কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

পাট উৎপাদনে অভিবাসন রোধ ও গ্রামীণ উন্নয়ন

পাট এক ধরনের দ্বিবীজপত্রী আঁশযুক্ত গাছ। এর ছাল থেকে হয় আঁশ আর ভেতরে থাকে কাঠি। প্রাচীনকালে একে বল হতো নালিতা। কেউ কেউ মনে করেন পাটের আদি নিবাস দক্ষিণ চীন ও আফ্রিকায়। ভারতে এর চাষ শুরু হয় বাগানের উদ্ভিদ হিসেবে। প্রথমে এর ব্যবহার হতো সবজি ও ঔষধিগাছ হিসেবে। তবে বস্ত্র হিসেবেও পাটের ব্যবহার অনেক পুরনো। বাংলাদেশের গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে পাট উৎপন্ন হতো প্রায় তিন হাজার বছর আগে। ক্রমে এর উৎপাদন ও ব্যবহার বেড়েছে পাট পরিণত হয়েছে এ দেশের কৃষকের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে। বাঙালির ঐতিহ্যে ও অস্তিত্বে একাকার হয়ে মিশে গেছে সোনালি আঁশ পাট। বাংলাদেশে ৯০ দশকে পাট হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। মাঝে প্রায় ৩০-৪০ বছর পাটের এলাকা কমতে কমতে ৪.০-৪.৫ লাখ হেক্টরে নেমে যায়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক আঁশের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধির সাথে সাথে গত ২০১০-১৫ সাল পর্যন্ত পাট চাষের এলাকা বৃদ্ধি প্রায় ৭-৮ লাখ হেক্টরে পৌঁছে গেছে। শুধু তাই নয় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আগের ১২ লাখ হেক্টর এলাকা থেকে যে পরিমাণ পাট পাওয়া যেত এখন ৭.০-৮.০ লাখ হেক্টর জমি থেকেই বা তার চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, তখন ১২ লাখ হেক্টর থেকে প্রায় ৬০-৬৫ লাখ বেল পাট পাওয়া যেত আর সম্প্রতি মাত্র ৭.০-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতেই প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র অধিক পরিমাণে কাঁচা পাট আঁশ রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কমবেশি পাট উৎপাদিত হয়ে থাকে। তবে বেশি পরিমাণে পাট উৎপাদন হয় ফরিদপুর, যশোর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, জামালপুর এবং ঢাকা জেলায়। আগে পাটের  একক জমিতে উৎপাদন কম হলেও বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির বিকাশের ফলে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ১৯৬৯-৭০ সালে এ দেশে পাটের গড় ফলন ছিল ১.২৮ টন/হেক্টর, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৬-০৭ সালে  দাঁড়ায় ১.৯৮ টন/হেক্টর, যা বর্তমানে ২.০১ টন/হেক্টর হয়েছে। এ দেশের মাটি ও আবহাওয়া পাট উৎপাদনের জন্য দারুণ উপযুক্ত, কৃষকগণ ও পাট চাষে খুবই অভ্যস্ত এবং বেশি আগ্রহী।


তুলনামূলক বিচারে পাট থেকে বৈদেশিক মুদ্রার আয়  হ্রাস পেলেও বিশ্ববাজারে এখনও বাংলাদেশী পাটের আধিপত্য বিরাজমান। বাংলাদেশী কাঁচাপাট প্রধানত রফতানি করা হয়, ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইউরোপ, আইভরিকোষ্ট, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে। অপরদিকে পাটজাত পণ্য রফতানি হয় ইউরোপ, তুরস্ক, ইরান, আমেরিকা, সিরিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, জাপান, সুদান, ঘানা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রে। আমাদের কাঁচাপাট আমদানির বেলায় পাকিস্তান, চীন ও ভারত এবং পাটজাত দ্রব্য আমদানির বেলায় ইউরোপ ও তুরস্কের স্থান সবার শীর্ষে। তার কারণ পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী এখন নিরুৎসাহিত করছে পরিবেশবাদীরা, পলিথিন ও সিনথেটিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপরদিকে পাট পরিবেশবান্ধব। তাই এর চাহিদা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। এক সময় সিনথেটিকের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে গিয়েছিল পাট। এখন পরিস্থিতি পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। তাই পাটের ক্রমবিকাশমান আন্তর্জাতিক বাজার ধরার জন্য আমাদের খুবই তৎপর হওয়া প্রয়োজন।


দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিভাগের পাট চাষিরা বর্তমানে পাটের উৎপাদন এবং বাজারমূল্যে সন্তুষ্ট। ২০১৬ এর মাঝামাঝি জুন জুলাই মাসের দিকে বিশেষত, রাজশাহীর স্থানীয় হাটবাজারে প্রতি মণ পাট ১৭০০ টাকা থেকে ১৯০০ টাকা বিক্রি হয়েছে, যেখানে গত ২০১৫ সালে পাটের মূল্য ছিল মণপ্রতি ১৪০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা। বর্তমানে পরিবেশ সচেতনতার ফলে বিশ্বব্যাপী আবার পাটের চাহিদা বাড়ছে। পাটের ব্যবসা সব সময়ই বেশ রমরমা থাকে। বিভিন্ন ধাপে কাঁচাপাট ক্রয় করা হয় ভোক্তার হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রাথমিক ধাপ কৃষকের ঘর বা গ্রাম্য হাট থেকে পাট আঁশ ক্রয় করে নেয় বেপারিরা। এদের থেকে দ্বিতীয় ধাপ ক্রয় করে গুদামের মালিক ও পাট ব্যবসায়ীরা। তৃতীয় ধাপে পাট ক্রয় করা হয় নারায়ণগঞ্জ/খুলনার পাট কলগুলোতে। চতুর্থ ধাপে বা শেষ পর্যায় পাট বা আঁশজাত পণ্যের চালান হয় বিদেশে রফতানি বাজারে। এসব ধাপ অতিক্রমে কিছু বিপণন ও প্রক্রিয়াকরণ খরচ গুণতে হয়। মুনাফারও অংশ দিতে হয় প্রতিটি ধাপে তাতে ভোক্তাপ্রদত্ত দামের একটি বড় অংশের ভাগিদার কৃষক হতে পারে না বলেই পাটের কৃষক মুনাফার খুব কম অংশ পেয়ে থাকেন।


কৃষকপর্যায়ে আভিবাসন রোধ
বর্তমানে পরিবেশ গত কারণে পাটের চাহিদার বৃদ্ধি ও সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। যদিও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক গুরুত্বের বিবেচনায় পাট অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফসল তবুও বিভিন্ন সমস্যা ও বাধা যেমন কৃষি জমির অভাব, মূল্যের জন্য কৃষকের অনীহা, আঁশের বাজারজাতকরণ ও পাট কলগুলো  দৈন্যদশা ইত্যাদি কারণে এ দেশের পাট ফসল তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৩% পাট থেকে আসে এবং দেশের জিডিপিতে এর অবদান প্রায় শতকরা ৩ ভাগ। প্রতি বছর প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা কৃষক পেয়ে থাকে পাট আঁশ ও পাটখড়ি বিক্রি করে। এ দেশের প্রায় ৪০ লাখ কৃষক পাটের ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকে। এ ছাড়াও কাঁচাপাট ও পাটজাত দ্রব্য বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষেত্রে রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। পাট ফসল দেশের কর্মসংস্থানে বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করছে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তৃতভাবে। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০% ভাগ পাট চাষ এবং চাষ পরবর্তী বিভিন্ন প্রক্রিয়া যেমন- প্রক্রিয়াজাতকরণ, আঁশ বাঁধাই, গুদামজাতকরণ, পরিবহন/স্থানান্তর ও বিপণন ইত্যাদির সাথে জড়িত। বিশেষ করে পাটের আঁশ পঁচার পর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানো ইত্যাদি কাজে কৃষক পরিবারের মহিলা সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি দেশের মহিলা কর্মসংস্থানের এক বিরল উদাহরণ। পাটের আঁশ বিক্রির টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে, গ্রামীণ জনপদে সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও পরবর্তী রবিশস্য চাষের আর্থিক সহায়তা  করে থাকে। তাই পাট চাষের সাথে জড়িত কৃষকদের অন্য পেশায় বা অন্য স্থানে পেশার তাগিদে উপার্জনের জন্য স্থানান্তর হতে হয় না। পাট গোলায় থাকলে নগদ টাকা হাতে আছে বলেই তারা মনে করেন। যে কোনো প্রয়োজনে যে কোনো ভাবেই যখন তখন গোলার পাট বিক্রি করে কৃষক তার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারে। তাই কৃষকপর্যায়ে অভিবাসন রোধে পাট ফসল উৎপাদনের কোনো জুড়ি নেই।


