ্ধতির ধাপসমূহ :
ক. পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতকরণ :  
আধা নিবিড় পদ্ধতিতে নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে পুকুরের আয়তন খুব বেশি প্রভাব না ফেললেও পানির গভীরতা অনেকাংশে প্রভাব রাখে। এজন্য পুকুরের আয়তন ০.৫-১.০ একর এবং পানির গভীরতা ৪-৫ ফুট হওয়া বাঞ্ছনীয়। আধা লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো সম্ভব এমন স্থানে পুকুর নির্বাচন করে তলদেশ সমতল করতে হবে।

 

খ. কাঠের ব্রিজ তৈরি : নরম খোলসের কাঁকড়া চাষের ক্ষেত্রে দৈনিক অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৬-৮ বার পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কাঁকড়ার খাবার প্রয়োগ ও খোলস পরিবর্তনের অবস্থা সহজে পর্যবেক্ষণ করার জন্য পুকুরের মাঝে একটি শক্ত ও টেকসই কাঠের ব্রিজ তৈরি করতে হবে। ব্রিজের উপরে ছাউনি এবং নিচে নাইলনের সুতা টানানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে, যেন তীব্র জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে ব্রিজ ভেঙে না যায় এবং বাক্সগুলোকে দুর্যোগময় পরিবেশে হারিয়ে না যায়।
 

গ. ভাসমান কাঠামো ও বাক্স স্থাপন : বাক্স পানিতে ভেসে থাকার জন্য ভাসমান কাঠামো তৈরি করতে হবে। কাঠামো তৈরিতে ৫টি সমান দৈর্ঘ্যরে পিভিসি পাইপ পাশাপাশি নিয়ে কাঁকড়ার বাক্সের দৈর্ঘ্যরে সমান দুরত্ব ফাঁকা রেখে বাঁশ দ্বারা বেঁধে দিতে হবে। কাঠামো পুকুরের দৈর্র্ঘ্যরে অর্ধেক হলে ভালো।
 

ঘ. কাঁকড়া সংগ্রহ ও পরিবহন : সারাবছর নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ করা যায়। এজন্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে ৫০-৬০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া সংগ্রহ করতে হবে। কেননা এই আকারের অপ্রাপ্ত বয়সের কাঁকড়া দ্রুত খোলস পরিবর্তন করে থাকে। প্রকৃতিগতভাবে কাঁকড়া খুবই আক্রমণাত্মক প্রাণী। তাই সংগৃহীত কাঁকড়া পরিবহনে মূলত ২টি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে-
১। কাঁকড়ার চিলেপেড ২টি বাঁধা থাকতে হবে।
২। বাতাস থেকে কাঁকড়ার অক্সিজেন গ্রহণের ব্যবস্থা এবং আর্দ্র থাকার জন্য কাঁকড়ার শরীরে কাঁদা মাখতে হবে। এতে কাঁকড়ার মৃত্যুহার অনেকাংশে কমে যায়।

 

ঙ. চিলেপেড ফেলে দেওয়ার পদ্বতি : কাঁকড়াকে বরফ ও পানির মিশ্রণে ডুবিয়ে রাখলেও কাঁকড়া নিজের থেকে চিলেপেড ছেড়ে দেয়। নিজ থেকে চিলেপেড ছেড়ে দেওয়ার পদ্ধতিকে বলে অটোনোমাইজেশন। চিলেপেড ও শরীরের জোড়ার কিছুটা আগে চাপ দিতে হবে। প্রথমে হালকাভাবে চাপ প্রয়োগ করে ধীরে ধীরে চাপ বাড়াতে হবে অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত কাঁকড়া নিজ থেকে চিলেপেড না ছাড়ছে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে চাপের প্রেক্ষিতে চিলেপেড যেন টেনে আনা না হয়। কাঁকড়ার বাহু পুনঃগঠনের বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে খোলস পরিবতর্নের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অঙ্গের পুনরায় আবির্ভাব ঘটে। খোলস পরিবর্তন কাঁকড়ার নিয়মতান্ত্রিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রতিবার ২০-৪০ গ্রাম দৈহিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে। সদ্য খোলস পরিবর্তনকারী কাঁকড়াকে নরম খোলস কাঁকড়া (Soft shell crab) বলে।
 

