কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ঝালের সেনসেশন বোম্বাই মরিচ

আসুন নিজের গাছে বোম্বাই মরিচ ফলাই মাত্র ১ মাসে! পতিত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে পারেন বোম্বাই মরিচ। বোম্বাই মরিচ, মরিচের একটি প্রজাতি, যা প্রচণ্ড ঝালের কারণে সমধিক পরিচিত। অন্যান্য আরও বহু নামে পরিচিত হলেও কোথাও কোথাও নাগা মরিচ, কামরাঙা মরিচ কিংবা ভূত জলোকিয়া নামেও পরিচিত। পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে এর প্রচ- ঝালের কারণে একে অনেক সময়ই হয়তো ভুল করে, ভূত মরিচ বলা হয়ে থাকে। স্কোভিল (Scoville: ঝাল পরিমাপের মানদণ্ড) অনুযায়ী এর মান ১০+++। তবে মূলত সুগন্ধ আর স্বাদের জন্যই এর এত কদর। একটু চেষ্টা করলেই বাণিজ্যিকভাবে আমরা মাত্র ১ মাসে ফলাতে পারি এ মরিচ।
 

কোথায় পাবেন বীজ
যে কোনো নার্সারি, হর্টিকালচার সেন্টার বা গ্রামের হাট বাজার থেকেও কেনা যায় বোম্বাই মরিচের চারা। তবে বিশ্বস্ত উৎস হতে চারা ক্রয় করলে জাত ও চারার মান সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা যায়। বীজ থেকেও চারা উৎপাদন করে রোপণ করা যায় সে ক্ষেত্রে ভালোমানের প্যাকেটজাত বীজ ব্যবহার করতে হবে।

 

জলবায়ু
এ মরিচ শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ যায়। ফসলের প্রাথমিক অবস্থায় অল্প বৃষ্টিপাত এবং ফসলের বাড়বাড়তির সময় পরিমিত বৃষ্টিপাত হলে মরিচ খুব ভালো হয়। অতিরিক্ত ও পরিমাণের কম বৃষ্টিপাত মরিচের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ফুল ও ফল ধরা কমে যায় এবং অধিক আর্দ্রতায় ফল পচে যায়। ফলের পরিপক্বতার সময় শুকনো আবহাওয়া থাকলে এর গুণগতমান ও রঙ অক্ষুণ্ন থাকে। বেশি বৃষ্টিপাত ও মেঘলা আকাশে ফুল ধারণে সমস্যা হয়।

 

জমি নির্বাচন
জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ উর্বর দো-আঁশ মাটি চাষাবাদের বেশি ভালো। অম্লমাটিতে মরিচের চাষ করা হলেও ক্ষারীয় মাটিতে ফলন ভালো হয় না অর্থাৎ মাটির পিএইচ ৫.৫ হতে ৭.০ এর মধ্যে থাকতে হবে। ছায়ামুক্ত ও বৃষ্টির সময় পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু জমি মরিচ চাষের উপযোগী। বন্যাবিধৌত পলি এলাকায় মাঝারি ও উঁচুভিটা যেখানে বর্ষার পর ভাদ্র অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন জো অবস্থা আসে সেখানে মরিচ ভালো হয়। বিশেষ করে সেচ এলাকায় অথবা নদী, নালা, খাল বা দীঘির আশপাশে, বাগানের রাস্তা, পানের বরজ, লেবু কমলা, পেঁপে, কলাসহ অন্যান্য দ্রুতবর্ধনশীল ফল বাগান, সবজি বাগানের পাশে, ঘরের কাছে, উঁচু ভিটায়, বোম্বাই মরিচ চাষ করা যায় অনায়াসে। উঁচু করে মাটি তুলে প্লট বানিয়ে বোম্বাই মরিচের চারা রোপণ করতে হয়। আগেই বীজতলায় পলিথিনে চারা তৈরি করে নিতে হবে। সরাসরি বপন করেও আবাদ করা যায় কিন্তু এতে বীজ বেশি লাগে, সময় বেশি লাগে এবং আর্থিক ক্ষতি হয়। ৩ ফুট চওড়া বেডে ২ লাইন বোম্বাই মরিচের চারা লাগাতে হয়।


