কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

গবাদিপশুর ধনুষ্টঙ্কার রোগ

আমাদের দেশের জন্য গবাদিপশু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ৩৩.৩৫ মিলিয়ন ছাগল এবং ১.১৬ মিলিয়ন ভেড়া আছে। আমাদের দেশে ছাগল ও ভেড়া অন্যতম ছোট রুমিনেন্ট প্রাণী, যাকে বলা হয় গরীবের বন্ধু। আমাদের দেশের ছাগলের মাংস ও চামড়া বিশ্ববিখ্যাত। ভেড়ার লোম ও মাংস খুবই উন্নতমানের। ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল তৈরি করা যায়। এদের মাংস এবং দুধ যেমন খুবই উন্নত মানের প্রোটিনের উৎস তেমনি এর চামড়া অন্যতম অর্থকরী পণ্য। এভাবে গবাদিপশু আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের দেশে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতীয় ছাগলই বেশি পাওয়া যায়। যেহেতু অধিকাংশ ছাগলের চামড়ার রঙ কালো তাই একে বলা হয় ব্ল্যাক বেঙ্গল। ছাগল ও ভেড়া পালনে রোগবালাই প্রধান অন্তরায়। ফলে প্রতি বছরই এদের উৎপাদন ও ব্যাহত হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে পশুর যেসব রোগ দেখা যায় সাধারণত সেগুলো হচ্ছে ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসজনিত। এর মধ্যে ধনুষ্টঙ্কার উল্লেখযোগ্য একটি রোগ। এখন জেনে নেই ধনুষ্টঙ্কার রোগ সম্পর্কে।


ধনুষ্টঙ্কার মানুষসহ প্রায় সব গৃহপালিত পশুর জীবাণু ঘটিত একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। এরোগে দাঁত কপাটি বা চোয়াল লেগে যায় বলে একে লক জ্ব বলা হয়। অতিবেদন টেটানি ও খিঁচুনি এ রোগের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। ক্লস্ট্রিডিয়াম টেটানি (Clostridium tetani) জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট টকসিন এ রোগের কারণ। এটি গ্রাম পজিটিভ অ্যান-অ্যারোবিক জীবাণু। এ জীবাণু কার্বোহাইড্রেট ফারমেন্ট করে না। এ জীবাণু স্পোর সৃষ্টি করে। এ স্পোর অনেক বছর মাটিতে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। শুধু তাই নয়, ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৩০ থেকে ৬০ মিনিট টিকে থাকতে সক্ষম। তবে ১১৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ২০ মিনিটে বিনষ্ট হয়। এ ব্যাকটেরিয়া প্রধানত দুই প্রকৃতির টকসিন সৃষ্টি করে নিউরোটকসিন বা টিটানোস্পাজমিন (tetanospasmin) - এটি সক্রিয় টকসিন যা রোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হেমোলাইসিন (Haemolysin) যা রক্ত হেমোলাইসিস করে তবে রোগ সৃষ্টিতে তেমন কোন ভূমিকা নেই।


টিটেনাস জীবাণু স্বাভাবিক অবস্থায় পশুর পরিপাকতন্ত্রে বাস করে এবং মলের সাথে বেরিয়ে মাটিতে স্পোর অবস্থায় থাকে। এ দূষিত মাটির সংস্পর্শে গভীর ক্ষত দিয়ে এ জীবাণু দেহে প্রবেশ করে। তবে ক্ষতের কোষ কলা বিনষ্ট হয়ে অ্যানঅ্যারোবিক অবস্থার সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এ স্পোর সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পশুর প্রসবকালীন এ জীবাণুর স্পোর জনননালির মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। এছাড়া খোজা করা, লেজ কাটা শিয়াল কুকুরে কামড়ানো, নাভির ক্ষত, দাঁতলোলা এসবের ক্ষতের মাধ্যমে এ জীবাণুর স্পোর সংক্রমিত হয়ে মড়ক আকারে টিটেনাস রোগ হবার তথ্য রয়েছে। প্রধানত গভীর ক্ষত, প্রসবকালীন, খোঁজা করা এসব সময় এ জীবাণুর স্পোর প্রবেশ করে ক্ষত স্থানে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। ক্ষত স্থানের টিস্যু বিনষ্ট হলে বিনষ্ট টিস্যুতে অক্সিজেন লোপ পেয়ে অ্যানঅ্যারোবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় এ জীবাণু বংশ বৃদ্ধি করেই নিউরোটকসিন সৃষ্টি করে। ব্লাড ব্রেন ব্যারিয়ার থাকায় এ টকসিন পেরিফেরাল স্নায়ুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে। এ টকসিন স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে স্নায়ুর তেমন কোনো পরিবর্তন সাধন করে না কিন্তু অতিসংবেদ্যতা (hypersensitivity) সৃষ্টি করে। নিউরোটকসিন প্রধানত দুইভাবে কাজ করে। প্রথমত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ক্রিয়া স্পাজম (সবিরাম পেশীয় সংকোচন ও শিথিলকরণ) জনিত খিঁচুনি এবং দ্বিতীয়ত পেশির স্নায়ুপ্রান্তে সরাসরি ক্রিয়া করে ফলে টনিক (অবিচ্ছিন্ন পেশির সংকোচন) খিঁচুনি হয়।


