কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দরকার কৃষকবান্ধব ব্যবসা

কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেসব পণ্য উৎপাদন করেন কৃষকরা তার ভালো দাম কখনই পান না। এর ওপর আছে বাজারদরের ব্যাপক ওঠানামা, পরিবহন জটিলতাসহ পণ্য স্থানান্তরে কালক্ষেপণের দীর্ঘসূত্রিতা, আছে উৎপাদন পর্যায়ে নানা রকমের ঝুঁকি। এবার ফাল্গুনের শেষে যে বৃষ্টি হলো তাতে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক তরমুজ ও আলু চাষি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। কৃষকরা পণ্য উৎপাদন করে তাই তেমন লাভবান হতে পারছেন না। তারা যে লাভ না পাচ্ছেন তার চেয়ে বেশি লাভ চলে যাচ্ছে খামার থেকে বাজারের মধ্যে থাকা এক শ্রেণীর লোকের কাছে। তাই আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যতই উৎপাদন বাড়ানো হোক না কেন, কখনও কখনও সেই বাড়তি উৎপাদন কৃষকদের বাড়তি কোনো লাভ নিশ্চিত করতে পারছে না। এতে অনেক কৃষক কৃষি উৎপাদনে আগ্রহ ও পুঁজি হারিয়ে ফেলছেন।
কৃষকদের জন্য সুসংগঠিত কোনো বাজার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে না ওঠার কারণে প্রত্যেকেই স্বতন্ত্রভাবে তাদের পণ্য বিপণন করছেন। এতে প্রত্যেককেই আলাদাভাবে বাজার খুঁজতে হচ্ছে, বাজারে সেসব পণ্য নিজেদেরই পরিবহন করে নিয়ে যেতে হচ্ছে, নিজেদেরই বিক্রির জন্য চেষ্টা করতে হচ্ছে ও বিক্রির পর টাকা পাওয়ার জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে। এতে প্রত্যেকেরই সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ বেশি লাগছে। উৎপাদন পর্যায়ে স্বতন্ত্র কৃষকের উৎপাদনকে উৎসাহিত না করে দলগতভাবে কৃষি পণ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত করতে পারলে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়বে, মান বাড়বে, খামারে যান্ত্রিকীকরণের ফলে শ্রমিক ব্যয় ও অন্যান্য খরচসহ উৎপাদন ব্যয় কমবে ও নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের মাধ্যমে বাজার সংযোগ সহজ হবে। সামগ্রিকভাবে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সব কর্মকা- পরিকল্পনামাফিক করা সম্ভব হবে। কৃষকরাও কৃষি পণ্য উৎপাদনে লাভ-ক্ষতির বিষয় হিসাব করতে পারবেন ও বুঝতে পারবেন যে কোনো পণ্য উৎপাদন করে কত বেশি মুনাফা হচ্ছে।
সচরাচর কৃষকরা উৎপাদনের বিষয়ে তাদের নিজস্ব ভাবনা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করেন, কখনও কখনও কিছু পরামর্শ নেন। কিন্তু উৎপাদনের আয়-ব্যয়ের কোনো সঠিক হিসাব রাখেন না, বিক্রির ব্যাপারেও সঠিক কোনো পরিকল্পনা করেন না। এখন সময় এসেছে এসব নিয়ে ভাবার। সঠিক উৎপাদন পরিকল্পনা ও ব্যবসায় পরিকল্পনা করে চাষাবাদ করতে পারলে প্রচলিত লাভের চেয়ে বেশি লাভ করা অবশ্যই সম্ভব। এখন সময় এসেছে কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের। এসবই বাণিজ্যিক কৃষির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধাপে ধাপে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করে এগোতে পারলে কৃষকদের সংগঠিত ও উদ্বুদ্ধ করে কৃষকবান্ধব ব্যবসায় অনুপ্রাণিত করা সম্ভব। এ পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য দেশের কৃষকদের ভ্যালু চেইন ও বাজার সংযোগের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেয়া যায়।
