কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ইঁদুরের আক্রমণে ক্ষতি এবং এর দমন ব্যবস্থাপনা

ভূমিকা : ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বলতে আমরা সদা বর্ধিষ্ণু দাঁত বিশিষ্ট প্রাণী বুঝি। কাঠবিড়ালি, সজারু, ইঁদুর এই প্রাণী বর্গের অন্তর্ভুক্ত। সারা পৃথিবীতে ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর প্রায় ১৭০০টি প্রজাতি আছে। তন্মধ্যে ২০টি প্রজাতি আপদবালাই রূপে চিহ্নিত। ইঁদুর জাতীয় প্রাণীদের কাটাকাটির স্বভাব তার প্রকৃতিগত। দাঁত ছোট রাখার জন্য এরা প্রতিনিয়তই কাঁটাকাটি করে। যদি ইঁদুরের এ অভ্যাস বন্ধ রাখা হয়, তবে তার দাঁত অনেক বড় হয়ে যাবে। সুতরাং দাঁত ছোট রাখার জন্য তাকে প্রতিনিয়তই কাটাকাটি করতে হয়। এক হিসাবে দেখা গেছে যে, ইঁদুর যে পরিমাণ ভক্ষণ করে তার দশ গুণ সে কেটে নষ্ট করে।


বিশ্বের অন্যতম ইঁদুর উপদ্রুত এবং বংশ বিস্তারকারী এলাকা হচ্ছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানকার উপকূলীয় লোনা ও মিঠাপানির মিশ্রণের এলাকাগুলো ইঁদুরের বংশ বিস্তারের জন্য বেশ অনুকূল। ফসলের মাঠ ছাড়াও এ অববাহিকায় অবস্থিত হাট-বাজার ও শিল্পাঞ্চলগুলোতেও ইঁদুরের উপদ্রব বেশি পরিলক্ষিত হয় (ইউএসডিএ, ২০১০)।


ইঁদুর আমাদের বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের একটি প্রাণী। জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করতে ইঁদুরের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু সময়ে ইঁদুর ফসল ও কৃষকের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাই জমির শস্য ও গোলার ফসল রক্ষার্থে ইঁদুর দমন করতে হয়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগ ইঁদুর দমনে পেঁচা নিয়ে গবেষণা করছে। বিশ্বের ইসরায়েল একমাত্র দেশ যারা একমাত্র পেঁচা দিয়ে ইদুর দমন করছে। আমরা জানি ইঁদুরের প্রধান শত্রু পেঁচা, চিল, সাপ, বিড়াল প্রভৃতি। পেঁচা দিয়ে জৈবিক উপায়ে ইঁদুর দমন করা গেলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা পাবে। সেই সাথে কৃষকও স্বল্প খরচের ফসলি জমির  ও গোলার শস্য ইঁদুরের ক্ষয়ক্ষতির থেকে রক্ষা করতে পারবে।


দানাদার শস্যে ক্ষতির পরিমাণ : বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, প্রতি বছর দুই হাজার কোটি টাকার খাদ্য শস্য ইঁদুরের পেটে চলে যাচ্ছে। ইঁদুর যে শুধুমাত্র দানাদার ফসলের ক্ষতি করে তা নয়, অন্যান্য ফসল, ফলমূল ও আসবাবপত্রেরও ক্ষতি সাধন করে, যেমন- নারিকেল, আলু, ডাল, অন্যান্য সবজি ইত্যাদি। বৈদ্যুতিক তার ও যন্ত্রপাতিও এর হাত থেকে রেহাই পায় না। তাছাড়া ইঁদুর বিভিন্ন ধরনের স্থাপনাও কেটে নষ্ট করে, যার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক তবে তা মুদ্রা মানে ইতিপূর্বে খুব একটা হিসাব করা হয়নি। সরকারি-বেসরকারি খাদ্য গুদাম, পাউরুটি ও বিস্কুট তৈরির কারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা পণ্য বিক্রেতার দোকানে বিপুল পরিমাণে খাদ্য ইঁদুর নষ্ট করছে যার পরিসংখ্যানও অজানা।


ইঁদুরের আক্রমণের কারণে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন ১১টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফসলের মোট ক্ষতির বিবেচনায় ইঁদুরের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ফিলিপাইন। দেশটির উৎপাদিত ধানের ২০ শতাংশ ইঁদুর খেয়ে ফেলে ও নষ্ট করে। লাওস এ প্রায় ১৫ শতাংশ ধান ইঁদুরের পেটে যায়। বাংলাদেশে ইঁদুরের আক্রমণে বছরে আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গম ৪-১২ ভাগ, গোল আলু ৫-৭ ভাগ, আনারস ৬-৯ ভাগ নষ্ট করে। গড়ে মাঠ ফসলের ৫-৭% এবং গুদামজাত শস্য ৩-৫% ক্ষতি করে। ইঁদুর শতকরা ৭ থেকে ১০ ভাগ সেচ নালাও নষ্ট করে থাকে। সেটা ফসলের উৎপাদনের উপর প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এর এক গবেষণায় দেখা যায়, এশিয়ায় ইঁদুর বছরে যা ধান-চাল খেয়ে নষ্ট করে তা ১৮ কোটি মানুষের এক বছরের খাবারের সমান। শুধু বাংলাদেশে ইঁদুর ৫০-৫৪ লাখ লোকের এক বছরের খাবার নষ্ট করে। তাছাড়া ইঁদুরের মাধ্যমে মোট ৬০ ধরনের রোগ ছড়ায়।


