কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ক্ষুুধামুক্ত দেশ গড়তে মিষ্টিফসলের গুরুত্ব

জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রথম এবং প্রধান উপজীব্য হচ্ছে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়া। ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়তে আগে দরকার ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়া। ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়ার প্রথম অঙ্গীকার ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তারই ফলশ্রুতিতে তিনি কৃষিকে ঢেলে সাজাবার প্রয়াস নিয়েছিলেন। কৃষি ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গড়ে তুলেছিলেন এদেশের মিষ্টিফসলের ভিত্তি। কারণ মিষ্টিফসলের সবগুলি উদ্ভিদ উৎসই প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ্য করে টিকে থাকতে পারে। অন্যদিকে মিষ্টিফসল সবই অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন। ফলে ভবিষ্যতের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অল্প জমিতে অধিক পুষ্টিকর খাবার উৎপাদন করতে মিষ্টিফসলই হবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টিফসল হচ্ছে আখ। আখ থেকে হয় রস, গুড়, চিনি। আখের পাশাপাশি রয়েছে তাল, খেজুর, গোলপাতা, স্টেভিয়া, সুগারবিট, মধু, যষ্টিমধু প্রভৃতি। তাল থেকে হয় রস, গুড়, তালমিছরি প্রভৃতি। খেজুর ও গোলপাতা থেকেও হয় রস, গুড়। সুগারবিট থেকে হয় গুড়, চিনি, মাছের খাবার, গবাদি পশুর খাবার প্রভৃতি। স্টেভিয়া, যষ্টিমধু এবং মধুর পুষ্টিগুণ ও ঔষধিগুণ সর্বজনবিদিত। আর বড় কথা হলো এসব খাবারের পাশাপাশি ঐ সমস্ত ফসলভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের খাদ্য শিল্প গড়ে তোলা যেতে পারে। তাতে রয়েছে দারিদ্র্য মোচনেরও অপার সম্ভাবনা। এসব ছাড়াও তাল এর বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি তাল গাছ বজ্রপাতের বিপদ থেকে রক্ষা করে। এখানে আলোচিত ফসলগুলির মধ্যে আখ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বেশি প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু। তবে তাল ও খেজুর গাছও প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে। গোলপাতা গাছ সেখানেই হয় যেখানে অন্যকোন ফসল হয় না। অর্থাৎ জোয়ার-ভাটা যুক্ত লবণাক্ত এলাকায়। তাই এখানে আখ কেন্দ্রিক আলোচনাতেই বেশি জোড় দেয়া হলো।


এখন দেখা যাক, কে, কোথায় এবং কিভাবে মিষ্টিফসল চাষের মাধ্যমে অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার উৎপাদন করতে এবং অধিক লাভ করতে পারেন।


১। অতি দরিদ্র পরিবারের আয় এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে আখচাষ এর ভূমিকা আমাদের দেশের গ্রাম-শহর সর্বত্রই চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী আখ জাতের (চিউইং কেন) ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যে সমস্ত পরিবার দৈনিক মজুরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে যাদের বসতভিটা ছাড়া আবাদি  কোন জমি নেই। পরিবারের কর্তা-ব্যক্তিটি সকালে কাজের সন্ধানে বের হয়ে যায়, কাজের বিনিময়ে পাওয়া মজুরি দিয়ে পরিবারের সবার চাল-ডালের সংস্থান করেন। তার পক্ষে সন্তানদের জন্য ১টি আখ ৩০/- টাকা দিয়ে কেনা খুবই কষ্টকর। ঐ ব্যক্তিটি যদি তার বসতভিটার আশেপাশে ১০০টি চিবিয়ে খাওয়ার আখের চারা সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে লাগিয়ে রাখে এবং পরিবারের সদস্যরা সঠিক পরিচর্যা করে তবে রোপণকৃত ১০০টি চারা থেকে কমপক্ষে ৬০০টি সুস্থ সবল আখ পাওয়া সম্ভব, যা সর্বনিম্ন বাজারদরে বিক্রি করে ১৫,০০০/- টাকা আয় করা সম্ভব। আর এজন্য যে পরিচর্যা দরকার তা বাড়ির মহিলারাই করতে পারে। অর্থাৎ মাসে ১০০০ টাকা আয় করতে বাড়ির কর্তা ব্যক্তিকে কোন চিন্তা করতে হয় না। অথবা ৬০০টি আখের মধ্যে কিছু আখ বিক্রি করে টাকা আয় করতে পারে এবং অবশিষ্টগুলি শিশুদের খেতে দিলে তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়।


