কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি গবেষণায় গৃহীত কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ করণীয়

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধির জন্য কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৪.১০% এবং দেশের জনশক্তির ৪১ ভাগ কৃষিকাজে নিয়োজিত। তাই এদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষির উন্নয়ন অপরিহার্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমি ও মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। কৃষির এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আমাদের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল কৃষিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের ১২টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। গবেষণা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাউন্সিল নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন এবং কৃষি গবেষণার মান উন্নয়নসহ বিজ্ঞানীদের গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে।


কৃষিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কাউন্সিলের গৃহীত কার্যক্রম
গবেষণা অগ্রাধিকার ও নীতি-নির্ধারণী ডকুমেন্ট প্রণয়ন : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মাঠ পর্যায়ের ও অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করে দেশের চাহিদার ও বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা অগ্রাধিকার ও ভিশন ডকুমেন্ট ২০৩০ প্রণয়ন করেছে। কৃষির ১২টি সাব-সেক্টরের জন্য প্রণীত এ ভিশন ডকুমেন্ট দেশের ভবিষ্যৎ কৃষি গবেষণার দিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ প্রণয়নসহ বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী ডকুমেন্ট প্রণয়নের কাজ করছে।


গবেষণা সমন্বয়, মনিটরিং ও মূল্যায়ন : কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বৈততা পরিহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম প্রণয়নে গবেষণা প্রতিষ্ঠানমূহকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান কাউন্সিলের প্রধান কাজ। বিএআরসি সহযোগী সংস্থার বিজ্ঞানী/কর্মকর্তা সমন্বয়ে সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের গবেষণা কার্যক্রম পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করছে। এ ছাড়া নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।


মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম : বিএআরসি জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমে কর্মরত বিজ্ঞানীদের গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণ ও উচ্চ শিক্ষার জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫ প্রণয়ন করেছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মানব সম্পদ উন্নয়নে রাজস্ব ও বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত এনএটিপি প্রকল্পের আওতায় কৃষি বিজ্ঞানীদের পিএইচডি/পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের সুযোগসহ বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। প্রশাসনিক এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সম্যক ধারণা দেয়ার লক্ষ্যে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমের বিজ্ঞানীদেরকে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তি গড়ার লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ/সেমিনার/কর্মশালা অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদান করছে।


ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এনএটিপি) ফেজ-১ ও ২: ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এনএটিপি) ফেজ-১ এর মাধ্যমে ১০৮টি গবেষণা উপ-প্রকল্প নার্সভুক্ত ১২টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ৪২টি হস্তান্তরযোগ্য প্রযুক্তি (শস্য-২২টি, প্রাণিসম্পদ-৫টি, মৎস্য-৩টি, তথ্য প্রযিুক্তি ও অন্যান্য-১২টি) উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এনএটিপি) ফেজ-২ এর মাধ্যমে মোট ১৯০টি সিআরজি ও ৩৯টি পিবিআরজি গবেষণা উপ-প্রকল্প বিভিন্ন নার্স প্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।


কৌলিসম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার : ক্রমবর্ধিষ্ণু জনসংখ্যা ও বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে উচ্চ ফলনশীল, পুষ্টি সমৃদ্ধ বায়োটিক ও এবায়োটিক ঘাত সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন, সংরক্ষণ এবং এর যথাযথ ব্যবহার বর্তমান সময়ের অন্যতম চাহিদা। খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে ফসলের কৌলিসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইতোমধ্যে দেশের ভেতরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মানো ফসলের উত্তম স্থানীয় জাত সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করে অনেক ফল ও সবজির জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া দেশের বাইরে থেকে প্রবর্তিত উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ মূল্যায়ন করেও এদেশে চাষ উপযোগী অনেক ফসলের জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। সংরক্ষিত কৌলিসম্পদকে উদ্ভিদ প্রজনন কর্মসূচিতে ব্যবহার করে ফসলের বিভিন্ন রকম গুণগত মানসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি এসব জাতের ব্যবহার পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত জিংক সমৃদ্ধ ধান, লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ মিষ্টি আলু ইত্যাদি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।


ফসলের সারের মাত্রা সুপারিশমালা : নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে বিভিন্ন ফসলের উপর পরিচালিত গবেষণা ফলাফল সংকলিত করে বিএআরসি কর্তৃক ঐ অঞ্চলে বিভিন্ন ফসলের সারের মাত্রা সুপারিশ করা হয়। প্রতি ৫ বছর অন্তর উক্ত সার সুপারিশমাল হালনাগাদ করে Fertilizer Recommendation Guide (FRG) প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ সার সুপারিশমালা FRG-2018 প্রকাশ করা হয়েছে এবং তা দেশের সকল কৃষি সম্প্রসারণ ও গবেষণায় নিয়োজিত কর্মকর্তা/বিজ্ঞানীদের মাঝে বিতরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।


