কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচনে সবজি

আমরা খাদ্য খাই মনের সাধ মেটানোর জন্য, দেহের পুষ্টির জন্য, যার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সবল রেখে কর্মক্ষম জীবন যাপন করা যায়। আমাদের খাদ্য তালিকায় সবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এ প্রবণতা উন্নত বিশ্বে স্বপোন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি। তাইতো সেসব দেশে মাথাপিছু প্রতিদিন সবজি গ্রহণের পরিমাণ দেশভেদে আমাদের মতো দেশের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেশি। মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশসহ শারীরিক সক্ষমতার বিচারে সেসব দেশের নাগরিকরা তাই আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে। এ অবস্থার অবসানে আমাদের খাদ্য তালিকায় মানবদেহের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় দুটি খাদ্য উপাদান, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিনের পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য এগুলোর সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস বিভিন্ন প্রকারের সবজির অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প আমাদের নেই। আমাদের শর্করা নির্ভর খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন রঙের পাতা ও ফল মূল জাতীয় সবজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের খাদ্য জগতে বিভিন্ন প্রকারের সবজিই একমাত্র খাদ্য, শরীর গঠনে যার ইতিবাচক ছাড়া কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই। সেজন্যই তো সুস্থ সবল স্বাস্থ্য চান বেশি করে সবজি খান এ স্লোগান আমাদের খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব অনুধাবনে আমাদের অনুপ্রাণিত করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
 

খাদ্য নিরাপত্তা
খাদ্য নিরাপত্তা হলো খাদ্যের কার্যকর চাহিদা মোতাবেক সুষম খাদ্য সরবরাহ; যখন জনসাধারণ সব সময় সুস্থ ও কর্মঠ জীবন যাপনের জন্য দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা ও পছন্দসই খাদ্য সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে, সে অবস্থাকেই খাদ্য নিরাপত্তা বলা হবে। বর্তমানে আমরা দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেলেও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার সাথে পুষ্টি নিরাপত্তার কার্যকরভাবে সংযোগ ঘটাতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই সবজি ফসলের অধিক উৎপাদন ও গ্রহণ দানাজাতীয় ফসলের ওপর চাপ কমিয়ে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি কৃষকের জন্য মুনাফার সংস্থান করে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে সব ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

মাথাপিছু সবজির প্রাপ্যতা
বিবিএস ২০১৫ তথ্য অনুযায়ী, মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৭.৯৩ মিলিয়ন হেক্টর যার মধ্যে সবজি ফসলের দখলে মাত্র ২.৬৩% এর কিছু ওপরে। এ থেকেই অনুমান করা যায় কত অল্প পরিমাণ জমি থেকে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণুু বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সবজির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তবে উৎপাদনের অগ্রযাত্রা যথেষ্ট আশানুরূপ। আবাদি জমি বৃদ্ধির বিচারে পৃথিবীতে প্রথম এবং উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয় স্থান। সর্বশেষ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ০.৪০ মিলিয়ন হেক্টর জমি থেকে ১৫২.৬৪ লাখ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। যদিও সবজিভিত্তিক পুষ্টি গ্রহণের উপাত্ত ও পরিমাণে ভিন্নতা আছে বিভিন্ন রেফারেন্সে। যেমন- গড়ে দৈনিক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের গ্রহণ করা দরকার ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। আর আমরা গ্রহণ করছি ১০০ থেকে ১৬৬ গ্রাম। অনেকে আবার বলেন প্রতিদিন প্রতি জনের জন্য প্রায় ৬২ গ্রাম সবজি উৎপাদিত হয়েছে কিন্তু এ পরিমাণ কখনোই মাথাপিছু প্রাপ্যতা হিসাবে ধরা যাবে না কারণ বিভিন্ন মাধ্যমের মতে গড়ে যদি ০৪ ভাগের ০১ ভাগও সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায় তাহলেও তা ৫০ গ্রামে নেমে আসে। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু সেটা যে ঋঅঙ কর্তক অনুমোদিত মাথাপিছু প্রতিদিন ২২০ গ্রাম এর ০৩ ভাগের ০১ ভাগের বেশি না। সেক্ষেত্রে উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় তিন বা চার গুণ বেশি বাড়াতে হবে।

 