২। অল্প জমিতে আখ চাষ করে অনেক বেশি উপার্জন করা আজকাল সারাদেশে সারাবছর উপজেলা শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত প্রতিটি বাজারের কোণায় কোণায় চিবিয়ে খাওয়া আখ বিক্রি ব্যাপকহারে শুরু হয়। যার বাজার দর এলাকাভেদে ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রতিটি আখের দাম অপেক্ষাকৃত কম হলেও মধ্য, দক্ষিণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে দাম ও চাহিদা খুবই বেশি। এক বিঘা জমিতে ৩০০০টি চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষুর চারা রোপণ করা যায়। (এক্ষেত্রে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১ মিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৪৫ সে.মি.।) এক বিঘা অর্থাৎ ১৩৪৯ বর্গমিটার জমিতে এ মাপে লাগানো হলে ২৯৯৮ বা ৩০০০টি চারা লাগানো যাবে। সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে এটা রোপণ করে, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গাছ প্রতি কমপক্ষে ৫টি কুশি পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে ঝাড় প্রতি ১টি মাতৃগাছ এবং ৫টি কুশি অর্থাৎ ৬টি আখ পাওয়া যাবে। সুতরাং ৩০০০টি ঝাড়ে ৩০০০x৬=১৮০০০টি আখ পাওয়া যাবে) তাথেকে ১৮০০০টি সুস্থ ও সবল আখ উৎপাদন করা সম্ভব। সর্বনিম্ন বাজারদরে (১৮০০০x১০টাকা=১,৮০,০০০ টাকা) তা বিক্রি করেও এ থেকে ১,৮০,০০০/-টাকা আসবে যার চাষাবাদ থেকে বিক্রি পর্যন্ত মোট খরচ হয় প্রায় ২৫০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা। অর্থাৎ নিট লাভ হয় ১,৫০,০০০ টাকা। এটা গেল আখের হিসাব। আখ ছাড়াও ঐ জমিতে সাথী ফসল চাষ করে প্রায় ১০,০০০-১৫,০০০ টাকা নিট লাভ হবে। এ টাকা দিয়ে চাষি তার আখ চাষের ঐ খরচ মিটাতে পারবে। যদিও বলা হয় আখ ১২-১৪ মাস মাঠে থাকে কিন্তু এর পরিপক্বতার জন্য ১০-১২ মাসই যথেষ্ঠ। তদুপরি যদি চিবিয়ে খাওয়ার আখ হয় তাহলে তা ৭-৮ মাসেই বিক্রির উপযোগী হয়। এক বিঘার মতো এত অল্প জমি ব্যবহার করে শুধুমাত্র সঠিক জাত ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে এত বেশি আয় শুধু আখ চাষের মাধ্যমেই তুলে আনা সম্ভব। সেকারণেই সঠিক জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আখ চাষ করে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করা যেমন সম্ভব তেমনি সম্ভব অধিক উপার্জন এর মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করা এবং এভাবেই সম্ভব দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকার পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা।