সাধারণত এ রোগের সুপ্তিকাল ১ থেকে ৩ সপ্তাহ। তবে অনেক সময় মাস পর্যন্ত হতে দেখা যায়। মেষ, ছাগলের লেজ কাটা, খোঁজ করা বা লোম কাটার ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। সব প্রজাতির পশুর এ রোগের ক্লিনিক্যাল উপসর্গ প্রায় একই রকম। রোগের প্রথম দিকে দেহের বিভিন্ন অংশের মাংসপেশি শক্ত হয়। মাঢ়ির মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে দাঁত কপাটি লাগে। তাই এ রোগকে লক জ্ব বলা হয়। এ অবস্থায় পশু কিছু খেতে পারেনা। মুখ দিয়ে লালা ঝরে। পশুর মাংসপেশি শক্ত হবার ফলে পশু কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থাকে এবং পড়ে গেলে উঠানো যায় না।


যে কোনো শব্দে পশু চমকে উঠে। এতে মাংসপেশি শক্ত সংকোচন হওয়া  বৃদ্ধি পায়। শ্বাসরোধ হয়ে পশু মৃত্যুবরণ করে।
রোগের প্রথম পর্যায়ে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু শেষ অবস্থায় মাংসপেশীর ক্রমাগত সংকোচন ও শক্ত হওয়ার ফলে দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় (১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। এ রোগে মেষ ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে মারা যায়।


অতি সম্প্রতি দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, বাচ্চা প্রসব, অস্ত্রোপাচার, খোঁজা করার ইতিহাস এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপসর্গ বিশেষ করে পেশির স্পাজম, থর্ড আইলিড পক্ষাঘাতের কারণে বেরিয়ে আসা ও লক জ্ব এসব পরীক্ষা করে এ রোগ নির্ণয় করা যায়। সুনির্দিষ্ট রোগ নিরূপণের জন্য ক্ষতস্থান থেকে সোয়ার সংগ্রহ করে অ্যানঅ্যারোবিক মিডিয়ায় কালচার, গ্রাম স্ট্রেইন ও বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা করে এ রোগের জীবাণু শনাক্ত করা যায়। এ জীবাণু কার্বোহাইড্রেট ফারমেন্ট করে না।


প্রধানত ৪টি মূল নিয়মে এ রোগে আক্রান্ত পশুর চিকিৎসা করা যায়। যদি দেহে কোনো ক্ষত পাওয়া যায় তবে ক্ষতের মধ্যে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম (ATS) দিয়ে ক্ষতের টকসিন বিনষ্ট করতে হবে। অতপর হাইড্রোজেন পার অক্সাইড বা অন্য কোনো জীবাণুনাশক ওষুধ দিয়ে ক্ষতস্থান সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার করে সরাসরি পেনিসিলিন ইনজেকশন দিতে হবে। ক্ষতে প্রথমে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম প্রয়োগ না করে শুধু হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ও পেনিসিলিন প্রয়োগেও ক্ষতের টকসিন শোষিত হয়। কোনো ক্ষত পাওয়া না গেলে সেক্ষেত্রে আক্রান্ত পশুর প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১০ হাজার ইউনিট পেনিসিলিন হিসেবে শিরা বা পেশির মধ্যে দিনে দুইবার করে ৫ থেকে ৬ দিন ইনজেকশন দিতে হয়। দেহের রেসিডিউয়্যাল টকসিনকে নিউট্রোলাইজ করে দেহের টকসিন বিনষ্ট করার জন্য অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম ইনজেকশন দিতে হয়। তবে সাধারণত উপসর্গ প্রকাশের পর এ চিকিৎসায় তেমন সুফল পাওয়া যায় না। মেষ ও ছাগলে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫হাজার ইউনিট ইনজেকশন দিতে হয়।