দেহের পুষ্টিতে সবজি
সবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য এবং সবজিভেদে কাঁচা বা রান্না অবস্থায় সুস্বাদু খাবারের ভা-ার।  আমাদের দৈনন্দিন খাবারে বিভিন্ন প্রকারের সবজির সমারোহ যেমন স্বাদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা আনে তেমনি বৈচিত্র্যময় সবজির উপস্থিতি নানারকম পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সব পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ বিভিন্ন রকমের সবজি তাই সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তালিকার অপরিহার্য অংশ। বেশ কিছু সবজি আছে যেগুলো খেলে আমাদের দেহের পুষ্টি বিশেষ করে ভিটামিন ও খনিজের চাহিদা মেটায়। এর মধ্যে আছে- পালংশাক, কচুশাক, লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটা, বরবটি, শসা, কাঁচামরিচ, মুলাশাক, ঢেঁড়শ, লেটুস, মটরশুটি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, শিম, লাউশাক, গাজর, মিষ্টিকুমড়া ও কুমড়াশাক, কচু ও কচুশাক, বরবটি, কলমিশাক..। পরিকল্পিতভাবে আবাদ শিডিউল করলে সারা বছরই এসব শাকসবজি নিয়মিত ও পরিমিত খাওয়া যায়।

 

নিরাপদে সবজি উৎপাদান
বিগত বছরগুলোতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বিষয়ক আলোচনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে যা স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়াও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়টি অন্যান্য কৃষি উৎপাদনের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কেননা সবজি ফসল বিভিন্ন রোগ ও পোকায় সহজেই আক্রান্ত হয়। তাই উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক অতিমাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার করে এবং নিরাপদ সময়ের আগেই তা বাজারজাত করে। অনেক সবজিই কাঁচা খাওয়া হয় বা অল্প রান্নায় খাওয়া হয় বলে মানবদেহে বিষাক্ত খাবারের প্রভাব পড়ে এবং নানারকম রোগশোক ও অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে ফসল কাটা বা উত্তোলন করে বাজারজাত করা পর্যন্ত এমনকি ভোক্তার হাতে যাওয়ার পরও তা বিভিন্নভাবে অনিরাপদ হতে পারে। এ সম্পর্কিত সম্যক জ্ঞানের অভাবে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতা সবজি ফসলকে অনিরাপদ করে খাবারের অনুপযুক্ত অথবা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

 

দারিদ্র্যবিমোচনে সবজি
কৃষকদের অধিক মুনাফা নিশ্চিতকরণ সবজির মতো দ্রুতপচনশীল পণ্যে সমন্বিত ও উন্নত কৃষি বিপণন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। যা আমাদের দেশে একেবারেই অনুপস্থিত বলে সবজি চাষিরা বছরের বিভিন্ন সময়ে তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম মূল্যও পায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তা চাষিদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং পরবর্তীতে অনুৎসাহিত হয়ে পড়ে। তাই সবজির মতো দ্রুতপচনশীল অথচ অতীব প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে ও কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনে উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় পার্যায়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। তা না হলে সবজির মতো সংবেদনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে বিপণনের চরম অব্যবস্থা কৃষকের জন্য কি রকম বিপর্যয়কর হতে পারে।

 

বছরব্যাপী সবজি চাষ
আমাদের দেশে বিভিন্ন সূত্র মতে, প্রচলিত ও অপ্রচলিত চাষকৃত সবজির সংখ্যা প্রায় শতাধিক। এর মধ্যে ৩০-৩৫টিকে  প্রধান সবজি বলে ধরা যায়। প্রকারভেদে কিছু সবজি মৌসুমভিত্তিক এবং কিছু সারা বছরই চাষ করা যায়। মানুষের চাহিদার ব্যাপ্তিকে মৌসুমের বাইরে নিয়ে যেতে যে সবজি যে মৌসুমের নয় কিন্তু চাহিদা আছে সে ধরনের জাত ও চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। কৃষক তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে অধিক মূল্য পেতে স্বাভাবিক মৌসুমের আগে বা পরে অনেক সবজিই চাষ করতে শুরু করেছে। কিন্তু অমৌসুমি হওয়ার কারণে অধিক মূল্য পাওয়া যায় বলে কৃষক অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলিয়েও এসব সবজির চাষ অব্যাহত রাখছে। ফলে বহু সবজি যেগুলো আগে মৌসুমি সবজি ছিল এখন তা সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে। সে অর্থে মৌসুমের দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় প্রতিটি মৌসুমেই অমৌসুমি সবজির প্রাপ্যতা বাড়ছে। আর এতে করে সারা বছরই বা বছরের অধিকাংশ সময় কম বেশি সব সবজি উৎপাদিত হচ্ছে এবং তা বাজারে পাওয়াও যাচ্ছে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। জাত ও প্রযুক্তি কৃষকের হাতের মুঠোয়। শুধু জাতীয় পর্যায় থেকে নীতিমালার মাধ্যমে সব কিছু সমম্বয় করে কার্যকর বাজার ব্যবস্থা চালু করে কৃষককে তার ন্যায্যমূল্য পেতে সহায়তার মাধ্যমে সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা রকম সবজির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। সবজিভেদে বাণিজ্যিক কৃষি বা পারিবারিক বাগানে ব্যবহার্য এমনই কিছু পদ্ধতি হলো- বাগানে চাষ করা যায়; ঘরের ছাদে বা চালে পতিত জায়গায় চাষ করা যায়; খোলা মাঠে চাষ করা যায়; পাহাড়ের ঢালে চাষ করা যায়।

