কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পুষ্টি নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচনে সবজি চাষ

আমরা খাদ্য গ্রহণ করি দেহের পুষ্টির জন্য এবং যার মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ ও সবল রেখে কর্মক্ষম জীবন যাপন করা যায়। তাই  এ ব্যাপারে মানুষের খাদ্য তালিকায় আদিকাল থেকেই সবজি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আমাদের উপমহাদেশেই সবজি নির্ভর খাদ্য ব্যবস্থার আদি নিবাস এবং বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে স্বাস্থ্য  সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্য তালিকায় সবজির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।  আর এ প্রবণতা উন্নত বিশ্বে স্বল্পোন্নত বিশ্বের তুলনায় অধিকতর লক্ষণীয়। তাইতো এসব দেশে মাথাপিছু প্রতিদিন সবজি গ্রহণের পরিমাণ দেশভেদে আমাদের মতো দেশের তুলনায় ৪ থেকে ৫ গুণ বা তারও বেশি। মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশসহ শারীরিক সক্ষমতার বিচারে তাইতো ওইসব দেশের নাগরিকরা আমাদের থেকে অনেক অগ্রগামী। এ অবস্থার অবসানকল্পে আমাদের খাদ্য তালিকায় মানবদেহের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় দুটি খাদ্য উপাদান, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিন এর পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য এগুলোর সবচেয়ে সহজলভ্য উৎস বিভিন্ন প্রকারের সবজির অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের শর্করা নির্ভর খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্যময় (বিভিন্ন রঙের) পাতাজাতীয় ও ফল মূলজাতীয় সবজিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের খাদ্য জগতে বিভিন্ন প্রকারের সবজিই সম্ভবত একমাত্র খাদ্য, শরীর গঠনে যার ইতিবাচক ছাড়া কোনো নেতিবাচক প্রভাব নেই। বর্তমানে আমরা দানাজাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেলেও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার সাথে পুষ্টি নিরাপত্তার কার্যকরভাবে সংযোগ ঘটাতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্থহীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশে বর্তমানে অপুষ্টি একটি অন্যতম  প্রধান সমস্যা। আর এ সমস্যা দূরীকরণে পুষ্টি সমৃদ্ধ সুষম খাবারের নিশ্চয়তা দিতে সবজি গোত্রীয় ফসল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে  যেহেতু সবজি ফসল বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ। তাই সবজি ফসলের অধিক উৎপাদন ও গ্রহণ দানাজাতীয় ফসলের ওপর চাপ কমিয়ে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষক ভাইদের জন্য অধিক মুনাফার সংস্থান করে দেশের অর্থনীতিতেও বিরাট অবদান রাখতে পারে।
মাথাপিছু প্রাপ্যতায় সবজির অবস্থান  
বিবিএস ২০১৫ অনুযায়ী মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৭.৯৩ মিলিয়ন হেক্টর যার মধ্যে সবজি ফসলের দখলে মাত্র ২.৬৩% এর কিছু ওপরে। এ থেকেই অনুমান করা যায় কত অল্প পরিমাণ জমি থেকে আমাদের ক্রমবর্ধিষ্ণুু বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সবজির চাহিদা মেটানো হচ্ছে। আর তাই মাথাপিছু প্রয়োজনের নিরিখে উৎপাদন যথেষ্ট নয়। তারপরও প্রতি একক জমিতে উচ্চফলনশীল উন্নত জাত আবাদের মাধ্যমে সবজি ফসলে তুলনামূলক অধিক ফলন পাওয়া যায় বলে প্রয়োজনীয় প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা না গেলেও উৎপাদনের অগ্রযাত্রা যথেষ্ট আশানুরূপ আবাদি জমি বৃদ্ধির বিচারে পৃথিবীতে প্রথম এবং উৎপাদন বৃদ্ধির হারে তৃতীয় স্থান। সর্বশেষ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী মাত্র ০.৪০ মিলিয়ন হেক্টর জমি থেকে ৩.