কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

হাইড্রোপনিক ফার্মিং : এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান পানিতে যোগ করে সে পানিতে ফসল উৎপাদন করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় হাইড্রোপনিক ফার্মিং। গাছের জন্য সরবরাহকৃত পানিতে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকলে মাটি ছাড়াও গাছ উৎপাদন করা যায়। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য এ ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মাটির পরিবর্তে পানিতে ফসল উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় ফসলের সব খাদ্য উপাদান দ্রবণে মিশিয়ে সেখানে গাছ রোপণ করা হয়। আবার কখনও কখনও মাটি ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে চারা রোপণ করে তাতে খাদ্য উপাদান স্প্রে করেও হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করা হয়ে থাকে। এটি একটি অত্যাধুনিক ফসল চাষ পদ্ধতি। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, তাইওয়ান, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাইড্রোপনিক পদ্ধতির মাধ্যমে সবজি ও ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এ পদ্ধতি ব্যবহারে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
 

বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক ফার্মিংয়ের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে বর্ধিত মুখের চাহিদা পূরণ করতে প্রয়োজন হচ্ছে অতিরিক্ত খাদ্য। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মাটি ছাড়া ভিন্ন মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করে সে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে একদিকে যেমন অনুর্বর এবং উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জায়গা ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল উৎপাদন করা যাবে তেমনি শহরেও বদ্ধ জায়গায় উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন করে লাভবান হওয়া সম্ভব হবে। হাইড্রোপনিক পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব এবং এ চাষে কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম বিধায় ফসলে কোনো পেস্টিসাইড প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। ফলে উৎপাদিত ফসলে কোনো বিষাক্ত প্রভাব থাকে না। এ পদ্ধতিকে অবশ্য বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন বলা যাবে না। এ দেশে কৃষক পর্যায়ে মনের অজান্তে অনেক আগ থেকেই কিছু হাইড্রোপনিক কালচার হয়ে আসছে। বর্তমানে সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে আরও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে সেখানে ভাসমান জৈব বেডে এ পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে ফসল উৎপাদিত হয়ে আসছে। এ প্রাকৃতিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতেও অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবহার করে সারা বছর ফসল চাষ করার সুযোগ রয়েছে। এসব প্রচলিত পদ্ধতির উন্নয়নের জন্যও আধুনিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানার আবশ্যকতা রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে ভাসমান চাষ পদ্ধতি বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর হাইড্রোপনিক পদ্ধতি থেকে অবশ্যই আলাদা। আমরা হাইড্রোপনিক কালচার বা ফার্মিং বলতে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর হাইড্রোপনিক ফসল চাষ ব্যবস্থাপনাকেই বুঝাতে চাচ্ছি। এ পদ্ধতির প্রসারে বাংলাদেশ নিবিষ্টভাবে কাজ করছে এবং দ্রুতগতিতে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক কৃষির ইতিহাস
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভাসমান বেডে যে সবজি আবাদ হয়ে আসছে তা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিরই একটি সাধারণ রূপ বলা যেতে পারে। আমাদের শহরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে লতানো গাছ বোতলে পানির মধ্যে রেখে বারান্দায় গ্রিলে উঠিয়ে দেয়ার যে রীতি তাও হাইড্রোপনিক ব্যবস্থাপনারই মূলমন্ত্র। অনেক সময় পাতাবাহার জাতীয় গাছের ডাল কেটে বোতলের পানিতে রেখে মূল গজিয়ে তারপর মাটিতে লাগানো হতো সেটাও একই ধারণা প্রসূত। বর্তমানে এ পুরনো ধারণার সাথে যোগ হয়েছে পানিতে গাছের খাদ্য উপাদান মিশিয়ে এবং পরিবেশের অন্যান্য প্রভাবগুলো নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্যিকভাবে ফসল উৎপাদন সম্পর্কিত ব্যবস্থাপনা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ অনেক আগে থেকেই আধুনিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষ শুরু করে। বাংলাদেশ হাইড্রোপনিক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করে মাত্র কয়েক বছর আগে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ১৯৯৮ সালে প্রথম এ পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা, সার্বিক পর্যালোচনা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে লেগে যায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত। অতপর ২০০৬ সালে এসে শুরু হয় হাইড্রোপনিক কালচারের ওপর প্রকৃত গবেষণা। বছরান্তে ২০০৭ সালে বাংলাদেশের জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাইড্রোপনিক পদ্ধতির গবেষণা শুরু হয় টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস ও স্ট্রবেরি নিয়ে। আরও এক বছর পরে ২০০৮ সালে তার সাথে যোগ হয় ক্ষিরা, শসা, গাঁদা ফুল ও বেগুন। এভাবে ২০০৯ সালে বামন শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রোকলি এবং চন্দ্রমল্লিকাকেও গবেষণার তালিকায় আনা হয়। অতঃপর ২০১১-১২ অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠান হাইড্রোপনিক কালচার পদ্ধতিতে বারোটি অর্থনৈতিক ফসল উৎপন্ন করতে সক্ষম হয় যা বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ষোলোতে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্রেও এগিয়ে চলেছে হাইড্রোপনিক কালচারের জন্য গবেষণা। গবেষণা শুরু করেছে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়। গবেষণার পাশাপাশি হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এগিয়ে আসছেন আগ্রহী কৃষকগণ।