চ. কাঁকড়া মজুদ, খাদ্য প্রয়োগ এবং পুকুর ব্যবস্থাপনা : বর্তমানে ১টি বাক্সে ১টি কাঁকড়া রেখে বাণিজ্যিকভাবে নরম খোলসের কাঁকড়া চাষের ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চিলেপেড ফেলে দিয়ে নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে একই বাক্সে একের অধিক কাঁকড়া মজুদ করা সম্ভব। কাঁকড়া চাষে খাদ্য হিসেবে উচ্ছিষ্ট মাছ সর্বোত্তম। কাঁকড়ার ওজনের ৫-১০% হারে প্রতি দুইদিন অন্তর অন্তর খাদ্য সরবারহ করতে হবে। নরম খোলসের কাঁকড়া চাষের জন্য পানির লবণাক্ত ১৫-১৮ পিপিটি, পি.এইচ ৬.৫-৮.০ এবং ক্ষারত্ব ৮০ এর উপরে থাকা বাঞ্ছনীয়। ক্ষারত্ব কমে গেলে দ্রুত পানি পরিবর্তন অথবা চুন প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া প্রতি মাসে একবার প্রোবায়োটিক ব্যবহার করা উত্তম। এজন্য পুকুরের পানির গুণাগুণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
 

ছ. পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ : নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে প্রতি ৩ ঘণ্টা অন্তর অন্তর দিনে রাতে পর্যবেক্ষণ করে নরম এবং মৃত কাঁকড়াগুলোকে দ্রুত তুলে ফেলতে হবে। নরম কাঁকড়া চেনার সহজ উপায় হচ্ছে বাক্সে পরিত্যাক্ত খোলসের কারণে মজুদকৃত কাঁকড়ার চেয়ে বেশি সংখ্যক কাঁকড়া দেখা যাবে। নরম খোলসের কাঁকড়া ৩-৪ ঘণ্টা আধা লবণাক্ত (১৫-২০ পিপিটি) পানিতে থাকলে খোলস পুনরায় শক্ত হয়ে যায়। এজন্য নরম খোলসের কাঁকড়া চাষে আহরণের পূর্বে খোলস পরিবর্তনের পর খোলস শক্ত না হওয়ার জন্য দ্রুত লবণ পানি থেকে তুলে মিঠা পানিতে কয়েক ঘণ্টা সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। সংগৃহীত নরম খোলসযুক্ত কাঁকড়াকে আর্দ্র রাখার জন্য ট্রেতে সাজিয়ে রেখে ভেজা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে দিতে হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত সংগৃহীত নরম খোলসযুক্ত কাঁকড়াগুলোকে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠাতে হবে।                             
 

জ. কাঁকড়ার পুকুরে মাছ চাষ : কাঁকড়া চাষে পুকুরের পানির উপরিস্তর ব্যবহৃত হয়। ফলে অব্যবহৃত থাকে পানির নিচের স্তর। পুকুরের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কাঁকড়ার পাশাপাশি লবণাক্ততা সহ্যক্ষম ভেটকি ও তেলাপিয়া মাছ চাষ করলে পানির গুণাগুণ ঠিক থাকে। ভেটকি মাংশাসি প্রজাতির হওয়ায় কাঁকড়ার জন্য ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট মাছের উদ্বৃত্ত অংশ, মৃত কাঁকড়া ভেটকি মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তেলাপিয়া মাছ পুকুরের জৈবিক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।  


ঞ. ফলাফল : কাঁকড়া নিজেদের বাচ্চা এমনকি নিজের সমান আকারের অন্য কাঁকড়াকেও খেয়ে ফেলতে পারে। ফলে শক্তি অপচয়ের পাশাপাশি মৃত্যুহার অনেকাংশে বেড়ে যায়। কাঁকড়ার চিলেপেড ২টি ফেলে দিলে আক্রমণাত্মক মনোভাব সম্পূর্ণভাবে কমে যায় এবং দ্রুত খোলস পরিবর্তনে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বিচরণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নতুন চিলেপেড তৈরিতে ব্যস্ত থাকে। নরম খোলসের কাঁকড়া চাষ পদ্ধতিতে চিলেপেড ফেলে দিলে কাঁকড়া অপেক্ষাকৃত কম সময়ে খোলস পরিবর্তন করে, উল্লেখযোগ্য হারে মৃত্যু হ্রাস পায় এবং  বৃদ্ধি হার বেড়ে যায়। এই পদ্ধতিতে চাষ করে এক ফসলে অর্থাৎ প্রতি ২ মাসে প্রতি একর পুকুর থেকে ২৫০০-২৬০০ কেজি নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন করা সম্ভব। নিম্ন ছকেমাঠ পর্যায়ের গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হলো

 

ড. ডুরিন আখতার জাহান১ মোহাম্মদ রেদোয়ানুর রহমান২
ড. মো: আসাদুজ্জমান৩ নূর-এ-রওশন৪

১প্রকল্প পরিচালক, বামগই, মোবাইল-০১৭১২৬১১১৮৫ durin_bfri@yahoo.com; ২প্রভাষক, সিভাসু, মোবাইল-০১৭১৭৪১২০৪৯; ৩সহকারী অধ্যাপক, সিভাসু; ৪বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বামগই

 


Share with :

Facebook Facebook