কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পরিবর্তিত জলবায়ুতে পরিবেশ রক্ষায় পাট ও পাটজাত পণ্য

বাংলাদেশকে সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে পাট। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পাট ছিল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব তন্তু হিসেবে আবার পাটের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পাট ও পাটপণ্য শুধু পরিবেশবান্ধব এবং সহজে পচনশীলই নয় এটা পরিবেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়কারী কৃত্রিম তন্তুর জনপ্রিয়তা বা ব্যবহার ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তাছাড়া জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০৯ সালকে The International Year of Natural Fibers হিসেবে ঘোষিত ও পালিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহার আরও উৎসাহিত হয়েছে।
 

পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার : পরিবেশ রক্ষায় এবং স্বাস্থ্য উন্নত হাইড্রোকার্বন মুক্ত জুট ব্লেচিং অয়েল উন্নয়ন, জুট ফাইবারকে বিশেষ রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্নিরোধী পাটজাত বস্ত্র উৎপাদন, পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন ব্যাগের বিকল্প স্বল্পব্যয়ে পাটের ব্যাগ তৈরি এবং দেশের নার্সারিগুলোতে গাছের চারা সংরক্ষণে পাটের ব্যাগ (নার্সারি পট) উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এছাড়া পাট কাটিংস ও নি¤œমানের পাটের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারিকেলের ছোবড়ার সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হয় পরিবেশবান্ধব এবং ব্যয়সাশ্রয়ী জুট জিওটেক্সটাইল। জিওটেক্সটাইল ভূমিক্ষয় রোধ, রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড় রক্ষা ও পাহাড়ধস রোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। জিওটেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন ৭শ’ কোটি টাকার। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, রেল, সড়কসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে জিওটেক্সটাইলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বজুড়ে নানা কাজে ‘মেটাল নেটিং’ বা পলিমার থেকে তৈরি সিনথেটিক জিওটেক্সটাইলের পরিবর্তে পরিবেশ উপযোগী ও উৎকৃষ্ট জুট জিওটেক্সটাইলের কদর বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পাট এখন পশ্চিমা বিশ্বের গাড়ি নির্মাণ, পেপার এন্ড পাম্প, ইনসুলেশন শিল্পে, জিওটেক্সটাইল হেলথ কেয়ার, ফুটওয়্যার, উড়োজাহাজ, কম্পিউটারের বডি তৈরি, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টস শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ইউরোপের বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্চ, ওডি ফোর্ড, যুক্তরাষ্ট্রের জিএম মটর, জাপানের টয়োটা, হোন্ডা কোম্পানিসহ নামিদামি সব গাড়ি কোম্পানিই তাদের গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও ডেশবোর্ড তৈরিতে ব্যবহার করছে পাট ও কেনাফ। বিএমডব্লিউ পাট দিয়ে তৈরি করছে পরিবেশ সম্মত ‘গ্রিন কার’, যার চাহিদা এখন প্রচুর।   
 

জমির উর্বরতা বৃদ্ধি : মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে পাটের গুরুত্ব অপরিসীম। পাট ফসলের মূল মাটির ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি বা তার বেশি গভীরে প্রবেশ করে মাটির উপরিস্তরে সৃষ্ট শক্ত ‘প্লাউপ্যান’ ভেঙে দিয়ে এর নিচে তলিয়ে যাওয়া অজৈব খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে মাটির ওপরের স্তরে মিশিয়ে দেয়। ফলে অন্যান্য অগভীরমূলি ফসলের পুষ্টি উপাদান গ্রহণ সহজ হয় এবং মাটির ভৌত অবস্থার উন্নয়ন ঘটে। মাটিতে পানি চলাচল সহজ ও স্বাভাবিক থাকে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাট ফসল উৎপাদন কালে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাট পাতা মাটিতে পড়ে। পাটের পাতায় প্রচুর নাইট্রোজেন, ক্যারোটিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে। এছাড়া পাট ফসল কর্তনের পর জমিতে যে পাটগাছের গোড়াসহ শিকড় থেকে যায় তা পরে পচে মাটির সঙ্গে মিশে জৈব সার যোগ করে, এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সময় সারের খরচ কম লাগে। প্রতি বছর গড়ে ৯৫৬.৩৮ হাজার টন পাট পাতা ও ৪২৩.৪০ হাজার টন পাটগাছের শিকড় মাটির সঙ্গে মিশে যায়, যা জমির উর্বরতা ও মাটির গুণগত মান বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রভাব রাখে। এ কারণে যে জমিতে পাট চাষ হয়, সেখানে অন্যান্য ফসলের ফলনও ভালো হয়।
 