 

বাংলাদেশে বর্তমান হাইড্রোপনিক চাষের অবস্থা
বাংলাদেশে হাইড্রোপনিক কালচারের গবেষণা অনেকটা এগিয়ে গেছে। হাইড্রোপনিক ফার্মিং ব্যবস্থাপনাও এগিয়ে যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছে। হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে স্বাভাবিক চাষের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ ফলন বেশি পাওয়া যায়। সেজন্য এ চাষ পদ্ধতির সুবিধার দিকগুলো বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। বারির পটুয়াখালী উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সারা বছর তরমুজ উৎপাদনের প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে প্রদান করেছেন। বারির হাইড্রোপনিক প্রযুক্তি বিএআরসি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরবরাহ করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে ফসল চাষের জন্য ঢাকার মহাখালীতে শহর পর্যায়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে অনেক সম্প্রসারণ কর্মীকেও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ^বিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে এ চাষ ব্যবস্থাপনার ওপর গবেষণা বেশ এগিয়ে গেছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ চলমান আছে।  

 

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ একুয়াপনিক কালচার পদ্ধতির ওপর গবেষণা করছে। এ পদ্ধতিতে পানির ট্যাংকে পিলেট খাদ্য দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। পানির ওপর ককশিট দিয়ে সবজির চাষ চলছে। আলাদা জায়গায় চারা তৈরি করে সারা বছর এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা যাচ্ছে। একই সাথে পানিতে মাছের পোনা মজুদ করা হয়। শীতকালে টমেটো, লেটুস, পুদিনা এবং গ্রীষ্মকালে ঢেঁড়স, পুঁইশাক ও কলমি চাষ করা যায়। শীত কালে গিফট তেলাপিয়া ও মনোসেক্স তেলাপিয়া এবং গ্রীষ্মকালে এর সাথে থাই কই, ভিয়েতনামি কই, সরপুঁটি ও লাল তেলাপিয়া চাষ করা যাচ্ছে। আশা করা যায় এ পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয়তা পাবে।
 

বাংলাদেশের হাইড্রোপনিক ফসল
হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে জন্মানো যাবে পাতা জাতীয় সবজির মধ্যে লেটুস, গিমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া ও বাঁধাকপি এসব। ফল জাতীয় সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, শসা, ক্ষিরা, ক্যাপসিকাম, মেলন ও স্কোয়াস উল্লেখযোগ্য। ফলের মধ্যে আছে স্ট্রবেরি এবং ফুলের মধ্যে উৎপাদন করা যাবে অ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড ও চন্দ্রমল্লিকা। ভবিষ্যতে যোগ হতে পারে তালিকায় আরও অনেক নতুন ফসলের নাম। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ট্রে, প্লাস্টিক বালতি, পানির বোতল ও মাটির পাতিল ব্যবহার করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গায় সবজি উৎপাদন করতে পারবেন। গ্রিন হাউস, প্লাস্টিক হাউস, ফিনাইল হাউসে এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়।