৭৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন (আলু বাদে) সবজি উৎপাদিত হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রতিজনের জন্য প্রায় ৬২ গ্রাম সবজি উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু এ পরিমাণ কখনোই মাথাপিছু পাপ্যতা হিসাবে ধরা যাবে না কারণ বিভিন্ন মাধ্যমের হিসাব মতে গড়ে যদি চার ভাগের এক ভাগও সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায় তাহলেও তা ৫০ গ্রামে নেমে আসে। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু সেটা যে FAO কর্তক অনুমোদিত মাথাপিছু প্রতিদিন ২২০ গ্রাম এর তিন ভাগের এক ভাগের বেশি নয় তা মনে হয়। সেক্ষেত্রে উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় তিন গুণ বা তারও বেশি বৃদ্ধি করতে হবে।    
পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা
পুষ্টি নিরাপত্তা বিষয়টি খাদ্য নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এক সময় খাদ্য নিরাপত্তা মানে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাবারের প্রাপ্যতাকেই বুঝানো হতো, পুষ্টির কথাটি তেমন গুরুত্ব পায়নি। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় অত্যাবশ্যক খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যের লভ্যতা এবং খাদ্যের পুষ্টিমান। আর আবশ্যকীয় তিনটি বিষয়ের মধ্যে শেষোক্তিটির কারণে সুষম খাবারের কার্যকর সরবরাহ চাহিদা মোতাবেক পেতে হলে খাদ্য তালিকায় সবজির অন্তর্ভুক্তি অতি আবশ্যকীয়ভাবেই থাকতে হবে।
সবজির পুষ্টিমান
সবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর খাদ্য এবং সবজিভেদে কাঁচা বা রান্না অবস্থায় সুস্বাদু খাবারের ভা-ার। আমাদের দৈনন্দিন খাবারে বিভিন্ন প্রকারের সবজির সমারোহ যেমন স্বাদের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতা আনয়ন করে তেমনি বৈচিত্র্যময় সবজির উপস্থিতি নানারকম পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে থাকে। মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সব পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ সবজি তাই সুস্থ, সবল, কর্মক্ষম ও বুদ্ধিদীপ্ত জাতি খাদ্য তালিকার অপরিহার্য অংশ। বছরব্যাপী হরেক রকমের নিরাপদ সবজির চাষ সম্প্রসারণ  ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে পুষ্টিহীনতা বা পুষ্টিস্বল্পতা দূরীকরণে যেমন অবদান রাখা যাবে  সে সাথে উৎপাদনের সাথে জড়িত কৃষককুল ও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। আর তা করা গেলে সবজির মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা থাকবে যা পুষ্টির নিরাপত্তা ও দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়ক হবে।
পুষ্টি চাহিদা পূরণে ও রোগ প্রতিরোধে শাকসবজির ভূমিকা
মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে শাকসবজির ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রকারের ভিটামিন ও খনিজ লবণের উৎস হিসেবে স্বল্প খরচে বছরব্যাপী এর জোগান দিতে সবজি ফসলের কোনো বিকল্প নেই।  আর এসব খাদ্য উপাদান অল্প প্রয়োজন হলেও তা শরীর গঠনে ও বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশে অত্যাবশ্যকীয়। সবজির জগতে বৈচিত্র্যময় বহু ফসলের সমাহার এবং বছরব্যাপী এর চাষাবাদ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা গেলে শুধু পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান করা যাবে তাই নয়, এসব পুষ্টির অভাবজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকেও জাতিকে মুক্ত রাখা যাবে।
নিরাপদ সবজি উৎপাদান
নিরাপদ সবজি উৎপাদনের বিষয়টি অন্যান্য কৃষি উৎপাদনের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কারণ সবজি ফসল বিভিন্ন রোগ ও পোকায় সহজেই আক্রান্ত হয় বলে উৎপাদন পর্যায়ে কৃষক অতিমাত্রায় বালাইনাশক ব্যবহার করে এবং নিরাপদ সময়ের আগেই তা বাজারজাত করে। অনেক সবজিই কাঁচা খাওয়া হয় বা অল্প রান্নায় খাওয়া হয় বলে মানবদেহে বিষাক্ত খাবারের প্রভাব পড়ে এবং নানা রকম রোগশোক ও অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে। উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে ফসল উত্তোলন করে বাজারজাত করা পর্যন্ত এমনকি ভোক্তার হাতে যাওয়ার পরও তা বিভিন্নভাবে অনিরাপদ হতে পারে। এ সম্পর্কিত সম্যক জ্ঞানের অভাবে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসচেতনতা সবজি ফসলকে অনিরাপদ করে খাবারের অনুপযুক্ত অথবা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।  
