কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

সরিষার রোগ ও তার প্রতিকার

সরিষা বাংলাদেশের প্রধান তেল ফসলের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের প্রায় ৬.৮৮ লাখ হেক্টর জমিতে তেল ফসলের চাষ করা হয় এবং এর মধ্যে ৪.৬২ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ করা হয় যার মোট উৎপাদন ৪.৮৯ লাখ মেট্রিক টন (তথ্য ডিএই-২০০৯-১০)। সরিষা আবাদ করতে গিয়ে কৃষক নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তার মধ্যে রোগের আক্রমণ অন্যতম। বাংলাদেশে প্রায় ১৪টি রোগ দ্বারা সরিষা আক্রান্ত হয়ে থাকে, এর মধ্যে ৯টি ছত্রাকজনিত, ১টি ব্যাক্টেরিয়াজনিত, ২টি ভাইরাসজনিত, ১টি নেমাটোড এবং ১টি সম্পূরক উদ্ভিদ (অরোবাংকি)। এদেশে পাতা ঝলসানো, ডাউনি মিলডিউ, ক্লোরোসিয়ানা কাণ্ড পচা এবং সম্পূরক উদ্ভিদ (অরোবাংকি) প্রধান। এ ছাড়া আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্যের কারণেও অন্যান্য রোগ দেখা যায়। নিচে সরিষার বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-


১. পাতা ঝলসানো রোগ (Alternaria blight)
রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Alternaria brassicae এবং Alternaria brassiaicola নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগের সৃষ্টি হয় এবং বীজ বিকল্প পোষক ও বায়ুর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৭% এর অধিক এবং তাপমাত্রা ১২-২৫ ডিগ্রি সে. ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়।


রোগের লক্ষণ
১. এ রোগ প্রাথমিক অবস্থায় সরিষা গাছের নিচের বয়স্ক পাতায় ছোট, বাদামি গোলাকার দাগ আকারে আক্রমণ করে। পরবর্তীতে এ দাগ আকারে বড় হতে থাকে।
২. পরবর্তীতে গাছের পাতা, শুটি, কাণ্ড ও ফলে গোলাকার গাঢ় বাদামি বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগগুলো ধূসর, গোলাকার সীমা রেখা দ্বারা আবদ্ধ থাকে। অনেকগুলো দাগ একত্রিত হয় বড় দাগের সৃষ্টি করে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়।
৩. আক্রান্ত শুঁটি থেকে পাওয়া বীজ ছোট, বিবর্ণ এবং কুঁচকে যায় এবং ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।


রোগের প্রতিকার
১. রোগ সহনশীল জাত ব্যবহার করতে হবে। তৈলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত দৌলত, বারি সরিষা ১০, বারি সরিষা ১১ ইত্যাদি জাতগুলো এ রোগ সহনশীল।
২. সঠিক সময়ে বীজ বপন করতে হবে অর্থাৎ অক্টোবরে  শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে।
৩. সুস্থ সবল  জীবাণু মুক্ত এবং প্রত্যয়িত বীজ বপন করতে হবে।
৪. সরিষার মাঠে সময়মতো আগাছা পরিষ্কার করতে হবে বিশেষ করে বথুয়া পরিষ্কার করতে হবে।
৫. অনুমোদিত মাত্রায় পটাশ সার ব্যবহার করলে পাতা ঝলসানো রোগের আক্রমণ কম হয়। জমিতে পূর্ববর্তী ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং ফসল কর্তনের পর আক্রান্ত গাছের পাতা জমি থেকে সরিয়ে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৬. প্রতি কেজি বীজ ২.৫ গ্রাম হারে প্রভে´ ২০০ ডব্লিউ পি দ্বারা শোধন করে বপন করতে হবে।
৭. ১০০ গ্রাম নিমপাতায় সামান্য পানি দিয়ে পিষিয়ে তার রস ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ফসলে ১০ দিন অন্তর ৩ বার গাছে প্রয়োগ করলে রোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করা যায়।
৮. এ রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে রোভরাল-৫০ ডব্লিউপি শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন অন্তর ৩ বার পুরো গাছে ছিটিয়ে স্প্রে করলে এ রোগের আক্রমণ থেকে ফসলকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।

 

২. ডাউনি মিলডিউ রোগ (Downey mildew)
রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Peronospora parasitica নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। এ ছত্রাক গাছের আক্রান্ত অংশে এবং বিকল্প পোষক ও স্পোর হিসেবে বেঁচে থাকে। ঠাণ্ডা (তাপমাত্রা ১০-২০ ডিগ্রি সে.) এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় (৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতা) এ রোগ সহজে বিস্তার লাভ করে। এছাড়া গাছের সংখ্যা বেশি হলে এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।


রোগের লক্ষণ
১. গাছের চারা অবস্থার পর থেকে যেকোনো সময় এ রোগে গাছ আক্রান্ত হতে পারে।
২. আক্রান্ত পাতার নিম্নপৃষ্ঠে সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক দেখা যায় এবং পাতার উপরের পৃষ্ঠ হলদে হয়ে যায়।
৩. অনুকূল আবহাওয়ায় এ ছত্রাকের বংশ দ্রুত বৃদ্ধি পায়; ফলে পাতা আকারে ছোট হয়ে যায়।
৪. এ রোগ পরবর্তীতে সরিষার শুঁটি আক্রমণ করে এবং বীজ হতে খাদ্য গ্রহণ করার ফলে উৎপাদন বহুলাংশে কমে যায়।

 