৩। আখের রস বিক্রেতাদের জীবিকানির্বাহ সারা বছরই দেশের সকল উপজেলা শহরের অলিগলিতে দেখা যায় আখের রস বিক্রেতাদের। এরা ছোট ছোট হস্তচালিত মাড়াই মেশিনে তাৎক্ষণিকভাবে আখ মাড়াই করে রস বিক্রি করে। জাতের এবং সময়ের তারতম্য অনুসারে একটি আখ থেকে প্রায় ৬-৮ গ্লাস রস হয়। প্রতি গ্লাস আখের রস স্থানভেদে ৫-১০ টাকা বিক্রি হয়। অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি ১০ টাকার আখ থেকে সর্বনিম্ন ৩০ টাকার রস বিক্রি করে আখ প্রতি কমপক্ষে ২০ টাকা লাভ করে।  প্রতিদিন এরা মৌসুমভেদে গড়ে প্রায় ২৫- ৫০টি আখ বিক্রি করে ৫০০-১০০০ টাকা নিট লাভ করে। এসব রস বিপণন কাজে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর জন্য অধিক রস উৎপাদন উপযোগী আখ চাষ বৃদ্ধি করতে হবে, সারাবছর আখের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং রস উৎপাদনের মেশিনটিকে একটু সংস্কার করে স্বাস্থ্যসম্মত করতে হবে। তাহলেই সাধারণ জনগণের জন্য আখের রসের চাহিদা পূরণ করা যাবে। পাশাপশি রস বিপণন কাজে আরো বেশি সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন অপরিসীম ভূমিকা পালন করবে, তেমনি পুষ্টি উপাদানের যোগানও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


৪। আখ চাষের মাধ্যমে বড় চাষিদের বিশেষ ভূমিকা বড় চাষিদের দায়িত্বও বড়। তারা যদি বাণিজ্যিকভাবে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে তা চিনিকলে দেয়ার জন্য, গুড় তৈরির জন্য কিংবা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য যে কারণেই করুক না কেন, আখ যেহেতু সারা বছর ব্যাপী মাঠে থাকে তাই শ্রমিকের কর্মসংস্থানও সারা বছরব্যাপী করতে পারে। তাছাড়া আখ পরিবহনে, গুড় তৈরিতে এবং গুড় বাজারজাতকরণে যে পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান হয়, অন্য কোন একক ফসলে এত কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ নেই। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন এত মানুষের কর্মসংস্থান করার পর গুড় তৈরি করে তা কি লাভ হবে? অবশ্যই হবে। কারণ বাজারে চিনির চেয়ে গুড়ের দাম বেশি। আর যদি ভেজালমুক্ত গুড় তৈরির প্রমাণ করতে পারেন এবং সেই গুড়ের একটা ব্র্যান্ড/ট্রেড মার্ক তৈরি করতে পারেন তবে তার সে ব্যবসাটি হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং অধিক লাভজনক।


৫। আখ চাষের মাধ্যমে বড় উদ্যোক্তা তৈরি করা অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও এখন আখের রস বোতলজাত করে বাজারজাত করার প্রযুক্তি রয়েছে। আখের রসের ভেষজ গুণ, পুষ্টিমান এবং স্বাদের কারণে এর চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা যেকোন কোমল পানীয়ের চেয়ে অনেক বেশি। অতএব অল্পকিছু বিনিয়োগের করে আখের রস বোতলজাত করার মাধ্যমেও একটি উন্নতমানের ব্যবসা শুরু করা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এমনকি তা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে। এসব ছাড়াও আখ থেকে বায়োফুয়েলসহ আরো অনেক শিল্প স্থাপনেরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।