দারিদ্র্যবিমোচন
কৃষকের অধিক মুনাফা নিশ্চিতকরণ সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যে সমন্বিত ও উন্নত কৃষি বিপণন ব্যবস্থার ওপরে নির্ভরশীল যা আমাদের দেশে একেবারেই অনুপস্থিত বিধায় সবজি চাষিরা বছরের বিভিন্ন সময়ে তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম মূল্যও পায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তা চাষিদের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং পরে অনুৎসাহিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থা সবজির মতো একটি অতীব প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উৎপাদনশীলতা ব্যাহত করবে যা সামগ্রিকভাবে সরকার ঘোষিত সবার জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ও কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনের পথে বিরাট অন্তরায়। তাই সবজির মতো দ্রুত পচনশীল অথচ অতীব প্রয়োজনীয় খাদ্য পণ্যের উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতীয় পার্যায়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের আশু দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে কৃষকের যথাযথ মূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানে সবজি ফসলের রপ্তানিবাজার স¤প্রসারণের লক্ষ্যেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম, এসব পণ্যের রপ্তানিকারকদের সাথে কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত করে সম্ভাব্য কিছু কিছু চিহ্নিত এলাকা সু-কৃষিচর্চা ও জৈব কৃষির মাধ্যমে রপ্তানিমুখী সবজি চাষ সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভরা মৌসুমে যথাযথ মূল্য প্রাপ্তির সমস্যা হলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে তা সংরক্ষণে উৎসাহিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে অল্প জমি থেকে অধিক মুনাফা চাষিরা সবজি ফসল থেকে সহজেই পেতে পারে যা তাদের দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
 বছরব্যাপী সবজি চাষ
আমাদের দেশে চাষকৃত সবজির সংখ্যা প্রায় ৯০টির মতো। এর মধ্যে ৩০-৩৫টিতে প্রধান সবজি বলে ধরা যায়। প্রকারভেদে কিছু সবজি মৌসুমভিত্তিক এবং কিছু সারা বছরই চাষ করা যায়।  মৌসুমের নয় এমন সময়ে চাষ করাতে ফলন কম হয় এবং রোগশোক, পোকামাকড় বা বৈরী আবহাওয়ারও সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু অমৌসুমি হওয়ার কারণে অধিক মূল্য পাওয়া যায় বলে কৃষক ভাইরা অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলিয়েও এসব সবজির চাষ অব্যাহত রাখেন। ফলে যেগুলো আগে মৌসুমি সবজি ছিল এখন তা সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে। সে অর্থে মৌসুমের দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় প্রতিটি মৌসুমেই অমৌসুমি সবজির প্রাপ্যতা বাড়ছে। আর এতে করে সারা বছরই বা বছরের অধিকাংশ সময় কমবেশি সব সবজি উৎপাদিত হচ্ছে এবং তা বাজারে পাওয়াও যাচ্ছে। তাই বছরব্যাপী হরেক রকমের সবজির প্রাপ্যতা এখন আর কোনো সমস্য নয়। জাত ও প্রযুক্তি কৃষকের হাতের মুঠোয়। শুধু জাতীয় পর্যায় থেকে নীতিমালার মাধ্যমে সব কিছু সমম্বয় করে কার্যকর বাজার ব্যবস্থা চালু করে কৃষককে তার ন্যায্যমূল্য পেতে সহায়তার মাধ্যমে বছরব্যাপী নিরবচ্ছিন্নভাবে নানা রকম সবজির সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।
সবজি চাষের সম্ভাব্য পরিবেশ ও পদ্ধতি