রোগের প্রতিকার
১. সুস্থ সবল ও জীবাণু মুক্ত বীজ বপণ করতে হবে।
২. ন্যাপাস জাতীয় সরিষা এ রোগ সহনশীল।
৩. সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার এবং সেচের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. শস্য পর্যায়ক্রম করতে হবে।
৫. ফসল কর্তনের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৬. বীজ বপনের আগে বীজ শোধন (প্রোভে´ ২০০ ডব্লিউ পি ২.৫ গ্রাম বা ব্যাভিস্টিন ২ গ্রাম/ কেজি বীজ) করে লাগাতে হবে।
৭. রোগ দেখা দেয়া মাত্র রিডোমিল এম জেড-৭২ বা ডাইথেন এম-৪৫ শতকরা ০.২ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাশনাশক) ১০ দিন অন্তর ৩ বার পুরো গাছে ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে ফসলকে এ রোগ থেকে রক্ষা করা যায়।

 

৩. স্ক্লেরোসিনিয়া কাণ্ড পচা রোাগ (Sclerotinia stem rot)
রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Sclerotinia sclerotiorum নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। এই ছত্রাক মৃত অথবা জীবন্ত উদ্ভিদে সাদা মাইসেলিয়া তৈরি করে এবং উদ্ভিদের আক্রান্ত অংশে এবং মাটিতে কালো দানার মতো স্ক্লেরোসিয়া তৈরি করে বেঁচে থাকে। এ ছাড়া আক্রান্ত বীজের মাধ্যমেও এরা বিস্তার লাভ করে থাকে। সাধারণত আর্দ্রতা অধিক (৯০-৯৫%) এবং ১৮-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় বায়ু প্রবাহের ফলে এ রোগের প্রাদুর্ভব বেশি হয়।
 

রোগের লক্ষণ
১. প্রাথমিক অবস্থায় সরিষার গাছের কাণ্ডে পানি ভেজা দাগ লক্ষণ পরিলক্ষিত হয় যা পরবর্তীতে তুলার মতো সাদা মাইসেলিয়া সৃষ্টি করে।
২. আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে আক্রান্ত কাণ্ড বিবর্ণ হয়ে যায় এবং টিস্যু মারা যায়।
৩. সরিষা গাছে অকাল পক্বতা পরিলক্ষিত হয় এবং গাছ হেলে পড়ে, শুকিয়ে যায় ও মারা যায় এবং ফলন মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়।
৪. কাণ্ডের মধ্যে শক্ত কালো স্ক্লেরোসিয়া সৃষ্টি হয় এ স্কে¬রোসিয়া অনেক সময় কাণ্ডের ওপরে দেখতে পাওয়া যায়।

 

রোগের প্রতিকার
১. সুস্থ সবল রোগমুক্ত প্রত্যয়িত বীজ বপন করতে হবে।
২. গ্রীষ্ম মৌসুমে গভীরভাবে জমি চাষ দিতে হবে।
৩. জমিতে আক্রান্ত ফসলের অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৪. এ রোগের পোষক নয় এমন ফসল দ্বারা শস্য পর্যায়ক্রম করতে হবে যেমন- গম, যব, ধান এবং ভুট্টা।
৫. জমিতে ট্রাইকোডারমা ভিরিডি অথবা ট্রাইকোডারমা হারজেনিয়াম প্রতি হেক্টর জমিতে ২.৫ কেজি হারে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
৬. কারবেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক ০.১ ভাগ হারে (প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ছত্রাকনাশক) ফুল আসার সময় ২০ দিন অন্তর ২ বার পুরো গাছে ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে এ রোগ থেকে রক্ষা করা যায়।

 

৪. সপুষ্পক পরজীবী উদ্ভিদ (Orobanche প্রজাতি) রোগের কারণ, উৎপত্তি ও বিস্তার : Orobanche Spp. নামক এক প্রকার সপুষ্পক শিকড়-পরজীবী উদ্ভিদ যার বংশ বৃদ্ধি সরিষার ওপর নির্ভরশীল। মাটি, ফসলের পরিত্যক্ত অংশ, সেচের পানি প্রভৃতির মাধ্যমে রোগের বিস্তার লাভ করে। প্রতি বছর একই জমিতে সরিষা পরিবারের কোনো ফসলের চাষ করলে এ পরজীবী উদ্ভিদের বিস্তার ঘটে।


রোগের লক্ষণ
১. অরোবাংকি এক প্রকার সপুষ্পক শিকড়-পরজীবী উদ্ভিদ যার বংশ বৃদ্ধি সরিষার ওপর নির্ভরশীল।
২. এর বীজ মাটিতেই অবস্থান করে।
৩. সরিষা গাছের শিকড়ের সাথে এ পরজীবী উদ্ভিদ সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে।
৪. ফলে আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়, বৃদ্ধি কমে যায় এবং ফলন হ্রাস পায়।

 

রোগের প্রতিকার
১. একই জমিতে প্রতি বছর সরিষা চাষ না করে অন্যান্য ফসল যেমন- ধান, গম জাতীয় ফসল (যাতে অরোবাংকি না হয়) পর্যায়ক্রমে চাষ করলে এ রোগের প্রাদুর্ভার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
২. ফল আসার আগেই এ পরজীবী উদ্ভিদ জমি হতে উঠিয়ে ফেলতে হবে।
৩. বীজ বপনের পূর্বে জমি লাঙল দিয়ে গভীরভাবে চাষ করতে হবে। এতে পরজীবী উদ্ভিদের বীজ মাটির গভীরে চলে যায় এবং সরিষার শিকড়ের সংস্পর্শে না আসায় বীজ গজাতে পারে না।
৪. টিএসপি ২৫০ কেজি/হেক্টর প্রয়োগের মাধ্যমে রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো যায়।
৫. জমিতে ২৫% কপার সালফেট দ্রবণ স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

 

*বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা

মো. রাজিব হুমায়ুন*


Share with :

Facebook Facebook