পরিচর্যা
পারিবারিকভাবে কম পরিমাণে চাষ করলে তেমন যত্নআত্তির প্রয়োজন পড়ে না। তবে বাণ্যিজ্যিকভাবে আবাদ করলে জমি তৈরি প্রয়োজনীয় জৈব রাসায়নিক সার ২ থেকে আড়াই ফুট দূরে লাইন এবং গর্তে চারা রোপণ করতে হয়। সাধারণত শীতকালে চারা রোপণের একটা হুজুক দেখা দেয়। তবে সতর্কভাবে লাগালে সারা বছর লাগানো যায়। সারের পরিমাণ অনেকটা সাধারণ মরিচের মতো। তবে গাছ বড় এবং বেশি দিন বাঁচে বলে প্রতি বছর সার দিতে হয়। যেহেতু বোম্বাই মরিচ বহুবর্ষজীবী তাই গাছপ্রতি যত্ন আবশ্যকীয়। পানির প্রতি বেশ অনুভূতি প্রবণ। পানিবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। চারা লাগানোর দেড় ২ মাস পর থেকেই ফুল ধরে এবং ফুল আসার ১ মাসের মধ্যে খাবার উপযোগী হয়। কাঁচামরিচ যেমন বেশি কাঁচা অবস্থায় ঝাল থাকে না কিন্তু বোম্বাই মরিচ ছোট অবস্থায়ও ঝাল থাকে এবং সুগন্ধিতে মাতোয়ারা করে ফল ধরার শুরু থেকেই।


রোগবালাই
বোম্বাই মরিচের অল্প কিছু পোকামাকড় সমস্যা। এর মধ্যে পাতা কোঁকড়ানো, থ্রিপস পোকা, অতিক্ষুদ্র গাঢ় বাদামি মাকড়সা, জাবপোকা, ফলছিদ্রকারী পোকা অন্যতম। আর রোগের মধ্যে কা- পচা, ঢলেপড়া রোগ, মরিচপচা, ডগা শুকিয়ে যাওয়া ও ফল পচা বা অ্যানথ্রাকনোজ উল্লেখযোগ্য। আবাদের শুরু থেকে সুস্থ সবল চারা রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ, সেচ নিকাশ, আগাছা দমন, পানি সেচ, আক্রান্ত পাতা বা ডাল ছিঁড়ে ফেলা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে অর্থাৎ ক্লিন আবাদের ফলে বোম্বাই মরিচ উৎপাদন ফলন আশাতীত ভালো হবে।


বারান্দা বা ছাদে বোম্বাই মরিচ চাষ
প্রতিটি চারা লাগানোর আগে মাটি প্রস্তুত করে নিতে হবে। প্রতিটি ১০ ইঞ্চি টবের জন্য ১/৩ গোবর (২ ভাগ মাটি, ১ ভাগ গোবর), ২ চিমটি টিএসপি, ১ চিমটি ইউরিয়া, ১ চিমটি পটাশ সার, অল্প পরিমাণ সরিষার খৈল দিয়ে ৪-৫ দিন মাটি রোদে শুকাতে দিন। তারপর এ মাটিতে চারা লাগানো হয়। চারা যদি সবল না হয় তাহলে দিনে ২-৩ বার ইউরিয়া মিশ্রিত পানি স্প্রে করলে চারা সবল হয়ে যাবে।


সপ্তাহে ১ দিন মাটি খুঁচিয়ে আলগা করে দেবেন, আর আগাছা সরিয়ে দেবেন। চারা লাগানোর ২০-২৫ দিনের মধ্যেই ফুল আসবে গাছে। আর সেই ফুল থেকে আস্তে আস্তে ধরতে শুরু করবে আপনার প্রিয় বোম্বাই মরিচ। মরিচ যত বেশি দিন গাছে থাকবে তত ঝাল হবে।


খুব নিচের শাখাগুলো কেটে/ভেঙে ফেলবেন, নাহলে গাছের জোর কমে যাবে, মরিচ হবে ছোট। গাছ রাখবেন কড়া রোদে, ছায়ায় থাকলে মরিচ ধরবে না।
১টা মরিচ গাছ অনেক দিন ফল দেবে। আর ১টা গাছে যে পরিমাণ মরিচ ধরে তা খেয়েই শেষ করা কঠিন।


২-৪টা গাছ হলে পোকামাকড় হাতেই মেরে দমন করা যায়। গাছ বেশি হলে অথবা কীটনাশক দিতে চাইলে মরটাস ব্যবহার করা যায় তবে শাকসবজিতে কীটনাশক ব্যবহার না করাই ভালো।
এবার নিজেই একবার চেষ্টা করে দেখুন কত সহজে ফলানো যায় আপনার প্রিয় বোম্বাই মরিচ।

 

(*এখানে ১ মাসে ফলনের ব্যাপারটা বলা হয়েছে চারা লাগানোর ক্ষেত্রে। বীজ থেকে ফলন পেতে সময় আড়াই থেকে তিন মাস লাগতে পারে।)

 

কৃষিবিদ মো. আসিফ ইকবাল*

তথ্য সূত্র : ইন্টারনেট
*আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস, কুমিল্লা অঞ্চল, কুমিল্লা, মোবাইল: ০১৭১৫৪৩৬৯০৫  Email:t.asif@gmail.cm


Share with :

Facebook Facebook