সবজিভেদে বাণিজ্যিক কৃষি বা পারিবারিক বাগানে; ঘরের ছাদে বা চালে; খোলা মাঠে; পাহাড়ের ঢালে; বাড়ির আঙিনায় বড় গাছে; পানিতে; পানির ওপরে মাচায়; সমতল ভূমিতেও মাচায়; সমতল ভূমিতে বহুতল মাচায়; জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান পদ্ধতিতে; চর অঞ্চলে বালুময় জমিতে ঋবৎঃরমধঃরড়হ পদ্ধতিতে; লবণাক্ত ভূমিতে ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে চাষ করা যায়; হাইড্রোপনিত পদ্ধতিতে মাটিবিহীন বহুস্তর বিশিষ্ট স্থাপনা করে অতি অল্প জায়গায় অনেক প্রকার সবজি ফলানো যায়; লবণাক্ত বা বালির চর এলাকায় খাঁড়া পদ্ধতিতে বস্তা বা সস্তা কাঠ ও বাঁশের স্ট্রাকচার তৈরি করে মাটি ভর্তি করে সেখানেও চাষ করা যায়;  সেঁতসেঁতে ছায়াযুক্ত এলকায় যেখানে অন্য ফসল ফলানো যায় না সেখানেও বিশেষ বিশেষ কিছু সবজি চাষ করা যায়।
বাড়ির ছাদে ও বসতবাড়িতে সবজি চাষ
পারিবারিক খাদ্য তালিকায় দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে একটি অত্যন্ত সুন্দর ও কার্যকর ব্যবস্থা। অনেকেই এভাবে ইদানিং সবজি বাগান করেন এবং নিজ হাতে উৎপাদিত বিষমুক্ত তরজাতা নিরাপদ সবজি দিয়ে নির্ভেজাল পুষ্টির জোগান দিচ্ছেন স্ব স্ব পরিবারের খাদ্য তালিকায়। বসতবাড়িতে সবজি চাষ করার সময় এমন সবজি নির্বাচন করতে হবে যা প্রয়োজনীয় পুষ্টির দিক থেকে উচ্চমানের, খেতেও সুস্বাদু এবং যেগুলোর বাড়তি সবজি বিক্রি করতেও অসুবিধা নেই। তাছাড়া সেগুলো যেন স্থানীয় জলবায়ুতে জন্মানোর উপযোগী হয়।
পুষ্টি ঘাটতিজনিত সমস্যাবলি
বিভিন্ন প্রকার খাদ্যোপাদান যেমন- শর্করা, আমিষ, তেল, খাদ্যপ্রাণ এবং খনিজ পদার্থেও অভাবে মানুষের শরীরে বিভিন্ন রকমের অপুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা যায়। অপুষ্টিজনিত সমস্যাগুলো হলো- শিশু কম ওজন নিয়ে জন্মায়; বিভিন্ন অপুষ্টিজনিত রোগে ভোগে; মহিলা এবং শিশু রক্তশূন্যতায় ভোগে; প্রয়োজনীয় ক্যালারির অভাবে ভুগছে; ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত রোগে ভুগছে; রাইবোক্লেভিনের অভাবে ভুগছে; গলা ফোলা রোদে আক্তান্ত হচ্ছে; শিশুরা অন্ধত্ব বরণ করছে। সে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে সহজলভ্য এবং কম ব্যয়বহুল উপায় খাদ্য তালিকায় রকমারি সবজির ব্যবহার। সামগ্রিকভাবে বছরব্যাপী খাবার হিসেবে অন্যান্য খাবারের সাথে হরেকরকম সবজি পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ করে অপুষ্টিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
সবজি ফসলের প্রযুক্তিগত অবস্থা
উদ্ভাবিত ৩২-৩৩টি প্রধান সবজির প্রায় ১০০টিরও অধিক ওপি ও শংকর জাতের মধ্যে বেশ কয়েকটি জাত ও কিছু উৎপাদন প্রযুক্তি জাতীয় পর্যায়ে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। এর মধ্যে টমেটো, বেগুন, লাউ, ঢেঁড়শ, মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙা, লালশাক,  কলমিশাক, চিনাশাক, বাটিশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক শিম ও বরবটিসহ আরও কিছু সবজি জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে যেমন- পলি ছাউনিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।
বীজকথন
উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি প্রয়াস খুবই ভালো। কিন্তু সে সব জাতের মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও বিতরণ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। বর্তমানে সবজি বীজের জাতীয় মোট চাহিদা বলা হয় ৪৫০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি ব্যবস্থাপনার দ্বারা উৎপাদিত বীজের পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ এবং আমাদানি করা হয় তাও প্রায় ১৫ শতাংশ। এর বাইরে ৫৫ শতাংশ বা তারও কিছু বেশি বীজ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে এর সবই কৃষকের নিজস্ব রাখা বীজ যা মানের বিচারে নিম্নমানের। আমদানি করা বীজের একটা অংশ দ্বারা চাষি প্রায়শই প্রতারিত হয়। তাই সবজি উৎপাদনের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনের প্রধানতম উপাদান মানসম্পন্ন বীজের নিশ্বয়তা বিধানকল্পে সরকার ও নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ থাকতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কর্মপন্থার কিছু সুপারিশ