 

হাইড্রোপনিক ফার্মিং পদ্ধতি
হাইড্রোপনিক ফার্মিং কেবল চারা উৎপাদনের সময় ছাড়া কোনো উৎপাদন মিডিয়া ব্যবহার করার দরকার হবেনা। এ পদ্ধতিতে পটে পাথর নুড়ি বা স্পঞ্জ দিয়ে পূর্ণ করে তাতে শুধু চারা উৎপাদন করা হয়। পরবর্তিতে নিউট্রিয়েন্ট দ্রবণে এ চারা রোপণ করে ফসল চাষ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া পদ্ধতিতে হাইড্রোপনিক ফার্মিং করতে গাছের চারা দ্রবণে রোপণ না করে মাটি ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে রোপণ করে সেখানে নিউট্রিয়েন্ট দ্রবণ প্রয়োগ করতে হবে। মাধ্যম হিসেবে অজৈব ও জৈব উভয় প্রকার মাধ্যমই ব্যবহার করা যাবে। বালি কণা, গ্রাভেল, বা কৃত্রিম কাদা অজৈব মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে তিন মিলিমিটার ব্যাসার্ধের চেয়ে কম আকারের বালি কণা ব্যবহৃত হয়। গ্রাভেল কালচারে নির্দিষ্ট সময় পরপর নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করা হয়। কৃত্রিম কাদাতে সাধারণত শোভাবর্ধনকারী গাছ লাগানো হয়। জৈব উপাদানের মধ্যে কাঠের গুড়া এবং ধানের তুষ বা তার ছাই ব্যবহার করা হয়। এতেও ড্রিপিং পদ্ধতিতে নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করতে হবে। তৃতীয়ত, এরোপনিক্স পদ্ধতিতে সার্বক্ষণিক অথবা সময় সময় ফসলের মূলে নিউট্রিয়েন্ট স্প্রে করা লাগে। এখানেও কোনো উৎপাদন মিডিয়া ব্যবহার করা হয়না বলেই একেও হাইড্রোপনিক কালচার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে শুনেই আগ্রহী কৃষকদের কাজ শুরু করতে হবে। প্রযুক্তিকে সামর্থের সাথে মিলিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আগ্রহীদের সহায়তার জন্য সরকারি পর্যায়েও প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা দেয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে হবে।

 

হাইড্রোপনিক দ্রবণ সংগ্রহ
সব ধরনের হাইড্রোপনিক ফার্মিংয়ের ক্ষেত্রে নিউট্রিয়েন্ট দ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এখন বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি কোম্পানি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে হাইড্রোপনিক কালচারের জন্য উৎপাদিত নিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করছে। হাইড্রোপনিক সার তরল আকারে বা পাউডার আকারে থাকে যাকে দ্রবীভূত করে প্রয়োগ করতে হয়। মাটিতে যে সব অর্গানিক উপাদান ব্যবহার করা হয় সেগুলোর সাথে মাটির বিভিন্ন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উপাদানের কথা বিবেচনা করে এ নিউট্রিয়েন্ট তৈরি করা  হয়ে  থাকে। হাইড্রোপনিক বাগানে যদিও গাছ পানিতে জন্মায় তবুও মূল আটকানোর জন্য মাধ্যম প্রয়োজন হয়। মাধ্যম হিসেবে পারলাইট, নারিকেলের ছোবড়া, রকউল এমনকি বালিও ব্যবহার করা যেতে পারে। যাই ব্যবহার করা হোক না কেন তাতে মৃত্তিকা বাহিত রোগের হাত থেকে গাছ রক্ষা পায়। অন্যান্য দেশে অনেকেই হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফুলের বাগান করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এ পদ্ধতিই এখন চিরাচরিত মাটিতে ফুল বাগানের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকৃত পক্ষে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে ফুল বাগান করার বেশ কিছু সুবিধা আছে।