বায়ুম-লকে শুদ্ধিকরণ : পরিবেশবিদদের মতে, প্রতিটি দেশেই মোট ভূমির তুলনায় ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। পাট একটি আঁশ উৎপাদনকারী মাঠ ফসল যা বনভূমির মতো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে ভূমিকা রাখতে পারে। সারা বিশ্বে বছরে প্রায় ৪৭.৬৮ মিলিয়ন টন কাঁচা সবুজ পাটগাছ উৎপাদিত হয়, যার প্রায় ৫.৭২ মিলিয়ন টন কাঁচাপাতা এবং ২১.৯৩ মিলিয়ন টন কাঁচা সবুজ কা-। বর্তমান বিশ্বে পাট আঁশের উৎপাদন প্রায় ২.৯৮ মিলিয়ন টন। আঁশের সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে ১.৪৩ মিলিয়ন টন শুকনা পাতা ও ৬.২০ মিলিয়ন টন শুকনা পাটকাঠি বায়োমাস হিসেবে উৎপাদিত হয়। পাট ফসলের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা ০.২৩ থেকে ০.৪৪ মিলিগ্রাম/বর্গমিটার/সেকেন্ড। পাট ফসল পৃথিবীর গ্রিন হাউস গ্যাস ও তার পরিপ্রেক্ষিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে কিছুটা হলেও ব্যাহত করে পৃথিবীকে তার পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে। আবার অন্যদিকে, প্রতি হেক্টর পাট ফসল ১০০ দিন সময়ে ১০.৬৬ টন অক্সিজেন নিঃসরণ করে বায়ুম-লকে বিশুদ্ধ ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রাখে। বনের গাছ কেটে ম- তৈরি করে কাগজ তৈরি হয়। এক টন কাগজ তৈরি করতে ১৭টি পরিণত গাছ কাটতে হয়। পরিবেশ সুরক্ষার দিক চিন্তা করে পাটকাঠি দিয়ে স্বল্প ব্যয়ে পেপার পাল্প তৈরি করা যায়। পাটকাঠি জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ও পেপার পাল্প তৈরিতে ব্যবহৃত হাওয়ায় বন উজাড়ের হাত থেকে কিছুটা হলেও পরিবেশ রক্ষা পায়।
 