 

সবজি চাষে বহুমুখিতা
পানিতে চাষ করা যায়; পানির ওপরে মাচায় চাষ করা যায়; সমতল ভূমিতেও মাচায় চাষ করা যায়; সমতল ভূমিতে বহুতল মাচায় চাষ করা যায়; জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; চর অঞ্চলে বালুময় জমিতে ঋবৎঃরমধঃরড়হ পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; লবণাক্ত ভূমিতে ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মাটিবিহীন বহুস্তর বিশিষ্ট স্থাপনা করে অতি অল্প জায়গায় অনেক প্রকার সবজি ফলানো যায়; লবণাক্ত বা বালির চর এলাকায় খাঁড়া পদ্ধতিতে বস্তা বা সস্তা কাঠ ও বাঁশের স্ট্র্রাকচার তৈরি করে মাটি ভর্তি করে সেখানেও চাষ করা যায়; সেঁতসেঁতে ছায়াযুক্ত এলাকায় যেখানে অন্য ফসল ফলানো যায় না সেখানেও বিশেষ বিশেষ কিছু সবজি চাষ করা যায়; এমনই আরও অনেক বৈচিত্র্যময় পরিবেশে বা অবস্থায় বিভিন্ন সবজির চাষ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ এবং তা গবেষণা করে প্রযুক্তি আকারে সারা দেশে কৃষক এমনকি ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যার জন্য যেখানে যে পদ্ধতি প্রযোজ্য তার প্রচার ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা যায়। অনেকেই ইদানীং সবজি বাগান করেন এবং নিজ হাতে উৎপাদিত বিষমুক্ত তরজাতা নিরাপদ সবজি দিয়ে নির্ভেজাল পুষ্টির জোগান দিচ্ছেন স্ব স্ব পরিবারের খাদ্য তালিকায়। বাংলাদেশে শতাধিক রকমের সবজি শীতকাল, গ্রীষ্মকাল আবার কোনো কোনোটি সারা বছর চাষ করা হয়। বসতবাড়িতে সবজি চাষ করার সময় এমন সবজি নির্বাচন করতে হবে যা প্রয়োজনীয় পুষ্টির দিক থেকে উচ্চমানের, খেতেও সুস্বাদু এবং যেগুলোর বাড়তি সবজি বিক্রিও করা যায় বাজার চাহিদার সাথে মিল রেখে।

 

পুষ্টিজনিত সমস্যাবলি
বিভিন্ন প্রকার খাদ্যোপাদান শর্করা, আমিষ, তেল, খাদ্যপ্রাণ এবং খনিজ পদার্থের অভাবে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকমের অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা যায়। শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়; বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে; মহিলা এবং শিশু রক্তশূন্যতায় ভোগে; প্রয়োজনীয় ক্যালারির অভাবে ভুগছে; ভিটামিন এ’র অভাবজনিত রোগে ভুগছে; রাইবোক্লেভিনের অভাবে ভুগছে; গলা ফোলা রোদে আক্তান্ত হচ্ছে; শিশুরা অন্ধত্ব বরণ করছে। পুষ্টি ঘাটতিজনিত সমস্যাগুলোর শতকরা হার বা সংখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তা যে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনপদে এক বিরাট সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই বলেই মনে হয়।  আর সে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং কম ব্যয়বহুল উপায় খাদ্য তালিকায় নিয়মিত ও পরিমিত রকমারি সবজির ব্যবহার। সামগ্রিকভাবে বছরব্যাপী খাবার হিসেবে অন্যান্য খাবারের সাথে হরেক রকম সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করে অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 