শ্বাসরোধ প্রতিরোধ মাংসপেশির টেটানি শিথিল বা হ্রাস করার জন্য ওষুধ প্রয়োগ করা। ক্লোরাল হাইড্রেট ও ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ইনজেকশন দিতে হবে। ক্লোরাল হাইড্রেট ২% সলুশন প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১ মিলি হিসেবে শিরার মধ্যে ইনজেকশন দিতে হবে। সম্পৃক্ত ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ৩৫ মিলি হিসেবে দিনে দুইবার করে প্রথম ১০ দিন এবং একবার করে পরবর্তী ১০ দিন ত্বকের নিচে ইনজেকশন দিতে হয়। ক্লোরপ্রোমাজিন হাইড্রোক্লোরাইড (লারগ্যাকটিল) প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ০.৪ মিলিগ্রাম হিসেবে শিরায় এবং ১ মিলিগ্রাম হিসেবে মাংসপেশিতে প্রত্যহ ইনজেকশন দিতে হয়। এছাড়া অ্যাসিটাইল প্রোমাজিন প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ০.০৫ মিলিগ্রাম হিসেবে দিনে দুইবার করে ৮ থেকে ১০ দিন মাংসপেশি বা শিরায় ইনজেকশন দিতে হয়।
 

সহায়ক চিকিৎস
প্রয়োজনে শিরায় ডেক্সট্রোজ স্যালাইন দিতে হবে এবং স্টোমাক টিউবের সাহায্যে খাওয়াতে হবে।
পশুকে অন্ধকার ঘরে ও নির্জন স্থানে রাখতে হবে যাতে কোনো উপদ্রব পশুর উত্তেজনা সৃষ্টি করতে না পারে।
প্রয়োজনে ডুস দিয়ে পায়খানা ও ক্যাথেটার দিয়ে প্রস্রাব করাতে হবে।

 

প্রতিরোধ

স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থায় অস্ত্রোপচার
অস্ত্রোপচারের সময় ত্বক পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক পদার্থ লাগিয়ে জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। খোঁজা করা , লেজকাটা, লোম কাটা এসব কাজ করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

অস্ত্রোপচারের সময় ত্বকের নিচে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম (ATS) ও ইনজেকশন দিলে ১০-২৪ দিন এ রোগ প্রতিরোধ হয়। মেষ শাবক ও ছাগলের জন্য ২০০ ইউনিট প্রয়োগে কাজ হয়।
 

ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিরোধ
টিটেনাস টকসয়িড ইনজেকশন বা অ্যালাম প্রিসিপিটেড ফরমালিন ট্রিটেড টকসি এনজুটিক এলাকায় এ টিকা একবার ইনজেকশন দেয়ার ১০-১৪ দিনের মধ্যে দেহে সক্রিয় ইমুনিটি সৃষ্টি করে এবং প্রায় ১ বছর সক্রিয় থাকে। এ টিকা ১২ মাস পর পুনরায় প্রয়োগে আজীবন ইমুনিটি সৃষ্টি হয়।

 

প্রয়োজনে অ্যান্টিটিটেনাস সিরাম ও টিটেনাস টকসিয়ড একই পশুকে এক সাথে প্রয়োগ করা যায়। তবে ভিন্ন সিরিঞ্জে ভিন্ন স্থানে প্রয়োগ করতে হয়।
 

গর্ভবতী পশুর গর্ভাবস্থায় শেষ সপ্তাহে টকসয়িড ইনজেকশন দিলে কলস্ট্রামে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডিজ থাকে যা খেয়ে বাচ্চার ১০ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত দেহে এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মে। বাচ্চার বয়স ১০ সপ্তাহ হলে ০.৫ মিলিলিটার টকসয়িড মাংসপেশি বা ত্বকের নিচে ১২ সপ্তাহ পর পুনরায় ইনজেকশন করতে হয়। পরে বছরে একবার করে ইনজেকশন দিলেই এ রোগ প্রতিরোধ হয়।

 

কৃষিবিদ ডা. হাসান তানভির রিফাত*

* মাধবী কুঞ্জ, রায়পুর, নোয়াখালী


Share with :

Facebook Facebook