কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গ্রীষ্মকালীন মুগডালের চাষ

ডাল বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় উদ্ভিদ উৎস থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান। এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ছাড়াও শর্করা, চর্বি ও খনিজ রয়েছে। মুগ, মসুর, মাষকলাই, ছোলা, মটর যে কোনো ডালই হোক না কেন তা শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং উপকারী। তবে নিরামিষভোজীদের জন্য মুগডাল জনপ্রিয় একটি খাবার। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যামাইনো এসিড ও উচ্চমাত্রার প্রোটিন রয়েছে যা শরীরে আমিষের ঘাটতি পূরণ করে। কাজেই প্রতিদিনের তালিকায় এ খাবারটি রাখা ভালো। মুগডালের প্রধান কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো- হজমে সহায়তা করে শরীরের পরিপাক নালির মধ্যে যে বিষাক্ত পদার্থ আছে তা বের করে দেয়, ফলে হজম শক্তি বাড়ে। এ ছাড়া এতে লেসিথিন নামে এমন এক ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে যা যকৃতে চর্বি জমাতে বাধা দেয়। অপর দিকে, মুগ ডালে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকায় ক্ষুধা কম লাগে। এতে ভিটামিন বি২ নামে এমন একটি উপাদান রয়েছে যা ক্যান্সারের কোষগুলো ধ্বংস করতে সহায়তা করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি চমৎকার খাবার হলো মুগ ডাল। এটি রক্তে শর্করার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং বিভিন্ন রোগের হাত থেকে বাঁচায়।  মুগের এত গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বাংলাদেশে ৬ লাখ হেক্টর জমিতে ৫ লাখ টন ডাল উৎপাদিত হয় যা চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ। উপরন্তু প্রতি বছর দেশে ডাল উৎপাদন কমছে কিন্তু বাড়ছে ডালের চাহিদা। তবে আশায় কথা হচ্ছে বিগত কয়েক বছরে অন্যান্য ডালের আবাদ কমলেও কিন্তু মুগের আবাদ বাড়ছে। এর কারণ হলো মুগই একমাত্র ফসল যা শীতকালীন ফসল কাটার পর চাষ করা যায়। কিন্তু মুগ চাষের প্রধান অসুবধাগুলোর মধ্যে একটি হলো মুগের ফল একই সাথে পাকে না ফলে একাধিকবার ফল সংগ্রহ করাত হয় যা শ্রমঘন কাজ। বর্তমানে প্রচলিত জাতগুলোর ফল একই সাথে পাকে না। মুগের ফলগুলো যেন একই সাথে  পাকে  সে  উদ্দেশ্যকে  সামনে রেখে  বাংলাদেশ কৃষি  গবেষণা  ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীগণ গবেষণার মাধ্যমে কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন যা ফলগুলো প্রায় একইসাথে পাকে এবং ফলনও ভালো। নতুন জাতজাতগুলো হলো বারিমুগ-৫, বারিমুগ-৬, বিনামুগ-৫, বিনামুগ-৭, বিনামুগ-৮ এবং বিইউ মুগ-৪। জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো গাছের উচ্চতা খাটো থেকে মাঝারি (৩৫-৪০ সেন্টিমিটার), জীবনকাল কম (বীজ বপন থেকে পরিপক্ব পর্যন্ত সময় লাগে ৬৫-৭০ দিন), বীজের আকার মাঝারি ও উজ্জ্বল সবুজ, গ্রীষ্মকালে চাষের উপযোগী। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ১.৮ টন এবং পাতা হলুদ মোজাইক ভাইরাস সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন।


চাষ উপযোগী জমি : বৃষ্টির পানি জমে থাকে না এরূপ যে কোনো জমিতেই মুগের চাষ করা যায়। তবে বেলে দো-আঁশ জমিতে চাষ করলে ফলন ভালো হয়। বৃষ্টি বা অন্য কারণে ক্ষেত্রে পানি জমে গেলে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
 