এ দেশে কৃষকদের সম্পৃক্ত ও দক্ষ করে গড়ে তুলে কৃষকদের দিয়ে কৃষকবান্ধব ব্যবসা করানো যেতে পারে। এরই মধ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা অঙ্গ (আইএফএমসি) প্রকল্প কৃষকদের সংগঠিত করে গ্রুপভিত্তিক বাজার সংযোগ তৈরির মাধ্যমে কৃষকদের ব্যবসায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের ৬১টি জেলার ৩৭৩টি উপজেলায় মোট ৮৫৪টি এ ধরনের কৃষক গ্রুপ বা কৃষক সংগঠন তৈরির মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মানসম্মত কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বাজার সংযোগ সৃষ্টি করে কৃষকবান্ধব ব্যবসার মাধ্যমে তা বিপণনের জন্য ধারাবাহিকভাবে কিছু কাজ করা হচ্ছে।
প্রথমত, এ প্রকল্পে থেকে উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে প্রকল্পের কর্মকর্তারা উপযুক্ত কৃষক সংগঠন ও কৃষক গ্রুপ নির্বাচন করছেন। ভালো সংগঠন তৈরিতেও তারা সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। গড়ে প্রতি উপজেলায় ১ থেকে ৩টি কৃষক সংগঠন নির্বাচন করা হচ্ছে। প্রতিটি কৃষক সংগঠন বা কৃষক গ্রুপে থাকেন ৩৫ জন সদস্য। কৃষক সংগঠনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। এজন্য প্রতিটি কৃষক সংগঠনের নির্বাহী কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিটি সংগঠন থেকে ৪ জন সদস্যকে নির্বাচন করা হয় যাদের বলা হয় বিজনেস ফোকাল পারসন (বিএফপি)। এ দলের ২ জন থাকেন নারী ও ২ জন পুরুষ সদস্য। কৃষক সংগঠনের সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই তারা নির্বাচিত হন। এসব সদস্যদের নিবিড়ভাবে ১০ দিনব্যাপী কৃষক সংগঠন ও বাজার সংযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা সাংগঠনিক ও ব্যবসায়িক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পান।
প্রশিক্ষণ শেষে উপজেলা কৃষি অফিসে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষক সংগঠন ও বাজার সংযোগ বিষয়ক একদিনের একটি কর্মশালা আয়োজন করেন যেখানে সংগঠন ও ব্যবসা সংশ্লিষ্ট উপজেলার অন্যান্য বিভাগীয় কর্মকর্তা, উপকরণ ব্যবসায়ী, আড়ৎদার প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় কৃষক সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বিএফপিবৃন্দ তাদের ব্যবসা পরিকল্পনা সবার সামনে উপস্থাপন ও আলোচনা করেন। তাদের ব্যবসা কার্যক্রমে উপস্থিত অন্যান্য সবাইকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে এবং কোন বিভাগ থেকে তারা কী কী সেবা ও সুযোগ পেতে পারে সে ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার পর কৃষক সংগঠনের সাথে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিসারের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বিএফপিবৃন্দ স্ব স্ব এলাকায় ফিরে গিয়ে কৃষক সংগঠনের অবশিষ্ট সদস্যদের ৮ দিনে কৃষক সংগঠন ও বাজার সংযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন। উদ্দেশ্য যে, সংগঠনের সব সদস্য যাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে দক্ষতার সাথে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করতে পারেন। নারী সদস্যরা যাথে নারীবান্ধব কৃষি ব্যবসা নিয়ে ভাবতে ও করতে পারেন সেজন্য তাদের বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে তারা ব্যবসা পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার প্রাথমিক মূলধন হিসেবে কৃষক সংগঠনকে আইএফএমসি প্রকল্প থেকে প্রত্যেক সংগঠনকে ৩৫০০০ টাকা দেয়া হয় যদি তারা নিজেরা ব্যবসার জন্য সমপরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে রাজি হয়। ব্যবসার জন্য এলাকায় পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা বিবেচনা করে পণ্য নির্বাচন ও