সবজির প্রযুক্তি ও বীজ
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সবজি গবেষণার সূত্রপাত আশির দশকের শুরুতে। এরপর এর ক্রমবিকাশের ধারা অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলেছে। কৃষি গবেষণা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এ গোত্রের ফসলের জাত উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত। এক্ষেত্রে এ উদ্ভাবিত ৩০-৩৫টি প্রধান সবজির প্রায় ১০০টিরও বেশি  জাত ও কিছু উৎপাদন প্রযুক্তি জাতীয় পর্যায়ে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০টির মতো বিভিন্ন সবজির জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর বাইরে বীজ কোম্পানিগুলো অনেক সবজির ওপি এবং শংকর জাত আমদানি করে বাজারজাত করে আসছে বহু আগ থেকেই এখনও যা অব্যাহত আছে। সবজি গবেষণার জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ বছর আগে প্রথমবারের  মতো বেসরকারি খাতে বীজ কোম্পানি নিজস্ব গবেষণা (আরএন্ডডি) কার্যক্রম শুরু করে দেশের মাটিতে। সে থেকে এ পর্যন্ত আরও ৮-১০টি বেসরকারি কোম্পানি নিজস্ব গবেষণা পর্যায়ক্রমে শুরু করে। বর্তমানে তাদের উদ্ভাবিত অনেক সবজির জাত কৃষক পর্যায়ে সমাদৃত হয়েছে এবং সবজির ফলন বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখছে যা খুবই আশাব্যঞ্জক। উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি প্রয়াস খুবই ভালো। কিন্তু সেসব জাতের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বর্তমানে সবজি বীজের জাতীয় মোট চাহিদা বলা হয় ৪৫০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত বীজের পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ এবং আমাদানি করা হয় তাও প্রায় ১৫ শতাংশ। আমদানি করা বীজের একটা অংশ দ্বারা চাষি প্রায়শই প্রতারিত হয় এমন অভিযোগও শোনা যায়। এর বাইরে যে ৫৫ শতাংশ বা তারও কিছু বেশি বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে এর সবই কৃষকের নিজস্ব রাখা বীজ যা মানের বিচারে নি¤œমানের। তাই সবজি উৎপাদনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনের প্রধানতম উপাদান মানসম্পন্ন বীজের নিশ্চয়তায় সরকার ও নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ থাকতে হবে।

 

সবজি উৎপাদন ও ব্যবহার
বাংলাদেশের খাদ্য শস্যে উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও তার কার্যকর সম্প্রসারণে জাতীয় উদ্যোগ দানাদার শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। তবে পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও অবহেলিত। যার ফলে বিভিন্ন প্রকারের অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্তের হার এখনও যথেষ্ট উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে এবং শিশু ও মহিলারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার হচ্ছে। এ অবস্থার অবসানে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল সবজির উৎপাদন বাড়িয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আপামর জনগণের পুষ্টির নিরাপত্তা বিধানে আরও বেশি সচেষ্ট হওয়ার এখনই সময়। সরকারিভাবে জাতীয় সবজি মেলার প্রচলন এ সম্পর্কে সরকারের সদিচ্ছারই প্রতিফলন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এরপরও যেতে হবে আমাদের বহুদূর কাক্সিক্ষত পুষ্টি নিরাপত্তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে। সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলে লক্ষ্যে পৌঁছানে যাবে দ্রুতই। এ পরিপ্রেক্ষিতে সুপারিশমালা হলো-
উৎপাদিত সবজির ন্যূনতম বাজার মূল্য নির্ধারণ করে কৃষক পর্যায়ে তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; কৃষক পর্যায়ে সময়মতো সঠিক মূল্যে উন্নতমানের সবজি বীজের সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করা; কৃষক পর্যায়ে সবজির সংগ্রহ ও স্বল্পকালীন সংরক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থা করা; কৃষককে সংগঠিত করে সবজি চাষিদের সমবায় সমিতি গঠন করা যাতে করে তারা পণ্যের ন্যায্য বিক্রয় মূল্য পেতে দরকষাকষির অবস্থানে যেতে পারে; এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান শক্ত করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের সাহায্য করতে পারেন; সবজির রফতানিমুখী উৎপাদন এলাকা নির্বাচন করে প্রশিক্ষিত চাষি তৈরি করা এবং রফতানিকারকদের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করা; সবজির মতো দ্রুতপচনশীল পণ্যের পরিবহনে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা; ফসল তোলার পর নষ্ট হওয়া কমাতে চাষের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উত্তোলন এবং পরবর্তীতে কিভাবে সবজির যত্ন নিতে হয় এ ব্যাপারে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে হবে; সর্বোপরি চলমান গবেষণা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার পদক্ষেপ নিতে হবে; সবজি ফসলের ক্ষেত্রে ধীরগতি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হবে গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের মাঝে অধিকতর সমম্বয় সাধন করে। রোগমুক্ত, সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন রঙের সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে সবাইকে। এ ব্যাপারে জাতীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যকর ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আমাদের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং বেশি করে সবজি অথবা সবজি জাত খাবার খেতে হবে। আর তা করতে পারলে যেমন অপুষ্টির হাত থেকে জাতি রক্ষা পাবে তেমনি ব্যয়বহুল দানা শস্যের ওপরে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারলে অন্যান্য ফসলসহ সবজি চাষের জন্য বেশি জমি পাওয়া যাবে। তখন বছরব্যাপী আবাদ বাড়িয়ে পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানসহ বিরাট সংখ্যক কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হবে।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

*পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

 


Share with :

Facebook Facebook