বপনের সময় : গ্রীষ্মকালীন মুগ বপনের সময় অঞ্চলভেদে কিছুটা তারতম্য হয়। দক্ষিণাঞ্চলের (বরিশাল বিভাগ) জেলাগুলো মাঘ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফাল্গুন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত (জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারি মসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত) সময়ের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ফাল্গুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে চৈত্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত (ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে মার্চেও শেষ পর্যন্ত) সময়ের মধ্যে বীঝ বপন সম্পন্ন করতে হবে। মার্চের ১৫ তারিখের পর (ফাল্গুন মাসের পর) বপন করলে ফলন কমে যায়।
সতর্কতা : আষাঢ় মাসের (মধ্য জুন থেকে জুলাই) অবিরাম বৃষ্টিতে মুগের ফল পচে যায়। চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহ মধ্যে (মধ্য মার্চ) বীজ বপন সম্পন্ন করতে পারলে আষাঢ় মাসের আগে ফসল সংগ্রহ করা যায় এবং ফল পচনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়। এ ছাড়াও অনুমোদিত সময়ের আগে বীজ বপন করলে শীতের কারণে চারা মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

জমি তৈরি : জমির অবস্থাভেদে ২-৪ টি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। শীতকালীন ফসল তোলার পর মুগ চাষের জন্য ১-২টি চাষই যথেষ্ট তবে পতিত জমির জন্য ৩-৪টি চাষ লাগে। জমিতে পানির অভাব হলে হলে বীজের অংকোরোদগমের সুবধার জন্য একটি হালকা সেচ দেয়া প্রয়োজন।
সার প্রয়োগ : জমির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে সারের তাপতম্য করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সার সুপারিশমালা অনুসরণ করতে হবে। তবে সাধারণভাবে একরে ১২-১৫ কেজি ইউরিয়া, ২৮-৩০ কেজি টিএসপি, ১৫-২০ কেজি এমওপি ও ৫ কেজি জিপসাম সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বপন পদ্ধতি ও বীজের পরিমাণ : মুগকালাই সাধারণ ছিটিয়ে বপন করা হয়। বপনের পর ভালোভাবে মই দিয়ে বীজগুলো ঢেকে দিতে হবে। তবে সারিতে বপন করলে ব্যবস্থাপনায় সুবধিা হয় ও ফলন বেশি হয়। এ ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি হতে হবে। একরে ১০-১২ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।


আগাছা দমন : চারা গজানোর পরে জমিতে আগাছা আগাছা দেখা দিলে ১৫-২০ দিন পর নিড়ানি দিয়ে হালকাভাবে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে  ফেলতে হবে। এতে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
পানি সেচ : মুগকালাই চাষাবাদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় পানি সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে জমিতে অত্যধিক পানির প্রয়োজন হলে একবার সেচ দেয়া বাঞ্ছনীয়। এতে ভালো ফলন পাওয়া যায়।  
রোগ ও পোকামাকড় দমন : নতুন উন্নত মুগ ডালের জাতগুলো পাতার সার্কোস্পোরা দাগ রোগ প্রতিরোধ  ক্ষমতাসম্পন্ন এবং হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগ সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন। তাছাড়া পোকার আক্রমন ও তুলনামুুলক কম। মোজাইক ভাইরাস রোগ দেখা দেয়া মাত্র গাছ উপড়ে ফেলতে হবে। সাধারণত কোন ছত্রাকনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না তবে ছত্রাকের মারাত্মক আক্রমণ হলে যে কোনো ছত্রাকনাশক (ডাইথেন এম ৪৫, বেভিস্টন ৫০, রিডোমিল গোন্ড) ৭-১০ দিন পর পর দুইবার প্রয়োগ করা যেতে পারে। পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে ডায়াজিনন ৬০ইসি, নুভাক্রন ৮০ wsc, রিপকর্ড ব্যবহার করা যায়।

 

ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ : মুগকালাই ক্ষেত  থেকে সংগ্রহ করা খুবই অসুবিধাজনক। কারণ দেশে যেসব প্রচলিত জাত আছে সেগুলোর ফল একসাথে পাকে না বিধায় কয়েকবার সংগ্রহ করতে হয়। এক্ষেত্রে নতুন উন্নত মুগ ডালের জাতগুলোর ফল প্রায় একই সাথে পাকে ফলে সংগ্রহ করা সহজ। ফসল কাটা হলে গাছগুলো ভালোভাবে শুকিয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা গরু দিয়ে মাড়াই করে বীজ সংগ্রহ করতে হয়।
এ পর বীজগুলো পরিষ্কার করে এবং ভালোভাবে  রোদে শুকিয়ে মাটি বা টিনের পাত্রে মুখ বন্ধ করে সংরক্ষণ করা হলে অনেক দিন পর্যন্ত বীজ ভালো থাকে।

ড. এম. মনজুরুল আলম মণ্ডল*
*পিএসও, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ, # ০১৭১৬৭৪৯৪২৯


Share with :

Facebook Facebook