পাট উৎপাদনে গ্রামীণ উন্নয়ন
বর্তমানে বাংলাদেশে পাটচাষির সংখ্যা ৪০ লাখ। জিডিপিতে পাট খাতের অবদান ০.২৬ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১.৪ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির ১২.৫ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে পাট উৎপাদনের কাজে। পাট শিল্পে জড়িত আছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ শ্রমিক। এর মধ্যে সরকারি সংস্থা বিজেএমসি শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ এবং বেসরকারি সংস্থা বিজেএসএ ও বিজেএমএ সংস্থা মিলে শতকরা ৬০ ভাগ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করছে। মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ উপার্জন করা হয় পাট রপ্তানি থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর, পাট দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক চতুর্থাংশ আসে কাঁচাপাট রপ্তানি থেকে। দেশের কৃষকদের জন্য নগদ অর্থের সংস্থান করে যাচ্ছে পাট। মহাজনদের বা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ, সন্তানের বিয়ে, বউয়ের শাড়ি, গয়না, শহরে জমি কেনা সবই হয় চাষিদের পাট বিক্রির অর্থ দিয়ে।অসহায় পাটচাষিরা তাদের সংগঠন থেকে স্বল্প সুদে অর্থ নিয়ে সংকট সময় পার করতে পারছে। ফলে তাদের আর মৌসুমের শুরুতে কম দামে পাট বিক্রয় করতে হচ্ছে না। সেই পাট মজুদ করে রেখে পরে বেশি দামে বিক্রি করেতে পারছেন চাষিরা, এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। এভাবে সারা দেশে চাষিদের সংগঠন গড়ে উঠলে ফড়িয়াদের চক্র ভেঙে যাবে। তখন চাষিদের আর পানির দরে পাট বিক্রি করতে হবে না। ফলে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে পাট উৎপাদনে কৃষকের সামর্থ্যরে উন্নয়ন তথা গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে থাকে।


পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য। একটি বাঙালি সংস্কৃতিরই একটি অপরিহার্য অংশ। এ দেশের কৃষকদের নগদ অর্থ উপার্জনে, কর্মসংস্থানে, দারিদ্র্য বিমোচনে, বৈদেশিক অর্থ আহরণে ও সর্বোপরি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তভাবে বিনির্মাণে পাটের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধির যে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে তাকে কাজে লাগাতে হবে পুরোপুরি। বিকাশ ঘটাতে হবে পাটভিত্তিক কল-কারখানার। সেজন্য চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে ঐতিহ্যবাহী পাটের ক্ষেত্রে সে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে বর্তমান সরকার পুরোপুরি প্রস্তুত বলেই আমদের ধারণা। বাংলার সোনালি আঁশ অদূর অভিষ্যতে তার হারানো গৌরব ফিরে পাক এ প্রত্যাশা সবার।

 

কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
*সিএসও এবং প্রধান কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বিজেআরআই, ঢাকা। মোবাইল : ০১৫৫২-৪১৬৫৩৭,
mahbub_agronomy@yahoo.com


Share with :

Facebook Facebook