কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ একটি বিশ্লেষণ

বাংলায় মেলা সদা শতত পরিবর্তনশীল। মেলা ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনা নানা পার্বণকে ঘিরে প্রবর্তিত। কিন্তু ফল মেলা শহর গ্রামান্তরের কৃষিতে নতুন সংযোজন। কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় এটি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কৌশল সংযোজন। ফল মেলা একটি সম্প্রসারণ পদ্ধতি ও প্রযুক্তি। বিশেষ ধরনের স্বরূপ, থিম ও দ্রুত বহনযোগ্য বিশেষ বার্তা। ফল চাষের কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও খাদ্য অভ্যাসে ফল আহারের অনুপ্রেরণা তাগিদ। বিশেষ করে সব পেশার মানুষের অংশগ্রহণ এবং কৃষি নির্ভর মানুষের জৈব প্রযুক্তি সংযোগ তথা দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের বিশেষ আবহ তৈরি করে। মেলা বনে যায় চলমান কৃষি ব্যবসার প্রসার ও আয় তৈরির সোপান। বার্ষিক ফল মেলা ও ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ সফল। ফুরফুরে মেজাজে এ মেলা বার বার ফিরে আসুক কৃষকের শুভ বারতা নিয়ে।


জাতীয় ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ
গত কয়েক বছর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সম্ভাবনায় কৃষি মেলা প্রবর্তন করা হয়।  এ সত্ত্বেও ফল বৃক্ষ রোপণের বাস্তবতা অনুধাবনে ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ পালন ও জাতীয় ফল মেলা সম্প্রসারণ পদ্ধতিকে আরও অধিকতর কার্যকর করে তুলছে। এ পক্ষ শুরু থেকেই একটি মূল সুর নিয়ে আত্ম প্রকাশ করে। ১৬-১৮ জুন ২০১৬ এর বৃক্ষ রোপণ পক্ষের প্রতিপাদ্য অর্থপুষ্টি-স্বাস্থ্য চান, ফলদ ফল বেশি খান। ২০১৫ ছিল দিন বদলের বাংলাদেশ, ফল বৃক্ষে ভরবো দেশ। এ মূল থিমগুলো বিশেষ বার্তা নিয়ে আসে যা অন্তত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। উপজেলা ইউনিয়ন গ্রাম হাটে তথা দেশ জুড়ে রঙিন পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট কলাকৌশল বিস্তারে ফল চাষিদের আনন্দে বিমোহীত করছে নতুন ফলচাষির সংখ্যা বৃদ্ধিতে দেখা দেয় নতুন অনুরণ।


পুষ্টি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় দেশজ ফলের অবদান সঠিক এ উপস্থাপনায় বলা হয় দেশে-৭০ প্রজাতির দেশীয় ফল বিদ্যামান। সৌভাগ্যে হলো দেশব্যাপী সবমিলিয়ে ১৩০টি ফলের চাষের তালিকা তৈরি করা হয়। দেশের চাষযোগ্য জমির ১-২% জমি ফল চাষের আওতায় রয়েছে। কিন্তু ফসলভিত্তিক মোট আয়ের শতকরা ১০% জোগায় দিয়ে থাকে ফল। ২০১০ সালে এফএওর এক তথ্য মতে, বাংলাদেশ ফল উৎপাদান সৌভাগ্যময় দেশের তালিকায় অধিভুক্ত। তথ্য মতে, দেশের ফলের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি ও হেক্টরপ্রতি উৎপাদনের নিরিখে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে যা ভারত এবং চীনের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশে ১.৩৮ লাখ হেক্টের জমিতে মোট ৪৫.৮১ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়। ফলের মোট বার্ষিক চাহিদা ৭.১ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ মোট চাহিদার ৬৪% উৎপাদিত হচ্ছে বাকি ৩৬% আমদানি করতে হয়। আমদানিকৃত ফল সহজেই চোখে পড়ে আপেল, আঙুর, আনাড়, কমলা, মাল্টা এসব। পুষ্টি প্রাপ্যতায় হিসেব মতো দৈনিক চাহিদা রয়েছে ৫৬ গ্রাম। দৈনিক মাথাপিচু ৩০-৩৫ গ্রাম ফলের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। তাই বলা যায়, বাংলাদেশে পুষ্টির প্রাপ্যতার সূচক সঠিক পথে এগোতে পারছে না। ইফপ্রির বৈশ্বিক পুষ্টি প্রতিবেদন ২০১৪ এ শিশুদের খর্বতা, কৃশতা, অতি ওজন এবং নারীদের রক্ত স্বল্পতা হ্রাসের সূচকে  সাফল্য অর্জনে বিছিয়ে আছে। যদিও ২.৭ হারে খর্বতা কমেছে তবে ৩.৩% হারে খর্বতা হ্রাসের মাত্রা কমাতে হবে। সুতরাং পুষ্টির চাহিদা পূরণ একবিংশ শতাব্দীর উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন বাংলাদেশে মোট ফল উৎপাদনের ৫৪ ভাগ সরবরাহ হয় মধুমাস বলে খ্যাতি মে-আগস্ট এ চার মাসে। বাকি ২৪ ভাগ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এবং ২২ ভাগ সেপ্টেম্বের থেকে ডিসেম্বর মাসে। অর্থাৎ শীত ঋতুতে ফল কম উৎপন্ন হয়। তাই এ লিন পিরিয়ডে ফল উৎপাদনের অধিকতর সম্ভবনা সারা বছর ধরে ফল উৎপাদনের কৌশল রপ্ত করাসহ ফলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ করা দরকার।