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম তন্তু বর্জন : পৃথিবী জুড়ে প্রতি মিনিটে ১০ লাখেরও বেশি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক ব্যাগের মূল উপাদান সিনথেটিক পলিমার তৈরি হয় পেট্রোলিয়াম থেকে। এ বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরিতে প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে মোট খনিজ তেলের ৪% ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক ব্যাগ জৈববিয়োজনশীল নয়। এক টন পাট থেকে তৈরি থলে বা বস্তা পোড়ালে বাতাসে ২ গিগা জুল তাপ এবং ১৫০ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে এক টন প্লাস্টিক ব্যাগ পোড়ালে বাতাসে ৬৩ গিগা জুল তাপ ও ১৩৪০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড মেশে। এসব ক্ষতিকারক বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্যশস্য ও চিনি মোড়কজাত করার জন্য পরিবেশবান্ধব পাটের বস্তা বা থলে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। সাম্প্রতিককালে বিশ্বের বিাভন্ন দেশ সিনথেটিক ব্যাগসহ পরিবেশ বিনাশক অন্যান্য উপাদানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ঝুঁকে পড়ছে প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের দিকে। এক্ষেত্রে পাটই হয়ে উঠেছে বিকল্প অবলম্বন। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ইতালি। অথচ তারা ছিল পৃথিবীর সর্বাধিক প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারকারী দেশ। প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা দেশের মধ্যে আছে ব্রাজিল, ভুটান, চীন, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, তাইওয়ান, তানজানিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকাসহ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজ্য। এ তালিকা প্রতি বছরই বাড়ছে। ওয়ালমার্ট, টেসকোর মতো বৃহৎ চেইন শপগুলো পাটের ব্যাগ ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিখ্যাত চেইন শপ টেসকোর প্রতি মাসে ১ মিলিয়ন প্রাকৃতিক আঁশের তৈরি ব্যাগের প্রয়েজন। এ ব্যাগ তারা প্রধানত ভারত থেকে আমদানি করছে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে ১ লাখ পাটের ব্যাগ রপ্তানি করা হয়। সম্প্রতি পাট ও পাটজাত বর্জ্যরে সেলুলোজ থেকে পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ উদ্ভাবন করেছে পরমাণু শক্তি কমিশন, যা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়েয় হিসাব মতে শুধু ঢাকাতেই মাসে প্রায় ৪১ কোটি পলিব্যাগ ব্যবহার করা হয়। বিশ্বে প্রতি বছর ১ ট্রিলিয়ন মেট্রিক টন পলিথিন ব্যবহার করা হয়, যার ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার ১০ লাখেরও বেশি পাখি এবং  লক্ষাধিক জলজপ্রাণী।
 

সরকারি উদ্যোগ : বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। পাটের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি, চাষ সম্প্রসারণ, গুণগতমান উন্নয়ন এবং পাট শিল্পকে সুরক্ষা দিতে অনুধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রেখে পাট আইন-২০১৭ মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এর ফলে পাটজাত পন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকার বস্তা ব্যবহৃত হয়েছে। সম্প্রতি সরকার ধান, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি ও সারের সঙ্গে আরও ১১টি পণ্যের সরবরাহ ও বিতরণে কৃত্রিম মোড়কের ব্যবহারজনিত কারণে সৃষ্টি পরিবেশ দূষণরোধকল্পে বাধ্যতামূলকভাবে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের মোড়ক হিসেবে ৭৫ শতাংশ পাট আছে এমন উপাদান দিয়ে তৈরি মোড়ক ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন-২০১০ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে বার্ষিক পাটের ব্যাগের চাহিদা ৯০ হাজার পিস থেকে বেড়ে ৮৪ কোটি পিসে উন্নিত হবে। এতে ৫,৩৯,২০০ টন পাটের আঁশের প্রয়োজন হবে যা দেশের মোট পাট উৎপাদনের ৭৭ শতাংশ।
 

ধারণা করা হচ্ছে, পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই সারা বিশ্বে তিনগুণ বেড়ে যাবে। ফলত পাটপণ্যের বাজারই সৃষ্টি হবে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়নের। দুনিয়াব্যাপী পাটের ব্যাগের চাহিদা বৃদ্ধি ও আমাদের দেশের উন্নতমানের পাট এ দুই হাতিয়ার কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশেরও সফলতা আসতে পারে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এ আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। এদেশের মান্ধাতার আমলের পাটকলগুলো আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এ খাতে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে হবে এবং ছোট কারখানাগুলো সমবায়ের মাধ্যমে বড় আকারের উৎপাদনে কাজে লাগাতে হবে। পাট চাষ থেকে পাটপন্য উৎপাদন, বিক্রয় ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। সেজন্য সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য পাটের মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে তা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

কৃষিবিদ মো. আল-মামুন*
*ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭; ০১৭১১১৮৬০৫১,
almamunbjri@gmail.com


Share with :

Facebook Facebook