 

পদ্ধতি সম্প্রসারণে উদ্যোগ
সরকারের পক্ষ থেকে হাইড্রোপনিক চাষ মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য প্রচেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কিছু এনজিও এ প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এগিয়ে এসেছে। ব্র্যাক ভূমিহীন কৃষকদের হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষের কৌশল শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। গত ২০১২ সালে এ প্রতিষ্ঠান চাঁদপুর, নেত্রকোনা ও মানিকগঞ্জের ১০০ ভূমিহীন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়। এসব কৃষককে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষ করার জন্য দশটি করে বাকেট এবং নিউট্রিয়েন্ট সলুশন সরবরাহ করা হয়। তাদের এ উদ্যোগ অব্যাহত আছে। গ্রিন লিফ এগ্রো মহাখালিতে এর সেল সেন্টারে হাইড্রোপনিক ফার্মিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রিয়েন্ট সলুশন বিক্রি করে থাকে। আলফা এগ্রো প্রান্তিকও এ পদ্ধতিতে চাষের কাজ শুরু করেছে। হাইড্রোপনিক কালচার প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিভিন্ন মিডিয়াতে এর ব্যাপক প্রচার শুরু হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে বহুতল বিশিষ্ট হাইড্রোপনিক ফার্ম করার পরিকল্পনাও এগিয়ে চলেছে। এখনও এ ধরণের ফার্মিং ব্যবস্থাপনা গড়ে না উঠলেও শিগগিরই গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। তাহলেই কৃষি আর শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং সম্প্রসারিত হবে নিয়ন্ত্রিত বহুতল বিশিষ্ট হাইড্রোপনিক খামারে। বাংলাদেশের কৃষি পরিগণিত হবে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে।

 

সুপারিশ
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির গবেষণার পাশাপাশি প্রযুক্তি বিস্তারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি বিস্তারের জন্য যথেষ্ট প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সমবায়ের ভিত্তিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। ভূমিহীন কৃষকদের এ সংক্রান্তে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। তাদের এ চাষ পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মানুষ যদি বুঝতে পারে তারা এ পদ্ধতি ব্যবহার করে লাভবান হবে তাহলে অবশ্যই গ্রহণ করবে। সকল পর্যায়ে হাইড্রোপনিক চাষ ও খামার গড়ে তোলার জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যারা আগ্রহী হবেন তাদের সহায়তা করার জন্য সরকারের কৃষি অধিদপ্তরকে সার্বক্ষণিক তৎপর থাকতে হবে। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে গৃহিত পরিকল্পনা অনুসারে এগিয়ে গেলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সফল হবে।

 

জলবায়ু পরিবর্তন জনিত পরিস্থিতিতিতে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ বাংলাদেশে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ পদ্ধতিতে বাড়ির ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায়, পলিটানেল ও নেট হাউস কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সহজেই চাষাবাদ করা সম্ভব হবে। বাড়ির আঙিনায় নানা ফুলের চাষ করা যাবে। এতে করে একদিকে যেমন পতিত জমি বা অব্যবহৃত জায়গার সফল ব্যবহার হবে, অন্য দিকে দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবে। সেদিন আর হয়ত দূরে নয় যখন বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে মাটি ছাড়া হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে শাক সবজি, ফল ও ফুলের চাষ হবে। আমাদের বিশ^াস আগামী দিনে হাইড্রোপনিক ফার্মিং পাল্টে দিবে বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি তথা দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা। আমরা সেদিনের প্রত্যাশায় থাকলাম।

ড. পিয়ার মোহাম্মদ*

*পরিচালক (অর্থ), বাংলাদেশ টেলিভিশন, রামপুরা, ঢাকা


Share with :

Facebook Facebook