কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

অসময়ের ফসল ভুট্টা

কৃষি প্রধান আমাদের এই বাংলাদেশ। কৃষি ও কৃষকের ওপর নির্ভর করে খাদ্য নিরাপত্তা। ষড়ঋতুর এ দেশে আজ আর ছয়টি ঋতু দেখা যায় না। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিন ঋতুতে যেন আটকে গেছে দেশ। কৃষক ও কৃষি বিজ্ঞানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রায় সারা বছর সব ধরনের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। এরই ফলশ্রুতিতে বর্ষার সবজি  গ্রীষ্মে, আর গ্রীষ্মের সবজি শীতে পাওয়া যাচ্ছে, শুধু প্রয়োজন একটু নিষ্ঠা ও সচেতনতা। এতে যেমন আমাদের উদ্ভিজ পুষ্টি চাহিদা মিটছে তেমনই কৃষি ও কৃষক অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে।


অর্থকরী ফসল হিসাবে ভুট্টার কথাই ধরা যাক, সারা বছরই চাষ করা যায় এ ফসলটি। ফাল্গুন মাসে সরিষা ও আলু তোলার পর অনেক কৃষক জমিতে ধান চাষ করতে আগ্রহী হয়ে পরেন। এ সময়ে ধান চাষে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের কৃষক ভাইদের। চারার বয়স বেশি হয়ে যাওয়াতে বীজতলায় কিছু পোকা আক্রমণ ও রোগের সংক্রমণ হয়ে থাকে, যা মূল জমিতে চারার সাথে বয়ে নিয়ে যায়। এতে চারা অবস্থায় ধান গাছের বৃদ্ধি যেমন বাধাগ্রস্ত হয় তেমনই নানারকম বালাইয়ের আবির্ভাব হয়ে থাকে। কৃষক তখন আগাছা দমনের সাথে সাথে বালাইনাশক ব্যবহার করে থাকেন, কিন্তু সঠিক বালাইনাশক নির্বাচন করতে না পারায় বা স্টাবলিশমেন্ট অবস্থায় অধিক বালাইনাশক ব্যবহার করায় একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে অন্যদিকে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে এ সময়ে কৃষক তার চাহিদা মতো চারা পান না আবার ফেলেও মূল জমিতে অধিক বয়সের চারা রোপণের ফলে কৃষক তার কাক্সিক্ষত ফলনও পাচ্ছেন না। এসব ঝামেলা এড়িয়ে সচেতন কৃষক যদি ভুট্টা আবাদের দিকে মনোনিবেশ করেন তাহলে একদিকে যেমন ঝামেলাবিহীন উৎপাদন নিশ্চিত হবে অন্যদিকে উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণ করে অধিক ফলন পেতে পারেন। আলু চাষে কৃষক যথেষ্ট পরিমাণে সার ব্যবহার করে থাকেন তাতে পরে ওই জমিতে ভুট্টা চাষ করলে সারের পরিমাণ যেমন কম লাগে তেমনই লিচিং হওয়া খাদ্য উপাদান ভুট্টা গাছের গভীর মূল দ্বারা গৃহীত হয়। এ সময়ে ভুট্টা চাষে, ভুট্টা গাছের জীবনকালও কমে আসে তাই খেয়াল রাখতে হবে জীবন চক্রের পাঁচটি ধাপে যেন জমিতে রসের অভাব না হয়। ধাপ পাঁচটি হলো ১. চারা অবস্থায় (৩০ থেকে ৩৫ দিন বয়সে ৪-৬ পাতা পর্যায়), ২. হাঁটু উচ্চতায় (৫০ থেকে ৫৫ দিন বয়সে ৮-১২ পাতা পর্যায়), ৩. টাসেলিং অবস্থায় (৭০ থেকে ৭৫ দিন বয়সে মাথায় ফুল/পরুষ ফুল আসা পর্যায়), ৪. সিল্কিং অবস্থায় (৮০ থেকে ৮৫ দিন বয়সে মোচা বা মহিলা ফুল আসা পর্যায়), ৫. দানা পরিপূর্ণতা হওয়ার সময় (১০০ থেকে ১১০ দিন বয়সে)। এবার একটু দেখা যাক ভুট্টার পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার সম্পর্কে।

ভুট্টার বিভিন্ন অংশ

আমিষ

(%)

চর্বি

(%)

শর্করা

(%)

আঁশ

(%)

ক্যালসিয়াম

(গ্রাম/১০০কেজি)

ফসফরাস

(গ্রাম/১০০ কেজি)

ভুট্টার কচি পাতা

১১.১

১.১

৪৪.২

২৯.৬

৬৮০

২১০

ফুল আসার সময়ের পাতা

৬.৪

০.৯

৫১.২

২৯.৯

৬১০

১৯০

দানা পুষ্ট হওয়ার সময়ের পাতা

৫.১

১.৫

৫৯.২

২৬.৯

৪৯০

১৯০

ভুট্টার হলুদ দানা

১২.১

-

৭৯.৬

১.৪

২০

৩৬০

ভুট্টার সাদ দানা

১০.৬

-

৮১.৪

১.৯

২০

৩৬০

ভুট্টার মোচা

২.১

-

৫৬.৪

-

৫০

৬০


ভুট্টার পুষ্টি মূল্য
ভুট্টার ব্যবহার

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভুট্টা মানুষের প্রধান খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হলেও আমাদের দেশে তা এখন সেই পর্যায় যায়নি। ব্যবহার মধ্যে রয়েছে যেমন- মানুষের খাবার- পরটা, লুচি, খিচুরি, রুটি, মোয়া, নাড়– এবং পোড়া ও সিদ্ধ মোচা। ভুট্টার পাতা গবাদিপশু পাখিকে খাওয়ানো যায় আর দানা মোরগ-মুরগির সুষম খাবার যা বর্তমানে পোলট্রি ও ফিশ ফিড তৈরিতে প্রধান কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভুট্টার গাছ ও পাতা ঘরের ছাউনি ও বেড়ায় ব্যবহার করা যায় এবং অবশিষ্টাংশ জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হয়।


সর্বোপরি আমাদের দেশে ফসলের উৎপাদন খরচ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একমাত্র ভুট্টা ফসল আবাদ করে কৃষক কখনও ক্ষতির সম্মুখীন হন নাই। শুধু নিয়মতান্ত্রিক চাষাবাদ ও সঠিক সেচ ব্যবস্থপনাই ভুট্টা ফসলের অধিক ফলন কৃষকের ঘরে আসে, তাতে কৃষি ও কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন আসবে।

 

কৃষিবিদ খন্দকার ইয়াছিন মোহাম্মদ শওকত*

*প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইন্ডাস্ট্রিজ


Share with :

Facebook Facebook