তার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সংগঠনের একটি কালেকশন পয়েন্ট বা পণ্য একত্রীকরণ স্থান থাকে। সাধারণত সংগঠনের ঘর বা কোনো বাড়ির উঠোনকে কালেকশন পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কৃষক গ্রুপের সদস্যরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সে স্থানে নিয়ে আসেন। কে কতটুকু সেদিন বিক্রির জন্য নিয়ে এলেন তার তথ্য লিখে রাখা হয়। বিএফপিবৃন্দ এ কাজে সাহায্য করেন। এরই মধ্যে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিএফপিবৃন্দ বিভিন্ন বাজারে বা আড়তে সেদিনের ওই পণ্যের বাজারদর যাচাই করেন। যে বাজারে পণ্যের চাহিদা ও দাম ভালো থাকে পরিবহন খরচ বিবেচনা করে অধিক দামে যেখানে বিক্রি করা যাবে তা ঠিক করে রাখেন। এজন্য তারা একাধিক বাজারে সংযোগ স্থাপন করেন। চলতি বাজারদর অনুযায়ী উৎপাদকদের দাম সংগঠনের তহবিল থেকে সাথে সাথে পরিশোধ করে দেন। আবার বাকি রেখে বাজারে বিক্রির পরও কেউ কেউ উৎপাদকদের দাম পরিশোধ করেন। পণ্য একত্রিত হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যরা পণ্য পরিচ্ছন্ন, বাছাই বা গ্রেডিং, প্যাকিং এসব কাজ করেন।
এরপর বিএফপি বা ব্যবসার জন্য সংগঠন থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সেসব পণ্য বাজারে নিয়ে যান। বিক্রির পর ফিরে এসে লাভ-লোকসান হিসাব করে খাতায় লিখে রাখেন। সপ্তাহ বা মাস শেষে মোট লাভ-লোকসান হিসাব করেন ও লভ্যাংশ বণ্টন করেন। সাধারণত ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করার জন্য কৃষক সংগঠনের লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হয় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ ও বিএফপিদের লভ্যাংশ ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ। এর ফলে নিয়মিত কিছু না কিছু লাভ সংগঠনের তহবিলে যোগ হতে থাকে। এতে কৃষক সংগঠনের আর্থিক সক্ষমতা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কিছু সদস্যের স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দেখা গেছে, ভালো কর্মতৎপর একজন বিএফপি মাসে এভাবে বাড়িতে থেকে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। পণ্যের পরিমাণ বেশি হলে আয়ও বাড়ে। সংগঠন মজবুত থাকলে, সংগঠনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে, সঠিক নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা থাকলে এবং মান সম্মত পণ্য উৎপাদন ও জোগান অব্যাহত রাখতে পারলে এটি একটি স্থায়ী ব্যবসায়িক ও আয়বর্ধক কর্মকা-ে পরিণত হতে পারে। সারা বছর যাতে ব্যবসা ও আয়সৃজন কর্মকা- চলতে পারে সেজন্য তারা প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় শুরুতেই বছরব্যাপী একটি ব্যবসার পরিকল্পনা করে ফেলেন। এজন্য সারা বছর প্রতি মৌসুমেই তাদের কিছু না কিছু আয়ের পথ খোলা থাকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য যাতে কৃষক গ্রুপের বা সংগঠনের মাধ্যমে যাতে বিপণন বা রপ্তানি করা যায় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, আম, সবজি এসব রপ্তানিতে সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের মান এবং সুনাম ধরে রাখতে পারে বাংলাদেশেরই বিশ্বস্ত কৃষক ও কৃষক সংগঠন। সময় এসেছে কৃষকবান্ধব ব্যবসা চালু করার।

কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়*
*উপপ্রকল্প পরিচালক, আইএফএমসি প্রকল্প, খামারবাড়ি ঢাকা ও পাহাড়ি ফসল, উপকূলীয় কৃষি, শাকসবজির রোগ, মশলার চাষ, শাকসবজি চাষ ইত্যাদি গ্রন্থের রচয়িতা।


Share with :

Facebook Facebook