ইঁদুরের আশ্রয়স্থানসমূহ : গ্রীষ্ম মৌসুমে ইঁদুর সাধারণত ফসলের ক্ষেতে ও গ্রাম এলাকার বিভিন্ন স্থানে গর্ত করে সেখানে অবস্থান করে। কিন্ত বর্ষা মৌসুমে নিম্নভূমি প্লাবিত হলে এবং ফসলের জমিতে বৃষ্টির পানি জমলেই ইঁদুর গিয়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উঁচু গ্রামীণ সড়ক, বেড়িবাঁধ  ও পুরোনো স্থাপনায় ইঁদুরের দল গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ অবকাঠামোগুলো কাটাকাটি করে ইঁদুর বাসা তৈরি করে। বর্ষা এলে জোয়ার-ভাটার পানির মতো ইঁদুরও বেড়িবাঁধগুলোর জন্য অভিশাপ হয়ে আসে। জোয়ার ভাটা ও বন্যার পানি ফসলের মাঠ ডুবিয়ে দিলে ইঁদুর এসে বেড়িবাঁধ ও গ্রামীণ সড়ক ফুটো করে সেখানে আশ্রয় নেয়। আর ঐ ফুটো দিয়ে পানি প্রবেশ করে বেড়িবাঁধ ও সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


ধান ক্ষেতে ও গুদামে ইঁদুরের আক্রমণ : ইঁদুর ধানগাছের কুশি  তেরছা করে (৪৫ ডিগ্রি কোণে) কেটে দেয়। ধান পাকলে ধানের ছড়া কেটে মাটির নিচে সুড়ঙ্গ করে জমা রাখে। ধানের জমিতে প্রধানত মাঠের বড় কালো ইঁদুর, মাঠের কালো ইঁদুর ইত্যাদি ক্ষতি করে থাকে। গেছো ইঁদুর গুদামজাত শস্যের ক্ষতিসাধন করে থাকে।


দমন ব্যবস্থাপনা : ইঁদুর দমনে বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক (যেমন-লাইভ ট্র্যাপ, স্ন্যাপ ট্র্যাপ), রাসায়নিক  (যেমন-ফসটক্সিন, মিথাইল ব্রোমাইড ইত্যাদি) ব্যবহার হচ্ছে। ধানের জমিতে ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে জীবন্ত ফাঁদ (live trap) সবচেয়ে কার্যকরী। ফাঁদে টোপ হিসেবে শামুকের মাংস, ধান, নারিকেলের শাঁস, কলা ও শুঁটকি মাছ ব্যবহার করলে ইঁদুর বেশি ধরা পড়ে। তাছাড়া  ধান বা চালের সাথে নারিকেল তৈল টোপ হিসেবে ব্যবহার করলে বেশ কার্যকরী ফলাফল পাওয়া যায়। শস্য গুদাম এবং বসতবাড়িতে ইঁদুর দমনের ক্ষেত্রে আঠাযুক্ত  ফাঁদ বেশি কার্যকরী। ইঁদুর অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী তাই প্রতিদিন একই ধরনের বিষ টোপ ব্যবহার না করে তা পরিবর্তন করে দিতে হবে।
ইঁদুরের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে -

 

জমির আইল সরু (৬x৮ ইঞ্চি) ও আশপাশ আবর্জনা মুক্ত রাখা।
ইঁদুর উপদ্রুত এলাকায় যথাসম্ভব একই সময়ে কর্তন করা যায় এমনভাবে ফসলের চাষ করা।
গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর নিধন করা।
গর্তে পানি অথবা মরিচের ধোঁয়া দিয়ে ইঁদুর বের করে মেরে ফেলা।
বিভিন্ন প্রকারের ফাঁদ ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করা।
গাছের কাণ্ডে পিচ্ছিল ধাতব পাত পেচিয়ে ইঁদুরের গাছে উঠা প্রতিরোধ করা।
জৈবিক দমন অর্থাৎ বিড়াল, সাপ, বেজি, পেঁচা, চিল ইত্যাদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
বিভিন্ন ধরনের ইঁদুরনাশক যেমন-একমাত্রা ও বহুমাত্রা বিষ টোপ, গ্যাস বড়ি ইত্যাদি সাবধানতার সাথে ব্যবহার করা।
গোলার শস্য মেঝেতে মাচা করে রাখা।
গুদামজাত শস্যের ক্ষেত্রে ফাঁদ ব্যবহার করে জীবন্ত অবস্থায় ইঁদুর ধরে মারা।
ইঁদুর ধরার জন্য বিশেষ ধরনের আঠালো গ্লু (র‌্যাট গ্লু) কাঠের উপর ব্যবহার করা।
বড় গুদামে শস্য সংরক্ষণের পূর্বে গ্যাস বাষ্প ব্যবহার করা।

 

মীর মোঃ মনিরুজ্জামান কবির১ ড. মো. নজমুল বারী২ ড. শেখ শামিউল হক৩
১বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মোবাইল : ০১৭১২২১৫৪৮৯, ৩মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অ. দা.) এবং বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর-১৭০১


Share with :

Facebook Facebook