বাংলাদেশের খাদ্য শস্যে উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও তার কার্যকর সম্প্রসারণে জাতীয় উদ্যোগ দানাদার শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। তবে পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও যথেষ্ট অবহেলিত। যার ফলে বিভিন্ন প্রকারের অপুষ্টিজনিত রোগ-শোকের আক্রান্তের হার এখনও যথেষ্ট উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে এবং শিশু ও মহিলারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার হচ্ছে। এ অবস্থার অবসানকল্পে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল যেমন- সবজির উৎপাদন বাড়িয়ে সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আপামর জনগণের পুষ্টির নিরাপত্তা বিধানে আরও বেশি সচেষ্ট হওয়ার এখনই সময়। সে লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলে লক্ষ্যে পৌঁছানে যাবে দ্রুতই।
১.     উৎপাদিত সবজির ন্যূনতম বাজার মূল্য নির্ধারণ করে কৃষক পর্যায়ে তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ;
২.     কৃষক পর্যায়ে সময়মতো সঠিক মূল্যে উন্নতমানের সবজি বীজের সরবরাহ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত করা;
৩.     কৃষক পর্যায়ে সবজির সংগ্রহ ও স্বল্পকালীন সংরক্ষণ সুবিধার ব্যবস্থা করা;
৪.     সবজি চাষিদের সমবায় সমিতি গঠন করা যাতে করে তারা পণ্যের ন্যায্য বিক্রয় মূল্য পেতে দর কষাকষির অবস্থানে যেতে পারে। এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান শক্ত করতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা তাদের সাহায্য করতে পারেন;
৫.     সবজির রপ্তানিমুখী উৎপাদন এলাকায় প্রশিক্ষিত চাষি তৈরি করা এবং রপ্তানিকারকদের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করা;
৬.     সবজির মতো দ্রুত পচনশীল পণ্যে পরিবহনে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা;
৭.     ফসল উত্তোলন পরবর্তী নষ্ট হয়ে যাওয়া কমাতে চাষের প্রাথমিক পর্যায় থেকে উত্তোলন এবং পরবর্তীতে কিভাবে সবজির যতœ নিতে হয় এ ব্যাপারে কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা গড়ে তোলার পদক্ষের নিতে হবে;
৮.     চলমান গবেষণা কার্যক্রমে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার পদক্ষের নিতে হবে;
৯.     সবজি ফসলের ক্ষেত্রে ধীরগতি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে হবে গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের মাঝে সমম্বয় সাধন করে।
রোগমুক্ত, সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে সুষম খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন রঙের রকমারি সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে সবাইকে। এ ব্যাপারে জাতীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যকর ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং বেশি করে সবজি অথবা সবজি জাত খাবার খেতে হবে। আর তা করতে পারলে যেমন অপুষ্টির হাত থেকে জাতি রক্ষা পাবে তেমনি ব্যয়বহুল দানা শস্যের ওপরে নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারলে অন্যান্য ফসলসহ সবজি চাষের জন্য অধিক জমি পাওয়া যাবে। তখন বছরব্যাপী আবাদ বৃদ্ধি করে পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান সহ বিরাট সংখ্যক কৃষকের দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হবে।

ড. শাহাবুদ্দীন আহমদ*
*সাবেক পরিচালক, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই, জয়দেবপুর, গাজীপুর


Share with :

Facebook Facebook