এসব কারণেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভিত্তিক আখ চাষ করা জরুরি প্রয়োজন। আখ চাষে জমির মালিকের  লাভের পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। যদিও চিনিকল এলাকার আখচাষিরা আখ সরবরাহ করে সময়মতো আখের দাম না পাওয়াতে হতাশায় ভোগেন, তবে দেরিতে হলেও সেখানে আখের মূল্যটি কিন্তু নির্দিষ্ট থাকে। অন্য ফসলের মতো ওঠানামা করে না। আর চিনিকল বহির্ভূত গুড় উৎপাদন এলাকায় আখ চাষিরা  অপেক্ষাকৃত বেশি দামে আখ বিক্রি করে থাকেন। অন্যদিকে চিবিয়ে খাওয়া আখ উৎপাদনকারীগণ লাভ করেন সবচেয়ে বেশি। ফলে শেষোক্ত দুই এলাকার আখ চাষিদের আখ চাষে কোন হতাশা নেই। তাই সারা দেশের সকল ধরনের জমিতেই আখের আবাদ বিস্তৃত করা যেতে পারে। বিশেষ করে চাষের জন্য প্রতিকূল জমি এবং দুযোগপূর্ণ আবহাওয়ায় একমাত্র আখই নিশ্চিতভাবে চাষিকে ফসলহানির আশংকা থেকে মুক্ত রাখে। এখানে তারই কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো।


ক) খরা পীড়িত এলাকা দেশের আখ ফসল সবচেয়ে বেশি খরায় টিকে থাকতে পারে। শুধু তাই নয় যেখানে অন্যসব  ফসল পানির অভাবে মারা যায় সেখানেও আখ ফসল বেঁচে থাকতে পারে এবং পানি পেলে তা আবার পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠে। সেজন্যই উত্তরাঞ্চলের খরা পীড়িত এলাকায় আখ চাষের ব্যাপকতা বেশি। শুধু আখই নয়, খরা পীড়িত এলাকার জন্যও আখের সাথে সাথী ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।


খ) চরাঞ্চলের বালিময় পতিত জমি চরের বালিময় পতিত জমিতে যেখানে অন্য কোন ফসল চাষ করে লাভ করা যায় না, সেখানেও আখ চাষ করে, আখের সাথে সাথী ফসল করে এবং গুড় তৈরি করে যথেষ্ট লাভ করার সুযোগ রয়েছে। এর কারণ আখের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত গভীরে চলে যেতে পারে। তাছাড়া চরে অন্যান্য ফসল চাষ করে চাষিরা ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ বন্যায় তা ডুবিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অথচ আখ এমন একটি ফসল যা ১২-১৫ ফুট লম্বা হয় এবং বন্যায় এর নিম্নাংশ ডুবে থাকলেও কোন ক্ষতি হয় না। আবার চরে যেসব স্বল্পমেয়াদি ফসল হয় সেগুলোকে সাথী ফসল হিসেবে আখের সাথে চাষ করা যায়। ফলে আখ থেকে গুড় তৈরি করে মূল লাভের পাশাপাশি আরো বেশি লাভ করা সম্ভব হয়।


গ) দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা যেখানে লবণাক্ততার কারণে অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা যায় না সেখানেও আখ ফসল তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায় উচ্চ মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করার মতো প্রচলিত ফসলধারায় অন্য কোন ফসল নেই। সম্প্রতি অবমুক্ত কেবলমাত্র কয়েকটি ধানের জাত (বিনা ধান ১০ প্রতি মিটারে ১২ ডিএস এবং ব্রি ধান ৬৭ প্রতি মিটারে ৮ ডিএস) ঐ মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। কিন্তু আখ ফসল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই প্রতি মিটারে ১৫ ডিএস মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই লবণাক্ত এলাকারও লাভজনক ফসল আখ।


ঘ) পাহাড়ি এলাকা পাহাড়ি এলাকায়ও এক বিঘা জমিতে ৩০০০টি চিবিয়ে খাওয়া আখের চারা সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে রোপণ করে তাহলে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে তা থেকে ১৮০০০টি সুস্থ ও সবল আখ উৎপাদন করা সম্ভব। পাহাড়ি এলাকায় আখের বাজার দর অপেক্ষাকৃত বেশি। ফলে সর্বনিম্ন বাজারদরে তা বিক্রি করেও ৩,০০,০০০/- টাকা উপার্জন করা সম্ভব। অল্প জমি ব্যবহার করে সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে এত বেশি আয় করা শুধু আখ চাষের মাধ্যমেই সম্ভব। একইভাবে পাহাড়ি এলাকায় গুড়ের দামও বেশি। তাই ওখানকার মানুষ গুড় করেও বেশি লাভ করতে পারেন।  