পুষ্টির চাহিদা পূরণে দেশীয় ফল : বলা হয় ফলই বল। দেশীয় ফলের গুরুত্ব দেশে উৎপাদান সহয়ক শক্তি। শহরের ৭৩ লাখ বসতবাড়ির ছাদে ফল চাষসহ নগরীতে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান তথা ফল উৎপাদান মৌসুমে কৃষকের আর্থিক লাভও দারিদ্র্যবিমোচনের কথা বলেন। ফল উৎপাদনের ভরা মৌসুমে ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজকরণের প্রসার তথা ফল রপ্তানি প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা যায়। প্রবন্ধকার ড. রহমান ফলকে অনুপুষ্টির একমাত্র আধার বলে ব্যাখ্যা করেন। ফলের সামাজিক ও আর্থিক উপযোগিতার কথা বলেন। নার্সারিগুলোতে উন্নত মানের চারা উৎপাদন। কৃষি ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনের আহ্বান জানান।


জাতীয় ফল প্রদর্শনী : ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষর বিশেষ আকর্ষণ জাতীয় ফল প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনী ১৬-১৮ জুন পার্থক্য দেশীয় ফলের পরিচয়, শনাক্তকরণ এবং এর পুষ্টিমান সম্পর্কে সব বয়সের নর-নারীসহ শিশু কিশোরের ফলের জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করছে। বিশেষ করে ঢাকাবাসী প্রকৃতির খরতাপে তিক্ত সময়ে এ মেলা বেশ পরিদর্শনে আগ্রহ লক্ষ করা যায়। এ মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টল ফলসহ গবেষণালব্ধ প্রকাশ তথ্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে ফল বাজার সম্পসারণ করছে।


সম্ভাবনাময় বসতবাড়ি : বাংলাদেশের ১ কোটি ৫৫ লাখ বসতবাড়িতে প্রচলিত ও অপ্রচালিত ফল একযোগে ৫৩% ভাগ ফল জোগান দেয়। তবে বসতবাড়িতে ফল উৎপাদন এখনও পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না বসতবাড়ির স্থান স্বল্পতা দিকবিবেচনা করে একই মাসে বেল উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যে সঠিক তথ্য সম্পর্কিত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পূর্বে গ্রামে ও শহরের বসতবাড়িতে দেশীয় ফলের গাছের সমাহার দেখা যেত। আজকাল তা আর দেখা যায় না। বসতবাড়িতে দেশীয় প্রজাতির ফল ক্রমান্বয়য়ে বিস্তার হতে যাচ্ছে। তাই বসতবাড়ির আঙিনায় ফল সবজি চাষে পুষ্টি জোগানের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা যায়।
এ প্রসঙ্গে দেশীয় ফলের জিনপুল সংরক্ষেণের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। অনেক উন্নত জাত বাজারে আসলেও দেশীয় ফলের জাতসহ স্থানীয় অনেক ফলের জাত বিলুপ্তি হচ্ছে। জাতগুলো সংরক্ষণ এবং এর উন্নয়নে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় মনোনিবেশ করে তাদের সহযোগিতার ধারা অব্যাহত রাখা দরকার।


দারিদ্র্যবিমোচনে কৃষি বিজ্ঞানী : বিজ্ঞানীদের যাচাই বাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্নত জাতের ফল ও চারা বাজারজাতকরণে উৎফুল্ল হচ্ছে। অপরিচিত ফলের পরিচিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৮টি বিভিন্ন ফলের জাত অবমুক্ত করেছে। ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জার্মপ্লাজম সেন্টার বিজ্ঞানীদের গবেষণার সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউট ৬৬টি জাত অবমুক্ত করেছে। বাজারে ফলের রঙের নানা বৈচিত্র্যতা লক্ষ করা যায়। শহর থেকে গ্রামের হাটে ক্ষুদ্র ফল ব্যবসায়ীরা স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিজ্ঞনীদের অবমুক্তকৃত ফল জাতীয় ঐক্য ও সাম্যতার বার্তা নিয়ে আসছে।


খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ন্যায় ফল উৎপাদনের দিকে লক্ষ্য সম্প্রসারিত করার দিকনির্দেশনা দেন। প্রান্তিক পতিত জমি পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিজ্ঞানীরা দেশ বিদেশের সাফল্য দেখে শিখে অনুপ্রাণিত হয়ে সব উদ্যোগে দীক্ষিত হয়ে করার অনুপ্রেরণায় কথা বলেন। যেমন- বীজবিহীন লটকন, ছোট বীজের আমড়া, খরাকৃতির নারিকেল জাত উৎপাদনের কথা বলেন। পাশাপাশি ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কৌশল বিস্তারের মাধ্যমে ফলের নানা সামগ্রী তৈরির প্রতি জোর দেয়। যেমন চিপস, জাম, জেলি, জুস তৈরির কথা বলেন। আগের তুলনা নতুন নতুন উদ্যোক্তারা ফল প্রক্রিয়াকরণের ব্যবসায় এগিয়ে আসছেন। কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুতসই যোগাযোগের মাধ্যমে ফল উৎপাদান ও বিপণনে যুগান্তকারী সুযোগ ও অগ্রগতি লাভ করবে।


কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নেক্সাস : এবারের ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষের একটি বিশেষ যোগসাজশ কৃষি ব্যবসার সংযোগ, সমন্বয় ও সম্প্রসারণের সমাহার। বলা হয়, বাণিজ্যের সোনা ক্ষেতের কোণা। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮২৫ টন আম রপ্তানি করা হয়েছে। এ বছর আম রপ্তানি লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার টন। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চাল আমদানিতে ট্যারিফ বসিয়ে চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করছেন। অন্যদিকে চাল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করছেন। অনুরূপ বাংলাদেশ থেকে ফল রপ্তানিতে সরকারের সুযোগ-সুবিধা অধিকতর সুযোগ প্রদানের উৎসাহ ব্যক্ত করেছেন। সম্ভাবনাময় ফল কলা আর কাঁঠালের চিপস, নানা ফলের প্যাকেটজাত জুস তৈরির সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সেতুবন্ধন তৈরির সুযোগ ও সহযোগিতা প্রদানের আশ^াস প্রদান করেন। মনিষিরা বলেন, জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি হলো গাছের মতো। কৃষি তার মূল, শিল্প তার শাখা এবং বাণিজ্য তার পাতা। আজকের এ আয়োজনে অতি উচ্চমাত্রার এ প্রবাদটি ফল ও কৃষি বাণিজ্যের শাসকের কথা বলে দেয়।


ফল উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নতুন আধুনিক জাত অবমুক্ত করা। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির কৌশল তৈরি করে সে অনুযায়ী নিবিড় গবেষণা হলো ফল বিস্তার করা। উন্নত কৌলিতাত্ত্বিক সমৃদ্ধ ও মান সম্মত চারা কলম উৎপাদনের মাধ্যমে ফলজ বৃক্ষের চারা সহজলভ্য করে পতিত পাহাড়ি ও বসতবাড়ির জমিতে পরিকল্পিত চারা রোপণ করা। ফল উৎপাদনের বিশেষ জোন তৈরি করা। ফলের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া বিকাশের মাধ্যমে পোস্ট হারভেস্ট লস কমিয়ে আনা। ফল চাষে মাঝারি কৃষকের ক্ষুদ্রঋণ, মাঝারি কৃষকের মধ্যে উন্নত মানের চারা বিতরণ ও প্রণোদনা দেয়।


খাদ্য থালায় শুধু ভাত নয় এর সাথে থাকবে টাটকা দেশী ফল। বছরব্যাপী বারোমাসি ফল। ক্রমবর্ধমান মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দেশি ফলই আশার আলো। দেশ সবজি উৎপাদন পাঁচত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। বাড়তি চাল, আলু রপ্তানি হচ্ছে। ফল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তানের চেয়ে প্রাগসর। মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনেও সাফল্যের গাঁথা বিদ্যমান যা সামগ্রিক কৃষির উন্নতি সাধনের শুভসূচক। তাই বলা যায় ফল সংবেদনশীল মনে রসনা জোগায়। জাতীয় ঐক্য ও সম্যতার প্রতীক নানা জাতের ফল। তাই প্রকৃতি ও ফলের ভালোবাসায় খুঁজে ফিরুক অবহমান বাংলার ফল ধরা প্রকৃতি। জাতীয় ফলদ পণ্য ও ফল মেলা সার্থক বার বার ফিরে আসুক সুখ ও সমৃদ্ধির বারতা নিয়ে।


ড. এস এম আতিকুল্লাহ*
*এগ্রিকালচার স্পেশালিস্ট, জাতীয় ভূমি জোনিং প্রকল্প, ০১৭১২৮৮৯৯২৭; mdatikullah@yahoo.com


Share with :

Facebook Facebook