কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য শস্যবীমা

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ যার সার্বিক উন্নয়ন কৃষির ওপরই নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের দেশের আবহাওয়া অনবরত বদলে যাচ্ছে ফলে কৃষিক্ষেত্রে নানা রকম ফসলের সময়মতো উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের কৃষির গতি ও প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে মারাত্মকভাবে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের কৃষি প্রতিনিয়ত প্রকৃতির বৈরী পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে এগিয়ে চলছে। অসময়ে খরা, বন্যার কারণে একদিকে কৃষক হারিয়ে ফেলছে অতি মূল্যবান ফসলসহ নানা জাতের বীজ অন্যদিকে মাটি হারাচ্ছে ফসল উৎপাদনশীলতা। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের কৃষি নির্ভরশীল ক্ষুদ্র খামারভিত্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলদেশের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন করতে হলে কৃষির এসব সমস্যা নিরূপণ করে, খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা আমাদের জন্য খুব জরুরি। এছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও বৈরী আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন প্রয়োজন। কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে আমরা কিছুটা সফল হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার আধুনিক প্রযুক্তির মারাত্মক অভাব এখনও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যেমন- লবণাক্ততা, উচ্চ তাপমাত্রা, খরা কিংবা বন্যাসহিষ্ণু প্রযুক্তির অভাব লক্ষণীয় যা টেকসই কৃষি উৎপাদনের পূর্বশর্ত।
 

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা ও চলমান অগ্রগতিতে কৃষি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষি ব্যবস্থার ওপর নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি প্রতি বছরই খরায় আক্রান্ত হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ দেয়ার ফলে নদীর কাছাকাছি এলাকায় জমিতে পলি পড়ে উঁচু হয়েছে কিন্তু বাঁধের ভেতরে বেসিনের মতো নিচু হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। এরকম জলাবদ্ধ জমির পরিমাণ প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিগত ৪০ বছরে লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৭% বেড়েছে। নদীর নাব্য কমে গিয়ে লবণাক্ত পানি সমুদ্র থেকে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পরছে। ফলে দেশের স্বাভাবিক কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে লবণাক্ততায় আক্রান্ত জমির পরিমাণ এক মিলিয়ন হেক্টরেরও বেশি। বাংলাদেশে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ৮,৩০,০০০ হেক্টর আবাদি জমির ক্ষতি করেছে। প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি হাওর কিংবা বিল এলাকায় অবস্থিত এবং হাওরাঞ্চলের পানি সময়মতো বের করে চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। বিগত ৩৫ বছরের মধ্যে এবছরের এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হওয়ার ফলে অকাল বন্যায় কৃষকের শত শত কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে। অসময়ে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক বেঁচে থাকার অবলম্বন বোরো ধান ও সবজি তলিয়ে যাওয়ায় এখন তারা নিঃস্ব।   
 

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়াও কৃষকের ফসলের মাঠে নতুন নতুন রোগবালাইয়ের সংক্রমণে প্রতি বছর সহস্র কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীতে ফসলের ভয়াবহ রোগগুলোর মধ্যে গমের ব্লাস্ট রোগ অন্যতম, অনুকূল আবহাওয়ায় যা মহামারি আকারে দেখা দেয়। ১৯৮৫ সালে সর্বপ্রথম এ রোগটি ব্রাজিলে দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গত বছর অনাকাক্সিক্ষতভাবে এ রোগটি বাংলাদেশে প্রথম দেখা দেয় এবং দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের আটটি জেলার প্রায় ১৫,০০০ হেক্টর জমির গম নষ্ট করে। আক্রান্ত জমিতে ৪০-৫০ ভাগ, ক্ষেত্রবিশেষে শত ভাগ ফসল নষ্ট হয়। রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য গত বছর আক্রান্ত গমক্ষেতগুলো সরকারি নির্দেশনায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, এ বছর উল্লেখযোগ্য হারে গম উৎপাদন কমিয়ে আনা হয়েছে এবং বিগত বছরের তুলনায় ওই এলাকাগুলো গম চাষ প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে। এ বছর যারা গম চাষ করেছেন তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থোড় আসার আগেই গমের গাছ কেটে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গত বছরের গমের চাষকৃত জমিগুলো এ বছর কৃষক তামাক, মসুর ও ভুট্টা চাষ করেছেন। অতি সম্প্রতি দেশের প্রায় সব অঞ্চলে ধানের জমিগুলোতে নেক ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাব কৃষিজীবী, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষি নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। নেক ব্লাস্টের ভয়ঙ্কর আক্রমণে ধানের দানা পুষ্ঠ হতে না পারায় শীষ সাদা ও চিটা হয়ে যাচ্ছে। তদুপরি, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ফসলের বাম্পার ফলনের আশায় প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সে কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থায়, কৃষক যদি কৃষি কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ফসল হারিয়ে লোকশান গুনে এবং রাষ্ট্র থেকে কাক্সিক্ষত সহযোগিতা না পায় তাহলে কৃষি কাজে একসময় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এরূপভাবে কৃষকের কৃষি কাজের প্রতি অনাগ্রহ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে যা আমাদের দেশর বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ জনপদের জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। তাই আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি ও কৃষককে সুরক্ষা প্রদানে শস্যবীমা প্রচলন এখন সময়ের দাবি।   
 

কৃষি ও শস্যবীমা হচ্ছে কৃষি পণ্য উৎপাদনকারী ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কৃষি বীমা সুরক্ষার আওতায় থাকে কৃষক, মৎস্য চাষি, গবাদি পশুপাখি পালনকারী ও কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ঠ অন্যান্য চাষি। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশে অনেক প্রকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগ খরা, বন্যা, শিলাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় ঘটে থাকে যা কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের মারাত্মক ক্ষতি করে। ফলে গোটা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। কৃষি ও শস্যবীমার মাধ্যমে কৃষি আয়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা এবং সব প্রকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে কৃষি ও কৃষককে নিরাপত্তা বা সুরক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে। কৃষি ও শস্যবীমা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিকে পুষিয়ে দিয়ে কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে অপরদিকে কৃষি পণ্যের দামের পতনশীলতা থেকেও কৃষককে রক্ষা করে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শস্যবীমা পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে যা কৃষি ও কৃষককে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানের প্রয়োজনীয় সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
 

বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তা বিধানে দৃষ্টান্তস্বরূপ  সফলতা লাভ করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এ সফলতার মূল ভিত্তি রচনা করেছেন এদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক। তাই কৃষিবান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট সবিনয় প্রস্তাব করছি আমাদের গ্রামীণ কৃষক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে কৃষি ও শস্যবীমা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ঠ বাজেটসহ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের  দিনবদলের অংশীদার হবেন। নতুবা  ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশাহারা কৃষক পরিবার কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি স্বনামধন্য বীমা কোম্পানি ও এনজিওগুলো কৃষক সুরক্ষায় শস্যবীমা কার্যক্রম চালুর মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। কেননা কৃষি ও শস্যবীমা কৃষিতে বিদ্যমান প্রাকৃতিক বৈরী প্রভাবের নির্ভশীলতার বেড়াজালে আটকে পড়া কৃষককে শুধু রক্ষাই করবে না বরং তার কৃষিকে লাভজনক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে, যা দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও বেশি মজবুত করবে বলেই আমার বিশ্বাস। 

 

মো. নূর-ই-আলম সিদ্দিকী* 
*সহকারী অধ্যাপক, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ, কৃষি অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৬; ০১৭২৩১২৯২২৪

 


Share with :

Facebook Facebook