ঙ) পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা হাওর এলাকার অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে অল্প কিছুদিন পরেই পানি নেমে যায়। এসব জায়গাগুলি নির্বাচন করে সেখানে জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু আখের জাত রোপণ করা যেতে পারে। যেমন ঈশ্বরদী ৩৭, ঈশ্বরদী ৩৪, ঈশ্বরদী ২০, ঈশ্বরদী ২১ প্রভৃতি। তাছাড়া হাওরে প্রতি বছর বজ্রপাতের কারণে অনেক সংখ্যক মানুষ মারা যায়। তাই এই এলাকায় অধিক তালগাছ রোপণের মাধ্যমে তালের রস, গুড়, তালমিছরি প্রভৃতি বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার পাশাপাশি বজ্রপাত প্রতিরোধেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।


চ) দুযোর্গ এর ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা যেখানে প্রায় প্রতিবছরই সিডর-আইলা’র মতো মারাত্মক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হানা দিয়ে ক্ষেতের সব ফসল লণ্ড-ভণ্ড করে দেয়, সেখানে আখফসল থাকলে তা ঐ এলাকার জীবন রক্ষাকারী ফসলে পরিণত হয়। কারণ ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ড-ভণ্ড সবকিছুতে রান্না করার উপকরণও চলে যায়, ঘরের শুকনা খাবারও (যদি থাকে) শেষ হয়ে যায়, আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় পানীয় জলের। অন্যদিকে ঢাকা তথা দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পানীয় জল কিংবা খাদ্য সাহায্য পৌঁছাতেও সময় লাগে। আর এ সময়েই পানির অভাবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় ঐ এলাকার শিশুরা, এমনকি তাদের জীবনহানিরও আশংকা দেখা দেয়। অথচ ঐ এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে চিবিয়ে খাওয়া আখ থাকলে, ঝড়ে তা যত ক্ষতিগ্রস্তই হোক না কেন, তা থেকে পানি ও পুষ্টি উভয়ই পাওয়া যেতে পারে। সংকটকালীন ঐ সময়ে বাড়ির শিশুদের জন্য তা হয় জীবন রক্ষাকারী খাদ্য। সেকারণেই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকার প্রতিটি বাড়িতেই চিবিয়ে খাওয়া আখের আবাদ করতে হবে।


অর্থাৎ সারাদেশেই আখ চাষ করা এখন জরুরি প্রয়োজন। বরং উল্টা করে বলা যায়, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যখন বিজ্ঞানীরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন পরিবর্তন সহিষ্ণু ফসল, সেখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সহিষ্ণু ফসল হচ্ছে আখ। আখের রস যেমন পুষ্টিকর, আখের চাষও তেমনি লাভজনক। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হচ্ছে এলাকাভিত্তিক আখের জাত নির্বাচন করে তার ভাল বীজের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। এটা করতে পারলেই আখ চাষ সম্প্রসারণ করা অনেক সহজ হবে, কারণ আখ সম্প্রসারণের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে ভাল বীজের অভাব। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে আখ চাষের উপকরণ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি-জ্ঞান এবং উৎপাদিত কাঁচামালের বাজার সবই আমাদের দেশেই যথেষ্ট ভালো রয়েছে। তাই দেশের যেকোন এলাকায় আখচাষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। আর এটা করতে পারলেই দেশের চিনি ও গুড় এর যোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনেও যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

 

ড. মো. আমজাদ হোসেন১ ড. সমজিৎ কুমার পাল২

১মহাপরিচালক, মোবাইল : ০১৭১৮৪২৬২০০  ২মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক, মোবাইল : ০১৭১২০২১১৪০ বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী, পাবনা


Share with :

Facebook Facebook