শস্য বিন্যাস উদ্ভাবনের মাধ্যমে জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মাধ্যমে অঞ্চল উপযোগী ফসলের স্বল্প-মেয়াদি জাত উদ্ভাবন এবং তা শস্য বিন্যাসে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে নতুন নতুন শস্য-বিন্যাসের প্রচলন করা হচ্ছে। নতুন শস্য বিন্যাস প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে প্রচলনের ফলে একদিকে যেমন শস্য-নিবিড়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মোট ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।


জমির উপযোগিতা ভিত্তিক ক্রপ জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন : বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মাটি, জলবায়ু ও এলাকা উপযোগী ফসল নির্বাচন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্রপ জোনিং ম্যাপ প্রণয়ন করছে। নার্স প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বিএআরসি কর্তৃক ১৭টি ফসলের ম্যাপ তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় অন্যান্য ফসলের ক্রপ জোনিং ম্যাপ তৈরির লক্ষ্যে ৩০০টি উপজেলায় ক্রপ জোনিং প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।


পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার : পানিসম্পদের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফসল উৎপাদনের জন্য সেচ কাজে বিভিন্ন পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবন করা হয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ পানি সেচের পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানি দ্বারা সেচ প্রদানে অধিক গুরুত্ব প্রদান, দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ঘাটতি সেচের মাধ্যমে প্রযোজ্য এলাকায় ফসল উৎপাদন এবং পানি সাশ্রয়ী শস্য বিন্যাস অনুসরণ এবং আর্থিকভাবে লাভজনক শস্য-বিন্যাসকে সেচ ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রোগ্রাম উন্নয়ন ও প্রসার : সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিষমুক্ত উচ্চমূল্য সবজি যেমন টমেটো, বেগুন, শসা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মিষ্টিকুমড়া, ঢেঁড়স, শিম ইত্যাদি উৎপাদনের লক্ষ্যে এ ফসলগুলোর বালাই প্রতিরোধক জাত নির্বাচন এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় টেকসই প্যাকেজ উদ্ভাবনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকরণে বিএআরসি সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছে। ফেরোমন ট্র্যাপ পদ্ধতি সবজি ফসলের পোকা ও রোগবালাই দমনে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে এবং কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।


উত্তম কৃষি পদ্ধতি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন : নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টি নিরাপত্তা আমাদের নিশ্চিত করতে এসডিজির সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুষ্টিসহ বহুমাত্রিক বিষয় জড়িত। তাই এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল উচ্চমূল্য ফসলের জন্য উত্তম কৃষি পদ্ধতির নীতি নির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লষ্টি অংশীজনকে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কাজ করছে। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে কৃষিপণ্য ও খাদ্য সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ছে। ফসল উৎপাদনে পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কৃষকদেরকে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব এবং জীবাণু সার প্রয়োগ করার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।


পতিত ও লবণাক্ততা অঞ্চলে শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি : খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সরকার দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি উপকূলীয় জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে মাস্টার প্লান প্রণয়ন করেছে। উক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাউন্সিল নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ দক্ষিণাঞ্চলসহ উপকূলীয় অঞ্চলে সম্প্রসারণের কাজ করছে। এ ছাড়া যে সমস্ত অঞ্চলে শস্য নিবিড়তা কম সেখানে শস্যের নিবিড়তা বাড়াতে গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের আওতায় স্বল্প সেচে বা বিনা সেচে রবি ফসল যেমন সরিষা, ছোলা, মশুর, খেসারি, মুগডাল, তিল চাষের মাধ্যমে এক বা দুফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরের জন্য বৃহত্তর সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।


কৃষি যান্ত্রিকীকরণ : বিএআরসি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, ফসল সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমুহের বিজ্ঞানীদের দিক নির্দেশনা, পরামর্শ ও কারিগরি সহয়তা প্রদান করছে। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রিকীকরণ রোডম্যাপ ২০২১, ২০৩১ ও ২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। National Agricultural Technology Project (NATP)-ও এর অর্থায়নে পাহাড়ে সেচের পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবনীয় উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণে ফলে কৃষি উৎপাদনে কৃষি শ্রমিকের ঘাটতি ও সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমানো সম্ভব হচ্ছে।


মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন : দেশের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৩০ শতাংশ যোগান দেয় মাছ। ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে সকল জীবিত জলজ সম্পদের সার্বিক উন্নয়ন ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি স্বল্প ব্যয়ে পরিবেশবান্ধব উন্নত মৎস্যচাষ এবং ব্যবস্থাপনা; প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে বহুবিধ মৎস্যজাত দ্রব্যাদির উন্নয়ন এবং জনপ্রিয়করণের উদ্দেশ্যে গবেষণা পরিচালনাসহ ইলিশ, চিংড়ি, কুচে মাছ, ঝিনুক, মুক্তাসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।


দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ গবাদি-প্রাণী ও হাঁস-মুরগি পালন ও প্রজনন কর্মসূচির আওতায় জীবিকা নির্বাহ করে। বিএআরসি দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণকল্পে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধিতে নার্স ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।


সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন : দেশের সামুদ্রিক সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে বিএআরসি সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ করছে। এ গবেষণার অংশ হিসেবে সামুদ্রিক শৈবালের ৭টি প্রজাতি নার্সারিতে সাফল্যজনকভাবে চাষ করা হয়েছে এবং এদের মধ্যে হিপনিয়া প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবালটি উন্মুক্ত সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।


কৃষিজাত পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ : দেশের কৃষিজাত পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্প এর আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের আয় বৃদ্ধির জন্য বাজার ব্যবস্থা ও নির্বাচিত শস্য বাজারজাতকরণের উন্নয়নের জন্য কৃষক-বিপণন সমন্বয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়াস নেয়া হয়েছে। সাপ্লাই চেইন উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন সরকারি, এনজিও ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাজার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিসমূহের উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।


তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন : বিএআরসি জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেমভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরণের তথ্য/উপাত্তের ডাটাবেইজ স্থাপন করে তথ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ জন্য  ICT কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে কাউন্সিলসহ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহে  ICT Cell গঠন করা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়নের জন্য কাউন্সিলে ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কাউন্সিলে জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS) এর কাজ অব্যাহত আছে। এর পাশাপাশি কাউন্সিলে জলবায়ু বিষয়ক তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে যা দেশে কৃষি ক্ষেত্রে ঝুঁকি হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া কৃষকদেরকে মোবাইল অ্যাপস-ভিত্তিক মাঠ-পর্যায়ের কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান প্রদান করে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে কাজ করছে।


খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় পদক্ষেপসমূহ
পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে টেকসই খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিকরণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবর্তিত কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে নিমোক্ত বিষয়সমূহে গুরুত্বারোপ করতে হবে;
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট খরা, বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, তাপমাত্রা এবং রোগ ও পোকা প্রতিরোধী ফসলের উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিমান সম্পন্ন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ;
দেশের বিলুপ্ত প্রায় ফসলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রজনন কাজে ব্যবহার;
কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সুষম সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা;
কৃষি পরিবেশ অঞ্চল-ভিত্তিক লাগসই ফসল নির্বাচন, ফসল বিন্যাস নির্ধারণের মাধ্যমে শস্যর নিবিড়তা বৃদ্ধি, উন্নত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের নিমিত্ত  বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন;
নার্স প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসলের নতুন জাতের পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রজনন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উন্নতমানের প্রত্যয়িত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ;
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সার্বিক উন্নয়নকল্পে গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো;
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে উত্তম কৃষি পদ্ধতি
(Good Agricultural Practices) বাস্তবায়ন;
বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ে ফলনের পার্থক্য কমানো;
ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার সাশ্রয়ী পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেকসই খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা;
সমন্বিত খামার ও বালাই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উন্নয়ন করা;
খাদ্যচক্রে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ে গবেষণা এবং শিল্প উদ্যোক্তা ও  ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ;
কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে উৎসাহিতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার ও শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি উদ্ভাবন;
কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, সবররাহ ও মূল্য সংযোজন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের উপর গবেষণা পরিচালনা করা এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাজার ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটানো;
কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষককে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ওপর দেশে/বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন;
কৃষিতে আইসিটি প্রয়োগ এবং গণমাধ্যম ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে জনগণের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ;
উদ্ভাবিত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি দ্রুত হস্তান্তর এবং গবেষণা, শিক্ষা, সম্প্রসারণ ও কৃষক সংযোগ জোরদার করন;

 

কৃষিপণ্যের মান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন Accredated গবেষণা ল্যাব স্থাপন এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তা পর্যায়ে প্রণোদনা প্রদান/স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে উন্নত করার অগ্রযাত্রা সফল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সহযোগী সংস্থাসমূহকে জাতীয় কৃষি নীতিমালার ভিত্তিতে গবেষণার মান উন্নয়নে দিক-নির্দেশনা ও সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। কৃষি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তোলা সক্ষম হবে।

 

ড. মো: কবির ইকরামুল হক

নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫, মোবাইল : ০১৭১১৪৬৬৪২৪


Share with :

Facebook Facebook